
চিত্র ৭ঃ কয়ার্টজ পাথরের তৈরী তীরের ফলা।
স্টলটা থেকে বেরিয়ে একটু হাঁটতেই, কানে এসে পরিচিত এক বাঁশীর সুর। যেই সুর মূলত এতদিন শুনে এসেছি টিভিতে প্রচারিত আদবাসী আমেরিকানদের নিয়ে কোন তথ্যচিত্র অথবা সিনেমায় ।
শব্দ লক্ষ্য করে এগিয়ে গিয়ে দেখি একটা স্টলে চেয়ার পেতে বসে আদিবাসী দাদিমা বাজাচ্ছেন সেই বাঁশী। একধরনের বিষন্ন কিন্তু শান্তিময় তার সুর।
যেন হাজার হাজার বছর ধরে জন্ম-জন্মান্তর পেরিয়ে এসে আদিবাসী মানুষের আত্মার কান্না শুনিএয়ে চলেছে । মুগ্ধ হয়ে শুলাম কিছুক্ষণ। বিনীত অনুরোধ করে রেকর্ড করে নিলাম তার কিছু অংশ।
ভিডিও ১ঃ আদিবাসী বাশীর সুর
পার্কের একেবারে কোনায় কয়েকটা টালির ছাদ বিশিষ্ট দালান। তার একটাতে বিক্রি হচ্ছে খাবার-দাবার। যে সে খাবার নয়, আদিবাসী আমেরিকানদের ঐতিহ্যমন্ডিত ফ্রাই ব্রেড দিয়ে বানানো বিভিন্ন ধরনের খাবার।
ফ্রাইব্রেড এর সাথে চিনি দিয়ে , অথবা গরুর মাংসের টাকো (taco) বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফ্রাই ব্রেড মুলত তেলে ভাজা পরোটা, তবে আমাদের পরোটার তুলনায় বেশ পুরু।
এই ফ্রাই ব্রেড কিন্তু আদিবাসী ইন্ডিয়ানদের মূল খাদ্য ছিলো না। এত মূল খাদ্য হয়ে ওঠার ইতিহাসটা বেশ করুন।
১৮শ শতকের দিকে যখন নাভাহো ইন্ডিয়ানদের আরিজোনা অংগরাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হচ্ছিলো, তখন আমেরিকার সরকার তাদেরকে রেশন হিসেবে খেতে দেয় এই রুটি।
তিনশ মাইল হেঁটে নিউ মেক্সিকোতে তাদের যেতে বাধ্য করা হয়। যা “লং ওয়াক” নামে পরিচিত।
এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি আমিরাকান আদিবাসীদের বিপুল ঐতিহ্যের অতি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। ইতিহাসবিদদের মতে, প্রায় ১৫ হাজার বছর, বা তারো আগে, এই আমেরিকার ভূখন্ডে তাদের প্রথম আবির্ভাব।
এশিয়া থেকে বেরিঙ্গিয়া (আমেরিকা এবং এশিয়া মহাদেশের মধ্যবর্তী সংযোগস্থল, যা বেরিং প্রণালী দিয়ে যুক্ত ) হয়ে তারা আসে এখানে।
ভুতত্তবিদগণ ধারণা করেন, প্রায় ৬০ থেকে ২৫ হাজার বছর আগে সমুদ্রের উচ্চতা নেমে যাবার কারনে এবং হিমবাহ গলে যাবার ফলে সাইবেরিয়া এবং আলাস্কার মাঝে বেরিং প্রণালী নামক স্থলসেতু তৈরী হয় , যা এই মাইগ্রেশানে সহয়তা করে।
পরবর্তী কয়েক হাজার বছরে পেলিও-আমেরিকানরা (paleo-American) শত শত গোত্র এবং জাতীয়তায় বভক্ত হয় আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে।
বর্তমানে সরকারীভাবে স্বীকৃত প্রায় পাঁচশ-এরও বেশী আদিবাসী গোত্রের নাম তথ্যভুক্ত করা আছে।
বেশীরভাগ স্টল ঘুরে দেখা গেলো বাহারী রং এর নক্সাদার পোশাক, শাল, কাপড়ের ব্যাগ ইত্যাদি।
এছাড়াও রয়েছে প্রচুর পরিমানে পশুজাত দ্রব্য , খরগোশের ছাল, ভালুকের নখর, কায়োটির দাত, বাজপাখির পালক, হাড়গোড়, কাছিমের খোলস ইত্যাদি।
মুলত ব্যবহৃত হয় সাংস্কৃতিক সজ্জায়। এছাড়া পাওয়া গেল টমাহক (আদিবাসী কুঠার), এবং বিভন্ন জাতের ছুরি।










চিত্র ৮ দোকানের সামগ্রী, পোস্খাক, অস্ত্র, পশুজাত দ্রব্য
ট্রেইলারের ভেতরে ছোট্ট যাদুঘর
একপাশে একটা ট্রেইলার ট্রাকের মধ্যে ছোট আকারে যাদুঘর সাজানো হয়েছে। ক্ষুদ্র পরিসরে নানাবিধ ঐতিহাসিক জিনিসপত্র এবং চিত্র দিয়ে সাজানো।




চিত্র ৯ঃ যাদুঘর প্রদর্শিত সামগ্রীর কিছু কিছু
মূল অনুষ্ঠান শুরু
কিছুক্ষন বাদেই শুরু হলো দিনের মূল কার্যকম। মাঠের মাঝকানে দড়ি দিয়ে হিরে রাখা জায়গাটেকে কেন্দ্র করা সবাই চেয়ার বা মাদুর পেতে বসে পড়লো।
শুরু হলো আদিম ঢাকার দ্রিম দ্রিম শব্দ আর সেই সাথে খালি গলায় প্রাথনা সংগীত। চোখ বুঁজলে মনে হতে লাগলো যেন হাজার বছরের পুরনো কোন গোত্রের আদিম রীতি অনুষ্ঠানে এসে পড়েছি – বনের মধ্যে খোলা আকাশের মিটিমিটি তারার নিচে জ্বলন্ত আগুন ঘিরে চলছে নৃত্য, ঢাকবাদন আর আদিম সংগীত।
গোত্রভেদে নাচের বৈচিত্র্য
ঢাকের তালে তালে বিভিন্ন গোত্রের রীতি অনুযায়ী বিচিত্র বাহারী পোশাক পড়ে মাঠের মধ্যে আসতে লাগলো নৃত্য প্রদর্শনকারীরা। প্রতিটা নাচের আগে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করা হলো এর ধরন এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে।
এই নাচগুলো সাধারনত প্রদর্শন করা ইয় ঘড়ির কাঁটার দিকে অথবা ঘড়ির কাঁটার উল্টোদিকে প্রদক্ষিন করতে করতে। ব্যাপারটা জীবনের চক্রাকার নিয়মকে কে প্রতিনিধিত্ব করে।
কিছু নাচ পুরুষপ্রধান, কিছু নারীপ্রধান। পুরুষদের বিভিন্ন ভংগিমার নাচ রয়েছে। কোন নাচের ভঙ্গিমা খুবি দৃঢ়, অতি সংক্ষিপ্ত পদচালনা, যেগুলো স্ট্রেইট ডান্স নামে পরিচিত।
আরেক রকম নাচের গতি সর্পিল , আতর্কিত ভংগিমার পরিবর্তন, যোদ্ধা নাচের প্রকৃতি অনেকটা এরকম। ঘাস নৃত্যতে দেখা যায় পায়ের চেটো ব্যবহার করে মাটিতে আঘাতের মাধ্যে ঘাস দলিত করার ভংগিমা।
সাধারণত প্রাচীনকালে নাচের প্রাঙ্গনে ঘাস সমান করতে এই নাচ দিয়েই মুল অনুষ্টান শুরু করা হত। নারীদের নাচের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো শাল নৃত্য।
নাম দেখেই বোঝা যাচ্ছে বর্ণিল শালের ব্যবহার এই নৃত্যের মূলকেন্দ্র। জিঙ্গেল নাচে মেয়েদের পড়তে হয় ধাতুর তৈরী ঝালরের মত জামা, পরিনত বয়স্ক মহিলাদের গায়ের জামায় লাগানো থাকে ৩৬৫ টি ধাতব ঝালর, যা বছরের প্রতিটাদিনকে প্রতিনিধিত্ব করে।
জামাগুলো বেশ ভারী , তাই শুধু পরিনত মহিলারাই এই পোশাক পড়ে নাচতে পারেন।


চিত্র ১০ঃ নৃত্যরত আদিবাসী।
টিমোথী রে-র সঙ্গে আলাপ
অনুষ্টানের ফাঁকে ছবি তুলতে তুলতে আলাপ হলো টিমোথী রে -এর সাথে। জন্মসূত্রে সে অর্ধেক চেরকি ইন্ডিয়ান, অর্ধেক আইরিশ। ভার্জিনিয়া থেকে এসেছে সে এই পাও ওয়াও এ অংশ নিতে।
তার কাছে থেকে জানতে পারলাম তার পশু-পখী প্রীতি, আরভেষজ ঔষধ এর প্রতি আগ্রহ সম্বন্ধে। আদিবাসী আমেরিকান নাচের প্রকৃতি সম্বধে জানলাম তার কাছ থেকে।
আলাপ বেশ জমে গেল । পরে আলাপ শেষে আগামী বছরের অনুষ্ঠেয় ভার্জিনিয়ার ড্রামস অফ দ্যা পেইন্টেড মাউন্টেইন্সের আংশগ্রহনের আমন্ত্রন পেলাম।
পেইন্টেড মাউন্টেনের মূল আকর্ষন হলো, এই পাহাড়ের গায়ে এখনো রয়ে গেছে আদিবাসীদের অংকিত প্রাচীন চিত্রকর্ম।

চিত্র ১১ঃ টিমোথী রে এর সাথে।
শোকের অনুষ্ঠান
বেলা গড়িয়ে এলে অনুষ্ঠান চলে এলো প্রায় শেষের দিকে। এতক্ষন নাচ গানের ফাকে ফাকে হাসি তামাশা করছিলো সবাই। হঠাৎ করে গম্ভীর একটা আবহ সৃষ্টি হল।
একইসাথে বুঝতে পারলাম কেন পাও ওয়াও শুধু আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের সাংসৃতিক প্রদর্শনী নয়। এ তাদের সামাজিক আত্মীয়তার মিলন মেলা। উপস্থাপক জানালেন গোত্রের এক দম্পতি তাদের সন্তানকে হারিয়েছেন খুব সম্প্রতি।
আত্মহত্যা করেছে সেই হতভাগ্য কোনো কারনে। তাদের জন্য অনুষ্ঠিত হলো সমবেদনা নৃত্য। দূর্লভ এই অনুষ্ঠান রেকর্ড করতে বারন করা হলো তাই এর কোনো চিত্র দেখাতে পারছিনা।
মূলত শোকগ্রস্ত দম্পত্তিকে সামনে রেখে শুরু হলো ধীরপায়ে এক চক্রাকার নৃত্য । সেই সাথে বরাবরের মত ঢাকবাদন এবং প্রার্থনাগীত । দম্পত্তির হাতে একধরনের খড়জাতীয় ধুপ।
ধোঁয়া বেরুচ্ছে থেকে থেকে। কিছুক্ষন পর পর তা তুলে ধরা হচ্ছে মাথার উপরে । নাচের মাঝখানে একজন একজন করে গোত্রের সবাই তাদেরকে আলিংগন করে সমবেদনা জানাতে লাগলো।
সবার চোখে পানি। বুকের মধ্যে বুঝতে পারলাম তাদের মধ্যেকার টান কতখানি।
সমাপ্তি
অনুষ্ঠান সমাপ্ত করা হলো আদিবাসী পতাকা হাতে সংক্ষিপ্ত এক নাচের মধ্যে দিয়ে। পতাকা গোত্রের আধাত্মিক নেতার হাতে। তার পরনে অবশ্য ছিল সাধারন প্যান্ট-শার্ট।
কিন্তু চলন দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তার উপস্তিতির গুরুত্ব এই অনুষ্ঠানে। বুঝলাম বিদায় নেবার পালা এবার। আদিবাসীদের বিদায় জানিয়ে অদ্ভুত এক ভালো লাগা নিয়ে ফিরে চল্লাম নিজ গৃহে।
লেখকঃ অবনীল
তথ্যসূত্রঃ সচলায়তন