Last updated Oct 23rd, 2026
0

রাখাইনরা কবে বাংলাদেশে এসেছে — এই প্রশ্নের সবচেয়ে প্রচলিত উত্তর ১৭৮৪, যে বছর বর্মি রাজা বোধ পায়ার বাহিনী আরাকান রাজ্য দখলে নামে। কিন্তু নথি একটি সালের কথা বলে না, বলে কয়েকটি ঢেউয়ের কথা: ১৭৮৪-র আগেও আরাকানিরা চট্টগ্রাম অঞ্চলে ছিলেন, শরণার্থীর সবচেয়ে বড় স্রোত এসেছিল ১৭৯৭ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে, আর পটুয়াখালী-বরগুনার উপকূলে বসতি গড়ার নথিভুক্ত প্রমাণ মেলে উনিশ শতকের প্রথম দশকগুলোতে।
এই লেখা সেই ইতিহাস ধাপে ধাপে সাজিয়েছে: আরাকানের পতন, কক্সবাজারে হিরাম কক্সের পুনর্বাসন, বাকেরগঞ্জের সুন্দরবনে বন কেটে বসতি, কুয়াকাটা নামের গল্প, আর 2022 সালের জনশুমারিতে উপকূলের রাখাইনরা কোথায় কতজন। যেখানে উৎসগুলো আলাদা কথা বলে, সেখানে দুটোই পাশাপাশি রাখা হয়েছে। রাখাইন ও মারমার পার্থক্য এবং ‘মগ’ নামের ইতিহাস আলাদা লেখায় আছে — রাখাইন ও মারমা আলাদা জাতি, আর ‘মগ’ নামটি কোথা থেকে এল; এখানে তা আবার বলা হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও আশপাশের জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের সব লেখার সূচি পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
এই লেখায় যা আছে
সরাসরি উত্তর: আজকের কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনার রাখাইনদের পূর্বপুরুষদের বড় অংশ এসেছিলেন ১৭৮৪-৮৫ সালে আরাকান বর্মি শাসনে যাওয়ার পরের তিন-চার দশকে, শরণার্থী হয়ে। বাংলাপিডিয়া একে বলে “আঠারো শতকের শেষে” আসা। তবে আরাকানিদের উপস্থিতি এর আগেও ছিল, আর আগমন একবারে শেষ হয়নি।
উৎসগুলো মিলিয়ে দেখলে অন্তত চারটি স্তর আলাদা করা যায়। প্রথম স্তর ১৭৮৪-র আগের: ১৬৬৬ সালে মোগলদের চট্টগ্রাম দখলের আগে পর্যন্ত গোটা কক্সবাজার অঞ্চল আরাকান রাজ্যের অংশ ছিল বলে বাংলাপিডিয়ার কক্সবাজার জেলা ভুক্তি জানায়, আর Kyaw Minn Htin-এর 2015 সালের গবেষণাপ্রবন্ধ এক সমসাময়িক হিসাব উদ্ধৃত করে বলে, ১৭৭৫ সালে প্রায় 2,000 আরাকানি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এলাকায় বসতি গড়তে এসেছিলেন। দ্বিতীয় স্তর ১৭৮৪-৮৫ সালের পতনের ঠিক পরের পলায়ন। তৃতীয় স্তর, যেটি সবচেয়ে বড়, ১৭৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ১৮০০ পর্যন্ত — আরাকানে বিদ্রোহ ও বর্মি দমনের পর। চতুর্থ স্তর উনিশ শতকের প্রথম ভাগে: চট্টগ্রাম ও রামু থেকে আরাকানিরা দল বেঁধে বাকেরগঞ্জের সুন্দরবনে, অর্থাৎ আজকের পটুয়াখালী-বরগুনায়, গিয়ে বসতি গড়েন। ১৯০৮ সালের চট্টগ্রাম জেলা গেজেটিয়ার আরও একটি ঢেউয়ের কথা বলে — প্রথম ইঙ্গ-বর্মি যুদ্ধের (১৮২৪) কিছু আগে ব্রিটিশ আশ্রয়ে আসা আরাকানিরা।
তাহলে ১৭৮৪ সালটি এত পরিচিত কেন? কারণ সালটি একটি রাজ্যের শেষের প্রতীক। আমাদের আর্কাইভের দুটি লেখাই এই সালকে কেন্দ্রে রাখে। জওয়াং রাখাইনের রাখাইন বা মারমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতি কথা লেখে, আরাকান থেকে বিতাড়িত মানুষ মাতামুহুরি উপত্যকা হয়ে কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়ায় ছড়িয়ে পড়েন, আর অনেকে চলে যান পটুয়াখালী ও বরিশালের দিকে। মেইনথিন প্রমীলার বরিশাল অঞ্চলের রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর ভূমি এবং সম্পদে অধিকার লেখাটি শুরুই হয় এই বাক্যে যে রাখাইনরা বাংলার মাটিতে জীবন সাজিয়ে তোলেন “১৭৮৪ সাল থেকে”। কিন্তু উনিশ শতকের ব্রিটিশ জেলা-বিবরণী পটুয়াখালী অঞ্চলের ক্ষেত্রে আরও পরের সাল দেয়। এই দুই ধরনের দাবি নিচে আলাদা অংশে পাশাপাশি রাখা আছে।
সরাসরি উত্তর: ১৭৮৪ সালের শেষে বর্মার Konbaung বংশের রাজা বোধ পায়া (Bodawpaya) আরাকান আক্রমণ করেন। ইংরেজি উইকিপিডিয়ার হিসাবে অভিযান শুরু হয় 2 ডিসেম্বর 1784, আর রাজধানী ম্রাউক-উ (Mrauk U) দখল হয় 2 জানুয়ারি 1785। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ম্রাউক-উ রাজ্যের সেখানেই শেষ।
উইকিপিডিয়ার “Konbaung conquest of Arakan” নিবন্ধ অনুযায়ী অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন যুবরাজ Thado Minsaw; বাহিনীতে ছিল 20,000-এর বেশি সৈন্য, 2,500 অশ্বারোহী আর 200 হাতি। তিনটি দল Arakan Yoma পর্বতশ্রেণি তিনটি গিরিপথে পেরোয়, চতুর্থ দলটি আসে নৌপথে। শেষ আরাকানরাজ Maha Thammada (বাংলাপিডিয়ায় “তামাদা”) 31 ডিসেম্বর 1784 বর্মি শিবিরে আক্রমণ চালিয়ে পরাজিত হন; তাঁকে সপরিবারে বর্মার তখনকার রাজধানী Amarapura-য় নিয়ে যাওয়া হয়, আর দুই বছর পর বন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই নিবন্ধ Aye Chan-এর 2005 সালের গবেষণা উদ্ধৃত করে বলে, দখলের পর প্রায় 35,000 মানুষ ব্রিটিশ শাসিত চট্টগ্রাম অঞ্চলে পালিয়ে আসেন।
পতনের সালটি নিয়ে উৎসে অমিল আছে। উইকিপিডিয়া রাজধানী পতনের তারিখ দেয় জানুয়ারি 1785; ১৯০৮ সালের চট্টগ্রাম গেজেটিয়ার এক জায়গায় 1784, আরেক জায়গায় 1783 লেখে; হেনরি বেভারিজের ১৮৭৬ সালের বাকেরগঞ্জ জেলা-বিবরণী আরাকানের বর্মায় অন্তর্ভুক্তির সাল দেয় 1787। বাংলাপিডিয়ার বাংলা ভুক্তি বলে, “মধ্য-আঠারো শতকে আমত্য হারি’র আমন্ত্রণে ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজ আরাকান দখল করে”, আর ১৭৮৫ সালে তামাদা পালিয়ে গেলে বোধ পায়া আরাকানকে ব্রহ্মদেশের সঙ্গে যুক্ত করেন। সাধারণ পাঠকের জন্য ব্যাপারটা সহজ: অভিযান শুরু ১৭৮৪-র শেষে, রাজধানী পতন ১৭৮৫-র শুরুতে, আর রাখাইন সমাজের স্মৃতিতে ও লেখায় সালটি ১৭৮৪।
দখলের সঙ্গে আরাকানের সবচেয়ে পবিত্র বুদ্ধমূর্তি মহামুনিকে বর্মার মূল ভূখণ্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। উইকিপিডিয়ার ম্রাউক-উ নিবন্ধ জানায়, মূর্তিটি এখন মান্দালয়ে। জওয়াং রাখাইনের লেখা Abid Bahar-এর একটি প্রবন্ধ উদ্ধৃত করে বলে, বর্মি রাজা পুত্রের নেতৃত্বে বিশাল বাহিনী পাঠান, যারা নগর গুঁড়িয়ে দেয় এবং আরাকানিদের গৌরবের প্রতীক মহামুনিকে নিয়ে যায়। নিহতের সংখ্যা নিয়ে বাংলাপিডিয়ার দুই ভাষার ভুক্তিই একটি বড় অঙ্ক দেয় — অন্তত দুই লক্ষ আরাকানি হত্যা এবং প্রায় সমসংখ্যক মানুষকে দাস হিসেবে বর্মায় পাঠানো। এই সংখ্যার পেছনে কোনো সমসাময়িক নথির উল্লেখ ভুক্তিতে নেই; এটি বাংলাপিডিয়ার ভুক্তির লেখক কামরুল হাসানের দেওয়া হিসাব হিসেবেই পড়া উচিত।
সরাসরি উত্তর: হ্যাঁ। চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার শতাব্দীর পর শতাব্দী আরাকান রাজ্যের অংশ ছিল, আর ১৬৬৬ সালে মোগলরা চট্টগ্রাম দখল করার পরও আরাকানিদের বসতি পুরো মুছে যায়নি। ১৭৮৪ তাই প্রথম আগমনের সাল নয়; এটি সবচেয়ে বড় পলায়নের সূচনার সাল।
বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি কক্সবাজার জেলা ভুক্তি জানায়, আরাকানরাজ Sulat Inga Chandra ৯৫৩ সালে চট্টগ্রাম দখল করেন, তারপর থেকে কক্সবাজার আরাকান রাজ্যের অংশ, আর এই অবস্থা চলে ১৬৬৬ সালে মোগল বিজয় পর্যন্ত। একই ভুক্তি বলে, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কক্সবাজার অঞ্চলে বসতি গড়াতে চাষিদের মধ্যে উদারভাবে জমি বিলির নীতি নেয়, আর তাতে চট্টগ্রামের নানা জায়গা থেকে এবং আরাকান থেকেও মানুষ এসে বসেন। বাংলাপিডিয়ার রাখাইন ভুক্তির আরেকটি তথ্য: মোগল সুবাদার শায়েস্তা খান ১৬৬৬ সালে কক্সবাজার-চট্টগ্রামে আরাকানি বাসিন্দাদের ওপর “মগজমা” নামে কর বসান। অর্থাৎ বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় ১৬৬৬ সালেও কক্সবাজার-চট্টগ্রামে আরাকানি বাসিন্দা ছিলেন।
Kyaw Minn Htin-এর প্রবন্ধ (SUVANNABHUMI, ডিসেম্বর 2015) এ বিষয়ে আরও সুনির্দিষ্ট। ১৭৬০ সালে চট্টগ্রাম কোম্পানির হাতে আসার পর ব্রিটিশরা পতিত জমি আবাদ করাতে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে মানুষ টানছিল; Serajuddin-এর ১৯৭১ সালের গবেষণা উদ্ধৃত করে তিনি লেখেন, ১৭৭৫ সালে, আরাকান পতনের দশ বছর আগে, প্রায় 2,000 আরাকানি কোম্পানির এলাকায় বসতি গড়তে আসেন। Francis Hamilton (Buchanan)-এর ১৮২৫ সালের বিবরণও তিনি উদ্ধৃত করেছেন: পাহাড়ে থাকা আরাকানিরা বর্মি বিজয়ের “ত্রিশ থেকে চল্লিশ বছর আগে”, অর্থাৎ ১৭৪০-৫০-এর দশকে, নিজেদের দেশ ছেড়েছিলেন। এই পুরনো বসতিদের ইতিহাস মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমাদের প্রশ্ন, যা রাখাইন-মারমা পার্থক্যের লেখায় বিস্তারিত আছে।
জওয়াং রাখাইনের লেখা আরও পুরনো এক কিংবদন্তির কথা বলে: খ্রিস্টপূর্ব ৫৮০ সালে রাখাইন রাজা চেন্দাসুরিয়ার সময়ে বহু আরাকানি ধর্মপ্রচারে রামু অঞ্চলে এসেছিলেন। লেখক নিজেই একে কিংবদন্তি বলেছেন — “এই কিংবদন্তি মেনে নেয়া হলে” তবেই সেটি আগমনের সময় হবে। ইতিহাসের কালানুক্রমে এই দাবি যাচাইযোগ্য নয়, তবে রাখাইন সমাজ নিজেদের এই ভূখণ্ডে উপস্থিতিকে কত পুরনো বলে দেখে, তার একটি নমুনা এটি।
সরাসরি উত্তর: ১৭৯৭ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে। ১৯০৮ সালের চট্টগ্রাম জেলা গেজেটিয়ার লেখে, এই সময়ে “প্রায় ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার” মানুষ আরাকান থেকে চট্টগ্রাম জেলায় চলে আসেন, আর ১৭৯৮ সালের মধ্যে আগতদের সংখ্যা এত বেড়ে যায় যে সরকারকে তাঁদের ভরণপোষণের ব্যাপক ব্যবস্থা নিতে হয়।
দখলের পরপরই সব মানুষ পালাননি। L. S. S. O’Malley সম্পাদিত Eastern Bengal District Gazetteers: Chittagong (১৯০৮) ঘটনাক্রম এভাবে সাজায়: বর্মি বিজেতাদের নিপীড়ন ও আদায়ের চাপে বহু আরাকানি চট্টগ্রামের সীমানায় এসে আশ্রয় নেন, আর তখনকার অনাবাদি বিশাল জমিতে তাঁদের বসতে দেওয়া হয়। অনেকে শান্তিপূর্ণ চাষি হয়ে যান; অন্যরা নিরাপদ আশ্রয়ের ভরসায় সীমান্ত পেরিয়ে বর্মি সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে থাকেন। ১৭৯৩ সালে পরাজিত তিন বিদ্রোহী সর্দার চট্টগ্রামে পালিয়ে এলে তাঁদের ধরতে 5,000 সৈন্যের এক বর্মি বাহিনী নাফ নদী পেরিয়ে আসে; ব্রিটিশরা দোষী প্রমাণ হলে তাঁদের ফিরিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিলে বাহিনী ফিরে যায়। গেজেটিয়ারের ভাষায়, “এই সময় থেকে” আরাকান থেকে মগদের অবিরাম অভিবাসন শুরু হয়।
এই একই ঘটনার সাল Kyaw Minn Htin-এর উদ্ধৃত হ্যামিলটনের বিবরণে ১৭৯৪: “আভার সৈন্যদের ১৭৯৪ সালের চট্টগ্রাম প্রদেশ আক্রমণ, আর আশ্রয় নিতে আসা কয়েকজন শরণার্থীকে ফিরিয়ে দেওয়া” পাহাড়ের পুরনো আরাকানি বাসিন্দাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। গেজেটিয়ার বলছে ১৭৯৩, হ্যামিলটন বলছেন ১৭৯৪।
বাংলাপিডিয়ার বাংলা ভুক্তি এর সঙ্গে আরও দুটি ঘটনা যোগ করে। ১৭৯১ সালে ওয়েমোর নেতৃত্বে একদল কক্সবাজার থেকে আরাকানে গিয়ে আগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিয়ে ফিরে আসে, আর ১৭৯৬ সালে আরাকানে দেশব্যাপী বিদ্রোহ হয়, যার ফলে অনেক আরাকানি কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নেন। ইংরেজি ভুক্তি একই ঘটনাগুলো একটু ভিন্ন ক্রমে বলে: ওয়েমোর অভিযানের দল ১৭৯১ সালে কক্সবাজারে ফিরে আসে, আর ১৭৯৬ সালে বিদ্রোহের পর বিপুলসংখ্যক আরাকানি রাখাইন কক্সবাজারে আশ্রয় নেন। দুই ভুক্তিতেই ১৭৯৬-এর বিদ্রোহের পরের আশ্রয়গ্রহণকে আলাদা একটি বড় ঢেউ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
এই সময়ের ইতিহাসে এক বিদ্রোহী নেতার নামও বারবার আসে, যাঁকে চট্টগ্রাম গেজেটিয়ার লেখে “King-berring” আর বেভারিজ লেখেন “Kiobering”; বেভারিজ Sir Arthur Phayre-এর বরাতে নামটির শুদ্ধ রূপ দেন Khyeng-byan, যিনি ১৮১১ সালের দিকে বর্মিদের তাড়াতে আরাকানে অভিযান চালিয়েছিলেন। গেজেটিয়ার জানায়, তাঁর অনুসারী ছিল আনুমানিক 3,000 জন, আর ১৮১৪ সালের এপ্রিলে 500 বর্মি সৈন্য তাঁকে তাড়া করে চট্টগ্রামের ভেতরে ঢুকে পড়ে। হ্যামিলটনের যে বর্ণনা গেজেটিয়ার উদ্ধৃত করেছে, সেখানে পাহাড়-জঙ্গলে অস্থায়ী কুঁড়েঘরে থাকা শরণার্থীদের অবস্থাকে “অনেক দিক থেকে অত্যন্ত শোচনীয়” বলা হয়েছে: একদিকে বর্মি রোষ, অন্যদিকে বিদ্রোহীদের দলে যোগ দিতে চাপ, আর ক্ষুধায় স্থানীয় চাষিদের খাবার কেড়ে নিলে কোম্পানির সৈন্যের আক্রমণ।
সরাসরি উত্তর: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে আরাকানি শরণার্থীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়। কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১৭৯৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়; তাঁর স্মরণে যে বাজার বসানো হয়, তার নাম হয় কক্সবাজার — “কক্সের বাজার”। এভাবেই রাখাইন শরণার্থীদের পুনর্বাসনের ইতিহাস একটি জেলার নামে থেকে গেছে।
বাংলাপিডিয়ার কক্সবাজার জেলা ভুক্তি পুনর্বাসনের শর্তও জানায়: প্রতিটি শরণার্থী পরিবারকে 1 একর জমি এবং ছয় মাসের জন্য 26 মণ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হয়। একই ভুক্তি অনুযায়ী ১৭৯৯ সালে প্রায় ত্রিশ হাজার আরাকানি কক্সবাজার অঞ্চলে পালিয়ে আসেন। উইকিপিডিয়া জানায়, কক্স ছিলেন “পালংকি” ফাঁড়ির সুপারিনটেনডেন্ট — কক্সবাজারের পুরনো নাম পালংকি, আরেক নাম “পানোয়া”। বাংলাপিডিয়ার বাংলা রাখাইন ভুক্তির ভাষায়, ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স “১৭৯৯ সালে কক্সবাজারের সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত হন”।
দায়িত্ব কে দিয়েছিলেন, তা নিয়ে একটি বাড়তি তথ্য দেয় ঢাকা ট্রিবিউনে Tim Steel-এর 2016 সালের লেখা: আনুমানিক ১৭৯৮ সালে নতুন গভর্নর-জেনারেল Richard Wellesley (Earl of Mornington) শরণার্থীদের এমন জমি ও কাজে বসানোর দায়িত্ব কক্সকে দেন, যা কোম্পানির জন্যও লাভজনক হতে পারে। পরিকল্পনা ছিল আবাদযোগ্য জমি বা মাছ ধরার সুযোগ আছে এমন জায়গায় মানুষ বসানো এবং ব্যবসার জন্য বাজার তৈরি করা। কক্সের মৃত্যুর সাল নিয়ে এই লেখা অন্য উৎস থেকে আলাদা — বাংলাপিডিয়া ও উইকিপিডিয়া ১৭৯৯ বলে, Tim Steel-এর লেখায় ১৭৯৭।
চট্টগ্রাম গেজেটিয়ার কক্সের পরের অধ্যায়টুকুও লিখে রেখেছে। জলবায়ুর অস্বাস্থ্যকরতায় বছর শেষ হওয়ার আগেই কক্সের মৃত্যু হয়, তাঁর জায়গায় আসেন ঢাকার রেজিস্ট্রার Ker। অনাহারী শরণার্থীদের জন্য বিপুল পরিমাণ ধান-চাল কিনতে হয়; কালেক্টরের পরামর্শে তাঁদের রামু থেকে উখিয়া ঘাট পর্যন্ত একটি সড়ক তৈরির কাজে লাগানো হয়। ১৮০০ সালের মে মাসে কালেক্টর জরুরি ভিত্তিতে 20,000 টাকা চেয়ে পাঠান, কারণ বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণে কোষাগার খালি হয়ে গিয়েছিল। তখন অনেকে আরাকানে ফিরে যেতে শুরু করেন, আর সরকারের সচিবকে লিখে জানাতে হয় যে আরাকানের অভিবাসীদের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই, তাঁরা চাইলে চলে যেতে পারেন। ১৮০৬ সালে গিয়ে কালেক্টর প্রথমবার এমন জমির তালিকা পাঠাতে পারেন, যার জন্য মগ অভিবাসীরা খাজনা দেওয়ার চুক্তি করেছেন।
জমি বিলি নিয়ে স্থানীয় বিরোধও ছিল। বাংলাপিডিয়ার বাংলা ভুক্তি জানায়, কক্স যখন উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের নীতিমালা করছিলেন, স্থান নির্ধারণ করছিলেন ও জমি পত্তনি দিচ্ছিলেন, তখন শের মোস্তফা খান, কালিচরণ, সাদ উদ্দীন প্রভৃতি ভূস্বামী দ্বন্দ্ব শুরু করেন। ১৮১৭ সালে পিচেলের উদ্যোগে কক্সবাজারের সরকারি সম্পত্তি প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য করমুক্ত ঘোষণা করা হয়; ইংরেজি ভুক্তি বলে, এতে বিরোধের অবসান ঘটে।
সরাসরি উত্তর: নির্দিষ্ট একটি সংখ্যা নেই। সমসাময়িক ও পরবর্তী উৎসগুলো 30,000 থেকে 50,000-এর মধ্যে শরণার্থীর কথা বলে, এক হিসাবে আরও বেশি; আর সরকারিভাবে পুনর্বাসিতের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কম — ১৮০০ থেকে ১৮১৩ সালের মধ্যে 14,451 জন। নিচের ছকে প্রতিটি সংখ্যা তার উৎসসহ রাখা হলো।
| সংখ্যা | কী গোনা হয়েছে | উৎস |
|---|---|---|
| প্রায় 2,000 | ১৭৭৫ সালে, পতনের আগেই, কোম্পানির এলাকায় বসতি গড়তে আসা আরাকানি | Kyaw Minn Htin (2015), Serajuddin (1971)-এর সূত্রে |
| প্রায় 35,000 | দখলের পর চট্টগ্রাম অঞ্চলে পালিয়ে আসা মানুষ | উইকিপিডিয়া, Aye Chan (2005)-এর সূত্রে |
| 30,000 | ১৭৯৮ সালে চট্টগ্রামে আশ্রয় নেওয়া আরাকানি | বেভারিজ, The District of Bakarganj (1876) |
| প্রায় 30,000 | ১৭৯৯ সালে কক্সবাজার অঞ্চলে পালিয়ে আসা আরাকানি | বাংলাপিডিয়া, কক্সবাজার জেলা |
| 30,000–40,000 | ১৭৯৭ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলায় আসা মানুষ | চট্টগ্রাম জেলা গেজেটিয়ার (1908) |
| 40,000–50,000 | জুলাই ১৭৯৯-এ হিরাম কক্সের রিপোর্টে আগত রাখাইন | বাংলাপিডিয়া, রাখাইন |
| 14,451 | ১৮০০ থেকে 29 জানুয়ারি ১৮১৩ পর্যন্ত পুনর্বাসিত | বাংলাপিডিয়া, রাখাইন |
| লক্ষাধিক | শুধু রামু এলাকায় দেখা আরাকানি শরণার্থী | বাংলাপিডিয়া, রাখাইন (“স্যার ওয়ান্টার হেমিল্টন”-এর বরাতে) |
| আনুমানিক 100,000 | কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীতে কোম্পানির পুনর্বাসিত | উইকিপিডিয়া, Rakhine people |
এই সংখ্যাগুলোর মধ্যে একটি স্পষ্ট ফারাক আছে: কতজন এসেছিলেন আর কতজনকে সরকারিভাবে জমি দিয়ে বসানো হয়েছিল। বাংলাপিডিয়ার রাখাইন ভুক্তি এর কারণও বলে: কোম্পানি ১৮০০ সালের মে মাসে রাখাইনদের আর অভিবাসন বন্ধের আদেশ জারি করে। গেজেটিয়ার আবার জানায়, ১৮১২ সালের এগারো নম্বর রেগুলেশন (Regulation XI of 1812) পাস হয় এই বসতির প্রসঙ্গে; একই বইয়ের আরেক অধ্যায় একে বলে মগদের এই জেলায় বসতি গড়া ঠেকানোর রেগুলেশন। আর ১৮০০ সালেই অনেকে ফিরে যেতে শুরু করেছিলেন। তাই শরণার্থীর মোট সংখ্যা আর স্থায়ী বসতির সংখ্যা এক নয়।
সরাসরি উত্তর: রামু, উখিয়া, কক্সবাজার শহর, চকরিয়ার হারবাং, মহেশখালী আর টেকনাফে। বাংলাপিডিয়া পুনর্বাসন-এলাকাগুলোর নাম দেয়: কক্সবাজার পৌর এলাকা, খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডী, রামু, পানের ছড়া, আশকর কাটা, টেকনাফ, খারাংখালী, হ্নীলা, চকরিয়ার হারবাং ও মহেশখালীর গোরকঘাটা। আজও কক্সবাজারের রাখাইনরা মূলত এসব জায়গাতেই থাকেন।
১৯০৮ সালের গেজেটিয়ার চট্টগ্রামের “মগ”দের তিন ভাগে ভাগ করেছিল, আর তার একটি ভাগ ঠিক এই উপকূলের রাখাইনরা — “রোয়াং বা রাখাইং মগ”। গেজেটিয়ার অনুযায়ী এঁরা কক্সবাজার মহকুমায় থাকেন, আঠারো শতকের শেষে বর্মি বিজয়ের পর পালিয়ে আসা শরণার্থীদের এবং ১৮২৪ সালের প্রথম বর্মি যুদ্ধের কিছু আগে ব্রিটিশ আশ্রয়ে আসা মানুষের বংশধর। সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি রামু ও উখিয়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় — যেখানে সরকার তাঁদের জমি দিয়েছিল — তারপর কক্সবাজার শহরে ও হারবাংয়ে। শহর ও বড় গ্রামে যাঁরা থাকতেন তাঁরা ব্যবসা করতেন, সুযোগ থাকলে মাছ ধরতেন। গেজেটিয়ার লেখে, “রোয়াং” শব্দটি “রাখাইং”-এরই বিকৃতি, যা আরাকানের দেশীয় নাম।
চট্টগ্রাম গেজেটিয়ারের আরেক অধ্যায় জানায়, আগতদের নাফ নদীর তীরে ও মহেশখালী দ্বীপের অনাবাদি জমিতে বসতে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু অধিকাংশই গিয়েছিলেন আজকের পার্বত্য চট্টগ্রামের দিকে। বাংলাপিডিয়াও বলে, ব্রিটিশরা দ্বিতীয় দফায় শরণার্থীদের কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীতে পুনর্বাসন করে, আর এটিই রাখাইনদের সবচেয়ে বড় অভিবাসন।

পুরনো এই বসতি-মানচিত্র আজকের শুমারির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022-এর কক্সবাজার কমিউনিটি রিপোর্টের সারণি C-13 অনুযায়ী জেলায় রাখাইন 7,273 জন। উপজেলাভিত্তিক ভাগ নিচের ছকে:
| উপজেলা (কক্সবাজার) | রাখাইন, 2022 | পুরনো নথিতে যে নাম আছে |
|---|---|---|
| কক্সবাজার সদর (পৌরসভায় 1,316) | 3,494 | কক্সবাজার শহর, খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডী (বাংলাপিডিয়া) |
| মহেশখালী (পৌরসভায় 850) | 1,230 | গোরকঘাটা (বাংলাপিডিয়া); মহেশখালী দ্বীপ (গেজেটিয়ার) |
| টেকনাফ | 992 | টেকনাফ, হ্নীলা, খারাংখালী (বাংলাপিডিয়া); নাফ তীর (গেজেটিয়ার) |
| চকরিয়া | 833 | হারবাং (বাংলাপিডিয়া ও গেজেটিয়ার) |
| রামু | 538 | রামু (বাংলাপিডিয়া ও গেজেটিয়ার) |
| পেকুয়া | 114 | — |
| উখিয়া | 67 | উখিয়া (গেজেটিয়ার) |
| ঈদগাঁও | 5 | — |
| কুতুবদিয়া | 0 | — |
| কক্সবাজার জেলা | 7,273 |
ছকের একটি তথ্য চোখে পড়ার মতো: ১৯০৮ সালে গেজেটিয়ার যে রামু ও উখিয়াকে রাখাইনদের প্রধান বসতি বলেছিল, 2022-এ সেখানে রাখাইন যথাক্রমে 538 ও 67 জন, আর সবচেয়ে বেশি এখন কক্সবাজার সদর ও মহেশখালীতে। এই স্থানান্তর কবে, কেন ঘটল, তা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
সরাসরি উত্তর: এ নিয়ে দুই ধরনের দাবি আছে। রাখাইন সমাজের নেতারা ও তাঁদের লেখা বলে, রাখাইনরা ১৭৮৪ সালের দিকে সাগর পাড়ি দিয়ে রাঙ্গাবালীতে প্রথম নামেন। ১৮৭৬ সালের ব্রিটিশ জেলা-বিবরণী বলে, বাকেরগঞ্জের সুন্দরবনে মগদের কোনো বসতি সত্তর বছরের বেশি পুরনো নয়, আর দলবদ্ধ বসতির প্রথম লিখিত প্রমাণ ১৮১৬ ও ১৮২৪ সালের।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের 9 আগস্ট 2025-এর প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি মং চো থিন তালুকদার জানান, ১৭৮৪ সালের দিকে সাগর পাড়ি দিয়ে রাখাইনরা পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী এলাকায় আসেন, সমুদ্রগামী পালতোলা নৌকায়। এমন একটি নৌকা কুয়াকাটার হুইচ্যানপাড়ায় মাটি খুঁড়ে পাওয়া যায়, আর ২০১২ সালে সেটি কুয়াকাটা পৌরসভার বৌদ্ধবিহার ও রাখাইন মহিলা মার্কেটের কাছে সংরক্ষণ করা হয়। একই প্রতিবেদনের ইংরেজি সংস্করণ জানায়, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বিহারের পাশে ঐতিহাসিক এই নৌকাটি সংরক্ষণ করেছে। প্রতিবেদনে রাখাইনরা বলেছেন, প্রায় আড়াইশো বছর আগে তাঁদের পূর্বপুরুষরা রাঙ্গাবালী, কলাপাড়া ও বরগুনার তালতলী এলাকায় আবাস গড়েন।
মেইনথিন প্রমীলার লেখা, যা দ্য ডেইলি স্টার-এর 3 অক্টোবর 2025-এর প্রতিবেদনেও প্রায় হুবহু প্রতিফলিত, একই সাল দেয়: ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে রাখাইনরা বরিশালের সর্বদক্ষিণের উপকূলে পা রাখার আগে এলাকাটি ছিল জনমানবহীন, হিংস্র প্রাণীতে ভরা গভীর বন। লেখাটি উইলিয়াম হান্টার ও জি. ই. হার্ভের বরাত দিয়ে বলে, আঠারো শতকের শেষ প্রান্তে ব্রিটিশ সরকার জঙ্গল পরিষ্কার ও ভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য রাখাইনদের সুন্দরবন অঞ্চলে পুনর্বাসিত করে, আর এভাবে আজকের গলাচিপা, কলাপাড়া, আমতলী ও বরগুনায় রাখাইন বসতি ছড়ায়।
বাকেরগঞ্জ জেলায় পাঁচ বছর কর্মরত ব্রিটিশ কর্মকর্তা হেনরি বেভারিজের ১৮৭৬ সালে প্রকাশিত The District of Bakarganj: Its History and Statistics বইয়ের সুন্দরবন অধ্যায়ে (পৃষ্ঠা 163–165) “মগ”দের নিয়ে কয়েক অনুচ্ছেদ আছে। তিনি লেখেন, আগের কালে মগরা সুন্দরবনে লুটতরাজ চালাত, রেনেলের মানচিত্রে একটি বড় এলাকাকে তাদের হাতে জনশূন্য বলে চিহ্নিত করা হয়েছে; কিন্তু বর্তমানে সুন্দরবনের নানা জায়গায় যে মগরা আছেন তাঁরা সেই পুরনো আমল থেকে আছেন — এমন ভাবার কারণ নেই, আর “সম্ভবত তাঁদের কোনো বসতিই সত্তর বছরের বেশি পুরনো নয়।” ১৮৭৬ থেকে সত্তর বছর পেছালে দাঁড়ায় আনুমানিক ১৮০৬।
বেভারিজ নথি থেকে একটি নির্দিষ্ট দাবিও তুলে দিয়েছেন। 24 মার্চ 1824 তারিখে Thungari নামে এক মগ রাজস্ব বোর্ডে আবেদন করেন: তিনি বিপুল খরচে চট্টগ্রাম ও রামু থেকে 230টি পরিবারকে বসতি গড়তে এনেছিলেন, কিন্তু Domingo de Silva নামে একজন তাঁকে বেদখল করেছে। আবেদনে তিনি নিজেকে আরাকানের অধিবাসী বলেন, যিনি দেশের রাজা সিংহাসনচ্যুত হওয়ার পর দেশ ছেড়ে ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া আশ্রয় নিয়েছিলেন; আর বসতিদের এনেছিলেন ঢাকার কালেক্টরের 31 জুলাই 1816 তারিখের এক উৎসাহব্যঞ্জক চিঠির ভরসায়। বেভারিজ পাদটীকায় যোগ করেন, Chapli-র মগরা তাঁকে বলেছিলেন Thungari প্রথম বসতিস্থাপক নন — প্রথম এসেছিলেন Anju Chaudhari; আরেকজনের মতে Anju Chaudhari ও Amparit Chaudhari প্রথম বসতি গড়েন, আর প্রথম বসতির নাম Boro Baisdia।
বেভারিজের আরেকটি পর্যবেক্ষণ সরাসরি এই লেখার প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত: জেলার মগরা তাঁকে জানিয়েছিলেন, যুদ্ধ তাঁদের দেশ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। তিনি লেখেন, ১৭৯৮ সালে 30,000 আরাকানি চট্টগ্রামে আশ্রয় নেন, আর “সম্ভবত তাঁদের কেউ কেউ” Chapli-তে এসেছিলেন। ১৮১২ সালের 31 ডিসেম্বর তারিখের Battye নামে এক কর্মকর্তার চিঠিরও উল্লেখ আছে, যেখানে রামু থেকে আসা কিছু মগকে বিদ্রোহী “Kiobering”-এর অনুসারী সন্দেহে গ্রেপ্তার করে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ রামু থেকে বাকেরগঞ্জের সুন্দরবনে মানুষের যাতায়াত ১৮১২ সালেই চলছিল।
১৮৭৪ সালের অক্টোবরে বেভারিজ নিজে মগদের প্রধান বসতি Khaprabhanga ঘুরে আসেন, যা ছিল Gulsakhali থানার Chapli-র কাছে; সেখানে তিনি একজন পুরোহিত ও একটি ছোট বিহার-বিদ্যালয় দেখেন। মগরা Chapli, Nishanbari ও Maudhobi-তেও বড় সংখ্যায় থাকতেন। তাঁর উদ্ধৃত শুমারি অনুযায়ী জেলায় মগ 4,049 জন — 2,140 পুরুষ, 1,909 নারী — সবাই বৌদ্ধ। বাড়ি ছিল খুঁটির ওপর তোলা, গোলপাতার ছাউনি; নারীরা কাপড় বুনতেন। বাঙালিরা তাঁদের সাধারণত “চৌধুরী” বলে সম্বোধন করত, যে উপাধির শুরু Chila Chaudhari নামে এক সচ্ছল মগ থেকে বলে বেভারিজের ধারণা। তাঁর বইয়ে মগদের নিয়ে ঔপনিবেশিক কর্মকর্তার কিছু কটু মন্তব্যও আছে; এই লেখায় কেবল তারিখ, জায়গা ও সংখ্যা নেওয়া হয়েছে। আজকের তালতলী উপজেলায় নিশানবাড়িয়া নামে একটি ইউনিয়ন আছে (জনশুমারি 2022); বেভারিজের Nishanbari আর এই নিশানবাড়িয়া একই জায়গা কি না, কোনো উৎসে স্পষ্ট করে বলা নেই।
রাখাইন সমাজের বয়ান বলছে ১৭৮৪ সালের দিকে, বেভারিজের বয়ান বলছে মোটামুটি ১৮০৬-এর পরে, প্রথম দলবদ্ধ বসতির নথি ১৮১৬-১৮২৪। উইকিপিডিয়ার Rakhine people নিবন্ধও বলে, রাখাইনরা পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলায় বসতি গড়েন “উনিশ শতকে”, আর বাংলাপিডিয়ার কুয়াকাটা ভুক্তি বলে “১৭৮০-এর দশকে”। দুই বয়ানের মধ্যে একটি মিলের জায়গাও আছে: দুটোই বলে, এই রাখাইনরা আরাকান হারানোর পর এসেছিলেন, আর তাঁরা গভীর জঙ্গল কেটে প্রথম আবাদ করেছিলেন।
সরাসরি উত্তর: প্রচলিত ব্যাখ্যা তাই বলে। বাংলাপিডিয়ার কুয়াকাটা ভুক্তি একে “কিংবদন্তি” হিসেবে লেখে: আরাকান থেকে বিতাড়িত বহু রাখাইন ১৭৮০-এর দশকে উপকূলে বসতি গড়েন, মিঠা পানি না পেয়ে একটি কুয়া খোঁড়েন, আর তা থেকেই জায়গার নাম হয় কুয়াকাটা।
উইকিপিডিয়ার কুয়াকাটা নিবন্ধ একই ব্যাখ্যা দেয় এবং যোগ করে, তারপর থেকে রাখাইন পাড়াগুলোতে পানির জন্য কুয়া খোঁড়ার রীতি চলে আসছে। একই নিবন্ধ জানায়, কুয়াকাটা সৈকতের কাছে রাখাইন গ্রাম কেরানীপাড়ার শুরুতে একটি বৌদ্ধ বিহারের কাছে একটি প্রাচীন কুয়া আছে, তার সামনে সীমা বৌদ্ধ বিহার, যেখানে প্রায় সাঁইত্রিশ মণ ওজনের অষ্টধাতুর ধ্যানমগ্ন বুদ্ধমূর্তি রাখা। বাংলাপিডিয়ার পটুয়াখালী জেলা ভুক্তিও কুয়াকাটার দর্শনীয় স্থানের তালিকায় সীমা বৌদ্ধ বিহার, বুদ্ধমূর্তি ও রাখাইন পল্লীর নাম রেখেছে।

রাখাইন ভাষায় জায়গাটির আলাদা নামও ছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে মং চো থিন তালুকদার বলেছেন, পটুয়াখালী, বরগুনা ও কক্সবাজার অঞ্চলের আদি নামও ছিল রাখাইন ভাষায়, যেমন আজকের কুয়াকাটার আদি নাম ছিল “কানছাই চোয়ান”। একই প্রতিবেদন জানায়, কুয়াকাটা শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ থেরের ভাষ্যে বিহারটি ১৭৮৪ সালের দিকে প্রথম ছনের ছাউনি দিয়ে তৈরি হয়, ১৯৫১ সালে এর কাগজপত্র হয়, আর ২০০৩ সালে পাকা স্থাপনা ওঠে। মেইনথিন প্রমীলার লেখায় কুয়াকাটা পর্যটনকেন্দ্র থেকে এক কিলোমিটার উত্তরে ১৯২৫ সালে নির্মিত একটি শায়িত বুদ্ধমূর্তি ও বিহারের উল্লেখ আছে, যাকে তিনি দেশের সর্ববৃহৎ শয়নকৃত বুদ্ধ প্রতিকৃতি বলেছেন।
সরাসরি উত্তর: ব্রিটিশ সরকার জঙ্গল কেটে জমি আবাদে উৎসাহ দিতে আবাদকারীর অধিকার স্বীকার করত। মেইনথিন প্রমীলার লেখা অনুযায়ী যিনি যতটুকু জমি দখলে এনে আবাদ করতেন, সরকার তাতে দখলীস্বত্বে মালিকানা দিত; প্রথম পাঁচ থেকে দশ বছর খাজনা ছাড়া চাষ করা যেত। পরে ১৯৫০ সালের প্রজাস্বত্ব আইনে তাঁদের জমি রক্ষায় আলাদা ধারা যোগ হয়।
প্রমীলার লেখা জানায়, ১৯০৮ সালে ব্রিটিশ সরকার খেপুপাড়ায় প্রথম একজন কলোনিজেশন অফিসার নিয়োগ দেয়, আর পুরো এলাকার নাম তখন ছিল “দি বাখরগঞ্জ-সুন্দরবন কলোনিজেশন”। ওই এলাকায় প্রায় 237টি রাখাইন গ্রাম গড়ে উঠেছিল, প্রত্যেকটি নিজের হাতে জঙ্গল কেটে আবাদ করা জমির ওপর। পরে “সার্কেল সেটেলমেন্ট”-এর মাধ্যমে প্রথম দশ বছরের জন্য খাজনা ধার্য হয়। ১৯০৮ থেকে ১৯৩০ সময়টাকে লেখাটি কলোনিজেশনের “স্বর্ণযুগ” বলে, কারণ তখন রাখাইন প্রধানরা বহু বৌদ্ধ স্থাপনা গড়ে তোলেন। দ্য ডেইলি স্টারের 2025 সালের প্রতিবেদনও ১৯০৮–১৯৩০ সময়ে রাখাইন নেতাদের বৌদ্ধ স্থাপনা নির্মাণের কথা বলে।
বেভারিজের বই আরেকটি তথ্য দেয়, যা এই কলোনিজেশনের আগের অবস্থা বোঝায়: Gomess নামে এক কর্মকর্তার হিসাব উদ্ধৃত করে তিনি লেখেন, বাকেরগঞ্জের সুন্দরবনের প্রায় অর্ধেক তখন পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল, আর ১৮৩০ থেকে ১৮৭২ সালের মধ্যে প্রায় 177,152 একর জমি আবাদ হয়। এই বিস্তারে মগরা ছিলেন “জঙ্গল পরিষ্কারে খুব দক্ষ” — বেভারিজের ভাষায় — যদিও তিনি লিখেছেন, তাঁর জেলায় থাকার পাঁচ বছরে মগদের চাষাবাদ খুব একটা বাড়েনি।
স্বাধীনতার আগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি স্বীকৃতি আসে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে। প্রমীলার লেখা ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন দুটোই বলে, এই আইনে পটুয়াখালীর রাখাইনদের বাকেরগঞ্জের “মগ” নামে আদিবাসী হিসেবে স্বীকার করে জমি হস্তান্তরে তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় ৯৭ ধারা যোগ করা হয়। ধারাটি ঠিক কী বলে, আর সমতলের অন্য আদিবাসীদের বেলায় কীভাবে প্রযোজ্য, তা আমাদের প্রজাস্বত্ব আইনের ৯৭ ধারা নিয়ে আলাদা লেখায় আছে।
সরাসরি উত্তর: উপকূলের রাখাইনরা মূলত ১৭৮৪-র পরের শরণার্থী ঢেউয়ের উত্তরসূরি, আর তাঁরা নিজেদের রাখাইন বলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমারা নিজেদের আলাদা জাতি হিসেবে পরিচয় দেন, এবং কয়েকজন গবেষকের মতে তাঁদের পূর্বপুরুষদের বড় অংশ ১৭৮৪-র আগেই এ অঞ্চলে ছিলেন। দুই প্রশ্নের বিস্তারিত আলোচনা আলাদা লেখায় আছে।
Kyaw Minn Htin-এর প্রবন্ধ বলে, বাংলায় আরাকানি অভিবাসনের একাধিক ঢেউ ছিল, আর শেষ ঢেউ আসে আরাকান বিজয়ের পর আনুমানিক ১৭৯৪ সালে; এই সময়ের আরাকানি বসতি বিশেষভাবে দেখা যায় কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় এলাকায়। তাঁর পর্যবেক্ষণ, কক্সবাজারের আরাকানিরা সবসময় নিজেদের “রাখাইন” বলেন, “মারমা” নয়; অথচ পটুয়াখালীর মানুষ নিজেদের “মারমা” বা “রাখাইন” দুই নামেই পরিচয় দিতে আপত্তি করতেন না। আবদুল মাবুদ খানের ১৯৮৪ সালের গবেষণা উদ্ধৃত করে তিনি লেখেন, পুরনো কালে পটুয়াখালীর আরাকানিরা নিজেদের “মারমা” বলতেন, আর সম্প্রতি কিছু তরুণ নিজেদের “রাখাইন” বলে পরিচয় দিচ্ছেন — খানের মতে স্বাধীন বার্মায় রাখাইন জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রভাবে।
চট্টগ্রাম গেজেটিয়ার ১৯০৮ সালেই এই পার্থক্য লক্ষ করেছিল: “জুমিয়া মগ”রা দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম ও পূর্বের পাহাড়ে বসবাস করে নিজেদের পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী মনে করেন, আর “রোয়াং মগ”রা আরাকান থেকে আসা সাম্প্রতিকতর স্রোতের মানুষ; গেজেটিয়ারের মতে দুই দলই সম্ভবত একই আদি জনগোষ্ঠী থেকে। পার্বত্য চট্টগ্রামেও কিছু রাখাইন থাকেন: 2022 সালের শুমারিতে রাঙামাটিতে 568, খাগড়াছড়িতে 475, বান্দরবানে 355 জন। রাখাইন-মারমা প্রশ্নের পুরো আলোচনা — দুই জাতির নিজস্ব অবস্থান, ভাষা, আর ‘মগ’ নামের আপত্তি — পড়তে পারেন রাখাইন ও মারমা আলাদা জাতি লেখায়।
সরাসরি উত্তর: জনশুমারি 2022 অনুযায়ী বাংলাদেশে রাখাইন 11,197 জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে 7,273, বরগুনায় 1,017, পটুয়াখালীতে 891 — এই তিন উপকূলীয় জেলায় মোট 9,181 জন, অর্থাৎ দেশের রাখাইনদের প্রায় 82 শতাংশ। পার্বত্য তিন জেলায় আছেন 1,398 জন।
| জেলা ও উপজেলা | রাখাইন, 2022 |
|---|---|
| পটুয়াখালী জেলা | 891 |
| — কলাপাড়া (কুয়াকাটা এই উপজেলায়) | 825 |
| — রাঙ্গাবালী | 52 |
| — পটুয়াখালী সদর | 12 |
| — গলাচিপা ও মির্জাগঞ্জ | 1 + 1 |
| বরগুনা জেলা | 1,017 |
| — তালতলী | 932 |
| — বরগুনা সদর | 81 |
| — আমতলী, অন্যান্য | 4 |
| কক্সবাজার জেলা | 7,273 |
| পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা | 1,398 |
| বাংলাদেশ | 11,197 |
উৎস: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022 — পটুয়াখালী ও বরগুনা জেলা প্রতিবেদন (সারণি P17), কক্সবাজার কমিউনিটি রিপোর্ট (সারণি C-13), জাতীয় প্রতিবেদন। জাতীয় ও জেলাভিত্তিক সব জাতিগোষ্ঠীর সংখ্যা আছে আমাদের জনশুমারি ২০২২: ৫০ জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা, জেলা ধরে ধরে লেখায়।
পটুয়াখালী-বরগুনার আগের সংখ্যাগুলো অন্য উৎস থেকে আসে, আর সেগুলো একই মাপে গোনা নয়। মেইনথিন প্রমীলার লেখা বলে, ১৭৮৪–১৯০০ সময়ে বরিশাল উপকূলে প্রায় 50,000-এর বেশি রাখাইন থাকতেন, ১৯০০–১৯৪৮ সময়ে তা হয় 35,000, ১৯৯০ সালে 4,000, আর কারিতাসের ২০১৪ সালের জরিপে প্রায় 2,561। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন বলে ১৯০০ সালের দিকে 50 হাজার, এখন আড়াই হাজারের মতো। অথচ বেভারিজ তাঁর ১৮৭৬ সালের বইয়ে শুমারির বরাতে পুরো বাকেরগঞ্জ জেলায় মগের সংখ্যা দেন 4,049। উনিশ শতকের এই সরকারি সংখ্যা আর বিশ শতকের শুরুর 50,000-এর অনুমানের মধ্যে বড় ফারাক আছে, যা কোনো উৎসে ব্যাখ্যা করা নেই। 2022-এর শুমারি দুই জেলায় গুনেছে 1,908 জন — কারিতাসের 2,561-এর চেয়েও কম।
গ্রামের হিসাবও একই পতন দেখায়। প্রমীলার লেখা অনুযায়ী মোট 237টি রাখাইন পাড়ার মধ্যে পটুয়াখালীর 144টির মধ্যে ২০১৫ সালে টিকে ছিল 32টি (কলাপাড়ায় 28, গলাচিপায় 4), আর বরগুনার 93টির মধ্যে 13টি। দ্য ডেইলি স্টার (2025) গুনেছে 44টি গ্রাম — কলাপাড়ায় 27, তালতলী ও বরগুনা সদরে 13, রাঙ্গাবালীতে 4। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কারিতাসের হিসাব দিয়ে বলে, পটুয়াখালী ও বরগুনায় এখন 40টি রাখাইন পল্লি। শুমারির সংখ্যাও এই ভৌগোলিক ছবির সঙ্গে মেলে: পটুয়াখালীর রাখাইনদের 93 শতাংশ কলাপাড়ায়, বরগুনার 92 শতাংশ তালতলীতে।
উপকূলের অন্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে রাখাইনদের তুলনা এবং সমতলের আদিবাসীদের সামগ্রিক ছবি পাওয়া যাবে সমতলের আদিবাসী জাতিগুলো: কে কোথায় থাকেন লেখায়।
সরাসরি উত্তর: উৎসগুলো চারটি কারণের কথা বলে — আরাকানে ফিরে যাওয়া, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা, জমি হারানো, আর দেশের ভেতরে অন্যত্র চলে যাওয়া। কোন কারণে কতজন কমেছেন, তার কোনো হিসাব কোনো উৎসে নেই।
ফিরে যাওয়া। এই প্রবণতা শুরু থেকেই ছিল। চট্টগ্রাম গেজেটিয়ার জানায়, ১৮০০ সালেই শরণার্থীরা দলে দলে ফিরতে শুরু করেন। ১৯০৮ সালে গেজেটিয়ার লিখছে, অভিবাসনের স্রোত এখন “ঠিক উল্টো দিকে” বইছে: চট্টগ্রামের বাইরে গণনা করা মানুষের মধ্যে প্রায় 14,000 পাওয়া গেছে আরাকানে, যাঁদের বেশিরভাগ এমন মগ, যাঁদের পূর্বপুরুষ প্রায় এক শতাব্দী আগে চট্টগ্রামে আশ্রয় নিয়েছিলেন; ১৮৯৭ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর বহু পরিবার স্থায়ীভাবে আরাকানে চলে যায়। বাকেরগঞ্জ নিয়ে বেভারিজও ১৮৭৬ সালে লেখেন, অনেক মগ আরাকানে ফিরে গেছেন বলে মনে হয়।
দুর্যোগ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯০০ সালের দিকের 50 হাজার রাখাইনের বড় অংশ মারা যান ১৯৬৫ সালের বন্যায়। দ্য ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং বলেন, কলাপাড়া, তালতলী, কুয়াকাটা, আমতলী — এসব এলাকা একসময় পুরোটাই রাখাইনদের ছিল; আড়াইশো বছরে জনসংখ্যা বাড়ার কথা, অথচ তা নাটকীয়ভাবে কমেছে — অনেকে আরাকানে ফিরে গেছেন, কেউ ঢাকায় চলে গেছেন, আর অন্যরা হারিয়েছেন বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে। প্রমীলার লেখায় ১৯৬২ সালের ঘূর্ণিঝড়েরও উল্লেখ আছে।
জমি হারানো। প্রমীলার লেখা বলে, বিভিন্ন নথি অনুযায়ী উপকূলের 99 ভাগ রাখাইন পরিবার আজ ভূমিহীন। ডেইলি স্টার (2025) বলছে 90 শতাংশের বেশি, যেখানে দেশভাগের আগে ভূমিহীন ছিলেন 20–25 শতাংশ। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদনে কারিতাসের কর্মকর্তা মং ম্যা বলেন, ১৯৯০-এর দশকে কুয়াকাটাসহ পটুয়াখালী ও বরগুনার পর্যটন সম্ভাবনা বাড়তে থাকলে রাখাইনদের ভূমি দখল “খুবই সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়”। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী কুয়াকাটা শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের জমি আরএস রেকর্ডে 2 একর 44 শতাংশ হলেও এখন বিহার টিকে আছে 65 শতাংশে। পটুয়াখালী-বরগুনায় কারিতাসের হিসাবে এখন 12টি রাখাইন গ্রামে কোনো শ্মশান নেই।
অন্যত্র চলে যাওয়া। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদনে সঞ্জীব দ্রং ঢাকায় চলে যাওয়ার কথা বলেছেন, আর বিডিনিউজের প্রতিবেদনে তালতলীর লাউপাড়ার গ্রামপ্রধান জানিয়েছেন, জমির মামলা চালানোর সামর্থ্য না থাকায় কিছু বাসিন্দা মিয়ানমারে চলে গেছেন।
এখানে এসে শুরুর প্রশ্নটি নতুন অর্থ পায়। মেইনথিন প্রমীলার লেখা ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন দুটোই উপকূলের জমিতে রাখাইনদের দাবির ভিত্তি হিসেবে একই ইতিহাস বলে: রাখাইনরাই সেখানে প্রথম বসতি গড়েছিলেন, জঙ্গল কেটে জমি আবাদ করেছিলেন, আর ব্রিটিশ সরকার সেই আবাদের ভিত্তিতে তাঁদের দখলীস্বত্ব দিয়েছিল। তাই রাখাইনরা কবে এসেছিলেন, এই প্রশ্নের উত্তর উপকূলে কেবল পাঠ্যবইয়ের তথ্য নয়।
সবচেয়ে বড় অংশ এসেছিলেন ১৭৮৪-৮৫ সালে বর্মার রাজা বোধ পায়ার আরাকান দখলের পরের তিন-চার দশকে, শরণার্থী হয়ে। ১৯০৮ সালের চট্টগ্রাম গেজেটিয়ার অনুযায়ী সবচেয়ে বড় স্রোত আসে ১৭৯৭ থেকে ১৮০০ সালের মধ্যে। তবে ১৭৭৫ সালেও প্রায় 2,000 আরাকানি কোম্পানির এলাকায় বসতি গড়তে এসেছিলেন, আর চট্টগ্রাম ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত আরাকান রাজ্যেরই অংশ ছিল।
১৭৮৪ সালের ডিসেম্বরে বর্মার Konbaung বংশের রাজা বোধ পায়া আরাকান আক্রমণ করেন। যুবরাজ Thado Minsaw-এর নেতৃত্বে 20,000-এর বেশি সৈন্যের বাহিনী 2 জানুয়ারি 1785 রাজধানী ম্রাউক-উ দখল করে। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের ম্রাউক-উ রাজ্যের অবসান ঘটে, আর আরাকানের পবিত্র মহামুনি বুদ্ধমূর্তি বর্মায় নিয়ে যাওয়া হয়।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সকে আরাকানি শরণার্থীদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী প্রতিটি পরিবার পেত 1 একর জমি ও ছয় মাসের জন্য 26 মণ খাদ্য। কাজ শেষ হওয়ার আগেই ১৭৯৯ সালে কক্সের মৃত্যু হয়; তাঁর স্মরণে বসানো বাজারের নাম হয় কক্সবাজার। জায়গাটির পুরনো নাম ছিল পালংকি।
নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। বাংলাপিডিয়ার কক্সবাজার জেলা ভুক্তি বলে ১৭৯৯ সালে প্রায় 30,000; চট্টগ্রাম গেজেটিয়ার (1908) বলে ১৭৯৭–১৮০০ সালে 30,000 থেকে 40,000; বাংলাপিডিয়ার রাখাইন ভুক্তিতে হিরাম কক্সের জুলাই ১৭৯৯-এর রিপোর্টের বরাতে 40,000 থেকে 50,000। একই ভুক্তি অনুযায়ী ১৮০০ থেকে ১৮১৩ সালের মধ্যে সরকারিভাবে পুনর্বাসিত হন 14,451 জন।
রাখাইন সমাজের নেতারা বলেন, ১৭৮৪ সালের দিকে পালতোলা নৌকায় সাগর পাড়ি দিয়ে তাঁরা রাঙ্গাবালীতে প্রথম নামেন। হেনরি বেভারিজের ১৮৭৬ সালের বাকেরগঞ্জ জেলা-বিবরণী বলে, সুন্দরবনে মগদের কোনো বসতি সত্তর বছরের বেশি পুরনো নয়; সেখানে ১৮২৪ সালের এক আবেদনে চট্টগ্রাম ও রামু থেকে 230টি পরিবার আনার কথা আছে।
বাংলাপিডিয়ার কুয়াকাটা ভুক্তির কিংবদন্তি অনুযায়ী আরাকান থেকে বিতাড়িত রাখাইনরা ১৭৮০-এর দশকে উপকূলে বসতি গড়ে মিঠা পানির জন্য একটি কুয়া খোঁড়েন, আর তা থেকেই নাম কুয়াকাটা। বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের বরিশাল অঞ্চলের সভাপতি মং চো থিন তালুকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, জায়গাটির রাখাইন আদি নাম ছিল ‘কানছাই চোয়ান’।
বাংলাপিডিয়া পুনর্বাসন-এলাকা হিসেবে কক্সবাজার পৌর এলাকা, খুরুশকুল, চৌফলদণ্ডী, রামু, টেকনাফ, হ্নীলা, চকরিয়ার হারবাং ও মহেশখালীর গোরকঘাটার নাম দেয়। জনশুমারি 2022 অনুযায়ী জেলার 7,273 রাখাইনের মধ্যে কক্সবাজার সদরে 3,494, মহেশখালীতে 1,230, টেকনাফে 992, চকরিয়ায় 833 আর রামুতে 538 জন।
জনশুমারি ও গৃহগণনা 2022 অনুযায়ী 11,197 জন। এর মধ্যে কক্সবাজারে 7,273, বরগুনায় 1,017 ও পটুয়াখালীতে 891 — তিন উপকূলীয় জেলায় মোট 9,181, অর্থাৎ প্রায় 82 শতাংশ। পার্বত্য তিন জেলায় 1,398 জন: রাঙামাটিতে 568, খাগড়াছড়িতে 475, বান্দরবানে 355।
উৎসগুলো চারটি কারণ বলে: আরাকানে ফিরে যাওয়া, ১৯৬৫ সালের বন্যাসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ, জমি হারানো এবং ঢাকাসহ অন্যত্র চলে যাওয়া। ডেইলি স্টারের 2025 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী এলাকার 90 শতাংশের বেশি রাখাইন পরিবার ভূমিহীন, আর একসময়ের 237টি গ্রামের মধ্যে টিকে আছে 44টি।
না, উৎস অনুযায়ী নয়। Kyaw Minn Htin-এর 2015 সালের প্রবন্ধ বলে, উপকূলের রাখাইনরা মূলত ১৭৮৪-র পরের শেষ শরণার্থী ঢেউয়ের উত্তরসূরি, আর পার্বত্য চট্টগ্রামের মারমাদের পূর্বপুরুষদের বড় অংশ এর আগেই, সম্ভবত ১৭৪০-৫০-এর দশকে, বসতি গড়েছিলেন। মারমা লেখকদের অনেকে নিজেদের উৎপত্তি পেগু থেকে বলেন, যা আলাদা লেখায় আলোচিত।
মেইনথিন প্রমীলার লেখা ও ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহণ ও প্রজাস্বত্ব আইনে পটুয়াখালীর রাখাইনদের বাকেরগঞ্জের ‘মগ’ নামে আদিবাসী হিসেবে স্বীকার করা হয়, আর জমি হস্তান্তরে তাঁদের স্বার্থ রক্ষায় ৯৭ ধারা যোগ হয়। ধারাটি অনুযায়ী তালিকাভুক্ত আদিবাসী রায়তের জমি অ-আদিবাসীর কাছে বিক্রি, দান বা উইল করতে রাজস্ব কর্মকর্তার অনুমতি লাগে।
বিহারের অধ্যক্ষ ইন্দ্রবংশ থের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেছেন, বিহারটি ১৭৮৪ সালের দিকে প্রথম ছনের ছাউনি দিয়ে তৈরি হয়, ১৯৫১ সালে এর কাগজপত্র হয়, আর ২০০৩ সালে পাকা স্থাপনা ওঠে। আরএস রেকর্ডে বিহারের জমি 2 একর 44 শতাংশ, কিন্তু এখন বিহার টিকে আছে 65 শতাংশ জমিতে।
আমাদের আর্কাইভ
ঐতিহাসিক নথি ও গবেষণা
বিশ্বকোষ
সংবাদ ও প্রবন্ধ
সরকারি পরিসংখ্যান
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:আরাকান, কক্সবাজার, রাখাইন
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।