Last updated Oct 23rd, 2026
0

সাঁওতালদের নিজস্ব ধর্মে কোনো মূর্তি নেই, কোনো লিখিত ধর্মগ্রন্থও প্রথাগতভাবে ছিল না। বিশ্বাসের কেন্দ্রে আছেন সৃষ্টিকর্তা ঠাকুর জিউ আর অসংখ্য বোঙ্গা (আত্মা বা দেবতা), যাঁদের পূজা হয় গ্রামের প্রান্তে শালগাছের কুঞ্জ জাহেরথানে। এই সাঁওতাল ধর্মকে অনুসারীরা নিজেরা বলেন “সারি ধরম”, কেউ বলেন “সারনা”; বোঙ্গা আর সারনা এই দুই শব্দই বিশ্বাসটির পরিচয় বহন করে। বাংলাদেশের জনশুমারিতে ধর্মটির আলাদা কোনো ঘর নেই।
এই লেখা বিশ্বাসটির ভেতরের কাঠামো ধরে এগোয়: বোঙ্গা কারা, কার স্থান কোথায়, পূজা কে করেন, সৃষ্টির কাহিনি কী বলে, বছরের কোন পরবে কোন দেবতা, আর রাষ্ট্রের খাতায় এই ধর্ম কেন অদৃশ্য। সাঁওতাল গ্রামের শাসনব্যবস্থা ও মাঝি হাড়ামের কথা আলাদা করে আছে আমাদের সাঁওতাল গ্রাম পঞ্চায়েত ও মাঝি হাড়াম নিয়ে লেখায়; এখানে তা আবার বলা হয়নি।
এই লেখায়
সাঁওতালরা নিজেদের ধর্মকে সাধারণত “সারি ধরম” বলেন; একই বিশ্বাসকে কেউ কেউ “সারনা” বলেন, আর বাইরের লোকের কাছে অনুসারীরা প্রায়ই “সনাতন সাঁওতাল” নামে পরিচিত। তিনটি নামই চালু, এবং উৎসভেদে কোনটি সাঁওতালদের নিজস্ব, সে বিষয়ে বক্তব্য আলাদা।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে রাজীব নূরের 17 ডিসেম্বর 2022-এর প্রতিবেদন লিখেছে, সাঁওতালরা নিজেদের “সারি ধরম” অনুসারী বলে পরিচয় দেন, অন্যরা সারনা বলে দাবি করেন; আবার পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ঝাড়খণ্ডের সাঁওতালরা নিজেদের সারনা বলেন। একই প্রতিবেদনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মানিক সরেন জানিয়েছেন, তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দুটিকে একসঙ্গে “সারি-সারনা” নামে স্বীকৃতি চাইছেন, আর প্রতিবেদন অনুযায়ী এই দুই ধর্মের অনুসারীরা “সাধারণভাবে ‘সনাতন সাঁওতাল’ বলে পরিচিত”।
শব্দ দুটির উৎস নিয়েও দুই রকম ব্যাখ্যা আছে। বাংলা উইকিপিডিয়ার “সারি ধরম” ভুক্তি লিখেছে, “সারি” এসেছে সাঁওতালি “সারিসারজম” থেকে, যার অর্থ শালগাছ, আর শব্দটির বাংলা অর্থ “সত্য”। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Sarnaism” ভুক্তি লিখেছে, “সারনা” মুন্ডারি শব্দ, অর্থ পবিত্র কুঞ্জ, এবং শালগাছের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত; একই ভুক্তি জানায়, সাঁওতালরা প্রথমে সারনা পরিচয় গ্রহণ না করলেও পরের দশকগুলোতে ধীরে ধীরে এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। দুই ব্যাখ্যাতেই শালগাছ কেন্দ্রে, আর সেই শালগাছই পূজার স্থানের প্রধান গাছ — এ কথা পরের অংশগুলোতে আসবে।
আরও একটি নাম পাওয়া যায় পুরোনো লেখায়: সাঁওতালরা ও তাঁদের নিকটজাতিরা একসময় নিজেদের “খারওয়ার” বা “খেরওয়াল” বলতেন। জুমজার্নালে মানিক সরেনের সাঁওতাল নামের বানান নিয়ে লেখায় তার বিস্তারিত আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Sarnaism ভুক্তিতে সাঁওতালদের ধর্মীয় আত্মপরিচয়ের প্রসঙ্গে “Kherwarism” শব্দটিও এসেছে। বিডিনিউজের প্রতিবেদনে মানিক সরেন খেরোয়াল বলতে সাঁওতাল, মুন্ডা, কোল, মাহালি, কুড়মি, ভীল, হো, ভূমিজ — এই জাতিগুলোকে বুঝিয়েছেন এবং বলেছেন, ধর্ম পালনের ক্ষেত্রে তাঁরা সবাই হিন্দুদের থেকে আলাদা।
সাঁওতাল ধর্মে বোঙ্গা হলো অনৈসর্গিক আত্মা বা দেবসত্তা, যারা মানুষের ভালো-মন্দ ঘটায়; সারনা বা জাহেরথান হলো সেই কুঞ্জ, যেখানে গ্রামের প্রধান বোঙ্গাদের পূজা হয়। বাংলাপিডিয়ার ভাষায়, সাঁওতালদের বিশ্বাসে আত্মা অমর এবং “অনৈসর্গিক আত্মাই (বোঙ্গা) সব ঐহিক ভালমন্দ নির্ধারণ করে”।
আহমদ রফিকের লেখা বাংলাপিডিয়ার সাঁওতাল ভুক্তি আরও লিখেছে, দৈনন্দিন পূজা-অর্চনায় বোঙ্গার স্থান গুরুত্বপূর্ণ, গৃহদেবতা হিসেবে “আবে বোঙ্গা”র প্রতাপ যথেষ্ট, আর সাঁওতালরা ধর্মবিশ্বাসে সর্বপ্রাণবাদী ও প্রকৃতি উপাসক হলেও “ঠাকুরজিউ”-কে সৃষ্টিকর্তা মানেন। মূর্তিপূজার প্রচলন নেই, এবং ভুক্তিটির ভাষায় সাঁওতালদের “ধর্ম আছে কিন্তু কোন আনুশাসনিক ধর্মগ্রন্থ নেই”।
ভারতের ধর্মতত্ত্ব পত্রিকা Journal of Dharma-তে 1994 সালে চেরিয়ান মেনাচেরি (Menacherry 1994) লিখেছেন, সাঁওতালদের লিখিত ঐতিহ্য নেই; মৌখিক ঐতিহ্য আর লোককাহিনিই বোঙ্গাদের জগৎ খুলে দেয়, আর বোঙ্গারাই সাঁওতালদের মঙ্গলের দায়িত্বে বলে মনে করা হয়। তাঁর মতে, এই ধর্ম পাপ ও প্রায়শ্চিত্তকে ঘিরে নয়; অসুখ-বিপদকে দেখা হয় বোঙ্গার ক্রোধের ফল হিসেবে। কিছু বোঙ্গার পূজা হয় গোটা সমাজ মিলে প্রকাশ্যে, কিছু পরিবারের ভেতরে।
বোঙ্গা মানেই যে কল্যাণকর দেবতা, তা নয়। জুমজার্নালের সংগ্রহে থাকা “ভাইয়ের জন্য উপহার” নামের সাঁওতাল রূপকথায় বোঙ্গাকে বলা হয়েছে “অপদেবতা” — সে মানুষের রূপ ধরে কৃষকের মেয়েকে চেয়ে নেয়, পরে বাঘ হয়ে ওত পেতে থাকে। 1909 সালে প্রকাশিত সিসিল হেনরি বম্পাসের অনুবাদ-সংকলন Folklore of the Santal Parganas-এ লেখা আছে, সাঁওতালরা শ্মশানকে খুব ভয় পান, কারণ মৃত মানুষ বোঙ্গা হয় এবং সেই বোঙ্গা রূপ বদলায়। আবার একই বইয়ে আছে, প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মারা গেলে “পূর্বপুরুষ বোঙ্গা” হন, আর বাহা ও সোহরাই উৎসবে তাঁদের উদ্দেশে বলি দেওয়া হয়। অর্থাৎ বোঙ্গা শব্দটি একসঙ্গে দেবতা, পূর্বপুরুষ, বন-পাহাড়-সীমানার আত্মা — সবাইকে ধারণ করে।
সাঁওতালদের নিজেদের মৌখিক ঐতিহ্য বোঙ্গাদের ইতিহাসও দেয়। নরওয়েজীয় মিশনারি লার্স ওলসেন স্ক্রেফসরুড 1871 সালে কোলেয়ান নামের এক বৃদ্ধ সাঁওতাল গুরুর মুখ থেকে যে কাহিনি লিখে নিয়েছিলেন (সাঁওতালিতে হড়কোরেন মারে হাপড়ামকো রেয়াঃ কাথা, 1887), পি. ও. বডিংয়ের ইংরেজি অনুবাদে (Traditions and Institutions of the Santals, 1942) তার শুরুতেই কোলেয়ান বলছেন: আদিকালে তাঁদের কোনো বোঙ্গা ছিল না, পূর্বপুরুষেরা কেবল ঠাকুরের উপাসনা করতেন; বোঙ্গারা এসেছে দেশান্তরের পথে পথে।
উৎসভেদে উত্তর আলাদা। বাংলাপিডিয়া ও মেনাচেরি সূর্য-দেবতা সিং বোঙ্গাকেই প্রধান উপাস্য বা স্রষ্টা ঠাকুর জিউ বলে লিখেছেন; কিন্তু কোলেয়ানের বিবরণে ঠাকুর আলাদা, তিনি অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তা, আর সিং বোঙ্গা তাঁর অধীন “ভালো বোঙ্গা”। দুটি অবস্থানই নথিতে আছে।
বাংলাপিডিয়া লিখেছে, সাঁওতালদের প্রধান উপাস্য সূর্য, “তাদের ভাষায় সিং বোঙ্গা”। মেনাচেরি (1994) প্রধান দেবতাদের তালিকার প্রথমে রেখেছেন সিং বোঙ্গা বা সিং চান্দোকে — সূর্য-দেবতা, যাঁকে ঠাকুর জিউ হিসেবেও শনাক্ত করা হয়, তিনিই স্রষ্টা; প্রতি পঞ্চম বছরে ছাগল বলি দিয়ে তাঁর পূজা হয়। বম্পাসের সংকলনে (“The Beginning of Things”) সরাসরি লেখা: ঠাকুর বাবাই সিং চান্দো বা সূর্য, আর চাঁদ তাঁর স্ত্রী।
কোলেয়ানের বিবরণ এর সঙ্গে মেলে না। বডিংয়ের অনুবাদে তিনি বলছেন, এখনকার সাঁওতালরা সিং বোঙ্গাকে ঠাকুর ভেবে সূর্যের দিকে মুখ করে পূজা করেন, কিন্তু গুরুদের কাছে পূর্বপুরুষদের দেওয়া শিক্ষা হলো ঠাকুর আলাদা — তাঁকে মানুষের চোখে দেখা যায় না, তিনি নিজে সব দেখেন, তিনিই আকাশ-পৃথিবী, মানুষ-পশু-পাখি, ধান-চাল সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, তিনিই মানুষকে আনেন, তিনিই নিয়ে যান। সিং বোঙ্গাকে তাঁরা “ভালো বোঙ্গা” বলেন, কারণ তিনি ভোর আনেন, সন্ধ্যা আনেন, রোদ দেন, বৃষ্টি দেন। কোলেয়ান আরও বলেছেন, মানুষ বোঙ্গাদের সম্মান জানাতে প্রার্থনায় সব বোঙ্গাকেই “ঠাকুর” বলে ডাকে, কিন্তু তারা ঠাকুর নয়, কেবল বোঙ্গা।
বইটির সম্পাদক স্টেন কোনো ভূমিকায় সতর্ক করেছেন, “ঠাকুর” নামটি আর্য উৎসের বলে মনে হয় এবং “জিউ” (আত্মা) শব্দটি নিশ্চিতভাবেই তাই — কিন্তু তাতে পুরো ধারণাটি ধার করা প্রমাণ হয় না। বাংলাদেশের মাঠ থেকে লেখা সালেক খোকনের আদিবাসী মিথ এবং অন্যান্য (ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, 2011) বইয়ে দিনাজপুরের সাঁওতালদের কথা: তাঁদের “আদি দেবতা সূর্য”, সাঁওতালিতে “সিং বোঙ্গা”; সূর্য পূর্বদিকে ওঠে বলে পূর্বদিক পবিত্র, তাই পূজাসহ নানা অনুষ্ঠানে তাঁরা পূর্বদিকে মুখ করে বসেন (পৃ. 16–17, 145)।
সূর্য আর চাঁদকে ঘিরে একটি কাহিনিও দুই উৎসে প্রায় একইভাবে পাওয়া যায়। কোলেয়ানের বিবরণে সূর্য পুরুষ, চাঁদ তার স্ত্রী, তারারা তাদের সন্তান। রোদের তাপে পৃথিবী পুড়ছিল বলে চাঁদ প্রস্তাব দেয়, দুজনেই নিজেদের সন্তান খেয়ে ফেলবে; চাঁদ তার মেয়েদের ঝুড়ির নিচে লুকিয়ে রেখে মিথ্যা বলে, আর সূর্য সত্যি সত্যি নিজের ছেলেদের খেয়ে ফেলে। রাতে প্রতারণা ধরা পড়লে সূর্য তলোয়ার দিয়ে চাঁদকে কাটে — সেই থেকে মাসে মাসে চাঁদ ক্ষয় হয়। বম্পাসের সংকলনেও একই কাহিনি আছে, শুধু সেখানে কারণটি মানুষকে আগুনে ধ্বংস হওয়া থেকে বাঁচানো, আর বেঁচে যাওয়া দুই তারা শুকতারা ও সন্ধ্যাতারা।
কোলেয়ানের তালিকায় বোঙ্গাদের একটি ক্রম আছে: সিং বোঙ্গা সবার বড়, তারপর জম সিম বোঙ্গা, মারাং বুরু, জাহের এরা, মোড়েকো-তুরুইকো, গোসাঁই এরা, পারগানা, মাঝি হাড়াম, ঘরের ওড়াক বোঙ্গা ও গোপন আবগে বোঙ্গা। নিচের ছকে এই তালিকার সঙ্গে মেনাচেরি (1994) ও বাংলাদেশের মাঠের বিবরণ পাশাপাশি রাখা হলো।
| বোঙ্গা | কোলেয়ান (স্ক্রেফসরুড-বডিং) যা বলে | মেনাচেরি (1994) যা বলে | বাংলাদেশের উৎসে |
|---|---|---|---|
| সিং বোঙ্গা (সূর্য) | “আমাদের বড় বোঙ্গা”; জীবনে অন্তত একবার, সামর্থ্য থাকলে প্রতি পাঁচ-ছয় বছরে ছাগল বলি | সর্বোচ্চ দেবতা, ঠাকুর জিউ, স্রষ্টা; প্রতি পঞ্চম বছরে ছাগল বলি | “আদি দেবতা” (খোকন); “প্রধান উপাস্য” (বাংলাপিডিয়া) |
| জম সিম বোঙ্গা | শুরুতে ছিলেন না, পরে যুক্ত; গোত্রভেদে নাম আলাদা | উল্লেখ নেই | পাওয়া যায়নি |
| মারাং বুরু | আসল নাম লিটা; জাহেরথানে তাঁর পাথর | রক্ষাকর্তা; প্রথম নারী-পুরুষকে জুটি বাঁধিয়েছিলেন | পর্বত-দেবতা, পরে গ্রামদেবতা (বাংলাপিডিয়া); বাহায় প্রথম ফুল (ডেইলি স্টার 2023) |
| জাহের এরা | “পবিত্র কুঞ্জের দেবী”, আসল নাম রাম সালগি | মূর্তিহীন কল্যাণকর দেবী; ভালো ফসল ও গবাদি পশুর মড়কের সময় পূজা | বাহায় মুরগি বলি “জাহেরএরা”র উদ্দেশে (খোকন) |
| মোড়েকো-তুরুইকো | “পাঁচ” ও “ছয়”; ছয়ের প্রশংসা হয়, বলি নয় | তেমন গুরুত্বপূর্ণ নন | বাহার মন্ত্রে “মরেকু তুরেকু” (খোকন) |
| গোসাঁই এরা | মহুয়া গাছের গোড়ায় তাঁর পাথর | পরিবারের দেবী; ঘা সারাতে সাদা মুরগি বলি | বাহায় “গোসায়এরা” (খোকন) |
| পারগানা বোঙ্গা | জাহেরথানে আলাদা পাথর; অঘ্রানে জানথাড় বলি | পরবর্তীকালের | পাওয়া যায়নি |
| মাঝি হাড়াম বোঙ্গা | গ্রামপ্রধানের বাড়ির সামনে মাঝিথানে | মাঝি হাড়াম ও মাঝি বুড়হি গ্রাম পাহারা দেন | রাজশাহীর একটি “মৗঞ্জহি থান” (বিডিনিউজ) |
| ওড়াক (ঘরের) বোঙ্গা ও আবগে বোঙ্গা | গোত্রভেদে আলাদা; নাম বাইরের লোক ও মেয়েদের জানানো হয় না, মৃত্যুর আগে বড় ছেলেকে ফিসফিস করে বলা হয় | ওড়া বোঙ্গা প্রায় 10টি, আবগে প্রায় 20টি; আবগের বলি কেবল পুরুষেরা খান | গৃহদেবতা “আবে বোঙ্গা” (বাংলাপিডিয়া) |
ছকের একটি অমিল চোখে পড়ার মতো। মেনাচেরি মারাং বুরু ও গোসাঁই এরা দুজনকেই “কেবল পরিবারের দেবতা” বলেছেন, কিন্তু কোলেয়ানের বিবরণে দুজনেরই পাথর বসে গ্রামের জাহেরথানে, এবং গ্রামের পুরোহিত সারা গ্রামের হয়ে তাঁদের পূজা দেন। মেনাচেরির বক্তব্য এ. বি. চৌধুরীর The Santals: Religion and Rituals (1987) থেকে নেওয়া।
বোঙ্গাদের এই তালিকার বাইরেও আছে আরও অনেকে। কোলেয়ান বলেছেন, সীমানার বোঙ্গা, নদীর গর্তের বোঙ্গা, পুকুরের বোঙ্গা, গাছের গোড়ার বোঙ্গা, বনের বোঙ্গা, পাহাড়ের বোঙ্গা আছে; ওঝাদের আলাদা বোঙ্গা আছে; যারা ধনী হতে চায় তারা “ধন-বোঙ্গা”র পূজা করে। সীমানার বোঙ্গাদের সম্পর্কে তাঁর কথা: তারা ভীষণ ঈর্ষাপরায়ণ, খুশি না রাখলে সাপ পাঠায়, বাঘে খাওয়ায় বা হঠাৎ অসুখ আনে — তাই বছরে দুবার, রোপণ ও কাটার সময় তাদের মুরগি দেওয়া হয়।
মারাং বুরু শব্দের অর্থ “বড় পাহাড়”। তিনি পর্বত-দেবতা, যিনি বাংলাপিডিয়ার ভাষায় “যথেষ্ট মর্যাদাব্যঞ্জক হয়ে গ্রামদেবতায় পরিণত হয়েছেন”। কোলেয়ানের বিবরণে তাঁর আসল নাম লিটা, আর সৃষ্টির কাহিনিতে তিনিই প্রথম মানুষ দুজনকে হাঁড়িয়া বানাতে শিখিয়েছিলেন।
বডিংয়ের পাদটীকায় আছে, লিটা সাঁওতালদের প্রধান বোঙ্গার আসল নাম, যাঁকে সবসময় “মারাং বুরু” বলে উল্লেখ করা হয়; রংধনুর সাঁওতালি নামেও লিটার নাম জড়িয়ে আছে। কোলেয়ানের কাহিনিতে লিটা প্রথম মানব-মানবী পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়হির কাছে এসে নিজেকে তাঁদের দাদু বলে পরিচয় দেন, হাঁড়িয়ার মূল চিনিয়ে দেন, এবং বলেন — খাওয়ার আগে কিছুটা মারাং বুরুর নামে মাটিতে ঢেলে দিতে হবে।
মেনাচেরি মারাং বুরুকে বলেছেন রক্ষাকর্তা দেবতা, যিনি প্রথম নারী-পুরুষকে জুটি বাঁধিয়ে বংশবিস্তার ঘটিয়েছিলেন। আবার বম্পাসের সংকলনে একটি কাহিনি আছে, যেখানে মারাং বুরু মানুষের সঙ্গে সভা করতেন, মানুষ তাঁর কণ্ঠ শুনত কিন্তু মুখ দেখত না। কোলেয়ানের পরলোক-বর্ণনাতেও মারাং বুরু আছেন — পাপীদের আগুনের গর্তে লোহার কোঁচ হাতে।
বাংলাদেশে বাহা পরবে মারাং বুরুর নাম গানেও শোনা যায়। প্রথম আলোর 31 মার্চ 2019-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বারকোনা গ্রামের জাহেরথানে নারীরা নাচের সঙ্গে গেয়েছিলেন “মারাং বুরুয় চিয়ালেৎ হো বির দিসম দ”। সালেক খোকনের বইয়ে মহেশপুরের বাহার গানে প্রায় একই পঙ্ক্তির অর্থ দেওয়া আছে: “কে কে ওই জঙ্গলে গিয়েছিলো, কে কে ওই জঙ্গলটা পরিষ্কার করেছিলো” (পৃ. 70)।
সাঁওতাল গ্রামে দুটি পবিত্র স্থান থাকে: গ্রামের প্রান্তে গাছের কুঞ্জ জাহেরথান, আর গ্রামপ্রধানের বাড়ির সামনে মাঝিথান। বাংলা উইকিপিডিয়ার সারি ধরম ভুক্তি লিখেছে, “প্রত্যেক গ্রামে একটি মাঝিথান ও জাহেরথান থাকে”। জাহেরথানে মূর্তি থাকে না; থাকে গাছের গোড়ায় পাথর।
জাহেরথান কীভাবে তৈরি হয়, তার বিবরণ দিয়েছেন কোলেয়ান। নতুন গ্রাম পত্তনের সময় গ্রামের রাস্তার শেষ মাথায় পবিত্র কুঞ্জের জায়গা রাখা হয়। তারপর গ্রামবাসীরা বোঙ্গাদের “তুলে আনেন”: কয়েকজন মানুষের ওপর বোঙ্গা ভর করেন, তাঁরা বন থেকে পাথর এনে গাছের গোড়ায় বসান — পাশাপাশি তিনটি, একটি জাহের এরার, একটি মোড়েকোর, একটি মারাং বুরুর; তারপর আরও তিনটি — গোসাঁই এরার পাথর মহুয়া গাছের গোড়ায়, পারগানার পাথর যেকোনো গাছের গোড়ায়, আর মাঝি হাড়ামের পাথর আনা হয় গ্রামে, মাঝির বাড়ির সামনের রাস্তায়; সেখানেই পরে মাঝিথান তৈরি হয়। এরপর ভর-পাওয়া বোঙ্গারা জাহের এরার হাতে জলের লোটা নিয়ে যাঁর মাথায় জল ঢালেন, তিনিই গ্রামের পুরোহিত হন (বডিং, পৃ. 101–104)।
ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Sarnaism ভুক্তি লিখেছে, সাঁওতাল ও ভূমিজরা পবিত্র কুঞ্জকে জাহেরথান বলেন, ওরাওঁরা অন্য নামে, হো-রা অন্য নামে; কুঞ্জে শালগাছ থাকে, সঙ্গে মহুয়া, নিম, বট; কুঞ্জের গাছ কাটা বা ভেতর থেকে কিছু নেওয়া প্রথাগতভাবে নিষিদ্ধ। এই নিষেধ বাংলাদেশের জাহেরথানেও মানা হয় কি না, সে বিষয়ে কোনো বাংলাদেশি উৎস পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের জাহেরথানের দুটি নথিভুক্ত বিবরণ আছে। প্রথম আলোর 2019-এর প্রতিবেদনে বারকোনা গ্রামের জাহেরথান মাঠের পশ্চিম কোণে; নাইকের (পুরোহিত) হাতে কাঁসার থালায় সিঁদুর, কলা, ধূপ আর নতুন ফুল, গোবর দিয়ে লেপা জায়গায় বসে তিনি আচার করেন, জ্যান্ত মুরগির মাথায় সিঁদুর দিয়ে আতপ চাল খাইয়ে বলি দেওয়া হয়, আর জাহেরথানের তিন পাশে নারীরা নাচেন। সালেক খোকনের বইয়ে দিনাজপুরের মহেশপুরে বাহার পূজা হচ্ছিল “গ্রামের একেবারে শেষপ্রান্তে নির্জন বন আকৃতির জায়গায়”; একটি উঁচু জায়গায় তিনটি ধনুক দাঁড় করিয়ে তার মধ্যে চাল, সিঁদুর, ধান, দূর্বা আর শালফুল রাখা ছিল (পৃ. 69)।
মাঝিথান নিয়ে একটি রাষ্ট্রীয় তথ্যও আছে। বিডিনিউজের প্রতিবেদনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন জানিয়েছেন, রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ভানগাছি ইউনিয়নের বাঁশাবাড়িয়া গ্রামে একটি “মৗঞ্জহি থানের (সাঁওতাল উপাসনালয়)” জন্য 2016–2017 অর্থবছরে 50 হাজার টাকা বরাদ্দ হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে; এর বাইরে আর কোনো অনুদানের তথ্য তাঁর জানা নেই।
সাঁওতাল গ্রামের সর্বজনীন পূজা করেন গ্রামের পুরোহিত নায়কে; তাঁর সহকারী “প্রান্তের পুরোহিত” কুডাম নায়কে। ঘরের বোঙ্গা ও পূর্বপুরুষের পূজা করে প্রতিটি পরিবার নিজে। বাংলাদেশের মাঠের বিবরণে অবশ্য গ্রামপ্রধান বা জগ মাঝিকেও পূজা দিতে দেখা গেছে।
কোলেয়ানের বর্ণনায় নায়কে সোহরাইয়ের আগের রাত মাটিতে মাদুর পেতে শুয়ে সংযম পালন করেন, বাহার আগের রাতে নায়কে ও তাঁর স্ত্রী দুজনেই মাটিতে শোন। অঘ্রানের জানথাড় বলি দেন প্রান্তের পুরোহিত, পারগানা বোঙ্গার স্থানে, এবং বলির উপকরণ ও চাল তাঁকেই দিতে হয়। পূজার ভোজে নায়কে ও প্রান্তের পুরোহিত দুই ভাগ পান, অন্যরা এক ভাগ। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Marang Buru ভুক্তিও লিখেছে, সাঁওতালদের মধ্যে পুরোহিতকে বলে নায়কে, মুন্ডাদের মধ্যে পাহান।
গ্রাম চালানোর পাঁচ পদের একটি এই নায়কে — বাংলা উইকিপিডিয়া পাঁচটি পদ গুনেছে: মাঝিবাবা, জগমাঝি, পারানিক, গোডেৎ, নায়কে। পদগুলোর কাজ ও বানানের বিভিন্নতা নিয়ে বিস্তারিত আছে আমাদের মাঝি হাড়াম নিয়ে লেখায়। ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত দিকটি হলো: কোলেয়ানের বিবরণে গোডেৎ ঘরে ঘরে মুরগি ও চাল তোলেন, মাঝি সভা ডেকে পরবের দিন ঠিক করেন, আর পরবের সময় জগমাঝি ও জগপারানিক তরুণ-তরুণীদের দায়িত্বে থাকেন।
বাংলাদেশের দুটি বিবরণে ছবিটা একটু আলাদা। সালেক খোকনের বইয়ে দিনাজপুরের বিরল উপজেলার গিরিডোবায় সোহরাইয়ের প্রথম দিনে মাঠে বোঙ্গা বা সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশে মুরগি বলি দিচ্ছিলেন “গোত্রের মহত” রাগদা হেমব্রন (পৃ. 87); বোচাগঞ্জের মহেশপুরে বাহায় উপোস অবস্থায় পূজা দিচ্ছিলেন “গোত্রের জগ মাঝি” বাঠু সরেন (পৃ. 69)। আর প্রথম আলোর বারকোনার বিবরণে পূজা করেছেন নাইকে। অর্থাৎ বাংলাদেশে কে পূজা করবেন, তা গ্রামভেদে আলাদা দেখা গেছে; কোন নিয়মে, তা উৎসগুলোতে বলা নেই।
সাঁওতাল সৃষ্টিকাহিনি অনুযায়ী শুরুতে কেবল জল ছিল। ঠাকুর জিউ জলের প্রাণী বানালেন, কেঁচো কচ্ছপের পিঠে মাটি তুলে পৃথিবী গড়ল, আর ঠাকুরের বানানো দুটি হাঁস-পাখির ডিম ফুটে জন্ম নিলেন প্রথম মানব-মানবী পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়হি। কাহিনিটি কোলেয়ানের বিবরণে, দিনাজপুরের মাঠে এবং জুমজার্নালের সংগ্রহে — তিন জায়গাতেই পাওয়া যায়।
কোলেয়ানের বিবরণে কাহিনিটি এরকম: ঠাকুর প্রথমে মাটি দিয়ে দুজন মানুষ গড়েছিলেন, কিন্তু প্রাণ দেওয়ার আগেই আকাশ থেকে “দিনের ঘোড়া” নেমে তাঁদের পায়ে মাড়িয়ে যায়। তখন ঠাকুর নিজের বুক থেকে উপাদান নিয়ে দুটি হাঁস-হাঁসিল পাখি বানালেন, ফুঁ দিয়ে প্রাণ দিলেন। পাখিরা বসার জায়গা না পেয়ে বসে ঘোড়ার মুখের ফেনার ওপর। খাবার নেই বলে ঠাকুর একে একে কুমির, চিংড়ি, এক জাতের বড় মাছ আর কাঁকড়াকে পাঠালেন মাটি তুলতে — সবার মাটি জলে গলে গেল। শেষে কেঁচো রাজি হলো, শর্ত — কচ্ছপকে জলের ওপর দাঁড়াতে হবে। ঠাকুর কচ্ছপের চার পা চার দিকে শিকলে বাঁধলেন, কেঁচো মাটি খেয়ে কচ্ছপের পিঠে উগরে দিল, পৃথিবী তৈরি হলো। প্রথম গজাল সিরম ঘাস, তারপর দূর্বা, তারপর করম গাছ। সিরম ঘাসের ঝোপে পাখিরা ডিম পাড়ল, ডিম ফুটে এল এক ছেলে আর এক মেয়ে। তাঁদের নাম হাড়াম ও আয়ো; কেউ কেউ বলেন পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়হি। পাখিরা তাঁদের পিঠে করে রেখে এল পশ্চিমে “হিহিড়ি পিপিড়ি” নামের জায়গায় (বডিং, পৃ. 3–5)।
দিনাজপুরের বোচাগঞ্জের মহেশপুরে দালু সরেন সালেক খোকনকে একই কাহিনি বলেছেন, সামান্য পার্থক্যে: ঠাকুর জিয়ো জলের মধ্যে কাঁকড়া, কুমির, বোয়াল, কাছিম, কেঁচোর মতো জীব সৃষ্টি করলেন, মাটি থেকে এক জোড়া মানব-মানবী গড়লেন, কিন্তু প্রাণ দেওয়ার আগেই আকাশ থেকে “আজব এক ঘোড়া” এসে মূর্তিগুলো খেয়ে ফেলে; তারপর ঠাকুর নিজের বুকের অংশ থেকে এক জোড়া পাতিহাঁস সৃষ্টি করলেন, আর শেষে কেঁচো মাটি তুলে আনলে পৃথিবী তৈরি হলো, পাতিহাঁসের ডিম ফুটে জন্মাল পিলচু হড়ম ও পিলচু বুড়ী (পৃ. 145–146)। এই সংস্করণে কাছিম নিজেও মাটি তুলতে ব্যর্থদের একজন, আর কোলেয়ানের বিবরণে কচ্ছপ মাটি তোলে না, পিঠ পেতে দেয়। একই বইয়ে বিরলের দিকে লেখা আরেকটি সংক্ষিপ্ত রূপ: পৃথিবী সৃষ্টির আগে সব জলে ঢাকা ছিল, কেঁচো ও কচ্ছপ স্রষ্টাকে সাহায্য করে, তারপর স্রষ্টা আদি পিতা-মাতা তৈরি করেন (পৃ. 18–19)।
জুমজার্নালে মানিক সরেনের লেখায় একই সূত্র: “সাঁওতালি পুরানে সাঁওতালদের আদি পিতা-মাতা পিলচু হাড়াম-পিলচু বুডহির জন্ম হয়েছে হাঁস-হাঁসিল নামক পাখি থেকে।” তিনি সাঁওতালদের প্রথম নিবাস হিহিড়ি পিপিড়ি থেকে চাম্পা পর্যন্ত দেশান্তরের একটি ক্রমও দিয়েছেন, আর একটি গানের অর্থ: “হিহিড়ি পিপিড়িতে আমরা জন্মেছিলাম, খোজ কামানে আমরা হারিয়ে গিয়েছিলাম, হারাতাতে আমরা বেড়ে উঠেছিলাম, সাসাং বেডাতে আমরা গোত্র (পদবী) ভাগ করেছিলাম।”
কাহিনির পরের অংশে আছে প্লাবন নয়, আগুনের বৃষ্টি। কোলেয়ানের বিবরণে খোজ কামানে মানুষ এত খারাপ হয়ে যায় যে ঠাকুর তাদের ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নেন; একটি পবিত্র জুটিকে হারাতা পাহাড়ের গুহায় পাঠিয়ে সাত দিন সাত রাত আগুনের বৃষ্টি নামান (কোনো কোনো গুরুর মতে আকাশের বৃষ্টি)। বম্পাসের সংকলনে বৃষ্টিটি পাঁচ দিন পাঁচ রাতের, আর সেখানে সিং চান্দো একজোড়া মানুষকে চামড়া দিয়ে মুখ বন্ধ করা গুহায় লুকিয়ে রাখেন। পিলচু হাড়াম ও পিলচু বুড়হির সন্তানেরাই সাঁওতালদের গোত্রগুলোর আদি পুরুষ: কোলেয়ানের বিবরণে প্রথম সাত গোত্র হাঁসদা, মুরমু, কিস্কু, হেমব্রম, মারান্ডি, সরেন, টুডু; পরে যুক্ত হয় বাস্কে, বেসরা, পাঁওরিয়া, চোঁড়ে ও হারিয়ে যাওয়া বেদেয়া। সালেক খোকনের বইয়ে দালু সরেনের দেওয়া তালিকাতেও 12টি গোত্র, বানান কিছুটা আলাদা (পৃ. 68)।
এই কাহিনি সাঁওতাল জীবনে কেবল গল্প নয়। বডিং তাঁর ভূমিকায় লিখেছেন, পূর্বপুরুষদের এই কাহিনি প্রতিটি সাঁওতালের জীবনে দুবার আবৃত্তি করা হয়: একবার শিশুকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ সামাজিক অধিকার দেওয়ার অনুষ্ঠান চাচো ছাটিয়ারে, আরেকবার মৃত্যুর পর ভান্ডানে, যখন মৃতকে পরলোকে পূর্বপুরুষদের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এই আবৃত্তির কাজ গুরুর; বডিংয়ের ব্যাখ্যায় যেকোনো সাঁওতাল বয়স্ক গুরুর শিষ্য হয়ে গুরু হতে পারেন, তাই সব জায়গায় কাহিনি হুবহু একরকম আশা করা যায় না।
হাঁড়িয়া কেন পবিত্র, তার উত্তরও এই কাহিনিতে। কোলেয়ানের বিবরণে লিটা (মারাং বুরু) পিলচু হাড়াম-বুড়হিকে হাঁড়িয়া বানাতে শেখান। সালেক খোকনের বইয়ে মহেশপুরের এক মহত যে সংস্করণ বলেছেন, তাতে শিক্ষকটি ঠাকুর জিয়ো নিজে, মানুষের বেশে এসে; শর্ত ছিল, তৈরির পর কিছুটা তাঁকে উৎসর্গ না করে তারা যেন তা স্পর্শ না করে (পৃ. 142)। লেখক যোগ করেছেন, “এ কারণেই সাঁওতালসহ আদিবাসীদের কাছে হাঁড়িয়া পবিত্র পানীয়।”
সাঁওতালদের বছর শুরু হয় ফাল্গুনে, আর প্রায় প্রতি ঋতুতে একটি পরব আছে, যার বেশিরভাগই চাষের কোনো ধাপের সঙ্গে জড়িত। সবচেয়ে বড় দুটি হলো পৌষের সোহরাই ও ফাল্গুনের বাহা। বাংলাপিডিয়া ও কোলেয়ানের তালিকা নিচের ছকে পাশাপাশি; দুটি তালিকা মেলে না, কারণ দুটি আলাদা সময়ের ও অঞ্চলের।
| মাস | বাংলাপিডিয়া (বাংলাদেশ) | কোলেয়ান, 1871 (সাঁওতাল পরগনা অঞ্চল) |
|---|---|---|
| ফাল্গুন | নববর্ষের মাস; স্যালসেই উৎসব; বাহা (ফুলফোটার উৎসব) | বাহা, চাঁদের তৃতীয় পক্ষে; “বছর ঘোরার” উৎসব |
| চৈত্র | বোঙ্গাবোঙ্গি | — |
| বৈশাখ | হোম | — |
| আষাঢ় | — | বীজ বোনার মুরগি: প্রতি ঘর একটি; জাহেরথানে প্রতিটি বোঙ্গাকে আলাদা বলি |
| শ্রাবণ | — | রোপণ শেষে “সবুজ মুরগি”, ধান যেন সবুজ হয় |
| ভাদ্র | — | উঁচু জমির প্রথম ফসল (ইরি ও গুন্দলি) জাহেরথানে নিবেদন |
| আশ্বিন | দিবি | — |
| অঘ্রান | — | জানথাড়: নিচু জমির নতুন ধান; পারগানা বোঙ্গার স্থানে শূকর বা ভেড়া বলি |
| পৌষ | পৌষ শেষে সোহরাই, “একপ্রকার জাতীয় উৎসব” | সোহরাই, ধান কাটা-মাড়াইয়ের পর; মাসের শেষ দিনে সাকরাত |
| মাঘ | — | মাঘ মুরগি, ছনঘাস কাটার জন্য; গ্রামের সব পদ “ছেড়ে দেওয়া” ও ফিরে পাওয়ার আনুষ্ঠানিকতা |
কোলেয়ানের তালিকার মাঘ মাসের অনুষ্ঠানটির সামাজিক দিক আছে, যা ধর্ম আর গ্রামশাসনকে এক সুতোয় বাঁধে: মাঘের শেষে মাঝি থেকে নায়কে পর্যন্ত সবাই প্রকাশ্যে বলেন, তাঁরা দায়িত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন; কয়েক দিন পর হাঁড়িয়ার আসরে গ্রামবাসী তাঁদের আবার ফিরিয়ে নেন। বাংলা উইকিপিডিয়ার সূত্রে এই “মাঘ সিম”-এ গ্রাম পরিচালকদের পুনর্নির্বাচনের প্রসঙ্গটি আমাদের মাঝি হাড়ামের লেখায় আছে।
কোলেয়ান আরও কিছু অনিয়মিত অনুষ্ঠানের কথা বলেছেন: বড় বিপদ এলে সারা গ্রামের মানত হিসেবে জাহেরথানে “মাক মোড়ে” বলি; আর কারও ব্যক্তিগত মানতে পূর্বপুরুষ, ঘরের বোঙ্গা ও মারাং বুরুর নামে গরু বলি। তাঁর কথায়, দিকু জমিদারেরা জানতে পারলে ভারী জরিমানা করতেন বলে এই বলি রাতে করতে হতো; বডিংয়ের টীকায় এই জমিদারেরা হিন্দু।
সোহরাই ধান কাটার পরের উৎসব, গবাদি পশুকে ঘিরে, আর সাঁওতালদের প্রধান উৎসব। বাংলাপিডিয়া একে বলেছে “একপ্রকার জাতীয় উৎসব”, যা পৌষ সংক্রান্তিতে পালিত হয় এবং “ফসলের দেবতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশও এ অনুষ্ঠানের অঙ্গ”। দিনাজপুরের গিরিডোবায় এটি সাত দিন ধরে চলে।
তারিখ নিয়ে উৎসগুলো আলাদা। বাংলাপিডিয়া পৌষ সংক্রান্তির দিন বলেছে; কোলেয়ানের বিবরণে পৌষ মাসে, ধান কাটা-মাড়াইয়ের পর, মাঝি সভা ডেকে দিন ঠিক করেন; সালেক খোকনের বইয়ে গিরিডোবার সাঁওতালরা “পৌষ-মাঘ মাসে” সোহরাই পালন করেন (পৃ. 86); আর ইংরেজি উইকিপিডিয়ার “Sohrai” ভুক্তি লিখেছে, ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে উৎসবটি কার্তিকের অমাবস্যায় হয়, তবে সাঁওতাল পরগনায় জানুয়ারির 10 থেকে 15 তারিখের মধ্যে।
সালেক খোকন দিনাজপুরের বিরল উপজেলার গিরিডোবা গ্রামে সাত দিনের যে বিবরণ দিয়েছেন (দৈনিক কালের কণ্ঠ ও সাপ্তাহিক-এ 2009–2010 সালে প্রকাশিত লেখা, বইয়ে পৃ. 86–89), সেটি এরকম:
কোলেয়ানের 1871 সালের বিবরণে সোহরাইয়ের প্রথম দিনের কেন্দ্রে গবাদি পশু। নায়কে জলের ধারে গোবর লেপা একটি চৌকো জায়গায় চালের ছোট ছোট স্তূপ রেখে সিঁদুরের দাগ দেন, স্তূপের ওপর একটি ডিম রাখেন, আর জাহের এরার উদ্দেশে প্রার্থনা করে মুরগি বলি দেন। তারপর রাখাল ছেলেরা গরুর পাল নিয়ে আসে; যে গরু ডিমটি মাড়ায় বা শোঁকে, তার পা ধুয়ে শিং-এ তেল-সিঁদুর মাখানো হয়, আর সেই গরুর রাখালকে কাঁধে তুলে মাঝির কাছে নেওয়া হয়। রাতে তরুণেরা গোয়ালের দরজায় ঢোল বাজিয়ে গরুদের “জাগান”, মেয়েরা প্রদীপ, ধান আর দূর্বা নিয়ে গোয়ালে গোয়ালে বরণ করেন (বডিং, পৃ. 137–140)। উৎসব পাঁচ দিন পাঁচ রাতের, আর মাঝির ঘোষণায় সোহরাইকে বলা হয় “বড় দিদি” এসেছেন।
বাংলাদেশের সোহরাইয়ে গরুর এই অংশ এখনো একইভাবে হয় কি না, খোকনের বিবরণে তা নেই; তাঁর বর্ণনার তৃতীয় দিনের ষাঁড়ের খেলাটিই একমাত্র গবাদি পশু-সম্পর্কিত আচার। কোলেয়ানের তালিকায় সোহরাই ও বাহার মধ্যে একটি পার্থক্যও আছে: সোহরাইয়ে গ্রামের পথে অশ্লীল চিৎকার ও গানের ছাড় থাকে, যা বাহায় থাকে না — তাঁর ভাষায় বাহা “ন্যায়নিষ্ঠ উৎসব”।
বাহা মানে ফুল; বাহা পরব বসন্তে শাল আর মহুয়া ফুল ফোটার উৎসব, সাঁওতালদের দ্বিতীয় বড় উৎসব। নিয়মটি সহজ: বাহা পূজা না হওয়া পর্যন্ত সাঁওতাল মেয়েরা নতুন ফুল খোঁপায় দেন না, মহুয়া খাওয়া হয় না। প্রথম ফুল দেওয়া হয় জাহেরথানের দেবতাদের।
কোলেয়ানের বিবরণে নিষেধটি স্পষ্ট: বাহার আগে বসন্তে ফোটা কয়েকটি গাছের ফুলের রস চোষা যাবে না, শালফুল দিয়ে সাজা যাবে না, মহুয়া খাওয়া যাবে না; কেউ খেলে বাহা না হওয়া পর্যন্ত নায়কে তার বাড়িতে যাবেন না, তার কিছু খাবেনও না। প্রথম আলোর 2019-এর প্রতিবেদন দিনাজপুরে প্রায় একই কথা লিখেছে: বসন্তকে বরণ না করা পর্যন্ত সাঁওতালরা “মাতকমের মধু খায় না, খোঁপায় দেয় না সারজম ফুল”। ডেইলি স্টার বাংলার 11 মার্চ 2023-এর প্রতিবেদন গোবিন্দগঞ্জের আদমপুর থেকে লিখেছে, সাঁওতাল নারীরা প্রথমে “মারঙ বুরু এবং জাহের এঁরা দেবতাকে” ফুল উৎসর্গ করে তারপর নাচ-গান করেন।
তারিখ নিয়ে আবার উৎসভেদ। কোলেয়ানের বিবরণে বাহা ফাল্গুনে, চাঁদের তৃতীয় পক্ষে; প্রথম আলোর প্রতিবেদনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্র সরেন বলেছেন, সমতলের সাঁওতালরা “প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের পূর্ণিমা তিথিতে” এ উৎসব পালন করেন; আর ডেইলি স্টার বাংলার 22 মার্চ 2026-এর প্রতিবেদন গোবিন্দগঞ্জের রাজাবিরাট থেকে লিখেছে, উৎসব হয় “ফাল্গুন মাসের দোল পূর্ণিমার পর থেকে”। বাস্তবে বাংলাদেশে তারিখ গ্রামভেদে আলাদা: বারকোনায় 2019-এ মার্চের শেষে দুই দিন, আদমপুরে 2023-এ 11 মার্চ।
কোলেয়ানের বিবরণে বাহার কেন্দ্রীয় আচারটি ভর। আগের সন্ধ্যায় নায়কের বাড়িতে ঢোল বাজলে তিনজন মানুষের ওপর তিন বোঙ্গা ভর করেন — জাহের এরা, মোড়েকো ও মারাং বুরু। জাহের এরা গলায় হার পরে মাথায় ঝুড়ি আর ঝাঁটা নেন, মোড়েকো তীর-ধনুক, মারাং বুরু কাঁধে কুড়াল। তাঁরা ছুটে গিয়ে জাহেরথান ঝাঁট দেন। পরদিন সকালে আবার ভর হলে মোড়েকো শালগাছের ফুলে তীর ছোড়েন, মারাং বুরু গাছে উঠে ফুল ফেলেন, জাহের এরা ঝুড়িতে সেই ফুল ধরেন। নায়কে প্রতিটি বোঙ্গার স্থানে একটি শালফুলের কুঁড়ি আর একটি মহুয়া রাখেন। বিকেলে নায়কে ফুল নিয়ে গ্রামে ফেরেন, প্রতিটি বাড়ির সামনে মেয়েরা তাঁর পা ধুইয়ে দেন, তিনি তাঁদের একটি করে ফুল দেন, আর একে অপরের গায়ে জল ছিটানো শুরু হয় (বডিং, পৃ. 150–157)।

দিনাজপুরের মহেশপুরে সালেক খোকনের দেখা বাহায় (সাপ্তাহিক, 2 সেপ্টেম্বর 2010; বইয়ে পৃ. 67–70) উৎসবটি তিন দিনের। প্রথম দিন পূজায় মুরগি বলি দেওয়া হয় জাহেরএরা, গোসায়এরা, মরেকু, তুরুইকু নামের দেবতা বা বোঙ্গার সন্তুষ্টির জন্য; তারপর মেয়েরা খোঁপায় শালফুল পরে নাচেন, মাদল-ঢোল বাজিয়ে বাড়ি বাড়ি শালফুল বিলি হয়। দ্বিতীয় দিন একে অপরের গায়ে জল ছিটানো — খোকন লিখেছেন, সাঁওতালরা বিশ্বাস করেন এতে পুরোনো হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়; তৃতীয় দিন কেবল আনন্দের আসর। শালফুলকে সাঁওতালরা বলেন “সারজম বাহা”, আর শালফুল ছাড়া বাহা হয় না। শালফুল পাওয়ার আগে বাড়ির লোক বিতরণকারীর পা ধুইয়ে ভেতরে নেন; খোকনের ভাষায়, “সাঁওতালদের বিশ্বাস ফুল রূপে দেবতা বা বোঙ্গাই তার ঘরে প্রবেশ করেছে।”
এখানে একটি বাস্তব বদল নথিভুক্ত আছে। ডেইলি স্টার বাংলার 2026-এর রাজাবিরাট প্রতিবেদনে আয়োজকদের একজন শ্যামবালা হেমব্রম বলেছেন, উৎসবে শাল ও মহুয়া ফুলের প্রাচীন প্রথা থাকলেও স্থানীয় এলাকায় এসব গাছ না থাকায় অন্য ফুল দিয়েই আনুষ্ঠানিকতা সারা হয়। প্রথম আলোর বারকোনার প্রতিবেদন উৎসবের দুই দিনের নাম দিয়েছে: প্রথম দিন “উম”, দ্বিতীয় দিন “বাহা সীরদি”।
করম গাছের ডাল ঘিরে করম পরব সাঁওতালরা পালন করেন, তবে কোলেয়ান নিজেই বলেছেন এটি প্রতিবেশী “দিকু”দের (অ-সাঁওতাল) কাছ থেকে নেওয়া। সাকরাত পৌষের শেষ দিনের পরব, যার মূল আচার কলাগাছে তীর ছোড়া।
কোলেয়ানের কথায়: দিকুদের কাছ থেকে তাঁরা অনেক পরব নিয়েছেন, কিন্তু তার মধ্যে কেবল করম গোটা গ্রাম মিলে পালন করে; তখন কারমু ও ধারমুকে বেলাওঞ্জা ফুল, রোদে শুকানো ধান, দূর্বা, তেল ও সিঁদুর দেওয়া হয়, আর করম ডালে দুই হাত কাপড় টাঙানো হয় (বডিং, পৃ. 158)। সালেক খোকনের বইয়ে মহেশপুরের সানজিলা যে করম রাজার কাহিনি বলেছেন, তার নায়কেরাও দুই ভাই — করম ও ধরম, লোকে বলে কর্মু ও ধর্মু; ভাদ্র মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীতে উৎসবের প্রসঙ্গ, অপমানিত কর্মুর অভিশাপ, শেষে দুই ভাইয়ের মিলন ও করম গাছের ডাল ছুঁয়ে শপথ — “আমার করম, আমার ধরম”; লেখক লিখেছেন, এ ঘটনার পর থেকে সাঁওতালরা করম উৎসব পালন করে আসছে (পৃ. 140–141)। বিডিনিউজের প্রতিবেদন লিখেছে, কারাম উৎসব উত্তরের 38টি জাতিগোষ্ঠীকে “এক বৃন্তে বেঁধে রেখেছে”। ওরাওঁ, মুন্ডা ও অন্যদের করমের বিবরণ আলাদা; মুন্ডাদের প্রসঙ্গ আছে আমাদের মুন্ডা জনগোষ্ঠী নিয়ে লেখায়।
সাকরাত নিয়ে দুই উৎসের বিবরণ অনেকটা মেলে। কোলেয়ানের বিবরণে পৌষের শেষ দিনে ঘরে ঘরে মুরগি কাটা হয়, পুরুষেরা কাছের বনে শিকারে যান, ফিরে বোঙ্গা ও পূর্বপুরুষদের পিঠা আর চিড়া দেন, তারপর জগমাঝি একটি কলাগাছ বা রেড়িগাছ কেটে গ্রামের রাস্তার শেষে পোঁতেন; প্রথমে নায়কে তীর ছোড়েন, তারপর সব পুরুষ, যতক্ষণ না কেউ লক্ষ্যভেদ করেন। বিজয়ীকে জগমাঝি কাঁধে তুলে সবার কাছে নেন, আর কাটা গাছটিকে দুজন মানুষ শিকারের পশুর মতো কাঁধে করে মাঝির বাড়িতে নিয়ে যান — নাম “মাঝির শিকারের মাংস” (বডিং, পৃ. 148–149)। সালেক খোকন দিনাজপুরে একটি কাহিনি শুনেছেন গিরিডোবার রাগদা হেমব্রনের মুখে — এক সাঁওতাল রাজা, রানির প্রতিহিংসা আর রাজার বোনের কথা — যার শেষে লেখক লিখেছেন, সেই থেকে “সাঁওতালদের শাকরাৎ-এর সময় কলাগাছে তীর মারা ও লাঠির ঘায়ে হাঁড়ি ভাঙাকে এরা অশুভ শক্তির প্রতীকী বিনাশ বলে মনে করে” (পৃ. 17–18)।
প্রথাগতভাবে সাঁওতালরা মৃতদেহ দাহ করেন, পরে সুবিধামতো সময়ে শ্রাদ্ধ হয়; বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি ভুক্তি অনুযায়ী এখন অনেকে কবরও দেন। বিশ্বাসে মৃত প্রাপ্তবয়স্ক পূর্বপুরুষ-বোঙ্গা হন, আর ঠাকুর পরলোকে ভালো-মন্দ কাজের বিচার করেন।
বাংলাপিডিয়ার বাংলা ভুক্তি লিখেছে, গ্রামের কোনো সদস্য মারা গেলে গ্রামপ্রধানকে উপস্থিত হয়ে মৃতকে “যথোচিত মর্যাদায়” সৎকারের ব্যবস্থা করতে হয়। ইংরেজি ভুক্তি যোগ করেছে: “Santals cremate their dead bodies. But today, many of them bury the dead in graves.”
কোলেয়ানের বিবরণে দাহের পর পোড়া হাড় — তাঁদের ভাষায় “ফুল-হাড়” — নেওয়া হয় দামোদর নদে। নদের কাছে যাঁরা থাকেন তাঁরা দাহের দিনই ভাসান; দূরের মানুষেরা দুই-তিন বছর পর, বেশিরভাগ অঘ্রান মাসে। মৃতের উত্তরাধিকারী সূর্যোদয়ের দিকে মুখ করে ডুব দিয়ে হাড় ভাসিয়ে দেন। হেমব্রম গোত্রের কেউ কেউ হাড় নেন অন্য একটি নদীতে (বডিং, পৃ. 181–182)। বাংলাদেশের সাঁওতালরা হাড় কোথায় ভাসান, সে বিষয়ে কোনো উৎস পাওয়া যায়নি।
পরলোক নিয়ে কোলেয়ানের বিশ্বাস: ঠাকুর প্রত্যেকের জন্য একটি “সের” (মাপ) বেঁধে দিয়েছেন, তা ফুরোলে তিনি নিয়ে যান, এবং পরলোকে ভালো-মন্দ কাজ বিচার করে জায়গা দেন; ভালো মানুষের ওপর বোঙ্গাদের কোনো ক্ষমতা নেই। বম্পাসের সংকলনে পরলোকের ছবি অন্যরকম: সেখানে চান্দো বোঙ্গা মৃতদের দিয়ে কঠোর পরিশ্রম করান, জল পাওয়া কঠিন, তাই মৃতের সঙ্গে জলপাত্র দেওয়া হয়। একই বইয়ে আছে, শিশুরা মারা গেলে ভূত হয়, আর প্রাপ্তবয়স্করা পূর্বপুরুষ-বোঙ্গা, যাঁদের বাহা ও সোহরাইয়ে বলি দেওয়া হয়।
সাঁওতাল ধর্মে প্রতিবেশী হিন্দু সমাজের প্রভাব পুরোনো, আর খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণও বড় আকারে হয়েছে। বিডিনিউজের 2022-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় 50 শতাংশ সাঁওতাল খ্রিষ্টান হয়ে গেছেন। প্রতিবেদনটির শিরোনামই সংকটের নাম দিয়েছে: “নিভু নিভু ধর্মের বাতি”।
কোলেয়ান নিজেই হিন্দু প্রভাবের কথা খোলাখুলি বলেছেন। তাঁর তালিকায় দিকুদের পরবগুলোতে — দুর্গা, কালী, মনসা, ছাতা, পাতা, জাত্রা — যারা পালন করে তারা নিজেরা পূজা দেয়, বাকিরা কেবল দেখতে যায়; কিন্তু “এই পরবগুলো আমাদের নয়”, তাই অন্য জাতির বোঙ্গাকে পূজা দেওয়া ঠিক নয়, এতে নিজেদের বোঙ্গারা রাগ করেন — “সতিনের সংসারের মতো, কাউকেই খুশি রাখা যায় না” (বডিং, পৃ. 158)। বডিং তাঁর ভূমিকায় যোগ করেছেন, গুরুদের কাহিনিতেই আছে যে পূর্বপুরুষেরা একসময় দীর্ঘ আলোচনার পর কিছু নিজস্ব রীতি ছেড়ে হিন্দু রীতি গ্রহণ করেছিলেন, আর উৎসবে ও দাহের সময় অনেক গান গাওয়া হয় বিহারি ভাষায়, যা অনেক সাঁওতাল বোঝেন না। মেনাচেরি (1994) লিখেছেন, সাঁওতালরা পরে কালী, সরস্বতী প্রভৃতি হিন্দু দেবতার পূজাও শুরু করেন। বাংলাপিডিয়াও বলেছে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানে “লৌকিক হিন্দু দেবদেবীর প্রভাবও” দেখা যায়।
খ্রিষ্টধর্মের প্রসঙ্গে বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি ভুক্তি লিখেছে, দারিদ্র্যপীড়িত জীবনে মিশনারিদের সমাজকল্যাণমূলক কাজ ও তার সঙ্গে আধ্যাত্মিক শান্তির বাণী প্রচার খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণকে ত্বরান্বিত করেছে। সালেক খোকন মহেশপুর থেকে লিখেছেন (সাপ্তাহিক, 16 সেপ্টেম্বর 2010): অভাবের কারণে সেখানে অনেক সাঁওতাল পরিবার খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছে, ফলে হাঁড়িয়া বন্ধ না হলেও পুরোনো আচারগুলো ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে; গ্রামের মহত বাঠু সরেন দুঃখ করে বলেছেন, “অভাবের সাথে সাথে সাঁওতালরা বিক্রি করে ফেলছে নিজেদের জাতি সত্তাটুকু” (পৃ. 142)।
কতজন খ্রিষ্টান, তার কোনো সরকারি হিসাব নেই, কারণ শুমারি ধর্মকে জাতির সঙ্গে মিলিয়ে প্রকাশ করে না। বিডিনিউজের প্রতিবেদনে “প্রায় 50 শতাংশ” সংখ্যাটির পেছনে কোনো জরিপের উল্লেখ নেই। একই প্রতিবেদনে খোকন সুইটেন মুর্মু জাতীয় আদিবাসী পরিষদের নিজস্ব হিসাব দিয়েছেন: দেশে সাঁওতাল 5 লাখের বেশি, তার অন্তত অর্ধেক সারি-সারনা ধর্মের; আর খোকন ও মানিক দুজনের মতে উত্তরের সব জাতি মিলিয়ে সারি-সারনা অনুসারী তিন লাখের বেশি। বিডিনিউজের একই প্রতিবেদন জনশুমারি 2022-এর প্রাথমিক ফল থেকে সাঁওতালের সংখ্যা দিয়েছে 1,29,049; জুমজার্নালের মাঝি হাড়াম লেখায় বিবিএস-এর জাতীয় প্রতিবেদন থেকে সংখ্যাটি 1,29,056। সংখ্যার এই ফারাক নিয়ে বিস্তারিত আছে আমাদের জনশুমারিতে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী গোনার পদ্ধতি নিয়ে লেখায়।
ধর্ম পালনের বাস্তব বাধার কথাও বিডিনিউজের প্রতিবেদনে আছে। মানিক সরেন বলেছেন, এই ধর্মাবলম্বীদের “বাধ্য হয়ে নিজেদের সনাতন বা হিন্দু বলে পরিচয় দিতে হয়”। তিনি নিজে বিয়ে করেছেন খেরোয়ালদের আদি রীতি “সার সাগুনে বিহা” মেনে, কিন্তু প্রতিবেদন অনুযায়ী এ ধর্মের “কেতাবি স্বীকৃতি নেই বলে বিয়ে রেজিস্ট্রি করা যায় না”। একই প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী পারভেজ হাসেম সংবিধানের 41 অনুচ্ছেদ উদ্ধৃত করে বলেছেন, সাঁওতাল বা যেকোনো জাতিগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের আদি ধর্মের অনুসারী বলে পরিচয় দেওয়ার অধিকার রাখেন, ধর্মান্তরিত হওয়ার পর আদি ধর্মে ফিরে যেতেও সংবিধানে বাধা নেই।
বাংলাদেশের জনশুমারিতে ধর্মের পাঁচটি ঘর: মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও “অন্যান্য”। সারি ধরম বা সারনার আলাদা ঘর নেই, আর “অন্যান্য” ঘরে কারা আছেন তার ভাঙনও প্রকাশিত হয় না। ফলে প্রথাগত বিশ্বাসের সাঁওতাল কতজন, শুমারি থেকে তা জানা যায় না।
বিডিনিউজের প্রতিবেদনের ভাষায়, সংবিধান সবাইকে নিজ ধর্ম পালনের অধিকার দিলেও “রাষ্ট্রের খাতায় মোটা দাগে ধর্ম আছে পাঁচটি। এর মধ্যে মূলধারার চারটি, আর বাকিগুলো মিলিয়ে ‘অন্যান্য’।” প্রতিবেদন অনুযায়ী সাঁওতালসহ সারি ও সারনা ধর্মাবলম্বী উত্তরের 38টি জাতিগোষ্ঠী চায়, শুমারিতে তাদের সংখ্যাও জানানো হোক, আর ধর্ম মন্ত্রণালয় তাদেরও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও উৎসবে সহায়তা করুক।
শুমারির সংখ্যা দিয়ে প্রশ্নটির উত্তর কেন মেলে না, তা দুটি জেলার প্রকাশিত ছক পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়। দুটি জেলাতেই বিবিএস-এর জেলা প্রতিবেদন থেকে নেওয়া (Table 3.1.13 ধর্ম, Table P17 জাতিগোষ্ঠী):
| জেলা (2022) | মোট ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী | এর মধ্যে সাঁওতাল | ধর্ম: খ্রিষ্টান | ধর্ম: “অন্যান্য” |
|---|---|---|---|---|
| চাঁপাইনবাবগঞ্জ | 23,278 | 6,409 | 7,216 | 2,106 |
| জয়পুরহাট | 26,325 | 2,833 | 4,756 | 3,951 |
ছকটি কোনো সিদ্ধান্ত দেয় না, কেবল সীমা দেখায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে “অন্যান্য” ধর্মের মানুষ 2,106 জন, অথচ শুধু সাঁওতালই 6,409 আর ওরাওঁ 6,510; জয়পুরহাটে “অন্যান্য” 3,951, সাঁওতাল 2,833। “অন্যান্য” ঘরের মানুষ কোন জাতির, আর প্রথাগত বিশ্বাসের মানুষ কোন ঘরে লেখা হয়েছেন — হিন্দু, “অন্যান্য” নাকি অন্য কোথাও — প্রকাশিত ছক থেকে তা জানা যায় না। মানিক সরেনের “বাধ্য হয়ে নিজেদের সনাতন বা হিন্দু বলে পরিচয় দিতে হয়” কথাটি এই প্রসঙ্গেই প্রাসঙ্গিক। রাষ্ট্র কোন শব্দে জাতিগুলোকে গোনে, তার নথি-কালানুক্রম আছে আমাদের সরকারি পরিভাষা নিয়ে লেখায়।
ভারতে সাঁওতালসহ আদিবাসীদের প্রকৃতি-পূজাকে শুমারিতে আলাদা ধর্ম হিসেবে গোনার দাবিতে দুটি রাজ্য বিধানসভা প্রস্তাব পাস করেছে: ঝাড়খণ্ড 11 নভেম্বর 2020-এ সারনা কোডের পক্ষে, পশ্চিমবঙ্গ 17 ফেব্রুয়ারি 2023-এ সারি ও সারনা দুটিকে আলাদা ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃতির পক্ষে। পশ্চিমবঙ্গের প্রস্তাবে কেন্দ্র 2024 সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সাড়া দেয়নি বলে আউটলুক লিখেছে; ঝাড়খণ্ডের প্রস্তাবের পরিণতি নিয়ে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।
ডাউন টু আর্থ-এ ঈশান কুকরেতির 11 নভেম্বর 2020-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী ঝাড়খণ্ড মন্ত্রিসভা 10 নভেম্বর প্রস্তাবটি অনুমোদন করে, পরদিন বিধানসভা পাস করে; কেন্দ্র অনুমোদন দিলে 2021-এর শুমারিতে নতুন ধর্মের ঘর রাখতে হতো। প্রতিবেদনটি লিখেছে, ভারতের শুমারিতে 1871 থেকে 1951 পর্যন্ত উপজাতিকে ধর্মীয় পরিচয় হিসেবে আলাদা ঘর ছিল, পরে বাদ পড়ে। তখন নাগরিকেরা কেবল ছয়টি ধর্ম থেকে বেছে নিতে পারতেন। একই প্রতিবেদনে রাঁচির একজন অধিকারকর্মী আপত্তিও তুলেছেন: “সারনা” নামটি প্রকৃতি-পূজারি সবার নয়।
আউটলুক-এ স্নিগ্ধেন্দু ভট্টাচার্যের 8 ফেব্রুয়ারি 2024-এর প্রতিবেদন লিখেছে, পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা 17 ফেব্রুয়ারি 2023-এ সারি ও সারনাকে আলাদা ধর্মীয় সম্প্রদায় হিসেবে স্বীকৃতির প্রস্তাব পাস করে, 10 দিন পর রাজ্য সরকার তা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠায়, আর প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কেন্দ্র সাড়া দেয়নি। প্রতিবেদনে “সারি ধরম আভেন আরাং” নামের একটি সাঁওতাল কর্মী-দলের দিল্লিতে প্রতিবাদ ডাকার কথাও আছে।
ভারতের 2011 সালের শুমারির সংখ্যা ইংরেজি উইকিপিডিয়ার Sarnaism ও Sari Dharam ভুক্তি থেকে: “অন্যান্য ধর্ম ও বিশ্বাস” ঘরের ভেতরে সারনা লিখেছেন 49,57,467 জন, যাঁদের 30.48 শতাংশ সাঁওতাল; আর সারি ধরম লিখেছেন 5,06,369 জন, যাঁদের 94.43 শতাংশ পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতাল। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো সংখ্যা নেই।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এর একটি প্রাসঙ্গিকতা আছে। বিডিনিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী এখানে দাবিটি “সারি-সারনা” নামে, আর এটি কেবল সাঁওতালদের নয়, উত্তরের 38টি জাতিগোষ্ঠীর। উত্তরবঙ্গের অন্য জাতিগুলোর পরিচয় পাওয়া যাবে আমাদের সমতলের আদিবাসী জাতিগুলোর তালিকায়; বরেন্দ্রের ওরাওঁদের নিয়ে আছে কুড়ুখ ভাষার লেখা। পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর সব লেখা একসঙ্গে আছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
সাঁওতালরা নিজেদের প্রথাগত ধর্মকে সাধারণত “সারি ধরম” বলেন; একই বিশ্বাসকে কেউ কেউ “সারনা” বলেন। বিডিনিউজের 2022-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে দাবিটি “সারি-সারনা” নামে, আর অনুসারীরা সাধারণভাবে “সনাতন সাঁওতাল” বলে পরিচিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিহার ও ঝাড়খণ্ডের সাঁওতালরা নিজেদের সারনা বলেন বলে একই প্রতিবেদন লিখেছে।
বোঙ্গা হলো সাঁওতাল বিশ্বাসের অনৈসর্গিক আত্মা বা দেবসত্তা। বাংলাপিডিয়ার ভাষায় এই আত্মাই “সব ঐহিক ভালমন্দ নির্ধারণ করে”। সূর্য সিং বোঙ্গা, পর্বত-দেবতা মারাং বুরু, জাহেরথানের দেবী জাহের এরা থেকে শুরু করে ঘরের গোপন আবগে বোঙ্গা, সীমানা, বন ও নদীর বোঙ্গা, এমনকি মৃত পূর্বপুরুষ — সবাই বোঙ্গা।
না। বাংলাপিডিয়া লিখেছে, সাঁওতালদের ধর্মাচরণে মূর্তিপূজার প্রচলন নেই। জাহেরথানে দেবতাদের প্রতীক গাছের গোড়ায় রাখা পাথর; 1871 সালে লিখে নেওয়া গুরু কোলেয়ানের বিবরণ অনুযায়ী জাহের এরা, মোড়েকো ও মারাং বুরুর তিনটি পাথর পাশাপাশি থাকে, গোসাঁই এরার পাথর মহুয়া গাছের গোড়ায়। মেনাচেরি (1994) লিখেছেন, জাহের এরার কোনো মূর্তি নেই।
জাহেরথান সাঁওতাল গ্রামের পবিত্র কুঞ্জ, গ্রামের রাস্তার শেষ প্রান্তে, যেখানে গ্রামের প্রধান বোঙ্গাদের সর্বজনীন পূজা হয়। কুঞ্জে শালগাছ থাকে। গ্রামপ্রধানের বাড়ির সামনে আলাদা একটি স্থান মাঝিথান, মাঝি হাড়াম বোঙ্গার জন্য। প্রথম আলোর 2019-এর প্রতিবেদনে দিনাজপুরের বারকোনায় জাহেরথানে বাহা পূজার বিবরণ আছে।
সাঁওতালরা ঠাকুর জিউকে সৃষ্টিকর্তা মানেন। বাংলাপিডিয়া ও মেনাচেরি (1994) সূর্য-দেবতা সিং বোঙ্গাকেই ঠাকুর জিউ হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু 1871 সালে গুরু কোলেয়ানের বিবরণে ঠাকুর আলাদা: অদৃশ্য সৃষ্টিকর্তা, যিনি মানুষকে আনেন ও নিয়ে যান; সিং বোঙ্গা তাঁর অধীন “ভালো বোঙ্গা”। দুটি অবস্থানই নথিতে আছে।
তাঁরা সাঁওতাল সৃষ্টিকাহিনির প্রথম মানব-মানবী। কাহিনি অনুযায়ী ঠাকুরের বানানো হাঁস-হাঁসিল পাখির ডিম ফুটে তাঁদের জন্ম, প্রথম নিবাস হিহিড়ি পিপিড়ি। তাঁদের সাত ছেলে-সাত মেয়ে থেকে হাঁসদা, মুরমু, কিস্কু, হেমব্রম, মারান্ডি, সরেন, টুডু গোত্রের শুরু। কাহিনিটি কোলেয়ানের বিবরণে, দিনাজপুরে সালেক খোকনের সংগ্রহে ও জুমজার্নালে মানিক সরেনের লেখায় আছে।
প্রধান দুটি হলো সোহরাই ও বাহা। বাংলাপিডিয়া সোহরাইকে “একপ্রকার জাতীয় উৎসব” বলেছে, পৌষ সংক্রান্তিতে; দিনাজপুরের গিরিডোবায় এটি সাত দিন ধরে চলে বলে সালেক খোকন লিখেছেন। বাহা ফাল্গুনে, শাল ও মহুয়া ফুল ফোটার উৎসব। এর বাইরে বীজ বোনা, রোপণ, প্রথম ফসল, করম ও সাকরাতের অনুষ্ঠান আছে।
বাহা পূজার আগে সাঁওতাল মেয়েরা নতুন ফুল, বিশেষত শালফুল, খোঁপায় দেন না এবং মহুয়া খাওয়া হয় না। প্রথম আলো (2019) দিনাজপুর থেকে লিখেছে, বসন্তকে বরণ না করা পর্যন্ত সাঁওতালরা “মাতকমের মধু খায় না, খোঁপায় দেয় না সারজম ফুল”। কোলেয়ানের বিবরণে, নিয়ম ভাঙলে নায়কে সেই বাড়িতে যান না।
গ্রামের সর্বজনীন পূজা করেন পুরোহিত নায়কে; তাঁর সহকারী প্রান্তের পুরোহিত কুডাম নায়কে। ঘরের বোঙ্গা ও পূর্বপুরুষের পূজা পরিবার নিজে করে। বাংলাদেশে অবশ্য দিনাজপুরের গিরিডোবায় সোহরাইয়ের বলি দিয়েছেন গোত্রের মহত, আর মহেশপুরে বাহার পূজা দিয়েছেন জগ মাঝি — সালেক খোকনের 2011 সালের বইয়ে এমনটাই লেখা।
সরকারি হিসাব নেই, কারণ জনশুমারি ধর্মকে জাতির সঙ্গে মিলিয়ে প্রকাশ করে না। বিডিনিউজের 17 ডিসেম্বর 2022-এর প্রতিবেদন লিখেছে, প্রায় 50 শতাংশ সাঁওতাল খ্রিষ্টান হয়ে গেছেন। একই প্রতিবেদনে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের হিসাব, দেশে সাঁওতাল 5 লাখের বেশি এবং তাঁদের অন্তত অর্ধেক সারি-সারনা ধর্মের।
না। বাংলাদেশের জনশুমারি 2022-এ ধর্মের পাঁচটি ঘর: মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ ও “অন্যান্য”। “অন্যান্য”-এর ভেতরের ভাঙন প্রকাশিত হয় না। যেমন চাঁপাইনবাবগঞ্জে “অন্যান্য” ধর্মের মানুষ 2,106 জন, অথচ জেলার সাঁওতাল 6,409 জন (বিবিএস জেলা প্রতিবেদন)। সারি-সারনা অনুসারীরা শুমারিতে নিজেদের সংখ্যা প্রকাশের দাবি করছেন।
সারনা কোড হলো ভারতের শুমারিতে আদিবাসীদের প্রকৃতি-পূজাকে আলাদা ধর্ম হিসেবে গোনার দাবি। ঝাড়খণ্ড বিধানসভা 11 নভেম্বর 2020-এ এর পক্ষে প্রস্তাব পাস করে (ডাউন টু আর্থ); পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা 17 ফেব্রুয়ারি 2023-এ সারি ও সারনা দুটিকে আলাদা স্বীকৃতির প্রস্তাব পাস করে। আউটলুকের 2024-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী কেন্দ্র তখনো সাড়া দেয়নি।
জুমজার্নালের নিজস্ব সংগ্রহ
মৌখিক ঐতিহ্যের লিখিত রূপ ও পুরোনো সংকলন
বিশ্বকোষ
গবেষণা
সরকারি পরিসংখ্যান
সংবাদমাধ্যম
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:সাঁওতাল, সাঁওতাল সমাজ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।