Last updated Oct 23rd, 2026
0

পাজন হলো চাকমাদের বিজু উৎসবের প্রধান খাবার: অনেক রকম সবজি, বুনো শাক, কন্দ আর শুঁটকি একসঙ্গে রেঁধে তৈরি এক তরকারি, যা মূল বিজুর দিন প্রতিটি ঘরে অতিথিকে প্রথমেই খেতে দেওয়া হয়। কত পদের সবজি লাগে, তার একক কোনো উত্তর নেই; প্রকাশিত উৎসগুলোতে সংখ্যাটি 5 থেকে 150 পর্যন্ত, আর প্রচলিত বিশ্বাস হলো বিজুর দিন অন্তত সাত বাড়ির পাজন খেলে সারা বছর রোগব্যাধি দূরে থাকে।
এই লেখায় পাজন নিয়ে প্রকাশিত প্রতিটি দাবি উৎসের নামসহ পাশাপাশি রাখা হলো: কত পদের সবজি, কোন কোন সবজি, নামটি কোথা থেকে এল, কত বাড়িতে খেতে হয়, আর অন্য জনগোষ্ঠী একে কী নামে ডাকে। সঙ্গে আছে বিজুর অন্য খাবার ও পানীয়, অর্থাৎ পিঠা, জগরা ও দোচোয়ানি, এবং ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা ও মারমাদের নববর্ষের খাবার।
বিজুর তিন দিনের পুরো আচার-ক্রম আছে আমাদের লেখা বৈসাবি: বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুর আলাদা আচার-ক্রম-এ। চাকমা রান্নার পদ্ধতি, পিঠা ও রোজকার পদ নিয়ে বিস্তারিত আছে চাকমা খাবার ও রান্না: গোরাং, হেবাং, বাচ্ছুরি আর জুমের ভাত-এ, আর সিদোল ও নাপ্পি কোথা থেকে আসে তা আছে পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি-তে। এখানে সেগুলো আবার বলা হয়নি।
সূচিপত্র
পাজন বহু রকম সবজি মিশিয়ে রাঁধা একটি তরকারি, চাকমাদের বিজুর দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ মূল বিজুর দিন, এটি রান্না ও পরিবেশন হয়। মূল বিজু পড়ে চৈত্রের শেষ দিনে। এদিন যে-ই ঘরে আসুক, আপ্যায়ন শুরু হয় পাজন দিয়ে।
জুমজার্নালের আর্কাইভে সংরক্ষিত তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা বইয়ে ক্রমটি এভাবে দেওয়া: ফুল বিজুর দিন দুপুরের পর গ্রামের মেয়েরা বনে ও খেতে সবজি জোগাড় করতে যান, পুরুষেরা যান শিকারে বা মাছ ধরতে। পরদিন, মূল বিজুর সকালে স্নান সেরে এসে মেয়েরা আগের দিনের জোগাড় করা সবজি মিশিয়ে পাজন রাঁধেন এবং ঘরে আসা গ্রামবাসীকে খেতে দেন।

সংবাদমাধ্যমও দিনটি একই বলছে। দ্য ডেইলি স্টার 2018 সালে লিখেছে, দ্বিতীয় দিন মূল বিজুতে “পাজন” রান্না হয়, যার উপকরণ আসে জঙ্গল থেকে। দ্য ডেইলি স্টারের 2026 সালের একটি লেখায়ও পাজনকে বিশেষভাবে বিজুর দ্বিতীয় দিনের খাবার বলা হয়েছে। প্রথম আলো 2016 সালে লিখেছে, ফুল বিঝুর পরের দিন মূল বিঝু “মূলত খানাপিনার জন্য বরাদ্দ”, সেদিন সদর দরজা সব অতিথির জন্য খোলা থাকে আর ভোজন শুরু হয় পাজন দিয়ে।
প্রস্তুতি অবশ্য শুরু হয় আগের দিন থেকে। দ্য ডেইলি স্টারের 2016 সালের প্রতিবেদনে (ত্রিবেণী চাকমা, ইংরেজিতে Tribeni Chakma) আছে, নববর্ষের আগের দিন পাহাড়ের নারীরা পাজনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বাংলা ট্রিবিউন 2026 সালে লিখেছে, সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে পাড়ায় পাড়ায় পাজনের সবজি কাটা শুরু হয়।
পাজন কেবল বিজুর খাবারও নয়। আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখাটি জানায়, আষাঢ়ের 7 তারিখ হালপালনির দিনেও “বিজুর মতো” প্রতি বাড়িতে মদ, পাজন ও নানা খাবার পরিবেশন করা হয়।
পাজনে কত পদের সবজি লাগে, তার কোনো সর্বজনস্বীকৃত সংখ্যা নেই। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখা বলে ন্যূনতম 5 পদ, অনেক সময় 100-র বেশি; সংবাদমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি আসে “কমপক্ষে 32” আর “30 থেকে 40”; একজন রাঁধুনি 100 থেকে 150 পদের কথাও বলেছেন। নিচের ছকে প্রতিটি দাবি তার উৎসের পাশে রাখা হলো।
| কত পদ | কে বলছেন / কোথায় | উৎস ও সাল |
|---|---|---|
| ন্যূনতম 5; অনেক সময় 100-র বেশি | লেখকের বর্ণনা: সবাই সবজির সংখ্যা বাড়ানোর চেষ্টা করেন | “চাকমা জাতি”, জুমজার্নাল আর্কাইভ |
| 5 প্রকার | বৈসাবি নিবন্ধের বিজু অংশ | বাংলা উইকিপিডিয়া |
| 7 থেকে 35 | রাঙামাটির এক কিশোর প্রতিবেদকের লেখা | বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, 2023 |
| প্রতি বাড়িতে 10 থেকে 25 | রাঙামাটি প্রতিনিধির প্রতিবেদন | প্রথম আলো, 2019 |
| প্রায় 20 | ফুল বিজুতে সংগ্রহ করা শাকসবজি | কিশোর আলো, 2023 (হালনাগাদ 2026) |
| 20 থেকে 30; আবার 25 থেকে 30 বা তারও বেশি | একই প্রতিবেদনে দুটি পরিসর | প্রথম আলো, 2016 (হরি কিশোর চাকমা) |
| কমপক্ষে 20 থেকে 30 | পাহাড়ি খাবার নিয়ে ফিচার | ঢাকা ট্রিবিউন, 2024 |
| কমপক্ষে 22 | 85 বছর বয়সী Mondakini Chakma | দ্য ডেইলি স্টার, 2016 |
| “একসময় বলা হতো” কমপক্ষে 22 | রজত কান্তি রায়ের লেখা | প্রথম আলো, 2020 (পুনঃপ্রকাশ 2023) |
| 25 থেকে 30 | “পাচন” নামে, সব জনগোষ্ঠীর বৈসাবি প্রসঙ্গে | বাংলা উইকিপিডিয়া |
| 32 (বত্রিশ); “প্রকৃত” পাজনে 36; সব না পেলে কমপক্ষে 20 | বিজু নিয়ে শিক্ষামূলক পাতা | অনুশীলন (onushilon.org) |
| 36; ন্যূনতম 20 | বিজু উৎসব পাতা | বাঘাইছড়ি উপজেলা তথ্য বাতায়ন |
| কমপক্ষে 32; কোনো কোনো বাড়িতে প্রায় 100 | রাঙামাটির বাসিন্দাদের বক্তব্য | বাংলা ট্রিবিউন, 2025 ও 2026 |
| কমপক্ষে 32; অনেকে 100-র বেশি | হারি বৈসু ও মূল বিজু নিয়ে প্রতিবেদন | দৈনিক জনকণ্ঠ, 13 এপ্রিল 2025 |
| 32 | ছবির প্রতিবেদন: “বলা হয়, 32 পদের সবজি দিতে হয়” | হাল ফ্যাশন, 2025 |
| 30 বা 40; 30-এর কম হলে “জমে না” | রাঙামাটি প্রতিনিধির প্রতিবেদন | প্রথম আলো, 2025 |
| প্রায়ই 30 থেকে 40 | বিজু নিয়ে লেখা | দ্য ডেইলি স্টার, 2026 |
| 30 থেকে 40 | রাঙামাটি থেকে প্রতিবেদন | প্রতিদিনের বাংলাদেশ, 2023; দৈনিক জনকণ্ঠ, 14 এপ্রিল 2025 |
| 30 থেকে 50 | রাঙামাটির পাজন রান্নার প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রতিবেদন | প্রথম আলো, 2023 |
| সর্বনিম্ন 35; কেউ কেউ 100 থেকে 150 | লাবনী চাকমা | দেশ সংবাদ, 2025 |
| আগে 107; এখন 20 থেকে 30 | “পাহাড়ি লোককথা” ও মাসানু রোয়াজা | ইত্তেফাক, 2026 |
ছকটি থেকে তিনটি বিষয় স্পষ্ট হয়। এক, ন্যূনতম সংখ্যা উৎসভেদে 5, 7, 20, 22, 30, 32 বা 35; কোনো একটি সংখ্যাকে সবার মানা “নিয়ম” বলার মতো উৎস নেই। দুই, সাম্প্রতিক সংবাদমাধ্যমে “32” সংখ্যাটি বারবার ফিরে আসে, কখনো বাসিন্দাদের মুখে, কখনো প্রতিবেদকের নিজের কথায়। তিন, প্রায় সব উৎসই একটি কথায় একমত: সবজি যত বেশি, পাজন তত ভালো। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখা বলছে সবাই সবজির পদ বাড়াতে চেষ্টা করেন; Mondakini Chakma ডেইলি স্টারকে বলেছেন, যত বেশি সবজি, স্বাদ তত ভালো।
একই পত্রিকার ভিন্ন বছরের প্রতিবেদনেও সংখ্যা মেলে না। প্রথম আলো 2019 সালে লিখেছে প্রতি বাড়িতে 10 থেকে 25, 2023 সালে 30 থেকে 50, আর 2025 সালে 30 বা 40। দৈনিক জনকণ্ঠ এক দিনের ব্যবধানে দুটি প্রতিবেদনে লিখেছে “কমপক্ষে 32” আর “30 থেকে 40”।
পাজনের উপকরণের কোনো স্থির তালিকা নেই; প্রতিটি উৎস কিছু নাম দিয়েছে। প্রায় সব তালিকায় আছে কাঁচা কাঁঠাল, তারা, বেতের কচি অংশ, বুনো আলু বা কন্দ আর শুঁটকি। বাকিগুলো মৌসুম, এলাকা ও পরিবারভেদে বদলায়। নিচে উৎস ধরে নামগুলো রাখা হলো, যেমনটি সেখানে লেখা।
| উৎস | যে সবজি ও উপকরণের নাম আছে |
|---|---|
| চাংমাটারা (তনয় দেওয়ান), আর্কাইভ | জঙ্গলের তারা, গন্ধকী, কাটুরের আগা বা মূল, কদাজা কচুর দিগ, কেতকী, গোলাক বেতের আগা (বেদাগী), মরিচা বেতের আগা (তিতাবিজি); সঙ্গে বাড়ির খেতের সবজি |
| “চাকমা জাতি”, আর্কাইভ | নানা সবজির সঙ্গে শুঁটকি বা শুকনো মাছ |
| প্রথম আলো, 2016 ও 2025 | কয়েক মাস আগে শুকিয়ে রাখা বড় মাছ, কাঁচা কাঁঠাল, আম, তারা, বেতাগী (মরিচ বেতের গোড়ার অংশ), বেত প্রজাতির চাংকুল, কাট্টোল ডিঙি, জংলি আলু ও কন্দ; 2025-এর প্রতিবেদনে বিভিন্ন ফুলও |
| দ্য ডেইলি স্টার, 2016 | তারা (“অবশ্যই লাগে”), চাকমা নামে bedagi, hathol dingyi, bigol biji; পাহাড়ি আলু, মিষ্টি আলু, আলু, শিম, শুঁটকি, বাঁশ কোড়ল, কাঁচা কাঁঠাল ও পাকা কাঁঠালের বিচি; শুকিয়ে রাখা মুলা, শিম ও বাঁশ কোড়লও চলে |
| বাংলা ট্রিবিউন, 2025 ও 2026; দেশ সংবাদ, 2025 | কাঁঠাল, কলা, মুলা, মিষ্টি কুমড়া, বেতডগা, তারা, নানা প্রকার শুঁটকি; দেশ সংবাদে পাহাড়ের নানা লতাপাতা |
| অনুশীলন; বাঘাইছড়ি উপজেলা তথ্য বাতায়ন | বুনো আলু, চিংড়ি মাছ, কাঁচা কাঁঠাল, মটর, ছোলা, শিমের বিচি, কচি বেত, বাঁশের ডগা, গ্রীষ্মকালীন সবজি; বাঘাইছড়ির পাতায় হাঙরের শুঁটকি ও সিদোলও |
| ইত্তেফাক, 2026 | কাঁচা কাঁঠাল, সজনে, জুমের আলু, মিষ্টি কুমড়া, শিমফুল, গাজর, শসা, বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি; অনেক ক্ষেত্রে শুঁটকি |
| হাল ফ্যাশন, 2025 | কলাগাছের ভেতরের অংশ, মিষ্টি আলু, করলা, ছোট গোল তিতবেগুন, কাঁচা কাঁঠাল, তারা, দু-এক পদের শাক, ভেষজ; সেই রান্নায় চিংড়ি |
| ক্যানভাস, 2019 | মৌসুমি সবজি, পাহাড়ি লতাগুল্ম, তারা, সাবারাং, ফুজি, বাঁশ কোড়ল, কচি কাঁঠাল; সঙ্গে চিংড়ি বা শুঁটকি |
| আজকের পত্রিকা, 2023 | কাঁচা কাঁঠাল, আলু, শিম, বরবটি; সিদোল বা নাপ্পি |
| ঢাকা ট্রিবিউন, 2024 | বাঁশ কোড়ল, কাঁচা কাঁঠাল, বেগুন, আলু, মিষ্টি আলু, কুমড়া; শুঁটকি |
তালিকাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি পার্থক্য চোখে পড়ে। পুরনো বর্ণনায়, যেমন চাংমাটারা-য়, প্রায় সব নামই বনের: কন্দ, বেতের আগা, কচুর ডাঁটা, কেতকী। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে, যেমন ইত্তেফাক 2026-এ, যোগ হয়েছে গাজর, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও শসার মতো বাজারের সবজি। প্রথম আলো 2016 সালে লিখেছে, বাজারের সবজি তো থাকেই, তবে স্বাদ বাড়ায় বুনো সবজি, আলু, কন্দ ও ফুল।
“তারা” নামের সবজিটি প্রায় সব তালিকায় আছে। দ্য ডেইলি স্টারকে Parul Dewan বলেছেন, পাহাড়ে জন্মানো বিশেষ গন্ধের এই সবজি পাজনে “অবশ্যই” লাগে। চাংমাটারা-য় একে বলা হয়েছে “সবজি বিশেষ”। তারার বাংলা বা বৈজ্ঞানিক নাম এই উৎসগুলোর কোনোটিতে দেওয়া নেই। বেতের অংশের নামও উৎসভেদে আলাদা বানানে আসে: চাংমাটারা-য় “বেদাগী”, প্রথম আলোয় “বেতাগী”, ডেইলি স্টারে ইংরেজিতে bedagi, বাংলা ট্রিবিউনে “বেতডগা”।
কেন এই সময়েই এত পদ পাওয়া যায়, তার একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংস্কৃতিকর্মী শিশির চাকমা (প্রথম আলো, 2016): চৈত্র ও বৈশাখে প্রকৃতিতে যে ফল-মূল ও সবজি জন্মে, অন্য ঋতুতে তা হয় না, তাই বিজুর পাজনে এত পদের সমাগম সম্ভব হয় আর স্বাদও অন্য সময়ের পাজনের চেয়ে বেশি হয়। Parul Dewan-ও ডেইলি স্টারকে বলেছেন, কিছু দুর্লভ সবজি কেবল চৈত্র মাসেই মেলে।
উৎসগুলো এখানে একমত নয়। প্রথম আলো 2025 সালে লিখেছে, পাহাড়ের পাজনে “অবশ্যই” শুঁটকি মাছ দিতে হবে, আর এজন্য কয়েক মাস আগে থেকে বড় মাছ শুকিয়ে রাখা হয়। অন্যদিকে হাল ফ্যাশনের 2025 সালের প্রতিবেদন বলছে, প্রতিটি পরিবারের রেসিপি আলাদা, আর অনেকে নিরামিষ পাজনও রাঁধেন।
মাঝামাঝি কথাও আছে। আজকের পত্রিকার 2023 সালের প্রতিবেদনে বাবিন চাকমা বলেছেন, মূলত তেল-মসলা ছাড়া সিদোল বা নাপ্পি দিয়ে পাজন (সেখানে বানান “পাজং”) রাঁধা হয়, তবে তেল, মসলা ও শুঁটকি মিশিয়েও রাঁধা যায়; সেই মেলার স্টলগুলোতে মসলা ও শুঁটকি দেওয়া পাজনই বেশি দেখা গেছে। ইত্তেফাক 2026 সালে লিখেছে “অনেক ক্ষেত্রে” শুঁটকি দেওয়া হয়। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় আছে, অনেক সময় একশোর বেশি সবজির সঙ্গে শুঁটকি বা শুকনো মাছ মিশিয়ে পাজন রাঁধা হয়।
শুঁটকির ধরনেও বৈচিত্র্য আছে। বাঘাইছড়ি উপজেলা তথ্য বাতায়নে হাঙরের শুঁটকি, চিংড়ি মাছ আর সিদোলের কথা আছে; হাল ফ্যাশনের রান্নায় দেওয়া হয়েছিল চিংড়ি। সিদোল ও নাপ্পি কী এবং কোথায় তৈরি হয়, সে আলোচনা আছে সিদোল ও নাপ্পি নিয়ে আমাদের লেখায়।
এর সঙ্গে একটি আলাদা প্রশ্নও জড়িত। বাংলা উইকিপিডিয়ার বৈসাবি নিবন্ধ বলছে, বিজুর তিন দিন কেউ কোনো জীবিত প্রাণী বধ করেন না। আর্কাইভের ত্রিপুরা লেখাটিও জানায়, বৈসুমার দিনে প্রাণীবধ “একেবারেই নিষিদ্ধ”। প্রাণীবধের এই নিষেধ আর পাজনের শুঁটকিকে কোনো উৎস একসঙ্গে আলোচনা করেনি।
“পাজন” নামটি কোথা থেকে এল, তা নিয়ে প্রকাশিত উৎসে তিনটি আলাদা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়: “পাঁচ অন্ন” বা “পাঁচন” থেকে, বাংলা “পাঁচন” শব্দ থেকে, আর “জুম” থেকে। কোনো ব্যাখ্যার পক্ষেই ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণ উৎসগুলোতে দেওয়া নেই; প্রতিটি একজন লেখক বা গবেষকের মত।
| ব্যাখ্যা | কে বলছেন | উৎস |
|---|---|---|
| “পাঁচ অন্ন (পাঁচন)” থেকে “সম্ভবত”, কারণ ন্যূনতম পাঁচ পদের সবজি লাগে | “চাকমা জাতি” লেখার লেখক | জুমজার্নাল আর্কাইভ |
| বাংলা “পাঁচন” শব্দ থেকে; তবে রান্নার পদ ভিন্ন, পাজনে পদ অনেক বেশি | রাঙামাটির লেখক সুগত চাকমা | প্রথম আলো, 2016 |
| বাংলা “পাঁচন” থেকে, “ধারণা করা হয়” | প্রতিবেদকের ভাষ্য | ইত্তেফাক, 2026 |
| “জুম থেকে এসেছে”: জুমের সব সবজি মিশিয়ে রান্নাকে পাজন বলা হয় | সংস্কৃতি গবেষক ও শিক্ষাবিদ মংসানু চৌধুরী | প্রথম আলো, 2019; প্রতিদিনের বাংলাদেশ, 2023 |
প্রথম দুটি ব্যাখ্যা কাছাকাছি, কারণ বাংলা “পাঁচন” শব্দটিও পাঁচের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু “চাকমা জাতি” লেখার লেখক নিজেই “সম্ভবত” ও “হতে পারে” শব্দ ব্যবহার করেছেন, অর্থাৎ এটি প্রস্তাব, নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নয়। মংসানু চৌধুরীর ব্যাখ্যা পুরোপুরি আলাদা দিকে যায়; তিনি শব্দটিকে জুমচাষের সঙ্গে যুক্ত করেছেন, তবে “জুম” থেকে “পাজন” কীভাবে হলো, সেই ধ্বনিগত পথ প্রকাশিত প্রতিবেদনে নেই।
বাংলা পাঁচনের সঙ্গে পাজনের তফাত নিয়ে অবশ্য উৎসগুলো একমত। প্রথম আলো 2025 সালে লিখেছে, শব্দগত মিল থাকলেও রান্নার পদ্ধতি “একেবারেই আলাদা”: বাঙালি পাঁচনে আমিষ দেওয়ার রীতি নেই, পাহাড়ের পাজনে শুঁটকি দিতেই হয়। প্রথম আলো 2016-ও লিখেছে, শুঁটকি ও শুকনো মাছের কারণে পাজনের স্বাদ “একেবারেই আলাদা”।
লেখার বানানও এক নয়: “পাজন” (বেশির ভাগ চাকমা ও সংবাদ উৎস), “পাঁচন” (কিশোর আলো, জনকণ্ঠ, আর্কাইভের ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা লেখা), “পাচন” (বাংলা উইকিপিডিয়া, প্রথম আলো 2019), “পাজং” (আজকের পত্রিকা), “পাচক” (প্রতিদিনের বাংলাদেশ)। ইংরেজি উৎসে Pajon ও Pachon দুটোই আছে।
“পাজন” শব্দটি মূলত চাকমাদের। মারমারা একে বলেন “হাং-র”, ত্রিপুরারা “মৈজারবং”, আর চাকরা “কাইনবোং”। নামগুলো প্রথম আলোর 2023 সালের প্রতিবেদনে তিনজন আলাদা ব্যক্তির বরাতে এসেছে, পরে প্রতিদিনের বাংলাদেশেও একই তালিকা ছাপা হয়েছে।
| জনগোষ্ঠী | নাম | কার বরাতে |
|---|---|---|
| চাকমা | পাজন | মংসানু চৌধুরী: “পাজন শব্দটি মূলত চাকমারা ব্যবহার করেন” |
| মারমা | হাং-র | অধ্যাপক মংসানু চৌধুরী |
| ত্রিপুরা | মৈজারবং (মৈ = তরকারি, জারবং = মিশ্রণ) | সজীব ত্রিপুরা, রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ও ককবরক অভিধানের লেখক |
| চাক | কাইনবোং | নাইক্ষ্যংছড়ির বাসিন্দা পাই থুই চাক |
ত্রিপুরা নামটির অর্থও এখানে আছে: সজীব ত্রিপুরার ব্যাখ্যায় নানা তরকারির মিশ্রণে তৈরি বলেই নাম মৈজারবং। মারমা ও চাক নামের আক্ষরিক অর্থ প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি।
জুমজার্নালের আর্কাইভের লেখাগুলো আবার বাংলা শব্দ “পাঁচন” ব্যবহার করেছে। ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত জানায়, বৈসুমার দিনে ধনী-গরিব সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী পিঠা, মদ, সরবত ও পাঁচন দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করেন। তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয় লেখায় আছে, বিষুর তিন দিন শাকসবজি ও ফলমূল দিয়ে “পাঁচন নামক বিশেষ খাবার” রেঁধে অতিথিদের দেওয়া হয়। তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় খাবারটির নিজস্ব কোনো নাম আছে কি না, তা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
আরেকটি নাম ঘুরে বেড়ায় যার উৎস দুর্বল: বাংলা উইকিপিডিয়া ও অনুশীলন ওয়েবসাইট বৈসাবির খাবারকে “গণত্মক বা পাচন” বলেছে। দুটি পাতার বাক্য প্রায় হুবহু এক, আর “গণত্মক” নামটি কোন জনগোষ্ঠীর বা কোন ভাষার, তা কোনোটিতে বলা নেই। অন্য কোনো উৎসে নামটি পাওয়া যায়নি।
প্রথম আলো 2016 সালে পাজনকে চাকমা-মারমা-ত্রিপুরাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীগুলোর উৎসবের উপকরণ বলেছে, আর 2023 সালের প্রতিবেদনে আছে, পাহাড়ের সব সম্প্রদায়ই এটি রাঁধে, নাম কেবল আলাদা। কোন জনগোষ্ঠীর রান্নায় কী পার্থক্য, সে বিবরণ কোনো উৎসে নেই। জনগোষ্ঠী ধরে সংস্কৃতির সাধারণ পরিচয় আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য লেখায়, আর পুরো অঞ্চলের লেখাগুলো একসঙ্গে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
সবচেয়ে বেশি উৎসে যে বিশ্বাসটি আছে তা হলো, বিজুর দিন অন্তত সাতটি বাড়িতে পাজন খেলে সারা বছর রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যায়। তবে প্রথম আলোর 2016 সালের প্রতিবেদন বলছে অন্তত 10টি বাড়ি, আর হাল ফ্যাশন বলছে 5 বা 7টি।
| কত বাড়ি | বিশ্বাসটি কী বলে | উৎস |
|---|---|---|
| অন্তত 10 | না খেলে পরের জন্মে মানবজন্ম না-ও হতে পারে | প্রথম আলো, 2016 |
| অন্তত 7 | সারা বছর অসুখ থেকে মুক্ত (স্কুলশিক্ষক Snigdha Chakma, “একটি মিথ” বলে) | দ্য ডেইলি স্টার, 2016 |
| কমপক্ষে 7 | সাতটি বাড়িতে খাওয়া “আবশ্যক” বলে মনে করা হয় | প্রথম আলো, 2019 |
| 7 | সারা বছর নীরোগ | ক্যানভাস, 2019 |
| 7 | সারা বছর রোগব্যাধি থেকে মুক্ত | বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, 2023 |
| 7 | রোগব্যাধি উপশম হয় | প্রথম আলো, 2023; প্রতিদিনের বাংলাদেশ, 2023 |
| কম করে হলেও 7 | শারীরিকভাবে সুস্থ ও রোগমুক্ত (বিনিতা চাকমা ও অন্যরা) | বাংলা ট্রিবিউন, 2025 ও 2026 |
| 7 | শরীর সুস্থ, রোগ দূরে | দৈনিক জনকণ্ঠ, 14 এপ্রিল 2025; দেশ সংবাদ, 2025 |
| একদিনে 7টি পরিবার | সারা বছর সুস্থ | ইত্তেফাক, 2026 |
| 5 বা 7 | বছরজুড়ে রোগবালাই হয় না | হাল ফ্যাশন, 2025 |
প্রথম আলো 2016-এর সংস্করণটি অন্যদের চেয়ে আলাদা কেবল সংখ্যায় নয়, ফলাফলেও। সেখানে না খাওয়ার ফল রোগ নয়, পরজন্মের সঙ্গে যুক্ত; বাকি সব উৎসে কথাটি স্বাস্থ্যের। দুটি ভাষ্যই প্রকাশিত, আর কোনটি পুরনো রূপ, তা কোনো উৎস বলেনি।
সংখ্যাটি অনেকে নিছক ন্যূনতম হিসেবে দেখেন। দ্য ডেইলি স্টারের 2016 সালের প্রতিবেদনে Dalim Kumar Tanchangya বলেছেন, সেদিন তিনি অন্তত 20টি বাড়িতে পাজন খেতে যাবেন। দেশ সংবাদের প্রতিবেদনে লাবনী চাকমা বলেছেন, বন্ধুদের নিয়ে সবার বাড়িতে গিয়ে পাজন খেয়ে রাতে বাসায় ফেরেন।
এই ঘোরাঘুরির একটি নামও আছে। প্রথম আলো 2016 সালে লিখেছে, চাকমা বাড়িতে বিঝুর দিন নিমন্ত্রণ খেতে যাওয়াকে সংক্ষেপে “বিঝু খাওয়া” বলে, আর কোনো বাড়ির বিঝু খাওয়া কেমন হলো, তা অনেকটা নির্ভর করে পাজনের স্বাদের ওপর। দৈনিক জনকণ্ঠের প্রতিবেদন বলছে, এদিন কাউকে নিমন্ত্রণ করতে হয় না, যে কেউ যে কোনো ঘরে গিয়ে বিজু খেতে পারেন।
রীতিটি পাহাড়িদের বাইরেও ছড়িয়েছে। বাংলা ট্রিবিউনের 2025 সালের প্রতিবেদনে শিক্ষক রিংকু দে ও আয়েশা আক্তার বলেছেন, এদিন তাঁরা পাহাড়ি বন্ধু ও সহকর্মীদের বাড়িতে বেড়াতে যান, আর যে বাড়িতেই যান, পাজন খাওয়া হয়ই। চাকমা রাজবাড়িতেও প্রতি বিঝুতে পাজন রান্না হয়: রানি য়েন য়েন প্রথম আলোকে (2016) বলেছেন, যাঁরা আসেন সবাইকে পাজন দেওয়া হয়, আর তাঁরাও কারও বাড়িতে গেলে সামান্য হলেও পাজন মুখে দেন।
পাজনকে ঘিরে সবচেয়ে পুরনো ও বহুল প্রচলিত বিশ্বাস হলো, এর সবজিগুলোর ঔষধি গুণ আছে, তাই বছরের শেষে বা শুরুতে খেলে আসন্ন বছরের অসুখ দূরে থাকে। কেউ একে বিশ্বাস বলেন, কেউ “মিথ”; এর পক্ষে কোনো চিকিৎসা-গবেষণা উৎসগুলোতে উল্লেখ করা হয়নি।
বাংলা উইকিপিডিয়ার বৈসাবি নিবন্ধ বলছে, চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা বিশ্বাস করেন পাজনের “দৈব গুণাবলী” আগত বছরের অসুস্থতা ও দুর্ভাগ্য দূর করবে। প্রথম আলো 2025 সালে রাঙামাটির শিক্ষাবিদ মংসানু চৌধুরী ও লেখক সুগত চাকমার বরাতে লিখেছে, শত বছর আগে পাহাড়িরা জুম ও বন থেকে সবজি সংগ্রহ করে পাজন রাঁধতেন, আর সেসব সবজির 90 শতাংশের ঔষধি গুণ আছে; একই প্রতিবেদনে আছে, পাজনের সবজির 90 শতাংশ বন্য পরিবেশে জন্মায়। দ্য ডেইলি স্টারের 2026 সালের লেখাও প্রায় 90 শতাংশ উপকরণকে বন থেকে সংগৃহীত বলেছে।
আরেকটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন নারী উদ্যোক্তা বিনিতা চাকমা (প্রতিদিনের বাংলাদেশ, 2023) এবং ফুলেন দেবী চাকমা (দৈনিক জনকণ্ঠ, 2025)। দুজনের কথা প্রায় এক: আগে গ্রাম ও জুমের মানুষ যে সবজি সব মৌসুমে পেতেন না, তা শুকিয়ে রাখতেন, পরে অন্য সবজির সঙ্গে মিশিয়ে রেঁধে শরীরে শক্তি পেতেন; সেই ধারণা থেকেই এসব সবজিকে ঔষধি মনে করা হতো, আর সেখান থেকে বিজুতে পাজন খাওয়ার রীতি।
Snigdha Chakma ডেইলি স্টারকে (2016) কথাটিকে সরাসরি “মিথ” বলেছেন; দেশ সংবাদও “মিথ” শব্দটি ব্যবহার করেছে। মংসানু চৌধুরীর ব্যাখ্যায় (প্রথম আলো, 2019) বিশ্বাসটি জুমের সঙ্গে যুক্ত: জুমিয়ারা মনে করতেন জুমে উৎপন্ন সবজির ঔষধি গুণ আছে, তাই নতুন বছরে সুস্থ থাকার জন্য বছরের শেষে পাজন খাওয়া হয়।
প্রথাগতভাবে পাজনের সবজি আসত বন ও জুম থেকে, ফুল বিজুর দিন মেয়েরা নিজেরা সংগ্রহ করতেন। এখন বিজুর আগের দিনগুলোতে রাঙামাটির শহর ও উপজেলার হাটে আলাদা করে পাজনের সবজি বিক্রি হয়; প্রথম আলো 2025 সালে লিখেছে, বিজুর আগের দিন রাঙামাটিতে অর্ধশতাধিক বাজারে বিজুর হাট বসেছিল।
চাংমাটারা-র বর্ণনায় সংগ্রহ ছিল পুরো গ্রামের কাজ: ফুল বিজুর দিন দুপুরের পর পুরুষেরা দল বেঁধে শিকারে বা মাছ ধরতে যেতেন, আর মেয়েরা জঙ্গলে যেতেন তারা, গন্ধকী, কচুর ডাঁটা, বেতের আগা আনতে; বাড়ির খেত থেকেও সবজি আনা হতো।
হাটের ছবি পাওয়া যায় সংবাদে। প্রথম আলো 2019 সালে রাঙামাটি শহরের তিনটি হাটের কথা লিখেছে: বনরূপা, তবলছড়ি ও কল্যাণপুর। কুতুকছড়ি থেকে আসা শান্তি দেবী চাকমা জানিয়েছিলেন, বন ও খেত থেকে কয়েক মণ সবজি এনেছিলেন, দুপুরের মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যায়। প্রথম আলো 2025 সালের প্রতিবেদনে আছে, হাটগুলোতে নানা কন্দ, আলু, ফুল, পাতা ও গাছের ডগা কিনতে ক্রেতারা ব্যস্ত ছিলেন।
বিক্রেতার দিকটাও উঠে এসেছে। দ্য ডেইলি স্টারের 2016 সালের প্রতিবেদনে নানিয়ারচরের Hugurmara এলাকার বিক্রেতা Subina Chakma-র কথা আছে, যিনি সাধারণত শনি ও বুধবারের হাটে বসেন, কিন্তু বিজুর আগে মঙ্গলবারও সবজি নিয়ে বনরূপা বাজারে এসেছিলেন। কাঁচা কাঁঠালসহ অনেক সবজি তাঁকে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক কম দামে বেচতে হচ্ছিল, আর বাড়ি ফিরে নিজের পরিবারের পাজনও রাঁধতে হতো। দামের কোনো নির্দিষ্ট হিসাব এই প্রতিবেদনগুলোতে নেই।
প্রতিযোগিতার আগেও একই অভ্যাস। প্রথম আলো 2023 সালে লিখেছে, উৎসবের দু-এক দিন আগেই হাটবাজার থেকে সবজি সংগ্রহ করা হয়।
পাজনের রান্না মূলত অনেক রকম সবজি কেটে, ধুয়ে, শুঁটকি বা সিদোল দিয়ে এক বড় হাঁড়িতে রাঁধার কাজ; কেউ তেল-মসলা ছাড়াই রাঁধেন, কেউ তেল-মসলা দেন। পরিমাণ, ক্রম ও সময়ের পূর্ণ কোনো রেসিপি নির্ভরযোগ্য উৎসে নেই; প্রতিটি পরিবারের পদ্ধতি আলাদা বলে উৎসগুলো নিজেরাই জানিয়েছে।
বাংলা ট্রিবিউনের 2026 সালের প্রতিবেদনে কাজের ক্রমটি এভাবে আছে: ভোরে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির সবাই মিলে সবজি কাটেন, পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে রান্না শুরু হয়, রান্না শেষে শুরু হয় আপ্যায়ন। হাল ফ্যাশনের 2025 সালের ছবির প্রতিবেদনে দেখা যায়, কাটা সবজি বড় ডেকচিতে নিয়ে রান্না হচ্ছে, আর সেখানে লেখা আছে প্রতিটি পরিবারের রেসিপি আলাদা।
তেল-মসলার প্রশ্নে আগের অংশে বলা আজকের পত্রিকার কথাটিই সবচেয়ে নির্দিষ্ট: মূলত তেল-মসলা ছাড়া সিদোল বা নাপ্পি দিয়ে, তবে তেল-মসলা-শুঁটকি দিয়েও। দ্য ডেইলি স্টার 2016 সালে লিখেছে, স্বাদ বাড়াতে নানা রকম মসলা দেওয়া হয়। চাকমা রান্নার সাধারণ ধরন, অর্থাৎ সেদ্ধ বা কম তেলে রান্না, আর উজ্যা, গোরাং ও কেবাং-এর মতো পদ্ধতির ব্যাখ্যা আছে চাকমা রান্না নিয়ে আমাদের লেখায়।
রাঁধুনিরা কাজটিকে সহজ বলেন না। প্রথম আলো 2025 সালে রাঁধুনিদের বরাতে লিখেছে, পাজন রান্না “সূক্ষ্ম শিল্পের মতো”। প্রথম আলো 2016-এর প্রতিবেদনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার ছাত্রী ডিমানা চাকমা জানিয়েছিলেন, সে বছর তিনি মায়ের সঙ্গে 25 পদের সবজি আর শুঁটকি মাছ দিয়ে পাজন রাঁধবেন। ধাপে ধাপে রান্না দেখতে চাইলে হাল ফ্যাশনের ছবির প্রতিবেদনটি দেখতে পারেন (লিংক তথ্যসূত্রে)।
কার পাজনে কত পদ, এ নিয়ে পাহাড়ে বরাবরই প্রতিযোগিতার মনোভাব ছিল, আর এখন তা আনুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতাও হয়েছে। 2023 সালে রাঙামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের মেলায় পাজন রান্নার প্রতিযোগিতায় ছয়টি দল অংশ নেয়, আর মেলায় অন্তত 40টি দোকানে পাজন বিক্রি হচ্ছিল (প্রথম আলো, 2023)।
প্রতিযোগিতার মনোভাবটি পুরনো। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় আছে, সবাই পাজনে সবজির পদ বাড়ানোর চেষ্টা করেন। বাঘাইছড়ি উপজেলা তথ্য বাতায়নের বিজু পাতায় লেখা, যে বাড়িতে সবচেয়ে বেশি পদ দিয়ে পাজন রাঁধা হয়, বিজুর সময় সে বাড়ির সুনাম বাড়ে।
প্রথম আলো 2023-এর প্রতিবেদন বলছে, মেলাটি 3 এপ্রিল শুরু হয়েছিল, আর প্রতিযোগিতা হয় মেলার শেষ দিনের আগের দিন, বৃহস্পতিবার। অংশ নেওয়া দোলন ত্রিপুরা জানিয়েছিলেন, তাঁরা চারজন মিলে রেঁধেছেন, আর তিনি 35 প্রকার সবজি দিয়েছেন; আগের বছরও তিনি অংশ নিয়েছিলেন। প্রথম আলো 2025 সালেও লিখেছে, বিজুর আগে রাঙামাটির বিভিন্ন এলাকায় নারীদের অংশগ্রহণে পাজন রান্নার প্রতিযোগিতা হয়।
শহরেও পাজন পৌঁছেছে। ক্যানভাস ম্যাগাজিন 2019 সালে ঢাকার মিরপুরের দুটি চাকমা খাবারের রেস্তোরাঁর কথা লিখেছে, যেখানে পাজন পাওয়া যায়, আর জানিয়েছে, সেখানে পাজন রাঁধা হয় অনেক রকম সবজির সঙ্গে চিংড়ি বা শুঁটকি দিয়ে। তবে বিনিতা চাকমা প্রতিদিনের বাংলাদেশকে (2023) বলেছেন, রেস্তোরাঁর পাজনে সবজির পদ কম থাকে, তাই বিজুর পাজনের ঘ্রাণ ও স্বাদের সঙ্গে অনেক তফাত।
মূল বিজুর আপ্যায়নে পাজনের পাশে থাকে নানা রকম পিঠা, বিশেষ করে বিন্নি চালের পিঠা, আর ফলমূল ও সেদ্ধ আলু। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় নাম আছে সান্ন্যাপিঠা, বিনিপিঠা, কলাপিঠা, বিনি হগা ও চিনি বানাহ্-র; শহরে এখন এগুলোর জায়গা নিচ্ছে বাজারের মিষ্টি, জিলাপি ও চটপটি।
পিঠা তৈরি হয় আগের সন্ধ্যায়। চাংমাটারা জানায়, ফুল বিজুর সন্ধ্যার পর পরদিনের জন্য সান্যা পিদা, বরা পিদা ও হগা পিদা বানিয়ে রাখা হয়। একই বইয়ে চাকমা পিঠার একটি দীর্ঘ তালিকা আছে, বেশির ভাগই মাটির পগোনে ভাপে সেদ্ধ হয়, আর বিন্নি চাল প্রথম পছন্দ। সেই তালিকা ও পিঠার উপকরণ নিয়ে বিস্তারিত আছে চাকমা খাবারের লেখার পিঠা অংশে।
সংবাদমাধ্যমে বিজুর পাতের আরও কিছু পদের নাম আসে। প্রথম আলো 2016 সালে লিখেছে, তালিকায় থাকে তরমুজসহ নানা ফল, বিন্নি চালের পিঠা, মটর ডাল দিয়ে তৈরি খাবার, দই ও নানা পানীয়, তবে পরিবারভেদে পদ বদলালেও একটি পদ সব বাড়িতে থাকে, সেটি পাজন। প্রথম আলোর 2023 সালের লেখায় বিশেষ করে বিন্নি চালের বড়া পিঠার কথা আছে। ঢাকা ট্রিবিউন 2024 সালে বিনি হগা পিঠাকে চাকমা পদ বলেছে: রাতভর ভেজানো বিন্নি চালের সঙ্গে নারকেল, কলা ও এক চিমটি লবণ মিশিয়ে বিশেষ এক ধরনের পাতার মোচায় ভরে ভাপে রাঁধা হয়।
“চাকমা জাতি” লেখার আরেকটি পর্যবেক্ষণ: মূল বিজুর দিন ঐতিহ্যবাহী নানা পিঠার সঙ্গে তাজা ফলমূল ও বিভিন্ন সেদ্ধ আলু পরিবেশন করা হয়। শহরের বদলটিও সেখানে লেখা: আগের ঐতিহ্যবাহী খাবার ও পানীয় এখন শহরে কমই দেখা যায়; সামর্থ্য অনুযায়ী মিষ্টি, জিলাপি, চটপটি, মাংস ও কোমল পানীয় দেওয়া হয়। দেশ সংবাদের 2025 সালের প্রতিবেদনেও বিজুর আয়োজনে নুডলস, পায়েস, মিষ্টি, চটপটি, মাংস, রুটি, পোলাও আর তরমুজ, আপেল ও কমলার নাম আছে।
বিজুতে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ঘরে তৈরি মদ পরিবেশনের রীতি আছে। উৎসগুলোতে তিনটি নাম আসে: দোচোয়ানি (দুবার পাতিত কড়া মদ), জগরা আর কানজি। জগরা ও কানজি একই জিনিস কি না, তা নিয়ে উৎসে অমিল আছে।
চাংমাটারা-য় চাকমাদের মদের তিনটি রূপ আলাদা করে দেওয়া: মদ, যার গুণমান অনুযায়ী এক চুয়ানি ও দুচুয়ানি ভাগ; জগরা, যা বিনি চাল দিয়ে তৈরি; আর কানজি, যা সাধারণ চাল দিয়ে। অনুশীলন ওয়েবসাইট ও বাঘাইছড়ি উপজেলা তথ্য বাতায়ন আবার “জগরা বা কাঞ্জি” একসঙ্গে লিখেছে, একই পানীয়ের দুই নাম হিসেবে।
দুটি পানীয়ের বর্ণনা বাঘাইছড়ির পাতায় সবচেয়ে বিস্তারিত। দোচোয়ানি তৈরি হয় ভাত পচিয়ে তার রস পাতন করে; দুবার পাতন বা চোয়ানো হয় বলে নাম দো-চোয়ানি, রং পানির মতো স্বচ্ছ, আর বিন্নি চালের ভাত থেকে তৈরি ভালো মানের দোচোয়ানিতে 70 থেকে 75 শতাংশ অ্যালকোহল থাকে বলে সেখানে লেখা। জগরা ফ্যাকাশে সাদা, স্বাদে টক-মিষ্টি, অ্যালকোহল খুবই কম। একই পাতার তথ্য অনুশীলন ওয়েবসাইটেও প্রায় হুবহু আছে, তাই এ দুটিকে স্বাধীন দুই উৎস ধরা যায় না।
খাওয়ার নিয়মও লেখা আছে বাঘাইছড়ির পাতায়: বিজুর দিনগুলোতে ছেলেমেয়ে বা বুড়োবুড়ির মদ খেতে বাধা নেই, কিন্তু মদ খেয়ে মাতলামি করা চাকমা সমাজে গর্হিত অপরাধ; বয়স অনুযায়ী আলাদা আসর বসে। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় শুধু এটুকু আছে যে মূল বিজুতে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মদও পরিবেশন করা হয়।
অন্য জনগোষ্ঠীর বেলায় আর্কাইভের তথ্য আলাদা। তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত বলছে, আগে বিষুর দিনগুলোতে মদ, জগড়া ও কাঞ্চি নামের নেশার ব্যবহার ব্যাপক ছিল, অনেকে এখনো পান করেন; “তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়” লেখা বলছে, তঞ্চঙ্গ্যাদের মধ্যে মদের ব্যবহার আস্তে আস্তে কমে আসছে। ত্রিপুরাদের বৈসুমার আপ্যায়নে পিঠা ও পাঁচনের সঙ্গে মদ ও সরবতের কথা আছে আর্কাইভের ত্রিপুরা লেখায়।
একই সময়ের উৎসব হলেও খাবারের রীতি প্রতিটি জনগোষ্ঠীর আলাদা। ত্রিপুরাদের বৈসুতে প্রথম দিন পিঠার প্রস্তুতি আর দ্বিতীয় দিন পাঁচন-পিঠা-মদে আপ্যায়ন; তঞ্চঙ্গ্যাদের বিষুতে মু-পিঠা অপরিহার্য; মারমাদের সাংগ্রাইয়ে খাবারের কেন্দ্রে বিহারে দান ও পিঠা বিনিময়। নিচে উৎস ধরে আলাদা করে রাখা হলো।
আর্কাইভের “ত্রিপুরা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী হারি বৈসুর দিন ত্রিপুরা নারীরা বিন্নি ধানের চাল গুঁড়ো করেন পিঠার জন্য, আর নারী-পুরুষ মিলে জঙ্গল থেকে কলাপাতা ও লাইরু পাতা আনেন, যা দিয়ে নানা পিঠা হয়। বৈসুমার দিন ধনী-গরিব ভেদ থাকে না; সবাই সামর্থ্য অনুযায়ী পিঠা, মদ, সরবত ও পাঁচন দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করেন, আর এদিন প্রাণীবধ নিষিদ্ধ।
বিসিকাতালের খাবার আলাদা। একই লেখা জানায়, নববর্ষের এই দিনে প্রতিটি পরিবার সামর্থ্য অনুযায়ী আমিষের আয়োজন করে, পিঠা, পাঁচন ও মদ তো থাকেই; অবস্থাপন্নরা গ্রামের গরিব ও বিধবাদের জন্য বিশেষ ভোজ দেন; ঘরের দরজা দিনরাত খোলা থাকে, কারণ বিশ্বাস করা হয় কেউ খালি মুখে ফিরে গেলে গৃহস্থের অমঙ্গল। অর্থাৎ ত্রিপুরা রীতিতে আমিষ আসে প্রাণীবধ নিষিদ্ধ বৈসুমার পরের দিন। প্রথম আলোর 2023 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ত্রিপুরা ভাষায় পাজনের নাম মৈজারবং।
আর্কাইভের “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী মূল বিষুর দিন সব ঘরের দুয়ার খোলা থাকে, অতিথিদের পিঠা ও ফলমূল দিয়ে আপ্যায়ন হয়, আর প্রতিটি পরিবারে বিনি চালের গুঁড়ো দিয়ে মু-পিঠা তৈরি হয়; বিষুতে মু-পিঠা দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন তঞ্চঙ্গ্যাদের কাছে “অপরিহার্য”। লেখাটি পিঠাটিকে রসমালাইয়ের মতো বলে বর্ণনা করেছে: বিনি চালের গুঁড়োর গোলা দুধে সেদ্ধ, চিনি বা গুড়ে মিষ্টি, সঙ্গে নারকেল ও বাদাম। পাহাড়বার্তার একটি প্রতিবেদনেও আয়োজকদের বরাতে মূল বিষুর মু-পিঠার কথা একইভাবে আছে।
“তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়” লেখায় বিষুর তিন দিনের পিঠার নাম আছে: বিন্নি পিঠা, চান্যা পিঠা ও কলা পিঠা, সঙ্গে শাকসবজি ও ফলমূল দিয়ে পাঁচন। উৎসবটি আরও বিস্তারিত আছে বৈসাবির আচার-ক্রম নিয়ে আমাদের লেখায়।
মারমাদের সাংগ্রাইয়ে খাবারের প্রসঙ্গ আসে প্রধানত ভিক্ষুদের দানে আর পিঠায়। বাংলা উইকিপিডিয়ার বৈসাবি নিবন্ধ অনুযায়ী ভোরে বিহারে “অংরুং ছোইং” (ভিক্ষুদের সবার খাবার) আর দুপুরে “দোয়াইং” (দুপুরের খাবার) দান করা হয়; সাংগ্রাইয়ের বিদায়ের দিন বিহারে আসা পুণ্যার্থীদের মধ্যে পিঠা বিতরণ, প্রতিবেশীদের মধ্যে পিঠা বিনিময় আর বয়োজ্যেষ্ঠদের পিঠা দানের কথা আছে। শেষ অংশটির পাশে উইকিপিডিয়া নিজেই “তথ্যসূত্র প্রয়োজন” লিখে রেখেছে।
মারমা পিঠার নাম আছে ঢাকা ট্রিবিউনের 2020 সালের একটি প্রতিবেদনে, মারমা সংস্কৃতির গবেষক Chinglamong Chowdhury-র বরাতে: জুমের বিন্নি চাল, নারকেল, গুড় ও মিষ্টি ফল দিয়ে তৈরি চেচমা, কোদামু, কেইন্দা, চিলামু ও গংমু। প্রতিবেদনটি অবশ্য সাংগ্রাই নিয়ে নয়, খাগড়াছড়ির মারমা পিঠা নিয়ে; কোন পিঠা বিশেষ করে সাংগ্রাইয়ের, তা সেখানে বলা নেই। মারমাদের পানিখেলা ও সাংগ্রাইয়ের দিনগুলোর বিবরণ আছে সাংগ্রাই জলকেলি: মারমাদের রিলং পোয়ে কবে, কোথায়, কীভাবে হয় লেখায়।
উৎসগুলো তিনটি বদলের কথা বলে: বন কমে যাওয়ায় পাজনের সবজির বৈচিত্র্য কমছে, বাজারের সবজি ও কেনা খাবার ঢুকছে, আর শহরে পুরনো কিছু রীতি প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পাজন মেলা, প্রতিযোগিতা ও রেস্তোরাঁর মাধ্যমে নতুন পরিসরে পৌঁছেছে।
বাংলা উইকিপিডিয়ার বৈসাবি নিবন্ধ বলছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বনজঙ্গল কমে যাওয়ায় পাজনের সবজির ধরনও কমে যাচ্ছে। ইত্তেফাকের রাঙামাটি প্রতিনিধি 2026 সালে লিখেছেন, পাহাড়ি লোককথা অনুযায়ী একসময় প্রায় 107 ধরনের সবজি দেওয়া হতো, কিন্তু এখন সবজি সহজলভ্য না হওয়ায় 20 থেকে 30 ধরনেই রাঁধা হয়; একই প্রতিবেদনে কলেজ গেট এলাকার মাসানু রোয়াজা বলেছেন, আগে 107 প্রকার সবজি দিয়ে পাজন রাঁধা হতো।
খাবারের তালিকার বদল বহু আগে থেকেই নথিভুক্ত। চাংমাটারা লিখেছে, শহরাঞ্চলে ও শিক্ষিত চাকমারা ঐতিহ্যবাহী পিঠার বদলে বাজার থেকে কেনা মিষ্টি পাজনের সঙ্গে পরিবেশন করেন, আর হাঁস-মুরগিকে খাবার ছিটানো ও বুড়োদের স্নান করানোর প্রথা প্রায় বিলুপ্তির পথে। “চাকমা জাতি” লেখাও শহরে ঐতিহ্যবাহী পিঠা ও পানীয় কমে আসার কথা বলেছে।
তবু পাজন নিজে টিকে আছে, এমনকি বিস্তার পেয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার 2016 সালে লিখেছে, ঢাকায় বিজু পালন করা Parul Dewan সব উপকরণ জোগাড় করে নিয়েছিলেন, কারণ পাজন ছাড়া তাঁর বিজু পূর্ণ হয় না। দেশ সংবাদ ও বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বাঙালি অতিথিরাও বাড়ি বাড়ি পাজন খেতে যান। প্রথম আলো 2016-এর তুলনাটিও এখানে প্রাসঙ্গিক: ঈদে যেমন সেমাই, বিঝুতে তেমনি পাজন।
পাজন চাকমাদের বিজু উৎসবের প্রধান খাবার, অনেক রকম সবজি, বুনো শাক, কন্দ, বেতের কচি অংশ ও কাঁচা কাঁঠাল একসঙ্গে শুঁটকি বা সিদোল দিয়ে রাঁধা এক তরকারি। চৈত্রের শেষ দিন মূল বিজুতে প্রতিটি ঘরে অতিথি আপ্যায়ন শুরু হয় পাজন দিয়ে। প্রথম আলোর 2023 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী পাহাড়ের অন্য সম্প্রদায়ও নববর্ষে এমন খাবার রাঁধে, ভিন্ন নামে।
নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা নেই। জুমজার্নাল আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখা বলছে ন্যূনতম 5 পদ, অনেক সময় 100-র বেশি। বাংলা ট্রিবিউন (2025, 2026) ও জনকণ্ঠ (2025) লিখেছে কমপক্ষে 32; প্রথম আলো (2025) ও ডেইলি স্টার (2026) 30 থেকে 40; প্রথম আলো (2023) 30 থেকে 50; ইত্তেফাক (2026) আগে 107, এখন 20 থেকে 30।
বিজুর দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ চৈত্রের শেষ দিন মূল বিজুতে। তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা অনুযায়ী ফুল বিজুর দিন দুপুরের পর মেয়েরা বন ও খেত থেকে সবজি জোগাড় করেন, আর মূল বিজুর সকালে স্নান সেরে সেই সবজি মিশিয়ে পাজন রাঁধেন। আষাঢ়ের 7 তারিখ হালপালনির দিনেও পাজন পরিবেশন করা হয় বলে আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখায় আছে।
তিনটি ব্যাখ্যা প্রকাশিত আছে। আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখা বলছে “পাঁচ অন্ন (পাঁচন)” থেকে সম্ভবত, কারণ ন্যূনতম পাঁচ পদের সবজি লাগে। লেখক সুগত চাকমা (প্রথম আলো, 2016) বলেছেন বাংলা “পাঁচন” থেকে। গবেষক মংসানু চৌধুরী (প্রথম আলো, 2019) বলেছেন শব্দটি “জুম থেকে এসেছে”।
নামে মিল থাকলেও রান্না আলাদা। প্রথম আলো (2025) লিখেছে, বাঙালি পাঁচনে আমিষ দেওয়ার রীতি নেই, কিন্তু পাহাড়ের পাজনে শুঁটকি মাছ দিতেই হয়। লেখক সুগত চাকমা (প্রথম আলো, 2016) বলেছেন, পাজনে পাঁচনের চেয়ে অনেক বেশি পদ থাকে, আর বুনো সবজি, আলু, কন্দ ও ফুল এর স্বাদ বাড়ায়।
প্রথম আলোর 2023 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী মারমারা পাজনকে বলেন “হাং-র” (অধ্যাপক মংসানু চৌধুরীর বরাতে), ত্রিপুরারা “মৈজারবং” (সজীব ত্রিপুরার বরাতে; মৈ মানে তরকারি, জারবং মানে মিশ্রণ), আর চাকরা “কাইনবোং” (নাইক্ষ্যংছড়ির পাই থুই চাকের বরাতে)। জুমজার্নালের ত্রিপুরা ও তঞ্চঙ্গ্যা আর্কাইভ লেখায় খাবারটির নাম “পাঁচন”।
বেশির ভাগ উৎস বলছে অন্তত সাতটি বাড়ি, এতে সারা বছর রোগব্যাধি থেকে মুক্ত থাকা যায় বলে বিশ্বাস (ডেইলি স্টার 2016, প্রথম আলো 2019 ও 2023, বাংলা ট্রিবিউন 2025-2026, ইত্তেফাক 2026)। প্রথম আলোর 2016 সালের প্রতিবেদন বলছে অন্তত 10টি বাড়ি, না হলে পরজন্মে মানবজন্ম না-ও হতে পারে। হাল ফ্যাশন (2025) লিখেছে 5 বা 7টি।
উৎসে অমিল আছে। প্রথম আলো (2025) লিখেছে পাজনে অবশ্যই শুঁটকি দিতে হবে, এজন্য কয়েক মাস আগে থেকে বড় মাছ শুকিয়ে রাখা হয়। হাল ফ্যাশন (2025) লিখেছে, অনেকে নিরামিষ পাজনও রাঁধেন। আজকের পত্রিকায় (2023) বাবিন চাকমা বলেছেন, মূলত তেল-মসলা ছাড়া সিদোল বা নাপ্পি দিয়ে রাঁধা হয়, তবে তেল-মসলা-শুঁটকি দিয়েও রাঁধা যায়।
প্রায় সব তালিকায় আছে কাঁচা কাঁঠাল, তারা, বেতের কচি অংশ (বেদাগী বা বেতাগী), বুনো আলু ও কন্দ আর বাঁশ কোড়ল। তনয় দেওয়ানের চাংমাটারা-য় আরও আছে গন্ধকী, কাটুরের আগা, কদাজা কচুর দিগ, কেতকী ও তিতাবিজি। প্রথম আলো (2016) চাংকুল ও কাট্টোল ডিঙির নাম দিয়েছে; সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে কুমড়া, মুলা, বেগুন, শিম, এমনকি ফুলকপি-বাঁধাকপিও আছে।
আর্কাইভের “চাকমা জাতি” লেখা অনুযায়ী নানা পিঠা (সান্ন্যাপিঠা, বিনিপিঠা, কলাপিঠা, বিনি হগা), তাজা ফলমূল, সেদ্ধ আলু, চিনি বানাহ্ আর প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য মদ। চাংমাটারা জানায়, সান্যা, বরা ও হগা পিদা আগের সন্ধ্যায় বানিয়ে রাখা হয়। শহরে এখন বাজারের মিষ্টি, জিলাপি, চটপটি, মাংস ও কোমল পানীয়ও থাকে।
দুটিই চাল থেকে ঘরে তৈরি মদ। বাঘাইছড়ি উপজেলা তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী দোচোয়ানি ভাত পচিয়ে তার রস দুবার পাতন করে তৈরি, পানির মতো স্বচ্ছ ও খুব কড়া; জগরা ফ্যাকাশে সাদা, টক-মিষ্টি, অ্যালকোহল কম। চাংমাটারা-য় জগরা বিনি চালের আর কানজি সাধারণ চালের, দুটি আলাদা পানীয় হিসেবে আছে।
জুমজার্নালের “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত” অনুযায়ী মূল বিষুর দিন প্রতিটি তঞ্চঙ্গ্যা পরিবারে মু-পিঠা তৈরি হয়, আর এটি দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন “অপরিহার্য”। বিনি চালের গুঁড়োর গোলা দুধে সেদ্ধ করে চিনি বা গুড়, নারকেল ও বাদাম দিয়ে রসমালাইয়ের মতো করা হয়। আরেক আর্কাইভ লেখায় বিন্নি, চান্যা ও কলা পিঠার নামও আছে।
প্রাথমিক উৎস (জুমজার্নাল আর্কাইভ)
সংবাদমাধ্যম ও অন্যান্য
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:চাকমা, চাকমা সংস্কৃতি, বিজু, বৈসাবি
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।