Last updated Nov 3rd, 2026
0

আদিবাসী ভাষার বই প্রকাশনা বাংলাদেশে কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই। নামপত্র আর খবর মিলিয়ে যে ছবি পাওয়া যায় তাতে এই বইগুলোর টাকা এসেছে লেখকের নিজের পকেট থেকে, জেলাভিত্তিক সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ও পার্বত্য জেলা পরিষদ থেকে, ইউএনডিপির মতো দাতা সংস্থা থেকে, গির্জা, ক্লাব, ছাত্রসংগঠন, দাতব্য ফাউন্ডেশন আর সরকারের পাঠ্যপুস্তক বোর্ড থেকে। কোন বই কার টাকায় ছাপা, এই লেখায় তা বই ধরে ধরে দেখানো হলো — যেখানে উৎস যা বলে, কেবল ততটুকু।
শুরুটা একটা গোলাপি মলাটের পাতলা বই দিয়ে। 1959 সালে উলুছড়ির নোয়ারাম চাকমা “চাকমার পথম শিক্ষা” নামে চাকমা বর্ণমালার একটি প্রাথমিক বই বের করেন। মলাটে লেখা “সংগ্রাহক ও প্রকাশক — নোয়ারাম চাকমা”। ভেতরে “আমার কথা”-য় তিনি জানিয়েছেন, বারো বছরের পরিশ্রমের ফল এই বই, আর টাকার অভাবে বইটির আকার ছোট রাখতে হয়েছে। প্রায় সত্তর বছর পরে বান্দরবানে ইয়াংঙান ম্রো রেংমিটচ্য ভাষার শব্দের বই ছাপেন — খবর অনুযায়ী, নিজের পকেটের টাকায়। দুই বইয়ের মাঝখানে কারা কারা প্রকাশকের জায়গা নিয়েছে, নিচে তার হিসাব।
সূচিপত্র
উৎসে যে বইগুলোর অর্থের উৎস বা প্রকাশকের নাম পাওয়া যায়, সেগুলোকে টাকার উৎস ধরে সাজালে সাতটি ধরন দাঁড়ায়: লেখক নিজে, সরকারি সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ও জেলা পরিষদ, দাতা সংস্থার সহযোগিতায় স্থানীয় সংগঠন, রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পদে থাকা ব্যক্তি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, দাতব্য ফাউন্ডেশন, আর জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।
নিচের ছকে প্রতিটি ধরনের একটি বা দুটি উদাহরণ, উৎসসহ। ছকটি পূর্ণ তালিকা নয় — প্রতিটি সারিতে কেবল সেই বই, যার প্রকাশনা-তথ্য নামপত্রে বা খবরে পড়া গেছে।
| টাকা বা প্রকাশনা কার | উদাহরণ (ভাষা, সাল) | উৎস যা বলে |
|---|---|---|
| লেখক নিজে | চাকমার পথম শিক্ষা (চাকমা, 1959); মিটচ্য তখক (রেংমিটচ্য, 2023) | মলাটে “সংগ্রাহক ও প্রকাশক” নোয়ারাম চাকমা; কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন অনুযায়ী ইয়াংঙান ম্রো নিজের টাকায় বনতুলি প্রিন্টার্স থেকে ছেপেছেন |
| সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ও জেলা পরিষদ | চাঙমা পত্থম পাঠ (চাকমা, 2001); ককবরক অভিধান ও ব্যাকরণ (1989) | নামপত্রে রাঙ্গামাটির ইনস্টিটিউট ও রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ; আর্কাইভের ককবরক লেখায় রাঙামাটির উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট |
| দাতা সংস্থার সহযোগিতায় স্থানীয় সংগঠন | চাঙমা ভাচ আলাম; চাঙমা দাগ কধা (চাকমা, 2015) | প্রকাশক চাঙমা একাডেমি ও জাবারাং কল্যাণ সমিতি, “সহযোগিতায় সিএইচটিডিএফ-ইউএনডিপি” |
| পদে থাকা ব্যক্তি | এচ্যা বিঝুত মা গঙ্গী তরে দিবে বিঝু ফুল (চাকমা, 2005) | “Contributed & Published By” তৎকালীন উপমন্ত্রী মনি স্বপন দেওয়ান |
| ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান | বম ভাষার বই; চাকমা লিপিতে ত্রিপিটকের পিডিএফ | আর্কাইভের বম লেখায় “চার্চ ভিত্তিক প্রকাশনাই প্রধান”; কল্পতরু নিজেকে বৌদ্ধধর্মীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বলে |
| দাতব্য ফাউন্ডেশন | ম্রো রূপকথা (ম্রো, 2019); সাঁওতাল ভাষায় রূপকথা | বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন প্রকাশ করে বিনা মূল্যে বিতরণ করেছে (গ্লোবাল ভয়েসেস); রকমারির তালিকায় প্রকাশক বিদ্যানন্দ প্রকাশনী |
| সরকার | চাকমা, মারমা, ককবরক, গারো ও সাদরি ভাষার প্রাথমিক পাঠ্যবই; ছয় ভাষায় “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” | জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড; অনুবাদে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পৃষ্ঠপোষকতা |
ছকের বাইরে আরেকটি সারি থাকা দরকার, যেটি ফাঁকা: “প্রকাশকের নাম বা খরচ কে দিয়েছে, তা উৎসে নেই”। ম্রো ভাষার প্রথম ব্যাকরণ বই “ততোং” (2022) আর মারমা-বাংলা অভিধান (2022) — দুটোরই মোড়ক উন্মোচনের খবর একাধিক পত্রিকায় আছে, কিন্তু কোনো প্রতিবেদনে প্রকাশকের নাম বা খরচের উৎস নেই। সে কথা নিচে আলাদা করে আছে।
নোয়ারাম চাকমার “চাকমার পথম শিক্ষা” (প্রথম সংস্করণ 1959) লেখক নিজে প্রকাশ করেছিলেন — মলাটে লেখা “সংগ্রাহক ও প্রকাশক”। ছেপেছিল চট্টগ্রামের চন্দনপুরার একটি ছাপাখানা। বইটি বেরোয় পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনারের অনুমতি নিয়ে, চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের অভিমতসহ। বইটির পুরো স্ক্যান আমাদের ইবুক লাইব্রেরিতে আছে।
বইয়ের দ্বিতীয় পাতার মাথায় ছাপা: “মাননীয় পার্ব্বত্য চট্টগ্রাম ডেপুটী কমিশনার বাহাদুরের Memo No. 1900 (4) G Dated Rangamati the 30. 4. 1959 তারিখে অনুমতি প্রাপ্ত।” তার নিচে নকশাদার ফ্রেমে চাকমা রাজার অভিমত, যেখানে বইটিকে চাকমা ভাষা লেখার প্রণালীর “প্রথম অবদান” বলা হয়েছে।

লেখকের ভূমিকা “আমার কথা”-য় তিন রকম তথ্য আছে। এক, বইটি তাঁর “সুদীর্ঘ বারো বছরের পরিশ্রমের ফল”। দুই, টাকার টানাটানি: তাঁর ভাষায়, “আর্থিক অস্বচ্ছলতার জন্যে পুস্তকটীর কলেবর ক্ষুদ্র করতে বাধ্য হয়েছি।” তিন, সাহায্যকারীদের নাম — বিশেষ করে তৎকালীন ডেপুটি কমিশনার “M. A. Kareem Iqbal C.S.P” আর চাকমা রাজা ক্যাপ্টেন ত্রিদিব রায়। লেখক লিখেছেন, এঁরা সাহায্য না করলে বইটি প্রকাশ করতে পারতেন না। সাহায্য কী ধরনের — টাকা, অনুমতি না অন্য কিছু — ভূমিকায় তা খুলে বলা নেই।
ভূমিকার নিচে ছাপাখানার নাম: “এম. রহমান ছিদ্দিকী ইছলামিয়া এণ্ড প্রিন্টিং প্রেস, চন্দনপুর, চট্টগ্রাম”। উলুছড়ির লেখকের বই ছাপা হয়েছিল চট্টগ্রাম শহরে।
আর্কাইভে থাকা উৎপল চাকমার লেখা “আদিবাসী ভাষাগত সঙ্কট ও সম্ভাবনার প্রেক্ষিত” জানায়, নোয়ারাম চাকমার বইটি পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা শিশুদের পাঠ্যবই হিসেবে তৎকালীন টেক্সটবুক বোর্ডের অনুমোদন পেয়েছিল। একই লেখায় আছে, এর আগে 1940 সালে “মি. মিলার” নামে একজন “চাকমা প্রাইমার” নামে শিশুপাঠ্য বই প্রকাশ করে স্কুলে চালুর চেষ্টা করেছিলেন। মিলারের বইয়ের প্রকাশক বা অর্থের উৎস সেখানে নেই।
জুমজার্নালের ইবুক লাইব্রেরিতে চাকমা ভাষার যে বইগুলো আছে, তাদের নামপত্রে প্রকাশকের ঘরে আছে একজন লেখক থেকে শুরু করে সরকারি ইনস্টিটিউট, দাতা-সহায়তাপুষ্ট সংগঠন, বৌদ্ধ বিহার, কিশোর ক্লাব, বিশ্ববিদ্যালয়ের সাহিত্য দল আর ঢাকার বাংলাবাজারের প্রকাশনী পর্যন্ত। নিচের ছক লাইব্রেরির রেকর্ড থেকে, প্রতিটি বইয়ের লিংকসহ।
ছকটি কেবল চাকমা ভাষার বইয়ের, কারণ লাইব্রেরিতে আদিবাসী ভাষায় লেখা বইগুলোর প্রায় সবই চাকমা। অন্য ভাষার প্রকাশনা নিয়ে নিচে আলাদা অংশ আছে; চাকমা বইয়ের ধরন অন্য ভাষার বেলায় খাটে, এমন কোনো উৎস নেই।
| বই | সাল | নামপত্রে প্রকাশক |
|---|---|---|
| চাকমার পথম শিক্ষা — নোয়ারাম চাকমা | 1959 | লেখক নিজে (“সংগ্রাহক ও প্রকাশক”) |
| গোজেন লামা — শিবচরণ, সম্পাদনা ননাধন চাকমা | 1975 | রাঙ্গামাটি প্রকাশনী, রিজার্ভ বাজার |
| রাধামন ধনপুদি (১ম খণ্ড) | 1980 | মুরোল্যা লিটারেচার গ্রুপ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় |
| রাধামন ধনপুদি (২য় খণ্ড) | 1981 | রাঙামাটি ঈস্থেটিকস কাউন্সিল |
| চাকমা কধা ভান্ডাল — সি. আর. চাকমা | 1391 বঙ্গাব্দ | লেখক নিজে, লিলুয়া (হাওড়া); পরিবেশক পুস্তক বিপণি, কলকাতা |
| চাঙমার আগ পুধি | 1989 | চাঙমাভাষা প্রকাশনা পরিষদ, রাঙামাটি |
| দিগবন সেরেত্তুন — মৃত্তিকা চাঙমা | 1995; ২য় প্রকাশ 2013 | ছড়াখুম পাবলিশার্স, রাঙামাটি |
| চাঙমা পত্থম পাঠ (প্রাইমার) | 2001; পুনর্মুদ্রণ 2007–2013 | ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ |
| চন্দবী বারমাস ও চিত্ররেখা বারমাস | 2003 | উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি |
| রাধামন ধনপুদি — সম্পাদক সুগত চাকমা | 2004 | উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি |
| গোজেন লামা — সম্পাদনা সুগম চাকমা | 2004 | বনযোগীছড়া কিশোর-কিশোরী কল্যাণ সমিতি, জুরাছড়ি |
| এচ্যা বিঝুত মা গঙ্গী তরে দিবে বিঝু ফুল — তরুণ কুমার চাকমা | 2005 | উপমন্ত্রী মনি স্বপন দেওয়ান; প্রাপ্তিস্থান ছড়াখুম পাবলিশার্স |
| চাঙমা আগর মাধ আ ভাচ-সুদোম — ইত্তুকগুল’ চাঙমা | 2006 | শিপচরন সাহিত্য কেন্দ্র, কাটাবন, ঢাকা |
| কজমা চিত্তির বই | 2007 | জুনো পহর একাডেমী, রাঙামাটি |
| চাকমা কবিতা — সম্পাদনা নন্দলাল শর্মা | 2008 | সূচীপত্র, বাংলাবাজার, ঢাকা |
| চাকমা গল্প (1978–2009) | 2009 | পুলক সাহিত্য সমিতি, বনরূপা, রাঙামাটি |
| এ্যাংকুর — মৃত্তিকা চাঙমা | 2010 | ছড়াখুম পাবলিশার্স |
| চাকমা শব্দ ভান্ডাল — আর্য্যমিত্র চাকমা | 2011 | ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ি |
| জুম গাভুরী — তরুণ কুমার চাকমা | 2012 | ছড়াখুম পাবলিশার্স |
| চাঙমা কধায় ফুর বাড়েং — জীবনসার ভিক্ষু | 2012 | নু-অ যদাবল ধর্মহ্র ছদক, দীঘিনালা |
| চাঙমা ভাচ আলাম — প্রধান সম্পাদক আর্যমিত্র চাকমা | 2015 | চাঙমা একাডেমি ও জাবারাং কল্যাণ সমিতি, সিএইচটিডিএফ-ইউএনডিপির সহযোগিতায় |
| চাঙমা দাগ কধা | 2015 | চাঙমা একাডেমী ও জাবারাং কল্যাণ সমিতি, সিএইচটিডিএফ-ইউএনডিপির সহযোগিতায় |
| চাকমা পচ্ছন — নিরঞ্জন চাকমা | 2015 | কল্পতরু, রাঙামাটি |
| পহ্র ফুদোক | 2015 | রেগা প্রকাশনী, রাঙামাটি |
| চাকমা-বাংলা অভিধান — সুগত চাকমা | 2016 | ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি |
| চাঙমা শিক্ষা বই — মিঠুন চাঙমা | 2016–2017 | চাঙমা বর্ণমালা ও ধ্বনি সংক্রান্ত পর্যালোচনা কমিটি, খাগড়াছড়ি |
রেকর্ডে কয়েকটি বইয়ের প্রকাশক কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, একজন ব্যক্তি — যেমন একটি গানের স্বরলিপি বই আর একটি ধর্মীয় সংকলন। আবার কয়েকটির প্রকাশকের ঘর ফাঁকা, কারণ পিডিএফটি একটি অংশমাত্র বা নামপত্র চাকমা লিপিতে। যেমন “ছাংবিজ্জা” (2006) আর একটি “চাংমা শিক্ষা” বইয়ের প্রকাশকের নাম রেকর্ডে নেই।
“ছড়াখুম পাবলিশার্স” নামটি 1995 থেকে 2012 পর্যন্ত একাধিক বইয়ের নামপত্রে আছে; “দিগবন সেরেত্তুন”-এর নামপত্রে প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রকাশক হিসেবে একজন ব্যক্তির নামও আছে।
রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট চাকমা প্রাইমার, চাকমা অভিধান ও শব্দকোষ, চাকমা পালাগান আর ককবরক অভিধান-ব্যাকরণ প্রকাশ করেছে। 2025 সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী জেলা পরিষদের উদ্যোগে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও ম্রো ভাষার অভিধান এবং ককবরক শব্দভাণ্ডার প্রকাশ করা হয়েছে।
নামপত্র থেকে পাওয়া উদাহরণ:
ককবরকের বেলায় আর্কাইভে থাকা মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার লেখা “কালের দর্পনে ককবরকের লিখিত চর্চা” জানায়, 1984 সালে রাঙামাটির উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট থেকে জাফার আহমাদ হানাফীর সম্পাদনায় “ত্রিপুরা ভাষা শিক্ষার প্রথম পাঠ” আর 1989 সালে একই ইনস্টিটিউট থেকে সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার সম্পাদনায় ককবরক ভাষার অভিধান ও ব্যাকরণ প্রকাশিত হয়।
ম্রো ভাষার ক্ষেত্রে নিউ এজে Mong Sing Neo (21 ফেব্রুয়ারি 2026) লিখেছেন, বান্দরবানের উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট ম্রো ভাষা শিক্ষায় সহায়তা করেছে। সে সহায়তায় কোনো বই ছাপা হয়েছিল কি না, লেখায় নেই।
দেশ রূপান্তরে শংকর হোড় (21 ফেব্রুয়ারি 2025) লিখেছেন, “গত দুই বছর আগে” জেলা পরিষদের উদ্যোগে ককবরক শব্দভাণ্ডারসহ চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও ম্রো ভাষার অভিধান প্রকাশ করা হয়েছে। কোন জেলা পরিষদ, অভিধানগুলোর নাম বা সংকলক কারা — প্রতিবেদনে নেই।
একই প্রতিবেদনে চাকমা কালচারাল কাউন্সিল অব বাংলাদেশের উপদেষ্টা আনন্দ জ্যোতি চাকমার উদ্ধৃতি আছে: ভাষাটি সমৃদ্ধ করতে “সরকারি পৃষ্ঠপোষকতারও প্রয়োজন রয়েছে।” প্রতিবেদন অনুযায়ী সংগঠনটি 2023 সাল থেকে গ্রামে গ্রামে চাকমা বর্ণমালা শেখাচ্ছে; বই প্রকাশের কথা সেখানে নেই।
মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা তাঁর লেখায় নিজের মত হিসেবে লিখেছেন, ইনস্টিটিউটগুলোতে গবেষণা সেলের বিধান থাকলেও কার্যকর মৌলিক গবেষণা দেখা যায় না, আর তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ভাষা বিকাশে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। তাঁর প্রস্তাব: সরকারি আর্থিক বরাদ্দ দিয়ে পরিষদগুলোকে ভাষা ও সংস্কৃতির কাজে সহায়তা করা।
2015 সালে খাগড়াছড়ির চাঙমা একাডেমি ও জাবারাং কল্যাণ সমিতি দুটি বড় চাকমা বই প্রকাশ করে — চাকমা-বাংলা অভিধান “চাঙমা ভাচ আলাম” আর প্রবাদের সংকলন “চাঙমা দাগ কধা”। দুটির নামপত্রেই লেখা “সহযোগিতায় সিএইচটিডিএফ-ইউএনডিপি”। অভিধানটি ছাপা হয়েছে বান্দরবানে, দাম 300 টাকা।

“চাঙমা ভাচ আলাম”-এর নামপত্রে যা আছে:
একই বছরের “চাঙমা দাগ কধা” চাকমা প্রবাদ-প্রবচনের সংকলন, চাকমা হরফে ছাপা, বাংলায় উচ্চারণ ও ভাবার্থসহ; প্রকাশক একই দুই সংগঠন, একই সহযোগিতা, ISBN 978-984-33-9004-2।
পিডিএফটির প্রথম পাতায় আরেকটি তথ্য আছে, যা বইয়ের নয়, স্ক্যানের: “কল্পতরু বই পিডিএফ প্রকল্প”-এর পরিচিতি। সে কথা নিচে বিতরণের অংশে।
সিএইচটিডিএফ (চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস ডেভেলপমেন্ট ফ্যাসিলিটি) কত টাকা দিয়েছিল বা কত কপি ছাপা হয়েছিল — নামপত্রে নেই। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার ককবরক লেখায় জাবারাং কল্যাণ সমিতির নাম আরেক জায়গায় আছে: ককবরক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ও বাংলাদেশ ত্রিপুরা কল্যাণ সংসদের সঙ্গে সভা-কর্মশালার আয়োজক হিসেবে।
চাকমা কবিতা, গল্প আর উৎসব-সংকলনের প্রকাশকের তালিকায় আছেন একজন উপমন্ত্রী, জুরাছড়ির একটি কিশোর-কিশোরী কল্যাণ সমিতি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সাহিত্য দল, রাঙামাটির জুম ঈস্থেটিকস কাউন্সিল আর ছড়াখুম, কল্পতরু ও রেগার মতো রাঙামাটির ছোট প্রকাশনী।
তরুণ কুমার চাকমার চাকমা কবিতার বই “এচ্যা বিঝুত মা গঙ্গী তরে দিবে বিঝু ফুল” (বিঝু 2005)-এর নামপত্র চাকমা ভাষায় লেখা। সেখানে “ফ’গদাঙ্যা” (প্রকাশক) হিসেবে আছেন মি. মনি স্বপন দেওয়ান, “মাননীয় উপমন্ত্রী”, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ইংরেজি অংশে: “Contributed & Published By: Moni Swapan Dewan, MP, Deputy Minister, Ministry of CHT affairs, Govt. of Bangladesh.”

একই পাতায় আরও আছে: প্রাপ্তিস্থান (“যিদু যিদু পা যেব’”) ছরাখুম পাবলিশার্স, বনরূপা, রাঙামাটি; গ্রাফিক্স বাংলাবাজারের একটি প্রতিষ্ঠান; ছাপা (“ছাবানা”) 48/1 নর্থব্রুক হল রোড, বাংলাবাজার; দাম (“বেজানান”) 50 টাকা। বইটির লেখা চাকমা ভাষায়, ছাপা ঢাকায়, প্রাপ্তিস্থান রাঙামাটিতে।
ছড়াখুম পাবলিশার্স (মৃত্তিকা চাঙমা ও তরুণ কুমার চাকমার বই), কল্পতরু (“চাকমা পচ্ছন”, 2015, চাকমা লিপিতে) আর রেগা প্রকাশনী (“পহ্র ফুদোক”, 2015)। ঢাকার দুটি নাম আছে: কাটাবনের শিপচরন সাহিত্য কেন্দ্র (2006) আর বাংলাবাজারের সূচীপত্র, যারা 2008 সালে নন্দলাল শর্মার সম্পাদনায় “চাকমা কবিতা” ISBN সহ ছেপেছে।
কল্পতরুর নিজের পরিচিতি (“চাঙমা ভাচ আলাম”-এর পিডিএফের প্রথম পাতায়) অনুযায়ী এটি “মূলত একটি বৌদ্ধধর্মীয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান”, যাত্রা শুরু 2013 সালে একটি বই প্রকাশের মধ্য দিয়ে।
উৎসে পাওয়া ম্রো ভাষার বইগুলোর টাকা এসেছে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে: 2004 সালের প্রাথমিক পাঠ্যবই গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আর্থিক সহায়তায়, 2019 সালের “ম্রো রূপকথা” বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশনের প্রকাশনায়, আর 2023 সালের রেংমিটচ্য শব্দের বই সংকলক ইয়াংঙান ম্রোর নিজের টাকায়। 2022 সালের ব্যাকরণ “ততোং”-এর প্রকাশক বা খরচের উৎস কোনো প্রতিবেদনে নেই।
ইয়াংঙান ম্রোর বইয়ের পূর্ণ তালিকা ও সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন খবরের অমিল ইয়াংঙান ম্রো ও তাঁর বই নিয়ে আমাদের লেখায় আছে; ম্রো বর্ণমালার ইতিহাস ম্রো লিপির লেখায়। এখানে কেবল প্রকাশনার দিকটি।
নিউ এজে Mong Sing Neo (21 ফেব্রুয়ারি 2026) লিখেছেন, 1994 সালে Menrum Mro প্রথম ম্রো সফটওয়্যার তৈরি করেন (পরে নাম হয় “Rien”) এবং তা দিয়ে ধর্মীয় শিক্ষার একটি বই প্রকাশ করেন। 2004 সালে ম্রো বর্ণমালা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আর্থিক সহায়তা পায়, যা দিয়ে প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবই প্রকাশ সম্ভব হয়।
গ্লোবাল ভয়েসেস (2 মার্চ 2019) জানায়, সে বছরের একুশে ফেব্রুয়ারিতে একটি দাতব্য ফাউন্ডেশন ইয়াংঙান ম্রোর লেখা “Mro Fairy Tales” ম্রো হরফে প্রকাশ করে বিনা মূল্যে বিতরণ করে; বইটি বাংলাতেও প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনে ছবির ক্যাপশনে প্রতিষ্ঠানটির নাম বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন; বিদ্যানন্দ পাবলিকেশন্স তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান।
প্রতিষ্ঠাতা Kishor Kumar Das গ্লোবাল ভয়েসেসকে দুটি সমস্যার কথা বলেছেন। প্রথম সমস্যা ছিল ম্রো ভাষায় লেখক খুঁজে পাওয়া — ফেসবুকে বিজ্ঞাপন দিয়ে, পরে এক স্বেচ্ছাসেবকের মাধ্যমে লেখককে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় সমস্যা ফন্ট: তাঁর কথায়, এসব ফন্টে বাংলাবাজারে কোনোদিন কাজ হয়নি। বইটি করার কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, তাঁদের কয়েকটি আদিবাসী এতিমখানার শিশুদের মাতৃভাষায় বই উপহার দেওয়া।
বাংলা ট্রিবিউন (18 ফেব্রুয়ারি 2022) ও ঢাকা ট্রিবিউন জানায়, ম্রো ভাষার প্রথম ব্যাকরণ বই “ততোং”-এর মোড়ক উন্মোচন হয় 17 ফেব্রুয়ারি 2022, বান্দরবান শহরের উজানি পাড়ায় লেখকের বাসায়; উন্মোচন করেন ক্রামা ধর্মের প্রধান শিষ্য লেংয়াং ম্রো। কোন প্রেসে ছাপা, কে খরচ দিয়েছে — তিনটি প্রতিবেদনের (বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা ট্রিবিউন, গ্লোবাল ভয়েসেস 2022) কোনোটিতে নেই।
উন্মোচনে ম্রো ভাষার শিক্ষক ঙানসিং ম্রো বলেন, বর্ণমালা আবিষ্কারের পর হাতে লিখে লিখে বর্ণমালা পড়ানো হতো, এখন নিজেদের ভাষায় বই আকারে ছাপা হলো (বাংলা ট্রিবিউন)।
দেশেবিদেশেতে পুনর্মুদ্রিত কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন (31 জানুয়ারি 2023) অনুযায়ী “মিটচ্য তখক” প্রকাশিত হয়েছে বান্দরবানের বনতুলি প্রিন্টার্স থেকে, আর “নিজের পকেটের পয়সা খরচ করেই” এটি প্রকাশ করেছেন ইয়াংঙান ম্রো। বইটির বাকি বিবরণ — শব্দসংখ্যা, বক্তা, লিপি — রেংমিটচ্য অভিধান নিয়ে আমাদের লেখায়।
একই প্রতিবেদন জানায়, তাঁর প্রথম বই “রিইয়ুং খতি” প্রকাশিত হয় 2015 সালে। প্রথম বইয়ের প্রকাশক বা খরচের উৎস সেখানে নেই।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (16 ডিসেম্বর 2024) জানায়, ইয়াংঙান ম্রো সাত বীরশ্রেষ্ঠর জীবনী নিয়ে 24 পৃষ্ঠার একটি বই ম্রো বর্ণমালায় লিখেছেন, নাম “নমমো তসেন কিয়াক মি”; মোড়ক উন্মোচন হয় বান্দরবান শহরের উজানি পাড়ার একটি রেস্তোরাঁয়। লেখার কাজ শুরু 2017 সালের ডিসেম্বরে। প্রকাশক বা খরচের উৎস প্রতিবেদনে নেই।
2022 সালের এপ্রিলে বান্দরবানে মোড়ক উন্মোচন হওয়া মারমা-বাংলা অভিধানটি সংকলক জুয়েল বড়ুয়া নিজের উদ্যোগে তৈরি করেছেন বলে দুটি পত্রিকা লিখেছে। কারা ছেপেছে, খরচ কে দিয়েছে — কোনো প্রতিবেদনে নেই। বিডিনিউজের হিসাবে বইটি 370 পৃষ্ঠার।
প্রথম আলো (8 এপ্রিল 2022) লিখেছে, সংকলকের মাতৃভাষা বাংলা হলেও তিনি “স্ব-উদ্যোগে” মারমা ভাষা ও বর্ণমালা শিখেছেন; কাজ শুরু 2017 সালে, করোনার সময় স্কুল বন্ধ থাকায় সংকলন শেষ করার সময় পান। মোড়ক উন্মোচক শিক্ষাবিদ ক্য শৈ প্রু মারমা বলেন, একজন বাংলাভাষী শিক্ষক “নিজের আগ্রহে, উদ্যোগে” অভিধানটি সংকলন করেছেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (9 এপ্রিল 2022) লিখেছে, 2017 সাল থেকে তিনি “নিজ উদ্যোগে” মারমা বর্ণমালা ও ভাষাশিক্ষা চর্চা করছেন, সম্পাদনায় মারমা ভাষা জানা পাঁচজনের সহযোগিতা নিয়েছেন, আর বইটি প্রকাশিত হয় আগের মাসে।
সংকলকের কর্মস্থল নিয়ে দুই পত্রিকার তথ্য আলাদা: প্রথম আলো লিখেছে তিনি রোয়াংছড়ি সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক; বিডিনিউজ লিখেছে তিনি চট্টগ্রামের পটিয়ার একটি সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, আর 2017 সালে রোয়াংছড়িতে শিক্ষকতা করতেন। অভিধানটির বিষয়বস্তু নিয়ে অভিধানের তালিকার লেখায় আরও আছে।
বাংলাদেশে ককবরক বইয়ের প্রকাশক হিসেবে আর্কাইভের একটি লেখা ব্যক্তি, সম্প্রদায়ের সংগঠন আর রাঙামাটির সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের নাম দেয়। 1942 সালের একটি ককবরক গানের বই থেকে 1989 সালের অভিধান পর্যন্ত — সবই মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার লেখা অনুযায়ী।
লেখাটি আরও জানায়, ককবরক অভিধান রচনার জন্য গঠিত একটি টেকনিক্যাল কমিটি সামার ইনস্টিটিউট অব লিঙ্গুইস্টিকসের (এসআইএল) সঙ্গে যোগাযোগ করে সহায়তা নিয়েছে। কোন অভিধান, কবে — তা সেখানে স্পষ্ট নয়। ককবরক কোন হরফে লেখা হবে, সে বিতর্কও এই লেখায় আছে; এখানে তা বাদ রাখা হলো।
আর্কাইভে থাকা জির কুং সাহুর লেখা “বম ভাষা: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ” সরাসরি বলে, বম ভাষায় “চার্চ ভিত্তিক প্রকাশনাই প্রধান”। বাইবেল, ধর্মীয় সংগীত, বাইবেলের ব্যাখ্যা আর নানা বিষয়ের বই বম ভাষায় আছে; বম সম্প্রদায় নিজেরা 1948 সালে প্রথা-আইনের একটি পুস্তিকা ছাপে।
লেখাটির আরও কিছু তথ্য:
বম অভিধান নিয়ে লেখাটির তথ্য অভিধানের তালিকায় আছে; কুকি-চিন ভাষাগুলোর লিপি ও শ্রেণিবিন্যাস কুকি-চিন ভাষা নিয়ে আমাদের লেখায়।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) চাকমা, মারমা, ককবরক (ত্রিপুরা), গারো ও সাদরি — পাঁচ ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণির পাঠ্যবই ছেপে বিনা মূল্যে বিতরণ করে। শুরু কবে, তা নিয়ে উৎসে দুই সাল আছে: বেশির ভাগ প্রতিবেদন বলে 2017, সুগত চাকমা প্রথম আলোয় (14 ফেব্রুয়ারি 2025) লিখেছেন 2016 সাল থেকে ধাপে ধাপে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ইংরেজি প্রতিবেদন (21 ফেব্রুয়ারি 2022) এনসিটিবির বরাতে জানায়, সে বছর পাঁচ জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মধ্যে 312,000টি বই বিতরণ করা হয়েছে। শুরুতে সাঁওতাল ও মণিপুরী ভাষার বইয়ের পরিকল্পনাও ছিল, কিন্তু লেখার (হরফের) সমস্যায় তা স্থগিত হয়। একই প্রতিবেদনে তৎকালীন এনসিটিবি চেয়ারম্যান Farhadul Islam বলেছেন, অন্য জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় পাঠ্যবই প্রকাশের প্রক্রিয়া পিছিয়েছে উপগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে “দ্বন্দ্ব ও উদাসীনতার” কারণে।
পাঠ্যবই প্রণয়নের কারিগরি কমিটির সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিজ্ঞানের অধ্যাপক Shourav Sikder একই প্রতিবেদনে বলেন, কাজ শুরু হয় 2013 সালে, বই আসে 2017 সালে। তাঁর মতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় উদ্যোগটি এগোচ্ছে না।
সাঁওতালি বইয়ের বেলায় বিডিনিউজের বাংলা প্রতিবেদন (28 ফেব্রুয়ারি 2023) লেখে, রোমান, বাংলা না অলচিকি — কোন হরফে বই হবে, সেই দ্বন্দ্বে বই ছাপানোর কাজ আটকে যায়।
এর বাইরে কোনো আদিবাসী ভাষার সাধারণ বই (গল্প, কবিতা, অভিধান) এনসিটিবি ছাপে, এমন তথ্য উৎসে পাওয়া যায়নি। আর্কাইভে থাকা “বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা আন্দোলন ও চাকমা ভাষার দশা” (2017) প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদনের বরাতে লেখে, বিতরণ করা পাঠ্যবই তখন কাজে আসছিল না।
2024 সালে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের পৃষ্ঠপোষকতায় শেখ মুজিবুর রহমানের “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” চাকমা, মারমা, ককবরক, গারো, কুড়মালি ও সাদরি — ছয় ভাষায় অনূদিত হয়ে প্রকাশিত হয়। বিডিনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রত্যেক অনুবাদককে কাজের জন্য এক লাখ টাকা দেওয়া হয়।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন (21 ফেব্রুয়ারি 2024) অনুযায়ী অনুবাদকেরা হলেন: মারমা ভাষায় নুথোয়াই মারমা, আচিক (গারো) ভাষায় বাঁধন আরেং, সাদরিতে যোগেন্দ্র নাথ, ককবরকে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, চাকমায় আর্যমিত্র চাকমা আর কুড়মালিতে উজ্জ্বল মাহাতো।
প্রতিবেদন জানায়, উদ্যোগটির শুরু নুথোয়াই মারমার প্রস্তাবে। ইনস্টিটিউট তাঁকে আগে 7 মার্চের ভাষণ মারমায় অনুবাদ করতে ডেকেছিল; তখন তিনি “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” অনুবাদের কথা জানিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দেন। সেই প্রস্তাব নিয়ে ইনস্টিটিউট ছয় ভাষায় অনুবাদের উদ্যোগ নেয়, “এবং সবাইকে এক লাখ টাকা দেওয়া হয় বইটি নিয়ে কাজ করতে।”
নুথোয়াই মারমা প্রতিবেদনে বলেছেন, মারমা ভাষার নিজস্ব অভিধান না থাকায় অনেক বাংলা শব্দের মারমা প্রতিশব্দ পেতে সমস্যা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরেকটি উদ্ধৃতি আছে: রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এলে আরও অনেকে এগিয়ে যাবেন।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (21 অক্টোবর 2023) জানায়, ইয়াংঙান ম্রো 7 মার্চের ভাষণ ম্রো ভাষায় অনুবাদ করেছেন এবং বান্দরবান-চিম্বুক সড়কের পাশের রামরি পাড়ায় বইটির মোড়ক উন্মোচন হয়। সেই বইয়ের প্রকাশক বা অর্থের উৎস জানা যায়নি।
দ্য ডেইলি স্টার (23 ফেব্রুয়ারি 2020) লিখেছে, সে বছর একুশে বইমেলায় আদিবাসী প্রকাশক ছিল কেবল দুটি — Mithun Raksham-এর Thokbirim আর Shadhan Maibam-এর Teuri। Thokbirim তখন পর্যন্ত 30টি বই প্রকাশ করেছিল, সে বছর 11টি; Teuri একজন আদিবাসী লেখকের একটি বই।
প্রতিবেদনের আরও কিছু তথ্য:
প্রতিবেদনটি বইগুলোর ভাষা আলাদা করে বলেনি — উল্লিখিত বইগুলোর কয়টি গারো বা হাজং ভাষায় আর কয়টি বাংলায়, তা স্পষ্ট নয়।
রকমারির তালিকায় “সাঁওতাল ভাষায় রূপকথা” নামে একটি হার্ডকভার বই আছে, প্রকাশক বিদ্যানন্দ প্রকাশনী, অনুবাদক প্রদীপ হেমব্রম, তালিকাভুক্ত দাম 350 টাকা। 2019 সালে বিদ্যানন্দের প্রতিষ্ঠাতা গ্লোবাল ভয়েসেসকে বলেছিলেন, পরের বছর আরও কয়েকটি ভাষায় বই প্রকাশের পরিকল্পনা আছে। বইটি কবে ছাপা, কয় কপি, তা তালিকায় নেই।
নামপত্র ও খবরে পাওয়া দাম: 2005 সালের চাকমা কবিতার বই 50 টাকা, 2015 সালের “চাঙমা ভাচ আলাম” 300 টাকা, রকমারিতে বিদ্যানন্দের সাঁওতাল রূপকথা 350 টাকা। এনসিটিবির পাঠ্যবই আর 2019 সালের “ম্রো রূপকথা” বিনা মূল্যে বিতরণ হয়েছে। চাকমা লিপির বহু বই রাঙামাটির কল্পতরুর অবাণিজ্যিক ওয়েবসাইটে পিডিএফ হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
কল্পতরুর পরিচিতিপাতা (“চাঙমা ভাচ আলাম”-এর পিডিএফের প্রথম পাতায়) জানায়: প্রতিষ্ঠার “বছর খানেক পর” তারা “kalpataruboi.org” নামে একটি অবাণিজ্যিক ডাউনলোডিং ওয়েবসাইট চালু করে, যেখানে মূল ত্রিপিটকসহ বৌদ্ধধর্মীয় বই পিডিএফ আকারে বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। আর্কাইভের 2017 সালের একটি লেখা জানায়, ভদন্ত করুণাবংশ ভিক্ষু পুরো পালি ত্রিপিটক চাকমা অক্ষরে লিখেছেন, যা পিডিএফ সংস্করণে ওই ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
লাইব্রেরির রেকর্ড অনুযায়ী জীবনসার ভিক্ষুর “চাঙমা কধায় ফুর বাড়েং” আর বৈসাবি সংকলন “অখ্যইক”-এর পিডিএফ কল্পতরু বই পিডিএফ প্রকল্পের স্ক্যান।
নামপত্রে ছাপাখানা আর প্রাপ্তিস্থান অনেক সময় আলাদা শহরে:
সংখ্যার দিকটি — কয় কপি ছাপা হয়েছিল — উৎসে প্রায় কোথাও নেই। যে নামপত্রগুলো এই লেখায় পড়া হয়েছে, তার কোনোটিতে মুদ্রণসংখ্যা লেখা নেই।
বইগুলো খুঁজে পাওয়ার আরেকটি পথ জুমজার্নালের নিজের সংগ্রহ: ইবুকে থাকা আদিবাসী লোককথার বইয়ের তালিকা আর পাহাড়ের লোককথা কারা সংগ্রহ করেছিলেন — দুই লেখায় লোককথার বইগুলোর প্রকাশনা-তথ্য আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য বিষয়ের লেখা পাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়; চাকমা লিপির ইতিহাস চাকমা লিপি (অঝাপাত) নিয়ে লেখায়।
উৎস অনুযায়ী লেখক নিজে (নোয়ারাম চাকমা, 1959; ইয়াংঙান ম্রো, 2023), রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, পার্বত্য জেলা পরিষদ, চাঙমা একাডেমি ও জাবারাং কল্যাণ সমিতি (ইউএনডিপির সহযোগিতায়), গির্জা, বিদ্যানন্দ ফাউন্ডেশন, ক্লাব ও সাহিত্য দল, রাঙামাটির ছোট প্রকাশনী, আর পাঠ্যবইয়ের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড।
জুমজার্নালের আর্কাইভ-লেখা অনুযায়ী 1940 সালে “মি. মিলার” “চাকমা প্রাইমার” প্রকাশ করেন। 1959 সালে নোয়ারাম চাকমা নিজে প্রকাশ করেন “চাকমার পথম শিক্ষা”, যার মলাটে লেখা “সংগ্রাহক ও প্রকাশক”। চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় বইটিকে চাকমা ভাষা লেখার প্রণালীর “প্রথম অবদান” বলেছিলেন।
“চাকমার পথম শিক্ষা” (1959) ছাপা হয়েছিল চট্টগ্রামের চন্দনপুরার “এম. রহমান ছিদ্দিকী ইছলামিয়া এণ্ড প্রিন্টিং প্রেস”-এ। বইটি বেরোয় পার্বত্য চট্টগ্রামের ডেপুটি কমিশনারের Memo No. 1900 (4) G, 30 এপ্রিল 1959-এর অনুমতি নিয়ে। লেখক ভূমিকায় জানিয়েছেন, আর্থিক অস্বচ্ছলতার কারণে বইটির আকার ছোট রাখতে হয়েছে।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন (দেশেবিদেশেতে পুনর্মুদ্রিত, 31 জানুয়ারি 2023) অনুযায়ী ইয়াংঙান ম্রোর “মিটচ্য তখক” প্রকাশিত হয়েছে বান্দরবানের বনতুলি প্রিন্টার্স থেকে, আর তিনি নিজের পকেটের পয়সা খরচ করে এটি প্রকাশ করেছেন। কোনো প্রতিষ্ঠানের অর্থায়নের কথা প্রতিবেদনে নেই।
বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা ট্রিবিউন ও গ্লোবাল ভয়েসেস জানায়, ইয়াংঙান ম্রোর লেখা “ততোং”-এর মোড়ক উন্মোচন হয় 17 ফেব্রুয়ারি 2022, বান্দরবানের উজানি পাড়ায় লেখকের বাসায়। প্রকাশকের নাম, ছাপাখানা বা খরচের উৎস — তিন প্রতিবেদনের কোনোটিতে নেই।
চাকমা-বাংলা অভিধান “চাঙমা ভাচ আলাম” আর প্রবাদ-সংকলন “চাঙমা দাগ কধা” (দুটিই মার্চ 2015, খাগড়াছড়ি)-র নামপত্রে লেখা “সহযোগিতায় সিএইচটিডিএফ-ইউএনডিপি”; প্রকাশক চাঙমা একাডেমি ও জাবারাং কল্যাণ সমিতি। সহযোগিতার অঙ্ক বা ছাপার সংখ্যা নামপত্রে নেই।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড চাকমা, মারমা, ককবরক, গারো ও সাদরি ভাষায় প্রাক-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণির বই ছাপে। বেশির ভাগ প্রতিবেদন শুরুর সাল বলে 2017, সুগত চাকমা লিখেছেন 2016। 2022 সালে বোর্ডের হিসাবে 312,000টি বই বিতরণ হয়। সাঁওতালি ও মণিপুরীর বই হরফের সমস্যায় স্থগিত।
দ্য ডেইলি স্টার বাংলার 1 জানুয়ারি 2026-এর প্রতিবেদনে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের হিসাব: 10 উপজেলার 27,801 জন চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা শিক্ষার্থী মাতৃভাষার বই পেয়েছে — প্রাক-প্রাথমিকে 13,134টি, প্রথম শ্রেণিতে 20,880টি, দ্বিতীয়তে 21,207টি, তৃতীয়তে 7,205টি বই। অভিভাবকেরা বলেছেন, পড়ানোর মতো যথেষ্ট শিক্ষক নেই।
বিডিনিউজের 21 ফেব্রুয়ারি 2024-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী চাকমা, মারমা, ককবরক, গারো (আচিক), কুড়মালি ও সাদরি — ছয় ভাষায়। পৃষ্ঠপোষক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট; প্রত্যেক অনুবাদককে কাজের জন্য এক লাখ টাকা দেওয়া হয়। চাকমায় অনুবাদ করেছেন আর্যমিত্র চাকমা, মারমায় নুথোয়াই মারমা, ককবরকে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা।
জির কুং সাহুর লেখা “বম ভাষা: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ” অনুযায়ী বম ভাষায় “চার্চ ভিত্তিক প্রকাশনাই প্রধান” — বাইবেল, ধর্মীয় সংগীত ও ব্যাখ্যার বই। বম সম্প্রদায় 1948 সালে প্রথাগত আইনের পুস্তিকা “Bawm Dan Bu” ছাপে, আর বর্ণমালার বই “বম বু বুল বু” বেরোয় 1952 সালে।
দ্য ডেইলি স্টারের 23 ফেব্রুয়ারি 2020-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী সে বছর আদিবাসী প্রকাশক ছিল দুটি — Mithun Raksham-এর Thokbirim আর Shadhan Maibam-এর Teuri। Thokbirim তখন পর্যন্ত 30টি বই প্রকাশ করেছিল, সে বছর 11টি। পরের বছরগুলোর হিসাব উৎসে পাওয়া যায়নি।
নিউ এজে Mong Sing Neo-র লেখা (21 ফেব্রুয়ারি 2026) অনুযায়ী 2004 সালে ম্রো বর্ণমালা সংরক্ষণ ও উন্নয়ন কমিটি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের আর্থিক সহায়তা পায়, যা দিয়ে প্রাথমিক স্তরের পাঠ্যবই প্রকাশ সম্ভব হয়। তার আগে 1994 সালে Menrum Mro নিজের তৈরি সফটওয়্যারে একটি ধর্মশিক্ষার বই প্রকাশ করেন।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 3 নভেম্বর 2026
প্রসঙ্গ:আদিবাসী ভাষা, চাকমা, বম, ম্রো
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।