Jumjournal Logo

মাওরি জাতি: ওয়াইটাঙি চুক্তির দুই পাঠ, আর একটি নদী যে আইনি ব্যক্তি

Last updated Oct 15th, 2026

0

ওয়াইটাঙি চুক্তির চতুর্থ শিট — একটিমাত্র টিকে থাকা ছাপা কপি, ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৪০

১৮৪০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নিউজিল্যান্ডের বে অফ আইল্যান্ডসে একটি চুক্তি সই হয়েছিল। চুক্তিটির দুটি পাঠ ছিল — একটি ইংরেজিতে, একটি মাওরি ভাষায়। আর নিউজিল্যান্ডের ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনালের সরকারি ভাষায়: “the Māori text is not an exact translation of the English text.”

আরও একটি তথ্য আছে, যা এই গোটা গল্পের ভার বহন করে। ট্রাইব্যুনালের হিসাব অনুযায়ী ওই বছরের শেষে ৫০০-র বেশি মাওরি চুক্তিতে সই করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ইংরেজি পাঠের কাগজে সই করেছিলেন মাত্র ৩৯ জন — ওয়াইকাটো হেডস আর মানুকাউ, এই দুই জায়গায়।

অর্থাৎ যাঁরা সই করেছিলেন, তাঁদের প্রায় সবাই সই করেছিলেন মাওরি পাঠে। আর সেই পাঠে যে শব্দগুলো ছিল, সেগুলোর অর্থ ইংরেজি পাঠের শব্দগুলোর সঙ্গে মেলে না।

এই লেখাটি সেই ফারাকটি নিয়ে — শব্দে শব্দে কী আলাদা, তার ফলে দেড়শো বছরে কী হলো, আর শেষে একটি রাষ্ট্র কীভাবে নিজের ভুল শোধরানোর ব্যবস্থা দাঁড় করাল। পাহাড়ের পাঠকের জন্য প্রশ্নটি অপরিচিত নয়: একটি চুক্তির দুই পক্ষ যখন একই শব্দে দুই অর্থ বোঝে, তখন কী হয়।

মাওরি কারা, আর কতজন

মাওরি হলেন আওতেয়ারোয়া নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী জনগোষ্ঠী। Stats NZ-এর সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৩০ জুন তারিখে মাওরি জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৯,০৪,১০০ — দেশের মোট জনসংখ্যার ১৭.৩ শতাংশ।

অর্থাৎ প্রতি ছয় জন নিউজিল্যান্ডারের একজনের বেশি। তুলনার জন্য: বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ, তানজানিয়ায় মাসাইরা আরও কম। এই অনুপাতের ফারাকই নিউজিল্যান্ডের রাজনীতিতে মাওরি প্রশ্নের ওজন ব্যাখ্যা করে।

Stats NZ-এর ২০২৩ সালের ১৬ নভেম্বরের প্রকাশনা অনুযায়ী ওই বছরে মাওরি জনসংখ্যা বেড়েছে ১৩,১০০ জন, অর্থাৎ ১.৫ শতাংশ — জাতীয় বৃদ্ধির হার ছিল ২.৭ শতাংশ। এর মধ্যে স্বাভাবিক বৃদ্ধি (জন্ম বিয়োগ মৃত্যু) ১২,৯০০; বাকিটা অভিবাসন এবং জাতিগত পরিচয় বদলের যোগফল — যাঁরা নিজেদের পরিচয়ে মাওরি যোগ করেছেন, বিয়োগ যাঁরা আর যোগ করছেন না।

শেষ অংশটি লক্ষ করার মতো। একটি সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা স্বীকার করে নিচ্ছে যে জাতিগত পরিচয় স্থির জিনিস নয় — মানুষ পরিচয় যোগ করেন, ছেড়ে দেন, আবার ফিরে আসেন। পরিচয়-গণনার যে তর্ক বাংলাদেশে চলে, সেখানে এই স্বীকৃতিটি কাজে লাগতে পারে।

জনসংখ্যার দুটি মাপ: ‘জাতিগোষ্ঠী’ আর ‘বংশধর’

নিউজিল্যান্ডে মাওরি জনসংখ্যা দুই রকমে মাপা হয়, আর দুটি সংখ্যা আলাদা। একটি মাপ হলো জাতিগত পরিচয় (ethnicity) — কে নিজেকে মাওরি বলে পরিচয় দেন। আরেকটি মাপ হলো বংশপরিচয় (descent) — কার পূর্বপুরুষে মাওরি আছেন।

Stats NZ-এর প্রাক্কলনে জাতিগত পরিচয়ের সংখ্যা ৯,০৪,১০০ (১৭.৩%)। অন্যদিকে ২০২৩ সালের আদমশুমারির ফল হিসেবে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী মাওরি বংশধর ৯,৭৮,২৪৬ জন, অর্থাৎ জনসংখ্যার ১৯.৬ শতাংশ — ২০১৮-র তুলনায় ১২.৫ শতাংশ বেশি। [এই দ্বিতীয় সংখ্যাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত শুমারি-ফলের ভিত্তিতে; Stats NZ-এর মূল প্রকাশনায় যাচাই করা হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]

একই শুমারির ফল অনুযায়ী ৩,৬৬,০১৫ জন (৪১.২%) নিজেদের কেবল মাওরি বলে পরিচয় দিয়েছেন, আর ৪,০৯,৪০১ জন (৪৬.১%) ইউরোপীয় ও মাওরি — দুটোই।

কেন দুটি মাপ দরকার? কারণ একটি মাপ বলে মানুষ নিজেকে কী মনে করেন, আরেকটি বলে বংশসূত্র কী। নিউজিল্যান্ডের আইনে কিছু অধিকার বংশপরিচয়ের সঙ্গে জড়িত, কিছু জাতিগত পরিচয়ের সঙ্গে — তাই দুটোই গোনা হয়।

মাওরি জনগোষ্ঠী কত তরুণ

Stats NZ-এর হিসাবে মাওরি পুরুষদের মধ্যমা বয়স ২৫.৮ বছর, নারীদের ২৭.৯ — অথচ জাতীয় মধ্যমা বয়স যথাক্রমে ৩৭.০ ও ৩৯.০। অর্থাৎ ফারাক এগারো বছরেরও বেশি।

Stats NZ নিজেই এটিকে ব্যাখ্যা করেছে “reflecting a younger Māori population” বলে। ২০২৩ সালের ৩০ জুন তারিখে মাওরি হিসেবে পরিচয়দাতা পুরুষ ৪,৫০,২০০ জন, নারী ৪,৫৩,৯০০ জন।

এই এগারো বছরের ফারাকটির অর্থ অনেক। এটি বলে, মাওরি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ-অনুপাত বাড়বে — স্কুল, ভাষা-শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে মাওরি তরুণদের অংশ ক্রমশ বড় হবে। একই সঙ্গে এটি একটি সতর্কবার্তাও: তরুণ জনগোষ্ঠী মানে সাধারণত আয়ু কম, আর তা স্বাস্থ্য-বৈষম্যের দিকেই নির্দেশ করে।

১৮৪০: ওয়াইটাঙি চুক্তি কীভাবে সই হলো

ওয়াইটাঙির চুক্তি-প্রাঙ্গণে ওয়ারেনুই (সভাঘর)-এর ভেতর
ওয়াইটাঙির চুক্তি-প্রাঙ্গণে ওয়ারেনুই (সভাঘর)-এর ভেতর। ছবি: Phil Whitehouse from London, United Kingdom, উইকিমিডিয়া কমন্স, CC BY 2.0 (মূল ফাইল)

১৮৪০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ওয়াইটাঙিতে চুক্তিটি সই করেন ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হবসন, কয়েকজন ইংরেজ বাসিন্দা, এবং ৪৩ থেকে ৪৬ জন মাওরি রাঙাতিরা (প্রধান)। সংখ্যাটি নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে — ট্রাইব্যুনালের নথিই “between 43 and 46” লিখেছে।

ব্রিটিশ সরকার চুক্তিটি কেন চেয়েছিল, তার ব্যাখ্যাও সরকারি নথিতে আছে। নিউজিল্যান্ডে বসবাসরত ব্রিটিশ মানুষের সংখ্যা বাড়ছিল, তাই একধরনের বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা হচ্ছিল। তারপর নিউজিল্যান্ড কোম্পানির বেসরকারি বসতি স্থাপনের পরিকল্পনা সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য করে। সরকার হবসনকে নির্দেশ দেয় চুক্তি নিয়ে আলোচনা করতে — আর কারণ হিসেবে বলা হয়, কোনো সরকার প্রতিষ্ঠার আগে মাওরিদের সম্মতি নেওয়া প্রয়োজন।

এই যুক্তিটি গুরুত্বপূর্ণ: সম্মতি নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা ব্রিটিশরা নিজেরাই স্বীকার করেছিল। পরবর্তী দেড়শো বছরের সব তর্ক দাঁড়িয়ে আছে এই প্রশ্নে — সম্মতিটি আসলে কিসের উপর নেওয়া হয়েছিল।

ওয়াইটাঙির পর চুক্তিটি নর্থল্যান্ডের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয় আরও সই সংগ্রহের জন্য, আর দেশের বাকি অংশে অনুলিপি পাঠানো হয়। বছর শেষে ৫০০-র বেশি মাওরি সই করেছিলেন, যাঁদের ১৩ জন নারী।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি: ইংরেজি পাঠে সই মাত্র ৩৯

ওয়াইটাঙি চুক্তির দ্বিতীয় শিট, মানুকাউ-কাউহিয়া শিট, ১৮৪০
ওয়াইটাঙি চুক্তির দ্বিতীয় শিট, মানুকাউ-কাউহিয়া শিট, ১৮৪০। ছবি: Archives New Zealand, উইকিমিডিয়া কমন্স, Public domain (মূল ফাইল)

ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী ইংরেজি পাঠ বহনকারী কাগজটিতে সই হয়েছিল কেবল ওয়াইকাটো হেডস ও মানুকাউতে, ৩৯ জন রাঙাতিরার হাতে। বাকি সবাই — পাঁচশোর বেশি মানুষ — সই করেছিলেন মাওরি পাঠে।

এই একটি তথ্যই চুক্তি-বিতর্কের ভরকেন্দ্র ঠিক করে দেয়। আন্তর্জাতিক আইনের একটি প্রচলিত নীতি হলো, অস্পষ্টতা থাকলে দুর্বল পক্ষের বোঝাপড়া বা যে পাঠে তারা সই করেছে, সেটিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া (contra proferentem)। কিন্তু উপনিবেশ-পরবর্তী শাসনে বাস্তবে অগ্রাধিকার পেয়েছিল ইংরেজি পাঠ।

পাহাড়ের পাঠকের জন্য প্রশ্নটি সরাসরি প্রযোজ্য: একটি চুক্তির বাংলা ও ইংরেজি পাঠে যদি অর্থ আলাদা হয়, কোনটি চলবে? আর যে পক্ষ নিজের ভাষার পাঠে সই করেছে, তার বোঝাপড়ার আইনি ওজন কত?

চুক্তির দুটি পাঠ — আর সেগুলো এক নয়

নিউজিল্যান্ডের আইনে দুটি পাঠই স্বীকৃত: Treaty of Waitangi Act 1975-এর প্রথম তফসিলে ইংরেজি ও মাওরি — দুটো পাঠই ছাপা আছে। আর ওই একই আইনে ট্রাইব্যুনালকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে “decide issues raised by the differences between them” — দুই পাঠের পার্থক্য থেকে উদ্ভূত প্রশ্নগুলো নিষ্পত্তি করা।

অর্থাৎ রাষ্ট্র নিজেই আইনে লিখে রেখেছে যে পাঠ দুটি মেলে না, এবং সেই অমিলের মীমাংসার জন্য একটি প্রতিষ্ঠান দরকার। এটি একটি অসাধারণ স্বীকারোক্তি — এবং একটি কার্যকর ব্যবস্থাও।

আরও একটি জিনিস জানা দরকার। “চুক্তি” বলতে একটি কাগজ বোঝায় না — Archives New Zealand-এর বিবরণ অনুযায়ী ওয়াইটাঙি চুক্তি আসলে নয়টি দলিলের সমষ্টি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় সই সংগ্রহের জন্য আলাদা আলাদা শিট পাঠানো হয়েছিল, আর সেগুলোর প্রতিটিই এখন চুক্তির অংশ। এর মধ্যে একটিমাত্র ছাপা কপি টিকে আছে — ওয়াইকাটো কপি, যেটি ১৮৪০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পাইহিয়াতে CMS-এর মুদ্রক উইলিয়াম কোলেনসো ছাপেন, আর যার নিচে সই করেন ঙাতি পাউ (ওয়াইকাটো) ও ঙাতি তে ওয়েহি (র‍্যাগলান)-এর পাঁচজন প্রধান।

নিচের অংশগুলোতে ধারা ধরে ধরে দুই পাঠ পাশাপাশি রাখা হলো। ইংরেজি পাঠের উদ্ধৃতি ও মাওরি পাঠের শব্দ — দুটোই ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনালের প্রকাশিত পাঠ থেকে, যা ১৯৭৫ সালের আইনের প্রথম তফসিলের।

প্রথম ধারা: Sovereignty বনাম Kawanatanga

ইংরেজি পাঠে মাওরি প্রধানরা রানিকে দিয়ে দিচ্ছেন sovereignty — সার্বভৌমত্ব। মাওরি পাঠে তাঁরা দিচ্ছেন kawanatanga — শাসনক্ষমতা বা গভর্নরের দায়িত্ব। এই এক শব্দের ফারাকেই দেড়শো বছরের বিরোধ।

ইংরেজি পাঠের ভাষা: প্রধানরা রানিকে দিচ্ছেন “absolutely and without reservation all the rights and powers of Sovereignty” — নিঃশর্তে, সম্পূর্ণভাবে, সার্বভৌমত্বের সব অধিকার ও ক্ষমতা।

মাওরি পাঠের ভাষা (Ko te Tuatahi): “ka tuku rawa atu ki te Kuini o Ingarani ake tonu atu — te Kawanatanga katoa o o ratou wenua”। অধ্যাপক স্যার হিউ কাওয়ারুর অনুবাদে এর অর্থ — প্রধানরা ইংল্যান্ডের রানিকে চিরকালের জন্য সম্পূর্ণভাবে দিচ্ছেন “the complete government over their land”, অর্থাৎ তাঁদের ভূমির উপর সম্পূর্ণ শাসন।

পার্থক্যটি কেন তৈরি হলো? Te Papa-র ব্যাখ্যা অনুযায়ী ব্রিটিশ ধারণার “sovereignty” শব্দটির মাওরি সমাজের প্রেক্ষাপটে সরাসরি কোনো প্রতিশব্দ ছিল না। অনুবাদকরা ব্যবহার করলেন kawanatanga — যা আসলে ইংরেজি governance-এর একটি লিপ্যন্তর। মাওরিরা শব্দটি চিনতেন বাইবেল থেকে, আর নিউ সাউথ ওয়েলসের Kawana বা গভর্নরের ভূমিকা থেকে।

অর্থাৎ মাওরিরা যা বুঝেছিলেন, সেটি ছিল একজন গভর্নরের মতো একটি শাসন-ব্যবস্থা মেনে নেওয়া — নিজেদের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব হস্তান্তর নয়।

দ্বিতীয় ধারা: Possession বনাম Tino Rangatiratanga

ইংরেজি পাঠে মাওরিদের নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে “full exclusive and undisturbed possession” — অবাধ দখল। মাওরি পাঠে নিশ্চয়তা দেওয়া হচ্ছে tino rangatiratanga — পূর্ণ প্রধানত্ব বা কর্তৃত্ব।

ইংরেজি পাঠ: রানি নিশ্চয়তা দিচ্ছেন প্রধান, গোত্র ও পরিবারগুলোকে — তাঁদের “Lands and Estates Forests Fisheries and other properties”-এর পূর্ণ, একান্ত ও অবাধ দখলের, যতদিন তাঁরা সেগুলো নিজেদের দখলে রাখতে চান।

মাওরি পাঠ (Ko te Tuarua): রানি নিশ্চিত করছেন প্রধান, গোত্র ও নিউজিল্যান্ডের সব মানুষের “te tino rangatiratanga o o ratou wenua o ratou kainga me o ratou taonga katoa”। কাওয়ারুর অনুবাদে — “the unqualified exercise of their chieftainship over their lands, villages and all their treasures”।

ফারাকটি লক্ষ করুন। “দখল” একটি সম্পত্তি-সম্পর্ক; “প্রধানত্ব” একটি কর্তৃত্ব-সম্পর্ক। প্রথমটি বলে জিনিসটি আপনার; দ্বিতীয়টি বলে ওই জিনিসের উপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা আপনার।

আর এখানেই প্রথম ধারার সঙ্গে একটি স্পষ্ট টানাপোড়েন তৈরি হয়। মাওরি পাঠে প্রথম ধারায় দেওয়া হচ্ছে kawanatanga (শাসন), আর দ্বিতীয় ধারায় রাখা হচ্ছে tino rangatiratanga (পূর্ণ কর্তৃত্ব)। দুটিই একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, মাওরিরা একটি ভাগ করা ব্যবস্থা বুঝেছিলেন — গভর্নরের হাতে সাধারণ শাসন, নিজেদের হাতে নিজেদের বিষয়ে কর্তৃত্ব।

‘তাওঙ্গা’ শব্দটি: কেবল সম্পত্তি নয়

মাওরি পাঠে দ্বিতীয় ধারায় যে শব্দটি সবচেয়ে দূর পর্যন্ত গেছে, সেটি taonga — কাওয়ারুর অনুবাদে “treasures”। ইংরেজি পাঠে ছিল “other properties”, অর্থাৎ অন্যান্য সম্পত্তি।

“সম্পত্তি” আর “ধনসম্পদ/মূল্যবান বস্তু” — এই দুইয়ের পরিধি আলাদা। taonga শব্দটির ভেতরে এমন জিনিস আসে যেগুলো বেচাকেনার বস্তু নয়: ভাষা, জ্ঞান, নদী, মাছের ঝাঁক, এমনকি বেতার তরঙ্গ।

এর ফল বাস্তবে দেখা গেছে। ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনাল নিজের প্রতিবেদনের তালিকা দিতে গিয়ে লিখেছে, তারা রিপোর্ট করেছে “from te reo Māori and the radio spectrum to fresh water, fisheries, the foreshore and seabed and Māori health and homelessness” — ভাষা ও বেতার তরঙ্গ থেকে স্বাদুপানি, মৎস্যসম্পদ, উপকূল ও সমুদ্রতল, মাওরি স্বাস্থ্য ও গৃহহীনতা পর্যন্ত।

অর্থাৎ ১৮৪০ সালের একটি মাওরি শব্দের পরিধি ১৯৮০-৯০-এর দশকে গিয়ে ভাষা ও বেতার তরঙ্গের অধিকার পর্যন্ত পৌঁছেছে। পরিভাষা নিরীহ জিনিস নয় — এই লেখার সবচেয়ে কাজের শিক্ষা সম্ভবত এটিই।

জমি বিক্রির অগ্রাধিকার: দ্বিতীয় ধারার দ্বিতীয় অংশ

দ্বিতীয় ধারার শেষ অংশে প্রধানরা রানিকে দিচ্ছেন জমি কেনার একান্ত অগ্রাধিকার — ইংরেজি পাঠে “the exclusive right of Preemption”। অর্থাৎ মাওরিরা জমি বেচতে চাইলে প্রথমে মুকুটকেই বেচতে হবে, দাম ঠিক হবে আলোচনায়।

মাওরি পাঠে এই অংশটির ভাষা আলাদা। সেখানে বলা হচ্ছে প্রধানরা রানিকে দিচ্ছেন “te hokonga” — কাওয়ারুর অনুবাদে প্রধানরা রানির কাছে জমি “sell” করবেন, দাম ঠিক হবে জমির মালিক ও রানির নিয়োগ করা ক্রয়-প্রতিনিধির মধ্যে।

পার্থক্যটি সূক্ষ্ম কিন্তু বড়। ইংরেজি পাঠে এটি একটি স্থায়ী আইনি অগ্রাধিকার — মুকুটের একচেটিয়া ক্রয়াধিকার। মাওরি পাঠে এটি পড়া যায় একটি বিক্রির ব্যবস্থা হিসেবে, যেখানে দাম নিয়ে দুই পক্ষের সমঝোতা হবে।

উনিশ শতকে জমি হাতবদলের ইতিহাস এই এক ধারারই ফল। ক্রয়ের একচেটিয়া অধিকার থাকলে দাম নির্ধারণের ক্ষমতাও কার্যত এক পক্ষের হাতে চলে যায়।

তৃতীয় ধারা: অধিকার, নাকি অধিকার ও কর্তব্য

তৃতীয় ধারা সবচেয়ে কম বিতর্কিত — এখানে রানি মাওরিদের দিচ্ছেন রাজকীয় সুরক্ষা এবং ব্রিটিশ প্রজার সব অধিকার ও সুবিধা। ইংরেজি পাঠে: “all the Rights and Privileges of British Subjects”।

মাওরি পাঠে (Ko te Tuatoru): রানি রক্ষা করবেন নিউজিল্যান্ডের সব মাওরিকে, আর তাঁদের দেবেন “nga tikanga katoa rite tahi ki ana mea ki nga tangata o Ingarani” — ইংল্যান্ডের মানুষের সমান সব tikanga।

কাওয়ারুর অনুবাদে এটি দাঁড়ায় “the same rights and duties of citizenship as the people of England” — অধিকার ও কর্তব্য, দুটোই। শব্দটি লক্ষণীয়, কারণ Te Awa Tupua আইনে পরে tikanga-র সরকারি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে: “customary law, values, and practices” — প্রথাগত আইন, মূল্যবোধ ও চর্চা।

অর্থাৎ ১৮৪০ সালে মাওরি পাঠে যে শব্দটি “অধিকার” বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছিল, নিউজিল্যান্ডের আইনে আজ সেটির অর্থ “প্রথাগত আইন”। এটিও একটি ফারাক, যা সহজে চোখে পড়ে না।

কাওয়ারুর অনুবাদ: মাওরিরা কী বুঝেছিলেন

ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনাল তার নিজের ওয়েবসাইটে মাওরি পাঠের একটি সমকালীন অনুবাদ প্রকাশ করে, যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট — যাঁরা সই করেছিলেন, তাঁরা পাঠটি কীভাবে বুঝেছিলেন তা দেখানো।

অনুবাদটি করেছেন ট্রাইব্যুনালের প্রাক্তন সদস্য অধ্যাপক স্যার হিউ কাওয়ারু। ট্রাইব্যুনালের ভাষায়, “The translation sets out to show how Māori would have understood the meaning of the text they signed.” এটি প্রকাশিত হয় Waitangi Revisited: Perspectives on the Treaty of Waitangi বইতে (সম্পাদক Michael Belgrave, Merata Kawharu ও David Williams; Oxford University Press, ১৯৮৯)।

এই পদ্ধতিটি নিজেই একটি নজির। রাষ্ট্রীয় একটি ট্রাইব্যুনাল স্বীকার করে নিচ্ছে যে দলিলের অর্থ নির্ধারণে সইদাতাদের বোঝাপড়া প্রাসঙ্গিক, এবং সেই বোঝাপড়া দেখানোর জন্য আলাদা একটি অনুবাদ প্রকাশ করছে।

কাওয়ারুর অনুবাদে কয়েকটি শব্দের পাশে টীকা-সংখ্যা আছে — chieftainship, administrator, complete government, unqualified exercise, treasures, rights and duties। প্রতিটিই এমন জায়গা, যেখানে ইংরেজি পাঠের সঙ্গে ফারাক আছে।

১৮৭৭: আদালত বলল চুক্তি একটি ‘legal nullity’

চুক্তি সইয়ের সাঁইত্রিশ বছর পর, ১৮৭৭ সালে একজন বিচারক চুক্তিটিকে ‘legal nullity’ অর্থাৎ আইনত অস্তিত্বহীন বলে ঘোষণা করেন। এই তথ্যটি ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনালের নিজের ইতিহাস-পাতায় লেখা আছে।

ট্রাইব্যুনালের বিবরণ অনুযায়ী ১৮৪০ সালে চুক্তি সইয়ের পর থেকেই মাওরিরা মুকুটের কাছে বারবার অভিযোগ জানিয়েছেন যে চুক্তির শর্ত মানা হচ্ছে না। কিন্তু “Often these petitions and protests fell on deaf ears” — আবেদন ও প্রতিবাদ প্রায়ই বধির কানে পড়েছে।

পরিস্থিতি বদলায় ১৯৭০-এর দশকে, যখন অমীমাংসিত চুক্তি-অভিযোগ নিয়ে মাওরি প্রতিবাদ বাড়তে থাকে এবং ট্রাইব্যুনালের ভাষায় “sometimes taking place outside the law” — কখনো আইনের বাইরে গিয়েও।

অর্থাৎ ট্রাইব্যুনাল তৈরি হয়েছিল রাষ্ট্রের সদিচ্ছা থেকে নয়, চাপ থেকে। এটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নিজের স্বীকারোক্তি।

১৯৭৫: ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনাল

Treaty of Waitangi Act 1975 দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনাল — একটি আইনি প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে মাওরিদের চুক্তি-সংক্রান্ত দাবি তদন্ত করা যাবে। আইনের দ্বিতীয় তফসিল অনুযায়ী এটি একটি Commission of Inquiry হিসেবে গণ্য, আর একই আইনে এটিকে Tribunal-ও বলা হয়েছে — অর্থাৎ দুটোরই বৈশিষ্ট্য আছে।

ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা আইনের ৫ ধারায় নির্দিষ্ট, আর তাতে আছে:

  1. সুপ্রতিষ্ঠিত দাবিগুলো নিয়ে তদন্ত ও সুপারিশ
  2. প্রস্তাবিত আইন পরীক্ষা ও প্রতিবেদন — যদি সংসদ বা কোনো মন্ত্রী সেটি ট্রাইব্যুনালে পাঠান
  3. নির্দিষ্ট কিছু জমি নিয়ে সুপারিশ বা নির্ধারণ — মুকুটের বনভূমি, রেলের জমি, রাষ্ট্রীয় মালিকানার প্রতিষ্ঠানের জমি, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হস্তান্তরিত জমি

আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতাটি: ট্রাইব্যুনালের রয়েছে চুক্তির অর্থ ও ফল নির্ধারণের একান্ত কর্তৃত্ব (exclusive authority to determine the meaning and effect of the Treaty), আর সেই সঙ্গে দুই পাঠের পার্থক্য থেকে ওঠা প্রশ্নগুলো নিষ্পত্তির ক্ষমতা।

ট্রাইব্যুনালে সদস্য থাকেন সর্বোচ্চ ২০ জন। বর্তমান চেয়ারপারসন মাওরি ল্যান্ড কোর্টের প্রধান বিচারক Chief Judge Caren Fox।

১৯৮৫: ১৮৪০ পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ার অনুমতি

প্রথমে ট্রাইব্যুনাল কেবল চলতি সরকারি কাজকর্ম নিয়ে দাবি শুনতে পারত। ১৯৮৫ সালে সংসদ ট্রাইব্যুনালকে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত পিছিয়ে গিয়ে ঘটনা তদন্তের অনুমতি দেয়।

এই একটি সংশোধনী ট্রাইব্যুনালের চরিত্র বদলে দেয়। এর আগে এটি ছিল সমকালীন অভিযোগের ফোরাম; এর পরে এটি হয়ে গেল একশো পঁয়তাল্লিশ বছরের ঐতিহাসিক হিসাব নেওয়ার প্রতিষ্ঠান।

ফল হলো তাৎক্ষণিক। ট্রাইব্যুনালের ভাষায়, “Many hundreds of historical claims were made”। এত দাবি সামলাতে ট্রাইব্যুনাল সেগুলোকে জেলা-ভিত্তিক দলে ভাগ করে, আর একটি নির্দিষ্ট এলাকার দাবিগুলো গবেষণা ও শুনানি করার পদ্ধতিটির নাম হয় district inquiry।

পাহাড়ের পাঠকের জন্য তুলনাটি সরাসরি: ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কত পিছন পর্যন্ত যেতে পারবে — এই প্রশ্নটিই নিউজিল্যান্ডে ১৯৮৫ সালে একটি সংশোধনী দিয়ে মিটেছিল।

চল্লিশ বছরে ট্রাইব্যুনালের হিসাব

২০১৫ সালে ট্রাইব্যুনাল তার চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিজের হিসাব প্রকাশ করে। সংখ্যাগুলো একটি প্রতিষ্ঠানের কাজের মাপ দেয়:

৪০ বছরে (১৯৭৫–২০১৫)সংখ্যা
নিবন্ধিত দাবি২,৫০১
সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে প্রতিবেদন হয়েছে১,০২৮ দাবি
চূড়ান্ত প্রতিবেদন১২৩
জেলা-প্রতিবেদনে আচ্ছাদিত ভূমিনিউজিল্যান্ডের ৭৯%

অনুপাতটি লক্ষণীয়: ২,৫০১টি দাবির মধ্যে ১,০২৮টিতে প্রতিবেদন হয়েছে, অর্থাৎ প্রায় ৪১ শতাংশ। চল্লিশ বছরে। এটি একদিকে ধৈর্যের হিসাব, অন্যদিকে ধীরগতির।

ট্রাইব্যুনাল তার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রতি মাতারিকি-তে — মাওরি নববর্ষে। প্রাতিষ্ঠানিক সময়সূচিতে একটি আদিবাসী পঞ্জিকা, এটিও একটি নীরব স্বীকৃতি।

ট্রাইব্যুনালের সুপারিশ থেকে যে প্রতিষ্ঠানগুলো হয়েছে

ট্রাইব্যুনালের সুপারিশ কেবল কাগজে থাকেনি — সেগুলো থেকে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল নিজেই তার পাতায় লিখেছে, বহু সুপারিশ সরকার বাস্তবায়ন করেছে, আর প্রতিবেদনগুলো অনেক উদ্যোগ ও নতুন প্রতিষ্ঠানে অবদান রেখেছে। নাম ধরে তারা উল্লেখ করেছে চারটি:

  • reo irirangi — মাওরি বেতার
  • Te Taura Whiri i te Reo Māori — মাওরি ভাষা কমিশন
  • Te Māngai Pāho — মাওরি সম্প্রচার তহবিল সংস্থা
  • Te Aka Whai Ora — মাওরি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ

এই তালিকাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলে। একটি তদন্ত-ট্রাইব্যুনালের ক্ষমতা কেবল সুপারিশ করা — বাধ্য করা নয়। তবু সুপারিশ থেকে বেতার, ভাষা কমিশন, সম্প্রচার-তহবিল ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ দাঁড়িয়ে গেছে। সুপারিশের ক্ষমতা আর বাধ্য করার ক্ষমতা এক নয়, কিন্তু সুপারিশও নিষ্ফল নয়।

২০০৮: নতুন ঐতিহাসিক দাবি নেওয়া বন্ধ

২০০৮ সালে সংসদ ট্রাইব্যুনালের নতুন ঐতিহাসিক দাবি নিবন্ধনের ক্ষমতা তুলে নেয়। ট্রাইব্যুনালের নিজের ভাষায়, জেলা-তদন্তের প্রক্রিয়া শেষের দিকে এগোচ্ছিল, আর সেই প্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত।

অর্থাৎ ঐতিহাসিক দাবির দরজা একটি নির্দিষ্ট তারিখে বন্ধ হয়ে গেছে। যাঁরা তার আগে দাবি করেননি, তাঁদের ঐতিহাসিক অভিযোগ আর ট্রাইব্যুনালে নিবন্ধিত হবে না।

এটি একটি নকশাগত সিদ্ধান্ত, আর এর দুটি দিক আছে। একদিকে এটি প্রক্রিয়াটিকে শেষ করার দিকে ঠেলে দেয় — অনির্দিষ্টকাল ধরে চলতে দেয় না। অন্যদিকে এটি একটি সময়সীমা তৈরি করে, যার পরে অভিযোগের ঐতিহাসিক পথটি বন্ধ।

২০২৫–২০৩৫: ট্রাইব্যুনাল নিজের কাজ কোথায় শেষ করতে চায়

২০২৫ সালের ২ জুলাই ট্রাইব্যুনালের চেয়ারপারসন Chief Judge Dr Caren Fox প্রকাশ করেন Strategic Direction 2025–2035, যেখানে দুটি পর্বে কাজ শেষ করার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

২০২৫ থেকে ২০৩০ — অগ্রাধিকার পাবে বেশিরভাগ ঐতিহাসিক দাবির শুনানি শেষ করা: অবশিষ্ট পাঁচটি জেলা-তদন্ত, আর অবশিষ্ট ঐতিহাসিক বিষয়সংক্রান্ত দাবিগুলোর তদন্ত, সঙ্গে পাঁচটি kaupapa তদন্ত।

২০৩০ থেকে ২০৩৫ — বাকি আটটি kaupapa তদন্ত শেষ করা, আর অবশিষ্ট সমকালীন দাবিগুলোর তদন্ত শুরু করা।

দুই পর্বেই জরুরি হিসেবে মঞ্জুর হওয়া দাবি ও প্রতিকারের আবেদনগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির কাজ চলবে।

লক্ষণীয়, ২০২৫ সালে ট্রাইব্যুনাল তার পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করেছে, আর সেই উপলক্ষে একটি সম্মেলনও হয়েছে। অর্থাৎ পঞ্চাশ বছর পরেও কাজ শেষ হয়নি, এবং প্রতিষ্ঠানটি নিজেই আরও দশ বছরের পরিকল্পনা দিচ্ছে। চুক্তি-সংক্রান্ত হিসাব মেটানো প্রজন্মের কাজ — এটি সম্ভবত এই লেখার সবচেয়ে বাস্তব শিক্ষা।

ভাষা: ২০১৬ সালের আইনটি নিজেই দুই ভাষায়

নিউজিল্যান্ডের মাওরি ভাষা আইনের নাম Te Ture mō Te Reo Māori 2016 / Māori Language Act 2016 — আর আইনটির পাঠ প্রকাশিত হয় মাওরি ও ইংরেজি, দুই ভাষায় পাশাপাশি। অনুমোদনের তারিখ ২০১৬ সালের ২৯ এপ্রিল, Public Act 2016 No 17।

এই বিন্যাসটিই একটি উত্তর। ১৮৪০ সালে দুটি পাঠ ছিল এবং তারা মিলত না; ২০১৬ সালে রাষ্ট্র দুটি পাঠকে একই আইনের অংশ করে প্রকাশ করছে। শিরোনামেও মাওরি নামটি আগে।

আইনের উদ্দেশ্য-অংশে te reo Māori-কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে চারভাবে — এটি (i) iwi ও মাওরিদের taonga; (ii) …; (iii) জাতির কাছে মূল্যবান একটি ভাষা; এবং (iv) নিউজিল্যান্ডের একটি সরকারি ভাষা (an official language of New Zealand)। সঙ্গে দ্বিতীয় উদ্দেশ্য — ভাষাটিকে সমর্থন ও পুনরুজ্জীবনের উপায় তৈরি করা।

আইনের ৪ ধারায় মাওরি পাঠে লেখা আছে: “He taonga te reo Māori mā ngā iwi me ngāi Māori” — te reo Māori হলো iwi ও মাওরিদের taonga; আর “Ko ngā iwi me ngāi Māori ngā kaitiaki o te reo Māori” — iwi ও মাওরিরাই এই ভাষার kaitiaki, অর্থাৎ অভিভাবক বা রক্ষক।

লক্ষ করুন শব্দটি আবার taonga — ১৮৪০ সালের চুক্তির দ্বিতীয় ধারার সেই শব্দ। ভাষাকে taonga বলার মধ্য দিয়ে আইনটি চুক্তির সঙ্গে সরাসরি সুতো বেঁধে দিচ্ছে।

Te Mātāwai: ভাষার নেতৃত্ব কার হাতে

২০১৬ সালের আইনটি Te Mātāwai নামে একটি স্বাধীন সাংবিধানিক-আইনি সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে, যার কাজ iwi ও মাওরিদের পক্ষ থেকে ভাষার নেতৃত্ব দেওয়া — ভাষার kaitiaki হিসেবে তাঁদের ভূমিকায়।

আইনের ভাষা অনুযায়ী Te Mātāwai এবং মুকুট — দুই পক্ষ মিলে মাওরি ভাষার কৌশল তৈরি করবে, যার লক্ষ্য ভাষাভাষীর সংখ্যা বাড়ানো এবং তাঁদের দক্ষতার উন্নতি।

একই আইনে Te Taura Whiri (ভাষা কমিশন), Te Reo Whakapuaki Irirangi ও Māori Television Service-এর দায়িত্ব সমন্বয় করা হয়, আর Te Pūtahi Paoho বিলুপ্ত করা হয়।

কাঠামোটি লক্ষ করার মতো: ভাষা-নীতির নেতৃত্ব রাষ্ট্রের একক হাতে নয়, iwi ও মাওরিদের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি সংস্থার হাতে — আর কৌশল তৈরি হবে দুই পক্ষ মিলে। মাতৃভাষায় শিক্ষার আলোচনায় এই মডেলটি তুলনীয়।

কতজন te reo Māori বলেন

২০২৩ সালের আদমশুমারির ফল অনুযায়ী te reo Māori বলতে পারেন ২,১৩,৮৪৯ জন, যা ২০১৮ সালের ১,৮৫,৯৫৫-র চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। [এই সংখ্যাগুলো শুমারি-ফলের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে; Stats NZ-এর মূল প্রকাশনায় যাচাই করা হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]

কিন্তু একটি দ্বিতীয় সংখ্যা ছবিটি জটিল করে দেয়। মাওরিদের নিজেদের মধ্যে te reo বলতে পারার হার কার্যত বদলায়নি — ২০১৩ সালে ১৮.৪ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৮.৬ শতাংশ।

দুটি সংখ্যা একসঙ্গে পড়লে যা দাঁড়ায়: মোট বক্তার সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু মাওরি জনগোষ্ঠীর ভেতরে অনুপাত প্রায় একই। অর্থাৎ জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে বক্তার সংখ্যাও বাড়ছে, আর অমাওরিদের মধ্যেও ভাষা শেখার হার বাড়ছে — কিন্তু নিজের জনগোষ্ঠীর ভেতরে ভাষা ফেরানোর কাজটি এখনো বাকি।

আইন, কমিশন, বেতার, টেলিভিশন ও একটি স্বাধীন ভাষা-সংস্থা — এতকিছুর পরেও অনুপাতটি দশ বছরে ০.২ শতাংশ বিন্দু বেড়েছে। ভাষা পুনরুজ্জীবন প্রাতিষ্ঠানিক সমর্থন পেলেও দ্রুত হয় না — পাহাড়ের ভাষা-কর্মসূচির জন্য এটি একটি বাস্তব মাপকাঠি।

২০১৭: নদী একটি আইনি ব্যক্তি

দুরি হিল থেকে দেখা হোয়াঙ্গানুই শহর ও হোয়াঙ্গানুই নদী
দুরি হিল থেকে দেখা হোয়াঙ্গানুই শহর ও হোয়াঙ্গানুই নদী। ছবি: Avenue, উইকিমিডিয়া কমন্স, CC BY-SA 3.0 (মূল ফাইল)

২০১৭ সালের ২০ মার্চ অনুমোদিত Te Awa Tupua (Whanganui River Claims Settlement) Act 2017-এর ১৪ ধারায় লেখা আছে — “Te Awa Tupua is a legal person and has all the rights, powers, duties, and liabilities of a legal person.” অর্থাৎ হোয়াঙ্গানুই নদী একটি আইনি ব্যক্তি, মানুষ বা কোম্পানির মতোই অধিকার, ক্ষমতা, কর্তব্য ও দায় নিয়ে।

আইনটি Public Act 2017 No 7, আর এটি পরিচালনা করে মাওরি উন্নয়ন মন্ত্রণালয় — Te Puni Kōkiri।

কিন্তু “নদী” বলতে আইনটি কী বোঝাচ্ছে? ১২ ধারায় সংজ্ঞাটি দেওয়া আছে, আর সেটি কেবল পানির ধারা নয়: “Te Awa Tupua is an indivisible and living whole, comprising the Whanganui River from the mountains to the sea, incorporating all its physical and metaphysical elements.”

পর্বত থেকে সমুদ্র পর্যন্ত একটি অবিভাজ্য ও জীবন্ত সমগ্র — যার মধ্যে ভৌত ও অধিভৌত, দুই ধরনের উপাদানই আছে। একটি রাষ্ট্রীয় আইনে “metaphysical elements” শব্দবন্ধটি থাকা নিজেই লক্ষণীয়।

Tupua te Kawa: ‘আমিই নদী, নদীই আমি’

আইনের ১৩ ধারায় নদীর অন্তর্নিহিত মূল্যবোধগুলো লেখা আছে, নাম Tupua te Kawa — আর প্রতিটি মূল্যবোধ প্রথমে মাওরি ভাষায়, তারপর ইংরেজিতে। এগুলো আইনেরই অংশ, ভূমিকা নয়।

প্রথম কাওয়া — “Ko te Awa te mātāpuna o te ora: the River is the source of spiritual and physical sustenance.” আইনের ব্যাখ্যায়: Te Awa Tupua একটি আধ্যাত্মিক ও ভৌত সত্তা, যা নদীর ভেতরের জীবন ও প্রাকৃতিক সম্পদ এবং নদীর iwi, hapū ও অন্য জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও কল্যাণ — দুটোই ধারণ ও রক্ষা করে।

দ্বিতীয় কাওয়া — “E rere kau mai i te Awa nui mai i te Kahui Maunga ki Tangaroa: the great River flows from the mountains to the sea.”

তৃতীয় কাওয়া — “Ko au te Awa, ko te Awa ko au: I am the River and the River is me.”

শেষ বাক্যটি একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের আইনের ভেতরে লেখা। এটি কবিতা নয়, প্রস্তাবনা নয় — এটি একটি সংবিধিবদ্ধ মূল্যবোধ, যার ভিত্তিতে নদীর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী হোয়াঙ্গানুই নদীর iwi ও hapū-র সঙ্গে নদীর একটি অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক আছে।

Te Pou Tupua: নদীর মানুষ-মুখ

একটি নদী নিজে আদালতে যেতে পারে না। তাই আইনের ১৮ ধারায় তৈরি হয়েছে Te Pou Tupua নামে একটি দপ্তর, যা আইনের ভাষায় Te Awa Tupua-র “human face” — মানুষ-মুখ — এবং যা নদীর নামে কাজ করে।

১৪(২) ধারা অনুযায়ী নদীর অধিকার, ক্ষমতা ও কর্তব্য প্রয়োগ করবে এবং তার দায় নেবে Te Pou Tupua, নদীর পক্ষে ও নদীর নামে। আর ১৮(৩) ধারা অনুযায়ী এই দপ্তরের আছে পূর্ণ সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় সব ক্ষমতা।

১৯ ধারায় দপ্তরের কাজগুলো সাজানো:

  1. Te Awa Tupua-র পক্ষে ও তার হয়ে কথা বলা ও কাজ করা
  2. Te Awa Tupua-র আইনি মর্যাদা এবং Tupua te Kawa — দুটোই সমুন্নত রাখা
  3. নদীর স্বাস্থ্য ও কল্যাণের প্রসার ও সুরক্ষা
  4. নদীর নামে ন্যস্ত জমির জন্য ভূস্বামীর দায়িত্ব পালন (৪১(১) ধারায় ন্যস্ত জমি)

আইনে আরও কয়েকটি অঙ্গ আছে — Te Kōpuka (কৌশল-গোষ্ঠী), Te Heke Ngahuru (কৌশল), Te Karewao (উপদেষ্টা গোষ্ঠী, ২৭ ধারা), আর Te Korotete o Te Awa Tupua (Te Awa Tupua তহবিল)।

আর আইনটি tikanga শব্দের একটি সংজ্ঞাও দিয়েছে, যা এই গোটা আলোচনায় কাজে লাগে: “tikanga means customary law, values, and practices” — প্রথাগত আইন, মূল্যবোধ ও চর্চা। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় আইন প্রথাগত আইনকে নাম ধরে স্বীকৃতি দিচ্ছে।

পাহাড়ের পাঠকের জন্য: দুই পাঠের অমিল আর চুক্তি বাস্তবায়ন

মাওরিদের গল্পের সবচেয়ে কাজের অংশটি নিউজিল্যান্ডের ভূগোল নয়, বরং একটি পদ্ধতি — রাষ্ট্র কীভাবে নিজের চুক্তির অমিল স্বীকার করে তার মীমাংসার ব্যবস্থা বানাল। তিনটি মিল আর দুটি অমিল নিচে।

মিল এক — একই চুক্তির দুই পাঠ, দুই অর্থ। ১৮৪০-এ sovereignty বনাম kawanatanga, possession বনাম tino rangatiratanga। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়ন-তর্কেও প্রশ্নটি একই ধাঁচের: ধারায় কী লেখা আছে, আর দুই পক্ষ সেটিকে কীভাবে পড়ছে।

মিল দুই — চুক্তিকে ‘আইনত অস্তিত্বহীন’ বলার প্রবণতা। ১৮৭৭ সালে এক বিচারক চুক্তিকে legal nullity বলেছিলেন। চুক্তি রাজনৈতিক দলিল না আইনি দলিল — এই প্রশ্নটি পাহাড়েও ওঠে।

মিল তিন — সময়। ১৮৪০-এর চুক্তির হিসাব নিতে ট্রাইব্যুনাল তৈরি হয় ১৯৭৫-এ, ঐতিহাসিক দাবির অনুমতি মেলে ১৯৮৫-তে, আর ২০২৫-এ প্রতিষ্ঠানটি আরও দশ বছরের পরিকল্পনা দিচ্ছে। একশো পঁচাশি বছর পরেও কাজ শেষ হয়নি।

অমিল এক — এবং এটিই সবচেয়ে বড়। নিউজিল্যান্ড রাষ্ট্র আইনে লিখে রেখেছে যে দুই পাঠ মেলে না, আর সেই অমিল নিষ্পত্তির একান্ত কর্তৃত্ব একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়েছে। বাংলাদেশে চুক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে এমন কোনো নির্দিষ্ট ফোরাম নেই।

অমিল দুই — অনুপাত। মাওরি জনসংখ্যার ১৭.৩ শতাংশ; বাংলাদেশে আদিবাসী জনগোষ্ঠী প্রায় ১ শতাংশ। সংখ্যার ওজন রাজনীতিতে ফারাক তৈরি করে, আর সেটি অস্বীকার করার কিছু নেই।

শেষে একটি কথা, যা আর্কাইভেই লেখা আছে। জুমজার্নালে প্রকাশিত একটি সাক্ষাৎকারে ফেলিক্স প্যাডেল বলেছেন, “মাওরি, অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসী আর আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের ব্যাপারে যে ভবিষ্যৎবাণী করা হয়েছিল তা সঠিক হয়নি।” অর্থাৎ এই জনগোষ্ঠীগুলো মিলিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। যায়নি। ১৯৮৫-র সংশোধনী, ২০১৬-র দ্বিভাষিক আইন আর ২০১৭-র নদী-আইন সেই না-যাওয়ারই নথি।

চতুর্থ প্রতিশ্রুতি, যা দলিলে লেখা নেই

চুক্তির তিনটি ধারার বাইরে একটি চতুর্থ প্রতিশ্রুতির কথা নথিবদ্ধ আছে, যা চুক্তির কাগজে লেখা হয়নি — ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি। নিউজিল্যান্ডের জাতীয় সংগ্রহশালা Te Papa-র বিবরণ অনুযায়ী ওয়াইটাঙিতে মুখে বলা হয়েছিল:

“The Governor says the several faiths of England, of the Wesleyans, of Rome, and also Māori custom shall be alike protected by him.”

অর্থাৎ গভর্নর বলেছিলেন, ইংল্যান্ডের ধর্ম, ওয়েসলিয়ানদের ধর্ম, রোমের ধর্ম — এবং মাওরি প্রথা — সবই তিনি সমানভাবে রক্ষা করবেন।

শেষ অংশটি লক্ষণীয়। তিনটি খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের পাশে Māori custom-কে একই বাক্যে একই সুরক্ষার আওতায় রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ ১৮৪০ সালেই মাওরি প্রথাগত বিশ্বাস ও চর্চাকে রক্ষার কথা বলা হয়েছিল — কিন্তু কথাটি দলিলে ওঠেনি, ফলে আইনি ভার পায়নি।

পাহাড়ের আলোচনায় এই পার্থক্যটি কাজে লাগে: আলোচনার টেবিলে বলা কথা আর দলিলে লেখা কথা এক নয়। যেটি লেখা হয় না, সেটি পরে প্রমাণ করা কঠিন।

চুক্তির উপসংহারে একটি বাক্য, যা আজ অস্বস্তিকর

চুক্তির ইংরেজি পাঠের শেষ অংশে প্রধানরা ঘোষণা করছেন যে তাঁদের চুক্তির শর্তগুলো “fully to understand” করানো হয়েছে। পুরো বাক্যটি: প্রধানরা “having been made fully to understand the Provisions of the foregoing Treaty, accept and enter into the same in the full spirit and meaning thereof”।

দুই পাঠের অমিলের কথা মনে রাখলে এই বাক্যটি আজ অন্যভাবে পড়তে হয়। যাঁরা এই ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত হলেন, তাঁদের প্রায় সবাই সই করেছিলেন অন্য একটি পাঠে — যেখানে sovereignty-র জায়গায় ছিল kawanatanga, আর possession-এর জায়গায় tino rangatiratanga।

মাওরি পাঠের উপসংহারেও একটি সমতুল্য বাক্য আছে: প্রধানরা “ka kite nei i te ritenga o enei kupu” — কাওয়ারুর অনুবাদে, “having seen the shape of these words which we accept and agree”।

“এই শব্দগুলোর আকার দেখে” — বাক্যটি “শর্তগুলো সম্পূর্ণ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে”-র চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। ভাষার এই সূক্ষ্ম ফারাকই দেড়শো বছর পর একটি ট্রাইব্যুনালের কাজের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

মাওরি জাতি কোথায় বাস করে, আর কতজন?

মাওরি হলেন আওতেয়ারোয়া নিউজিল্যান্ডের আদিবাসী জনগোষ্ঠী। Stats NZ-এর সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৩ সালের ৩০ জুন তারিখে মাওরি জাতিগোষ্ঠীর জনসংখ্যা ৯,০৪,১০০ — দেশের মোট জনসংখ্যার ১৭.৩ শতাংশ, অর্থাৎ প্রতি ছয়জনে একজনের বেশি। এর মধ্যে পুরুষ ৪,৫০,২০০ এবং নারী ৪,৫৩,৯০০। মাওরি বংশধরের সংখ্যা আরও বেশি, প্রায় ৯,৭৮,২৪৬।

ওয়াইটাঙি চুক্তি কখন ও কোথায় সই হয়?

১৮৪০ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি, নিউজিল্যান্ডের বে অফ আইল্যান্ডসের ওয়াইটাঙিতে। সই করেন ক্যাপ্টেন উইলিয়াম হবসন, কয়েকজন ইংরেজ বাসিন্দা এবং ৪৩ থেকে ৪৬ জন মাওরি রাঙাতিরা। এরপর চুক্তিটি নর্থল্যান্ড ও দেশের অন্যান্য অংশে নিয়ে যাওয়া হয়; ওই বছরের শেষে ৫০০-র বেশি মাওরি সই করেছিলেন, যাঁদের ১৩ জন নারী।

চুক্তির দুই পাঠের মূল পার্থক্য কী?

দুটি ধারায়। প্রথম ধারায় ইংরেজি পাঠে মাওরিরা দিচ্ছেন ‘sovereignty’ অর্থাৎ সার্বভৌমত্ব, মাওরি পাঠে দিচ্ছেন ‘kawanatanga’ অর্থাৎ শাসনক্ষমতা। দ্বিতীয় ধারায় ইংরেজি পাঠে নিশ্চয়তা ‘undisturbed possession’ বা অবাধ দখলের, মাওরি পাঠে ‘tino rangatiratanga’ বা পূর্ণ প্রধানত্বের। ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনালের ভাষায় মাওরি পাঠ ইংরেজি পাঠের হুবহু অনুবাদ নয়।

কোন পাঠে বেশি মানুষ সই করেছিলেন?

মাওরি পাঠে। ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনালের নথি অনুযায়ী ইংরেজি পাঠ বহনকারী কাগজটিতে সই হয়েছিল কেবল ওয়াইকাটো হেডস ও মানুকাউতে, ৩৯ জন রাঙাতিরার হাতে। ওই বছরের শেষে মোট সইদাতা ছিলেন পাঁচশোরও বেশি, অর্থাৎ বাকি প্রায় সবাই সই করেছিলেন মাওরি পাঠে। এই তথ্যটিই চুক্তি-ব্যাখ্যার বিতর্কে সবচেয়ে বেশি ওজন রাখে, কারণ সইদাতারা যে পাঠ পড়ে সম্মতি দিয়েছিলেন সেটি মাওরি পাঠ — আর সেই পাঠের শব্দগুলোর অর্থ ইংরেজি পাঠের শব্দগুলোর সঙ্গে মেলে না।

‘taonga’ শব্দের তাৎপর্য কী?

মাওরি পাঠের দ্বিতীয় ধারায় ‘taonga’ শব্দটি আছে, যার অনুবাদ ‘treasures’; ইংরেজি পাঠে সেখানে ছিল ‘other properties’। ‘taonga’-র পরিধি সম্পত্তির চেয়ে বড় — এর ভেতরে আসে ভাষা, জ্ঞান, নদী, মৎস্যসম্পদ, এমনকি বেতার তরঙ্গ। ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনাল এসব বিষয়েই প্রতিবেদন দিয়েছে, যার ফলে ভাষা কমিশন ও মাওরি বেতারের মতো প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে।

ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনাল কী?

Treaty of Waitangi Act 1975 দিয়ে প্রতিষ্ঠিত একটি তদন্ত-প্রতিষ্ঠান, যা আইনের দ্বিতীয় তফসিল অনুযায়ী Commission of Inquiry হিসেবেও গণ্য। এর কাজ চুক্তি-সংক্রান্ত মাওরি দাবির তদন্ত ও সুপারিশ, প্রস্তাবিত আইন পরীক্ষা, এবং নির্দিষ্ট কিছু সরকারি জমি নিয়ে নির্ধারণ। চুক্তির অর্থ ও ফল নির্ধারণে এবং দুই পাঠের পার্থক্য নিষ্পত্তিতে এর একান্ত কর্তৃত্ব আছে। সদস্য সর্বোচ্চ ২০ জন।

ট্রাইব্যুনাল কত পিছন পর্যন্ত যেতে পারে?

১৮৪০ সাল পর্যন্ত। শুরুতে ট্রাইব্যুনাল কেবল চলতি সরকারি কাজকর্ম নিয়ে দাবি শুনতে পারত; ১৯৮৫ সালে সংসদ তাকে ১৮৪০ পর্যন্ত পিছিয়ে গিয়ে তদন্তের অনুমতি দেয়। এর ফলে শত শত ঐতিহাসিক দাবি আসে, যেগুলো জেলা-ভিত্তিক দলে ভাগ করে শুনানি হয়। তবে ২০০৮ সালে সংসদ নতুন ঐতিহাসিক দাবি নিবন্ধনের ক্ষমতা তুলে নেয়।

ট্রাইব্যুনাল চল্লিশ বছরে কী করেছে?

২০১৫ সালে চল্লিশ বছর পূর্তিতে ট্রাইব্যুনালের হিসাব: ২,৫০১টি দাবি নিবন্ধিত, ১,০২৮টি দাবিতে সম্পূর্ণ বা আংশিক প্রতিবেদন, ১২৩টি চূড়ান্ত প্রতিবেদন, আর জেলা-প্রতিবেদনে আচ্ছাদিত নিউজিল্যান্ডের ভূমির ৭৯ শতাংশ। সুপারিশ থেকে তৈরি হয়েছে মাওরি বেতার, মাওরি ভাষা কমিশন, মাওরি সম্প্রচার তহবিল সংস্থা ও মাওরি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

te reo Māori কি সরকারি ভাষা?

হ্যাঁ। Te Ture mō Te Reo Māori 2016 (Māori Language Act 2016, অনুমোদন ২৯ এপ্রিল ২০১৬) আইনে te reo Māori-কে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে iwi ও মাওরিদের taonga হিসেবে, জাতির কাছে মূল্যবান ভাষা হিসেবে, এবং নিউজিল্যান্ডের একটি সরকারি ভাষা হিসেবে। আইনটির পাঠ নিজেই মাওরি ও ইংরেজি দুই ভাষায় প্রকাশিত, আর শিরোনামে মাওরি নামটি আগে।

কতজন te reo Māori বলতে পারেন?

২০২৩ সালের শুমারির ফল অনুযায়ী ২,১৩,৮৪৯ জন, যা ২০১৮ সালের ১,৮৫,৯৫৫-র চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশি। তবে মাওরিদের নিজেদের মধ্যে ভাষা বলতে পারার হার কার্যত বদলায়নি — ২০১৩ সালে ১৮.৪ শতাংশ, ২০২৩ সালে ১৮.৬ শতাংশ। অর্থাৎ মোট বক্তা বাড়ছে, কিন্তু জনগোষ্ঠীর ভেতরে অনুপাত প্রায় একই।

হোয়াঙ্গানুই নদীকে আইনি ব্যক্তি ঘোষণা মানে কী?

Te Awa Tupua (Whanganui River Claims Settlement) Act 2017-এর ১৪ ধারায় লেখা আছে, Te Awa Tupua একটি আইনি ব্যক্তি এবং তার আইনি ব্যক্তির সব অধিকার, ক্ষমতা, কর্তব্য ও দায় আছে। ১২ ধারায় নদীকে বলা হয়েছে পর্বত থেকে সমুদ্র পর্যন্ত একটি অবিভাজ্য ও জীবন্ত সমগ্র, যার ভৌত ও অধিভৌত উভয় উপাদানই এর অন্তর্ভুক্ত। আইনটি অনুমোদিত হয় ২০১৭ সালের ২০ মার্চ।

নদীর পক্ষে কে কথা বলে?

Te Pou Tupua — আইনের ১৮ ধারায় প্রতিষ্ঠিত একটি দপ্তর, যাকে আইনেই Te Awa Tupua-র ‘human face’ বা মানুষ-মুখ বলা হয়েছে। ১৯ ধারা অনুযায়ী এর কাজ নদীর পক্ষে কথা বলা ও কাজ করা, নদীর আইনি মর্যাদা ও Tupua te Kawa মূল্যবোধ সমুন্নত রাখা, নদীর স্বাস্থ্য ও কল্যাণ রক্ষা, আর নদীর নামে ন্যস্ত জমির ভূস্বামীর দায়িত্ব পালন।

যা এখনো জানা যায়নি

এই লেখার ফাঁকগুলো নিচে খোলাখুলি লেখা আছে।

  • মাওরি বংশধরের সংখ্যা ও te reo বক্তার সংখ্যা — ৯,৭৮,২৪৬ এবং ২,১৩,৮৪৯ — এসেছে ২০২৩ শুমারির ফল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে, Stats NZ-এর মূল প্রকাশনা থেকে নয়। জাতিগত পরিচয়ের সংখ্যাটি (৯,০৪,১০০) অবশ্য Stats NZ-এর সরকারি প্রকাশনার।
  • চুক্তি সইয়ের তারিখ নিয়ে একটি ছোট অসঙ্গতি — ওয়াইটাঙি ট্রাইব্যুনাল বলছে ৬ ফেব্রুয়ারি ১৮৪০, আর Te Papa-র পাতায় ৪ ফেব্রুয়ারি উল্লেখ আছে। চুক্তির মাওরি ও ইংরেজি দুই পাঠেই লেখা আছে “te ono o nga ra o Pepueri” ও “the Sixth day of February”, তাই এখানে ৬ ফেব্রুয়ারিই ব্যবহার করা হয়েছে।
  • চুক্তি-নিষ্পত্তির আর্থিক হিসাব — কত দাবি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং মোট ক্ষতিপূরণের পরিমাণ কত, তার কোনো সংখ্যা এই লেখার উৎসে নেই।
  • ২০১৫-র পরের ট্রাইব্যুনাল-পরিসংখ্যান — ২,৫০১ দাবি ও ১২৩ প্রতিবেদনের হিসাব চল্লিশ বছর পূর্তির, অর্থাৎ ২০১৫ সালের। এর পরের দশ বছরের হালনাগাদ সংখ্যা জানা যায়নি।
  • kaupapa তদন্ত আসলে কী — ২০২৫–২০৩৫ কৌশলপত্রে এই শব্দটি কেন্দ্রীয়, কিন্তু এর সংজ্ঞা এই লেখার উৎসে বিস্তারিত নেই।
  • কোহাঙ্গা রেও (kōhanga reo) ভাষা-নীড়ের সংখ্যা ও শিক্ষার্থী — মাওরি ভাষা পুনরুজ্জীবনের সবচেয়ে পরিচিত কর্মসূচিটির কোনো সংখ্যা যাচাইযোগ্য উৎসে পাওয়া যায়নি, তাই এখানে সেটি নিয়ে দাবি করা হয়নি।
  • নদী-আইনের পর বাস্তবে কী বদলেছে — ২০১৭ সালের আইনের পর আদালতে বা প্রশাসনে Te Pou Tupua কতবার নদীর পক্ষে দাঁড়িয়েছে, তার কোনো হিসাব জানা যায়নি।
  • Te Korotete তহবিলের পরিমাণ — আইনে তহবিলটির উল্লেখ আছে, কিন্তু অর্থের অঙ্ক এই লেখার উৎসে নেই।

তথ্যসূত্র

  1. Waitangi Tribunal, “Māori and English texts” — চুক্তির দুই পাঠ, Treaty of Waitangi Act 1975-এর প্রথম তফসিল থেকে, সঙ্গে অধ্যাপক স্যার হিউ কাওয়ারুর সমকালীন অনুবাদ — waitangitribunal.govt.nz
  2. Waitangi Tribunal, “About the treaty” — সইয়ের তারিখ ও সংখ্যা, ইংরেজি পাঠে ৩৯ জনের সই, দুই পাঠের অমিল — waitangitribunal.govt.nz
  3. Waitangi Tribunal, “The Waitangi Tribunal” — ১৯৭৫-এর আইন, ১৮৭৭-এর ‘legal nullity’, ১৯৮৫ ও ২০০৮-এর বদল, ৪০ বছরের হিসাব, সৃষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো, ২০২৫–২০৩৫ কৌশলপত্র — waitangitribunal.govt.nz
  4. Stats NZ, Māori population estimates: At 30 June 2023, ১৬ নভেম্বর ২০২৩ — জনসংখ্যা, বৃদ্ধি ও মধ্যমা বয়স — stats.govt.nz
  5. Te Awa Tupua (Whanganui River Claims Settlement) Act 2017 (Public Act 2017 No 7) — ধারা ১২, ১৩, ১৪, ১৮, ১৯ — legislation.govt.nz
  6. Te Ture mō Te Reo Māori 2016 / Māori Language Act 2016 (Public Act 2016 No 17) — উদ্দেশ্য, ৪ ধারা, Te Mātāwai — legislation.govt.nz
  7. Museum of New Zealand Te Papa Tongarewa, “The content of the Treaty of Waitangi” — ধারা ধরে ধরে দুই পাঠের তুলনা, kawanatanga শব্দের উৎস — tepapa.govt.nz
  8. জুমজার্নাল আর্কাইভ, “ফেলিক্স প্যাডেল: আদিবাসী অর্থনীতিই হতে পারে ভবিষ্যত ভারতের” — মাওরি, অস্ট্রেলীয় আদিবাসী ও নেটিভ আমেরিকানদের নিয়ে ভবিষ্যৎবাণী প্রসঙ্গে

সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬

প্রসঙ্গ:আদিবাসী, আদিবাসী অধিকার, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ভাষা, নিউজিল্যান্ড, ভূমি অধিকার, মাওরি, মানবাধিকার

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা