Jumjournal Logo

সতীশচন্দ্র ঘোষের ‘চাকমা জাতি’ (1909): একশো বছর পরেও যে বই উদ্ধৃত হয়

Last updated Nov 3rd, 2026

0

সতীশচন্দ্র ঘোষের ‘চাকমাজাতি’ বইয়ের 1909 সালের নামপত্র, পাশে রাঙামাটি রাজবাড়ি থেকে রাজা ভুবনমোহন রায়ের ছাপা চিঠি

১৩১৬ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ 1909 সালে কলকাতা থেকে বেরোয় চার শতাধিক পাতার একটি বই — সতীশচন্দ্র ঘোষের ‘চাকমা জাতি’, নামপত্রে পুরো নাম চাক্‌মাজাতি (জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত)। বইটি বাংলা ভাষায় চাকমাদের নিয়ে লেখা প্রথম পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ হিসেবে উল্লেখিত হয়, আর একশো বছরেরও বেশি পরে চাকমা ইতিহাস, তঞ্চঙ্গ্যা উৎপত্তি, চাকমা লিপি, বিয়ের দাভা কিংবা ধর্মগ্রন্থ আঘরতারা নিয়ে লেখায় এখনো এর পাতা উদ্ধৃত হয়। একই সঙ্গে চাকমা ইতিহাসবিদ অশোক কুমার দেওয়ান এই বইকেই চাকমা ইতিহাসের বহু ভুল ধারণার উৎস বলে চিহ্নিত করেছেন।

এই লেখায় সতীশচন্দ্র ঘোষ চাকমা জাতি বই নিয়ে তিনটি কাজ করা হয়েছে: বইয়ে আসলে কী আছে, তা মূল বইয়ের পাতা ধরে; পরের লেখকেরা কে কোন কাজে বইটি উদ্ধৃত করেছেন, তা জুমজার্নালের আর্কাইভের লেখাগুলো থেকে; আর নাম-ঠিকানাসহ যাঁরা বইটির সমালোচনা করেছেন, তাঁরা ঠিক কী বলেছেন। কোন পক্ষ ঠিক, সে বিচার এখানে করা হয়নি — দুই পক্ষের কথা পাশাপাশি রাখা হয়েছে।

সূচিপত্র

  1. সতীশচন্দ্র ঘোষ কে ছিলেন, বইটি কীভাবে লেখা হলো
  2. বইটি কবে, কোথা থেকে, কার টাকায় ছাপা হয়
  3. চাকমা জাতি বইয়ের সংস্করণ ও অনলাইন কপি
  4. ‘চাকমা জাতি’ বইয়ে কী আছে: বিশটি পরিচ্ছেদের মানচিত্র
  5. বইয়ের ইতিহাস-অংশ যা দাবি করে
  6. সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতির বিবরণ
  7. 1909 সালের পাঠকেরা বইটি নিয়ে কী লিখেছিলেন
  8. পরের লেখকেরা বইটি কে কোন কাজে উদ্ধৃত করেছেন
  9. অশোক কুমার দেওয়ানের সমালোচনা
  10. আরও যাঁরা আপত্তি তুলেছেন
  11. সমালোচকেরাও বইটির কোন অংশকে মূল্যবান বলেন
  12. সচরাচর জিজ্ঞাসা
  13. যা এখনো জানা যায়নি
  14. তথ্যসূত্র

সতীশচন্দ্র ঘোষ কে ছিলেন, আর ‘চাকমা জাতি’ বইটি কীভাবে লেখা হলো

সতীশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন রাঙামাটি গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক, বাঙালি, চাকমা নন। বইয়ের ভূমিকা ‘নিবেদনম্‌’-এ তিনি নিজেই লিখেছেন, ওই চাকরির অষ্টম বছরে বইটি শেষ হয়, আর উপাদান জোগাড়ে লেগেছিল প্রায় চার বছর। লক্ষ্য হিসেবে লিখেছেন “অজ্ঞাত জনমণ্ডলীকে দশের সমক্ষে আনিয়া পরিচিত” করা।

লেখার শুরুর গল্পটা তিনি দিয়েছেন ব্যক্তিগত সুরে। ছোটবেলায় মায়ের কাছে চাকমা রানি কালিন্দীর কথা শুনে তাঁর জীবনী জানার আগ্রহ জন্মায়; রাঙামাটিতে শিক্ষকতা নিয়ে আসার পর সেই আগ্রহ ফিরে আসে। প্রথমে তিনি পুরো পার্বত্য জেলার ইতিহাস লেখার কথা ভেবেছিলেন, কিন্তু স্থানীয় প্রধান শাসনকর্তা নিজেই সে কাজে হাত দিয়েছেন শুনে সরে আসেন, আর কালিন্দী রানি, তাঁর রাজবংশ ও পুরো চাকমা সমাজের বিবরণে মন দেন।

কাজটা সহজ ছিল না, সে কথাও তিনি লুকাননি। ‘নিবেদনম্‌’-এ আছে, যাঁদের পরিচয় তুলে ধরতে চাইছিলেন তাঁরা “কেমন এক ভীতিপূর্ণ সঙ্কোচ” বোধ করতেন, আর তাঁদের অভাব-অভিযোগের খবর নিতে গিয়েও বাধা পেয়েছেন। বর্মি ভাষা জানতেন না, তাই সহকর্মী শিক্ষক মঙ আংজাইয়ের সাহায্য নিয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন। উপাদান সংগ্রহে তাঁর প্রধান সহায় হিসেবে নাম দিয়েছেন জিতেন্দ্রনাথ তালুকদারের; কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন অবিনাশচন্দ্র দেওয়ান, মধুচন্দ্র দেওয়ান, ডেপুটি ইন্সপেক্টর গগনচন্দ্র বড়ুয়া ও সুপারিনটেন্ডেন্ট অফিসের কর্মী শ্যামাচরণ বিশ্বাসকে। ছবি জোগাড় করে দিয়েছিলেন কুমার রমণীমোহন রায় ও মিশনারি ডাক্তার জি. ও. টেইলার।

সতীশচন্দ্র ঘোষের জন্ম-মৃত্যুর সাল তাঁর নিজের বইয়ে নেই। আমাদের আর্কাইভে নন্দলাল শর্মার লেখা চাকমা জাতির ইতিহাস চর্চা লেখাটি তাঁর জীবনকাল দিয়েছে 1881–1929। সেখানে পদবি ছাপা হয়েছে “শেষ”, যা ছাপার ভুল — একই বাক্যে রাঙামাটি স্কুলের শিক্ষকতা ও 1909 সালের ‘চাকমা জাতি’র উল্লেখ আছে।

1909 সালের সংস্করণের নামপত্রে লেখকের নামের পরে আছে “এম্‌, আর, এ, এস্‌”। অশোক কুমার দেওয়ান লিখেছেন, এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে “Royal Asiatic Society”র সদস্যপদ দিয়ে সম্মানিত করা হয় (ইতিহাস বিচার, পৃ. 15); বইয়ের নামপাতায় তাঁর নামের পরে “এম্‌, আর, এ, এস্‌” লেখা আছে, আর শরচ্চন্দ্র দাসও ভূমিকায় তাঁকে সোসাইটির “বিশিষ্ট সভ্য” বলেছেন।

বইটি কবে, কোথা থেকে, কার টাকায় ছাপা হয়

‘চাকমা জাতি’ ছাপা হয় 1909 সালে, কলকাতায়, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাবলীর 24তম খণ্ড হিসেবে; প্রকাশক শ্রীসারদাচরণ ঘোষ, 17 নং ঢাকাপটি, বড়বাজার। ভূমিকা লেখেন তিব্বত-ভ্রমণকারী শরচ্চন্দ্র দাস। ছাপার খরচের বড় অংশ দেন চাকমা রাজা ভুবনমোহন রায়, সঙ্গে কৃষ্ণচন্দ্র দেওয়ান ও ত্রিলোচন দেওয়ান।

বইয়ের প্রকাশনা-পাতায় একটি অস্বাভাবিক তথ্য খোলাখুলি ছাপা আছে: বইটি পাঁচটি ছাপাখানা ঘুরে বেরিয়েছে — প্রথম আট ফর্মা কমলা প্রিন্টিং ওয়ার্কসে, পরের সাত ফর্মা ফাইন আর্ট প্রেসে, ছাব্বিশ ফর্মা কার্তিক প্রেসে, এক ফর্মা কলিকাতা প্রেসে, বাকিটা মেটকাফ প্রেসে। ‘নিবেদনম্‌’-এ লেখক জানিয়েছেন, ছাপাখানার “লৌহকবল” থেকে বই উদ্ধার করতে প্রায় দেড় বছর লেগেছে, আর এক প্রেসের আচরণ নিয়ে তিনি লিখেছেন, তা “বলিতে ঘৃণা হয়”। এই গোলমালের কারণেই বইয়ের শুরুতে শুদ্ধিপত্র যোগ করতে হয়।

দাম দুই রকম: সোনা-রুপার ছাপে চকচকে বাঁধাই তিন টাকা, পেস্টবোর্ড বাঁধাই আড়াই টাকা। ‘নিবেদনম্‌’-এর তারিখ “১লা আগষ্ট, ১৯০৯”।

বই হওয়ার আগে এর কয়েকটি পরিচ্ছেদ প্রবন্ধ আকারে বেরিয়েছিল। লেখকের নিজের তালিকায় পত্রিকাগুলো: ভারতী, প্রবাসী, সাহিত্য, কল্পতরু, বৌদ্ধবন্ধু ও সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা। কারণ হিসেবে লিখেছেন, যাতে “ভ্রমপ্রমাদ বিশোধিত” হয়। আমাদের আর্কাইভের কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা-বিষয়ক লেখাটি একটি প্রবন্ধের নির্দিষ্ট ঠিকানাও দিয়েছে: ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকা’র ত্রয়োদশ বর্ষ চতুর্থ সংখ্যায় (১৩১৪) “চাকমাদিগের ভাষা তথ্য”।

রাঙামাটি রাজবাড়ি থেকে রাজা ভুবনমোহন রায় বইটি পেয়ে যে চিঠি লেখেন, সেটিও বইয়ের শুরুতে ছাপা আছে: “ইহা পড়িতে পড়িতে মনে হইয়াছিল, কেহ যেন পটবিশেষে আমাদের চাকমাজাতির আগত বিগত সকল ঘটনাই অতি নিখুঁতরূপে অঙ্কিত করিয়া সম্মুখে ধরিয়াছেন।” ‘নিবেদনম্‌’-এ লেখক জানিয়েছেন, রাজা মূল পাণ্ডুলিপিও দেখে দিয়েছিলেন, আর বইটি তাঁকেই উৎসর্গ করা।

‘চাকমাজাতি’ বইয়ের 1909 সালের সংস্করণে লেখকের ভূমিকা ‘নিবেদনম্‌’-এর প্রথম ছাপা পাতা
1909 সালের সংস্করণে লেখকের ‘নিবেদনম্‌’-এর প্রথম পাতা। এখানেই তিনি রানি কালিন্দীর প্রতি আগ্রহ, রাঙামাটির শিক্ষকতা আর চার বছরের উপাদান সংগ্রহের কথা লিখেছেন। ছবি: সতীশচন্দ্র ঘোষ, চাকমাজাতি (কলিকাতা, 1909) · পাবলিক ডোমেইন · Digital Library of India / Internet Archive

চাকমা জাতি বইয়ের সংস্করণ, অনুবাদ ও অনলাইন কপি

বইটির অন্তত তিনটি প্রকাশের খবর পাওয়া যায়: 1909 সালের মূল সংস্করণ, কলকাতার অরুণা প্রকাশনের জুলাই 2000-এর পুনর্মুদ্রণ, আর নন্দলাল শর্মার লেখা অনুযায়ী 2009 সালের একটি সংস্করণ। একটি ইংরেজি অনুবাদের কথাও দুই লেখক বলেছেন, কিন্তু সেই অনুবাদের কোনো কপি পাওয়া যায়নি।

1909, মূল সংস্করণ। ভারতের ডিজিটাল লাইব্রেরির একটি স্ক্যান Internet Archive-এ আছে, কুচবিহারের নর্থ বেঙ্গল স্টেট লাইব্রেরির কপি থেকে; মেটাডেটায় পাতা 464, অধিকার “In Public Domain”। মূল সংস্করণটি এখানে পড়া যায়।

2000, অরুণা প্রকাশন, কলকাতা। প্রকাশক শ্যামল ভট্টাচার্য্য, প্রথম সংস্করণ জুলাই 2000; নামপত্রে রঞ্জিত সেনের নাম আছে, আর শুরুতে যোগ হয়েছে প্রায় তেইশ পাতার “নবসংস্করণের ভূমিকা”। এই কপিটিও ত্রিপুরার বীরচন্দ্র স্টেট সেন্ট্রাল লাইব্রেরি থেকে স্ক্যান হয়ে Internet Archive-এ রাখা আছে (442 পাতা)। আমাদের আর্কাইভের চাকমাদের প্রাচীনতম লিখিত ও মানচিত্র-প্রমাণ লেখাটি পৃষ্ঠাসংখ্যা দিয়েছে এই পুনর্মুদ্রণ ধরে।

2009। নন্দলাল শর্মা লিখেছেন, “শতবর্ষ পরে ২০০৯ সালে গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ” প্রকাশ করেন সোনামনি চাকমা ও মমতা চাকমা। অরুণা প্রকাশনের 2000 সালের পুনর্মুদ্রণ থাকায় দুই তথ্যে অমিল আছে: অরুণা নিজের কপিকে “প্রথম সংস্করণ” বলেছে, নন্দলাল শর্মা 2009-এরটিকে “দ্বিতীয় সংস্করণ”। 2009 সংস্করণের প্রকাশনা-তথ্য পাওয়া যায়নি।

ইংরেজি অনুবাদ। নন্দলাল শর্মা লিখেছেন, “১৯১১ সালে বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়”, আর তথ্যসূত্র দিয়েছেন “সেলিনা ১৯৯৭:৩০১”। অশোক কুমার দেওয়ানও লিখেছেন, “সতীশ ঘোষের চাকমা জাতির ইংরেজী অনুবাদও প্রকাশিত হয়” — তবে সাল দেননি। অনুবাদকের নাম বা অনুবাদের কোনো গ্রন্থাগার-তালিকা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

জুমজার্নালের ইবুক লাইব্রেরিতে বইটি এখনো নেই; সেখানে আছে এর পরের প্রজন্মের কয়েকটি বই, যেমন সুপ্রিয় তালুকদারের ‘চম্পকনগর সন্ধানে: বিবর্তনের ধারায় চাকমা জাতি’ ও নন্দলাল শর্মার ‘চাকমা জাতির লোকসাহিত্য চর্চা ও অন্যান্য’।

‘চাকমা জাতি’ বইয়ে কী আছে: বিশটি পরিচ্ছেদের মানচিত্র

বইটিতে বিশটি পরিচ্ছেদ, একটি উপসংহার, পাঠক ও পত্রিকার মতামতের একটি অংশ আর তিন ভাগের পরিশিষ্ট আছে। ভূমিকা-লেখক শরচ্চন্দ্র দাস একে তিন খণ্ডে ভাগ করে দেখিয়েছেন: প্রথম থেকে চতুর্থ পরিচ্ছেদ “ইতিবৃত্ত ভাগ”, পঞ্চম থেকে ত্রয়োদশ “সামাজিক ভাগ”, আর বাকিটা “সভ্যতা ভাগ”।

নিচের ছকটি বইয়ের সূচিপত্র থেকে নেওয়া (পৃষ্ঠাসংখ্যা অরুণা প্রকাশনের পুনর্মুদ্রণের সূচি অনুযায়ী, যেখানে স্ক্যানে পড়া গেছে):

পরিচ্ছেদবিষয়শুরু পৃষ্ঠা
প্রথমজাতীয় পরিচয়, প্রাচীন কাহিনী1
দ্বিতীয়আবাসস্থান, লোকসংখ্যা, বংশ বিভাগ33
তৃতীয়রাজাবলী ও তাঁদের কার্যালোচনা; রানি ও কুমারদের জীবনী50
চতুর্থরাজনীতি ও শাসনপ্রথা, রাজকীয় উৎসব; তালুক ও তালুক দেওয়ান; মৌজা গঠন ও হেডম্যান নিয়োগ; প্রধান ব্যক্তিদের সংক্ষিপ্ত জীবনী105
পঞ্চমশ্রমবিভাগ ও কুলমর্যাদা: খীসা, কারবারী, ওঝা ও রায়ত—
ষষ্ঠজাতীয় চরিত্র, স্ত্রী-স্বাধীনতা, দাম্পত্য প্রেম133
সপ্তমধর্ম ও পর্বনিয়ম142
অষ্টমসমাজবিধি ও স্ত্রী-আচার—
নবমজন্ম থেকে বিবাহ পর্যন্ত দশকর্ম; অন্ত্যেষ্টি, হাড়ভাসান, শ্রাদ্ধ—
দশমপ্রাথমিক সংস্কার ও ভবিষ্যৎ-ধারণা; প্রবাদবাক্য186
একাদশআহার্য ও পানীয়195
দ্বাদশচিকিৎসা ও শুশ্রূষা205
ত্রয়োদশপোশাক-পরিচ্ছদ, গহনা ও আবশ্যকীয় সরঞ্জাম216
চতুর্দশকৃষি: জুম ও হাল চাষ; ধান, কার্পাস ইত্যাদি223
পঞ্চদশশিল্প: বস্ত্রশিল্প, বেতের বুনন, নৌকা গঠন—
ষোড়শপশুপালন ও শিকার243
সপ্তদশঅন্যান্য সাধারণ ব্যবসা247
অষ্টাদশশিক্ষা ও স্ত্রীশিক্ষা; ভাষা, বর্ণমালা, অন্য ভাষার সঙ্গে সাদৃশ্য252
উনবিংশকবি ও কবিতা, বারমাস, ছড়া, হেঁয়ালি267
বিংশক্রীড়া, কৌতুক (নাচ, বাজিপোড়ানো), বাদ্য ও সংগীত295
উপসংহারবাঙালি-সংস্রব, মিশনারি-চেষ্টা, ইংরেজ অধিকারের ফল318
মতামতপাঠক ও পত্রিকার চিঠি-মন্তব্যের অংশ334
পরিশিষ্টপার্বত্য চট্টগ্রামের শাসনকর্তাদের তালিকা; 1900 সালের বিধান (শাসনবিধি) ও নিয়মাবলির বাংলা অনুবাদ; মৌজা-পরিচয়345

সূচি দেখলে বোঝা যায়, নাম ‘চাকমা জাতি’ হলেও বইটি কেবল ইতিহাস নয় — রান্না থেকে চিকিৎসা, নৌকা গড়া থেকে বারমাসি গান পর্যন্ত গোটা সমাজের এক বিবরণী। শরচ্চন্দ্র দাস ভূমিকায় আরও একটি দিক ধরিয়ে দিয়েছেন: চাকমাদের লক্ষ্য করে লেখা হলেও এতে “সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক তত্ত্বও” মোটা দাগে আলোচিত হয়েছে। পরিশিষ্টের শাসনকর্তাদের তালিকা আর 1900 সালের শাসনবিধির বাংলা অনুবাদ এর প্রমাণ — ‘নিবেদনম্‌’ অনুযায়ী অনুবাদ ছাপার অনুমতি দিয়েছিলেন বিভাগীয় কমিশনার।

অরুণা পুনর্মুদ্রণের নতুন ভূমিকা বইয়ের পাদটীকার পরিসরের দিকেও দৃষ্টি দিয়েছে — বুদ্ধমূর্তি, চট্টগ্রামের ইসলামাবাদ নাম, কর্ণফুলী নদীর ভূগোল পর্যন্ত পাদটীকায় এসেছে। একই ভূমিকা কুকিদের সম্পর্কে তথ্য আর চাকমা নারীর স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনাকে (পৃ. 139–41) বইয়ের “দুর্লভ” অংশ বলেছে।

‘চাকমা জাতি’ বইয়ের ইতিহাস-অংশ যা দাবি করে

বইয়ের প্রথম চার পরিচ্ছেদ চাকমাদের উৎপত্তি ও রাজবংশের ইতিহাস সাজিয়েছে। মূল দাবিগুলো হলো: চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদি বাসিন্দা নন; বর্মিরা যাদের “ছাক্‌” বা “ছেক্‌” বলে, তারা চাকমা; আর তাই আরাকানি পুঁথি ‘দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদ ফুং’-এ বর্ণিত ছাকদের যুদ্ধ-পরাজয়ের কাহিনী চাকমা ইতিহাসেরই অংশ। এই শেষ দাবিটিই পরে সবচেয়ে বেশি সমালোচিত হয়েছে।

“ছাক” নামের প্রশ্ন। বইয়ে লেখা আছে, “ব্রহ্মদেশীয়েরা ইহাদিগকে ‘ছাক্‌’ বা ‘ছেক্‌’ নামে নির্দেশ করেন। কুকিরাও ডাকে ‘টুইছেক্‌’।” ঘোষ ব্যাখ্যা করেছেন, কুকি ভাষায় “টুই” মানে জল, অর্থাৎ জলতীরবাসী জাতি। নিজেই যোগ করেছেন, এই ব্যাখ্যা ক্যাপ্টেন লুইনের মত অনুসরণ করে।

মোগল-উৎপত্তির জনশ্রুতি। ঘোষ লিখেছেন, “মঘেরা বলে, ইহারা মোগল বংশধর।” চাকমা রাজাদের “খাঁ” উপাধি, কামানের নাম কালু খাঁ ও ফতে খাঁ, আর কিছু “মুসলমানী সংস্কার” ও “আদব-কায়দা” প্রবেশের কথা তিনি মেনে নিয়েছেন। কিন্তু আজাদ বুলবুলের লেখার পাঠ অনুযায়ী, এসব যুক্তিতে চাকমাদের মোগল-উদ্ভূত প্রমাণের চেষ্টাকে ঘোষ সঠিক বলেননি (ঘোষ, 1909, পৃ. 5–6)।

দৈংনাক বা তঞ্চঙ্গ্যার উৎপত্তি। বইয়ের 20–33 পৃষ্ঠার একটি কাহিনী অনুযায়ী 615 মঘাব্দে (1333–34 খ্রিস্টাব্দ) আরাকানাধিপতি মেংগদি চাকমা রাজা ইয়ংজকে কৌশলে পরাজিত করে দশ হাজার প্রজাকে বন্দি করেন, আর তাদের এংখ্যং বা ইয়ংখ্যং নামক স্থানে বসতি দিয়ে “দৈংনাক” নাম দেওয়া হয়। এই অংশটি বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা তাঁর তঞ্চঙ্গ্যা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লেখায় লম্বা উদ্ধৃতিতে তুলে দিয়েছেন।

চাকমা রাজাদের মোহর। ঘোষ চাকমা রাজাদের কয়েকটি মোহরের ছাপ ছেপেছেন। আমাদের আর্কাইভের চাকমাদের প্রাচীনতম প্রমাণ-বিষয়ক লেখা এর পাঠ দিয়েছে: দুটি রাজকীয় প্রতীকচিহ্ন, আটটিতে ফারসি লেখা, যার প্রাচীনতমটিতে “ফতে খাঁ ১১৩৩ হিং”। একই লেখা জানিয়েছে, ঘোষ একটি বংশলতিকা ছেপেছেন যা “গুনাই ওয়াংঝা” থেকে শুরু হয়ে রাজা ভুবনমোহন পর্যন্ত আসে।

আদি ধর্ম ও বর্ণমালা। ভূমিকায় শরচ্চন্দ্র দাস বইয়ের দুটি দাবি আলাদা করে প্রশংসা করেছেন: তিব্বতের মহাযান ধর্মই চাকমাদের আদি ধর্ম, আর প্রাচীন বাংলা বর্ণমালার সঙ্গে বর্মি ও চাকমা বর্ণের সাদৃশ্য। দ্বিতীয় দাবিটিকে তিনি বলেছেন “এক অপূর্ব তথ্য”।

সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতির বিবরণে বইটি কী বলে

বইয়ের বড় অংশ — পঞ্চম থেকে বিংশ পরিচ্ছেদ — 1900-এর দশকের চাকমা সমাজের পর্যবেক্ষণ: পদবি ও শ্রমবিভাগ, বিয়ে ও অন্ত্যেষ্টি, খাদ্য, চিকিৎসা, পোশাক, জুম চাষ, তাঁত, নৌকা, গান ও খেলা। পরের লেখকেরা বইটির এই অংশই সবচেয়ে বেশি তথ্যের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন, আর এখানেই কিছু বর্ণনাকে চাকমা লেখকেরা অতিরঞ্জিত বা অপমানজনক বলেছেন।

ভাষা। অষ্টাদশ পরিচ্ছেদে ঘোষ লিখেছেন: “চাকমাদিগের মূল ভাষা বাঙ্গালা, তবে ইহা প্রচলিত বাঙ্গালার তুলনায় নিতান্ত বিকৃত, এবং সংক্ষিপ্ত কম নহে। ইংরাজ রাজপুরুষেরা ইহাকে ‘চাক্‌মা-বাঙ্গলা’ নামে অভিহিত করিয়াছেন।” কারণ হিসেবে তিনি পূর্ববঙ্গে বাংলার “বিকৃতি” আর মঘ, ত্রিপুরা ও “মুসলমানী” ভাষার সঙ্গে মিশ্রণের কথা বলেছেন। একই পরিচ্ছেদে চাকমা বর্ণমালা ছাপা হয়েছে; আমাদের আর্কাইভে তনয় দেওয়ানের লেখা অনুযায়ী কৃষ্টচন্দ্র দেওয়ান যে বর্ণমালা গ্রিয়ারসনকে পাঠান, তা 1903 সালে ‘লিংগুইস্টিক সার্ভে অব ইন্ডিয়া’য় ছাপা হয়, আর “সতীশ ঘোষের চাকমা জাতি বইয়েও চাকমা বর্ণ দেখা যায়”। চাকমা লিপির ইতিহাসে বইটির জায়গা নিয়ে আরও আছে আমাদের চাকমা লিপি (অঝাপাত)-বিষয়ক লেখায়।

ধর্মগ্রন্থ। সপ্তম পরিচ্ছেদে ঘোষ লিখেছেন, চাকমাদের ধর্মশাস্ত্রের নাম “আগরতারা” অর্থাৎ “পৌরাণিক শাস্ত্র” — “আগর” মানে পূর্বের, “তারা” মানে শাস্ত্র।

শিক্ষা। মেয়েরেগা ছদ্মনামের এক লেখকের উদ্ধৃতি অনুযায়ী, ঘোষ সরকারি কাগজপত্র থেকে লিখেছেন যে প্রায় অর্ধলক্ষ চাকমার মধ্যে 2,156 জন পুরুষ ও 44 জন নারী শিক্ষিত; তাঁদের মধ্যে 788 জন পুরুষ ও 24 জন নারী বাংলা, আর 55 জন পুরুষ ইংরেজি জানতেন।

বিয়ের দাভা। এডিট দেওয়ানের লেখায় উদ্ধৃত হয়েছে, ঘোষের হিসাবে দাভার পরিমাণ 50–60 তোলা রুপার গহনা এবং 100–120 টাকা পর্যন্ত হতে পারত।

গঝা ও গুত্থি। আমাদের আর্কাইভের চাকমা জাতি লেখায় সঞ্জীব চাকমা জানিয়েছেন, ঘোষ “গঝা”-কে গোষ্ঠী হিসেবে লিখেছেন, অন্যদিকে অশোক কুমার দেওয়ান শব্দটির উৎস আরাকানি “গং” (দলনেতা) আর “ছা” (সন্তান) থেকে দেখিয়েছেন।

উপসংহার। শেষ অংশে ঘোষ বাঙালি-সংস্রব, মিশনারিদের কাজ ও ইংরেজ শাসনের ফল আলোচনা করেছেন। নিজের অবস্থান নিয়ে লিখেছেন: “আমি নিজেও বাঙ্গালী”। শরচ্চন্দ্র দাসের ভূমিকা অনুযায়ী, বইয়ের ইতিহাস-আলোচনা “সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ভাবে চলিয়াছে” — দাসের আশা ছিল, তাই বইটি “রাজা-প্রজা, স্বজাতি-বিজাতি সকলের” প্রীতি পাবে।

1909 সালের পাঠকেরা চাকমা জাতি বই নিয়ে কী লিখেছিলেন

বইয়ের শেষে “মতামত” নামে প্রায় দশ পাতা জুড়ে লেখক নিজেই পাঠক ও পত্রিকার চিঠি-মন্তব্যের অংশ ছেপেছেন। মন্তব্যগুলো প্রায় সবই প্রশংসা — চাকমা সমাজের প্রতিনিধি থেকে কলকাতার সাহিত্যিক পর্যন্ত। লেখকের নিজের বাছাই করা বলে এই অংশ সমালোচনার নমুনা নয়, তবে তখন কারা বইটি পড়েছিলেন, তার তালিকা হিসেবে কাজে লাগে।

  • অবিনাশচন্দ্র দেওয়ান, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্কুলসমূহের ডেপুটি ইন্সপেক্টর: “আমাদের প্রত্যেক বালকের হস্তে ইহার এক এক খণ্ড দেখিতে পাইলে বুঝিব, সমাজ প্রাচীনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করিতে শিখিয়াছে।”
  • দীনেশচন্দ্র সেন: একটি “নগণ্য” বলে পরিচিত জাতিকে নগণ্য মনে না করে সতীশবাবু “বিপুল উদ্যমের সহিত” এই ইতিহাস লিখেছেন।
  • জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর: “শুধু রাজাদের বংশাবলী ও রাজত্বকালের বিবরণ — দেশের প্রকৃত ইতিহাস নহে।” তাঁর মতে ঘোষের প্রণালীই “ইতিবৃত্ত লিখিবার প্রকৃত প্রণালী”।
  • বিজয়চন্দ্র মজুমদার: বইটি ইংরেজিতে লেখা হলে নৃতাত্ত্বিক সভা লেখককে সম্মানিত করত; সঙ্গে আক্ষেপ — “এই অতি উৎকৃষ্ট গ্রন্থখানি কেহ পড়িবে না জানি।” তিনি শরচ্চন্দ্র দাসের কথাও উদ্ধৃত করেছেন: বইটি “জাতিতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থের মধ্যে সর্ব প্রথম”।
  • কালীপ্রসন্ন ঘোষ বিদ্যাসাগর: কেউ ভারতের ভৌগোলিক ইতিবৃত্ত বা সভ্যতার ইতিহাস লিখতে গেলে বইটি “নিশ্চয়ই তাহার প্রয়োজনে লাগিবে”।
  • রাজেন্দ্রচন্দ্র শাস্ত্রী, বঙ্গীয় সরকারের প্রধান অনুবাদক: “গ্রন্থের ভাষা ভাল ও সুপাঠ্য। কাগজ, ছাপাই ও বাঁধাই অতি উৎকৃষ্ট।”
  • ব্যোমকেশ মুস্তফী: এ পর্যন্ত যত “বন্যজাতির” বিবরণ লেখার চেষ্টা হয়েছে, তার কোনোটি ঘোষের পথে এগোয়নি।
  • পত্রিকা: চট্টগ্রামের ‘জ্যোতিঃ’ লিখেছিল, বইটি চাকমাদের “জাতীয় সম্পদই বটে”; ‘প্রবাসী’ লিখেছিল, জাতিবিশেষের ইতিহাস বাংলায় খুব কম, তার মধ্যে এটি “সর্বপ্রধান মনে হয়”; ‘ভারতী’ লেখকের “উদার সহানুভূতি”র কথা বলেছিল।

এই অংশে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, জর্জ গ্রিয়ারসন, সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ ও কয়েকটি ইংরেজি পত্রিকার (বেঙ্গলী, অমৃত বাজার, ইংলিশম্যান, ইন্ডিয়ান মিরর) ইংরেজি মন্তব্যও ছাপা আছে। স্ক্যান-কপিতে ইংরেজি অংশগুলোর পাঠ পরিষ্কার নয়, তাই সেগুলোর বক্তব্য এখানে দেওয়া হলো না।

একশো বছর পরেও কে কোন কাজে ‘চাকমা জাতি’ উদ্ধৃত করেছেন

জুমজার্নালের আর্কাইভেই অন্তত পনেরোটি লেখা বইটি নাম ধরে উদ্ধৃত বা উল্লেখ করেছে — চাকমা লেখক যেমন আছেন, তেমনি তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা ও বাঙালি লেখকও। কেউ নিয়েছেন পৃষ্ঠাসংখ্যাসহ তথ্য, কেউ নিয়েছেন বইয়ের দাবি খণ্ডন করার জন্য। নিচের ছক আমাদের আর্কাইভের লেখাগুলো থেকে তৈরি।

লেখকলেখাবইটি কোন কাজে ব্যবহৃত
ড. মুহম্মদ আব্দুর রহিমইতিহাসের আলোকে চাকমা জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামকার্পাস মহল ও কোম্পানি আমলের রাজস্ব-প্রসঙ্গে পাদটীকায় পৃ. 10, 13, 75 ও 81; বোর্ডের একটি চিঠি ঘোষের বই থেকে উদ্ধৃত
আজাদ বুলবুলপার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা আদিবাসীর জাতিত্ত্ব বিচার ও অভিবাসনরানি কালিন্দীর জানা পূর্বপুরুষের সংখ্যা (পৃ. 133); মোগল-উৎপত্তির জনশ্রুতি ও তা খণ্ডন (পৃ. 5–6)
বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যাতঞ্চঙ্গ্যা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস; তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্তদৈংনাক-উৎপত্তির কাহিনী (পৃ. 20–33) পুরো উদ্ধৃত করে প্রশ্ন তোলা
প্রকট চাকমাপার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাচীন বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ “লুরি”দের ইতিহাস বিচার“আগরতারা” শব্দের অর্থ (পৃ. 187) ও আরেকটি তথ্য (পৃ. 112)
সঞ্জীব চাকমাচাকমা জাতি“গঝা”-র অর্থ
তনয় দেওয়ানচাংমাটারা: চাকমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস; চাকমা ভাষার বর্ণমালা ও ব্যাকরণপ্রথম দিকের ছাপা চাকমা বর্ণমালার একটি; বর্ণের আকার তুলনায় ঘোষের রূপ
মেয়েরেগা (ছদ্মনাম)বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা আন্দোলন ও চাকমা ভাষার দশারানি কালিন্দীর বাংলা ব্যবহার (পৃ. 84), শিক্ষিতের সংখ্যা, আর ভাষা নিয়ে ঘোষের মন্তব্য (পৃ. 257)
এডিট দেওয়ানযৌতুক, দাভা, কর্ণওয়ালিশ ও আমরাদাভার পরিমাণ
সলিল রায়“ত্রিপুরা” জাতির পূর্ব-পরিচয়বইয়ে ছাপা হেডম্যানদের তালিকা থেকে ত্রিপুরা দলপতিদের “পু-মাং” আখ্যা
গৌতম কুমার চাকমাপার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল: যুগসন্ধিক্ষণ, নানা সমস্যা ও নানা কথাপাদটীকায় পৃ. 64
ধীর কুমার চাকমাঅতীত, বর্তমান ও সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের হিল চাদিগাঙচাকমাদের “জাতি” বলে নামকরণের নজির
প্রশান্ত ত্রিপুরাঅশোক কুমার দেওয়ানের চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার প্রসঙ্গে কিছু কথাবইয়ের শিরোনামে “জাতি” শব্দের ব্যবহার — “উপজাতি” বিতর্কের প্রেক্ষাপটে
আনন্দ বিকাশ চাকমাঊনিশ শতকে বাংলার গ্রামীণ সমাজ: প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রামসামাজিক প্রথাকে ঘোষের ভাষায় “জাতীয় বিধান”
এডিসন চাকমাপার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িকতার উৎসমুখচাকমারা ভিনদেশ থেকে “উড়ে এসে জুড়ে বসেনি” — এই যুক্তির বিশদ বিবরণের উৎস হিসেবে (প্রকাশকাল লিখেছেন 1908)
গৌতমলাল চাকমা; শুভ্র জ্যোতি চাকমাভারতের চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশ; পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণতথ্যসূত্র তালিকার প্রথম বই

ছকটি থেকে একটি বিন্যাস চোখে পড়ে। রাজস্ব, প্রশাসন, দাভা, শিক্ষার সংখ্যা বা হেডম্যানদের তালিকার মতো সমকালীন তথ্যের জন্য লেখকেরা বইটিকে নির্ভরযোগ্য উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কিন্তু প্রাচীন ইতিহাস, দৈংনাক-উৎপত্তি, আগরতারার অর্থ বা ভাষা নিয়ে ঘোষের মতামত উদ্ধৃত হয়েছে বেশির ভাগ সময় প্রশ্ন তোলার জন্য।

গোজেন লামা পালা নিয়ে আমাদের গোজেন লামা-বিষয়ক লেখা দেখিয়েছে, গৌতমলাল চাকমার তথ্যসূত্র তালিকায় ‘চাকমা জাতি’ (1909) একই সারিতে আছে মাধব চন্দ্র চাকমা কর্মীর ‘শ্রী শ্রী রাজনামা’, সুগত চাকমার ‘চাকমা পরিচিতি’ (1978) ও নিরঞ্জন চাকমার বইয়ের সঙ্গে — অর্থাৎ ভারতের চাকমা সাহিত্য-আলোচনাতেও বইটি ভিত্তিগ্রন্থের তালিকায় থাকে।

পরবর্তী চাকমা ইতিহাসগ্রন্থের ওপর বইটির প্রভাব নিয়ে আজাদ বুলবুল লিখেছেন, রাজা ভুবনমোহন রায় (1919), মাধব চন্দ্র চাকমা কর্মী (1940), নোয়ারাম চাকমা (1962), বিরাজ মোহন দেওয়ান (1969), প্রাণহরি তালুকদার (1981) প্রমুখ “লুইন ও সতীশ ঘোষকে সূত্র হিসাবে” বিবেচনা করে অনুরূপ ইতিহাস লিখেছেন। প্রকট চাকমার লেখা অনুযায়ী নোয়ারাম চাকমা ১৯৬২ সালের ‘পার্বত্য রাজলহরী’তে আগরতারা শব্দের অর্থে ঘোষকে সমর্থন করেছেন।

অশোক কুমার দেওয়ানের সমালোচনা: “চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার”

‘চাকমা জাতি’র সবচেয়ে বিস্তারিত সমালোচনা অশোক কুমার দেওয়ানের (1926–1991) ‘চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার’। তাঁর মূল কথা: বইটি চাকমা সমাজের তথ্যের মূল্যবান দলিল, কিন্তু ইতিহাস-অংশ “স্থানে স্থানে নিতান্ত ভ্রমাত্মক”; ঘোষ “ছাক” আর চাকমাকে এক ধরে আরাকানি পুঁথির কাহিনী চাকমা ইতিহাসে জুড়ে দিয়েছেন, আর পরের লেখকেরা তা যাচাই না করে মেনে নিয়েছেন।

অশোক কুমার দেওয়ান ছিলেন রাঙামাটির উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের প্রথম পরিচালক। বইয়ের ভূমিকা অনুযায়ী তিনি 1981 সালে ইনস্টিটিউটের ‘উপজাতীয় গবেষণা পত্রিকা’র প্রথম সংখ্যায় “চাকমা জাতির ইতিহাসে অষ্টাদশ শতক” প্রবন্ধ লেখেন, পরে দুই খণ্ডে ‘চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার’-এর খসড়া করেন, কিন্তু জীবদ্দশায় ছাপতে পারেননি। মৃত্যুর পর নভেম্বর 1991-এ প্রথম খণ্ডটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ করেন মিসেস দিপীকা দেওয়ান, খবংপর্য্যা, খাগড়াছড়ি থেকে; পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন খাগড়াছড়ি ইনস্টিটিউটের সুসময় চাকমা। জুমজার্নালের আর্কাইভে এই পুস্তিকার ছবি তোলা কপি আছে; নিচের উদ্ধৃতি সেখান থেকে।

সাধারণ অভিযোগ। দেওয়ান লিখেছেন, ঘোষ “অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে” বর্ণনা করলেও বইটি “স্থানে স্থানে নিতান্ত ভ্রমাত্মক বিবরণে পূর্ণ”। যাঁদের চাকমাদের সঙ্গে সরাসরি পরিচয়ের সুযোগ নেই, তাঁদের কাছে এটিই ছিল “একমাত্র অবলম্বন”, ফলে ভুল তথ্য অন্যদেরও ভুল সিদ্ধান্তে নিয়ে গেছে। আরও লিখেছেন, ঘোষ নিজে “লুইন সাহেবের পূর্ব প্রকাশিত গ্রন্থ থেকে অনেক কিছুই সত্য মিথ্যা যাচাই না করে গ্রহণ” করেছেন (পৃ. 14–15)।

পরবর্তী ইতিবৃত্তকারদের নির্ভরতা। দেওয়ানের ভাষায়, পরের লেখকেরা ঘোষের তথ্য “বিনা পরীক্ষায় প্রামাণ্য হিসাবে” নিয়েছেন, আর “রূঢ় হলেও মন্তব্য করতে হয় যে পরবর্তী লেখকগণের অধিকাংশ বিবরণ মূলতঃ সতীশ ঘোষেরই চর্বিত চর্বন”। এ কারণেই তিনি প্রচলিত ইতিহাসের অসংগতি দেখাতে প্রধানত ঘোষের বিবরণ ধরে আলোচনা করেছেন (পৃ. 16)।

“ছাক” শব্দের যুক্তি। লুইনের বইয়ে উদ্ধৃত এক ইংরেজি চিঠিতে এক রাজার নামের শেষাংশ পড়ে ঘোষ তাঁকে “ছাক” রাজা, অর্থাৎ চাকমা রাজা ছিরীত্তমা হিসেবে ধরেছেন। দেওয়ান লিখেছেন, ধ্বনিগত সামান্য মিল ছাড়া এ ধারণার পক্ষে আর কোনো সূত্র নেই, আর এই “তুচ্ছ জিনিসটিকে ভিত্তি করে” এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া যথেষ্ট হয়নি (পৃ. 42)। তাঁর মতে, দেঙ্গ্যাওয়াদি কোথাও বলেনি ছাক ও চাকমা এক; ঘোষই প্রথম এই ধারণা প্রকাশ করেন, আর এ মতের সব সমর্থক “সতীশ ঘোষের পরবর্তী কালের” (পৃ. 50–51)।

দেঙ্গ্যাওয়াদি পুঁথির মূল্য। দেওয়ান লিখেছেন, ফেয়ার প্রমুখ ইংরেজ ঐতিহাসিকের বর্মা-ইতিহাসে ইয়ংজের বিরুদ্ধে আরাকানরাজের বিশাল অভিযানের কোনো বিবরণ নেই। তাঁর অনুমান, পুঁথিটি ফেয়ারের ইতিহাসের অনেক পরে “ইতিহাসে অনভিজ্ঞ কোন উৎসাহী গ্রাম্য রচয়িতা” লিখে থাকতে পারেন। তিনি এটাও উল্লেখ করেছেন যে ঘোষ নিজে আরাকানি ভাষা জানতেন না বলে স্বীকার করেছেন এবং অনুবাদকের সাহায্যে পুঁথিটির তথ্য নিয়েছেন, আর ফেয়ারের History of Burma (1883) সম্পর্কে অবহিত থাকলেও তা পড়েছিলেন বলে মনে হয় না। চুইজং ক্যথং ও দেঙ্গ্যাওয়াদি — এই দুই বইয়ের প্রথম উল্লেখ দেওয়ান পেয়েছেন রাজা ভুবনমোহন রায়ের 28 আগস্ট 1907-এর একটি নোটে, তাই প্রথম “আবিষ্কারক” কে, তা তিনি নিশ্চিত করে বলেননি।

চাক জাতির কাহিনীর সঙ্গে মিল। দেওয়ান দেখিয়েছেন, চাক জাতির নিজস্ব ইতিহাস-কাহিনী আর ঘোষের দৈংনাক-কাহিনী নামের বানান ও খুঁটিনাটি বাদে “অবিকল এক” — ঘোষের ইয়ংজ চাক ইতিহাসে য়েংচো, মইচাগিরি সেখানে মিছাগিরি। তাঁর প্রশ্ন: “এই কাহিনী কি চাকরা আমাদের কাছ থেকে চুরি করেছে? না আমরাই তাঁদের কাহিনীকে আমাদের বলে চালিয়ে দিচ্ছি?” (উদ্ধৃতি বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যার লেখা থেকে, ইতিহাস বিচার, পৃ. 64–65)।

সামগ্রিক রায়। দেওয়ানের ভাষায়, ঘোষ “ব্রহ্ম-আরাকান ইতিহাসের খিচুড়ি পাকানো একটি অভিনব চাকমা ইতিহাস” দাঁড় করান, আর স্বজাতীয়রা সেই তত্ত্ব সমর্থন করে বইটিকে চাকমা ইতিহাসের “অথরিটি” বানিয়ে দেন। পুস্তিকার শেষে তিনি লিখেছেন, বিজয়গিরির কাহিনীকে কাব্য ধরলে আর বর্মা-অংশের কাহিনীগুলো শান বা অন্য গোত্রের ধরলে দেড় হাজার বছরের প্রচলিত চাকমা ইতিহাসের “শতকরা প্রায় একশ’ ভাগই ফাঁকা”।

দেওয়ানের এই বক্তব্যের পাশে অন্য পাঠও আছে। আমাদের আর্কাইভে প্রশান্ত ত্রিপুরা দেওয়ানের গবেষণাকে ঘোষের বইয়ের “বিশদ পর্যালোচনা” বলে উল্লেখ করেছেন। আর চাকমারা বর্মার সাক-জাতির বংশধর কি না, সে প্রশ্নে দেওয়ানের নিজস্ব বিকল্প মত আনন্দ বিকাশ চাকমা তাঁর লেখায় তুলে ধরেছেন: ভাষা ও সংস্কৃতির বিচারে চাকমাদের উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনো প্রাচীন আর্যভাষী মঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠী থেকে উদ্ভূত মনে করাই যুক্তিসংগত।

অশোক দেওয়ান ছাড়া আরও কে কে ‘চাকমা জাতি’র বিরুদ্ধে আপত্তি তুলেছেন

দেওয়ানের আগে ও পরে অন্তত ছয়জন লেখক বইটির নির্দিষ্ট দাবি নিয়ে আপত্তি তুলেছেন: মাধব চন্দ্র চাকমা কর্মী (1940), বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, আজাদ বুলবুল, আনন্দ বিকাশ চাকমা, সুমঙ্গল চাকমা ও মেয়েরেগা ছদ্মনামের লেখক। প্রশ্নগুলো উৎপত্তি-কাহিনী থেকে ভাষা ও মন্ত্রোচ্চারণের বর্ণনা পর্যন্ত ছড়ানো।

মাধব চন্দ্র চাকমা কর্মী, ‘শ্রী শ্রী রাজনামা’ (1940)। অশোক দেওয়ানের উদ্ধৃতি অনুযায়ী মাধব চন্দ্র লিখেছিলেন, ঘোষের বই পড়ে “আমরা পরিতৃপ্ত হইতে পারি নাই… আমরা তাঁহার সকল সিদ্ধান্ত অভ্রান্ত বলিয়া মানিয়া লইতে প্রস্তুত নই। তিনি উপযুক্ত উপাদানের অভাবে অপসিদ্ধান্ত করিতে বাধ্য হইয়াছেন।” দেওয়ানের পর্যবেক্ষণ, এই আপত্তি সত্ত্বেও পুরাণ-অংশ আর কিছু জনশ্রুতি বাদে মাধব চন্দ্র প্রায় সব তথ্যে ঘোষকেই অনুসরণ করেছেন এবং বারবার তাঁর তথ্যকে সূত্র হিসেবে দিয়েছেন।

বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা। তাঁর মতে, ঘোষ, মাধব চন্দ্র ও বিরাজ মোহন দেওয়ানের বইয়ে তঞ্চঙ্গ্যা উৎপত্তির বিবরণ “মূলতঃ একই সূত্রকে কিঞ্চিৎ রদবদল করে” সাজানো, আর সে বিবরণ পড়ে তঞ্চঙ্গ্যাদের চাকমার শাখা ধরে নিতে “কষ্ট হয়”। আরাকানি ভাষায় দৈংনাক মানে যোদ্ধা; তাঁর প্রশ্ন, ঘোষের কাহিনীর দশ হাজার বন্দি প্রজা আদৌ চাকমা ছিল কি না, কারণ রাজার সৈন্যদলে বিভিন্ন জাতির লোক থাকে।

আজাদ বুলবুল। তাঁর মতে, লুইন (1870) আরাকানি ইতিহাস ‘রাজওয়াং’ ও ‘দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদ ফুং’-এর কাহিনীকে চাকমা ইতিহাস বলে অনুমান করেছিলেন, আর “সতীশ চন্দ্র ঘোষও (১৯০৯) একই ধারণার বশবর্তী হয়ে” চাকমা ইতিহাস লিখেছেন।

আনন্দ বিকাশ চাকমা। তাঁর লেখায় সতর্ক ভাষা: ঘোষের বইয়ে বর্ণিত অষ্টাদশ শতকের আগের, বর্মা-ইতিহাসের সঙ্গে মেশানো চাকমা রাজবংশের কাহিনীর সত্যতা “প্রমাণ সাপেক্ষ বলে কেউ কেউ মনে করেন”। তিনি আরও লিখেছেন, বিজয়গিরি, সমরগিরি প্রমুখ রাজার নাম চাকমা সাহিত্যিক উপাদান ছাড়া কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক বা বিদেশি উৎসে নেই।

আগরতারার অর্থ। প্রকট চাকমার লেখায় উদ্ধৃত অশোক দেওয়ানের মত (ইতিহাস বিচার, দ্বিতীয় খণ্ড, 1993, পৃ. 99): “সতীষ চন্দ্র ঘোষের অর্থ ব্যাখ্যা সঠিক নয়।” দেওয়ানের মতে শব্দটি “আখর” (অক্ষর) থেকে, চাকমা উচ্চারণে “আঘর”, তাই অর্থ “লিখিত সূত্র”; “শ্রী ঘোষের ‘আগর’ শব্দটি ভুল”। চাকমা লুরি ও আঘরতারা নিয়ে বিস্তারিত পড়তে পারেন আমাদের আর্কাইভের লুরিদের ইতিহাস বিচার লেখায়।

সুমঙ্গল চাকমা। চাকমাদের “উং” শব্দ নিয়ে লেখায় তিনি জানিয়েছেন, ঘোষ পৃ. 210-এ দেখিয়েছেন চাকমা ওঝারা মন্ত্র পড়ার আগে “হুঁ হুঁ” করে জপ করেন — সুমঙ্গল চাকমার মতে, যা “অতি রঞ্জিত ছাড়া কিছুই না”।

মেয়েরেগা। চাকমা ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখায় তিনি দেখিয়েছেন, লুইন চাকমাদের ভাষাকে বাংলার “bastard dialect” বলেছিলেন, আর ঘোষ পৃ. 257-এ একই মন্তব্য করেছেন। তাঁর মতে, এভাবে সংখ্যাগুরুরা চাকমাদের “বাঙালি বানাতে” চেয়েছিল। অন্যদিকে রানি কালিন্দীর আমলে বাংলার প্রাধান্যে ঘোষ যে খুশি হয়েছিলেন (পৃ. 84), সেটিও তিনি উদ্ধৃত করেছেন।

নন্দলাল শর্মা। তিনি বইটির “নানা দোষ-ত্রুটির কথা স্বীকার করেও” লিখেছেন, চাকমা জাতি সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনার সূত্রপাত এই বই থেকেই। কোন দোষ-ত্রুটির কথা বলছেন, তা লেখাটিতে নির্দিষ্ট করা নেই।

সমালোচকেরাও ‘চাকমা জাতি’র কোন অংশকে মূল্যবান বলেন

সবচেয়ে কঠোর সমালোচক অশোক কুমার দেওয়ানও ঘোষের বই আর লুইনের The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein-কে তৎকালীন চাকমা সমাজের “মূল্যবান ঐতিহাসিক দলিল হিসাবে বিবেচিত হওয়ার দাবী রাখে” বলে লিখেছেন। তাঁর আপত্তি প্রাচীন ইতিহাস-অংশে; সমাজ-বিবরণে নয়।

দেওয়ান একই জায়গায় স্বীকার করেছেন, ঘোষের বই “সর্ব প্রথম সামগ্রিক পরিচয় সহ” চাকমাদের ধর্ম, সমাজ, সংস্কৃতি, রীতিনীতি, ভাষা, লিপি, সাহিত্য ও শিল্পের ওপর আলোকপাত করেছে, আর লুইনের পর হাচিনসনের 1906 সালের বইয়েও ইতিহাস-সংক্রান্ত কোনো বিষয় আলোচিত হয়নি। আধুনিক শিক্ষা ও “বস্তুতান্ত্রিক সভ্যতার” চাপে চাকমা সমাজ দ্রুত বদলাচ্ছে — তাই বিশ শতকের গোড়ার সমাজের ছবির জন্য এই দুই বইয়ের দাম আছে, এটাই তাঁর যুক্তি।

আমাদের আর্কাইভের কার্তিকচন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা-বিষয়ক লেখাটিও একই সুরে বলেছে: সিভিলিয়ানদের লেখার পরে বাংলা ভাষায় পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের নিয়ে এটিই প্রথম বিস্তারিত অনুসন্ধান, আর এর এক দশক পরে প্রকাশিত রাজা ভুবনমোহন রায়ের ‘চাকমা রাজবংশের ইতিহাস’ (1919) চাকমাদের নিজেদের বাংলা চর্চার আদি নিদর্শন। নন্দলাল শর্মাও ঘোষের বইকে চাকমাদের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাসগ্রন্থের সূচনা বলেছেন, আর চাকমাদের নিজেদের ইতিহাস চর্চার সূচনা ধরেছেন রাজা ভুবনমোহন রায় থেকে।

চাকমাদের উৎপত্তি ও রাজবংশ নিয়ে বিভিন্ন উৎস কোথায় মেলে আর কোথায় মেলে না, তার পূর্ণ তালিকা আছে আমাদের চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে কবে থেকে আছে লেখায়। আর পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য জনগোষ্ঠী ও ইতিহাসের প্রেক্ষাপট পাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম হাবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

সতীশচন্দ্র ঘোষের ‘চাকমা জাতি’ বইটি কবে প্রকাশিত হয়?

বইটি প্রকাশিত হয় ১৩১৬ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ 1909 সালে, কলকাতা থেকে। এটি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাবলীর 24তম খণ্ড; প্রকাশক শ্রীসারদাচরণ ঘোষ, বড়বাজার। লেখকের ভূমিকা ‘নিবেদনম্‌’-এর তারিখ 1 আগস্ট 1909। ভূমিকা লেখেন শরচ্চন্দ্র দাস, আর বইটি চাকমা রাজা ভুবনমোহন রায়কে উৎসর্গ করা।

সতীশচন্দ্র ঘোষ কে ছিলেন?

সতীশচন্দ্র ঘোষ ছিলেন রাঙামাটি গভর্নমেন্ট হাই স্কুলের সহকারী শিক্ষক, বাঙালি। বইয়ের ভূমিকায় তিনি জানিয়েছেন, চাকরির অষ্টম বছরে বইটি শেষ হয় এবং উপাদান সংগ্রহে প্রায় চার বছর লাগে। নন্দলাল শর্মার লেখায় তাঁর জীবনকাল 1881–1929। বইয়ের নামপত্রে নামের পরে “এম্‌, আর, এ, এস্‌” লেখা আছে।

‘চাকমা জাতি’ বইয়ে কী কী বিষয় আছে?

বইটিতে বিশটি পরিচ্ছেদ: উৎপত্তি ও প্রাচীন কাহিনী, বাসস্থান ও লোকসংখ্যা, রাজাবলী, শাসনপ্রথা ও মৌজা, পদবি ও শ্রমবিভাগ, ধর্ম, বিয়ে ও অন্ত্যেষ্টি, প্রবাদ, খাদ্য, চিকিৎসা, পোশাক, জুম চাষ, তাঁত ও নৌকা, শিক্ষা ও ভাষা-বর্ণমালা, কবিতা ও বারমাস, খেলা ও সংগীত। শেষে আছে উপসংহার, পাঠকদের মতামত আর পরিশিষ্টে শাসনকর্তাদের তালিকা, 1900 সালের শাসনবিধির বাংলা অনুবাদ ও মৌজা-পরিচয়।

‘চাকমা জাতি’ বইটি অনলাইনে কোথায় পড়া যায়?

বইটির দুটি স্ক্যান Internet Archive-এ আছে, দুটিই ভারতের ডিজিটাল লাইব্রেরি থেকে। একটি 1909 সালের মূল সংস্করণ (464 পাতা, কুচবিহারের নর্থ বেঙ্গল স্টেট লাইব্রেরির কপি, পাবলিক ডোমেইন হিসেবে চিহ্নিত)। অন্যটি কলকাতার অরুণা প্রকাশনের জুলাই 2000-এর পুনর্মুদ্রণ (442 পাতা), যাতে নতুন একটি ভূমিকা যোগ হয়েছে।

‘চাকমা জাতি’ বইয়ের কি ইংরেজি অনুবাদ আছে?

দুজন লেখক ইংরেজি অনুবাদের কথা বলেছেন। নন্দলাল শর্মা লিখেছেন, 1911 সালে ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয়; অশোক কুমার দেওয়ানও অনুবাদ প্রকাশের কথা লিখেছেন, তবে সাল দেননি। অনুবাদকের নাম বা অনুবাদের কোনো কপি বা গ্রন্থাগার-তালিকা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।

‘চাকমা জাতি’ বইটির প্রধান সমালোচক কে?

সবচেয়ে বিস্তারিত সমালোচনা অশোক কুমার দেওয়ানের (1926–1991) ‘চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার’, যার প্রথম খণ্ড তাঁর মৃত্যুর পর নভেম্বর 1991-এ খাগড়াছড়ি থেকে প্রকাশিত হয়। তিনি লিখেছেন, বইটি “স্থানে স্থানে নিতান্ত ভ্রমাত্মক”, ঘোষ লুইনের অনেক তথ্য যাচাই না করে নিয়েছেন, আর পরের লেখকদের অধিকাংশ বিবরণ ঘোষেরই “চর্বিত চর্বন”।

ঘোষ কেন চাকমাদের বর্মার “ছাক” জাতি বলে ধরেছিলেন?

ঘোষ লিখেছেন, বর্মিরা চাকমাদের “ছাক্‌” বা “ছেক্‌” নামে ডাকে, আর কুকিরা ডাকে “টুইছেক্‌”। এই সূত্রে তিনি আরাকানি পুঁথি দেঙ্গ্যাওয়াদিতে বর্ণিত ছাকদের কাহিনী চাকমা ইতিহাসে নেন। অশোক কুমার দেওয়ান লিখেছেন, ধ্বনিগত মিল ছাড়া এর পক্ষে কোনো সূত্র নেই, আর দেঙ্গ্যাওয়াদি কোথাও ছাক ও চাকমাকে এক বলেনি।

তঞ্চঙ্গ্যাদের উৎপত্তি নিয়ে ‘চাকমা জাতি’ বই কী বলে?

বইয়ের 20–33 পৃষ্ঠার কাহিনী অনুযায়ী 1333–34 খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ মেংগদি চাকমা রাজা ইয়ংজকে পরাজিত করে দশ হাজার প্রজাকে বন্দি করেন এবং তাদের “দৈংনাক” নাম দেন। বীর কুমার তঞ্চঙ্গ্যা প্রশ্ন তুলেছেন, ওই প্রজারা আদৌ চাকমা ছিল কি না, কারণ আরাকানি ভাষায় দৈংনাক মানে যোদ্ধা, আর একই কাহিনী চাক জাতিও নিজেদের বলে দাবি করে।

চাকমা ভাষা নিয়ে সতীশচন্দ্র ঘোষ কী লিখেছিলেন?

অষ্টাদশ পরিচ্ছেদে ঘোষ লিখেছেন, চাকমাদের “মূল ভাষা বাঙ্গালা, তবে ইহা প্রচলিত বাঙ্গালার তুলনায় নিতান্ত বিকৃত”, আর ইংরেজ কর্মকর্তারা একে “চাক্‌মা-বাঙ্গলা” বলেছেন। একই পরিচ্ছেদে চাকমা বর্ণমালা ছাপা আছে। মেয়েরেগা ছদ্মনামের লেখক এই মন্তব্যকে লুইনের তাচ্ছিল্যপূর্ণ মতেরই পুনরাবৃত্তি বলেছেন।

আগরতারা শব্দের অর্থ নিয়ে বিরোধটা কী?

ঘোষ লিখেছেন, “আগরতারা” মানে পৌরাণিক শাস্ত্র — “আগর” পূর্বের, “তারা” শাস্ত্র। প্রকট চাকমার লেখা অনুযায়ী নোয়ারাম চাকমা 1962 সালে এই ব্যাখ্যা সমর্থন করেন। অশোক কুমার দেওয়ান লিখেছেন ব্যাখ্যাটি সঠিক নয়; শব্দটি “আখর” (অক্ষর) থেকে, চাকমা উচ্চারণে “আঘর”, তাই অর্থ লিখিত সূত্র।

1909 সালে বইটি পাঠকদের কাছে কেমন সাড়া পেয়েছিল?

বইয়ের শেষে লেখক নিজেই “মতামত” অংশে প্রশংসাসূচক চিঠি ও পত্রিকার মন্তব্য ছেপেছেন: অবিনাশচন্দ্র দেওয়ান, দীনেশচন্দ্র সেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিজয়চন্দ্র মজুমদার, জলধর সেন প্রমুখ, এবং ‘প্রবাসী’, ‘ভারতী’, ‘জ্যোতিঃ’ পত্রিকা। ‘প্রবাসী’ লিখেছিল, জাতিবিশেষের ইতিহাসের মধ্যে বইটি “সর্বপ্রধান মনে হয়”।

পরের চাকমা ইতিহাসগ্রন্থগুলো কি ঘোষের বইয়ের ওপর নির্ভর করেছে?

আজাদ বুলবুল ও অশোক কুমার দেওয়ান — দুজনেই তাই লিখেছেন। বুলবুলের তালিকায় রাজা ভুবনমোহন রায় (1919), মাধব চন্দ্র চাকমা কর্মী (1940), নোয়ারাম চাকমা (1962), বিরাজ মোহন দেওয়ান (1969) ও প্রাণহরি তালুকদার (1981) লুইন ও ঘোষকে সূত্র ধরেছেন। দেওয়ান লিখেছেন, মাধব চন্দ্র ঘোষের সমালোচনা করেও প্রায় সব তথ্যে তাঁকেই অনুসরণ করেছেন।

যা এখনো জানা যায়নি

  • ইংরেজি অনুবাদ। নন্দলাল শর্মা 1911 সালের একটি ইংরেজি অনুবাদের কথা লিখেছেন, অশোক কুমার দেওয়ানও অনুবাদের উল্লেখ করেছেন। অনুবাদের শিরোনাম, অনুবাদক বা কোনো টিকে থাকা কপির খোঁজ জানা যায়নি।
  • 2009 সংস্করণ। সোনামনি চাকমা ও মমতা চাকমার 2009 সালের সংস্করণের প্রকাশক, স্থান ও পরিবর্তন সম্পর্কে তথ্য পাওয়া যায়নি; অরুণা প্রকাশনের 2000 সালের পুনর্মুদ্রণের সঙ্গে “দ্বিতীয় সংস্করণ” পরিচয়ের অমিলও মেটানো যায়নি।
  • লেখকের জীবনী। সতীশচন্দ্র ঘোষের জন্ম-মৃত্যুর সাল (1881–1929) কেবল নন্দলাল শর্মার লেখায় পাওয়া গেছে; জন্মস্থান, রাঙামাটি ছাড়ার পরের জীবন বা অন্য রচনা সম্পর্কে তথ্য জানা যায়নি।
  • দেঙ্গ্যাওয়াদি পুঁথি। ঘোষ যে আরাকানি পুঁথি ‘দেঙ্গ্যাওয়াদি আরেদ ফুং’ থেকে পৃষ্ঠাসংখ্যাসহ উদ্ধৃতি দিয়েছেন, তার কোনো কপি বা প্রকাশনা-তথ্য পাওয়া যায়নি। অশোক কুমার দেওয়ানও লিখেছেন, পুঁথিটি পরীক্ষা করার উপায় নেই।
  • প্রবন্ধগুলোর তালিকা। কোন পরিচ্ছেদ কোন পত্রিকার কোন সংখ্যায় প্রথম ছাপা হয়েছিল, তার পূর্ণ তালিকা পাওয়া যায়নি; কেবল সাহিত্য পরিষৎ পত্রিকার একটি প্রবন্ধের ঠিকানা জানা গেছে।
  • “মতামত” অংশের ইংরেজি মন্তব্য। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, গ্রিয়ারসন ও ইংরেজি পত্রিকাগুলোর মন্তব্য স্ক্যান-কপিতে পাঠযোগ্য নয়; সেগুলো প্রশংসা না সমালোচনা, তা এখানে যাচাই করা যায়নি।
  • ইতিহাস বিচারের দ্বিতীয় খণ্ড। প্রকট চাকমা 1993 সালের দ্বিতীয় খণ্ড উদ্ধৃত করেছেন; সেই খণ্ডে ঘোষ সম্পর্কে আর কী আছে, তা জানা যায়নি।

তথ্যসূত্র

মূল বই

  • সতীশচন্দ্র ঘোষ, চাক্‌মাজাতি (জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত), শরচ্চন্দ্র দাসের ভূমিকাসহ, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ গ্রন্থাবলী 24, প্রকাশক শ্রীসারদাচরণ ঘোষ, কলিকাতা, ১৩১৬ (1909)। Digital Library of India / Internet Archive।
  • সতীশ চন্দ্র ঘোষ, চাকমা জাতি (জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত), পুনর্মুদ্রণ, অরুণা প্রকাশন, কলকাতা, জুলাই 2000, “নবসংস্করণের ভূমিকা” সহ। Digital Library of India / Internet Archive।
  • অশোক কুমার দেওয়ান, চাকমা জাতির ইতিহাস বিচার (প্রথম অধ্যায়), প্রকাশক মিসেস দিপীকা দেওয়ান, খবংপর্য্যা, খাগড়াছড়ি, নভেম্বর 1991। জুমজার্নাল আর্কাইভের ছবি-কপি।

জুমজার্নাল আর্কাইভের লেখা

সর্বশেষ হালনাগাদ: 3 নভেম্বর 2026

প্রসঙ্গ:চাকমা, চাকমা জাতির আদিনিবাস, চাকমা জাতির ইতিহাস

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা