Jumjournal Logo

গোজেন লামা: শিবচরণের ঈশ্বর নামা, আর তার শ্রেণি নিয়ে তিনটি দাবি

Last updated Oct 15th, 2026

0

Featured image

গোজেন লামা চাকমা সাহিত্যের সবচেয়ে পরিচিত পুরনো রচনা, আর তার নামের অর্থও পরিচিত একটি শব্দে দেওয়া — ঈশ্বর নামা।

কিন্তু এটি ঠিক কী ধরনের বই, তা নিয়ে উৎসগুলো একমত নয়। কোথাও তাকে বলা হয়েছে কাব্যগ্রন্থ, কোথাও পালা বা গীতিকবিতা, আর কোথাও ধর্মগ্রন্থ।

এই পাতায় সেই তিনটি দাবি পাশাপাশি রাখা হলো — কে কী বলেছেন, আর কোন তথ্যটি কোথা থেকে এসেছে।

সূচিপত্র

নামের অর্থ: গোজেন মানে কী

জুমজার্নালের আর্কাইভে গোজেন লামার নামের অর্থ সরাসরি দেওয়া আছে — সাধক কবি শিবচরণ চাকমার জীবন কথা-য় লেখা, এটি ‘গোজেন লামা’ অর্থাৎ ‘ঈশ্বর নামা’।

আর শব্দটির অর্থ আর্কাইভের আরেক জায়গাতেও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়। চাকমা লোককথা: সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী-তে সৃষ্টিকর্তার নাম গোজেন, আর পাঠে বন্ধনীতে ব্যাখ্যা দেওয়া — অর্থাৎ ঈশ্বর।

লামা শব্দটির অর্থ পাঠে আলাদা করে দেওয়া নেই, তবে নামের অনুবাদ থেকেই তা অনুমান করা যায় — নামা, অর্থাৎ বৃত্তান্ত বা গ্রন্থ। প্রতিধ্বনি-র একটি লেখাতেও বলা হয়েছে শিরোনামের শব্দটি ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তা বোঝায়।

অর্থাৎ নামটি একটি বিষয়ও নির্দেশ করে: এটি ঈশ্বর-সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ, আর তার সঙ্গে সৃষ্টির কাহিনিও জড়িত।

[লামা শব্দটির ভাষাগত ব্যুৎপত্তি কোনো পঠিত উৎসে দেওয়া নেই — যাচাই প্রয়োজন]

কে লিখেছেন: উদাসী শিবচরণ চাকমা

দুটি আলাদা উৎস গোজেন লামার রচয়িতা হিসেবে একই নাম দেয় — শিবচরণ চাকমা। তবে দুটি উৎসে তাঁর পরিচয়ের শব্দ আলাদা।

জুমজার্নালের আর্কাইভে তাঁকে বলা হয়েছে “চাকমা সাহিত্যের আদি কবি ও সাধক”, আর “পার্বত্য চট্টগ্রামে এক কিংবদন্তি চরিত্র”। পাঠে তাঁর রচনাকে বলা হয়েছে কাব্যগ্রন্থ।

প্রতিধ্বনি-র লেখায় তাঁকে বলা হয়েছে “অলৌকিক শক্তিধর উদাসী শিবচরণ চাকমা”, আর বাক্যটিতে দাবির মাত্রাও স্পষ্ট করা আছে — “…রচনা করেছেন বলে মনে করেন ঐতিহাসিকেরা”।

অর্থাৎ রচয়িতার নামটি নিশ্চিত নয়, অনুমিত — আর দুটি উৎসের একটি তা স্পষ্ট করে বলে দেয়।

“উদাসী” শব্দটিও কেবল বিশেষণ নয়। আর্কাইভের জীবনকথায় তাঁর স্বভাবের বর্ণনাই তা ব্যাখ্যা করে — শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন “সংসারের প্রতি উদাসীন ভাবুক প্রকৃতির”, আর কিশোর বয়সেই গভীর অরণ্যে নির্জন জায়গায় গিয়ে ধ্যান করতেন।

পাঠে তাঁর ভাবনার বিষয়ও দেওয়া আছে, আর তা গোজেন লামার বিষয়ের সঙ্গে মেলে: “পৃথিবীতে কেন এমন হয়, কারা করেন এসব ভাবতেন।”

১১৮৪ বঙ্গাব্দ: একটি সন, আর তার ভেতরের অসঙ্গতি

গোজেন লামা নিয়ে যে সনটি সবচেয়ে বেশি উদ্ধৃত হয় — ১১৮৪ বঙ্গাব্দ — সেটি আসলে বইটির রচনাকাল নয়। আর্কাইভের উৎস অনুযায়ী এটি শিবচরণের জন্মকাল, আর তা-ও অনুমান।

বাক্যটি আর্কাইভের জীবনকথায় হুবহু এরকম: “তাঁর জন্মকাল সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও বাংলা ১১৮৪ এবং ইংরেজি ১৭৪০-৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বলে অনুমান করা যায়।”

তিনটি জিনিস এখানে লক্ষণীয়।

এক — এটি জন্মকাল, রচনাকাল নয়। গোজেন লামা কখন রচিত হয়েছিল, সেই তথ্য কোনো পঠিত উৎসে নেই।

দুই — উৎস নিজেই এটিকে অনুমান বলছে। বাক্যে “সঠিক কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও” আর “অনুমান করা যায়” — দুটোই আছে।

তিন — দুটি সনের মধ্যে একটি অসঙ্গতি আছে। বঙ্গাব্দ ১১৮৪ সাধারণ হিসাবে ১৭৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দের সমান; অথচ একই বাক্যে ইংরেজি সন দেওয়া ১৭৪০-৫০। দুটি সন একসঙ্গে মেলে না।

যা লেখা আছেপ্রচলিত হিসাবে যা হয়
বাংলা ১১৮৪প্রায় ১৭৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দ
ইংরেজি ১৭৪০-৫০প্রায় ১১৪৭-৫৭ বঙ্গাব্দ

অর্থাৎ উৎসের দুটি সনের মধ্যে প্রায় তিরিশ বছরের ফারাক। কোনটি মুদ্রণের ভুল, কিংবা দুটোই দুটো আলাদা অনুমান — তা বাক্য থেকে বলা যায় না।

[এই অসঙ্গতি নিয়ে কোনো পঠিত উৎসে আলোচনা পাওয়া যায়নি, আর মূল বইটির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]

সেজন্যই এই পাতার শিরোনামে কোনো সন দেওয়া হয়নি। একটি অনুমিত জন্মসনকে রচনাকাল হিসেবে চালিয়ে দেওয়া সহজ, আর সেটি একটি ভুল যা পরে বহুবার উদ্ধৃত হতে পারে।

শিবচরণের জীবন: শিলক থেকে তৈনছড়ি

আর্কাইভের জীবনকথা-য় শিবচরণের জীবনের কয়েকটি নির্দিষ্ট তথ্য নাম ধরে দেওয়া আছে, আর সেগুলো একসঙ্গে রাখলে একটি অভিবাসনের ছবিও পাওয়া যায়।

তথ্যআর্কাইভে যা লেখা
জন্মস্থানকাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী নদীর উপনদী শিলকের তীরে ‘উয়ারা ওযাহ্’ নামক স্থান
পিতাধূংবী
মাতাধর্মবী চাকমা
ভাইবোনদুই সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ; জ্যেষ্ঠ ভাই কালিচরণ
প্রথম শিক্ষকমাতুল সম্পর্কীয় হরমণি
ভাবশিষ্যচিত্তঙ্যা ওরফে চিধং

পিতার মৃত্যু হয় তাঁর শৈশবেই, আর তখন “পরিবারে গুরু দায়িত্ব নিতে হয় জ্যোষ্ঠ ভাই কালিচরণকে”।

পড়াশোনায় উৎসাহ দিতেন মা ও বড় ভাই — অর্থাৎ পরিবারে বিরোধ ছিল শিক্ষা নিয়ে নয়, সংসার নিয়ে।

অভিবাসনের অংশটি রাজনৈতিক, আর তা তারিখহীন হলেও নাম ধরে দেওয়া। শুল্ক প্রদানের বিরোধ নিয়ে চাকমা রাজা শুকদেব রায় তৎকালীন ব্রিটিশদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন, আর রাজার সেনাপতি রুনু খাঁর সঙ্গে ব্রিটিশদের কয়েকবার যুদ্ধ হয়।

ফলাফল একটি গণ-স্থানান্তর: চাকমারা শিলক নদীর তীর ছেড়ে “বাপ দাদার বাস্তুভিটা ছেড়ে” মাতামুহুরী নদীর তৈনছড়ির তীরে চলে যেতে বাধ্য হন — আর শিবচরণের পরিবারও সঙ্গে।

এই স্থাননামটি আর্কাইভে আরেকবার ফিরে আসে, আর সেখানে একটি জনগোষ্ঠীর নামের ব্যুৎপত্তির সঙ্গে জড়িয়ে — তঞ্চঙ্গ্যা কলাত্থুর কন্যা পাঠে বলা হয়েছে, তৈনছড়িতে বসতি গড়ার কারণেই তাঁরা তৈনছর্য্যা নামে পরিচিত হন।

অর্থাৎ একই নদীর তীর দুটি আলাদা কাহিনির কেন্দ্রে — একটিতে একজন কবির পরিবারের আশ্রয়, অন্যটিতে একটি জনগোষ্ঠীর নামের উৎপত্তি।

অন্তর্ধানের সন্ধ্যা: বইটি যেভাবে হাতবদল হয়

গোজেন লামা সংক্রান্ত সবচেয়ে নির্দিষ্ট ঘটনাটি বইটির রচনা নয় — তার হাতবদল। আর তা ঘটে একটি সন্ধ্যায়, কবির অদৃশ্য হওয়ার ঠিক আগে।

আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী শিবচরণ এক পর্যায়ে “মর্ত্যলোক থেকে অন্তর্ধান” করেন, আর কোনোদিন ফিরে আসেননি।

তার আগে যা ঘটে তা একটি নির্দিষ্ট দৃশ্য: এক সন্ধ্যায় তিনি বন্ধুদের ডেকে তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘গোজেন লামা’ পড়ে শোনান, কাব্যটি তাঁদের হাতে তুলে দেন, আর অদৃশ্য হয়ে যান।

এই এক বাক্যে তিনটি কাজ আছে — পাঠ, হস্তান্তর আর প্রস্থান। আর এটিই ব্যাখ্যা করে কেন বইটি টিকে গেল: রচয়িতা থাকলেন না, কিন্তু পাঠ থেকে গেল।

আর্কাইভের জীবনকথায় তাঁর অলৌকিক ক্ষমতার আরেকটি জনশ্রুতিও আছে। মা একদিন বেইন — পাঠে অর্থ দেওয়া, তাঁত — বুনতে বুনতে তাঁকে সংসারী হতে বলেন, আর তিনি উত্তর দেন, ধরতে পারলে মায়ের জয় হবে।

মা ধরতে গেলে দেখেন তিনি অদৃশ্য; আর বেইন বোনা থামিয়ে কুত্তি — পাঠে অর্থ দেওয়া, মাটির তৈরি জলপাত্র — থেকে জল খেতে গিয়ে দেখেন সেই কুত্তির ছোট নলের ভেতরে শিবচরণ “পুতুলের মত বসে আছেন”।

তারপর মা আর কোনোদিন তাঁকে সংসারী হতে বলেননি।

এই গল্পটি গোজেন লামার বিষয় নয়, কিন্তু তার লেখকের পরিচয়ের অংশ — আর সেজন্যই প্রতিধ্বনির লেখায় তাঁকে “অলৌকিক শক্তিধর” বলা হয়েছে।

তিনটি দাবি: কাব্যগ্রন্থ, পালা, না ধর্মগ্রন্থ

গোজেন লামা ঠিক কী ধরনের রচনা — এই প্রশ্নে তিনটি উৎস তিনটি আলাদা উত্তর দেয়। আর তিনটিই নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করে।

উৎসযে শব্দে বর্ণনা করাসঙ্গে যা বলা আছে
জুমজার্নাল — শিবচরণের জীবন কথাকাব্যগ্রন্থ“তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘গোজেন লামা’ অর্থাৎ ‘ঈশ্বর নামা’”
প্রতিধ্বনি — চম্পকনগরের চাকমা সাহিত্যপালা ও গীতিকবিতা“চাকমা লোকসাহিত্যের সবচেয়ে জনপ্রিয় পালা বা গান”
জুমজার্নাল — ভারতের চাকমা ভাষা ও সাহিত্যধর্মগ্রন্থ“চাকমাদের ধর্মগ্রন্থ আগর তারা, গোজেন লামা, তাল্লিক শাস্ত্র চাকমা লিপিতে লিখিত হয়েছে”

তিনটি দাবি পরস্পরবিরোধী নয়, আর সেটিই এখানে আসল কথা। একটি রচনা একইসঙ্গে কাব্য, গেয় পালা আর ধর্মীয় পাঠ হতে পারে — বিশেষ করে যদি তা সৃষ্টির কাহিনি নিয়ে হয় আর গেংখুলিরা তা গেয়ে থাকেন।

তবে পার্থক্যটি ব্যবহারিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মগ্রন্থ হলে তার একটি প্রমাণিত পাঠ থাকার কথা; পালা হলে প্রতিটি পরিবেশনায় তা বদলায়।

আর গেংখুলি পরিবেশনার ক্ষেত্রে বদলানোটাই নিয়ম। প্রথম আলো-র একটি লেখায় বলা হয়েছে, নির্দিষ্ট লিখিত পাঠ না থাকায় প্রত্যেক পরিবেশক কাহিনি বদলে নেন — কারও পরিবেশনায় মিলন, কারও পরিবেশনায় বিচ্ছেদ।

[গোজেন লামার কোনো প্রমাণিত বা সমালোচনামূলক সংস্করণ আছে কি না, তা কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি — যাচাই প্রয়োজন]

বিষয়বস্তু: সৃষ্টির কাহিনি

গোজেন লামার বিষয় নিয়ে পঠিত উৎসগুলো একমত। প্রতিধ্বনি-র লেখা অনুযায়ী এতে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয় মিশে আছে, আর এতে পৃথিবী ও জীবজগতের সৃষ্টির বর্ণনা আছে।

নামের অর্থের সঙ্গে এটি মেলে — ঈশ্বর নামা, অর্থাৎ ঈশ্বর-বৃত্তান্ত।

আর শিবচরণের নিজের ভাবনার সঙ্গেও মেলে। আর্কাইভের জীবনকথায় তাঁর কিশোর বয়সের প্রশ্নগুলোই এই বিষয়: “পৃথিবীতে কেন এমন হয়, কারা করেন এসব ভাবতেন।”

তবে বইটির ভেতরে ঠিক কী আছে — কত পর্ব, কোন কোন ঘটনা, কোন ক্রমে — সেই বিবরণ কোনো পঠিত উৎসে নেই।

তুলনার জন্য একটি কথা। প্রতিধ্বনি-র একই লেখায় আরেকটি চাকমা ধর্মীয় পুঁথির কথা আছে — আগরতারা, যা পুরোপুরি চাকমা লিপিতে লেখা আর ২৮টি পর্বে বিভক্ত, আর যাকে মূলত পালি সুত্তের অপভ্রংশ বলা হয়েছে।

অর্থাৎ আগরতারার গঠন সম্পর্কে যা জানা যায়, গোজেন লামা সম্পর্কে তা জানা যায় না। [গোজেন লামার পর্বসংখ্যা ও অধ্যায়-বিন্যাস কোনো পঠিত উৎসে দেওয়া নেই]

চাকমা লিপিতে লেখা তিনটি বই

গোজেন লামা একা নয়। জুমজার্নালের একটি লেখায় চাকমা লিপিতে লেখা তিনটি ধর্মগ্রন্থের নাম একসঙ্গে দেওয়া আছে — আগর তারা, গোজেন লামা আর তাল্লিক শাস্ত্র।

তিনটি নাম একসঙ্গে থাকার অর্থ, এগুলো একটি লিখিত ঐতিহ্যের অংশ — কেবল মুখে মুখে চলা পালা নয়।

আর সেই লিপির ইতিহাসও একই লেখায় আছে। পাঠ অনুযায়ী বাংলা ভাষা ও বাংলা লিপির প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে চাকমা লিপির ব্যবহার কমতে থাকে।

লেখাটিতে সেই পরিবর্তনের সঙ্গে একটি নামও জড়িয়ে আছে — রানি কালিন্দীর উদ্যোগ, আর সময়কাল হিসেবে ১৮৪৪-১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ।

এর একটি সরাসরি ফল আছে গোজেন লামার জন্য। যে লিপিতে বইটি লেখা, সেই লিপিই পরে পাঠকের কাছে অপরিচিত হয়ে যায় — আর সেজন্যই পরবর্তী প্রকাশনাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

একই লেখা অনুযায়ী আজ মিজোরামে সিএডিসি-র অধীনে ১৭৪টি স্কুলে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত চাকমা লিপিতে পঠন-পাঠন চলে। [এই সংখ্যাটি কোন বছরের, তা লেখায় বলা নেই]

পাহাড়ি ভাষার লিপি ও মাতৃভাষায় শিক্ষার বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি ভাষা ও মাতৃভাষায় শিক্ষা-য়।

ছাপার অক্ষরে: ত্রিপুর চন্দ্র সেন, ১৯৬৯

গোজেন লামা সংক্রান্ত সবচেয়ে নির্দিষ্ট ও যাচাইযোগ্য তথ্যটি প্রকাশনার। জুমজার্নালের লেখা অনুযায়ী ত্রিপুর চন্দ্র সেন ‘গোজেন লামা’ নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করেন, আর সন হিসেবে দেওয়া ১৯৬৯।

বাক্যটি হুবহু: “ত্রিপুর চন্দ্র সেন ‘গোজেন লামা’ নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করেন।”

আর উপাদান কোথা থেকে পেলেন, তাও লেখায় আছে — মাধব মাস্টার কর্মীর আত্মীয়দের কাছ থেকে।

এই এক বাক্যে মৌখিক ঐতিহ্য থেকে মুদ্রিত বইয়ে যাওয়ার পথটি দেখা যায়: কবি অদৃশ্য হন, পাঠ বন্ধুদের হাতে যায়, তারপর আত্মীয়দের হাতে, আর শেষে একজন প্রকাশকের হাতে।

আর্কাইভের জীবনকথার শেষেও একটি প্রকাশনার কৃতজ্ঞতা আছে, আর সেখানে গোজেন লামার আরেকজন প্রকাশকের নাম — ইন্টুমণি তালুকদার, রেগা প্রকাশনী, যাঁকে লেখাটিতে “গোজেন লামা বইটির প্রকাশক”ও বলা হয়েছে।

অর্থাৎ অন্তত দুটি প্রকাশনা-উদ্যোগের নাম পাওয়া যায়, আর দুটির মধ্যে সময়ের ফারাক অনেক। [রেগা প্রকাশনীর সংস্করণটি কোন সালের, তা কোনো পঠিত উৎসে নেই — যাচাই প্রয়োজন]

জীবনকথাটির নিজের উৎসও দেওয়া আছে: বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি, রাঙ্গামাটি, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ২০১৪।

লুরিরা: যাঁরা গোজেনকে সবার উপরে রাখতেন

গোজেন কেবল একটি বইয়ের শিরোনাম নয় — জুমজার্নালের একটি দীর্ঘ লেখা অনুযায়ী এটি একটি নির্দিষ্ট ভিক্ষুসংঘের ধর্মচর্চার কেন্দ্রীয় নাম।

লেখাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাসকারী একটি সংঘ-সমাজ নিয়ে, যাঁরা নিজেদের মহাযানী বৌদ্ধধর্মের অনুসারী বলে দাবি করেন, আর স্থানীয়দের কাছে “লুরি” নামেই অধিক পরিচিত।

লেখাটিতে গোজেন নামের উৎপত্তি নিয়ে একটি ব্যাখ্যা আছে, আর তা তুলনামূলক: তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মে মহাযানীরা যেমন হিন্দু দেব-দেবীর পাশাপাশি নিজেদের মতো দেবতার আবির্ভাব ঘটিয়েছিলেন, “তেমনি লুরিরাও বিভিন্ন হিন্দু দেব-দেবীর পাশাপাশি একটি সৃষ্টিকর্তা বা দেবতার কল্পনা করে যার নাম তাঁরা দিয়েছে ‘গোজেন’”।

আর তাঁদের চর্চায় সেই নামের অবস্থানও দেওয়া — লুরিরা “সৃষ্টিকর্তা গোজেনকে সবার উপরে রেখেই” সব ধর্মীয় কাজ করতেন।

এই প্রসঙ্গটি গোজেন লামাকে একটি ব্যবহারিক কাঠামোর ভেতরে বসিয়ে দেয়। বইটি কেবল সাহিত্য নয় — যাঁরা তা ব্যবহার করতেন, তাঁদের একটি পদ ছিল, আর তাঁদের একটি আচার-ব্যবস্থা ছিল।

লুরিদের কাজের বিবরণও লেখাটিতে আছে, আর তা একটি পদ্যে — কবি ও ভাষা গবেষক মুকুন্দ চাঙমা-র লেখা, বঙ্গানুবাদসহ। অনুবাদ অনুযায়ী লুরিরা মৃতের দাহ ও শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে পুণ্যকর্ম করে দিতেন, সীবলী পূজা করতেন, আর আগরতারা পড়তেন।

পদ্যের বঙ্গানুবাদে আগরতারার পরিচয়ও বন্ধনীতে দেওয়া — “চাকমাদের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ”।

অর্থাৎ আগরতারা পড়া হতো আচারে, আর গোজেন লামা গাওয়া হতো পরিবেশনায় — দুটি বইয়ের ব্যবহারের ধরন আলাদা, যদিও দুটোই চাকমা লিপিতে লেখা ধর্মগ্রন্থ হিসেবে একসঙ্গে উল্লিখিত হয়।

লেখাটি নিজেই গবেষণার অভাবের কথাও বলে: লুরিদের বিষয়ে “আজ অবদি তেমন কোন গবেষণা কর্ম সম্পাদিত হয়নি”, আর সেজন্য তাঁদের ইতিহাস ও ধর্মমত নিয়ে দালিলিক প্রমাণ হাজির করা সম্ভব হয়নি।

এই স্বীকারোক্তিটি গোজেন লামার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য — বইটি যাঁদের, তাঁদের নিয়েই গবেষণা কম।

লুরিদের ইতিহাস, তাঁদের মহাযানী দাবি ও আচার নিয়ে পূর্ণ আলোচনা আছে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাচীন বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ “লুরি”দের ইতিহাস-এ।

চাকমা লিপি কারা ব্যবহার করতেন

গোজেন লামা যে লিপিতে লেখা, সেই লিপির ব্যবহার কখনোই সর্বজনীন ছিল না। জুমজার্নালের লেখা অনুযায়ী তা ছিল “সীমিত”, আর ব্যবহারকারীরা ছিলেন দুটি নির্দিষ্ট পেশার।

কারাকী কাজে
তান্ত্রিক ওঝা-বৈদ্যরাদৈনন্দিন চিকিৎসার কাজে
পুরোহিত লুরি বা লাউলিরাধর্মীয় কাজে

আর তা সুপ্রাচীন কাল থেকেই। লেখায় একটি বর্তমান-কালের দাবিও আছে: “বর্তমান কালের ওঝা-বৈদ্যরাও পরম্পরাগতভাবে চাকমা লিপিতে তাদের চিকিৎসা মন্ত্র ও চিকিৎসা পদ্বতিতে ব্যবহার করে আসছেন।”

অর্থাৎ লিপিটি মরে যায়নি — তার ব্যবহারকারীর বৃত্ত ছোট হয়ে গেছে, আর সেই বৃত্তের ভেতরে এখনো চিকিৎসা ও মন্ত্র আছে।

চাকমা লিপিতে কী কী লেখা হতো, তার তালিকাও লেখায় আছে — হাতে লেখা পুঁথি, সাহিত্যের উপাদান, ওঝা-বৈদ্যদের মন্ত্র আর বনজ ঔষধপত্রের নাম।

আর সাহিত্যের ধরন হিসেবে তিনটি নাম: পালাগান (ব্যালাড), বারমাসী আর চৌতিশা।

এই তালিকায় গোজেন লামার অবস্থান লক্ষণীয়। লেখাটিতে তাকে রাখা হয়েছে ধর্মগ্রন্থের দলে, পালাগানের দলে নয় — আর সেটিই এই পাতার আগের অংশে দেখানো তিনটি দাবির একটি।

রানি কালিন্দীর উদ্যোগ, আর একটি ভাষার বদল

চাকমা লিপির ব্যবহার কমার সঙ্গে একটি নাম ও একটি সময়কাল জড়িয়ে আছে — রানি কালিন্দীর উদ্যোগ, আর ১৮৪৪-১৮৭২ খ্রিস্টাব্দ।

বাক্যটি হুবহু: “কালিন্দী রাণীর উদ্যেগে ১৮৪৪-১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে ঊনবিংশ শতাব্দির শেষ দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বাংলা ভাষা ও বাংলা লিপির প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে চাকমা লিপির ব্যবহার হ্রাস পেতে থাকে।”

আর তার পরের ধাপটিও লেখায় আছে: “এরপর থেকে শুরু হয় বাংলা ভাষা ও বাংলা লিপিতে চাকমাদের ধর্ম ও সাহিত্য চর্চা।”

একই উদ্যোগের আরেকটি ফলও দেওয়া আছে, আর তা একটি অনুবাদের। কালিন্দী রানির উদ্যোগে বর্মী ভাষায় রচিত তাদুয়াং নামের বৌদ্ধ ধর্মীয় গ্রন্থের বাংলা অনুবাদ থেকে জনৈক নীল কমল দাস বাংলা পদে লেখেন বৌদ্ধরঞ্জিকা, আর তা চাকমা সমাজে প্রচলন করা হয়।

লেখাটিতে এই বইটির একটি বড় দাবিও আছে — এটি বৌদ্ধধর্মের প্রথম বাংলা ভাষায় অনুবাদ গ্রন্থ, আর সেই দাবির সূত্রও দেওয়া: ড. আশা দাশ, বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধধর্ম ও সংস্কৃতি, পৃষ্ঠা ২৩০।

গোজেন লামার জন্য এর তাৎপর্য সরাসরি। যে লিপিতে বইটি লেখা হয়েছিল, সেই লিপির পাঠক কমে যাওয়ার পর বইটিকে টিকতে হয়েছে অন্য কারও উদ্যোগে — আর সেই উদ্যোগটি আসে প্রায় একশো বছর পরে।

[১৮৪৪-১৮৭২ সময়কালটি রানি কালিন্দীর রাজত্বকাল না কি বাংলা প্রচলনের কাল, তা বাক্য থেকে স্পষ্ট নয় — যাচাই প্রয়োজন]

লক্ষীপালা: যে বইটি হাতছাড়া হয়ে গেল

গোজেন লামার প্রকাশক ত্রিপুর চন্দ্র সেন আরেকটি বইও প্রকাশ করেছিলেন, আর সেটির গল্পটি এই পাতার সবচেয়ে অস্বস্তিকর অংশ — কারণ বইটি আর পাওয়া যায়নি।

জুমজার্নালের লেখা অনুযায়ী ত্রিপুর চন্দ্র সেন নিজেই উল্লেখ করেছেন যে তিনি লক্ষীপালা (ব্যালাড) প্রকাশ করেছেন।

কিন্তু লেখক তা দেখতে পাননি, আর বাক্যটি স্পষ্ট: “দুর্ভাগ্য বশত এই প্রকাশিত লক্ষী পালাটি দেখার বা সংগ্রহ করার সুযোগ হয়নি।”

আর তারপর যা আছে, তা লোকসাহিত্য সংগ্রহের একটি সাধারণ অভিজ্ঞতার বিবরণ। গবেষক রমা প্রসাদ দত্ত (পল্টু দা) জীবিত থাকাকালে বলেছিলেন তাঁর পাঠাগারে গিয়ে জেরক্স করে আনার জন্য — আর লেখকের নিজের ভাষায়, “আজ যাবো কাল যাবো করতে করতে” সেটি হয়নি।

এই এক বাক্যে একটি বই হারিয়ে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি আছে — কেউ তা প্রকাশ করেছিলেন, কেউ তা সংগ্রহে রেখেছিলেন, কেউ তা নিতে বলেছিলেন, আর কেউ সময়মতো যায়নি।

গোজেন লামার ক্ষেত্রে ঠিক এই জায়গাটিতেই ফারাক। সেটি হাতবদল হয়েছিল — কবির বন্ধুদের হাতে, তারপর মাধব মাস্টার কর্মীর আত্মীয়দের হাতে, তারপর প্রকাশকের হাতে, আর সেজন্যই তার নাম আজ জানা যায়।

এই অংশটি একটি কথা মনে করিয়ে দেয়: আর্কাইভের পাঠে যে নামগুলো পাওয়া যায়, সেগুলোই টিকে যাওয়া অংশ — আর যা হারিয়ে গেছে তার হিসাব কোথাও নেই।

পাহাড়ের লোককথা কারা সংগ্রহ করেছিলেন আর কোন বইয়ে তা আছে, সে নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ের লোককথা কে সংগ্রহ করেছিলেন-এ।

১৯৬৯: একই বছরে চারটি বই

গোজেন লামার প্রকাশের সনটি একা দাঁড়িয়ে নেই। জুমজার্নালের লেখার তথ্যসূত্র তালিকায় ১৯৬৯ সালের চারটি বইয়ের নাম আছে, আর তা একটি সক্রিয় বছরের ছবি দেয়।

বইযাঁরসন
গোজেনলামাত্রিপুর চন্দ্র সেন১৯৬৯
চাকমা জাতির ইতিবৃত্তবিরাজ মোহন দেওয়ান১৯৬৯
বাংলা সাহিত্যে বৌদ্ধ ধর্ম ও সংস্কৃতিড. আশা দাশ১৯৬৯
চান্দবী বার মাচ (বাংলা অনুবাদ)ধর্মধন পন্ডিত রচিত; অনুবাদ অক্ষয় চান চাকমা১৯৬৯

চতুর্থটি কাঞ্চনপুর থেকে প্রকাশিত, আর তার পরের বছরই — ১৯৭০-এ — ফরা কিংকর চাকমার তাবতিংশ স্বর্গ নামে একটি বাংলা কবিতার বই।

লেখাটিতে গোজেন লামার প্রকাশকাল দুইভাবে দেওয়া — মূল পাঠে “ষাটের দশকের শেষ দিকে”, আর তথ্যসূত্র তালিকায় ১৯৬৯। দুটি পরস্পরবিরোধী নয়।

এই বছরটির তাৎপর্য গোজেন লামার জন্য আছে। একটি পুরনো হস্তলিখিত পাঠ ছাপার অক্ষরে এল ঠিক সেই সময়ে, যখন চাকমা ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে বই প্রকাশ বাড়ছিল — অর্থাৎ তা একটি একক উদ্যোগ নয়, একটি ধারার অংশ।

লেখাটির নিজের তথ্যসূত্র তালিকায় আরও যেসব বই আছে, সেগুলোও এই ধারারই — সতীশ চন্দ্র ঘোষের চাকমা জাতি (১৯০৯), মাধব চন্দ্র চাকমা কর্মীর শ্রী শ্রী রাজনামা, সুগত চাকমার চাকমা পরিচিতি (১৯৭৮), ড. দুলাল চৌধুরীর চাকমা প্রবাদ (১৯৮০) আর নিরঞ্জন চাকমার চাকমা ভাষা ও সাহিত্য প্রসঙ্গে (১৯৮৯)।

লেখাটির লেখক গৌতমলাল চাকমা, পরিচয়ে কবি ও প্রাবন্ধিক, ত্রিপুরা, ভারত।

২০০৪-এর সংস্করণ: সম্পাদনায় সুগত চাকমা

গোজেন লামার একটি পূর্ণ গ্রন্থপঞ্জি-উদ্ধৃতিও জুমজার্নালের আর্কাইভে আছে, আর তা একটি একাডেমিক ভঙ্গিতে — পৃষ্ঠাসংখ্যাসহ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাচীন বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘ “লুরি”দের ইতিহাস লেখাটির টীকায় উদ্ধৃতিটি হুবহু এরকম: “গোজেন লামা, রচনায়- শিবচরণ, সম্পাদনায়- সুগত চাকমা, ২০০৪, রাংগামাটি, পৃঃ ৮(এক লামা)।”

এই এক লাইনে চারটি নতুন তথ্য আছে, আর প্রতিটিই এই পাতার আগের অংশগুলোর ফাঁক পূরণ করে।

যা জানা গেলবিস্তারিত
আরেকটি সংস্করণ২০০৪, রাঙ্গামাটি — ত্রিপুর চন্দ্র সেনের ১৯৬৯ প্রকাশের পঁয়ত্রিশ বছর পরে
সম্পাদকের নামসুগত চাকমা — আর্কাইভের অন্য লেখায় তাঁর চাকমা পরিচিতি (১৯৭৮) বইটিরও উল্লেখ আছে
রচয়িতার নাম“রচনায়- শিবচরণ” — অর্থাৎ এই সংস্করণে রচয়িতা হিসেবে শিবচরণের নামই ছাপা
ভেতরের বিভাগপৃষ্ঠা উল্লেখের পাশে বন্ধনীতে লেখা “এক লামা”

শেষ সারিটি সবচেয়ে কৌতূহলজনক। বন্ধনীর “এক লামা” থেকে বোঝা যায়, বইটির ভেতরের অংশগুলোকে “লামা” বলা হয় — অর্থাৎ শব্দটি কেবল শিরোনামে নয়, বিভাগের নামেও।

এটি নামের অর্থের সঙ্গেও মেলে। যদি লামা মানে বৃত্তান্ত বা অধ্যায় হয়, তবে “গোজেন লামা” মানে ঈশ্বর-বৃত্তান্ত, আর “এক লামা” মানে প্রথম বৃত্তান্ত।

[এই পাঠটি নিশ্চিত করার জন্য ২০০৪ সংস্করণটি দেখা হয়নি; উপরের তথ্য টীকার উদ্ধৃতি থেকে — যাচাই প্রয়োজন]

তবু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। গোজেন লামার অন্তত দুটি মুদ্রিত সংস্করণের অস্তিত্ব এখন নাম ও সন ধরে বলা যায় — ১৯৬৯ (ত্রিপুর চন্দ্র সেন) আর ২০০৪ (সম্পাদনা সুগত চাকমা, রাঙ্গামাটি) — আর সঙ্গে রেগা প্রকাশনীর একটি সংস্করণের কথাও আছে, সন ছাড়া।

বইয়ের ভেতরের একটি পঙ্‌ক্তি

গোজেন লামার ভেতরের একটি লাইনও আর্কাইভে উদ্ধৃত আছে, আর তার সঙ্গে বাংলা অনুবাদও — এটিই এই পাতায় বইটির পাঠ থেকে পাওয়া একমাত্র সরাসরি নমুনা।

পঙ্‌ক্তিটি লুরিদের ইতিহাস লেখায় উদ্ধৃত, আর সূত্র হিসেবে দেওয়া আছে ২০০৪ সংস্করণের পৃষ্ঠা ৮:

“জল উবরে বচ্যে থল, বানেল গোজেনে জীবসকল।।”

আর লেখাটিতে তার বাংলা অনুবাদও দেওয়া: “জলের উপর বসেছে সমান, গোজেন সৃষ্টি করেছেন জীবসকলকে।।”

দুটি কথা এই এক পঙ্‌ক্তিতেই নিশ্চিত হয়।

এক — বিষয়টি সৃষ্টির। লাইনটি বলছে জলের উপর স্থলভাগ বসেছে, আর গোজেন জীবজগৎ সৃষ্টি করেছেন। এটি প্রতিধ্বনির লেখায় দেওয়া বিষয়-বিবরণের সঙ্গে সরাসরি মেলে।

দুই — আর্কাইভের লোককথার সঙ্গে ছবিটিও মেলে। আর্কাইভের চাকমা সৃষ্টিকথায় শুরুর অবস্থা ছিল “অপার-অনন্ত স্থির জলরাশি”, আর তার উপরেই মাটি জমে স্থলভাগ হয়।

অর্থাৎ বই আর মুখে-মুখে চলা গল্প — দুটোতেই একই ক্রম: আগে জল, পরে স্থল। দুটোর মধ্যে কোনটি কার থেকে, তা এই নমুনা থেকে বলা যায় না।

লেখাটিতে পঙ্‌ক্তির রচয়িতাকে বলা হয়েছে “চাকমাদের আদি কবি”, আর তাঁর রচনাকে “ভক্তিমূলক গাথা” — অর্থাৎ এটি এই পাতার আগের অংশে দেখানো তিনটি দাবির আরেকটি রূপ।

আর ভূমিকার কথাও লেখায় আছে: লুরিরা “সৃষ্টিকর্তা গোজেনকে সবার উপরে রেখেই” সব ধর্মীয় কাজ করতেন।

চাকমা সাহিত্যের তিন যুগে গোজেন লামা কোথায়

গোজেন লামার অবস্থান নিয়ে একটি চতুর্থ কাঠামোও আর্কাইভে আছে, আর তা একটি সাহিত্য-পর্বায়ন — কবি সুহৃদ চাকমার।

পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা লেখক সমাজ ও সাহিত্য চর্চা লেখা অনুযায়ী তিনি চাকমা সাহিত্যকে তিনটি যুগে ভাগ করেন:

যুগযা এই যুগে পড়ে
প্রাচীন যুগলোকসাহিত্য — জ্ঞেনহুলি (গেঙখুলি) পালা, প্রেম সাহিত্য, আর ইতিহাস-সম্পৃক্ত রাধামন-ধনপুদি পালা
মধ্য যুগধর্ম-সম্পৃক্ত সাহিত্য — গোজেন লামা — আর সামাজিক প্রণালী-সম্পৃক্ত সাহিত্য
আধুনিক যুগ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে

এই ভাগে দুটি জিনিস লক্ষণীয়।

প্রথম — গোজেন লামা আর রাধামন-ধনপুদি আলাদা যুগে। পর্বায়ন অনুযায়ী গেংখুলি পালা আগের, আর গোজেন লামা পরের — যদিও দুটোই গেংখুলিরা গেয়ে থাকেন।

দ্বিতীয় — এখানে গোজেন লামাকে ধর্ম-সম্পৃক্ত সাহিত্য বলা হয়েছে, অর্থাৎ ধর্মগ্রন্থের দাবির কাছাকাছি, কিন্তু হুবহু এক নয়। “সম্পৃক্ত” শব্দটি একটি সতর্ক শব্দ।

লেখাটিতে পর্বায়নের উৎসও দেওয়া — সুহৃদ চাকমা স্মারকগ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৯৪-১১২।

আর আধুনিক যুগ নিয়ে একটি সতর্কতাও আছে: বিশ শতক থেকে হিসাব করা হলেও কার্যত “চাকমারা যখনই আত্মপ্রত্যয়ের উপলব্ধি হতে চাকমা কবিতা রচনার প্রয়াস পান, তখনই” এই যুগের শুরু।

চারটি কাঠামো একসঙ্গে রাখলে গোজেন লামার অবস্থান এরকম: কাব্যগ্রন্থ (আর্কাইভের জীবনকথা), পালা ও গীতিকবিতা (প্রতিধ্বনি), ধর্মগ্রন্থ (আর্কাইভের ভাষা-সাহিত্য লেখা), আর ধর্ম-সম্পৃক্ত মধ্যযুগীয় সাহিত্য (সুহৃদ চাকমার পর্বায়ন)।

চারটিই একটি সাধারণ কথায় মেলে — এটি একটি পদ্যে লেখা, গেয়, ঈশ্বর ও সৃষ্টি নিয়ে রচনা, আর তার শ্রেণিনাম নির্ভর করে কে কোন দিক থেকে দেখছেন তার উপর।

গেংখুলিরা যা গেয়ে থাকেন

গোজেন লামা কেবল পড়ার বই নয় — প্রতিধ্বনি-র লেখা অনুযায়ী গেংখুলি গায়কেরা এটি সারা রাত ধরে পরিবেশন করেন, আর তা একটিমাত্র বাদ্যযন্ত্র সঙ্গে নিয়ে।

পরিবেশনার সময়সীমাটি অন্য উৎসেও মেলে। চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদের পাতায় বলা হয়েছে, একটি গেংখুলি পরিবেশনা সাধারণত সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চলে, আর কখনো কয়েক দিন ধরেও।

আর পরিবেশনার ফারাকটি প্রথম আলো-র লেখায় স্পষ্ট — নির্দিষ্ট লিখিত পাঠ না থাকায় প্রত্যেক পরিবেশক কাহিনি বদলে নেন।

গেংখুলি ঐতিহ্য, তাঁদের বাদ্যযন্ত্র ও রাধামন-ধনপুদি পালা নিয়ে জুমজার্নালে আলাদা লেখা আছে — গেংখুলি ও রাধামন-ধনপুদি: চাকমা মৌখিক সাহিত্যের পাঠ।

একটি বিষয় এখানে পরিষ্কার করা দরকার। গোজেন লামা আর রাধামন-ধনপুদি এক নয় — প্রথমটি সৃষ্টি ও ঈশ্বর নিয়ে, দ্বিতীয়টি একটি প্রেমকাহিনি। কিন্তু দুটোই গেংখুলিরা গেয়ে থাকেন, আর সেজন্যই দুটো প্রায়ই একসঙ্গে উল্লিখিত হয়।

পাহাড়ি গান ও বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আলাদা লেখা আছে পাহাড়ি গান ও আদিবাসী বাদ্যযন্ত্র-তে।

আর্কাইভের গল্পে গোজেন

গোজেন লামা বইটি জুমজার্নালের আর্কাইভে নেই, কিন্তু তার কেন্দ্রীয় চরিত্রটি আছে — আর্কাইভের একটি চাকমা লোককথায়।

সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী পাঠে সৃষ্টিকর্তার নাম গোজেন, আর বন্ধনীতে অর্থ দেওয়া — অর্থাৎ ঈশ্বর।

পাঠে তাঁর কাজগুলোও নাম ধরে আছে: মহাসমুদ্রের উপর একটি বিশাল বটগাছ সৃষ্টি, তার পাতায় আসন গেড়ে ধ্যান, নিজের ছায়া থেকে প্রথম মানব কেদুগা, আর নিজের শরীরের ময়লা থেকে প্রথম মানবী কেদুগী।

পরে তিনি একের পর এক দেবতা পাঠান — কালেইয়্যা, বিয়াত্রা — আর শেষে মাহ লখী মা এসে জুমচাষের ব্যবস্থা করে দেন।

এই পাঠটির উৎস গোজেন লামা নয়; আর্কাইভে উৎস হিসেবে লেখা ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা। অর্থাৎ গোজেনের কাহিনি বইয়ের বাইরেও মুখে মুখে চলেছে, আর অন্য একটি সংকলনে উঠেছে।

[আর্কাইভের এই পাঠটি গোজেন লামার কোনো অংশের সঙ্গে মেলে কি না, তা মিলিয়ে দেখা যায়নি, কারণ বইটির পাঠ পড়া হয়নি — যাচাই প্রয়োজন]

পাহাড়ের সব সৃষ্টিকথার তুলনা আছে আলাদা লেখায়: আদিবাসী সৃষ্টিকথা।

কোন তথ্য কোন উৎস থেকে

গোজেন লামা নিয়ে ইন্টারনেটে যা পাওয়া যায় তার অনেকটাই পরস্পর থেকে নেওয়া। তাই কোন দাবিটি কোথা থেকে এল, সেটি আলাদা করে দেখানো দরকার।

দাবিযে উৎসে পাওয়া গেছেদাবির মাত্রা
নামের অর্থ ঈশ্বর নামাজুমজার্নাল; আর্কাইভের লোককথায় গোজেন = ঈশ্বরসরাসরি
রচয়িতা শিবচরণ চাকমাজুমজার্নাল; প্রতিধ্বনিপ্রতিধ্বনি বলছে “ঐতিহাসিকেরা মনে করেন”
জন্ম ১১৮৪ বঙ্গাব্দ / ১৭৪০-৫০ খ্রি.জুমজার্নালউৎস নিজেই বলছে “অনুমান করা যায়”; দুটি সনে অসঙ্গতি
বিষয় সৃষ্টির কাহিনিপ্রতিধ্বনিসরাসরি
চাকমা লিপিতে লেখা ধর্মগ্রন্থজুমজার্নালসরাসরি
১৯৬৯-এ ত্রিপুর চন্দ্র সেনের প্রকাশজুমজার্নালসরাসরি
রেগা প্রকাশনীর সংস্করণজুমজার্নালপ্রকাশকের নাম আছে, সন নেই
গেংখুলিরা সারা রাত গেয়ে থাকেনপ্রতিধ্বনি; চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদসরাসরি
২০০৪, রাঙ্গামাটি; সম্পাদনা সুগত চাকমাজুমজার্নাল — লুরিদের ইতিহাসটীকায় পূর্ণ গ্রন্থপঞ্জি-উদ্ধৃতি, পৃষ্ঠাসহ
বইয়ের ভেতরের একটি পঙ্‌ক্তিজুমজার্নাল — লুরিদের ইতিহাসবাংলা অনুবাদসহ উদ্ধৃত, পৃষ্ঠা ৮
মধ্যযুগীয় ধর্ম-সম্পৃক্ত সাহিত্যজুমজার্নাল — চাকমা লেখক সমাজকবি সুহৃদ চাকমার পর্বায়ন
রচনাকালকোনো পঠিত উৎসে নেই—
পর্বসংখ্যা ও অধ্যায়-বিন্যাসকোনো পঠিত উৎসে নেই—

ছকের শেষ দুটি সারি এই পাতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গোজেন লামা কখন লেখা হয়েছিল আর তার ভেতরে কত পর্ব আছে — এই দুটি মৌলিক তথ্যই কোনো পঠিত উৎসে পাওয়া যায়নি।

সেজন্যই যেকোনো লেখায় যদি রচনাকাল হিসেবে একটি নির্দিষ্ট সন দেখা যায়, সেটি কোথা থেকে এসেছে তা জিজ্ঞেস করা দরকার।

ছকটি আরেকটি কথাও দেখায়। গোজেন লামা নিয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যগুলো প্রকাশনার, আর সবচেয়ে অনির্ভরযোগ্যগুলো উৎপত্তির। কে ছাপলেন, কোন সালে, কে সম্পাদনা করলেন — এগুলো নাম ও সন ধরে বলা যায়; কে লিখলেন আর কখন — এগুলো অনুমান।

লোকসাহিত্যে এটি অস্বাভাবিক নয়। মুখে-মুখে চলা একটি পাঠ ছাপার অক্ষরে এলেই তার নথি শুরু হয়, আর তার আগের ইতিহাসটি থেকে যায় জনশ্রুতিতে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

গোজেন লামা মানে কী?

ঈশ্বর নামা। জুমজার্নালের আর্কাইভে শিবচরণ চাকমার জীবনকথায় সরাসরি লেখা আছে — “তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘গোজেন লামা’ অর্থাৎ ‘ঈশ্বর নামা’”। আর আর্কাইভের একটি চাকমা লোককথায় সৃষ্টিকর্তার নাম গোজেন, আর বন্ধনীতে অর্থ দেওয়া — অর্থাৎ ঈশ্বর।

গোজেন লামা কে লিখেছেন?

দুটি উৎসই একই নাম দেয় — শিবচরণ চাকমা। জুমজার্নালে তাঁকে বলা হয়েছে “চাকমা সাহিত্যের আদি কবি ও সাধক”, আর প্রতিধ্বনির লেখায় “অলৌকিক শক্তিধর উদাসী শিবচরণ চাকমা”। তবে প্রতিধ্বনি দাবির মাত্রাও স্পষ্ট করে দেয় — “রচনা করেছেন বলে মনে করেন ঐতিহাসিকেরা”।

গোজেন লামা কখন রচিত হয়েছিল?

রচনাকাল কোনো পঠিত উৎসে নেই। যে সনটি প্রায়ই উদ্ধৃত হয় — ১১৮৪ বঙ্গাব্দ — সেটি আসলে শিবচরণের অনুমিত জন্মকাল, রচনাকাল নয়।

১১৮৪ বঙ্গাব্দ কীসের সন?

শিবচরণ চাকমার জন্মকাল, আর তা-ও অনুমান। আর্কাইভের বাক্যটি হুবহু — “তাঁর জন্মকাল সম্পর্কে সঠিক কোন তথ্য পাওয়া না গেলেও বাংলা ১১৮৪ এবং ইংরেজি ১৭৪০-৫০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বলে অনুমান করা যায়।”

১১৮৪ বঙ্গাব্দ আর ১৭৪০-৫০ খ্রিস্টাব্দ কি একই?

না। প্রচলিত হিসাবে ১১৮৪ বঙ্গাব্দ প্রায় ১৭৭৭-৭৮ খ্রিস্টাব্দের সমান, আর ১৭৪০-৫০ খ্রিস্টাব্দ প্রায় ১১৪৭-৫৭ বঙ্গাব্দের। অর্থাৎ একই বাক্যের দুটি সনের মধ্যে প্রায় তিরিশ বছরের ফারাক। অসঙ্গতিটি নিয়ে কোনো পঠিত উৎসে আলোচনা পাওয়া যায়নি।

গোজেন লামা কি ধর্মগ্রন্থ?

উৎসভেদে তিন রকম উত্তর আছে। জুমজার্নালের একটি লেখায় তাকে বলা হয়েছে কাব্যগ্রন্থ; প্রতিধ্বনির লেখায় পালা ও গীতিকবিতা; আর জুমজার্নালের আরেকটি লেখায় চাকমা লিপিতে লেখা ধর্মগ্রন্থ — আগর তারা ও তাল্লিক শাস্ত্রের সঙ্গে একসঙ্গে। তিনটি দাবি পরস্পরবিরোধী নয়।

গোজেন লামায় কী আছে?

প্রতিধ্বনির লেখা অনুযায়ী এতে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয় মিশে আছে, আর এতে পৃথিবী ও জীবজগতের সৃষ্টির বর্ণনা আছে। তবে বইটিতে কত পর্ব আছে বা ঘটনাগুলো কোন ক্রমে — সেই বিবরণ কোনো পঠিত উৎসে নেই।

গোজেন লামা কে প্রকাশ করেছিলেন?

জুমজার্নালের লেখা অনুযায়ী ত্রিপুর চন্দ্র সেন নিজ উদ্যোগে প্রকাশ করেন, আর সন হিসেবে দেওয়া ১৯৬৯। উপাদান তিনি পেয়েছিলেন মাধব মাস্টার কর্মীর আত্মীয়দের কাছ থেকে। আর্কাইভের আরেকটি লেখায় রেগা প্রকাশনীর ইন্টুমণি তালুকদারকেও বইটির প্রকাশক বলা হয়েছে, তবে সন ছাড়া।

শিবচরণ চাকমা কোথায় জন্মেছিলেন?

আর্কাইভের জীবনকথা অনুযায়ী কাপ্তাই উপজেলার কর্ণফুলী নদীর উপনদী শিলকের তীরে ‘উয়ারা ওযাহ্’ নামক স্থানে। তাঁর পিতার নাম ধূংবী, মাতার নাম ধর্মবী চাকমা, আর তিনি ছিলেন দুই সন্তানের কনিষ্ঠ; জ্যেষ্ঠ ভাইয়ের নাম কালিচরণ।

শিবচরণের পরিবার কেন তৈনছড়িতে গেল?

আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী শুল্ক প্রদানের বিরোধ নিয়ে চাকমা রাজা শুকদেব রায় ব্রিটিশদের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন, আর রাজার সেনাপতি রুনু খাঁর সঙ্গে ব্রিটিশদের কয়েকবার যুদ্ধ হয়। তখন চাকমারা শিলক নদীর তীর ছেড়ে মাতামুহুরী নদীর তৈনছড়ির তীরে চলে যেতে বাধ্য হন, আর শিবচরণের পরিবারও সঙ্গে যায়।

গোজেন লামা কীভাবে টিকে গেল?

আর্কাইভের বিবরণ অনুযায়ী অন্তর্ধানের আগে এক সন্ধ্যায় শিবচরণ বন্ধুদের ডেকে কাব্যগ্রন্থটি পড়ে শোনান, তাঁদের হাতে তুলে দেন, আর অদৃশ্য হয়ে যান। অর্থাৎ রচয়িতা থাকলেন না, কিন্তু পাঠ থেকে গেল।

গোজেন লামা আর রাধামন-ধনপুদি কি একই?

না। গোজেন লামা সৃষ্টি ও ঈশ্বর নিয়ে, আর রাধামন-ধনপুদি একটি প্রেমকাহিনি। তবে দুটোই গেংখুলি গায়কেরা গেয়ে থাকেন, আর সেজন্যই দুটো প্রায়ই একসঙ্গে উল্লিখিত হয়।

চাকমা লিপিতে লেখা ধর্মগ্রন্থ কোনগুলো?

জুমজার্নালের একটি লেখায় তিনটি নাম একসঙ্গে দেওয়া — আগর তারা, গোজেন লামা আর তাল্লিক শাস্ত্র। একই লেখা অনুযায়ী বাংলা ভাষা ও লিপির প্রচলনের সঙ্গে সঙ্গে চাকমা লিপির ব্যবহার কমতে থাকে।

আগরতারা কী?

প্রতিধ্বনির লেখা অনুযায়ী এটি চাকমা পুরোহিতদের লেখা একটি ধর্মীয় পুঁথি, পুরোপুরি চাকমা লিপিতে লেখা আর ২৮টি পর্বে বিভক্ত; লেখায় একে মূলত পালি সুত্তের অপভ্রংশ বলা হয়েছে। গোজেন লামার ক্ষেত্রে এ ধরনের গঠনগত বিবরণ কোনো পঠিত উৎসে নেই।

চাকমা লিপি কারা ব্যবহার করতেন?

জুমজার্নালের লেখা অনুযায়ী ব্যবহার ছিল সীমিত, আর দুটি পেশার মানুষ তা ব্যবহার করতেন — তান্ত্রিক ওঝা-বৈদ্যরা দৈনন্দিন চিকিৎসার কাজে, আর পুরোহিত লুরি বা লাউলিরা ধর্মীয় কাজে। লেখাটি জানায়, বর্তমান কালের ওঝা-বৈদ্যরাও পরম্পরাগতভাবে চাকমা লিপিতে তাঁদের চিকিৎসা মন্ত্র ব্যবহার করে আসছেন।

ত্রিপুর চন্দ্র সেন আর কী প্রকাশ করেছিলেন?

লক্ষীপালা নামে একটি ব্যালাড। তবে জুমজার্নালের লেখক তা দেখতে পাননি — “দুর্ভাগ্য বশত এই প্রকাশিত লক্ষী পালাটি দেখার বা সংগ্রহ করার সুযোগ হয়নি।” গবেষক রমা প্রসাদ দত্ত (পল্টু দা) জীবিত থাকাকালে তাঁর পাঠাগারে গিয়ে জেরক্স করে আনতে বলেছিলেন, কিন্তু “আজ যাবো কাল যাবো করতে করতে” তা হয়নি।

গোজেন লামার কোনো আধুনিক সংস্করণ আছে?

আছে। জুমজার্নালের লুরিদের ইতিহাস লেখাটির টীকায় পূর্ণ উদ্ধৃতি দেওয়া — “গোজেন লামা, রচনায়- শিবচরণ, সম্পাদনায়- সুগত চাকমা, ২০০৪, রাংগামাটি, পৃঃ ৮(এক লামা)।” অর্থাৎ ২০০৪ সালে রাঙ্গামাটি থেকে সুগত চাকমার সম্পাদনায় একটি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল।

গোজেন লামার ভেতরের কোনো লাইন কি পাওয়া যায়?

একটি পাওয়া যায়। জুমজার্নালের লুরিদের ইতিহাস লেখায় ২০০৪ সংস্করণের পৃষ্ঠা ৮ থেকে উদ্ধৃত — “জল উবরে বচ্যে থল, বানেল গোজেনে জীবসকল।।” আর বাংলা অনুবাদও দেওয়া: “জলের উপর বসেছে সমান, গোজেন সৃষ্টি করেছেন জীবসকলকে।।”

চাকমা সাহিত্যের পর্বায়নে গোজেন লামা কোথায়?

কবি সুহৃদ চাকমার তিন-যুগের ভাগে এটি মধ্য যুগে — ধর্ম-সম্পৃক্ত সাহিত্য হিসেবে। প্রাচীন যুগে গেংখুলি পালা ও রাধামন-ধনপুদি, আর আধুনিক যুগ ১৯০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে। উৎস হিসেবে দেওয়া সুহৃদ চাকমা স্মারকগ্রন্থ, পৃষ্ঠা ৯৪-১১২।

যা এখনো জানা যায়নি

  • রচনাকাল — গোজেন লামা কখন লেখা হয়েছিল, তা কোনো পঠিত উৎসে নেই।
  • দুটি সনের অসঙ্গতি — ১১৮৪ বঙ্গাব্দ ও ১৭৪০-৫০ খ্রিস্টাব্দ একসঙ্গে মেলে না; কোনটি মুদ্রণের ভুল তা যাচাই করা যায়নি।
  • পর্বসংখ্যা ও বিন্যাস — বইটিতে কত পর্ব, কোন ক্রমে কী আছে — কোনো পঠিত উৎসে নেই।
  • প্রমাণিত সংস্করণ — কোনো সমালোচনামূলক বা প্রমাণিত সংস্করণ আছে কি না তা জানা যায়নি।
  • রেগা প্রকাশনীর সংস্করণের সন — প্রকাশকের নাম আছে, সন নেই।
  • ‘লামা’ শব্দের ব্যুৎপত্তি — নামের অনুবাদ থেকে অর্থ বোঝা যায়, কিন্তু ভাষাগত ব্যুৎপত্তি কোনো উৎসে নেই।
  • আর্কাইভের লোককথার সঙ্গে সম্পর্ক — আর্কাইভের সৃষ্টিকথাটি গোজেন লামার কোনো অংশের সঙ্গে মেলে কি না, তা মিলিয়ে দেখা যায়নি।
  • মূল পাঠ — এই লেখার জন্য গোজেন লামার কোনো সংস্করণ পড়া হয়নি; সব তথ্য দ্বিতীয় সূত্রের।

তথ্যসূত্র

এই পাতার প্রতিটি দাবির পাশে তার উৎস উপরে নাম ধরে দেওয়া আছে, আর উদ্ধৃতিগুলো হুবহু। গোজেন লামার মূল পাঠ এই লেখার জন্য পড়া হয়নি — তাই বইটির ভেতরের বিবরণ এখানে নেই।

  1. সাধক কবি শিবচরণ চাকমার জীবন কথা, জুমজার্নাল — লেখায় উৎস হিসেবে দেওয়া: বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি, রাঙ্গামাটি, প্রথম প্রকাশ এপ্রিল ২০১৪; কৃতজ্ঞতা ইন্টুমণি তালুকদার, রেগা প্রকাশনী।
  2. ভারতের চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশ: সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা, জুমজার্নাল — ত্রিপুর চন্দ্র সেনের ১৯৬৯ প্রকাশ ও চাকমা লিপির তিনটি ধর্মগ্রন্থ।
  3. উপল বড়ুয়া, চম্পকনগরের চাকমা সাহিত্য, প্রতিধ্বনি, ১৪ মার্চ ২০২৩ — রচয়িতার অনুমান, বিষয়বস্তু, আগরতারার ২৮ পর্ব।
  4. আহমেদ মুনির, চিরন্তন এক চাকমা প্রেমগাথা, প্রথম আলো, ২৫ জুলাই ২০২৩ — গেংখুলি পরিবেশনার পরিবর্তনশীলতা।
  5. চাকমা স্বশাসিত জেলা পরিষদ, Culture & Tradition — গেংখুলি পরিবেশনার সময়সীমা।
  6. চাকমা লোককথা: সৃষ্টির আদিকথা ও জুমচাষ প্রচলনের কাহিনী, জুমজার্নাল আর্কাইভ — গোজেন = ঈশ্বর, আর সৃষ্টির ধারা।
  7. গেংখুলি ও রাধামন-ধনপুদি: চাকমা মৌখিক সাহিত্যের পাঠ, জুমজার্নাল।

সব ব্যক্তির নাম, স্থানের নাম ও চাকমা শব্দ উৎসে যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা হয়েছে। এই পাতায় গোজেন লামার কোনো ধর্মীয় দাবিকে সমর্থন বা খণ্ডন করা হয়নি — কেবল উৎসগুলোতে যা লেখা আছে তা তুলে ধরা হয়েছে, আর কোন দাবি কোথা থেকে এসেছে তা আলাদা করে দেখানো হয়েছে। সর্বশেষ হালনাগাদ: ৮ অক্টোবর ২০২৬।

প্রসঙ্গ:গোজেন লামা, চাকমা, চাকমা সাহিত্য, লোককাহিনী, শিবচরণ চাকমা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা