Jumjournal Logo

লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ ম্রো ভূমি বিরোধ: রেংয়েন পাড়ার 400 একর ও মানবাধিকার কমিশনের অনুসন্ধান

Last updated Oct 19th, 2026

0

বান্দরবানের লামা উপজেলায় ঘন সবুজ গাছে ঢাকা টিলা, সামনে চাষের জন্য তৈরি খেত আর একটি গাছ

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ ম্রো ভূমি বিরোধে দুই দফা অনুসন্ধান করেছিল। 2022 সালের মে মাসে কমিশন জানায়, 26 এপ্রিল সরই ইউনিয়নের তিন পাড়ার প্রায় 350 একর জুমভূমি পোড়ানো এবং ম্রো ও ত্রিপুরাদের উচ্ছেদ-চেষ্টার অভিযোগের “প্রাথমিক সত্যতা” পাওয়া গেছে। 2023 সালের 5 জানুয়ারি রেংয়েন ম্রো পাড়া পরিদর্শনের পর কমিশনের তদন্ত দলের প্রধান বলেন, হামলা, ঘরে আগুন ও লুটপাটের অভিযোগের “সত্যতা মিলেছে”। কোম্পানি প্রতিবারই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, জমিটি তাদের ইজারাভুক্ত।

এই লেখায় কেবল সেই কথাগুলো রাখা হয়েছে যা কোনো সরকারি নথি, কমিশনের বিবৃতি, আদালত-সংক্রান্ত খবর বা নাম-উল্লেখিত সংবাদমাধ্যমে ছাপা হয়েছে — প্রতিটির পাশে উৎসের নাম। যেখানে কোম্পানির বক্তব্য ছাপা হয়েছে, সেখানে সেটিও আছে; যেখানে ছাপা হয়নি, সেখানে সে কথাই লেখা আছে। কোম্পানির কর্মকর্তা ও গ্রামবাসীদের উল্লেখ করা হয়েছে পদবি দিয়ে, নাম দিয়ে নয়। জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের নাম দেওয়া হয়েছে যেখানে উৎসে তা বাংলায় ছাপা আছে।

এই লেখায়

  1. বিরোধটি কোথায়, কাদের নিয়ে
  2. ইজারা: কবে, কত একর, কার কাছ থেকে
  3. 2017 থেকে 2021: সরকারি নথিতে প্রথম যা লেখা হয়েছিল
  4. 26 এপ্রিল 2022-এর আগুন
  5. মানবাধিকার কমিশন 2022 সালে কী বলেছিল
  6. জেলা পরিষদের তদন্ত কমিটি
  7. ত্রাণ, মতবিনিময় সভা ও আপস-প্রস্তাব
  8. কোম্পানির করা মামলাগুলো
  9. সেপ্টেম্বর–অক্টোবর 2022: ঝিরি, কলাগাছ, গাছ কাটা
  10. 1 জানুয়ারি 2023 রাতে রেংয়েন পাড়ায় কী ঘটেছিল
  11. মানবাধিকার কমিশনের জানুয়ারি 2023-এর অনুসন্ধান
  12. কারবারির এজাহার ও গ্রেপ্তারের অবস্থা
  13. সংসদীয় উপকমিটি এপ্রিল 2023-এ কী বলেছিল
  14. পার্বত্য চুক্তি ও আইন ইজারা নিয়ে কী বলে
  15. কোম্পানির সব বক্তব্য এক জায়গায়
  16. 2025 সালের গ্রেপ্তার
  17. প্রশ্নোত্তর
  18. যা এখনো জানা যায়নি
  19. তথ্যসূত্র

লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ ম্রো ভূমি বিরোধটি কোথায়, কাদের নিয়ে?

বিরোধটি বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নে। এক পক্ষে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, অন্য পক্ষে তিনটি পাড়া — দুটি ম্রো পাড়া (লাংকম ও রেংয়েন) এবং একটি ত্রিপুরা পাড়া (জয়চন্দ্র)। বিরোধের কেন্দ্রে প্রায় 400 একর জমি, যেটিকে পাড়াবাসীরা নিজেদের জুমভূমি এবং কোম্পানি নিজেদের ইজারার জমি বলে দাবি করে।

পাড়াগুলোর নামের বানান উৎসভেদে আলাদা। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন 2022-এর অভিযোগ-অংশে লেখা “লংকম কারবারিপাড়া, রেংয়েন কারবারিপাড়া ও জয়চন্দ্র ত্রিপুরা কারবারিপাড়া”; একই প্রতিবেদনের আরেক অংশে “লাংকমপাড়া, রেঙেনপাড়া ও জয় চন্দ্রপাড়া”। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা কখনো “রেঙয়েন”, কখনো “রেংয়েন”, কখনো “রেংইয়েন” লিখেছে। এই লেখায় কমিশনের বানান “রেংয়েন” ও ডেইলি স্টারের “লাংকম” ব্যবহার করা হয়েছে। পাড়াগুলোর নাম প্রত্যেকটির কারবারির (পাড়াপ্রধান) নামে।

কয়টি পরিবার এই বিরোধে জড়িত, সে সংখ্যাও এক নয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) ও দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে তিন পাড়ায় 39টি ম্রো ও ত্রিপুরা পরিবার। প্রথম আলো লিখেছে প্রায় 36টি পরিবার খাদ্যসংকটে। সংসদীয় উপকমিটির প্রস্তাব ছিল 36টি পরিবারের জন্য। প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণ লিখেছে, রেংয়েন পাড়ায় 11টি ম্রো পরিবার। 2021 সালে দ্য ডেইলি স্টারের ইংরেজি প্রতিবেদনে তিন গ্রামের প্রায় 65টি পরিবারের কথা ছিল।

পাড়াগুলো কবে বসেছে, তা নিয়েও একটি নথিভুক্ত বক্তব্য আছে। টিবিএস-কে ডলুছড়ি মৌজার হেডম্যান বলেছিলেন, পরিবারগুলো 2006–07 সাল থেকে বসতি গড়ে এবং 2010 সালে দখল বুঝে পায়; লাংকম পাড়ার কারবারি বলেছিলেন, 2011 থেকে 2017 সালের মধ্যে 80টি পরিবার বসেছিল, যার 41টি পরে চলে যায়। অন্যদিকে গ্রামবাসীদের বরাতে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে, তাঁরা “বংশ পরম্পরায়” এই জমিতে জুম চাষ করে আসছেন। ম্রো জনগোষ্ঠী বান্দরবানের কোন কোন উপজেলায় থাকেন, সে বিষয়ে আমাদের লেখা ম্রো জনগোষ্ঠী ও ক্রামা ধর্ম দেখতে পারেন।

বান্দরবানের লামা উপজেলার ইউনিয়ন ও মৌজাভিত্তিক মানচিত্র, উত্তর দিকে গোলাপি রঙে সরই ইউনিয়ন
লামা উপজেলার মৌজা মানচিত্র। উত্তরের গোলাপি অংশটি সরই ইউনিয়ন (79-Sarai)। মানচিত্র: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, Small Area Atlas: Bandarban Zila · সরকারি প্রকাশনা · উইকিমিডিয়া কমন্স

লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের ইজারা কবে, কত একর, কার কাছ থেকে?

মোট আয়তন নিয়ে উৎসগুলো মোটামুটি একমত: প্রায় 1,600 একর, সরই ও ডলুছড়ি — দুই মৌজায়। কিন্তু ইজারা কোন বছরে এবং কে দিয়েছিল, তা নিয়ে অন্তত চার রকম বক্তব্য আছে। প্রকৃত দখলের পরিমাণ নিয়ে পাড়াবাসী ও কোম্পানির হিসাব একেবারেই আলাদা।

উৎস ইজারার বছর কে দিয়েছিল আয়তন
দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি), ফেব্রুয়ারি 2021 — কোম্পানির ব্যবস্থাপকের বরাতে 1994, মেয়াদ 40 বছর জেলা প্রশাসন সরই মৌজায় 375 একর, ডলুছড়ি মৌজায় 1,225 একর
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, এপ্রিল 2022 — কোম্পানির বক্তব্য 1994–95 ও 1996 বান্দরবান জেলা প্রশাসন প্রায় 1,600 একর, 64 জনকে নিয়ে প্রকল্প
টিবিএস, এপ্রিল 2022 এক জায়গায় 1996; জেলা প্রশাসকের বক্তব্যে 1995 জেলা প্রশাসন, 64 জনকে প্রায় 1,600 একর
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, সেপ্টেম্বর 2022 — ভূমি রক্ষা কমিটির বরাতে 1988–1994 উল্লেখ নেই 1,600 একর; বাস্তবে 3,000–3,500 একর দখলের অভিযোগ
ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স, 2025 1992 বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ উল্লেখ নেই

দ্য ডেইলি স্টার বাংলা-র জানুয়ারি 2023-এর প্রতিবেদনে ভূমি রক্ষা কমিটির এক নেতার বরাতে বলা হয়েছে, 80 ও 90-এর দশকে ডলুছড়ি ও সরই মৌজার মোট 1,600 একর ইজারা দেওয়া হয়; কমিটির অভিযোগ, সীমানার অস্পষ্টতার সুযোগে কোম্পানি 3,000 একরের বেশি জমিতে বাগান করেছে, এবং বিরোধের 400 একর ইজারার বাইরের জমি।

কোম্পানির অবস্থান ঠিক উল্টো। 2022 সালের 5 সেপ্টেম্বর কোম্পানির প্রকল্প পরিচালক দ্য ডেইলি স্টার বাংলা-কে বলেন, “সংবাদ সম্মেলন করে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। ৪০০ একর জমি আমাদের লিজের আওতাধীন।”

ইজারার শর্ত নিয়ে কী জানা যায়

শর্ত নিয়েও দুটি আলাদা বক্তব্য আছে। ভূমি রক্ষা কমিটির সদস্যসচিব দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে বলেন, ইজারা চুক্তি অনুযায়ী 10 বছরের মধ্যে রাবার বাগান করতে হবে এবং জমি অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা যাবে না। অন্যদিকে দ্য ডেইলি স্টারের 2021 সালের প্রতিবেদন একটি কানুনগো প্রতিবেদনের (অক্টোবর 2017) কথা উল্লেখ করে, যেখানে শর্ত ছিল বরাদ্দের 5 বছরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার। ওই প্রতিবেদনে কোম্পানির ব্যবস্থাপক বলেন, চুক্তিতে এমন কোনো শর্ত আছে কি না তা তাঁদের জানা নেই।

2017 থেকে 2021: এই জমি নিয়ে সরকারি নথিতে প্রথম কী লেখা হয়েছিল?

প্রকাশিত উৎসে পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো সরকারি নথি অক্টোবর 2017-এর। দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি, 12 ফেব্রুয়ারি 2021) জানায়, লামার তৎকালীন সহকারী কমিশনার (ভূমি) স্বাক্ষরিত সেই প্রতিবেদনে লেখা ছিল, ম্রোরা প্রজন্ম ধরে জমিটি ব্যবহার করছেন এবং কোম্পানিকে বরাদ্দ দিলে তাঁরা জীবিকা হারাবেন।

একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, 2017 সালে কোম্পানির ব্যবস্থাপক গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেছিলেন, যাতে ডলুছড়ি মৌজার হেডম্যানসহ পাঁচজন আসামি ছিলেন। প্রতিবেদনের মূল বিষয় ছিল 23 জানুয়ারি 2021-এর একটি ঘটনা: তিন গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রায় 120 জন লোক এসে প্রায় 200 একর জুমভূমি দখল করে। কোম্পানির ব্যবস্থাপক তখন বলেন, কোম্পানি কারও জুমভূমি দখল করেনি, বরং ম্রো ও ত্রিপুরারাই অবৈধভাবে প্লটে ঢুকেছেন; তাঁর ভাষায়, “We didn’t threaten anyone.” লামা থানার তৎকালীন ওসি অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং বলেন, ম্রোদের আদালতে যেতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল।

পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) আগস্ট 2020-এর মাসিক মানবাধিকার প্রতিবেদন লিখেছিল, লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ ও আরেকটি কোম্পানি সরই ইউনিয়নের তিনটি ম্রো গ্রামের ঘর পুড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে; প্রতিবেদনটিতে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের অধিগ্রহণ 1,600 একর বলা হয়েছে। এটি একটি রাজনৈতিক সংগঠনের প্রতিবেদন; এতে কোম্পানির কোনো বক্তব্য নেই। 2022 সালের অক্টোবরে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা গ্রামবাসীদের বরাতে লিখেছে, কোম্পানি “২০১৯ সালে হঠাৎ” রাবার প্লটের নামে এই ভূমি দখলের চেষ্টা শুরু করে।

26 এপ্রিল 2022: জুমভূমিতে আগুন — কত একর পুড়েছিল, কোম্পানি কী বলেছিল?

2022 সালের 26 এপ্রিল (মঙ্গলবার) লাংকম, রেংয়েন ও জয়চন্দ্র পাড়ার জুমভূমি, প্রাকৃতিক বন ও বাগানে আগুন লাগে। পোড়া জমির পরিমাণ উৎসভেদে 100 থেকে 400 একর। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদনে সংখ্যাটি প্রায় 350 একর। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিবিএসকে বলেন, তারা নিজেদের ইজারার জমিতে 300 একর কাজুবাদাম ও ফলের বাগান পুড়িয়েছে।

উৎস পোড়া জমির পরিমাণ
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 27 ও 30 এপ্রিল 2022 প্রায় 100 একর জুমবাগান
টিবিএস, 30 এপ্রিল 2022 (প্রতিবেদনের সূচনা) 300–350 একরের গাছপালা
টিবিএস — সরই ইউপি চেয়ারম্যানের বক্তব্য 400 একর
টিবিএস — কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বক্তব্য 300 একর কাজুবাদাম ও ফলের বাগান
জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বার্ষিক প্রতিবেদন 2022 প্রায় 400 একর জুমজমির মধ্যে প্রায় 350 একর
নিউ এজ, নভেম্বর 2022 প্রায় 400 একর

দ্য ডেইলি স্টার বাংলা-র 27 এপ্রিলের প্রথম প্রতিবেদনে কোম্পানির পরিচালক বলেন, “আমরা কারো জুমের যায়গায় আগুন লাগাইনি। তবে আমরা সেখানে আমাদের জায়গা পরিষ্কার করেছিলাম।” লামার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সেদিন জানান, এসি ল্যান্ড, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়েছিল; কাছে পানির উৎস না থাকায় আগুন নিয়ন্ত্রণ কঠিন ছিল, আর কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা অভিযোগ অস্বীকার করে।

টিবিএস-এর 30 এপ্রিলের প্রতিবেদনে কোম্পানির দুটি বক্তব্য পাশাপাশি আছে। বৃহস্পতিবার কোম্পানির ব্যবস্থাপক জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে বলেছিলেন, “I think this fire has been set as part of a new conspiracy.” শনিবার কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিবিএসকে বলেন, “We burnt 300 acres of cashew nut gardens and orchards.” তিনি দাবি করেন, কোনো আদিবাসী বসতবাড়ির ক্ষতি হয়নি এবং কোম্পানি তাদের ইজারার জমির ভেতরেই ছিল। বান্দরবানের তৎকালীন জেলা প্রশাসক টিবিএসকে বলেন, কোম্পানি জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে, উপজেলা প্রশাসন তদন্ত করছে, এবং “The land is still allotted to the rubber plantation owners.”

মামলা ও প্রথম গ্রেপ্তার

28 এপ্রিল লাংকম পাড়ার কারবারি লামার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আটজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন; টিবিএস লিখেছে, আদালত থানাকে মামলা রেকর্ড করার নির্দেশ দেন। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (30 এপ্রিল) জানায়, পুলিশ কোম্পানির একজন ব্যবস্থাপক ও একজন মাঝিকে গ্রেপ্তার করে, আদালত তাঁদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠান। লামা থানার ওসি শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, অভিযোগের “প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে”, অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। এই মামলায় পরে অভিযোগপত্র হয়েছে কি না, প্রকাশিত কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

আগুনে কী কী নষ্ট হয়েছিল, তার বিবরণ দ্য ডেইলি স্টার বাংলার 30 এপ্রিলের প্রতিবেদনে আছে: ধান, আম, কলা ও আনারসের বাগান; পাড়ার শ্মশান; মৌচাক; ঝিরির কাঁকড়া ও মাছ। জুমচাষের সঙ্গে পাহাড়ের মানুষের জীবিকা কীভাবে বাঁধা, সে প্রসঙ্গে আমাদের আর্কাইভের লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান দেখতে পারেন।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন 2022 সালে লামা নিয়ে কী বলেছিল?

11 মে 2022 কমিশন এক বিবৃতিতে জানায়, তাদের সংগৃহীত তথ্যে উচ্ছেদ-চেষ্টা ও মামলা দিয়ে হয়রানির অভিযোগের “প্রাথমিক সত্যতা” লক্ষ্য করা গেছে, এবং চারটি মন্ত্রণালয়-দপ্তরকে পাঁচটি নির্দেশনা দেয়। কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন 2022-এ ঘটনাটি দুই জায়গায় আছে; একটিতে সরাসরি লেখা, লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ ম্রো জনগোষ্ঠীর ফসল কেটে পুড়িয়ে দেয়।

কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন 2022-এর “অভিযোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মানবাধিকার সুরক্ষা” অধ্যায়ে (পৃষ্ঠা 55) শিরোনাম: “খাদ্য ও সুপেয় পানির অভাবে তিনটি গ্রামের মানুষ”। সেখানে লেখা, 26 এপ্রিল 2022 লামার তিন কারবারিপাড়ার “প্রায় ৩৫০ একর জুমচাষের প্রাকৃতিক বন পুড়িয়ে দেয়া, পানির ঝর্ণা বিনষ্ট করা” এবং তার ফলে খাদ্য ও পানির অভাবের বিষয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন থেকে পাওয়া তথ্যে কমিশনের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। তারপরের বাক্যগুলো এই:

“উক্ত প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয় যে, লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দীর্ঘদিন থেকে উক্ত এলাকার ম্রো এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদের চেষ্টা করছে। এছাড়া স্থানীয়দের নামে বিভিন্ন সময় মামলা দিয়ে দেশ ছাড়া করার চেষ্টা করা হচ্ছে মর্মেও উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সংগৃহিত তথ্যেও এসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা লক্ষ্য করা গিয়েছে।”

কমিশন ঘটনাটিকে “মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন” বলে এবং পাঁচটি উদ্যোগ নেয়:

  1. ত্রাণ পর্যাপ্ত নয় বলে প্রতীয়মান হওয়ায় সব ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাদ্য, পানি ও প্রয়োজনে গৃহনির্মাণ সহায়তা দিতে সচিব, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে বলা হয়।
  2. স্থানীয়দের যাতে হয়রানি করা না হয় এবং অগ্নিকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সচিব, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বলা হয়।
  3. আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঠেকাতে ও ভুক্তভোগীদের হয়রানি থেকে রক্ষা করতে পুলিশ সুপার, বান্দরবানকে বলা হয়।
  4. সার্বিক তদন্ত করে প্রকৃত অবস্থা প্রতিবেদন আকারে কমিশনে দাখিল করতে জেলা প্রশাসক, বান্দরবানকে বলা হয়।
  5. তত্ত্বাবধানের জন্য আদেশের অনুলিপি বিভাগীয় কমিশনার, চট্টগ্রামকে দেওয়া হয়।

আইপি নিউজ বিডি-তে প্রকাশিত কমিশনের 11 মে-র বিবৃতি অনুযায়ী জেলা প্রশাসককে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছিল 15 জুনের মধ্যে। সেই প্রতিবেদন জমা পড়েছিল কি না, প্রকাশিত কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। বিবৃতিতে কোম্পানির কোনো বক্তব্য নেই।

প্রতিবেদনের আরেকটি অংশে (পৃষ্ঠা 30, “সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অধিকার পরিস্থিতি”) কমিশনের ভাষা আরও সরাসরি: “এবছর ২৬ এপ্রিল লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ সেখানকার ম্রো জনগোষ্ঠীর ফসল কেটে পুড়িয়ে দেয়।” একই অনুচ্ছেদে লেখা, “কোম্পানির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করা মামলায় কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন”, এবং কমিশন “আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া এবং ম্রো ও ত্রিপুরাদের পুনর্বাসনের জন্য” জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দিয়েছিল।

প্রতিবেদনের মুখবন্ধে কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ লিখেছেন, নতুন কমিশন 10 ডিসেম্বর 2022 দায়িত্ব নেওয়ার পর বান্দরবানের লামা উপজেলায় ম্রোদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় কমিশন “ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শনপূর্বক সুনির্দিষ্ট কার্যক্রম গ্রহণের সুপারিশ” করেছে। জানুয়ারি 2023-এর পরিদর্শনের বিবরণ নিচে আলাদা করে আছে।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের তদন্ত কমিটি কী সুপারিশ করেছিল?

আগুনের পর বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ একটি পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করে, যার প্রধান ছিলেন স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক। বিডিনিউজ২৪ জানায়, কমিটি ইজারা বাতিলসহ ছয়টি সুপারিশ করেছিল, যা বাস্তবায়ন হয়নি। কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি; এর বিষয়বস্তু জানা যায় কেবল সংবাদমাধ্যমে উদ্ধৃত বক্তব্য থেকে।

এই কমিটি নিয়ে তিনটি সূত্র আছে, কোনোটিই প্রতিবেদন নিজে নয়:

  • বিডিনিউজ২৪ (12 অক্টোবর 2022): 36 নাগরিকের যৌথ বিবৃতির বরাতে কমিটির গঠন (পাঁচ সদস্য, প্রধান স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক) এবং ইজারা বাতিলসহ ছয় সুপারিশ, যা বাস্তবায়িত হয়নি। ছয়টির বাকি পাঁচটি প্রতিবেদনে নেই। একই প্রতিবেদনে কোম্পানির ব্যবস্থাপক অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বলে উল্লেখ আছে।
  • দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (5 সেপ্টেম্বর 2022): ভূমি রক্ষা কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে, জেলা পরিষদের তদন্ত কমিটি ইজারা বাতিলের সুপারিশ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠায়।
  • দ্য ডেইলি স্টারের মতামত-নিবন্ধ (9 নভেম্বর 2022, লেখক বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের এক কর্মকর্তা): জেলা পরিষদের প্রতিবেদন ইজারার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। এটি মতামত, সংবাদ নয়।

পরে হিল ভয়েস (7 জানুয়ারি 2023) লিখেছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন ও জেলা পরিষদের তদন্ত কমিটি জড়িতদের গ্রেপ্তার, ম্রো ও ত্রিপুরাদের জীবন ও ভূমির নিরাপত্তা এবং কোম্পানির ইজারা বাতিলের সুপারিশ করেছিল, কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে ইজারা বাতিলের কোনো সুপারিশ নেই — সেখানে সুপারিশ ত্রাণ, আইনগত ব্যবস্থা, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিয়ে।

ত্রাণ, মতবিনিময় সভা আর আপস-প্রস্তাব: প্রশাসন কী করেছিল?

আগুনের পর প্রশাসনের তিনটি উদ্যোগ নথিভুক্ত: মে মাসে ত্রাণ বিতরণ, আগস্টে পার্বত্য মন্ত্রীর সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভা, আর সেপ্টেম্বরে 144 ধারার নিষেধাজ্ঞা। মতবিনিময়ে প্রতি পরিবারকে 5 একর করে দেওয়ার প্রস্তাব আসে, যা পাড়াবাসী প্রত্যাখ্যান করেন। কোম্পানি 400-র মধ্যে 195 একর দিতে চেয়েছিল বলেও এক বিবৃতিতে উল্লেখ আছে।

ত্রাণ (8 মে 2022)। প্রথম আলো জানায়, লামার ইউএনও ও সরই ইউপি চেয়ারম্যান চাল, ডাল, চিড়া, গুড় ও পানি নিয়ে যান। বিতরণে কোম্পানির একজন ব্যবস্থাপককে দেখে লাংকম ও রেংয়েন পাড়ার ম্রোরা ত্রাণ নেননি; জয়চন্দ্র পাড়ার 16টি ত্রিপুরা পরিবারও পরে ত্রাণ ফেরত দেয়। কোম্পানির প্রকল্প পরিচালক প্রথম আলোকে বলেন, ইউপি চেয়ারম্যানের অনুরোধেই তাঁদের লোক সেখানে গিয়েছিলেন, এবং “ম্রো ও ত্রিপুরাদের ভুল বুঝিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে লাগানো হচ্ছে।”

মতবিনিময় সভা (16 আগস্ট 2022)। আইপি নিউজ বিডি জানায়, জেলা প্রশাসনের সম্মেলনকক্ষে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রীর সভাপতিত্বে কোম্পানি ও তিন পাড়ার বাসিন্দাদের নিয়ে সভা হয়। ভূমি রক্ষা কমিটির সভাপতির ভাষ্যে, সভায় 36টি পরিবারকে 5 একর করে দেওয়ার প্রস্তাব আসে, গ্রামবাসী তা প্রত্যাখ্যান করেন। জেলা প্রশাসক জানান, সিদ্ধান্ত হয়নি, আলোচনা চলবে। প্রতিবেদনে কোম্পানির কোনো বক্তব্য নেই।

195 একরের প্রস্তাব। দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় (5 সেপ্টেম্বর 2022) উদ্ধৃত ভূমি রক্ষা কমিটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জেলা প্রশাসনসহ সমঝোতা বৈঠকে কোম্পানি 400 একরের মধ্যে 195 একর দিতে চেয়েছিল; গ্রামবাসী পুরো জমির মালিকানা চান। কোম্পানির পক্ষ থেকে এই প্রস্তাবের নিশ্চিতকরণ প্রকাশিত হয়নি।

নিষেধাজ্ঞা (সেপ্টেম্বর 2022) ও হাইকোর্টের নির্দেশনা। কাপেং ফাউন্ডেশন লিখেছে, 27 সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিরোধপূর্ণ এলাকায় দুই পক্ষের প্রবেশে 144 ধারায় নিষেধাজ্ঞা দেয়। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (27 অক্টোবর 2022) শিরোনামে লিখেছে “হাইকোর্ট-প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষিত”, আর ভেতরে “১৪৪/৪৫ ধারায় নিষেধাজ্ঞা”-র কথা। হাইকোর্টের সেই নির্দেশনা কবে, কোন রিট বা মামলায়, কী আদেশ — তা ওই প্রতিবেদনে বা অন্য কোনো প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি।

লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে কয়টি মামলা করেছিল?

প্রকাশিত উৎসে কোম্পানির পক্ষে করা অন্তত তিনটি মামলার উল্লেখ আছে, তার দুটির তারিখ জানা: 14 আগস্ট 2022 (11 জনের বিরুদ্ধে) ও 4 সেপ্টেম্বর 2022 (14 জনের বিরুদ্ধে, সিআর মামলা নম্বর 313/2022)। এর আগে 2017 সালে আরেকটি মামলার কথা দ্য ডেইলি স্টার লিখেছিল। গ্রামবাসীরা মামলাগুলোকে মিথ্যা বলেন; মামলাগুলোর নিষ্পত্তি জানা যায়নি।

  • 2017: কোম্পানির ব্যবস্থাপক পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন, যাঁদের মধ্যে ডলুছড়ি মৌজার হেডম্যান ছিলেন (দ্য ডেইলি স্টার, ফেব্রুয়ারি 2021)।
  • 14 আগস্ট 2022: কোম্পানির উপব্যবস্থাপক বান্দরবানের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে 11 জন গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে মামলা করেন (কাপেং ফাউন্ডেশন)। ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স জানায়, অভিযোগ ছিল বেআইনি সমাবেশ এবং দণ্ডবিধির 435 ধারায় আগুন বা বিস্ফোরক দিয়ে ক্ষতিসাধন।
  • 4 সেপ্টেম্বর 2022: 14 জন গ্রামবাসীর বিরুদ্ধে সিআর মামলা নম্বর 313/2022 (কাপেং ফাউন্ডেশন)।

ভূমি রক্ষা কমিটি 5 সেপ্টেম্বরের সংবাদ সম্মেলনে বলে, তাদের 11 জন সদস্যের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা হয়েছে। নিউ এজ (22 সেপ্টেম্বর 2022) “বিভিন্ন সময়ে তিনটি মামলার” কথা লিখেছে। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (26 সেপ্টেম্বর 2022) কমিটির এক সদস্যের বরাতে লিখেছে, কোম্পানি তিন পাড়ার বাসিন্দাদের বিরুদ্ধে মামলা করে হয়রানি করছে। এসব মামলা নিয়ে কোম্পানির কোনো বক্তব্য প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি।

সেপ্টেম্বর–অক্টোবর 2022: ঝিরিতে বিষ, কলাগাছ আর বন কাটার অভিযোগে কোম্পানি কী বলেছিল?

2022 সালের সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে তিনটি অভিযোগ ওঠে: 6 সেপ্টেম্বর রেংয়েন পাড়ার একমাত্র পানির উৎস ঝিরিতে বিষ, 24 সেপ্টেম্বর প্রায় 300 কলাগাছ কাটা, আর 23 অক্টোবর থেকে বাগান ও বন কাটা। শেষ অভিযোগটি কোম্পানির প্রকল্প পরিচালক প্রথমে অস্বীকার করেন, পরে দ্য ডেইলি স্টার বাংলার কাছে স্বীকার করেন যে কাটা চলছে তাঁদের নির্দেশেই।

ঝিরিতে বিষ (6 সেপ্টেম্বর)। ভূমি রক্ষা কমিটির গোলটেবিল বৈঠকের খবরে (দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 21 সেপ্টেম্বর 2022) অভিযোগ ছিল, কোম্পানির কর্মীরা রেংয়েন কারবারি পাড়ার একমাত্র পানির উৎস কালাইয়া ঝিরিতে বিষ ঢেলেছে। এই অভিযোগে কোম্পানির কোনো বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি, এবং কোনো সরকারি পরীক্ষার ফলও পাওয়া যায়নি।

কলাগাছ কাটা (24 সেপ্টেম্বর)। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (26 সেপ্টেম্বর 2022) জানায়, কোম্পানির 40–50 জন শ্রমিক রেংয়েন পাড়ার এক বাসিন্দার বাগানের প্রায় 300 কলাগাছ কেটে ফেলে। কোম্পানির ব্যবস্থাপক বলেন, “আমাদের লোকজন কারও কলাগাছ কাটেনি।” তিনি পাল্টা দাবি করেন, আগের বছর কোম্পানির বাগানে লাগানো প্রায় 10,000 রাবার চারা কেটে ফেলা হয়েছিল। একই প্রতিবেদনে ইউএনও জানান, তিন পাড়ার বাসিন্দারা যে শিশুদের স্কুল বানাচ্ছিলেন, এক পক্ষের অভিযোগে তা বন্ধ রাখা হয়েছে, কারণ জমিটি বিরোধপূর্ণ।

বাগান ও বন কাটা (23 অক্টোবর থেকে)। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা-র 27 অক্টোবর 2022-এর প্রতিবেদনে কোম্পানির প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য তিন ধাপে ছাপা হয়েছে। প্রথমে: “না, আমাদের লোকজন কোনো বাগান কাটেনি। পাহাড়িরাই কেটেছে। তারাই আমাদের লিজ নেওয়া বাগানে অবৈধভাবে গ্রাম বানিয়েছে।” তারপর: “ওখানে সব জায়গা আমাদের। আমরা জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লিজ নিয়েছি।” প্রতিবেদন অনুযায়ী এরপর তিনি স্বীকার করেন, 23 অক্টোবর থেকে তাঁদের নির্দেশনাতেই সেখানে গাছ কাটা চলছে। নিউ এজ (1 নভেম্বর 2022) একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তির বরাতে লিখেছে, 23–26 অক্টোবরে রেংয়েন পাড়ার বাসিন্দাদের অন্তত 50টি আমগাছ ও 20 একর বন কাটা হয়।

এই সময়ে ব্যবসা ও মানবাধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টার (7 নভেম্বর 2022) অভিযোগগুলো নিয়ে লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজকে জবাব দিতে অনুরোধ করে। সংস্থার পাতায় লেখা, কোম্পানি জবাব দেয়নি।

1 জানুয়ারি 2023 রাতে রেংয়েন ম্রো পাড়ায় কী ঘটেছিল?

নতুন বছরের প্রথম রাতে রেংয়েন ম্রো পাড়ায় হামলা হয়: ঘরে আগুন, ভাঙচুর ও লুটপাট। পাড়াবাসীর অভিযোগ, হামলাকারীরা রাবার কোম্পানির পক্ষে এসেছিল। কটি ঘর পুড়েছিল এবং ঠিক কোন রাতে, তা নিয়ে উৎসগুলোর হিসাব আলাদা। কোম্পানি জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে; এক পরিচালক দাবি করেন, ম্রোরা নিজেরাই ঘরে আগুন দিয়েছে।

উৎস সময় ক্ষতি
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 2 জানুয়ারি 2023 (ভুক্তভোগীদের বরাতে) সোমবার, 2 জানুয়ারি, রাত প্রায় 1টা 7টি ঘরে আগুন, 5–6টি ঘর ভাঙচুর
দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, 5 জানুয়ারি 2023 (কারবারির বরাতে) রোববার দিবাগত রাত সাড়ে 12টা 3টি ঘরে আগুন, ভাঙচুর ও লুটপাট
বিডিনিউজ২৪ (ইংরেজি), 20 জানুয়ারি 2023 1 জানুয়ারি, রাত প্রায় সাড়ে 12টা 3টি ঘরে আগুন, 3টি ভাঙা, আরও 2টিতে ভাঙচুর-লুট
হিল ভয়েস (এজাহারের বরাতে), 7 জানুয়ারি 2023 1 জানুয়ারি গভীর রাত 3টি ঘরে আগুন, আরও 5টিতে ভাঙচুর; প্রায় 8 লাখ টাকার মালামাল লুট
কাপেং ফাউন্ডেশন, 5 জানুয়ারি 2023 2 জানুয়ারি রাত প্রায় 1টা 7টি ঘর পোড়া, 2টি ভাঙা

হামলাকারীদের সংখ্যা নিয়ে বিবরণও আলাদা: দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় কারবারির ভাষ্যে “রাবার কোম্পানির ছয়টি গাড়িতে শতাধিক লোকজন”; প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণে কোম্পানির 100-র বেশি লোক; হিল ভয়েসে এজাহারের বরাতে ছয়টি ছোট ট্রাকে লাঠি, ধারালো অস্ত্র ও কেরোসিনের টিন নিয়ে আসা লোকজন। হিল ভয়েস আরও লিখেছে, এজাহারে বলা হয়েছে 31 ডিসেম্বর 2022 লামা থানার এক উপপরিদর্শক বাসিন্দাদের ঘর ভেঙে দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন। এই অভিযোগ নিয়ে পুলিশের কোনো বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি।

কোম্পানির তিন রকম বক্তব্য

হামলার পরের দুই সপ্তাহে তিনটি সংবাদমাধ্যম কোম্পানির তিনজন কর্মকর্তার বক্তব্য ছাপে:

  • দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (2 জানুয়ারি) — কোম্পানির ব্যবস্থাপক: “গ্রামে আগুন ও হামলার বিষয়ে কিছুই জানি না। শুনেছি গ্রামবাসীরা আমাদের ৪০০ একর জায়গায় নতুন করে ঘর তৈরি করছে। ওই জায়গা আমাদের। ওদের না।”
  • প্রথম আলো ইংরেজি — কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেংয়েন পাড়ায় আগুন ও লুটপাটের বিষয়ে কোম্পানি কিছু জানে না বলে জানান, এবং বলেন, ওই এলাকায় কিছু ঘটলেই ম্রো ও ত্রিপুরারা কোম্পানিকে দোষ দেন।
  • বিডিনিউজ২৪ ইংরেজি (20 জানুয়ারি) — কোম্পানি অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করে, কোম্পানিকে ফাঁসাতে ম্রোরা নিজেরাই ঘরে আগুন দিয়েছে। কোম্পানির এক পরিচালক হুমকি দেওয়ার কথা অস্বীকার করেন, পাল্টা অভিযোগ করেন যে ম্রোরাই কর্মীদের হুমকি দিয়েছে, কিছু কর্মী পাশের বাগানে যাওয়া বন্ধ করেছেন বা চাকরি ছেড়েছেন। তাঁর ভাষায়, “It seems that we have created our own risk by investing so much money here.”

পুলিশ ও প্রশাসনের প্রথম প্রতিক্রিয়াও নথিভুক্ত। 2 জানুয়ারির প্রতিবেদনে লামা থানার ডিউটি অফিসার ও লামা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার বলেন, তাঁরা ঘটনার কথা জানেন না; জেলা প্রশাসক বলেন, রাবার কোম্পানির সঙ্গে গ্রামবাসীদের দীর্ঘদিনের বিরোধ আছে, কোম্পানি দায়ী প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিডিনিউজ২৪ জানায়, পরে বান্দরবান রেড ক্রিসেন্ট, গ্রাম উন্নয়ন সংগঠন ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্তদের কম্বল, চাল, টিন ও নগদ সহায়তা দেয়।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের জানুয়ারি 2023-এর অনুসন্ধানে কী পাওয়া গেল?

কমিশন 4 জানুয়ারি পাঁচ দফা নির্দেশনা দেয়, 5 জানুয়ারি সদস্য কংজরী চৌধুরীর নেতৃত্বে চার সদস্যের দল রেংয়েন পাড়া পরিদর্শন করে, আর 17 জানুয়ারি চেয়ারম্যান নিজে যান। পরিদর্শনের দিন দলপ্রধান জানান, হামলা, ঘরে আগুন ও লুটপাটের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। দলের লিখিত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (5 জানুয়ারি 2023) অনুযায়ী দলে ছিলেন কমিশনের সদস্য কংজরী চৌধুরী (দলপ্রধান), পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) মো. আশরাফুল আলম, উপপরিচালক মোহাম্মদ গাজী সালাউদ্দিন এবং রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. রবিউল ইসলাম। প্রতিবেদনের বাক্য: “কমিশনের তদন্ত দলের প্রধান কংজরী চৌধুরী সাংবাদিকদের জানান, ম্রোদের ওপর হামলা, তাদের ঘরে আগুন দেওয়া এবং লুটপাটের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। তারা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। কমিশনে তারা তাদের তদন্ত রিপোর্ট জমা দেবেন।”

একই প্রতিবেদনে কংজরী চৌধুরী বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রধান সমস্যা ভূমি সমস্যা, এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশন ঠিকভাবে কাজ করতে পারলে তার অনেকটাই সমাধান হতো। প্রতিবেদনের শেষে লেখা, “তবে হামলাসহ ম্রোদের অভিযোগ অস্বীকার করেছে লামা রাবার ইন্ড্রাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষ।” তদন্ত দল কোম্পানির কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও কথা বলেছিল, তবে সে বিষয়ে সাংবাদিকদের কিছু জানায়নি।

দুই সপ্তাহ পরে, 17 জানুয়ারি, কমিশনের চেয়ারম্যান ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্য ডেইলি স্টার বাংলা-কে বলেন, “ম্রো পাড়ায় যারা অগ্নিসংযোগ করেছে তাদের ছেড়ে দেওয়া হবে না।” কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন 2023-এ (পৃষ্ঠা 93) এই পরিদর্শনের একটি ছবি আছে, ক্যাপশন: “১৭ জানুয়ারি ২০২৩ তারিখ বান্দরবানের লামা উপজেলায় ম্রো জাতিসত্তার মানুষদের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের পরিদর্শন।” বিডিনিউজ২৪ জানায়, চেয়ারম্যান বলেছিলেন স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

কাপেং ফাউন্ডেশনের হিসাবে, কমিশন 4 জানুয়ারি ভুক্তভোগী পরিবারকে সহায়তা ও হয়রানি না করাসহ পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়ে জেলা প্রশাসককে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলে, এবং পরে প্রতিবেদনে “আরও তথ্য প্রয়োজন” বলে 31 জানুয়ারি 2023-এর মধ্যে জেলা প্রশাসকের কাছে অতিরিক্ত তথ্য চায়।

পরিদর্শনের তারিখ নিয়ে একটি অমিল আছে: জানুয়ারির প্রতিবেদনগুলোতে কংজরী চৌধুরীর দলের পরিদর্শন 5 জানুয়ারি, কিন্তু দ্য ডেইলি স্টার বাংলা-র 26 এপ্রিল 2023-এর প্রতিবেদনে লেখা “গত ৫ মার্চ” কমিশনের দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং কংজরী চৌধুরী বলেন “তদন্তে তারা অগ্নিসংযোগের সত্যতা পেয়েছেন। সে অনুযায়ী রিপোর্ট দেওয়া হবে।”

“সত্যতা মিলেছে” কথাটি কোন নথিতে আছে

কমিশনের কোনো প্রকাশিত নথিতে জানুয়ারি 2023-এর তদন্তের পূর্ণ প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। ফলে “হামলা, আগুন ও লুটপাটের সত্যতা” কথাটি দাঁড়িয়ে আছে দলপ্রধানের মৌখিক বক্তব্যে, যা দ্য ডেইলি স্টার বাংলাসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম ছেপেছে। এপ্রিল 2022-এর আগুন নিয়ে কমিশনের অবস্থান অবশ্য লিখিত আকারে আছে — বার্ষিক প্রতিবেদন 2022-এ, “প্রাথমিক সত্যতা” শব্দে। কমিশনের অনুসন্ধানে হামলাকারী কারা, তা কোনো প্রকাশিত নথিতে নির্দিষ্ট করা হয়নি।

রেংয়েন পাড়ার কারবারির মামলায় কারা আসামি, কেউ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কি?

7 জানুয়ারি 2023, হামলার ছয় দিন পর, রেংয়েন পাড়ার কারবারি লামা থানায় মামলা করেন। আসামি 10 জন নামধারী এবং 150–170 জন অজ্ঞাত; নামধারীদের মধ্যে কোম্পানির চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, প্রকল্প পরিচালক ও ব্যবস্থাপক। 18 জানুয়ারি পর্যন্ত কেউ গ্রেপ্তার হননি।

দ্য ডেইলি স্টার বাংলা (7 জানুয়ারি) অনুযায়ী লামা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পাড়ার কারবারিসহ 5–6 জন গ্রামবাসী থানায় এসে কোম্পানির একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে প্রধান আসামি করে মামলা করেছেন। একই প্রতিবেদনে ওই কর্মকর্তার পদবি একবার “ব্যবস্থাপনা পরিচালক”, একবার “প্রকল্প পরিচালক” লেখা। হিল ভয়েস লিখেছে, এজাহারে কোম্পানির চার কর্মকর্তাকে পরিকল্পনাকারী এবং ছয়জনকে অগ্নিসংযোগে নেতৃত্বদানকারী হিসেবে নাম দেওয়া হয়েছে। এজাহারে কোন কোন ধারা উল্লেখ করা হয়েছে, প্রকাশিত কোনো উৎসে নেই।

মামলা দেরিতে কেন, তা নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য ছাপা হয়েছে। এক গ্রামবাসী দ্য ডেইলি স্টার বাংলাকে বলেন, কোম্পানির লোকজন পাড়ার আশপাশে নজরদারি করছে শুনে থানায় যেতে ভয় পাচ্ছিলেন। 18 জানুয়ারির প্রতিবেদনে বান্দরবানের পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, পুলিশ ঘটনার পরদিন থেকেই মামলা করতে বলেছিল, “কিন্তু তারা ৭ দিন পর মামলা করেছে।” ভারপ্রাপ্ত ওসি বলেন, “অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আমাদের দিক থেকে চেষ্টার কোনো কমতি নেই।” এরপর কেউ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কি না, অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে কি না, প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি।

সংসদীয় উপকমিটি এপ্রিল 2023-এ রেংয়েন পাড়ায় গিয়ে কী বলেছিল?

পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির একটি উপকমিটি 26 এপ্রিল 2023 রেংয়েন পাড়ায় যায়। আহ্বায়ক পাড়াপ্রধানদের বলেন, জায়গাটি রাবার কোম্পানির নামে লিজ দেওয়া এবং গ্রামবাসীর নামে দলিল নেই। তিনি 220 একর গ্রামবাসীর নামে বন্দোবস্ত দেওয়ার প্রস্তাব দেন; পাড়ার নেতারা 400 একর দাবি করেন।

দ্য ডেইলি স্টার বাংলা অনুযায়ী উপকমিটিতে ছিলেন আহ্বায়ক ও চট্টগ্রাম-6 আসনের সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, রাঙামাটির সংসদ সদস্য দীপঙ্কর তালুকদার এবং সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য বাসন্তী চাকমা। পাড়াবাসী ও কোম্পানির পরিচালকদের উপস্থিতিতে আলোচনা শেষে আহ্বায়ক কারবারিদের বলেন, “এই জায়গাটা রাবার কোম্পানির নামে লিজ দেওয়া আছে। আপনারা এখানে বসবাস করলেও আপনাদের নামে জমির দলিল নেই। জমির মালিক আপনারা নন।”

তাঁর প্রস্তাব ছিল: প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে 5 একর করে 36 পরিবারের জন্য 180 একর, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের জন্য 5 একর, তিন গ্রামের জন্য 15 একর এবং শ্মশানের জন্য 20 একর — মোট 220 একর, কোম্পানির কাছ থেকে। তিনি বলেন, পার্বত্য চুক্তির পর ভূমি বন্দোবস্ত প্রক্রিয়া বন্ধ আছে, প্রয়োজনে বিশেষ অনুরোধে “আইনটা আবার চালু করে” তিন গ্রামের নামে 220 একর বন্দোবস্ত করা হবে। পাড়ার নেতারা 400 একর চান।

পাড়াবাসীর পক্ষ থেকে সেদিন বলা হয়, “কোম্পানির লোকেরা আমাদের ঘর পুড়িয়ে দিলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।” পরদিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠকের কথা ছিল। সেই বৈঠকে কী হয়েছিল, এবং উপকমিটির প্রতিবেদন সংসদে জমা পড়েছিল কি না, প্রকাশিত কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। প্রতিবেদনে কোম্পানির পরিচালকদের কোনো বক্তব্য ছাপা হয়নি।

পার্বত্য চুক্তি ও প্রচলিত আইন রাবার বাগানের ইজারা নিয়ে কী বলে?

1997 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (ঘ) খণ্ডের 8 নম্বর ধারায় বলা আছে, রাবার বা অন্য প্লান্টেশনের জন্য যেসব অ-উপজাতীয় ও অ-স্থানীয় ব্যক্তিকে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, তাঁদের মধ্যে যাঁরা দশ বছরে প্রকল্প নেননি বা জমি ঠিকভাবে ব্যবহার করেননি, তাঁদের বন্দোবস্ত বাতিল হবে। (খ) খণ্ডের 26 ধারায় জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া জমি ইজারা বা বন্দোবস্ত নিষেধ।

এই দুই ধারার পূর্ণ ব্যাখ্যা আমাদের আর্কাইভের লেখা ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে আবেদন করবেন কীভাবে-এ আছে। সেখানে উদ্ধৃত চুক্তির ভাষা অনুযায়ী, (খ) খণ্ডের 26 ধারা পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনের 64 ধারা নতুন করে লিখেছে: পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোনো জমি ইজারা, বন্দোবস্ত, ক্রয়, বিক্রয় বা হস্তান্তর করা যাবে না। ব্যতিক্রম রক্ষিত বনাঞ্চল, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এলাকা, বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ এলাকা, রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানা ও সরকারের নামে রেকর্ডকৃত ভূমি।

লামার ইজারা এই ধারাগুলোর আওতায় পড়ে কি না, তা নিয়ে প্রকাশিত দুটি ভিন্ন অবস্থান আছে। দ্য ডেইলি স্টারের মতামত-নিবন্ধ (নভেম্বর 2022) বলে, আঞ্চলিক পরিষদ ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সম্মতি ছাড়া ইজারা দেওয়া হয়েছে, যা চুক্তি ও আইনের লঙ্ঘন। ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স লিখেছে, ইজারা দিয়েছিল জেলা পরিষদই, 1992 সালে। কোম্পানির প্রকল্প পরিচালক বলেছেন, ইজারা নেওয়া হয়েছিল জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে। ভূমি রক্ষা কমিটির অভিযোগ, 10 বছরের মধ্যে বাগান করার শর্ত ভাঙা হয়েছে; টিবিএস লিখেছে, বাসিন্দাদের মতে কোম্পানি 27 বছরে পুরো এলাকায় রাবার লাগায়নি। এই প্রশ্নে কোনো আদালত বা ভূমি কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।

পাহাড়ে ইজারা-ব্যবস্থার ইতিহাস — 1900 সালের শাসনবিধির 34 নম্বর বিধি, 1920, 1971 ও 1979 সালের সংশোধনী — আমাদের লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি: ১৯০০ সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন-এ আছে। বাণিজ্যিক বাগান ও রাবার চাষের জন্য ইজারা যে জুমিয়াদের সমষ্টিগত ভূমি হারানোর একটি কারণ, সে অভিযোগ আমাদের আর্কাইভের পুরোনো লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার চিত্র-এও লিপিবদ্ধ: সেখানে লেখা, “জমি ইজারা দানের মধ্য দিয়েও পাহাড়ি জুমিয়ারা তাদের জুম ও সমষ্টিগত ভূমি হারাচ্ছে”।

লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ নিজের পক্ষে কী বলেছে — সব বক্তব্য এক জায়গায়

প্রকাশিত উৎসে কোম্পানির পক্ষে বারোটি বক্তব্য পাওয়া যায়, সবই সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া। কোম্পানির নিজস্ব কোনো লিখিত বিবৃতি, সংবাদ সম্মেলন বা ওয়েবসাইট পাওয়া যায়নি। মূল অবস্থান তিনটি: বিরোধের জমি ইজারাভুক্ত, আগুন ও হামলায় কোম্পানি জড়িত নয়, আর গ্রামবাসীরা অবৈধভাবে জমিতে বসেছেন। একটি বক্তব্যে আগুন দেওয়ার কথা স্বীকার করা হয়, তবে নিজেদের বাগানে।

তারিখ ও সংবাদমাধ্যম বক্তার পদবি (উৎসে যেমন) বক্তব্য
ফেব্রুয়ারি 2021, দ্য ডেইলি স্টার ব্যবস্থাপক জুমভূমি দখল করা হয়নি; ম্রো ও ত্রিপুরারা অবৈধভাবে প্লটে ঢুকেছেন; ইজারার শর্ত জানা নেই
27 এপ্রিল 2022, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা পরিচালক “আমরা কারো জুমের যায়গায় আগুন লাগাইনি। তবে আমরা সেখানে আমাদের জায়গা পরিষ্কার করেছিলাম।”
এপ্রিল 2022, টিবিএস ব্যবস্থাপক আগুন “নতুন ষড়যন্ত্রের অংশ”
30 এপ্রিল 2022, টিবিএস ব্যবস্থাপনা পরিচালক 300 একর কাজুবাদাম ও ফলের বাগান পোড়ানো হয়েছে, ইজারার জমির ভেতরে; কোনো বসতবাড়ির ক্ষতি হয়নি
8 মে 2022, প্রথম আলো প্রকল্প পরিচালক “ম্রো ও ত্রিপুরাদের ভুল বুঝিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে লাগানো হচ্ছে।”
5 সেপ্টেম্বর 2022, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা প্রকল্প পরিচালক “৪০০ একর জমি আমাদের লিজের আওতাধীন।”
26 সেপ্টেম্বর 2022, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ব্যবস্থাপক “আমাদের লোকজন কারও কলাগাছ কাটেনি।”
12 অক্টোবর 2022, বিডিনিউজ২৪ ব্যবস্থাপক অভিযোগ অস্বীকার (উদ্ধৃতি ছাপা হয়নি)
27 অক্টোবর 2022, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা প্রকল্প পরিচালক প্রথমে অস্বীকার; “ওখানে সব জায়গা আমাদের। আমরা জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে লিজ নিয়েছি।”; পরে নিজেদের নির্দেশে গাছ কাটা স্বীকার
নভেম্বর 2022, বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টার — জবাবের অনুরোধে সাড়া দেয়নি
2 জানুয়ারি 2023, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ব্যবস্থাপক “গ্রামে আগুন ও হামলার বিষয়ে কিছুই জানি না… ওই জায়গা আমাদের। ওদের না।”
জানুয়ারি 2023, প্রথম আলো ইংরেজি ব্যবস্থাপনা পরিচালক আগুন-লুটপাটের বিষয়ে কোম্পানি কিছু জানে না; কিছু হলেই কোম্পানিকে দোষ দেওয়া হয়
20 জানুয়ারি 2023, বিডিনিউজ২৪ পরিচালক ম্রোরা নিজেরাই ঘরে আগুন দিয়েছে বলে কোম্পানির দাবি; হুমকির অভিযোগ অস্বীকার, পাল্টা অভিযোগ

একই নামের এক কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বিভিন্ন পদবিতে উল্লেখ করেছে — কোথাও “পরিচালক”, কোথাও “প্রকল্প পরিচালক”, কোথাও “ব্যবস্থাপনা পরিচালক”, কোথাও “ম্যানেজার”। এমনকি দ্য ডেইলি স্টার বাংলার একটি প্রতিবেদনেই দুটি পদবি আছে। কোম্পানির প্রকৃত পরিচালনা কাঠামো কোনো প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি। ছকের পদবিগুলো উৎসে যেমন ছাপা হয়েছে তেমনই রাখা হয়েছে।

2025 সালে ভূমি রক্ষা কমিটির নেতাকে কোন মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়?

22 ফেব্রুয়ারি 2025 সন্ধ্যায় লামা থানার সাদা পোশাকের পুলিশ লাংকম পাড়া থেকে ভূমি রক্ষা কমিটির এক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সের তথ্য অনুযায়ী মামলাটি কোম্পানির 14 আগস্ট 2022-এর অভিযোগ থেকে, যাতে দণ্ডবিধির 435 ধারা প্রয়োগ করা হয়েছিল। গ্রেপ্তার নিয়ে কোম্পানি বা পুলিশের কোনো বক্তব্য প্রকাশিত হয়নি।

ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স জানায়, গ্রেপ্তার পরোয়ানা ছাড়া হয়েছিল এবং 23 ফেব্রুয়ারি থেকে তিনি বান্দরবান জেলা কারাগারে ছিলেন; সংস্থাটি আটককে “arbitrary” বলেছে। কাপেং ফাউন্ডেশন তাঁর ছেলের বরাতে লিখেছে, তাঁর বিরুদ্ধে তিনটি মামলা আছে; লামা থানায় ফোন করে সাড়া পাওয়া যায়নি বলেও কাপেং উল্লেখ করেছে। তিনি জামিন পেয়েছিলেন কি না, তা-ও জানা যায়নি।

প্রশ্নোত্তর

জাতীয় মানবাধিকার কমিশন লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে অভিযোগে কী পেয়েছিল?

কমিশন দুই ধাপে বলেছে। মে 2022-এ তারা জানায়, 26 এপ্রিল প্রায় 350 একর জুমভূমি পোড়ানো ও ম্রো-ত্রিপুরাদের উচ্ছেদ-চেষ্টার অভিযোগের “প্রাথমিক সত্যতা” পাওয়া গেছে; এটি কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন 2022-এ ছাপা আছে। 5 জানুয়ারি 2023 তদন্ত দলের প্রধান কংজরী চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, রেংয়েন পাড়ায় হামলা, আগুন ও লুটপাটের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। দ্বিতীয় তদন্তের লিখিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ কত একর জমি ইজারা পেয়েছিল?

বেশিরভাগ উৎস মোট প্রায় 1,600 একর বলে। দ্য ডেইলি স্টারের 2021 সালের প্রতিবেদনে কোম্পানির ব্যবস্থাপকের হিসাবে সরই মৌজায় 375 একর এবং ডলুছড়ি মৌজায় 1,225 একর, 1994 সালে 40 বছরের জন্য। ইজারার বছর নিয়ে উৎসভেদে 1988–1994, 1992, 1994, 1995 ও 1996 পাওয়া যায়। ভূমি রক্ষা কমিটির দাবি, কোম্পানি বাস্তবে 3,000 থেকে 3,500 একর দখলে রেখেছে।

রেংয়েন ম্রো পাড়া কোথায়?

রেংয়েন ম্রো পাড়া বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নে। পাশের দুটি পাড়া লাংকম ম্রো পাড়া ও জয়চন্দ্র ত্রিপুরা পাড়া। টিবিএস ও দ্য ডেইলি স্টার বাংলার হিসাবে তিন পাড়ায় 39টি পরিবার; প্রথম আলো ইংরেজির হিসাবে রেংয়েন পাড়ায় 11টি ম্রো পরিবার। পাড়ার নাম কারবারির নামে, আর বানান উৎসভেদে রেংয়েন, রেঙয়েন, রেঙেন বা রেংইয়েন।

26 এপ্রিল 2022-এর আগুনে কত একর পুড়েছিল?

উৎসভেদে সংখ্যা আলাদা। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা লিখেছে প্রায় 100 একর জুমবাগান; টিবিএস 300–350 একর; জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন 2022 প্রায় 400 একর জুমজমির মধ্যে প্রায় 350 একর; সরই ইউপি চেয়ারম্যান 400 একর। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক টিবিএসকে বলেন, তারা নিজেদের ইজারার জমিতে 300 একর কাজুবাদাম ও ফলের বাগান পুড়িয়েছেন।

লামা রাবার ইন্ডাস্ট্রিজ অভিযোগের জবাবে কী বলেছে?

কোম্পানির কর্মকর্তারা সংবাদমাধ্যমকে বারবার বলেছেন, বিরোধের 400 একর তাদের ইজারার জমি এবং গ্রামবাসীরা সেখানে অবৈধভাবে ঘর তুলেছেন। জানুয়ারি 2023-এর হামলায় জড়িত থাকার কথা তারা অস্বীকার করেছে; বিডিনিউজ২৪-কে কোম্পানি দাবি করে, ম্রোরা নিজেরাই ঘরে আগুন দিয়েছে। নভেম্বর 2022-এ বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টারের জবাবের অনুরোধে কোম্পানি সাড়া দেয়নি।

1 জানুয়ারি 2023-এর হামলায় কয়টি ঘর পুড়েছিল?

হিল ভয়েসে উদ্ধৃত এজাহার ও বিডিনিউজ২৪ অনুযায়ী 3টি ঘরে আগুন দেওয়া হয় এবং আরও কয়েকটিতে ভাঙচুর ও লুটপাট হয়; এজাহারে লুটের মূল্য প্রায় 8 লাখ টাকা। ঘটনার পরদিনের দ্য ডেইলি স্টার বাংলা ও কাপেং ফাউন্ডেশন 7টি ঘর পোড়ার কথা লিখেছিল। সময় নিয়েও অমিল আছে: কিছু উৎসে 1 জানুয়ারি রাত সাড়ে 12টা, কিছুতে 2 জানুয়ারি রাত 1টা।

রেংয়েন পাড়ার হামলার মামলায় কেউ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন কি?

7 জানুয়ারি 2023 রেংয়েন পাড়ার কারবারি লামা থানায় 10 জনের নাম উল্লেখ করে এবং 150–170 জন অজ্ঞাতকে আসামি করে মামলা করেন। দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 18 জানুয়ারি জানায়, তখনো কেউ গ্রেপ্তার হননি। এর পরে গ্রেপ্তার বা অভিযোগপত্রের কোনো খবর প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি। এপ্রিল 2022-এর আগুনের মামলায় অবশ্য কোম্পানির একজন ব্যবস্থাপকসহ দুজন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদ কি ইজারা বাতিলের সুপারিশ করেছিল?

সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী করেছিল। বিডিনিউজ২৪ (অক্টোবর 2022) জানায়, পরিষদের পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি, যার প্রধান ছিলেন স্থানীয় সরকারের উপপরিচালক, ইজারা বাতিলসহ ছয়টি সুপারিশ করেছিল এবং সেগুলো বাস্তবায়ন হয়নি। দ্য ডেইলি স্টার বাংলায় উদ্ধৃত ভূমি রক্ষা কমিটির বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী সুপারিশটি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। পরিষদের প্রতিবেদন নিজে প্রকাশিত হয়নি।

সংসদীয় কমিটি লামার জমি নিয়ে কী প্রস্তাব দিয়েছিল?

26 এপ্রিল 2023 পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির উপকমিটি রেংয়েন পাড়ায় যায়। আহ্বায়ক এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী বলেন, জায়গাটি রাবার কোম্পানির নামে লিজ দেওয়া এবং গ্রামবাসীর নামে দলিল নেই। তিনি কোম্পানির কাছ থেকে মোট 220 একর — 36 পরিবারকে 5 একর করে, আর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গ্রাম ও শ্মশানের জন্য — দেওয়ার প্রস্তাব দেন। পাড়ার নেতারা 400 একর দাবি করেন।

পার্বত্য চুক্তিতে রাবার বাগানের ইজারা নিয়ে কী বলা আছে?

1997 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির (ঘ) খণ্ডের 8 নম্বর ধারা বলে, রাবার বা অন্য প্লান্টেশনের জন্য বরাদ্দ পাওয়া যেসব অ-উপজাতীয় ও অ-স্থানীয় ব্যক্তি দশ বছরে প্রকল্প নেননি বা জমি ঠিকভাবে ব্যবহার করেননি, তাঁদের বন্দোবস্ত বাতিল হবে। (খ) খণ্ডের 26 ধারা অনুযায়ী জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া পার্বত্য জেলার জমি ইজারা বা বন্দোবস্ত দেওয়া যায় না, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া।

কোম্পানি গ্রামবাসীদের বিরুদ্ধে কী মামলা করেছিল?

প্রকাশিত উৎসে অন্তত তিনটি মামলার উল্লেখ আছে। কাপেং ফাউন্ডেশন অনুযায়ী 14 আগস্ট 2022 কোম্পানির উপব্যবস্থাপক বান্দরবানের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে 11 জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন, আর 4 সেপ্টেম্বর 2022 আরও 14 জনের বিরুদ্ধে সিআর মামলা 313/2022 হয়। ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স জানায়, প্রথমটির অভিযোগ বেআইনি সমাবেশ ও দণ্ডবিধির 435 ধারা। 2017 সালেও একটি মামলা হয়েছিল।

হাইকোর্ট কি লামার জমি নিয়ে কোনো আদেশ দিয়েছিল?

দ্য ডেইলি স্টার বাংলা 27 অক্টোবর 2022 শিরোনামে লিখেছে, “হাইকোর্ট-প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষিত”, আর কাপেং ফাউন্ডেশন লিখেছে, 2 অক্টোবর 2022 হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও কোম্পানির শ্রমিকেরা বন কেটেছে। কিন্তু সেই আদেশের তারিখ, রিট বা মামলার নম্বর, আবেদনকারী ও আদেশের ভাষা কোনো প্রকাশিত উৎসে পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের 144 ধারার নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল 27 সেপ্টেম্বর 2022।

যা এখনো জানা যায়নি

  • কমিশনের জানুয়ারি 2023-এর লিখিত তদন্ত প্রতিবেদন। দলপ্রধান বলেছিলেন প্রতিবেদন কমিশনে জমা হবে; কমিশনের প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন 2023-এ কেবল পরিদর্শনের ছবি আছে, প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নেই।
  • জেলা প্রশাসকের প্রতিবেদন। কমিশন 15 জুন 2022 এবং পরে 31 জানুয়ারি 2023-এর মধ্যে প্রতিবেদন চেয়েছিল। সেগুলো জমা পড়েছিল কি না এবং কী ছিল, জানা যায়নি।
  • জেলা পরিষদের তদন্ত প্রতিবেদন। ছয় সুপারিশের পাঁচটি কী ছিল, এবং মন্ত্রণালয় কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, জানা যায়নি।
  • হাইকোর্টের নির্দেশনা। তারিখ, মামলার নম্বর ও আদেশের ভাষা পাওয়া যায়নি।
  • ইজারার মূল দলিল। কোন বছর, কে দিয়েছিল, কোন শর্তে — উৎসগুলোর মধ্যে মেলে না; দলিলের কোনো অনুলিপি প্রকাশিত হয়নি।
  • মামলাগুলোর পরিণতি। এপ্রিল 2022 ও জানুয়ারি 2023-এর দুই মামলা এবং কোম্পানির করা মামলাগুলোর অভিযোগপত্র, বিচার বা নিষ্পত্তির খবর পাওয়া যায়নি।
  • সংসদীয় উপকমিটির পরবর্তী বৈঠক ও প্রতিবেদন। 27 এপ্রিল 2023 জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বৈঠকের ফল জানা যায়নি।
  • 2023-এর পরের অবস্থা। ইজারা বহাল আছে না বাতিল হয়েছে, পাড়াগুলো এখনো সেখানে আছে কি না — 2025 সালের গ্রেপ্তারের খবর ছাড়া পরবর্তী কোনো নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
  • সংখ্যার অমিল। পরিবারের সংখ্যা (11, 36, 39, 65), পোড়া জমি (100–400 একর) এবং পোড়া ঘর (3 বা 7) — উৎসগুলো এক সংখ্যায় একমত নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি, আইন ও জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের অন্য লেখাগুলো পাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম হাব পাতায়।

তথ্যসূত্র

সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক নথি

  1. জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২, পৃষ্ঠা 10 (মুখবন্ধ), 30 ও 55। ঢাকা। (কমিশনের বার্ষিক প্রতিবেদন পাতা)
  2. জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৩, পৃষ্ঠা 93। ঢাকা।
  3. জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের 11 মে 2022-এর বিবৃতি, আইপি নিউজ বিডিতে প্রকাশিত: লামায় ম্রো-ত্রিপুরা আদিবাসীদের উচ্ছেদ চেষ্টার সত্যতা পেয়েছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, 12 মে 2022।
  4. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো। Small Area Atlas: Bandarban Zila — Lama Upazila mauza geocode map, উইকিমিডিয়া কমন্স।

জুমজার্নাল আর্কাইভ

  1. ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে আবেদন করবেন কীভাবে — পার্বত্য চুক্তির (খ) 26 ও (ঘ) 8 ধারার পাঠ।
  2. পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি: ১৯০০ সালের রেগুলেশন থেকে ভূমি কমিশন।
  3. পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার চিত্র।
  4. পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমচাষে আদিবাসী লোকজ্ঞান।
  5. ম্রো জনগোষ্ঠী ও ক্রামা ধর্ম।

সংবাদ প্রতিবেদন

  1. দ্য ডেইলি স্টার। Land lost, so is livelihood, 12 ফেব্রুয়ারি 2021।
  2. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। রাবার কোম্পানির বিরুদ্ধে ম্রোদের জুমের বাগান পুড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ, 27 এপ্রিল 2022।
  3. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। লামায় পাহাড়ে রাবার কোম্পানির আগুনে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, 30 এপ্রিল 2022।
  4. দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। Greed for land burns hills to ashes, 30 এপ্রিল 2022।
  5. প্রথম আলো। লামায় রাবার কোম্পানির লোকজন দেখে ত্রাণ নেননি পাড়াবাসী, 8 মে 2022।
  6. আইপি নিউজ বিডি। লামায় ৪০০ একর জুমভূমি: বিরোধ নিরসনে মতবিনিময় সভা, আগস্ট 2022।
  7. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। ম্রো-ত্রিপুরাদের ৪০০ একর জমির দখল মুক্তি ও মামলা প্রত্যাহারের দাবি, 5 সেপ্টেম্বর 2022।
  8. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। ‘পাহাড় ইজারা দিয়ে ম্রো ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়কে উচ্ছেদ করা হচ্ছে’, 21 সেপ্টেম্বর 2022।
  9. নিউ এজ। Protection sought for 400 acres of Mro, Tripura land in Lama, 22 সেপ্টেম্বর 2022।
  10. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। এবার লামায় রাবার কোম্পানির বিরুদ্ধে ৩০০ কলাগাছ কাটার অভিযোগ, 26 সেপ্টেম্বর 2022।
  11. বিডিনিউজ২৪। লামায় আদিবাসীদের ‘উচ্ছেদের চেষ্টা’: নাগরিক সমাজের উদ্বেগ, 12 অক্টোবর 2022।
  12. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। হাইকোর্ট-প্রশাসনের নির্দেশনা উপেক্ষিত, জুম বাগান-বন কাটছে রাবার ইন্ডাস্ট্রির মালিকপক্ষ, 27 অক্টোবর 2022।
  13. নিউ এজ। Cancellation of land lease to Lama Rubber Industries demanded, 1 নভেম্বর 2022।
  14. দ্য ডেইলি স্টার (মতামত)। An environmental and livelihood crisis in Bandarban’s Lama, 9 নভেম্বর 2022।
  15. বিজনেস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস রিসোর্স সেন্টার। Bangladesh: Lama Rubber Industries activities in Bandarban infringe on Indigenous people’s rights, 7 নভেম্বর 2022।
  16. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। লামায় ম্রোদের বাড়িঘরে আগুন-ভাঙচুরের অভিযোগ, 2 জানুয়ারি 2023।
  17. প্রথম আলো ইংরেজি। Mru people attacked in Bandarban, houses torched, vandalised, জানুয়ারি 2023।
  18. কাপেং ফাউন্ডেশন। Heinous attack and torching of indigenous Mro houses by Lama Rubber Industries in Bandarban, 5 জানুয়ারি 2023।
  19. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। ম্রোদের ওপর হামলা, আগুন ও লুটপাটের সত্যতা মিলেছে: জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, 5 জানুয়ারি 2023।
  20. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। ম্রো পাড়ায় হামলা: রাবার ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা, 7 জানুয়ারি 2023।
  21. হিল ভয়েস। Lastly case filed in the incident of arson and looting on Mro village in Lama, 7 জানুয়ারি 2023।
  22. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। ম্রো পাড়ায় হামলা-অগ্নিসংযোগ: ১০ দিনেও ধরা পড়েনি অভিযুক্তরা, 18 জানুয়ারি 2023।
  23. বিডিনিউজ২৪ (ইংরেজি)। A Jan 1 attack vandalised and torched Mro homes in Bandarban’s Lama, 20 জানুয়ারি 2023।
  24. দ্য ডেইলি স্টার বাংলা। ম্রো পাড়ার জায়গা রাবার কোম্পানির নামে লিজ দেওয়া আছে: সংসদীয় কমিটি, 26 এপ্রিল 2023।
  25. পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। August 2020: Monthly Report on Human Rights Situation in the CHT।
  26. ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স। Indigenous land rights defender arbitrarily detained in Bandarban District Jail, 2025।
  27. কাপেং ফাউন্ডেশন। Arrest of Indigenous leader and ongoing land grabbing in Bandarban, ফেব্রুয়ারি 2025।

সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026

প্রসঙ্গ:জুমচাষ, বান্দরবান, ভূমি অধিকার, ভূমি বিরোধ, মানবাধিকার, ম্রো

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা