Jumjournal Logo

স্নেহ কুমার চাকমার সংক্ষিপ্ত জীবনী

Last updated Oct 6th, 2026

401

স্নেহ কুমার চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস লিখতে গেলে যার নাম না লিখলে ইতিহাস অসম্পূর্ন থেকে যায় সেই নাম হল স্নেন কুমার চাকমা।

তিনি ছিলেন জুম্ম জাতীয় অধিকার আন্দোলনের রূপকার, মেহনতী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু, স্বদেশী আন্দোলনের বীর সৈনিক, ১৯৪৭ইং ১৫ই অগাষ্ট রাঙ্গামাটীতে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উড়ানোর অগ্রনায়ক, বিশিষ্ঠ রাজনীতি ও শিক্ষাবিদ এবং বৌদ্ধ দর্শনের সু-বিশ্লেষক।

তাঁর বর্নাঢ্য গৌরবোজ্জল রাজনীতি ও সামাজিক জীবন থেকে নেওয়া সংক্ষিপ্ত জীবনী লেখার দুঃসাহস করেছি শুধুমাত্র নতুন প্রজন্মকে এই কৃতি সন্তান সম্পর্কে নুন্যতম ধারনার জন্য।

জন্ম ও পরিবার

স্নেহ কুমার চাকমা
স্নেহ কুমার চাকমা

১৯১৪ সালে খাগড়াছড়ি সদরের ঐতিহ্যবাহী খবং পজ্জ্যা গ্রামে দরিদ্র চাষী শ্যাম চন্দ্রের ঔরষে, মনকুমারীর গর্ভে এক মহেন্দ্রক্ষনে এই মহান নেতার জন্ম। তিন ভাই ও ছয় বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়।

পড়াশোনার শুরু

পড়া- লেখার হাতে খড়ি খবং পজ্জ্যা হি রামের নিম্ন প্রাইমাড়ি স্কুল। আপার প্রাইমাড়ি স্কুল শেষ করেন রাঙ্গামাটি জেলার সূতি মাওরুম গ্রামে (বর্তমান ছোট মহাপুরুম)।

প্রাইমাড়ি গন্ধি পেরিয়ে ১৯২৭ সালে রাঙ্গামাটী হাইস্কুলে ভর্তি হন।মুলতঃ তখন থেকেই তিনি স্বদেশী আন্দোলনে জড়িয়ে পরেন।

স্বদেশী আন্দোলন ও কারাবরণ

যার জন্য ১৯৩০ সনে ক্লাশ বর্জনে নেতৃত্ব দেওয়ার উজুহাতে ছয় মাসের জন্য স্কুল থেকে বহিস্কৃত হন।

নবম শ্রেনীতে পড়ার সময় তিনি ১৯৩১ সনে ডঃ প্রফুল্ল ঘোষের মাধ্যমে স্ব-শরীরে স্বদেশী আন্দোলনে অংশ গ্রহনের জন্য কুমিল্লা ময়নামতি অভয়াশ্রমে যান কিন্তু দুর্ভাগ্য, মাত্র কয়েক দিনের মাথায় কুমিল্লার ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে গ্রেফটার করে রাঙ্গামাটীতে ফেরত পাঠান।

এরপর ১৯৩৩ সনে কারাগার থেকে মেট্রিক পরীক্ষায় অংশ গ্রহন করে কৃতিত্বের সহিত প্রথম বিভাগে পাশ করে জেলার প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

কলেজ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসমিতি

১৯৩৭ সনে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বি,এ পাশ করেন।বি,এ পাশ করার পর তিনি তৎকালিন পার্বত্য চট্টগ্রামের একমাত্র সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসমিতির সাধারন সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন যা পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার নিষিদ্ধ ঘোষনা করে।

সে সময় তিনি সমাজ সংস্কার আন্দোলনের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে স্বদেশী আন্দোলনে অংশ গ্রহন করেন এবং কি তিনি সে সময় ভারত স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক, আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রধান নেতাজী সুভাস বোসের সাথেও সাক্ষাত করেন।

১৯৪৭: দেশভাগ ও তার পরিণাম

১৯৪৭ সালে দেশ বিভক্তির সময় পার্বত্য জুম্ম জনগনের দাবীকে উপেক্ষা করে, সম্পূর্ন এক তরফাভাবে বাউন্ডারি কমিশনের চেয়ারম্যান স্যর শেরিল রেড ক্লিপ অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তরভূক্ত করে তখন স্নেহ বাবুর নেতৃত্বে ১৯৪৭ ইং ১৫ই অগাষ্ট তৎকালিন পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজধানী রাঙ্গামাটীতে ভারতীয় জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন যা ১৭ই অগাষ্ট পর্যন্ত উদীমান ছিল।

পরবর্তীতে পাকিস্তান সরকার তাঁর ওতার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দেশ দ্রোহী মামলা রুজু করলে তিনি ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় গ্রহন করেন।

ভারত সরকারের লোভনীয় চাকরী ও লোভনীয় দলীয় পদবীর প্রস্তাব প্রত্যাখান করে তিনি আজীবন নিরলসভাবে জুম্ম জনগনের সেবা করে গেছেন।

কাপ্তাই বাঁধ ও উদ্বাস্তু পুনর্বাসন

১৯৬৪/৬৫সালে কাপ্টাই বাঁধের ফলে হাজার হাজার বাস্তুভিটা হারা মানুষ যখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে আশ্রয় গ্রহন করেছিল তখন স্নেহ বাবু ঐ অসহায় জুম্মদের পাশে ত্রান কর্তা রূপে আবির্ভূত হন।তিনি তাদেরকে সুস্থ্য পুনর্বাসনের জন্য ভারত সরকারের নিকট চাপ
সৃষ্ঠি করেন।

পরবর্তীতে ঐ সর্বস্ব হারা অসহায় লোকদেরকে নেফা প্রদেশে (বর্তমান অরুনাচল) পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।

১৯৮৬-র শরণার্থী সংকট ও শেষ দিন

১৯৮৬ সালে সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান পরিস্থিতির কারনে হাজার হাজার জুম্ম প্রান রক্ষার জন্য ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে আশ্রয় গ্রহন করলে তিনি ঐ অসহায় জুম্মদেরকে আন্তর্জাতিক শরনার্থী মর্যাদা প্রদানের জন্য ভারত সরকারের উপর চাপ সৃষ্ঠি করেন এবং ভারত সরকার প্রায় একলক্ষ অসহায় আশ্রিত জুম্মকে শরনার্থী হিসাবে সীকৃতি প্রদান করতে বাধ্য হয়।

১৯৮৭ইং ১৮ই জুলাই, যখন পার্বত্য জুম্ম শরনার্থী ইস্যুটি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বার্নিং ইস্যু হয়ে উঠে, আন্তর্জাতিক মহল পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সরকারের উপর চাপ দিতে থাকে, ঠিক তখনি নিজের শেষ ইচ্ছা,জুম্ম জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠাকে অপূর্ন রেখে পার্বত্য জুম্মদেরকে চোখের জলে ভাসিয়ে এবং দুই পুত্র ও তিন কন্যা সন্তানকে পিতৃ হারা করে ত্রিপুরা রাজধানী আগরতলার জি,বি হাসপাতালে এই মহান নেতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

উত্তরাধিকার

পরিশেষঃ ১৯৮৩ সালের ১০ই নভেম্বর এম,এন লার্মার অকাল মৃত্যুতে জুম্ম জনগনের যে অপুরনীয় ক্ষতি সাধিত হয়েছিল সেই ক্ষতির পরিমান বেড়ে গেল কয়েকগুন স্নেহ
বাবুর মৃত্যুতে।

কারন তিনি ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একমাত্র বিদেশ মুখপাত্র, উপদেষ্ঠা এবং সঠিক পথ প্রদর্শক।

তথ্যসুত্র: Triptymoy Chakma-র ওয়াল থেকে কপি পেস্ট

প্রসঙ্গ:জুম্ম, ত্রিপুরা রাজ্য, পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, স্নেহ কুমার চাকমা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা