Jumjournal Logo

আদিবাসী সৃষ্টিকথা: পৃথিবী, সূর্য আর গ্রহণ নিয়ে পাহাড়ের সাতটি ব্যাখ্যা

Last updated Oct 15th, 2026

0

Featured image

পৃথিবী কীভাবে হলো, সূর্য আর চাঁদ কেন বদলে গেল, গ্রহণ কেন হয়, রঙধনু কেন আবছা — জুমজার্নালের আর্কাইভে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আছে ছয়টি জনগোষ্ঠীর অন্তত সাতটি পাঠে।

এই পাতায় সেই পাঠগুলো পাশাপাশি রাখা হলো — চাকমা, ম্রো, গারো, চাক ও ত্রিপুরা। প্রতিটি উত্তরই আলাদা, কিন্তু প্রশ্নগুলো প্রায় এক।

আর একটি জিনিস সবগুলোতেই আছে: সৃষ্টি কোনো একবারের ঘটনা নয়। মাটি আনতে হয়, অনুমতি নিতে হয়, খাদ্যের ব্যবস্থা করতে হয়, আর যা একবার ঠিক হয় তা আবার ভেঙে পড়তে পারে।

সূচিপত্র

আর্কাইভে কোন কোন সৃষ্টিকথা

আর্কাইভের ১২৫টি পাঠের ১৭টিতে সৃষ্টি-সংক্রান্ত আলোচনা আছে, কিন্তু যেগুলো সরাসরি পৃথিবী, আকাশ বা কোনো মহাজাগতিক ঘটনার ব্যাখ্যা দেয় — সেগুলো সাতটি।

পাঠজনগোষ্ঠীশব্দযা ব্যাখ্যা করে
সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনীচাকমা২,৩১৫পৃথিবী, স্থলভাগ, প্রথম মানুষ, জুমচাষ
ক্রংথপ সাংচিয়া (পৃথিবী সৃষ্টির কাহিনী)ম্রো১,৫৯০পৃথিবী, জল-স্থলের অনুপাত, দুঃখের উৎপত্তি
চাফির সাংচিয়া (যমজ ভাই-এর গল্প)ম্রো১,৫৪০চাঁদ-সূর্যের বদল, সূর্যগ্রহণ ও চন্দ্রগ্রহণ
সূৰ্য্য গ্রহণগারো১,০৬৮সূর্যগ্রহণ
শরিমনবিক মননাং (চাকদের রঙধনু গল্প)চাক১,১০২প্রলয়ের পর নতুন শুরু, রঙধনু
চাঁদের ছেলে সোনাব্যাঙত্রিপুরা২,৪৩১চন্দ্রমাদেবের সন্তান, একটি রাজবংশের সূচনা
রক্তপিয়াসি দেবতাত্রিপুরা৬৪৩চৌদ্দ দেবতার পূজায় বলির প্রথা

তালিকায় ম্রো দুটি পাঠ, আর তা কাকতালীয় নয়। আর্কাইভে সৃষ্টি-সংক্রান্ত আলোচনা সবচেয়ে বেশি খেয়াং সংগ্রহে — পাঁচটি পাঠে — আর তারপর মারমা ও ম্রো তিনটি করে।

তবে খেয়াং পাঠগুলোতে শব্দটি প্রসঙ্গক্রমে এসেছে, আর ম্রো দুটি পাঠে তা কাহিনির কেন্দ্র।

প্রতিটি জনগোষ্ঠীর পূর্ণ সূচি আছে পাহাড়ের রূপকথার পূর্ণ সূচিতে।

শুরুর অবস্থা: শূন্যতার তিন বর্ণনা

তিনটি পাঠ পৃথিবীর আগের অবস্থা বর্ণনা করে, আর তিনটি বর্ণনাই আলাদা — একটিতে কিছুই নেই, একটিতে একটি পাথর ভাসছে, আর একটিতে সব শুকিয়ে গেছে।

চাকমা পাঠে অনুপস্থিতির তালিকাটি নাম ধরে দেওয়া, আর সেটিই আর্কাইভের সবচেয়ে সম্পূর্ণ শূন্যতার বর্ণনা: “ছিল না বায়ু, রোদ, বৃষ্টি, আলো, সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র, পশু, পাখি এবং মানুষ। এমন কি ছিল না পৃথিবীও। ছিল কেবল অপার-অনন্ত স্থির জলরাশি এবং নিঃসীম অন্ধকার।”

লক্ষণীয়, জল সেখানে অনুপস্থিত নয় — জল আগেই ছিল, আর তা স্থির। যা ছিল না তা হলো মাটি।

ম্রো পাঠে শুরুর ছবিটি আরও নির্দিষ্ট। মৃত্তিকা ছিল না, আর মহাসমুদ্রের উপর ভেসে যাওয়া “এক খন্ড প্রস্তর”-কেই বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বলা হতো। সেই পাথরে বাস করতেন এক বিধবা বৃদ্ধা ও তাঁর নাতি ক্লাংচা।

অর্থাৎ ম্রো পাঠে সৃষ্টির আগেই মানুষ আছে — দু’জন, আর তাদেরই উদ্যোগে পৃথিবী তৈরি হয়। চাকমা পাঠে মানুষ আসে পরে।

চাক পাঠে শুরুটি শূন্যতার নয়, ধ্বংসের পরের। পৃথিবীতে প্রলয় হয়েছে, গাছপালা-পশুপাখি-মানুষ সবাই মারা গেছে, “এমনকি পৃথিবীতে পানি পর্যন্ত শুকিয়ে” গেছে — আর বেঁচে আছে কেবল দু’জন।

তিনটি বর্ণনায় একটি জিনিস সাধারণ: প্রতিটিতেই একটি জিনিসের অভাব গল্পটিকে চালায় — চাকমায় মাটির, ম্রোতে মাটির, আর চাকে জলের।

মাটি কোথা থেকে এল

চাকমা ও ম্রো — দুটি পাঠেই পৃথিবী তৈরি হয় সমুদ্রের তলা বা অন্য কোনো জায়গা থেকে মাটি এনে। কিন্তু কে আনে আর কীভাবে, তা দুটিতে সম্পূর্ণ আলাদা।

চাকমা পাঠে গোজেন সমুদ্রের উপর একটি বিশাল বটগাছ সৃষ্টি করেন, তার কয়েকটি পাতা ছিঁড়ে আসন করে ধ্যানে বসেন। আর সেই ধ্যানের সময় এক কাঁকড়া-দৈত্য সমুদ্রের তলা থেকে মাটি এনে বটগাছের শিকড় ঘিরে জমাতে থাকে — তা থেকেই স্থলভাগ।

অর্থাৎ এখানে সৃষ্টিকর্তা মাটি আনেন না; আনে একটি প্রাণী, আর তা ঘটে ধ্যানের পাশে।

ম্রো পাঠে পরিকল্পনাটি দেন দাদী, আর বাহক একটি বন্য জন্তু — পাকচারুয়া, যার পরিচয় পাঠে বন্ধনীতে দেওয়া, “এক প্রকার বন্য জন্তু”। গন্তব্য রেংমা ওয়ালে চর উম নুই, অর্থাৎ মৃত্তিকা দ্বীপ।

আর সৃষ্টির অনুপাতটিও ম্রো পাঠে সংখ্যা ধরে দেওয়া: ক্লাংচা মৃত্তিকা কণা দিয়ে তিন ভাগে জল আর এক ভাগে স্থল সৃষ্টি করে।

এই সংখ্যাটি লক্ষণীয়, কারণ তা পৃথিবীর বাস্তব অনুপাতের কাছাকাছি। [পাঠটি কোনো বাইরের তথ্য থেকে এই অনুপাত নিয়েছে কি না, তা কোনো পঠিত উৎসে আলোচিত নয় — যাচাই প্রয়োজন]

দুটি পাঠেই বটগাছ আছে, আর দুটিতেই তা কেন্দ্রীয় — চাকমা পাঠে ধ্যানের আসন আর মাটি জমার ভিত্তি, আর আর্কাইভে বটগাছ মোট আটটি পাঠে ফিরে আসে।

অনুমতি বনাম চুরি: ম্রো সৃষ্টিকথার শর্ত

আর্কাইভের সৃষ্টিকথাগুলোর মধ্যে ম্রো পাঠটি একাই একটি নৈতিক শর্ত বসায়, আর সেই শর্ত ছাড়া পৃথিবী তৈরিই হয় না — চুরি করা মাটিতে ভূমি হবে না।

প্রথম চেষ্টাটি ব্যর্থ হয় ঠিক এই কারণে। পাকচারুয়া মৃত্তিকা দ্বীপ থেকে মাটি চুরি করে আনে, আর সমুদ্র পার হওয়ার সময় তিমি মাছ তা ছিনিয়ে নেয় — পাঠে কারণটি স্পষ্ট: “চুরি করে নিয়ে এসেছে বলে তিমি মৃত্তিকা খন্ডটি নিতে বাধা দিলো।”

দাদীর নির্দেশটি তখন আর কৌশলের নয়, নীতির: “চুরি করে মৃত্তিকা আনলে কোনো দিনও ভূমি সৃষ্টি হবে না। কাজেই তুমি স্বয়ং গিয়ে মৃত্তিকা দ্বীপের শাসন কর্তার নিকট হতে অনুমতি নিয়ে তোমার পরিকল্পনা জানাও।”

দ্বিতীয় যাত্রাটি তাই ব্যক্তিগত — ক্লাংচা নিজে যায়। দ্বীপবাসীরা তাকে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে বন্দি করে রাজার কাছে নিয়ে যায়, আর রাজা পরিকল্পনা শুনে “খুবই সন্তুষ্ট” হন।

আর তারপর যা ঘটে তা অনুমতির চেয়েও বেশি: রাজা মাটি, প্রাণীর বীজ ও উদ্ভিদের বীজ সবই দিয়ে দেন, আর কোথায় কী রোপণ করতে হবে তাও শিখিয়ে দেন।

অর্থাৎ ম্রো সৃষ্টিকথার কেন্দ্রীয় বক্তব্য একটি ভূমি-নীতি: মাটি কারও সম্পত্তি, আর তা নিতে হলে মালিকের অনুমতি লাগে। পাহাড়ের ভূমি-বিরোধের প্রেক্ষাপটে এই শর্তটি আলাদা মনোযোগ দাবি করে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি-ব্যবস্থা ও বিরোধ নিয়ে আলাদা লেখা আছে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি: ১৯০০ সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন-এ।

প্রথম মানুষ: কেদুগা আর কেদুগী

আর্কাইভে প্রথম মানুষের নাম আছে কেবল একটি পাঠে — চাকমা সৃষ্টিকথায় — আর দু’জনের জন্মই অস্বাভাবিক।

প্রথম মানবের উৎপত্তিটি একটি ভুল বোঝাবুঝি থেকে। ধ্যানরত গোজেন একজনকে দেখে পরপর তিনবার প্রশ্ন করেন, তিনবারই উত্তর নেই। তারপর বুঝতে পারেন — “এতো নিজেরই ছায়া।”

পাঠে তাঁর প্রতিক্রিয়াটিও আছে, আর তা মানবিক: “গোজেন নিজেই যেন লজ্জিত হলেন।” তারপর সেই ছায়াকে প্রাণ দিয়ে নাম দেন কেদুগা।

দ্বিতীয়জনের উৎপত্তি আরও অপ্রত্যাশিত — নিজের শরীরের ময়লা থেকে, আর পাঠে চাকমা শব্দটিও দেওয়া: ড্রিং। তাঁর নাম কেদুগী।

অর্থাৎ প্রথম মানব সৃষ্টিকর্তার প্রতিচ্ছবি, আর প্রথম মানবী তাঁর শরীরের অংশ। দুটি জন্মের মধ্যে একটি স্তরভেদ আছে, আর পাঠ তা ব্যাখ্যা করে না।

এরপর গোজেন প্রাণীকুলের আহারের দায়িত্ব ফলবান বৃক্ষের উপর ন্যস্ত করে স্বর্গে ফিরে যান, আর কেদুগা-কেদুগী “বন্য ফলমূল ও আলু ইত্যাদি আহার করে” বাঁচতে থাকেন।

চাক পাঠেও প্রথম দুই মানুষ আছে, কিন্তু তারা সৃষ্ট নয় — প্রলয়ের পর বেঁচে যাওয়া দু’জন, আর তাদের নাম য়ুনচকবা ও য়ুনচকমে। আর তারা ভাই-বোন।

দেবতার ধারা: গোজেন থেকে মাহ লখী মা

চাকমা সৃষ্টিকথার সবচেয়ে অস্বাভাবিক দিক হলো এটি একজন সৃষ্টিকর্তার গল্প নয় — পরপর কয়েকজন দেবতার, আর প্রত্যেকে একটি নির্দিষ্ট সমস্যা সমাধান করতে আসেন।

কেকী সমস্যাকী করেন
গোজেন (পাঠে: অর্থাৎ ঈশ্বর)কিছুই নেইবটগাছ, স্থলভাগ, প্রথম মানব ও মানবী
কালেইয়্যাহিমপাত ও দুর্ভিক্ষ (কভাৎ, পাঠে অর্থ: মন্বন্তর)হিমপাত থামান, কিন্তু দুর্ভিক্ষ থামে না
বিয়াত্রা (গঙ্গাপুত্র)খাদ্য ও বাসস্থানভুট্টা, যব, জোয়ার; আর আগুনের ব্যবহার ও গৃহনির্মাণের কৌশল
মাহ লখী মা (মহালক্ষী মা)স্থায়ী অন্নসংস্থানজুমচাষের ব্যবস্থা

ধারাটির গঠন ক্রমবর্ধমান: প্রত্যেকে আগেরজনের অসম্পূর্ণ কাজ সম্পূর্ণ করেন। আর প্রত্যেকেরই একটি ব্যর্থতা আছে — কালেইয়্যা দুর্ভিক্ষ থামাতে পারেন না, আর পরে স্বর্গে গিয়ে মাহ লখী মা-কে আনতেও ব্যর্থ হন।

সেই ব্যর্থতার কারণটি পাঠে বিস্তারে আছে, আর তা একটি চরিত্র-পরীক্ষা। মাহ লখী মা দু’জনকেই মদ্য ও ভাং দিয়ে আপ্যায়ন করেন; কালেইয়্যা তা গ্রহণ করে মাতাল হয়ে পড়েন আর তাঁকে “কখনো মা’ কখনো ‘দিদি’ সম্বোধন” করতে থাকেন।

বিয়াত্রা একই আপ্যায়ন গ্রহণ করেন, কিন্তু “পান করলেন না, লুকিয়ে এক কোণায় রেখে দিলেন” — আর তাতেই মাহ লখী মা প্রসন্ন হয়ে তাঁর সঙ্গে যেতে সম্মত হন।

অর্থাৎ পরীক্ষাটি সংযমের, শক্তির নয়। আর তার পুরস্কারও পাঠে আছে — পরে মাহ লখী মা বিয়াত্রাকে বর দেন যে তিনি দেবপূজায় সবার আগে পূজা পাবেন।

আর্কাইভের ম্রো সৃষ্টিকথায় দেবতা নেই; সেখানে পরিকল্পনা আসে একজন বৃদ্ধার কাছ থেকে, আর কাজ করে তাঁর নাতি। দুটি পাঠের ফারাকটি তাই কেবল নামের নয় — একটিতে সৃষ্টি স্বর্গ থেকে নেমে আসে, অন্যটিতে মানুষই করে।

দুঃখের বীজ আর তার ঠিকানা

আর্কাইভের কোনো সৃষ্টিকথায় দুঃখকে দুর্ঘটনা বলা হয়নি, কিন্তু ম্রো পাঠে তা একটি পরিকল্পনার অংশ — আর প্রতিটি দুঃখের নির্দিষ্ট ঠিকানাও দেওয়া আছে।

মৃত্তিকা দ্বীপের রাজা প্রাণী ও উদ্ভিদের বীজের সঙ্গে দেন আরও কিছু — রোগ-ব্যাধি, ঝগড়া-ঝাটি, চুরি-ডাকাতি, আলোচনা-সমালোচনা, ছলনা ও ব্যভিচারের বীজ। আর শিখিয়ে দেন কোথায় কোনটি প্রয়োগ করতে হবে।

বীজযেখানে প্রয়োগ করতে বলা হয়
ঝগড়া-বিবাদমদ্যপান আসরে
রোগ-ব্যাধিঝর্ণার ধারে
সমালোচনারমণীদের আড্ডাখানায়
চুরি-ডাকাতিগৃহের সম্মুখে
ব্যভিচারযুবক-যুবতীদের শয়নকক্ষে

তালিকাটি একটি সমাজ-পর্যবেক্ষণ, বসানো একটি সৃষ্টিকথার ভেতরে। প্রতিটি সমস্যা যে জায়গায় সত্যিই দেখা যায়, গল্পে তার বীজ সেখানেই রোপিত।

পাঠের ভাষা তার নিজের সময়ের, আর তালিকার একটি সারি আজকের পাঠকের কাছে আপত্তিকর শোনাতে পারে। তালিকাটি এখানে পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই দেওয়া হলো, বদল ছাড়া।

চাকমা পাঠেও দুঃখের একটি উৎপত্তি আছে, কিন্তু অন্যভাবে — অভিশাপে। জঘনা প্রজাতির গাছেরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তারা চিরকাল প্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখবে, কিন্তু এক-দু’মাসেই ফল শেষ হয়ে যায়। রেগে গিয়ে কালেইয়্যা দেবতা তাদের অভিশাপ দেন, আর সেই থেকে জঘনা ফল মানুষের অখাদ্য।

সূর্য ও চাঁদ: তিনটি আলাদা ব্যাখ্যা

আকাশের ঘটনা নিয়ে আর্কাইভে তিনটি পাঠ আছে, আর তিনটিরই ব্যাখ্যা আলাদা — একটিতে সূর্য শাস্তি পায়, একটিতে তার পথ আটকে দেওয়া হয়, আর একটিতে চাঁদ একজনের প্রেমিক।

পাঠসূর্য বা চাঁদের ভূমিকাব্যাখ্যা
ম্রো চাফির সাংচিয়াসূর্য এক ঘাতক — যমজ ভাইয়ের মা-বাবার মৃত্যুর কারণশাস্তির পর চাঁদ-সূর্য বদল হয়ে যায়; আর ডিম না দিলে গ্রহণ হয়
গারো সূৰ্য্য গ্রহণসালগ্রা (সুর্য দেবতা) একজন অতিথি, যিনি বিশ্বাসভঙ্গ করেনতাঁর পথে একটি গাছ পুঁতে দেওয়ায় পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়
ত্রিপুরা চাঁদের ছেলে সোনাব্যাঙচন্দ্রমাদেব একজন প্রেমিকতাঁর সন্তান পৃথিবীতে রাজা হয়

তিনটি ব্যাখ্যার মধ্যে একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে: সূর্য ও চাঁদ কোনোটিতেই নিছক বস্তু নয় — তারা চরিত্র, যাদের সঙ্গে কথা বলা যায়, ঝগড়া করা যায়, কিংবা প্রেম করা যায়।

আর তিনটিতেই একটি দ্বন্দ্ব থেকে আকাশের বর্তমান অবস্থা তৈরি হয় — অর্থাৎ আকাশ একটি সমাধানের ফল, শুরু থেকে এমন নয়।

ম্রো যমজ ভাই: লোহার খাঁচা আর আকাশের প্রহরীরা

ম্রো চাফির সাংচিয়া আর্কাইভের একমাত্র পাঠ যেখানে কেউ সূর্যকে ধরতে যায় — আর তার জন্য একটি লোহার খাঁচা বানানো হয়।

কারণটি ব্যক্তিগত, আর তা উন্মোচিত হয় দাদীর মুখে একটি অপমানের পর। যমজ মুম ও মীয়া ছিল উগ্র ও অবাধ্য; শেষে দাদী রেগে বলে ফেলেন — “তোমাদের মা-বাবাকে সূর্য-দেবতা খেয়ে ফেলেছে।”

ব্যাখ্যাটিও তিনি দেন, আর তা পাহাড়ের গ্রীষ্মেরই: বাবা “গয়াল শিকার করতে” গিয়ে প্রচণ্ড তাপে মারা যান, আর মা গ্রীষ্মের কাঠফাটা দুপুরে সন্তান প্রসবের পরেই।

প্রতিশোধের পরিকল্পনাটি প্রযুক্তিগত। সূর্য যে পথ দিয়ে আসে সেই পথে লোহার খাঁচা বসিয়ে দেওয়া হবে, আর সূর্য ঢুকলেই দরজা বন্ধ। সঙ্গে অস্ত্র — তীর-ধনুক ও তলোয়ার।

আর অস্ত্রের সঙ্গে একটি আঠাও: দুই ভাই বট ও অশ্বত্থ গাছের কষ বের করে সূর্যের গায়ে নিক্ষেপ করার পরিকল্পনা করে, যাতে সে দুর্বল হয়ে পড়ে।

সূর্যের পথের বর্ণনাটি ভৌগোলিক — “দুই পাহাড়ের মাঝখানে একটা বিরাট গিরির সুরঙ্গ পথ”, আর পথের দু’ধারে বড় বড় বট ও অশ্বত্থ গাছ।

কিন্তু গল্পের সেরা অংশটি সূর্যের আসার আগে। রাতভর তিনজন আলোকপিণ্ড একের পর এক আসে, আর দুই ভাই প্রত্যেককে থামিয়ে পরিচয় জিজ্ঞেস করে:

  • সন্ধ্যাতারা — পরিচয় দেয়, “সূর্যের নিরাপত্তা প্রহরী”
  • চাঁদ বা শশী কুমার — তার কাজ, সূর্য অস্ত গেলে কালোরাত্রি মুছে ফেলা আর জ্যোৎস্না দিয়ে পৃথিবী আলোকিত করা
  • শুকতারা — “সূর্যের দেহরক্ষী”, আর সে আগে আগে আসে “রাস্তা-ঘাট ঠিক আছে কিনা তা দেখার জন্য”

এই তিনটি পরিচয় একসঙ্গে একটি পূর্ণ আকাশ-শৃঙ্খলা তৈরি করে — সূর্য একজন শাসক, আর তার প্রহরী, দেহরক্ষী ও পথ-পরিদর্শক আছে।

চাঁদকে ছেড়ে দেওয়ার কারণটিও সুন্দর। মীয়া বলে, “তাহলে শীঘ্রই চলে যাও। তোমার জন্য পৃথিবীর সমস্ত জীব অপেক্ষা করছে।” অর্থাৎ প্রতিশোধকামীরাও চাঁদের কাজটিকে প্রয়োজনীয় মানে।

পরিণতি দুটি — শাস্তি ভোগের পর “তখন থেকে চাঁদ-সূর্য বদল হয়ে গেলো”, আর যখন যমজ ভাইদের ডিম দেওয়া যায় না তখন সূর্যগ্রহণ হয়; চন্দ্রগ্রহণের বেলায়ও একইরকম হয় বলে ম্রোরা মনে করেন।

অর্থাৎ গ্রহণ এখানে একবারের ঘটনা নয় — একটি পুনরাবৃত্ত লেনদেনের ব্যর্থতা। প্রতিবার ডিম না দিলে প্রতিবার গ্রহণ।

গারো সূর্যগ্রহণ: পথ আটকে দেওয়া

গারো পাঠে সূর্যগ্রহণের কারণ কোনো যুদ্ধ নয়, কোনো শাস্তিও নয় — একটি গাছ পুঁতে রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া।

গল্পের শুরু একটি অস্বাভাবিক জন্ম দিয়ে। আনিং জিনজিনি সাত বছর গর্ভে ধারণ করে, সাত দিন গর্ভযাতনার পর জন্ম দেন মুনী-কে, যার “পাকস্থলী বলতে কিছুই নাই” আর যার বৃদ্ধিও হয় না।

রাগে ও লজ্জায় মুনীকে ফেলে দেওয়া হয় একটি বিরাট পাথরের উপর। সেখান থেকে এক পাখি তাকে তুলে নিয়ে একটি মরা ডালে বসে, আর তখনই তার চোখ ঘুমে ঢুলু ঢুলু হয়ে আসে — মুনী হাত থেকে পড়ে যায় সাতটি বাঁশঝাড়ের তলায়, আর সেখানে একটি সতেজ গাছ হয়ে গজিয়ে ওঠে।

অর্থাৎ মুনীর ধর্মই ঘুম, আর গল্পের বাকি অংশ সেই ধর্মেরই প্রমাণ। ধনী নিবা আজেফা মুনীর গায়ে অস্ত্র ঠেসান দিয়ে ভাত খেতে বসে ঘুমে অচেতন হয়ে পড়েন। পরামর্শ পেয়ে তিনি মুনীর গোড়া কাপড়ের কোণায় বেঁধে নেন — আর তারপর যার সঙ্গেই দেখা হয়, সে ঘুমিয়ে পড়ে: সজারু, গোসাপ, খেকশিয়াল, খরগোশ, বুনোছাগল।

বাজারেও একই — দোকানি তাকে দেখামাত্র ঘুমে জড়িয়ে আসে, আর দরদামের প্রয়োজন পড়ে না। “সে যে দাম বলে দোকানী সেই দামেই তাকে জিনিষ দিয়ে দেয়।”

গল্পের সংকটটি আলাদা, আর তা অতিথির বিশ্বাসভঙ্গের। পথে সালগ্রা — পাঠে বন্ধনীতে অর্থ, সুর্য দেবতা — নিবা আজেফার বাড়িতে বেড়াতে যান, আর গৃহকর্তার অনুপস্থিতিতে তাঁর স্ত্রী রেছি দিলজের সঙ্গে জোর করেন।

প্রতিশোধের উপায়টি তখন সেই ঘুমের গাছ। পরামর্শমতো নিবা আজেফা সালজং ফাৎরা গুহার দরজায় রাস্তার মাঝখানে গর্ত করে মুনীকে পুঁতে রাখেন, আর তাতেই সালগ্রা এক পা-ও অগ্রসর হতে পারেন না।

ফল সঙ্গে সঙ্গে: “পৃথিবী অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে গেল।” অর্থাৎ গ্রহণ মানে সূর্যের পথে কিছু পুঁতে রাখা হয়েছে।

উদ্ধারকাজটিও প্রাতিষ্ঠানিক — সালগ্রার অনুচরেরা পরামর্শ সভা ডাকেন, ভার দেওয়া হয় ওয়াসিফা ওয়াকসংফার উপরে, আর তিনি দরজার এক কিনার দিয়ে গিয়ে মুনীকে এক টানে তুলে ফেলেন। “পৃথিবী আবার সূর্যের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল।”

পাঠের শেষটি কোনো মীমাংসা নয়, পালানো — নিবা আজেফা সব সম্পদ ছেড়ে রেছি দিলজের হাত ধরে “সমতল ভূমির দিকে দৌড়ে পালাতে” থাকেন।

চাঁদের সন্তান: ত্রিপুরা পাঠ

ত্রিপুরা চাঁদের ছেলে সোনাব্যাঙ-এ আকাশের দেবতা শাস্তি দেন না বা পথ আটকে পড়েন না — তিনি একজন মানুষের প্রেমিক হন, আর তার ফল একটি সামাজিক সংকট।

শুরু দৃষ্টি বিনিময়ে। কুফুর আনমনা হয়ে চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকে, আর “চাদের ভিতর থেকে এক সুন্দর পুরুষ” তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। পাঠে তাঁর পরিচয়: “এই লােকটি হল স্বয়ং চন্দ্রমাদেব।”

তারপর স্বপ্ন, আর স্বপ্ন থেকে বাস্তব — একরাতে কুফুর স্বপ্নে দেখে চন্দ্রমাদেব এসে বলছেন, “কুফুর আমি এসেছি। তুমি আমাকে গ্রহণ করো।” পরদিন রাতে সে জেগে থাকে, আর মিলন শুরু হয়।

সংকটটি সামাজিক, আর তা গল্পের আসল বিষয়। কুফুর গর্ভবতী হলে সে সত্যিটাই বলে, কিন্তু কেউ বিশ্বাস করে না — “মানুষের সঙ্গে দেবতার মিলন কি করে সম্ভব হবে?”

আর তারপর দায় চাপে অন্য একজনের উপর। যেহেতু বাড়িতে আর কোনো পুরুষ নেই, গ্রামের লোকেরা ধরে নেয় দায়ী মামা নিজেই — “লজ্জায় মামা যেন মাটিতে মিশে গেল।”

শাস্তিটিও সামাজিক: কুফুরকে গ্রাম থেকে বের করে দিতে হবে, নইলে মামা-মামীকে একঘরে করা হবে। শেষে মামা তাকে “একটা পুরোনো জুমের গীয়রিঙ-এ” রেখে আসেন।

অর্থাৎ দেবতার সঙ্গে সম্পর্কের ফল সম্মান নয়, নির্বাসন। আর্কাইভের সৃষ্টি-সংক্রান্ত পাঠগুলোর মধ্যে এটিই একমাত্র যেখানে অলৌকিক ঘটনার মূল্য একজন নারীকে দিতে হয়।

গল্পের শেষে তার সন্তান চন্দ্রকুমার রাজা হয়, আর প্রজারা তাকে ডাকে ফা — পাঠে অর্থ দেওয়া, পিতা। আর তিনি পরে মনু নদীর তীরে এক পর্বতে চলে যান।

রঙধনু কেন আবছা: চাক পাঠ

চাক শরিমনবিক মননাং আর্কাইভের একমাত্র পাঠ যা রঙধনুর ব্যাখ্যা দেয়, আর ব্যাখ্যাটি একটি লজ্জার।

প্রলয়ের পর বেঁচে থাকে দু’জন — য়ুনচকবা ও য়ুনচকমে, ভাই ও বোন। পৃথিবীতে পানি শুকিয়ে গেছে, আর তৃষ্ণার্ত অবস্থায় তারা কেবল একটি কামারের দোকান খুঁজে পায়।

কামারের শর্তটি গল্পের কেন্দ্র: “ভাইবোন হলে পানি দিতে পারব না। তবে স্বামীস্ত্রী হলে পানি দিতে পারি।”

আর শর্তটি মারাত্মক হয়ে ওঠে একটি নিয়মের কারণে, যা পাঠে আগেই বসানো — “তখনকার আমল কিন্তু সত্যযুগ। যা মুখে বলে তাই ঘটে।”

প্রথমবার তারা উত্তর না দিয়েই ফিরে আসে। গাছের ছায়ায় বসে আলোচনা করতে করতে বোন বলে, “মরণের চেয়ে স্বামীস্ত্রী পরিচয় দিয়ে কামারের কাছে পানি পান করি” — আর ভাই লজ্জায় কথাটি বলতে পারে না; বলে বোন।

পরিণতি পাঠে স্পষ্ট: ভাই লজ্জায় পালিয়ে আত্মহত্যা করে, আর সেই লজ্জার কারণেই আকাশে ওঠার সময় সে অস্পষ্টভাবে দেখা দেয়।

অর্থাৎ রঙধনু একজন মানুষ, আর তার আবছা হওয়ার কারণ লজ্জা। আর্কাইভের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত কিন্তু সবচেয়ে ভারী উৎপত্তি-ব্যাখ্যাগুলোর একটি।

“সত্যযুগে মুখের কথা ফলে যেত” — এই একই ধারণা আর্কাইভের চাকমা হঅ্’বি আর ধঅ্’বি-তেও আছে, প্রায় একই ভাষায়, আর সেখানেও তা একটি অনিচ্ছাকৃত অভিশাপ তৈরি করে।

জুমচাষ কীভাবে এল

আর্কাইভে জুমচাষের উৎপত্তি ব্যাখ্যা করে একটি পাঠ — চাকমা সৃষ্টিকথার দ্বিতীয়ার্ধ — আর সেখানে জুম কোনো আবিষ্কার নয়, একজন দেবীর শেখানো পদ্ধতি।

মাহ লখী মা স্বর্গ থেকে আসার সময় সঙ্গে নেন “ধান্যসহ যাবতীয় খাদ্যশষ্যের এবং সজীর বীজ একটি করে”, বাঁধা একটি কাপড়ের পুঁটলিতে।

পথে দুধ-সাগর পার হওয়ার পর্বটি আর্কাইভের সবচেয়ে সহযোগিতামূলক দৃশ্য — কাঁকড়া ভাসে, শুকর তার পিঠে দাঁড়ায়, মাকড়সা পেটের আঁশ দিয়ে এপার-ওপার বাঁধে, আর মে-মে ছাগলী পাখিটি দেবীকে পিঠে নিয়ে উড়ে গিয়ে শুকরের পিঠে বসে।

আর চারজনের প্রত্যেকে একটি বর পান, আর চারটিই উৎপত্তি-ব্যাখ্যা: কাঁকড়া জলে-স্থলে সমানভাবে চলবে; শুকর পশুকুলে সবচেয়ে বেশি চর্বির অধিকারী হবে; মাকড়সার পেটের আঁশ কখনো ফুরোবে না; আর বিয়াত্রা দেবপূজায় সবার আগে পূজা পাবেন।

জুমের পর্বটি আরও ব্যবহারিক। দেবী বুড়ো মিচ্ছিঙ্যাকে দিয়ে একের পর এক কাজ করান — মাঘ-ফাল্গুনে জুমক্ষেত চিহ্নিত করা, জঙ্গল কাটা, চৈত্রের শেষে পোড়ানো — আর নিজে গিয়ে বীজ রোপণ করেন।

আর একটি উপকাহিনি আছে যা পাহাড়ের চাষির একটি বাস্তব কষ্টকে ব্যাখ্যা করে: দেবী আগাছা সাফ করে জুমের উত্তর প্রান্তের একটি গর্তে ঢুকিয়ে পাথর চাপা দিয়ে রাখেন, আর বুড়োকে নিষেধ করেন সেদিকে যেতে।

কৌতূহলে বুড়ো পাথর সরিয়ে দেন, আর আগাছারা “হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে এসে সারা জুমক্ষেত জুড়ে” বসে পড়ে। দেবীর মন্তব্যটিই উপসংহার: “বুড়ো, তুমি জুমচাষীদের জুম নিড়ানির কাজটা শুধু শুধু বাড়িয়ে দিয়ে এলে।”

অর্থাৎ জুমে আজ যে আগাছা নিড়াতে হয়, তার দায় একটি লঙ্ঘিত নিষেধের।

পাহাড়ের খাবার ও জুমজীবন নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি-তে।

প্রথা ও পূজার জন্ম

আর্কাইভের সৃষ্টি-সংক্রান্ত পাঠগুলোর কয়েকটি কেবল প্রকৃতি ব্যাখ্যা করে না — একটি চলতি আচারের সূচনাও ব্যাখ্যা করে।

পাঠযে আচারের সূচনা
চাকমা সৃষ্টির আদিকথামাহ লখী মা অদৃশ্যভাবে থাকবেন ধানের শিষ এবং ধান ও চালের ঝুড়িতে; আর বিয়াত্রা দেবপূজায় সবার আগে পূজা পাবেন
ত্রিপুরা রক্তপিয়াসি দেবতাচৌদ্দ দেবতার পূজায় ছাগল বলি; পূজা আষাঢ় মাসের শুক্লা অষ্টমী থেকে সাত দিন
ত্রিপুরা অলস পুরোহিতবুড়াচা পূজা বাধ্যতামূলক; আর পূজা পরিচালনাকারীকে বলা হয় ‘ডেঙ্গা ওচাই’
তঞ্চঙ্গ্যা কলাত্থুর কন্যামামা ভাগিনার নববধূকে প্রথম দেখার দিন আকাশে তারা না ওঠা পর্যন্ত ভাত খান না

এই দলটি কাঠামোগতভাবে আলাদা, কারণ এখানে গল্পের দাবি যাচাইযোগ্য — আচারটি আজও আছে কি না, তা জিজ্ঞেস করা যায়।

আর দুটি পাঠ নিজেই সেই দাবি করে। তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে লেখা, “সেই রীতির প্রচলন এখনও আছে”; আর ত্রিপুরা পাঠে পূজার সময়কাল তারিখ ধরে দেওয়া।

সেজন্যই এই পাঠগুলো রূপকথার চেয়ে কিংবদন্তির কাছাকাছি — আর আর্কাইভের দুটি উৎস-গ্রন্থের শিরোনামেই “কিংবদন্তি” শব্দটি আছে।

[এই আচারগুলো আজ কোন অঞ্চলে কতটা চালু, তা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]

চৌদ্দ দেবতা: যে পূজার সূচনা একটি রাজার গল্পে

ত্রিপুরা রক্তপিয়াসি দেবতা ৬৪৩ শব্দের একটি ছোট পাঠ, কিন্তু আর্কাইভে এটিই একমাত্র যা একটি নির্দিষ্ট পূজার সূচনা তারিখ ধরে ব্যাখ্যা করে।

গল্পের পটভূমি রাজসভা। রাজা ত্রিলোচন ত্রিপুরা রাজ্য শাসন করেন, আর তিনি “হিরাবতী রানির একমাত্র ছেলে”। রানি-মা হিরাবতীর বর্ণনাটিও পাঠে আছে — রানি হওয়া সত্ত্বেও তিনি ছিলেন “অসাধারণ নারী”।

শিরোনামের দেবতাটি রক্ত চায়, আর গল্পের পরিণতি সেই দাবির একটি মীমাংসা।

শেষ বাক্যগুলোতেই পাঠের আসল কাজ: চৌদ্দ দেবতার উদ্দেশ্যে ছাগল বলি দেওয়া একটা প্রথা হয়ে দাঁড়াল, আর পূজার সময়কালও দেওয়া — “চৌদ্দ দেবতার পূজা আষাঢ় মাসের শুক্লা অষ্টমী থেকে শুরু হয়ে সাত দিন ধরে চলে।”

এই এক বাক্যে তিনটি যাচাইযোগ্য তথ্য আছে — কোন দেবতা, কোন মাস, কত দিন। আর্কাইভের অন্য কোনো উৎপত্তি-কাহিনি এত নির্দিষ্ট নয়।

সেজন্যই পাঠটির অবস্থান রূপকথা ও ইতিহাসের মাঝখানে। গল্পের ঘটনাগুলো অলৌকিক, কিন্তু তার উপসংহারটি একটি চলতি পঞ্জিকার তথ্য।

আর্কাইভে এই ধরনের আরেকটি পাঠ ত্রিপুরা অলস পুরোহিত, যেখানে বুড়াচা পূজা কেন বাধ্যতামূলক আর ডেঙ্গা ওচাই কে — দুটোই ব্যাখ্যা করা আছে। ওচাই শব্দের অর্থও আর্কাইভে দেওয়া: গ্রামের পুরোহিত।

[চৌদ্দ দেবতার পূজার বর্তমান আচার, স্থান ও সময় কোনো পঠিত উৎসে যাচাই করা হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]

প্রলয়: যে সৃষ্টিকথা শুরু হয় শেষ দিয়ে

আর্কাইভের ছয়টি সৃষ্টিকথা শুরু হয় শূন্যতা বা পাথর থেকে, কিন্তু চাক পাঠটি শুরু হয় একটি ধ্বংস থেকে — আর সেটিই তাকে আলাদা করে।

পাঠের প্রথম বাক্যেই শর্তটি: পৃথিবীতে প্রলয় হলে “গাছপালা, জীবজ পশুপাখি ও মানুষ সবাই মারা যায়”, আর পানি পর্যন্ত শুকিয়ে যায়।

পাঠে শব্দটির পাশে বন্ধনীতে একটি প্রতিশব্দও দেওয়া আছে — কেয়ামত। অর্থাৎ কথক ধারণাটি বোঝাতে একটি পরিচিত শব্দ ব্যবহার করেছেন।

এরপর যা বাকি থাকে তা দুই মানুষ আর একটি কামারের দোকান। আর সেই দোকানই গল্পের একমাত্র প্রতিষ্ঠান — প্রলয়ের পরেও একজন কামার আছেন, আর তিনি শর্ত দিতে পারেন।

গঠনের দিক থেকে এটি আর্কাইভের অন্য সৃষ্টিকথাগুলোর উল্টো দিক। অন্যগুলোতে প্রশ্ন ছিল — কিছু না থাকলে কীভাবে সব হয়; এখানে প্রশ্ন — সব হারানোর পর কীভাবে আবার শুরু হয়।

আর উত্তরটি অস্বস্তিকর: শুরু হয় একটি মিথ্যা পরিচয় দিয়ে, আর সেই মিথ্যা সত্যযুগের নিয়মে সত্যি হয়ে যায়।

চাকমা পাঠেও একটি প্রায়-প্রলয় আছে, কিন্তু মাঝপথে। বংশ বেড়ে চলার পর নামে প্রচণ্ড হিমপাত, ফলবান গাছ কমে যায়, আর দেখা দেয় কভাৎ — পাঠে অর্থ, মন্বন্তর।

পার্থক্যটি কাঠামোগত। চাকমা পাঠে দুর্যোগের পর দেবতা পাঠানো হয়; চাক পাঠে কেউ আসে না — দুই মানুষকেই উপায় বের করতে হয়।

যে পাঁচটি পাঠে কথকের নাম ও গ্রামের নাম আছে

আর্কাইভের ১২৫টি পাঠের মধ্যে মাত্র পাঁচটিতে কথকের নাম এবং তাঁর স্থানের নাম দুটোই দেওয়া আছে — আর পাঁচটিই গারো সংগ্রহের।

দুজন কথকের নাম আছে। ধরণ সিং সাংমা (তুরা, গারো হিলস্) চারটি পাঠে — নীরে-সিনজে, মিকখল, মাৎছা-দু-মাৎছা-বেৎ ও ক্ষেত পাহারা। আর দিংবান মারাক রাকসাম (গ্রাম: রংবিংগিরি, গারো হিলস্) একটিতে — সূৰ্য্য গ্রহণ।

গারো সংগ্রহে মোট সাতটি পাঠ, তাই পাঁচটিতে কথকের নাম থাকার অর্থ এই একটিমাত্র সংগ্রহই মাঠ-সংগ্রহের নথি হিসেবে কাজ করে। বাকি দুটির একটিতে লেখা “রূপকথাটি সঞ্জীব দ্রং কর্তৃক বর্ণিত”, আর অন্যটিতে একটি বইয়ের নাম।

এই পাতার বিষয়ের দিক থেকে সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক পাঠটি দিংবান মারাক রাকসামের — সূৰ্য্য গ্রহণ।

পাঠের একেবারে শেষে লেখা: “কথকঃ দিংবান মারাক রাকসাম, গ্রাম: রংবিংগিরি গারো হিলস্”।

এই এক লাইনে তিনটি তথ্য আছে, আর তিনটিই লোককথা সংগ্রহের দৃষ্টিতে মূল্যবান:

  • শব্দটি “লেখক” নয়, “কথক” — অর্থাৎ তিনি গল্পটি বলেছেন
  • তাঁর নাম — দিংবান মারাক রাকসাম
  • তাঁর গ্রাম ও অঞ্চল — রংবিংগিরি, গারো হিলস্

আর্কাইভের গারো সংগ্রহের বাইরে এর কোনোটিই নেই। অধিকাংশ পাঠে কেবল বইয়ের নাম; কিছুতে “লেখক”; তিনটিতে “বর্ণিত”। মাঠ-সংগ্রহের স্থান কেবল গারো পাঠগুলোতে।

এর ফলে এই পাঁচটি পাঠের মান আলাদা। কেউ চাইলে গ্রামের নাম ধরে খোঁজ করতে পারেন, আর গল্পের অন্য রূপ আছে কি না যাচাই করতে পারেন।

লক্ষণীয়, একটি পাঠে কৃতিত্বের লাইনটি এলোমেলো — “লেখক: কথক ও ধরণ সিং সাংমা”। অর্থাৎ “লেখক” আর “কথক” দুটো শব্দ একসঙ্গে বসে গেছে। [এটি মুদ্রণের ভুল কি না তা কোনো পঠিত উৎসে স্পষ্ট নয়]

পাঠটিতে গারো নাম ও শব্দের সংখ্যাও সবচেয়ে বেশি — আনিং জিনজিনি ছিনিং জিনজিনা, আনাং, মামা দিলথাং, নিবা আজেফা জনজা গিলজেফা, রেছি দিলজে, সালগ্রা, মুনী, আগুদারে রংফাদারে, সালজং ফাৎরা, ওয়াসিফা ওয়াকসংফা, দ্রি আ‘খুছং ছি ব্রাস, আ’খং গিত্তেল।

কয়েকটির বাংলা অর্থও বন্ধনীতে দেওয়া — সালগ্রা (সুর্য দেবতা), নামছিক (বৌ, ভাগ্নী, সম্পর্ক), ছূ বিৎছি (উত্তম মদ)।

সংগ্রাহক ও কথকদের ভূমিকা নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ের লোককথা কে সংগ্রহ করেছিলেন-এ।

সৃষ্টিকথার জন্তুরা: কাঁকড়া, শুকর আর মাকড়সা

আর্কাইভের সৃষ্টিকথাগুলোতে সবচেয়ে কঠিন কাজগুলো করে পশু ও পাখিরা — আর তাদের পুরস্কারও দেওয়া হয়, নাম ধরে।

চাকমা পাঠে তিনটি প্রাণী দুধ-সাগর পার করায়, আর প্রত্যেকের কাজ আলাদা। কাঁকড়া ভাসে, শুকর তার পিঠে দাঁড়ায়, আর মাকড়সা পেটের আঁশ দিয়ে এপার-ওপার বেঁধে দেয় — যাতে ধরে ধরে পার হওয়া যায়।

আর চারজনের বরগুলোই উৎপত্তি-ব্যাখ্যা: কাঁকড়া জলে-স্থলে সমানভাবে চলতে পারবে; শুকর পশুকুলে সবচেয়ে বেশি চর্বির অধিকারী হবে; মাকড়সার পেটের আঁশ কখনো ফুরোবে না; আর বিয়াত্রা দেবপূজায় সবার আগে পূজা পাবেন।

লক্ষণীয়, একই চাকমা পাঠের শুরুতেও মাটি আনে একটি প্রাণী — কাঁকড়া-দৈত্য। অর্থাৎ পৃথিবীর শুরু আর দেবীর আগমন, দুটোতেই কাঁকড়া আছে।

ম্রো পাঠে বাহক পাকচারুয়া, আর বাধা দেয় একটি তিমি মাছ — আর তা দেয় নীতির কারণে, কারণ মাটি চুরি করা হয়েছিল। অর্থাৎ তিমি এখানে একজন রক্ষক, বাধা নয়।

গারো পাঠে শিশুটিকে প্রথমে তুলে নেয় একটি পাখি, আর তার ঘুমিয়ে পড়াতেই মুনী মাটিতে পড়ে গাছ হয়ে ওঠে। পরে যারা মুনীর সংস্পর্শে ঘুমিয়ে পড়ে, তাদের তালিকাও পাঠে নাম ধরে — সজারু, গোসাপ, খেকশিয়াল, খরগোশ, বুনোছাগল।

আর চাকমা পাঠের শেষ অংশে খবর ছড়ায় পেঁচা, সারারাত উড়ে উড়ে কু-লু-লু শব্দে — আর পুরস্কারের সোনার টোপর পেয়ে যায় একটি কাঠঠোকরা।

এই শেষ জোড়াটি আর্কাইভে আরেকবার ফিরে আসে, আর তা অন্য জনগোষ্ঠীর পাঠে — তঞ্চঙ্গ্যা বাঘ ও শূকরের মিতালী-তে পেঁচা সারারাত ডাকাডাকি করেও ভোররাতে ঘুমিয়ে পড়ে, আর সিংহ সোনার মুকুট দেন কাঠঠোকরাকে।

দুটি পাঠে জনগোষ্ঠী আলাদা, কাহিনি আলাদা, কিন্তু অভিযোগটি হুবহু এক — সারারাতের পরিশ্রম গেল পেঁচার, আর পুরস্কার পেল কাঠঠোকরা।

তিনটি সাধারণ ধারা

সাতটি পাঠের কাহিনি আলাদা, জনগোষ্ঠী আলাদা, উত্তরও আলাদা — তবু তিনটি ধারা সবগুলোতেই ফিরে আসে।

এক — সৃষ্টি একবারে শেষ হয় না। চাকমা পাঠে পৃথিবী তৈরি হওয়ার পরও হিমপাত আসে, দুর্ভিক্ষ আসে, আর পরপর তিনজন দেবতাকে পাঠাতে হয়। ম্রো পাঠে প্রথম চেষ্টাটি ব্যর্থ হয়। চাক পাঠে সবকিছু একবার ধ্বংস হয়ে যায়। কোনো পাঠেই সৃষ্টি স্থায়ী নয়।

দুই — কাজটি ভাগ করা। চাকমা পাঠে মাটি আনে কাঁকড়া, দুধ-সাগর পার করে চারটি প্রাণী, খবর ছড়ায় পেঁচা। ম্রো পাঠে পরিকল্পনা দাদীর, যাত্রা নাতির, বাহক পাকচারুয়া। গারো পাঠে উদ্ধারকাজের ভার দেওয়া হয় একজনের উপর, পরামর্শ সভার সিদ্ধান্তে। কোথাও একজন সব করেন না।

তিন — প্রকৃতির আজকের চেহারা একটি পুরনো ঘটনার ফল। কাঁকড়া কেন জলে-স্থলে চলে, শুকরের চর্বি কেন বেশি, মাকড়সার আঁশ কেন ফুরোয় না, জঘনা ফল কেন অখাদ্য, রঙধনু কেন আবছা, গ্রহণ কেন হয়, জুমে কেন আগাছা — সাতটি পাঠ মিলিয়ে অন্তত পনেরোটি এমন ব্যাখ্যা আছে।

আর একটি ধারা আলাদা করে বলার মতো। আর্কাইভের সৃষ্টিকথাগুলোতে সৃষ্টিকর্তা অভ্রান্ত নন। গোজেন নিজের ছায়াকে অন্য কেউ ভেবে প্রশ্ন করেন আর “লজ্জিত” হন; কালেইয়্যা মাতাল হয়ে ব্যর্থ হন; মৃত্তিকা দ্বীপের মাটি প্রথমবার চুরি হয়ে যায়; আর গারো পাঠে সূর্য দেবতা নিজেই অতিথির মর্যাদা ভাঙেন।

পাহাড়ের অন্য সব গল্পের সূচি ও মোটিফের গণনা আছে পাহাড়ের রূপকথার পূর্ণ সূচিতে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

আর্কাইভে আদিবাসী সৃষ্টিকথা কতটি আছে?

সরাসরি পৃথিবী, আকাশ বা কোনো মহাজাগতিক ঘটনার ব্যাখ্যা দেয় সাতটি পাঠ — চাকমা একটি, ম্রো দুটি, গারো একটি, চাক একটি আর ত্রিপুরা দুটি। এছাড়া সৃষ্টি-সংক্রান্ত আলোচনা আছে মোট ১৭টি পাঠে।

চাকমা সৃষ্টিকথায় পৃথিবী কীভাবে হলো?

পাঠ অনুযায়ী শুরুতে ছিল কেবল অপার-অনন্ত স্থির জলরাশি ও নিঃসীম অন্ধকার। গোজেন সমুদ্রের উপর একটি বিশাল বটগাছ সৃষ্টি করে তার পাতায় আসন গেড়ে ধ্যানে বসেন, আর এক কাঁকড়া-দৈত্য সমুদ্রের তলা থেকে মাটি এনে বটগাছের শিকড় ঘিরে জমিয়ে স্থলভাগ তৈরি করে।

চাকমা লোককথায় প্রথম মানুষের নাম কী?

প্রথম মানব কেদুগা — গোজেনের নিজের ছায়াকে প্রাণ দিয়ে সৃষ্ট — আর প্রথম মানবী কেদুগী, যাঁকে গোজেন নিজের শরীরের ময়লা (চাকমা ভাষায় ‘ড্রিং’) থেকে সৃষ্টি করেন।

ম্রো সৃষ্টিকথায় চুরি করা মাটি দিয়ে পৃথিবী হয় না কেন?

পাঠে কারণটি সরাসরি দেওয়া। প্রথমবার পাকচারুয়া মাটি চুরি করে আনে, আর সমুদ্র পার হওয়ার সময় তিমি মাছ তা ছিনিয়ে নেয়। দাদীর কথায় — “চুরি করে মৃত্তিকা আনলে কোনো দিনও ভূমি সৃষ্টি হবে না।” তাই ক্লাংচা নিজে গিয়ে মৃত্তিকা দ্বীপের শাসনকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নেয়।

ম্রো সৃষ্টিকথায় জল আর স্থলের অনুপাত কত?

পাঠে সংখ্যা ধরে দেওয়া — ক্লাংচা মৃত্তিকা কণা দিয়ে তিন ভাগে জল আর এক ভাগে স্থল সৃষ্টি করে।

সূর্যগ্রহণের ব্যাখ্যা আর্কাইভে কী কী?

দুটি, দুই জনগোষ্ঠীর। ম্রো চাফির সাংচিয়া অনুযায়ী শাস্তি ভোগের পর চাঁদ-সূর্য বদল হয়ে যায়, আর যখন যমজ ভাইদের ডিম দেওয়া যায় না তখন গ্রহণ হয়। গারো সূৰ্য্য গ্রহণ অনুযায়ী সূর্য দেবতার পথে একটি ঘুম-ধরানো গাছ পুঁতে রাখায় তিনি এক পা-ও এগোতে পারেন না, আর পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়।

ম্রো গল্পে যমজ ভাই সূর্যকে ধরতে চায় কেন?

দাদীর মুখে তারা জানতে পারে তাদের মা-বাবাকে সূর্য দেবতা খেয়ে ফেলেছে — বাবা গয়াল শিকারে গিয়ে প্রচণ্ড তাপে মারা যান, আর মা গ্রীষ্মের কাঠফাটা দুপুরে সন্তান প্রসবের পরেই। তাই তারা সূর্যের পথে লোহার খাঁচা বসায়।

ম্রো গল্পে আকাশের প্রহরীরা কে কে?

তিনজন, আর প্রত্যেকে নিজের পরিচয় দেয় — সন্ধ্যাতারা বলে সে “সূর্যের নিরাপত্তা প্রহরী”; চাঁদ বা শশী কুমার বলে তার কাজ কালোরাত্রি মুছে জ্যোৎস্না দিয়ে পৃথিবী আলোকিত করা; আর শুকতারা বলে সে “সূর্যের দেহরক্ষী”, আর আগে আগে এসে রাস্তা দেখে নেয়।

গারো গল্পে ‘মুনী’ কী?

একটি অস্বাভাবিক সন্তান, যার পাকস্থলী নেই আর বৃদ্ধিও হয় না। ফেলে দেওয়া হলে সে সাতটি বাঁশঝাড়ের তলায় একটি সতেজ গাছ হয়ে গজিয়ে ওঠে, আর তার ধর্ম ঘুম — যার সঙ্গেই তার সংস্পর্শ হয়, সে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই গাছ সূর্যের পথে পুঁতে রাখাতেই গ্রহণ হয়।

চাকদের রঙধনু গল্পে কী বলা আছে?

প্রলয়ের পর বেঁচে থাকে ভাই-বোন য়ুনচকবা ও য়ুনচকমে। তৃষ্ণার্ত অবস্থায় কামার বলে, ভাইবোন হলে পানি দেবে না, স্বামী-স্ত্রী হলে দেবে। সত্যযুগে মুখের কথা ফলে যেত, তাই কথাটি ফলে যায়। পাঠ অনুযায়ী ভাই লজ্জায় পালিয়ে আত্মহত্যা করে, আর সেই লজ্জার কারণেই আকাশে ওঠার সময় সে অস্পষ্টভাবে দেখা দেয়।

জুমচাষ কীভাবে শুরু হলো — গল্প কী বলে?

চাকমা সৃষ্টিকথার দ্বিতীয়ার্ধ অনুযায়ী মাহ লখী মা বিয়াত্রা দেবতার আমন্ত্রণে স্বর্গ থেকে এসে জুমচাষের ব্যবস্থা করে দেন। তিনি সঙ্গে আনেন সব খাদ্যশস্যের বীজ, আর বুড়ো মিচ্ছিঙ্যাকে দিয়ে জুমের প্রতিটি পর্ব করান — মাঘ-ফাল্গুনে ক্ষেত চিহ্নিত করা, জঙ্গল কাটা, চৈত্রের শেষে পোড়ানো।

জুমে আগাছা হয় কেন — গল্পে কী ব্যাখ্যা?

মাহ লখী মা জুমের আগাছা সাফ করে একটি গর্তে ঢুকিয়ে পাথর চাপা দিয়ে রাখেন, আর বুড়োকে নিষেধ করেন জুমের উত্তর প্রান্তে যেতে। কৌতূহলে বুড়ো পাথর সরিয়ে দিলে আগাছারা বেরিয়ে এসে সারা জুমে বসে পড়ে। দেবীর মন্তব্য — “তুমি জুমচাষীদের জুম নিড়ানির কাজটা শুধু শুধু বাড়িয়ে দিয়ে এলে।”

ম্রো সৃষ্টিকথায় দুঃখের বীজের কথা কী?

মৃত্তিকা দ্বীপের রাজা প্রাণী ও উদ্ভিদের বীজের সঙ্গে দেন রোগ-ব্যাধি, ঝগড়া-ঝাটি, চুরি-ডাকাতি, সমালোচনা, ছলনা ও ব্যভিচারের বীজ — আর কোথায় কোনটি প্রয়োগ করতে হবে তাও শিখিয়ে দেন: ঝগড়ার বীজ মদ্যপান আসরে, রোগের বীজ ঝর্ণার ধারে, সমালোচনার বীজ আড্ডাখানায়, চুরির বীজ গৃহের সম্মুখে।

কোন কোন পাঠে কথকের নাম ও গ্রামের নাম আছে?

পাঁচটিতে, আর পাঁচটিই গারো সংগ্রহের। ধরণ সিং সাংমা (তুরা, গারো হিলস্) চারটি পাঠের কথক — নীরে-সিনজে, মিকখল, মাৎছা-দু-মাৎছা-বেৎ ও ক্ষেত পাহারা; আর দিংবান মারাক রাকসাম (গ্রাম: রংবিংগিরি, গারো হিলস্) সূৰ্য্য গ্রহণ-এর। আর্কাইভের আর কোনো সংগ্রহে মাঠ-সংগ্রহের স্থান দেওয়া নেই।

আদিবাসী সৃষ্টিকথায় কি সৃষ্টিকর্তা অভ্রান্ত?

আর্কাইভের পাঠগুলোতে নন। চাকমা পাঠে গোজেন নিজের ছায়াকে অন্য কেউ ভেবে প্রশ্ন করেন আর “লজ্জিত” হন; কালেইয়্যা দেবতা মাতাল হয়ে ব্যর্থ হন; ম্রো পাঠে প্রথমবার মাটি চুরি হয়ে যায়; আর গারো পাঠে সূর্য দেবতা নিজেই অতিথির মর্যাদা ভাঙেন।

যা এখনো জানা যায়নি

  • পাঠগুলোর পরস্পর সম্পর্ক — একই প্রশ্নের এতগুলো আলাদা উত্তর স্বাধীনভাবে তৈরি, নাকি কোনো সাধারণ উৎস থেকে — তা কোনো পঠিত উৎসে আলোচিত নয়।
  • তিন ভাগ জল, এক ভাগ স্থল — ম্রো পাঠের এই অনুপাতটি কোনো বাইরের তথ্য থেকে এসেছে কি না, তা জানা যায়নি।
  • আচারগুলোর বর্তমান অবস্থা — চৌদ্দ দেবতার পূজা, বুড়াচা পূজা ও মামার ভাত না খাওয়ার নিয়ম আজ কোথায় কতটা চালু, তা কোনো পঠিত উৎসে নেই।
  • নামগুলোর অর্থ — গোজেন, কেদুগা, কেদুগী, কালেইয়্যা, বিয়াত্রা, ক্লাংচা, মুনী, য়ুনচকবা, য়ুনচকমে — এগুলোর ভাষাগত অর্থ পাঠে দেওয়া নেই।
  • পাকচারুয়া ও জঘনা — পাঠে কেবল “এক প্রকার বন্য জন্তু” আর অভিশাপে অখাদ্য হওয়া ফল বলা হয়েছে; প্রচলিত বা বৈজ্ঞানিক পরিচয় নেই।
  • মে-মে ছাগলী — নামে “ছাগলী” থাকলেও পাঠে বলা “এক ধরনের ছোট্ট পাখি”; পাখিটির প্রচলিত নাম জানা যায়নি।
  • গারো পাঠের বাকি নামগুলো — আগুদারে রংফাদারে, সালজং ফাৎরা, দ্রি আ‘খুছং ছি ব্রাস — এগুলো আজকের কোন জায়গা, তা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি।
  • খেয়াং সংগ্রহের পাঁচটি সৃষ্টি-সংক্রান্ত পাঠ — সেগুলোতে শব্দটি প্রসঙ্গক্রমে এসেছে; আলাদা কোনো খেয়াং সৃষ্টিকথা আর্কাইভে আছে কি না তা যাচাই করা যায়নি।

তথ্যসূত্র

এই পাতার সব তুলনা জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত সাতটি পাঠের নিজের লেখা থেকে করা — ঘটনাক্রম, সংলাপ, বন্ধনীতে দেওয়া বাংলা অর্থ, কথক বা লেখকের নাম ও উৎসের নামসহ। উদ্ধৃতিগুলো হুবহু।

  1. চাকমা লোককথা: সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী — উৎস ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা।
  2. সিংইয়ং ম্রো, ক্রংথপ সাংচিয়া (পৃথিবী সৃষ্টির কাহিনী) — উৎস ম্রো রূপকথা, লোককাহিনী ও কিংবদন্তি।
  3. সিংইয়ং মুরুং, চাফির সাংচিয়া (যমজ ভাই-এর গল্প)।
  4. কথক দিংবান মারাক রাকসাম (গ্রাম: রংবিংগিরি, গারো হিলস্), গারো উপকথা: সূৰ্য্য গ্রহণ।
  5. পাই থুই চাক, শরিমনবিক মননাং (চাকদের রঙধনু গল্প)।
  6. ত্রিপুরী রূপকথাঃ চাঁদের ছেলে সোনাব্যাঙ — উৎস ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা।
  7. আবু রেজা, ত্রিপুরা লোককাহিনী: রক্তপিয়াসি দেবতা।

সব দেবতার নাম, ব্যক্তির নাম, স্থানের নাম, জনগোষ্ঠীর নাম ও মূল ভাষার শব্দ আর্কাইভের পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে। কোনো জনগোষ্ঠীর সৃষ্টিকথাকে অন্যটির চেয়ে প্রামাণিক বলা হয়নি, আর কোনো পাঠের ধর্মীয় দাবিকে সমর্থন বা খণ্ডন করা হয়নি — কেবল পাঠে যা লেখা আছে তা তুলে ধরা হয়েছে। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।

প্রসঙ্গ:গারো, চাক, চাকমা, ত্রিপুরা, ম্রো, রূপকথা, লোককাহিনী

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা