Jumjournal Logo

‘জুমল্যান্ড ষড়যন্ত্র’ বলতে কী বোঝানো হয়: কে কবে কী প্রকাশ করেছে, আর দলিলে কী লেখা আছে

Last updated Oct 19th, 2026

2

শুকনো ছড়ার বুকে ধাপে ধাপে সাজানো পাথরের স্তর, দুই পাশে গাছপালা

“জুমল্যান্ড ষড়যন্ত্র” কথাটি প্রথম শুনলে মনে হতে পারে এটি কোনো আদালতের রায় বা সরকারি তদন্তের নাম। আসলে শব্দটি দুই ধরনের লেখায় পাওয়া যায়। এক, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির 1987 ও 1992 সালের দাবিনামা, যেখানে বাংলাদেশের ভেতরে স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের নাম বদলে “জুম্ম ল্যান্ড” বা “জুমল্যান্ড” রাখার কথা লেখা আছে। দুই, 2015 সাল থেকে প্রকাশিত একগুচ্ছ সংবাদ ও কলাম, যেগুলোতে “জুমল্যান্ড” বলতে বাংলাদেশ থেকে আলাদা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার অভিযোগ বোঝানো হয়েছে। 1997 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে শব্দটি একবারও নেই।

এই পাতা কোনো পক্ষের রায় দেয় না। কোন দলিলে কী লেখা, কোন প্রকাশনা কবে কী ছেপেছে, কে কোন সূত্রের কথা বলেছেন, আর যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁরা কী বলেছেন — উদ্ধৃতিসহ শুধু সেটুকু এক জায়গায় রাখা হলো। চুক্তির ধারা-ভিত্তিক বিশ্লেষণ আমাদের আলাদা লেখা পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি 1997: ধারা ধরে ধরে-এ আছে, আর জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফের ইতিহাস জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ: কে, কবে, কেন-এ। এখানে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি নেই। পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে আমাদের সব লেখা একসঙ্গে পাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।

সূচিপত্র

  1. এক নজরে: কোন দলিলে “জুমল্যান্ড” আছে, কোনটিতে নেই
  2. “জুম” থেকে “জুম্ম”, “জুম্ম” থেকে “জুমল্যান্ড”: নামটি কোথা থেকে
  3. 1987 সালের পাঁচ দফায় “জুম্ম ল্যান্ড” নামে কী চাওয়া হয়েছিল
  4. একই দাবিনামা, দুই রকম বিবরণ: আর্কাইভের পাঠ ও এক সেনা কর্মকর্তার স্মৃতিকথা
  5. 1992 সালের সংশোধিত দাবিনামা ও “জুম্মল্যান্ড আঞ্চলিক পরিষদ”
  6. 1997 সালের চুক্তিতে কি “জুমল্যান্ড” আছে?
  7. দাবিনামা বনাম চুক্তি: পাশাপাশি ছক
  8. “জুমল্যান্ড ষড়যন্ত্র” শিরোনাম কবে থেকে, কোথায় ছাপা হয়েছে
  9. লেখাগুলোতে ঠিক কী কী দাবি করা হয়েছে, আর সূত্র হিসেবে কী বলা আছে
  10. একই অনুচ্ছেদ এক কাগজ থেকে আরেক কাগজে: প্রকাশনার চক্র
  11. “আদিবাসী” স্বীকৃতির দাবির সঙ্গে জুমল্যান্ডকে কারা জুড়েছেন
  12. যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা কী বলেছেন
  13. সামাজিক মাধ্যমে কোন দাবি যাচাই হয়েছে
  14. “Jummaland” নামটি কারা নিজেরা ব্যবহার করেছেন
  15. প্রশ্নোত্তর
  16. যা এখনো জানা যায়নি
  17. তথ্যসূত্র

এক নজরে: কোন দলিলে “জুমল্যান্ড” আছে, কোনটিতে নেই

জনসংহতি সমিতির দুটি দাবিনামায় শব্দটি আছে, দুটিতেই বাংলাদেশের ভেতরে থেকে নাম বদলের প্রস্তাব হিসেবে। 1997 সালের চুক্তির পূর্ণ পাঠে শব্দটি নেই, অঞ্চলের নামও বদলায়নি। 2015 থেকে প্রকাশিত সংবাদ ও কলামে শব্দটি এসেছে স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার অভিযোগ বোঝাতে। বানানও এক নয়: জুম্ম ল্যান্ড, জুমল্যান্ড, জুম্মল্যান্ড, জুম্মুল্যান্ড।

দলিল / প্রকাশনা সাল যে বানানে আছে সেখানে শব্দটির অর্থ
জনসংহতি সমিতির পাঁচ দফা দাবিনামা 17 ডিসেম্বর 1987 “জুম্ম ল্যান্ড” প্রাদেশিক মর্যাদাসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের নতুন নাম
সংশোধিত পাঁচ দফা ও আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের রূপরেখা 4 ডিসেম্বর 1992 “জুমল্যান্ড”, “জুম্মল্যান্ড আঞ্চলিক পরিষদ” তিন জেলা মিলিয়ে একটি প্রশাসনিক ইউনিটের নাম, এবং প্রস্তাবিত আঞ্চলিক পরিষদের নাম
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি 2 ডিসেম্বর 1997 নেই অঞ্চলের নাম “পার্বত্য চট্টগ্রাম”, পরিষদের নাম “আঞ্চলিক পরিষদ”
পার্বত্যনিউজ, ইত্তেফাক, কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, ঢাকা টাইমস, এখন টিভিসহ সংবাদ ও কলাম 2015–2025 জুমল্যান্ড / জুম্মল্যান্ড বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ার অভিযোগ
সময়ের আলো-তে প্রকাশিত কলাম 30 সেপ্টেম্বর 2024 জুম্মুল্যান্ড / জুমল্যান্ড সামাজিক মাধ্যমের বিতর্ক, যার বিপরীতে আন্দোলনকারীদের অস্বীকৃতি উদ্ধৃত
ডিসমিসল্যাবের ফ্যাক্টচেক 16 আগস্ট 2026 জুম্মল্যান্ড ভাইরাল ভিডিওর ক্যাপশনে আরোপিত দাবি, যা বক্তব্যে পাওয়া যায়নি

“জুম” থেকে “জুম্ম”, “জুম্ম” থেকে “জুমল্যান্ড”: নামটি কোথা থেকে

“জুমল্যান্ড” শব্দের প্রথম অংশ “জুম”, অর্থাৎ পাহাড়ের ঢালে বন কেটে পুড়িয়ে করা চাষ। রূপায়ন দেওয়ানের একটি প্রবন্ধ অনুযায়ী, পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি জনগোষ্ঠীকে একসঙ্গে বোঝাতে আশির দশকের শুরুতে “জুম্ম” শব্দটি রাজনৈতিক পরিচয় হিসেবে দাঁড়ায়; জনসংহতি সমিতির দাবিনামায় সেই শব্দ থেকেই “জুম্ম ল্যান্ড” নামের প্রস্তাব আসে।

রূপায়ন দেওয়ানের ইংরেজি প্রবন্ধ, যা আমাদের আর্কাইভে “CHT indigenous people: Identity and Confusion” শিরোনামে আছে, লেখে যে আশির দশকের শুরুতে দশটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠী মিলে “জুম্ম” ও “জুম্ম জাতি” নামে একটি রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে ওঠে। একই লেখায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের বাঙালিরা চাকমাদের বোঝাতে “জুম্মা” শব্দটি ব্যবহার করতেন এবং শব্দটি অবমাননাকর হিসেবে গণ্য হতো; আবার পাহাড়ে যাওয়া বোঝাতে তাঁরা বলতেন “Jumat geye”। রূপায়ন দেওয়ানের ভাষায়, জনসংহতি সমিতির প্রচারে “জুম্ম” পরিচয় আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত হলেও সরকার “Jummaland” নামে রাজি হয়নি, “a demand put forward in 1988”।

বাংলা উইকিপিডিয়ার “জুম্ম জনগোষ্ঠী” নিবন্ধ জুম্ম বলতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, চাক, পাংখোয়া, ম্রো, বম, লুসাই, খিয়াং, রাখাইন ও খুমিদের সমষ্টিকে বোঝায়। জুম চাষ নিজে কীভাবে চলে, সে বিষয়ে আমাদের আলাদা লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম চাষ দেখতে পারেন।

শব্দটির বানান নিয়েও একটি কথা। জনসংহতি সমিতির 1987 সালের দাবিনামা লেখে “জুম্ম ল্যান্ড” (দুই শব্দে), 1992 সালেরটি নামের দফায় লেখে “জুমল্যান্ড” আর পরিষদের নামে “জুম্মল্যান্ড”। সংবাদমাধ্যমে “জুমল্যান্ড” ও “জুম্মল্যান্ড” দুটিই চলে; 2024 সালে সময়ের আলো-র একটি কলামে “জুম্মুল্যান্ড” বানানও আছে। ইংরেজিতে সাধারণত “Jummaland”।

1987 সালের পাঁচ দফায় “জুম্ম ল্যান্ড” নামে কী চাওয়া হয়েছিল

জনসংহতি সমিতির পাঁচ দফা দাবিনামা 17 ডিসেম্বর 1987 সরকার ও সমিতির দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠকে পেশ করা হয়। তার প্রথম দফায় পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য নিজস্ব আইন পরিষদসহ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন চাওয়া হয়, আর একটি উপদফায় লেখা: পার্বত্য চট্টগ্রামের নাম বদলে “জুম্ম ল্যান্ড” রাখা হোক।

দাবিনামার পূর্ণ পাঠ আমাদের আর্কাইভের লেখা “ঐতিহাসিক তিনটি দলিল এবং জুম্ম জনগণের লড়াই সংগ্রাম”-এ ছাপা আছে (লেখক কজমিলিক্ক্য চাঙমা, প্রকাশ 19 মার্চ 2020)। সেখানে দাবিনামার শেষে বন্ধনীতে লেখা: “১৭ ডিসেম্বর, ১৯৮৭, বৃহস্পতিবার গণ-প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার ও পার্ব্বত্য চট্টগ্রাম জন সংহতি সমিতির মধ্যে দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে এই ৫ (পাঁচ) দফা সম্বলিত দাবীনামা … আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হয়।”

প্রথম দফার উপদফাগুলো এরকম:

  • ক) “পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রাদেশিক মর্যাদা প্রদান করা।”
  • খ) “নিজস্ব আইন পরিষদ সম্বলিত প্রাদেশিক স্বায়ত্ব শাসন পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রদান করা।”
  • গ) প্রাদেশিক আইন পরিষদ নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হবে।
  • ঘ) “দেশ রক্ষা, বৈদেশিক, মুদ্রা ও ভারী শিল্প ব্যতীত” সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ, শিক্ষা, বন, ভূমি বন্দোবস্তসহ বাকি সব বিষয়ের দায়িত্ব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।
  • ঙ) কেন্দ্র ও প্রদেশের ক্ষমতা আলাদা তালিকায়।
  • চ) “পার্ব্বত্য চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তন করিয়া পার্ব্বত্য চট্টগ্রামকে ‘‘জুম্ম ল্যান্ড’’ নামে পরিচিত করা।”
  • ছ) “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিবর্তন করা।”

অর্থাৎ এই দলিলে “জুম্ম ল্যান্ড” একটি প্রদেশের নাম, যে প্রদেশ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন করে গড়ার কথা, এবং প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র, মুদ্রা ও ভারী শিল্প কেন্দ্রের হাতে থাকার কথা। দাবিনামার ভূমিকায় সমিতি লেখে, জুম্ম জনগণ “বাংলাদেশের উপযুক্ত নাগরিক হইয়া বাঁচিয়া থাকিতে চাহিয়াছিলাম”।

একই দাবিনামার দ্বিতীয় দফায় আরও কয়েকটি শর্ত আছে, যা পরবর্তী বিতর্কে বারবার উঠে এসেছে: গণভোট ছাড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে সংবিধান সংশোধন না করা, বাইরে থেকে এসে বসতি স্থাপন ও জমি কেনা বন্ধ করা, এবং স্থায়ী অধিবাসী নন এমন কারও অনুমতি ছাড়া প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ। তৃতীয় দফায় 17 আগস্ট 1947 থেকে যাঁরা “বেআইনীভাবে” এসে জমি নিয়েছেন তাঁদের সরিয়ে নেওয়ার দাবি আছে।

জনসংহতি সমিতির পাঁচ দফার প্রেক্ষিতে এরশাদ সরকার 1989 সালে তিনটি পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন করে — এটি আর্কাইভ লেখার লেখকের বিবরণ। সেই আইনে “জুম্ম ল্যান্ড” নাম গৃহীত হয়নি; পরিষদের নাম ছিল জেলাভিত্তিক “স্থানীয় সরকার পরিষদ”।

একই দাবিনামা, দুই রকম বিবরণ: আর্কাইভের পাঠ ও এক সেনা কর্মকর্তার স্মৃতিকথা

1987 সালের দাবিনামার প্রথম দফা নিয়ে দুটি লিখিত বিবরণ পাওয়া যায়, আর দুটি হুবহু মেলে না। আর্কাইভে ছাপা পাঠে “জুম্ম ল্যান্ড” একটি প্রদেশের নাম; সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের 2016 সালের কলামে প্রথম দফার যে উদ্ধৃতি আছে, তাতে বাংলাদেশকে দুই প্রদেশের একটি ফেডারেশনে ভাগ করার কথা।

পার্বত্যনিউজে 10 আগস্ট 2016 প্রকাশিত “জুম্মল্যান্ডের অজানা গল্প এবং সামারি” কলামে ইবরাহিম (বীর প্রতীক) লেখেন, 20 ডিসেম্বর 1987 থেকে তিনি খাগড়াছড়ি ব্রিগেড কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন এবং সরকারের হয়ে শান্তি আলোচনার দায়িত্ব তাঁর ওপর পড়ে। তিনি লেখেন, “দাবিনামাটি ছিল পাঁচ দফা। পাঁচ দফার পুরোটাই এখানে লিখব না, স্থানাভাবে। শুধু প্রথম দফা লিখলাম।” তারপর তাঁর উদ্ধৃতি:

“বর্তমান বাংলাদেশকে দু’টি প্রদেশে ভাগ করা হবে। একটি প্রদেশের নাম হবে বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। আরেকটি প্রদেশের নাম হবে জুম্মল্যান্ড; রাজধানী রাঙ্গামাটি। দু’টি প্রদেশ মিলে একটি ফেডারেশন হবে; ফেডারেশনের নাম হবে ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ; রাজধানী ঢাকা। সাংবিধানিকভাবে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে বিষয় বণ্টন হবে; শুধু চারটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রের হাতে, বাকি সব প্রাদেশিক সরকারের হাতে।”

দুটি বিবরণের মিল ও অমিল এই ছকে:

বিষয় আর্কাইভে ছাপা দাবিনামার পাঠ (জনসংহতি সমিতির প্রচারপত্র সূত্রে) ইবরাহিমের কলামে উদ্ধৃত প্রথম দফা
জুম্ম ল্যান্ড / জুম্মল্যান্ড কী পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রস্তাবিত নতুন নাম ফেডারেশনের দুই প্রদেশের একটির নাম
রাজধানী উল্লেখ নেই রাঙ্গামাটি
রাষ্ট্রের নাম “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের প্রয়োজনীয় সংশোধন”; রাষ্ট্রের নাম বদলের কথা নেই “ফেডারেল রিপাবলিক অব বাংলাদেশ”
কেন্দ্রের হাতে কোন বিষয় দেশ রক্ষা, বৈদেশিক, মুদ্রা ও ভারী শিল্প (চারটি) “শুধু চারটি বিষয়” (নাম উল্লেখ নেই)
পেশের তারিখ 17 ডিসেম্বর 1987 “১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে এসে তারা লিখিতভাবে তাদের দাবি উপস্থাপন করেছিল”

কোন পাঠটি মূল কাগজের সঙ্গে হুবহু মেলে, তা যাচাই করার মতো মূল দাবিনামার ছবি বা সরকারি নথি প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। আর্কাইভের লেখাটি সূত্র হিসেবে জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার বিভাগের প্রচারপত্রের নাম দেয়; ইবরাহিম তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা ও “পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রক্রিয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতির মূল্যায়ন” বইয়ের কথা বলেন। সালেও ভিন্নতা আছে: আর্কাইভের দলিল ও ইবরাহিম দুজনেই 1987 বলেন, রূপায়ন দেওয়ানের ইংরেজি প্রবন্ধ “Jummaland” দাবির সাল লেখে 1988।

ইবরাহিম একই কলামে পাঁচ দফাকে 1966 সালের ছয় দফার “অতি-কিঞ্চিৎ সংশোধিত রূপ” বলেন এবং লেখেন, দাবিগুলো মেনে নেওয়া মানে “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মানচিত্র আবারো অঙ্কন করা”। এটি তাঁর মূল্যায়ন। দাবিনামার নিজের পাঠে স্বাধীনতা বা আলাদা রাষ্ট্রের কথা নেই; আছে সংবিধান সংশোধন করে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের কথা।

1992 সালের সংশোধিত দাবিনামা ও “জুম্মল্যান্ড আঞ্চলিক পরিষদ”

1992 সালের সংশোধিত পাঁচ দফায় জনসংহতি সমিতি প্রদেশের দাবি ছেড়ে “আঞ্চলিক পরিষদ সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্ব শাসন” চায়। নামের দাবি থাকে: তিন জেলা মিলিয়ে একটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইউনিট, যার নাম “জুমল্যান্ড”; আর প্রস্তাবিত পরিষদের নাম “জুম্মল্যান্ড আঞ্চলিক পরিষদ”। দলিলটি 4 ডিসেম্বর 1992 সরকারের কাছে পেশ করা হয়।

আর্কাইভের একই লেখায় দলিলের শেষে “দ্রষ্টব্য” অংশে লেখা: “৪ঠা ডিসেম্বর, রোজ শুক্রবার, ১৯৯২ সন পার্বত্য চট্টগ্রাম যোগাযোগ কমিটির মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিকট … সংশোধিত পাঁচদফা দাবীনামাসহ আঞ্চলিক পরিষদ সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা পেশ করা হয়।” সূত্র হিসেবে দেওয়া আছে সমিতির তথ্য ও প্রচার বিভাগের প্রচারপত্র।

দলিলের মূল দফাগুলো:

  1. প্রথম দফা, সংবিধান সংশোধন করে: “পার্ব্বত্য চট্টগ্রামকে একটি পৃথক শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা প্রদান করা” এবং “আঞ্চলিক পরিষদ সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্ব শাসন” দেওয়া। পরিষদের হাতে যাবে এমন বিষয়ের একটি তালিকা আছে, যার ক্রমিক 36 পর্যন্ত যায় (আর্কাইভের পাঠে 12–14 নম্বর বিষয় নেই) — সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ, ভূমি, শিক্ষা, বন, জুম চাষ ও জুমিয়াদের পুনর্বাসন, কারাগার ইত্যাদি। পাঠে যে বিষয়গুলো আছে, তার মধ্যে প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র নেই।
  2. দ্বিতীয় দফা: চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরুং, বোম, লুসাই, পাংখো, খুমী, খিয়াং ও চাক — “এই ভিন্ন ভাষাভাষি দশটি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি”; পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি “বিশেষ শাসন বিধি” অনুযায়ী চলবে; বাইরে থেকে বসতি ও জমি কেনা বন্ধ; গণভোট ছাড়া সংবিধান সংশোধন নয়।
  3. নামের দাবি (আর্কাইভের পাঠে “২। ১) ক–খ” হিসেবে চিহ্নিত অংশ): “রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এই তিনটি জেলা বলবৎ রাখিয়া একত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামকে একটি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ইউনিটে পরিণত করা।” তারপর: “পার্বত্য চট্টগ্রামের নাম পরিবর্তন করিয়া পার্বত্য চট্টগ্রামকে ‘‘ জুমল্যান্ড’’ নামে পরিচিত করা।” এর পরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক একটি পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি।
  4. তৃতীয় দফা: 17 আগস্ট 1947 থেকে আসা “বহিরাগতদেরকে” সরিয়ে নেওয়া, ভারতে চলে যাওয়া শরণার্থীদের ফেরত আনা, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ছাড়া অন্য সামরিক ক্যাম্প তুলে নেওয়া।
  5. চতুর্থ দফা: সমিতির সদস্যদের পুনর্বাসন ও মামলা প্রত্যাহার, চাকরি ও শিক্ষায় কোটা।

দলিলের সঙ্গে যুক্ত “আঞ্চলিক পরিষদ সম্বলিত আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসনের সংক্ষিপ্ত রূপরেখা” অংশের প্রথম ধারা: “এই আঞ্চলিক পরিষদ ‘‘জুম্মল্যান্ড আঞ্চলিক পরিষদ’’ নামে অভিহিত হইবে।” পরিষদের আসন অনধিক 48টি, যার বণ্টন রূপরেখায় এভাবে লেখা: “কেবলমাত্র জুম্ম জনগণের জন্য” 35টি সাধারণ আসন; চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা ছাড়া অন্য “সংখ্যালঘু জুম্ম জনগণের জন্য” 7টি; “বাংগালীদের জন্য” 3টি; মহিলাদের জন্য 3টি। পরিষদের প্রধান হবেন চেয়ারম্যান, মেয়াদ পাঁচ বছর, আর চেয়ারম্যান শপথ নেবেন রাষ্ট্রপতির কাছে। সদস্য হওয়ার প্রথম শর্ত: “কোন ব্যক্তি বাংলাদেশের নাগরিক হইলে”।

দলিলের ভূমিকায় সমিতি দাবিগুলো উপস্থাপন করে “পার্ব্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থে” এবং “গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নিকট”। আর্কাইভ লেখার লেখক জানান, এই সংশোধিত দাবিনামার ভিত্তিতেই আলোচনা চলে এবং শেষে 2 ডিসেম্বর 1997 চুক্তি সই হয়।

1997 সালের চুক্তিতে কি “জুমল্যান্ড” আছে?

নেই। 2 ডিসেম্বর 1997 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাংলা পাঠে “জুমল্যান্ড”, “জুম্মল্যান্ড” বা “জুম্ম” — কোনো শব্দই একবারও আসেনি। অঞ্চলের নাম চুক্তিতে “পার্বত্য চট্টগ্রাম”, পরিষদের নাম “আঞ্চলিক পরিষদ”, আর জনগোষ্ঠী বোঝাতে চুক্তি ব্যবহার করে “উপজাতি” ও “উপজাতীয়”।

বাংলাদেশের জেলাভিত্তিক মানচিত্র, দক্ষিণ-পূর্ব কোণে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা লাল রঙে চিহ্নিত
বাংলাদেশের মানচিত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা — রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। 1992 সালের দাবিনামা এই তিন জেলা “বলবৎ রাখিয়া” একটি ইউনিট চেয়েছিল; 1997 সালের চুক্তি তিন জেলা পরিষদের ওপর একটি আঞ্চলিক পরিষদ রাখে। মানচিত্র: Nafsadh · CC0 · Wikimedia Commons

চুক্তির পূর্ণ পাঠ আমাদের আর্কাইভে “পার্বত্য চুক্তি” শিরোনামে আছে। নাম ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে প্রাসঙ্গিক অংশগুলো:

  • প্রস্তাবনা: চুক্তি সম্পাদিত হয় “গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের আওতায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতার প্রতি পূর্ণ ও অবিচল আনুগত্য রাখিয়া”।
  • ক খণ্ড, ধারা 1: “উভয় পক্ষ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চল হিসাবে বিবেচনা করিয়া এই অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণ এবং এই অঞ্চলের সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করার প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করিয়াছেন”।
  • খ খণ্ড, ধারা 2: নাম বদল একটিই — “পার্বত্য জেলা স্থানীয় সরকার পরিষদ” এর নাম সংশোধন করে “পার্বত্য জেলা পরিষদ”।
  • গ খণ্ড, ধারা 1–3: তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের সমন্বয়ে “একটি আঞ্চলিক পরিষদ”; চেয়ারম্যান “অবশ্যই উপজাতীয় হইবেন”; চেয়ারম্যানসহ 22 সদস্য, যার দুই-তৃতীয়াংশ উপজাতীয়।
  • ঘ খণ্ড, ধারা 12–14: জনসংহতি সমিতি সদস্য ও অস্ত্রের তালিকা দেবে এবং নির্ধারিত দিনে অস্ত্র জমা দেবে।
  • স্বাক্ষর: সরকারের পক্ষে আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ্‌, আহ্বায়ক, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক জাতীয় কমিটি; “পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের পক্ষে” জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা, সভাপতি, পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি।

অর্থাৎ যে দলটি 1987 ও 1992 সালে “জুম্ম ল্যান্ড” / “জুমল্যান্ড” নাম চেয়েছিল, সেই দলই 1997 সালে এমন একটি দলিলে সই করে যেখানে নামের দাবি নেই এবং প্রথম বাক্যেই রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি আনুগত্যের কথা আছে। নামের দাবি কেন বাদ গেল, আলোচনার কোন পর্যায়ে বাদ গেল — সে বিষয়ে কোনো পক্ষের প্রকাশিত বিবরণ পাওয়া যায়নি। চুক্তির কোন ধারা কতটা বাস্তবায়িত হয়েছে, তার হিসাব পার্বত্য চুক্তি 1997: কী ছিল, কতটা হলো, কোথায় আটকে আছে লেখায় আছে।

দাবিনামা বনাম চুক্তি: পাশাপাশি ছক

তিনটি দলিল পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, নাম, ক্ষমতার পরিধি ও আসন-বণ্টন তিনবারে কীভাবে বদলেছে। 1987 সালে প্রদেশ ও “জুম্ম ল্যান্ড”, 1992 সালে আঞ্চলিক পরিষদ ও “জুমল্যান্ড”, 1997 সালে আঞ্চলিক পরিষদ কিন্তু নাম অপরিবর্তিত।

বিষয় পাঁচ দফা, 1987 সংশোধিত পাঁচ দফা, 1992 চুক্তি, 1997
অঞ্চলের নাম “জুম্ম ল্যান্ড” “জুমল্যান্ড” পার্বত্য চট্টগ্রাম (বদল নেই)
শাসনের ধরন প্রাদেশিক মর্যাদা, নিজস্ব আইন পরিষদ “পৃথক শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা”, আঞ্চলিক পরিষদ তিন জেলা পরিষদের সমন্বয়ে আঞ্চলিক পরিষদ
পরিষদের নাম প্রাদেশিক আইন পরিষদ “জুম্মল্যান্ড আঞ্চলিক পরিষদ” আঞ্চলিক পরিষদ
সদস্যসংখ্যা উল্লেখ নেই অনধিক 48 (35 + 7 + 3 বাঙালি + 3 মহিলা) 22, দুই-তৃতীয়াংশ উপজাতীয়
কেন্দ্রের হাতে দেশ রক্ষা, বৈদেশিক, মুদ্রা, ভারী শিল্প 36 ক্রমিক পর্যন্ত বিষয় পরিষদে; প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র তালিকায় নেই প্রস্তাবনায় রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি আনুগত্য
জনগোষ্ঠীর পরিভাষা “জুম্ম জনগণ”, দশটি “ভিন্ন ভাষাভাষি” জাতি “জুম্ম জনগণ”, দশটি জাতির সাংবিধানিক স্বীকৃতি “উপজাতি”, “উপজাতীয়”
পেশ / সই দ্বিতীয় আনুষ্ঠানিক বৈঠক, 17 ডিসেম্বর 1987 পার্বত্য চট্টগ্রাম যোগাযোগ কমিটির মাধ্যমে, 4 ডিসেম্বর 1992 সরকার ও জনসংহতি সমিতি, 2 ডিসেম্বর 1997

“উপজাতি” বনাম “আদিবাসী” পরিভাষা-বিতর্কে রাষ্ট্র কোন দলিলে কী শব্দ ব্যবহার করেছে, তার কালানুক্রম আছে রাষ্ট্র কোন শব্দ ব্যবহার করে লেখায়।

“জুমল্যান্ড ষড়যন্ত্র” শিরোনাম কবে থেকে, কোথায় ছাপা হয়েছে

“জুমল্যান্ড ষড়যন্ত্র” বা “জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র” ধরনের শিরোনাম পাওয়া যায় 2015 সাল থেকে। এর বড় অংশ পার্বত্যনিউজে প্রকাশিত, যার “জুম্মল্যান্ড” ট্যাগে 2016 থেকে 2022 পর্যন্ত আটটি আলাদা লেখা জমা আছে। জাতীয় দৈনিকের মধ্যে ইত্তেফাক 2018 সালে একটি প্রতিবেদন ছাপে; কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের 2019 সালের প্রতিবেদন পরে অন্য সাইটে পুনর্মুদ্রিত হয়েছে।

প্রকাশের তারিখ অনুযায়ী তালিকা (প্রতিটি লেখার পাতা খুলে পড়া; “পুনর্মুদ্রণ” মানে লেখাটি অন্য কাগজ থেকে নেওয়া বলে সাইট নিজেই চিহ্নিত করেছে):

তারিখ প্রকাশনা ও লেখক শিরোনাম ধরন
22 মার্চ 2015 পার্বত্যনিউজ; এবনে গোলাম সামাদ জুমল্যান্ড গঠনের স্বপ্ন প্রবন্ধ
23 ফেব্রুয়ারি 2016 পার্বত্যনিউজ রিপোর্ট পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ব্যাপকভাবে রাষ্ট্রবিরোধী ও সাম্প্রদায়িক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে সামাজিক গণমাধ্যমে বিশেষ প্রতিবেদন
10 আগস্ট 2016 পার্বত্যনিউজ; সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক জুম্মল্যান্ডের অজানা গল্প এবং সামারি কলাম
7 জানুয়ারি 2018 পার্বত্যনিউজ; তিমির মজুমদার পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক দল ও তাদের সশস্ত্র বাহিনীর কার্যক্রম এবং স্বাধীন ‘জুম্মল্যান্ড’ এর স্বপ্ন মুক্তমত
2 ফেব্রুয়ারি 2018 পার্বত্যনিউজ; তিমির মজুমদার পার্বত্য চট্টগ্রাম কি পূর্ব তিমুর কিংবা দক্ষিণ সুদান এর মত স্বাধীন জুম্মল্যান্ড হবে? মুক্তমত
8 নভেম্বর 2018 দৈনিক ইত্তেফাক; শামীম হামিদ, খাগড়াছড়ি থেকে ফিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ‘স্বাধীন জুম্মল্যান্ড’ সংগ্রাম প্রতিবেদন
10 নভেম্বর 2018 (ট্যাগ পাতার তারিখ); পাতায় প্রকাশের তারিখ 28 এপ্রিল 2019 পার্বত্যনিউজ; মেহেদী হাসান পলাশ রাজনৈতিক ডামাডোলে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভেঙে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার তৎপরতা প্রবন্ধ
29–30 এপ্রিল 2019 কালের কণ্ঠ; মেহেদী হাসান — একই দিনে পার্বত্যনিউজ (“অন্য মিডিয়া”), হিল নিউজ বিডি ও ফাতেহ২৪-এ জুমল্যান্ডের ষড়যন্ত্র, অনলাইনে স্বাধীনতার প্রচারণা! প্রতিবেদন ও পুনর্মুদ্রণ
12–14 জুন 2019 বাংলাদেশ প্রতিদিন; মানিক মুনতাসির — পার্বত্যনিউজে “অন্য মিডিয়া” আঞ্চলিক সংগঠনের আড়ালে ‘জুম্মল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র প্রতিবেদন ও পুনর্মুদ্রণ
8 আগস্ট 2019 সিএইচটি টুডে আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি জুমল্যান্ড প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্রের অংশ : ফিরোজা বেগম চিনু সমাবেশের খবর
4 ডিসেম্বর 2022 পার্বত্যনিউজ; ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. নাসিমুল গনি পার্বত্যচুক্তির ২৫ বছর পর জুম্মল্যান্ডের দাবি এবং যৌক্তিকতা প্রবন্ধ
29 সেপ্টেম্বর 2023 ঢাকা টাইমস; গোলাম যাকারিয়া পৃথক রাজ্য ‘জুমল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠার বায়না ধরেছে একদল চতুর দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারী মতামত
30 সেপ্টেম্বর 2024 সময়ের আলো; আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি বিস্মৃত জুমল্যান্ড আবার কেন অস্তিত্বশীল মতামত
7 আগস্ট 2025 এখন টিভি (ওয়েবসাইট) পার্বত্য চট্টগ্রামে আধিপত্যের রক্তখেলা, লক্ষ্য ‘জুম্মল্যান্ড’ প্রতিবেদন
16 আগস্ট 2026 ডিসমিসল্যাব জাতিসংঘে ‘জুম্মল্যান্ড’ নামে নতুন রাষ্ট্র গঠনের দাবি করেননি অগাস্টিনা চাকমা ফ্যাক্টচেক

তালিকাটি সম্পূর্ণ নয়; এখানে কেবল সেই লেখাগুলো আছে যেগুলোর পূর্ণ পাঠ পড়া গেছে। কালের কণ্ঠ ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের মূল পাতার পাঠ সরাসরি পাওয়া যায়নি; তাদের পাঠ এসেছে পুনর্মুদ্রণ থেকে, যেখানে উৎস হিসেবে পত্রিকার নাম লেখা আছে। কালের কণ্ঠের তারিখ 29 এপ্রিল 2019 ও বাংলাদেশ প্রতিদিনের তারিখ 12 জুন 2019 নেওয়া হয়েছে বাংলা উইকিপিডিয়ার উদ্ধৃতি-তালিকা থেকে।

লেখাগুলোতে ঠিক কী কী দাবি করা হয়েছে, আর সূত্র হিসেবে কী বলা আছে

লেখাগুলোর দাবি মোটামুটি পাঁচ ধরনের: সামাজিক মাধ্যমে “জুমল্যান্ড” নামে পাতা, পতাকা, মানচিত্র ও মুদ্রার ছবি; বিদেশে সভা ও দূতাবাসে বার্তা; আঞ্চলিক দলের নেতাদের উদ্দেশ্য নিয়ে অভিযোগ; চুক্তি নিজেই “জুম্মল্যান্ড”-এর পথ, এমন মূল্যায়ন; আর একজন নেতার নামে উদ্ধৃতি। প্রতিটির পাশে লেখায় দেওয়া সূত্রটিও এখানে রাখা হলো।

সামাজিক মাধ্যমের পাতা, পতাকা ও মানচিত্র

ইত্তেফাকের 8 নভেম্বর 2018 প্রতিবেদন লেখে, “তিন পার্বত্য জেলার সাধারণ মানুষ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে” যে “ইউনাইটেড জুম্মল্যান্ড, অ্যাফিলিয়েটেড বাই রিপাবলিক অফ জুম্মল্যান্ড” নামে একটি ফেসবুক পাতা আছে; সেখানে পতাকা, মানচিত্র, পরিচয়পত্র, মুদ্রা ও রেডিও চ্যানেলের ছবি প্রকাশ করা হয়েছে এবং 10 নভেম্বর “কথিত জুম্ম জাতীয় শোক দিবসে” পতাকা অর্ধনমিত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি খন্দকার গোলাম ফারুক বলেন, “রাষ্ট্র বিরোধী প্রচার প্রচারণা বরদাশত করা হবে না।”

মেহেদী হাসান পলাশের পার্বত্যনিউজ প্রবন্ধ “Ministry of National Security, Government of Jummaland” নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে 10 নভেম্বর পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি ঘোষণার কথা লেখে, এবং আরও কয়েকটি পাতার নাম দেয় (“UNIVERSITY OF JUMMALAND”, “GOVERNMENT OF JUMMALAND” ইত্যাদি)। পাতাগুলোর দাবি অনুযায়ী পতাকাটি 14 এপ্রিল 2017 “উন্মোচন” করা হয়; প্রবন্ধে পতাকার চার রং — সাদা, লাল, সবুজ, নীল — ও মাঝের তারার যে ব্যাখ্যা পাতাগুলো দিয়েছে, তা বিস্তারিত তুলে দেওয়া আছে। একই প্রবন্ধে বলা হয়, “অনুন্ধানে জানা গেছে” 2015 সালের ডিসেম্বরে আঞ্চলিক সংগঠনের পক্ষ থেকে পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতায় তা হয়নি।

পার্বত্যনিউজের 23 ফেব্রুয়ারি 2016 প্রতিবেদন লেখে, সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণায় “বাংলাদেশ ভেঙে স্বাধীন জুম্মল্যান্ড গঠনের পক্ষে জনমতও গঠন করা হয়”। একই প্রতিবেদনে “পাহাড়ের সচেতন মহলের মতে” বাক্যাংশে বলা হয়েছে, “পাহাড়ের সাধারণ ও নিরীহ পাহাড়ীরা এ সকল প্রচারণা সাথে জড়িত না থাকলেও তারাই এর প্রধান শিকার”।

বিদেশে সভা ও দূতাবাসে বার্তা

ইত্তেফাক ও পলাশের প্রবন্ধ দুটোই লেখে, এম এন লারমার মৃত্যুবার্ষিকীতে নয়াদিল্লিতে আয়োজিত একটি সভার ব্যানারে “জুম্মল্যান্ড”-এর মানচিত্র ছিল এবং সেখানে একজন বৌদ্ধ ভিক্ষু উপস্থিত ছিলেন যাঁকে প্রতিবেদনে “কথিত জুম্মল্যান্ডের স্বঘোষিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী” বলা হয়েছে। দুটি লেখাই কাঠমান্ডুর একটি সেমিনারের কথা বলে, যেখানে “বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য দেওয়া হয় বলে একটি সরকারি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে”। ঢাকা টাইমসের 2023 সালের মতামতে কলকাতায় 23 সেপ্টেম্বর 2023 অনুষ্ঠিত একটি সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় একই ব্যক্তিকে “কথিত জুম্মল্যান্ড রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রী দাবি করা” বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

কালের কণ্ঠের 2019 সালের প্রতিবেদন (পুনর্মুদ্রণ সূত্রে) শুরু হয় একটি ফেসবুক মন্তব্য দিয়ে: শ্রীলঙ্কায় হামলার পর কলম্বোর ইইউ দূতাবাসের পোস্টে একজন লেখেন, “জুমল্যান্ড থেকে গভীর শোক জানাই।” প্রতিবেদন বলে, “জানা যায়” এক বা একাধিক গোষ্ঠী “জুমল্যান্ড” প্রতিষ্ঠায় সমর্থন চেয়ে দূতাবাসে বার্তা পাঠিয়েছে, “জুমল্যান্ড টিভি” নামে টুইটার অ্যাকাউন্ট আছে, এবং জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন পার্লামেন্টের কাছে অনলাইনে আবেদন করা হয়েছে।

আঞ্চলিক দলের নেতাদের নিয়ে অভিযোগ

বাংলাদেশ প্রতিদিনের মানিক মুনতাসিরের প্রতিবেদন (পার্বত্যনিউজে পুনর্মুদ্রিত) লেখে, “জানা গেছে” জনসংহতি সমিতি, ইউপিডিএফ ও দুই দলের সংস্কারপন্থি অংশের “শীর্ষ নেতাদের অনেকেই বাংলাদেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করলেও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করেন না”। এই দাবির পক্ষে কোনো নথি বা নাম প্রতিবেদনে নেই। একই প্রতিবেদনে সেনাবাহিনীর 24 পদাতিক ডিভিশনের তৎকালীন জিওসি মেজর জেনারেল এস এম মতিউর রহমানের বক্তব্য উদ্ধৃত: “যারা পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চিন্তা করছে তাদের সে ষড়যন্ত্র কোনো দিনই বাস্তবায়ন হবে না।” প্রতিবেদনেই আছে, “পাহাড়িদের মধ্যেও অধিকাংশই এর বিরোধিতা করে আসছেন বলে জানা গেছে।”

এখন টিভির 2025 সালের প্রতিবেদন লেখে, অস্ত্রের মজুত ও চাঁদাবাজির মধ্য দিয়ে “সন্ত্রাসীদের অনেকেই স্বপ্ন দেখে তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র জুম্মল্যান্ড প্রতিষ্ঠার। সোশ্যাল মিডিয়াতেও দেখা যায় এসব প্রচারণা।” পরের বাক্যেই: “তবে সাধারণ পাহাড়িরা জানায়, এ ধরনের তৎপরতায় সমর্থন নেই তাদের।”

তিমির মজুমদারের দুটি “মুক্তমত” লেখা প্রথম পুরুষে লেখা। প্রথমটিতে লেখক নিজেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক প্রত্যন্ত পাড়ার মানুষ হিসেবে পরিচয় দেন এবং লেখেন, সেখানকার যুবকদের “স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো হয় নতুন দেশ ‘জুম্মল্যান্ড’ এর”; লেখায় আঞ্চলিক দলগুলোর সশস্ত্র সদস্যদের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ আছে। দ্বিতীয়টিতে লেখক চুক্তির 72 ধারার 48টি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়েছে বলে উল্লেখ করে লেখেন, একটি গোষ্ঠী “ভবিষ্যতে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ‘জুম্মল্যান্ড’ নামে একটি নতুন দেশ গঠন করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে”।

চুক্তিকে ঘিরে মূল্যায়ন

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. নাসিমুল গনির 2022 সালের প্রবন্ধ লেখে, “পঁচিশ বছরের অস্ত্র বিরতি ও শান্তি চুক্তির অন্তরালে ‘জুম্মল্যান্ড’ প্রতিষ্ঠা করার … দ্বিতীয় প্রয়াস (প্রথম প্রয়াস ১৯৭২ সালে শুরু হয়) প্রায় সম্পূর্ণ হয়েছে।” প্রবন্ধে আরও দাবি করা হয়েছে, কিছু “অশুভ শক্তি” 2 ডিসেম্বর 1997 চুক্তির দিন “আমেরিকাতে বসে স্বাধীন জুম্মল্যান্ডের ঘোষণা দিয়েছে”। কারা, কোন অনুষ্ঠানে বা কোন দলিলে এই ঘোষণা দিয়েছে, তার নাম বা সূত্র প্রবন্ধে নেই।

একজন নেতার নামে উদ্ধৃতি

এবনে গোলাম সামাদের 2015 সালের প্রবন্ধ লেখে, “চাকমা নেতা সন্তু লারমা (জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা) বলছেন, জুমল্যান্ড গড়ার কথা”, এবং তাঁর নামে আরও লেখে যে মঙ্গোলীয় নৃগোষ্ঠীর জুমচাষিদের “সবাইকে নিয়ে গড়তে হবে একটি দেশ, জুমল্যান্ড”। সন্তু লারমা কবে, কোথায়, কোন বক্তৃতা বা লেখায় এ কথা বলেছেন, তার উল্লেখ প্রবন্ধে নেই, এবং অন্য কোনো উৎসে এই উক্তি পাওয়া যায়নি।

সূত্রের ধরন এক নজরে

দাবি কোথায় লেখায় সূত্র হিসেবে যা বলা আছে
“জুম্মল্যান্ড” নামে ফেসবুক পাতা, পতাকা, মানচিত্র ইত্তেফাক 2018; পলাশ 2018/2019 পাতাগুলোর নাম ও তাদের প্রকাশিত বিবরণ; “সাধারণ মানুষ এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী”
কাঠমান্ডুর সেমিনারে বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য ইত্তেফাক 2018; পলাশ “একটি সরকারি গোয়েন্দা সূত্র”
দূতাবাসে বার্তা, “জুমল্যান্ড টিভি” কালের কণ্ঠ 2019; বাংলাদেশ প্রতিদিন 2019 “জানা যায়”; একটি ফেসবুক মন্তব্য
নেতারা জাতীয় পরিচয়পত্র নেন না বাংলাদেশ প্রতিদিন 2019 “জানা গেছে”; নাম বা নথি নেই
এমন গোষ্ঠীর তথ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের কাছে আছে কালের কণ্ঠ 2019 অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার বক্তব্য: “আমি আপনাদের প্রমাণ দেখাতে পারব না; কিন্তু আমাদের কাছেও এ ধরনের গোষ্ঠীর তথ্য আছে।”
চুক্তির দিন আমেরিকায় স্বাধীনতার ঘোষণা গনি 2022 উল্লেখ নেই
সন্তু লারমা “জুমল্যান্ড গড়ার কথা” বলছেন সামাদ 2015 উল্লেখ নেই
জনসংহতি সমিতি “জুম্ম ল্যান্ড” / “জুমল্যান্ড” নাম চেয়েছিল সমিতির 1987 ও 1992 দাবিনামা; ইবরাহিম 2016 দলিলের পাঠ (সমিতির প্রচারপত্র); আলোচনায় থাকা কর্মকর্তার স্মৃতিকথা

একই অনুচ্ছেদ এক কাগজ থেকে আরেক কাগজে: প্রকাশনার চক্র

প্রকাশিত লেখাগুলো পাশাপাশি পড়লে দেখা যায়, কয়েকটি অনুচ্ছেদ প্রায় হুবহু একাধিক জায়গায় ছাপা হয়েছে। ফলে আলাদা আলাদা প্রকাশনার নাম দেখা গেলেও তথ্যের উৎস প্রায়ই একটি বা দুটি প্রতিবেদন। একটি জায়গায় একই উদ্ধৃতি দুই প্রকাশনায় দুই ভিন্ন ব্যক্তির নামে ছাপা হয়েছে।

  1. ইত্তেফাক ও পার্বত্যনিউজ, নভেম্বর 2018: নয়াদিল্লির সভা, মানচিত্রসহ ব্যানার, “স্বঘোষিত পররাষ্ট্রমন্ত্রী” এবং কাঠমান্ডুর সেমিনার নিয়ে ইত্তেফাকের 8 নভেম্বর 2018 প্রতিবেদনের অনুচ্ছেদটি মেহেদী হাসান পলাশের পার্বত্যনিউজ প্রবন্ধে প্রায় হুবহু আছে, একই বাক্যে “একটি সরকারি গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে” শব্দগুচ্ছসহ।
  2. কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন, 30 এপ্রিল 2019: পূর্ণ পাঠ একই দিনে পার্বত্যনিউজের “অন্য মিডিয়া” বিভাগে, হিল নিউজ বিডিতে এবং ফাতেহ২৪-এ ছাপা হয়। হিল নিউজ বিডির সংস্করণে কালের কণ্ঠের নাম শুধু উদ্ধৃত বক্তার প্রসঙ্গে আছে; ফাতেহ২৪ শুরুতেই লেখে, “কালের কণ্ঠ লিখেছে”।
  3. বাংলাদেশ প্রতিদিন, জুন 2019: মানিক মুনতাসিরের প্রতিবেদনে কালের কণ্ঠের তিনটি বাক্য প্রায় হুবহু আছে — “জানা যায়, পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় ‘জুম্মল্যান্ড’ নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এক বা একাধিক গোষ্ঠী তৎপর রয়েছে”, দূতাবাসে বার্তা, “জুম্মল্যান্ড টিভি” — শুধু বানান “জুমল্যান্ড” থেকে “জুম্মল্যান্ড” হয়েছে।
  4. একই উদ্ধৃতি, দুই বক্তা: “শান্তিচুক্তির আগে এ ধরনের গোষ্ঠীর বেশ তৎপরতা ছিল। এখনো এ দেশের পার্বত্য এলাকা নিয়ে দেশি-বিদেশি অনেক ষড়যন্ত্র আছে। অনেক দেশ ও তাদের বেসরকারি সংস্থাগুলোর (এনজিও) তৎপরতাও বেশ সন্দেহজনক। সরকারকে এ বিষয়ে তৎপর হওয়া প্রয়োজন।” কালের কণ্ঠের প্রতিবেদন (পুনর্মুদ্রণ সূত্রে) এই কথাগুলো মেজর জেনারেল (অব.) এ কে মোহাম্মদ আলী শিকদারের বলে লেখে; বাংলাদেশ প্রতিদিনের প্রতিবেদন (পুনর্মুদ্রণ সূত্রে) একই কথা লেখে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেনের নামে।
  5. বাংলা উইকিপিডিয়া: “জুম্ম জনগোষ্ঠী” নিবন্ধে একটি বাক্য আছে — জুম্ম জনগোষ্ঠী “জুমল্যান্ড বা জুম্মল্যান্ড নামক স্বাধীন ভূখণ্ড সৃষ্টির দাবি জানিয়ে আসছে, যাকে বাংলাদেশ সরকার একটি গভীর ষড়যন্ত্র বলে দাবি করে থাকে।” বাক্যটির পেছনে উদ্ধৃতি তিনটি: বাংলাদেশ প্রতিদিন (12 জুন 2019), কালের কণ্ঠ (29 এপ্রিল 2019) ও ইত্তেফাক (8 নভেম্বর 2018) — ওপরের তিনটি প্রতিবেদনই। কোনো সরকারি বিবৃতি বা জনগোষ্ঠীর কোনো সংগঠনের দলিল সেখানে উদ্ধৃত নেই। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Jumma” নিবন্ধেও ইত্তেফাকের একই প্রতিবেদন উদ্ধৃত।

পার্বত্যনিউজের প্রতিটি “জুম্মল্যান্ড” লেখার নিচে একই ট্যাগের অন্য লেখাগুলোর তালিকা থাকে, তাই এক লেখা থেকে পাঠক সহজেই বাকিগুলোতে পৌঁছান। কোন শিরোনাম সার্চ ফলাফলে কত মানুষের কাছে পৌঁছেছে, সে হিসাব প্রকাশ্যে নেই।

“আদিবাসী” স্বীকৃতির দাবির সঙ্গে জুমল্যান্ডকে কারা জুড়েছেন

2018 থেকে কয়েকটি লেখা ও একটি সমাবেশে “আদিবাসী” স্বীকৃতির দাবিকে “জুমল্যান্ড” প্রতিষ্ঠার পথ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। যুক্তিটি এরকম: আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে আন্তর্জাতিক দলিলের সুযোগে বিচ্ছিন্নতা সহজ হবে। এর বিপরীতে 2024 সালের একটি কলাম উল্লেখ করে, পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের আট দফায় আদিবাসী স্বীকৃতির দাবি থাকলেও জুমল্যান্ডের কথা নেই।

মেহেদী হাসান পলাশের প্রবন্ধ লেখে, “জুম্মল্যান্ড বাস্তবায়নের অংশ হিসাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় জনগোষ্ঠী নিজেদের হঠাৎ করেই আদিবাসী দাবী করতে শুরু করে। কেননা, আদিবাসী স্বীকৃতি পেলে আইএলও কনভেনশন-১৬৯ এবং জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক চার্টার-২০০৭ অনুযায়ী জুম্মল্যান্ডের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সহজ হয়ে যাবে।”

সিএইচটি টুডের 8 আগস্ট 2019 খবর অনুযায়ী, রাঙামাটিতে “সচেতন পার্বত্যবাসী” ব্যানারে আদিবাসী দিবস পালনের প্রতিবাদ সমাবেশে প্রধান অতিথি, সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফিরোজা বেগম চিনু বলেন, যারা আদিবাসী হিসেবে স্বীকৃতি চায় এবং আদিবাসী দিবস পালন করে তারা “বিচ্ছিন্নতবাদী পার্বত্য এলাকায় জুমল্যান্ড প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করছে”। সমাবেশে বক্তারা আরও বলেন, পাহাড়িরা “আড়াইশ বছর ধরে” এবং বাঙালিরা “হাজার হাজার বছর ধরে” পাহাড়ে বাস করছে — এটি সমাবেশের বক্তাদের দাবি, খবরে কোনো সূত্র দেওয়া নেই।

সময়ের আলো-তে 30 সেপ্টেম্বর 2024 প্রকাশিত কলামে আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি লেখেন, “সংঘাত ও বৈষম্যবিরোধী পাহাড়ি ছাত্র আন্দোলন”-এর আট দফায় পাহাড়িদের 5 শতাংশ কোটা পুনর্বহাল, আদিবাসী হিসেবে সাংবিধানিক স্বীকৃতি, চুক্তি অনুযায়ী ভূমি সমস্যার সমাধান ও মাতৃভাষায় শিক্ষার দাবি ছিল, “কিন্তু সেখানে কোথাও জুমল্যান্ড গড়ার কথা, স্বাধীনতার কথা, বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার কথা নেই”।

আন্তর্জাতিক দলিলে “আদিবাসী” শব্দের সংজ্ঞা কী, আর জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা নিয়ে কী লেখা আছে, তা আমাদের দুটি লেখায় আলাদা করে আছে: আন্তর্জাতিক সংজ্ঞায় আদিবাসী এবং জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার ঘোষণাপত্র ও বাংলাদেশ।

যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁরা কী বলেছেন

অভিযোগের লক্ষ্য মূলত আঞ্চলিক দল ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠী। তাদের পক্ষ থেকে “জুমল্যান্ড ষড়যন্ত্র” শব্দবন্ধের সরাসরি জবাব হিসেবে প্রকাশিত কোনো দলীয় বিবৃতি পাওয়া যায়নি। যা পাওয়া যায়: দলগুলোর নিজস্ব দাবিনামা ও কর্মসূচি, সংবাদে উদ্ধৃত একজন মুখপাত্রের বক্তব্য, আর 2024 সালের আন্দোলনকারীদের উদ্ধৃতি।

ইউপিডিএফ। এখন টিভির 2025 সালের প্রতিবেদনে প্রতিবেদক ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমার কাছে “পার্বত্য অঞ্চলে একটি স্বাধীন সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের যৌক্তিকতা” জানতে চান। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত তাঁর উত্তর শুরু হয় “আপনি যেকোনো নাম দিতে পারেন” দিয়ে; তারপর তিনি মৌজার অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচালনা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কথা বলেন এবং বলেন, “আমাদের কোনো প্রতিরক্ষা নীতি থাকবে না। বাংলাদেশের আপামর জনগণের ওপর যখন কোনো কারণে হামলা হবে, বাইরের শত্রু আক্রমণ করবে তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলবে।” একই প্রতিবেদনে স্থানীয়দের উদ্ধৃতি: “তারা মূলত চায় স্বায়ত্তশাসন। এক কথায় ভারতে যেভাবে প্রদেশগুলো চলছে, এরকম আরকি!” ইউপিডিএফের নিজস্ব দলিলে “পূর্ণস্বায়ত্তশাসন” বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ লেখায় দলটির গঠনতন্ত্র ধরে আছে।

জনসংহতি সমিতি। সমিতির নিজের প্রকাশিত দলিলে “জুম্ম ল্যান্ড” / “জুমল্যান্ড” এসেছে নাম হিসেবে, সংবিধান সংশোধন করে বাংলাদেশের ভেতরে প্রাদেশিক বা আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাবের অংশ হিসেবে; 1992 সালের রূপরেখায় পরিষদের সদস্য হওয়ার প্রথম শর্ত বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। 1997 সালের চুক্তিতে সমিতির সভাপতি যে দলিলে সই করেন, তার প্রথম বাক্যে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতার প্রতি আনুগত্যের কথা আছে। চুক্তির পর সমিতির দাবি চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন — এটি সমিতি-সংক্রান্ত আমাদের আলাদা লেখায় দলটির দলিল ধরে আছে।

2024 সালের আন্দোলনকারীরা। সময়ের আলো-র কলাম আন্দোলনকারী পাহাড়িদের কথা এভাবে উদ্ধৃত করে: “আমরা জুম্মুল্যান্ড গঠনের দাবি করিনি, আমরা আমাদের অধিকার চাই।” কলামটি আরও লেখে, নিহতদের স্মরণে আন্দোলনকারীরা জাতীয় সংগীত গেয়েছিলেন। একই কলাম লেখে, “নতুন করে পাহাড়িদের পক্ষ থেকে জুমল্যান্ডের দাবি সামনে না আসেনি ঠিকই। তবে একসময় তো সেই আলাপ ছিল” — এবং সেই “আলাপ” সশস্ত্র সংগ্রামের সময়ের সঙ্গে যুক্ত করে, 1997 সালের চুক্তিতে যার “বিদ্রোহ পর্ব” শেষ হয় বলে লেখক বর্ণনা করেন।

এখন টিভি ও বাংলাদেশ প্রতিদিন — যে দুটি প্রতিবেদন “জুম্মল্যান্ড” তৎপরতার অভিযোগ ছেপেছে — দুটিতেই একটি করে বাক্য আছে যে সাধারণ পাহাড়িদের সমর্থন বা অধিকাংশের সমর্থন এতে নেই (ওপরে উদ্ধৃত)।

সামাজিক মাধ্যমে কোন দাবি যাচাই হয়েছে

“জুম্মল্যান্ড” নিয়ে অন্তত একটি ভাইরাল দাবি স্বাধীন ফ্যাক্টচেকে যাচাই হয়েছে। আগস্ট 2026-এ ডিসমিসল্যাব দেখায়, জাতিসংঘের আদিবাসী-বিষয়ক স্থায়ী ফোরামে অগাস্টিনা চাকমার দুটি বক্তব্যের ভিডিও কেটে “জুম্মল্যান্ড” রাষ্ট্রের দাবির ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া হয়েছিল; পূর্ণ বক্তব্যে এমন কোনো দাবি নেই।

ডিসমিসল্যাবের 16 আগস্ট 2026 প্রতিবেদন অনুযায়ী, “দেশবিদেশ” নামের একটি ফেসবুক পাতা 12 আগস্ট দুটি ভিডিও পোস্ট করে; একটির ভেতরের লেখা: “পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভেঙ্গে চাকমা উপজাতিদের জন্য জুম্মল্যান্ড নামক নতুন রাষ্ট্র গঠনের জাতিসংঘে দাবি অগস্টিনা চাকমার”। প্রতিবেদন প্রকাশের আগ পর্যন্ত ভিডিও দুটি যথাক্রমে প্রায় 68 হাজার ও 70 হাজার বার দেখা হয়েছিল। ডিসমিসল্যাব ভিডিওর দৃশ্য মিলিয়ে দেখায়, একটি 22 এপ্রিল 2026 (ফোরামের 25তম অধিবেশন) এবং অন্যটি 25 এপ্রিল 2023 (22তম অধিবেশন) এর বক্তব্য থেকে কাটা। প্রথম বক্তব্যে জুম্ম নারী ও শিশুদের ওপর সহিংসতা ও চুক্তি বাস্তবায়নের অপেক্ষার কথা, দ্বিতীয়টিতে ভূমি অধিকারের কথা; ডিসমিসল্যাবের ভাষায়, “‘জুম্মল্যান্ড’ নামে নতুন কোনো রাষ্ট্র গঠনের দাবি করা হয়নি।”

সময়ের আলো-র 2024 সালের কলামও লেখে, সেপ্টেম্বর 2024-এর সংঘাতের সময় “জুম্মুল্যান্ডের মানচিত্র, লোগো, মুদ্রা ইত্যাদি নেট দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হলো” এবং “আসাম, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন বাহিনীর ট্রেনিং ও অস্ত্র মহড়ার ভিডিও, টিকটকারদের অস্ত্রসহ ফানি ভিডিওকে জুমল্যান্ড তৈরির সংগ্রাম বলে প্রচার চালানো হলো”। কলামে এই ভিডিওগুলোর নির্দিষ্ট লিংক বা যাচাইয়ের বিবরণ নেই। একই সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে ছড়ানো এগারোটি ভুয়া দাবির যে তালিকা রিউমর স্ক্যানার করেছিল (প্রথম আলো, 21 সেপ্টেম্বর 2024), তাতে “জুম্মল্যান্ড” শব্দটি নেই।

পলাশ ও ইত্তেফাক যে ফেসবুক পাতাগুলোর নাম দিয়েছে, সেগুলো কারা চালাত, এখনো চালু আছে কি না, বা কোনো স্বাধীন যাচাই সংস্থা সেগুলো পরীক্ষা করেছে কি না — তা জানা যায়নি।

“Jummaland” নামটি কারা নিজেরা ব্যবহার করেছেন

অভিযোগের বাইরেও “Jummaland” নামটি অনলাইনে ব্যবহৃত হয়েছে, কখনো পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিশব্দ হিসেবে, কখনো স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের নাম হিসেবে। এই ব্যবহারগুলোতে নামের পাশে প্রায়ই “Bangladesh” লেখা থাকে।

  • “Voice of Jummaland” ব্লগ (blogspot): 2009 সালের খবরগুলোর ডেটলাইনে লেখা “Jummaland, November 2009 (UJI)”; চাকমা রাজা দেবাশীষ রায়ের পরিচয়ে লেখা “Jummaland, Bangladesh”; আরেকটি পোস্টে পার্বত্য চট্টগ্রামকে লেখা হয়েছে “Chittagong Hill Tracts (Jummaland) in Bangladesh”। ব্লগটি কারা চালান, তা পাতায় স্পষ্ট নয়।
  • ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্রাই ম্যাগাজিন (icmagazine.org), চাকমাদের নিয়ে একটি লেখা: “The Shanti Bahini fought for a self-governing state within Bangladesh known as ‘Jummaland’.” অর্থাৎ এখানে নামটি বাংলাদেশের ভেতরে একটি স্বশাসিত অঞ্চলের নাম হিসেবে বর্ণিত।
  • রূপায়ন দেওয়ানের প্রবন্ধ (আমাদের ইংরেজি আর্কাইভ): “Jummaland” নামের দাবিকে মিজোরামের সঙ্গে তুলনা করে — লুসাই হিলস জেলা 1954 সালে মিজো হিল জেলা, 1972 সালে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল মিজোরাম এবং 1987 সালে রাজ্য হয়। লেখকের যুক্তি, দাবির পরে নাম বদলানো সেখানে সম্ভব হয়েছিল।
  • পলাশ ও ইত্তেফাক উদ্ধৃত ফেসবুক পাতাগুলো (“Republic of Jummaland”, “Government of Jummaland” ইত্যাদি): এগুলো, প্রতিবেদন দুটির বিবরণ অনুযায়ী, নামটি একটি আলাদা রাষ্ট্রের অর্থে ব্যবহার করেছে।

একই নাম তাই অন্তত তিন অর্থে লেখা হয়েছে: বাংলাদেশের ভেতরে একটি প্রদেশ বা অঞ্চলের প্রস্তাবিত নাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের একটি বিকল্প নাম, এবং একটি আলাদা রাষ্ট্রের নাম। কোন লেখায় কোন অর্থ, তা লেখাটি নিজে পড়ে দেখা ছাড়া বোঝার উপায় নেই।

প্রসঙ্গ:জুমল্যান্ড, পার্বত্য চট্টগ্রাম

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা