
উৎস: বাংলাদেশ গণপরিষদের বিতর্ক — খণ্ড ২ সংখ্যা ১৩
তারিখ: মঙ্গলবার, ৩১ অক্টোবর, ১৯৭২
বিষয়: সংবিধান-বিল বিবেচনা (দফাওয়ারী পাঠ) (৬ অনুচ্ছেদ : নাগরিকত্বের উপর সংশোধনী প্রস্তাব)
জনাব আঃ রাজ্জাক ভূঁইয়া : মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমি প্রস্তাব করছি যে, সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে নিম্নোক্ত অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করা হোক :
‘৬। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন।’
শ্রী লারমা : মাননীয় স্পিকার সাহেব, জনাব আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়া সংশোধনী প্রস্তাব এনেছেন যে, বাংলাদেশের নাগরিকগণ বাঙালি বলে পরিচিত হবেন।
মাননীয় স্পিকার সাহেব, এ ব্যপারে আমার বক্তব্য হল, সংবিধান বিলে আছে, “বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে।’ এর সঙ্গে সুস্পষ্ট করে বাংলাদেশের নাগরিকগণকে বাঙালি বলে পরিচিত করবার জন্য জনাব আব্দুর রাজ্জাক ভূঁইয়ার প্রস্তাবে আমার একটু আপত্তি আছে যে, বাংলাদেশের নাগরিকত্বের যে সংজ্ঞা, তাতে করে ভালোভাবে বিবেচনা করে তা যথোপযুক্তভাবে গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করি।
আমি যে অঞ্চল থেকে এসেছি, সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যুগ যুগ ধরে বাংলাদেশে বাস করে আসছে। বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় বাঙালিদের সঙ্গে আমরা লেখাপড়া শিখে আসছি। বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের কোটি কোটি জনগণের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সব দিক দিয়েই আমরা একসঙ্গে একযোগে বসবাস করে আসছি। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ, দাদা, চৌদ্দ পুরুষ—কেউ বলে নাই, আমি বাঙালি।
আমার সদস্য-সদস্যা ভাই-বোনদের কাছে আমার আবেদন, আমি জানি না, আমাদের এই সংবিধানে আমাদেরকে কেন বাঙালি বলে পরিচিত করতে চায়….।
জনাব স্পিকার : আপনি কি বাঙালি হতে চান না?
শ্রী লারমা : মাননীয় স্পিকার সাহেব, আমাদিগকে বাঙালি জাতি বলে কখনো বলা হয় নাই। আমরা কোনদিনই নিজেদেরকে বাঙালি বলে মনে করি নাই। আজ যদি এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানের জন্য এই সংশোধনী পাশ হয়ে যায়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পেয়ে যাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদেরকে বাংলাদেশী বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।
..(সংশোধনী পাশ হয়ে যায়)
শ্রী লারমা : মাননীয় স্পিকার, আমাদের অধিকার সম্পূর্ণরূপে খর্ব করে এই ৬ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধিত আকারে গৃহীত হল। আমি এর প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং প্রতিবাদ স্বরূপ আমি অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য গণপরিষদের বৈঠক বর্জন করছি।
..(অতঃপর মাননীয় সদস্য পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান)
সৈয়দ নজরুল ইসলাম (শিল্প মন্ত্রী) : ……আমি পরিষদের তরফ থেকে দাঁড়িয়েছি। কারণ আমাদের একজন মাননীয় সদস্য বাবু শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আজকে অনির্দিষ্ট কালের জন্য এই পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করে চলে গেছেন। এর চেয়ে মর্মান্তিক, এর চেয়ে দুঃখজনক ঘটনা এই পরিষদে আর ঘটে নাই। যেহেতু এর উপলক্ষ এই প্রস্তাবের সারমর্ম, সেই হেতু আমি এই প্রস্তাবের উপর দু’একটা কথা বলতে চাই। যে সংশোধনীর উপর তিনি অনির্দিষ্ট কালের জন্য পরিষদ-কক্ষ ত্যাগ করেছেন, সেটা গৃহীত হয়েছে। অতএব, তার উপর আমার কোন বক্তব্য পেশ করার অবকাশ নাই। আমরা জাতি হিসেবে বাঙালি। তার সঙ্গে জেনারেল ওসমানী সাহেবের সংশোধনীর একটা ভাবগত মিল আছে বলে আমি মাননীয় সদস্য বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা যাঁদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁরা যাতে ভুল না করেন, সেজন্য দাঁড়িয়েছি।
বাঙালি হিসেবে পরিচয় দিতে রাজী না হয়ে বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এই পরিষদ- কক্ষ ত্যাগ করেন। আমরা শুধু পরিষদ সদস্যবৃন্দই নই—আমি মনে করি, সারা বাঙালি জাতি এতে মর্মাহত হয়েছে। আমি এটা না বললে পাশে ভুল বোঝাবুঝি হয়, সেজন্য দাঁড়িয়েছি।
সেজন্য বলতে চাই, তিনি যাঁদের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাঁদের প্রস্তাব উত্থাপন না করে, বাঙালি-পরিচয়ের প্রতিবাদে যাঁদের নাম করে এই পরিষদ কক্ষ পরিত্যাগ করে চলে গেছেন, তাঁরা বাঙালি জাতির অঙ্গ। পার্বত্য চট্টগ্রামে যে ৫ লক্ষ উপজাতি রয়েছে, তাঁরা বাঙালি। তাঁরা সাড়ে সাত কোটি বাঙালির অঙ্গ বলে আমরা মনে করি।
বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা বাংলা ভাষায় বক্তৃতা করেছেন। তিনি বলেছিলেন, তিনি বাংলা বলতে দ্বিধাবোধ করেন না। একথা স্বীকার করার পরেও কেন তিনি চলে গেছেন, তা যদি তিনি বলতেন, তাহলে আমি এই পরিষদে তার জবাব দিতে পারতাম। তাঁর অনুপস্থিতিতে বলছি বলে এ কথা আমাকে বলতে হচ্ছে।
ঐ পার্বত্য চট্টগ্রামের যারা অধিবাসী, তাঁরা এই স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্রেরই অঙ্গ। বিশেষ করে কালকে আমাদের আইন-মন্ত্রী বলেছেন যে, তাঁদের প্রতি দীর্ঘদিন যাবৎ তৃতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁদের সংসদীয় আইনের আওতা এবং বাইরের সভ্য জগতের আইনের আওতার বাইরে রেখে বিচ্ছিন্ন মনোভাবের সুযোগ বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীরা দিয়েছিল৷ আমরা তা চাই না, আমরা চাই, পার্বত্য চট্টগ্রামের নাগরিকরা সারা বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির নাগরিকের সমমর্যাদাসম্পন্ন হবে। তা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের ৫ লক্ষ অধিবাসী বাঙালি জাতির গর্ব হিসেবে থাকবে।
শিক্ষা ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে অনুন্নত এলাকা পার্বত্য চট্টগ্রাম। যদি কেউ মনে করেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের যে অনুন্নত অবস্থা, তার চেয়ে তুলনামূলকভাবে বাংলার অন্যান্য এলাকা অধিক অনুন্নত তাহলে তাঁরা স্মরণ রাখা উচিত যে, বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম দরিদ্র দেশ এবং বাংলাদেশে শিক্ষার হার কম। যে দেশের শিক্ষার হার কম, সে দেশ স্বভাবতই অনুন্নত হয়ে থাকে। এই অনুন্নতিই সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করেছিল অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। ত্রিশ লক্ষ বাঙালি প্রাণ দিয়েছে সেই অধিকার সংগ্রামে এবং সেই সংগ্রামের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীরা যে একাত্মতা অনুভব করে নাই, এ কথা আমি বিশ্বাস করি না।
আমি মনে করি, বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আজকে যে উদ্দেশ্যে পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেছেন, তিনি যাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের জন্য তিনি সেটা করতে পারেন নাই— যদিও তিনি গর্ব করে বলে থাকেন, আমি বাঙালি নই। আমি বলব, যাদের ভোটে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, তাদের সহযোগিতা থেকে এ হাউস বঞ্চিত হয়েছে।
আমি পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, তাদের জন্য সংবিধানে যে ব্যবস্থা রাখা হয়েছে, তাতে তাদের প্রতিটি লোকের ধর্ম, নিজস্ব আচারের যথেষ্ট সুযোগ থাকবে। সামগ্রিকভাবে আমরা বাঙালি জাতি এবং বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা হচ্ছি হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খৃষ্টান ঐক্যবদ্ধ শক্তি যার বলে আমরা বাঙালি জাতি প্রতিষ্ঠা করেছি।
আমি আশা করি, এই ঐক্য, এই জাতীয়তাবাদ বিনষ্ট করার জন্য কেউ প্রচেষ্টা চালাবেন না। যদি চালান, তাহলে সারা জাতির অন্তরে ব্যথা দেওয়া হবে। এবং ব্যথা দিয়ে কেউ হয়তো দেশের অমঙ্গলের চেষ্টা করে পারবেন। এতে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুই আসতে পারে না।
বাবু মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এখন যেখানেই থাকুন না কেন, আমি তাঁকে আপনার মাধ্যমে আশ্বাস দিতে পারি, তাঁর বক্তব্য পেশ করার, তাঁর সংশোধনী দেওয়ার সবকিছুই বলার অধিকার আছে। কিন্তু ‘বাঙালি’ বলে পরিচয় দেওয়ার প্রতিবাদে তিনি যদি কক্ষ ত্যাগ করে চলে যান, তাহলে তিনি শুধু এই পরিষদেরই নয় তিনি যাদের প্রতিনিধিত্ব করছেন, তাদের মধ্যে একটা জাতি সম্বন্ধে ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি করবেন এবং সমগ্র বাঙালি জাতির মনে ব্যথা দেবেন। সেজন্যই আমি দাঁড়িয়েছি।
তাঁর কাছে আমার অনুরোধ, তিনি পরিষদে এসে তাঁর দায়িত্ব পালন করুন। পরিষদে এসে এই বাঙালি জাতীয়তাবাদের মহান প্রস্তাবকে সফল করে তুলুন। আমি আশা করব যে, বাঙালি হিসেবে তিনি তাঁর নিজস্ব অঞ্চল ও নিজের পরিচয় দেওয়ার সুযোগ গ্রহণ করবেন। এই বলে আমি শেষ করছি।
জনাব ডেপুটি স্পিকার : …এখন শ্রী মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা তাঁর সংশোধনী উত্থাপন করবেন।
শ্রী লারমা : মাননীয় ডেপুটি সাহেব, আমি আপনার মাধ্যমে এই মহান পরিষদে প্রস্তাব করছি যে, ‘১৭ অনুচ্ছেদের ৩য় পঙক্তিতে অবস্থিত ‘আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত শব্দাবলীর পরিবর্তে ‘শিক্ষার বিভিন্ন দিকে মেধা ও প্রবণতা অনুসারে শব্দাবলী সন্নিবেশ করা হোক।
জনাব ডেপুটি স্পিকার : ……………………
শ্রী লারমা : আমি এই সংশোধনী এনেছি তার কারণ, এই শিক্ষা সম্বন্ধে আমার একটা বক্তব্য আছে। শিক্ষা যদি শুধু আইনের দ্বারা নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত হয়, তাহলে যে ছেলেমেয়েরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করে ভবিষ্যতে দেশের কর্ণধার হবে, মেধা-অনুযায়ী শিক্ষার সুযোগের অভাবে তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটবে না। সেই মেধা ও প্রবণতা বিভিন্ন জনের বিভিন্নভাবে পরিস্ফুটিত হয়।
সেই দিকে লক্ষ্য রেখে যদি মেধার প্রবণতা অনুসারে শিক্ষার স্তর নির্ধারিত হয়, তাহলে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে মানুষের প্রতিভার বিকাশ লাভ হবে। আর যদি মেধা ও প্রবণতা অনুসারে শিক্ষার সুযোগ দেওয়া না হয়, তাহলে ছেলেমেয়েদেরকে দেশের উপযুক্ত নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা যাবে না।
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে জানি যে, যদি মেধা ও প্রবণতাকে শিক্ষার সব স্তরে যথার্থভাবে মর্যাদা দেওয়া না হয়, তাহলে ছেলেমেয়েদের মেধার উপযুক্ত বিকাশ সাধিত হবে না।
সেইজন্য এটা গ্রহণ করার জন্য আমি আপনার মাধ্যমে বলছি।
…….(ভোটে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়)…….
প্রসঙ্গ:এমএন লারমা, জুম্ম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।