Last updated Oct 17th, 2026
3

মধুপুরের ধরাতি গ্রামের এক গারো নারী 2006 সালে মারা যাওয়ার সময় তাঁর সব জমি রেখে যান চার মেয়ে আর দুই ছেলের জন্য; ছোট মেয়েকে আগেই বেছে রেখেছিলেন নকনা হিসেবে, ছেলেরা পেয়েছেন অল্প ভাগ। তাঁর স্বামীর নিজের কোনো সম্পত্তি নেই। এই এক পরিবারের গল্পেই গারো মাহারি নকমা সমাজ ব্যবস্থা-র মূল কথা ধরা আছে: মানুষের পরিচয় মায়ের মাহারি দিয়ে, সম্পত্তি থাকে একজন বাছাই-করা মেয়ের নামে, আর সংসার, গ্রাম ও বিচারের প্রধান পদ — নকমা — পুরুষের।
এই লেখা গারো সমাজের ভেতরের কাঠামো ধরে ধরে দেখায়: চাচ্চি, মাচং ও মাহারি কী, আখিম কীভাবে দুই পরিবারকে বাঁধে, নকনা ও নক্রম কীভাবে ঠিক হন, নকমার তিন স্তর, আর বিচার-সালিশে কোন অপরাধের কী সাজা। তার আগে ছোট করে গারোদের পরিচয় — কারা, কোথায় থাকেন, আদমশুমারি 2022 অনুযায়ী সংখ্যা কত, ভাষা ও ধর্ম কী। মাতৃসূত্রীয় আর মাতৃতান্ত্রিক শব্দের তফাত এবং বিভিন্ন জাতির তুলনা আলাদা লেখায় আছে — “বাংলাদেশের কোন জাতিগুলো মাতৃসূত্রীয়, কোনগুলো নয় — ‘মাতৃতান্ত্রিক’ বলাটা কেন ঠিক নয়”। পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিগুলোর পরিচয়ের জন্য রয়েছে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব।
এই লেখায় যা আছে
গারোরা বাংলাদেশের বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল ও ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ে বসবাসকারী একটি জাতি। নিজেদের তাঁরা বলেন মান্দি বা আচিক মান্দে। বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধ (লেখক গারো গবেষক সুভাষ জেংচাম) অনুযায়ী তাঁরা মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর তিব্বতী-বর্মণ শাখার বোড়ো উপশাখার মানুষ, এবং ‘গারো’ নামটিকে অনেকে বাইরে থেকে চাপানো ও অবমাননাকর মনে করেন।
নামের অর্থ নিয়ে গারো ও বাঙালি লেখকদের ব্যাখ্যা কাছাকাছি, তবে হুবহু এক নয়। 1977 সালের এক সেমিনারে গারো লেখক মণীন্দ্রনাথ মারাক লিখেছিলেন, “মান্দাই” শব্দটি মান্দি বা মান্দে থেকে এসেছে, যার অর্থ মানুষ। ‘গারো’ নামের উৎস নিয়ে তিনি চারটি মত দিয়েছেন — তিব্বতের গারু নামের এক অঞ্চলে বাস, গারো গানচিং নামের একটি উপদল, একসময় গৌড়ে রাজত্ব, কিংবা বাঙালিদের পরিহাস — এবং প্রথম ও তৃতীয়টির পাশে লিখেছেন “গবেষণা সাপেক্ষ”। আবদুস্ সাত্তারের গারোদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য (বাংলা একাডেমী, 1980) বলছে, পাহাড়ের বাসিন্দারা “আচিক” অর্থাৎ পাহাড়ের খাঁটি মানুষ, আর সমতলের বাসিন্দারা “মান্দাই” অর্থাৎ মানুষ। একই লেখক 1963 সালের এক প্রবন্ধে দুই ভাগকে লিখেছিলেন ‘আচ্ছিক’ (পাহাড়ি) ও ‘লামদানী’ (সমতলী)।
গারোদের আদি বাসভূমি নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়। বাংলাপিডিয়া চীনের সিনকিয়াং প্রদেশ থেকে তিব্বত হয়ে আসার কথা বলে; সাত্তার (1980) লিখেছেন, প্লেফেয়ার থেকে মণীন্দ্রনাথ মারাক পর্যন্ত কেউই গারোদের উদ্ভব ও নামের উৎপত্তি নিয়ে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেননি। এই লেখা সেই বিতর্কে ঢোকে না।
গারো সমাজ একাধিক ভাষিক-আঞ্চলিক দলে বিভক্ত। বাংলাপিডিয়া 13টি দলের নাম দিয়েছে — আওয়ে, আবেং, আত্তং, রূগা, চিবক, চিসক, দোয়াল, মাচ্চি, কচ্চু, আতিয়াগ্রা, মাৎজাংচি, গারা-গানচিং ও মেগাম — এবং বলছে বাংলাদেশে আবেং দলের মানুষই বেশি। মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) তালিকা দিয়েছিলেন 10টি উপদলের: আবেং, আওয়া, রুগা, মাৎছি, গারা গানচিং, জারিয়াদং, চিবক, আত্তং, দুয়াল (ব্রাক বা কৎচ) এবং মেগাম বা মিগাম। এই দলগুলো আর নিচের চাচ্চি-মাচং আলাদা জিনিস — প্রথমটি অঞ্চল ও উপভাষার ভাগ, দ্বিতীয়টি আত্মীয়তার।
আমাদের আর্কাইভে গারোদের নিয়ে একটি পুরোনো সাধারণ লেখা আছে — গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি — যাতে পোশাক, খাদ্য, দেবদেবী ও জুম-পঞ্জিকার বিবরণ আছে। এই লেখা সেগুলো পুনরাবৃত্তি করে না।
বাংলাদেশে গারোদের প্রধান বসতি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা, শেরপুরের নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী, এবং টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায়। বাংলাপিডিয়া এর বাইরে জামালপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও গাজীপুর জেলার নাম দিয়েছে। আদমশুমারি 2022 অনুযায়ী প্রায় 59% গারো ময়মনসিংহ বিভাগে আর প্রায় 31% ঢাকা বিভাগে থাকেন।
পুরোনো উৎসগুলো আরও কিছু জায়গার কথা বলে। সাত্তার (1980) ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট, শ্রীবর্দী, কলমাকান্দা, বিরিশিরি ও বারহাট্টার পাশাপাশি টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়, ঢাকার কাউরাইদ ও ভাওয়াল গড়ের কিছু অংশ, সুনামগঞ্জ মহকুমার খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়-সংলগ্ন এলাকা এবং রংপুর জেলার রৌমারী থানার নাম দিয়েছেন। মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) শ্রীপুর ও কাওরাইদের কথা আলাদা করে বলেছেন। আর্কাইভের গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি লেখায় আছে, সীমান্তের টিলা সমতল হয়ে যাওয়ায় বহু গারো মেঘালয়ে চলে গেছেন, আর মুক্তিযুদ্ধের সময়ও অনেকে দেশ ছেড়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে গারোদের ভূমিকা নিয়ে পড়ুন মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের অবদান।
মধুপুরে গারোরা আর সংখ্যাগরিষ্ঠ নন। প্রথম আলোর 2019 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোসাইটি ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট (SEHD) 2017–2018 সালে মধুপুরের 44টি বনগ্রামে জরিপ চালিয়ে মোট 47,726 জন মানুষ পায়, যার 64.61% বাঙালি ও 35.39% গারো। গারোরা নিজেদের আচিক ভাষায় মধুপুর বনকে বলেন “আবিমা” — উর্বর মাটি।
শহরেও গারোদের সংখ্যা বাড়ছে। Md. Abdul Jalil ও Mohammad Ali Oakkas (2012) নৃবিজ্ঞানী Ellen Bal-এর গবেষণা উদ্ধৃত করে লিখেছেন, 1960-এর দশক থেকে কাজ ও উচ্চশিক্ষার জন্য গারোরা ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে আসতে শুরু করেন, আর এই প্রবণতা বাড়ছে।
জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022 অনুযায়ী বাংলাদেশে গারো জনসংখ্যা 76,854 জন — পুরুষ 37,900 (49.31%), নারী 38,954 (50.69%)। দেশের মোট 1,650,478 জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত মানুষের মধ্যে এটি 4.66%, এবং সংখ্যায় গারোরা ষষ্ঠ — চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল ও ওরাওঁদের পরে।
বিভাগভিত্তিক হিসাব আসে BBS-এর জাতীয় প্রতিবেদনের (খণ্ড 1) Table P29 থেকে। শেষ কলামটি এই লেখার নিজস্ব হিসাব: ওই বিভাগের মোট ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী জনসংখ্যার কত অংশ গারো।
| বিভাগ | গারো | মোট গারোর % | বিভাগের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে গারো % |
|---|---|---|---|
| ময়মনসিংহ | 45,164 | 58.8 | 73.4 (মোট 61,561) |
| ঢাকা | 23,462 | 30.5 | 28.5 (মোট 82,324) |
| সিলেট | 6,941 | 9.0 | 5.1 (মোট 136,692) |
| চট্টগ্রাম | 728 | 0.9 | 0.1 |
| রাজশাহী | 347 | 0.5 | 0.1 |
| রংপুর | 99 | 0.13 | 0.1 |
| খুলনা | 73 | 0.09 | 0.2 |
| বরিশাল | 40 | 0.05 | 1.0 |
| বাংলাদেশ | 76,854 | 100 | 4.66 |
ময়মনসিংহ বিভাগে প্রতি চারজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত মানুষের প্রায় তিনজনই গারো। জেলা ও উপজেলার হিসাব আছে BBS-এর জেলা প্রতিবেদনের Table P17-এ। নেত্রকোনা জেলায় 21,605 জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত মানুষের 16,064 জন গারো; তার 8,527 জন দুর্গাপুর উপজেলায় (উপজেলার 10,598 জনের মধ্যে) আর 6,802 জন কলমাকান্দায় (9,374 জনের মধ্যে) — অর্থাৎ এই দুই সীমান্ত-উপজেলাতেই দেশের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ গারোর বাস। জামালপুর জেলায় 1,222 জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত মানুষের 748 জন গারো, যার 582 জন বকশীগঞ্জ উপজেলায়।
আদমশুমারির সংখ্যা আর অন্য উৎসের অনুমান মেলে না। বাংলাপিডিয়া গারো জনসংখ্যা লিখেছে “প্রায় দেড়লক্ষ”; BBS 2022 বলছে 76,854। Jalil ও Oakkas (2012) লিখেছেন, বাংলাদেশে কতজন গারো আছেন তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। আদমশুমারি ধর্ম বা ভাষা ধরে গারোদের আলাদা হিসাব দেয়নি — জাতীয় প্রতিবেদনে জাতিভিত্তিক ছক কেবল লিঙ্গ, বিভাগ, জেলা ও বয়স ধরে।
গারোদের ভাষা গারো বা মান্দি; বাংলাদেশের গারোরা একে বলেন “মান্দি খুসিক”। এটি সিনো-তিব্বতীয় পরিবারের বোড়ো-গারো শাখার ভাষা। বাংলাদেশের গারোরা প্রায় সবাই দ্বিভাষিক: ঘরে গারো, বাইরে বাংলা। ভাষাটির নিজস্ব প্রচলিত বর্ণমালা নেই; বাংলাদেশে বাংলা ও রোমান — দুই লিপিতেই লেখা হয়।
ভাষাটির শ্রেণিকরণ নিয়ে উৎসগুলো একই কথা বলে। মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) গ্রিয়ারসনের উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন, গারো তিব্বত-বর্মণ ভাষাগোষ্ঠীর, এবং কাছারী, রাভা, বড়ো, কোচ ও টিপরা প্রভৃতি জাতির ভাষার সঙ্গে এর অনেক মিল। ইংরেজি উইকিপিডিয়া একে বোড়ো-গারো উপশাখায় রাখে।
গারো ভাষার কয়েকটি উপভাষা আছে; বাংলাপিডিয়ার দলের তালিকার বানানে আওয়ে, আবেং, মাচ্চি, দোয়াল, চিসক, গারা-গানচিং ইত্যাদি। ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলছে আবেং উপভাষা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশেও বলা হয়; বিবর্তনপথের একটি লেখা (2025) লিখেছে, বাংলাদেশে আবেং-ই সাধারণ কথ্য রূপ। মার্কিন ভাষাবিজ্ঞানী Robbins Burling 2003 সালে মধুপুরের মান্দি ভাষার শব্দকোষ ও শব্দসূচি প্রকাশ করেন (The Language of the Modhupur Mandi (Garo)), যা এখন উন্মুক্তভাবে পড়া যায়।
লিপি নিয়ে উৎসভেদে কথা আলাদা। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী উনিশ শতকের শেষে মার্কিন ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা আওয়ে উপভাষাকে প্রথমে বাংলা লিপিতেই লিখিত রূপ দেন; আজ ভারতে রোমান লিপি চলে, আর বাংলাদেশে বাংলা লিপির একটি রূপ রোমানের পাশাপাশি ব্যবহৃত হয়। আর্কাইভের পুরোনো লেখায় আছে “গারো ভাষা বাংলা বর্ণমালায় লেখা হয়”। Jalil ও Oakkas (2012) লিখেছেন, বর্তমানে কোনো গারো বর্ণমালা পাওয়া যায় না।
ভাষাটি কতটা ঝুঁকিতে? Glottolog-এ Catalogue of Endangered Languages-এর মূল্যায়ন উদ্ধৃত: গারো “Vulnerable”। মূল্যায়নটি Burling (2003)-এর ভিত্তিতে বলছে, বাংলাদেশের গারোরা দোকানি, ফেরিওয়ালা, সরকারি কর্মকর্তা ও গির্জার কর্মকর্তার সঙ্গে বাংলায় কথা বলেন, শিক্ষার মাধ্যমও বাংলা; তাই ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে ভাষাটি বেশি বিপন্ন — তবু এখানেও বেশির ভাগ গারো শিশু প্রথম ভাষা হিসেবে গারোই শেখে। সমকালে মেজবাহ উদ্দিন তুহিনের 2024 সালের লেখার পর্যবেক্ষণ আরও কঠোর: অনেকে নিজের ভাষা হারিয়ে বাংলা ও ইংরেজিতে কথা বলছেন। পাহাড়ি ভাষাগুলোর লিপি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে আছে পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় 99% গারো খ্রিষ্টান, এবং তাঁদের মধ্যে রোমান ক্যাথলিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ; বাকিরা মূলত ব্যাপটিস্ট। গারোদের আদি ধর্মের নাম সাংসারেক (বানানভেদে সংসারেক)। মধুপুর গড়ের কয়েকটি গ্রামে এখনো সাংসারেক পুরোহিত — খামাল — ও তাঁর সহকারী মাদ্দক আছেন।
খ্রিষ্টধর্ম এসেছে দুই পথে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, উনিশ শতকের শেষে অস্ট্রেলিয়ান ব্যাপটিস্ট মিশনারিরা নেত্রকোনার দুর্গাপুর থানার বিরিশিরি গ্রামে কাজ শুরু করেন, আর রোমান ক্যাথলিক মিশনারিরা 1909 সালের দিকে নেত্রকোনার রাণীখং এলাকায়। চার্চ অব বাংলাদেশ ও সেভেন্থ-ডে অ্যাডভেন্টিস্ট সম্প্রদায়েরও কিছু গারো অনুসারী আছেন। মিশনারিরা শিক্ষায় জোর দেওয়ায় গারো-অধ্যুষিত প্রায় প্রতিটি গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয় হয়েছে, আর বাংলাপিডিয়া গারোদের শিক্ষার হার দিয়েছে প্রায় 80%। Jalil ও Oakkas-এর (2012) সুনামগঞ্জের 206টি পরিবারের সমীক্ষায় উত্তরদাতাদের 57.77% সাক্ষর।
সাংসারেকে খামালের ভূমিকা বড়। বাংলাপিডিয়া বলছে, খামাল অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন, কোন দেবতার কোপে অসুখ হয়েছে তা নির্ণয় করে প্রতিকার দেন; পদটি বংশানুক্রমিক নয়, যোগ্যতায় পাওয়া যায়, তবে সাধারণত পূর্ণবয়স্ক পুরুষই খামাল হন। সাত্তার (1980) একই পুরোহিতকে লিখেছেন “কামাল”। আবিমা টাইমসে 2021 সালে লুই সাংমার এক লেখায় মধুপুর গড়ের সাতজন খামালের নাম আছে — চুনিয়া, ধরাতি, সাইনামারী, কাকরাগুনি, বন্দরিয়া, বেদুরিয়া ও উত্তর জাঙ্গালিয়া গ্রামে — আর নয়নপুর, সাইনামারী, পীরগাছা, ধরাতি, হাগুড়াকুড়ি ও বেদুরিয়ায় নয়জন মাদ্দকের। সাংসারেক অনুসারীর মোট সংখ্যা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
ধর্ম বদলালেও সামাজিক কাঠামো পুরোপুরি বদলায়নি — এটিই নিচের অংশগুলোর মূল কথা। তবে 1980 সালে সাত্তার নিজেই সতর্ক করেছিলেন, তাঁর সংস্কৃতির আলোচনা কেবল যাঁরা এখনো প্রাচীন ধর্মে বিশ্বাসী তাঁদের বেলায় প্রযোজ্য, যাঁরা অন্য ধর্ম নিয়েছেন তাঁদের বেলায় নয়। তাই নিচের অনেক বিবরণ — বিশেষত বিচার ও শাস্তির — প্রথাগত সমাজের, আজকের প্রতিটি গারো গ্রামের নয়। গারো সৃষ্টিকথা ও লোককথার কয়েকটি পাঠ পাওয়া যাবে আদিবাসী সৃষ্টিকথা ও লোককাহিনীর পূর্ণ সূচি-তে।
গারো সমাজ ভেতর থেকে চলে মায়ের দিকের আত্মীয়-দলের ওপর। সবচেয়ে বড় দল চাচ্চি (সাংমা, মারাক, মোমিন ইত্যাদি), তার ভেতরে মাচং, মাচঙের ভেতরে মাহারি, আর মাহারির ভেতরে নক বা গৃহস্থালি। বিয়ের নিয়ম ঠিক করে চাচ্চি ও মাচং; সম্পত্তি পাহারা দেয় মাহারি; ঘর চালান নকনা ও নক্রম; আর বিচারে বসেন নকমা ও মাহারির পুরুষেরা।
তবে পরিভাষাগুলোর ব্যবহার উৎসভেদে আলাদা — এটি মনে রাখা জরুরি। সাত্তার (1980) ও মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) “মাচং বা মাহারী” লিখে দুটিকে একই অর্থে ব্যবহার করেছেন। Jalil ও Oakkas (2012), সুভাষ জেংচামের 1994 সালের বই উদ্ধৃত করে, তিন স্তর আলাদা করেছেন: চাচ্চি ভাগ হয় মাচঙে, মাচং ভাগ হয় মাহারিতে, আর মাহারি কয়েকটি পরিবারের ছোট রক্তসম্পর্কের দল যারা সাধারণত এক জায়গায় থাকে। নিচের ছকে প্রতিটি শব্দ, তার অর্থ এবং কোন উৎস কোন বানান লিখেছে।
| শব্দ | অর্থ | উৎসে বানান |
|---|---|---|
| চাচ্চি | সাংমা, মারাক, মোমিন প্রভৃতি বড় বহির্বিবাহী দল; কোনো কোনো উপভাষায় সাধারণভাবে “আত্মীয়” | Chatchi (Jalil ও Oakkas); চাৎচি (বিবর্তনপথ); চাতচি = ঘনিষ্ঠ আত্মীয় (সাত্তার) |
| মাচং | মায়ের দিকের নামধারী বংশ; জন্মসূত্রে আজীবন সদস্যপদ | মাচং (মারাক); মাচাং (সাত্তার); মাছং (বিভা সাংমা); ma’chong (Burling) |
| মাহারি | মাতৃবংশ; সম্পত্তি ও বিয়ের দায় যার | মাহারী (সাত্তার, মারাক); Mahari (Jalil ও Oakkas) |
| আখিম | বিয়ের সূত্রে দুই মাহারির যৌথ দায়িত্ব | আখিম (সাত্তার) |
| নকনা | উত্তরাধিকারী কন্যা | নকনা (সাত্তার); নক্না (মারাক, বাংলাপিডিয়া); নোকনা (আর্কাইভ) |
| নক্রম | নকনার স্বামী | নক্রম (সাত্তার, মারাক, সমকাল); নোকরাম (সাত্তার 1963) |
| আগাতি | নকনা ছাড়া অন্য মেয়েরা; তাঁদের স্বামী চাওয়ারী | আগাতি (মারাক); Agettey (Jalil ও Oakkas) |
| চ্রা | নারীর ভাই ও মামারা | চ্রা (সাত্তার) |
| নকমা | গৃহকর্তা; গ্রামপ্রধান (সংনি নকমা); অঞ্চলপ্রধান (আখিং নকমা) | নকমা (সাত্তার, মারাক) |
| আখিং | মাহারির যৌথ ভূখণ্ড; পুরোনো অর্থে “রাজ্য” | আখিং (সাত্তার, মারাক); আ.খিং (বিবর্তনপথ) |
| চাকলা | বৈঠক বা দরবার, যেখানে সিদ্ধান্ত ও বিচার হয় | চাকলা (সাত্তার) |
| গ্রো বা দাই | জরিমানা, অর্থদণ্ড | গ্রো, দাই (সাত্তার); গ্রো (মারাক) |
গারো নামের শেষে সবচেয়ে বেশি শোনা যায় সাংমা ও মারাক। এগুলো চাচ্চি বা বড় বহির্বিবাহী দলের নাম: একই দলের দুজনের বিয়ে নিষিদ্ধ, কারণ তাঁরা সম্পর্কে ভাই-বোন। কয়টি দল আছে, সে প্রশ্নে উৎসগুলো তিন, চার, পাঁচ ও দশ — চার রকম উত্তর দেয়।
‘চাচ্চি’ শব্দটির অর্থ নিয়েও প্রশ্ন আছে। মেঘালয়ের Rengsanggri গ্রামের নামকরণ নিয়ে Anne Hvenekilde, Caroline R. Marak ও Robbins Burling-এর গবেষণা বলছে, চাচ্চি শব্দটি কখনো কখনো সাংমা-মারাক ধরনের দলের জন্য ব্যবহার হলেও, অন্তত কিছু উপভাষায় এর অর্থ শুধু “আত্মীয়স্বজন”; তাই তাঁরা দলগুলোকে বলেছেন “exogamous groups”। সাত্তারের বইয়েও “চাতচি” এসেছে “ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজন” অর্থে।
বিয়ের নিয়মটি সব উৎসে এক। সাত্তার (1980) লিখেছেন, বিয়েতে খেয়াল রাখতে হয় যেন মারাকের সঙ্গে মারাকের, সাংমার সঙ্গে সাংমার বা মোমিনের সঙ্গে মোমিনের বিয়ে না হয়; বিয়ে হতে হবে দুটি আলাদা গোষ্ঠীর মধ্যে। Burling ও সহ-লেখকেরা আরও সূক্ষ্ম তফাত দেখিয়েছেন: যেসব অঞ্চলে সবাই সাংমা বা মারাক, সেখানে বিয়ে হতো শুধু উল্টো দলে; মোমিন, শিরা ও আরেং অন্য চার দলের যেকোনোটিতে বিয়ে করতে পারেন, কেবল নিজের দলে নয়। তাঁদের হিসাবে সাংমা-মারাক নাম কাউকে আলাদা করে চেনায় না — অনেক গ্রামে বিবাহিতদের ঠিক অর্ধেক সাংমা, অর্ধেক মারাক — কিন্তু বিয়ে আর আত্মীয়বাচক সম্বোধন এই দলই ঠিক করে দেয়। দুজন সমবয়সী সাংমা একে অপরকে ভাই-বোন ডাকতে পারেন, রক্তের সম্পর্ক খুঁজে না পেলেও।
প্রত্যেক গারো জন্মসূত্রে মায়ের মাচঙের সদস্য, এবং বিয়েতেও তা বদলায় না। মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) লিখেছেন, মাচং বা মাহারি অর্থাৎ মাতৃপদবির নাম “শতাধিকের উপরে” — যেমন রেমা, চিসিম, দাওয়া, রাংসা, আসাক্রা, রিছিল, রংমা, মাংসাং, বাংশিল। Burling ও সহ-লেখকদের অনুমান, কয়েকশো মাচঙের তালিকা করা সম্ভব।
বাংলাদেশে পরিচয়ে মাচঙের নামই বেশি ব্যবহৃত হয় — অন্তত Burling যে দুটি গ্রামে থেকেছেন, সেখানে। Burling ও সহ-লেখকেরা লিখেছেন, মেঘালয়ের গারোরা আনুষ্ঠানিক পরিচয়ে তিনটি নাম জোড়েন — নিজের নাম, মাচঙের নাম আর সাংমা বা মারাক — কিন্তু বাংলাদেশের যে দুটি গ্রামে Burling থেকেছেন, সেখানে মানুষ সাধারণত শুধু নিজের নাম ও মাচঙের নাম বলেন, সাংমা-মারাক যোগ করেন কম। তবু বাংলাদেশের সরকারি নথিতেও সাংমা-মারাক উঠে যায়। সাত্তারের (1980) মাচঙের তালিকায় রেমা, চিসিম, দাওয়া, বাশা, আসাক্রা, রিছিল, রংমা, মাংসাং, বাংশিলের পাশে সাংমা, মারাক, মোমিন ও শিরাও আছে — শেষ চারটিকে তিনি বলেছেন “প্রধান”। অর্থাৎ তাঁর হিসাবে চাচ্চি আর মাচঙের সীমারেখা আলাদা করা নেই।
মাচং কেবল নাম নয়, দায়িত্বও। Burling ও সহ-লেখকদের ভাষায়, একই গ্রামে বা পাশাপাশি গ্রামে থাকা এক মাচঙের সদস্যরা একে অপরের ওপর নির্ভর করেন, একে অপরের আচরণের জন্য যৌথভাবে দায়ী থাকেন, আর পারিবারিক সংকটে একসঙ্গে বসেন। একটি গ্রামে সাধারণত অল্প কয়েকটি মাচং থাকে, অনেক গ্রামে প্রায় সব নারী তিন-চারটির বেশি মাচঙের নন, আর প্রায়ই অর্ধেকের বেশি নারী একটি মাচঙের — যাকে ওই গ্রামের কেন্দ্রীয় মাচং ধরা হয়। মেঘালয়ের যে গ্রামে তাঁরা কাজ করেছেন, সেখানে কাউকে সরাসরি নাম জিজ্ঞেস করা কিছুটা অভদ্রতা, কিন্তু মাচং জিজ্ঞেস করায় দোষ নেই; মাচং না জানলে দুজন গারোর পক্ষে পরস্পরের সঙ্গে আচরণ ঠিক করা কঠিন।
মাচঙের ভেতরে বিয়ে গুরুতর অপরাধ। সাত্তার (1980) লিখেছেন, একই গোষ্ঠীতে বিয়েকে বলা হয় “মারাং” বা পাপ; মাচং বা মাহারির আইন ভাঙা “মাদং” বা বড় অন্যায়, আর এমন বিয়ে হলে দম্পতিকে সমাজচ্যুত করা হয়, সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। Jalil ও Oakkas (2012) সুনামগঞ্জে দেখেছেন উল্টো প্রবণতা: একই গোষ্ঠীতে বিয়ে এখন প্রায়ই দেখা যায়, আর সমাজ তা কিছুটা মেনেও নিয়েছে। তাঁদের হিসাবে মামাতো-পিসতুতো ভাইবোনের বিয়ে অনুমোদিত, কিন্তু খালাতো বা চাচাতো ভাইবোনের বিয়ে নিষিদ্ধ।
গারো বিয়ে দুজন মানুষের নয়, দুই মাহারির চুক্তি। সাত্তার (1980) লিখেছেন, বিয়ের পর স্বামী ও স্ত্রী উভয়ের মাহারির লোকেরা সম্পত্তি রক্ষা থেকে দাম্পত্য সুখ পর্যন্ত সবকিছুর দেখভাল করেন; এই যৌথ ব্যবস্থার নাম আখিম। মেয়ের মামা, ভাই, খালু ও নানা আখিমের অন্তর্ভুক্ত, আর তাঁরা খেয়াল রাখেন সম্পত্তি যেন ঠিক হাতে যায়।
আখিম সবচেয়ে স্পষ্ট হয় মৃত্যুর পর। সাত্তারের বর্ণনায়, নকনা মারা গেলে বিপত্নীক স্বামীর জন্য আরেকজন স্ত্রী জোগাড়ের দায় মৃতার মাহারির; আর স্বামী মারা গেলে বিধবার জন্য নতুন স্বামী খুঁজে দেয় মৃত স্বামীর আখিমের লোকেরা। এই ব্যবস্থার নাম সাপ্পা (বিভা সাংমার বানানে ছাপ্পা)। সাপ্পার বয়স-অসমতা নিয়ে গারো নারী লেখকদের সমালোচনা মাতৃসূত্রীয় জাতিগুলো নিয়ে আমাদের আলাদা লেখায় আছে; এখানে কেবল কাঠামোটুকু।
নতুন স্বামী গ্রহণের আগে বিধবাকে একটি অনুষ্ঠান পালন করতে হয় — “রাংদি মিকচি গালা”, সাত্তারের ব্যাখ্যায় যার অর্থ “অশ্রু বিসর্জন করা”: স্বামীর বাড়িতে গিয়ে কিছুদিন কান্নাকাটি করা। এরপর তিনি ফিরে আসেন, আর কিছুদিন পর আবার শ্বশুরবাড়ি যান “রাংদিক গা আ” — দ্বিতীয় স্বামী প্রার্থনা করতে। মানকদের (আপনজনদের) মতের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় স্বামী নিলে অর্থদণ্ড হয়।
আখিম থেকে বেরোনোর পথও নিয়মে বাঁধা। সাত্তার লিখেছেন, স্ত্রীর মৃত্যুর পর মৃতার মাহারি যদি নতুন স্ত্রী দিতে না পারে, তাহলে চাকলা বা দরবার বসে, আর সেই মাচং কিছু অর্থদণ্ড বা দাই দিয়ে বিপত্নীককে আখিমমুক্ত করে। শুধু স্ত্রীপক্ষ মুক্ত করলেই হবে না, নিজের পক্ষের আখিমের অনুমতিও লাগবে। নতুন স্ত্রীকে যদি মৃতার মাচঙের চাতচি ও চ্রা গ্রহণ না করেন, তাহলে তিনি সম্পত্তিতে কোনো অধিকার পান না। আর কেউ স্ত্রীর মাহারি ও আখিমের মত ছাড়া অন্য মাচঙে বিয়ে করলে তাঁকে “গ্রো” দিতে হয় এবং মৃত বা তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর সম্পত্তিতে তাঁর আর কোনো অধিকার থাকে না; সে সম্পত্তি থেকে যায় স্ত্রীর চ্রা অর্থাৎ ভাই ও মামার অধিকারে।
একই বইয়ে আরও দুটি ব্যবস্থার কথা আছে, দুটিই সম্পত্তিকে মাহারির ভেতরে রাখার জন্য। প্রথমটি “আনচাপা জিগ্গীতি”: গৃহকর্তা নকমা ও তাঁর মেয়ে নকনা দুজনেই মারা গেলে নক্রম তাঁর শাশুড়িকে, অর্থাৎ গৃহকর্ত্রীকে বিয়ে করেন, আর শাশুড়িই তখন নকনার ভূমিকা নেন। দ্বিতীয়টি দুই স্ত্রীর ব্যবস্থা: প্রথম স্ত্রী “জিকমা”, দ্বিতীয় “জিগ্গীতি”; জিকমাই সংসারের সর্বময় কর্ত্রী। দুজন একই মাচঙের হলে জিকমার মৃত্যুর পর জিগ্গীতি কর্ত্রী হন; আলাদা মাচঙের হলে জিকমার মাচং নিজেদের মধ্য থেকে নকনা নিযুক্ত করে। বহুবিবাহ প্রশ্নে আর্কাইভের গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি লেখা ভিন্ন কথা বলে: “বহুবিবাহ গারো সমাজে নেই”, তবে কেউ দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাইলে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি লাগে এবং সংসারে প্রথম স্ত্রীর অধিকারই বেশি থাকে।
নকনা হলেন পরিবারের সেই মেয়ে, যাঁর নামে সম্পত্তি থাকে এবং যিনি মা-বাবার দেখাশোনা করেন; সাধারণত ছোট মেয়ে। কে নকনা হবেন, তা ঠিক হয় চাকলায় — মায়ের মাহারি, আখিমের লোক আর গোষ্ঠীপ্রধান নকমার উপস্থিতিতে — তবে চূড়ান্ত মত মায়ের। নকনার স্বামী নক্রম, আর তিনি কে হতে পারেন সে বিষয়ে কঠোর নিয়ম ছিল।
সাত্তার (1980) বাছাইয়ের তিনটি পরিস্থিতি আলাদা করে লিখেছেন। প্রথমত, ছোট মেয়ে অনুপযুক্ত হলে অন্য মেয়েদের মধ্য থেকে নকনা ঠিক হয়; তখন আখিমের লোক ও মেয়ের মাহারির সদস্যরা চাকলায় বসেন। দ্বিতীয়ত, পরিবারে মেয়ে না থাকলে মা তাঁর “মানক” — বোন বা খালার মতো আপনজন — কারও অবিবাহিত মেয়েকে নকনা করতে পারেন; কখনো মায়ের চ্রার মত নেওয়া অপরিহার্য হয়, আর মেয়ের মা-বাবার অনুমতিও লাগে। তৃতীয়ত, মেয়েরা নাবালিকা থাকতে মা মারা গেলে মায়ের ভাই, মামা বা মাহারির কেউ অভিভাবক হন, আর মেয়েরা বড় হলে “সাধারণত বড় মেয়েকেই” নকনা করা হয় — ছোট মেয়ের নিয়মের এটি একটি স্পষ্ট ব্যতিক্রম। মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) মেয়েহীন পরিবারের ক্ষেত্রে বোনের মেয়ে বা নিকট আত্মীয় কোনো কন্যাকে দত্তক নেওয়ার কথা লিখেছেন; গারো ভাষায় এর নাম দেরাগাতা। মারাক আরও লিখেছেন, সম্পত্তি উইল করা গারো আইনের বাইরে। সাত্তারের শর্ত, দত্তক কন্যাকে স্ত্রীর মাচঙেরই হতে হবে।
নক্রম কে হবেন, এখানে দুই উৎসের কথা আলাদা। মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) লিখেছেন, নক্রম হন মেয়ের পিতার আপন ভাগ্নে অর্থাৎ বোনের ছেলে, আর অন্য কেউ নক্রম হয়ে সম্পত্তি ভোগদখল করতে পারেন না; বিবর্তনপথের লেখাও (2025) একই কথা বলে। সাত্তার (1980) লিখেছেন, নকনাকে বিয়ে দেওয়া হয় “আপন মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে”। প্রথম মতে বর মেয়ের পিসতুতো ভাই, দ্বিতীয় মতে মামাতো ভাই।
অন্য মেয়েরা কী পান? মারাক লিখেছেন, পরিবারের অন্য মেয়েদের বলা হয় আগাতি, তাঁদের স্বামীদের চাওয়ারী, আর নকনা দয়া করে যা দেন তাঁরা তা-ই পান। Jalil ও Oakkas (2012) সুনামগঞ্জে একই নিয়ম পেয়েছেন — বড় মেয়েরা “Agettey”, তাঁদের স্বামীরা কয়েক বছর শ্বশুরবাড়িতে থেকে আলাদা সংসার গড়েন, আর নক্রম শ্বশুর-শাশুড়ির মৃত্যু পর্যন্ত দেখাশোনা করলে পরিবারের সম্পত্তির অধিকারী হন, যদিও তা ব্যবহারে স্ত্রী ও তাঁর আত্মীয়দের অনুমতি লাগে। সমকালের 2024 সালের লেখাও বলছে, পরিবারের সব দায়, মা-বাবার সেবাযত্ন ও ভরণপোষণ নকনা-নক্রমের।
অধিকার হারানোর নিয়মও আছে। সাত্তার (1980) লিখেছেন, নকনা ও নক্রম ব্যক্তিগত রাগে বাড়ি ছেড়ে গেলে সম্পত্তির মালিকানা হারান; কিন্তু মা-বাবা তাঁদের তাড়িয়ে দিলে চাকলা ডেকে বিচার করিয়ে তাঁরা পুনর্বহাল হতে পারেন। কোনো মেয়ে ভিন্নধর্মী যুবককে বিয়ে করলে সম্পত্তিতে তাঁর অধিকার থাকে না। নক্রম নকনা ও মেয়েদের অনুমতি ছাড়া জমি বিক্রি বা বন্ধক দিলে গারো সামাজিক আইনে তা চুরির পর্যায়ে পড়ে। দত্তক মেয়ে সম্পত্তির মালিক হতে পারেন, কিন্তু গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রীকে ছেড়ে গেলে অধিকার হারান। জমি ছাড়া পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, যুদ্ধাস্ত্র, জুম ও চাষের সরঞ্জাম, অলংকার — এসব পুত্র-কন্যা সবাই ভাগ করে পেতে পারেন, তবে সিংহভাগ পান নকনা।
বাস্তবে কেমন দাঁড়ায়, তার একটি নথিভুক্ত উদাহরণ লেখার শুরুর পরিবারটি — Philip Gain-এর 2019 সালের ডেইলি স্টার প্রতিবেদন থেকে। মধুপুরের ধরাতি গ্রামের ওই নারী ছোট মেয়েকে নকনা বেছেছিলেন, আর সেই মেয়ের স্বামী পরিবারের নক্রম। প্রতিবেদন লিখেছে, নকনা স্বেচ্ছায় না দিলে নক্রম বা তাঁদের ছেলেরা তাঁর জমির মালিক হবেন না; ছেলেরা সাধারণত সম্পত্তির ছোট ভাগ পান, সেটিও মায়ের বিবেচনায়।
নকমা শব্দটি উৎসে তিন স্তরে এসেছে: পরিবারের গৃহকর্তা নকমা, গ্রামের শাসক সংনি নকমা, আর একটি বৃহত্তর ভূখণ্ড বা আখিঙের প্রধান আখিং নকমা। তিন স্তরেই পদটি পুরুষের। সাত্তার (1980) লিখেছেন, আখিং নকমা ও সংনি নকমার পুরোনো শাসনব্যবস্থা এখন আর নেই, তবে তার একটি অবশেষ টিকে আছে; মণীন্দ্রনাথ মারাকও (1977) আখিং নকমাদের কথা লিখেছেন অতীতকালে।
সাত্তারের বইয়ে “গৃহকর্তা অর্থাৎ নকমা”, আর তাঁর মৃত্যুর পর “তার স্ত্রী অর্থাৎ গৃহকর্ত্রী”। পরিবারে নকমা পুরুষ হলেও সম্পত্তির মালিক নন — এই বৈপরীত্যের বিশদ আলোচনা “বাংলাদেশের কোন জাতিগুলো মাতৃসূত্রীয়, কোনগুলো নয়” লেখায় আছে। নকনা বাছাইয়ের চাকলায় “গোষ্ঠীপ্রধান বা নকমার ভূমিকাও উল্লেখযোগ্য”, লিখেছেন সাত্তার।
মণীন্দ্রনাথ মারাকের প্রথম প্রবন্ধ (1977) বলছে, সংনি নকমা বা গ্রাম প্রশাসক গ্রামের শাসন ও বিচার করতেন, এবং “সংনি নকমা ও লস্কর বিচার কার্য সমাধা করিতেন”; কর আদায় করতেন মৌজাদারেরা। একই সংকলনে তাঁর দ্বিতীয় প্রবন্ধে আছে, গ্রামের শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য “বংশানুক্রমে সংনি নকমা (গ্রাম শাসক) নিযুক্ত হয়”। সাত্তারও লিখেছেন, আখিং নকমার পরেই ছিল সংনি নকমা, বিচারের জন্য লস্কর, কর আদায়ে মৌজাদার।
আজ গ্রামে সংনি নকমা আছেন কি না, সে বিষয়ে একমাত্র সাম্প্রতিক উৎস বিবর্তনপথের একটি লেখা (2025), যেখানে বলা হয়েছে বর্তমানে গ্রামগুলোতে সংনি নকমা আর নেই; ছোটখাটো বিষয় গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা মীমাংসা করেন, আর গুরুতর বিষয়ে গারোরাও আদালতে যান [যাচাই প্রয়োজন]। Jalil ও Oakkas (2012) সুনামগঞ্জে একজন সম্প্রদায়-নেতার কথা লিখেছেন, যিনি সাধারণত উঁচু পারিবারিক মর্যাদার ভিত্তিতে বাছাই হন এবং পালাক্রমে কোন পরিবার উৎসবের আয়োজন করবে তা ঠিক করেন; তাঁকে তাঁরা নকমা বলেননি।
মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) লিখেছেন, যুবকদের জন্য গ্রামের মাঝখানে একটি ঘর তোলা হয় — নাকপান্থে বা নকপান্থে — আর সংনি নকমা প্রয়োজনমতো এই ঘরকে বিচারালয় হিসেবে ব্যবহার করেন। দ্বিতীয় প্রবন্ধে তিনি যোগ করেছেন, ঘরটি যুবকদের বাস, নকমার বিচার এবং আমোদ-প্রমোদের জন্য, আর এতে মেয়েদের প্রবেশাধিকার নেই। আর্কাইভের পুরোনো লেখাতেও একই বিবরণ আছে।
মারাক (1977) ও সাত্তার (1980) দুজনেই আখিং মানে লিখেছেন “রাজ্য” আর নকমা মানে “রাজা”। মারাকের বিবরণে প্রাচীনকালে গারোদের মধ্যে অনেক আখিং নকমা ছিলেন, প্রত্যেকে নিজের আখিঙের “সর্বেসর্বা শাসক”, আর প্রজারা তাঁকে আউইল বা ভূমিকর দিত। সাত্তার লিখেছেন, রাজ্যের রাজাই ছিলেন সর্বময় কর্তা এবং দণ্ডমুণ্ডের মালিক। মারাক জুম-পঞ্জিকা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট কাজ দেখিয়েছেন: বছরের দশম মাস কিলকজায় (নভেম্বরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি) আখিং নকমা নতুন জমি — আ’দাল — চাষের জন্য বিতরণ করেন। আর্কাইভের লেখায় এই পঞ্জিকা একই রূপে আছে।
প্রথাগত নিয়মে আখিং বা মাহারির ভূমি কোনো একক ব্যক্তির নয়, মাহারির যৌথ সম্পত্তি; মাহারির সদস্যদের অনুমতি ছাড়া তা বিক্রি, বন্ধক বা উইল করা যায় না। দলিলের হিসাবে ছবিটা ভিন্ন: মধুপুরের 44টি বনগ্রামে গারো পরিবারের মাত্র 4%-এর বসতবাড়ির সিএস বা আরওআর দলিল আছে।
বিবর্তনপথের লেখা (2025) লিখেছে, “আ. খিং ভূমির মালিক মাহারী। এটি মাহারীর যৌথ সম্পত্তি”, এবং মাতৃসূত্রীয় প্রথায় মাহারির জমি কেউ বিক্রি করতে পারতেন না। সাত্তার (1980) একই নীতি লিখেছেন অপরাধের তালিকায়: চ্রা, চাতচি ও আখিম সদস্যদের অনুমতি ছাড়া জমি বিক্রি, বন্ধক বা উইলের চেষ্টা শাস্তিযোগ্য। তাঁর সারকথা — গারোদের বিষয়সম্পত্তি যুগ যুগ ধরে মাতৃগোষ্ঠীর মাহারি বা মাচংভুক্ত সদস্যরাই রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন।
দলিলের অভাব পুরোনো সমস্যা। আর্কাইভের গারো ইতিহাস ও সংস্কৃতি লেখায় আছে, গারোরা ঐতিহাসিকভাবে ভূমিহীন; অনেকের দখলে জমি থাকলেও দখলিস্বত্ব ছাড়া দলিল নেই। একই লেখা বলছে, গোত্রভিত্তিক মালিকানার জমি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের পর দলিল করে ব্যক্তিমালিকানায় দেওয়া হয়েছিল। ওপরের 4% হিসাবটি প্রথম আলোর 2019 সালের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত SEHD-এর 2017–2018 সালের জরিপের; একই জরিপে বাঙালি পরিবারের ক্ষেত্রে হারটি 13%।
দলিল যেখানে আছে, সেখানে নিয়মও বদলাচ্ছে। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, মা-বাবা এখন জীবিত অবস্থাতেই ছেলের নামে জমি রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন। সাত্তারের বইয়েই 1980 সালে লেখা ছিল, নকনা কেবল ছেলে রেখে মারা গেলে সাধারণত তাঁর বোন বা বোনের মেয়েরা সম্পত্তি দাবি করেন, তবে “ইদানীং” এসব ক্ষেত্রে পুত্রদেরও সম্পত্তি পেতে দেখা যায়।
প্রথাগত গারো সমাজে বিচার করতেন নকমা বা গোষ্ঠীপ্রধান, নক্রম, চ্রা, চাতচি ও কামাল (বাংলাপিডিয়ার বানানে খামাল); বিচার বসত চাকলায়। সাজা মূলত জরিমানা — গ্রো বা দাই — আর শুদ্ধিকরণের খরচ, যাকে বলা হয় সামরাং। সাত্তার (1980) লিখেছেন, জটিল মামলা বাংলাদেশ সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
সাত্তার অপরাধকে দুই স্তরে ভাগ করেছেন: “মাদং” বা বড় অন্যায়, আর “বাকদং” বা ছোট অন্যায়। অবৈধ প্রেম, মাহারি বা মাচং-বহির্ভূত বিয়ে মাদং পর্যায়ের। গুরুতর অপরাধের আরেক নাম “মারাং”। নিচের ছকে তাঁর বইয়ে দেওয়া উদাহরণগুলো — এগুলো 1980 সালের প্রকাশিত বিবরণ, বর্তমানের প্রতিটি গ্রামের চর্চা নয়।
| অপরাধ বা পরিস্থিতি | সাত্তারের বিবরণে মীমাংসা |
|---|---|
| অবিবাহিত যুবতী গর্ভবতী | গোষ্ঠীপ্রধানেরা দরবার বসান; মাহারিতে বিয়ে চললে অনুষ্ঠান করে বিয়ে, না চললে ছেলে মেয়েটি ও সন্তানের বারো বছরের খোরপোশ দেন; দরবারের খরচ হিসেবে টাকা ও কয়েক বোতল মদ জরিমানা |
| জারজ সন্তানকে সমাজে নেওয়া | সন্তান অন্যদের সমান মর্যাদা পায়, তবে আগে “সামরাং” অনুষ্ঠান; জরিমানার টাকায় গ্রামবাসীকে খাওয়ানো হয় |
| ব্যভিচার | অর্থদণ্ড ও মদ; সংক্ষুব্ধ মাচঙের মানক “গ্রো” দাবি করেন |
| সন্তানের পিতৃত্ব নিয়ে অস্বীকার | মাতব্বরদের সামনে গরম জলে ডিম তোলার পরীক্ষা, অথবা দুজনকে পুকুরে ডুব দেওয়ানো; দোষী অর্থদণ্ড ও শাস্তি দুটোই পান |
| ভিন্নধর্মীকে বিয়ে | যুবতী সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত ও গ্রাম থেকে বহিষ্কৃত |
| হাতেনাতে চোর ধরা | “কপালে চারা দিয়ে” সারাদিন সূর্যের দিকে মুখ করে দাঁড় করানো; চারা পড়ে গেলে পিটুনি; অপরাধ সামান্য হলে এক হাজার বার কান ধরে ওঠবস, নয়তো মাতব্বরদের সামনে দশ হাত জায়গা নাক ঘষা |
| সন্দেহভাজন চোর দোষ স্বীকার না করলে | গভীর বনে গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা; বিশ্বাস, দোষী হলে বন্য জন্তু খেয়ে ফেলবে |
| তালাক | স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই গ্রাম্য বিচারের সামনে আসতে হয়; সিদ্ধান্ত মাতব্বরদের; দোষী সামরাং-এর অর্থদণ্ড দেন |
| অবিশ্বাসী স্ত্রী তালাক চাইলে | স্বামীকে গ্রো দিতে হয় না; তালাকপ্রাপ্তা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত; নির্দোষ স্বামীকে স্ত্রীর মাচং থেকে আবার সাপ্পা দেওয়া হয় |
মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) প্রাচীনকালের বিচার নিয়ে লিখেছেন, দোষীকে গ্রো অর্থাৎ অর্থদণ্ড দিতে হতো, আর বিচারে জটিলতা দেখা দিলে অগ্নিপরীক্ষা ও জলপরীক্ষায় দোষী-নির্দোষ নির্ধারণ হতো। সাত্তারের বইয়ে আরও কিছু নিষেধের কথা আছে, যেগুলো ভাঙলে শাস্তি দেয় মানুষ নয়, অদৃশ্য শক্তি — এমনটাই বিশ্বাস: জুমের কিছু নতুন ফসল ওয়ানগালা পূজায় দেবতার উদ্দেশে উৎসর্গ না করে খাওয়া চলে না; নতুন ঘরে “নক মিত্তের” বা গৃহদেবতার নামে উৎসর্গ না করে বাস করা যায় না। তাঁর বাক্যে, আইন-শৃঙ্খলা মেনে চলা গারোদের ধর্মীয় বিশ্বাসেরই অংশ।
উৎসগুলো চারটি পরিবর্তন বারবার দেখাচ্ছে: সম্পত্তিতে ছেলেদের ভাগ বাড়ছে, যৌথ পরিবার ভেঙে একক পরিবার হচ্ছে, মাচঙের বিয়ের নিয়ম শিথিল হচ্ছে, আর প্রথাগত গ্রাম-শাসনের জায়গা নিচ্ছে গণ্যমান্য ব্যক্তি, গির্জা ও আদালত। তবে কাঠামোটি ভেঙে পড়েনি — সুনামগঞ্জের এক সমীক্ষায় দশটির নয়টি পরিবারই এখনো যৌথ।
Jalil ও Oakkas-এর (2012) সুনামগঞ্জের 206টি পরিবারের মধ্যে 187টি যৌথ (90.78%) আর 19টি একক (9.22%); 47.57% পরিবারের সদস্য 7–9 জন। তবু তাঁরা লিখেছেন, তরুণেরা শ্বশুরবাড়িতে থাকতে কম আগ্রহী, শিক্ষা ও চাকরির জন্য পরিবার ছড়িয়ে পড়ছে, আর আধুনিক গারো পরিবারে বয়োজ্যেষ্ঠ নারী অনেকটাই “প্রতীকী প্রধান”। তাঁদের ব্যাখ্যায় পরিবর্তনের দুই কারণ — বাঙালি সমাজের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা আর খ্রিষ্টধর্ম। বিয়েও এখন বেশির ভাগ খ্রিষ্টীয় রীতিতে হয়; পুরোনো “বর ধরে আনা” বিয়ে ও থুনপা বিয়ে বাংলাদেশে খুব কম দেখা যায়।
সম্পত্তির দাবিও বদলাচ্ছে। Philip Gain-এর প্রতিবেদন (ডেইলি স্টার, 2019) লিখেছে, গারো ও খাসি দুই মাতৃসূত্রীয় সমাজেই পুরুষেরা নানা রূপে সম্পত্তিতে অধিকার দাবি করছেন; প্রতিবেদনে উদ্ধৃত একজন গারো বলেছেন, তাঁরা নকনা-নক্রম প্রথা এমনভাবে বদলাতে চান যাতে নারী-পুরুষ সমান ভাগ পান। বাংলাপিডিয়া একই দিকের পরিবর্তন লিখেছে — ছেলের নামে জমির দলিল। শিক্ষিত ছেলেদের সন্তানের ওপর নিজেদের পদবি চাপানোর প্রবণতা নিয়ে গারো লেখিকা বিভা সাংমার 1977 সালের সমালোচনা মাতৃসূত্রীয় জাতিগুলো নিয়ে আমাদের আলাদা লেখায় বিস্তারিত আছে।
নামকরণেও তফাত দেখা যায় সীমান্তের দুই পাশে। Burling ও সহ-লেখকেরা লিখেছেন, বাংলাদেশের ক্যাথলিক গারোরা দীক্ষার সময় খ্রিষ্টীয় নাম পান, আর কখনো কখনো সেটিই দৈনন্দিন নাম হয়ে যায়। অন্যদিকে প্রথম সন্তানের নাম ধরে মা-বাবাকে “অমুকের মা”, “অমুকের বাবা” ডাকার যে রীতি তাঁরা মেঘালয়ের গ্রামে দেখেছেন, তার কাছাকাছি একটি রীতির কথা মণীন্দ্রনাথ মারাকও (1977) লিখেছেন: প্রথম সন্তানের নাম পিতা বা মাতার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়, যেমন পিতার নাম আচং, সন্তান চিরে, তো পিতা পরিচিত হন “আচং চিরে”।
আর্কাইভে সাতটি গারো লোককথা আছে, যেমন মাৎছা-দু-মাৎছা-বেৎ। তার চারটির কথক ধরণ সিং সাংমা, তুরা, গারো হিলস — অর্থাৎ গল্পগুলো মূলত মেঘালয়ের পাঠ।
গারোরা বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল ও ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের একটি জাতি; নিজেদের তাঁরা বলেন মান্দি বা আচিক মান্দে, যার অর্থ মানুষ বা পাহাড়ের মানুষ। বাংলাপিডিয়া তাঁদের মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর তিব্বতী-বর্মণ শাখার বোড়ো উপশাখার মানুষ বলে, এবং লিখেছে যে অনেক গারো ‘গারো’ নামটিকে বাইরে থেকে চাপানো ও অবমাননাকর মনে করেন। সমাজটি মাতৃসূত্রীয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী গারোদের প্রধান বসতি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া, নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা, শেরপুরের নালিতাবাড়ী ও ঝিনাইগাতী এবং টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায়; জামালপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট ও গাজীপুরেও তাঁরা আছেন। আদমশুমারি 2022 অনুযায়ী 45,164 জন গারো ময়মনসিংহ বিভাগে, 23,462 জন ঢাকা বিভাগে এবং 6,941 জন সিলেট বিভাগে থাকেন।
জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022 অনুযায়ী বাংলাদেশে গারো জনসংখ্যা 76,854 জন — পুরুষ 37,900, নারী 38,954। দেশের 1,650,478 জন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীভুক্ত মানুষের মধ্যে এটি 4.66%, আর সংখ্যায় গারোরা ষষ্ঠ। বাংলাপিডিয়া অবশ্য গারো জনসংখ্যা “প্রায় দেড়লক্ষ” লিখেছে। সূত্র: BBS জাতীয় প্রতিবেদন খণ্ড 1, Table P29।
গারোদের ভাষা গারো বা মান্দি; বাংলাদেশের গারোরা একে বলেন মান্দি খুসিক। এটি সিনো-তিব্বতীয় পরিবারের বোড়ো-গারো শাখার ভাষা, আর বাংলাদেশে আবেং উপভাষা বেশি প্রচলিত। বাংলাদেশে লেখা হয় বাংলা ও রোমান দুই লিপিতে। Glottolog-এর উদ্ধৃত মূল্যায়ন অনুযায়ী ভাষাটি “Vulnerable”, এবং ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে বেশি বিপন্ন, কারণ এখানে শিক্ষার মাধ্যম বাংলা।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় 99% গারো খ্রিষ্টান, যাঁদের বেশির ভাগ রোমান ক্যাথলিক, বাকিরা মূলত ব্যাপটিস্ট। ব্যাপটিস্ট মিশন শুরু হয় উনিশ শতকের শেষে নেত্রকোনার বিরিশিরিতে, ক্যাথলিক মিশন 1909 সালের দিকে রাণীখঙে। আদি ধর্মের নাম সাংসারেক; মধুপুরের কয়েকটি গ্রামে এখনো সাংসারেক পুরোহিত খামাল আছেন।
মাহারি গারো সমাজের মাতৃবংশ: প্রত্যেকে মায়ের মাহারির সদস্য, আর বিয়ের পরও তা বদলায় না। আবদুস্ সাত্তারের বই (1980) অনুযায়ী বিয়ের পর স্বামী ও স্ত্রী দুজনের মাহারির লোকেরা সম্পত্তি ও দাম্পত্যের দেখভাল করেন, মৃত্যুর পর নতুন সঙ্গী জোগান, আর মাহারির জমি তাঁদের অনুমতি ছাড়া বিক্রি করা যায় না। একই মাহারিতে বিয়ে নিষিদ্ধ।
উৎসভেদে উত্তর আলাদা। আবদুস্ সাত্তার (1980) ও মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) “মাচং বা মাহারী” লিখে দুটিকে সমার্থক ধরেছেন। Jalil ও Oakkas (2012), সুভাষ জেংচামকে উদ্ধৃত করে, তিন স্তর দেখিয়েছেন: চাচ্চি ভাগ হয় মাচঙে, মাচং ভাগ হয় মাহারিতে, আর মাহারি হলো কয়েকটি পরিবারের ছোট রক্তসম্পর্কের দল, যারা সাধারণত এক জায়গায় থাকে।
উৎসভেদে তিন থেকে দশ। বাংলাপিডিয়া পাঁচটি বলে — সাংমা, মারাক, মোমিন, শিরা ও আরেং; Jalil ও Oakkas-ও পাঁচটি বলেছেন, তবে বাংলাদেশে প্রধানত সাংমা, মারাক ও মোমিন। মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) চারটি “সাধারণ পদবী” দিয়েছেন, আর জুমজার্নাল আর্কাইভের একটি পুরোনো লেখা দশটি গোত্রের কথা বলে। একই চাচ্চিতে বিয়ে নিষিদ্ধ।
নকমা গারো সমাজের প্রধান — উৎসে শব্দটি তিন স্তরে আছে। পরিবারে গৃহকর্তা নকমা; গ্রামে সংনি নকমা, যিনি মণীন্দ্রনাথ মারাকের (1977) বিবরণে বংশানুক্রমে নিযুক্ত হয়ে শাসন ও বিচার করতেন; আর আখিং নকমা, একটি ভূখণ্ডের প্রধান, যাঁকে প্রজারা আউইল বা ভূমিকর দিত। তিন স্তরেই পদটি পুরুষের, যদিও সম্পত্তির মালিক নারী।
আখিং হলো মাহারির যৌথ ভূখণ্ড। মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) ও আবদুস্ সাত্তার (1980) পুরোনো অর্থে আখিংকে “রাজ্য” বলেছেন, যার প্রধান আখিং নকমা; মারাকের বিবরণে কিলকজা মাসে তিনি নতুন জুমজমি বণ্টন করতেন। প্রথা অনুযায়ী আখিং ভূমি মাহারির যৌথ সম্পত্তি, বিক্রি নিষিদ্ধ। কিন্তু মধুপুরে মাত্র 4% গারো পরিবারের বসতবাড়ির দলিল আছে (SEHD জরিপ, 2017–18)।
সাধারণত ছোট মেয়ে নকনা হন। আবদুস্ সাত্তার (1980) অনুযায়ী ছোট মেয়ে অনুপযুক্ত হলে আখিমের লোক ও মেয়ের মাহারির সদস্যরা চাকলা বা বৈঠকে বসে অন্য মেয়ে বাছেন; গোষ্ঠীপ্রধান নকমাও থাকেন, তবে মায়ের মতই চূড়ান্ত। মেয়ে না থাকলে বোন বা খালার মেয়েকে নকনা করা যায়, যাকে মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) বলেছেন দেরাগাতা।
নক্রম হলেন নকনার স্বামী, যিনি শ্বশুরবাড়িতে থেকে শ্বশুর-শাশুড়ির দেখাশোনা করেন। মণীন্দ্রনাথ মারাক (1977) লিখেছেন, নক্রম হন মেয়ের পিতার আপন ভাগ্নে, অর্থাৎ পিসতুতো ভাই; আবদুস্ সাত্তার (1980) লিখেছেন, নকনাকে বিয়ে দেওয়া হয় আপন মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে। নক্রম নকনা ও মেয়েদের অনুমতি ছাড়া জমি বিক্রি বা বন্ধক দিতে পারেন না।
প্রথাগতভাবে বিচার করতেন নকমা বা গোষ্ঠীপ্রধান, নক্রম, চ্রা অর্থাৎ মামা-ভাই, চাতচি ও কামাল বা পুরোহিত; বিচার বসত চাকলা বা দরবারে। আবদুস্ সাত্তার (1980) অনুযায়ী সাজা মূলত গ্রো বা দাই অর্থাৎ জরিমানা, আর শুদ্ধিকরণের খরচ সামরাং; জটিল মামলা সরকারের কাছে যায়। একটি সাম্প্রতিক অনলাইন লেখা বলছে, গুরুতর বিষয়ে গারোরা এখন আদালতে যান।
আবদুস্ সাত্তার (1980) লিখেছেন, একই গোষ্ঠীতে বিয়েকে বলা হয় “মারাং” বা পাপ, আর মাচং বা মাহারির আইন ভাঙা “মাদং” বা বড় অন্যায়; এমন দম্পতিকে সমাজচ্যুত করে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হতো ও গ্রাম থেকে তাড়ানো হতো। Jalil ও Oakkas-এর (2012) সুনামগঞ্জের সমীক্ষা অবশ্য বলছে, এমন বিয়ে এখন প্রায়ই দেখা যায় এবং সমাজ কিছুটা মেনে নিয়েছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:উত্তরাধিকার, গারো, গারো সমাজ, প্রথাগত আইন
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।