Jumjournal Logo

কবি সুহৃদ চাকমা’র স্মরণে

Last updated Oct 6th, 2026

878

Suhrid Chakma

কবি সুহৃদ চাকমা’র সাথে আমার খুবই আন্তরিক সম্পর্ক ছিল। আমরা অনেকেই সুগত চাকমা (ননাধন), মৃত্তিকা চাকমা, শিশির চাকমা, ঝিমিত ঝিমিত চাকমা, লালন চাকমা, বীর কুমার চাকমাসহ অনেকেই হৈ হুল্লুড় করে চলেছিলাম।

সাপ্তাহিক বনভূমি ও আমাদের সম্পর্ক

বিশেষ করে ১৯৭৮ সালের ২৬ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্রামের সর্বপ্রথম ও তৎকালীন একমাত্র সংবাদপত্র “সাপ্তাহিক বনভূমি” প্রকাশের পর সম্পর্ক আরও গভীর হয়। বিশেষ করে লেখালেখি নিয়ে এত বেশি সম্পর্ক ছিল। তা কোনদিন ভুলার নয়।

“বনফুল” নিয়ে বিপদ: দুটি চিঠি

সুহৃদদের জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া চলাকালীন সময়ে “বনফুল” নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন অনুমতি বিহীন ছাপানো নিয়ে অসুবিধায় পড়াতে ১৪-১১-৭৮ ইং এবং ১৩-০৯-৮০ ইং চিঠি লিখেছিল। তা হুবহু দেয়া হল। (অনেক চিঠি দেয়া হয়েছিল আপাততঃ এ দুটি ছাপা গেল)

মকছুদ ভাই,

নমস্কারান্তে বিশেষ এই, আমি খুবই বিপদে পড়েছি। এ পরিপ্রেক্ষিতে আপনার সরণাপন্ন ছাড়া আমার কোন গত্যন্তর নেই।

বই সম্পাদনা ব্যাপারে আমার জ্ঞান খুবই সীমিত। তা আপনার জানা কথা। বইটি বাধ্য হয়ে আমাকে সম্পাদনা করতে হয়েছে, নিশ্চয় আপনি বুঝতে পেরেছেন যেহেতু আপনিও এসব কাজ করে আসছেন।

নব বিক্রম বাবুর Article টি সম্পূর্ণ সরল বিশ্বাসে আমি ছাপার দায়িত্ব নিয়েছি। কারন উনি রিস্ক নেবেন বলে জানিয়েছেন। এখন এ ব্যাপার আলাদা হয়ে গেছে। আপনি জানেন, আমি রাজনীতির রা’টা পর্যন্ত বুঝিনা। সাহিত্য-সংস্কৃতি আমার একটু জানা আছে বটে কিন্তু সে সব তো আপনারা পক্ক করে দিয়েছেন দিচ্ছেন।

এমতাবস্থায়, আমি কি করবো না করবো খুবই চিন্তিত আছি। সুসময় চাকমা ঐদিন আপনার কথা বলেছে। আপনি নাকি এসব ব্যাপারে আমাকে ভাল উপদেশ ও সাহায্য করতে পারবেন।

আপনি নিজে বলুন, আজ আমার বিরুদ্ধে যে সব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা’কি আমি চার ভাগের একভাগও হতে পারি? অন্ততঃ আমার মন, মুখ, চোখ দেখে মিথ্যা বলতে পারবেন না।

বনফুল অনুমতি বিহীন কেন ছাপিয়েছি সচিবালয়ে সে অভিযোগের চিন্তায় আমার এখন রাত দিন ঘুম হয় না। এদিকে পরীক্ষা আসছে ২০ তারিখ ১৫ ই নভেম্বর সাবসিবিয়ারী ইংরেজী, ইতিহাস। অনার্স ডিসেম্বর ১ লা থেকে শেষ। তাই জানিয়েছি ডিসেম্বরের শেষে দেখা করবো অর্থাৎ কারণ দর্শাবো? কিন্তু ভাই কি করে দর্শাবো?

এখন আমি কি করতে পারি আপনি উপায়টুকু না বললে আমার খুবই অসুবিধে হবে। নানা জনে নানা কথাতো ছড়াচ্ছে। চিঠি পেলে আপনি তাড়াতাড়ি উত্তর দিবেন এবং জানাবেন অন্ততঃ আমার অবস্থা বিবেচনা করে। তাই সাহিত্য এসব, সেসব আর করা হবে না। যে রকম মানসিক যন্ত্রনা ভূগছি আমাকে স্বচক্ষে দেখতে বোঝতে আপনার কষ্ট হবে না। তাই এটুকু অনুরোধ আমাকে একটু সাহায্য করুন।

ইতি

আপনারই

সুহৃদ

একে এম মকছুদ আহাম্মদ

সম্পাদক, সাপ্তাহিক বনভূমি

রাঙ্গামাটি প্রকাশনী

রাঙ্গামাটি, রিজার্ভ বাজার

পার্বত্য চট্টগ্রাম।


জনাব, আমার লিখা “ইয়াসমিন” গল্পটি ছাপাবেন না। এখানে একটা ম্যাগাজিনে তা ছাপানো হয়েছে। তা ছাড়া ওখানে কিছু আঙ্গিকে দূর্বল ছিল। অন্যটি (প্রবন্ধটি) ছাপাবেন। নমস্কারসহ

-সুহৃদ চাকমা

চিঠি দুটি যা জানায়

এ দুটি চিঠি থেকে পরিস্কার বুঝা যায় যে, সুহৃদ চাকমা’র সাথে কি ধরণের সম্পর্ক এবং আন্তরিকতা ছিল। সুহৃদ চাকমা এবং অনেকেই সাপ্তাহিক বনভূমি’র ভূমিকে উর্বর করে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

পরবর্তীতে সুহৃদ চাকমা একজন উচুমানের কবিতে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু আমাদের অত্যন্ত দূর্ভাগ্য সুহৃদ চাকমা আমাদের মাঝ থেকে বড়ই অকালে হারিয়ে গেল। এ হারিয়ে যাওয়া যে এতই বেদনাবিধুর সেটা কল্পনা করা যায় না। তাকে হারিয়ে আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে যা কোন দিনই পূরণ হবার নয়।

স্মৃতিতে সুহৃদ চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামে কবি সুহৃদ চাকমা উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে থাকবে আমাদের মাঝে। সুহৃদ’র স্মৃতিকে ধরে রাখার মত একটা ব্যবস্থা করা গেলে তার আত্মার শান্তি পেত। পার্বত্য চট্টগ্রামে কবি, সাহিত্যিকদের মধ্যে অদ্যাবধি যারা সুখ্যাত হয়েছেন।

আমরা চিনি, জানি তারা স্কুলেই কবি সুহৃদ চাকমার অকালে অন্তঃর্ধান হয়ে চির অজানায় হারিয়ে যাওয়ায় ব্যথিত হয়েছেন।

আজকে তার স্মৃতি চারনায় একথা নির্দিধায় বলা যায় যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সাহিত্য, সংস্কৃতিসহ সকল ক্ষেত্রে বর্তমানে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে; তাতে সুহৃদ চাকমার মত প্রতিশ্রুতিশীল, প্রতিভাবান লোকের বড় বেশী প্রয়োজন ছিল।

আজকের পাহাড়

যেখানে এখন দেশ প্রেম, জাত প্রেমের নামে চলছে আত্মপ্রেমের প্রতিযোগীতা। সমাজে’র নিরন্ন, নিরিহ জনতার ভাগ্যকাশে এখনো ঢেকে আছে চির চেনা সেই দারিদ্রতার কালো মেঘে।

পাহাড়ের শান্তি ও সুমিষ্ট হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে বারুদের পোড়া গন্ধ। কুটিল রাজনৈতিক স্বার্থের হানাহানিতে একে একে হারিয়ে যাচ্ছে এখানে মানুষের সরলতা টুকু। ভালবাসা, স্নেহ , মায়া-মমতা ঘেরা আদি -অকৃত্রিম পাহাড়ী সমাজ ব্যবস্থা।

যেখানে কোন বিভেদ বিস্বংবাদ ফাটল ধরাতে পারতনা ভাইয়ে ভাইয়ে। স্বজনের মধ্যে শান্তিতে সহাবস্থান ছিল মানুষের মূলনীতি। সেখানে আজ প্রতিনিয়ত চলছে শেখানো হচ্ছে জাতপাত, ধর্ম।

সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদের মন্ত্র। ফলে এখানে সৃষ্টি হয়েছে অনাকাঙ্খিত সামাজিক অস্থিরতা। এমন দুঃসময়ে জুম্ম জননীর কবিতার সন্তান সুহৃদ চাকমার শুন্যতা আমরা অনুভব করি।

তাঁর লেখা সংরক্ষণের প্রশ্ন

সুহৃদ চাকমার স্মারক গ্রন্থ, ২০০৫ — এই লেখাটি এই গ্রন্থের ৯–১৪ পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া
সুহৃদ চাকমার স্মারক গ্রন্থ, ২০০৫ — এই লেখাটি এই গ্রন্থের ৯–১৪ পৃষ্ঠা থেকে নেওয়া

তবে, সুহৃদ চাকমা’র লেখা কাব্য সাহিত্যেকে যদি সংরক্ষণ করে তার সমাজ চেতনাকে জনগনের কাছে তুলে ধরা যায়। তাহলে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।


লেখকঃ    এ. কে. এম মকছুদ আহমেদ

নোটঃ সুহৃদ চাকমা স্মারক গ্রন্থ ( পৃঃ ৯-১৪), লেখাটি জাক (জুম ঈসথেটিক কাউন্সিল) এর ২৫ বছরপূর্তি উপলক্ষ্যে কবি সুহৃদ চাকমার স্মরণে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রসঙ্গ:পার্বত্য চট্টগ্রাম, ব্যক্তিত্ব, সুহৃদ চাকমা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা