Last updated Oct 15th, 2026
0

গেংখুলি শব্দটি একইসঙ্গে তিনটি জিনিস বোঝায় — একটি সুর, সেই সুরে গাওয়া দীর্ঘ পালা, আর যাঁরা তা গেয়ে থাকেন সেই গায়কেরা।
এই পাতাটি তৃতীয়টি নিয়ে — গায়কদের নিয়ে। তাঁরা কারা, কী নামে ডাকা হয়, কীভাবে পরিবেশন করেন, কোন যন্ত্র বাজান, কত রাত ধরে গান, কী কী গেয়ে থাকেন, আর আজ কতজন অবশিষ্ট।
পালাগুলোর কাহিনি ও রাধামন-ধনপুদির গল্প নিয়ে আলাদা লেখা আছে গেংখুলি ও রাধামন-ধনপুদি: চাকমা মৌখিক সাহিত্যের পাঠ-এ।
গেংখুলি শব্দটি পঠিত উৎসগুলোতে তিনটি আলাদা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, আর তিনটিই বৈধ। একটি সুর, সেই সুরে গাওয়া পালা, আর পালাটি যাঁরা গেয়ে থাকেন সেই গায়কেরা।
| অর্থ | যে উৎসে |
|---|---|
| একটি সুর — ঐতিহ্যবাহী ও স্বতন্ত্র একটি সুর, যাতে পালা গাওয়া হয় | নিধি চাকমার থিসিস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২১; আর্কাইভের চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ-এ “গেংখুলীদের পালাগানের সুর” |
| একধরনের পালা বা ব্যালাড — চাকমা ইতিহাস নিয়ে দীর্ঘ গাথা | চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদ; চাকমা জাতির আদিনিবাস সন্ধানে-এ “গেংখুলি গীত নামক লোকগীতি বা পালাগান” |
| গায়ক — যাঁরা এই পালা গেয়ে থাকেন, তাঁদেরও গেংখুলি বলা হয় | চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদ; প্রথম আলো-য় “গেংখুলি পালাকার”; পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণ-এ “গেংখুলি নামক চারণ কবিগণ” |
বানানেও ভিন্নতা আছে, আর তা উৎসভেদে — গেংখুলি, গেঙখুলি, গেংখুলী, গেংহুলি, জ্ঞেনহুলি, আর ইংরেজিতে Gengkhuli, Genghuli, Geingkhuli।
আর্কাইভের একটি লেখায় দুটি বানান একসঙ্গেই দেওয়া — পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা লেখক সমাজ ও সাহিত্য চর্চা-য় লেখা “জ্ঞেনহুলি(গেঙখুলি)পালা”।
তৃতীয় অর্থটিই এই পাতার বিষয়, কারণ সেটিই একটি পেশা বা ভূমিকার নাম — আর ভূমিকাটি আজ কতজন পালন করেন, সেই প্রশ্নটিই সবচেয়ে জরুরি।
লক্ষ করার মতো একটি বিষয় আছে এই তিন অর্থের সম্পর্কেও। সুর, রচনা আর পরিবেশক — তিনটির একটিই নাম, অর্থাৎ ঐতিহ্যটি তিনটিকে আলাদা করে দেখে না।
আর্কাইভের দুটি আলাদা লেখায় গেংখুলিদের জন্য একই বাংলা পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে — চারণ কবি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা আদিবাসীর জাতিসত্তা-য় লেখা: “চাকমাদের চারণ কবি গেংখুলিদের লােকগানে রাজা বিজয়গিরির দিগ্বিজয়ের কাহিনী জানা যায়।”
আর বিংশ শতাব্দী পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণ-এ একটি আরও জোরালো বাক্য: “পাহাড়িদের মধ্যে এ লোকসাহিত্য চর্চাকারী এখন শুধুমাত্র গেংখুলি নামক চারণ কবিগণ।”
এই দ্বিতীয় বাক্যটি এই পাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ধৃতি, কারণ তা একটি দাবি করে — পাহাড়ি লোকসাহিত্যের জীবিত চর্চাকারী আর কেউ নেই, কেবল গেংখুলিরা আছেন।
একই লেখায় তার আগের বাক্যটিও আছে, আর সেটি কারণটি বলে: “বর্তমানে লোকসাহিত্যের অন্যতম অঙ্গ পাহাড়ি লোকসঙ্গীতগুলো আজ লুপ্ত হয়ে যেতে বসেছে।”
পরিভাষাটি নিজেও তথ্যপূর্ণ। চারণ কবি মানে ভ্রাম্যমাণ গায়ক — যিনি এক জায়গায় বসে নন, গ্রাম থেকে গ্রামে গিয়ে গেয়ে থাকেন।
তবে পঠিত উৎসগুলোতে গেংখুলিদের যাত্রাপথ, ভ্রমণের পরিধি কিংবা পারিশ্রমিকের কোনো বিবরণ নেই — অর্থাৎ পরিভাষাটি যা ইঙ্গিত করে, তার বিস্তারিত নথি পাওয়া যায়নি।
[গেংখুলিরা সত্যিই ভ্রাম্যমাণ ছিলেন কি না, কিংবা “চারণ কবি” কেবল একটি বাংলা অনুবাদ হিসেবে ব্যবহৃত — তা কোনো পঠিত উৎসে স্পষ্ট নয়; যাচাই প্রয়োজন]
চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদের পাতায় একটি বাক্য আছে যা ভূমিকাটিকে সীমিত করে দেয় — এই পালা গাওয়া হয় “বাছাই করা মানুষদের” দিয়ে, আর তাঁদেরও গেংখুলি বলা হয়।
অর্থাৎ যে কেউ গেংখুলি নন। এটি একটি বিশেষ দক্ষতা, আর সেই দক্ষতার সঙ্গে নামটিও যুক্ত হয়ে যায়।
নামের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রমাণ রেকর্ডিংয়ের তালিকায়ও আছে — দুটি সংরক্ষিত রেকর্ডিংয়ে গায়কের নামই “বিরো গেংখুলি” আর “কুঞ্জলাল গেংখুলি”।
অর্থাৎ শব্দটি পদবির মতো ব্যবহৃত হয়, ঠিক যেমন একজন বৈদ্য বা ওঝার ক্ষেত্রে হয়।
দক্ষতাটি শেখারও দরকার হয়। একটি রেকর্ডিংয়ের তথ্য অনুযায়ী বিরো গেংখুলি খান্দারা চাকমা-র কাছে তালিম নিয়েছিলেন — অর্থাৎ গুরু-শিষ্য পরম্পরা ছিল।
আর পরম্পরার কথা আর্কাইভেও আছে। চাকমা জাতির আদিনিবাস সন্ধানে-এ গেংখুলিদের সম্পর্কে লেখা, তাঁরা “উত্তরসূরী হিসেবে পূর্বপুরুষদের গাওয়া লোকগীতি বংশ পরম্পরায় গেয়ে আসছেন”।
এই বাক্যটি একটি নতুন তথ্য যোগ করে — শেখাটি কেবল গুরুর কাছে নয়, বংশের ভিতরেও। অর্থাৎ ভূমিকাটি পারিবারিকও হতে পারত।
আর একই পাতায় আরেকটি তথ্য আছে, যা ভূমিকাটিকে আরও নির্দিষ্ট করে: নির্দিষ্ট গান নির্দিষ্ট উপলক্ষের সঙ্গে বাঁধা।
অর্থাৎ একজন গেংখুলির জানা থাকতে হয় কোন উপলক্ষে কোনটি গাওয়া হয় — দক্ষতাটি কেবল গলার নয়, ভাণ্ডারেরও।
[গেংখুলি হওয়ার কোনো প্রথাগত দীক্ষা বা স্বীকৃতির পদ্ধতি ছিল কি না, তা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
পরিবেশনার দৈর্ঘ্য নিয়ে তিনটি উৎস তিনটি হিসাব দেয়, আর তিনটিই বড়।
| উৎস | পরিবেশনার দৈর্ঘ্য |
|---|---|
| চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদ | সাধারণত সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত; কখনো কয়েক দিন ধরেও |
| প্রথম আলো | রাধামন-ধনপুদি পালা সাত দিন সাত রাত ধরে পর্বে পর্বে পরিবেশিত, আর তাতেও শেষ হয় না |
| প্রতিধ্বনি | গোজেন লামা পালা সারা রাত ধরে, আর একটিমাত্র বাদ্যযন্ত্র সঙ্গে |
তিনটি হিসাব পরস্পরবিরোধী নয় — পালার দৈর্ঘ্য আলাদা, তাই পরিবেশনার দৈর্ঘ্যও আলাদা।
আর দৈর্ঘ্যের একটি কারণ পালার গঠনে। প্রতিধ্বনি-র লেখা অনুযায়ী রাধামন-ধনপুদি গাথাটি নয়টি পর্বে বিভক্ত, আর তার সিকুয়েলটিও পর্বে বিভক্ত।
পর্বের ভিতরে আবার নামওয়ালা পরিচ্ছেদ আছে। চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ-এ লেখা, রাধামন ধনপুদি পালায় “জুম কাবা পালা” নামে একটি পরিচ্ছেদ আছে।
অর্থাৎ পালাটি একটানা একটি গান নয় — এর ভিতরে নাম ধরে আলাদা করা অংশ আছে, আর সেগুলো আলাদা করেও পরিবেশন করা সম্ভব।
এই সময়-হিসাবটি ভূমিকাটির একটি ব্যবহারিক দিকও দেখায়। একজন গেংখুলিকে সারা রাত জেগে গাইতে হয়, আর কখনো পরপর কয়েক রাত।
অর্থাৎ এটি একটি শারীরিক কাজও — আর সেজন্যই একজন গেংখুলির বয়স বাড়লে পরিবেশনার সংখ্যা কমে আসা স্বাভাবিক।
আরেকটি প্রসঙ্গও এখানে কাজে লাগে। চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ-এ লেখা, চাকমাদের মধ্যে নৃত্যগীত সমন্বিত কোনো জাতীয় উৎসবের প্রচলন নেই।
অর্থাৎ গেংখুলি পরিবেশনার জন্য বাঁধা কোনো বার্ষিক মঞ্চ ছিল না। পরিবেশনাটি উৎসবের অংশ নয়, বরং আলাদা একটি আয়োজন — আর সেটিও পরে আয়োজন কমে আসার একটি কারণ হতে পারে।
[একটি পরিবেশনায় কতজন গেংখুলি থাকেন — একজন না একাধিক — তা কোনো পঠিত উৎসে স্পষ্ট নয়]
গেংখুলি ও চাকমা গানের বাদ্যযন্ত্র নিয়ে উৎসগুলো আলাদা তালিকা দেয়, আর তালিকার দৈর্ঘ্য দুই থেকে আট পর্যন্ত যায়।
| উৎস | যন্ত্রের তালিকা | সংখ্যা |
|---|---|---|
| প্রথম আলো | খেংগড়ং, ধুদক | ২ |
| চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদ | হেংগরং, সিংহা, ধুধুক | ৩ |
| জুমচাষ — “চাকমা গানে সবচেয়ে বেশি উল্লিখিত” | ধুধুক, বাঝি, শিঙা, হেংগরং | ৪ |
| চাকমা জাতি | ধুদুক, হেঙগরঙ, শিঙা, বাঁশি, ঢুল, ডগর, সারিন্দ্যা, তাক | ৮ |
তালিকাগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিধিতে আলাদা। সংকীর্ণ তালিকাগুলো গেংখুলি পরিবেশনার, আর দীর্ঘ তালিকাটি চাকমা সংগীতের সব ধারার।
একটি সংখ্যাগত তথ্য গেংখুলির জন্য নির্দিষ্ট। প্রতিধ্বনি-র লেখা অনুযায়ী গেংখুলি গায়কেরা গোজেন লামা পালা সারা রাত পরিবেশন করেন একটিমাত্র বাদ্যযন্ত্র সঙ্গে নিয়ে।
অর্থাৎ এটি অর্কেস্ট্রা নয় — একজন গায়ক, একটি যন্ত্র, আর সারা রাত। সংরক্ষিত দুটি রেকর্ডিংয়ের তথ্যেও সেটিই মেলে: দুটিতেই গায়ক একইসঙ্গে একটি তারযুক্ত যন্ত্র বাজিয়েছেন।
বাঁশির একটি আলাদা জায়গা আছে পালার ভিতরেই। জুমচাষ-এ লেখা, “ঐতিহ্যবাহী পালাগান ‘রাধামন ধনপুদি পালা’ তে যেমন খুব গুরুত্বের সাথে বাঁশির উল্লেখ আছে, তেমনি আধুনিক চাকমা গান পর্যন্ত বাঁশির সুর ছাড়া কদাচিৎ কুলীনতা অর্জন করতে পারে।”
অর্থাৎ বাঁশি দুই দিক থেকেই আছে — পালার কাহিনির ভিতরে একটি বস্তু হিসেবে, আর পরিবেশনার যন্ত্র হিসেবে।
যন্ত্রগুলো কোথায় থাকত, তারও একটি বিবরণ আছে একই লেখায়: জুমিয়াদের মধ্যে তরুণ-তরুণী থাকলে ঘরের বেড়ায় বাঁশের খাপে হেংগরং, বাঝি বা বাঁশি আর ধুধক লটকে থাকতে দেখা যেত।
এটি একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য — যন্ত্রগুলো মঞ্চের নয়, ঘরের। অর্থাৎ বাজানোটি দৈনন্দিন জীবনের অংশ ছিল।
কবিতাতেও যন্ত্রগুলো একসঙ্গে আসে। একই লেখায় কবি ফেলাজিয়া চাকমার “জুম্মবী পরাণী মর” কবিতার বর্ণনায় মোনঘরের ইজোরে বসে বাঁশি, ধুধুক, হেংগরং আর শিঙা বাজানোর দৃশ্য আছে।
পাহাড়ের বাদ্যযন্ত্রগুলোর নাম, গঠন ও বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র: নাম ধরে ধরে একটি পাঠ-এ।
[সিএডিসি-র পাতায় তিনটি যন্ত্রের নাম একসঙ্গে দেওয়া, তবে সেগুলো গেংখুলি পরিবেশনার সঙ্গেই যুক্ত কি না তা স্পষ্ট করা হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]
গেংখুলি পরিবেশকদের মধ্যে অন্তত দুজনের নাম একটি সংরক্ষিত শব্দ-সংগ্রহে আছে, আর সঙ্গে তাঁদের বয়স, গুরুর নাম ও রেকর্ডিংয়ের স্থান-কালও।
| গায়ক | যা জানা যায় |
|---|---|
| বিরো গেংখুলি | গায়ক ও তারযুক্ত যন্ত্রবাদক; রেকর্ডিংয়ের সময় বয়স প্রায় সত্তর; তালিম নিয়েছিলেন খান্দারা চাকমার কাছে; রেকর্ডিং ২০০৭ |
| কুঞ্জলাল গেংখুলি | গায়ক ও তারযুক্ত যন্ত্রবাদক; রেকর্ডিং জানুয়ারি ২০০৭, কমলানগর, মিজোরাম |
এই দুটি নথি কয়েকটি কারণে মূল্যবান।
এক — নামের সঙ্গে পদবি। দুজনের নামের শেষেই “গেংখুলি”, অর্থাৎ ভূমিকাটি পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে।
দুই — গুরুর নাম। খান্দারা চাকমার নাম থাকার অর্থ, ২০০৭-এর আগে অন্তত আরও একটি প্রজন্মের গেংখুলি ছিলেন।
তিন — স্থান। দুটি রেকর্ডিংয়ের একটি মিজোরামের কমলানগরে — অর্থাৎ ঐতিহ্যটি কেবল বাংলাদেশের নয়, সীমান্তের ওপারেও।
চার — বয়স। ২০০৭ সালে একজনের বয়স প্রায় সত্তর। অর্থাৎ তিনি সম্ভবত ১৯৩০-এর দশকের মানুষ।
এই শেষ তথ্যটিই সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নটি তোলে। ২০০৭ সালে যিনি সত্তর, তিনি আজ আছেন কি না — আর তাঁর শিষ্য কেউ আছেন কি না।
আর একটি তুলনাও এখানে কাজে লাগে। আর্কাইভের শতাধিক লেখায় কবি, গীতিকার, সুরকার ও শিল্পীদের নাম আছে — কিন্তু নামসহ গেংখুলি পরিবেশক পাওয়া গেছে মাত্র এই দুজন, আর তাঁদের একজনের গুরু।
অর্থাৎ নথিভুক্তির দিক থেকে এই ভূমিকাটি চাকমা সংগীতের সবচেয়ে কম নথিভুক্ত অংশগুলোর একটি।
[এই দুজনের বর্তমান অবস্থা, কিংবা তাঁদের শিষ্যদের কথা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
[রেকর্ডিং দুটির ক্যাটালগ-তথ্য অনুসন্ধানের ফলাফল থেকে নেওয়া; মূল সংগ্রহের পাতাটি এই লেখার সময়ে খোলা যায়নি]
গেংখুলিদের ভাণ্ডারে অন্তত পাঁচটি পালার নাম পঠিত উৎসগুলোতে পাওয়া যায়, আর তিনটি নিয়ে বিস্তারিত বিবরণও আছে।
| পালা | বিষয় ও যা জানা যায় | উৎস |
|---|---|---|
| রাধামন-ধনপুদি পালা | প্রেমকাহিনি; নয়টি পর্বে বিভক্ত; সাত দিন সাত রাত ধরে পরিবেশিত; ভিতরে “জুম কাবা পালা” নামে পরিচ্ছেদ | প্রতিধ্বনি; প্রথম আলো; জুমচাষ |
| চাদিগাং ছাড়া পালা | চাকমা জাতীয় জীবনে স্থানান্তর নিয়ে পালাগান | চাকমা জাতি; থিসিস |
| গোজেন লামা | সৃষ্টি ও ঈশ্বর; সারা রাত ধরে, একটিমাত্র যন্ত্রে | প্রতিধ্বনি |
| লোরবো মিদুঙি পালা | পালাগানের তালিকায়; বিষয়ের বিবরণ পাওয়া যায়নি | চাকমা জাতি |
| লক্ষ্মী পালা | পালাগানের তালিকায়; ভারতে একটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল বলে উল্লেখ | চাকমা জাতি; ভারতের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য |
| লাঙ্যা-লাঙনী পালা | পালাগানের তালিকায়; বিষয়ের বিবরণ পাওয়া যায়নি | চাকমা জাতি |
| তান্যাবী পালা | বারমাসির আদলে রচিত পালার তালিকায় | পাহাড়ি সাহিত্য চর্চা |
এই তালিকার মধ্যে দুটিকে আলাদা মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। চাকমা জাতি-তে লেখা, “অনেকের মতে, রাধামন-ধনপুদি পালা ও চাদিগাং ছাড়া পালা মহাকাব্য মর্যাদাসম্পন্ন।”
সাতটি একসঙ্গে রাখলে ভাণ্ডারের ব্যাপ্তি বোঝা যায় — প্রেম, ইতিহাস, ধর্ম আর স্থানান্তর।
আর্কাইভের একটি লেখায় আরেকটি ভূমিকার কথাও আছে। চাকমা লেখক সমাজ ও সাহিত্য চর্চা-য় গেংখুলি পালার মধ্য দিয়ে একটি বিশ্বাস চলে আসার কথা বলা হয়েছে — চাকমাদের পূর্বপুরুষেরা চম্পকনগর থেকে এসেছেন।
আর চাকমা জাতির আদিনিবাস সন্ধানে-এ সেই কথাটিই আরও সরাসরি: “আমাদের এই ধারণাটা চলে আসছে বংশ পরম্পরায় – বাপ-দাদা, পূর্বপুরুষদের মুখ থেকে শুনে, আমাদের ‘গেংখুলি গীত’ নামক লোকগীতি বা পালাগানের মাধ্যমে।”
অর্থাৎ গেংখুলিরা কেবল গান করেন না — তাঁরা একটি জনগোষ্ঠীর উৎপত্তি-বিশ্বাসের বাহকও।
চাদিগাং ছাড়া পালার তিনটি ভিন্ন বিবরণ নিয়ে আলাদা লেখা আছে চাদিগাং ছাড়া পালা-য়, আর গোজেন লামা নিয়ে গোজেন লামা: শিবচরণের ঈশ্বর নামা-য়।
[লোরবো মিদুঙি ও লাঙ্যা-লাঙনী পালার কাহিনি বা দৈর্ঘ্য কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি]
পালার পাশে আরেকটি ধারার নাম বারবার আসে — বারমাসি, আর আর্কাইভের একটি লেখায় পাঁচটি বারমাসির নামও আছে।
সেই লেখায় তালিকাটি এভাবে: চান্দবী বারমাস, চিত্ররেখা বারমাস, মেয়েবী বারমাস, মা-বাব বারমাস, সৃষ্টি বারমাস — আর তারপর বারমাসির আদলে রচিত “কলি চদিজা”, “রাধামন ধনপুদি পালা” ও তান্যাবী পালা।
এই বাক্যটি একটি সম্পর্ক দেখায় — রাধামন-ধনপুদি পালাটিকে বারমাসির আদলে রচিত বলা হয়েছে, অর্থাৎ পালা ও বারমাসি আলাদা নয়, একটি আরেকটির ছাঁদ ধার করে।
বারমাসি কী, তারও একটি বিবরণ আছে চাকমা জাতি-তে: পুরোনো পাণ্ডুলিপির তালিকায় “সুন্দরীদের সােন্দর্য, প্রেম ও বিরহ কাহিনী নিয়ে রচিত বারমাসি”।
আর জুমচাষ-এ একটি নির্দিষ্ট বারমাসির মর্যাদার কথা: “‘তান্যাবি বারমাস’ একটি বিখ্যা চাকমা গীতি কবিতা।”
লক্ষণীয়, একই নাম দুটি ধারায় দুই রূপে আসে — তান্যাবী পালা আর তান্যাবি বারমাস। অর্থাৎ একই কাহিনি দুই ছাঁদে গাওয়া হতে পারে।
বারমাসি কীভাবে ব্যবহৃত হত, তার একটি ছোট বর্ণনাও আছে একই লেখায়: “অবসরে এসব পালা বা বারমাসি পড়ে পড়ে চাকমারা সময় কাটাত।”
এই একটি বাক্য আগের ছবিটিকে জটিল করে দেয়। যদি পালা পড়া হত, তবে পালার লিখিত রূপ কারও কাছে ছিল — অন্তত বারমাসির ক্ষেত্রে।
অর্থাৎ পালা কেবল গেংখুলির গলায় ছিল না, কিছু অংশ পাণ্ডুলিপিতেও ছিল — আর পরের অনুচ্ছেদটি সেই দিকটিই দেখে।
গেংখুলি ঐতিহ্যের সবচেয়ে বেশি উল্লিখিত বৈশিষ্ট্যটি একটি অনুপস্থিতি — পরিবেশনার জন্য কোনো নির্দিষ্ট বাঁধা পাঠ নেই।
প্রথম আলো-র লেখায় এর ফলটি সরাসরি বলা: নির্দিষ্ট লিখিত পাঠ না থাকায় প্রত্যেক পরিবেশক কাহিনি বদলে নেন — কারও পরিবেশনায় মিলন, কারও পরিবেশনায় বিচ্ছেদ।
অর্থাৎ একই পালার সমাপ্তি দুই রাতে দুই রকম হতে পারে।
একই লেখায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের থিয়েটার বিভাগের শিক্ষক ও নাট্যকর্মী কুন্তল বড়ুয়া-র মতও আছে, যিনি চাকমা নাটক নিয়ে পিএইচডি করেছেন — তাঁর মতে পালাটি মূলত একটি বিষাদের গান, আর এর কাহিনি প্রত্যেক পরিবেশকের সঙ্গে বদলায়।
এর দুটি দিক আছে, আর দুটোই সত্যি।
একদিকে এটি একটি শক্তি — পরিবেশক শ্রোতা, উপলক্ষ ও সময় বুঝে কাহিনি সাজাতে পারেন, আর গল্পটি জীবন্ত থাকে।
অন্যদিকে এটি একটি ভঙ্গুরতা — যেহেতু পাঠ কারও কাছে নেই, সেহেতু একজন পরিবেশক চলে গেলে তাঁর ভাণ্ডারটিও চলে যায়।
তবে “লিখিত পাঠ নেই” কথাটি নিরঙ্কুশ নয়, আর তার প্রমাণ আর্কাইভেই। চাকমা জাতি-তে পুরোনো চাকমা পাণ্ডুলিপির তালিকায় বারমাসি ও পালাগানের পাণ্ডুলিপি আছে — ধর্মগ্রন্থ “আগরতারা”, তন্ত্রমন্ত্রের বই আর “তালিক শাস্ত্র”-র পাশে।
অর্থাৎ দুটি কথা একসঙ্গে সত্যি। পালার পাণ্ডুলিপি ছিল, কিন্তু পরিবেশনা সেই পাণ্ডুলিপি ধরে হত না।
এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা দেখায় সমস্যাটি লেখার অভাব নয় — সমস্যাটি হলো পরিবেশনাটি কোনো লেখায় ধরা পড়ে না।
আর সেজন্যই প্রথম আলো-র আরেকটি কথা তাৎপর্যপূর্ণ: পালাটির পূর্ণ স্বাদ কেবল গেংখুলি পালাকারদের সামনে বসেই পাওয়া যায়।
অর্থাৎ ছাপা পাঠ পরিবেশনার বিকল্প নয় — আর সেটিই এই ঐতিহ্যের নথিভুক্তিকে কঠিন করে তোলে।
পালাগুলোর ছাপা সংস্করণ নিয়ে সবচেয়ে বিস্তারিত তথ্য আছে ভারতের চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশ-এ, আর সেখানে একটি সম্পূর্ণ সম্পাদনা-তথ্যও দেওয়া।
| প্রকাশনা | যা উল্লিখিত |
|---|---|
| রাধামন ধনপুদি পালা | সম্পাদনায় ভবন্ত্ত বিকাশ চাকমা, সংগ্রহে ইন্দুমাধব চাকমা |
| লক্ষ্মী পালা | ব্যালাড হিসেবে প্রকাশিত বলে উল্লেখ; তবে লেখকের ভাষায় “এই প্রকাশিত লক্ষী পালাটি দেখার বা সংগ্রহ করার সুযোগ হয়নি” |
| উভোগীত (পত্রিকা) | ১৯৮৪ সালে বিজন তালুকদারের সম্পাদনায় প্রকাশিত একটি সাহিত্য পত্রিকা |
| একটি নাটক | রাধামন ধনপুদি পালাকে কেন্দ্র করে রচিত |
“সংগ্রহে ইন্দুমাধব চাকমা” — এই তিনটি শব্দ একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। অর্থাৎ পালাটি কারও কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, আর সংগ্রাহকের নাম নথিভুক্ত।
তবে যাঁর কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল — অর্থাৎ যে গেংখুলি গেয়েছিলেন — তাঁর নাম উৎসে নেই।
এটি একটি পরিচিত ধরন। সংগ্রাহক ও সম্পাদকের নাম টেকে, পরিবেশকের নাম টেকে না।
আরেকটি রূপান্তরের কথাও আছে একই লেখায় — রাধামন ধনপুদি পালাকে কেন্দ্র করে একটি নাটক রচিত হয়েছে।
অর্থাৎ পালাটি তিনটি রূপে আছে: গেংখুলির গলায়, বইয়ের পাতায়, আর মঞ্চে — আর তিনটিই আলাদা শিল্প।
একটি সতর্কবার্তাও একই লেখায়: “বুঝে না বুঝে বাংলা ভাষার যাত্রা পালা মঞ্চস্থ করার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।”
[রাধামন ধনপুদি পালার ছাপা সংস্করণটির প্রকাশসাল ও প্রকাশকের নাম পঠিত উৎসে দেওয়া হয়নি]
আর্কাইভের একটি দীর্ঘ অনুসন্ধানে গেংখুলি গীতকে ঐতিহাসিক প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, আর সেখানে পালার পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করে ভূগোল মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
চাকমা জাতির আদিনিবাস সন্ধানে-এ চাকমাদের আদি বাসস্থান চম্পকনগরের অবস্থান খোঁজা হয়েছে, আর সেই খোঁজায় গেংখুলি গীতের দুটি পঙ্ক্তি সাক্ষ্য হিসেবে এসেছে।
প্রথমটি নদী পার হওয়ার মুহূর্তের: “নাজের উল্লাসে রাধামন, খৈ গাঙত পল্লাক্কি সৈন্যগণ” — লেখায় এর অর্থ দেওয়া, সৈন্যবাহিনী খৈয় নদীতে উপস্থিত হলে সেনাপতি রাধামন আনন্দ-উল্লাস করেন।
দ্বিতীয়টি সমুদ্রের: “অপার পানি সাগর বেই, কুল-কিনারা দেঘা নেই, জাদিপুজাত তে ঘি দিল, রোয়্যাঙ্গা দেঝত তে কুলেল।”
এই দুটি পঙ্ক্তি এই পাতার জন্য দুই কারণে মূল্যবান। এক, এগুলো গেংখুলি পালার হুবহু ভাষার নমুনা। দুই, এগুলো দেখায় পালার ভিতরে ভূগোলের নাম আছে — নদী, সমুদ্র, দেশ।
আর সেই ভূগোল ধরেই লেখায় একটি যুক্তি সাজানো হয়েছে, আর তাতে একটি জায়গায় পালার সাক্ষ্য খারিজও করা হয়েছে।
লেখকের যুক্তি: পশ্চিম ত্রিপুরার চম্পকনগর খোয়াই নদী থেকে বেশি দূরে নয়, তাই সেখান থেকে যাত্রা করলে খোয়াই নদীর তীরে পৌঁছানোটি উল্লাস করার মতো মাইলফলক হওয়ার কথা নয়।
আর তারপর আসে সেই বাক্যটি, যা পরিবেশকদের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে সৎ মন্তব্য: “কিন্তু এই গেংখুলীরা হয়তো জীবনে ত্রিপুরার চম্পকনগর, খোয়াই নদী, চাকমাঘাট ইত্যাদি এলাকা ভ্রমণ করেননি, বরং উত্তরসূরী হিসেবে পূর্বপুরুষদের গাওয়া লোকগীতি বংশ পরম্পরায় গেয়ে আসছেন।”
এই একটি বাক্য গেংখুলিদের ভূমিকাটিকে সঠিকভাবে স্থাপন করে। তাঁরা প্রত্যক্ষদর্শী নন, বাহক — আর বাহকের গানে ভূগোল ঝাপসা হতে পারে।
অর্থাৎ পালাটি একটি ঐতিহাসিক উৎস, কিন্তু একটি পরোক্ষ উৎস — আর তার সীমা উৎসটি নিজেই স্বীকার করে।
একই কাহিনির আরেকটি সারসংক্ষেপ আছে চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা আদিবাসীর জাতিসত্তা-য়, যেখানে গেংখুলিদের লোকগানকে বিজয়গিরির দিগ্বিজয়ের কাহিনির উৎস বলা হয়েছে।
আর কালনির্ণয়ের একটি হিসাব আছে চাকমা জাতি-তে: প্রদীপ্ত খীসার বরাত দিয়ে লেখা, আনুমানিক ৫৯০ সালে চাকমা যুবরাজ বিজয়গিরি ও সেনাপতি রাধামন খীসা রোয়াং রাজ্য, অক্সাদেশ, কাঞ্চননগর ও কালঞ্জর জয় করেন।
অর্থাৎ পালাটিকে যদি ইতিহাস হিসেবে পড়া হয়, তবে ঘটনাগুলো ষষ্ঠ শতকের — আর তা হলে পালাটি প্রায় চৌদ্দ শতক ধরে মুখে মুখে চলে এসেছে।
[এই কালনির্ণয়টি একটি অনুমান, আর ভিন্ন উৎসে ভিন্ন সাল পাওয়া যায় — যাচাই প্রয়োজন]
চাকমা লোকগীতির ভাগ নিয়ে দুটি উৎস দুটি আলাদা তালিকা দেয় — একটিতে তিনটি ধারা, আরেকটিতে চারটি। আর দুটিতেই গেংখুলি গীত আছে।
| উৎস | ভাগ | সংখ্যা |
|---|---|---|
| নিধি চাকমার থিসিস, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ২০২১ | উভোগীত, গেংখুলি গীত, হবি গান | ৩ |
| চাকমা জাতি — পান্নালাল মজুমদারের বরাতে | গেংখুলী গীত, উভোগীত, অলিগীত, বিজু গীত | ৪ |
দুটি তালিকার দুটি নাম মেলে — গেংখুলি গীত আর উভোগীত। বাকিগুলো আলাদা।
চার-ভাগের তালিকায় বাকি দুটির বিবরণও দেওয়া। একই লেখায় লেখা, অলিগীত বা অলিদাগনিগীত হলো একধরনের ঘুমপাড়ানি গীত, আর বিজুগীত হলো বিজুকে কেন্দ্র করে রচিত গান।
আর একটি তৃতীয় তালিকাও আছে। চাকমা সমাজের যত পূজা পার্বণ-এ সুরের তালিকা দেওয়া হয়েছে এভাবে — “‘অলি’ অর্থাৎ ঘুমপাড়ানী গান, উভোগীত, গেংখুলীদের পালাগানের সুর ইত্যাদি”।
এই তৃতীয় তালিকাটি একটি জিনিস নিশ্চিত করে। আর্কাইভের নিজের লেখায়ও গেংখুলিকে একটি সুর হিসেবে গোনা হয়েছে — অর্থাৎ থিসিসের “সুর” অর্থটি একা নয়।
তালিকার সংখ্যা মেলে না কেন, তার একটি সম্ভাব্য কারণ আছে। “হবি গান” আর “বিজু গীত” — দুটিই উপলক্ষ-নির্দিষ্ট গান, আর কোন উপলক্ষকে আলাদা ধারা গোনা হবে তা শ্রেণিবিন্যাসকারীর সিদ্ধান্ত।
অর্থাৎ ভাগগুলো পরস্পরবিরোধী নয়, বরং একই উপাদানের আলাদা সাজ। তবে কোন ভাগটি বেশি প্রচলিত, তা কোনো পঠিত উৎসে বলা নেই।
আরেকটি বড় তালিকা আছে ভারতের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য-এ, যেখানে চাকমা লোকসাহিত্যের উপাদান হিসেবে একসঙ্গে গোনা হয়েছে — ছড়া, প্রবাদ, ধাঁধা, পালাগান (ব্যালাড), রূপকথা, কিংবদন্তি আর উভোগীত।
[পান্নালাল মজুমদারের মূল বইটি এই লেখার জন্য দেখা হয়নি; তথ্য আর্কাইভের লেখার উদ্ধৃতি থেকে]
উভোগীতের বিবরণটি এই পাতার জন্য প্রাসঙ্গিক, কারণ তা গেংখুলি পালার সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট ফারাক দেখায় — কোথায় গাওয়া যায়, আর কে গায়।
চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ-এ উভোগীতের গঠন বলা হয়েছে: “এ ধরনের গানে সাধারণত পালা করে দুজন শিল্পী অংশগ্রহণ করে থাকেন, প্রায়শ যাঁদের একজন নারী ও অন্যজন পুরুষ।”
আর তারপর আসে একটি বিধিনিষেধ, যা পঠিত উৎসগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অপ্রত্যাশিত তথ্য: “তাই চাকমা জনপদে গ্রামের অভ্যন্তরে ঐতিহ্যবাহী এই উভোগীত গাওয়া সাধারণভাবে নিষিদ্ধ।”
অর্থাৎ উভোগীতের একটি জায়গা আছে, আর সেটি গ্রাম নয় — জুম।
একই লেখায় জুমে গাওয়ার দৃশ্যও আছে: সঙ্গীসাথীদের নিয়ে জুমের কাজে বা বিশ্রামের সময় কোনো যুবক প্রেমরসাত্মক উভোগীত গাইতে শুরু করলে বাকিরা উল্লসিত হয়ে “এ হো হো হো” করে উল্লাসধ্বনি “রেইং” দিয়ে উঠত।
আর লেখকের সিদ্ধান্ত: জুম উভোগীত চর্চার জন্য একটি পরিবেশ সৃষ্টি করেছে, যেখানে মন খুলে চর্চা করতে কোনো বাধার সম্মুখীন হতে হয় না।
থিসিসে উভোগীতের আরেকটি বৈশিষ্ট্য আছে — কথাগুলো আগে থেকে তৈরি নয়, “prepared instant”, অর্থাৎ তাৎক্ষণিক। যে গাইতে চায়, সে কেবল উভোগীতের স্বতন্ত্র সুরটি অনুসরণ করে।
এখানেই গেংখুলির সঙ্গে মূল ফারাক। উভোগীতের কথা তাৎক্ষণিক, আর গেংখুলি পালার কথা একটি দীর্ঘ কাহিনি — যা পরিবেশককে মনে রাখতে হয়, যদিও তিনি তা বদলেও নিতে পারেন।
| বিষয় | উভোগীত | গেংখুলি পালা |
|---|---|---|
| কে গায় | দুজন, প্রায়শ একজন নারী একজন পুরুষ, পালা করে | “বাছাই করা” একজন গায়ক |
| কথা | তাৎক্ষণিক | দীর্ঘ কাহিনি, মনে রাখা, তবে বদলানো যায় |
| জায়গা | গ্রামের ভিতরে নিষিদ্ধ; জুমে গাওয়া হয় | পঠিত উৎসে কোনো বিধিনিষেধ নেই |
| দৈর্ঘ্য | একটি গান | সারা রাত, কখনো কয়েক রাত |
| বিষয় | প্রেম ও প্রকৃতি | প্রেম, ইতিহাস, ধর্ম, স্থানান্তর |
থিসিসে একটি উভোগীতের অনুবাদও আছে, আর তার রচয়িতা হিসেবে একজন চাকমা কবি ও গীতিকারের নাম দেওয়া — আলোময় চাকমা।
নামটি আর্কাইভের পাঠকের কাছে পরিচিত হতে পারে, কারণ চাকমা রূপকথার সূচিতে একটি পাঠ আছে একই নামে — সনার চিঝির পশ্চন, মেঘঅ পিধে, চাকমা ভাষায় লেখা, তারিখ ২৮.০৬.২০১৭।
[দুটি নাম একই ব্যক্তির কি না তা কোনো পঠিত উৎসে নিশ্চিত করা যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
গেংখুলি পালার অবস্থান একটি সাহিত্য-পর্বায়নেও দেওয়া আছে — আর্কাইভের একটি লেখায়, কবি সুহৃদ চাকমার ভাগ অনুযায়ী।
সেই ভাগে প্রাচীন যুগ-এ পড়ে লোকসাহিত্য — জ্ঞেনহুলি বা গেঙখুলি পালা, প্রেম সাহিত্য, আর ইতিহাস-সম্পৃক্ত রাধামন-ধনপুদি পালা।
তারপর মধ্য যুগ-এ ধর্ম-সম্পৃক্ত সাহিত্য — গোজেন লামা — আর সামাজিক প্রণালী-সম্পৃক্ত সাহিত্য। আর আধুনিক যুগ ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে।
পর্বায়নের উৎস হিসেবে দেওয়া সুহৃদ চাকমা স্মারকগ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৯৪-১১২।
এই ভাগটি গেংখুলিদের জন্য একটি দাবি করে — তাঁদের পালা চাকমা সাহিত্যের প্রাচীনতম স্তরে, অর্থাৎ লিখিত সাহিত্যের আগে।
তবে পর্বায়নে একটি অস্বস্তিও আছে। গোজেন লামা মধ্য যুগে রাখা হয়েছে, অথচ সেটিও গেংখুলিরাই গেয়ে থাকেন — অর্থাৎ একই পরিবেশক দুটি যুগের রচনা গাইছেন।
এর একটি সরল ব্যাখ্যা হতে পারে: পর্বায়নটি রচনার কালের, পরিবেশনার নয়।
আর সেই ব্যাখ্যাটি মানলে একটি সিদ্ধান্ত আসে, যা এই পাতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ। গেংখুলিদের ভাণ্ডার কোনো একটি যুগের নয় — তাঁরা একসঙ্গে প্রাচীন ও মধ্যযুগের রচনা বহন করেন।
[এই পর্বায়নের মূল গ্রন্থটি এই লেখার জন্য দেখা হয়নি; তথ্য আর্কাইভের লেখার উদ্ধৃতি থেকে]
গেংখুলি নামটি কেবল পুরোনো পরিবেশকদের নয়। অন্তত তিনবার আধুনিক সংগীতে নামটি ফিরে এসেছে, আর একটি ক্ষেত্রে একটি দল নিজের নামই বদলে গেংখুলী রেখেছে।
সবচেয়ে স্পষ্ট প্রমাণটি বিংশ শতকের সপ্ত দশকে আমার লিখিত তিনটি চাকমা গান-এ। সত্তরের দশকের সাংস্কৃতিক দলগুলোর তালিকা দিতে গিয়ে লেখা হয়েছে — জাগরণী সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, রাধামন সাহিত্য গোষ্ঠী, ফ্রেন্ডস লিটারেচার গ্রুপ, আর “উন্মাদ শিল্পী গোষ্ঠী (বর্তমানে এর পরিবর্তিত নাম গেংখুলী শিল্পী গোষ্ঠী)”।
এই বন্ধনীর ভিতরের কথাটিই তথ্য। একটি দল, যার নাম ছিল “উন্মাদ”, পরে নিজের নাম নিয়েছে ঐতিহ্যবাহী পরিবেশকদের নাম থেকে।
আর সেই দলের কাজের একটি নমুনাও আছে আর্কাইভে। জুমচাষ-এ লেখা, “আশির দশকে গেংহুলি শিল্পীগোষ্ঠীর বিশিষ্ট শিল্পী যখন গেয়ে ওঠেন, ‘জুম আগুনো ছেই ফুদোগুন উরি যাদন্দে, ছেই ফুদোগুন দেইনেই তরে ইদোত উদেদে’” — অর্থাৎ জুম আগুনের ছাইরাশি ভেসে যাওয়া দৃশ্য দেখে তোমার কথা মনে পড়ে গেল।
অর্থাৎ নামটি কেবল খাতায় বদলায়নি — দলটি নামটি নিয়ে আশির দশকে গানও করেছে।
দ্বিতীয় উদাহরণটি গানের কথায়। কুমার সমিত রায় এর সংক্ষিপ্ত জীবনী-তে তাঁর একটি কালজয়ী গানের পঙ্ক্তি উদ্ধৃত — “রাধামন-ধনপুদি, শিবচরন-চান্দোবি”।
লেখায় বলা হয়েছে, গানের লাইনে ছিল চাকমা লোকসাহিত্যের রাধামন-ধনপুদির কথা আর শিবচরণ-চান্ধবীর কথা।
অর্থাৎ পালার চরিত্ররা আধুনিক গানে ঢুকে গেছে — গেংখুলির পালা থেকে সরাসরি নয়, বরং উল্লেখ হিসেবে।
একই লেখা অনুযায়ী কুমার সমিত রায় ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সংগীত-জগতের একজন কিংবদন্তি — পেশায় শিক্ষক, আর সঙ্গে কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার ও সুরকার; গীতিকার-সুরকার জীবন শুরু আশির দশকের শুরুতে।
তৃতীয় উদাহরণটি সমকালীন। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী রাঙামাটিতে গেংখুলি নামে একটি ব্যান্ড আছে, আর ২০২১ সালের একটি কনসার্টের ভিডিওতে মঞ্চে পরিবেশনার দৃশ্যও আছে।
এই পুনর্ব্যবহার দুটি দিক থেকে পড়া যায়।
একদিকে এটি একটি স্বীকৃতি — আধুনিক শিল্পীরা নিজের নাম নিচ্ছেন ঐতিহ্যবাহী পরিবেশকদের নাম থেকে।
অন্যদিকে এটি একটি অর্থান্তর। ঐতিহ্যবাহী গেংখুলি একজন, একটি যন্ত্র আর সারা রাত; একটি শিল্পীগোষ্ঠী বা ব্যান্ড তার উল্টো — অনেকজন, অনেক যন্ত্র আর একটি অনুষ্ঠান।
এই অর্থান্তরটি নিজেই একটি তথ্য: শব্দটি টিকে আছে, কিন্তু যে কাজটি সে বোঝাত, তা বদলে গেছে।
আরেকটি নামও লক্ষণীয়। একই লেখায় বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালে গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠী আধুনিক গানের প্রথম সংকলন প্রকাশ করে — নাম “শিঙগা”, যা একটি ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রেরই নাম।
[রাঙামাটির ব্যান্ডটি ঐতিহ্যবাহী গেংখুলি পালা পরিবেশন করে কি না, তা কোনো পঠিত উৎসে স্পষ্ট নয় — যাচাই প্রয়োজন]
[গেংখুলী শিল্পী গোষ্ঠী আজও সক্রিয় কি না, তা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি]
ঐতিহ্যবাহী গান বদলে ফেলা নিয়ে একটি প্রকাশ্য বিতর্ক হয়েছিল, আর তার বিবরণ আছে বিতর্কের একজন পক্ষের নিজের লেখায়।
বিংশ শতাব্দী পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণ-এ লেখা, বিশিষ্ট কবি, গীতিকার ও প্রবন্ধকার সলিল রায় আধুনিক গান লিখে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিলেন।
তাঁর নিজের ভাষায়: “অধুনা বেতার শিল্পী শ্রী সুরেন ত্রিপুরার নিজস্ব সুর যোজনায় যখন রাঙ্গামাটি কলা পরিষদের অনুষ্ঠানে আমার এ ধরনের ক’টি গান প্রথম গীত হলে যেদিন সুধী মহলের তরফ হতে স্বরূপ এবং বিরূপ উভয় সমালোচনাই আমাকে শুনতে হয়েছে।”
আর বিরোধীদের যুক্তিটি লেখায় সরাসরি দেওয়া: “বিপক্ষ দলের যুক্তি ছিল এই-চাকমা সমাজে প্রচলিত উবাগীতের ঐতিহ্যকে আমি নষ্ট করতে চলেছি।”
এই বিতর্কটি এই পাতার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা একটি সময় চিহ্নিত করে। অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী ধারা থেকে আধুনিক গানে সরে যাওয়াটি হঠাৎ ঘটেনি — তা নিয়ে তর্ক হয়েছিল, আর তর্কটি নথিভুক্ত।
লক্ষণীয়, আপত্তিটি গেংখুলি নিয়ে ছিল না, ছিল উভোগীত নিয়ে। তবে আপত্তির ধরনটি একই — নতুন সুর পুরোনো ধারাকে সরিয়ে দিচ্ছে।
একই লেখায় সেই দশকের ফলাফলও আছে, আর তা মিশ্র: “মোট কথা যে, আধুনিক সঙ্গীত ব্যতিত বিশেষ কোন সাহিত্য যেমন-কবিতা, গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি জাতীয় কোন সাহিত্য প্রশংসা পায়নি।”
অর্থাৎ আধুনিক গান জিতেছিল — আর সেই জয়টিই ঐতিহ্যবাহী ধারার পক্ষে সবচেয়ে বড় চাপ।
আর একটি অনুরূপ পরিণতির কথা আছে চিত্রশিল্পী চুনিলাল দেওয়ানের সংক্ষিপ্ত জীবনী-তে, যিনি ছবি আঁকার পাশাপাশি গান গাইতেন ও বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন। লেখায় বলা হয়েছে, তিনি “অবজ্ঞা ও অবহেলায় হারিয়ে গেলেন একদিন”।
তিনি গেংখুলি ছিলেন না, তবে তাঁর ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা একই ধরনের — নাম থেকে গেলেও চর্চাটি থাকেনি।
গেংখুলি ঐতিহ্যের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সবচেয়ে সরাসরি বক্তব্যটি একটি একাডেমিক কাজে — নিধি চাকমার থিসিসে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, মে ২০২১।
থিসিসে লেখা, ঐতিহ্যবাহী গান ও সাংস্কৃতিক চর্চা — উভোগীত, থেংগা বাংগা গীত আর গেংখুলি গীত — শিক্ষিত শ্রেণির কাছে “unfashionable” ও “backward” হয়ে উঠেছে।
আর কারণ হিসেবে দেওয়া আধুনিক শিক্ষার প্রসার: থিসিস অনুযায়ী আধুনিক শিক্ষা চাকমা সমাজের সাহিত্যে রুচি ও চাহিদা দৃশ্যমানভাবে বদলে দিয়েছে।
আর থিসিসে একটি সরল বাক্যও আছে: তথাকথিত শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের নিজেদের ঐতিহ্যবাহী লোকগীতি সম্পর্কে ধারণা ও আগ্রহ কম বা নেই।
আর্কাইভের ভাষাও একই দিকে যায়, আর তা থিসিসের অনেক আগের। পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণ-এ লেখা, “বর্তমানে লোকসাহিত্যের অন্যতম অঙ্গ পাহাড়ি লোকসঙ্গীতগুলো আজ লুপ্ত হয়ে যেতে বসেছে।”
আর তার পরের বাক্যটিই, যা এই পাতার শুরুতেও আছে: এ লোকসাহিত্যের চর্চাকারী এখন শুধুমাত্র গেংখুলি নামক চারণ কবিগণ।
দুটি বাক্য একসঙ্গে রাখলে একটি অস্বস্তিকর সিদ্ধান্ত আসে। যে ধারাটি লুপ্ত হতে বসেছে, তার একমাত্র জীবিত চর্চাকারীরাও সংখ্যায় কমে আসছেন।
উভোগীতের ক্ষেত্রে থিসিসে একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তনের কথাও আছে, আর তা গেংখুলির জন্যও প্রাসঙ্গিক। আজ অল্প কয়েকজনই এই গান গাইতে পারেন, আর তাঁরা গান একটি নির্দিষ্ট কথায় — আধুনিক গানের মতো।
অর্থাৎ যে বৈশিষ্ট্যটি এই ধারাকে আলাদা করত — তাৎক্ষণিক কথা, কিংবা পরিবেশকের হাতে বদলে যাওয়া কাহিনি — সেটিই আগে হারায়।
আর একটি আশঙ্কার কথাও আছে আর্কাইভে। জুমচাষ-এর শেষে লেখা, নতুন প্রজন্ম সুশিক্ষিত হয়ে অন্য কোনো সম্মানজনক পেশায় যাওয়ার আগেই জুমসংস্কৃতি ও জুমজীবনধারা একটি শো-পিস আইটেমের মতো কিংবা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের নৃত্যগীতে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ার আশঙ্কা অমূলক নয়।
এই আশঙ্কাটি গেংখুলির ক্ষেত্রে সরাসরি খাটে, আর কারণটি গঠনগত। একটি সারা-রাতের পালা কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময়সূচিতে আঁটে না — আঁটাতে গেলে কাটতে হয়।
থিসিসের লেখক নিজে চাকমা, আর তিনি লেখেন যে নিজের ঐতিহ্য এভাবে মিলিয়ে যেতে দেখা তাঁর ভালো লাগে না।
এই পাতার সবচেয়ে বড় ফাঁকটিও এখানেই। আজ কতজন গেংখুলি আছেন, তাঁরা কোথায়, আর কেউ শিষ্য নিচ্ছেন কি না — এই তিনটি প্রশ্নের উত্তর কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি।
[গেংখুলি পরিবেশকদের কোনো সাম্প্রতিক তালিকা, গণনা বা সংরক্ষণ-উদ্যোগের তথ্য পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
তিনটি জিনিস — একটি ঐতিহ্যবাহী ও স্বতন্ত্র সুর, সেই সুরে গাওয়া দীর্ঘ পালা, আর যাঁরা তা গেয়ে থাকেন সেই গায়কেরা। চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদের পাতায় বলা হয়েছে এই পালা “বাছাই করা মানুষেরা” গেয়ে থাকেন, আর তাঁদেরও গেংখুলি বলা হয়।
চারণ কবি। আর্কাইভের দুটি আলাদা লেখায় এই পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে — একটিতে লেখা “চাকমাদের চারণ কবি গেংখুলিদের লোকগানে রাজা বিজয়গিরির দিগ্বিজয়ের কাহিনী জানা যায়”, আর অন্যটিতে “পাহাড়িদের মধ্যে এ লোকসাহিত্য চর্চাকারী এখন শুধুমাত্র গেংখুলি নামক চারণ কবিগণ”।
চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদের পাতা অনুযায়ী সাধারণত সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত, আর কখনো কয়েক দিন ধরেও। প্রথম আলোর লেখা অনুযায়ী রাধামন-ধনপুদি পালা সাত দিন সাত রাত ধরে পর্বে পর্বে পরিবেশিত হয়, আর তাতেও শেষ হয় না।
উৎসভেদে তালিকা আলাদা। প্রথম আলোয় দুটি — খেংগড়ং আর ধুদক। চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদের পাতায় তিনটি — হেংগরং, সিংহা আর ধুধুক। আর্কাইভের একটি লেখায় চাকমা গানে সবচেয়ে বেশি উল্লিখিত চারটি — ধুধুক, বাঝি, শিঙা ও হেংগরং। আর আরেকটি লেখায় আটটি — ধুদুক, হেঙগরঙ, শিঙা, বাঁশি, ঢুল, ডগর, সারিন্দ্যা, তাক।
প্রতিধ্বনির লেখা অনুযায়ী গেংখুলি গায়কেরা গোজেন লামা পালা সারা রাত পরিবেশন করেন একটিমাত্র বাদ্যযন্ত্র সঙ্গে নিয়ে। সংরক্ষিত দুটি রেকর্ডিংয়ের তথ্যেও গায়ক একইসঙ্গে একটি তারযুক্ত যন্ত্র বাজিয়েছেন।
অন্তত দুজনের — বিরো গেংখুলি আর কুঞ্জলাল গেংখুলি, দুজনেরই ২০০৭ সালের রেকর্ডিং একটি সংরক্ষিত শব্দ-সংগ্রহে আছে। বিরো গেংখুলির বয়স তখন প্রায় সত্তর, আর তিনি তালিম নিয়েছিলেন খান্দারা চাকমার কাছে। কুঞ্জলাল গেংখুলির রেকর্ডিং জানুয়ারি ২০০৭-এ মিজোরামের কমলানগরে।
পঠিত উৎসে প্রথাগত দীক্ষার কোনো বিবরণ নেই, তবে তিনটি ইঙ্গিত আছে। এক, একজন গেংখুলি গুরুর কাছে তালিম নিয়েছিলেন। দুই, আর্কাইভের একটি লেখা অনুযায়ী গেংখুলিরা উত্তরসূরী হিসেবে পূর্বপুরুষদের গান বংশ পরম্পরায় গেয়ে আসছেন। তিন, নির্দিষ্ট গান নির্দিষ্ট উপলক্ষের সঙ্গে বাঁধা, তাই ভাণ্ডারটিও জানা থাকতে হয়।
পঠিত উৎসে অন্তত পাঁচটি পালার নাম পাওয়া যায় — রাধামন-ধনপুদি পালা, চাদিগাং ছাড়া পালা, গোজেন লামা, লোরবো মিদুঙি পালা, লক্ষ্মী পালা আর লাঙ্যা-লাঙনী পালা। এর মধ্যে রাধামন-ধনপুদি ও চাদিগাং ছাড়া পালাকে অনেকে মহাকাব্য মর্যাদাসম্পন্ন বলেন।
পরিবেশনার জন্য বাঁধা পাঠ নেই, আর প্রথম আলোর লেখা অনুযায়ী সেজন্যই প্রত্যেক পরিবেশক কাহিনি বদলে নেন — কারও পরিবেশনায় মিলন, কারও পরিবেশনায় বিচ্ছেদ। তবে আর্কাইভের একটি লেখায় পুরোনো চাকমা পাণ্ডুলিপির তালিকায় বারমাসি ও পালাগানের পাণ্ডুলিপির উল্লেখ আছে, আর আরেকটি লেখায় বলা হয়েছে অবসরে চাকমারা এসব পালা বা বারমাসি পড়ে সময় কাটাত।
আর্কাইভের একটি লেখা অনুযায়ী আছে — সম্পাদনায় ভবন্ত্ত বিকাশ চাকমা, সংগ্রহে ইন্দুমাধব চাকমা। একই লেখায় লক্ষ্মী পালাও প্রকাশিত হয়েছে বলে উল্লেখ, তবে লেখক জানিয়েছেন সেটি দেখার বা সংগ্রহ করার সুযোগ হয়নি।
হয়। আর্কাইভের একটি অনুসন্ধানে চম্পকনগরের অবস্থান খুঁজতে গেংখুলি গীতের পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে। তবে একই লেখায় একটি সতর্কবার্তাও আছে — গেংখুলিরা হয়তো সেই এলাকাগুলো জীবনে ভ্রমণ করেননি, বরং উত্তরসূরী হিসেবে পূর্বপুরুষদের গান বংশ পরম্পরায় গেয়ে আসছেন।
উৎসভেদে আলাদা। নিধি চাকমার থিসিসে তিনটি — উভোগীত, গেংখুলি গীত আর হবি গান। আর্কাইভের একটি লেখায় পান্নালাল মজুমদারের বরাতে চারটি — গেংখুলী গীত, উভোগীত, অলিগীত আর বিজু গীত। দুটি তালিকার দুটি নাম মেলে: গেংখুলি গীত আর উভোগীত।
উভোগীত গাওয়া হয় দুজনে পালা করে, প্রায়শ একজন নারী ও একজন পুরুষ, আর তার কথা তাৎক্ষণিক। গেংখুলি পালা একজন “বাছাই করা” গায়ক গেয়ে থাকেন, আর তার কথা একটি দীর্ঘ কাহিনি। আরেকটি ফারাক জায়গার — আর্কাইভের একটি লেখা অনুযায়ী গ্রামের অভ্যন্তরে উভোগীত গাওয়া সাধারণভাবে নিষিদ্ধ, তাই তা জুমে গাওয়া হত।
কবি সুহৃদ চাকমার তিন-যুগের ভাগে প্রাচীন যুগে — জ্ঞেনহুলি বা গেঙখুলি পালা, প্রেম সাহিত্য আর ইতিহাস-সম্পৃক্ত রাধামন-ধনপুদি পালা একসঙ্গে। উৎস হিসেবে দেওয়া সুহৃদ চাকমা স্মারকগ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৯৪-১১২।
না। সংরক্ষিত দুটি রেকর্ডিংয়ের একটি ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে মিজোরামের কমলানগরে করা। আর গেংখুলি ঐতিহ্যের বর্ণনা ভারতের চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদের নিজের পাতাতেও আছে।
আর্কাইভের একটি লেখা অনুযায়ী সত্তরের দশকের “উন্মাদ শিল্পী গোষ্ঠী” পরে নাম বদলে গেংখুলী শিল্পী গোষ্ঠী হয়েছে, আর আরেকটি লেখায় আশির দশকে সেই গোষ্ঠীর একজন শিল্পীর গাওয়া একটি গানের পঙ্ক্তি উদ্ধৃত আছে। এর বাইরে অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী রাঙামাটিতে গেংখুলি নামে একটি ব্যান্ডও আছে।
নিধি চাকমার থিসিসে (ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, মে ২০২১) বলা হয়েছে, উভোগীত, থেংগা বাংগা গীত আর গেংখুলি গীতের মতো ঐতিহ্যবাহী চর্চা শিক্ষিত শ্রেণির কাছে “unfashionable” ও “backward” হয়ে উঠেছে। আর্কাইভের একটি লেখাতেও বলা হয়েছে পাহাড়ি লোকসঙ্গীতগুলো লুপ্ত হয়ে যেতে বসেছে।
কোনো পঠিত উৎসে সংখ্যা পাওয়া যায়নি। গেংখুলি পরিবেশকদের কোনো সাম্প্রতিক তালিকা, গণনা বা সংরক্ষণ-উদ্যোগের তথ্যও পাওয়া যায়নি। যা জানা যায় তা হলো, ২০০৭ সালে রেকর্ড করা একজন গায়কের বয়স তখন প্রায় সত্তর ছিল।
উৎসভেদে বানান আলাদা — গেংখুলি, গেঙখুলি, গেংখুলী, গেংহুলি, জ্ঞেনহুলি, আর ইংরেজিতে Gengkhuli, Genghuli, Geingkhuli। আর্কাইভের একটি লেখায় দুটি বানান একসঙ্গেই দেওয়া — “জ্ঞেনহুলি(গেঙখুলি)পালা”। কোনটি প্রমিত তা কোনো পঠিত উৎসে বলা নেই।
এই পাতার প্রতিটি দাবির পাশে তার উৎস উপরে নাম ধরে দেওয়া আছে, আর উদ্ধৃতিগুলো হুবহু। কোনো গেংখুলি পরিবেশনা এই লেখার জন্য শোনা হয়নি — সব তথ্য লিখিত ও প্রকাশিত উৎসের।
সব ব্যক্তির নাম, স্থানের নাম ও চাকমা শব্দ উৎসে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে — বানানের ভিন্নতাসহ, কারণ সেটিও একটি তথ্য। এই পাতা পরিবেশক ও পরিবেশনা নিয়ে; পালাগুলোর কাহিনি আলাদা লেখায় আছে। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।
প্রসঙ্গ:উভোগীত, গান, গেংখুলি, গোজেন লামা, চাকমা গান, চাকমা সংস্কৃতি, চাকমা সাহিত্য, চাদিগাং ছাড়া পালা, পালা গীদ, বাদ্যযন্ত্র, রাধামন, রাধামন-ধনপুদি, লোকসংগীত
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।