Last updated Oct 15th, 2026
1

জুমজার্নালের আর্কাইভে কলার মোচা থেকে জন্ম নেওয়া এক কন্যার গল্প তিনবার আছে — তিনটিই তঞ্চঙ্গ্যা, তিনটির শিরোনাম তিন রকম, আর তিনজন আলাদা মানুষের বলা।
তিনটির নাম কলাত্থুর কন্যা, কলাখু কন্যা পসন আর সুন্দরী কলাথোর কন্যা। আকার ১,৩৭৬, ১,২৭২ আর ৩৭৮ শব্দ।
কিন্তু তিনটি একই গল্প নয়। দুটি একই কাহিনির দুই রূপ, আর তৃতীয়টি সম্পূর্ণ আলাদা একটি গল্প — কেবল নায়িকা এক। আর যে দুটি এক, তাদের একটির শেষে একটি প্রথার জন্ম হয় — যে প্রথা পাঠ অনুযায়ী আজও চালু।
তিনটি পাঠই তঞ্চঙ্গ্যা বিভাগে আছে, আর তিনটিতেই নায়িকা কলার মোচা থেকে আসা একটি মেয়ে। বাকি সব আলাদা।
| কলাত্থুর কন্যা | কলাখু কন্যা পসন | সুন্দরী কলাথোর কন্যা | |
|---|---|---|---|
| শব্দ | ১,৩৭৬ | ১,২৭২ | ৩৭৮ |
| বলেছেন | বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা | রবিন তঞ্চঙ্গ্যা | পারমিতা তঞ্চঙ্গ্যা (“কর্তৃক বর্ণিত”) |
| উৎস-গ্রন্থ | তঞ্চঙ্গ্যা রূপকথা লোককাহিনী ও কিংবদন্তী | পাঠে নেই | পাঠে নেই |
| নায়কের নাম | রাঙাধন | নাম নেই — “বুড়ীর ছেলে” | রাঙাধন |
| মায়ের নাম | সনামালা | নাম নেই | সনামালা |
| কাহিনির ধরন | মামার অভিমান ও প্রথার জন্ম | প্রতিদ্বন্দ্বী বধূ ও রূপান্তরের শিকল | মামার অভিমান ও প্রথার জন্ম |
| শেষে | একটি প্রথার ব্যাখ্যা | ডাইনীর মৃত্যু, সুখী সমাপ্তি | একই প্রথার ব্যাখ্যা |
ছক থেকেই স্পষ্ট: কলাত্থুর কন্যা ও সুন্দরী কলাথোর কন্যা একই কাহিনির দুই রূপ — একই নাম, একই মা, একই পরিণতি। আর কলাখু কন্যা পসন আলাদা একটি কাহিনি।
আকারের ফারাকটিও লক্ষণীয়। প্রথম ও তৃতীয় পাঠে একই ঘটনা, কিন্তু একটি ১,৩৭৬ শব্দের আর অন্যটি ৩৭৮ — প্রায় চার গুণ।
তিনটি শিরোনামে একই জিনিসের তিন রকম নাম, আর তার অর্থ একটি পাঠে স্পষ্ট করে দেওয়া আছে: কলাত্থুর — কলার মোচা।
| শিরোনামে | বন্ধনী বা টীকায় দেওয়া অর্থ |
|---|---|
| কলাত্থুর | “কলার মোচা” (পাঠের শেষে টীকায়) |
| কলাথোর | পাঠে “কলার থোর” শব্দটি ব্যবহৃত, অর্থ আলাদা করে দেওয়া নেই |
| কলাখু | শিরোনামের বন্ধনীতে — “কলার মোচার কন্যার গল্প” |
অর্থাৎ তিনটিই একই জিনিস — কলাগাছের ফুলের বেগুনি মোচা। কলাত্থুর কন্যা পাঠটিতে তার চেহারার বর্ণনাও আছে: “এসব দেখতে বেগুনী রঙের, তেলতেলে ও মসৃণ হয়ে থাকে।”
পাঠে একটি নির্দিষ্ট জাতের কলার নামও দেওয়া — তেল্যাকলা, আর টীকায় অর্থ: একপ্রকার কলা; মূল পাঠে আরও স্পষ্ট, “একপ্রকার জংলী কদলী”।
শিরোনামের শেষ শব্দ পসন বা পচ্ছন-এর অর্থও আর্কাইভে আছে — আরেকটি তঞ্চঙ্গ্যা পাঠের টীকায় লেখা, “পচ্ছন – রূপকথা”। চাকমা ভাষায় একই শব্দের রূপ পশ্চন, আর সেখানে অর্থ দেওয়া “শিশুতোষ গল্প”।
আর্কাইভের কোনো রূপকথা এভাবে শুরু হয় না। কলাত্থুর কন্যা-র প্রথম এক-তৃতীয়াংশ কোনো গল্প নয় — এটি তঞ্চঙ্গ্যা জনগোষ্ঠীর অভিবাসনের বিবরণ, নদী ও জায়গার নাম ধরে।
শুরু আরাকান থেকে। পাঠে লেখা, আরাকান এক সময় “রোয়াং দেশ” নামে পরিচিত ছিল, আর আরাকানীরা একদল চাকমাকে দৈংনাক নামে অভিহিত করত — মারমারাও তাই বলত।
তারপর আসে পথের বিবরণ, আর তা একটি মানচিত্রের মতো:
আর তারপর আসে নামের ব্যাখ্যা, যা পাঠের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যেহেতু তাঁরা তৈনছড়ি থেকে এসেছিলেন, চাকমা রাজার ভূমি অফিসে জুম-তৌজিতে তাঁদের তৈনছর্য্যা চাকমা নামে তৌজিভুক্ত করা হয় — আর “এই তৈনছর্য্যা শব্দটিই কালক্রমে তৈনচংগ্যায় রূপ লাভ করে”, যা আজ লেখা হয় তঞ্চঙ্গ্যা।
পাঠ নিজেই এই ব্যুৎপত্তিকে নিশ্চিত বলে দাবি করে না — লেখা আছে “কারোর কারোর ধারণা”। [এই নাম-ব্যুৎপত্তি কোনো স্বাধীন উৎসে যাচাই করা হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]
এই অংশটি শেষ হয় একটি সরাসরি বাক্যে, যা কথকের নিজের: “আমরা এবার ‘কলাত্থুর কন্যা’ রূপকথাতে ফিরে যাই।” অর্থাৎ ভূমিকাটি সচেতনভাবে দেওয়া।
আর তার একটি কারণও আছে। কলাত্থুর কন্যা নিজেই পরে বলে, তার ঘর কালাডেন গাঙের পাড়ে — অর্থাৎ আরাকানে। গল্পটি অভিবাসনেরই গল্প: মানুষ এসেছে, আর তার সঙ্গে এসেছে একটি কলাবন আর তার কন্যা।
দুটি পাঠেই প্রথম দেখার দৃশ্যটি প্রায় হুবহু এক, আর দুটিতেই ঘটনাটি ঘটে ফাল্গুন মাসে, জুমের জঙ্গল কাটার সময়।
কলাত্থুর কন্যা-য় রাঙাধনের বয়স চৌদ্দ-পনেরো, আর তার মনের অবস্থার বর্ণনাটি কাব্যিক — “তার তরুণ মনের আকাশে সবে মাত্র রঙধনুর রঙ্গিন আল্পনার আবির্ভাব হচ্ছে।”
পাঠে একটি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বকথাও আছে, যা অন্য পাঠে নেই। রাঙাধন তার মামাতো বোন ধংমালা-কে মনে মনে বউ হিসেবে কল্পনা করে, আর মাকে জিজ্ঞেস করে, “মা, ধংমালা কবে আমাদের ঘরে আসবে?”
মা সনামালা বুঝতে পারেন, কিন্তু কিছু বলেন না — কারণ ধংমালার সঙ্গে অন্য একজনের আইফাই চলছে, আর পাঠে বন্ধনীতে তার অর্থও দেওয়া: ভালবাসা।
অর্থাৎ কলাত্থুর কন্যার আবির্ভাবের আগেই রাঙাধন একবার প্রত্যাখ্যাত। আর সে কলার মোচার সৌন্দর্যকে ধংমালার সঙ্গেই তুলনা করে — “পিছল বেগুনী রঙের তেলতেলে কলার থোরের যে মায়াময় লাবণ্য, তা ধংমালার মাঝে সে দেখতে পায়।”
দেখার মুহূর্তটি দুই পাঠেই একই সংখ্যায় ঘটে। কলাত্থুর কন্যা-য় চারটি কলাগাছ কাটার পর পঞ্চমটিতে কোপ দিতেই কণ্ঠস্বর শোনা যায়; সুন্দরী কলাথোর কন্যা-য় “তিন চারটা কলাগাছ কাটার পর”।
আর অভিযোগটিও এক — তুমি আমার থাকবার জায়গা নষ্ট করে দিয়েছ। তারপর দাবি: “আমাকে এখন তোমার সঙ্গে ঘরে নিয়ে যাও।”
অর্থাৎ প্রস্তাবটি কন্যারই, নায়কের নয়। দুটি পাঠেই রাঙাধন কেবল রাজি হয়।
তার পোশাকের বর্ণনাও দুই পাঠে এক — কচি কলাপাতার রঙে সাজানো পিনন আর খাদি, যা “মোলায়েম, কোমল এবং মসৃণ”।
দুটি পাঠেরই আসল বিষয় প্রেম নয় — মামার অভিমান। আর সেই অভিমান থেকেই জন্ম নেয় একটি নিয়ম।
ঘটনাটি সরল। রাঙাধন কলাত্থুর কন্যাকে ঘরে আনে, কিন্তু মামারা দুপুরের খাওয়ার জন্য ঘরে ফিরেছেন। তাঁদের দেখে কন্যা ঘরে না উঠে কলাবনে লুকিয়ে পড়ে।
কনিষ্ঠ মামা — কলাত্থুর কন্যা-য় তাঁর নাম খুলারাম, সুন্দরী কলাথোর কন্যা-য় খোলারাম — তাঁকে এক পলক দেখে ফেলেন। তিনি তখনো বিয়ে করেননি, আর ভাগিনার বউ দেখে দুঃখ ও অভিমানে ভাত খান না।
দিদি সনামালা অনেক বোঝান। মামার উত্তরটি দীর্ঘ পাঠে আছে, আর তা সবচেয়ে মানবিক লাইন: “দিদি আমি পাগল নই। যারা যুবক অবিবাহিত তারাই আমার দুঃখ বুঝবে। তুমি আমার দুঃখ বুঝবে না।”
তারপর তাঁর শর্ত: “আমি ভাত খেতে পারি, যদি আমার ভাগিনা বৌ কলাত্থুর কন্যা আমাকে ভাত বেড়ে দেয়।”
আর কলাত্থুর কন্যা বনে, আর বের হচ্ছে না। সারাদিন কেটে যায়।
মোচড়টি আসে সন্ধ্যায়, আর সেটিই পুরো গল্পের কারণ। সূর্য অস্ত যায়, “ফাল্গুনের নির্মল সুনীল আকাশে একটা করে অসংখ্য তারকা মিট মিট করে জ্বলে” ওঠে — আর তখনই কলাত্থুর কন্যাকে দেখা যায়।
সংক্ষিপ্ত পাঠে একই মুহূর্ত আরও সরল: লোকজন দেখা যায় না, “আকাশে তারা ওঠে”, আর তখনই কন্যা ঝোপ থেকে বেরিয়ে আসে, ভাতের থালা এনে মামার সামনে রাখে, আর মামা হাত দেন।
উপসংহারটি দুই পাঠেই প্রথার: মামা তাঁর ভাগিনা-বউকে যেদিন প্রথম দেখেন, সেদিন আকাশে তারা না ওঠা পর্যন্ত তিনি ভাত খেতে পারেন না।
দুটি পাঠই দাবি করে প্রথাটি এখনো চালু, কিন্তু তার পরিধি দুই পাঠে আলাদা — আর সেই ফারাকটি গুরুত্বপূর্ণ।
সংক্ষিপ্ত পাঠের বাক্যটি সরল ও সীমিত: “সেই রীতির প্রচলন এখনও আছে। মামা তার ভাগিনা বউকে সর্বপ্রথম যেদিন দেখে, সেদিন আকাশে তারা না ওঠা পর্যন্ত ভাত খেতে পারে না।”
দীর্ঘ পাঠে নিয়মটি দু’ভাগে বলা, আর দ্বিতীয় ভাগটি পরিধি বাড়িয়ে দেয়:
অর্থাৎ গল্পে কারণটি একজন অবিবাহিত যুবকের অভিমান, কিন্তু নিয়মটি শেষ পর্যন্ত সব পুরুষের জন্য।
এই কাঠামোটিই পাঠটিকে কেবল রূপকথা থেকে আলাদা করে। গল্পটি একটি বর্তমান আচারের উৎস ব্যাখ্যা করছে — আর সেই অর্থে এটি কিংবদন্তির কাছাকাছি, যেমন তার উৎস-গ্রন্থের শিরোনামেও “কিংবদন্তী” শব্দটি আছে।
[প্রথাটি আজ কোন অঞ্চলে কতটা চালু, তা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে নারীর অবস্থান ও প্রথাগত আইন নিয়ে আলাদা লেখা আছে প্রথাগত আইনে আদিবাসী তঞ্চঙ্গ্যা নারীর অবস্থান-এ।
কলাখু কন্যা পসন-এ নায়িকা একই — কলার মোচা থেকে আসা একটি মেয়ে — কিন্তু বাকি সবকিছু আলাদা। এখানে কোনো মামা নেই, কোনো প্রথা জন্মায় না, আর গল্পের অর্ধেকই ঘটে নায়িকার মৃত্যুর পরে।
শুরু বিদেশ-যাত্রায়। বিধবা বুড়ির ছেলে বিয়ের ইচ্ছা নিয়ে ঘর ছাড়ে, আর মা তাকে “কলাপাতা মুড়িয়ে ভাত আর তরকারি” দিয়ে বিদায় দেন।
অন্য দেশে এক বুড়ির ঘরে সে আশ্রয় পায় কেবল একটি ডাক দিয়ে — সে বুড়িকে নানী বলে ডাকে, আর বুড়ি আহ্লাদিত হয়ে বলেন, “এতোদিন আমাকে নানী ডাকার কেউ ছিল না।”
আবিষ্কারের দৃশ্যটি সুন্দর। ধান পাহারা দিতে গিয়ে ছেলেটি ঘুমিয়ে পড়ে, আর জেগে দেখে সাতজন সুন্দরী পা দিয়ে ধান নেড়ে দিচ্ছেন। বুড়ির ফেরার শব্দে তাঁরা পালিয়ে বাড়ির পাশের কলাগাছগুলোতে একে একে মিলিয়ে যান।
ছেলেটি মনে রাখে কোন কলাগাছে কে ঢুকল, আর ফেরার সময় বুড়ি নিজেই পরামর্শ দেন — একটি কলাগাছ কেটে নিয়ে যেতে, আর পথে প্রতিটি পাহাড়ে পৌঁছে “একটি করে খোসা ছাড়াবে”।
পাঁচ-ছয়টি পাহাড় পেরোনোর পর মেয়েটি বেরিয়ে আসে। কিন্তু একটি সমস্যা দেখা দেয়, আর তা বাস্তবসম্মত: সে হাঁটতে পারে না, ধরে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে।
তাই ছেলেটি তাকে একটি বটগাছের উঁচু ডালে রেখে ঘোড়া আনতে যায় — আর সেই অনুপস্থিতিতেই গল্পের বিপর্যয়।
কলাখু কন্যা পসন-এর দ্বিতীয়ার্ধ একটি শিকল — নায়িকা মরে না, বারবার অন্য কিছু হয়ে ফিরে আসে, আর প্রতিবার তাকে আবার ধ্বংস করা হয়।
প্রথমে প্রতিস্থাপন। এক মায়াবী রাক্ষসী কুয়োর পাশে এসে মেয়েটিকে দেখে, আর একটি পান চেয়ে কথা শুরু করে। মেয়েটির কাছে পান নেই, তাই রাক্ষসী বলে বটগাছের পাতা ও বিচি দিয়েই খিলি বানাতে।
কৌশলটি ধৈর্যের। তিনবার সে পান মাটিতে ফেলে দেয়, তারপর বলে — “তুমি আমাকে হাতে হাতে দাও। তাহলে আর পড়ে যাবে না।” আর হাতে দিতে গিয়েই মেয়েটি নিচে টেনে নামানো হয়।
এরপর রাক্ষসী মেয়েটিকে মেরে কুয়োর ভেতর পুঁতে ফেলে, নিজে তার রূপ ধরে সেই ডালেই বসে থাকে।
কিন্তু গল্প সেখানে শেষ হয় না। শিকলটি শুরু হয়:
| ধাপ | যা হয় | কীভাবে ধ্বংস হয় |
|---|---|---|
| ১ | কুয়োর ভেতর যেখানে পোঁতা হয়েছিল, সেখানে ফোটে একটি লাল পদ্ম | মায়াবী তা দু’হাতে কচলে ছিঁড়ে বাইরে ছুড়ে ফেলে |
| ২ | সেই জায়গায় গজায় একটি লাউগাছ, আর তাতে একটি লাউ | মায়াবী লাউটি ছিঁড়ে রান্না করে |
| ৩ | যেখানে লাউয়ের তরকারি ফেলা হয়, সেখানে জন্মায় একটি সুপারি গাছ | সুপারি পেকে ঝরে পড়ে, আর কুড়িয়ে নেন এক বুড়ো-বুড়ি |
| ৪ | সুপারি থেকে বেরিয়ে এসে মেয়েটি লুকিয়ে রান্না করে রাখে | বুড়ি লুকিয়ে পাহারা দিয়ে তাকে ধরে ফেলেন |
শিকলের প্রতিটি ধাপে একটি জিনিস অপরিবর্তিত থাকে — মেয়েটি নায়ককে চিনতে পারে, আর মায়াবীকে প্রত্যাখ্যান করে। লাউটি ছেলেটির জন্য উপরে উঠে যায়, আর মায়াবীর কপালে টোকা দেয়।
ঘোড়াটিও একই কাজ করে — মায়াবীকে পিঠে তুলতে সে বারবার পিঠ সরিয়ে নেয়, আর লাল পদ্মটি তুলে আনার পর আর বাধা দেয় না।
শনাক্তকরণের দৃশ্যটি শেষে, আর তা একটি দুর্ঘটনায়। বুড়ি মেয়েটির রূপ লুকাতে তার গায়ে কালি মাখিয়ে রাখতেন; ছেলেটি পানি চাইলে গ্লাস থেকে ছলকে পানি পড়ে হাতের কালির কিছু অংশ মুছে যায়, আর আসল রূপ বেরিয়ে পড়ে।
সমাপ্তিটি কোনো যুদ্ধ নয়। মেয়েটি রাতে তার পুরো কাহিনি বলতে থাকে, আর তা শুনে মায়াবী “রাগে ফেটে” পড়ে নিজের আসল রূপে ফিরে যায়, আর চিৎকার করতে করতে মারা যায়।
অর্থাৎ ডাইনীকে মারে সত্যিটা শোনা, অন্য কিছু নয়। লেখক রবিন তঞ্চঙ্গ্যা।
দীর্ঘ পাঠটির একটি উপকাহিনি সংক্ষিপ্ত পাঠে নেই, আর সেটিই গল্পের মানসিক ভিত্তি — রাঙাধনের প্রথম প্রেম, যা শুরুই হয় না।
ধংমালা রাঙাধনের মামাতো বোন, বয়সে দু’বছরের বড়। পাহাড়ি সমাজে মামাতো-পিসতুতো সম্পর্কে বিয়ে প্রচলিত, তাই রাঙাধনের কল্পনাটি অস্বাভাবিক নয় — “মনে মনে ধংমালাকে তার বৌ কল্পনা করে আনে সে ঘরে।”
আর সে মাকে জিজ্ঞেসও করে, কিন্তু ঘুরিয়ে — “মা, ধংমালা কবে আমাদের ঘরে আসবে?”
মা সনামালার প্রতিক্রিয়াটি পাঠের সেরা বাক্যগুলোর একটি: তিনি বুঝতে পারেন “রাঙাধনের মনের বনে যৌবনের ভ্রমর পাখা মেলতে শুরু করেছে” — কিন্তু কিছু বলেন না।
কারণটিও পাঠে আছে, আর তা নির্দয়ভাবে সরল: ধংমালার সঙ্গে চক্রধন আঙুর আরেক নাতির আইফাই চলছে, অর্থাৎ ভালোবাসা। ধংমালা ইতিমধ্যেই অন্য কারও।
এই পর্বটি জানা থাকলে গল্পের পরের অংশটি সম্পূর্ণ আলাদা অর্থ পায়। রাঙাধন কলাগাছের মোচা দেখে মুগ্ধ হয়, কিন্তু সে আসলে ধংমালাকে দেখছে — পাঠে তা স্পষ্ট: মোচার “মায়াময় লাবণ্য, তা ধংমালার মাঝে সে দেখতে পায়”।
আর যখন সে কলাগাছ কাটতে শুরু করে, তখনও “তার চোখে ধংমালার রূপ লাবণ্য স্পষ্ট প্রতিভাত” হচ্ছিল। অর্থাৎ কলাত্থুর কন্যার আবির্ভাব ঘটে ঠিক সেই মুহূর্তে যখন সে অন্য একজনকে কল্পনা করছিল।
গল্পটি তাই একটি প্রতিস্থাপনের গল্প — হারানো প্রেমের জায়গায় একটি অলৌকিক প্রেম এসে বসে। সংক্ষিপ্ত পাঠে এই স্তরটি নেই; সেখানে রাঙাধন কেবল কলার থোর সংগ্রহ করছিল।
লক্ষণীয়, ধংমালা গল্পে আর ফিরে আসে না। তার নাম একবারই আসে, আর তারপর কাহিনি কলাত্থুর কন্যার।
কলার মোচা থেকে আসা একটি কন্যা আর্কাইভে একা নয়। অন্তত পাঁচটি পাঠে নায়িকা গাছ, ফুল বা পশু থেকে আসে, কিংবা সেখানেই ফিরে যায় — আর তারা পাঁচটি আলাদা জনগোষ্ঠীর।
গঠনটি দুই রকম, আর ফারাকটি দিকের।
প্রকৃতি থেকে সমাজে। কলাত্থুর কন্যা কলাবন থেকে ঘরে আসে। ত্রিপুরা বানর বউ-এ পরী বানর সেজে গাছে বসে থাকে, আর তীর ধরে নায়কের ঘরে আসে। ম্রো পুর ক্লাংওয়া সাংচিয়া-য় ব্যাঙ রাজার জামাই হয়।
সমাজ থেকে প্রকৃতিতে। ত্রিপুরা হরিণ-মাতা-য় মা ও ছেলেমেয়েরা শেষে মাছ হয়ে সমুদ্রে চলে যায়। ত্রিপুরা সারস বালিকা-য় মেয়ে আর ফিরে আসে না। হালাম চিনার কন্যা-য় বড় বোন পাখিদের ঝাঁকে মিশে “সারা জীবনের জন্য পাহাড়ের আরো উপরে শুণ্যে মিলিয়ে যায়”। আর ম্রো এক ডাইনীর গল্প-এ কিশোরীর স্পর্শে জল মাটি হয়ে যায়, আর সেখানে ফোটে একটি দোলনচাঁপা।
দুটি দলের অর্থও আলাদা। প্রকৃতি থেকে সমাজে আসা গল্পগুলো শেষ হয় বিয়েতে; সমাজ থেকে প্রকৃতিতে যাওয়া গল্পগুলো শেষ হয় হারানোয়।
আর কলাখু কন্যা পসন একইসঙ্গে দুটোই করে — মেয়েটি কলাগাছ থেকে আসে, তারপর মরে গিয়ে পদ্ম-লাউ-সুপারি হয়ে ফিরে আসে, আর শেষে আবার মানুষ হয়।
এই মোটিফের পূর্ণ তুলনা আছে আলাদা লেখায়: পশু বর ও পশু বউয়ের মোটিফ।
কলাখু কন্যা পসন-এর সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্যটি একটি সংখ্যার — সাতজন সুন্দরী পা দিয়ে ধান নেড়ে দিচ্ছেন, আর শব্দ পেয়ে তাঁরা কলাগাছগুলোতে একে একে মিলিয়ে যান।
আর্কাইভে সাতজনের এমন দল আরেকটি আছে, আর সেটি অন্য জনগোষ্ঠীর — ত্রিপুরা পরি বিবি চিনিন (সাত বোন পরী)। সেখানেও সাত বোন আকাশপথে উড়ে বেড়ায়, আর তাদের কাজও দেওয়া আছে: “তারা সন্ধ্যার তারা ফুটাতো আকাশে।”
দুটি পাঠে কাঠামোগত মিল তিনটি:
ফারাকটি পরিণতিতে। ত্রিপুরা পাঠে বানর-বউ অপমানিত হয়, বেত দিয়ে মার খায়, আর শেষে কাপড় বোনার পরীক্ষায় জিতে নিজেকে প্রমাণ করে। তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে মেয়েটি খুন হয়, আর তিনবার রূপ বদলে ফিরে আসে।
আর্কাইভে সাত সংখ্যাটি আরও কয়েক জায়গায় — ত্রিপুরা সাত বোন পরী-তে জমিদারের সাত ছেলে ও সাতটি তীর, ম্রো পুর ক্লাংওয়া সাংচিয়া-য় রাজার সাত মেয়ে, মারমা লুম্বোওয়াইং খইয়ক-এ সাত বন্ধু, আর ত্রিপুরা লাংগাই রাজা-য় সাতটি অজগর সাতটি মাথা নিয়ে।
[সাত সংখ্যার এই পুনরাবৃত্তি নিয়ে কোনো পঠিত উৎসে আলোচনা পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
তিনটি পাঠের কাহিনি আলাদা, আকার আলাদা, বলিয়ে আলাদা — তবু তিনটিতেই তিনটি জিনিস অপরিবর্তিত থাকে।
এক — নায়িকা কলাগাছ থেকে আসে। কলাগাছই তার ঘর, আর তিনটি পাঠেই সেই ঘর ভাঙা পড়ে — দুটিতে রাঙাধনের দা দিয়ে, আর তৃতীয়টিতে ছেলেটি গাছ কেটে সঙ্গে নিয়ে যায়।
দুই — সে নিজে উদ্যোগ নেয়। দুটি পাঠে সে নিজেই বলে তাকে ঘরে নিয়ে যেতে। তৃতীয়টিতে সে লুকিয়ে রান্না করে রাখে, আর ধরা পড়লে হাল ছেড়ে দিয়ে থেকে যায়। কোনো পাঠেই তাকে জোর করে আনা হয় না।
তিন — সে একটি শর্তে বাঁধা। দুটি পাঠে সে লোকচক্ষুর সামনে আসে না, আর বের হয় কেবল আকাশে তারা ওঠার পর। তৃতীয়টিতে সে হাঁটতে পারে না, আর তার রূপ লুকিয়ে রাখতে গায়ে কালি মাখাতে হয়।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্যটি সবচেয়ে কৌতূহলজনক, কারণ তা তিন পাঠে তিন রূপ নিলেও কাজ একই — কলাবনের কন্যা দিনের আলোয় বা মানুষের চোখের সামনে টেকে না।
আর সেই শর্তটি ভাঙা থেকেই দুটি পাঠে সংকট তৈরি হয়: দীর্ঘ পাঠে মামা তাকে দেখে ফেলেন, আর কলাখু কন্যা পসন-এ রাক্ষসী তাকে বটগাছের ডালে একা দেখে ফেলে।
আর্কাইভে তঞ্চঙ্গ্যা পাঠের সংখ্যা আট, মোট ১১,৬৮৫ শব্দ, আর গড় ১,৪৬০ — অর্থাৎ কলাত্থুর কন্যার তিনটি রূপ এই সংগ্রহের প্রায় অর্ধেক।
বাকি পাঁচটির মধ্যে দীর্ঘতম বাঘ ও শূকরের মিতালী (৩,৪২৯ শব্দ), যা আর্কাইভে আরও দুটি ভাষায় আছে — মারমা ও ম্রো। তিনটি রূপের তুলনা আছে বাঘ ও শূকরের মিতালি, তিন ভাষায়।
দ্বিতীয় দীর্ঘতম তেন্দেরার পচ্ছন (২,৮৪৩ শব্দ), আর সেটিও শুরু হয় ইতিহাস দিয়ে। প্রথম বাক্যেই একটি পদের ব্যাখ্যা: “জালিম্বর একজন আঙু। ‘আঙু’ হল সমাজপতি বা দলপতি। পরবর্তীতে কোন তালুকের অধিকারীকে আঙু বলা হয়।”
সেখানেও অভিবাসনের পথটি একই — জালিম্বর একদল লোক নিয়ে রোয়াঙ্গ (আরাকান) থেকে আনক (চট্টগ্রাম অঞ্চল) আসেন। অর্থাৎ দুটি তঞ্চঙ্গ্যা পাঠই একই অভিবাসনের পটভূমিতে বসানো।
তেন্দেরার পচ্ছন-এর শেষেও শব্দকোষ আছে — পচ্ছন (রূপকথা), চিজি (তুলনীয় খোকা), গুলা (ফল)। আর শেষ বাক্যটি কৌতুকের: “হয় নি এখন শেষ বয়সে হলে ক্ষতি কী?”
বাকি তিনটি ছোট — মানিক্যাব সিন্নী হানা (মানিকের বাপের সিরনী খাওয়া) (৮০৩ শব্দ), যা শেষ হয় মুরুব্বিদের সমস্বর শ্লেষে — “হায়রে মানিক্যার বাপ!”; এক বুড়ার গল্প (৬২৩ শব্দ), যেখানে বোকা বুড়ো শেষে বাঘের থাবায় মারা যায়; আর দাঁড়ভাঙা কাঁকড়ার গল্প (৯৬১ শব্দ)।
শেষটি আর্কাইভে আলাদা, কারণ এটি লোককথা নয় — এটি একজন সমকালীন লেখকের নিজের অভিজ্ঞতার লেখা, বাজার থেকে আনা জ্যান্ত কাঁকড়া দিয়ে শুরু, আর শেষে লেখকের পরিচয় ও ইমেইলসহ।
[এই পাঠটি রূপকথা বিভাগে কেন আছে, তা আর্কাইভের লেবেল থেকে স্পষ্ট নয় — যাচাই প্রয়োজন]
কলাখু কন্যা পসন-এ নায়ক একা কিছুই পায় না। প্রতিটি ধাপে তাকে পথ বলে দেন একজন বুড়ি — আর আশ্রয় পাওয়ার শর্তটি ছিল কেবল একটি ডাক।
দৃশ্যটি ছোট কিন্তু অর্থপূর্ণ। অজানা দেশে এক ঘরে বুড়িকে দেখে ছেলেটি তাঁকে নানী সম্বোধন করে ডাকতে থাকে, আর বুড়ি আহ্লাদিত হয়ে বলেন — “তুমি কে নাতি? আমাকে নানী ডাকলে, এতোদিন আমাকে নানী ডাকার কেউ ছিল না।”
আর আশ্রয়ের শর্ত সেখানেই শেষ: “তোমার যত দিন থাকতে ইচ্ছা থাক।”
এরপর বুড়ি দুটি কাজ করেন যা ছাড়া গল্পটি হতো না। প্রথম, তিনি ছেলেটিকে ধান পাহারা দিতে বসান — আর সেই পাহারাতেই সাত সুন্দরীর দেখা। দ্বিতীয়, বিদায়ের সময় তিনি নিজেই নির্দেশ দেন একটি কলাগাছ কেটে নিয়ে যেতে, আর “পাহাড়ে পৌছে একটি করে খোসা ছাড়াবে”।
অর্থাৎ বুড়ি জানতেন। পাঠ তা বলে না, কিন্তু নির্দেশটি এতই নির্দিষ্ট যে অন্য ব্যাখ্যা কঠিন।
আর গল্পের শেষেও একজন বুড়ি — অন্য একজন — মেয়েটিকে সুপারি থেকে বেরোনোর সময় ধরে ফেলেন, তার রূপ লুকাতে গায়ে কালি মাখান, আর নায়ক এলে তাকে লুকিয়ে থাকতে বলেন।
দুই বুড়ির ভূমিকাই রক্ষকের — একজন পথ দেখান, অন্যজন আড়াল করেন।
‘নানী’ ডাকের এই মোটিফটি আর্কাইভে আরেক জায়গায়ও আছে, আর তা অন্য ভাষায়। খেয়াং চোংক্লং পোচোং গুম খুই (তিন যুবকের গল্প)-এ যুবকটি বৃদ্ধাকে ডাকে “নানী নানী”, আর পাঠে খেয়াং শব্দটিও বন্ধনীতে দেওয়া — বেও বেও।
সেখানেও ফল একই: বৃদ্ধা তাকে নিজের কাপড় দিয়ে বিছানা করে দেন আর নিজের থাবিং চাপিয়ে রাখেন, আর তাতেই সে মন্ত্রের আক্রমণ থেকে বেঁচে যায়।
অর্থাৎ দুটি আলাদা জনগোষ্ঠীর দুটি গল্পে একই কাঠামো — অপরিচিত বৃদ্ধাকে আত্মীয় সম্বোধন করলে আশ্রয় ও রক্ষা মেলে। [এই মিল কোনো পঠিত উৎসে আলোচিত নয় — যাচাই প্রয়োজন]
আর্কাইভের সবচেয়ে ধীরগতির ফাঁদটি কলাখু কন্যা পসন-এ, আর তার উপকরণ কেবল একটি পানের খিলি।
রাক্ষসী প্রথমে তুলনা দিয়ে কথা শুরু করে — “তুমি সুন্দর নাকি আমি সুন্দর” — তারপর সম্বোধন বদলে আত্মীয়ে নামে: “ও নাতনী, আমাকে এক খিলি পান দাও না।”
লক্ষণীয়, এখানেও সেই একই আত্মীয়-সম্বোধন, কিন্তু উল্টো দিকে ব্যবহৃত — এবার ডাকটি আশ্রয় চাওয়ার নয়, ফাঁদ পাতার।
মেয়েটি বলে তার কাছে পান নেই। রাক্ষসীর সমাধানটি তাৎক্ষণিক ও আপাত-নিরীহ: বটগাছের পাতা আর বিচি দিয়ে খিলি বানিয়ে, গাছের আঠালো রস লাগিয়ে দিলেই হবে।
তারপর শুরু হয় ধৈর্যের খেলা। ছুড়ে দেওয়া খিলি সে তিনবার মাটিতে ফেলে দেয় — প্রতিবার দূরত্বটিকে অকেজো প্রমাণ করে — আর তারপর প্রস্তাবটি রাখে: “তুমি আমাকে হাতে হাতে দাও। তাহলে আর পড়ে যাবে না।”
ফাঁদের নকশাটি নিখুঁত, কারণ কোনো ধাপেই জোর নেই। প্রতিটি ধাপে মেয়েটি নিজে এগিয়ে আসে, আর শেষ ধাপে কেবল একটি হাত বাড়িয়ে দেয়।
হাত বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই টান — আর তারপর হত্যা, আর কুয়োর ভেতরে পুঁতে ফেলা।
পান-খিলির এই উপকরণটি পাহাড়ের দৈনন্দিন জীবনেরই। আর্কাইভে খিলি শব্দটি আরেকটি পাঠেও আছে — ত্রিপুরা বেদমান বুড়ো-য়।
আর বটগাছটিও আর্কাইভে ফিরে আসা একটি গাছ — আটটি পাঠে, আর অন্তত তিনটিতে সে গল্পের কেন্দ্রে: চাকমা সৃষ্টিকথায় গোজেন বটগাছের পাতায় আসন গেড়ে ধ্যানে বসেন, ম্রো এক দরিদ্র রাজপুত্রের কাহিনী-তে বটগাছের নিচেই রাক্ষসের সঙ্গে দেখা, আর এখানে বটগাছের ডালেই কলাখু কন্যা বসে থাকে।
তিনটি পাঠ পাশাপাশি রাখলে একটি জিনিস স্পষ্ট হয়: “কলার মোচার কন্যা” কোনো একক গল্প নয় — এটি একটি চরিত্র, আর তাকে ঘিরে অন্তত দুটি আলাদা কাহিনি চলে।
| যা পাঠে আছে | কলাত্থুর কন্যা | সুন্দরী কলাথোর কন্যা | কলাখু কন্যা পসন |
|---|---|---|---|
| তঞ্চঙ্গ্যা অভিবাসনের ইতিহাস | আছে | সংক্ষেপে (আরাকান থেকে আসা) | নেই |
| নায়কের নাম রাঙাধন | আছে | আছে | নেই |
| কলাগাছ কেটে প্রথম দেখা | আছে | আছে | নেই |
| মামার অভিমান | আছে | আছে | নেই |
| প্রথার জন্ম | আছে, দু’ভাগে | আছে, সংক্ষেপে | নেই |
| সাত সুন্দরী ও ধান নাড়া | নেই | নেই | আছে |
| প্রতিদ্বন্দ্বী বধূ | নেই | নেই | আছে |
| রূপান্তরের শিকল | নেই | নেই | আছে |
| শব্দার্থের টীকা | আছে | নেই | নেই |
দুটি পাঠের ফারাকটি বিস্তারের — একই ঘটনা, একটিতে ১,৩৭৬ শব্দে, অন্যটিতে ৩৭৮-তে। আর সংক্ষিপ্ত পাঠটি বাদ দিয়েছে ঠিক সেই অংশগুলো যা কাহিনির জন্য অপরিহার্য নয়: ইতিহাস, ধংমালার পর্ব, আর প্রকৃতির বর্ণনা।
তৃতীয় পাঠটির ফারাক কাহিনির। সেখানে কলাগাছ কাটার দৃশ্যটিই নেই — মেয়েটিকে পাওয়া যায় ধান পাহারা দিতে গিয়ে, আর কলাগাছটি কেটে নিয়ে যাওয়া হয় পথের নির্দেশ হিসেবে।
তিনটির মধ্যে কোনটি আগের, তা এই তিনটি পাঠ থেকে বলা যায় না। [তিনটি রূপের সম্পর্ক নিয়ে কোনো পঠিত উৎসে আলোচনা পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]
তিনটি পাঠের মধ্যে দুটিতে জুমচাষের পুরো চক্রটি নাম ধরে ধরে আছে, আর সেই বিবরণই গল্পের পটভূমি তৈরি করে।
সংক্ষিপ্ত পাঠের বর্ণনাটি সবচেয়ে গোছানো, আর তা কার্যত একটি ধাপের তালিকা: সনামালার ভাইয়েরা “জঙ্গল কেটে, আগুনে পুড়িয়ে জুম ক্ষেত তৈরি করত”; সনামালা ও রাঙাধন “আধাপোড়া জঙ্গল সাফ করে” ক্ষেত তৈরি করত; তারপর ধান ও অন্য ফসলের বীজ বোনা; ধান পাকলে ঘরে তোলা।
আর সেই সঙ্গে আরেকটি কাজের তালিকা — “তরকারি, লতাপাতা, সুতা ও তিল সংগ্রহ”। অর্থাৎ জুম কেবল ধানের নয়।
দীর্ঘ পাঠে ফসলের নামগুলো আরও নির্দিষ্ট — ধান, তিল, কার্পাস আর নানান ফসলের বীজ, তারপর “ক্ষেতের আগাছা বাছে”, আর শেষে ধান কেটে ঘরে তোলা।
কার্পাস শব্দটি লক্ষণীয়, কারণ আর্কাইভের চাকমা হঅ্’বি আর ধঅ্’বি-তেও জুমের ফসলের তালিকায় একই শব্দ আছে, আর সেখানে বন্ধনীতে অর্থ দেওয়া — জুম্ম তুলো।
শ্রমের ভাগটিও দুই পাঠে স্পষ্ট, আর তা সামাজিক তথ্য। বিধবা সনামালার জুমের ভারী কাজ — বন কাটা আর পোড়ানো — করে দেন তাঁর ভাইয়েরা, আর তিনি নিজে করেন সাফ করা, বোনা, আগাছা বাছা ও ফসল তোলা।
দীর্ঘ পাঠে আরেকটি বিশদও আছে: সনামালা বাবার পরিবারে থাকেন না, রাঙাধনকে নিয়ে “পৃথক ঘরে” থাকেন — অর্থাৎ বিধবা হয়েও তিনি আলাদা সংসার চালান।
আর রাঙাধন সম্পর্কে পাঠের মন্তব্যটি সৎ: সে মামাদের সঙ্গে জঙ্গল কাটতে যায়, মাকে “একটু আধটু” সাহায্য করে, কিন্তু “মন দিয়ে কাজ করেনা, করতে চায় না”।
পাহাড়ের জুমচাষ ও খাবার নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি খাবার: সিদোল, নাপ্পি আর রান্নার সাত পদ্ধতি-তে।
দুটি পাঠেই ঘটনাটি ঘটে ফাল্গুন মাসে, আর সেটি কোনো কাব্যিক পছন্দ নয় — জুমের কাজের সময়ানুক্রম।
জুমচাষে বন কাটার কাজ হয় শীতের শেষে, শুকনো মৌসুমে, যাতে কাটা জঙ্গল রোদে শুকিয়ে পরে পোড়ানো যায়। দুটি পাঠেই রাঙাধন ফাল্গুনে মামাদের সঙ্গে জুমের জঙ্গল কাটতে গিয়েছে।
আর ঠিক সেই সময়েই কলার মোচা ধরে। দীর্ঘ পাঠে দৃশ্যটি বিস্তারে আছে — “মনোরম তেল্যাকলার থোরগুলো বাতাসে দোলছে আর সোনালী রোদের ঝিলিক কচি কোমল মোলায়েম মসৃণ কলা পাতায় পড়ে ঝিকমিক করছে।”
অর্থাৎ গল্পের ঘটনাটি সম্ভব হয় কেবল একটি নির্দিষ্ট মাসে — যখন কলাগাছ কাটার কাজ আর মোচা ধরার সময় একসঙ্গে পড়ে।
সন্ধ্যার দৃশ্যটিও ফাল্গুনেরই, আর পাঠে আকাশের বর্ণনাটি সেই ঋতুর — “ফাল্গুনের নির্মল সুনীল আকাশে একটা করে অসংখ্য তারকা মিট মিট করে জ্বলে উঠল।”
শুকনো মৌসুমের পরিষ্কার আকাশেই তারা আগে ওঠে, আর তার উপরেই গল্পের সমাধান দাঁড়িয়ে আছে — মামা ভাত খেতে পারেন তারা ওঠার পর।
তাই গল্পটির দুটি কেন্দ্রীয় উপাদান — কলার মোচা আর আকাশের তারা — দুটোই একই মাসের।
কলাত্থুর কন্যা পাঠের একেবারে শেষে চারটি শব্দের টীকা দেওয়া আছে — আর্কাইভের খুব কম পাঠে এমন শব্দকোষ আছে।
| শব্দ | পাঠে দেওয়া অর্থ |
|---|---|
| পিনন | মহিলাদের নিম্নাঙ্গে পরনের কাপড় |
| খাদি | বক্ষবন্ধনী কাপড় |
| তেল্যাকলা | একপ্রকার কলা (মূল পাঠে: একপ্রকার জংলী কদলী) |
| কলাত্থুর | কলার মোচা |
পাঠের ভেতরেও কয়েকটি শব্দের অর্থ বন্ধনীতে দেওয়া — আঙু (সমাজপতি বা দলপতি, আরেকটি তঞ্চঙ্গ্যা পাঠে), আইফাই (ভালবাসা), চানা (বারান্দা), আনক (চট্টগ্রাম), রোয়াং (আরাকান), বড়গাঙ (কর্ণফুলী), মোইন (পাহাড়)।
শেষ শব্দটি লক্ষণীয়, কারণ তা জায়গার নামেই ব্যবহৃত — রাম মোইন ও সীতা মোইন, অর্থাৎ রাম পাহাড় ও সীতা পাহাড়।
পিনন ও খাদি তঞ্চঙ্গ্যা পোশাকের মূল দুটি অংশ, আর সেগুলো নিয়ে আলাদা লেখা আছে তঞ্চঙ্গ্যা পোশাকের স্বাতন্ত্র্য: পিনুইন, ফারদ্দরী ও গসার ভাগ-এ।
একটি বিষয় লক্ষণীয়: কলাত্থুর কন্যা পাহাড়ি পোশাকই পরে — তার পিনন ও খাদি কচি কলাপাতার রঙে সাজানো। অর্থাৎ প্রকৃতি থেকে আসা চরিত্রটিও সমাজের পোশাকেই আসে।
তিনটি পাঠের তিনজন আলাদা মানুষ, আর তিনজনের নামের সঙ্গে “তঞ্চঙ্গ্যা” পদবি।
শেষ পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। বর্ণিত মানে তিনি গল্পটি বলেছেন, লেখেননি — অর্থাৎ পাঠটি একটি মুখের বয়ানের প্রতিলিপি। আর্কাইভে এই শব্দটি আর মাত্র একটি পাঠে ব্যবহৃত, ত্রিপুরা সংগ্রহে।
সেটি হয়তো আকারের ফারাকটিও ব্যাখ্যা করে। মুখে বলা গল্প ৩৭৮ শব্দে শেষ হয়; বই থেকে আসা একই গল্প ১,৩৭৬ শব্দে।
তিনটি পাঠের কোনোটিতেই সংগ্রহের বছর বা স্থান নেই। তঞ্চঙ্গ্যা সংগ্রহের পূর্ণ তালিকা আছে পাহাড়ের রূপকথার পূর্ণ সূচিতে।
জুমজার্নালের আর্কাইভে তিনটি, তিনটিই তঞ্চঙ্গ্যা — কলাত্থুর কন্যা (১,৩৭৬ শব্দ), কলাখু কন্যা পসন (১,২৭২) আর সুন্দরী কলাথোর কন্যা (৩৭৮)। প্রথম ও তৃতীয়টি একই কাহিনির দুই রূপ; দ্বিতীয়টি আলাদা একটি গল্প।
কলার মোচা — পাঠের শেষে টীকায় অর্থটি দেওয়া আছে। একই জিনিসের তিন বানান আর্কাইভে আছে: কলাত্থুর, কলাথোর ও কলাখু। পাঠে মোচার বর্ণনাও আছে — “বেগুনী রঙের, তেলতেলে ও মসৃণ”।
ফাল্গুন মাসে জুমের জঙ্গল কাটার সময়। রাঙাধন কলার থোর সংগ্রহের জন্য কলাগাছ কাটতে থাকে, আর চারটি কাটার পর পঞ্চমটিতে কোপ দিতেই নারীকণ্ঠ শোনা যায় — তুমি আমার থাকবার জায়গা নষ্ট করে দিয়েছ। তারপর কন্যা নিজেই বলে, “আমাকে এখন তোমার সঙ্গে ঘরে নিয়ে যাও।”
মামা তাঁর ভাগিনার নববধূকে প্রথম যেদিন দেখেন, সেদিন আকাশে তারা না ওঠা পর্যন্ত ভাত খাওয়ার বিধান নেই। দীর্ঘ পাঠে নিয়মটি দু’ভাগে বলা — প্রথমে অবিবাহিত পুরুষদের জন্য, তারপর বিবাহিত পুরুষদেরও।
গল্প অনুযায়ী রাঙাধনের অবিবাহিত কনিষ্ঠ মামা ভাগিনার বউকে দেখে দুঃখ ও অভিমানে ভাত খাননি। তাঁর শর্ত ছিল, ভাগিনা-বউ নিজে ভাত বেড়ে দিলে তিনি খাবেন। কলাত্থুর কন্যা কলাবনে লুকিয়ে ছিল, আর বেরিয়ে আসে সন্ধ্যায় আকাশে তারা ওঠার পর।
আছে। পাঠ অনুযায়ী তাঁরা আরাকান থেকে এসে প্রথমে আলীকদমের তৈনছড়ির অববাহিকায় বসতি গড়েন, আর সেখান থেকে আসার কারণে চাকমা রাজার ভূমি অফিসে জুম-তৌজিতে তাঁদের “তৈনছর্য্যা চাকমা” নামে তৌজিভুক্ত করা হয়। পাঠের ভাষায়, সেই শব্দটিই কালক্রমে “তৈনচংগ্যা” হয়ে আজকের তঞ্চঙ্গ্যা — তবে পাঠ নিজেই একে “কারোর কারোর ধারণা” বলেছে।
আরাকান বা রোয়াং দেশ, কালাডেন গাঙ, কুমুখ্যাং পাড়া, আনক বা চট্টগ্রাম, আলীকদমের তৈনছড়ি, মাতামুহুরী নদী, শঙ্খ নদী, বড়গাঙ বা কর্ণফুলী, চন্দ্রঘোনা, রাম পাহাড় ও সীতা পাহাড়, ওয়াগ্গা, কাপ্তাই আর রাইংখং নদী।
সেখানে কলাগাছ কেটে প্রথম দেখার দৃশ্যই নেই, কোনো মামা নেই, আর কোনো প্রথা জন্মায় না। মেয়েটিকে পাওয়া যায় ধান পাহারা দিতে গিয়ে — সাতজন সুন্দরী পা দিয়ে ধান নেড়ে দিচ্ছিলেন, আর শব্দ পেয়ে তাঁরা কলাগাছগুলোতে মিলিয়ে যান।
মায়াবী রাক্ষসী মেয়েটিকে মেরে কুয়োয় পুঁতে ফেলার পর সেখানে ফোটে একটি লাল পদ্ম; তা ছিঁড়ে ফেলা হলে সেখানে গজায় লাউগাছ; লাউ রান্না করে ফেলে দেওয়া হলে জন্মায় সুপারি গাছ; আর সেই সুপারি থেকে মেয়েটি আবার বেরিয়ে আসে।
কোনো যুদ্ধে নয়। মেয়েটি রাতে তার পুরো কাহিনি বলতে থাকে, আর তা শুনে মায়াবী রাগে ফেটে পড়ে নিজের আসল রূপে ফিরে যায় এবং চিৎকার করতে করতে মারা যায়।
তিনজন আলাদা মানুষ — বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা (কলাত্থুর কন্যা, উৎস তঞ্চঙ্গ্যা রূপকথা লোককাহিনী ও কিংবদন্তী), রবিন তঞ্চঙ্গ্যা (কলাখু কন্যা পসন) আর পারমিতা তঞ্চঙ্গ্যা (সুন্দরী কলাথোর কন্যা)। শেষজনের ক্ষেত্রে পাঠে লেখা “কর্তৃক বর্ণিত”, অর্থাৎ তিনি গল্পটি বলেছেন।
তঞ্চঙ্গ্যা নারীর পোশাকের দুটি অংশ, আর পাঠের শেষে টীকায় অর্থ দেওয়া — পিনন হলো নিম্নাঙ্গে পরনের কাপড়, আর খাদি বক্ষবন্ধনী কাপড়। গল্পে কলাত্থুর কন্যার পিনন ও খাদি কচি কলাপাতার রঙে সাজানো।
রূপকথা। আর্কাইভের আরেকটি তঞ্চঙ্গ্যা পাঠের টীকায় সরাসরি লেখা আছে — “পচ্ছন – রূপকথা”। চাকমা ভাষায় একই শব্দের রূপ “পশ্চন”, আর সেখানে অর্থ দেওয়া “শিশুতোষ গল্প”।
দীর্ঘ পাঠে তার মামাতো বোন ধংমালা, বয়সে দু’বছরের বড়। রাঙাধন মনে মনে তাকে বউ কল্পনা করত আর মাকে জিজ্ঞেস করত কবে সে ঘরে আসবে। কিন্তু ধংমালার সঙ্গে অন্য একজনের “আইফাই” অর্থাৎ ভালোবাসা চলছিল। কলাত্থুর কন্যার আবির্ভাব ঘটে ঠিক সেই মুহূর্তে যখন রাঙাধন ধংমালাকেই কল্পনা করছিল।
অন্তত পাঁচটি, পাঁচটি আলাদা জনগোষ্ঠীর — ত্রিপুরা বানর বউ ও হরিণ-মাতা ও সারস বালিকা, হালাম চিনার কন্যা, আর ম্রো এক ডাইনীর গল্প, যেখানে কিশোরীর স্পর্শে জল মাটি হয়ে দোলনচাঁপা ফোটে। প্রকৃতি থেকে সমাজে আসা গল্পগুলো শেষ হয় বিয়েতে, আর সমাজ থেকে প্রকৃতিতে যাওয়াগুলো হারানোয়।
আটটি, মোট ১১,৬৮৫ শব্দ, গড় ১,৪৬০। এর তিনটিই কলার মোচার কন্যার গল্প — অর্থাৎ সংগ্রহের প্রায় অর্ধেক। বাকিগুলোর মধ্যে আছে বাঘ ও শূকরের মিতালী, তেন্দেরার পচ্ছন, মানিক্যাব সিন্নী হানা ও এক বুড়ার গল্প।
এই পাতার সব তুলনা জুমজার্নালের আর্কাইভে প্রকাশিত তিনটি পাঠের নিজের লেখা থেকে করা — শব্দসংখ্যা, ঘটনাক্রম, সংলাপ, টীকা, বলিয়ের নাম ও উৎসের নামসহ। তিনটি পাঠই সম্পূর্ণ পড়া হয়েছে, আর উদ্ধৃতিগুলো হুবহু।
সব ব্যক্তির নাম, স্থানের নাম, জনগোষ্ঠীর নাম ও তঞ্চঙ্গ্যা ভাষার শব্দ আর্কাইভের পাঠে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে — বানানের ভিন্নতাসহ, কারণ সেটিও একটি তথ্য। তুলনাটি তিনটি পাঠের ঘটনাক্রম ধরে করা; কোনো পাঠকে অন্যটির চেয়ে প্রামাণিক বলা হয়নি। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।
প্রসঙ্গ:তঞ্চঙ্গ্যা, তঞ্চঙ্গ্যা রূপকথা, রূপকথা, লোককাহিনী
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।