Last updated Oct 19th, 2026
1

লোগাং গণহত্যা ১৯৯২ তদন্ত নিয়ে মূল কথা দুটি। সরকারের এক-সদস্যের তদন্ত কমিশন, যার প্রধান ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, 20 আগস্ট 1992 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে বাংলায় প্রতিবেদন জমা দেয়; জনসমক্ষে আসে কেবল তার ইংরেজি সংক্ষেপ, যাতে লেখা ছিল আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে মিলে এই হত্যার জন্য দায়ী, আর এর সূত্র শান্তিবাহিনীর হাতে এক বাঙালি কিশোরের মৃত্যু। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল 1993 সালের এপ্রিলে লেখে, সংক্ষেপটি হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না, সাক্ষীদের বয়ানে অনেক স্ববিরোধ, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়নি, আর বিডিআরের ভূমিকা অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
এই লেখার বিষয় ঘটনাটি নয়, ঘটনার পরে রাষ্ট্র কী তদন্ত করেছিল এবং সেই তদন্ত নিয়ে কে কী আপত্তি তুলেছিল। খাগড়াছড়ির পানছড়ি উপজেলার লোগাং গুচ্ছগ্রামে 10 এপ্রিল 1992 কতজন মারা গিয়েছিলেন, সে প্রশ্নে উৎসগুলোর মধ্যে বিস্তর ফারাক; প্রতিটি সংখ্যা এখানে তার উৎসের নামসহ পাশাপাশি রাখা হয়েছে, কোনোটিকে “সঠিক” বলা হয়নি। মূল সূত্রগুলো হলো অ্যামনেস্টির 1992, 1993 ও 2000 সালের তিনটি নথি, জাতিসংঘের আদিবাসী কার্যদলে রামেন্দু শেখর দেওয়ানের 1992 সালের বক্তব্য (জুমজার্নাল আর্কাইভে অনূদিত), তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর তাঁর 21 মার্চ 1993 তারিখের বিশ্লেষণ, এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের 1992 সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন।
এক নজরে
লোগাং খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের একটি, উপজেলার উত্তর-পশ্চিম কোণে, ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তঘেঁষা। 1992 সালে যে জায়গায় হত্যাকাণ্ড ঘটে, অ্যামনেস্টির ভাষায় সেটি ছিল একটি “গুচ্ছগ্রাম”, যেখানে 1989–1990 সালে দূরের নানা পাড়া থেকে পাহাড়িদের এনে বসানো হয়েছিল সরকারের বিদ্রোহ-দমন নীতির অংশ হিসেবে।
বাংলাপিডিয়ার পানছড়ি উপজেলা ভুক্তি অনুযায়ী উপজেলার আয়তন 334.10 বর্গকিলোমিটার; উত্তরে ত্রিপুরা, দক্ষিণে খাগড়াছড়ি সদর, পূর্বে দীঘিনালা, পশ্চিমে মাটিরাঙ্গা। একই ভুক্তির 2011 সালের শুমারিভিত্তিক ছকে লোগাং ইউনিয়নের (জিওকোড 57) আয়তন 19,840 একর, জনসংখ্যা পুরুষ 5,837 ও নারী 5,797। উপজেলার উল্লেখযোগ্য হাটবাজারের তালিকায় লোগাং বাজার আছে। এই জনসংখ্যা 2011 সালের; 1992 সালে গুচ্ছগ্রামে কতজন থাকতেন, সে হিসাব আলাদা এবং বিতর্কিত, নিচে দেখা যাবে।
গুচ্ছগ্রামটির আকার নিয়ে দুই হিসাব আছে। অ্যামনেস্টির মে 1992 সালের প্রতিবেদন বলছে, লোগাংয়ে প্রায় 600টি ঘর ছিল, প্রায় সমসংখ্যক পরিবার; গ্রাম থেকে মাত্র 250 গজ দূরে বাংলাদেশ রাইফেলসের (বিডিআর) একটি ক্যাম্প, আর পানছড়ির সেনাক্যাম্প প্রায় পাঁচ মাইল দূরে। জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র রামেন্দু শেখর দেওয়ান 1993 সালের বিশ্লেষণে লেখেন, আশপাশের গ্রাম থেকে প্রায় 1,500 জুম্ম পরিবারকে জোর করে এনে এই গুচ্ছগ্রামে রাখা হয়েছিল। জাতিসংঘে তাঁর 1992 সালের বক্তব্যেও “১৫০০ জুম্ম পরিবার” সংখ্যাটি আছে।
লোগাং এলাকায় আগেও সহিংসতা হয়েছে। আমাদের আর্কাইভে এডিসন চাকমার লেখা পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রদায়িকতার উৎসমুখ 1983 সালের জুন থেকে আগস্টের মধ্যে গোলাকপতিমাছড়া, মাইচ্ছাছড়া, তারাবনছড়ি, লোগাংসহ কয়েকটি গ্রামে হামলার কথা বলে, আর 29 এপ্রিল 1986 পানছড়িতে শান্তিবাহিনীর বিডিআর ক্যাম্প আক্রমণের পর লোগাংসহ বহু পাহাড়ি গ্রামে পাল্টা হামলার কথা। অন্য দিকের সহিংসতাও নথিতে আছে: বাংলাপিডিয়ার একই ভুক্তি বলছে, 1986 সালের জুনে পানছড়ির দমদম, কালানাল ও ছনটিলায় শান্তিবাহিনীর সদস্যরা 105 জনকে হত্যা করে।
লোগাং যে একসময় নতুন বসতির জায়গাও ছিল, তার একটি ব্যক্তিগত সাক্ষ্য আছে পঞ্চ চাকমার স্মৃতিকথা চোখের পানি বাঁধের পানি যখন একাকার-এ: কাপ্তাই বাঁধে ভিটা ডুবে যাওয়ার কয়েক বছর পর তাঁর শ্বশুরবাড়ির পরিবার নৌকায় করে লোগাংয়ে এসে জমি কিনে থিতু হয়।
ঘটনার সূত্রপাত নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়। সরকারি তদন্তের ভাষ্যে শান্তিবাহিনী দা দিয়ে পাঁচজন বাঙালিকে আক্রমণ করে, যাদের একজন, কবির হোসেন (কিছু সাক্ষীর বয়ানে কবির আহমেদ), গলার জখমে মারা যান। জুম্ম পক্ষের বিবরণে দুই বাঙালি গরু চরাতে যাওয়া এক জুম্ম নারীকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল, আর বাধা দিতে আসা এক জুম্ম পুরুষকে তারা হত্যা করে।
অ্যামনেস্টি মে 1992 সালের প্রতিবেদনে দুটিই লিখেছে, বিচার না করে: এক বাঙালি তরুণ মারা যান, “হয় শান্তিবাহিনীর আক্রমণে, নয়তো কয়েকজন আদিবাসী নারীর ওপর আক্রমণের চেষ্টার সময় আহত হয়ে”। এপ্রিল 1993 সালের প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি নামটিও দেয়: কবির হোসেন, যাঁকে শান্তিবাহিনী হত্যা করেছে বলে অভিযোগ, “অথবা অন্য বিবরণ অনুযায়ী, যে আদিবাসী নারীকে তিনি আক্রমণ করেছিলেন, তিনি”।
এরপর যা ঘটে, তার বর্ণনায় উৎসগুলো কাছাকাছি, কিন্তু কে অংশ নিয়েছিল সেখানে ফারাক। অ্যামনেস্টির 1992 সালের বিবরণ অনুযায়ী মৃত্যুটির দায় শান্তিবাহিনীর ওপর চাপানো হয়, আর বাঙালি বসতিস্থাপনকারীরা ভিলেজ ডিফেন্স পার্টি (ভিডিপি, সরকারি স্বীকৃতিপ্রাপ্ত বেসামরিক বাহিনী) ও আধাসামরিক আনসারদের সঙ্গে দুপুরের দিকে লোগাং আক্রমণ করে। তারা গ্রাম ঘিরে ফেলে, বাসিন্দাদের ঘরে ঢুকিয়ে আগুন দেয়, পালাতে চাওয়া মানুষদের গুলি করে। অ্যামনেস্টি লিখেছে, বিডিআর হত্যাকাণ্ড শুরুর অল্প পরে পৌঁছায় কিন্তু তা থামাতে কিছু করেনি; প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে বিডিআর সদস্যরা গ্রাম ঘিরে রেখে মানুষকে পালাতে এবং মৃত ও আহতদের কাছে যেতে বাধা দেয়।
রামেন্দু শেখর দেওয়ানের বিবরণে আক্রমণকারী “সামরিক বাহিনী ও বাঙালি বসতিস্থাপনকারীরা” একসঙ্গে, এবং আক্রমণ পূর্বপরিকল্পিত। জাতিসংঘে তাঁর বক্তব্যে (আর্কাইভের অনুবাদে) “বাংলাদেশ নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেটলাররা একযোগে” হত্যা করে। হিল ভয়েসের 2022 সালের প্রতিবেদন বিডিআর ও “মুসলিম বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের” কথা বলে। সাংবাদিক বিপ্লব রহমান, যিনি 1992 সালে ঢাকা থেকে যাওয়া দলের সঙ্গে খাগড়াছড়িতে ছিলেন, পরে সচলায়তনে লিখেছেন সেনাবাহিনী, ভিডিপি, আনসার ও সেটেলাররা একযোগে আক্রমণ করে।
সরকারি তদন্ত শেষ পর্যন্ত কাকে দায়ী করেছিল, সেটি আলাদা প্রশ্ন, নিচের একটি অংশে আছে। এখানে শুধু এটুকু: প্রথম ঘটনাটির (কবির হোসেনের মৃত্যু) কোনো ময়নাতদন্তের কথা প্রতিবেদনে নেই, অ্যামনেস্টি 1993 সালে তা আলাদা করে উল্লেখ করেছে।
ঘটনার পরের দুই সপ্তাহে তিন ধরনের বক্তব্য আসে: সেনা কর্তৃপক্ষ ও সরকারের, ঘটনাস্থলের কাছে থাকা ঢাকার একটি নাগরিক দলের, আর জুম্ম সংগঠনগুলোর। সংখ্যা ও দায় নিয়ে তিন পক্ষের কথা প্রথম দিন থেকেই আলাদা, এবং সেই পার্থক্যই পরে তদন্তের কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
ঢাকার দলটি কেন সেখানে ছিল, তা একাধিক উৎসে আছে: চাকমাদের বিজু উৎসবে যোগ দিতে মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, সাংবাদিক, অধ্যাপক, সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলসহ একদল মানুষ খাগড়াছড়ি গিয়েছিলেন। দলটিতে কতজন ছিলেন, সে সংখ্যা উৎসভেদে 21 থেকে 23। বিপ্লব রহমানের বিবরণে দলটি 11 এপ্রিল সকালে ঢাকা ছাড়ে এবং পথেই ঘটনার খবর পায়; সঙ্গী হিসেবে তিনি লেখক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ, ব্যারিস্টার লুৎফর রহমান শাজাহান ও ব্যারিস্টার সারা হোসেনের নাম দেন।
| তারিখ (1992) | কী ঘটেছিল | উৎস |
|---|---|---|
| 10 এপ্রিল, দুপুর | লোগাং গুচ্ছগ্রামে আক্রমণ ও অগ্নিসংযোগ | অ্যামনেস্টি, মে 1992 |
| 10 এপ্রিল, রাত | খাগড়াছড়ি সেনানিবাসের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার শরীফ আজিজ রাত 8টায় খবর পান বলে অভিযোগ, তিন ঘণ্টা পরে লোগাং পৌঁছান | অ্যামনেস্টি, মে 1992 |
| 11 এপ্রিল | ব্রিগেডিয়ার শরীফ আজিজ জাতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, 11টি মৃতদেহ পাওয়া গেছে: 10 জন আদিবাসী, 1 জন বাঙালি; কারণ “শান্তিবাহিনীর হামলা ও তার পরে শান্তিবাহিনী ও স্থানীয় বাঙালিদের সংঘর্ষ”। একই দিন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ানকে গ্রামের একটি সীমিত অংশে যেতে দেওয়া হয় | অ্যামনেস্টি, মে 1992 |
| 12 এপ্রিল | ঢাকার দলটিকে পানছড়ি বাজারের সেনা চেকপোস্টে আটকানো হয়; লোগাং যেতে দেওয়া হয়নি | বিপ্লব রহমান (সচলায়তন, 2007); রামেন্দু শেখর দেওয়ান (জাতিসংঘ, 1992) |
| 13 এপ্রিল | দলটি খাগড়াছড়িতে ব্রিগেডিয়ার শরীফ আজিজের সঙ্গে দেখা করে | অ্যামনেস্টি, মে 1992 |
| 14 এপ্রিল | পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সমিতি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জন সমিতি এক বিবৃতিতে আনসার ও ভিডিপি সদস্যসহ কয়েকজন অভিযুক্তের নাম দেয় | অ্যামনেস্টি, মে 1992 |
| 19 এপ্রিল | দলটির কয়েকজন সদস্যের যৌথ বিবৃতি | অ্যামনেস্টি, মে 1992 |
| 20 এপ্রিল | ঢাকায় ফিরে 21 জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নিন্দা ও বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি | এডিসন চাকমা, জুমজার্নাল আর্কাইভ |
| 22 এপ্রিল | প্যারিসে দাতাদেশগুলোর বৈঠকের সময় বিক্ষোভ; অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান অভিযোগকে “সম্পূর্ণ অসত্য” বলেন | অ্যামনেস্টি, মে 1992 |
| 25 এপ্রিল | স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরী লোগাং পরিদর্শন করে শান্তিবাহিনীকে দায়ী করেন | রামেন্দু শেখর দেওয়ান (জাতিসংঘ, 1992; বিশ্লেষণ, 1993) |
| 27 এপ্রিল | বিরোধীদলীয় নেত্রী শেখ হাসিনা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেন | এডিসন চাকমা, জুমজার্নাল আর্কাইভ |
ঢাকার দলের যৌথ বিবৃতির মূল বাক্যটি অ্যামনেস্টি উদ্ধৃত করেছে, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ বিবেচনা করে: “400-এর বেশি ঘর পুড়ে ছাই হয়েছে এবং 200-এর বেশি শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ নিহত হয়েছেন”। প্যারিসের বৈঠকে অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের বক্তব্যও অ্যামনেস্টি উদ্ধৃত করেছে: আগের বছরের দাতাসভাতেও পার্বত্য চট্টগ্রামে দমনপীড়নের একই রকম অভিযোগ উঠেছিল, আর এটি “আমার প্রতিনিধিদলকে বিব্রত করার জন্য সাজানো পরিস্থিতি”।
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার লোগাং সফরের তারিখ নিয়ে দুই উৎস দুই রকম। রামেন্দু শেখর দেওয়ানের 1993 সালের ইংরেজি বিশ্লেষণে তারিখটি 13 মে 1992, আর বিপ্লব রহমানের লেখায় প্রকাশিত একটি আলোকচিত্রের পরিচিতিতেও 13 মে 1992, খাগড়াছড়ি। জুমজার্নাল আর্কাইভে থাকা দেওয়ানের জাতিসংঘ বক্তব্যের বাংলা অনুবাদে তারিখটি 13 অক্টোবর 1992। দুই উৎসেই বলা হয়েছে, সফরে প্রধানমন্ত্রী শান্তিবাহিনীকে দায়ী করেন।
সরকার 1992 সালের মে মাসে এক-সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে, যার একমাত্র সদস্য ও চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান। কমিশনের সচিব ছিলেন খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আবদুল মতিন সরকার। প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল “Logang Disturbances Enquiry Commission – 1992″।
কমিশন গঠনের মাস অ্যামনেস্টির এপ্রিল 1993 সালের প্রতিবেদনে আছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের 1992 সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন বলছে, দেশি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার কারণে আংশিকভাবে সরকার একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে এক-সদস্যের কমিশন নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। রামেন্দু শেখর দেওয়ানের ব্যাখ্যা অন্যরকম: তাঁর মতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় আগের দুটি ঘটনা, কাউখালী (25 মার্চ 1980) ও লংগদু (4 মে 1989), নিয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় এবার তদন্ত ও তার প্রকাশ দুটিই দাবি করেছিল।
সুলতান হোসেন খান কে ছিলেন, তা অন্য সূত্রে জানা যায়। ইংরেজি উইকিপিডিয়া অনুযায়ী তিনি 17 ফেব্রুয়ারি থেকে 24 ডিসেম্বর 1990 পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন। বিডিনিউজ২৪-এর 5 জুলাই 2015 তারিখের খবর অনুযায়ী তিনি সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার, এবং 2004 সালে দুর্নীতি দমন ব্যুরো দুর্নীতি দমন কমিশনে রূপান্তরিত হলে তিনি তার চেয়ারম্যান হন; সেই খবরেই তাঁর মৃত্যুর সংবাদ। উইকিপিডিয়ায় দুদকে তাঁর মেয়াদ 23 ফেব্রুয়ারি 2004 থেকে 8 ফেব্রুয়ারি 2007।
তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে জুম্ম পক্ষ শুরু থেকেই প্রশ্ন তোলে। জাতিসংঘে রামেন্দু শেখর দেওয়ান বলেন, তিনি “তৎকালীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির পক্ষের লোক ও সরকারের সমর্থক”। 1993 সালের বিশ্লেষণে দেওয়ান যোগ করেন, কমিশনের চেয়ারম্যান ও সচিব দুজনেই অ-জুম্ম, তাই জুম্ম সাক্ষীরা তাঁদের বিশ্বাস করেননি। এগুলো একটি পক্ষের অভিযোগ; সরকারের তরফে এর জবাব কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
সাক্ষ্য নেওয়া হয় খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে। দেওয়ানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী সামরিক কর্তৃপক্ষ নিচতলায় থাকত আর কমিশন বসত ওপরতলায়; সাক্ষীদের বাছাই করে, ব্রিফ করে ওপরে পাঠানো হতো, আর জুম্ম সাক্ষীদের সঙ্গে বাঙালিদের পাঠানো হতো। অ্যামনেস্টি এ বিষয়ে আরও সংযত ভাষায় একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ নথিভুক্ত করেছে, পরের একটি অংশে আছে। প্রতিবেদনে সাক্ষীদের নম্বর দেওয়া ছিল; দেওয়ানের বিশ্লেষণে অন্তত 99 নম্বর সাক্ষী পর্যন্ত উল্লেখ আছে।
প্রকাশিত ইংরেজি সংক্ষেপ অনুযায়ী তদন্তের সিদ্ধান্ত ছিল: শান্তিবাহিনী কবির হোসেনকে হত্যা করে; তার প্রতিক্রিয়ায় আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে মিলে “ভয় ও আতঙ্ক” থেকে গুলি চালায়; 12 জন আদিবাসী গ্রামবাসী নিহত, 13 জন আহত, 2 জন নিখোঁজ, আর প্রায় 550টি ঘর পুড়ে যায়।
প্রতিবেদনের মূল পাঠ এখনো জনসমক্ষে নেই। যা জানা যায়, তা এসেছে দুটি উৎস থেকে যারা প্রকাশিত ইংরেজি ভাষ্য পড়ে উদ্ধৃতি দিয়েছে: অ্যামনেস্টির এপ্রিল 1993 সালের প্রতিবেদন এবং রামেন্দু শেখর দেওয়ানের মার্চ 1993 সালের বিশ্লেষণ, যেটি 25 পৃষ্ঠার স্বাক্ষরিত ভাষ্যের ওপর করা। দুটি থেকে প্রতিবেদনের যে অংশগুলো পুনর্গঠন করা যায়:
অ্যামনেস্টির উদ্ধৃতি অনুযায়ী প্রতিবেদনের 16 পৃষ্ঠায় লেখা ছিল, লোগাংয়ের ঘটনা “বিদ্রোহীদের পরিকল্পিত উদ্দেশ্যের ফল”; সশস্ত্র শান্তিবাহিনী এক বাঙালি ছেলেকে হত্যা ও আরও দুজনকে গুরুতর আহত করে, যাতে বাঙালি ও আদিবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং বাঙালিরা প্রতিশোধ নেয়। প্রতিবেদন হত্যাকাণ্ডটিকে “ব্যাকল্যাশ” বা পাল্টা প্রতিক্রিয়া বলেছে।
দায়ের অংশে প্রতিবেদন বলেছে, “কিছু আনসার ও ভিডিপি সদস্য ঘটনার জন্য দায়ী”, এবং তারা কবির হোসেনের হত্যাজনিত “ভয় ও আতঙ্ক” থেকে গুলি করেছিল। আনসার, ভিডিপি ও বিডিআর সদস্যদের দাবি ছিল, শান্তিবাহিনী গ্রামের অন্য পাশ থেকে আধা ঘণ্টা ধরে তাদের দিকে গুলি চালিয়েছিল; প্রতিবেদন এই দাবিকে বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে বাতিল করে। অর্থাৎ প্রতিবেদন অনুযায়ী মূল ঘটনার সময় শান্তিবাহিনী গ্রামে আক্রমণ করেনি।
অ্যামনেস্টি প্রতিবেদনের সাক্ষ্যাংশ থেকে একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করেছে: আহত কবির হোসেনকে বাঙালি গ্রামবাসীরা বিডিআর ক্যাম্পে আনে, সতর্কঘণ্টা বাজে, আনসার, ভিডিপি ও বিডিআর সদস্যরা ক্যাম্পে জড়ো হয় এবং তাদের অস্ত্র দেওয়া হয়; আনসার ও ভিডিপি সদস্যরা পায় .303 রাইফেল ও 20 রাউন্ড করে গুলি, বিডিআর সদস্যরা স্বয়ংক্রিয় বা আধা-স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র। তারা দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে, যেখানে আদিবাসীদের গুচ্ছগ্রাম, গুলি চালায়। ভিডিপি ও আনসার সদস্যরা বলেছে, এক বিডিআর কর্মকর্তার আদেশে তারা মোট 300–350 রাউন্ড গুলি ছোড়ে। দায়ের অংশে বিডিআরের সমালোচনা ছিল কেবল এটুকু: সত্যিই সশস্ত্র বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হচ্ছে কি না যাচাই না করে আনসার ও ভিডিপিকে অস্ত্র দেওয়া।
রামেন্দু শেখর দেওয়ানের বিশ্লেষণ বলছে, প্রতিবেদন দুজন নিম্নপদস্থ সদস্যকে, একজন হাবিলদার ও একজন সুবেদার, ঘটনার জন্য আলাদা করে চিহ্নিত করে এবং তাদের বিচার ও শাস্তির সুপারিশ করে।
দেওয়ানের উদ্ধৃতি অনুযায়ী প্রতিবেদনের 19 পৃষ্ঠায় 1,200 জন মৃত্যুর অভিযোগ বাতিল করা হয় এই যুক্তিতে যে এত মৃতদেহ সরানো, লুকানো বা নষ্ট করা সম্ভব নয়, কারণ সেগুলো যানবাহন ছাড়া সরানো যায় না, রাস্তার কাছে ফেলতে হয়, আর এমন কিছু গোপন রাখা যায় না। 18 পৃষ্ঠায় এক জুম্ম সাক্ষীর 150টি মৃতদেহ সরিয়ে নিতে দেখার সাক্ষ্য নিয়ে প্রতিবেদনের মন্তব্য ছিল, পরদিন আঞ্চলিক কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার শরীফ আজিজ ঘটনাস্থলে এলে ওই ব্যক্তি 11 জন চাকমার মৃতদেহ নিজস্ব সৎকারের জন্য চেয়েছিলেন, 150 জনের মৃত্যুর কথা ব্রিগেডিয়ারকে বলেননি।
অ্যামনেস্টি লিখেছে, ব্রিগেডিয়ার শরীফ আজিজ ঘটনার পরে ঢাকার দলের আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের কাছে 138 জন মৃতের সংখ্যা স্বীকার করেছিলেন, এই সাক্ষ্য প্রতিবেদন কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই বাদ দিয়েছে; প্রতিবেদন শুধু বলে, ব্রিগেডিয়ার কমিশনকে জানিয়েছেন আদিবাসী ও বাঙালি মিলিয়ে মোট মৃত 13।
অ্যামনেস্টি ও দেওয়ান দুজনেই প্রতিবেদনের সুপারিশের একই অংশগুলো উদ্ধৃত করেছেন। প্রথমত, শান্তিবাহিনীর বিদ্রোহ কার্যকরভাবে দমন, যাকে প্রতিবেদন দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা ও শত্রুতা টিকিয়ে রাখার “প্রধান কারণ” বলেছে; প্রতিবেদন 1980–1991 সালে শান্তিবাহিনীর হাতে মৃত্যু, আহত ও অপহরণের একটি তালিকাও দেয়। দ্বিতীয়ত, বিদ্রোহের তীব্রতা কমানোর জন্য সেনাবাহিনীর প্রশংসা, এবং এই মন্তব্য (প্রতিবেদনের 23 পৃষ্ঠা) যে কমিশনের নজরে “একটিও বিচারবহির্ভূত হত্যা বা বিচারবহির্ভূত আটকের ঘটনা” আনা হয়নি। তৃতীয়ত, আদিবাসী ও বাঙালি গুচ্ছগ্রামগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে দেওয়া, আর বাঙালি গ্রামবাসীদের নিজস্ব গ্রামরক্ষা বাহিনী গড়ে তাদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া (24 পৃষ্ঠা)।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর প্রতিবেদনের আরেকটি দিক উল্লেখ করেছে: কমিশন সামরিক বাহিনীর সমালোচনা করেছিল বিদ্রোহ দমনের বাইরে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা ও বিচারের মতো ক্ষেত্রে ঢুকে পড়ার জন্য, যা বেসামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে থাকা উচিত। একই প্রতিবেদনের সারাংশে লেখা আছে, সরকারের নিজের কমিশন লোগাং ঘটনায় অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর সমালোচনা করেছে।
বিচারপতি সুলতান হোসেন খান 20 আগস্ট 1992 বাংলায় প্রতিবেদন জমা দেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মতিন চৌধুরীর কাছে। সরকার 7 অক্টোবর একটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি দেয় এবং পরদিন, 8 অক্টোবর 1992, প্রতিবেদনের 20 পৃষ্ঠার একটি ইংরেজি ভাষ্য প্রকাশ করে, যাতে বিচারপতির স্বাক্ষর ছিল না। পরে 25 পৃষ্ঠার আরেকটি ইংরেজি ভাষ্য আসে, এবার স্বাক্ষরসহ। বাংলা মূল প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি।
এই ক্রম রামেন্দু শেখর দেওয়ানের 1993 সালের বিশ্লেষণ থেকে। অ্যামনেস্টি এপ্রিল 1993 সালে লিখেছে, “একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন” 8 অক্টোবর 1992 জনসমক্ষে আনা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরও লিখেছে, প্রতিবেদনটি অক্টোবরে প্রকাশিত হয়। হিল ভয়েস 2022 সালে, ঘটনার ত্রিশ বছর পরে, লিখেছে সরকার কমিটির পূর্ণ প্রতিবেদন কখনো জনসমক্ষে আনেনি।
একটি বিষয় এখানে আলাদা করে রাখা দরকার। জমা ও প্রকাশের মধ্যে প্রায় সাত সপ্তাহের ব্যবধান, এবং জমা দেওয়া প্রতিবেদন আর প্রকাশিত ভাষ্য একই দৈর্ঘ্যের ছিল কি না তা জানা যায় না, কারণ মূলটি কেউ প্রকাশ্যে মেলাতে পারেননি। অ্যামনেস্টি প্রকাশিত ভাষ্যটিকে “সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন” ও “সারসংক্ষেপ প্রতিবেদন” বলেছে, এবং 1993 সালে আবারও সরকারকে “বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ” প্রতিবেদন প্রকাশের অনুরোধ জানিয়েছে। দেওয়ান অভিযোগ করেছেন, প্রকাশের আগে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পর্শকাতর অংশ বাদ দিয়েছিল; এই অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে কোনো নথি পাওয়া যায়নি।
উইকিপিডিয়ার ইংরেজি ও বাংলা নিবন্ধে লেখা আছে, প্রতিবেদন জমা পড়েছিল ঘটনার “ছয় মাস পরে”। 10 এপ্রিল থেকে 20 আগস্টের ব্যবধান চার মাসের কিছু বেশি; ছয় মাস পূর্ণ হয় অক্টোবরে, যখন ইংরেজি ভাষ্য প্রকাশিত হয়।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মূল আপত্তি এপ্রিল 1993 সালের “Bangladesh: Human rights concerns” প্রতিবেদনে (নথি নম্বর ASA 13/01/93)। সংস্থাটি কমিশন দ্রুত গঠনকে স্বাগত জানায়, কিন্তু বলে প্রকাশিত সংক্ষেপ লোগাংয়ের হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না, সাক্ষ্যে “অনেক স্ববিরোধ”, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা বাদ, বিডিআরের ভূমিকা অস্পষ্ট, আর তদন্ত চালানোর পদ্ধতি নিয়ে সে “গুরুতরভাবে উদ্বিগ্ন”।
বাংলা উইকিপিডিয়ার লোগাং নিবন্ধ অ্যামনেস্টির অভিযোগকে সংক্ষেপে বলেছে, প্রতিবেদনটি “পরস্পরবিরোধী ও অমীমাংসিত তথ্য” সম্বলিত। অ্যামনেস্টির নিজের নথির ভাষা আরও নির্দিষ্ট। নিচে প্রতিটি আপত্তি আলাদা করে, নথির ক্রম ধরে।
ঘটনার কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, মে 1992 সালের প্রতিবেদন “Bangladesh: Reprisal killings in Logong, Chittagong Hill Tracts, in April 1992” (ASA 13/04/92)-এ অ্যামনেস্টি সরকারের কাছে একটি “পূর্ণ, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ” তদন্ত দাবি করে, যার কাজের পদ্ধতি জাতিসংঘের বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রতিরোধ ও তদন্তের নীতিমালা মেনে চলবে। দাবির মধ্যে ছিল: নিরাপত্তা বাহিনী, আনসার ও ভিডিপি বেআইনি ও অপ্রয়োজনীয় প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ করেছিল কি না তা নির্ধারণ; বিডিআর কেন প্রতিরোধে কিছু করেনি তা তদন্ত; কার্যপরিধি ও ফলাফল দ্রুত প্রকাশ; এবং দায়ী নিরাপত্তা সদস্যদের বিচার। প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি স্পষ্ট লেখে, শত শত মৃত্যুর খবর ধারাবাহিকভাবে আসছে, কিন্তু সংস্থা নিজে সংখ্যাগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
অ্যামনেস্টি জানায়, জুলাই 1992 সালে সরকারকে লেখা এক চিঠিতে সে উদ্বেগ জানিয়েছিল যে কমিশনের সামনে সাক্ষ্য দিতে চাওয়া কিছু মানুষকে খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসের বাইরে মোতায়েন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হয়রানি করেছে, যার ফলে কয়েকজন সম্ভাব্য সাক্ষী সাক্ষ্য দিতে নিরুৎসাহিত হন। অ্যামনেস্টি নিশ্চয়তা চেয়েছিল যে যে কেউ সাক্ষ্য দিতে পারবেন এবং সাক্ষীরা সুরক্ষা পাবেন। অ্যামনেস্টির ভাষায়, সরকার এই উদ্বেগের কোনো জবাব দেয়নি।
অ্যামনেস্টি বারবার চিঠি লিখে কমিশনের কার্যপরিধি (terms of reference) জানতে চেয়েছিল। এপ্রিল 1993 পর্যন্ত তা জানানো হয়নি, তাই অ্যামনেস্টি লেখে, কমিশনের পদ্ধতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তদন্ত-মান পূরণ করেছিল কি না তা মূল্যায়ন করার অবস্থায় সে নেই।
অ্যামনেস্টি প্রকাশিত সংক্ষেপ থেকেই কয়েকটি স্ববিরোধ দেখায়। কিছু সাক্ষী বলেছেন শুধু বাঙালি বসতিস্থাপনকারী, ভিডিপি ও আনসার গুলি চালিয়েছে, অন্যরা বলেছেন বিডিআরও গুলিতে অংশ নিয়েছে। কিছু বিবরণে ঘরে আগুন দিয়েছে শান্তিবাহিনী, অন্য বিবরণে বাঙালিরা ভিডিপি ও আনসারের সঙ্গে মিলে। আনসার ও ভিডিপি বলেছে শান্তিবাহিনী আধা ঘণ্টা গুলি চালিয়েছে, অন্যরা বলেছেন শান্তিবাহিনী সেখানে ছিলই না। প্রতিবেদন কেন কিছু সাক্ষীকে “সত্যের সাক্ষী” বলেছে আর অন্যদের কম নির্ভরযোগ্য ধরেছে, তার কোনো ব্যাখ্যা নেই।
অ্যামনেস্টির মতে কবির হোসেনের সঙ্গে আহত বাঙালি ছেলেরা এবং যে আদিবাসী নারীকে তারা আক্রমণ করেছিল বলে অভিযোগ, তাঁদের কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে মনে হয় না। নিহতদের দেহ পরীক্ষা করা চিকিৎসা কর্মকর্তার সাক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, কিন্তু মৃত্যুর কারণ কোন ধরনের জখম, তা প্রতিবেদনে নেই। কবির হোসেনের মৃত্যুর জন্য শান্তিবাহিনীকে দায়ী করা হয়েছে, অথচ তাঁর ময়নাতদন্তের উল্লেখ নেই; কিছু বিবরণে তিনি দায়ের আঘাতে মারা যান, অন্য বিবরণে গুলিতে।
প্রতিবেদন পুরো ঘটনাকে শান্তিবাহিনীর “পরিকল্পিত উদ্দেশ্যের” ফল বললেও, অ্যামনেস্টি লিখেছে, যে প্রাথমিক ঘটনা থেকে প্রতিশোধ শুরু, সেটি বিস্তারিত তদন্ত করা হয়েছে বলে মনে হয় না। কমিশন বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের ভাষ্য গ্রহণ করেছে, আদিবাসীদের ভাষ্য বিবেচনা না করে। আবার একই সাক্ষীদের (ভিডিপি, আনসার, বিডিআর) কথা এক জায়গায় নির্ভরযোগ্য ধরা হয়েছে, অন্য জায়গায় বাতিল করা হয়েছে, কেন তা স্পষ্ট নয়।
অ্যামনেস্টির যুক্তি: প্রতিবেদন যেহেতু গুলিতে বিডিআরের অংশগ্রহণ অস্বীকার করেনি, তাই ধরে নিতে হয় বিডিআর আদিবাসী বেসামরিক মানুষদের ওপর গুলিতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিল। অথচ দায়ের অংশে বিডিআরের সমালোচনা কেবল অস্ত্র বিতরণের জন্য। অ্যামনেস্টি বিডিআরের ভূমিকা স্পষ্ট করার দাবি জানায়।
কমিশনের মন্তব্য যে তার নজরে একটিও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা আনা হয়নি, তার জবাবে অ্যামনেস্টি লেখে, সে নিজে ও অন্যান্য দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠন বছরের পর বছর পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ বহু মানবাধিকার লঙ্ঘন নথিভুক্ত করে সরকারকে দিয়েছে।
পুনরাবৃত্তি ঠেকানোর সুপারিশে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ নিয়ে কোনো নির্দেশিকার কথা নেই। আর বাঙালি গ্রামবাসীদের অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার সুপারিশ নিয়ে অ্যামনেস্টি লেখে, এখন ভিডিপি নিরস্ত্র এবং প্রয়োজন হলে সেনা বা বিডিআরের কাছ থেকে অস্ত্র পায়; এপ্রিল 1992-এর মতো ঘটনার পর এই সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে বেআইনি প্রাণঘাতী অস্ত্রব্যবহার আরও বাড়তে পারে।
শেষে অ্যামনেস্টি তিনটি দাবি পুনরাবৃত্তি করে: লোগাংয়ের ঘটনা নিয়ে বিস্তারিত ও পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ, কমিশনের কার্যপরিধি জানানো, এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আনা নির্দিষ্ট অভিযোগ ও মামলার বর্তমান অবস্থা জানানো। একই মাসে, আন্তর্জাতিক শ্রম সম্মেলনের জন্য তৈরি আরেকটি নথিতে (IOR 42/01/93) অ্যামনেস্টি একই দাবিগুলো আবার লেখে, এবং বলে সে 10 এপ্রিল 1992 লোগাংয়ে “100-এর বেশি” আদিবাসী মানুষের হত্যা নিয়ে সরকারের কাছে উদ্বেগ জানিয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র রামেন্দু শেখর দেওয়ান লোগাং নিয়ে দুটি নথি রেখে গেছেন। প্রথমটি 1992 সালে জেনেভায় জাতিসংঘের আদিবাসী জনগোষ্ঠী বিষয়ক কার্যদলে দেওয়া বক্তব্য, যার বাংলা অনুবাদ জুমজার্নাল আর্কাইভে আছে। দ্বিতীয়টি 21 মার্চ 1993 তারিখের ইংরেজি বিশ্লেষণ, যা 25 পৃষ্ঠার স্বাক্ষরিত প্রতিবেদন ধরে ধরে খণ্ডন করে। দুটিতেই তাঁর সিদ্ধান্ত: প্রতিবেদন “অসত্য” এবং এটি হত্যাকাণ্ড ঢাকার চেষ্টা।
আর্কাইভের অনুবাদ জাতিসংঘে লোগাং গণহত্যা নিয়ে রামেন্দু শেখর দেওয়ানের প্রতিবাদ-এ শিরোনামে স্থান লেখা জেনেভা, তারিখ “২৭-৩১, ১৯৯২” (মাসের নাম অনুবাদে নেই)। বক্তব্যে তিনি বলেন, জুলাই–ডিসেম্বর 1991 ও জানুয়ারি–জুন 1992 সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী সেটেলারদের সঙ্গে মিলে যথাক্রমে 663 ও 656টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটায়। লোগাং প্রসঙ্গে তাঁর দাবিগুলো: প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে 800 ঘর ও প্রায় 1,200 জন নিহত; সরকার আন্তর্জাতিক মহলে বলছে মাত্র 11 জন; লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশন পুরো ঘটনা “ভিত্তিহীন” বলেছে; তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া বিচারপতি সরকারের সমর্থক।
বক্তব্যের শেষে তিনি আন্তর্জাতিক মহলকে লোগাং, লংগদু, মাল্যে, দীঘিনালা, বাঘাইছড়ি, মাটিরাঙা, কাউখালী ও পানছড়ির ঘটনা তদন্তে একটি কমিটি পাঠানোর আহ্বান জানান। তিনি মনে করিয়ে দেন, 1980 সালের কাউখালী ও 1989 সালের লংগদু তদন্তের প্রতিবেদনও “আলোর মুখ দেখেনি”।
দেওয়ানের লিখিত বিশ্লেষণটি “An Analysis of the Bangladesh Government Report on the Logang Massacre of 10 April, 1992” নামে Center for World Indigenous Studies-এর আর্কাইভে আছে। এর প্রধান যুক্তিগুলো:
এই বিশ্লেষণ একটি রাজনৈতিক সংগঠনের মুখপাত্রের লেখা, এবং তার ভাষা প্রায়ই অভিযোগমূলক। তবে কিছু তথ্যে এটি অ্যামনেস্টির স্বাধীন নথির সঙ্গে মেলে: ব্রিগেডিয়ারের 138 মৃত স্বীকার করা ও পরে অস্বীকার, প্রথম ঘটনার আহতদের জিজ্ঞাসাবাদ না হওয়া, সাক্ষীদের ওপর চাপ, ভিডিপিকে অস্ত্র দেওয়ার সুপারিশ, এবং “একটিও বিচারবহির্ভূত হত্যা নেই” মন্তব্য।
লোগাংয়ে নিহতের সংখ্যা উৎসভেদে 11 থেকে প্রায় 1,200। সরকারি ও সামরিক বক্তব্যে 11 থেকে 13, সরকারি তদন্তে 12 জন আদিবাসী। অ্যামনেস্টি 1993 সালে “100-এর বেশি”, ঢাকার নাগরিক দল “200-এর বেশি”, পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের উদ্ধৃত হিসাবে প্রায় 300, আর জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে প্রায় 1,200 বলেছেন। কোনো স্বাধীন গণনা হয়নি।
| উৎস ও সময় | নিহত | অন্যান্য |
|---|---|---|
| ব্রিগেডিয়ার শরীফ আজিজ, সংবাদমাধ্যমে, 11 এপ্রিল 1992 (অ্যামনেস্টির উদ্ধৃতি) | 11 মৃতদেহ: 10 আদিবাসী, 1 বাঙালি | — |
| বিবিসি রেডিও, খাগড়াছড়ি সংবাদদাতার বরাতে, 11 এপ্রিল 1992 (বিপ্লব রহমানের স্মৃতি) | 13: 10 পাহাড়ি, 3 বাঙালি | শান্তিবাহিনীর আক্রমণ বলে প্রচার |
| “সরকারি বক্তব্য” (অ্যামনেস্টি, মে 1992) | 13 | 14 নিখোঁজ |
| প্রতিরক্ষা সূত্র, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার কাছে (অ্যামনেস্টি, মে 1992) | 12 আদিবাসী | 16 আহত |
| মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান [যাচাই প্রয়োজন: বাংলা বানান], 24 পদাতিক ডিভিশন, রয়টার্সকে (অ্যামনেস্টি, মে 1992) | 13 | 34 আহত |
| সরকারি তদন্ত কমিশন, প্রকাশ অক্টোবর 1992 (অ্যামনেস্টি, 1993; দেওয়ান, 1993) | 12 আদিবাসী | 13 আহত, 2 নিখোঁজ, প্রায় 550 ঘর পোড়া |
| যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, 1992 সালের প্রতিবেদন, তদন্ত কমিশনের বরাতে | 13 আদিবাসী | 13 আহত, 550 কুঁড়েঘর |
| এক বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি, স্ত্রীর মৃতদেহ নিতে এসে, 11 এপ্রিল (অ্যামনেস্টি, মে 1992) | 39 মৃতদেহ দেখেছেন | একটি অংশের গণনা |
| জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ান, গ্রামের সীমিত অংশে, 11 এপ্রিল (অ্যামনেস্টি, মে 1992) | 138 মৃতদেহ | হিল ভয়েস 2022-এ সংখ্যাটি 139 |
| এক জুম্ম প্রত্যক্ষদর্শী, কমিশনের সামনে (দেওয়ান, 1993) | 150টি মৃতদেহ সরিয়ে নিতে দেখেছেন | — |
| স্থানীয় এক বাঙালি চিকিৎসক (অ্যামনেস্টি, মে 1992) | 300 মৃতদেহ গুনে থেমে যান | — |
| ঢাকার নাগরিক দলের যৌথ বিবৃতি, 19 এপ্রিল 1992 (অ্যামনেস্টি) | 200-এর বেশি | 400-এর বেশি ঘর |
| সাপ্তাহিক প্রিয় প্রজন্ম, 1992 (বিপ্লব রহমানের বিবরণ) | অন্তত 200 | অন্তত 10 জন প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান |
| অ্যামনেস্টি, মে 1992 | “কয়েকশ” বলে খবর; যাচাই করা যায়নি | প্রায় 600 ঘরের গ্রাম |
| অ্যামনেস্টি, এপ্রিল 1993 ও ফেব্রুয়ারি 2000 | 100-এর বেশি বলে খবর | — |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন, “Life is not ours” এপ্রিল 1994 হালনাগাদ (শরদিন্দু শেখর চাকমার বইয়ে উদ্ধৃত) | প্রায় 300 | 700 ঘর পোড়া |
| এডিসন চাকমা, জুমজার্নাল আর্কাইভ | প্রায় 400 | প্রায় 800 ঘর; প্রায় 2,000 জন ভারতে শরণার্থী |
| ইংরেজি ও বাংলা উইকিপিডিয়া | 400-এর বেশি বলে অনুমান | 545-এর বেশি ঘর; 2,000-এর বেশি ত্রিপুরায় |
| হিল ভয়েস, 2022, গ্রামবাসীদের বরাতে | 200-এর বেশি | 500-এর বেশি ঘর |
| পিসিপি, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের খাগড়াছড়ি নেতাদের বিবৃতি, 2010 (ডেইলি স্টার) | 1,000-এর বেশি | — |
| রামেন্দু শেখর দেওয়ান, জাতিসংঘ 1992 ও বিশ্লেষণ 1993, প্রত্যক্ষদর্শী, বেঁচে যাওয়া ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সূত্রে | প্রায় 1,200 | প্রায় 800 ঘর |
ছকের দুটি বিষয় আলাদা করে লক্ষ করার মতো। প্রথমত, পোড়া ঘরের সংখ্যায় সরকারি তদন্ত (প্রায় 550) আর জুম্ম ও নাগরিক উৎসগুলোর (400 থেকে 800) পার্থক্য নিহতের সংখ্যার পার্থক্যের তুলনায় অনেক কম। দ্বিতীয়ত, 138 সংখ্যাটির উৎস একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির নিজের গণনা, এবং অ্যামনেস্টির বিবরণ অনুযায়ী ব্রিগেডিয়ার শরীফ আজিজ 13 এপ্রিল ঢাকার দলের কাছে সেটি সঠিক বলে স্বীকার করেছিলেন; কমিশনের কাছে তিনি মোট মৃত 13 বলেন।
শরদিন্দু শেখর চাকমার বই Ethnic Cleansing in Chittagong Hill Tracts (2006, জুমজার্নাল ই-বুক লাইব্রেরিতে আছে) পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের 1994 সালের হালনাগাদ উদ্ধৃত করে লেখে, ঘটনাস্থলে যেতে চাওয়া একটি মানবাধিকার দলকে সেনাবাহিনী যেতে দেয়নি এবং খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানকেও না; বইয়ের উপসংহারে লেখক নিজে আবার 300 সংখ্যাটি দিয়ে বলেন, অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতির তদন্ত হয়েছিল কিন্তু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল: জানুয়ারি 1993 সালে সরকার অ্যামনেস্টিকে জানায় যে আইনি ও শৃঙ্খলামূলক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, আর জুলাই 1993 সালে বলে আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যসহ আটজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে। মামলাগুলোর পরিণতি, কারও সাজা হয়েছিল কি না, তা কোনো উৎসে পাওয়া যায়নি।
অ্যামনেস্টির এপ্রিল 1993 সালের প্রতিবেদন সরকারের জানুয়ারি 1993 সালের চিঠি উদ্ধৃত করেছে: তদন্ত “এই মর্মান্তিক ঘটনার জন্য দায়ী স্থানীয় বেসামরিক ও আধাসামরিক কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের শনাক্ত করতে সাহায্য করেছে”, সরকার অপরাধীদের বিরুদ্ধে “আইনি ও শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা” নিয়েছে, এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা ঠেকাতে এসব স্থানীয় বাহিনীর ওপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তদারকি জোরদারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। একই প্রতিবেদন বলছে, যারা আপাতদৃষ্টিতে দায়ী তাদের কয়েকজন হেফাজতে আছে এবং মামলা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
অ্যামনেস্টির ফেব্রুয়ারি 2000 সালের সংকলন “Bangladesh: Human rights in the Chittagong Hill Tracts” (ASA 13/001/2000) 1993 সালের ঘটনাপঞ্জিতে লিখেছে: জুলাই 1993-এ সরকার জানায়, লোগাংয়ের হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগে আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যসহ আটজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা শুরু হয়েছে; আর এক সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী ঘটনায় জড়িত বিডিআরের এক সদস্যকে “উত্তেজিত অ-আদিবাসীদের সামলাতে ব্যর্থতার” জন্য বরখাস্ত করা হয়। একই সংকলনের 1992 সালের অংশে আছে, 1992 শেষ হওয়া পর্যন্ত কারও বিচার হয়েছিল কি না জানা যায়নি।
উৎসগুলোর বিবরণে এখানেও অমিল আছে। ইংরেজি উইকিপিডিয়া পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের বরাতে লিখেছে, আটজন সেনা কর্মকর্তা পদ হারিয়েছিলেন; অ্যামনেস্টির নথিতে আটজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও একজন বিডিআর সদস্যের বরখাস্তের কথা আছে, সেনা কর্মকর্তাদের পদ হারানোর কথা নেই। শরদিন্দু শেখর চাকমার বইয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের উদ্ধৃতি অনুযায়ী কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হলেও কোনো বেসামরিক বা সামরিক ব্যক্তিকে আদালতে বিচার করে শাস্তি দেওয়া হয়নি।
পরের দশকগুলোর বক্তব্য একই দিকে। 2010 সালে ঘটনার 18তম বার্ষিকীতে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম ও হিল উইমেন্স ফেডারেশনের খাগড়াছড়ি জেলা নেতারা এক বিবৃতিতে বলেন, 18 বছরেও কোনো সরকার দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়নি, এবং লোগাংসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সব হত্যাকাণ্ড নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান (ডেইলি স্টার, 10 এপ্রিল 2010)। 2022 সালে হিল ভয়েস লেখে, কোনো বিচার হয়নি, দোষীদের শাস্তি হয়নি, ক্ষতিগ্রস্তরা কোনো ক্ষতিপূরণ পাননি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের 1992 সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন কমিশনের ঘটনাবিবরণকে “বিশ্বাসযোগ্য” বলেছে, কিন্তু যোগ করেছে, হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। অ্যামনেস্টি প্রতিবেদনটিকে অসম্পূর্ণ বলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন ও আন্তর্জাতিক আদিবাসী সংগঠনগুলো সরকারি সংখ্যা গ্রহণ করেনি।
পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রতিবেদনের সংশ্লিষ্ট অংশ: মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা দাবি করেছেন কমিশনের প্রতিবেদন আদিবাসী হতাহতের সংখ্যা কম দেখিয়েছে, এবং তাঁরা বলে চলেছেন হামলায় “কয়েক ডজন থেকে কয়েকশ” মানুষ মারা গেছেন। প্রতিবেদন আরও বলে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সরকারি ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা, দুর্গম পথ ও বিদ্রোহের কারণে নিরাপত্তাহীনতায় নৃশংসতার অভিযোগ যাচাই করা কঠিন; এবং লোগাং নিজেও একটি গুচ্ছগ্রাম ছিল, যে গুচ্ছগ্রাম-নীতির সমালোচনা পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন মে 1991 সালের প্রতিবেদনে করেছিল।
রামেন্দু শেখর দেওয়ানের 1993 সালের বিশ্লেষণ জানায়, অ্যান্টি-স্লেভারি ইন্টারন্যাশনাল, সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল, ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্ক গ্রুপ ফর ইনডিজেনাস অ্যাফেয়ার্স (IWGIA) ও অর্গানাইজিং কমিটি চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস ক্যাম্পেইনসহ কয়েকটি সংগঠন অন্তত 1,200 জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছিল। সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল লন্ডনের বাংলাদেশ হাইকমিশনের কাছে মন্তব্য চাইলে হাইকমিশন হত্যাকাণ্ড ও পুরো ঘটনাই অস্বীকার করে, এই তথ্য দেওয়ানের দুই নথিতেই আছে। এসব সংগঠনের নিজস্ব 1992 সালের নথি অনলাইনে পাওয়া যায়নি, তাই তাদের অবস্থান এখানে কেবল দেওয়ানের বরাতে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের (ইউরোপ, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার যৌথ উদ্যোগ) নিজস্ব অবস্থান সম্পর্কে ইংরেজি উইকিপিডিয়া কমিশনের প্রকাশনা উদ্ধৃত করে লেখে: মৃতের সংখ্যা যা-ই হোক, নিরাপত্তা বাহিনী ও বসতিস্থাপনকারীরা যে জুম্মদের হত্যা ও ঘর পোড়ানোয় জড়িত ছিল, তা নিশ্চিত। কমিশনের এপ্রিল 1994 সালের হালনাগাদের মূল পাঠ অনলাইনে পাওয়া যায়নি; এর একটি অংশ শরদিন্দু শেখর চাকমার বইয়ে উদ্ধৃত।
হত্যাকাণ্ডের পর লোগাং ও আশপাশের বহু মানুষ ভারতের ত্রিপুরায় পালিয়ে যান; উৎসভেদে সংখ্যাটি প্রায় 2,000 বা তার বেশি। সে বছর পাহাড়িরা বিজু উৎসব বর্জন করেন। পরে ঘটনার বার্ষিকীতে প্রতি বছর 10 এপ্রিল স্মরণ ও বিচারের দাবি জানানো হয়।
রামেন্দু শেখর দেওয়ান জাতিসংঘে বলেছিলেন, এই গণহত্যা ত্রিপুরায় “আরেকটি জুম্ম শরণার্থীর ঢল” পাঠায়। এডিসন চাকমার লেখায় আশপাশের গ্রাম থেকে প্রায় 2,000 পাহাড়ি ভারতে শরণার্থী হন; উইকিপিডিয়ায় সংখ্যাটি 2,000-এর বেশি, এবং সেখানে লেখা আছে কিছু মানুষ জানুয়ারি 1997 পর্যন্ত গ্রামে ফিরতে পারেননি। শরণার্থীদের পরবর্তী প্রত্যাবাসন নিয়ে অ্যামনেস্টির 2000 সালের সংকলনে আছে, 1993 সালের মে মাসে ত্রিপুরার শিবির থেকে 50,000-এর বেশি শরণার্থী ফেরানোর চুক্তি হয়েছিল, কিন্তু নিরাপত্তার নিশ্চয়তা না থাকায় শরণার্থীরা তখন ফিরতে রাজি হননি; প্রত্যাবাসন শুরু হয় ফেব্রুয়ারি 1994-এ। এই সংখ্যাগুলো পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামের শরণার্থীদের, কেবল লোগাংয়ের নয়।
বিজু বর্জনের কথা দুটি আলাদা উৎসে আছে: বিপ্লব রহমান লিখেছেন, “লোগাঙের শোকে পাহাড়িরা বিঝু বর্জন করেন সেবার”, আর 2010 সালে সামহোয়্যারইন ব্লগে অডং চাকমা লিখেছেন, শোকে সে বছর আদিবাসীরা বৈসাবি উৎসব বর্জন করেছিলেন। দুজন উৎসবটির নাম দুভাবে লিখেছেন: বিপ্লব রহমান একে চাকমাদের সবচেয়ে বড় উৎসব বিঝু বলেছেন, আর অডং চাকমার লেখায় বৈসাবি নামটি এসেছে বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু তিনটি নাম মিলিয়ে।
লোগাং ইউনিয়ন পরে আরেকটি কারণে ইতিহাসে আসে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি অনুযায়ী শান্তিবাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা 5 মার্চ 1998 লোগাং ইউনিয়নের দুদুকছড়ায় অস্ত্রসমর্পণ করেন, এবং সেখানেই শান্তিবাহিনী বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্য ঘটনাগুলোর পাশে লোগাংকে দেখতে চাইলে আমাদের আর্কাইভে কয়েকটি লেখা আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি সমস্যার চিত্র লোগাং, রাম্বাদেবা, লংগদু ও কাউখালীর হত্যাকাণ্ডকে ভূমিবিরোধের সঙ্গে যুক্ত করে দেখে। পুরো অঞ্চলের ইতিহাস, জনগোষ্ঠী ও প্রশাসন নিয়ে লেখাগুলো একসঙ্গে পাওয়া যাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাতায়।
10 এপ্রিল 1992, খাগড়াছড়ি জেলার পানছড়ি উপজেলার লোগাং ইউনিয়নের একটি গুচ্ছগ্রামে, ভারতের ত্রিপুরা সীমান্তের কাছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মে 1992 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী গ্রামটিতে প্রায় 600টি ঘর ছিল, 1989–1990 সালে দূরের পাড়া থেকে পাহাড়িদের এনে সেখানে বসানো হয়েছিল, আর 250 গজ দূরে একটি বিডিআর ক্যাম্প ছিল।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি সুলতান হোসেন খান, এক-সদস্যের তদন্ত কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে। কমিশন গঠিত হয় মে 1992-এ, সচিব ছিলেন খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আবদুল মতিন সরকার। সুলতান হোসেন খান 1990 সালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ছিলেন এবং 2004 সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রথম চেয়ারম্যান হন; তিনি 2015 সালে মারা যান।
অক্টোবর 1992-এ প্রকাশিত ইংরেজি ভাষ্য অনুযায়ী 12 জন আদিবাসী নিহত, 13 জন আহত ও 2 জন নিখোঁজ, আর প্রায় 550টি ঘর পুড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর একই প্রতিবেদনের বরাতে 13 জন নিহত লিখেছে। অন্য উৎসগুলোর হিসাব 100-এর বেশি থেকে প্রায় 1,200 পর্যন্ত।
প্রতিবেদন বলেছে, কিছু আনসার ও ভিডিপি সদস্য বাঙালি বসতিস্থাপনকারীদের সঙ্গে মিলে “ভয় ও আতঙ্ক” থেকে গুলি চালিয়েছিল, আর পুরো ঘটনার মূলে ছিল শান্তিবাহিনীর হাতে কবির হোসেন নামে এক বাঙালি কিশোরের মৃত্যু। বিডিআরের সমালোচনা ছিল কেবল যাচাই ছাড়া অস্ত্র বিতরণের জন্য। শান্তিবাহিনী গ্রামে গুলি চালিয়েছিল, এই দাবি প্রতিবেদন বাতিল করে।
পুরোটা নয়। বাংলায় লেখা মূল প্রতিবেদন 20 আগস্ট 1992 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে জমা পড়ে, কিন্তু প্রকাশিত হয়নি। সরকার 8 অক্টোবর 1992 একটি 20 পৃষ্ঠার স্বাক্ষরহীন ইংরেজি ভাষ্য এবং পরে 25 পৃষ্ঠার স্বাক্ষরিত ইংরেজি ভাষ্য প্রকাশ করে। অ্যামনেস্টি এটিকে “সারসংক্ষেপ” বলে পূর্ণ প্রতিবেদন প্রকাশের দাবি জানায়।
এপ্রিল 1993 সালের প্রতিবেদনে (ASA 13/01/93) অ্যামনেস্টি বলে: সংক্ষেপটি হত্যার পূর্ণ ব্যাখ্যা দেয় না; সাক্ষ্যে অনেক স্ববিরোধ; প্রথম ঘটনার আহতরা ও অভিযুক্ত নারী জিজ্ঞাসিত হননি; কবির হোসেনের ময়নাতদন্ত নেই; বিডিআরের ভূমিকা অস্পষ্ট; সাক্ষীরা হয়রানির শিকার হয়েছেন; কার্যপরিধি অজানা; আর ভিডিপিকে অস্ত্র দেওয়ার সুপারিশ বিপজ্জনক।
অ্যামনেস্টির মে 1992 সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী খাগড়াছড়ি সেনানিবাসের অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার শরীফ আজিজ 11 এপ্রিল সংবাদমাধ্যমকে 11টি মৃতদেহের কথা বলেন, 10 জন আদিবাসী ও 1 জন বাঙালি। 13 এপ্রিল ঢাকার নাগরিক দলের কাছে তিনি 138 মৃতের সংখ্যা সঠিক বলে স্বীকার করেন বলে জানা যায়; তদন্ত কমিশনকে তিনি মোট মৃত 13 বলেন।
খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান সমীরণ দেওয়ান 11 এপ্রিল 1992 লোগাংয়ের একটি সীমিত অংশে যেতে পেরেছিলেন, সেখানে তিনি সৎকারের জন্য রাখা 138টি মৃতদেহ দেখেন; গ্রামের বাকি অংশে তাঁকে যেতে দেওয়া হয়নি। তথ্যটি অ্যামনেস্টির মে 1992 সালের প্রতিবেদনে আছে; হিল ভয়েসের 2022 সালের লেখায় সংখ্যাটি 139।
রামেন্দু শেখর দেওয়ান পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মুখপাত্র হিসেবে 1992 সালে জেনেভায় জাতিসংঘের আদিবাসী কার্যদলে লোগাং নিয়ে বক্তব্য দেন। তাঁর দাবি, প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে প্রায় 1,200 জন নিহত ও 800 ঘর পোড়া, আর তদন্তকারী বিচারপতি সরকারের সমর্থক। 21 মার্চ 1993 তিনি প্রতিবেদনের একটি বিস্তারিত খণ্ডনও লেখেন।
সরকার জুলাই 1993-এ জানায়, আধাসামরিক সদস্যসহ আটজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা হয়েছে, আর একজন বিডিআর সদস্যকে বরখাস্ত করা হয়েছে (অ্যামনেস্টি, 2000)। এসব মামলার রায় বা কারও সাজার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। 2010 সালে পাহাড়ি সংগঠনগুলো এবং 2022 সালে হিল ভয়েস বলেছে, কোনো বিচার বা শাস্তি হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের 1992 সালের মানবাধিকার প্রতিবেদন কমিশনের ঘটনাবিবরণকে “বিশ্বাসযোগ্য” বলেছে, তবে লিখেছে হতাহতের সংখ্যা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। প্রতিবেদনটি জানায়, মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের দাবি অনুযায়ী কমিশন আদিবাসী হতাহত কম দেখিয়েছে, এবং কমিশন অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়ার জন্য সামরিক বাহিনীর সমালোচনা করেছে।
রামেন্দু শেখর দেওয়ানের জাতিসংঘ বক্তব্য ও 1993 সালের বিশ্লেষণ অনুযায়ী 25 মার্চ 1980 কাউখালী এবং 4 মে 1989 লংগদুর ঘটনায় সরকার তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল, কিন্তু কোনো প্রতিবেদনই প্রকাশিত হয়নি। শরদিন্দু শেখর চাকমার বইয়েও লেখা আছে, লোগাং ও 1993 সালের নানিয়ারচর ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
সর্বশেষ হালনাগাদ: 17 অক্টোবর 2026
প্রসঙ্গ:খাগড়াছড়ি, পার্বত্য চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, মানবাধিকার, লোগাং গণহত্যা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।