Last updated Nov 3rd, 2026
0

চাকমা নববর্ষের উৎসবের নাম বাংলা হরফে লেখা হয় “বিঝু”। শব্দটির প্রথম ব্যঞ্জনের যে ধ্বনি, ইংরেজির z-এর কাছাকাছি, তার কোনো আলাদা অক্ষর বাংলা বর্ণমালায় নেই। তাই বাংলা হরফে পড়ে গান গাইতে গিয়ে অনেক শিল্পী উচ্চারণ করেন “Biju”। আদিবাসী সাহিত্য অনুবাদের সমস্যার এটি একটি নমুনা, আর তা ধরিয়ে দিয়েছিলেন একজন চাকমা লেখক, জুমজার্নালের আর্কাইভেই।
মূল ভাষা থেকে বাংলায় আদিবাসী সাহিত্য অনুবাদের সমস্যাগুলো অনুবাদক, গবেষক আর আমাদের আর্কাইভের লেখাগুলো নিজেরাই নাম ধরে বলেছে: বাংলা হরফে কিছু ধ্বনি লেখা যায় না, স্বরের ওঠানামায় যে অর্থ বদলায় তা হরফে সব জায়গায় ধরা পড়ে না, বানানের কোনো একক মান নেই, অভিধান নেই, আর অনেক লোককথার মূল পাঠ বা কথকের নামই নথিতে নেই। এই লেখায় প্রতিটি সমস্যা কার কথা, কোন ভাষা নিয়ে, তা উৎসসহ সাজানো।
এখানে নিজের কোনো তালিকা যোগ করা হয়নি। প্রতিটি সমস্যা কোনো অনুবাদক, ভাষাবিদ বা প্রকাশিত লেখার মুখে বলা; উদাহরণের অনূদিত লাইনগুলোও প্রকাশিত উৎস থেকে নেওয়া, উৎসের নামসহ। যেসব লোককথা নিয়ে আলাদা লেখা আছে, সেগুলোর কাহিনি এখানে আবার বলা হয়নি, শুধু লিংক দেওয়া হয়েছে।
এই লেখায়
এই লেখার বিষয় একটি দিক: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা (ককবরক), গারো (আচিক) বা অন্য কোনো আদিবাসী ভাষায় বলা বা লেখা সাহিত্য বাংলায় আনা। উল্টো দিকের অনুবাদ, অর্থাৎ বাংলা বা ইংরেজি থেকে আদিবাসী ভাষায়, আলাদা কাজ। তবে দুই দিকের অনুবাদকেরা কয়েকটি একই বাধার কথা বলেন, তাই কোথাও কোথাও সেগুলোও পাশে রাখা হয়েছে, দিকটা স্পষ্ট করে।
জুমজার্নালের আর্কাইভে “অনুবাদ” নামে একটি বিভাগ আছে, তাতে 19টি লেখা। সেগুলোর প্রায় সবই অন্য দিকের: ইংরেজি সংবাদপত্র বা প্রবন্ধ থেকে বাংলায়। যেমন পেরুর আদিবাসী নাম নিবন্ধন নিয়ে দ্য গার্ডিয়ানের একটি প্রতিবেদনের বাংলা অনুবাদ, অনুবাদক জওয়াং রাখাইন; কিংবা খোকন স্যুটেন মুর্মুর লেখা দ্য ডেইলি স্টারের একটি মতামতের বাংলা রূপ, আমাদের আদিবাসী ভাষাগুলোর বর্তমান অবস্থা, অনুবাদক সপ্তর্ষি দেওয়ান। কোনো আদিবাসী ভাষা থেকে বাংলায় আনা লেখা ওই বিভাগে নেই।
মূল ভাষা থেকে বাংলায় আনা কাজের বড় অংশ আর্কাইভে আছে অন্য জায়গায়: রূপকথা ও লোককাহিনির বিভাগে, আর গান-কবিতার পুরোনো প্রবন্ধগুলোর ভেতরে, যেখানে মূল লাইনের নিচে বাংলা অনুবাদ ছাপা।
আর্কাইভের রূপকথা বিভাগে ষোলটি জনগোষ্ঠীর 125টি পাঠ আছে, আর সেগুলোর প্রায় সবই বাংলায়। পাহাড়ের রূপকথা ও লোককাহিনীর পূর্ণ সূচি জানায়, অন্তত একটি পাঠ পুরোপুরি চাকমা ভাষায়, বাংলা লিপিতে: আলোময় চাকমার “সনার চিঝির পশ্চন — মেঘঅ পিধে”। বাকিগুলো বাংলায় বলা।
একই সূচির হিসাবে খেয়াং, ম্রো, চাক ও খুমী সংগ্রহের অনেক পাঠের শিরোনাম মূল ভাষায়, বন্ধনীতে বাংলা অর্থ: “ঙুলুই বেঙসেন চঃ খুই (লাল পিঁপড়ার গল্প)” ধরনের। সূচির ভাষায়, “শিরোনাম দুই ভাষায়, শরীর বাংলায়।” অর্থাৎ পাঠক যা পড়েন, তা কোনো একটি মূল পাঠের বাংলা রূপ, যার মূলটি আর্কাইভে নেই।
মারমা সংগ্রহ নিয়ে আর্কাইভের আলাদা লেখা মারমা রূপকথার ভাণ্ডার অন্য একটি কথা বলে: সেখানে ষোলটি পাঠে লেখকের নাম ছাপা, তাঁদের প্রায় সবাই মারমা, তাই লেখাটির মতে গল্পগুলো “অন্য কারও সংকলন থেকে অনুবাদ করে আনা নয়, নিজেদের লেখা”। মারমা লেখক নিজের সমাজের গল্প বাংলায় লিখছেন, তা কি অনুবাদ না পুনর্লিখন, সেই প্রশ্নটি নিচের কয়েকটি অংশে বারবার ফিরে আসে।
চাকমা ভাষার কয়েকটি ধ্বনির জন্য বাংলা বর্ণমালায় আলাদা অক্ষর নেই, আর বাংলা হরফে লেখা চাকমা শব্দ পড়তে গিয়ে পাঠক বাংলার উচ্চারণই বসিয়ে দেন। এই সমস্যাটি সবচেয়ে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন দেবাশীষ ওয়াংঝা, জুমজার্নালে 2020 সালে প্রকাশিত বাংলা হরফে চাকমা ভাষা উচ্চারণের সমস্যা ও তার সমাধান প্রবন্ধে।
প্রবন্ধটির পাদটীকা জানায়, লেখাটি 19 নভেম্বর 2014 রাঙামাটির রাজবাড়ীতে চাকমা রাজ কার্যালয়ের আয়োজনে, UNDP-র সহায়তায়, “বাংলা ও অন্যান্য হরফে চাকমা ভাষা উচ্চারণের সমস্যা ও তার সমাধান” শীর্ষক পরামর্শ সভায় পড়া প্রবন্ধের সংশোধিত রূপ।
লেখক যে উদাহরণগুলো দিয়েছেন:
এর কারণ ব্যাখ্যা করতে লেখক একটি নাম দিয়েছেন: “first script interference (প্রথম লিপির হস্তক্ষেপ)”। যিনি প্রথমে বাংলা লিপিতে অক্ষর চিনেছেন, তিনি চাকমা শব্দ পড়ার সময় বাংলা বানানের উচ্চারণ-কাঠামো মনে আনেন। লেখক নিজের কথাও বলেছেন: তাঁর প্রথম লিপি ইংরেজি, তাই তিনি Bozo বলেন, Bojo নয়।
তিনি সমস্যাটিকে কেবল চাকমার বলে মনে করেননি। প্রবন্ধে লেখা, বাংলায় শিক্ষিত ত্রিপুরা, মারমা, চাক ও অন্যান্য পাহাড়ি জাতির সদস্যদেরও অনুরূপ সমস্যা হচ্ছে; তবে চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ক্ষেত্রে বাংলার সঙ্গে সাদৃশ্যের কারণে “বাংলা ভাষার হস্তক্ষেপ” প্রকট, আর অন্যদের বেলায় প্রকৃত অবস্থা “কেবল সংশ্লিষ্ট জাতিগোষ্ঠি সদস্যরাই বলতে পারবেন”।
রোমান হরফকেও লেখক পূর্ণ সমাধান বলেননি। mhaw বা nhiye-এর মতো শব্দে ইংরেজির h-যুক্ত ব্যঞ্জনের অভাব সমস্যা করে, আর saan না san, fawth না foth, স্বরবর্ণের এমন প্রশ্নে বাংলার অ-কার, আ-কার, ও-কার বরং সুবিধা দেয়। লেখকের প্রস্তাব, চাকমা লিপিকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে রোমান, বাংলা ও চাকমা তিন বর্ণমালাতেই উচ্চারণের জন্য বিশেষ চিহ্ন যোগ করা।
পরামর্শ সভার সুপারিশও প্রবন্ধে ছাপা: কলকাতায় চাকমা ভাষা ও বর্ণমালার আন্তর্জাতিক সম্মেলন, ধ্বনিতত্ত্ব বিশেষজ্ঞসহ সেমিনার, বানানরীতির কর্মশালা, অপ্রয়োজনীয় বিদেশি শব্দের তালিকা, বিকৃত স্থাননামের প্রকৃত রূপ ফিরিয়ে আনা, আর একটি চাকমা ভাষা বোর্ড বা একাডেমি। সভায় দু-একজন চাকমা বর্ণ ছাড়া অন্য বর্ণ ব্যবহার না করার পক্ষে মত দেন; সংখ্যাগরিষ্ঠরা উচ্চারণের সমস্যা মেটাতে বাংলা বা ইংরেজি হরফ ব্যবহারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। চাকমা লিপির ইতিহাস ও বাংলা হরফ কীভাবে জায়গা নিল, তা আছে চাকমা লিপি (অঝাপাত) লেখায়।
বাংলা হরফে চাকমা সাহিত্য লিখলে শুধু উচ্চারণ নয়, অর্থও সরে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। এ কথা লিখেছেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটের তৎকালীন সহকারী পরিচালক পুলক বরণ চাকমা, প্রথম আলোয় 25 ডিসেম্বর 2013 প্রকাশিত “চাকমা ভাষাচর্চা কোন পথে” লেখায়।
তাঁর বাক্যটি: “বাংলা হরফে চাকমা সাহিত্য চর্চা করতে গেলে ভাষার মূল উচ্চারণ পরিবর্তিত হয়ে এর অর্থ ভিন্ন হওয়ার যথেষ্ট ঝুঁকি থাকে।” তার আগের বাক্যে তিনি সাধারণভাবে বলেছেন, এ দেশের ক্ষুদ্র জাতিগুলোর সাহিত্যচর্চা বাংলা হরফে হলেও “অনেক ক্ষেত্রে উচ্চারণগত সমস্যার সমাধান বাংলা দ্বারা সম্ভব নয়”।
একই লেখায় একটি ঐতিহাসিক তথ্যও আছে, যা দেখায় বাংলা হরফে চাকমা লেখার প্রশ্ন নতুন নয়। 1940-এর দশকের শুরুতে রাঙামাটি হাইস্কুলের ইংরেজ শিক্ষক মি. মিলার চাকমা ছেলেমেয়েদের বাংলা হরফে চাকমা ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখনকার চাকমা সমাজ একে ধর্মান্তরের চেষ্টা মনে করে বিরোধিতা করে, তবু পরে তিনি “চাকমা প্রাইমার” নামে একটি শিশুপাঠ্য বই প্রকাশ করেন। লেখাটি আরও জানায়, 1973 সালে সুগত চাকমা “চাকমা বাঙলা কধাতারা” নামে চাকমা-বাংলা অভিধান রচনা করেন, যাকে চাকমা ভাষার প্রথম অভিধান ধরা হয়।
ককবরকে একই বানানের শব্দ উঁচু বা নিচু সুরে বললে অর্থ বদলে যায়, আর বাংলা হরফে সেই ফারাক দেখানোর একটি পদ্ধতি চালু হলেও তা সব শব্দে কাজ করে না। এ কথা লিখেছেন ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের লেখক গীত্য কুমার রিয়াং, জুমজার্নালে 2019 সালে প্রকাশিত ককবরক বানান সমস্যা লেখায়।
তাঁর উদাহরণ: বাংলা অক্ষরে ককবরক লেখার সময় “আসা” অর্থে লেখা হয় ফায়, “ভেঙে দেওয়া” অর্থে ফাই; “বেঁচে থাকা” থাঙ, “চলে যাওয়া” থাং। অর্থাৎ উচ্চস্বরে ই ও ং, নিম্নস্বরে য় ও ঙ। তাঁর প্রশ্ন ছিল, “হর” শব্দটি যখন একবার রাত্রি আর একবার আগুন, তখন পার্থক্য কীভাবে দেখানো হবে; “চা” যখন যাওয়া আর ঠিক হওয়া দুই অর্থে, তখনই বা কী হবে, কারণ “অ-কার এবং আ-কার তো আর দু’টো নেই”।
লেখক আরও জানিয়েছেন, রিয়াং উপভাষার (কউ ব্রু) অর্ধেকের মতো শব্দ বিসর্গ ছাড়া লেখা যায় না, আর হসন্ত ছাড়া “ব্রু” শব্দটিই লেখা যায় না; তাই তিনি ককবরক লিপিতে বিসর্গ ও হসন্ত যুক্ত করার দাবি করেছেন। রোমান হরফেও উঁচু-নিচু সুরের সমস্যা থেকে যায়, তাঁর মতে। এই সমস্যাটি বাংলাদেশের ককবরক লেখকদেরও কি না, সে বিষয়ে লেখাটি কিছু বলেনি; লেখকের অভিজ্ঞতা ভারতের ত্রিপুরার।
বাংলাদেশে ককবরকের লিখিত চর্চার ইতিহাস লিখেছেন মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, আমাদের আর্কাইভের কালের দর্পনে ককবরকের লিখিত চর্চা লেখায়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের 2024 সালের একটি প্রতিবেদন জানায়, ককবরক ভাষা বর্তমানে রোমান হরফে লেখা হয়, আর মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা তাঁর ককবরক অনুবাদটি রোমান হরফেই করেছেন।
চাকমা ভাষায় সর্বজনস্বীকৃত কোনো প্রমিত ব্যাকরণ বা বানানরীতি নেই, তাই একই শব্দ একাধিক বৈধ বানানে লেখা হয়। এ কথা বলেছে চাকমা-বাংলা যন্ত্র-অনুবাদ নিয়ে একটি গবেষণাপত্র, “ChakmaNMT: Machine Translation for a Low-Resource and Endangered Language via Transliteration” (arXiv, প্রথম সংস্করণ অক্টোবর 2024, সংশোধিত জানুয়ারি 2026), লেখক Aunabil Chakma, Aditya Chakma, Masum Hasan, Soham Khisa, Chumui Tripura ও Rifat Shahriyar।
গবেষণাপত্রের পরিশিষ্ট অনুযায়ী, ভাষা-বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বৈদ্যরা ঐতিহাসিকভাবে নিজস্ব রীতিতে ভাষাটি লিখে রেখেছেন, প্রকাশিত ব্যাকরণ-নির্দেশিকা ছাড়া; পণ্ডিতদের মতভেদও প্রমিত নিয়মে পৌঁছানো কঠিন করেছে, আর সেই মতভেদ ভারতীয় ও বাংলাদেশি চাকমা পাণ্ডিত্যের ধারার পার্থক্যেও দেখা যায়।
পরীক্ষাটি এভাবে করা হয়েছিল: তিনজন চাকমা ভাষা-গবেষক আলাদাভাবে একই বাংলা বাক্যগুলো চাকমায় অনুবাদ করেন, যার মধ্যে 50টি বাক্য তিনজনেরই। গবেষণাপত্রের একটি চিত্রে দেখানো হয়েছে, একই বাংলা উৎস থেকে তিনজনের অনুবাদে একই শব্দ ভিন্ন ভিন্ন বানানে এসেছে। লেখকদের ভাষায়, এর মূলে প্রমিত চাকমা বানানরীতির অভাব।
এই পরীক্ষার অনুবাদ বাংলা থেকে চাকমায়, এই লেখার উল্টো দিকে। বানানের প্রশ্নটি অবশ্য কোনো এক দিকের নয়, ভাষাটিরই: একই গবেষণাপত্রের ভূমিকায় বলা হয়েছে, চাকমা মূলত মৌখিক ভাষা, লিপির ব্যবহার সীমিত। চাকমা অভিধানগুলোর তালিকা ও তাদের লিপি নিয়ে আছে আদিবাসী ভাষার অভিধান লেখায়।
প্রতিশব্দের অভাব আর সহায়ক অভিধান না থাকার কথা অনুবাদকেরা তিনটি আলাদা উৎসে বলেছেন। তিনটিই বাংলা থেকে আদিবাসী ভাষায় অনুবাদের অভিজ্ঞতা।
মারমা। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের 21 ফেব্রুয়ারি 2024-এর প্রতিবেদন “নৃগোষ্ঠীর ভাষায় অসমাপ্ত আত্মজীবনী: দুই অনুবাদকের অভিজ্ঞতা” অনুযায়ী আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইন্সটিটিউটের পৃষ্ঠপোষকতায় বইটি চাকমা, মারমা, ককবরক, গারো, কুড়মালি ও সাদরি ভাষায় অনূদিত হয়। মারমা অনুবাদক নুথোয়াই মারমা প্রতিবেদককে বলেছেন, মারমা ভাষার নিজস্ব কোনো অভিধান নেই, তাই অনেক ক্ষেত্রে বাংলা শব্দের মারমা অর্থ তাঁর মনে আসছিল না; প্রবীণ সদস্য ও গবেষকদের সাহায্য নিয়েছেন। তাঁর উদাহরণ: “বাংলা ভাষার ‘ষড়যন্ত্র’ শব্দটা মারমা ভাষায় কী হবে, তা নিয়ে এখনও আমি কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত।”
ককবরক। একই প্রতিবেদনে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেছেন, বইয়ে ব্যবহৃত সে সময়ের রাজনৈতিক পরিভাষার “অনেক শব্দ তো আমার মাতৃভাষায় নেই”। তাঁকে নানা মানুষের সঙ্গে কথা বলতে আর পুরোনো অভিধান দেখতে হয়েছে, আর যে শব্দ রাখতেই হবে, সেগুলো তিনি “বাংলাতেই রেখে দিয়েছি”। অনুবাদের পর তিনি নতুন প্রজন্মের কয়েকজনকে দিয়ে পড়িয়েছেন, তাঁরা মাতৃভাষায় যেভাবে বোঝেন সেভাবে লিখতে দিয়েছেন, তারপর নিজে সম্পাদনা করেছেন।
চাকমা। ChakmaNMT গবেষণাপত্রের পরিশিষ্ট জানায়, স্বেচ্ছাসেবী চাকমা অনুবাদকদের নিয়ে প্রাথমিক যাচাইয়ে দেখা গেছে, অনেক বাংলা বা ইংরেজি শব্দ চাকমায় কদাচিৎ ব্যবহৃত হয় বা সরাসরি প্রতিশব্দই নেই, ফলে প্রায়ই ঘুরিয়ে বলতে বা ব্যাখ্যা জুড়ে দিতে হয়েছে। অংশগ্রহণকারীরা বিমূর্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক শব্দ অনুবাদে অসুবিধার কথা জানিয়েছেন; বিশেষজ্ঞ অনুবাদকেরা সাধারণত হাতে লিখে অনুবাদ দিতেন, পরে টাইপিস্টরা তা ডিজিটাল করেছেন, কারণ চাকমা লিপিতে টাইপ করার অভ্যাস কম। এই কারণে গবেষকেরা উৎস-বাক্যের দৈর্ঘ্য 2 থেকে 8 শব্দে সীমিত রেখেছিলেন।
তিনটি অভিজ্ঞতাই বাংলা থেকে আদিবাসী ভাষার দিকে। আদিবাসী ভাষা থেকে বাংলার দিকে অনুবাদকের নিজের মুখে এমন বিবরণ উৎসগুলোতে কম; যেটুকু আছে, তা নিচের অংশগুলোতে।
বাংলায় লোকসাহিত্যের ধরন বোঝাতে রূপকথা, লোককথা, লোককাহিনী, উপকথা চারটি শব্দ চলে, আর পাহাড়ের ভাষাগুলোর নিজের শব্দ আলাদা। আমাদের আর্কাইভের সূচি-লেখাগুলো দেখিয়েছে, বাংলায় আনার সময় এই লেবেল কাহিনির চরিত্র বিচার করে বসানো হয়নি।
পূর্ণ সূচি লেখাটির হিসাবে আর্কাইভের শিরোনাম ও ট্যাগে “রূপকথা” আছে 102টি গল্পে, “লোককাহিনী” 42টিতে, “লোককথা” 20টিতে, “উপকথা” 5টিতে। লেখাটির ভাষায়, “লেবেলটি এসেছে যিনি পোস্টটি দিয়েছেন তাঁর হাত থেকে, কিংবা যে বই থেকে গল্পটি নেওয়া সেই বইয়ের শিরোনাম থেকে।”
মূল ভাষার শব্দগুলো আর্কাইভের পাঠ থেকেই পাওয়া যায়:
| ভাষা | গল্পের নিজের শব্দ | পাঠে দেওয়া বাংলা অর্থ | যেখানে আছে |
|---|---|---|---|
| চাকমা | পশ্চন | শিশুতোষ গল্প | পূর্ণ সূচি |
| তঞ্চঙ্গ্যা | পচ্ছন / পসন | রূপকথা | কলাত্থুর কন্যা |
| ম্রো | সাংচিয়া | গল্প বা কাহিনি (শিরোনামের বন্ধনী থেকে) | ম্রো রূপকথার সাংচিয়া |
| খেয়াং | খুই | গল্প (শিরোনামের বন্ধনী থেকে) | খেয়াং, চাক, খুমী, বম ও হালাম রূপকথা |
| ককবরক (ভারতের ত্রিপুরা) | কেরাং কথমা | কেরাং = স্থলকচ্ছপ, কথমা = গল্প; চন্দ্রকান্ত মুড়াসিংয়ের লেখা অনুযায়ী সব লোককথাই এই নামে | ত্রিপুরা ও মারমা মৌখিক সাহিত্য |
এই শব্দগুলো যেসব ধরনের কাহিনি বোঝায়, বাংলার চারটি লেবেলের কোনটির সঙ্গে তা মেলে, সে বিষয়ে কোনো ভাষাবিদের বিশ্লেষণ উৎসগুলোতে পাওয়া যায়নি। আর্কাইভের সূচিও লেবেল ধরে ভাগ না করে জনগোষ্ঠী ধরে ভাগ করেছে।
একটি লোককথার বাংলা পাঠ মূলের কতটা কাছে, তা বিচারের প্রথম শর্ত জানা যে গল্পটি কে বলেছিলেন আর কে বাংলায় এনেছেন। আমাদের আর্কাইভের পাহাড়ের লোককথা কে সংগ্রহ করেছিলেন লেখাটি এই জায়গাটিকেই “সবচেয়ে বড় ফাঁক” বলেছে।
লেখাটির হিসাবে আর্কাইভে কৃতিত্বের জন্য চারটি শব্দ চলে: লেখক, কথক, কর্তৃক বর্ণিত, সংগ্রহে। “লেখক” শব্দটি সবচেয়ে বেশি, আর লেখাটির মতে তা অস্পষ্ট: “তিনি মাঠে গিয়ে শুনে লিখেছেন, না কোনো বই থেকে নিয়েছেন, না নিজে রচনা করেছেন, তা জানা যায় না।” কথক বা বর্ণনাকারীর নাম আছে মাত্র দশটি পাঠে; কথকের নাম ও গ্রাম দুটোই আছে পাঁচটিতে, আর পাঁচটিই গারো।
লেখাটির “যা জানা যায়নি” তালিকায় দুটি সরাসরি অনুবাদের প্রশ্ন: যাঁদের নামে একাধিক পাঠ, যেমন আবু রেজা সতেরোটি আর সিংইয়ং ম্রো নয়টি, তাঁরা সংগ্রাহক, অনুবাদক না পুনর্লেখক, তা কোনো পাঠে বলা নেই; আর খেয়াং, চাক, খুমী ও ম্রো পাঠগুলোর শিরোনাম মূল ভাষায়, শরীর বাংলায়, কিন্তু “অনুবাদ কে করলেন তা নেই”।

ছাপা বইয়ের মধ্যে কথকের নাম সূচিতেই দেওয়ার একটি উদাহরণ বিভা সাংমার “গারো উপকথা”। আদিবাসী লোককথা বই লেখাটি জানায়, বইটির সূচিতে প্রতিটি গল্পের পাশে “যার কাছ থেকে পাওয়া গেছে” কলাম আছে। একই বইয়ের ভূমিকা অনুবাদের প্রশ্নটিও খোলে, পরের অংশে তা আছে।
অন্তত একটি বাংলা লোককথা-সংকলন নিজেই জানিয়েছে যে তার গল্পগুলো আক্ষরিক অনুবাদ নয়, মূলভাব রেখে নতুন আঙ্গিকে বলা; আর একটি ইংরেজি সংকলনের সম্পাদক জানিয়েছেন, তাঁর গল্পগুলো কেবল কাঠামোয় দেওয়া।
বিভা সাংমার “গারো উপকথা”-র ভূমিকা, আমাদের আদিবাসী লোককথা বই লেখায় উদ্ধৃত, দুটি কথা বলে। প্রথমত, কিছু গল্প সরাসরি লোকমুখ থেকে সংগ্রহ করা, আর কিছু দেওয়ান সিং রংমুথুর Apasong Agana ও ধরণ সিং সাংমার Achik Golporang নামের দুটি গারো বই থেকে অনুবাদ। দ্বিতীয়ত, কাহিনিগুলোর “মূলভাব বজায় রেখে অনুবাদ ও নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে”। লেখাটি যোগ করেছে, কোন গল্প মুখ থেকে আর কোনটি বই থেকে, তা সূচিতে আলাদা করে দেখানো নেই।
দ্বিতীয়টি সীমান্তের ওপারের। ভারতের National Folklore Support Centre-এর ত্রৈমাসিক Indian Folklife-এর জানুয়ারি 2010 সংখ্যা (ক্রমিক 35) ত্রিপুরার লোকসাহিত্য নিয়ে, অতিথি সম্পাদক Saroj Chaudhuri। সংখ্যাটির লোককথা অংশের সম্পাদকীয় টীকায় লেখা, গল্পগুলো দেওয়া হয়েছে “in skeleton only” (কেবল কাঠামো), আর এমন রূপ “cannot do justice to the artistic structure and temper of the tales”; কেবল দুটি গল্প বিস্তারিত দেওয়া হয়েছে, অনুবাদে মূলের যতটা সম্ভব কাছে থেকে। এগুলো ইংরেজি অনুবাদ, বাংলা নয়, আর ওই অংশের গল্পগুলোর নিচে লেখা “Collected and re-told by” (সংগৃহীত ও পুনঃকথিত)।
আর্কাইভের নিজের হিসাবেও আকারের ফারাকটি নথিবদ্ধ করার ধরনের সঙ্গে যুক্ত। পূর্ণ সূচি লেখাটি জানায়, ছোট পাঠগুলোর বেশিরভাগ খেয়াং, চাক ও খুমী সংগ্রহের, যেগুলোর শিরোনাম মূল ভাষায় আর বন্ধনীতে বাংলা অর্থ, আর লেখাটির অনুমান, এগুলো “অনুবাদ করে সংক্ষেপে লেখা”; দীর্ঘ পাঠগুলো সংকলন-গ্রন্থ থেকে হুবহু তুলে আনা। লেখাটি নিজেই একে “অনুমান” বলেছে।
একই গল্পের একাধিক বাংলা পাঠ পাশাপাশি রাখলে কোথায় কোথায় ফারাক, তার দুটি বিস্তারিত তুলনা আর্কাইভে আছে: বাঘ ও শূকরের মিতালি: একই গল্প তিন ভাষায় (তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা, ম্রো) আর কলাত্থুর কন্যা: তঞ্চঙ্গ্যা রূপকথার তিনটি রূপ। তুলনাগুলো সেখানেই পড়া যায়।
যে শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ নেই বা যা বদলালে অর্থ হারায়, সংগ্রাহক ও অনুবাদকেরা অনেক সময় সেটি মূল রূপে রেখে পাশে বা নিচে অর্থ দিয়েছেন। লোককথা সংগ্রাহকদের নিয়ে লেখাটি আর্কাইভের পাঠ থেকে এমন পাঁচটি অভ্যাস চিহ্নিত করেছে:
লেখাটির উপসংহার: “কাজটি নিছক অনুবাদ ছিল না — সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছিল কোন শব্দ রাখা হবে, কোথায় ব্যাখ্যা দেওয়া হবে, আর কতটুকু বলা হবে যে এখনো বাকি আছে।”
কবিতার অনুবাদেও একই পদ্ধতি দেখা যায়। সাহিত্য-পত্রিকা চাতালে 8 জুলাই 2024 প্রকাশিত ম্যাকলিন চাকমার চাকমা কবিতাগুলোর সঙ্গে বাংলা অনুবাদ ছাপা, আর পাতার শেষে তারকাচিহ্ন দিয়ে টীকা: “ভিরেচ- পাখির নাম, পিনোন- চাকমা নারীদের পরিধেয় পোশাক, বিরেচমরা- রাঙ্গামাটির এক পাহাড়ের নাম”। অনুবাদের ভেতরে একটি শব্দের পাশে বন্ধনীতেও অর্থ আছে: “সবুজ খাদি(ওড়না)”। পাতায় অনুবাদকের নাম দেওয়া নেই।
উল্টো দিকের অনুবাদে মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা যে শব্দ রাখতেই হবে বলে মনে করেছেন, তা বাংলাতেই রেখেছেন, বিডিনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী।
নিচের উদাহরণগুলো প্রকাশিত উৎস থেকে নেওয়া, যেখানে মূল ভাষার লাইন আর তার বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদ একসঙ্গে ছাপা। মন্তব্য যোগ করা হয়নি; প্রতিটির অনুবাদক ও উৎস উল্লেখ করা হয়েছে।
শুভ্র জ্যোতি চাকমার প্রবন্ধ বিংশ শতাব্দী পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণ জানায়, চাকমা রাজবাড়ি থেকে প্রকাশিত “গৈরিকা” পত্রিকায় বাংলা অনুবাদসহ ছাপা চুনীলাল দেওয়ানের চাকমা কবিতা “ঘর দুয়ারত”-কে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম আধুনিক কবিতা ধরা হয় যা কোনো পাহাড়ি ভাষায় লেখা। প্রবন্ধে প্রথম স্তবক:
| চাকমা (বাংলা হরফে) | বাংলা অনুবাদ |
|---|---|
| ঘর দুয়ারত এইনাই ডাগে সিবা কন্না মোরে, মুয়ান চিনং নাং ন জানং কুদু দেখ্যং তারে। | কুটীর দূয়ারে এসে ডাকে সে কে গো মোরে, মুখ চিনি না নাম জানি না কোথায় দেখিনু তারে। |
প্রবন্ধে কবিতাটির শেষে অনুবাদকের নাম দেওয়া: “(অনুবাদ-রাণী বিনীতা রায়)”। গৈরিকা 1936 থেকে 1951 সালের মধ্যে কখনো নিয়মিত, কখনো অনিয়মিতভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, প্রবন্ধটির তথ্য অনুযায়ী।
সুগত চাকমা (ননাধন) তাঁর লেখা বিংশ শতকের সপ্ত দশকে আমার লিখিত তিনটি চাকমা গান ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা প্রবন্ধে (জুমজার্নাল, 2020; উৎস হিসেবে লেখা “শিঙোর – এপ্রিল ২০০১”) নিজের তিনটি চাকমা গান আর তাদের বঙ্গানুবাদ দিয়েছেন। লেখকের ভাষায়, “পরবর্তীকালে এই গানটির বঙ্গানুবাদও আমি করি।” একটি গানের দুটি অনুবাদও লেখাটিতে আছে: বাংলা লেখকের নিজের, আর ইংরেজি কবি দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাকমার, 1975 বা 1976 সালের দিকে করা।
| চাকমা (বাংলা হরফে) | অনুবাদ | অনুবাদক |
|---|---|---|
| হিল্ল মিলাবুয়া জুমত যায়দে | পাহাড়ী মেয়েটি জুমে চলেছে | সুগত চাকমা (বাংলা) |
| হিল্ল মিল্লাবুয়া জুমত যায় দে | The highland lass goes to jhum / The hill girl goes to jhum | দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাকমা (ইংরেজি) |
| জুম্মবি কমলে হাদিবে ম’ ধাঘত | জুম্মবি কবে তুমি হাঁটবে মোর পাশেতে | সুগত চাকমা (বাংলা) |
প্রথম গানটির শিরোনাম লেখায় দুই বানানে ছাপা, “হিল্ল মিলাবুয়া” ও “হিল্ল মিল্লাবুয়া”; ছকে দুটিই যেমন আছে তেমন রাখা হয়েছে। লেখক জানিয়েছেন, ইংরেজি অনুবাদ দুটি তাঁর কাছ থেকে নিয়ে লেখক আব্দুস সাত্তার তাঁর একটি ইংরেজি বইয়ে ছাপেন।
চাতালের পাতায় “সাঝন্যের কবিতে” কবিতার প্রথম লাইন আর বাংলা অনুবাদ:
| চাকমা (বাংলা হরফে) | বাংলা অনুবাদ |
|---|---|
| সাঝন্যের কবিতে | সাঁঝের কবিতা |
| দিনর বেঘ বলপেইয়্যে আভা দ্বি-মুরো সেরে এগত্তর; | দিনের সব মাতাল হাওয়া দুই পাহাড়ের মাঝখানে; |
তিনটি উদাহরণেই চাকমা মূল বাংলা হরফে ছাপা। ভারতে বাংলা অনুবাদসহ প্রকাশিত চাকমা কবিতা-সংকলনের তালিকা দিয়েছেন গৌতমলাল চাকমা, ভারতের চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশ লেখায়: 1982 সালে নির্মল বসাক ও অভিজিৎ ঘোষের সম্পাদনায় “চাকমা কবিতা সংকলন”, 1983 সালে ভুরুম্ভ চাকমা ও ড. দুলাল চৌধুরীর সম্পাদনায় “ক’জলি”, আর 2016 সালে মালবিকা চাকমার “এক ফুদ শিরোপানি”, সবই বাংলা অনুবাদসহ।
ত্রিপুরার রাজবংশের ইতিহাস “রাজমালা”-র বাংলা অনুবাদ টিকে আছে, কিন্তু মূল ভাষার পাঠটির হদিস নেই, লিখেছেন মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা, আমাদের আর্কাইভের কালের দর্পনে ককবরকের লিখিত চর্চা লেখায়।
তাঁর লেখা অনুযায়ী রাজমালা প্রথমে কলমা লিপিতে লেখা হয়েছিল বলে জানা যায়, কিন্তু সেই মূল গ্রন্থের হদিস আজও মেলেনি। মহারাজ ধর্ম মাণিক্যের আমলে (1458-65) সংস্কৃত থেকে বাংলায় অনুবাদের সময় দুলু নারাণ বা দুর্লভেন্দ্র নারায়ণ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সাহায্য করেন এবং ককবরকে একটি কপি তর্জমা করে রাখেন বলে “নানা উৎস হতে জানা যায়”। লেখকের মতে বাংলা কপিটি যত্নে সংরক্ষিত হলেও ককবরক কপিটি “আর আলোর মুখ দেখেনি বা সচেতনভাবেই তা নষ্ট করা হয়ে থাকতে পারে”। এটি লেখকের অনুমান হিসেবেই লেখা।
বাংলা রাজমালা নিজেই মূল ভাষার কথা স্বীকার করে। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা রাজমালার দ্বিতীয় খণ্ডের ধর্ম মাণিক্য পর্বের 6 নম্বর পৃষ্ঠা থেকে এই চরণগুলো উদ্ধৃত করেছেন:
পূর্বে রাজমালা ছিল ত্রিপুর ভাষাতে
পয়ার গাঁথিল সব সকলে বুঝিতে
সু-ভাষাতে ধর্মরাজে রাজমালা কৈল
রাজমালা বলিয়া লোকেতে হৈল।
লেখকের ব্যাখ্যায়, সেই সময়ের বিচারে বাংলাকে “অধিকতর সভ্য সমাজের ভাষা” বিবেচনা করে গ্রন্থটি বাংলায়, রাজমালার পরিভাষায় “সু-ভাষায়”, অনুবাদ করা হয়। একই চরণ ও প্রসঙ্গ আছে তাঁর আরেকটি আর্কাইভ-লেখা ত্রিপুরাদের মাতৃভাষা ককবরক: একটি সংক্ষিপ্ত প্রোফাইল-এ, আর ত্রিপুরা ও মারমা মৌখিক সাহিত্য লেখাতেও।
একই লেখা পরের যুগের একটি ত্রিভাষিক কাজের কথাও বলে: ঠাকুর রাধামোহন দেববর্মন 1906 সালে “ত্রৈপুর কথামালা” নামে ককবরক-বাংলা-ইংরেজি ত্রিভাষিক অনুবাদগ্রন্থ লেখেন। আর বাংলাদেশে 1977 সালে রাঙামাটি থেকে সুরেশ ত্রিপুরার সম্পাদনায় প্রকাশিত ককবরক গানের সংকলন “বজন”-এ গানগুলোর বাংলা অনুবাদও দেওয়া হয়, লেখাটির তথ্য অনুযায়ী।
প্রকাশের সুযোগ আর পাঠকের অভাবের কথাও আদিবাসী লেখক ও অনুবাদকেরা বলেছেন। দ্য ডেইলি স্টারের 23 ফেব্রুয়ারি 2020-এর প্রতিবেদন “Keeping indigenous culture alive through literature” অমর একুশে বইমেলার আদিবাসী প্রকাশকদের নিয়ে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী সে বছর আদিবাসী প্রকাশক কেবল দুটি, Thokbirim আর Teuri। গবেষক ও কবি Theophil Nokrek বলেছেন, বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ গারো, আর সে বছর মাত্র 15 জন আদিবাসী লেখকের বই প্রকাশিত হয়েছে, “This can’t be enough”; তাঁর মতে আদিবাসী লেখক ও প্রকাশকদের পৃষ্ঠপোষকতা বাংলা একাডেমির দায়িত্ব। Shohel Chandra Hajang বলেছেন, নতুন লেখকদের কাজ প্রচারের নির্দিষ্ট কোনো প্ল্যাটফর্ম নেই। প্রকাশনা সংস্থা Pendulum-এর প্রকাশক বলেছেন, আদিবাসী লেখকদের সঙ্গে যথেষ্ট যোগাযোগ না থাকায় তাঁদের সাহিত্য প্রচার কঠিন। তখনকার বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক প্রতিবেদককে বলেছেন, আদিবাসী সাহিত্য সম্পর্কে তিনি ভালোভাবে অবগত নন, তবে একাডেমি বিষয়টি দেখবে।
মূল ভাষার পাঠকের কথাও এসেছে। বিডিনিউজের প্রতিবেদনে নুথোয়াই মারমা বলেছেন, আগের বছর মারমাদের নিয়ে তাঁর লেখা একটি বই “১০ জনের বেশি পড়তে পারেননি”, আর তা থেকেই তিনি বুঝেছেন ভাষাগত দিক দিয়ে তাঁরা কতটা পিছিয়ে। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা বলেছেন, ককবরকভাষী নতুন প্রজন্মের অধিকাংশ আর মাতৃভাষার চর্চা করছেন না।
অনুবাদ নিয়ে দাবিও পুরোনো। 2005 সালের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পঠিত একটি প্রবন্ধ, আর্কাইভে আদিবাসীদের মাতৃভাষা প্রচলন ও চর্চা: সংকট ও সম্ভাবনা নামে প্রকাশিত (লেখক মৃণাল কান্তি ত্রিপুরা, মংসিংঞো ও সুখেশ্বর চাকমা), তার সুপারিশে আদিবাসী ভাষার অভিধান তৈরি, অফিস-আদালতে প্রয়োজনে অনুবাদের ব্যবস্থা, আর “আদিবাসীদের সাহিত্য, অনুবাদ সাহিত্য” চর্চার কথা আছে।
উপরের সব সমস্যা এক জায়গায়, প্রতিটির পাশে যিনি বলেছেন, যে ভাষা নিয়ে বলেছেন, আর অনুবাদের দিক।
| সমস্যা | যিনি বলেছেন | ভাষা | দিক / প্রসঙ্গ | উৎস |
|---|---|---|---|---|
| বাংলা হরফে z, s ও নীরব h-এর ধ্বনি লেখা যায় না; “প্রথম লিপির হস্তক্ষেপ” | দেবাশীষ ওয়াংঝা | চাকমা | বাংলা হরফে চাকমা লেখা ও পড়া | জুমজার্নাল, 2020 (2014 সালের পরামর্শ সভা) |
| উচ্চারণ বদলে অর্থ ভিন্ন হওয়ার ঝুঁকি | পুলক বরণ চাকমা | চাকমা | বাংলা হরফে চাকমা সাহিত্যচর্চা | প্রথম আলো, 2013 |
| উঁচু-নিচু সুরে অর্থ বদলায়, বাংলা হরফে সব ক্ষেত্রে দেখানো যায় না | গীত্য কুমার রিয়াং | ককবরক (ভারতের ত্রিপুরা) | বাংলা হরফে ককবরক বানান | জুমজার্নাল, 2019 |
| প্রমিত বানান নেই; একই শব্দের একাধিক বৈধ বানান | Aunabil Chakma ও সহলেখকেরা | চাকমা | বাংলা থেকে চাকমা (যন্ত্র-অনুবাদের ডেটা) | ChakmaNMT, arXiv 2024/2026 |
| অভিধান নেই; “ষড়যন্ত্র”-র মতো শব্দের প্রতিশব্দ নিয়ে দ্বিধা | নুথোয়াই মারমা | মারমা | বাংলা থেকে মারমা | বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, 2024 |
| রাজনৈতিক পরিভাষার শব্দ নেই, বাংলাতেই রাখতে হয়েছে | মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা | ককবরক | বাংলা থেকে ককবরক | বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, 2024 |
| বিমূর্ত ও প্রাতিষ্ঠানিক শব্দের প্রতিশব্দ নেই, ঘুরিয়ে বলতে হয় | ChakmaNMT-এর অংশগ্রহণকারীরা | চাকমা | বাংলা/ইংরেজি থেকে চাকমা | ChakmaNMT, arXiv |
| বাংলা ধরন-লেবেল (রূপকথা, লোককথা…) কাহিনির চরিত্র বিচারে বসানো নয় | জুমজার্নাল আর্কাইভ | বহু ভাষা | মূল ভাষা থেকে বাংলা | পূর্ণ সূচি, অক্টোবর 2026 |
| কথক ও অনুবাদকের নাম নেই; “লেখক” শব্দ অস্পষ্ট | জুমজার্নাল আর্কাইভ | বহু ভাষা | মূল ভাষা থেকে বাংলা | লোককথা সংগ্রাহক, অক্টোবর 2026 |
| “মূলভাব বজায় রেখে… নতুন আঙ্গিকে”; কোনটি মুখ থেকে, কোনটি বই থেকে আলাদা করা নেই | বিভা সাংমা (ভূমিকা); জুমজার্নাল | গারো (আচিক) | গারো থেকে বাংলা | গারো উপকথা, 1981; আদিবাসী লোককথা বই, নভেম্বর 2026 |
| কেবল কাঠামো দেওয়া রূপ কাহিনির শিল্পরূপের প্রতি সুবিচার করে না | Indian Folklife-এর সম্পাদকীয় টীকা | ত্রিপুরার একাধিক ভাষা | মূল ভাষা থেকে ইংরেজি | Indian Folklife, জানুয়ারি 2010 |
| মূল পাঠ হারিয়ে গেছে, কেবল বাংলা অনুবাদ টিকে আছে | মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা | ককবরক / কলমা লিপি | রাজমালা, মূল থেকে সংস্কৃত হয়ে বাংলা | জুমজার্নাল, 2020 |
| প্রকাশক কম, প্ল্যাটফর্ম নেই, পৃষ্ঠপোষকতা নেই | Theophil Nokrek, Shohel Chandra Hajang প্রমুখ | গারো ও অন্যান্য | আদিবাসী লেখকের বই প্রকাশ | দ্য ডেইলি স্টার, 2020 |
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য বিষয়ের লেখাগুলোর সূচি আছে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব-এ। চাকমা সমাজ নিয়ে 1909 সালের বাংলা বই “চাকমা জাতি” সম্পর্কে আছে সতীশচন্দ্র ঘোষের ‘চাকমা জাতি’ লেখা।
অনুবাদক ও লেখকদের নাম ধরে বলা সমস্যাগুলো হলো: বাংলা হরফে কিছু ধ্বনি লেখা যায় না (দেবাশীষ ওয়াংঝা, চাকমা), উচ্চারণ বদলে অর্থ ভিন্ন হওয়ার ঝুঁকি (পুলক বরণ চাকমা), সুরের ফারাক বাংলা হরফে সব জায়গায় দেখানো যায় না (গীত্য কুমার রিয়াং, ককবরক), প্রমিত বানান ও অভিধান নেই, আর অনেক লোককথার কথক ও অনুবাদকের নাম নথিতে নেই।
দেবাশীষ ওয়াংঝার 2020 সালে জুমজার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ অনুযায়ী ইংরেজি z-এর মতো ধ্বনি (Bizu, Azu), s-এর ধ্বনি (Saan, Songora, Sodok) আর নীরব h (Olodya-কে Holodya বলা) বাংলা হরফে ঠিকমতো আসে না। ফলে গায়কেরা Bizu-কে Biju বলেন। তিনি এর নাম দিয়েছেন “প্রথম লিপির হস্তক্ষেপ”।
দেবাশীষ ওয়াংঝার প্রস্তাবিত ধারণা: যিনি প্রথমে যে লিপিতে অক্ষর চিনেছেন, তিনি অন্য ভাষার শব্দ পড়ার সময় সেই লিপির বানান-উচ্চারণ মনে আনেন। বাংলা লিপিতে প্রথম শিক্ষিত চাকমাভাষী তাই চাকমা শব্দে বাংলার উচ্চারণ বসান। লেখকের প্রথম লিপি ইংরেজি, তাই তিনি Bozo বলেন, Bojo নয়, প্রবন্ধে নিজেই লিখেছেন।
ChakmaNMT গবেষণাপত্র (arXiv, 2024, সংশোধিত 2026) অনুযায়ী চাকমায় সর্বজনস্বীকৃত প্রমিত ব্যাকরণ নেই, তাই একই শব্দ একাধিক বৈধ বানানে লেখা হয়। তিনজন চাকমা ভাষা-গবেষক আলাদাভাবে একই বাংলা বাক্য অনুবাদ করলে একই শব্দ ভিন্ন বানানে এসেছে। গবেষণাপত্রটি ভারতীয় ও বাংলাদেশি চাকমা পাণ্ডিত্যের ধারার পার্থক্যের কথাও বলেছে।
গীত্য কুমার রিয়াংয়ের “ককবরক বানান সমস্যা” (জুমজার্নাল, 2019) অনুযায়ী ককবরকে একই বানানের শব্দ উঁচু বা নিচু সুরে বললে অর্থ বদলায়, যেমন ফায় (আসা) আর ফাই (ভেঙে দেওয়া)। “হর” শব্দটি রাত্রি ও আগুন দুই অর্থে, আর তা বাংলা হরফে আলাদা করার উপায় নেই। তিনি বিসর্গ ও হসন্ত যুক্ত করার দাবি করেছেন।
না, প্রায় সবই বাংলায়। আর্কাইভের 125টি রূপকথা ও লোককাহিনির পাঠের মধ্যে অন্তত একটি, আলোময় চাকমার “সনার চিঝির পশ্চন — মেঘঅ পিধে”, পুরোপুরি চাকমা ভাষায় বাংলা লিপিতে। খেয়াং, ম্রো, চাক ও খুমী সংগ্রহের অনেক পাঠের শিরোনাম মূল ভাষায়, বন্ধনীতে বাংলা অর্থ, আর গল্পের শরীর বাংলায়।
কারণটি কোনো উৎসে বলা নেই, তবে অভাবটি নথিবদ্ধ। জুমজার্নালের “পাহাড়ের লোককথা কে সংগ্রহ করেছিলেন” লেখা অনুযায়ী আর্কাইভে কথক বা বর্ণনাকারীর নাম আছে মাত্র দশটি পাঠে, আর খেয়াং, চাক, খুমী ও ম্রো পাঠগুলোতে অনুবাদ কে করেছেন তা নেই। “লেখক” শব্দটি সংগ্রাহক, অনুবাদক না পুনর্লেখক বোঝায়, তাও বলা নেই।
বইটির ভূমিকা নিজেই জানায়, কাহিনিগুলোর “মূলভাব বজায় রেখে অনুবাদ ও নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হয়েছে”। কিছু গল্প সরাসরি লোকমুখ থেকে, কিছু গারো ভাষার দুটি বই, Apasong Agana ও Achik Golporang, থেকে অনুবাদ। কোনটি কোন উৎসের, সূচিতে আলাদা করা নেই। বইটি উপজাতীয় কালচারাল একাডেমী, বিরিশিরি থেকে 1981 সালে প্রকাশিত।
বাংলা রাজমালা নিজেই বলে, “পূর্বে রাজমালা ছিল ত্রিপুর ভাষাতে”। মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার লেখা অনুযায়ী মূল গ্রন্থটি কলমা লিপিতে লেখা হয়েছিল বলে জানা যায়, তা সংস্কৃত হয়ে ধর্ম মাণিক্যের আমলে (1458-65) বাংলায় অনুবাদ হয়। মূলটির কোনো কপি আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি, আর ককবরক কপিটিও হারিয়ে গেছে বলে তিনি লিখেছেন।
কয়েকটি একই। 2024 সালে বঙ্গবন্ধুর “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” ছয়টি ভাষায় অনুবাদের সময় নুথোয়াই মারমা অভিধান না থাকার কথা বলেছেন, আর মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা জানিয়েছেন অনেক রাজনৈতিক পরিভাষা ককবরকে নেই, সেগুলো বাংলাতেই রেখেছেন। ChakmaNMT গবেষণাতেও চাকমা অনুবাদকেরা বিমূর্ত শব্দের প্রতিশব্দ না থাকার কথা বলেছেন।
প্রকাশিত পাঠে প্রচলিত উপায় হলো শব্দটি মূল রূপে রেখে পাশে, বন্ধনীতে বা পাদটীকায় অর্থ দেওয়া। জুমজার্নালের আর্কাইভে চাকমা তাগল্ (দা), গারো নকফাস্থে (যুবকদের বসবাসের গৃহ) এমনভাবে রাখা। চাতালে প্রকাশিত ম্যাকলিন চাকমার কবিতার অনুবাদে পিনোন, বিরেচমরার মতো শব্দের টীকা পাতার শেষে দেওয়া।
শুভ্র জ্যোতি চাকমার প্রবন্ধ অনুযায়ী চুনীলাল দেওয়ানের চাকমা কবিতা “ঘর দুয়ারত”-কে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম আধুনিক কবিতা ধরা হয় যা কোনো পাহাড়ি ভাষায় লেখা। এটি চাকমা রাজবাড়ির “গৈরিকা” পত্রিকায় বাংলা অনুবাদসহ ছাপা হয়েছিল, আর অনুবাদক রাণী বিনীতা রায়।
জুমজার্নাল আর্কাইভ (প্রাথমিক উৎস)
সংবাদমাধ্যম ও সাহিত্য-পত্রিকা
গবেষণা ও একাডেমিক প্রকাশনা
সর্বশেষ হালনাগাদ: 3 নভেম্বর 2026
প্রসঙ্গ:অনুবাদ, আদিবাসী ভাষা, আদিবাসী লোককথা, ককবরক, চাকমা লিপি, চাকমা সাহিত্য
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।