Last updated Oct 23rd, 2026
0

খেংগ্রং বাদ্যযন্ত্র বাঁশের তৈরি একটি ছোট যন্ত্র, যা বাংলাপিডিয়ার মতে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও ত্রিপুরা — এই চার জনগোষ্ঠী বানায় ও বাজায়। বাংলাপিডিয়া মারমা নাম দিয়েছে খ্রে খ্রং, ত্রিপুরা নাম সাংমুঙ্; চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা লেখায় নামটি আসে হেঙগরঙ, হেংগরং, খেংগ্রং, খেংখংসহ অন্তত দশটি বানানে। আর জুমজার্নালের আর্কাইভের তিনটি আলাদা লেখা যন্ত্রটির যে বর্ণনা দেয় — সুতো আর বাঁশের টুকরো, ঠোঁটের ফাঁকে রেখে টেনে বাজানো — তা বাংলাপিডিয়ার “বেহালা জাতীয়” শ্রেণিবিভাগের সঙ্গে মেলে না।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সব বাদ্যযন্ত্রের এক-ছকের তালিকা আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাদ্যযন্ত্রের তালিকা লেখায়, আর ম্রো ও খুমিদের প্লুং নিয়ে আলাদা লেখা প্লুং বাঁশি কীভাবে বানানো হয়। এই লেখা কেবল একটি যন্ত্র নিয়ে: তার নামগুলো কোথা থেকে এল, কোন উৎস কী বলে, আর কোথায় উৎসগুলো একে অন্যের বিরুদ্ধে যায়।
সূচিপত্র
বাংলাপিডিয়ার “বাদ্যযন্ত্র” নিবন্ধের আদিবাসী অংশ (লেখক মোমেন চৌধুরী) বলছে, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বাঁশের কঞ্চি দিয়ে খেং খরং তৈরি করে বিভিন্ন আনন্দ-উৎসবে বাজায়, “তবে চাকমাদের মধ্যে এর ব্যবহার বেশি”। চার জনগোষ্ঠীর এই তালিকা পাওয়া যায় একটিমাত্র উৎসে — বাংলাপিডিয়ায়, বাংলা ও ইংরেজি দুই সংস্করণেই।
চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের বেলায় স্বাধীন সমর্থন অনেক। জুমজার্নালের চাকমা জাতি লেখায় চাকমাদের যন্ত্রের তালিকায় আছে “ধুদুক, হেঙগরঙ, শিঙা, বাঁশি, ঢুল, ডগর, সারিন্দ্যা, তাক”। ভারতের মিজোরামের চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদের ওয়েবসাইট চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী যন্ত্র হিসেবে HENGORONG, SINGHA ও DHUDHUK-এর নাম করেছে — অর্থাৎ সীমান্তের ওপারের চাকমা সমাজেও নামটি চলে। তঞ্চঙ্গ্যাদের ক্ষেত্রে বাংলাপিডিয়ার তঞ্চঙ্গ্যা নিবন্ধ বাঁশি, বেহালা, ধুরূক ও খেংখং-কে তাদের প্রধান যন্ত্র বলেছে, আর ইংরেজি উইকিপিডিয়ার তঞ্চঙ্গ্যা নিবন্ধ তালিকায় রেখেছে Bansi, Khengkhong, Dhuruk, Singa ও Suma।
মারমা ও ত্রিপুরাদের বেলায় ছবিটা উল্টো। বাংলাপিডিয়ার বাইরে কোনো উৎসে খ্রে খ্রং বা সাংমুঙ্ নাম পাওয়া যায়নি। জুমজার্নালের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় বোমাং রাজার যন্ত্রীদলের তালিকা আছে, কিন্তু এই যন্ত্র নেই; বাংলাপিডিয়ার মারমা নিবন্ধও সেইং ওয়েইং, কিয়ে ওয়েইং, পিলিঈ ও ঝিনের নাম করে, খ্রে খ্রং-এর নয়। এই অংশটি নিয়ে আরও বিস্তারিত নিচে মারমা ও ত্রিপুরা অংশে।
| জনগোষ্ঠী | নাম (উৎস যেভাবে লিখেছে) | কোন উৎসে আছে | স্বাধীন উৎসের সংখ্যা |
|---|---|---|---|
| চাকমা | হেঙগরঙ, হেংগরং, হেংগ্রং, খেংগরং, থেংগরঙ, খেংগড়ং, Hengorong | বাংলাপিডিয়া; জুমজার্নালের অন্তত 9টি লেখা; প্রথম আলো; CADC মিজোরাম; নিধি চাকমার থিসিস | 5+ |
| তঞ্চঙ্গ্যা | খেংগ্রং, খেংখং, খেংস্থরং, Khengkhong | বাংলাপিডিয়া (দুই নিবন্ধ); জুমজার্নালের 4টি লেখা; উইকিপিডিয়া | 3+ |
| মারমা | খ্রে খ্রং (বাংলা), khre khreng (ইংরেজি) | কেবল বাংলাপিডিয়া | 1 |
| ত্রিপুরা | সাংমুঙ্ (বাংলা), sangmun (ইংরেজি) | কেবল বাংলাপিডিয়া | 1 |
“চার জাতি” অংশটি বাংলাপিডিয়ায় স্পষ্ট লেখা আছে। “তিন নাম” অংশটি নেই। বাংলাপিডিয়া একটি শিরোনাম-নাম (খেং খরং) দিয়েছে, আর দুই জনগোষ্ঠীর আলাদা নাম — মারমার খ্রে খ্রং, ত্রিপুরার সাংমুঙ্। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা একই নাম বলেন, এমন কথা বাংলাপিডিয়ায় নেই; তারা যন্ত্রটিকে কী বলেন, সে কথাই সেখানে আলাদা করে লেখা নেই।
জনগোষ্ঠীর নিজেদের লেখায় দেখা যায়, চাকমা রূপগুলো সাধারণত হ দিয়ে শুরু (হেঙগরঙ, হেংগরং, হেংগ্রং), আর তঞ্চঙ্গ্যা রূপগুলো খ দিয়ে (খেংখং, খেংগ্রং, খেংস্থরং)। ব্যতিক্রমও আছে: আর্কাইভের রাধামন ধনপুদি পালা ও ইতিহাসের কিছু কথা লেখায় চাকমা প্রসঙ্গে লেখা খেংগরং, আর প্রথম আলোর লেখায় খেংগড়ং। আবার তঞ্চঙ্গ্যা কবি লগ্নকুমার তঞ্চঙ্গ্যার একটি কবিতার বাংলা অনুবাদে নামটি এসেছে হেঙ্গরঙ হিসেবে। তাই চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা নাম কাছাকাছি, কিন্তু উৎসগুলো একে একটিমাত্র নাম হিসেবে লেখে না।
হিসাবটা তাই নির্ভর করে কী গোনা হচ্ছে তার ওপর। প্রতি জনগোষ্ঠীর একটি করে নাম ধরলে নাম চারটি। বানান ধরলে পনেরোর বেশি। আর ধ্বনির মিল ধরলে চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা ও মারমা নাম কাছাকাছি, ত্রিপুরা নামটি আলাদা — যা নিচের দুই অংশে দেখা যাবে। “চার জাতির তিন নাম” তাই উৎসের কথা নয়, উৎস থেকে টানা একটি সরলীকরণ।
নিচের ছকে যন্ত্রটির প্রতিটি লিখিত রূপ রাখা হলো, ঠিক যেভাবে উৎসে ছাপা। জুমজার্নালের লেখাগুলোর সাল প্রকাশের সাল। এমন তালিকা অন্য কোথাও একসঙ্গে পাওয়া যায় না, আর এটি দেখায় কেন এই যন্ত্র নিয়ে খোঁজ করা কঠিন: একই যন্ত্র একেক লেখায় একেক বানানে।
| লিখিত রূপ | কার ভাষায় / কোন প্রসঙ্গে | উৎস | প্রকাশ |
|---|---|---|---|
| খেং খরং | শিরোনাম-নাম (জনগোষ্ঠী নির্দিষ্ট নয়) | বাংলাপিডিয়া, বাদ্যযন্ত্র | — |
| kheng kharang / khem kharam | শিরোনাম-নাম, ইংরেজি | Banglapedia, Musical Instruments | — |
| খ্রে খ্রং · khre khreng | মারমা | বাংলাপিডিয়া (বাংলা ও ইংরেজি) | — |
| সাংমুঙ্ · sangmun | ত্রিপুরা | বাংলাপিডিয়া (বাংলা ও ইংরেজি) | — |
| হেঙগরঙ | চাকমা | মোনঘর, ৭০ দশক এবং জুম পাহাড়ের রেনেসাঁ; চাকমা জাতি; চাংমাটারা | 2018, 2021, 2025 |
| হেংগরং | চাকমা | চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ | 2018 |
| হেঙগরং / হেংগরঙ | চাকমা (গদ্যে ও গানের পদে) | চাকমা লোক-সঙ্গীতে বিলুপ্তপ্রায় উভগীত | 2018 |
| হেংগরঙ | চাকমা | দূর্বল সংস্কৃতি বনাম আধুনিকতা | 2020 |
| খেংগরং | চাকমা (রাধামন-ধনপুদির কাহিনি) | রাধামন ধনপুদি পালা ও ইতিহাসের কিছু কথা | 2020 |
| থেংগরঙ | চাকমা কবিতার মূল পদ (অনুবাদে খেংগ্রংঙ) | বিংশ শতাব্দী পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণ | 2020 |
| হেংগ্রং | চাকমা (আরাকানি খেং খ্রেং-এর পাশে) | চাকমা ভাষার বর্ণমালা ও ব্যকরণ | 2021 |
| খেংগড়ং | চাকমা | প্রথম আলো, আহমেদ মুনির | 2023 |
| HENGORONG | চাকমা (মিজোরাম, ভারত) | চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদ | — |
| Hengorong | চাকমা | নিধি চাকমা, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থিসিস | 2021 |
| খেংখং | তঞ্চঙ্গ্যা | তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়; তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় প্রবাদ-প্রবচন ও তঞ্চঙ্গ্যা ধাঁধা; বাংলাপিডিয়া তঞ্চঙ্গ্যা নিবন্ধ | 2020 |
| Khengkhong / khengkhong | তঞ্চঙ্গ্যা | উইকিপিডিয়া; Banglapedia, Tanchangya | — |
| খেংস্থরং | তঞ্চঙ্গ্যা | তঞ্চঙ্গ্যা জাতির মহাতরী – বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা | 2020 |
| খেংগ্রং | তঞ্চঙ্গ্যা | তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত | 2025 |
| হেঙ্গরঙ / হেঙ্গরঙ্গ | তঞ্চঙ্গ্যা কবিতার বাংলা অনুবাদ ও টীকা | পার্বত্য চট্টগ্রামঃ আদিবাসী কবি ও কবিতা | 2020 |
ছকের দুটি জিনিস চোখে পড়ে। প্রথমত, যে বানান সার্চে সবচেয়ে বেশি খোঁজা হয় — খেংগ্রং — সেটি আর্কাইভে মাত্র একবার আছে, তঞ্চঙ্গ্যা লেখায়। চাকমা লেখার অধিকাংশই হ-দিয়ে-শুরু রূপ ব্যবহার করে। দ্বিতীয়ত, একই লেখার ভেতরেও বানান বদলায়: উভগীত নিয়ে লেখাটির গদ্যে হেঙগরং, আর উদ্ধৃত গানের পদে হেংগরঙ।
আর্কাইভের চাকমা ভাষার বর্ণমালা ও ব্যকরণ লেখায় চাকমা ভাষায় ঢোকা “অনার্য শব্দ”-এর উদাহরণ তালিকায় একটি জোড়া আছে: চাকমা “হেংগ্রং”, আরাকানি “খেং খ্রেং”। লেখাটি এই শব্দগুলোকে আরাকানি, ত্রিপুরি (ককবরক) বা কুকি-চীন ভাষা থেকে চাকমায় আসা শব্দের দলে রেখেছে। অর্থাৎ এই লেখা অনুযায়ী যন্ত্রের চাকমা নামটির আরাকানি প্রতিরূপ আছে।
এই সূত্রটি “তিন নাম”-এর প্রশ্নে নতুন আলো ফেলে। বাংলাপিডিয়ার ইংরেজি সংস্করণে মারমা নামটি khre khreng, যার শেষাংশ আরাকানি খেং খ্রেং-এর শেষাংশের সঙ্গে প্রায় হুবহু মেলে। বাংলা সংস্করণে একই নাম খ্রে খ্রং। চাকমা হেংগ্রং, তঞ্চঙ্গ্যা খেংগ্রং ও খেংখং, আরাকানি খেং খ্রেং আর মারমা খ্রে খ্রং — ধ্বনির দিক থেকে এগুলো একই পরিবারের মনে হয়। ত্রিপুরা নাম সাংমুঙ্ এই পরিবারের বাইরে।
তবে সতর্কতা দরকার। এই ধ্বনিগত মিল একটি পর্যবেক্ষণ; কোনো উৎস বলেনি যে মারমা নামটি আরাকানি নাম থেকে এসেছে, বা চার নামের একটি মূল শব্দ আছে। শব্দটির ব্যুৎপত্তি নিয়ে কোনো ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা পাওয়া যায়নি। আর্কাইভের লেখাটি কেবল চাকমা-আরাকানি জোড়াটি দিয়েছে।
সব উৎস একমত যে যন্ত্রটি বাঁশের। তবে বাঁশের কোন অংশ, তা নিয়ে তিন রকম বর্ণনা আছে, আর কোনোটিতে মাপ নেই।
| উৎস | উপাদানের বর্ণনা |
|---|---|
| বাংলাপিডিয়া | “বাঁশের কঞ্চি দিয়ে” |
| তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত | “বাঁশের ফালি দিয়ে তৈরি যন্ত্র (মাউথ অর্গান)” |
| তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয় | “বাঁশের ফালি দিয়ে তৈরী খেংখং বা মাউথ অর্গান” |
| পার্বত্য চট্টগ্রামঃ আদিবাসী কবি ও কবিতা | “সুতো ও বাঁশের টুকরো দিয়ে তৈরি এক ধরনের সুরেলা বাদ্য” |
| চাংমাটারা | চাকমাদের “বাঁশ ও গাছের তৈরী বাদ্যযন্ত্র ও খেলার উপকরণ”-এর তালিকায় হেঙগরঙ |
কঞ্চি হলো বাঁশের সরু ডাল, আর ফালি হলো বাঁশ চিরে বের করা পাতলা টুকরো। দুটো এক জিনিস নয়, তবে একটি সরু কঞ্চি চিরেও ফালি তৈরি হতে পারে — উৎসগুলো এ নিয়ে কিছু বলে না। সবচেয়ে তথ্যপূর্ণ বর্ণনাটি এসেছে একটি কবিতার টীকা থেকে: লগ্নকুমার তঞ্চঙ্গ্যার কবিতার অনুবাদের নিচে হেঙ্গরঙ্গ শব্দের অর্থ লেখা হয়েছে “সুতো ও বাঁশের টুকরো দিয়ে তৈরি”। অর্থাৎ যন্ত্রে বাঁশের সঙ্গে একটি সুতোও থাকে।
কতটা লম্বা, কতটা চওড়া, ভেতরে কোনো কাটা জিভ আছে কি না, সুতো কোথায় বাঁধা — এর কোনোটিই কোনো উৎসে লেখা নেই। চাকমাদের বাঁশি বা ধুধুকের মতো যন্ত্রের বেলায় বাংলাপিডিয়া গঠন বর্ণনা করেছে (ধুধুকের বেলায় “দুপ্রান্ত বন্ধ দুহাত লম্বা এক খন্ড বাঁশ”), কিন্তু খেং খরং-এর বেলায় কেবল উপাদানের নাম দিয়েছে।

আর্কাইভের তঞ্চঙ্গ্যা লেখা অনুযায়ী খেংগ্রং ঠোঁটের দুই ফাঁকে রেখে আলতো করে টেনে টেনে বাজানো হয়। যন্ত্র কীভাবে ধরা হয়, তার এটিই একমাত্র বিবরণ। লেখাটি তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়, যেখানে তঞ্চঙ্গ্যা যুবতীদের বাজানোর কথা এভাবে লেখা:
এই যন্ত্র ঠোটের দু ফাঁকে স্থাপন করে একটু বা ঈষৎ টেনে টেনে শব্দ তরঙ্গের সৃষ্টি করে
তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয়, জুমজার্নাল, 2020
একই বছরে প্রকাশিত আর্কাইভের আরেকটি তঞ্চঙ্গ্যা লেখা — তঞ্চঙ্গ্যা ভাষায় প্রবাদ-প্রবচন ও তঞ্চঙ্গ্যা ধাঁধা — একটি ধাঁধা রেখেছে, যার উত্তর খেংখং। আর্কাইভে ধাঁধাটি হুবহু এভাবে আছে: “লুরি টানিলে মোইন গুচরে- খেংখং”। ধাঁধাটির অর্থ বা বাংলা অনুবাদ লেখাটিতে দেওয়া নেই।
দুটি আলাদা লেখা তাই একই দিকে ইঙ্গিত করে: তঞ্চঙ্গ্যা লেখা অনুযায়ী যন্ত্রটি ঠোঁটে ধরে টেনে বাজানো হয়, আর কবিতার টীকা অনুযায়ী এতে সুতো থাকে। ধনুক বা ছড় দিয়ে বাজানোর কথা কোনো উৎসে নেই; আঙুলে টোকা দেওয়ার কথাও নেই।
উৎসগুলো যন্ত্রটির শ্রেণি নিয়ে দুই রকম কথা বলে। বাংলাপিডিয়া খেং খরংকে “বেহালা জাতীয়” আটটি যন্ত্রের দলে রেখেছে, ইংরেজিতে violin-like। জুমজার্নালের দুটি তঞ্চঙ্গ্যা লেখা একে বলেছে “মাউথ অর্গান”। দুটো শ্রেণি একেবারে আলাদা: বেহালায় তারে ছড় টেনে শব্দ হয়, মাউথ অর্গানে মুখের বাতাস বা মুখগহ্বর কাজে লাগে।
বাংলাপিডিয়ার “বেহালা জাতীয়” দলটি একটু ঢিলেঢালা। একই দলে আছে মারমাদের ক্রি-চয়, যাতে “দুটি কাঠির সাহায্যে” পনেরো-বিশটি তারে সুর তোলা হয়, আর ফকির দাঙ্গাইস, যা “একতারা বিশেষ”। অর্থাৎ দলটিতে ছড়ের যন্ত্র ছাড়াও কাঠি বা আঙুলে বাজানো তারের যন্ত্র আছে। খেং খরং-এর বেলায় কীভাবে বাজানো হয়, সে কথা বাংলাপিডিয়া লেখেনি।
আর্কাইভের বর্ণনা — ঠোঁটের ফাঁকে বাঁশের ফালি, সুতো, টান দিয়ে শব্দ — ইংরেজিতে যে যন্ত্রকে jaw harp বা mouth harp বলা হয়, তার সংজ্ঞার সঙ্গে মেলে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী এটি একটি ফ্রেমে লাগানো নমনীয় ধাতব বা বাঁশের জিভ; ফ্রেম ধরা হয় দাঁত বা ঠোঁটের সঙ্গে, মুখ কাজ করে অনুরণকের মতো; আর জিভ নাড়ানো হয় টোকা দিয়ে, নয়তো সুতো টেনে (string-pulled)। তবে এটি একটি তুলনা, উৎসের দাবি নয়: পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনো উৎস খেংগ্রংকে ইংরেজিতে jaw harp বলেনি, আর বাংলাপিডিয়া ও আর্কাইভের শ্রেণিবিভাগ এখনো পরস্পরবিরোধী।
| প্রশ্ন | বাংলাপিডিয়া | জুমজার্নালের আর্কাইভ |
|---|---|---|
| শ্রেণি | বেহালা জাতীয় (violin-like) | মাউথ অর্গান |
| উপাদান | বাঁশের কঞ্চি | বাঁশের ফালি; সুতো ও বাঁশের টুকরো |
| বাজানোর ভঙ্গি | লেখা নেই | ঠোঁটের দু ফাঁকে রেখে টেনে টেনে |
| কে বাজায় | লেখা নেই | তঞ্চঙ্গ্যা যুবতী বা নারী; চাকমা কাহিনিতে তরুণ-তরুণী দুজনেই |
| কখন | আনন্দ-উৎসবে | উভাগীত, উৎসব, জুমঘরের অবসর |
না। জুমজার্নালের লেখায় প্লুংকে মুখ-অর্গান আর খেংগ্রংকে “মাউথ অর্গান” বলা হয়েছে বলে গুলিয়ে যাওয়া সহজ, কিন্তু উৎস অনুযায়ী গঠন আলাদা। প্লুং ম্রো ও খুমিদের যন্ত্র, লাউয়ের খোলে কয়েকটি বাঁশের নল বসিয়ে তৈরি, আর নলের সংখ্যা দিয়ে তার প্রকার চেনা যায় — বিস্তারিত আছে প্লুং বাঁশি: প্লুংমা, প্লুংকে আর তিনতেং লেখায়। খেংগ্রং-এর বর্ণনায় লাউ নেই, নল নেই; আছে একটি বাঁশের ফালি আর সুতো, যা ঠোঁটের ফাঁকে ধরা হয়।
জনগোষ্ঠীও আলাদা। বাংলাপিডিয়ায় প্লুং-এর মালিক ম্রো ও খুমি, আর খেং খরং-এর চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও ত্রিপুরা। দুই তালিকায় কোনো জনগোষ্ঠী মেলে না। একটি চাকমা লেখায় অবশ্য দুই নাম পাশাপাশি এসেছে: “মোনঘর” লেখাটি বলছে, জুমের ফসল তোলার মৌসুমে পাহাড়ে পাহাড়ে বাজে “হেঙগরঙ, ধুধুক, শিঙে বা পুলুঙ”। এখানে পুলুঙ চাকমা প্রসঙ্গে প্লুং-জাতীয় যন্ত্রের নাম কি না, লেখাটি ব্যাখ্যা করেনি।
তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে খেংগ্রং নারীদের যন্ত্র বলে দুটি লেখায় আছে, আর পুরুষেরা বাজান বাঁশি। তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত বলছে, উভাগীতের সুরে “মহীলারা” খেংগ্রং বাজায় আর “পুরুষেরা বাঁশের তৈরি বাঁশি বাজায়”; গীঙলী বা গেঙ্গুলীরা বাজান বেহালা। তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয় আরও নির্দিষ্ট করে বলছে “তঞ্চঙ্গ্যা যুবতীরা”।
চাকমা উৎসে এমন নারী-পুরুষ ভাগ নেই। রাধামন-ধনপুদির কাহিনিতে দুজনেই একসঙ্গে বাজাতে শেখেন — আর্কাইভের লেখায় “খেংগরং, বাঁশি, ধুধুক, শিঙা, মেমত”, আর প্রথম আলোর লেখায় “বাঁশের বাদ্যযন্ত্র খেংগড়ং আর ধুদক”। চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ লেখাটি বলছে, জুমিয়াদের ঘরে “তরুণ তরুণী থাকলে” বেড়ায় হেংগরং ঝোলানো থাকে — যুবক না যুবতী, আলাদা করেনি।
তুলনার জন্য একটি তথ্য, যার সঙ্গে খেংগ্রং-এর সম্পর্ক কোনো উৎসে প্রমাণিত নয়: আর্কাইভের ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ লেখা বলছে, ককবরকভাষীদের “দাংদু বলে একটি বাদ্য যন্ত্র রয়েছে যা অতীতে যুবতীরা বাজাত”। দাংদু দেখতে কেমন বা কী দিয়ে তৈরি, লেখাটি বলেনি, আর দাংদু ও সাংমুঙ্ এক যন্ত্র কি না, কোথাও লেখা নেই।

চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যা দুই সমাজেই খেংগ্রং-এর সবচেয়ে বেশি উল্লেখ প্রেমের গানের সঙ্গে — তঞ্চঙ্গ্যাদের উভাগীত আর চাকমাদের উভগীত। দুটো লেখাতেই যন্ত্রটির জুড়ি বাঁশি।
তঞ্চঙ্গ্যা লেখা অনুযায়ী উভাগীতের অপর নাম সাপ্প্যেগীত, আর তা সাধারণত প্রেমের গান; এর সুরেই নারীরা খেংগ্রং বাজান। চাকমা উভগীত নিয়ে আর্কাইভের চাকমা লোক-সঙ্গীতে বিলুপ্তপ্রায় উভগীত লেখাটি বলছে, তরুণ-তরুণীর পালাক্রমে গাওয়া এই গানে “সঙ্গত হয় আপন মাধুরী মেশানো হেঙগরং আর বাঁশির অনুপম সুর”। ওই লেখায় উদ্ধৃত একটি উভগীতে তরুণের পদেই যন্ত্রগুলোর নাম আছে: “হেংগরঙ আর বাঝিবুও, বেলাবুও লঘে শিঙেবুও”।
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে 2021 সালে জমা দেওয়া নিধি চাকমার এমএ থিসিস Love, Longing and Commemoration: A Study of Chakma Culture through the Ubogeet একই কথা বলছে ইংরেজিতে: উভগীত গাওয়া হয় ঐতিহ্যবাহী যন্ত্রসহ বা যন্ত্র ছাড়া, যন্ত্রের উদাহরণ বাঁশি বা ‘Hengorong’। অর্থাৎ যন্ত্রটি গানের অপরিহার্য অঙ্গ নয়, ঐচ্ছিক সঙ্গী।
পালাগানের সঙ্গে সম্পর্কটি আলাদা। গেংখুলি পরিবেশনার যন্ত্র নিয়ে উৎসগুলোর বিভিন্ন তালিকা — কোনোটিতে দুটি, কোনোটিতে আটটি — বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে গেংখুলি: চাকমা চারণ কবি ও তাঁদের পরিবেশনা লেখায়; এখানে কেবল এটুকু যে প্রতিটি তালিকাতেই হেংগরং বা তার কোনো বানান আছে।
চাকমা লেখাগুলোতে খেংগ্রং মঞ্চের যন্ত্র নয়, ঘরের যন্ত্র। চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে জুমচাষ লেখায় জুমঘরের বর্ণনা: “জুমিয়াদের মধ্যে তরুণ তরুণী থাকলে ঘরের বেড়ায় বাঁশের খাপে হেংগরং, বাঝি বা বাঁশি ও ধুধক লটকে থাকতে দেখা যায়।” একই লেখা বলছে, চাকমা গানে সবচেয়ে বেশি উল্লেখ পাওয়া চারটি ঐতিহ্যবাহী যন্ত্র “ধুধুক, বাঝি, শিঙা ও হেংগরং”।
বাজানোর সময় নিয়েও একটি চাকমা লেখায় ইঙ্গিত আছে। মোনঘর, ৭০ দশক এবং জুম পাহাড়ের রেনেসাঁ লেখাটি ভাদ্র-আশ্বিনের ফসল তোলার মৌসুমের বর্ণনায় বলছে, তখন পাহাড়ে পাহাড়ে “হেঙগরঙ, ধুধুক, শিঙে বা পুলুঙ এর সুর ও তাল” ধ্বনিত হয়। চাংমাটারা – চাকমা জাতির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস হেঙগরঙকে রেখেছে “বিনোদনমুলক” দলে, বাঁশ ও গাছের তৈরি অন্য যন্ত্র ও খেলার উপকরণের সঙ্গে।
চাকমাদের সবচেয়ে পরিচিত পালা রাধামন-ধনপুদিতে যন্ত্রটি কাহিনির ভেতরেই আছে। আর্কাইভের রাধামন ধনপুদি পালা ও ইতিহাসের কিছু কথা লেখায় শৈশবের খেলার তালিকার পরেই: “কখনো মুখে খেংগরং, বাঁশি, ধুধুক, শিঙা, মেমত বাজাতো শিখলো।” লক্ষণীয় যে এখানে “মুখে” শব্দটি আছে — যা যন্ত্রটি মুখে ধরে বাজানোর বর্ণনার সঙ্গে মেলে, যদিও বাক্যটি তালিকার সব যন্ত্রের বেলায়ই প্রযোজ্য হতে পারে। পালাটির পাঠ ও পাঠভেদ নিয়ে আলাদা আলোচনা আছে গেংখুলি ও রাধামন-ধনপুদি লেখায়।
দুটি কবিতায় যন্ত্রটি এসেছে হারিয়ে যাওয়া জুম-জীবনের প্রতীক হিসেবে — একটি চাকমা, একটি তঞ্চঙ্গ্যা। চাকমা কবিতাটি ফেলাজিয়া চাকমার “জুম্মবী পরানী মর”, সত্তরের দশকে লেখা। আর্কাইভের বিংশ শতাব্দী পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণ লেখা অনুযায়ী কবিতাটি প্রথম ছাপা হয় 1973 সালে ‘বার্গী’ সংকলনে, আর সুগত চাকমার বরাত দিয়ে লেখাটি জানায়, কবিতাটির মূল প্রায় 70 লাইনের মধ্যে প্রথম প্রকাশে ছাপা হয়েছিল 35টি, আর সুগত চাকমা একে কিটসের Ode to Autumn-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কবিতার তৃতীয় স্তবকে জুমিয়ার কাছে প্রশ্ন: মনে পড়ে কি মোনঘর, চাঁদনি রাত, বাঁশি, শিঙা, ধুধুক — আর মূল চাকমা পদে “কুজিকুজি মনকানানি থেংগরঙ’র” সুর? লেখাটির বাংলা অনুবাদে এটি হয়েছে “মন মাতানো খেংগ্রংঙের সুমধুর সুর”। মূলে থেংগরঙ, অনুবাদে খেংগ্রংঙ — একই কবিতার দুই ভাষায় দুই বানান।
তঞ্চঙ্গ্যা কবিতাটি লগ্নকুমার তঞ্চঙ্গ্যার, যিনি আর্কাইভের পার্বত্য চট্টগ্রামঃ আদিবাসী কবি ও কবিতা লেখা অনুযায়ী তঞ্চঙ্গ্যা ও বাংলা দুই ভাষায় লেখেন। তঞ্চঙ্গ্যা থেকে অনূদিত কবিতায় কর্ণফুলীর ধারে বুলিভিদার পাহাড়ের নিচের বসতির স্মৃতি: সেই দিনে হাওয়ায় ভেসে বেড়াত “ভালোবাসার উভাগীত, ধুধুক, বাঁশি ও হেঙ্গরঙের সুর”। কবিতার পরেই টীকায় হেঙ্গরঙ্গ শব্দের অর্থ — “সুতো ও বাঁশের টুকরো দিয়ে তৈরি এক ধরনের সুরেলা বাদ্য” — যা যন্ত্রটির গঠনের সবচেয়ে স্পষ্ট লিখিত বর্ণনাগুলোর একটি।
দুই কবিতাতেই যন্ত্রটি অতীত কালের ক্রিয়ায় বাঁধা। চাকমা কবিতা জিজ্ঞেস করে “মনে পড়ে কি”, তঞ্চঙ্গ্যা কবিতা শেষ হয় এই বলে যে সেই দিনগুলো আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না।
মারমা ও ত্রিপুরা সমাজে যন্ত্রটির নাম ছাড়া আর কিছু জানা যায় না। দুটি নামের একমাত্র উৎস বাংলাপিডিয়া, আর সেখানে নাম দুটি ছাড়া কোনো আলাদা বিবরণ নেই — কে বাজান, কোন গানে, কোন অনুষ্ঠানে, কিছুই নয়।
মারমাদের নিজস্ব যন্ত্রতালিকাগুলোতে নামটি নেই। আর্কাইভের মারমা জাতির আদ্যোপান্ত লেখায় বোমাং রাজপুণ্যাহর যন্ত্রীদলে আছে খরা, মঙঃ, প্যাহ্, হ্নেঃ ও চে; বাংলাপিডিয়ার মারমা নিবন্ধে সেইং ওয়েইং, কিয়ে ওয়েইং, পিলিঈ ও ঝিনে। দুই তালিকাই রাজদরবার বা প্রধান যন্ত্রের, তাই একটি ছোট অবসরের যন্ত্র সেখানে না থাকাটা অস্বাভাবিক নয় — কিন্তু তাতে নামটির দ্বিতীয় কোনো সমর্থনও মেলে না।
ত্রিপুরাদের বেলায়ও একই অবস্থা। আর্কাইভের ককবরক সঙ্গীত অতীত ও ভবিষ্যৎ লেখা যন্ত্রের নাম দিয়েছে সারিন্দা, সুমুই, চংপ্রেং, খাম, ওয়াখপ, দাংদু ও হারিয়ে যাওয়া মুরি — সাংমুঙ্ নেই। বাংলাপিডিয়ার বাংলা সংস্করণে নামটি সাংমুঙ্, ইংরেজি সংস্করণে sangmun — শেষের ব্যঞ্জনে অমিল।
এই দুই জনগোষ্ঠীর বেলায় তথ্যের এই অভাব এই লেখার সবচেয়ে বড় ফাঁক। পুরো চিত্রের জন্য পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য যন্ত্রগুলোর সঙ্গে তুলনা দেখতে পারেন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাদ্যযন্ত্রের তালিকা ও পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র: নাম ধরে ধরে একটি পাঠ লেখায়, আর অঞ্চলের সার্বিক পরিচয় পাবেন পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
খেংগ্রং হারিয়ে যাচ্ছে, এমন সরাসরি দাবি কোনো উৎসে নেই; কতজন বাজাতে জানেন, সে হিসাবও নেই। তবে কয়েকটি উৎস আলাদাভাবে এই যন্ত্র যে গান ও জীবনধারার সঙ্গে জড়িত, তার ক্ষয়ের কথা বলে।
চাকমা উভগীত নিয়ে আর্কাইভের লেখাটির শিরোনামেই আছে “বিলুপ্তপ্রায়”। নিধি চাকমার থিসিস বলছে, উভগীত, থেংগা বাংগা গীত ও গেংখুলি গীতের মতো ঐতিহ্য শিক্ষিত শ্রেণির কাছে ‘unfashionable’ ও ‘backward’ হয়ে উঠেছে। আর বাংলাদেশের বাদ্যযন্ত্র, পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, ম্রো ও বমদের যন্ত্রসহ, নিয়ে গবেষণা করা রল্ফ কিলিয়াস তাঁর গবেষণার পাতায় বাংলাদেশে ঐতিহ্যবাহী সংগীতের সাধারণ অবস্থাকে “dire” বলেছেন। দুই কবিতাও যন্ত্রটিকে অতীতের স্মৃতি হিসেবে রেখেছে।
উল্টো দিকে একটি উদ্যোগের খবর আছে। আর্কাইভে বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার পরিচিতি (তঞ্চঙ্গ্যা জাতির মহাতরী) বলছে, সংস্থাটি রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক কেন্দ্রভিত্তিক তঞ্চঙ্গ্যা নৃত্য, গীত, পীংগিলি গীত, “খেংস্থরং ও বাঁশী” প্রশিক্ষণের পরিকল্পনা নিয়েছে, আর ইনস্টিটিউটে “১০দিন ব্যাপী কিছু প্রশিক্ষণের কাজ” সম্পন্ন হয়েছে। সেই প্রশিক্ষণে খেংস্থরং শেখানো হয়েছিল কি না, লেখাটি আলাদা করে বলেনি।
বাঁশের তৈরি একটি ছোট যন্ত্র। বাংলাপিডিয়া একে বেহালা-জাতীয় যন্ত্রের দলে রেখেছে। জুমজার্নালের তঞ্চঙ্গ্যা লেখাগুলো একে বলেছে বাঁশের ফালির মাউথ অর্গান, যা ঠোঁটের দুই ফাঁকে রেখে টেনে টেনে বাজানো হয়। একটি কবিতার টীকায় একে সুতো ও বাঁশের টুকরোর তৈরি সুরেলা বাদ্য বলা হয়েছে। শ্রেণি নিয়ে দুই উৎস একমত নয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, মারমা ও ত্রিপুরা — চার জনগোষ্ঠী বাঁশের কঞ্চি দিয়ে এটি তৈরি করে আনন্দ-উৎসবে বাজায়, তবে চাকমাদের মধ্যে ব্যবহার বেশি। চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যাদের ক্ষেত্রে জুমজার্নালের আর্কাইভ, উইকিপিডিয়া ও মিজোরামের চাকমা জেলা পরিষদ এর সমর্থন দেয়; মারমা ও ত্রিপুরার ক্ষেত্রে বাংলাপিডিয়াই একমাত্র উৎস।
বাংলাপিডিয়ার বাংলা সংস্করণ অনুযায়ী মারমারা বলে খ্রে খ্রং, ত্রিপুরারা বলে সাংমুঙ্। ইংরেজি সংস্করণে একই নাম দুটি লেখা khre khreng ও sangmun। এই দুই নামের অন্য কোনো লিখিত উৎস পাওয়া যায়নি, আর মারমা বা ত্রিপুরা সমাজে যন্ত্রটি কখন, কে বাজান, সে বিবরণও কোথাও নেই।
চাকমা লেখায় নামটি সাধারণত হ দিয়ে শুরু: হেঙগরঙ, হেংগরং, হেংগ্রং। রাধামন-ধনপুদি প্রসঙ্গে আর্কাইভে খেংগরং, প্রথম আলোয় খেংগড়ং, ফেলাজিয়া চাকমার কবিতার মূলে থেংগরঙ। মিজোরামের চাকমা জেলা পরিষদ ও নিধি চাকমার থিসিস ইংরেজিতে লিখেছে Hengorong। এক যন্ত্রের এতগুলো বানানই এ নিয়ে খোঁজাকে কঠিন করে।
তঞ্চঙ্গ্যা লেখায় নামটি খ দিয়ে শুরু: খেংখং (বাংলাপিডিয়া, আর্কাইভের দুটি লেখা), খেংগ্রং (তঞ্চঙ্গ্যা জাতির আদ্যোপান্ত) ও খেংস্থরং (তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থার পরিচিতি)। ইংরেজি উইকিপিডিয়া ও বাংলাপিডিয়া লিখেছে Khengkhong। লগ্নকুমার তঞ্চঙ্গ্যার কবিতার বাংলা অনুবাদে অবশ্য রূপটি হেঙ্গরঙ। আর্কাইভের দুটি লেখা অনুযায়ী তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে যন্ত্রটি বাজান নারীরা।
পুরোপুরি নয়। বাংলাপিডিয়ায় চার জনগোষ্ঠীর কথা আছে, কিন্তু চাকমা ও তঞ্চঙ্গ্যারা একই নাম বলেন, এমন কথা নেই। নিজেদের লেখায় চাকমা রূপ হেঙগরঙ-ধরনের, তঞ্চঙ্গ্যা রূপ খেংখং-ধরনের। প্রতি জনগোষ্ঠীর একটি করে নাম ধরলে নাম চারটি, আর বানান ধরলে পনেরোর বেশি। মারমা ও ত্রিপুরা নাম দুটি অবশ্য কেবল বাংলাপিডিয়াতেই পাওয়া যায়।
তঞ্চঙ্গ্যা জাতিসত্তার আত্মপরিচয় লেখাটি বলছে, যন্ত্রটি ঠোঁটের দুই ফাঁকে স্থাপন করে ঈষৎ টেনে টেনে শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করা হয়। আর্কাইভের তঞ্চঙ্গ্যা ধাঁধার সংকলনে খেংখং একটি ধাঁধার উত্তর, তবে ধাঁধাটির অর্থ সেখানে ব্যাখ্যা করা নেই। একটি কবিতার টীকা বলছে, যন্ত্রে সুতো থাকে। ছড় বা আঙুলের টোকায় বাজানোর কথা কোনো উৎসে নেই।
না। জুমজার্নালের লেখায় দুটিকেই মুখ-অর্গান বা মাউথ অর্গান বলা হলেও গঠন আলাদা। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী প্লুং ম্রো ও খুমিদের যন্ত্র, লাউয়ের খোলে বাঁশের নল বসিয়ে তৈরি। খেংগ্রং-এর বর্ণনায় লাউ বা নল নেই; আছে বাঁশের ফালি ও সুতো, যা ঠোঁটের ফাঁকে ধরা হয়। দুই যন্ত্রের জনগোষ্ঠীর তালিকাও মেলে না।
তঞ্চঙ্গ্যা সমাজে নারীরা। আর্কাইভের দুটি লেখা বলছে উভাগীতের সুরে মহিলারা বা যুবতীরা খেংগ্রং বাজান, আর পুরুষেরা বাজান বাঁশি। চাকমা উৎসে এমন ভাগ নেই: রাধামন ও ধনপুদি দুজনেই বাজাতে শেখেন, আর জুমঘরে তরুণ-তরুণী থাকলে বেড়ায় হেংগরং ঝোলানো থাকে বলে একটি লেখায় আছে।
মূলত প্রেমের গানের সঙ্গে। তঞ্চঙ্গ্যারা উভাগীতের সুরে বাজান। চাকমা উভগীত নিয়ে আর্কাইভের লেখা বলছে এই গানে সঙ্গত হয় হেঙগরং আর বাঁশির সুর। নিধি চাকমার 2021 সালের থিসিস অনুযায়ী উভগীত যন্ত্রসহ বা যন্ত্র ছাড়াও গাওয়া হয়, যন্ত্রের উদাহরণ বাঁশি বা Hengorong।
ব্যুৎপত্তি নিয়ে কোনো ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনা পাওয়া যায়নি। তবে জুমজার্নালের চাকমা ভাষার বর্ণমালা ও ব্যকরণ লেখায় চাকমা “হেংগ্রং”-এর পাশে আরাকানি প্রতিরূপ “খেং খ্রেং” দেওয়া আছে, অন্য ভাষা থেকে আসা শব্দের উদাহরণ হিসেবে। মারমা খ্রে খ্রং ধ্বনিতে এর কাছাকাছি; ত্রিপুরা সাংমুঙ্ আলাদা।
কতজন বাজান, তার কোনো হিসাব কোনো উৎসে নেই। চাকমা উভগীতকে আর্কাইভের একটি লেখা বিলুপ্তপ্রায় বলেছে, আর দুটি কবিতা যন্ত্রটিকে হারানো জুম-জীবনের স্মৃতি হিসেবে রেখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ তঞ্চঙ্গ্যা কল্যাণ সংস্থা খেংস্থরং ও বাঁশি প্রশিক্ষণের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে; সেই প্রশিক্ষণে যন্ত্রটি শেখানো হয়েছিল কি না, তা আলাদা করে বলা নেই।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 23 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যা, ত্রিপুরা, বাদ্যযন্ত্র, মারমা, লোকসংগীত
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।