Last updated Oct 19th, 2026
3

খাগড়াছড়ির কোনো খবরে “গুচ্ছগ্রাম” শব্দটি পড়লে আর ভোলা বা কুড়িগ্রামের কোনো খবরে একই শব্দ পড়লে দুটো আলাদা জিনিস বোঝায়। গুচ্ছগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গে মানে 1980-এর দশকে সেনাক্যাম্পের কাছে গড়া নিরাপত্তা-বসতি, যার রেশন আজও দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের “গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প” হলো ভূমিহীন ও দুর্যোগে ঘর হারানো পরিবারকে খাসজমিতে ঘর দেওয়ার জাতীয় কর্মসূচি, যার সাম্প্রতিক পর্যায়ের নথিতে তিন পার্বত্য জেলা সরাসরি বাদ।
দুটোর মন্ত্রণালয় আলাদা, বাজেট-খাত আলাদা, বাসিন্দা আলাদা, জন্মের কারণও আলাদা। তবু নাম এক হওয়ায় একই সার্চ-ফলাফলের পাতায় পাশাপাশি তিন রকম সংখ্যা চোখে পড়ে: প্রায় 26,000 পরিবার, 1,28,000-এর বেশি পরিবার, আর এক লাখের বেশি পরিবারের একটি জাতীয় হিসাব। এই লেখায় প্রতিটি সংখ্যা কোন কর্মসূচির, কোন নথির, তা আলাদা করে দেখানো হয়েছে। যেখানে সরকারি বয়ান আর সমালোচকদের বয়ান আলাদা, সেখানে দুটোই উৎসসহ পাশাপাশি রাখা হয়েছে।
সূচিপত্র
পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রাম পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রেশন-তালিকায় থাকা নিরাপত্তা-বসতি, যার শুরু সশস্ত্র সংঘাতের বছরগুলোতে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প একটি উন্নয়ন প্রকল্প, যেখানে ভূমিহীন পরিবার খাসজমির মালিকানা ও ঘর পায়। নিচের ছকে দুটোর প্রতিটি বৈশিষ্ট্য নথি ধরে পাশাপাশি রাখা হলো।
| বিষয় | পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রাম | ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প |
|---|---|---|
| দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয় | পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় (রেশন ছাড় করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে) | ভূমি মন্ত্রণালয় |
| সরকারি নথিতে নাম | “অ-উপজাতীয় পরিবারের গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচী” | “গুচ্ছগ্রাম (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন)”, “গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (সিভিআরপি)” |
| শুরু | বসতি নির্মাণ 1986, রেশন অক্টোবর 1988 থেকে (The Daily Star, 2010) | প্রথম গুচ্ছগ্রাম 1972 (পোড়াগাছা, নোয়াখালী); “গুচ্ছগ্রাম” নামে প্রকল্প জানুয়ারি 2009 থেকে (ভূমি মন্ত্রণালয়) |
| কারা থাকেন | মূলত সরকারি কর্মসূচিতে সমতল থেকে আনা বাঙালি পরিবার; সংঘাতের সময় পাহাড়িদের জন্যও আলাদা গুচ্ছগ্রাম ছিল (Amnesty International, 1991) | ভূমিহীন, গৃহহীন, নদীভাঙন ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার |
| সরকারি ঘোষিত উদ্দেশ্য | বসতি স্থাপনকারীদের “নিরাপত্তা” (The Daily Star, 2010 ও 2018) | দারিদ্র্য বিমোচন, খাসজমিতে মালিকানা, ঘর, পানি, স্যানিটেশন |
| সমালোচকদের পাঠ | বিদ্রোহ-দমন কৌশলের অংশ; পাহাড়িদের জমিতে বসতি (Amnesty, IDMC, পাহাড়ি লেখক ও সংগঠন) | নিম্নমানের নির্মাণ, অনিয়ম, দূরবর্তী অবস্থান (সংবাদপত্র, পরিকল্পনা কমিশন, একাডেমিক গবেষণা) |
| জমির মালিকানা | গুচ্ছগ্রামের ঘর অস্থায়ী; বরাদ্দের জমি অন্যত্র, যা নিয়ে পাহাড়িদের সঙ্গে বিরোধ | পরিবারপ্রতি গড়ে 5 শতক বসতভিটার কবুলিয়ত |
| সর্বশেষ সরকারি সংখ্যা | 25,997টি রেশনভোগী পরিবার (মন্ত্রণালয়ের চিঠি, এপ্রিল 2025) | দুই পর্যায়ে 42,053টি পরিবার (নভেম্বর 2018 পর্যন্ত, মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনা) |
| ভৌগোলিক এলাকা | খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা | “All over Bangladesh (Except 3 hill districts)” (দ্বিতীয় পর্যায়) |
ছকের শেষ সারিটিই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। একটি কর্মসূচি কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামে, অন্যটির সাম্প্রতিক পর্যায় ঠিক ওই তিন জেলা বাদ দিয়ে বাকি দেশে। তাই খাগড়াছড়ির কোনো গুচ্ছগ্রামের খবরে ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পের সংখ্যা জুড়ে দিলে, বা উল্টোটা করলে, হিসাবটি ভুল দাঁড়ায়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে জুমজার্নালের অন্য লেখাগুলো এক জায়গায় পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক পাতায়।
“গুচ্ছগ্রাম” মানে কয়েকটি পরিবারকে এক জায়গায় জড়ো করে বসানো গ্রাম, তাই শব্দটি দুই সরকারি কাজেই খাটে। জট আরও পাকিয়েছে আরেকটি নাম: পাহাড়ে সংঘাতের সময় যে বসতিগুলোকে “আদর্শগ্রাম” বলা হতো, প্রায় একই সময়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ও তার জাতীয় প্রকল্পের নাম দেয় “আদর্শ গ্রাম”।
Amnesty International তাদের আগস্ট 1991 সালের প্রতিবেদনে লিখেছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে এ ধরনের বসতির নাম সময়ের সঙ্গে বদলেছে: প্রথমে “protected villages”, তারপর “collective farms”, পরে “cluster villages”। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি 4 ডিসেম্বর 1992 তারিখে সরকারের কাছে যে সংশোধিত পাঁচ দফা দাবিনামা পেশ করে, তাতে পাঁচটি নাম একসঙ্গে আছে। দাবিনামার ভাষায়: “জুম্ম জনগণকে গুচ্ছগ্রাম, বড়গ্রাম, শান্তিগ্রাম, যুক্তগ্রাম ও আদর্শগ্রামের নামে গ্রুপিং করিবার কার্যক্রম বন্ধ করা এবং এই গ্রামসমূহ অনতিবিলম্বে ভাঙ্গিয়া দেওয়া।” দাবিনামার পূর্ণ পাঠ আমাদের আর্কাইভের জনসংহতি সমিতির ঐতিহাসিক দলিল নিয়ে লেখায় আছে।
অন্যদিকে ভূমি মন্ত্রণালয়ের 2018 সালের একটি উপস্থাপনা অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের “আদর্শ গ্রাম প্রকল্প-১” চলেছে জুলাই 1988 থেকে জুন 1998 পর্যন্ত। অর্থাৎ পাহাড়ের “আদর্শগ্রাম” আর সমতলের “আদর্শ গ্রাম” একই দশকের শব্দ, কিন্তু একটি বিদ্রোহ-দমনের সময়ের বসতি, অন্যটি ভূমিহীন পুনর্বাসন।
তৃতীয় একটি নামও বিভ্রান্তি বাড়ায়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে আলাদা একটি পুনর্বাসন কর্মসূচি আছে, যার পরিচিত নাম “আশ্রয়ণ”। বাসসের 29 এপ্রিল 2026 তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে জানান, 2001 সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে “আবাসন প্রকল্প” নেওয়া হয়েছিল, যা 2001 থেকে 2006 সালের মধ্যে 65 হাজার পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে বাস্তবায়িত হয়। একই বক্তব্যে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আওতায় এখন আবাসন-সংক্রান্ত প্রকল্প নেই। সারাক্ষণের অক্টোবর 2025 সালের প্রতিবেদন আশ্রয়ণকে “প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের” প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করে এবং গুচ্ছগ্রামের ঘর-নির্মাণ ব্যয়ের সঙ্গে তুলনা করে। অর্থাৎ আশ্রয়ণ বা আবাসন আর ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম আলাদা দপ্তরের আলাদা প্রকল্প।
সরকারি বয়ানে কারণ নিরাপত্তা: শান্তিবাহিনীর হামলা বাড়ায় বসতি স্থাপনকারী বাঙালি পরিবারদের সেনাক্যাম্পের কাছে সরিয়ে আনা হয়। Amnesty International, IDMC এবং পাহাড়ি লেখকেরা একে বিদ্রোহ-দমন কৌশলের অংশ বলেছেন, যার আওতায় পাহাড়িদেরও জোর করে গুচ্ছগ্রামে নেওয়া হয়েছিল। দুই বয়ান নিচে আলাদা করে রাখা হলো।
The Daily Star-এর 24 মার্চ 2010 তারিখের প্রতিবেদন লিখেছে, 1986 সালে পাহাড়ে ব্যাপক সহিংসতা শুরু হলে এইচ এম এরশাদের সরকার “to ensure their safety and security” বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য সেনাক্যাম্পের কাছে গুচ্ছগ্রাম তৈরি করে, এবং পরে প্রাথমিকভাবে তিন বছরের জন্য খাদ্য-রেশন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
একই পত্রিকার 26 অক্টোবর 2018 তারিখের প্রতিবেদন একটি নির্দিষ্ট ঘটনার “official information” উদ্ধৃত করেছে। খাগড়াছড়ির দীঘিনালার সোনামিয়া টিলায় 1983 সালে প্রাকৃতিক দুর্যোগে বাস্তুচ্যুত 812টি পরিবারকে 4,060 একর খাসজমিতে পুনর্বাসন করা হয়; পরিবারপ্রতি 23 শতক বসতভিটা ও 4.77 একর পাহাড়ি জমি। 1986 সালের মধ্যে শান্তিবাহিনীর উত্থানে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটলে পরিবারগুলোকে “for three months” বাবুছড়া গুচ্ছগ্রামে সরিয়ে আনা হয়।
এই বয়ানে গুচ্ছগ্রাম একটি সাময়িক নিরাপত্তা-ব্যবস্থা, যার রেশন প্রথমে তিন বছরের জন্য ভাবা হয়েছিল।
Amnesty International-এর আগস্ট 1991 সালের প্রতিবেদন (ASA 13/04/91) বলছে, পাহাড়িদের বিচ্ছিন্ন গ্রাম থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর ক্যাম্পের কাছের “protected villages”-এ যেতে বাধ্য করতে 1986 সালের দিকে নির্যাতনের খবর পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটির মূল্যায়ন: কর্তৃপক্ষ এই স্থানান্তরকে প্রায়ই আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বার্থে বলে উপস্থাপন করেছে, কিন্তু এটি সরকারের বিদ্রোহ-দমন নীতিরও অংশ, কারণ এসব গ্রামে পাহাড়িদের ওপর কড়া নজরদারি সম্ভব এবং শান্তিবাহিনীর রসদের পথ কেটে যায়। একই অনুচ্ছেদের শেষ বাক্য: “Bengali settlers have also been relocated into their own cluster villages.”
Internal Displacement Monitoring Centre (IDMC)-এর 28 মার্চ 2006 তারিখের প্রতিবেদন পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের 1991 সালের প্রতিবেদন “Life is not ours”-এর বরাতে লিখেছে, গুচ্ছগ্রামে জোরপূর্বক স্থানান্তর 1979 সাল থেকে সেনাবাহিনীর বিদ্রোহ-দমন কৌশলের অংশ হয়ে ওঠে।
আমাদের আর্কাইভে সিদ্ধার্থ চাকমার লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস প্রবন্ধে আছে: “যেখানে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প রয়েছে বা মিনি ক্যাম্প রয়েছে, সেই ক্যাম্পের আশে-পাশে সেটারদের গুচ্ছগ্রাম করে বসতি করানো হয়।” লেখকের দাবি, যুদ্ধাবস্থায় এদের “মানবঢাল” হিসেবে ব্যবহার করা হতো। গৌতম কুমার চাকমার জনসংহতি সমিতির গৃহযুদ্ধ ও তারপর লেখায় অন্য একটি দিক আছে: সমিতির সশস্ত্র কার্যকলাপের কারণে “অধিকাংশ সেটেলার পরিবার সেনা ক্যান্টনমেন্ট বা ক্যাম্পের গুচ্ছগ্রামে বসবাস করতে বাধ্য হয়”, ফলে সেটেলারদের জমি দিয়ে পুনর্বাসনের “দ্বিতীয় পর্যায়ের কার্যক্রম” ব্যাহত হয়।
দুই বয়ান একটি জায়গায় মেলে: গুচ্ছগ্রাম তৈরি হয়েছিল সশস্ত্র সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, সেনাক্যাম্পের কাছে। তফাত হলো উদ্দেশ্যের ব্যাখ্যায়। সমতল থেকে বাঙালি পরিবার আনার যে সরকারি কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় গুচ্ছগ্রাম এসেছে, তার সংখ্যা ও উৎসভেদে বিরোধ নিয়ে বিস্তারিত আছে পাহাড়ি ও বাঙালি জনসংখ্যার অনুপাত নিয়ে লেখায়, আর 1979 সালের পরের ভূমি-বন্দোবস্তের আইনি দিক আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি আইন নিয়ে লেখায়। এখানে তা আবার বলা হলো না।
আজ “গুচ্ছগ্রাম” বললে পাহাড়ে সাধারণত বাঙালি বসতি বোঝায়। কিন্তু সংঘাতের বছরগুলোতে চাকমা, মারমা ও অন্য পাহাড়িদেরও তাঁদের ছড়ানো পাড়া থেকে তুলে এনে গুচ্ছগ্রামে বসানো হয়েছিল। Amnesty International, IDMC ও জনসংহতি সমিতির দাবিনামা এই কথা আলাদাভাবে নথিভুক্ত করেছে। IDMC-র 2006 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী সেই গুচ্ছগ্রামগুলো পরে ভেঙে দেওয়া হয়।
Amnesty International-এর আগস্ট 1991 সালের প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ি অঞ্চলের এক নারীর সাক্ষ্য আছে, যার শুরু: “Ours is a cluster village.” তিনি জানান, 25 জুন 1989 তারিখের জেলা পরিষদ নির্বাচনে শান্তিবাহিনী ভোট বর্জন করতে বলেছিল, আর সেনাবাহিনী ভোট দিতে বাধ্য করেছিল। একই প্রতিবেদনে 68 বছর বয়সী এক ব্যক্তির সাক্ষ্য আছে, যাঁকে জুলাই 1989 সালে তাঁর গ্রাম থেকে “a new cluster village three miles from Pujgang”-এ নিয়ে যাওয়া হয়। তাঁর ভাষ্যে গ্রামটি পাহারা দিত সেনাবাহিনী, কিন্তু দৈনন্দিন প্রশাসন ছিল বসতি স্থাপনকারীদের হাতে।
Amnesty-র ডিসেম্বর 1991 সালের হালনাগাদ প্রতিবেদন (ASA 13/09/91) বলছে, 1991 সালেও কিছু মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটেছিল পাহাড়িদের “to move to cluster villages” বাধ্য করার উদ্দেশ্যে।
10 এপ্রিল 1992 তারিখে খাগড়াছড়ির পানছড়ির লোগাংয়ে যে হত্যাকাণ্ড ঘটে, সেই লোগাং নিজেই ছিল পাহাড়িদের একটি গুচ্ছগ্রাম। Amnesty International-এর মে 1992 সালের প্রতিবেদন (ASA 13/04/92) অনুযায়ী লোগাং একটি “so-called ‘cluster village’”, যেখানে 1989–1990 সালে কয়েকটি দূরবর্তী পাড়ার পাহাড়িদের সরকারের বিদ্রোহ-দমন নীতির অংশ হিসেবে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। গ্রামটিতে প্রায় 600টি ঘর ছিল, প্রায় 250 গজ দূরে বাংলাদেশ রাইফেলসের ক্যাম্প।
আমাদের আর্কাইভে জাতিসংঘে রামেন্দু শেখর দেওয়ানের লোগাং-বক্তৃতার অনুবাদ জায়গাটিকে “লোগাং গুচ্ছ গ্রাম” বলেই উল্লেখ করেছে। হত্যাকাণ্ড ও তার তদন্ত নিয়ে এখানে বিস্তারিত বলা হচ্ছে না; গুরুত্বপূর্ণ কেবল এটুকু যে লোগাং-প্রসঙ্গে “গুচ্ছগ্রাম” শব্দটি পাহাড়িদের বসতিকে বোঝায়, বাঙালিদের নয়।
IDMC-র 2006 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বান্দরবানে সেনাবাহিনী সংঘাতকালে বেশির ভাগ গুচ্ছগ্রাম গড়েছিল রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচি উপজেলায়। প্রতিবেদনটি লিখেছে, বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অনেক বাস্তুচ্যুত মানুষকে সংঘাতের সময় গুচ্ছগ্রামে জড়ো করা হয়েছিল, এবং মূল জমি হারানোয় তাঁরা পরে মিশ্র দলে ওই জায়গাতেই থেকে গেছেন। কোন গুচ্ছগ্রামে কোন জনগোষ্ঠীর কতজন ছিলেন, প্রতিবেদনে সে ভাগ নেই।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের 1991 সালের প্রতিবেদনের বরাতে IDMC আরও লিখেছে, এসব গ্রামের অবস্থা ত্রিপুরার শরণার্থী শিবিরের চেয়েও খারাপ ছিল বলে খবর পাওয়া যায়; জমির অভাব ও সীমিত সরকারি সহায়তায় ব্যাপক অনাহার দেখা দেয়, আর চলাফেরায় বাধা থাকায় প্রথাগত চাষ অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর পরের বাক্যটি গুরুত্বপূর্ণ: “Today, the cluster villages have been dismantled but many displaced remain in these sites with nowhere else to go.”
এখানে একটি সতর্কতা দরকার। IDMC-র বাক্যটি পাহাড়িদের গুচ্ছগ্রাম প্রসঙ্গে লেখা। বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের গুচ্ছগ্রাম ভাঙা হয়নি; 2025 সালেও সেগুলোর রেশন ছাড় হচ্ছে, যা পরের অংশে নথিসহ দেখানো হয়েছে।
বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের গুচ্ছগ্রামগুলো 1986 সালের দিকে “সাময়িক” ব্যবস্থা হিসেবে গড়া হলেও প্রায় চার দশক পরও টিকে আছে। খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইট অনুযায়ী জেলায় এখন 81টি গুচ্ছগ্রামে 53,855টি পরিবার থাকে, যাদের মধ্যে 26,220টি পরিবারের রেশন কার্ড আছে আর 27,635টির নেই।
জেলা প্রশাসনের “এক নজরে” পাতার আরেকটি সংখ্যা: গুচ্ছগ্রামে বসবাসকারী জনসংখ্যা 2,12,165 জন। পাতায় এই হিসাব কোন বছরের, তা লেখা নেই। জেলার অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে সংখ্যাগুলো আছে আমাদের “খাগড়াছড়ি জেলা পরিচিতি: অবস্থান, আয়তন, উপজেলা, জনসংখ্যা ও নামের উৎস” লেখায়।
The Daily Star-এর 26 অক্টোবর 2018 তারিখের প্রতিবেদনটি গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের নিজের ভাষায় কথা বলার বিরল নথি। প্রতিবেদনের শিরোনামই বাসিন্দাদের কথার সারাংশ: তিন মাসের জন্য আসা পরিবারগুলোর অপেক্ষা তিন দশকেও শেষ হয়নি। সোনামিয়া টিলা থেকে আসা এক নারী বাসিন্দা জানিয়েছেন, সেখানে তাঁদের ভিটা, চাষের জমি, ফলের বাগান, স্কুল, মাদ্রাসা ও কবরস্থান ছিল, যা এখন পাহাড়িদের দখলে। তাঁর বর্ণনায় গুচ্ছগ্রামে ঘুমানোর জায়গা, শৌচাগার আর গবাদিপশু রাখতে হয় আশি বর্গফুটের একটি অস্থায়ী জায়গায়। আরেক নারী বাসিন্দা জানিয়েছেন, দুই-তিনটি পরিবারকে পালা করে একটি শৌচাগার ব্যবহার করতে হয়।
একই প্রতিবেদনে দীঘিনালার তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেছেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও নাগরিক সুবিধার অভাবে গুচ্ছগ্রাম বাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে, কিন্তু পরিবারগুলোকে সোনামিয়া টিলায় ফেরানো হলে এমন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা শান্তিপূর্ণভাবে সামলানো যাবে না; তাই প্রশাসন কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায়। প্রতিবেদক সোনামিয়া টিলায় পাহাড়িদের কয়েকটি ঘর ও একটি বৌদ্ধ বিহার দেখেছেন। উল্টো দিকে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) মুখপাত্র বলেছেন, হেডম্যান ও রাজার সম্মতি ছাড়া অ-পাহাড়িদের নামে জমির বন্দোবস্তই ছিল “illegal”। খাগড়াছড়ি হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক একই কথা বলেছেন: পাহাড়ে জমির মালিকানা ঠিক হতে হবে হেডম্যানের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে।
সিএইচটিনিউজ ডটকমে 27 জানুয়ারি 2023 তারিখে প্রকাশিত একটি মতামত-লেখা খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলার মাইসছড়ি ইউনিয়নের ঘটনাক্রম দিয়েছে। লেখাটির দাবি, 1982 থেকে 1984 সালের মধ্যে মহালছড়ি উপজেলায় শত শত বাঙালি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়; 1986 সালে শান্তিবাহিনীর প্রতিরোধের মুখে সেনাবাহিনী জয়সেন পাড়াসহ কয়েকটি এলাকা থেকে তাঁদের সরিয়ে “পাকুজ্যাছড়ি গুচ্ছগ্রামে” জড়ো করে; আর পার্বত্য চুক্তির পর 2000 সাল থেকে আবার জয়সেন পাড়ায় ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা পাহাড়িদের বন্দোবস্তকৃত জমিতে হয়েছে বলে লেখকের অভিযোগ।
লেখাটি একটি নির্দিষ্ট জমি-বিরোধের উদাহরণ দেয়: 1965–66 সালে নিবন্ধিত এক কার্বারির 5 একর জমি পাকুজ্যাছড়ি গুচ্ছগ্রামের এক বাসিন্দা 1982 সালের একটি কবুলিয়ত দেখিয়ে দখলের চেষ্টা করেন। একই ঘটনার বিষয়ে প্রশাসন বা অভিযুক্ত পক্ষের বক্তব্য লেখাটিতে নেই, অন্য কোনো উৎসেও পাওয়া যায়নি।
গুচ্ছগ্রাম থেকে মূল বরাদ্দের জমিতে ফেরা, অর্থাৎ বাবুছড়া থেকে সোনামিয়া টিলায় বা পাকুজ্যাছড়ি থেকে জয়সেন পাড়ায়, দুই পক্ষের কাছে দুই রকম অর্থ বহন করে। বাসিন্দাদের কাছে এটি নিজের বৈধ জমিতে ফেরা; পাহাড়ি সংগঠনগুলোর কাছে এটি পাহাড়িদের জমিতে নতুন দখল। দুই পক্ষের সম্পর্কের বৃহত্তর চিত্র, সংঘাতের নথিভুক্ত ঘটনা ও শুমারির হিসাব আছে পাহাড়ি ও বাঙালি সহাবস্থান নিয়ে লেখায়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের 22 এপ্রিল 2025 তারিখের চিঠি অনুযায়ী খাগড়াছড়ির 24,511টি ও রাঙামাটির 1,486টি, মোট 25,997টি “অ-উপজাতীয়” পরিবার গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচীতে রেশন পায়। এপ্রিল–জুন 2025 এক কিস্তিতেই ছাড় হয়েছে 3,000.181 মেট্রিক টন চাল ও 4,097 মেট্রিক টন গম।
চিঠিটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের “সম্প্রীতি ও উন্নয়ন এবং গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচী (টি.আর)” পাতায় রাখা। এর কয়েকটি বিবরণ এই কর্মসূচির প্রশাসনিক চরিত্র স্পষ্ট করে:
চিঠির সংখ্যা থেকে হিসাব করলে এক কিস্তিতে (তিন মাস) পরিবারপ্রতি বরাদ্দ দাঁড়ায় প্রায় 273 কেজি খাদ্যশস্য, অর্থাৎ মাসে প্রায় 91 কেজি: প্রায় 38.5 কেজি চাল ও 52.5 কেজি গম। এটি গড় হিসাব, পরিবার-আকার অনুযায়ী বণ্টনের নিয়ম চিঠিতে নেই। The Daily Star-এর 2010 সালের প্রতিবেদন পরিবারপ্রতি মাসে 85 কেজি চালের কথা লিখেছিল।
| উৎস ও তারিখ | পরিবার | গুচ্ছগ্রাম | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| The Daily Star, 2 সেপ্টেম্বর 2003 | 26,000 | উল্লেখ নেই | প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় শরণার্থীদের রেশন বন্ধ করে বাঙালিদের রেশন চালু রাখতে বলে |
| The Daily Star, 4 জুন 2005 | 27,000 | উল্লেখ নেই | আরও 28,000 পরিবারকে রেশন দেওয়ার প্রস্তাব বিবেচনাধীন |
| The Daily Star, 24 মার্চ 2010 | 26,220 | 81 (খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি মিলিয়ে) | অক্টোবর 1988 থেকে রেশন |
| খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন, “এক নজরে” (তারিখহীন হিসাব) | 26,220 (কার্ডধারী), মোট 53,855 | 81 (শুধু খাগড়াছড়ি) | 27,635 পরিবারের রেশন কার্ড নেই |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়, 22 এপ্রিল 2025 | 25,997 (24,511 + 1,486) | উল্লেখ নেই | চাল ও গম, ত্রৈমাসিক কিস্তি |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি), বিবৃতি, 18 অক্টোবর 2025 (pahar24) | 26,000 | 68 (130টি গ্রাম থেকে সরিয়ে) | গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের “অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু” বলে দাবি |
গুচ্ছগ্রামের সংখ্যা নিয়ে উৎসগুলো এক নয়: The Daily Star 2010 সালে লিখেছে 81টি গুচ্ছগ্রাম খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি মিলিয়ে, খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের পাতা বলছে 81টি শুধু খাগড়াছড়িতে, আর পিসিসিপির বিবৃতি বলছে 68টি। রেশনভোগী পরিবারের সংখ্যা অবশ্য প্রায় দুই দশক ধরে 26,000-এর আশপাশে স্থির।
রেশন নিয়ে বিতর্কও পুরোনো। The Daily Star-এর 2 সেপ্টেম্বর 2003 তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ভারত-প্রত্যাগত প্রায় 65,000 পাহাড়ি শরণার্থীর রেশন বন্ধ করে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে পুনর্বাসনের নির্দেশ দেয়, কিন্তু গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের রেশন চালু রাখতে বলে। জনসংহতি সমিতি ও ইউপিডিএফ দুই দলই একে বৈষম্যমূলক বলেছিল। তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক সচিব পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, রেশন বন্ধ করা হয়নি, অর্থ মন্ত্রণালয় বরাদ্দ দেয়নি বলে দেওয়া যায়নি; চুক্তি অনুযায়ী শরণার্থীদের রেশন এক বছরের জন্যই ছিল। The Daily Star-এর 2010 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী 2003 সালে শরণার্থীদের রেশন ছয় মাস বন্ধ থাকার পর প্রতিবাদের মুখে আবার চালু হয়।
গুচ্ছগ্রামের বাঙালি বাসিন্দা ও তাঁদের সংগঠনগুলোর দাবি তিনটি: রেশন চালু রাখা ও বাড়ানো, স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি, আর মূল বরাদ্দের জমিতে ফেরা বা স্থায়ী পুনর্বাসন। পাহাড়ি সংগঠনগুলো উল্টো দাবি করে এসেছে: গুচ্ছগ্রাম ভেঙে বসতি স্থাপনকারীদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসন। দুই দাবিই নিচে উৎসসহ।
রাঙামাটির বাঘাইছড়ির বাঙালি বাসিন্দাদের বরাতে The Daily Star 2010 সালে লিখেছে, পাহাড়ে জনসংখ্যা বাড়লেও রেশন-প্রাপকের সংখ্যা বছরের পর বছর বাড়ানো হয়নি; দীঘিনালা থেকে বাঘাইছড়িতে আসা এক বাসিন্দা পত্রিকাটিকে বলেছিলেন, সরকারের উচিত তালিকা পর্যালোচনা করে প্রাপকের সংখ্যা বাড়ানো। 2005 সালে খাগড়াছড়ির তৎকালীন সংসদ সদস্য, যিনি তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানও, একই পত্রিকাকে বলেছিলেন, গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দাদের সংখ্যা বহুগুণ বেড়েছে এবং “They are really in bad situation”।
আমাদের আর্কাইভে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র নিয়ে তাতিন্দ্র লাল চাকমার লেখা উদ্ধৃত করেছে, 11 অক্টোবর 2002 তারিখে গুচ্ছগ্রামবাসী বাঙালিরা প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি স্মারকলিপি দেন, যেখানে তাঁরা নিজেদের “পার্বত্য জেলার স্থায়ী বাসিন্দা” বলে উল্লেখ করেন এবং গুচ্ছগ্রামবাসীদের রেশন চান। লেখক এই দুই দাবিকে পরস্পরবিরোধী বলে সমালোচনা করেছেন: তাঁর যুক্তি, প্রকৃত স্থায়ী বাসিন্দারা সরকারি রেশন পান না। স্মারকলিপির মূল কপি আর্কাইভে নেই; লেখায় এর একটি বাক্যই উদ্ধৃত।
পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র পরিষদ (পিসিসিপি) 18 অক্টোবর 2025 তারিখের বিবৃতিতে (pahar24-এ প্রকাশিত) গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের “গুচ্ছগ্রামে বন্দী” বলে বর্ণনা করেছে। বিবৃতির দাবি, শান্তিচুক্তির আগে যুদ্ধাবস্থায় 130টি গ্রাম থেকে 26 হাজার বাঙালি পরিবারকে “নিরাপত্তার অজুহাত দেখিয়ে” সরিয়ে 68টি গুচ্ছগ্রামে রাখা হয়, এবং প্রথম টাস্কফোর্সের সংজ্ঞা অনুযায়ী এরাও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু। সংগঠনটির দাবি, এঁদের পুনর্বাসন ছাড়া টাস্কফোর্সের সভা হতে পারে না।
The Daily Star-এর 2018 সালের প্রতিবেদনে দীঘিনালা ভূমি রক্ষা কমিটির সভাপতি বলেছেন, পরিবারগুলো বারবার ভিটায় ফেরার আবেদন করেছে, কাজ হয়নি; দীর্ঘ দারিদ্র্যে কেউ কেউ অবৈধ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন।
জনসংহতি সমিতির 1992 সালের সংশোধিত পাঁচ দফা দাবিনামায় গুচ্ছগ্রাম তিনবার এসেছে। পাহাড়িদের গুচ্ছগ্রাম ভেঙে দেওয়ার দাবির পাশাপাশি দাবিনামায় ছিল: “পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে ও গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত বহিরাগতদেরকে পর্যায়ক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম হইতে অনতিবিলম্বে অন্যত্র সরাইয়া লওয়া।” আরেকটি ধারায় 17 আগস্ট 1947-এর পরে আসা এবং “বিভিন্ন স্থানে ও গুচ্ছগ্রামে” বসবাসরত বহিরাগতদের সরিয়ে নেওয়ার কথা আছে।
আমাদের আর্কাইভে মঙ্গল কুমার চাকমার আদিবাসী জাতিসমূহের সাংস্কৃতিক অধিকার নিয়ে লেখা সাম্প্রতিক সময়ের একটি অভিযোগ যোগ করেছে: সরকার “সেটেলার বাঙালিদের গুচ্ছগ্রাম সম্প্রসারণের নামে ভূমি অধিগ্রহণ” করছে। কোন গুচ্ছগ্রাম কবে, কতটা জমিতে সম্প্রসারিত হয়েছে, লেখায় তার নির্দিষ্ট উদাহরণ নেই।
এডিসন চাকমার পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িকতার উৎসমুখ লেখায় বাবুছড়া গুচ্ছগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থানের একটি প্রত্যক্ষ বিবরণ আছে: দীঘিনালা থেকে বাবুছড়ার 12 কিলোমিটার পথে কোনো বাঙালি পরিবার নেই, বাবুছড়া বাজারের কাছে গুচ্ছগ্রাম, তার কাছেই পুলিশ ফাঁড়ি, আরও কিছু দূরে সেনা ছাউনি। লেখক এরপর চুক্তি-পরবর্তী একটি দাঙ্গার স্মৃতিচারণ করেছেন; সেটি একজন প্রত্যক্ষদর্শীর ব্যক্তিগত বিবরণ, তদন্ত-প্রতিবেদন নয়।
1997 সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির ইংরেজি পাঠে গুচ্ছগ্রাম বা cluster village শব্দ নেই; পুনর্বাসনের ধারায় বলা আছে কেবল “internally displaced tribal people”-এর কথা। তবু চুক্তির অধীনে গঠিত টাস্কফোর্স 2000 সালে যে তালিকা দেয়, তাতে 38,156টি অ-উপজাতীয় পরিবার ছিল। এই অন্তর্ভুক্তিই টাস্কফোর্স অচল হওয়ার একটি বড় কারণ হয়।
চুক্তির “ঘ” খণ্ডের প্রথম ধারার ইংরেজি পাঠ (PA-X Peace Agreements Database-এ সংরক্ষিত): “The Task Force shall, after determination, rehabilitate the internally displaced tribal people of three districts.” চুক্তির মূল ভাষা বাংলা; ধারাগুলোর বিস্তারিত আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে ধারা ধরে লেখায়।
Peace Accords Matrix (University of Notre Dame)-এর বিবরণ অনুযায়ী 2000 সালে টাস্কফোর্স 90,208টি আদিবাসী ও 38,156টি বাঙালি পরিবারের তালিকা জমা দেয়। জনসংহতি সমিতি ও জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতি তালিকাটি প্রত্যাখ্যান করে, কারণ তাতে 1979–1984 সালের বসতি স্থাপন কর্মসূচিতে আসা বাঙালিরা ছিলেন; সরকারপক্ষের সদস্যরা তাঁদের বাদ দিতে রাজি না হওয়ায় দুই সংগঠন টাস্কফোর্স বর্জন করে।
The Daily Star-এর 25 সেপ্টেম্বর 2018 তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী টাস্কফোর্সের তৎকালীন চেয়ারম্যান, যিনি তখন সংসদ সদস্যও, জানান, টাস্কফোর্স 81,777টি অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু পরিবার ও ভারত-প্রত্যাগত 21,900টি পরিবার চিহ্নিত করেছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার টাস্কফোর্স-নিবন্ধ এর সঙ্গে যোগ করেছে, অ-উপজাতীয় প্রায় 38,000 উদ্বাস্তুর পুনর্বাসনের জন্য আলাদা প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
পিসিসিপির 2025 সালের বিবৃতিতে টাস্কফোর্সের চূড়ান্ত তালিকার মোট সংখ্যা 1,28,314টি পরিবার: 90,208টি উপজাতীয় ও 38,156টি অ-উপজাতীয়। এই “এক লাখ আটাশ হাজার” সংখ্যাটিই প্রায়ই গুচ্ছগ্রামের সংখ্যার সঙ্গে মিশে যায়, যদিও এটি গুচ্ছগ্রামের নয়, টাস্কফোর্সের উদ্বাস্তু-তালিকার মোট। কে উদ্বাস্তু, এই প্রশ্নের বিরোধ আলাদা একটি বিষয়, এখানে কেবল সংখ্যাটির উৎস চিহ্নিত করা হলো।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নিজের উপস্থাপনা অনুযায়ী এই কর্মসূচির সূচনা 20 ফেব্রুয়ারি 1972, তৎকালীন নোয়াখালীর রামগতিতে “পোড়াগাছা গুচ্ছগ্রাম” উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। তারপর “আদর্শ গ্রাম” নামে দুটি প্রকল্প, 2009 থেকে “গুচ্ছগ্রাম” নামে দুটি পর্যায়; তৃতীয় পর্যায় এখনো অনুমোদনের অপেক্ষায়।
| পর্যায় | মেয়াদ | গ্রাম | পুনর্বাসিত পরিবার | উৎস |
|---|---|---|---|---|
| পোড়াগাছা গুচ্ছগ্রাম | উদ্বোধন 20 ফেব্রুয়ারি 1972 | 1 | উল্লেখ নেই | ভূমি মন্ত্রণালয়, 2018 |
| আদর্শ গ্রাম প্রকল্প-১ | জুলাই 1988 – জুন 1998 | 1,080 | 45,647 | ভূমি মন্ত্রণালয়, 2018 |
| আদর্শ গ্রাম প্রকল্প-২ | জুলাই 1998 – ডিসেম্বর 2008 | 427 | 25,385 | ভূমি মন্ত্রণালয়, 2018 |
| গুচ্ছগ্রাম (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন) | জানুয়ারি 2009 – সেপ্টেম্বর 2015 | 254 | 10,703 | ভূমি মন্ত্রণালয়, 2018; সমাপ্ত প্রকল্পের তালিকা |
| গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (সিভিআরপি) | অক্টোবর 2015 – জুন 2020 (মূল মেয়াদ) | 715 (নভেম্বর 2018 পর্যন্ত) | 31,350 (নভেম্বর 2018 পর্যন্ত); লক্ষ্য 50,000 | ভূমি মন্ত্রণালয়, 2018 |
| গুচ্ছগ্রাম-৩য় পর্যায় (প্রস্তাবিত) | অনুমোদন হয়নি | উল্লেখ নেই | প্রায় 20,000 (প্রস্তাব) | সারাক্ষণ, অক্টোবর 2025; বাসস, এপ্রিল 2026 |
প্রথম “গুচ্ছগ্রাম” পর্যায়টির পুরো অর্থায়ন এসেছে জাপান ঋণ মওকুফ তহবিল (জেডিসিএফ) থেকে, ব্যয় 18,375.63 লক্ষ টাকা। ভূমি মন্ত্রণালয়ের সমাপ্ত প্রকল্পের তালিকা অনুযায়ী এতে পরিবারপ্রতি গড়ে 5 শতক বসতভিটা, 300 বর্গফুটের ঘর ও আলাদা শৌচাগারের মালিকানা দেওয়া হয়েছে; মোট 536 একর খাসজমি বন্দোবস্ত হয়েছে, আর 1,233টি নলকূপ বসেছে।
এই তালিকায় গ্রামের সংখ্যা নিয়ে একটি ছোট অমিল আছে: মন্ত্রণালয়ের 2018 সালের উপস্থাপনা লিখেছে 254টি গুচ্ছগ্রাম ও 248টি বহুমুখী হলঘর, আর সমাপ্ত প্রকল্পের তালিকা লিখেছে 247টি গ্রামে 247টি বহুমুখী হলঘর।
দ্বিতীয় পর্যায়ের লক্ষ্য ছিল 2,500টি গুচ্ছগ্রামে 50,000টি “জলবায়ু-ক্ষতিগ্রস্ত” ভূমিহীন, গৃহহীন ও ঠিকানাহীন পরিবারের ঘর, 340টি বহুমুখী হলঘর ও 150টি ঘাটলা; সঙ্গে পরিবারপ্রতি দুজনের প্রশিক্ষণ ও বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) মাধ্যমে ক্ষুদ্রঋণ। বিআরডিবির ওয়েবসাইটে গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের ঋণ-অংশের মেয়াদ জানুয়ারি 2009 থেকে জুন 2020, এলাকা দেশের 53টি জেলার 137টি উপজেলা।
উপস্থাপনাটি দ্বিতীয় পর্যায়ের তিনটি সমস্যাও স্বীকার করেছে: অনেক উপজেলা থেকে নতুন গুচ্ছগ্রামের যথেষ্ট প্রস্তাব আসছে না, পুনর্বাসিতদের ঋণ ও প্রশিক্ষণের তহবিল যথেষ্ট নয়, আর প্রকল্পের যানবাহন না থাকায় মাঠপর্যায়ের তদারকি ব্যাহত হয়। এর শেষ স্লাইডের প্রতিশ্রুতি ছিল, পরের পর্যায়ে আরও এক লাখ পরিবার পুনর্বাসিত হবে।
শুরুর বছর নিয়ে উৎসে একটি অমিল আছে: ভূমি মন্ত্রণালয়ের উপস্থাপনা প্রথম গুচ্ছগ্রামের তারিখ দিয়েছে 1972, আর সারাক্ষণের অক্টোবর 2025 সালের প্রতিবেদন লিখেছে “১৯৮৮ সালে শুরু হওয়া গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচি”। 1988 সাল আদর্শ গ্রাম প্রকল্প-১-এর শুরুর বছর।
দ্বিতীয় পর্যায়ে চলেনি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নভেম্বর 2018 সালের উপস্থাপনার “Location of the Project” স্লাইডে লেখা: “All over Bangladesh (Except 3 hill districts- Rangamati, Khagrachhari and Bandarban)”। তবে প্রস্তাবিত তৃতীয় পর্যায়ের নকশায় “পার্বত্য অঞ্চলে ‘মাচাং’ ঘর”-এর আলাদা ব্যয় ধরা হয়েছে, যা সারাক্ষণের 2025 সালের প্রতিবেদনে আছে।
তিন পার্বত্য জেলা কেন বাদ, উপস্থাপনায় তার কারণ লেখা নেই, আর মন্ত্রণালয়ের অন্য কোনো প্রকাশিত নথিতেও কারণটি পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি একটি প্রাসঙ্গিক আইনি তথ্য উল্লেখ করা যায়, যা উপস্থাপনার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়: 1997 সালের চুক্তির “খ” খণ্ডের 26 নম্বর ধারায় বলা আছে, পার্বত্য জেলার সীমানার ভেতরে বন্দোবস্তযোগ্য খাসজমিসহ কোনো জমি পার্বত্য জেলা পরিষদের পূর্বানুমোদন ছাড়া বন্দোবস্ত, ইজারা, ক্রয়, বিক্রয় বা হস্তান্তর করা যাবে না। এর বিস্তারিত আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি আইন নিয়ে লেখায়।
তৃতীয় পর্যায় নিয়ে সর্বশেষ সরকারি বক্তব্য বাসসের 29 এপ্রিল 2026 তারিখের প্রতিবেদনে: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদে জানান, ভূমিহীন, গৃহহীন, ঠিকানাহীন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও নদীভাঙনে দুর্গত পরিবারের জন্য “গুচ্ছগ্রাম-৩ পর্যায় প্রকল্প” গ্রহণের কার্যক্রম “প্রক্রিয়াধীন”। তৃতীয় পর্যায়ে তিন পার্বত্য জেলা সত্যিই অন্তর্ভুক্ত হবে কি না, এবং হলে খাসজমি বন্দোবস্তে জেলা পরিষদের ভূমিকা কী হবে, তা কোনো প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্পটির সাফল্যের দাবি আছে মন্ত্রণালয়ের নথিতে, আর সীমাবদ্ধতার কথা আছে একাডেমিক গবেষণা, পরিকল্পনা কমিশন ও সংবাদপত্রে। একটি গবেষণা জীবিকার উল্লেখযোগ্য উন্নতি পেয়েছে, আবার একটি সংবাদ-প্রতিবেদন নিম্নমানের নির্মাণ ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে। দুই দিকই নিচে।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের 2018 সালের উপস্থাপনা লিখেছে, পুনর্বাসিত 1,12,000 পরিবারের সন্তানেরা স্কুল-কলেজে যাচ্ছে, অনেকে বিভিন্ন খাতে চাকরি করছে; খাসজমি ভূমিহীনদের মধ্যে বণ্টিত হচ্ছে এবং মালিকানা তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়াচ্ছে। সারাক্ষণের প্রতিবেদন অনুযায়ী জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশলেও (NSSS) গুচ্ছগ্রাম একটি থিম্যাটিক ক্লাস্টার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
Bishawjit Mallick ও Zakia Sultana-র গবেষণা “Livelihood after Relocation—Evidences of Guchchagram Project in Bangladesh” (Social Sciences, MDPI, খণ্ড 6, সংখ্যা 3, জুলাই 2017) গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার চারটি গুচ্ছগ্রামে মাঠ-গবেষণা করেছে। সারসংক্ষেপ অনুযায়ী স্থানান্তরিত মানুষের জীবিকায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, কিন্তু অবস্থানগত অসুবিধা, কৃষি উৎপাদন ও স্থানীয় শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার, এবং প্রকল্পের কিছু লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। গবেষকেরা এটাও লক্ষ করেছেন যে বিভিন্ন সরকার প্রকল্পটিকে ভিন্ন ভিন্ন নামে চালিয়েছে, কিন্তু মূল লক্ষ্য বদলায়নি।
সারাক্ষণের 7 অক্টোবর 2025 তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী পরিকল্পনা কমিশন 777 কোটি টাকার “গুচ্ছগ্রাম—তৃতীয় পর্যায় (ক্লাইমেট ভিকটিমস রিহ্যাবিলিটেশন)” প্রকল্প-প্রস্তাব ফেরত দিয়েছে। কমিশনের আপত্তি: কোন জেলা বা উপজেলায় কত পরিবার পুনর্বাসিত হবে তা স্পষ্ট নয়; প্রশিক্ষণ (20 কোটি) ও ঋণ (50 কোটি) অংশ ভূমি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বসীমার বাইরে; আর ঘর-নির্মাণ ব্যয় আশ্রয়ণ প্রকল্পের চেয়ে বেশি। প্রস্তাবে সমতলে সেমি-পাকা ঘরের ব্যয় 3,04,500 টাকা, চরাঞ্চলে টিনশেড ঘর 2,84,500 টাকা, পার্বত্য অঞ্চলে মাচাং ঘর 2,65,000 টাকা ধরা হয়েছিল; কমিশনের হিসাবে ব্যয় যৌক্তিক করলে প্রায় 200 কোটি টাকা কমে 20 হাজার পরিবার পুনর্বাসন সম্ভব।
দেশ রূপান্তরের 30 জুন 2020 তারিখের প্রতিবেদন খুলনার পাইকগাছা উপজেলার চারটি গুচ্ছগ্রামের কথা লিখেছে, যেখানে ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম-২ প্রকল্পের আওতায় 2017–18 অর্থবছরে 240টি পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী ঘর-শৌচাগার-নলকূপে 3 কোটি 78 লাখ 73 হাজার টাকা ব্যয় হলেও নিম্নমানের সামগ্রীতে ঘর অল্পদিনে ব্যবহার-অনুপযোগী হয়েছে, 24টি গভীর নলকূপ বসেনি, উন্নত চুলা দেওয়া হয়নি, সংযোগ-রাস্তা ও পুকুরঘাট হয়নি। নীতিমালা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিতে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের থাকার কথা; দুই চেয়ারম্যান অভিযোগ করেছেন, তাঁদের কিছুই জানানো হয়নি। প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ইউএনও প্রতিবেদককে জানান, কাজ শেষ হলেও ঘর তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর হয়নি; অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি অসুস্থ বলে জানান।
তিনটি সংখ্যা তিনটি আলাদা জিনিস গোনে। প্রায় 26,000 হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রামে রেশনভোগী বাঙালি পরিবার; 1,28,314 হলো চুক্তির টাস্কফোর্সের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু-তালিকার মোট, যার মধ্যে পাহাড়ি পরিবারই বেশি; আর এক লাখের বেশি পরিবারের জাতীয় হিসাবটি ভূমি মন্ত্রণালয়ের সারা দেশের কর্মসূচির, যেখানে পার্বত্য জেলা নেই।
| সংখ্যা | কী গোনে | কোন কর্মসূচি | উৎস |
|---|---|---|---|
| 25,997 / 26,220 / 26,000 | গুচ্ছগ্রামে রেশনভোগী অ-উপজাতীয় পরিবার | পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রাম | পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় 2025; খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন; The Daily Star 2003, 2010 |
| 53,855 | খাগড়াছড়ির গুচ্ছগ্রামে বসবাসরত সব পরিবার (কার্ডধারী ও কার্ডবিহীন) | পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রাম | খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসন |
| 1,28,314 | টাস্কফোর্সের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু-তালিকা (90,208 উপজাতীয় + 38,156 অ-উপজাতীয়) | কোনো গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচি নয়; চুক্তির টাস্কফোর্স | Peace Accords Matrix; পিসিসিপি 2025 |
| 1,13,085 | আদর্শ গ্রাম-১ ও ২, গুচ্ছগ্রাম-১ ও ২-এ পুনর্বাসিত পরিবারের যোগফল (নভেম্বর 2018 পর্যন্ত) | ভূমি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রকল্প | ভূমি মন্ত্রণালয় 2018-এর চারটি সংখ্যার যোগফল |
| 1,12,000 | “পুনর্বাসিত” পরিবার, যাদের সন্তানেরা শিক্ষা ও চাকরিতে | ভূমি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রকল্প | ভূমি মন্ত্রণালয় 2018 |
| 1,27,540 | জাতীয় গুচ্ছগ্রাম কর্মসূচিতে “সর্বমোট” পুনর্বাসিত পরিবার বলে উদ্ধৃত | ভূমি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রকল্প | গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের ওয়েবসাইটের নামে উদ্ধৃত; মূল পাতায় যাচাই করা যায়নি [যাচাই প্রয়োজন] |
ছক থেকে তিনটি ভুলের ধরন চোখে পড়ে। প্রথমত, ভূমি মন্ত্রণালয়ের জাতীয় হিসাবকে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রামের হিসাব ভাবা; অথচ দ্বিতীয় পর্যায়ের নথিতে তিন পার্বত্য জেলা বাদ। দ্বিতীয়ত, টাস্কফোর্সের 1,28,314 পরিবারকে গুচ্ছগ্রামের পরিবার ভাবা; অথচ সেই তালিকার 70 শতাংশের বেশি (90,208) পাহাড়ি পরিবার, এবং তালিকাটি গুচ্ছগ্রাম নয়, বাস্তুচ্যুতি নিয়ে। তৃতীয়ত, রেশনভোগী 26,000 পরিবারকে গুচ্ছগ্রামের মোট পরিবার ভাবা; অথচ খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের হিসাবে শুধু ওই জেলাতেই গুচ্ছগ্রামে 53,855টি পরিবার থাকে, যার অর্ধেকের বেশির রেশন কার্ড নেই।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেও “সর্বমোট” সংখ্যাটি কোন কোন পর্যায় মিলিয়ে, তা পরিষ্কার নয়। মন্ত্রণালয়ের 2018 সালের নথিতে চারটি পর্যায়ের যোগফল 1,13,085; একই নথির অন্য স্লাইডে “1,12,000” পরিবারের কথা আছে। দ্বিতীয় পর্যায় নভেম্বর 2018-এর পরেও চলেছে, তাই চূড়ান্ত যোগফল এর চেয়ে বেশি হওয়ার কথা, কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত অর্জনের সরকারি সংখ্যা কোনো প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি।
একটি খবর বা প্রতিবেদন কোন গুচ্ছগ্রামের কথা বলছে, তা পাঁচটি সূত্রে প্রায় সবসময় ধরা যায়: মন্ত্রণালয়ের নাম, জেলার নাম, রেশনের উল্লেখ, বাসিন্দাদের পরিচয়, আর প্রকল্পের নামের লেজুড়। নিচের তালিকাটি পাঠক নিজে যাচাইয়ের কাজে ব্যবহার করতে পারেন।
না। পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রাম 1986 সালের দিকে সেনাক্যাম্পের কাছে গড়া বসতি, যার বাঙালি বাসিন্দাদের রেশন দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প ভূমিহীন ও দুর্যোগ-ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে খাসজমিতে ঘর দেয়। 2018 সালের মন্ত্রণালয়-নথি অনুযায়ী এর দ্বিতীয় পর্যায় রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান বাদে সারা দেশে চলেছে।
The Daily Star-এর 2010 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী 1986 সালে সহিংসতা বাড়লে এরশাদ সরকার বাঙালি বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তার জন্য সেনাক্যাম্পের কাছে গুচ্ছগ্রাম তৈরি করে, আর অক্টোবর 1988 থেকে রেশন দেয়। Amnesty International ও IDMC এগুলোকে বিদ্রোহ-দমন কৌশলের অংশ বলেছে; IDMC-র মতে পাহাড়িদের জোর করে গুচ্ছগ্রামে নেওয়া শুরু 1979 থেকে।
হ্যাঁ। Amnesty International-এর 1991 সালের প্রতিবেদনে খাগড়াছড়ি অঞ্চলের এক নারী ও 68 বছর বয়সী এক ব্যক্তির সাক্ষ্য আছে, যাঁদের গুচ্ছগ্রামে বসানো হয়েছিল। IDMC-র 2006 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বান্দরবানে এমন গুচ্ছগ্রাম ছিল মূলত রোয়াংছড়ি, রুমা ও থানচিতে। জনসংহতি সমিতি 1992 সালে এগুলো ভেঙে দেওয়ার দাবি করে; IDMC লিখেছে পরে সেগুলো ভাঙা হয়।
হ্যাঁ, পাহাড়িদের গুচ্ছগ্রাম। Amnesty International-এর মে 1992 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী খাগড়াছড়ির পানছড়ির লোগাং একটি “cluster village”, যেখানে 1989–1990 সালে কয়েকটি দূরবর্তী পাড়ার পাহাড়িদের বিদ্রোহ-দমন নীতির অংশ হিসেবে বসানো হয়েছিল। গ্রামটিতে প্রায় 600টি ঘর ছিল, আর প্রায় 250 গজ দূরে ছিল বাংলাদেশ রাইফেলসের ক্যাম্প।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের 22 এপ্রিল 2025 তারিখের চিঠি অনুযায়ী 25,997টি “অ-উপজাতীয়” পরিবার: খাগড়াছড়িতে 24,511টি, রাঙামাটিতে 1,486টি। বান্দরবানের কোনো বরাদ্দ চিঠিতে নেই। The Daily Star 2010 সালে 26,220টি পরিবারের কথা লিখেছিল, আর খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটেও রেশন কার্ডধারী পরিবার 26,220টি।
এপ্রিল–জুন 2025 কিস্তিতে মন্ত্রণালয় 25,997টি পরিবারের জন্য 3,000.181 মেট্রিক টন চাল ও 4,097 মেট্রিক টন গম ছাড় করেছে। এই সংখ্যা থেকে হিসাব করলে গড়ে পরিবারপ্রতি মাসে প্রায় 91 কেজি খাদ্যশস্য দাঁড়ায়, যার প্রায় 38.5 কেজি চাল ও 52.5 কেজি গম। The Daily Star 2010 সালে মাসে 85 কেজি চালের কথা লিখেছিল।
খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনের “এক নজরে” পাতা অনুযায়ী 81টি, যেখানে 53,855টি পরিবার ও 2,12,165 জন মানুষ থাকেন; হিসাবটি কোন বছরের, পাতায় লেখা নেই। উৎসে অমিল আছে: The Daily Star 2010 সালে 81টি গুচ্ছগ্রাম খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি মিলিয়ে লিখেছিল, আর পিসিসিপির 2025 সালের বিবৃতি বলছে 68টি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের 2018 সালের উপস্থাপনা অনুযায়ী প্রথম গুচ্ছগ্রাম 20 ফেব্রুয়ারি 1972 নোয়াখালীর রামগতিতে, “পোড়াগাছা গুচ্ছগ্রাম”। এরপর আদর্শ গ্রাম প্রকল্প-১ (1988–1998), আদর্শ গ্রাম প্রকল্প-২ (1998–2008), “গুচ্ছগ্রাম” প্রকল্প (2009–2015) ও গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায় (2015 থেকে)। সারাক্ষণ 2025 সালে কর্মসূচির শুরু লিখেছে 1988। Mallick ও Sultana-র 2017 সালের গবেষণা বলছে, নাম বদলালেও প্রকল্পের মূল লক্ষ্য একই থেকেছে।
দ্বিতীয় পর্যায়ে চলেনি। ভূমি মন্ত্রণালয়ের নভেম্বর 2018 সালের উপস্থাপনায় প্রকল্প-এলাকা “All over Bangladesh (Except 3 hill districts- Rangamati, Khagrachhari and Bandarban)”। তবে প্রস্তাবিত তৃতীয় পর্যায়ের নকশায় পার্বত্য অঞ্চলের জন্য 2,65,000 টাকার মাচাং ঘর ধরা হয়েছে বলে সারাক্ষণ অক্টোবর 2025 সালে লিখেছে। তৃতীয় পর্যায় এখনো অনুমোদিত হয়নি।
ভূমি মন্ত্রণালয়ের নভেম্বর 2018 সালের উপস্থাপনা অনুযায়ী তখন পর্যন্ত 715টি গুচ্ছগ্রামে 31,350টি পরিবার; লক্ষ্য ছিল 2,500টি গুচ্ছগ্রামে 50,000টি পরিবার, মেয়াদ অক্টোবর 2015 থেকে জুন 2020। আগের “গুচ্ছগ্রাম” প্রকল্প (2009–2015) মিলিয়ে দুই পর্যায়ে মোট 42,053টি পরিবার। দ্বিতীয় পর্যায়ের চূড়ান্ত অর্জনের সংখ্যা প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি।
এটি গুচ্ছগ্রামের নয়, পার্বত্য চুক্তির অধীনে গঠিত টাস্কফোর্সের 2000 সালের অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু-তালিকার মোট: 90,208টি উপজাতীয় ও 38,156টি অ-উপজাতীয় পরিবার, মোট 1,28,314টি। Peace Accords Matrix অনুযায়ী বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের অন্তর্ভুক্তির প্রতিবাদে জনসংহতি সমিতি ও জুম্ম শরণার্থী কল্যাণ সমিতি টাস্কফোর্স বর্জন করে।
1997 সালের চুক্তির ইংরেজি পাঠে “cluster village” বা গুচ্ছগ্রাম শব্দটি নেই। পুনর্বাসনের “ঘ” খণ্ডের প্রথম ধারায় টাস্কফোর্সকে তিন জেলার “internally displaced tribal people” পুনর্বাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। গুচ্ছগ্রামের বাঙালিদের নিয়ে চুক্তির ইংরেজি পাঠে আলাদা কোনো ধারা নেই; তবু টাস্কফোর্সের 2000 সালের তালিকায় 38,156টি অ-উপজাতীয় পরিবার রাখা হয়েছিল।
প্রকাশিত উৎস অনুযায়ী তিনটি দাবি: রেশন চালু রাখা ও প্রাপকের সংখ্যা বাড়ানো (The Daily Star, 2010), স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি (2002 সালের স্মারকলিপি, আমাদের আর্কাইভে উদ্ধৃত), আর মূল বরাদ্দের জমিতে ফেরা বা স্থায়ী পুনর্বাসন (The Daily Star, 2018; পিসিসিপি, 2025)। পাহাড়ি সংগঠনগুলোর দাবি উল্টো: বসতি স্থাপনকারীদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে পুনর্বাসন।
না। সারাক্ষণের অক্টোবর 2025 সালের প্রতিবেদন আশ্রয়ণকে প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের প্রকল্প বলেছে, আর গুচ্ছগ্রাম ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী পরিকল্পনা কমিশন গুচ্ছগ্রাম-৩-এর ঘর-নির্মাণ ব্যয়কে আশ্রয়ণের ইউনিট-ব্যয়ের চেয়ে বেশি বলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা-গুচ্ছগ্রাম এ দুটির কোনোটিই নয়; তার রেশন দেয় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
গুচ্ছগ্রাম গড়ার সরকারি আদেশ। 1986 সালে কোন আদেশে, কোন দপ্তরের সিদ্ধান্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের গুচ্ছগ্রামগুলো গড়া হয়েছিল, তার পাঠ প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। সরকারি অবস্থান জানা যায় কেবল সংবাদপত্রে উদ্ধৃত “official information” থেকে।
পাহাড়িদের গুচ্ছগ্রামের তালিকা। সংঘাতকালে কতটি পাহাড়ি গুচ্ছগ্রাম ছিল, কোন জনগোষ্ঠীর কত পরিবার সেখানে ছিল, কবে কোনটি ভাঙা হয়, তার কোনো তালিকা পাওয়া যায়নি। এই লেখায় পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের 1991 সালের প্রতিবেদন “Life is not ours” কেবল IDMC-র উদ্ধৃতি থেকে নেওয়া; প্রতিবেদনটির পূর্ণ পাঠ অনলাইনে পাওয়া যায়নি।
রেশন নীতিমালা। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের 30 ডিসেম্বর 2024 তারিখের “অ-উপজাতীয় গুচ্ছগ্রামবাসীদের মধ্যে খাদ্যশস্য বিতরণ” নীতিমালার পাঠ প্রকাশিত পাতায় পাওয়া যায়নি; তাই কে রেশন কার্ড পান, নতুন কার্ড কীভাবে হয়, তা জানা যায়নি।
গুচ্ছগ্রামের সংখ্যা। 81 না 68, এবং 81টি কেবল খাগড়াছড়িতে না দুই জেলা মিলিয়ে, উৎসগুলো মেলে না। রাঙামাটি ও বান্দরবান জেলা প্রশাসনের ওয়েবসাইটে গুচ্ছগ্রামের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি।
জাতীয় প্রকল্পের মোট অর্জন। গুচ্ছগ্রাম-২য় পর্যায়ের চূড়ান্ত অর্জন এবং 1972 থেকে আজ পর্যন্ত মোট পুনর্বাসিত পরিবারের সমন্বিত সরকারি সংখ্যা প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি। প্রচলিত “1,27,540” সংখ্যাটি মূল সরকারি পাতায় যাচাই করা যায়নি।
তিন পার্বত্য জেলা বাদ পড়ার কারণ। ভূমি মন্ত্রণালয় কেন গুচ্ছগ্রাম-২ থেকে তিন পার্বত্য জেলা বাদ দিয়েছিল, এবং প্রস্তাবিত তৃতীয় পর্যায়ে পার্বত্য অঞ্চলের মাচাং ঘর কোথায় কাদের জন্য, তা কোনো প্রকাশিত নথিতে পাওয়া যায়নি।
পাকুজ্যাছড়ি ও সোনামিয়া টিলার বিরোধ। দুই ঘটনাতেই এক পক্ষের বয়ান প্রকাশিত; অন্য পক্ষের বা প্রশাসনের লিখিত বক্তব্য, কিংবা ভূমি কমিশনে এ নিয়ে কোনো আবেদনের ফল পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:খাগড়াছড়ি, পার্বত্য চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি সমস্যা, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, ভূমি অধিকার
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।