Last updated Nov 3rd, 2026
1

চাকমা ভাষার প্রথম উপন্যাস হিসেবে সবচেয়ে বেশি যে নামটি ঘোরে, সেটি ‘ফেবো’ — 2004 সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার অমর একুশে বইমেলায় আসা, চাকমা হরফে লেখা একটি উপন্যাস। কিন্তু ‘প্রথম’ শব্দটির পেছনে যে উৎস আছে, সেটি সেই সময়ের একটি সংবাদপত্রের ছোট খবর, আর সেখানেই লেখা: দাবিটি লেখকের নিজের। কোনো গ্রন্থপঞ্জি, গবেষণা বা প্রাতিষ্ঠানিক তালিকায় চাকমা ভাষার প্রথম উপন্যাস কোনটি, সে প্রশ্নের মীমাংসা পাওয়া যায়নি।
এই লেখায় প্রতিটি দাবিকে তার উৎস পর্যন্ত অনুসরণ করা হয়েছে: কে বলেছেন, কবে, কোথায়, আর ঠিক কোন শব্দে। পাশাপাশি রাখা হয়েছে সেই লেখাগুলোও, যেগুলো বিভিন্ন সময়ে বলেছে যে চাকমা ভাষায় তখনো কোনো উপন্যাস লেখা হয়নি। দুই ধরনের কথা পাশাপাশি দেখলে বোঝা যায় প্রশ্নটি কেন সহজ নয়।
এই লেখায় যা আছে
প্রচলিত উত্তর ‘ফেবো’। চাকরির পরীক্ষার প্রশ্নব্যাংক ধরনের ওয়েবসাইটে প্রশ্নটি বহুনির্বাচনী আকারে আসে, আর সঠিক উত্তর হিসেবে ‘ফেবো’ দেওয়া থাকে। তবে এসব জায়গায় লেখকের নাম, প্রকাশক বা কোনো উৎস থাকে না; কেবল নামটি থাকে।
উদাহরণ হিসেবে MyExaminer নামের একটি প্রশ্নব্যাংক সাইটে প্রশ্নটি এভাবে আছে: চাকমা ভাষায় লিখিত প্রথম উপন্যাস কোনটি — বিকল্প ‘ফেবো’, ‘চাকমা’, ‘বহান্য’, ‘ইনা’; সঠিক উত্তর ‘ফেবো’। সেখানে উত্তরের পক্ষে কোনো তথ্যসূত্র দেওয়া নেই।
নৃবিজ্ঞানী প্রশান্ত ত্রিপুরা 2021 সালে bdnews24.com-এ প্রকাশিত একটি মতামত-লেখায় বিষয়টি সরাসরি তুলেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘চাকমা ভাষায় লিখিত প্রথম উপন্যাস’ হিসেবে ‘ফেবো’ নামটি বিসিএস গাইড ধরনের কিছু পরিসরে জায়গা পেয়েছে, কিন্তু উপন্যাসের বিষয়বস্তু বা অন্য কোনো প্রাসঙ্গিক তথ্য সেসব জায়গায় নেই। তিনি আরও লিখেছেন, উপন্যাসটি কতজন পড়েছেন বা পাঠকেরা কীভাবে গ্রহণ করেছেন, সে বিষয়ে বিশদ তথ্য অন্তত ইন্টারনেটে পাওয়া যায় না।
তাই প্রচলিত উত্তরটির উৎস খুঁজতে হলে পরীক্ষার গাইড পেরিয়ে 2004 সালের সংবাদপত্রে ফিরে যেতে হয়।
‘ফেবো’ নিয়ে সমসাময়িক দুটি খবর পাওয়া যায়। একটি The Daily Star-এর, 21 ফেব্রুয়ারি 2004; অন্যটি বার্তা সংস্থা AFP-র, যা অস্ট্রেলিয়ার ABC News 23 ফেব্রুয়ারি 2004-এ প্রকাশ করে। দুটিতেই উপন্যাসটিকে বইমেলার নতুন বই হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
একুশের আগের দিনের বইমেলা নিয়ে প্রথম পাতার খবরটির শিরোনাম ছিল বইমেলার উৎসবমুখর পরিবেশ নিয়ে। সেদিন মেলায় 117টি নতুন বই এসেছিল বলে খবরে লেখা আছে। তার ভেতরে এক বাক্যে ‘ফেবো’র উল্লেখ: মেলায় এসেছে Debo Priya Chakma-র লেখা Febo নামের একটি উপন্যাস, যেটি লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী চাকমা ভাষায় ছাপা প্রথম উপন্যাস (“the first novel in print in the Chakma language, according to the writer”)।
এই বাক্যের দুটি অংশ লক্ষ করার মতো। ‘in print’ — অর্থাৎ ছাপা অবস্থায় প্রথম, লেখা হিসেবে প্রথম নয়। আর ‘according to the writer’ — দাবিটি পত্রিকার নিজের যাচাই নয়, লেখকের কথা।
AFP-র খবরটি একটু বিস্তারিত। এতে বলা হয়েছে, বইটির নাম Febo, ইংরেজিতে ‘The Terrified Moments’; এটি একটি উপন্যাস, যার পটভূমি 1980-এর দশক, যখন দক্ষিণ-পূর্বের পার্বত্য জেলাগুলোর বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সশস্ত্র লড়াই চলছিল। খবরে লেখককে Debapriya Sangma বলে উল্লেখ করা হয়েছে, আর বলা হয়েছে এটি তাঁর প্রথম বই এবং তিনি চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষ।
প্রকাশক হিসেবে খবরে নাম এসেছে Fangdang Publishers-এর। প্রকাশনা সংস্থার একজন মুখপাত্র AFP-কে বলেছিলেন, বইটি মেলায় প্রদর্শিত হয়েছে, আর ছাপাতে গিয়ে বিশেষ কিছু বাধা পেরোতে হয়েছে — সেগুলো নিচে লিপির অংশে আলোচনা করা হয়েছে।
AFP-র শিরোনাম ও প্রথম বাক্যের দাবি Daily Star-এর চেয়ে বড়: এটি নাকি বাংলাদেশে চাকমা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম বই (“The first Bangladeshi book ever to be published in the language of the country’s dominant Chakma tribe”)। খবরে চাকমা জনসংখ্যা 2.52 মিলিয়ন বলে লেখা আছে; এই সংখ্যার কোনো উৎস খবরে নেই।
সতেরো বছর পরে প্রশান্ত ত্রিপুরার লেখায় ‘ফেবো’র আরও কিছু বিবরণ আসে, যেগুলো তিনি ‘প্রকাশিত খবর অনুসারে’ বলে উল্লেখ করেছেন: উপন্যাসটির পটভূমি 1986 সালে খাগড়াছড়ি জেলার লোগাংয়ে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ড, আর শিরোনামের শব্দটির দুটি অর্থ — ‘ভয়ার্ত মুহূর্ত’ ও ‘ভয়ঙ্কর প্রাণী’। তাঁর লেখায় বইটি 2004 সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে, চাকমা ভাষা ও হরফে প্রকাশিত বলে উল্লেখ আছে। কোন ‘প্রকাশিত খবর’ থেকে লোগাংয়ের তথ্যটি নেওয়া, লেখায় তা বলা নেই।
‘ফেবো’র লেখকের নাম উৎসভেদে আলাদা বানানে এসেছে, আর একটি উৎসের ভেতরেই দুটি আলাদা নাম আছে। Daily Star লিখেছে Debo Priya Chakma, AFP লিখেছে Debapriya Sangma। bdnews24-এর লেখায় প্রথমবার ‘দেবপ্রিয় চাকমা’, পরে একই লেখায় ‘দেবাশীষ চাকমার ফেবো’।
| উৎস | তারিখ | লেখকের নাম যেভাবে লেখা |
|---|---|---|
| The Daily Star | 21 ফেব্রুয়ারি 2004 | Debo Priya Chakma |
| AFP (ABC News-এ প্রকাশিত) | 23 ফেব্রুয়ারি 2004 | Debapriya Sangma |
| bdnews24.com (প্রশান্ত ত্রিপুরা) | 10 নভেম্বর 2021 | ‘দেবপ্রিয় চাকমা’; একই লেখার পরের অংশে ‘দেবাশীষ চাকমা’ |
| MyExaminer প্রশ্নব্যাংক | তারিখ নেই | লেখকের নাম নেই |
AFP-র খবরে নামের সঙ্গে ‘Sangma’ পদবি, আর একই খবরে লেখককে চাকমা জনগোষ্ঠীর মানুষ বলা হয়েছে। bdnews24-এর লেখায় ‘দেবাশীষ চাকমা’ নামটি এসেছে বইটির হরফ নিয়ে আলোচনার অংশে; একই লেখায় 2013 সালের উপন্যাস ‘মুই মত্যেই’-এর লেখক হিসেবে ‘কে ভি দেবাশীষ চাকমা’র নাম আছে। বইটির প্রচ্ছদ বা আখ্যাপত্রে লেখকের নাম কীভাবে ছাপা, তা কোনো অনলাইন উৎসে পাওয়া যায়নি।
‘ফেবো’কে ‘প্রথম’ বলা উৎসগুলো একই জিনিস দাবি করে না। Daily Star বলেছে ‘ছাপা অবস্থায় প্রথম উপন্যাস, লেখকের ভাষ্যে’; AFP বলেছে বাংলাদেশে চাকমা ভাষায় প্রকাশিত ‘প্রথম বই’; পরীক্ষার গাইডগুলো বলে ‘চাকমা ভাষায় লিখিত প্রথম উপন্যাস’।
‘লিখিত প্রথম’ আর ‘ছাপা প্রথম’ এক কথা নয় — একটি পাণ্ডুলিপি ছাপার বহু আগে লেখা হতে পারে, কখনো ছাপা না-ও হতে পারে। ‘বাংলাদেশে প্রকাশিত প্রথম’ আর ‘চাকমা ভাষার প্রথম’ও এক কথা নয় — প্রথম আলোয় প্রকাশিত পুলক বরণ চাকমার 2013 সালের লেখা অনুযায়ী চাকমাদের আবাসস্থল পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়াও ভারতের মিজোরাম, অরুণাচল, ত্রিপুরা, আসাম ও মিয়ানমারে।
AFP-র ‘প্রথম বই’ দাবিটির পাশে আরেকটি তথ্য রাখা যায়। সুগত চাকমার বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য (2002) বইয়ের ‘চাকমা সাহিত্য চর্চা’ অধ্যায়ের তথ্যসূত্রে চাকমা কবিতার কয়েকটি বইয়ের নাম ও প্রকাশকাল আছে, যেমন দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাকমার ‘পাদারঙ কোচপানা’ (1978, জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর) ও সুহৃদ চাকমার ‘বাগী’ (1989, জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল)। প্রথম আলোর লেখায় আছে, 1940-এর দশকের শুরুতে রাঙামাটি হাইস্কুলের ইংরেজ শিক্ষক মি. মিলার ‘চাকমা প্রাইমার’ নামে একটি শিশুপাঠ্য বই প্রকাশ করেছিলেন।
bdnews24-এর লেখাটিও ‘প্রথম’ শব্দটিকে উদ্ধৃতিচিহ্নে রেখেছে, এবং লিখেছে যে ‘প্রথম চাকমা উপন্যাস’ হিসেবে বইটিকে স্বাগত জানিয়ে বা সমালোচনা করে যাঁরা মত দিয়েছেন, তাঁদের কেউ বইটি সত্যিই পড়েছেন, এমন প্রমাণ মেলে না।
‘ফেবো’ চাকমা লিপিতে লেখা, আর AFP-র খবর অনুযায়ী বইটি ছাপা হয়েছিল হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির ছবি তুলে। প্রকাশনা সংস্থার মুখপাত্র AFP-কে বলেছিলেন, তখনো চাকমা বর্ণমালার কোনো কম্পিউটার সংস্করণ ছিল না, তাই বইটি প্রথমে হাতে লেখা হয়, তারপর ছবি তোলা হয়, তারপর ছাপা হয়।
এই তথ্যের পাশে প্রথম আলোর 2013 সালের লেখাটির একটি বাক্য রাখা যায়: 2001 সালে জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের (জাক) সহায়তায় মোস্তাফা জব্বার চাকমা বর্ণমালার প্রথম সফটওয়্যার তৈরি করেন। দুই উৎসের কথা দুই রকম; কোনটি কোন অর্থে বলা — ছাপাখানার ব্যবহারযোগ্য ফন্ট, নাকি যেকোনো সফটওয়্যার — তা কোনো উৎসে আলাদা করে ব্যাখ্যা করা নেই।
bdnews24-এর লেখায় লিপির প্রসঙ্গটি অন্যভাবে এসেছে। প্রশান্ত ত্রিপুরা লিখেছেন, ‘প্রকাশিত খবর অনুসারে’ দেবাশীষ চাকমার ‘ফেবো’ ছাপানো হয়েছিল চাকমা হরফে হাতে লেখা টেক্সটের ছবির ভিত্তিতে, আর পরের উপন্যাস ‘মুই মত্যেই’ ছাপা হয়েছে বাংলা হরফে। তাঁর মতে হরফের বিষয়টি গৌণ, কারণ যেকোনো ভাষা যেকোনো হরফে লেখা সম্ভব; বড় প্রশ্ন হলো লিখিত চর্চার রেওয়াজ ও প্রতিষ্ঠিত বানানরীতি না থাকা।
চাকমা লিপির উৎপত্তি, বর্ণসংখ্যা নিয়ে মতভেদ আর ইউনিকোডে অন্তর্ভুক্তির ইতিহাস আমাদের আলাদা লেখা চাকমা লিপি (অঝাপাত): উৎপত্তি, বর্ণমালা, ইউনিকোড ও পুনরুজ্জীবন-এ আছে।
‘প্রথম উপন্যাস’ প্রশ্নের আরেক দিক হলো সেই লেখাগুলো, যেগুলো বিভিন্ন সময়ে স্পষ্ট করে বলেছে যে চাকমা সাহিত্যে তখনো কোনো উপন্যাস নেই। জুমজার্নালের আর্কাইভে এমন কয়েকটি লেখা আছে, আর জুমজার্নাল ইবুকে আছে চাকমা সাহিত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা-গ্রন্থ, যার সূচিপত্রে উপন্যাসের কোনো অংশ নেই।
বইটি প্রকাশ করেছিল উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি, 2002 সালে; 268 পৃষ্ঠার পুরো বইটি জুমজার্নাল ইবুকে পড়া যায়। সূচিপত্রের বড় ভাগগুলো হলো চাকমা ভাষা পরিচিতি, লোকসাহিত্য, কবিতা, তারপর নাটক ও গল্প। গল্পের ভাগে আছে সুগত চাকমার ‘পজ্জন’, অধ্যাপিকা নমিতা দেওয়ানের ‘কালাচান’র বিঝু’, রাজা দেবাশীষ রায়ের ‘গম লাগানাত্তুন বেচ’, শান্তিময় চাকমার ‘গধারাম’ স্বপন’। উপন্যাসের কোনো ভাগ নেই।
বইয়ের ‘চাকমা সাহিত্য চর্চা’ অধ্যায়ে (পৃষ্ঠা 111–115) শিবচরণের ‘গোজেন লামা’ থেকে শুরু করে 1990-এর দশক পর্যন্ত কবিতার বই ও মঞ্চস্থ নাটকের সালওয়ারি বিবরণ আছে; সেখানেও কোনো উপন্যাসের উল্লেখ নেই। অধ্যায়ের শেষে লেখা আছে, এটি দৈনিক বাংলার বাণী-র 21 ফেব্রুয়ারি 1999 সংখ্যায় প্রকাশিত সুগত চাকমার প্রবন্ধ ‘চাকমা সাহিত্য চর্চা’।
আমাদের আর্কাইভে প্রকাশিত ভারতের চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশ: সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা লিখেছেন ত্রিপুরার কবি ও প্রাবন্ধিক গৌতমলাল চাকমা। কবিদের তালিকার পরে তিনি লিখেছেন: “এ যাবত চাকমা সাহিত্যে বিভিন্ন বিষয়ের উপর কম বেশি রচনার নিদর্শন পাওয়া গেলেও চাকমা সাহিত্যের অঙ্গনে এখনও পর্যন্ত কোন উপন্যাস সৃষ্টি হয়নি।” লেখাটির রচনাকাল উল্লেখ নেই; এর তথ্যসূত্রের তালিকায় সবচেয়ে সাম্প্রতিক বইটি 1989 সালের।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙামাটির রিসার্চ অফিসার শুভ্র জ্যোতি চাকমার প্রবন্ধ বিংশ শতাব্দী পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি সাহিত্য চর্চার নবজাগরণ আমাদের আর্কাইভে আছে। তিনি লিখেছেন, পাহাড়িদের মধ্যে গান, কবিতা, ছড়া, ছোটগল্প লেখার চর্চা হরহামেশা দেখা গেলেও “এখনো উপন্যাস লেখার প্রবণতা দেখি না”। একই লেখায় তিনি জানিয়েছেন, আধুনিক সংগীত ছাড়া কবিতা, গল্প, উপন্যাস জাতীয় কোনো সাহিত্য তেমন প্রশংসা পায়নি।
আমাদের আর্কাইভের দীর্ঘ লেখা চাকমা জাতি-র লেখক সঞ্জীব চাকমা। সত্তর ও আশির দশকের সাহিত্য-সংগঠনগুলোর বিবরণের পরে তিনি লিখেছেন, “তবে সেসময় কোনো চাকমা উপন্যাস রচিত হতে দেখা যায়নি। মাত্র সাম্প্রতিককালে কেউ কেউ উপন্যাস রচনায় ব্যাপৃত হয়েছেন।” কারা, কোন উপন্যাস — লেখায় কোনো নাম নেই। লেখাটির তথ্যসূত্রের তালিকায় সুগত চাকমার 2002 সালের বইটিও আছে।
‘চাকমা উপন্যাস চাই’ আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের একটি প্রবন্ধ, 1993 সালে জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের বৈসুক-সাংগ্রাই-বিজু সংকলন ‘সাঙু’-তে প্রকাশিত। প্রবন্ধের মূল দাবি: চাকমা শিল্পীর লেখা, চাকমা ভাষায়, চাকমা জীবন নিয়ে উপন্যাস দরকার। লেখাটি আমাদের আর্কাইভে পুরোটাই পড়া যায়।
প্রবন্ধের শুরুতে ইলিয়াস লিখেছেন, চাকমা ভাষার সাহিত্যের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ মাত্র এক বছরের, তাও বাংলা অনুবাদের মাধ্যমে। তারপর তাঁর প্রধান কথা: “চাকমা শিল্পীর লেখা চাকমা ভাষায় উপন্যাস চাই; সেই উপন্যাসের বেশীর ভাগ লোক চাকমা, তাদের বাড়ি রাঙ্গামাটি কি খাগড়াছড়ি কি বান্দরবানের কোন পাহাড়ি জনপদ…”
তাঁর যুক্তি ছিল এই রকম: চাকমা কবিতা ক্ষোভ ও প্রতিরোধের অনুভূতি প্রকাশ করছে, কিন্তু আধুনিক মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও তার ভাঙাগড়াকে ধরতে উপন্যাসের দরকার। প্রবন্ধে তিনি ‘রাধামন ধনপুদি’ ও গেংখুলিদের পরিবেশনার কথা বলেছেন, আর লিখেছেন যে ঐতিহ্যের প্রতি ভক্তির জায়গায় জিজ্ঞাসা ও বিশ্লেষণ এলে চাকমা ঔপন্যাসিক ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তিকে মেলাতে পারবেন। প্রবন্ধ শেষ হয়েছে একটি প্রশ্নে — অনুপ্রাণিত ও দায়িত্বশীল চাকমা শিল্পী কি এই তৃষ্ণা মেটানোর উদ্যোগ নেবেন?
লেখাটির ভূমিকায় আর্কাইভের সম্পাদকীয় টীকায় বলা আছে, প্রকাশের পর চাকমা ছাড়া অন্য পাহাড়ি জাতিগুলোর শিক্ষিত মহলে এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হয়, কারণ পাহাড়ে আরও দশটির বেশি জাতি থাকার পরও শুধু চাকমাদের উপন্যাস দাবি করা হয়েছিল; এর বিপক্ষে কিছু লেখাও প্রকাশিত হয়।
শিশির চাকমার স্মৃতিচারণ সুহৃদ চাকমা: চাকমা সাহিত্যের এক ক্ষণজন্মা পুরুষ (সুহৃদ চাকমা স্মারক গ্রন্থ, পৃষ্ঠা 42–45) অনুযায়ী, কবি সুহৃদ চাকমার (জন্ম 20 জুন 1958, মৃত্যু 8 আগস্ট 1988) উপন্যাস লেখার ইচ্ছা ছিল, কিন্তু লেখা হয়নি। শিশির চাকমা লিখেছেন, তিনি বেঁচে থাকলে ইলিয়াসের ‘চাকমা উপন্যাস চাই’-এর উপযুক্ত উত্তর হয়তো তিনিই প্রথম দিতেন।
প্রশান্ত ত্রিপুরার bdnews24 লেখার শিরোনামই ইলিয়াসের প্রবন্ধকে উদ্দেশ করে: ‘চাকমা উপন্যাস তো মিলল, কিন্তু ‘চাকমা বাল্যশিক্ষা’র খবর কী’। লেখাটি জানায়, ইলিয়াস প্রবন্ধটি লিখেছিলেন 1993 সালে, আর তাঁর মৃত্যুর বছর 1997-এর 2 ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সই হয়। লেখাটি আরও উল্লেখ করেছে, 2011 সালে একজন ব্লগার ‘একজন বাঙালি লেনিন চাই’ শিরোনামে ইলিয়াসের দাবির একটি জবাব লিখেছিলেন, যেখানে ‘ফেবো’কেও সমালোচনা করা হয়েছিল।
না। ‘চাকমা ভাষার প্রথম উপন্যাস’ খুঁজতে গিয়ে প্রায়ই চাকমা লেখকের লেখা বাংলা বা ইংরেজি উপন্যাসের কথা আসে। উৎসগুলোতে এমন উদাহরণ আছে গৈরিকা পত্রিকায় ধারাবাহিক একটি উপন্যাস, ইংরেজিতে লেখা উপন্যাস, আর স্বাধীনতার পর পাহাড়ি লেখকদের বাংলা উপন্যাসের ক্ষেত্রে।
শুভ্র জ্যোতি চাকমার প্রবন্ধে আছে, বিংশ শতাব্দীতে রাণী বিনীতা রায়ের রচিত ‘অকূলে’ নামের একটি উপন্যাস গৈরিকা পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল, এবং “সম্ভবত তিনিই প্রথম উপন্যাস লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন।” উপন্যাসটি কোন ভাষায় লেখা, কোন সালে, কয় কিস্তিতে — প্রবন্ধে বলা নেই।
গৈরিকা পত্রিকা সম্পর্কে একাধিক উৎস একই কথা বলে। সুগত চাকমার 2002 সালের বই অনুযায়ী, চাকমা রাজপরিবারের সদস্য রাণী বিনীতা রায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় 1936 সাল থেকে ‘গৈরিকা’ প্রকাশিত হয়, নামকরণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, আর পত্রিকাটি অনিয়মিতভাবে 1951 সাল পর্যন্ত চলে। সঞ্জীব চাকমার লেখাতেও 1936 থেকে 1951 এবং রবীন্দ্রনাথের নামকরণের কথা আছে। বাংলাপিডিয়ার ‘চাকমা’ ভুক্তি চাকমা সাহিত্যপত্রের সূচনা হিসেবে 1936 সালে গৈরিকা-র প্রকাশকে চিহ্নিত করেছে। সুগত চাকমার বইয়ে আরও আছে, গৈরিকায় বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই লেখা প্রকাশিত হয়েছিল, আর এতদঞ্চলে পত্রিকাটি সাহিত্যচর্চা ও সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে নতুন যুগের সূচনা করে।
আমাদের আর্কাইভে প্রকাশিত মুকুর কান্তি খীসার সংক্ষিপ্ত জীবনপঞ্জি (সূত্র: CHT Aid Foundation) অনুযায়ী, খাগড়াছড়ির খবংপুজ্যা গ্রামে 1935 সালে জন্ম নেওয়া এই কূটনীতিক ইংরেজিতে All That Glisters ও Time and Again নামে উপন্যাস লিখেছিলেন। জীবনপঞ্জিতে বলা আছে, উপন্যাসগুলোতে পাহাড়িদের বঞ্চনার ইতিহাস, চাকমা সংস্কৃতি, 1947-এর দেশভাগ ও সমকালীন রাজনীতি ‘ন্যারেটিভ স্টাইলে’ এসেছে। প্রকাশসাল জীবনপঞ্জিতে নেই। এগুলো চাকমা লেখকের উপন্যাস, চাকমা ভাষার নয়।
নন্দলাল শর্মার লেখা স্বাধীনতা উত্তর পার্বত্য অঞ্চলে নৃগোষ্ঠীর বাংলা সাহিত্যচর্চা (প্রথম প্রকাশ: ‘আলাম’, 2012) জানায়, স্বাধীনতার পরে পার্বত্য অঞ্চলের লেখকদের বাংলা কবিতাগ্রন্থ, উপন্যাস, গবেষণা, ভ্রমণকাহিনি ও লোকসাহিত্যের বই রচিত হয়েছে, এবং এ সময়ে তাঁরা নিজস্ব মাতৃভাষায় যতটা সাহিত্যচর্চা করেছেন, তার চেয়ে বেশি করেছেন বাংলায়। কোন উপন্যাস, লেখায় তার নাম নেই।
‘ফেবো’র পরে চাকমা ভাষায় যে উপন্যাসটির উল্লেখ উৎসে পাওয়া যায়, সেটি ‘মুই মত্যেই’ (অর্থ ‘আমি আমার’)। bdnews24-এর লেখা অনুযায়ী এটি 2013 সালে প্রকাশিত, লেখক কে ভি দেবাশীষ চাকমা, আর এটি ছাপা হয়েছে বাংলা হরফে।
প্রশান্ত ত্রিপুরার মূল্যায়ন: উপন্যাস দুটির কোনোটি সাহিত্য হিসেবে চাকমা সমাজে খুব একটা সাড়া ফেলেছে, এমন আলামত মেলে না। তিনি এর কারণ হিসেবে লিখিত চর্চার রেওয়াজ না থাকা, প্রতিষ্ঠিত বানানরীতির অনুপস্থিতি এবং স্বল্প-ব্যবহৃত বা নব-উদ্ভাবিত লিপিতে লেখার কষ্টের কথা বলেছেন।
‘মুই মত্যেই’-এর প্রকাশক, পৃষ্ঠাসংখ্যা বা প্রকাশস্থান কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
এখানে ‘চাকমা ভাষা’ বলতে কী বোঝায়, সেটিও খেয়াল রাখার মতো। প্রথম আলোর লেখায় পুলক বরণ চাকমা লিখেছেন, বাংলা হরফে চাকমা সাহিত্যচর্চা করতে গেলে মূল উচ্চারণ বদলে অর্থ ভিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সাধনাজ্যোতি ভিক্ষুর একটি ব্লগ-লেখায় আছে, সত্তরের দশক থেকে ছাপার সুবিধার জন্য চাকমা কবি ও লেখকেরা বাংলা বর্ণে চাকমা ভাষায় সাহিত্যচর্চা করে আসছেন।
উপন্যাসের তুলনায় চাকমা কবিতা ও নাটকের ‘প্রথম’ নিয়ে উৎস অনেক বেশি, যদিও সেখানেও তারিখ ও বানানে অমিল আছে। নিচের ছকে উৎসগুলোর বক্তব্য পাশাপাশি রাখা হলো; উপন্যাসের প্রশ্নটি কোথায় দাঁড়িয়ে, তা এই পটভূমিতে বোঝা সহজ হয়।
| রচনা | উৎস যা বলে | উৎস |
|---|---|---|
| শিবচরণের ‘গোজেন লামা’ | চাকমাদের আদি কবির রচনা; প্রথম আলো: আঠারো শতকে (1777) চাকমা বর্ণমালায় রচিত। সঞ্জীব চাকমা: রচনাকাল নিয়ে তিনটি মত — 1777, 1822, 1776 | প্রথম আলো (2013); সঞ্জীব চাকমা; সুগত চাকমা (2002) |
| ধর্মধন-এর ‘চান্দবী’ | বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে চাকমা বর্ণে বাংলা ভাষায় রচিত কাব্য | সুগত চাকমা (2002), পৃ. 112 |
| প্রবোধচন্দ্র চাকমা (ফিরিংচান)-র ‘আলসি কবিতা’ | 1930 সালে প্রকাশিত কবিতার বই | সুগত চাকমা (2002), পৃ. 112 |
| প্রথম চাকমা নাটক | সুগত চাকমার বই: ‘ধেঙাবৈদ্য’ (শয়তান ওঝা), লেখক সুগত চাকমা (ননাধন), 1978 সালে রাঙামাটিতে মঞ্চস্থ। সাধনাজ্যোতি ভিক্ষুর ব্লগে একই নাটকের নাম ‘বেঙাবৈদ্য’ বানানে | সুগত চাকমা (2002), পৃ. 114; সাধনাজ্যোতি ভিক্ষু (2013) |
| উপন্যাস | Daily Star (2004): ‘ফেবো’, লেখকের ভাষ্যে ছাপা প্রথম। সুগত চাকমা (2002), গৌতমলাল চাকমা, শুভ্র জ্যোতি চাকমা: উপন্যাস নেই বা প্রবণতা নেই | উপরের অংশগুলো দেখুন |
শিবচরণ ও ‘গোজেন লামা’ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে গোজেন লামা: শিবচরণের ঈশ্বর নামা, আর তার শ্রেণি নিয়ে তিনটি দাবি লেখায়; আর মৌখিক আখ্যানের ধারক গেংখুলিদের কথা গেংখুলি: চাকমা চারণ কবি ও তাঁদের পরিবেশনা-তে।
ইংরেজি উইকিপিডিয়ার ‘List of first novels by language’ তালিকায় বাংলা, অসমীয়া, মৈতৈ, বর্মি, ওড়িয়া ও নেপালি ভাষার প্রথম উপন্যাসের নাম, সাল ও লেখক আছে; চাকমা ভাষার কোনো ভুক্তি সেখানে নেই (নভেম্বর 2026 পর্যন্ত)। তালিকাটি নিজেই অসম্পূর্ণ বলে চিহ্নিত।
| ভাষা | সাল | উপন্যাস | লেখক (তালিকায় যেভাবে) |
|---|---|---|---|
| বাংলা | 1857 | আলালের ঘরের দুলাল | Peary Chand Mitra |
| অসমীয়া | 1890 | ভানুমতী | Padmanath Gohain Baruah |
| বর্মি | 1904 | Maung Yin Maung, Ma Me Ma | James Hla Kyaw |
| মৈতৈ (মণিপুরি) | 1930 | মাধবী | Lamabam Kamal Singh |
| ককবরক | 1954 / 1987 | Chethuang (“a Kokborok novel”) / Hachuk Khurio, part 1 (“the first modern Kokborok novel”) | Sudhanwa Debbarma |
| চাকমা | — | তালিকায় নেই | — |
বাংলা থেকে মৈতৈ পর্যন্ত সারিগুলো উইকিপিডিয়ার ওই তালিকা থেকে। ককবরকের সারিটি তালিকা থেকে নয়, উইকিপিডিয়ার ‘Sudhanwa Debbarma’ নিবন্ধের উপন্যাস-ছক থেকে, যেখানে 1954 সালের ‘Chethuang’-কে কেবল ‘a Kokborok novel’ আর 1987 সালে Kokborok Sahitya Sabha প্রকাশিত ‘Hachuk Khurio’-কে ‘the first modern Kokborok novel’ বলা হয়েছে। ককবরকের লিখিত চর্চা নিয়ে আমাদের আর্কাইভে আছে কালের দর্পনে ককবরকের লিখিত চর্চা।
নিচের ছকে প্রতিটি উৎসের বক্তব্য তার নিজের ভাষার কাছাকাছি রাখা হয়েছে, প্রকাশকাল অনুযায়ী সাজিয়ে। যে উৎসের রচনাকাল জানা নেই, সেটি শেষে।
| উৎস | সাল | চাকমা উপন্যাস নিয়ে বক্তব্য |
|---|---|---|
| আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, ‘চাকমা উপন্যাস চাই’ (‘সাঙু’, জাক) | 1993 | চাকমা শিল্পীর লেখা চাকমা ভাষায় উপন্যাস চাই |
| সুগত চাকমা, ‘চাকমা সাহিত্য চর্চা’ (দৈনিক বাংলার বাণী) | 1999 | কবিতা ও নাটকের সালওয়ারি বিবরণ; উপন্যাসের উল্লেখ নেই |
| সুগত চাকমা, বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য | 2002 | সূচিপত্রে কবিতা, নাটক, গল্প আছে; উপন্যাসের ভাগ নেই |
| The Daily Star | 2004 | ‘Febo’, Debo Priya Chakma; লেখকের ভাষ্যে চাকমা ভাষায় ছাপা প্রথম উপন্যাস |
| AFP / ABC News | 2004 | ‘Febo’, Debapriya Sangma; বাংলাদেশে চাকমা ভাষায় প্রকাশিত প্রথম বই; হাতে লেখা পাণ্ডুলিপির ছবি থেকে ছাপা |
| নন্দলাল শর্মা (‘আলাম’) | 2012 | স্বাধীনতার পর পাহাড়ি লেখকেরা বাংলায় উপন্যাসসহ নানা বই লিখেছেন |
| প্রশান্ত ত্রিপুরা, bdnews24.com | 2021 | ‘ফেবো’ (2004, চাকমা হরফ) ও ‘মুই মত্যেই’ (2013, বাংলা হরফ); কোনোটি সমাজে সাড়া ফেলেছে এমন আলামত নেই |
| গৌতমলাল চাকমা (ভারত) | উল্লেখ নেই | চাকমা সাহিত্যে এখনও পর্যন্ত কোনো উপন্যাস সৃষ্টি হয়নি |
| শুভ্র জ্যোতি চাকমা | উল্লেখ নেই | পাহাড়িদের মধ্যে এখনো উপন্যাস লেখার প্রবণতা নেই; রাণী বিনীতা রায়ের ‘অকূলে’ গৈরিকায় ধারাবাহিক |
| সঞ্জীব চাকমা, ‘চাকমা জাতি’ | উল্লেখ নেই | সত্তর-আশির দশকে কোনো চাকমা উপন্যাস নেই; সাম্প্রতিককালে কেউ কেউ উপন্যাস লিখছেন |
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা, সাহিত্য ও জনগোষ্ঠী নিয়ে আমাদের অন্যান্য লেখা একসঙ্গে পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়। কোন আদিবাসী ভাষার অভিধান আছে, কোনটির নেই — সে হিসাব আছে আদিবাসী ভাষার অভিধান লেখায়।
সবচেয়ে প্রচলিত উত্তর ‘ফেবো’, যা 2004 সালের ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার একুশে বইমেলায় আসে। The Daily Star (21 ফেব্রুয়ারি 2004) লিখেছিল, লেখকের ভাষ্য অনুযায়ী এটি চাকমা ভাষায় ছাপা প্রথম উপন্যাস। কোনো গবেষণা বা গ্রন্থপঞ্জিতে ‘প্রথম’ দাবিটির স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
উৎসভেদে নাম আলাদা। The Daily Star (2004) লিখেছে Debo Priya Chakma, AFP (2004) লিখেছে Debapriya Sangma। প্রশান্ত ত্রিপুরার 2021 সালের bdnews24 লেখায় প্রথমে ‘দেবপ্রিয় চাকমা’, পরে একই লেখায় ‘দেবাশীষ চাকমা’ নাম এসেছে। বইটির আখ্যাপত্রে নাম কীভাবে ছাপা, তা জানা যায়নি।
bdnews24.com-এ প্রশান্ত ত্রিপুরা (2021) ‘প্রকাশিত খবর অনুসারে’ লিখেছেন, শিরোনামের শব্দটির দুটি অর্থ: ‘ভয়ার্ত মুহূর্ত’ ও ‘ভয়ঙ্কর প্রাণী’। AFP-র 2004 সালের খবরে বইটির ইংরেজি নাম দেওয়া হয়েছে ‘The Terrified Moments’।
AFP (2004) অনুযায়ী উপন্যাসটির পটভূমি 1980-এর দশক, যখন পার্বত্য জেলাগুলোর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে সশস্ত্র লড়াই চলছিল। bdnews24-এর 2021 সালের লেখায় ‘প্রকাশিত খবর অনুসারে’ বলা হয়েছে, পটভূমি 1986 সালে খাগড়াছড়ির লোগাংয়ে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ড। কাহিনির বিস্তারিত কোনো উৎসে নেই।
চাকমা হরফে। AFP-কে প্রকাশনা সংস্থার মুখপাত্র বলেছিলেন, তখন চাকমা বর্ণমালার কম্পিউটার সংস্করণ না থাকায় বইটি প্রথমে হাতে লেখা হয়, তারপর ছবি তুলে ছাপা হয়। প্রথম আলোর 2013 সালের একটি লেখায় আছে, 2001 সালে জাক-এর সহায়তায় মোস্তাফা জব্বার চাকমা বর্ণমালার প্রথম সফটওয়্যার তৈরি করেন।
কোনো উৎসে ফেবোর আগের চাকমা-ভাষার উপন্যাসের নাম পাওয়া যায়নি। সুগত চাকমার 2002 সালের বই বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য-র সূচিপত্রে কবিতা, নাটক ও গল্প আছে, উপন্যাসের ভাগ নেই। শুভ্র জ্যোতি চাকমা রাণী বিনীতা রায়ের ‘অকূলে’ উপন্যাসের কথা লিখেছেন, তবে তার ভাষা ও সাল উল্লেখ করেননি।
জানা যায়নি। শুভ্র জ্যোতি চাকমার প্রবন্ধে আছে, বিংশ শতাব্দীতে ‘অকূলে’ গৈরিকা পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় এবং “সম্ভবত তিনিই প্রথম উপন্যাস লেখার কাজে হাত দিয়েছিলেন”। ভাষা ও সাল প্রবন্ধে নেই। সুগত চাকমার বই অনুযায়ী গৈরিকা 1936 থেকে 1951 পর্যন্ত অনিয়মিত প্রকাশিত হয়, এবং এতে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষায় লেখা ছাপা হতো।
1993 সালে। প্রবন্ধটি জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের বৈসুক-সাংগ্রাই-বিজু সংকলন ‘সাঙু’-তে প্রকাশিত হয়। এতে ইলিয়াস চাকমা শিল্পীর লেখা, চাকমা ভাষায়, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি-বান্দরবানের মানুষের জীবন নিয়ে উপন্যাসের দাবি জানান। প্রবন্ধটি জুমজার্নালের আর্কাইভে পুরোটা প্রকাশিত আছে।
প্রশান্ত ত্রিপুরার 2021 সালের bdnews24 লেখা অনুযায়ী, 2013 সালে কে ভি দেবাশীষ চাকমার ‘মুই মত্যেই’ (‘আমি আমার’) প্রকাশিত হয়, বাংলা হরফে। এর প্রকাশক ও পৃষ্ঠাসংখ্যা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি। সঞ্জীব চাকমা লিখেছেন সাম্প্রতিককালে কেউ কেউ উপন্যাস লিখছেন, তবে নাম দেননি।
ত্রিপুরার কবি ও প্রাবন্ধিক গৌতমলাল চাকমা তাঁর ‘ভারতের চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধে লিখেছেন, চাকমা সাহিত্যের অঙ্গনে এখনও পর্যন্ত কোনো উপন্যাস সৃষ্টি হয়নি। প্রবন্ধটির রচনাকাল উল্লেখ নেই; তথ্যসূত্রের তালিকায় সবচেয়ে সাম্প্রতিক বইটি 1989 সালের। পরে ভারতে কোনো চাকমা উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে কি না, তা জানা যায়নি।
সুগত চাকমার বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য (2002) অনুযায়ী প্রথম চাকমা নাটক ‘ধেঙাবৈদ্য’ (শয়তান ওঝা), লেখক সুগত চাকমা (ননাধন), 1978 সালে রাঙামাটিতে মঞ্চস্থ। সাধনাজ্যোতি ভিক্ষুর 2013 সালের ব্লগে একই নাটকের নাম ‘বেঙাবৈদ্য’ বানানে লেখা।
সমসাময়িক সংবাদের মধ্যে The Daily Star (21 ফেব্রুয়ারি 2004) ও AFP (23 ফেব্রুয়ারি 2004), আর বিশ্লেষণের মধ্যে প্রশান্ত ত্রিপুরার bdnews24 লেখা (2021)। চাকমা সাহিত্যের সামগ্রিক চিত্রের জন্য সুগত চাকমার 2002 সালের বইটি জুমজার্নাল ইবুকে পড়া যায়। প্রশ্নব্যাংক সাইটগুলোতে উত্তর থাকলেও উৎস থাকে না।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 3 নভেম্বর 2026
প্রসঙ্গ:উপন্যাস, চাকমা, চাকমা উপন্যাস, চাকমা সাহিত্য
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।