Last updated Oct 15th, 2026
0

দেমাগ্রীর শিবিরে নাম লেখানোর সময় বুদ্ধধন চাকমাকে একটা প্রশ্ন করা হয়েছিল — সোনা, রুপা বা টাকা কিছু আছে কি? থাকলে জমা দিতে হবে। তাঁর মা তৎক্ষণাৎ হিসাব করে নিয়েছিলেন: এখন জমা দিলে পরে যদি ফেরত না পাই? তাই তিনি নিজের পিননের লাল পাড়ে লাল কাপড় দিয়ে একটা পকেট সেলাই করে ২২–২৩ হাজার টাকা লুকিয়ে রেখেছিলেন।
এটা ১৯৬৩ সালের আগের কথা। বুদ্ধধন চাকমা ছিলেন দেমাগ্রী শিবিরের ২২ নম্বর গ্রুপের নেতা — ৬৬২ জন মানুষের দল। সেখান থেকে তাঁদের হাঁটতে হয়েছিল ৩১ দিন।
এই লেখাটি তাঁদের নিয়ে — কাপ্তাই বাঁধের পানিতে যাঁদের গ্রাম ডুবে গিয়েছিল, যাঁরা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে গিয়েছিলেন, আর ষাট বছর পরেও যাঁদের একটা বড় অংশ নাগরিক নন। পাহাড়ের পাঠকের কাছে এঁরা অপরিচিত কেউ নন — একই জাতি, সীমান্তের অন্য পাশে।
লেখার প্রথম অর্ধেকটা দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণের উপর, যা জুমজার্নালের আর্কাইভেই আছে: পার্বত্য চট্টগ্রাম টু নেফা, ভারত : বড়পরং যাত্রা — সমারী চাকমার সংকলিত “কাপ্তাই বাঁধ : বর-পরং – ডুবুরীদের আত্মকথন” থেকে নেওয়া বুদ্ধধন চাকমার নিজের বয়ান। দ্বিতীয় অর্ধেকটা দাঁড়িয়ে আছে ভারতের আদালতের রায়, আদমশুমারি ও সরকারি নথির উপর।
২০১১ সালের ভারতীয় আদমশুমারিতে ভারতে চাকমাদের সংখ্যা ২,২৮,২৮১। রাজ্য ধরে ধরে: মিজোরামে ৯২,৮৫০, ত্রিপুরায় ৮৪,২৬৯, অরুণাচল প্রদেশে ৪৭,০৭৩, আসামে ৩,১৬৬, পশ্চিমবঙ্গে ১৭৫, মেঘালয়ে ১৫৯ ও নাগাল্যান্ডে ১৫৬। অর্থাৎ ভারতের চাকমাদের প্রায় সবাই উত্তর-পূর্বের তিনটি রাজ্যে।
তুলনার জন্য: বাংলাদেশের ২০২২ সালের আদমশুমারিতে চাকমাদের সংখ্যা ৪,৮৩,২৯৯। আর মিয়ানমারে ‘দাইংনেট’ নামে পরিচিত অংশটি প্রায় ৪৩,১০০। সব মিলিয়ে চাকমা জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি বাংলাদেশের বাইরে।
এই তিন রাজ্যে তাঁদের অবস্থা কিন্তু তিন রকম, আর সেটিই এই লেখার মূল কথা। মিজোরামে তাঁদের একটি সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ আছে। ত্রিপুরায় তাঁরা তফসিলি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃত। অরুণাচলে ষাট বছর বসবাসের পরেও তাঁদের বড় অংশের নাগরিকত্বের কাগজ হয়নি।
একটি সতর্কতা সংখ্যার ব্যাপারে। এই অঙ্কগুলো আদমশুমারির, তবে শুমারির নিজের টেবিল থেকে নেওয়া নয় — সংখ্যাগুলো এসেছে সেই উৎস থেকে, যারা শুমারিকে উদ্ধৃত করেছে। মিজোরামের সংখ্যা নিয়ে দুটি হিসাব চোখে পড়েছে, ৯২,৮৫০ আর ৯৬,৯৭২ — দুটোই ২০১১ শুমারির বলে দাবি করা। [যাচাই প্রয়োজন]
মূল কারণ কাপ্তাই বাঁধ। ষাটের দশকে কর্ণফুলী নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়, তাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে উর্বর এলাকা পানির নিচে চলে যায়। জুমজার্নালের আর্কাইভের হিসাব অনুযায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় এক লাখ মানুষ, যাঁদের অধিকাংশ চাকমা — তখন গোটা পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা ছিল প্রায় তিন লাখ।
অর্থাৎ প্রতি তিনজনে একজন। এমন অনুপাতে উচ্ছেদ কোনো জনগোষ্ঠী সহজে সামলাতে পারে না।
আর ভৌগোলিক দিকটিও গুরুত্বপূর্ণ। ডুবে যাওয়া এলাকাটি ছিল নদীর অববাহিকার সমতল জমি — পাহাড়ের ভেতরে যে অল্প কিছু ধানি জমি ছিল, তার প্রায় সবই। পাহাড়ে উঠে গেলে জুম করা যায়, কিন্তু হালচাষ করা যায় না। তাই যাঁরা সরে গেলেন, তাঁরা শুধু বাড়ি হারালেন না — চাষের ধরনটাই বদলাতে বাধ্য হলেন।
সময়রেখাটি লক্ষ করার মতো। আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী বাঁধের কাজ শুরু হয় ১৯৫২ সালে, শেষ হয় ১৯৫৮-র শুরুতে। কিন্তু সব spillway বন্ধ করে দেওয়ার পর বাঁধটি ভেঙে যায়। এরপর আইয়ুব খান পাকিস্তানের ক্ষমতা নেওয়ার পর আমেরিকার সহায়তায় আবার কাজ শুরু হয়ে ১৯৬১ সালে শেষ হয়।

সরকার বলেছিল ২৫০ বর্গমাইল এলাকা ডুববে; ডুবল ৩৫০ বর্গমাইল, আর বর্ষায় হ্রদের আয়তন হয় ৪০০ বর্গমাইল। এই ১০০ বর্গমাইলের ফারাকেই হাজারো পরিবারের হিসাব উল্টে যায় — কারণ ক্ষতিপূরণের তালিকা তৈরি হয়েছিল ছোট হিসাবটির ভিত্তিতে।
আর্কাইভের হিসাব ধরে ধরে:
বুদ্ধধন চাকমার বয়ানে একটি বিশদ আছে যা সরকারি নথিতে পাওয়া যাবে না: বাঁধটি প্রথমে অন্য জায়গায় হওয়ার কথা ছিল — রংরাংহুল মোন, চিলাক ঢাক-এর গোড়ায়। বিদেশ থেকে ইনজিনিয়ারও এসেছিলেন। পরে কোনো কারণে সেটি বন্ধ করে কর্ণফুলীর কাপ্তাই নামক জায়গায় বাঁধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সবাই পেয়েছিলেন কি না তা আজও কেউ বলতে পারে না। বুদ্ধধন চাকমা নিজের পরিবারের হিসাবটি মনে রেখেছেন: তাঁর আজু ও বাবা জায়গাজমির ক্ষতিপূরণ বাবদ হাতে পেয়েছিলেন ১ লাখ ৬২ হাজার টাকা। বাবা আজুকে নিয়ে রাঙামাটি গিয়ে টাকাটা এনেছিলেন।
তাঁর নিজের ভাষায় সন্দেহটি স্পষ্ট — তিনি লিখছেন, তিনি এখনো সন্দিহান বাঁধের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত সব জায়গার মালিক ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন কি না, কারণ “তখন তো এইসব কাগজে হিসাব কেউ রাখার সময় পায়নি”।
জমির হিসাবের একক নিয়েও একটি কথা আছে। তখন জমি মাপা হতো ‘দুন’ দিয়ে, এখন ‘একর’ দিয়ে। এককের এই বদল নিরীহ জিনিস নয় — যে জমি ‘দুন’-এ লেখা, সেটি একরের কাগজে তুলতে গিয়ে কতটা মিলল বা মিলল না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখন আর বের করা যাবে না।
আরেকটি জিনিস ঘটেছিল যা অনেকে জানেন না: গাছ কাটিং। ডুবে যাওয়া এলাকার উপর দিয়ে যাতে নৌকা বা লঞ্চ চলাচলে বাধা না পড়ে, তাই শ্রমিক এসে গ্রামের বড় বড় গাছ কেটে ফেলতে শুরু করে। বড় গাছের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল — তবে এখানেও একই প্রশ্ন, সবাই পেয়েছিলেন কি না।
ক্ষতিপূরণের টাকায় কী হলো, সেটির একটি দৃশ্যও তিনি রেখে গেছেন। কেউ কেউ রাঙামাটি গিয়ে কলের গান কিনে এনেছিলেন। গ্রাম ছাড়ার দিন কেউ সেই কলের গান বাজিয়ে বাজিয়ে এসেছেন; কেউ নৌকায় বসে করুণ সুরে বাঁশি বাজিয়ে জায়গা ছাড়ার দুঃখ ভুলতে চেয়েছেন। মেয়েরা কেঁদেছেন। তাঁর গ্রাম পুরোপুরি ডুবতে সময় লেগেছিল এক দিন এক রাত।
‘বড়পরং’ বা ‘বর-পরং’ মানে মহাযাত্রা — কাপ্তাই বাঁধের উদ্বাস্তুদের দলে দলে ভারতে চলে যাওয়ার ঘটনাটিকে চাকমা সমাজ এই নামেই চেনে। সিদ্ধান্তটি এক দিনে হয়নি, আর এটি কোনো একক নেতার সিদ্ধান্তও ছিল না।
বুদ্ধধন চাকমার বয়ান অনুযায়ী পুনর্বাসনের নতুন জায়গায় জীবন ভালো যাচ্ছিল না। নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়াতে না পেরে কলেরা, ম্যালেরিয়া ও টাইফয়েডে শত শত মানুষ মারা যান — বিশেষ করে নারী, বৃদ্ধ ও শিশু। এর সঙ্গে যোগ হয় কাঠ কাটা ও হাতি ধরার কাজে নিয়োজিত ‘আনসার কোম্পানি’র আগমন, যা নিয়ে এলাকায় অবিশ্বাস তৈরি হয়।
এখানে তাঁর একটি পার্থক্য-নির্দেশ লক্ষ করার মতো, কারণ এটি সহজ সাধারণীকরণ ভাঙে। তিনি লিখছেন, বহু বছর ধরে রাঙামাটিতে বাস করা বাঙালিদের সঙ্গে কোনো সমস্যা হয়নি, “জীবনভর আমাদের মধ্যে ওঠাবসা ছিল” — সমস্যা শুরু হয় এই নতুন কোম্পানির আসার পর।
তারপর কয়েকজন মানুষ এসে যুক্ত হলেন। সতীশ কানুনগো রাঙামাটি থেকে বাঘাইছড়িতে ফিরলেন, সঙ্গে রাঙামাটি কলেজের ছাত্র কুসুম চাকমা, আর ললিত কানুনগোর ছেলে খোকন। তিনজনে মিলে এলাকার মুরুব্বিদের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন। মৌজায় মৌজায় হেডম্যান, খীসা ও দেওয়ানরা বৈঠক করতে লাগলেন।
ঠিক হলো, আগে কেউ গিয়ে দেখে আসবে। কুসুম চাকমাকে পাঠানো হলো ভারতের দেমাগ্রীতে, সেখান থেকে শিলচরে — সঙ্গে সাহায্যের জন্য একজন কুকি। ফিরে এসে তিনি জানালেন, ভারত সরকার যেতে বলেছে; ভারতে গেলে তারা দায়িত্ব নেবে। বুদ্ধধন চাকমা যোগ করেছেন, “তখন জহুরলাল নেহেরুর সরকার ছিল।” [এটি বক্তার স্মৃতি; নেহেরুর মৃত্যু ১৯৬৪ সালের মে মাসে, তাই তারিখের সঙ্গে মেলানো প্রয়োজন — যাচাই প্রয়োজন]
এই কথার ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত হয়। তারপর বাঘাইছড়ি ও সাজেক থেকে, দীঘিনালার মইনী-চেঙ্গী থেকে দলে দলে মানুষ রওনা দেন।
এক গ্রামের মানুষ কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে বাজি ফুটিয়ে সংকেত পাঠাত — সেই শব্দ শুনে পরের গ্রাম রওনা দিত। বাজিটির নাম ‘গোলাক’। এই একটি বিশদে পুরো ঘটনাটির চরিত্র বোঝা যায়: এটি বিশৃঙ্খল পলায়ন ছিল না, এটি ছিল পরিকল্পিত, ধাপে ধাপে সাজানো একটি যাত্রা।
পরিকল্পনাটি ছিল সরল। একটি গ্রামের মানুষ চলে যাওয়ার পর আরেকটি গ্রামের মানুষ যাবে; আবার পাশাপাশি দুটি গ্রামের বাসিন্দারা একসঙ্গেও যেতে পারবেন। প্রথম দল কিছু দূর গিয়ে গোলাক ফুটিয়ে জানাবে, আর সেই শব্দেই পরের গ্রাম ঘর ছাড়বে।
আরেকটি সংকেত ছিল আরও নীরব। যাঁরা ভোরবেলা ওষুধের দোকানে গিয়ে কুইনিন কিনতেন — তখন ট্যাবলেট নয়, কুইনিন ছিল গুঁড়ো — তাঁদের দেখেই বোঝা যেত, এই পরিবারও দেশ ছাড়ার জন্য তৈরি।
পাকিস্তান সরকারও জেনে গিয়েছিল। বুদ্ধধন চাকমার বয়ান অনুযায়ী সরকারের পক্ষ থেকে ইসলাম কানুনগো ও হায়দার সাহেব নামে দুজনকে পাঠানো হয়েছিল চাকমাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য, যাতে তাঁরা ভারতে না যান। তাঁর শুকনো মন্তব্য: “কিন্তু আমরা চলে এলাম ভারতে।”
আর একটি জিনিস ফেলে আসা যায়নি। গ্রামের মন্দিরের বুদ্ধমূর্তি — সুদূর বার্মা থেকে এক মগ ভান্তে এনে দিয়েছিলেন। ঠিক হলো, মূর্তিটি সঙ্গে যাবে। ওজন এক মণের চেয়ে এক কেজি কম, সঙ্গে দুই কেজির একটি ঘণ্টা। যে মানুষটি পিঠে বয়ে এনেছিলেন, তাঁকে দিনে ১০ টাকা দেওয়া হতো; তিনি কখনো অভিযোগ করেননি, বরং বলতেন এত ওজনের জিনিস বইছেন বলে কখনো মনে হয়নি।
সীমান্ত পেরিয়ে দেমাগ্রীতে পৌঁছে তাঁদের ২২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়েছিল, প্রতিটি গ্রুপে এক হাজারের বেশি মানুষ। বুদ্ধধন চাকমার গ্রুপ নম্বর ছিল ২২, সদস্য ৬৬২ জন, আর তিনিই ছিলেন সেই গ্রুপের নেতা।
শিবিরে নাম লেখানোর সময় দুটি জিনিস জমা দিতে হয়েছিল। এক, মূল্যবান ধাতু ও টাকা — যার জবাবে তাঁর মা পিননের পাড়ে পকেট সেলাই করেছিলেন। দুই, সব ধরনের বন্দুক ও কার্তুজ; বলা হয়েছিল কোনো বন্দুক ফেলে না আসতে, সঙ্গে এনে জমা দিতে।
টাকার বিনিময়হারটিও তিনি মনে রেখেছেন: তখন পাকিস্তানের ১০০ টাকা দিলে ভারতের ১৩০ টাকা পাওয়া যেত।
ভারত সরকার থাকার জন্য ক্যাম্প বানিয়ে রেখেছিল — শিলছড়া, মনাছড়া, আনিপুর সহ অনেক জায়গায়, পথে পথে। দেমাগ্রীতে মানুষ বেড়ে যাওয়ায় সরকার ঠিক করল, এবার রওনা দেওয়া দরকার। গন্তব্য নেফা — নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ার এজেন্সি, আজকের অরুণাচল প্রদেশ।
দেমাগ্রী থেকে গন্তব্য পর্যন্ত হাঁটতে হয়েছিল প্রায় ৩১ দিন; তাঁদের বলা হয়েছিল দূরত্ব ৭০০ মাইল। পথে ৬ মাইল পর পর বিশ্রামের ক্যাম্প বানানো ছিল, আর রাস্তায় ভারত সরকারের ভলান্টিয়াররা ছিলেন। অসুস্থ, বৃদ্ধ ও গর্ভবতীদের জন্য গাড়ি ছিল।
কিন্তু যা ছিল না, তা হলো সময়। বুদ্ধধন চাকমার বয়ানের এই অংশটি সংক্ষেপ করা যায় না, তাই হুবহু: যাঁরা পথে মারা যাচ্ছিলেন বা যাবেন বলে বোঝা যাচ্ছিল, তাঁদের ছেড়ে আসতে হয়েছে — সঙ্গে এক বা দুজন ভলান্টিয়ার থাকতেন। মারা যাওয়ার পর পথের ধারে কোনোরকমে আগুনে দেওয়া বা মাটিচাপা দেওয়া হতো। আর যে মায়েরা সন্তান জন্ম দিচ্ছিলেন, তাঁদেরও ক্যাম্পে রেখে আসতে হয়েছে; সন্তান জন্মের পর তাঁরা নিজেরাই পথ চিনে এগিয়েছেন।
পথের দৃশ্যটিও তিনি লিখে রেখেছেন। মানুষের ঢলে মানুষের বিষ্ঠার গন্ধ তিন মাইল দূর থেকে পাওয়া যেত। রাস্তার দুধারে দেখা মিলত শিশুদের মৃতদেহ, অর্ধেক মাটির নিচে — তাড়াহুড়োয় পুরো চাপা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
মোট কতজন মারা গেলেন? কেউ জানে না, আর কোনোদিন জানা যাবেও না। তাঁর নিজের কথা: “কত মানুষ যে রাস্তায় অসুখে বিপদে পড়ে মারা গেছে সেসব হিসাব কেউ কোনোদিন আর পাবে না। আমরাই তখন কেউ এই হিসাব রাখতে পারিনি।” তাঁর নিজের গ্রুপে মারা গিয়েছিলেন একজন; অন্য গ্রুপে বেশি।
সবাইকে এক জায়গায় পাঠানো হয়নি। নেফা ছাড়া কিছু পরিবারকে নেওয়া হয়েছিল বিহারে, কিছুকে আন্দামানে। এই বিন্যাসটি বাংলায় প্রায় কোথাও লেখা হয়নি, অথচ এটি বোঝা না গেলে “ভারতের চাকমা” কথাটির অর্থ অসম্পূর্ণ থাকে।
বিহারের দলটি সম্পর্কে বুদ্ধধন চাকমা যা জানেন: সংখ্যায় ২০ থেকে ৩০ পরিবার। গিয়ে তাঁরা দেখলেন ওই এলাকায় বৃষ্টি নেই, শুধু রোদ; চালের অভাব, গম খেতে হতো; পানি তুলতে হতো মেশিন দিয়ে। তিন বছর পর তাঁরা বিহার থেকে ফিরে আসেন। যাঁরা বিহারে গিয়েছিলেন, তাঁরা ছিলেন ত্রিপুরার কুমারঘাট এলাকার শরণার্থী ক্যাম্পের মানুষ — সেই মাঠটি এখনো খালি পড়ে আছে।
আর নেফার খবর ফিরে এসেছিল যাঁরা দেখতে গিয়েছিলেন তাঁদের মুখে। বুদ্ধধনের পিসতুতো ভাই ফণিভূষণ প্রথম গ্রুপে নেফা গিয়ে ফিরে এসে বললেন: জঙ্গল আর জঙ্গল; বৃষ্টি হলেই সেই পানিতে হাতি ভেসে আসে; এই ঝড়, এই পানি, আর কনকনে ঠান্ডা। তাঁর সিদ্ধান্ত ছিল সোজা — “নেফায় গিয়ে থাকবো কী করে। খুবই ঠান্ডা। এতো ঠান্ডায় আমরা মরে যাবো।”
আরেকটি গ্রুপ গিয়েও একই কথা জানাল: নেফায় গেলে যাওয়া মাত্র সকলে মারা পড়বে। তখন ঠিক হলো, তাঁরা যাবেন না।
যাঁরা নেফায় যেতে রাজি হলেন না, তাঁদের রেশন বন্ধ করে দেওয়া হলো। বুদ্ধধন চাকমার বয়ানে এই বাক্যটিই সবচেয়ে ঠান্ডা — ভারত সরকারের প্রতিনিধি বলেছিলেন, এইসব গ্রুপের নেতা ও সদস্যদের রেশন বন্ধ করে দিতে হবে, আর রেশন বন্ধ করলেই তাঁরা নেফা চলে যাবেন।
আর তাই হলো। শিবিরে থাকা মানুষের হাতে টাকা ছিল না, সবাই রেশনের উপর নির্ভরশীল। তাঁর ভাষায় “এখন আরেক মরণ দশা। কী খাবো কীভাবে বাঁচবো।” শিবিরের সামনে সরকার নেফায় নিয়ে যাওয়ার গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, আর রেশন বন্ধ হওয়ার ভয়ে অনেকে ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও নেফা যেতে বাধ্য হলেন।
এটি মাথায় রাখা দরকার, কারণ পরবর্তী ষাট বছরের আইনি তর্কে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে — তাঁরা কি নিজের ইচ্ছায় অরুণাচলে গিয়েছিলেন? বুদ্ধধন চাকমার বিবরণ অনুযায়ী অনেকের ক্ষেত্রে উত্তরটি না।
শিবিরের দৈনন্দিন হিসাবটিও তিনি রেখেছেন। রেশন ছিল মাথাপিছু এক ‘ঢা’ চাল, সঙ্গে কেরোসিন তেল, সরিষার তেল ও শুটকি। নগদ দেওয়া হতো মাসে ১৭ টাকা, দু’বারে — যাতে একবারে সব খরচ করে ফেলা না যায়। লাকড়ির দাম ছিল ১০ পয়সা।
আনিপুর ক্যাম্পে পৌঁছানোর পর ভারত সরকার তাঁদের প্রত্যেককে একটি কাগজ দিয়েছিল। সেই কাগজের অর্থ তিনি বুঝেছিলেন এভাবে — “এখন আমাদেরকে আর কেউ ভারত থেকে বের করে দিতে পারবে না।” [কাগজটি কী ছিল — শরণার্থী নিবন্ধন, নাকি অন্য কিছু — তা বয়ানে স্পষ্ট নয়; যাচাই প্রয়োজন]
আর স্থানীয়দের সঙ্গে পরিচয়টি হয়েছিল একটি গুজব দিয়ে। তাঁদের পৌঁছানোর আগেই সরকার স্থানীয় মানুষদের বলে রেখেছিল সাবধানে থাকতে, কারণ “চাকমারা কিন্তু মানুষ খায়” — এবং তাদের যদি খেয়ে ফেলা হয়, সরকারের দোষ নেই। স্থানীয়রা সত্যিই ভয় পেতেন।

আনিপুর ক্যাম্পে প্রথমে দুই মাস থাকার কথা ছিল; থাকতে হয়েছিল তিন বছর। এই তিন বছরেই শিবিরের জীবন একটা স্থায়ী চেহারা নিয়ে ফেলে — বিয়ে হতো, কিন্তু সমাজের প্রচলিত নিয়মের ‘দাবা’ ধরাধরি বন্ধ হয়ে গেল, কারণ কারো হাতে টাকা নেই। সরকার শিবিরেই একটি ছোট বৌদ্ধমন্দির বানিয়ে দিয়েছিল।
তিন বছরের শেষে বুদ্ধধনদের পরিবার সিদ্ধান্ত নিল, তাঁরা নেফায় যাবেন না — যাবেন ত্রিপুরায়। কারণ তাঁদের একটি সুবিধা ছিল: তাঁর সৎভাই অনিল বরণ চাকমা — চাকমা সমাজের একজন কবি — আগে থেকেই ত্রিপুরায় থাকতেন। দেশভাগের সময়ই একটি দল পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে এসেছিল, যাতে ছিলেন জ্ঞানেন্দু চাকমা, রেবতী রঞ্জন চাকমা ও বিপিন তালুকদার মাস্টার; তাঁরা ভালো জায়গায় বসতি করতে পেরেছিলেন।
একদিন গভীর রাতে তাঁরা চুপিসারে আনিপুর ক্যাম্প ছাড়লেন। প্রথমে কয়েকটি পরিবার, পরে আরও ৩৭টির বেশি পরিবার ত্রিপুরায় চলে আসে। বুদ্ধধনদের পরিবার স্থায়ী হলো আন্ধার ছড়ায়; বাকিরা বাঁচার তাগিদে পং ছড়ার দিকে বসতি গড়লেন, যেখানে লাকড়ি ও শন বিক্রি করে টাকা পাওয়া যেত।
কিন্তু ক্যাম্প ছাড়ার দাম ছিল। তাঁর কথায়, ত্রিপুরায় ভারত সরকারের রেশন ছিল না, ছিল না কেউ যে একবেলা খেতে সাহায্য করবে — শুধু প্রকৃতির উপর নির্ভর করে লড়তে হয়েছিল। তাঁদের পরিবারের জন্য সহজ ছিল, কারণ বড় ভাই ছিলেন; বাকিদের জন্য ছিল কঠিন। দুই বছরের মধ্যে ঘন জঙ্গল সাফ হয়ে গিয়েছিল।
আর ত্রিপুরার পুরনো চাকমারা? তিনি লিখছেন, তাঁরা অনেক সাহায্য করেছিলেন। তবু কতদিন আধপেটা খেয়ে থাকতে হয়েছে।
ভারত সরকারের একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার আওতায় ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে ২,৭৪৮টি পরিবারের ১৪,৮৮৮ জন চাকমা ও হাজংকে নেফায় পুনর্বাসন করা হয়। সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তী ষাট বছরের পুরো তর্কটি এই পুনর্বাসনের চরিত্র নিয়ে — এটি রাষ্ট্রের নিজের সিদ্ধান্ত ছিল, না কি মানুষ নিজে এসে বসেছিল।
হাজংরাও এই যাত্রার অংশ। তাঁরা চাকমা নন — পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ অঞ্চলের একটি আলাদা জনগোষ্ঠী, যাঁরা একই সময়ে ভারতে আসেন এবং একই পুনর্বাসন-কর্মসূচিতে পড়েন। ভারতের আইনি নথিতে দুই জনগোষ্ঠীর নাম প্রায় সবসময় একসঙ্গে আসে — “চাকমা ও হাজং”।
এরপরের সংখ্যাগুলো দিয়ে বৃদ্ধির হারটি বোঝা যায়:
২০১১ সালের শুমারিতে অরুণাচলের চাকমারা কোথায় থাকেন, তার জেলা-ভিত্তিক ভাগটিও পাওয়া যায়। সবচেয়ে বেশি চাংলাং জেলায় — ৪০,২২৫ জন, যার মধ্যে দিয়ুনে ২৩,০৭২, মিয়াওতে ১০,৪৬৪, বরদুমসায় ৫,২২৭ ও খারসাংয়ে ১,৪৪২। এর বাইরে নামসাই জেলায় ৪,৭৮৯ আর পাপুমপারে জেলায় ২,০২৭।
অর্থাৎ অরুণাচলের চাকমারা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নেই — প্রায় ৮৫ শতাংশ একটি জেলাতেই, চাংলাং-এ। এটিও তর্কের একটি কারণ, কারণ ঘন বসতি নির্বাচনী হিসাবেও বদল আনে।
নেফায় পুনর্বাসনের সিদ্ধান্তটি কেবল মানবিক ছিল না, এর পিছনে একটি সীমান্ত-নিরাপত্তার হিসাবও ছিল। ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধের পর উত্তর-পূর্ব সীমান্তের জনবিরল এলাকাগুলো নিয়ে ভারতের নীতিনির্ধারকদের উদ্বেগ বাড়ে — এই প্রেক্ষাপটেই চাকমা ও হাজংদের ওই অঞ্চলে বসানো হয়।
এই প্রেক্ষাপটটি এড়িয়ে গেলে আজকের তর্কটি বোঝা যায় না। কারণ যদি রাষ্ট্র নিজের কৌশলগত হিসাবে একটি জনগোষ্ঠীকে সীমান্তে বসায়, তাহলে ষাট বছর পর সেই জনগোষ্ঠীকে “বহিরাগত” বলার মধ্যে একটি অসঙ্গতি থেকে যায়। চাকমা পক্ষের লেখকরা ঠিক এই যুক্তিটিই দেন।
অন্যদিকে অরুণাচলের ছাত্রসংগঠন ও রাজ্য সরকারের যুক্তি ভিন্ন — তাঁদের বক্তব্য, এতে একটি ছোট রাজ্যের জনমিতি বদলে যাচ্ছে এবং স্থানীয় উপজাতিদের অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দুই পক্ষের অবস্থান নিচে আলাদা করে দেওয়া আছে।
মিজোরামের চাকমাদের নিজেদের একটি সাংবিধানিক স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ আছে — Chakma Autonomous District Council (CADC), গঠিত ২৯ এপ্রিল ১৯৭২, ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায়। ভারতের তিন রাজ্যের মধ্যে এটিই চাকমাদের সবচেয়ে শক্ত আইনি অবস্থান।
পরিষদটি তৈরি হয়েছিল আগের পাওয়ি-লাখের রিজিওনাল কাউন্সিলকে তিন ভাগ করে — মারা অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (MADC), লাই অটোনমাস ডিস্ট্রিক্ট কাউন্সিল (LADC) এবং CADC। এই তথ্যগুলো CADC-র নিজস্ব সরকারি ওয়েবসাইটের।
এর ভূগোলটিও বলার মতো। পরিষদের উত্তরে লুংলেই জেলা, দক্ষিণে মিয়ানমার, পূর্বে LADC, আর পশ্চিমে বাংলাদেশ। অর্থাৎ যে সীমান্ত পেরিয়ে তাঁদের পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন, সেটি এখন তাঁদের পরিষদের পশ্চিম সীমানা।
ষষ্ঠ তফসিল জিনিসটি কী, সেটি পাহাড়ের পাঠকের জন্য আলাদা করে বলা দরকার। এটি ভারতীয় সংবিধানের একটি অংশ, যা উত্তর-পূর্বের নির্দিষ্ট কিছু উপজাতীয় এলাকাকে নিজস্ব পরিষদ গড়ার অধিকার দেয় — সেই পরিষদ জমি, বন, প্রথাগত আইন ও স্থানীয় প্রশাসনের বিষয়ে আইন বানাতে পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা পরিষদ ব্যবস্থার সঙ্গে ধারণাগত মিল আছে, তবে ক্ষমতার উৎস আলাদা: ষষ্ঠ তফসিল সংবিধানের ভেতরে, আর পার্বত্য জেলা পরিষদ একটি সাধারণ আইনে তৈরি।
শুরুতে পরিষদের হাতে ছিল ছয়টি বিভাগ; ১৯৯৪ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১৯টি বিষয়ে পৌঁছায়। প্রথম ছয়টি ছিল সাধারণ প্রশাসন, শিক্ষা, বন, ভূমি রাজস্ব ও বন্দোবস্ত, আইন প্রণয়ন এবং বিচার। পরে DRDA ও ICDS-এর মতো কর্মসূচিও যুক্ত হয়।
নির্বাচনের দিক থেকেও পরিষদটি পুরনো। CADC-র নিজের হিসাব অনুযায়ী সেখানে আটটি সাধারণ নির্বাচন হয়েছে, আর আসনসংখ্যা শুরুর ৮ থেকে বেড়ে ২০-এ পৌঁছেছে। বর্তমান পরিষদে ২০ জন নির্বাচিত ও ৪ জন মনোনীত — মোট ২৪ জন সদস্য।
কিন্তু একটি সংখ্যা পুরো ছবিটি বদলে দেয়। পরিষদের আয়তন ৬৮৬.২৫ বর্গকিলোমিটার, ভেতরে ৮৩টি গ্রাম, আর ২০১১ শুমারিতে মোট জনসংখ্যা ৬২,০৯৪ — যার মধ্যে চাকমা ৪৫,৩০৭। অর্থাৎ মিজোরামের চাকমাদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিষদের বাইরে থাকেন, এবং তাঁদের উপর পরিষদের স্বায়ত্তশাসন প্রযোজ্য নয়।
এটি একটি কাঠামোগত সীমা। স্বায়ত্তশাসন ভূখণ্ড-ভিত্তিক, জনগোষ্ঠী-ভিত্তিক নয় — তাই সীমানার বাইরে চলে গেলে সুরক্ষাটুকুও সঙ্গে যায় না।
২০২৫ সালের ৮ জুলাই মিজোরামের রাজ্যপাল CADC-তে ছয় মাসের জন্য গভর্নরের শাসন জারি করেন। কারণ হিসেবে বলা হয়, লাগাতার রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিষদের গুরুতর ক্ষতি করছে এবং সংবিধানের বিধান অনুযায়ী প্রশাসন চালানো যাচ্ছে না। আদেশটি ষষ্ঠ তফসিলের আওতায়; রাজ্যপাল ছিলেন বিজয় কুমার সিং।
ঘটনাক্রমটি এরকম। ১৬ জুন বিরোধী ZPM সদস্যরা অনাস্থা প্রস্তাব এনে মুখ্য নির্বাহী সদস্য মলিন কুমার চাকমা (বিজেপি)-কে সরিয়ে দেন। এর আগে তৎকালীন চেয়ারম্যান লক্ষণ চাকমা সহ ১২ জন বিজেপি সদস্য দল ছেড়ে ZPM-এ যোগ দিয়েছিলেন; পরে লক্ষণ চাকমার নেতৃত্বে ১৬ জন ZPM সদস্য পরবর্তী নির্বাহী কমিটি গঠনের দাবি জানান।
গভর্নরের শাসনের সময় পরিষদের সব দায়িত্ব পালন করেন লংতলাই জেলার ডেপুটি কমিশনার, তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে। অর্থাৎ নির্বাচিত পরিষদের জায়গায় নিয়োগপ্রাপ্ত আমলা।
এই ঘটনাটি এই লেখায় রাখছি একটি কারণে: স্বায়ত্তশাসন থাকা আর স্বায়ত্তশাসন কাজ করা — দুটি আলাদা জিনিস। কাগজে পরিষদ আছে, কিন্তু ২০২৫ সালের অর্ধেকটা সময় সেটি নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ছিল না।
মিজোরামে তফসিলি উপজাতিদের সংরক্ষণ উপ-শ্রেণিতে ভাগ করার পর চাকমাদের জন্য উচ্চশিক্ষায় আসন কমে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। IWGIA-র The Indigenous World 2025-এর ভারত অধ্যায়ে এটি নির্দিষ্ট করে লেখা আছে।
প্রসঙ্গটি ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়, যেখানে তফসিলি জাতি ও উপজাতির ভেতরে উপ-শ্রেণি করার অনুমতি দেওয়া হয় — উদ্দেশ্য ছিল সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দলগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া। IWGIA লিখছে, রাজ্যগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে, বিশেষত মিজোরামে, যেখানে চাকমাদের মতো ছোট জনগোষ্ঠী — যাঁরা আগে থেকেই বৈষম্যের মুখে — সংখ্যাগরিষ্ঠ উপজাতির তুলনায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উল্লেখযোগ্যভাবে কম আসন পাচ্ছেন।
IWGIA-র মূল্যায়নটি শুকনো কিন্তু ধারালো: যে ব্যবস্থাটি বৈষম্য কমানোর জন্য, সেটি এখানে প্রান্তিকতা বাড়িয়ে দিতে পারে।

২০১১ সালের শুমারিতে ত্রিপুরায় চাকমাদের সংখ্যা ৮৪,২৬৯ — ভারতের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, আর তাঁরা সেখানে তফসিলি উপজাতি হিসেবে স্বীকৃত। অরুণাচলের মতো নাগরিকত্বের প্রশ্ন ত্রিপুরায় একইভাবে ওঠে না।
কারণটি ইতিহাসে। বুদ্ধধন চাকমার বয়ান থেকেই দেখা যায়, ত্রিপুরায় চাকমা বসতি বড়পরং-এর আগে থেকেই ছিল — দেশভাগের সময়ই একটি দল পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে এসেছিল। পরে বড়পরং-এর মানুষজনের একটি অংশ শিবির ছেড়ে ত্রিপুরায় গিয়ে ওই পুরনো বসতির সঙ্গে যুক্ত হন। অর্থাৎ ত্রিপুরার চাকমা জনগোষ্ঠী একটিমাত্র ঢেউয়ে তৈরি হয়নি।
IWGIA-র ভারত অধ্যায়ে ত্রিপুরা প্রসঙ্গে একটি জিনিস আছে, যা সরাসরি চাকমাদের নিয়ে নয় কিন্তু প্রাসঙ্গিক: ভারত সরকার সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে ক্রমশ “Indigenous Populations” শব্দটি ব্যবহার করছে — যেমন ত্রিপুরা রাজ্যের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বিষয় খতিয়ে দেখতে একটি উচ্চ-পর্যায়ের কমিটি গঠনের বিজ্ঞপ্তিতে।
ত্রিপুরার চাকমাদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে এর বেশি যাচাইযোগ্য তথ্য জানা যায়নি — জমি, ভাষা-শিক্ষা বা রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের হালনাগাদ কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। এটি এই লেখার একটি স্বীকৃত ফাঁক।
১৯৯৬ সালের ৯ জানুয়ারি ভারতের সুপ্রিম কোর্ট National Human Rights Commission vs State of Arunachal Pradesh মামলায় রায় দেয় যে রাজ্যের সাংবিধানিক দায়িত্ব আছে চাকমাদের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা রক্ষা করা। রায়ের ভিত্তি ছিল সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১; বেঞ্চের নেতৃত্বে ছিলেন প্রধান বিচারপতি A. M. Ahmadi।
মামলাটি এসেছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের মাধ্যমে, অর্থাৎ রাষ্ট্রেরই একটি সংস্থার মাধ্যমে — এটি তাৎপর্যপূর্ণ।
আদালত তিনটি জিনিস বলেছিল:
প্রসঙ্গটি ছিল জরুরি। এর ঠিক আগে, ১৯৯৪–৯৫ সালে অরুণাচলের ছাত্রসংগঠন AAPSU চাকমাদের উদ্দেশে “quit notice” জারি করেছিল এবং একটি অর্থনৈতিক অবরোধ কার্যকর করেছিল।
২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্ট Committee for Citizenship Rights of the Chakmas of Arunachal Pradesh (CCRCAP) vs State of Arunachal Pradesh মামলায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারকে তিন মাসের মধ্যে নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়টি চূড়ান্ত করতে নির্দেশ দেয়। বেঞ্চে ছিলেন বিচারপতি Anil R. Dave ও Adarsh Kumar Goel।
অর্থাৎ ১৯৯৬-র রায়ের উনিশ বছর পরেও কাজটি হয়নি — তাই আদালতকে দ্বিতীয়বার, এবার একটি সময়সীমা বেঁধে, একই কথা বলতে হয়েছিল।
মামলাটি করেছিল CCRCAP, ১৯৯১ সালে গঠিত চাকমাদের নাগরিকত্ব-অধিকার বিষয়ক কমিটি।
আইনের চোখে বেশিরভাগ মানুষের যোগ্যতা আছে — সমস্যা প্রক্রিয়ায়। ভারতের নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-র ৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী ১ জুলাই ১৯৮৭-র আগে ভারতে জন্মানো ব্যক্তি জন্মসূত্রে নাগরিক। অরুণাচলের ৬৫,০০০–৭০,০০০ চাকমার মধ্যে প্রায় ৬০,০০০ জন এই শর্ত পূরণ করেন বলে মনে করা হয়।
কিন্তু এই অধিকারটি বেশিরভাগের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়া করা হয়নি। অর্থাৎ কাগজে অধিকার আছে, কাগজে অধিকারের প্রমাণ নেই।
এর পরের ধাপগুলো সময় ধরে সাজালে ছবিটি স্পষ্ট হয়:
বসবাসের সনদ (Residential Proof Certificate) জিনিসটি ছোট শোনালেও এটিই চাবি। ওই কাগজ ছাড়া স্কুলে ভর্তি, চাকরির আবেদন, ব্যাংক — কিছুই সহজে হয় না। সনদ দেওয়া বন্ধ করা মানে নাগরিকত্বের প্রশ্নে সরাসরি হাত না দিয়েও দৈনন্দিন জীবনকে আটকে দেওয়া। পাহাড়ের পাঠকের কাছে স্থায়ী বাসিন্দার সনদপত্র নিয়ে তর্কটি অপরিচিত নয়।
এই তর্কে দুটি সংগঠিত পক্ষ আছে, আর তাদের অবস্থান আলাদা করে বলা দরকার — কারণ একই ঘটনার দুটি পাঠ আছে। নিচে কে কী বলছে, তা–ই লিখছি; কোনো পক্ষ নিচ্ছি না।
| সংগঠন | কারা | অবস্থান |
|---|---|---|
| CCRCAP Committee for Citizenship Rights of the Chakmas of Arunachal Pradesh, ১৯৯১ |
চাকমা পক্ষ | আদালতের ১৯৯৬ ও ২০১৫-র নির্দেশ কার্যকর করে নাগরিকত্বের আবেদন প্রক্রিয়া করা হোক। ২০১৫-র মামলাটি এই সংগঠনেরই। |
| AAPSU All Arunachal Pradesh Students’ Union |
অরুণাচলের ছাত্রসংগঠন | নাগরিকত্ব, ভূমি অধিকার ও তফসিলি উপজাতি মর্যাদা — তিনটিরই বিরোধিতা। ১৯৯৪–৯৫-এ “quit notice” ও অর্থনৈতিক অবরোধ; ২০১৭-য় হরতাল; ২০২২-এ সনদ স্থগিতের দাবি। |
| CDFI Chakma Development Foundation of India |
চাকমা পক্ষ | অধিকার-বিষয়ক প্রচার ও নথিপত্র তৈরি |
সরকারি পক্ষের অবস্থানও সময়ের সঙ্গে বদলেছে। কেন্দ্র ২০১৭ সালে একটি “সীমিত নাগরিকত্ব” প্রস্তাব এনেছিল — অর্থাৎ নাগরিকত্ব দেওয়া হবে, কিন্তু ভূমি অধিকার বা তফসিলি উপজাতি মর্যাদা নয়। রাজ্যের পক্ষ থেকে এর বিরোধিতা হয়েছিল, আর ২০২১ সালে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্থানান্তরের কথা বলেছিলেন।
পরিভাষাটিও তর্কের অংশ। চাকমা পক্ষ ও আদালতের নথি ব্যবহার করে “পুনর্বাসিত”, “শরণার্থী” বা “নাগরিক”; বিরোধী পক্ষ ব্যবহার করে “অবৈধ অভিবাসী”। কোন শব্দটি ঠিক, সেই প্রশ্ন এখানে অমীমাংসিত রইল — শুধু লেখা থাকল কে কোন শব্দ ব্যবহার করছে, কারণ শব্দের পছন্দটাই এখানে অবস্থানের ঘোষণা।
একই জনগোষ্ঠী, একই ভাষা, একই ধর্ম — কিন্তু সীমান্তের এপার-ওপারে এবং ভারতের ভেতরেও রাজ্যভেদে তাঁদের আইনি অবস্থান তিন রকম। এই তুলনাটিই এই লেখার সবচেয়ে কাজের অংশ।
| মিজোরাম | ত্রিপুরা | অরুণাচল | |
|---|---|---|---|
| ২০১১ শুমারিতে সংখ্যা | ৯২,৮৫০ | ৮৪,২৬৯ | ৪৭,০৭৩ |
| নিজস্ব স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ | আছে — CADC, ১৯৭২ | নেই (রাজ্যে ষষ্ঠ তফসিলের পরিষদ আছে, চাকমাদের নিজস্ব নয়) | নেই |
| তফসিলি উপজাতি মর্যাদা | আছে | আছে | নেই; ছাত্রসংগঠন বিরোধিতা করছে |
| নাগরিকত্ব | প্রশ্ন ওঠে না | প্রশ্ন ওঠে না | দুটি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ সত্ত্বেও বড় অংশের প্রক্রিয়া হয়নি |
আর বাংলাদেশের দিকটি? পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমারা সংখ্যায় সবচেয়ে বড় (২০২২ শুমারিতে ৪,৮৩,২৯৯), নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন নেই, আর সার্কেল ও মৌজা ব্যবস্থাটি টিকে আছে। কিন্তু ভূমির প্রশ্নটি অমীমাংসিত — ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এখনো কাজ শেষ করেনি। অর্থাৎ দুই দেশের দুই সমস্যা: ভারতে কাগজের প্রশ্ন, বাংলাদেশে জমির প্রশ্ন।
আর একটি জিনিস দুই পাশেই এক। ১৯৬৪ সালে যাঁরা চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগ আর ফেরেননি। বুদ্ধধন চাকমা নিজেই ফেরেননি — তাঁর কারণটি রাজনৈতিক নয়, ব্যক্তিগত: “ওখানে গেলে আমার আত্মীয়-স্বজন হয়তো আমাকে ঠাট্টা করবে, আমাদের চলে আসা নিয়ে। হয়তো বলবে এইবার কেন মরতে এলে। সেটা আমার সহ্য হবে না।”
২০১১ সালের ভারতীয় আদমশুমারি অনুযায়ী ভারতে চাকমাদের সংখ্যা ২,২৮,২৮১। রাজ্য ধরে ধরে: মিজোরাম ৯২,৮৫০, ত্রিপুরা ৮৪,২৬৯, অরুণাচল প্রদেশ ৪৭,০৭৩, আসাম ৩,১৬৬, পশ্চিমবঙ্গ ১৭৫, মেঘালয় ১৫৯ ও নাগাল্যান্ড ১৫৬ — অর্থাৎ প্রায় সবাই উত্তর-পূর্বের তিনটি রাজ্যে। তুলনায় বাংলাদেশের ২০২২ সালের আদমশুমারিতে চাকমা ৪,৮৩,২৯৯, আর মিয়ানমারে ‘দাইংনেট’ নামে পরিচিত অংশটি প্রায় ৪৩,১০০। সব মিলিয়ে চাকমা জনগোষ্ঠীর এক-তৃতীয়াংশের বেশি বাংলাদেশের বাইরে বসবাস করেন।
মূল কারণ কাপ্তাই বাঁধ। কর্ণফুলী নদীর এই বাঁধে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৩৬৯টি মৌজার ১২৫টি পানির তলে চলে যায়, ডোবে ৫৪ হাজার একর কৃষিজমি — জেলার কৃষিজমির প্রায় ৪০ শতাংশ। ক্ষতিগ্রস্ত হন প্রায় এক লাখ মানুষ, যখন গোটা অঞ্চলের জনসংখ্যা ছিল প্রায় তিন লাখ। নতুন পুনর্বাসন এলাকায় রোগ, মৃত্যু ও জমির সংকটের মুখে অনেকে ভারতে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
‘বড়পরং’ বা ‘বর-পরং’ মানে মহাযাত্রা। কাপ্তাই বাঁধের পর ষাটের দশকে চাকমাদের দলে দলে ভারতে চলে যাওয়ার ঘটনাটিকে চাকমা সমাজ এই নামেই চেনে। যাত্রাটি পরিকল্পিত ছিল — এক গ্রামের মানুষ কিছু দূর গিয়ে ‘গোলাক’ অর্থাৎ বাজি ফুটিয়ে সংকেত দিত, সেই শব্দ শুনে পরের গ্রাম রওনা দিত।
বুদ্ধধন চাকমার প্রত্যক্ষ বিবরণ অনুযায়ী সীমান্ত পেরিয়ে দেমাগ্রী শিবিরে তাঁদের ২২টি গ্রুপে ভাগ করা হয়, প্রতিটিতে এক হাজারের বেশি মানুষ। সেখান থেকে হাঁটতে হয়েছিল প্রায় ৩১ দিন; দূরত্ব বলা হয়েছিল ৭০০ মাইল। পথে ৬ মাইল পর পর বিশ্রামের ক্যাম্প ছিল। যাঁরা হাঁটতে অক্ষম ছিলেন, তাঁদের পথে রেখে আসতে হয়েছে।
কোনো সংখ্যা নেই, এবং কোনোদিন পাওয়া যাবে না। বুদ্ধধন চাকমার ভাষায় — “কত মানুষ যে রাস্তায় অসুখে বিপদে পড়ে মারা গেছে সেসব হিসাব কেউ কোনোদিন আর পাবে না। আমরাই তখন কেউ এই হিসাব রাখতে পারিনি।” তাঁর নিজের ৬৬২ জনের গ্রুপে মারা গিয়েছিলেন একজন; অন্য গ্রুপগুলোতে বেশি।
না। নেফা অর্থাৎ আজকের অরুণাচল ছাড়াও কিছু পরিবারকে বিহারে ও আন্দামানে নেওয়া হয়েছিল। বিহারে যাওয়া ২০–৩০টি পরিবার তিন বছর পর ফিরে আসে — সেখানে বৃষ্টি নেই, চালের বদলে গম খেতে হতো, পানি তুলতে হতো মেশিনে। আর অনেকে শিবির ছেড়ে ত্রিপুরায় চলে গিয়ে স্থায়ী হন।
ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার আওতায় ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৯ সালের মধ্যে ২,৭৪৮টি পরিবারের ১৪,৮৮৮ জন চাকমা ও হাজংকে তৎকালীন নেফায় পুনর্বাসন করা হয়। ১৯৭৯ সালে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় ৩,৯০০ পরিবার বা ২১,৫০০ মানুষ, আর ২০১৫–১৬ সালের সমীক্ষায় চাকমা ও হাজং মিলিয়ে প্রায় ৬৫,৮৭৫।
আইনত বেশিরভাগের হওয়ার কথা, কিন্তু কাগজে নয়। ভারতের নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-র ৩ ধারা অনুযায়ী ১ জুলাই ১৯৮৭-র আগে ভারতে জন্মানো ব্যক্তি জন্মসূত্রে নাগরিক; অরুণাচলের ৬৫,০০০–৭০,০০০ চাকমার মধ্যে প্রায় ৬০,০০০ এই শর্ত পূরণ করেন বলে মনে করা হয়। কিন্তু বড় অংশের আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রক্রিয়া করা হয়নি।
দুইবার। ১৯৯৬ সালের ৯ জানুয়ারি NHRC vs State of Arunachal Pradesh মামলায় (প্রধান বিচারপতি A. M. Ahmadi) আদালত সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদের ভিত্তিতে চাকমাদের জীবন ও স্বাধীনতা রক্ষা, জোর করে তাড়ানো বন্ধ এবং নাগরিকত্বের আবেদন আইন অনুযায়ী প্রক্রিয়ার নির্দেশ দেয়। ২০১৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর CCRCAP vs State of Arunachal Pradesh মামলায় তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
মিজোরামের চাকমাদের স্বায়ত্তশাসিত পরিষদ, গঠিত ২৯ এপ্রিল ১৯৭২, ভারতীয় সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় — পাওয়ি-লাখের রিজিওনাল কাউন্সিল ভেঙে CADC, MADC ও LADC তৈরি হয়। আয়তন ৬৮৬.২৫ বর্গকিলোমিটার, ৮৩টি গ্রাম, ২০১১ শুমারিতে জনসংখ্যা ৬২,০৯৪। সদস্য ২০ জন নির্বাচিত ও ৪ জন মনোনীত। শুরুতে ৬টি বিভাগ, ১৯৯৪ সালের মধ্যে ১৯টি বিষয়।
না। ২০১১ শুমারিতে পরিষদের সীমানার ভেতরে চাকমা ৪৫,৩০৭ জন, অথচ মিজোরামে মোট চাকমা ৯২,৮৫০। অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পরিষদের বাইরে থাকেন এবং তাঁদের উপর পরিষদের স্বায়ত্তশাসন প্রযোজ্য নয়। কারণটি কাঠামোগত: ষষ্ঠ তফসিলের স্বায়ত্তশাসন ভূখণ্ড-ভিত্তিক, জনগোষ্ঠী-ভিত্তিক নয় — সীমানার বাইরে চলে গেলে সুরক্ষাটুকুও সঙ্গে যায় না। পরিষদের মোট জনসংখ্যা ৬২,০৯৪, আয়তন ৬৮৬.২৫ বর্গকিলোমিটার, গ্রাম ৮৩টি।
প্রশ্নের চরিত্রেই পার্থক্য। ভারতে, বিশেষত অরুণাচলে, মূল প্রশ্ন কাগজের — নাগরিকত্ব, বসবাসের সনদ, তফসিলি উপজাতি মর্যাদা। বাংলাদেশে নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন নেই, কিন্তু ভূমির প্রশ্নটি অমীমাংসিত; ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন এখনো কাজ শেষ করেনি। মিল একটাই — ১৯৬৪-তে যাঁরা চলে গিয়েছিলেন, তাঁদের বেশিরভাগ আর ফেরেননি।
এই লেখার ফাঁকগুলো নিচে খোলাখুলি লেখা আছে।
প্রাথমিক উৎস — জুমজার্নালের নিজস্ব আর্কাইভ
ভারতের দিক
৮, ৯ ও ১০ নম্বর উৎস তৃতীয়-স্তরের; সেগুলো থেকে নেওয়া প্রতিটি সংখ্যার পাশে উৎসের নাম লেখা আছে, আর আদমশুমারির মূল টেবিল না পাওয়ার কথা “যা এখনো জানা যায়নি” অংশে বলা আছে।
সর্বশেষ হালনাগাদ: ৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রসঙ্গ:অরুণাচল, আদিবাসী অধিকার, কাপ্তাই বাঁধ, চাকমা, চাকমা জাতি, ভারত, মিজোরাম, শরণার্থী
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।