
উৎস: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বিতর্ক — খণ্ড ২ সংখ্যা ১৫
তারিখ: বৃহস্পতিবার, ২১ জুন, ১৯৭৩
বিষয়: ১ নম্বর দাবি ছাঁটাই প্রস্তাব (ক)
শ্রী লারমা : জনাব স্পিকার, আমি প্রস্তাব করি যে, রেলওয়ে সাধারণ ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সরকারের ব্যর্থতা সম্পর্কে আলোচনা উত্থাপনকল্পে সাধারণ কার্য নির্বাহ ব্যয় (১) সাধারণ প্রশাসন শিরোনামাধীন ১নং দাবির (ক) প্রশাসন ব্যয় (১) সাধারণ ব্যবস্থাপনা (রেলওয়ে বোর্ড, পার্সোনেল প্রশাসন, পরিসংখ্যান, কর্মচারী কল্যাণ, পরিকল্পনা ও হিসাব পরীক্ষা দপ্তর) আইটেমের জন্য বরাদ্দকৃত ৩১,৬৬,০০০ টাকা থেকে ১০,০০,০০০ টাকা হ্রাস করা হোক।
জনাব স্পিকার : শ্রী লারমা, আপনার প্রস্তাবের সমর্থনে আপনার কিছু বলবার আছে কি?
শ্রী লারমা : হ্যাঁ, আছে। জনাব স্পিকার। মাননীয় স্পিকার, আমি যে এই ছাঁটাই প্রস্তাব এনেছি, তার পেছনে বড় যুক্তি হল রেলওয়ে প্রশাসন যেটা, সেটা যদি সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত না হয়, তাহলে রেলওয়ের উন্নতি বিধান কোনদিন হতে পারে না এবং রেলওয়ে প্রশাসন সুষ্ঠু ও সুন্দর হতে পারে না এবং তার যে সাধারণ ব্যবস্থাপনা সেটারও বাস্তবায়ন হতে পারে না। সাধারণ ব্যবস্থাপনার উপর রেলওয়ের উন্নতি নির্ভরশীল।
এই সাধারণ ব্যবস্থাপনার বিষয় নিয়ে আমার প্রধান বক্তব্য হল রেলওয়ে বোর্ড। রেলওয়ে বোর্ড সম্বন্ধে আগেকার আমলে আইন পরিষদে অনেক তর্ক-বিতর্ক হয়েছিল। সেহেতু তর্ক-বিতর্ক সম্বন্ধে আমার ব্যক্তিগত অভিমত এখনো শেষ হয় নাই। রেলওয়ে বোর্ড অনেক দিন আগে থেকেই চলে আসছে। সেই রেলওয়ে বোর্ডের যে কাঠামো সেই কাঠামোর এখনো পরিবর্তন হয় নাই। এই কাঠামোর যদি পরিবর্তন সাধন না হয়, তাহলে সেই আগের মানসিকতাই সব সময় বলবৎ থাকবে।
মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রীর নির্দেশে রেলওয়ে বোর্ড পরিচালিত হয় বটে কিন্তু তার গলদ হল এই যে, রেলওয়ে বোর্ডের প্রশাসন বর্তমানে যে ভারপ্রাপ্ত অফিসারের হাতে রয়েছে, সে অফিসারের হাতেই রেলওয়ের উন্নতি অবনতি সব কিছু দেখার ভার রয়েছে। তার ইচ্ছার উপরই সব কিছু নির্ভর করে। তাই রেলওয়ে বোর্ডের কাঠামো যদি পরিবর্তন সাধন করা না হয়, তাহলে রেলওয়ে সম্বন্ধে জনসাধারণের আগে যে রকম ধারণা ছিল, সেই রকম ধারণাই থেকে যাবে। কারণ সরকার-এর এগিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি আছে।
রেলওয়ে তার একটি বিভাগ বা শাখা। এই শাখাকে শক্তিশালী করতে হলে সরকারের যে কর্মসূচি— বর্তমান বছর থেকে শুরু হয়েছে তা আগামী দিনের জন্য সুষ্ঠু অর্থনীতির ভিত গড়ে তোলা। এই অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য যে নীতি, এই রেলওয়ে বোর্ডের দ্বারা তার বাস্তবায়নে বাধার সৃষ্টি হবে। সেই পাকিস্তানী আমলের মানসিকতা, সেই বৃটিশ আমলের মানসিকতা, এইভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে রেলওয়ের উন্নতি কোন কালেই সম্ভব নয়।
শ্রী লারমা : জনাব স্পিকার সাহেব, এই মিতব্যয় ছাঁটাই কেন করা হল? রেলওয়ের প্রশাসন ব্যবস্থায় কয়েক হাজার কর্মচারী রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রেলওয়ে বোর্ড, পার্সোনেল প্রশাসন, পরিসংখ্যান, কর্মচারী কল্যাণ, পরিকল্পনা ও হিসাব পরীক্ষা দপ্তর। উপরে চেয়ারম্যান পর্যন্ত এর মধ্যে রয়েছে। তাঁরা থাকে সবচেয়ে আরামে। সেই বৃটিশ আমলে, পাকিস্তানী আমলে যেসব সুযোগ-সুবিধা, আরাম-আয়েসের ব্যবস্থা কতিপয় কর্মচারীর জন্য করা হয়েছিল, তাঁরা আজো তা ভোগ করে চলেছেন।
আমরা আমাদের কর্মসূচির মাধ্যমে, সংবিধানের মাধ্যমে দেশের জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, আমরা সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির ভিত্তিতে দেশকে গড়ে তুলব এবং ধীরে ধীরে দেশকে সমাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাব। সেখানে প্রথম থেকেই যদি আমরা এটা ভঙ্গ করি, তাহলে আগামীতে যাঁরা আসবে, তাঁরা বলবে যে, আমরা শুধু কাগজে-পত্রে সমাজতন্ত্র বাস্তবায়িত করে গেছি, কাজে-কর্মে কিছুই করি নাই।
মাননীয় স্পিকার সাহেব, কিছুদিন আগে এ বিষয়ে তুমুল বিতর্ক হয়েছিল। তখন আমাদের বর্তমান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব আব্দুল মালেক উকিল রেলওয়ে বোর্ডকে White Elephant বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। তিনি তৎকালীন প্রাদেশিক সরকারের ১৯৬৬-৬৭ সালের রেলওয়ে বাজেট-এর উপর বক্তৃতায় বলেছিলেন, ‘What is the use of maintaining a white elephant ?’ তিনি এই বলে সমালোচনা করেছিলেন যে, ‘এটা যদি জনগণের কোন কাজে না আসে তাহলে এই White Elephant পোষে লাভ কি?’ সেজন্য আমি অন্য কোন অর্থে এটাকে বিবেচনা করছি না। এটা বৃটিশ, পাকিস্তানী মানসিকতার ফল।
আজকে আমরা নতুন যাত্রা পথে এগিয়ে চলছি। কাজেই আজকে এই White Elephant-এর মানসিকতার পরিবর্তন করে একে কাজের উপযোগী করতে হবে। জনাব স্পিকার সাহেব, সেই সময় জনাব আসাদুজ্জামান সাহেবও এর খুব সমালোচনা করেছিলেন। সেই সমালোচনার সময় তিন বলেছিলেন — ‘I would call upon everybody who is concerned in the welfare of the people, in the welfare of this state, to put their heads together and do something to save this country, because people are dissatisfied and there is dissatisfaction in the rank and file of the Government officials in every department which is rather dangerous for a country.’ তিনি সে সময় এভাবে এই রেলের সাধারণ ব্যবস্থা সম্বন্ধে বলে সরকারকে সাবধান করেছিলেন। সেই মাননীয় সদস্য জনাব আসাদুজ্জামান সাহেব, মাননীয় সদস্য জনাব আব্দুল মালেক উকিল সাহেব, তখন যে কথা বলেছিলেন, আজ ঠিক তার উল্টো কথা বলছেন।
জনাব স্পিকার সাহেব, ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আজকে সেই রেলওয়ে বাজেটে রেলওয়ে বোর্ডের কর্মচারীদের আরাম-আয়েসের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে ৩১ লক্ষ ৬৬ হাজার টাকা। অথচ এই বাবদে ১৯৭২-৭৩ সালে বরাদ্দ ছিল ২৭ লক্ষ ২১ হাজার টাকা। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, এদের জন্য আরও কিছু বেশি সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অথচ রেলওয়েতে যেসব নিম্নশ্রেণির কর্মচারী রয়েছে, যেমন- লাইনম্যান, সিগনালম্যান, এদের কল্যাণের জন্য কিছুই করা হয় নাই। সুতরাং আমাদের এ ব্যাপারে একটা পরিকল্পনা করা উচিত। আজকে আমাদের অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তনের জন্য আমরা কোটি কোটি মানুষের কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আমরা তা ভঙ্গ করতে পারব না। আমরা দেশকে বিপদে ফেলতে পারব না। আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাব উন্নতির দিকে। এখানে দেখা যায় একজন ‘পয়েন্টসম্যান’, একজন ট্রেনের টিকেট কালেক্টরের বেতন আর রেলওয়ে বোর্ডের কর্মচারীদের বেতনের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এর উপর আমি আরও ছাঁটাই প্রস্তাব এনেছি। সেগুলি হচ্ছে—(ঙ), (চ), (ছ) ও (জ)।
জনাব স্পিকার সাহেব, আজকে আমাদের এটা সম্পূর্ণরূপে চিন্তা করা উচিত, যাঁরা পাকিস্তান আমলে, বৃটিশ আমলে সব সময় সুখে-শান্তিতে, আরাম-আয়েসের সাথে জীবন-যাপন করে এসেছিল, যাঁদের ১০/১২ কামরার বাড়ি দেওয়া হয়েছিল তাঁরা সেখানে সব সময় আরাম-আয়েস করেছেন এবং এখনও করছেন। আর সেই ‘পয়েন্টসম্যান’ দিন-রাত কাজ করে, তাঁরা বৃষ্টিতে ভিজে, কড়া রৌদ্রে পুড়ে কাজ করেন অথচ তাঁদের জন্য থাকার সুবন্দোবস্ত নেই। আজকে সরকারি বিনিয়োগের প্রতিদান খাতে বাজেটে ২ কোটি ৪৫ লক্ষ ৭৩ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। এটা আয় কারা করবে? এইসব নিম্ন বেতনের কর্মচারীরা এ টাকা আয় করে দিচ্ছে। আজকে প্রথম ও দ্বিতীয় গ্রেডের কর্মচারীর পরিশ্রম করছেন নিচের দিকের কর্মচারীরাই প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করে যাচ্ছে। কাজেই আমি যে ছাঁটাই প্রস্তাব এনেছি, সেটা আমি এখানে ব্যাখ্যা করলাম।
জনাব স্পিকার : মি. লারমা আপনি কি প্রত্যাহার করছেন?
শ্রী লারমা : না, প্রত্যাহার করব না। (বাধা প্ৰদান)
জনাব স্পিকার : মি. লারমা আপনি কি প্রত্যাহার করছেন?
শ্রী লারমা : মি. স্পিকার, স্যার, আমি সন্তোষজনক জবাব পাই নাই, তাই আমি প্রত্যাহার করতে পারি না। (বাধা প্রদান )
জনাব স্পিকার : আপনার কথা আমি বুঝতে পারছি না।
শ্রী লারমা : মাননীয় যোগাযোগ মন্ত্রী সাহেব যে কথা বলেছেন, তাতে আমি ঠিকমত জবাব পাইনি, কাজেই যোগাযোগ মন্ত্রী মহোদয় আমাকে প্রস্তাব প্রত্যাহার করার যে অনুরোধ করেছেন তা আমি রক্ষা করতে পারছি না।
….(প্রস্তাবটি ধ্বনি ভোটে নাকচ হয়ে যায়)….
প্রসঙ্গ:এমএন লারমা, জুম্ম, পার্বত্য চট্টগ্রাম, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।