Last updated Oct 23rd, 2026
0

মারমা খাবারের কেন্দ্রে থাকে ভাত, মরিচের ভর্তার সঙ্গে খাওয়া সেদ্ধ সবজি, আর তরকারির স্বাদ গড়ে দেওয়া শুঁটকি ও ঙাপ্পি নামের মাছের পেস্ট। বাইরের মানুষের কাছে সবচেয়ে পরিচিত মারমা খাবার মুন্ডি, জুমের আতপ চালের নুডলস, যা বান্দরবানের মারমা জনগোষ্ঠীর জনপ্রিয় খাবার হিসেবে পরিচিত। এই লেখায় জুমজার্নালের আর্কাইভ আর প্রকাশিত প্রতিবেদন মিলিয়ে মারমা রান্নার পদ, উপকরণ, পদ্ধতি আর উৎসবের খাবার একসঙ্গে রাখা হলো।
পাহাড়ের খাবার নিয়ে আমাদের আগের লেখা পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি-তে সিদোল ও নাপ্পি কোথায় তৈরি হয় তা আছে, কিন্তু মারমা রান্নার আলাদা বিবরণ সেখানে ছিল না। আর চাকমা খাবার ও রান্না লেখাটি কেবল চাকমা রান্নার। এই লেখা সেই ফাঁকটুকু ভরায়: মারমা পাতে কী থাকে, কোন পদ কীভাবে তৈরি হয়, কোন পিঠার কী নাম, আর জন্ম, বিয়ে, ফসল তোলা ও সাংগ্রাইয়ে খাবারের ভূমিকা কী।
সূচিপত্র
মারমা খাবার চেনা যায় চারটি জিনিসে: প্রধান খাদ্য ভাত, সেদ্ধ শাকসবজি, সবজির তরকারিতেও শুঁটকি, আর ঙাপ্পি বা নাপ্পি নামের মাছের পেস্ট। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি সংস্করণ লিখেছে, ভাত ও সেদ্ধ সবজি মারমাদের প্রধান খাবার, আর শুকনা মাছের পেস্ট নাপ্পি তাঁদের প্রিয়। বাংলা উইকিপিডিয়াও লিখেছে, ভাত মারমাদের প্রধান খাদ্য।
জুমজার্নালের আর্কাইভে থাকা “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখার “খাদ্যাভ্যাস” অংশ, উচনু-র 2007 সালের লেখার বরাতে, মারমা রান্নার মূল গড়নটি তিন বাক্যে দিয়েছে। মারমারা মাছ ও মাংস ছাড়া অন্যান্য শাকসবজির খাবারেও শুঁটকি দেন। তরকারিতে দেন ঙাপ্পি, যাকে লেখাটি “মাছের পেস্ট” বলেছে। আর মরিচের ভর্তা দিয়ে সেদ্ধ শাকসবজি অনেকের পছন্দ, যার মারমা নাম “তোহ্জাঃ”; মরিচের চাটনি সাধারণত ঙাপ্পি দিয়েই সুস্বাদু করা হয়।
তেল-মসলার পরিমাণ নিয়েও প্রতিবেদনগুলো মোটামুটি একমত। প্রথম আলোর 2026 সালের একটি প্রতিবেদন বান্দরবানের মুন্ডি, তোজাহ ও লাকসুর কথা বলতে গিয়ে পাহাড়ি খাবারের বড় বৈশিষ্ট্য হিসেবে কম তেল ও মসলার ব্যবহার, স্থানীয় শাকসবজি, বাঁশকোঁড়ল, জুমের ফসল, পাহাড়ি মরিচ আর শুঁটকির কথা লিখেছে। তবে এটি পাহাড়ের খাবার নিয়ে সাধারণ মন্তব্য, কেবল মারমা রান্না নিয়ে নয়।
উল্টো দিকের একটি তথ্যও আছে। বান্দরবানের একটি মারমা রেস্তোরাঁ নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের 2025 সালের প্রতিবেদনে স্কুইড ভাজার বর্ণনায় লেখক Jannatul Naym Pieal লিখেছেন, সরিষার তেলের মাটিঘেঁষা স্বাদ মারমা রান্নার বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ “তেল প্রায় নেই” কথাটি সব মারমা পদের বেলায় খাটে না; সেদ্ধ সবজির তোহ্জা আর তেলে ভাজা পদ দুটোই মারমা পাতে আছে।
মারমা খাবারের সঙ্গে রাখাইন খাবারের মিলের কথাও উৎসে আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, মারমাদের সংস্কৃতি, যার মধ্যে খাবারও আছে, রাখাইনদের সঙ্গে মেলে। আমাদের আর্কাইভের “রাখাইন বা মারমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতি কথা” লেখাতেও খাদ্যাভ্যাসকে মিলের একটি দিক বলা হয়েছে। দুই জাতির সম্পর্ক ও পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত আছে রাখাইন ও মারমা আলাদা জাতি লেখায়।
ঙাপ্পি বা নাপ্পি হলো গাঁজানো মাছ বা চিংড়ির পেস্ট, যা মারমা রান্নায় তরকারি আর মরিচের চাটনির স্বাদ বাড়াতে অল্প পরিমাণে দেওয়া হয়। আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখায় বানান “ঙাপ্পি”, অর্থ “মাছের পেস্ট”; বাংলাপিডিয়া একে বলেছে শুকনা মাছের পেস্ট।
উপাদান নিয়ে উৎসে দুই রকম কথা আছে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের 2026 সালের লেখায় Abir Imtiaz নাপ্পিকে গাঁজানো মাছের প্রস্তুতি বলেছেন, যার স্বাদ নোনতা ও তীব্র, আর অল্প একটু দিলেই সাধারণ সবজির পদ বদলে যায়। ঢাকা ট্রিবিউনের 2024 সালের লেখায় Tahsina Inam Trisha নাপ্পিকে বলেছেন গাঁজানো চিংড়ির পেস্ট। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Ngapi নিবন্ধ জানায়, বর্মী শব্দ ngapi-র আক্ষরিক অর্থ “চাপা মাছ”, আর বাংলাদেশে চিংড়ির পেস্টকে বলা হয় নাপ্পি।
পাহাড়ে নাপ্পি আসে মূলত উপকূল থেকে। আমাদের আর্কাইভের “আদিবাসী জনগণের কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতি” লেখা অনুযায়ী কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর রাখাইনরা সামুদ্রিক শুঁটকি ও নাপ্পি উৎপাদন করেন, আর এর একটি অংশ মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যে রপ্তানি হয়। নাপ্পি ও সিদোল কোথায়, কারা তৈরি করেন, সে আলোচনা আছে সিদোল ও নাপ্পি নিয়ে আমাদের লেখায়; এখানে তার পুনরাবৃত্তি করা হলো না।
মারমা রান্নায় নাপ্পির জায়গাটি কোথায়, তা বোঝা যায় পদের বর্ণনা থেকে। প্রথম আলো লিখেছে মুন্ডি পরিবেশনের সময় বাটিতে “চিংড়ি শুঁটকির পেস্ট” মেশানো হয়, তোজাহ খাওয়া হয় সেই পেস্ট ও মরিচের সঙ্গে, আর বাঁশকোঁড়লের মারমা পদও ভাজা হয় ওই পেস্ট দিয়ে। প্রতিবেদনটি পেস্টটির নাম আলাদা করে বলেনি, তাই এটিই ঙাপ্পি কি না তা প্রতিবেদন থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় না।
রাখাইন রান্নার সঙ্গে মিলটি এখানেও স্পষ্ট। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, রাখাইন রাজ্যের ngapi-তে লবণ খুব কম বা একেবারেই থাকে না, মূলত সামুদ্রিক মাছ দিয়ে তৈরি হয়, আর এটি রাখাইনদের “মোন্ডি” (mont di) নামের নুডলস পদের স্যুপের ভিত্তি। মুন্ডি নিয়ে নিচে আলাদা অংশ আছে।
তোহ্জা বা তোজা হলো কয়েক রকম সবজি সেদ্ধ করে মরিচের ঝাল চাটনি বা ভর্তার সঙ্গে খাওয়ার মারমা পদ। আর্কাইভের লেখায় নামটি “তোহ্জাঃ”, প্রথম আলোয় “তোজাহ”, দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় “তোজা”, আর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে “Toja”। নামের রূপ আলাদা হলেও সব উৎস একই পদের কথা বলছে।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় 2026 সালে মীর রায়হান মাসুদ লিখেছেন, এই খাবারের চল চাকমা, মারমা, রাখাইন সব জনগোষ্ঠীতেই আছে, তবে “তোজা” নামটি মূলত মারমাদের। তাঁর লেখা অনুযায়ী চাকমারা একে বলেন “মরিচ বাত্তি লোই লাদাপাদা উচ্চি”, আর রাখাইনরা “হনতোজা”।
পদ্ধতির সারকথা সহজ। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী বড় টুকরো করে কাটা সবজি হালকা লবণ দেওয়া পানিতে সেদ্ধ করা হয়, কখনো সামান্য আদা বা রসুন দিয়ে; তারপর পানি ঝরিয়ে গরম পরিবেশন করা হয়। পাশের চাটনি তৈরি হয় শুকনা বা কাঁচা লাল মরিচ, লবণ আর কখনো রসুন দিয়ে, পাথরে বেটে। উপকরণের নাম: মৌসুমি সবজি, লবণ, আদা, রসুন, লাল মরিচ।
প্রথম আলোর বর্ণনায় তোজাহ “বেশ সাদামাটা” খাবার: সেদ্ধ সবজি খাওয়া হয় চিংড়ি শুঁটকির পেস্ট ও মরিচের সঙ্গে। বান্দরবানের মারমা রেস্তোরাঁ রে খ্যাইং-এর তোজা নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড লিখেছে, এতে ছিল হালকা ভাপানো শসা, বাঁধাকপি আর বরবটি, আর পাশে কাঁচা মরিচ, রসুন, লবণ, কখনো গাঁজানো চিংড়ি বা লেবু দিয়ে বাটা সবুজ চাটনি। এক উৎসে চাটনি লাল মরিচের, অন্যটিতে সবুজ মরিচের; দুটোই প্রতিবেদকেরা নিজে যা খেয়েছেন তার বর্ণনা।
পাশের জনগোষ্ঠীর রান্নায় একই ধরনের পদ আছে, তবে নিজস্ব নামে। আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পাতার রান্নার ছকে চাকদের “তোহ্জাহ্” আছে, শুকনা মাছ ও মরিচ বাটার সঙ্গে। মিলটি নামেও, কিন্তু চাকদের পদ মারমা পদেরই রূপ কি না, কোনো উৎস বলেনি।
মুন্ডি হলো চাল ভিজিয়ে, গুঁড়ো করে, মণ্ড বানিয়ে যন্ত্রে চেপে তৈরি সরু নুডলস, যা স্যুপ, ভাজা বা চাটনিতে মিশিয়ে খাওয়া হয়। প্রথম আলো একে বলেছে বান্দরবানের মারমা জনগোষ্ঠীর অন্যতম জনপ্রিয় খাবার, আর ঢাকা ট্রিবিউন 2020 সালে লিখেছে “বান্দরবানের ঐতিহ্যবাহী মারমা খাবার”।

নামের দুটি প্রচলিত রূপ আছে: মুন্ডি আর মুংডি। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 2020 সালে লিখেছে, “মুন্ডি” নামটি মারমা ভাষা থেকে এসেছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 2026 সালে নামের একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে: মারমা ভাষায় “মুং” অর্থ পিঠা আর “তি” অর্থ কেঁচো; দেখতে কেঁচোর মতো বলে “মুংতি” থেকে “মুংডি”। প্রতিবেদনটি নিজেই একে “ব্যাখ্যা পাওয়া যায়” বলে উপস্থাপন করেছে, প্রতিষ্ঠিত ব্যুৎপত্তি হিসেবে নয়।
নুডলস তৈরির ধাপ চারটি উৎসে প্রায় একই, কেবল চাল ভেজানোর সময়ে অমিল। ধাপগুলো হলো: চাল ভেজানো, ধুয়ে শুকানো, গুঁড়ো করা, গরম পানি দিয়ে মণ্ড বানানো, তারপর বিশেষ যন্ত্রে চেপে লম্বা নুডলস বের করা ও সেদ্ধ করা। প্রথম আলো লিখেছে জুমের আতপ চালের কথা; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে Maung Manu Marma বলেছেন ভালো মানের চাল, যেমন পাইজাম বা মিনিকেট, লাগে।
ভেজানোর সময় নিয়ে চার উৎস চার কথা বলে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে (2020) Maung Manu Marma বলেছেন এক থেকে দুই সপ্তাহ; ঢাকা ট্রিবিউনে (2020) Ching Nu Mong Marma বলেছেন দুই থেকে তিন দিন; প্রথম আলো (2026) লিখেছে “কয়েক দিন”; আর দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে (2021) এক বিক্রেতা বলেছেন “কয়েক ঘণ্টা”। বাড়িভেদে বা উদ্দেশ্যভেদে সময় বদলায় কি না, কোনো উৎস ব্যাখ্যা করেনি।
গুঁড়ো করার উপায়েও পার্থক্য আছে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে Labanya Bhowmik যে বিক্রেতার কথা লিখেছেন, তিনি চাল ঢেঁকিতে গুঁড়ো করেন, যন্ত্রে নুডলস বানান, তারপর রোদে শুকান; তাঁর ভাষায় কাজটি কষ্টের আর ধৈর্যের। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে Ching Nu Mong Marma হিসাব দিয়েছেন, এক কেজি চাল থেকে দুই কেজি মুন্ডি হয়।
শুকানো আর কাঁচা নুডলসের দুটি ধারাই আছে বলে মনে হয়। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বিক্রেতা রোদে শুকানো নুডলস অন্য মুন্ডি দোকানিদের কাছে বিক্রি করেন; ঢাকা ট্রিবিউন 2020 সালে লিখেছে, মিয়ানমার ও চীন থেকে আসা নুডলসের সঙ্গে স্থানীয় মুন্ডির প্রতিযোগিতা চলছে এবং দোকানিদের ভাষ্যে স্থানীয় কারিগরেরা “বিদেশি শুকনা মুন্ডির বাজারে” আগ্রহ হারাচ্ছেন।
মুন্ডি সাধারণত গরম ঝোলে নুডলস, সঙ্গে টক, ঝাল আর শুঁটকির স্বাদ মিশিয়ে বাটিতে দেওয়া হয়; ভাজা মুন্ডি আর চাটনি-মাখা মুন্ডিও আছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 2020 সালে তিনটি ধরন লিখেছে: ভাজা, নুডলস স্যুপ, আর চাটনি ও ঝাল মরিচ মেশানো। ঢাকা ট্রিবিউন 2024 সালে লিখেছে, স্যুপের মুন্ডিই বেশি জনপ্রিয়।
বাটিতে কী মেশানো হয়, তার তালিকা উৎসভেদে একটু আলাদা, কিন্তু টক আর শুঁটকি প্রায় সবখানে আছে। নিচে কেবল উপকরণের নাম রাখা হলো, পরিমাণ নয়।
| উৎস | মুন্ডির সঙ্গে যা দেওয়া হয় |
|---|---|
| প্রথম আলো, 2026 | গরম পানি, তেঁতুলের হালকা টক রস, চিংড়ি শুঁটকির পেস্ট; সঙ্গে মুরগির কাবাব |
| দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, 2021 | শুকনা লাল মরিচের গুঁড়া, শুকনা চিংড়ির গুঁড়া, সরিষার তেল, তেঁতুল বা লেবুর রস, বিশেষভাবে তৈরি গরম পানি; সঙ্গে সেদ্ধ ডিম ও মুরগির কাবাব |
| ঢাকা ট্রিবিউন, 2020 | মাছের তরকারি, স্যুপ বা চিংড়ি; গোলমরিচের গুঁড়া, পেঁয়াজ, ধনেপাতা, লেবুর রস, শুঁটকি |
| ঢাকা ট্রিবিউন, 2024 | মরিচের গুঁড়া, লবণ, তেঁতুলের চাটনি, মুরগি বা সবজির স্টক, ধনেপাতা |
| দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2026 | গোলমরিচ, পাহাড়ি মরিচ, পেঁয়াজ ভাজা, ধনেপাতা, চিংড়ি বা শুঁটকি; সঙ্গে চাটনি ও সেঁকা কাবাব |
বান্দরবান শহরে মুন্ডির দোকানের জায়গাগুলো উৎসে নাম ধরে আছে। ঢাকা ট্রিবিউন 2020 সালে লিখেছে, চাহিদা বাড়ায় উজানীপাড়া, মধ্যমপাড়া ও বালাঘাটায় অন্তত 30টি মুন্ডি হাউস গড়ে উঠেছে, আর দোকানে ভিড় শুরু হয় বিকেল থেকে। প্রথম আলো 2026 সালে একই তিন এলাকার কথা লিখে জানিয়েছে, বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত সেখানে পর্যটকের ভিড় থাকে, আর অনেকে মুন্ডিকে হালকা খাবার বা বিকেলের নাশতা হিসেবে খান।
দামের হিসাবগুলো পুরোনো ও স্থানভেদে আলাদা, তাই কেবল সময়ের ছবি হিসেবে কাজে লাগে। ঢাকা ট্রিবিউন 2020 সালে বান্দরবানে এক বাটির দাম লিখেছে 10–20 টাকা, আর দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস 2021 সালে ছোট বাটি 10 টাকা। সেই বিক্রেতার কথায়, একজন একবারে সর্বোচ্চ তিন-চার বাটি খান।
মুন্ডির ব্যবসা অনেক পরিবারের আয়ের উৎস। ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বান্দরবান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক Ma Ting Ting Marma বলেছেন, মারমারা বহুকাল ধরে মুন্ডি বানিয়ে আসছেন আর এই ঘরোয়া খাবারের বাণিজ্যিকীকরণে অনেক পরিবার উপকৃত হচ্ছে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসের বিক্রেতা বলেছেন, তাঁর বাবা 30–40 বছর আগে এই ব্যবসায় ছিলেন, আর তাঁর কাছে এটি কেবল লাভের বিষয় নয়, সমাজের সংস্কৃতিও।
বেশির ভাগ উৎস মুন্ডিকে মারমা খাবার বলে, তবে অন্তত একটি উৎস একে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী খাবার বলেছে, আর আরাকান ও মিয়ানমারের সঙ্গে যোগের কথাও একাধিক উৎসে আছে। ঢাকা ট্রিবিউন (2020), প্রথম আলো (2026) ও দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (2026) একে মারমা খাবার বলেছে; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের বাংলা সংস্করণে (2025) ফাইয়াজ আহনাফ সামিন লিখেছেন, “মুংডি ও লাকসু—দুটি রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী খাবার”।
বাকি উৎসগুলো দুই দিকেই ইঙ্গিত দেয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 2020 সালে একে “নৃগোষ্ঠীগুলোর প্রিয় খাবার” বলেছে, আর দোকানিদের বরাতে লিখেছে খাবারটি প্রতিবেশী মিয়ানমারে সবচেয়ে জনপ্রিয়। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস 2021 সালে লিখেছে, মারমারা আরাকানের সঙ্গে পরিচিত, যেখানে মানুষ স্যুপ ও মুন্ডি খেতে অভ্যস্ত। ইংরেজি উইকিপিডিয়া রাখাইন রাজ্যের “মোন্ডি”কে রাখাইনদের বৈশিষ্ট্যসূচক পদ বলেছে।
খাওয়ার দিক থেকে মুন্ডি এখন একটি জনগোষ্ঠীর গণ্ডিতে আটকে নেই। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের 2020 সালের প্রতিবেদনে শহরের উপকণ্ঠের লাইমি বম পাড়ার একজন বম বাসিন্দা বলেছেন, শহরে এলেই তিনি মুন্ডি খান। ঢাকার যে কার্টগুলোর কথা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা লিখেছে, সেগুলো চালান চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও মারমা তরুণেরা, আর একটি কার্টের হিসাবে ক্রেতার প্রায় 70 শতাংশ বাঙালি। ওপরের ছবির আলোকচিত্রীও খাবারটিকে চাকমাদের পছন্দের খাবার বলেছেন। কে খান আর কাদের ঐতিহ্য, এই দুই প্রশ্ন এক নয়।
লাকসু হলো সেদ্ধ মুরগির মাংস ছিঁড়ে কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন ও ভেষজ দিয়ে মাখানো ঝাল চাটনি বা সালাদের মতো পদ। প্রথম আলো একে বান্দরবানের দুপুর বা রাতের খাবারে জনপ্রিয় “মুরগির মাংস দিয়ে তৈরি একধরনের চাটনি” বলেছে, যা ঝালের জন্যই অনেকের প্রিয়।
ঢাকা ট্রিবিউন 2024 সালে লাকসুকে স্পষ্টভাবে মারমা পদ বলেছে, ইংরেজি বানানে “chicken laksa”। পদ্ধতির সারকথা: চামড়া ছাড়ানো মুরগি আদা, কাঁচা মরিচ, রসুন, গোলমরিচ ও জিরার সঙ্গে সেদ্ধ করে মাংস ছিঁড়ে নেওয়া হয়; সেদ্ধ আদা-রসুন-মরিচ বেটে সেই বাটার সঙ্গে মাংস, লেবুর রস, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ, ধনেপাতা আর সামান্য সরিষার তেল মেশানো হয়। উপকরণের নাম: মুরগি, আদা, রসুন, কাঁচা মরিচ, গোলমরিচ, জিরা, লেবু, পেঁয়াজ, ধনেপাতা, সরিষার তেল।
বান্দরবানের রে খ্যাইং রেস্তোরাঁয় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদক যে “চিকেন চাটনি” খেয়েছেন, তা-ও একই ধাঁচের: ছেঁড়া মুরগি, থেঁতো কাঁচা মরিচ, রসুন, পেঁয়াজ আর স্থানীয় ভেষজ। প্রতিবেদনে পদটির মারমা নাম দেওয়া নেই। ঢাকার কার্টে লাকসুর বর্ণনা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলায়: মসলা দিয়ে মুরগি সেদ্ধ করে হাড় ছাড়িয়ে পেঁয়াজ, মরিচ ও পাহাড়ি মসলা দিয়ে তৈরি, “সালাদের মতো” খাবার।
শব্দটি অন্য জনগোষ্ঠীতেও আছে, অন্য পদে। আমাদের আর্কাইভের মারমা-বিষয়ক একটি ‘লাকসু-ধর্মী’ লেখা-য় লেখক লিখেছেন, ত্রিপুরাদের প্রিয় “লাকসু” হলো শুঁটকি ও মরিচ, প্রায়ই তেঁতুল দিয়ে তৈরি সালাদ, আর অন্তত শব্দটি মারমা উৎস থেকে এসেছে বলে তাঁর ধারণা। লেখক নিজেই একে “ধারণা” বলেছেন। ত্রিপুরা রান্নার তালিকায় “কুরুয়া বা লাকসু” নামটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পাতাতেও আছে।
ভাচ্চুরিমালাহ হলো বাঁশকোঁড়ল দিয়ে তৈরি মারমা পদ, যা বর্ষায় বাঁশকোঁড়লের মৌসুমে রান্না হয়। প্রথম আলো লিখেছে, জুন-জুলাইয়ে সদ্য গজানো বাঁশকোঁড়ল প্রথমে সেদ্ধ করা হয়, তারপর বিশেষ কায়দায় কেটে চিংড়ি শুঁটকির পেস্ট ও মরিচ দিয়ে ভাজা হয়; মারমা ভাষায় এই খাবারের নাম “ভাচ্চুরিমালাহ”।
ঢাকা ট্রিবিউন 2024 সালে পদটির বর্ণনা দিয়েছে অন্যভাবে। সেখানে “Bachchuri malah” মানে “পুর-ভরা বাঁশকোঁড়ল”: পুর সাধারণত ভাজা শুঁটকির পেস্ট, তবে কিমা মাংস বা চিংড়িও হতে পারে, আর পুর-ভরা বাঁশকোঁড়ল ভেজে ভাতের সঙ্গে পরিবেশন করা হয়। প্রথম আলো কুচি করে ভাজার কথা বলছে, ঢাকা ট্রিবিউন পুর ভরার কথা; দুটো একই পদের দুই রূপ কি না, কোনো উৎস বলেনি।
বাঁশকোঁড়লের মারমা নাম নিয়েও দুই উৎস দুই রকম। দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় 2025 সালে রিকোর্স চাকমা লিখেছেন মারমা ভাষায় বাঁশকোঁড়ল “মেহ্যাং”; বাংলা উইকিপিডিয়ার “বাঁশ কোড়ল” নিবন্ধে মারমা নাম “ম্হই”, বর্মী লিপিসহ। পদের নাম “ভাচ্চুরিমালাহ”-র প্রথম অংশ চাকমা শব্দ “বাচ্ছুরি”-র সঙ্গে মেলে, কিন্তু কোনো উৎস এর ব্যাখ্যা দেয়নি।
রে খ্যাইং রেস্তোরাঁয় বাঁশকোঁড়লের পদটি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের বর্ণনায় কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ ও লবণ দিয়ে ভাজা, মচমচে থাকে এমনভাবে, আর তাতে হালকা গাঁজানো স্বাদ। বাঁশকোঁড়ল কোন বাঁশের, কোন মৌসুমে খাওয়া হয়, সে বিষয়ে বিস্তারিত আছে চাকমা খাবারের লেখার বাচ্ছুরি অংশে।
মারমা রান্নায় আমিষের জায়গায় আছে মাছ, মুরগি, হাঁস, শূকর আর কাঁকড়া, আর সংরক্ষিত আমিষ হিসেবে শুঁটকি ও ঙাপ্পি। আর্কাইভের লেখা জানায়, বাড়ির আঙিনায় গরু, ছাগল, মুরগি পালা হয় আর মাচাংয়ের নিচে রাখা হয় শূকর; কখনো কখনো শিকারও হয়, তবে লেখাটির ভাষায় তা জীবিকার প্রয়োজনে নয়।
বান্দরবানের উজানীপাড়ার রে খ্যাইং রেস্তোরাঁর মেনু থেকে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 2025 সালে কয়েকটি পদের বর্ণনা দিয়েছে। রেস্তোরাঁর মালিকদের ভাষ্যে “রে খ্যাইং” মারমা ভাষায় “ঠান্ডা পানি”। পদগুলো:
এটি একটি রেস্তোরাঁর মেনু, ঘরের রান্নার পূর্ণ ছবি নয়; প্রতিবেদক নিজেও একটি পদের উপকরণ নিয়ে “সম্ভবত” শব্দ ব্যবহার করেছেন। তবু তালিকাটি দেখায়, অন্তত এই রেস্তোরাঁর মারমা পাতে রূপচাঁদা ও স্কুইডের মতো সামুদ্রিক মাছও আছে।
উৎসবের আগে মাংসের জোগানের কথা বাংলা উইকিপিডিয়ার সাংগ্রাই নিবন্ধে আছে। সেখানে লেখা, মারমা শূকর-ব্যবসায়ীরা সাংগ্রাইয়ের বাজারে বিক্রির জন্য কয়েক মাস আগে থেকে শূকরের ছানা পালেন, আর সাংগ্রাইয়ের বাজারে শিকার করা প্রাণীও বিক্রি হয়। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী অবংমা পূজার ভোজে শূকরের মাংস রান্না হয় (নিচে আলাদা অংশে)।
মারমা খাবারের বড় অংশ আসে জুম থেকে: ধানের সঙ্গে একই জমিতে তুলা, ভুট্টা, মারফা, শিম, আলু, তিল, ধনে, টকপাতা, হলুদ ও আদা বোনা হয়। আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখায়, আহসানের 1993 সালের গবেষণার বরাতে, জুমচাষের পুরো বছরের হিসাব দেওয়া আছে।
লেখাটি অনুযায়ী এপ্রিলে প্রথম ভারী বৃষ্টির পর ধানের বীজ বোনা হয় কার্পাস, ভুট্টা, মারফা, শিম ও আলুর সঙ্গে, “দাউজু” নামের বিশেষ দা দিয়ে মাটিতে ছোট গর্ত খুঁড়ে। তিল ছিটিয়ে বোনা হয় পুরো ক্ষেতে, একইভাবে ধনে ও টকপাতার বীজও। জুমের সীমানায় লাগানো হয় হলুদ, আদা ও বুনো ফুল। বীজ সাধারণত নিজেদের, নয়তো প্রতিবেশীর সঙ্গে বিনিময়ে নেওয়া।
| সময় (আর্কাইভের লেখায় যেমন) | কী ঘরে ওঠে |
|---|---|
| জুন-জুলাই | প্রথম মারফা |
| জুলাই-আগস্ট | ভুট্টা |
| সেপ্টেম্বর-অক্টোবর; অন্য অনুচ্ছেদে “তসলাং” (আগস্ট-সেপ্টেম্বর) | ধান; তার আগে অবংমা পূজা |
| “ওয়াগ্যেওয়াই” (সেপ্টেম্বর-অক্টোবর) | ভুট্টা, ঢেঁড়স, শিম প্রভৃতি |
| “নাইত” (নভেম্বর-ডিসেম্বর) | তুলা, আদা, হলুদ প্রভৃতি |
ধান কাটার সময় একই লেখার দুই জায়গায় দুইভাবে আছে: এক জায়গায় সেপ্টেম্বর-অক্টোবর, আরেক জায়গায় “তসলাং” মাস, যাকে বন্ধনীতে আগস্ট-সেপ্টেম্বর বলা হয়েছে। ছকে দুটোই রাখা হলো।
বনও খাবারের উৎস। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, মারমারা পাহাড়ি বন থেকে গাছের পাতা, মূল ও কন্দ সংগ্রহ করে খাদ্যের চাহিদা মেটান, আর বসতবাড়ির পাশে ছোট বাগানও করেন। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ফসলহানিতে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিলে বন থেকে তা পুষিয়ে নেওয়া যেত; লেখাটি বলছে, গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক পর্যন্ত মারমা পরিবারগুলো মোটামুটি স্বাবলম্বী ছিল, আর ষাটের দশক থেকে ভূমি হারানোসহ নানা কারণে সেই অবস্থা ভেঙে পড়ে।
জুমের পতিত জমির মারমা নাম দুই আর্কাইভ-লেখায় দুই বানানে আছে: “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত”-তে “পুংঃছো”, আর “পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান” লেখায় “ইয়া পুংছোঃ”। জুমচাষের মাসওয়ারি কাজ নিয়ে বিস্তারিত আছে জুম চাষ: পাহাড়ের কৃষিবিদ্যা, মাসে মাসে লেখায়।
অবংমা পূজা হলো জুমের ধান কাটার আগে কার্বারীর পরিচালনায় হওয়া মারমা পূজা, যার শেষে সবাই মিলে ভাত, শূকরের মাংস ও মদ খান। আর্কাইভের লেখায় অবংমাকে বন্ধনীতে “লক্ষ্মী” বলা হয়েছে, আর পূজার উপকরণের পূর্ণ তালিকা দেওয়া আছে, আহসানের 1993 সালের গবেষণার বরাতে।
লেখাটি অনুযায়ী সুসজ্জিত বাঁশের মাচায় কলাপাতা বিছিয়ে তার ওপর কিছু চাল রাখা হয়, মাচার ওপর থেকে সুতায় একটি কাঁকড়া ঝোলে, আর পাশে একটি শূকর বাঁধা থাকে। অন্য মাচায় রাখা হয় একটি পাত্রে মুরগির বাচ্চার রক্ত, দুটি ডিম, এক বোতল মদ, নানা জাতের ধান, একটি সেদ্ধ মুরগির বাচ্চা, এক বান্ডিল সুতা, কিছু সেদ্ধ শাকসবজি, এক জগ পানি, এক প্লেট ভাত, একটি সেদ্ধ চিংড়ি, তিনটি মরিচ ও দুটি রুপার মুদ্রা।
উপস্থিত সবাই প্রার্থনা করার পর দুজন মাচাটি ধানক্ষেতের নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যান, শোভাযাত্রা করে সবাই পেছনে যান। পুরোহিত মন্ত্র পড়ার পর খাদ্যদ্রব্য সবার মধ্যে বিতরণ করা হয়, শূকরটি ক্ষেতে জবাই করে মাংস রান্না হয়, আর সবাই ভাত-মাংস ও মদ খেয়ে অনুষ্ঠান শেষ করেন। লেখাটির ভাষায়, এমন ভোজ দিলে পরিবারের মঙ্গল হয় বলে বিশ্বাস।
এখানে বর্ণনাটি উৎসে যেমন আছে তেমনই রাখা হলো। পূজাটি এখনো কতটা প্রচলিত, এলাকাভেদে উপকরণ বদলায় কি না, সে বিষয়ে সাম্প্রতিক কোনো বিবরণ পাওয়া যায়নি।
মারমা ভাষায় পিঠাকে বলে “মুং”, আর পিঠার নামের শেষে প্রায়ই “মু” বা “মুং” থাকে: ছেছমা, কদামু, কেইন্দামু, রেপ্রিমু, ছিলামু, ফাকামু, গুংমু। নামগুলো প্রথম আলোয় 2023 সালে সাধন বিকাশ চাকমার প্রতিবেদন থেকে নেওয়া; “মুং” মানে যে পিঠা, তা দ্য ডেইলি স্টার বাংলার মুন্ডি-ব্যুৎপত্তির ব্যাখ্যায় আছে।
এই তালিকার মধ্যে ছেছমা সবচেয়ে জনপ্রিয়, প্রতিবেদনটি লিখেছে। ছেছমা হলো কলাপাতায় মোড়ানো বিন্নি চালের পিঠা। বাকি ছয়টির প্রস্তুতি প্রতিবেদনে নেই। একই লেখায় কবি হাফিজ রশিদ খানের একটি কবিতার উদ্ধৃতি আছে, যেখানে এক বয়স্ক বিক্রেতা “রে ফ্রি সা মু” হেঁকে চিরুনি পিঠা বিক্রি করছেন; প্রতিবেদকের ভাষায় “রেফ্রিসামু মারমা পিঠা”, আর রাঙামাটিতে মারমা কম বলে সেখানে পিঠাটি তেমন চোখে পড়ে না।
পাহাড়ি পিঠার সাধারণ উপকরণ ও পদ্ধতির কথাও ওই প্রতিবেদনে আছে, যদিও তা মারমা পিঠা আলাদা করে নয়। বেশির ভাগ পিঠা হয় নতুন ধানের চাল থেকে; উপকরণ বলতে চালের গুঁড়া, নারকেল আর গুড়; কোনো পিঠা তেলে ভাজা, কোনোটি ভাপে। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গবেষক মংসানু চৌধুরী প্রতিবেদককে বলেছেন, পাহাড়ি পিঠা একসময় কেবল সামাজিক অনুষ্ঠানের অনুষঙ্গ ছিল, এখন বাণিজ্যিকভাবে ছড়িয়েছে।
পিঠার চাল আলাদা করে রাখার কথা বাংলা উইকিপিডিয়ার সাংগ্রাই নিবন্ধে আছে: সাংগ্রাইয়ের প্রস্তুতিতে জুম থেকে পাওয়া চাল নানা রকম পিঠার জন্য রেখে দেওয়া হয়। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, সাংগ্রাইয়ে মারমারা “সাংগ্রাইমু” নামের ঐতিহ্যবাহী পিঠা বানান। 2024 সালে ঢাকার শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় পিঠা উৎসবেও “সাংগ্রাই মুং” ছিল, প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী।
| পিঠার নাম | উৎসে যা বলা আছে | উৎস |
|---|---|---|
| ছেছমা | কলাপাতায় মোড়ানো বিন্নি চালের পিঠা; সবচেয়ে জনপ্রিয় | প্রথম আলো, 2023 |
| কদামু, কেইন্দামু, রেপ্রিমু, ছিলামু, ফাকামু, গুংমু | কেবল নাম আছে | প্রথম আলো, 2023 |
| রেফ্রিসামু | কবিতায় “চিরুনি পিঠা”; রেপ্রিমুর সঙ্গে এর সম্পর্ক প্রতিবেদনে বলা নেই | প্রথম আলো, 2023 |
| সাংগ্রাইমু / সাংগ্রাই মুং | সাংগ্রাইয়ের ঐতিহ্যবাহী পিঠা | ইংরেজি উইকিপিডিয়া; প্রথম আলো, 2024 |
সাংগ্রাইয়ে মারমা ঘরে তিন ধরনের খাবারের কাজ চলে: রাত জেগে পিঠা বানানো, বিহারে ভিক্ষুদের জন্য ছোয়াইং পাঠানো, আর বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে বিশেষ খাবার পাঠানো। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী বুদ্ধস্নানের পরের দুই দিনের কর্মসূচিতে আছে “বিশেষ খাদ্যদ্রব্য ও বিভিন্ন প্রকার পিঠা তৈরি” এবং ভিক্ষুদের ছোয়াইং দান।
বাংলা উইকিপিডিয়ার বর্ণনায় পাইংছোয়াই বা ফুল তোলার রাতে মারমা তরুণ-তরুণীদের অনেকে সারারাত জেগে পিঠা বানান। মূল সাংগ্রাইয়ের দিন গৃহিণীরা ছোয়াঈ আর পিঠা নিয়ে বিহারে যান; ছোয়াঈ শুধু নিজেদের বিহারে নয়, আশপাশের বিহারে এবং উপোসথ শীল পালনকারী আত্মীয়দের জন্যও পাঠানো হয়। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠদের বাড়িতেও খাবার আর পিঠা যায়। বয়োজ্যেষ্ঠদের স্নান করাতে যাওয়া তরুণ-তরুণীদের প্রতিটি বাড়ি থেকে কিছু না কিছু খেয়ে আসতে হয়, নিবন্ধটি লিখেছে।
সাংগ্রাইয়ের তৃতীয় দিনের একটি মিশ্র সবজির পদের কথা ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় আছে: “সাংগ্রাই আতাদা” দিনে মারমারা একশোর বেশি উপকরণে একটি সবজির পদ রাঁধেন, যার নাম “হাংবং”, আর নিবন্ধটি বলছে বাংলায় একে পাচন বলে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলার 2026 সালের সাংগ্রাই প্রতিবেদনও উৎসবের দিনগুলোতে নানা পদের মিশ্রিত সবজির পাচন রান্না ও অতিথিদের পরিবেশনের কথা বলেছে, যদিও অনুচ্ছেদটি চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও ত্রিপুরাদের উৎসবের পরে এসেছে এবং কোন জনগোষ্ঠীর কথা, তা স্পষ্ট নয়। হাংবংয়ের উপকরণ বা প্রণালির বিবরণ পাওয়া যায়নি।
এখনকার সাংগ্রাইয়ের সরকারি ও সামাজিক কর্মসূচিতেও পিঠা আছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা জানায়, 2026 সালে বান্দরবানে ছয় দিনের উৎসবে 14 এপ্রিল বিকেলে বুদ্ধস্নান আর সন্ধ্যায় পিঠা উৎসব ছিল; দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 2023 ও 2025 সালের কর্মসূচিতেও পিঠা তৈরি ও পিঠা উৎসবের কথা লিখেছে। সাংগ্রাইয়ের আচার-ক্রম, জলকেলি আর ফুল তোলার বিস্তারিত আছে সাংগ্রাই জলকেলি ও বৈসাবি: বিজু, সাংগ্রাই ও বৈসুর আলাদা আচার-ক্রম লেখায়।
ছোয়াইং হলো বিহারে ভিক্ষুদের জন্য দেওয়া খাবার, আর মারমাদের কয়েকটি বৌদ্ধ উৎসবে এই দানের কথা উৎসে নাম ধরে আছে। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী বৈশাখী পূর্ণিমা বা ক্ছুংলাব্রেতে মারমারা মন্দিরে ভিক্ষুদের ছোয়াইং দেন, যাকে বন্ধনীতে “বিশেষ খাবার” বলা হয়েছে।
আশ্বিনী পূর্ণিমা বা ওয়াগ্যোওয়াইয়ের দিনে খাবারের কাজ দুই রকম, লেখাটি জানায়। মন্দিরে দুপুরের আগেই ছোয়াইং দান করা হয়, আর সমাজের লোকজন খাবার বানিয়ে পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, ভিক্ষু ও যাঁরা বর্ষাবাস পালন করেছেন সেই বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে বিতরণ করেন। বাংলা উইকিপিডিয়া লিখেছে, এই দিন ঘরে ঘরে সুস্বাদু পিঠা তৈরি হয়।
কঠিন চীবর দানের পরদিন ভিক্ষুরা বুদ্ধমূর্তি নিয়ে গ্রামের মধ্য দিয়ে শোভাযাত্রা করেন, আর গ্রামের মানুষ পথে ছাউনি বানিয়ে ছোয়াইং ও অন্যান্য দ্রব্য দান করেন, আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী। ছোয়াইংয়ে ঠিক কোন কোন পদ থাকে, তার তালিকা কোনো উৎসে নেই।
মারমা জীবনচক্রের তিন বড় পর্বে খাবারের নির্দিষ্ট জায়গা আছে: জন্মের পর ক্ষমা চাওয়ার ভোজ, বিয়েতে মঙ্গল বাসন ও সেদ্ধ মোরগ, আর মৃত্যুর পর খোমেজা। আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখায় তিনটিরই বর্ণনা আছে।
লেখাটি অনুযায়ী প্রসূতি এ সময় বুকের দুধ বাড়ায় এমন খাবার খান, আর একপর্যায়ে নতুন শিশুকে বুকের দুধের পাশাপাশি লবণ মেশানো ভাতের মণ্ড খাওয়ানো হয়। জন্মের পনেরো দিন পর “মেদেঃতঃরে” নামের আচার হয়, যার অর্থ ক্ষমা প্রার্থনা; এতে ধাত্রী ও বয়স্ক প্রতিবেশীদের জন্য বিশেষ খাবার ও মদের আয়োজন থাকে, আর খাবার পরিবেশনের আগে শিশুর মা ধাত্রীকে এক গ্লাস মদ দিয়ে ক্ষমা চান।
বউ আনতে যাওয়ার দিন বরপক্ষ নিয়ে যায় একটি সেদ্ধ মোরগ, এক বোতল “চিংরে”, এক বোতল মদ আর কনের পোশাক ও অলংকার, লেখাটি জানায়। বিয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্বে ভিক্ষুর পরিত্রাণ সূত্র পাঠের জন্য “মঙ্গল বাসন” লাগে, যাতে থাকতে হয় থালাভর্তি ভাত, জংলী আলু, কলা, শুঁটকি মাছ, কুমড়া, শাকসবজি আর রান্না করা গোটা দুটি মোরগ-মুরগি।
মূল বিয়ের অনুষ্ঠানে একটি মোরগ আস্ত সেদ্ধ করে তার জিহ্বার একটি অংশ টেনে দেখা হয়, লেখাটি বলছে। প্রথম আলোয় 2026 সালে বুদ্ধজ্যোতি চাকমা একই রীতির কথা লিখেছেন: “লাকথেক মাংলা পোয়ে” অনুষ্ঠানে মঙ্গলঘটের পাশে একটি অর্ধসেদ্ধ মোরগ রাখা হতো, তার জিবের অগ্রভাগ দেখে নবদম্পতির শুভাশুভ বিচার হতো, আর সেই মোরগের রান্না করা মাংস দিয়ে বর-কনে পরস্পরকে ভাত খাওয়াতেন। প্রতিবেদনটির ভাষায়, এখন এই রীতির প্রচলন কম, বিশেষ করে শিক্ষিত সমাজে দেখা যায় না।
পারলৌকিক বিশ্বাস অনুযায়ী মরদেহের পায়ের দিকে রাখা হয় “খোমেজা”, যা চাল ও তরিতরকারি দিয়ে রান্না করা হয়, আর মাথার দিকে জলভর্তি পাত্র, লেখাটি জানায়। শ্মশানে নেওয়ার আগে মৃতের পাশে ছোট বাঁশের চোঙায় চাল ভরে শব্দ করে নাড়ানো হয়, যার নাম “নাঃরাঙঃ ছাইং হ্লোক”। মৃতের উদ্দেশে দান করা চালের হিসাবও “কুষ্ঠি”-তে লেখা হয়।
মারমা সমাজে চাল থেকে তৈরি মদ সামাজিক আচার আর অর্থনীতি দুটোরই অংশ, আর এটি তৈরি করেন মূলত নারীরা। আর্কাইভের লেখায় মদ তৈরিকে মারমাদের আটটি অর্থনৈতিক কাজের একটি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, আর শ্রমবিভাগের অংশে লেখা: “কাপড় বোনা ও মদ তৈরি নারীদের কাজ।”
মদ হওয়ার আগের ধাপের একটি নাম উৎসে আছে: “চিংরে”। আর্কাইভের লেখা একে বলেছে “মদ তৈরি হবার পূর্বে ভাত, পানি ও মুলির সংমিশ্রণ”। মুলি কী, তার ব্যাখ্যা লেখায় নেই। কত দিন রাখা হয়, পাতন হয় কি না, এসব প্রণালি কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
বাংলাপিডিয়ার দুই সংস্করণ দুইভাবে বলেছে। ইংরেজি সংস্করণ লিখেছে মারমারা “rice beer” বা ভাতের বিয়ার উপভোগ করেন, আর অর্থনৈতিক কাজের তালিকায় রেখেছে “brewing”; বাংলা সংস্করণে সেই একই তালিকায় শব্দটি “চোলাই মদ তৈরি”। মারমা মদ পাতন করা হয় কি না, দুই সংস্করণের শব্দ থেকে তাই নিশ্চিত হওয়া যায় না।
বিক্রির কথাও আছে। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী মারমারা বাজারে যা বিক্রি করেন তার মধ্যে ঝুড়ি ও বোনা কাপড়ের সঙ্গে মদও আছে, আর এসবের বেশির ভাগ বিক্রি হয় দালাল ও মহাজনের মাধ্যমে। সামাজিক আচারে মদের জায়গা ওপরের অংশগুলোতে দেখা গেছে: বিয়ের প্রস্তাব, বউ আনা, জন্মের পরের ক্ষমা প্রার্থনা আর অবংমা পূজার ভোজ। মারমা থামি-বয়ন ও নারীর কাজ নিয়ে আছে থামি আর আঙ্গি লেখা।
প্রথাগত মারমা বাড়িতে আলাদা রান্নাঘর আর গুদামঘর থাকে, আর ঘরের সঙ্গে লাগানো খোলা মাচা বা মাচাংয়ে ধান, সরিষা, মরিচ, তামাক শুকানো হয়। আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী বাঁশের বাড়ি মাটি থেকে 6–7 ফুট উঁচুতে খুঁটির ওপর তৈরি, আর প্রতিটি বাড়িতে থাকে শয়নঘর, বৈঠকঘর, রান্নাঘর ও গুদামঘর।

মাচাংয়ের এক কোণে হাঁস-মুরগির খোঁয়াড় থাকে, আর নিচে রাখা হয় জ্বালানি কাঠ, শূকর ও তাঁত, লেখাটি জানায়। নিজেদের খাওয়ার ধান রাখা হয় বাঁশের তৈরি একটি আধারে, আলাদা একটি ঘরে। জুমক্ষেতে “বক্” নামের ছোট জুমঘরে ফসল তোলার সময় অস্থায়ীভাবে ফসল রাখা হয়।
বাসনপত্র নিয়ে বাংলাপিডিয়া লিখেছে, মারমা পরিবারের রান্নাঘরের বাসন মূলত মাটির, বাঁশের বা কাঠের, যদিও অনেক পরিবার এখন অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি, কড়াই, থালা ও গ্লাস ব্যবহার করে। ফসল জমিয়ে রেখে ধীরে বিক্রির ব্যবস্থা মারমা সমাজে গড়ে ওঠেনি, আর্কাইভের লেখা বলছে; কেবল নিজেদের ভোগের জন্য অপরিহার্য ফসলটুকু রাখা হয়, বাকিটা ফসল তোলার পরপরই বিক্রি করতে হয়।
মারমা খাবারের মধ্যে শহরে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে মুন্ডি, তার সঙ্গে লাকসু; ঢাকায় এখন মারমা খাবারের রেস্তোরাঁ আর রাস্তার কার্ট দুই-ই আছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 2026 সালে ঢাকার পাহাড়ি খাবারের পাঁচটি ঠিকানার মধ্যে দুটি মারমা খাবারের বলেছে: উত্তরার “রোয়াজা” আর মালিবাগের “লারং”, দুই জায়গারই প্রধান আকর্ষণ মুংডি।
রাস্তার খাবারে মুন্ডির প্রবেশের ছবি দিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা, 2025 সালে। আগারগাঁও আর সংসদ ভবনের সামনের মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের ফুটপাথে কয়েকটি কার্টে মুংডি, লাকসু ও ব্যাম্বু চিকেন বিক্রি হয়। একটি কার্টের বিক্রেতা জানিয়েছেন, ক্রেতার প্রায় 70 শতাংশ বাঙালি; আরেকটির কাঁচামালের বেশির ভাগ আসে বান্দরবান থেকে। একটি কার্ট চালান মেয়হ্লাপু মারমা ও জ্যোতি চাকমা, প্রতিদিন ভোরে মুরগি কিনে সেদ্ধ করা, স্যুপ ও নুডলস তৈরি সব নিজেরাই করেন।
খাবার উৎসবেও মারমা পদ জায়গা পেয়েছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে, 2022 সালে ঢাকার একটি আদিবাসী খাবার উৎসবে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, রাখাইন ও গারোসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর খাবার নিয়ে 15টি স্টল বসেছিল। প্রথম আলো 2026 সালে লিখেছে, বান্দরবানে বেড়াতে আসা অনেক পর্যটকের কাছে পাহাড়ি খাবার ভ্রমণের অন্যতম আকর্ষণ, আর প্রথমবার আসা অনেকে জানতে চান মুন্ডি বা হেবাং কী।
এই প্রসারের একটি উল্টো দিকও প্রতিবেদনে আছে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের 2025 সালের প্রতিবেদন লিখেছে, বান্দরবানের বেশির ভাগ হোটেল-রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁ যা পরিবেশন করে, তাকে সত্যিকারের স্থানীয় খাবার বলা যায় না, যদিও “খাঁটি” দাবি করে। বাজারের জন্য রান্নার এই রূপান্তর ঘরের রান্নাকে কতটা বদলেছে, তার কোনো গবেষণা পাওয়া যায়নি।
মারমা ও চাকমা রান্নায় একই ধরনের কয়েকটি পদ আছে, কিন্তু নাম আলাদা, আর অনেক ক্ষেত্রে উপকরণও। নিচের ছকে কেবল সেই জোড়াগুলো রাখা হলো, যেগুলোর দুই দিকের নামই কোনো উৎসে পাওয়া গেছে। চাকমা দিকের নাম ও ব্যাখ্যা চাকমা খাবারের লেখা থেকে।
| ধরন | মারমা | চাকমা | উৎস (মারমা দিক) |
|---|---|---|---|
| তরকারির গাঁজানো স্বাদ-উপকরণ | ঙাপ্পি (মাছের পেস্ট) | সিদোল | আর্কাইভ, উচনু 2007 |
| সেদ্ধ সবজি, মরিচের ভর্তা বা চাটনির সঙ্গে | তোহ্জাঃ / তোজা | মরিচ বাত্তি লোই লাদাপাদা উচ্চি | আর্কাইভ; দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 2026 |
| বাঁশকোঁড়ল | মেহ্যাং / ম্হই | বাচ্ছুরি | দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 2025; বাংলা উইকিপিডিয়া |
| নববর্ষের মিশ্র সবজির পদ | হাংবং | পাজন | ইংরেজি উইকিপিডিয়া |
| পিঠা | মুং | পিদা | দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 2026 |
| সবচেয়ে জনপ্রিয় পিঠা | ছেছমা (কলাপাতায় বিন্নি চাল) | সান্নে | প্রথম আলো 2023 |
ছকটি দুই রান্নাকে এক করে দেখার জন্য নয়, বরং দেখানোর জন্য যে একই ধরনের খাবারেরও প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজের নাম আছে। পাহাড়ের অন্য জনগোষ্ঠীর রান্নার নাম যতটুকু জানা যায়, তা আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য পাতায়, আর পুরো অঞ্চলের পরিচিতি পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব পাতায়।
মারমাদের প্রধান খাবার ভাত, সঙ্গে সেদ্ধ শাকসবজি। বাংলাপিডিয়া লিখেছে ভাত ও সেদ্ধ সবজি মারমাদের প্রধান খাবার, আর শুকনা মাছের পেস্ট নাপ্পি তাঁদের প্রিয়। জুমজার্নালের আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখা অনুযায়ী মারমারা সবজির তরকারিতেও শুঁটকি দেন, তরকারিতে ঙাপ্পি দেন, আর মরিচের ভর্তা দিয়ে সেদ্ধ সবজি খান, যার নাম তোহ্জাঃ।
মুন্ডি চালের তৈরি সরু নুডলস। প্রথম আলো লিখেছে জুমের আতপ চাল কয়েক দিন ভিজিয়ে মণ্ড বানিয়ে বিশেষ পদ্ধতিতে সরু নুডলস বের করে সেদ্ধ করা হয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে এক কারিগর পাইজাম বা মিনিকেট চালের কথা বলেছেন। পরিবেশনের সময় গরম ঝোল, তেঁতুল বা লেবুর টক, মরিচ আর শুঁটকির পেস্ট মেশানো হয়।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 2020 সালে লিখেছে, নামটি মারমা ভাষা থেকে এসেছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 2026 সালে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে: মারমা ভাষায় “মুং” মানে পিঠা আর “তি” মানে কেঁচো, দেখতে কেঁচোর মতো বলে “মুংতি” থেকে “মুংডি”। প্রতিবেদনটি একে প্রচলিত ব্যাখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করেছে, প্রমাণিত ব্যুৎপত্তি হিসেবে নয়।
উৎসে দুই রকম কথা আছে। ঢাকা ট্রিবিউন, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার বাংলা একে মারমা খাবার বলেছে; দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড বাংলা 2025 সালে মুংডি ও লাকসুকে রাখাইনদের ঐতিহ্যবাহী খাবার বলেছে। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস আরাকানের সঙ্গে যোগের কথা লিখেছে, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়া রাখাইন রাজ্যের “মোন্ডি”কে রাখাইনদের বৈশিষ্ট্যসূচক পদ বলেছে।
উৎসভেদে আলাদা। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডে (2020) Maung Manu Marma বলেছেন এক থেকে দুই সপ্তাহ, ঢাকা ট্রিবিউনে (2020) Ching Nu Mong Marma বলেছেন দুই থেকে তিন দিন, প্রথম আলো (2026) লিখেছে কয়েক দিন, আর দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসে (2021) এক বিক্রেতা বলেছেন কয়েক ঘণ্টা। ভেজানোর পর গুঁড়ো করে গরম পানিতে মণ্ড বানিয়ে যন্ত্রে চেপে নুডলস হয়।
তোজা হলো কয়েক রকম সবজি সেদ্ধ করে মরিচের ঝাল চাটনি বা ভর্তার সঙ্গে খাওয়ার মারমা পদ। আর্কাইভের লেখায় নাম “তোহ্জাঃ”, আর মরিচের চাটনি সাধারণত ঙাপ্পি দিয়ে সুস্বাদু করা হয়। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে, পদটি চাকমা ও রাখাইনদের মধ্যেও আছে, তবে “তোজা” নামটি মূলত মারমাদের; রাখাইনরা বলেন “হনতোজা”।
বান্দরবানে লাকসু মুরগির ঝাল চাটনি। ঢাকা ট্রিবিউন 2024 সালে একে মারমা পদ বলে লিখেছে: মুরগি আদা, মরিচ, রসুন, গোলমরিচ ও জিরার সঙ্গে সেদ্ধ করে ছিঁড়ে নেওয়া হয়, তারপর আদা-রসুন-মরিচ বাটা, লেবুর রস, পেঁয়াজ, ধনেপাতা ও সামান্য সরিষার তেলে মাখানো হয়। ত্রিপুরাদের “লাকসু” আলাদা পদ, শুঁটকি ও মরিচের সালাদ।
আর্কাইভের মারমা-লেখায় বানান “ঙাপ্পি (মাছের পেস্ট)”, বাংলাপিডিয়ায় “Nappi”, শুকনা মাছের পেস্ট; দুই বর্ণনা কাছাকাছি, তবে কোনো উৎস দুটিকে সরাসরি এক বলেনি। উপাদান নিয়ে অমিল আছে: দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস একে গাঁজানো মাছ বলেছে, ঢাকা ট্রিবিউন গাঁজানো চিংড়ির পেস্ট। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী বর্মী ngapi মানে “চাপা মাছ”, আর বাংলাদেশে চিংড়ির পেস্টকে নাপ্পি বলে।
মারমা ভাষায় পিঠাকে বলে মুং। প্রথম আলোর 2023 সালের প্রতিবেদনে মারমা পিঠার সাতটি নাম আছে: ছেছমা, কদামু, কেইন্দামু, রেপ্রিমু, ছিলামু, ফাকামু ও গুংমু। এর মধ্যে ছেছমা সবচেয়ে জনপ্রিয়, কলাপাতায় মোড়ানো বিন্নি চালের পিঠা। সাংগ্রাইয়ের পিঠাকে ইংরেজি উইকিপিডিয়া “সাংগ্রাইমু” বলেছে।
সাংগ্রাইয়ে মারমা ঘরে পিঠা বানানো হয়, বিহারে ভিক্ষুদের জন্য ছোয়াইং পাঠানো হয়, আর বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রতিবেশীদের বাড়িতে বিশেষ খাবার যায়। বাংলা উইকিপিডিয়া অনুযায়ী পাইংছোয়াইয়ের রাতে তরুণ-তরুণীরা জেগে পিঠা বানান। ইংরেজি উইকিপিডিয়া লিখেছে, তৃতীয় দিনে একশোর বেশি উপকরণে “হাংবং” নামের সবজির পদ রান্না হয়।
ছোয়াইং হলো বৌদ্ধ বিহারে ভিক্ষুদের জন্য দান করা খাবার। জুমজার্নালের আর্কাইভের “মারমা জাতির আদ্যোপান্ত” লেখা অনুযায়ী মারমারা বৈশাখী পূর্ণিমা, আশ্বিনী পূর্ণিমা বা ওয়াগ্যোওয়াই, কঠিন চীবর দান আর সাংগ্রাইয়ে ভিক্ষুদের ছোয়াইং দেন; ওয়াগ্যোওয়াইয়ে তা দুপুরের আগেই দেওয়া হয়। ছোয়াইংয়ে কোন কোন পদ থাকে, তার তালিকা কোনো উৎসে নেই।
চাল থেকে তৈরি মদ। জুমজার্নালের আর্কাইভের লেখা অনুযায়ী মদ তৈরি নারীদের কাজ, মারমাদের আটটি অর্থনৈতিক কাজের একটি, আর মদ হওয়ার আগের ভাত, পানি ও মুলির মিশ্রণকে বলে “চিংরে”। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি সংস্করণ একে “rice beer” বলেছে, বাংলা সংস্করণ “চোলাই মদ”। জন্ম, বিয়ে ও পূজার আচারে মদের নির্দিষ্ট ভূমিকা আছে।
জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)
সংবাদমাধ্যম, বিশ্বকোষ ও অন্যান্য
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:বান্দরবান, মারমা, সাংগ্রাই
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।