Jumjournal Logo

ত্রিদিব রায়: 50তম চাকমা রাজা একাত্তরে কী করেছিলেন — নথিভিত্তিক বিবরণ

Last updated Nov 8th, 2026

0

রাঙামাটির রাজবাড়িতে চাকমা রাজ কার্যালয়ের সাদা দেয়ালে লাল রঙে চাকমা লিপির নামফলক, মাঝখানে গোলাকার রাজপ্রতীক; এই সার্কেলের 50তম রাজা ছিলেন ত্রিদিব রায়

ত্রিদিব রায় ছিলেন চাকমা সার্কেলের 50তম রাজা। 1971 সালে তিনি পাকিস্তানের পক্ষে ছিলেন: এপ্রিলে রাঙামাটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রবেশের আগে তিনি নিজে সেনা কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে “প্রতিরোধ হবে না” বলে নিশ্চয়তা দেন, নভেম্বরে ইয়াহিয়া খানের বিশেষ দূত হয়ে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া সফরে যান, আর ডিসেম্বরে যুদ্ধ শেষ হলে বাংলাদেশে না ফিরে পাকিস্তানে চলে যান। এই বিবরণের বড় অংশ তাঁর নিজের স্মৃতিকথা The Departed Melody (2003) থেকে; বাকিটা 1971 সালের সংবাদপত্র, পরের দশকগুলোর সরকারি তালিকা, আদালতের আদেশ ও দুই দেশের সংবাদমাধ্যম থেকে, প্রতিটি উৎসের নামসহ।

এই লেখা কোনো রায় দেয় না। একই মানুষকে পাকিস্তানের একটি গবেষণা-পত্রিকা দেখেছে “national hero” হিসেবে, বাংলাদেশের একটি দৈনিকের মতামত-কলাম লিখেছে তিনি ছিলেন “on the wrong side of history”, আর বাংলাদেশ সরকারের 2019 সালের একটি (পরে স্থগিত) তালিকায় তাঁর নাম এসেছে রাজাকারদের মধ্যে। কে কী বলেছে, কোন নথিতে কী আছে, আর কোথায় উৎসগুলো মেলে না, সেটুকুই এখানে সাজানো। চাকমা সার্কেল ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট পাওয়া যাবে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক লেখার সংকলনে।

এই লেখায় যা আছে

  1. ত্রিদিব রায় কে ছিলেন: এক নজরে তারিখ ও পদ
  2. জন্ম, পরিবার ও বড় হয়ে ওঠা
  3. কবে রাজা হলেন: অভিষেকের তারিখে তিন রকম তথ্য
  4. রাজত্বের প্রথম দুই দশক
  5. 1970 সালের নির্বাচন
  6. মার্চ–এপ্রিল 1971: রাঙামাটিতে কী ঘটছিল
  7. রাঙামাটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রবেশ
  8. মে থেকে অক্টোবর: সংবাদপত্র ও সাক্ষ্যে
  9. নভেম্বর 1971: বিশেষ দূতের সফর
  10. ডিসেম্বর 1971: কেন পাকিস্তানে গেলেন
  11. 1972: জাতিসংঘে মা ও ছেলে
  12. পাকিস্তানে মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত
  13. বাংলাদেশের সরকারি তালিকা ও আদালতে
  14. মৃত্যু, শোক ও শেষকৃত্য
  15. উত্তরাধিকার: রিজেন্ট থেকে দেবাশীষ রায়
  16. লেখক ত্রিদিব রায় ও তাঁর স্মৃতিকথা
  17. উৎসভেদে অমিল
  18. প্রশ্নোত্তর
  19. যা এখনো জানা যায়নি
  20. তথ্যসূত্র

ত্রিদিব রায় কে ছিলেন: এক নজরে তারিখ ও পদ

ত্রিদিব রায় (জন্ম 14 মে 1933, মৃত্যু 17 সেপ্টেম্বর 2012) চাকমা সার্কেলের 50তম রাজা, পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের দুইবারের সদস্য এবং 1970 সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হন। 1971 সালের পর তিনি পাকিস্তানে মন্ত্রী, বিশেষ দূত ও রাষ্ট্রদূত ছিলেন। নিচের ছকে প্রতিটি তারিখের উৎস দেওয়া হলো।

তারিখঘটনাউৎস
14 মে 1933জন্মস্মৃতিকথা, পৃ. 61 ও 90; ইংরেজি উইকিপিডিয়া
7 অক্টোবর 1951পিতা রাজা নলিনাক্ষ রায়ের মৃত্যুস্মৃতিকথা, পৃ. 60, 133; জুমজার্নাল আর্কাইভ
2 মার্চ 1953 / 2 মে 1953আনুষ্ঠানিক অভিষেক (তারিখে অমিল)স্মৃতিকথা, পৃ. 61, 133 / ডেইলি স্টার 2012
1962, 1965পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যস্মৃতিকথা, পৃ. 197; জুমজার্নাল আর্কাইভ
7 ডিসেম্বর 1970জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়স্মৃতিকথা, পৃ. 203; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস 2017
এপ্রিল 1971 (মাঝামাঝি)রাঙামাটিতে সেনা প্রবেশের আগে সেনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখাস্মৃতিকথা, পৃ. 219–221
9 নভেম্বর 1971রাঙামাটি ছাড়েন; আর ফেরেননিস্মৃতিকথা, পৃ. 222
24 ডিসেম্বর 1971ভুট্টোর মন্ত্রিসভায় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে শপথস্মৃতিকথা, পৃ. 242
সেপ্টেম্বর 1972জাতিসংঘে পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের নেতাস্মৃতিকথা, পৃ. 250; ডন 2012
1981–1995আর্জেন্টিনায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতদ্য নিউজ 2012; ইংরেজি উইকিপিডিয়া
17 সেপ্টেম্বর 2012ইসলামাবাদে মৃত্যুডন; ডেইলি স্টার

ত্রিদিব রায়ের জন্ম, পরিবার ও বড় হয়ে ওঠা

স্মৃতিকথায় ত্রিদিব রায় লিখেছেন, তাঁর জন্ম 14 মে 1933 (পৃ. 90)। এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের 2012 সালের শোক-সম্পাদকীয় ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া জন্মস্থান বলছে রাঙামাটির চাকমা রাজবাড়ি। পিতা রাজা নলিনাক্ষ রায়, মা বিনীতা রায়। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী বিনীতা রায় ছিলেন ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেনের নাতনি।

স্মৃতিকথার বংশতালিকার পাতায় (পৃ. 60) নলিনাক্ষ রায়ের জন্ম 6 জুন 1902 এবং মৃত্যু 7 অক্টোবর 1951 লেখা। ত্রিদিব রায় লিখেছেন, পিতার মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল 18, আর সেই থেকে “পরিবারের ও চাকমা জনগণের বংশগত দায়িত্ব” তাঁর কাঁধে আসে (পৃ. 129)। একই পাতায় ছয় ভাইবোনের নাম আছে: অমিতি, ত্রিদিব, সমিত, মৈত্রী, রাজশ্রী ও নন্দিত। আমাদের আর্কাইভের কুমার সমিত রায়ের জীবনী একই তালিকা দেয় এবং জানায়, সমিত রায়ের জন্ম 22 আগস্ট 1943। স্মৃতিকথাও এই তারিখ দেয় (পৃ. 103)।

পিতার মৃত্যুর পর পারিবারিক আলোচনা ছিল, তিনি কি এখনই অভিষিক্ত হবেন, নাকি আগে ইংল্যান্ডে আইন পড়া শেষ করবেন। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, কলকাতা হাইকোর্টের এক বিচারপতি আত্মীয়, পরিবারের বেশির ভাগ সদস্য, দেওয়ান ও হেডম্যানরা দেরি না করার পরামর্শ দেন, আর তিনি সেই পরামর্শ মেনে নেন (পৃ. 132–133)। 1952 সালে সরকার তাঁকে অবৈতনিক ম্যাজিস্ট্রেটও করে।

রানি আরতি রায়ের সঙ্গে তাঁর বিয়ে অভিষেকের বছরেই। আমাদের আর্কাইভের “পাদি সাহবাং” প্রবন্ধ জানায়, 1953 সালের এই বিয়েতে রাঙামাটির ডেপুটি কমিশনার লে. কর্নেল হিউম ঘটকালি করেছিলেন। আরতি রায় নিজেও বেইন বুননে দক্ষ ছিলেন; 1951 সালে রাঙামাটির এক প্রদর্শনীতে তিনি পুরস্কার পান।

ত্রিদিব রায় কবে চাকমা রাজা হন: অভিষেকের তারিখে তিন রকম তথ্য

ত্রিদিব রায় পিতার মৃত্যুর পর 1951 সাল থেকেই কার্যত রাজা, কিন্তু আনুষ্ঠানিক অভিষেকের তারিখ নিয়ে উৎসগুলো এক নয়। তাঁর নিজের স্মৃতিকথা বলে 2 মার্চ 1953; ডেইলি স্টার ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলে 2 মে 1953; আর রাজপরিবার সূত্রের বরাতে আমাদের আর্কাইভের একটি লেখা বলে 1954।

স্মৃতিকথায় দুই জায়গায় তারিখটি আছে। বংশতালিকার পাতায় লেখা “Accession (Installed as Chakma Raja) 2 March 1953” (পৃ. 61)। আর আনুষ্ঠানিক অভিষেক অধ্যায়ে তিনি লিখেছেন, পিতার মৃত্যু (7 অক্টোবর 1951) থেকে 2 মার্চ 1953 পর্যন্ত সময়টা ছিল “interregnum”, যেদিন তিনি “formally ascended the gadi and got married” (পৃ. 133)। একই পাতায় তিনি জানান, 1952 সালে সরকার তাঁর স্বীকৃতির আনুষ্ঠানিক আদেশ জারি করে।

আমাদের আর্কাইভে নিঝুম তালুকদারের লেখা চাকমাদের খাঁ, রায়, খীসা, দেওয়ান ও তালুকদার উপাধি জানায়, পুরাতন রাঙামাটি রাজপ্রাসাদে বিভাগীয় কমিশনার পীর আসানউদ্দীনের উপস্থিতিতে অভিষেক হয়, আর তিনি “প্রথম স্বাধীন পাকিস্তানের চাকমা রাজা”। অভিষেকের তারিখ ও তালিকার পুরো বিবরণ আছে আমাদের চাকমা রাজাদের নামের তালিকায়, যেখানে তালিকার ক্রমে তিনি 66 নম্বরে, সাল 1954।

প্রশ্নস্মৃতিকথা (2003)অন্য উৎস
পিতার মৃত্যু7 অক্টোবর 1951জুমজার্নাল আর্কাইভ: 7 অক্টোবর 1951; বাংলা উইকিপিডিয়া: 7 অক্টোবর 1952
আনুষ্ঠানিক অভিষেক2 মার্চ 1953ডেইলি স্টার 2012 ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া: 2 মে 1953; রাজপরিবার সূত্রে আর্কাইভ: 1954
সরকারি স্বীকৃতির আদেশ1952অন্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি

বাংলা উইকিপিডিয়ার নিবন্ধ নিজের ভেতরেই দুই তারিখ দেয়: সূচনায় 2 মে, জীবনী অংশে 2 মার্চ 1953।

রাজত্বের প্রথম দুই দশক: বৌদ্ধ পুনর্জাগরণ, কাপ্তাই বাঁধ ও আইনসভা

1953 থেকে 1970 পর্যন্ত ত্রিদিব রায়ের রাজত্বের তিনটি দিক উৎসে বারবার আসে: বার্মা থেকে অগ্রবংশ ভিক্ষুকে রাজগুরু হিসেবে আমন্ত্রণ, কাপ্তাই বাঁধে রাজধানী ডুবে যাওয়া, এবং প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হওয়া। প্রতিটি নিয়ে আমাদের আর্কাইভে আলাদা লেখা আছে; এখানে কেবল ত্রিদিব রায়ের অংশটুকু।

রাজগুরু অগ্রবংশ ও বৌদ্ধ পুনর্জাগরণ

আমাদের আর্কাইভের তঞ্চঙ্গ্যা জাতি বিষয়ক প্রবন্ধ জানায়, শ্রীমৎ অগ্রবংশ স্থবির 1957 সালে বার্মা থেকে ফিরলে “চাকমা রাজা মেজর ত্রিদিব রায় তাঁকে চাকমা রাজগুরু পদে 5 জানুয়ারি 1958 সালে” বরণ করেন। রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরোর জীবনী বলছে, ষষ্ঠ বৌদ্ধ সংগীতিতে (বার্মা, 1954–1956) দুজনের দেখা হয় এবং রাজা তাঁকে দেশে ফেরার আমন্ত্রণ জানান। আর্কাইভের “দৈংনাককের নব জন্ম: ভাগ্যের সন্তান তঞ্চঙ্গ্যাগণ” প্রবন্ধে উদ্ধৃত একটি ইংরেজি লেখা অনুযায়ী, রাজার আমন্ত্রণে অগ্রবংশ 1958 সালে রাঙামাটিতে আসেন, আর রাজগুরুর নেতৃত্বে 1959 সালে “পার্বত্য চট্টগ্রাম ভিক্ষু সমিতি” গড়ে ওঠে।

কাপ্তাই বাঁধ ও নতুন রাজবাড়ি

কাপ্তাই বাঁধে পুরনো রাঙামাটি ও রাজবাড়ি ডুবে যায়। স্মৃতিকথায় ত্রিদিব রায় লিখেছেন, নতুন রাজবাড়ি 1960 সালে নবগঠিত হ্রদের একটি দ্বীপে তৈরি হয় (পৃ. 214); দ্য ইনডিপেনডেন্টের একটি প্রতিবেদনের বরাতে আমাদের পুরনো রাঙামাটি শহরের ডুবে যাওয়া নিয়ে লেখাটি সাল বলছে 1962। বাঁধের পুরো ইতিহাস, ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ও প্রতিবাদ আছে কাপ্তাই বাঁধ নিয়ে আমাদের বিস্তারিত লেখায়।

বাঁধের সময় রাজার ভূমিকা নিয়ে আর্কাইভের দুটি লেখা ভিন্ন সুরে কথা বলে। চাকমা জাতির রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস লিখেছে, বাঁধ নির্মাণের সময় “রাজা ত্রিদিব রায় ছিলেন নির্বিকার”, আর ছাত্রনেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা প্রতিবাদ করে কারাবন্দি হন। বাঁধে বাস্তুচ্যুত করুণাময় চাকমা তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন, নতুন মৌজাগুলোর হেডম্যান পদ রাজা কিছুদিন নিজের হাতে রেখেছিলেন এবং পরে যাঁদের দেন, তাঁরা রাজার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। স্মৃতিকথায় ত্রিদিব রায় বাঁধটিকে “disastrous” বলেছেন; সূচিপত্রে অধ্যায়টির নামই “The disastrous Kaptai Dam”।

প্রাদেশিক পরিষদ ও সম্মানসূচক পদ

স্মৃতিকথা অনুযায়ী ত্রিদিব রায় 1962 সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচিত হন এবং 1965 সালে “বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়” দ্বিতীয় মেয়াদে (পৃ. 197)। আমাদের আর্কাইভের চাকমা জাতি নিবন্ধে 1965 সালের বিবরণ ভিন্ন: সেখানে প্রথমে বোমাং রাজা মংশৈ প্রু চৌধুরী নির্বাচিত হন, তিনি মন্ত্রী হলে শূন্য আসনে ত্রিদিব রায় নির্বাচিত হন।

স্মৃতিকথায় তিনি জানান, 1963 সালে ওয়াশিংটন ডিসির বিশ্ব খাদ্য কংগ্রেস থেকে ফেরার পর তাঁকে সম্মানসূচক মেজর পদে উন্নীত করা হয়; আগে তিনি সম্মানসূচক ক্যাপ্টেন ছিলেন (পৃ. 220)। 1964 সালে তিনি তিন মাস জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্য ছিলেন (পৃ. 225)। এই কারণেই আর্কাইভের অনেক লেখায় তাঁর নাম “মেজর রাজা ত্রিদিব রায়”।

1970 সালের নির্বাচনে ত্রিদিব রায় কীভাবে জিতলেন

7 ডিসেম্বর 1970 সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ত্রিদিব রায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জেতেন। পূর্ব পাকিস্তানের 162টি সাধারণ আসনের 160টি আওয়ামী লীগ পায়; বাকি দুটির একটি নূরুল আমিনের, অন্যটি ত্রিদিব রায়ের। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস ও তাঁর স্মৃতিকথা দুটোই বলে, পুরো পাকিস্তানে জাতীয় পরিষদে তিনিই একমাত্র অমুসলিম বিজয়ী ছিলেন।

তিন দলের প্রস্তাব, তিনটিই ফেরানো

স্মৃতিকথায় ত্রিদিব রায় লিখেছেন, মুসলিম লীগ নেতা ফজলুল কাদের চৌধুরী তাঁকে মুসলিম লীগের মনোনয়ন এবং নির্বাচনী খরচের জন্য প্রাথমিকভাবে এক লাখ রুপি দিতে চেয়েছিলেন; আওয়ামী লীগও যোগাযোগ করে; সব প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন, কারণ আগেই স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল (পৃ. 199)। মনোনয়নপত্র জমার সপ্তাহখানেক আগে শেখ মুজিবুর রহমানের টেলিগ্রাম পেয়ে তিনি ধানমন্ডিতে দেখা করেন। তাঁর বর্ণনায় তিনি বলেছিলেন, “We want a separate status for the Hill Tracts”, আর শেখ মুজিব উত্তরে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দেন (পৃ. 202)।

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের 2012 সালের শোক-সম্পাদকীয়ও লিখেছে, শেখ মুজিবের দেওয়া আওয়ামী লীগের টিকিট ফিরিয়ে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হন, এবং এতে আওয়ামী লীগ তাঁর ও চাকমাদের বিপক্ষে চলে যায়। স্মৃতিকথায় ত্রিদিব রায় জানান, এরপর আওয়ামী লীগ তাঁর বিরুদ্ধে চারু বিকাশ চাকমাকে প্রার্থী করে (পৃ. 203)।

ফলাফল ও প্রতীক

তাঁর প্রতীক ছিল হাতি। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, ব্যালটের উল্টো পিঠে সিল দেওয়ায় তাঁর দুই হাজারের বেশি ভোট বাতিল হয়, আর বাকি দুই প্রার্থীর (আওয়ামী লীগের চারু বিকাশ চাকমা ও বোমাং রাজা) মিলিত ভোট তাঁর চেয়ে বিশ হাজার কম ছিল (পৃ. 203–204)। আসনভিত্তিক আনুষ্ঠানিক ভোটসংখ্যা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

প্রাদেশিক পরিষদের দুটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে উত্তরে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ও দক্ষিণে অং শৈ প্রু চৌধুরী জেতেন। স্মৃতিকথা অনুযায়ী দক্ষিণে ত্রিদিব রায় চাকমা প্রার্থীর বদলে অং শৈ প্রু চৌধুরীকে সমর্থন করেছিলেন, কারণ ভোট ভাগ হলে আওয়ামী লীগ প্রার্থী জিতবেন বলে তাঁর ধারণা ছিল (পৃ. 200–202)। উত্তরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন তাঁর কাকা কুমার কোকনদাক্ষ রায়; সেখানে তাঁরা “নিরপেক্ষ” থাকেন (পৃ. 203)।

ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্যছকে তাঁকে “Member of the East Pakistan Legislative Assembly”, আসন PE-150, 17 ডিসেম্বর 1970 থেকে 17 এপ্রিল 1971 দেখানো হয়েছে। তাঁর স্মৃতিকথা, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ডেইলি স্টার ও 1971 সালের মর্নিং নিউজ সবাই তাঁকে জাতীয় পরিষদের নির্বাচিত সদস্য (MNA) বলে।

নির্বাচনের পর তিনি সমর্থনের জন্য ভুট্টো ও ইয়াহিয়া খানের দিকে তাকান। স্মৃতিকথায় তাঁর ব্যাখ্যা: শেখ মুজিব শুধু “উন্নয়ন” দিতে চেয়েছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য কোনো সাংবিধানিক রক্ষাকবচ বা বিশেষ মর্যাদা নয় (পৃ. 205)। 4 জানুয়ারি 1971 আবার দেখা করলে শেখ মুজিব তাঁকে ড. কামাল হোসেনের কাছে পাঠান; তাঁর ভাষায় সাড়া ছিল “polite but lukewarm” (পৃ. 206)।

মার্চ–এপ্রিল 1971: ত্রিদিব রায় তখন কোথায়, রাঙামাটিতে কী ঘটছিল

1 মার্চ 1971 জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণার সময় ত্রিদিব রায় ঢাকায় ছিলেন। স্মৃতিকথা অনুযায়ী 8 মার্চ সন্ধ্যার ট্রেনে তিনি চট্টগ্রাম রওনা হন এবং 9 মার্চ রাঙামাটি পৌঁছান (পৃ. 212)। 25 মার্চের পর থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি রাঙামাটিতে রাজবাড়ির দ্বীপে ছিলেন।

এই সপ্তাহগুলোর বিবরণ তাঁর বইয়ের “Excesses committed” অধ্যায়ে (পৃ. 214–217)। সেখানে তিনি দুই দিকের সহিংসতার কথাই লিখেছেন। একদিকে, চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী ঢোকার পর, এলাকার লোকজনের বরাতে, তাঁর এক কাকা ও দুই কিশোর চাচাতো ভাইকে কয়েকজন সৈন্য ধরে নিয়ে যায়, তাঁরা আর ফেরেননি; তিনি একে বলেছেন “the grossest human rights violations attributed to some members of the Pakistani military” (পৃ. 216)। অন্যদিকে, তাঁর বর্ণনায় 26 মার্চ থেকে রাঙামাটিতে আওয়ামী লীগ কর্মী, বিদ্রোহী পুলিশ ও ইপিআর সদস্যরা অবাঙালিদের আটক ও হত্যা করে (পৃ. 216–217)।

তিনি লিখেছেন, রাজবাড়ির দ্বীপে আত্মীয়রা আশ্রয় নেন, পাশের মৌজাগুলো থেকে রাতে পাহারাদার আনা হয়, আর দুই দফায় তিনি বন্দুক জমা দিতে অস্বীকার করেন (পৃ. 217)। 12 থেকে 14 এপ্রিল বিজু উৎসব হয়নি; স্মৃতিকথায় লেখা, “this year, for us there were no festivities” (পৃ. 218)। বাংলা উইকিপিডিয়াও প্রিয়জিত দেবসরকারের বইয়ের বরাতে বিজু না হওয়ার কথা বলে।

রাজপরিবারের ভেতরেই অবস্থান এক ছিল না। আর্কাইভের চাকমা জাতি নিবন্ধ জানায়, আওয়ামী লীগ প্রার্থী কোকনদাক্ষ রায় “মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে গিয়েছিলেন”। আর্কাইভের “মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী” প্রবন্ধ লিখেছে, রাজপরিবারের সদস্য কে. কে. রায় “মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে সর্বাত্মক সহযোগিতা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন”। স্মৃতিকথায় ত্রিদিব রায় লিখেছেন, ত্রিপুরায় গেলে তাঁর কাকাকে সেখানে আটক করা হয় (পৃ. 218); এই দাবির সমর্থন অন্য উৎসে পাওয়া যায়নি।

রাঙামাটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রবেশে ত্রিদিব রায়ের ভূমিকা কী ছিল

এপ্রিলের মাঝামাঝি পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাঙামাটিতে ঢোকার আগে ত্রিদিব রায় নিজে রাউজান, নতুনপাড়া ও চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে দেখা করে নিশ্চয়তা দেন যে শহরে প্রতিরোধ হবে না। একথা তাঁর স্মৃতিকথা নিজেই বলে, এবং IWGIA-র প্রকাশিত একটি আদিবাসী সাক্ষ্যও প্রায় একই ঘটনা বর্ণনা করে।

স্মৃতিকথার বিবরণ

“Raja’s Protection” অধ্যায়ে (পৃ. 218–221) ত্রিদিব রায় লিখেছেন, কয়েকজন মুসলিম লীগ নেতা তাঁর কাছে আসেন। তাঁদের একজন রাউজানে সেনাবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন; সেনাবাহিনী জানায়, রাজা ব্যক্তিগতভাবে নিশ্চয়তা না দিলে তারা “প্রতিরোধ হবে না” কথায় বিশ্বাস করবে না। তিনি নিজে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

যাওয়ার আগে তিনি রিজার্ভ বাজার ও তবলছড়ি বাজারে জনসভায় কথা বলেন। তাঁর বর্ণনায়, তবলছড়িতে “hundreds of people shouted pro-Pakistan slogans” এবং তাঁকে সেনাবাহিনীর কাছে যেতে অনুরোধ করে। তিনি সতর্ক করেন, সেনাবাহিনীর দিকে গুলি হলে তাঁর কথা ভঙ্গ হবে (পৃ. 219)। পরদিন ভোরে, তাঁর অনুমানে “16 April perhaps”, দুটি জিপ ও একটি ল্যান্ডরোভারে তিনি রাউজান যান, সেখান থেকে নতুনপাড়ায় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারে, তারপর চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সামরিক আইন সদর দপ্তরে। সেখানে ঢাকা থেকে আসা এক জেনারেল রাজি হন এবং কাপ্তাইয়ে লে. কর্নেল জেড এ খানের কাছে চিঠি দিয়ে একজন নৌ কর্মকর্তাকে পাঠান (পৃ. 219–220)। সেদিন সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী লঞ্চ ও স্পিডবোটে রাঙামাটিতে নামে (পৃ. 221)।

এর পরের সময় নিয়ে তাঁর দাবি: পার্বত্য চট্টগ্রামে “by and large” বেসামরিক মানুষের ওপর হয়রানি হয়নি, তবে যারা অস্ত্র ধরেছিল বা হত্যায় জড়িত ছিল, তাদের “reportedly either summarily executed” করা হয় বা চট্টগ্রামে সেনা সদর দপ্তরে পাঠানো হয় (পৃ. 221)। অধ্যায়ের শিরোনাম এসেছে তাঁর এই দাবি থেকে যে সমতল থেকে আসা বাঙালিরা রাজার আশ্রয়ে নিরাপদ বোধ করত।

একটি আদিবাসী সাক্ষ্য: এ.বি. চাকমা

IWGIA-র ডকুমেন্ট 51 (Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, সম্পাদক ভলফগাং মে) এ ছদ্মনামে প্রকাশিত এ.বি. চাকমার স্মৃতিচারণ আমাদের আর্কাইভে অনূদিত হয়েছে: নির্বাসন থেকে ফিরে দেখা: এক চাকমা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা। লেখক জানান, স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতারা ভারতে চলে যাওয়ার পর রাজা একটি সভা ডাকেন, যেখানে “আদিবাসী ও অ-আদিবাসী সকলকে” আমন্ত্রণ জানানো হয়, এবং সেখানে সেনাবাহিনীকে শহরে ঢোকার আহ্বান জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। তাঁর ভাষায়, রাজা ও অন্য সম্প্রদায়ের নেতারা গিয়ে সেনাবাহিনীকে “সাদরে অভ্যর্থনা জানায়”; সেনাবাহিনী “অনেককে হত্যা করে”, তবে আদিবাসী ও আওয়ামী লীগ সমর্থক নন এমন মুসলিমদের ক্ষতি করেনি।

একই লেখক মনে করেন, রাজার “ভূমিকার জন্য” বেসামরিক জনগণ সেনা আক্রমণ থেকে রক্ষা পেয়েছিল; এ কথা তিনি শুনেছিলেন নিজের মা-বাবা ও আত্মীয়দের কাছে। লেখার শেষে তিনি লিখেছেন, রাজার সেনাবাহিনীকে আমন্ত্রণ জানানোর ঘটনাকে পরে আদিবাসীদের “বাঙালি মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধাচরণের একটা বড় প্রমাণ” হিসেবে দাঁড় করানো হয়, এবং তা পাহাড়িদের ওপর সহিংসতা ও উচ্ছেদের অজুহাত হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

অন্য উৎসে একই সময়

বাংলা উইকিপিডিয়া প্রিয়জিত দেবসরকারের বই The Last Raja of West Pakistan-এর বাংলা অনুবাদের বরাতে লিখেছে, ত্রিদিব রায় পূর্ব পাকিস্তানের শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন এবং “মে মাসে” রিজার্ভ বাজার ও তবলছড়ি বাজারে জনসভায় “পাকিস্তান জিন্দাবাদ” স্লোগানে আনুগত্য প্রকাশ করেন। স্মৃতিকথা একই দুই বাজারের সভাকে সেনা প্রবেশের আগের দিন, এপ্রিলের মাঝামাঝি রাখে।

পাকিস্তান স্টাডি সেন্টারের জার্নাল Pakistan Perspectives-এ 2015 সালের একটি স্মরণ-নিবন্ধের সারাংশে বলা হয়েছে, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের “13 tribes”-কে পাকিস্তানের প্রতি অনুগত থাকতে আহ্বান জানান, আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে তাঁর “on-the-ground support” ব্রিগেডিয়ার জেড এ খানের বই The Way It Was-এ লিপিবদ্ধ আছে।

মে থেকে অক্টোবর 1971: সংবাদপত্র ও সাক্ষ্যে ত্রিদিব রায়

এই মাসগুলোতে ত্রিদিব রায়ের উপস্থিতির একটি সমসাময়িক নথি হলো 11 জুলাই 1971 তারিখের ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজ। পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল এ এ কে নিয়াজির পার্বত্য চট্টগ্রাম সফরের আইএসপিআর বিজ্ঞপ্তিভিত্তিক খবরে তাঁর নাম আছে।

প্রথম আলোর সংরক্ষিত প্রতিলিপি অনুযায়ী খবরটি বলছে, নিয়াজি হেলিকপ্টারে দোহাজারী, কাপ্তাই ও রাঙামাটি যান। রাঙামাটিতে তাঁকে জানানো হয়, উপজাতীয় লোকজন “miscreants” খুঁজে বের করতে সাহায্য করছে এবং মৌজা হেডম্যানরা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন। তারপর লেখা: “Raja Tridiv Roy, Chakma chief and MNA elect from Chittagong Hill Tracts, was also present during the visit.” খবরে তাঁর কোনো বক্তব্য উদ্ধৃত হয়নি।

এ.বি. চাকমার একই স্মৃতিচারণে আরেকটি ঘটনা আছে। মুক্তিবাহিনীর ছাড়পত্র সঙ্গে নিয়ে চলার সময় এক পাকিস্তানি সৈন্য তাঁকে থামালে একজন স্থানীয় চেয়ারম্যান সৈন্যকে বলেন, লেখক চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সম্প্রদায়ের লোক, আর “ত্রিদিব রায় পাকিস্তানী বাহিনীকে সহায়তা করে আসছেন”। এরপর সৈন্য অনিচ্ছায় তাঁকে ছেড়ে দেয়।

এই সময়ের সহিংসতা নিয়ে ত্রিদিব রায় পরে কলম্বোয় সাংবাদিকদের যা বলেছিলেন, স্মৃতিকথায় তা আছে: “violence was committed both by the Army and the Mukti Bahini” (পৃ. 225)। উদাহরণ হিসেবে তিনি লিখেছেন, 9 জুন 1971 কাপ্তাই হ্রদে একটি যাত্রীবাহী লঞ্চে মুক্তিবাহিনীর হামলায় প্রায় 40 জন যাত্রী নিহত হন, যাঁদের মধ্যে তাঁর এক আত্মীয়ের 11 বছরের মেয়ে ছিল। এ ঘটনার অন্য কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।

ডেইলি স্টারে 25 সেপ্টেম্বর 2012 প্রকাশিত সৈয়দ বদরুল আহসানের মতামত-কলাম “Story of a lost king” স্মৃতিকথাটি পড়ে লিখেছে, বইয়ে গণহত্যার প্রসঙ্গ প্রায় নেই, আর একাত্তরের শুরুর দিকে মুক্তিবাহিনীর হাতে চাকমা হত্যার যে বর্ণনা আছে তা “based on hearsay”। কলামিস্টের মতে, পুরো 1971 জুড়ে ত্রিদিব রায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিন্দা করার কারণ খুঁজে পাননি।

নভেম্বর 1971: বিশেষ দূত হিসেবে ত্রিদিব রায় কোথায় কোথায় গেলেন

9 নভেম্বর 1971 ত্রিদিব রায় রাঙামাটি ছাড়েন; এরপর আর কখনো বাংলাদেশে ফেরেননি। ঢাকা থেকে করাচি গিয়ে তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করেন এবং “Special Envoy, Ambassador Extraordinary and Plenipotentiary” হিসেবে শ্রীলঙ্কা, বার্মা ও থাইল্যান্ড সফরে যান। যুদ্ধ শুরুর দিন, 3 ডিসেম্বর, তিনি ব্যাংককে ছিলেন।

রাঙামাটি থেকে রাওয়ালপিন্ডি

“Called to Rawalpindi” অধ্যায় শুরু হয় এই বাক্যে: “I left home on 9 November 1971.” (পৃ. 222)। তিনি লিখেছেন, তিন সপ্তাহের সফর শেষে বাড়ি ফেরার কথা ছিল, এবং নিরাপত্তার কারণে সফরের কথা কয়েকজন ছাড়া কেউ জানত না। 11 নভেম্বর রাতে ঢাকা থেকে করাচির বিমান ছাড়ে, 12 নভেম্বর সকালে পৌঁছায় (পৃ. 223)।

পশ্চিম পাকিস্তানে তিনি ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করেন। স্মৃতিকথা অনুযায়ী ইয়াহিয়া রাজি হন যে আসন্ন সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রাম হবে কেন্দ্রশাসিত “Federally Administered Tribal Area”; আইনমন্ত্রী বিচারপতি কর্নেলিয়াস প্রথমে রাজি না থাকলেও রাষ্ট্রপতির নির্দেশে মেনে নেন (পৃ. 224)। ত্রিদিব রায় লিখেছেন, এটি ছিল “a longheld dream come true”। ডেইলি স্টারের 2012 সালের কলামও লিখেছে, ইয়াহিয়া খান তাঁকে স্বায়ত্তশাসনের আশ্বাস দিয়েছিলেন।

কলম্বো, রেঙ্গুন, ব্যাংকক

স্মৃতিকথার সফরসূচি (পৃ. 225–228):

  1. 25 নভেম্বর: পররাষ্ট্র দপ্তরের একজন পরিচালককে নিয়ে করাচি থেকে কলম্বো। বৌদ্ধ নেতা ও রাজনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক, সংবাদ সম্মেলন, ক্যান্ডির দন্ত মন্দির দর্শন।
  2. 27 নভেম্বর: রাষ্ট্রদূত আলতাফ শেখসহ প্রধানমন্ত্রী সিরিমাভো বন্দরনায়েকের সঙ্গে সাক্ষাৎ।
  3. 29 নভেম্বর: রেঙ্গুন।
  4. 1 ডিসেম্বর: কাঠমান্ডুর বিমান ধরতে না পেরে ব্যাংকক।
  5. 2–3 ডিসেম্বর: ব্যাংকক পোস্টকে সাক্ষাৎকার, যা 3 ডিসেম্বর প্রথম পাতায় ছাপা হয়। তাতে তিনি বলেন, ভারত পূর্ব পাকিস্তানকে “an independent satellite state” বানাতে চাইছে।
  6. ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ: থাই সরকারপ্রধান ফিল্ড মার্শাল কিত্তিকাচন ও রাজা ভূমিবলের সঙ্গে সাক্ষাৎ।

বাংলা উইকিপিডিয়া (দেবসরকারের বইয়ের বরাতে) একই সফরের কথা বলে, তবে শুরুর বিবরণ আলাদা: সেখানে 9 নভেম্বর তিনি প্রথমে থাইল্যান্ড যান, ব্যাংককের পাকিস্তান দূতাবাসের মাধ্যমে জরুরি তলব পেয়ে চট্টগ্রাম-ঢাকা হয়ে 11 নভেম্বর করাচি রওনা হন, এবং ইয়াহিয়া খান পশ্চিম পাকিস্তানে পৌঁছানোর পর তাঁকে বিশেষ দূত নিয়োগ দেন। সেখানে বলা হয়েছে, শ্রীলঙ্কা তখন পশ্চিম থেকে পূর্ব পাকিস্তানে বিমান চলাচলের ট্রানজিট ছিল এবং সেখানে বিমানের জ্বালানি সরবরাহ চালু রাখা ছিল সফরের মূল লক্ষ্য।

“পালিয়ে যাওয়া” প্রশ্নে দুই রকম বিবরণ

2010 সালে ইসলামাবাদে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক প্রতিবেদককে ত্রিদিব রায় বলেন, প্রচলিত ধারণার বিপরীতে তিনি যুদ্ধের পরে পশ্চিম পাকিস্তানে “ran away” করেননি; যুদ্ধ শুরুর অনেক আগে, 11 নভেম্বর, যুদ্ধ ঠেকাতে সমর্থন জোগাড়ের জন্য ইয়াহিয়া খানের বিশেষ দূত হয়ে তিনি রওনা হন। এ.বি. চাকমার স্মৃতিচারণও বলে, শেষ দিকে কর্তৃপক্ষ তাঁকে বৌদ্ধ দেশগুলো থেকে সমর্থন আদায়ের দায়িত্ব দিয়ে বিদেশে পাঠায় এবং বিজয়ের সময় তিনি বিদেশে ছিলেন।

বাংলাদেশের আদালতে 2017 সালের রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী বিডিনিউজ২৪-কে বলেন, তিনি “fled Bangladesh and went to Pakistan just after the war ended”। আর্কাইভের “চাকমা জাতির রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস” লিখেছে, তিনি “1971 সালের নভেম্বর মাসে পাকিস্তান চলে যান”।

ডিসেম্বর 1971: যুদ্ধ শেষে ত্রিদিব রায় কেন পাকিস্তানে গেলেন

16 ডিসেম্বরের পর ত্রিদিব রায় ব্যাংকক থেকে তেহরান ও কাবুল হয়ে রাওয়ালপিন্ডি যান এবং 24 ডিসেম্বর ভুট্টোর মন্ত্রিসভায় শপথ নেন। নিজের ব্যাখ্যায় কারণ তিনটি: পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ মর্যাদা আওয়ামী লীগ সরকারের কাছে পাওয়া যাবে না, দলবদল তাঁর নীতিবিরুদ্ধ, আর বাংলাদেশে থাকলে তাঁকে সরকারের অনুগত হতে হবে বা বিপদে পড়তে হবে।

ব্যাংককের টেলিফোন

স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, ব্যাংককে থাকার সময় বাংলাদেশের পক্ষে যোগ দেওয়া এক সাবেক পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত, যিনি 1962 সালে তাঁর সঙ্গে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন, ফোন করে তাঁকে দলত্যাগের আহ্বান জানান এবং “attractive inducements” দেন; তিনি রাজি হননি (পৃ. 229–230)। এরপর তিনি নিজের ভাবনা লিখেছেন: পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য সদ্য আদায় করা বিশেষ মর্যাদা পাকিস্তান ভাঙলে অর্থহীন হয়ে যায়; শেখ মুজিবের সরকার স্বায়ত্তশাসন দেবে না বলে তাঁর ধারণা; ব্যক্তিগতভাবে মন্ত্রিত্ব বা রাষ্ট্রদূতের পদ পাওয়া সম্ভব হলেও তিনি “a henchman of Mujib’s” হয়ে পাহাড়ের কাজ করতে পারবেন কি না (পৃ. 230–231)। তাঁর সিদ্ধান্তের বাক্য: “I was a Pakistani citizen owing my allegiance to Pakistan… I could not let the side down. It was not cricket.” (পৃ. 231)।

এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের 2012 সালের সম্পাদকীয় তাঁর ভয়ের কথা লিখেছে: নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়েও নতুন দেশে তাঁকে কারাগারে যেতে বা “exterminated” হতে হতে পারত, অথবা ব্যক্তিগত লাভের জন্য নীতি বিসর্জন দিতে হতো। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের 2010 সালের সাক্ষাৎকারে তাঁর উদ্ধৃতি: “If I had been there and not toed the government line, I would have either been eliminated, put behind bars or silenced”। একই সাক্ষাৎকারে তাঁর আরেকটি কারণ: পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ বাঙালি নন, আর তখনকার পূর্ব পাকিস্তান সরকার অঞ্চলটিকে “exploiting” করছিল।

তেহরান, কাবুল, রাওয়ালপিন্ডি

স্মৃতিকথা অনুযায়ী 20 ডিসেম্বর সকালে তিনি ব্যাংকক থেকে তেহরান পৌঁছান। সেদিন সন্ধ্যায় সেখানকার এক পাকিস্তানি কূটনীতিকের বাসায় বসে তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে ভুট্টোর প্রথম বেতার ভাষণ শোনেন (পৃ. 239–240)। স্মৃতিকথায় উদ্ধৃত ভাষণের অংশে ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানের “two elected leaders”, নূরুল আমিন ও “the Chakma Chief, who is out of the country”, এর কথা বলেন এবং তাঁকে অবিলম্বে পাকিস্তানে ফিরতে বলেন (পৃ. 241)।

21 ডিসেম্বর কাবুল, তারপর খাইবার গিরিপথ হয়ে পেশোয়ার ও রাওয়ালপিন্ডি। 23 ডিসেম্বর সকাল সাড়ে এগারোটায় ভুট্টো তাঁকে মন্ত্রিসভায় যোগ দিতে বলেন, আর 24 ডিসেম্বর রাত তিনটায় বারো সদস্যের মন্ত্রিসভা শপথ নেয়; তিনি পান সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় (পৃ. 242)। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন বলে, 22 ডিসেম্বর ব্যাংকক থেকেই তিনি বাংলাদেশের বদলে পাকিস্তানে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন।

তাঁর পরিবার, মা, স্ত্রী, ছেলেমেয়ে, রাঙামাটিতেই থেকে যান (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, ভারতীয় সেনাবাহিনী রাঙামাটিতে ঢুকে তাঁর দুই ভাইকে আটক করে, যাকে পরে “protective custody” বলা হয় (পৃ. 254)।

1972: জাতিসংঘে ত্রিদিব রায় ও তাঁর মা বিনীতা রায়

সেপ্টেম্বর 1972-এ জাতিসংঘের 27তম সাধারণ পরিষদ অধিবেশনে ত্রিদিব রায় পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের নেতা ছিলেন, যে অধিবেশনে বাংলাদেশের সদস্যপদের প্রশ্ন ছিল। ডনের 2012 সালের খবর অনুযায়ী, শেখ মুজিবুর রহমান পাল্টা যে প্রতিনিধিদল পাঠান, তার নেতা ছিলেন ত্রিদিব রায়ের মা।

স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, 17 সেপ্টেম্বর 1972 নিউইয়র্কে পাকিস্তান মিশনে প্রস্তুতি বৈঠক হয়, আর পরদিন 21 সদস্যের পূর্ণ প্রতিনিধিদলের প্রথম বৈঠক, যাকে তিনি “the largest ever Pakistan delegation to the United Nations” বলেছেন (পৃ. 250)। তিনি এমন প্রতিনিধিদলের প্রথম অমুসলিম প্রধান বলে দাবি করেছেন (পৃ. 256)। নিরাপত্তা পরিষদে চীনের ভেটোতে বাংলাদেশের সদস্যপদ তখন আটকে যায়; স্মৃতিকথা ও ডেইলি স্টারের কলাম দুটোই এর উল্লেখ করে।

মায়ের সঙ্গে দেখা হওয়ার বিবরণ স্মৃতিকথায় আছে। এক বন্ধুর বাসায় থাকার সময় মা ফোন করে বলেন, “I have come to take you back” (পৃ. 252)। পরদিন তিনি নিউইয়র্কের হোটেলে আসেন, সঙ্গে ছিলেন এক কাকা, আর পরিবারের চিঠি। ত্রিদিব রায়ের ভাষ্যে, শেখ মুজিব ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সামাদ তাঁর মাকে পাঠিয়েছিলেন তাঁকে ফিরিয়ে নিতে। এরপর এক বাংলাদেশি কূটনীতিক মন্ত্রিত্ব বা রাষ্ট্রদূতের পদের প্রস্তাব দেন, আর এক ভারতীয় সাংসদ দ্বিতীয় সাক্ষাতে বলেন, তিনি না ফিরলে বাংলাদেশ সরকার তাঁর পরিবারকে বিচারের মুখে ফেলতে পারে (পৃ. 253–254)। তিনি ফেরেননি।

ডেইলি স্টারের কলাম ও পাকিস্তানের Pakistan Perspectives নিবন্ধ দুটোই লিখেছে, ফিরে আসার পর ভুট্টো প্রটোকল ভেঙে তাঁকে বীরের অভ্যর্থনা দেন। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস একই কথা বলে।

পাকিস্তানে মন্ত্রী, দূত ও রাষ্ট্রদূত: ত্রিদিব রায়ের পরের চার দশক

1971 থেকে 1974 পর্যন্ত ত্রিদিব রায় ভুট্টোর মন্ত্রিসভায় সংখ্যালঘু বিষয়ক এবং পরে পর্যটনেরও মন্ত্রী ছিলেন। জেনারেল জিয়াউল হক তাঁকে 1981 সালে আর্জেন্টিনায় রাষ্ট্রদূত করে পাঠান; সেখানে তিনি প্রায় 15 বছর ছিলেন। 1996 সালে দেশে ফিরে তিনি আজীবন ফেডারেল মন্ত্রীর মর্যাদা পান এবং পাকিস্তান বৌদ্ধ সমিতির প্রধান হন।

মন্ত্রিত্ব, 1971–1974

স্মৃতিকথা অনুযায়ী 24 ডিসেম্বর 1971 তিনি সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী হন, আর 20 জানুয়ারি 1972 তাঁর প্রস্তাবে আলাদা পর্যটন বিভাগ তৈরি হয়ে তাঁর দপ্তরের সঙ্গে যুক্ত হয় (পৃ. 242–243)। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্যছকে “Minister of Minorities Affairs & Tourism” পদের মেয়াদ 14 আগস্ট 1973 থেকে 22 অক্টোবর 1974। স্মৃতিকথায় তিনি লিখেছেন, 1974 সালের অক্টোবরের শেষে লন্ডন থেকে মাস্কাটে পৌঁছে তিনি পাকিস্তানি কূটনীতিকের কাছে খবর পান যে মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনে তিনি বাদ পড়েছেন (পৃ. 294)। ডেইলি স্টারের কলাম লিখেছে, ভুট্টো তাঁকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে বিশেষ দূতের নতুন পদে বসান।

ইংরেজি উইকিপিডিয়া ও এক্সপ্রেস ট্রিবিউন জানায়, ভুট্টো তাঁকে রাষ্ট্রপতির পদ দিতে চেয়েছিলেন; 1973 সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে মুসলিম হতে হয়, আর তিনি ধর্ম বদলাতে রাজি ছিলেন না। পদটিকে তিনি “gilded cage” বলেছিলেন। পাকিস্তান পিপলস পার্টির সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে উৎস দুই রকম: উইকিপিডিয়ার তথ্যছকে তাঁর দল PPP, আর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস লিখেছে তিনি “never joined the Pakistan People’s Party, or any other party in Pakistan”।

রাষ্ট্রদূত, 1981–1996

ইসলামাবাদে আর্জেন্টিনার রাষ্ট্রদূত দ্য নিউজ-এ প্রকাশিত শোকবার্তায় লিখেছেন, ত্রিদিব রায় ছিলেন আর্জেন্টিনায় পাকিস্তানের “longest serving ambassador” (1981 থেকে 1995), সঙ্গে চিলি, পেরু, ইকুয়েডর ও উরুগুয়ের অনাবাসী রাষ্ট্রদূত। ডন লিখেছে পাঁচটি দেশে রাষ্ট্রদূত এবং শ্রীলঙ্কায় হাইকমিশনার। এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের ভাষায় 1977 সালে ভুট্টো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর 1981 সালে তাঁকে “carted off” করা হয় দূরের আর্জেন্টিনায়। বাংলা উইকিপিডিয়া আর্জেন্টিনার মেয়াদ লিখেছে 1981–1994, এবং 1995 সালে শ্রীলঙ্কায় হাইকমিশনার নিয়োগ।

আজীবন মন্ত্রী ও বৌদ্ধ সমিতি

ডন লিখেছে, যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষে থাকা ও পাকিস্তানে বসবাসের সিদ্ধান্তের “result” হিসেবে সরকার তাঁকে আজীবন ফেডারেল মন্ত্রী ঘোষণা করে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ভাষ্যে, 1996 সালে ফেরার পর তাঁকে আজীবন ফেডারেল মন্ত্রী করা হয়, তবে শেষ পর্যন্ত কোনো দপ্তর ছিল না। পিটিআই-এর 2012 সালের খবর বলছে, 2008 সালের নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তিনি সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন; এই তথ্য অন্য কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী 1996 থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তিনি পাকিস্তান বৌদ্ধ সমিতির প্রধান ছিলেন; উইকিপিডিয়া জানায়, 2005 সালে শ্রীলঙ্কা সরকার তাঁকে “Sri Lanka Ranjana” সম্মাননা দেয়। ডেইলি স্টারের কলাম লিখেছে, শেষ জীবনে তিনি পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের অবহেলার অভিযোগ করতেন। ইসলামাবাদের E-7 সেক্টরে তাঁর বাড়ির ফটকে লেখা ছিল “Chakma House” (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)।

বাংলাদেশের সরকারি তালিকা ও আদালতে ত্রিদিব রায়

বাংলাদেশে ত্রিদিব রায়ের নাম তিনটি সরকারি প্রেক্ষাপটে এসেছে: 1972 সালের দালাল আইন প্রসঙ্গে (একটি দ্বিতীয় পর্যায়ের উৎসে), 2019 সালে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত রাজাকার তালিকায়, এবং 2017 সালে হাইকোর্টের একটি অন্তর্বর্তী আদেশে।

1972: দালাল আইন

বাংলা উইকিপিডিয়া দেবসরকারের বইয়ের বরাতে লিখেছে, “1972 সালে বাংলাদেশে প্রণীত দালাল আইনে ত্রিদিব রায়ের নাম ছিল।” কোন তালিকা বা মামলায়, তার নথি পাওয়া যায়নি। ডেইলি স্টারের 2019 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ওই আইনে 37,000 জন গ্রেপ্তার হন, প্রায় 26,000 জন সাধারণ ক্ষমার আওতায় মুক্তি পান, আর 31 ডিসেম্বর 1975 আইনটি বাতিল হয়।

2019: রাজাকার তালিকা

15 ডিসেম্বর 2019 মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় 10,789 জনের একটি তালিকা প্রকাশ করে। ডেইলি স্টার লিখেছে, তালিকায় “the then Chakma Circle chief Raja Tridiv Roy” আছেন। মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, নামগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত নথি থেকে “without making any changes” নেওয়া। তালিকায় একই নাম একাধিকবার আসা ও বিশৃঙ্খলার অভিযোগ ওঠে।

এশিয়া টাইমস জানায়, কয়েক দিনের মধ্যে, পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের নাম তালিকায় আসার সমালোচনার মুখে, সরকার তালিকাটি স্থগিত করে; মন্ত্রী ভুল স্বীকার করে পরের বছর 26 মার্চ নতুন তালিকা প্রকাশের কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন বলেন, তাঁর মন্ত্রণালয় এমন কোনো তালিকা দেয়নি। সংশোধিত তালিকা প্রকাশ হয়েছে কি না এবং তাতে ত্রিদিব রায়ের নাম আছে কি না, তা জানা যায়নি।

2017: হাইকোর্টের আদেশ

22 মে 2017 বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর হাইকোর্ট বেঞ্চ দুই মুক্তিযোদ্ধার রিট আবেদনে আদেশ দেন, 90 দিনের মধ্যে দেশের সব স্থাপনা থেকে ত্রিদিব রায়ের নাম মুছে ফেলতে হবে, এবং কেন এমন নির্দেশ দেওয়া হবে না, সে বিষয়ে রুল জারি করেন (নিউ এজ/ইউএনবি; বিডিনিউজ২৪)। আবেদনকারীদের অভিযোগ ছিল, 1971 সালে তিনি পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর হয়ে কাজ করেছেন।

বিডিনিউজ২৪ লিখেছে, খাগড়াছড়িতে তাঁর নামে ত্রিদিবনগর এলাকা, ত্রিদিবনগর সড়ক ও ত্রিদিবনগর উচ্চ বিদ্যালয় আছে। রুলটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি ও নাম বদল কার্যকর হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।

রাজনীতিতে ব্যবহার নিয়ে আর্কাইভের লেখা

আমাদের আর্কাইভের কয়েকটি লেখা একটি অভিন্ন অভিযোগ তোলে: রাজার অবস্থানকে সব পাহাড়িকে পাকিস্তানপন্থী বলার যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। “মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী” প্রবন্ধে লেখা, তাঁর অবস্থানের জন্য “সকল চাকমাদের ঢালাওভাবে পাকিস্তানের দালাল বলা হয়”। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট না থাকলে কেমন হতো এই পাহাড় লেখার লেখক জানান, রাজা তৃণমূল জনগণকে প্রভাবিত করেছিলেন, এমন জোরালো প্রমাণ তাঁর চোখে পড়েনি।

মৃত্যু, শোক ও শেষকৃত্য: ত্রিদিব রায় কবে ও কোথায় মারা যান

ত্রিদিব রায় 17 সেপ্টেম্বর 2012, সোমবার, ইসলামাবাদের বাসভবনে হৃদ্‌রোগে মারা যান (ডন; ডেইলি স্টার)। মৃত্যুকালে বয়স নিয়ে তিন রকম তথ্য আছে: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস 79, ডেইলি স্টার 80, ডন 81। জন্মতারিখ 14 মে 1933 ধরলে বয়স হয় 79।

ডন জানায়, রাষ্ট্রপতি আসিফ আলী জারদারি, প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খার শোক জানান। পিটিআই-এর খবরে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র দপ্তরের বিবৃতি উদ্ধৃত: “Pakistan has lost a distinguished diplomat”। ভারতের মিজোরামের চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদ 18 সেপ্টেম্বর শোকসভা করে এবং দিনটিকে ছুটি ঘোষণা করে (পরিষদের ওয়েবসাইট)।

ডেইলি স্টার মৃত্যুর পরদিন লিখেছে, রাজা দেবাশীষ রায় পাকিস্তানে গিয়ে বাবার মরদেহ রাঙামাটিতে এনে দাহ করার চেষ্টা করতে পারেন। বাংলা উইকিপিডিয়া jjdin.com-এর 28 সেপ্টেম্বর 2012 তারিখের একটি খবরের বরাতে লিখেছে, তাঁর ইচ্ছা ছিল বাংলাদেশে শেষকৃত্য হোক, তবে তা হয়নি, এবং মৃত্যুর দশ দিন পর ইসলামাবাদে দাহ করা হয়। মূল খবরটি পাওয়া যায়নি।

পরিবার নিয়ে ডেইলি স্টারের শোক-খবর লিখেছে, তিনি স্ত্রী “Binita Roy”, তিন ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে গেছেন। ইংরেজি ও বাংলা উইকিপিডিয়া এবং আমাদের আর্কাইভ অনুযায়ী তাঁর স্ত্রী রানি আরতি রায়; বিনীতা রায় ছিলেন তাঁর মা।

উত্তরাধিকার: রিজেন্ট সমিত রায় থেকে রাজা দেবাশীষ রায়

ত্রিদিব রায় পাকিস্তানে থেকে যাওয়ার পর তাঁর ছোট ভাই কুমার সমিত রায় রিজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, আর ছেলে দেবাশীষ রায় 25 ডিসেম্বর 1977 চাকমা সার্কেলের 51তম রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। সার্কেল চিফের দায়িত্ব ও ক্ষমতা নিয়ে বিস্তারিত আছে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন সার্কেল চিফের ক্ষমতা লেখায়।

আর্কাইভের চাকমা রাজাদের তালিকা অনুযায়ী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মালেক উকিল 30 এপ্রিল 1973 রাঙামাটি সফরে দেবাশীষ রায়ের 18 বছর পূর্ণ হলে তাঁকে সিংহাসনে বসানোর সম্মতি দেন; স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের 25/5/74 তারিখের প্রজ্ঞাপনে নিয়োগ আদেশ জারি হয়। স্মৃতিকথায় 1974 সালের অক্টোবরের বিবরণে ত্রিদিব রায় লিখেছেন, বাংলাদেশ গেজেটে তাঁর ছেলের উত্তরাধিকার প্রজ্ঞাপিত হয়েছে, “after three years when my brother Samit had been serving as Regent” (পৃ. 294)। অন্যত্র তিনি লিখেছেন, দেবাশীষ রায় 1977 সালে রাজা হন “with my blessings, as I was living in Pakistan” (পৃ. 71)।

আর্কাইভের “পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট” লেখাটি ডা. এ কে দেওয়ানের বইয়ের বরাতে জানায়, শেখ মুজিবুর রহমান রাজাকে দেশে ফেরাতে আমেরিকায় বিশেষ দূত পাঠিয়েছিলেন, আর তিনি না ফেরায় 1973 সালে নাবালক দেবাশীষ রায়কে অভিষেকের উদ্যোগ নেন।

রাঙামাটির রাজবাড়িতে চাকমা রাজ কার্যালয়ের সাদা দেয়ালে লাল রঙে চাকমা লিপির নামফলক, মাঝখানে গোলাকার রাজপ্রতীক; এই সার্কেলের 50তম রাজা ছিলেন ত্রিদিব রায়
রাঙামাটির রাজবাড়িতে চাকমা রাজ কার্যালয়ের নামফলক, চাকমা লিপিতে লেখা, মাঝে রাজপ্রতীক। ছবি: জুমজার্নাল আর্কাইভ (2017)

লেখক ত্রিদিব রায় ও তাঁর স্মৃতিকথা The Departed Melody

ত্রিদিব রায়ের প্রধান বই তাঁর স্মৃতিকথা The Departed Melody, প্রকাশক পিপিএ পাবলিকেশন্স, ইসলামাবাদ, জুলাই 2003। সূচিপত্রে বইটির তিন অংশ: “The Jummas and Their Culture” (পার্বত্য চট্টগ্রাম, চাকমা রাজাদের ইতিহাস ও 1971 পর্যন্ত তাঁর জীবন), “A Decade in New Pakistan” (1972–1981), এবং লাতিন আমেরিকার বছরগুলো নিয়ে “Southern Peregrinations”। এর বাইরে একটি ছোটগল্প সংকলন (উর্দুতে অনূদিত) ও South American Diary নামে একটি ভ্রমণগ্রন্থ আছে (ডন; উইকিপিডিয়া)।

বইয়ের মুদ্রণ-পাতা অনুযায়ী প্রথম সংস্করণ ছাপা হয় এক হাজার কপি, ISBN 969-8587-10-1। উৎসর্গপত্রে লেখা: “To the indigenous peoples throughout the world and particularly to the Jummas of the Chittagong Hill Tracts.” বইটির একটি স্ক্যান করা কপি ইন্টারনেট আর্কাইভে আছে, 2025 সালে আপলোড করা।

গবেষকদের লেখায় বইটি উৎস হিসেবে আগে থেকেই ব্যবহৃত। আমাদের আর্কাইভের “উনিশ শতকে বাংলার গ্রামীণ সমাজ: প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম” প্রবন্ধ এর পৃ. 25 উদ্ধৃত করেছে, আর “পাদি সাহবাং” প্রবন্ধ পৃ. 53 ও 126। আমাদের কাপ্তাই বাঁধ লেখায় উল্লেখ আছে, ডেইলি স্টারের একটি লেখা বাঁধের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে বইটির একটি মত উদ্ধৃত করেছিল।

লেখক হিসেবে তাঁর আগের একটি কাজের কথা আর্কাইভের চাকমা জাতির ইতিহাস চর্চা প্রবন্ধে আছে: “ক্যাপ্টেন রাজকুমার ত্রিদিব রায় (পরে রাজা) রচিত Tribal of the Chittagong Hill Tracts 1951 সালে প্রকাশিত হয়েছিল”। একই প্রবন্ধে বিরাজ মোহন দেওয়ানের চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত (1969) বইয়ের ভূমিকায় রাজা ত্রিদিব রায়ের লেখা থেকে উদ্ধৃতি আছে।

তাঁকে নিয়ে লেখা জীবনী প্রিয়জিত দেবসরকারের The Last Raja of West Pakistan, যার বাংলা অনুবাদ “পশ্চিম পাকিস্তানের শেষ রাজা” (অনুবাদক রইসুল হক বাহার, বাতিঘর)। ইংরেজি উইকিপিডিয়ায় উদ্ধৃত ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সমালোচনা বইটিকে “amateur yarn” বলেছে এবং লিখেছে, পাকিস্তান, বাংলাদেশ বা ভারতের কারও সাক্ষাৎকার নেওয়ার প্রমাণ বইয়ে নেই।

উৎসভেদে অমিল: ত্রিদিব রায় সম্পর্কে কোন তথ্যে উৎসগুলো মেলে না

ত্রিদিব রায় সম্পর্কে অন্তত দশটি তথ্যে উৎসগুলোর মধ্যে অমিল আছে, যার বেশির ভাগ তারিখ ও মেয়াদ নিয়ে। নিচের ছক প্রতিটি দাবিকে তার উৎসের পাশে রাখে; কোনটি ঠিক, তা এখানে নির্ধারণ করা হয়নি।

বিষয়এক উৎসঅন্য উৎস
পিতার মৃত্যুর সাল1951 (স্মৃতিকথা; জুমজার্নাল আর্কাইভ)1952 (বাংলা উইকিপিডিয়া)
অভিষেক2 মার্চ 1953 (স্মৃতিকথা)2 মে 1953 (ডেইলি স্টার; ইংরেজি উইকিপিডিয়া); 1954 (রাজপরিবার সূত্রে আর্কাইভ)
1965 সালের প্রাদেশিক আসনবিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দ্বিতীয় মেয়াদ (স্মৃতিকথা)বোমাং রাজার ছেড়ে দেওয়া আসনে (আর্কাইভের চাকমা জাতি নিবন্ধ)
1970 সালে কোন পরিষদেজাতীয় পরিষদ (স্মৃতিকথা; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস; মর্নিং নিউজ 1971)প্রাদেশিক পরিষদ, আসন PE-150 (ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্যছক)
রিজার্ভ ও তবলছড়ি বাজারের সভাএপ্রিলের মাঝামাঝি, সেনা প্রবেশের আগে (স্মৃতিকথা)মে মাসে (বাংলা উইকিপিডিয়া, দেবসরকারের বরাতে)
পশ্চিম পাকিস্তানে যাত্রা9 নভেম্বর বাড়ি ছাড়েন, 11 নভেম্বর ঢাকা থেকে করাচি (স্মৃতিকথা; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই (রিট আবেদনকারীদের আইনজীবী, 2017)
পাকিস্তানে ফেরার সিদ্ধান্ত20 ডিসেম্বর তেহরান, 23 ডিসেম্বর রাওয়ালপিন্ডিতে ভুট্টোর সঙ্গে দেখা (স্মৃতিকথা)22 ডিসেম্বর ব্যাংকক থেকে (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
পিপলস পার্টির সদস্যপদদল: PPP (ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তথ্যছক)কোনো দলে যোগ দেননি (ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)
আর্জেন্টিনায় মেয়াদ1981–1995 (দ্য নিউজ; ইংরেজি উইকিপিডিয়া)1981–1994 (বাংলা উইকিপিডিয়া)
মৃত্যুকালে বয়স79 (এক্সপ্রেস ট্রিবিউন; ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস)80 (ডেইলি স্টার); 81 (ডন)
স্ত্রীর নামআরতি রায় (উইকিপিডিয়া; আর্কাইভ; স্মৃতিকথা)“Binita Roy” (ডেইলি স্টারের শোক-খবর)

ত্রিদিব রায় সম্পর্কে প্রশ্নোত্তর

ত্রিদিব রায় কে ছিলেন?

ত্রিদিব রায় (1933–2012) ছিলেন চাকমা সার্কেলের 50তম রাজা। তিনি 1962 ও 1965 সালে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে এবং 1970 সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে নির্বাচিত হন। 1971 সালে পাকিস্তানের পক্ষে থাকেন এবং পরে পাকিস্তানে মন্ত্রী, বিশেষ দূত ও আর্জেন্টিনায় রাষ্ট্রদূত হন।

ত্রিদিব রায় একাত্তরে কী করেছিলেন?

তাঁর স্মৃতিকথা অনুযায়ী এপ্রিল 1971-এর মাঝামাঝি তিনি রাউজান ও চট্টগ্রামে সেনা কর্মকর্তাদের কাছে গিয়ে নিশ্চয়তা দেন যে রাঙামাটিতে প্রতিরোধ হবে না; সেদিন সন্ধ্যায় সেনাবাহিনী শহরে নামে। 9 নভেম্বর তিনি রাঙামাটি ছাড়েন, ইয়াহিয়া খানের বিশেষ দূত হয়ে শ্রীলঙ্কা, বার্মা ও থাইল্যান্ড সফর করেন, আর ডিসেম্বরে পাকিস্তানে চলে যান।

ত্রিদিব রায় কবে চাকমা রাজা হন?

পিতা নলিনাক্ষ রায়ের মৃত্যু হয় 7 অক্টোবর 1951। আনুষ্ঠানিক অভিষেকের তারিখে উৎস ভিন্ন: তাঁর স্মৃতিকথা (পৃ. 61, 133) বলে 2 মার্চ 1953, ডেইলি স্টার ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া বলে 2 মে 1953, আর রাজপরিবার সূত্রের বরাতে জুমজার্নাল আর্কাইভের একটি লেখা বলে 1954। স্মৃতিকথা অনুযায়ী সরকারি স্বীকৃতির আদেশ হয় 1952 সালে।

1970 সালের নির্বাচনে ত্রিদিব রায় কোন দলের প্রার্থী ছিলেন?

তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন; প্রতীক হাতি। স্মৃতিকথা অনুযায়ী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে বলেছিলেন, আর ফজলুল কাদের চৌধুরী মুসলিম লীগের মনোনয়ন ও এক লাখ রুপি দিতে চেয়েছিলেন; তিনি দুটিই ফিরিয়ে দেন। পূর্ব পাকিস্তানের 162টি সাধারণ আসনের যে দুটি আওয়ামী লীগ পায়নি, তার একটি তাঁর।

ত্রিদিব রায় কবে পাকিস্তানে চলে যান?

স্মৃতিকথা অনুযায়ী 9 নভেম্বর 1971 তিনি রাঙামাটি ছাড়েন এবং 11 নভেম্বর রাতে ঢাকা থেকে করাচি যান। বিশেষ দূতের সফর শেষে 20 ডিসেম্বর তেহরান, 21 ডিসেম্বর কাবুল হয়ে রাওয়ালপিন্ডি পৌঁছান এবং 24 ডিসেম্বর ভুট্টোর মন্ত্রিসভায় শপথ নেন। 2017 সালের রিট আবেদনকারীদের আইনজীবীর ভাষ্যে, তিনি যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই পাকিস্তানে যান।

ত্রিদিব রায় বাংলাদেশে ফেরেননি কেন?

স্মৃতিকথায় তাঁর ব্যাখ্যা: পার্বত্য চট্টগ্রামের বিশেষ মর্যাদা আওয়ামী লীগ সরকার দেবে না বলে তাঁর ধারণা ছিল, আর নিজেকে তিনি পাকিস্তানের প্রতি অনুগত নাগরিক মনে করতেন। 2010 সালে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে তিনি বলেন, বাংলাদেশে থেকে সরকারের লাইনে না চললে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হতো, কারাগারে পাঠানো হতো বা চুপ করিয়ে দেওয়া হতো।

জাতিসংঘে ত্রিদিব রায়ের মা কী করেছিলেন?

সেপ্টেম্বর 1972-এ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ত্রিদিব রায় পাকিস্তানের 21 সদস্যের প্রতিনিধিদলের নেতা ছিলেন। ডন জানায়, শেখ মুজিবুর রহমান পাল্টা যে প্রতিনিধিদল পাঠান তার নেতা ছিলেন তাঁর মা বিনীতা রায়। স্মৃতিকথা অনুযায়ী মা নিউইয়র্কে এসে তাঁকে বলেন, “I have come to take you back”; তিনি ফেরেননি।

ত্রিদিব রায় পাকিস্তানে কোন কোন পদে ছিলেন?

তিনি ভুট্টোর মন্ত্রিসভায় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী ছিলেন (24 ডিসেম্বর 1971 থেকে), 1972 সালে পর্যটন বিভাগও তাঁর দপ্তরে যুক্ত হয়; উইকিপিডিয়া মেয়াদ শেষ দেখায় 22 অক্টোবর 1974। 1981–1995 আর্জেন্টিনায় রাষ্ট্রদূত, সঙ্গে চিলি, পেরু, ইকুয়েডর ও উরুগুয়ে; 1995–1996 শ্রীলঙ্কায় হাইকমিশনার। পরে আজীবন ফেডারেল মন্ত্রীর মর্যাদা পান।

ভুট্টো কি ত্রিদিব রায়কে রাষ্ট্রপতি হতে বলেছিলেন?

এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী হ্যাঁ। ভুট্টো তাঁকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতির পদ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু 1973 সালের সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে মুসলিম হতে হয়, আর বৌদ্ধ ত্রিদিব রায় ধর্ম বদলাতে রাজি ছিলেন না। এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের ভাষায় পদটিকে তিনি “gilded cage” বলেছিলেন।

বাংলাদেশের রাজাকার তালিকায় কি ত্রিদিব রায়ের নাম আছে?

ডেইলি স্টার জানায়, 15 ডিসেম্বর 2019 মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত 10,789 জনের তালিকায় “the then Chakma Circle chief Raja Tridiv Roy” ছিলেন। এশিয়া টাইমস জানায়, ভুল ও মুক্তিযোদ্ধাদের নাম থাকার সমালোচনায় কয়েক দিনের মধ্যে সরকার তালিকাটি স্থগিত করে। সংশোধিত তালিকায় তাঁর নাম আছে কি না, জানা যায়নি।

হাইকোর্ট ত্রিদিব রায়ের নাম নিয়ে কী আদেশ দিয়েছিল?

22 মে 2017 বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহর বেঞ্চ দুই মুক্তিযোদ্ধার রিট আবেদনে 90 দিনের মধ্যে দেশের সব স্থাপনা থেকে তাঁর নাম মুছে ফেলার আদেশ দেন এবং রুল জারি করেন (নিউ এজ; বিডিনিউজ২৪)। খাগড়াছড়িতে তাঁর নামে ত্রিদিবনগর এলাকা, সড়ক ও উচ্চ বিদ্যালয় আছে। রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি জানা যায়নি।

ত্রিদিব রায় কবে, কোথায় মারা যান?

17 সেপ্টেম্বর 2012 ইসলামাবাদের বাসভবনে হৃদ্‌রোগে তাঁর মৃত্যু হয় (ডন; ডেইলি স্টার)। বয়স নিয়ে উৎস ভিন্ন: এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস 79, ডেইলি স্টার 80, ডন 81। বাংলা উইকিপিডিয়া একটি সংবাদের বরাতে লিখেছে, মৃত্যুর দশ দিন পর ইসলামাবাদে তাঁকে দাহ করা হয়।

ত্রিদিব রায়ের পর চাকমা রাজা কে হন?

তাঁর ছেলে দেবাশীষ রায় 25 ডিসেম্বর 1977 চাকমা সার্কেলের 51তম রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। মাঝের সময়ে ত্রিদিব রায়ের ছোট ভাই কুমার সমিত রায় রিজেন্ট ছিলেন। জুমজার্নাল আর্কাইভ অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের 25/5/74 তারিখের প্রজ্ঞাপনে নিয়োগ আদেশ জারি হয়।

The Departed Melody বইটি কী?

এটি ত্রিদিব রায়ের স্মৃতিকথা, প্রকাশক পিপিএ পাবলিকেশন্স, ইসলামাবাদ, জুলাই 2003, প্রথম সংস্করণ এক হাজার কপি, ISBN 969-8587-10-1। বইয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চাকমা রাজাদের ইতিহাস, তাঁর শৈশব, 1970–71 সালের ঘটনা, পাকিস্তানে প্রথম দশক ও লাতিন আমেরিকার বছরগুলোর বিবরণ আছে। উৎসর্গ করা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্মদের।

যা এখনো জানা যায়নি

  • 1970 সালের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম আসনের আনুষ্ঠানিক ভোটসংখ্যা। স্মৃতিকথা কেবল ব্যবধানের একটি হিসাব দেয়।
  • 1972 সালের দালাল আইনে ত্রিদিব রায়ের নামে কোনো মামলা, পরোয়ানা বা তালিকাভুক্তির মূল নথি।
  • 2019 সালের স্থগিত রাজাকার তালিকার পর সংশোধিত তালিকা প্রকাশ হয়েছে কি না, আর তাতে তাঁর নাম আছে কি না।
  • 2017 সালের হাইকোর্ট রুলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি, এবং খাগড়াছড়ির ত্রিদিবনগর এলাকা, সড়ক ও বিদ্যালয়ের নাম বদল কার্যকর হয়েছে কি না।
  • এপ্রিল 1971-এ রাঙামাটিতে সেনা প্রবেশের পর কতজন নিহত বা আটক হন, তার কোনো স্বাধীন হিসাব।
  • পাকিস্তান সরকারের গেজেটে তাঁর মন্ত্রিত্ব, আজীবন মন্ত্রীর মর্যাদা ও রাষ্ট্রদূত নিয়োগের প্রজ্ঞাপন।
  • ইসলামাবাদে শেষকৃত্যের তারিখ ও স্থান নিয়ে কোনো প্রত্যক্ষ সংবাদ-প্রতিবেদন।
  • ব্রিগেডিয়ার জেড এ খানের The Way It Was বইয়ে রাঙামাটি অভিযানের বিবরণ, যার উল্লেখ পাকিস্তানি নিবন্ধে আছে।

তথ্যসূত্র

প্রাথমিক উৎস

  1. Raja Tridiv Roy, The Departed Melody (Memoirs), PPA Publications, Islamabad, July 2003, ISBN 969-8587-10-1; ব্যবহৃত পৃষ্ঠা 60–61, 71, 90, 103, 129–133, 197–231, 239–257, 294. স্ক্যান: Internet Archive
  2. “Gen Niazi visits troops in Ctg and Hill Tracts”, Morning News, 11 July 1971 (প্রথম আলোর সংরক্ষিত প্রতিলিপি): PDF
  3. এ.বি. চাকমা (ছদ্মনাম), “নির্বাসন থেকে ফিরে দেখা: এক চাকমা ব্যক্তির অভিজ্ঞতা”, মূল: Wolfgang Mey (ed.), Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh, IWGIA Document 51; অনুবাদ: সায়ক চাকমা; জুমজার্নাল
  4. United News of Bangladesh, “Erase Tridiv Roy’s name from all structures: HC”, New Age, 23 May 2017: newagebd.net
  5. Staff Correspondent, “HC wants anti-liberation Chakma king Tridiv Roy’s name removed”, bdnews24.com, 22 May 2017: bdnews24.com
  6. Staff Correspondent, “Govt publishes list of Razakars”, The Daily Star, 15 December 2019: thedailystar.net
  7. Chakma Autonomous District Council, “CADC Observed Condolence Over Chakma Raja Tridiv Roy’s Demise”, 18 September 2012: cadc.gov.in

জুমজার্নাল আর্কাইভ

  1. নিঝুম তালুকদার, “চাকমাদের খাঁ, রায়, খীসা, দেওয়ান ও তালুকদার উপাধি”: jumjournal.com
  2. “চাকমা রাজবংশের ইতিহাস ও চাকমা রাজাদের নামের তালিকা”: jumjournal.com
  3. “কুমার সমিত রায় এর সংক্ষিপ্ত জীবনী”: jumjournal.com
  4. “চাকমা জাতি”: jumjournal.com
  5. “চাকমা জাতির রাজনৈতিক সংগ্রামের ইতিহাস”: jumjournal.com
  6. “পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট না থাকলে কেমন হতো এই পাহাড়!”: jumjournal.com
  7. “চাকমা জাতির ইতিহাস চর্চা”: jumjournal.com
  8. “আলোকিত তঞ্চঙ্গ্যা পূজনীয় ভিক্ষু রাজগুরু অগ্রবংশ মহাথেরো”: jumjournal.com
  9. আর্কাইভের অন্য লেখা: “মুক্তিযুদ্ধে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী: মহাকাব্যের অগ্রন্থিত কবিতা”, “তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত”, “পাদি সাহবাং: চাকমা ঐতিহ্যের জীবন বৃক্ষ”, “মৃত্যুর ফাঁদ, কাপ্তাই বাঁধ” (করুণাময় চাকমা), “উনিশ শতকে বাংলার গ্রামীণ সমাজ: প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম”।

সংবাদপত্র ও সাক্ষাৎকার

  1. “Raja Tridiv Roy dies”, Dawn, 18 September 2012: dawn.com
  2. “Tridiv Roy passes away”, The Daily Star, 18 September 2012: thedailystar.net
  3. “The Raja who gave away his kingdom”, The Express Tribune, 18 September 2012 (Wayback Machine কপি): web.archive.org
  4. Ishrat Hyatt, “Eulogy for a friend”, The News International, 18 September 2012 (Wayback Machine কপি): web.archive.org
  5. Press Trust of India, “Former Chakma king dies in Pakistan”, Business Standard, 2012: business-standard.com
  6. Syed Badrul Ahsan, “Story of a lost king” (মতামত), The Daily Star, 25 September 2012: thedailystar.net
  7. Nirupama Subramanian, “Chittagong’s former Chakma raja who left Bangladesh to live in Pakistan”, The Indian Express, 20 September 2017: indianexpress.com
  8. “Bangladesh forced to withdraw war collaborators list”, Asia Times, December 2019: asiatimes.com

গবেষণা ও বিশ্বকোষ

  1. Syed Munir Wasti, “In memoriam: Raja Tridiv Roy”, Pakistan Perspectives, Vol. 20, No. 1 (2015), Pakistan Study Centre: journal.psc.edu.pk
  2. “Tridev Roy”, English Wikipedia (2026 সালের সংস্করণ): en.wikipedia.org
  3. “ত্রিদিব রায়”, বাংলা উইকিপিডিয়া (প্রিয়জিত দেবসরকার, পশ্চিম পাকিস্তানের শেষ রাজা, অনু. রইসুল হক বাহার, বাতিঘর, এর বরাতে): bn.wikipedia.org
  4. “The Last Raja of West Pakistan”, English Wikipedia: en.wikipedia.org
  5. “1970 Pakistani general election in East Pakistan”, English Wikipedia (আসনের হিসাব): en.wikipedia.org

সর্বশেষ হালনাগাদ: 8 নভেম্বর 2026

প্রসঙ্গ:

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

রাঙামাটি জেলার সাজেকে রুইলুই জুনিয়র হাই স্কুলের সবুজ টিনের চালের একতলা ভবন, বাঁশের বেড়া ও সামনে পাকা রাস্তা; এই জেলারই প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ 70-30 কোটা বিতর্কে আটকে আছে

Nov 8th, 2026 · আর্কাইভ, শিক্ষা

6

রাঙামাটিতে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা চারবার স্থগিত: 70-30 কোটা বিরোধের কালানুক্রম