icon

কল্পনা আমরা তোমায় তাদেরকে ভুলতে দেব না

Saptorshi Dewan

Last updated Jun 22nd, 2020 icon 218

সে ছিল ২২ বছর বয়সী একজন সোচ্চার নারী অধিকার কর্মী। সে ছিল এমন এক সম্প্রদায়ের যে সম্প্রদায়ের লোকজন বাংলাদেশে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হয়। সে ছিল এমন একজন নারী যে আমাদের দেশের সর্বাধিক ভক্তিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানকে ভয় পায়নি। তাঁর এইসব বৈশিষ্ট্যই তাঁকে ভয়ানকভাবে নিরাপত্তাহীন এবং অন্তর্ধানের (অর্থাৎ যাদেরকে কোনো চিহ্ন ছাড়াই অদৃশ্য বানানো হয়) টার্গেট বানিয়েছিল।

এখানে “ডেইলি স্টার (The Daily Star)” এবং অন্যান্য পত্রিকার শিরোনামগুলো উল্লেখ করা হল — “DU students urge government to rescue Kalpana Chakma” (The Daily Star, July 1, 1996), “Mahila Parishad urges govt to rescue Kalpana” (The Daily Star, July 2, 1996), “Abduction of Kalpana, Home ministry probe demanded” (The Daily Star, July 5, 1996), “Int’l appeal for Kalpana’s release” (The Daily Star, July 10, 1996), “HR bodies urge Home Ministry to rescue Kalpana” (The Daily Star, July 15, 1996), “Kalpana issue: 24 Infantry Div terms it a conspiracy against Army” (The Daily Star, July 24, 1996), “Where’s Kalpana?” (The Daily Star, July 24, 1996)।

তাঁর অপহরণের ১৩ বছর পরও “কল্পনা কোথায়?” এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই।

বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের (Bangladesh Human Rights Commission) একটি প্রতিবেদনে কার্যনির্বাহী পরিচালক আইনজীবী কে.এম.হক কায়সার কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছিলেন কল্পনা ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে অবস্থান করছিল ( The Daily Star, July 9, 1996)।

প্রতিবেদনে আরো দাবি করা হয়েছে যে, অপহরণের জন্য অভিযুক্ত কর্মকর্তা ঘটনার সময় অন্য দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত ছিল।

যাঁরা BHRC (Bangladesh Human Rights Commission) – এর  এই সন্দেহজনক প্রতিবেদন সংকলন করেছে তারা কখনো প্রধান দুই সাক্ষী কল্পনার দুই ভাইয়ের সাথে কথা বলেনি। তার পরপরই, খুবই তাড়াতাড়ি দাবি উঠল কল্পনা চাকমাকে নাকি ঝিনাইদহে ( The Daily Star July 28,1996) তৃপ্তি বেগম রূপে দেখা গিয়েছে কিন্তু সেই দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হল।

যখন তাঁকে “দেখা গিয়েছে” বলে মিথ্যা দাবি চলছিল এবং বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো থেকে চাপ বৃদ্ধি পায় তখন সরকার বাধ্য হয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে কল্পনা চাকমার হদিস উদঘাটন করার জন্যে।

মজার ব্যাপার হল, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন কোনদিন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি এবং প্রতিবেদনটি যখন সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয় তখন এটি প্রতারণাপূর্ণ হিসেবে রয়ে যায়। দেখা গিয়েছে যারা এই অপহরণে অভিযুক্ত হিসেবে দায়ী ছিল তারা যেই রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তার অধীনে তারা বরাবরই শাস্তি থেকে রেহাই ভোগ করে আসছে।

যদিও আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় ছিল এবং মনে হয়েছিল যেন তাদের পার্বত্য চট্টগ্রাম-পন্থী মনোভাব রয়েছে কিন্তু তাদের ক্ষমতার অধীনে করা তদন্ত থেকে কোন ধরণের ইতিবাচক কিছু আসেনি।

তাঁর মা এবং ভাইয়ের দেওয়া তথ্যমতে, ১৯৯৬ সালের ১২ই জুন সকালে খুবই ভোরে কল্পনা চাকমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেদিন ছিল জাতীয় নির্বাচন, যে নির্বাচনে প্রথমবারের মত হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার জিতেছিল। স্বচ্ছ বিচার ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতির অধীনে তাদের ২০০৮ সালের পুন-নির্বাচনের দ্বারা আমরা ন্যায়ের একটি আশা নিয়ে পুনর্দীপ্ত হয়েছিলাম।

১৯৯৬ সালের পরবর্তী সরকার চলতি বছরে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে রাজনৈতিক বিচারশক্তি দেখিয়েছিল এবং এলাকায় যুদ্ধ শেষ করতে সক্ষম হয়। দূর্ভাগ্যক্রমে যদিও আদিবাসী নেতা সন্তু লারমা অস্ত্রসমর্পণ করেছিলেন এবং চুক্তিটি স্বাক্ষর করেছিলেন কিন্তু চুক্তির বেশিরভাগ ধারা আজ পর্যন্ত অবাস্তবায়িত।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি পুরোপুরিভাবে বাস্তবায়ন করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় এবং সংসদের ভারপ্রাপ্ত নেত্রী সায়েদা সাজেদা চৌধুরীকে চুক্তি বাস্তবায়নের জাতীয় কমিটির প্রধান করা হয়েছিল।

কল্পনা কখনো শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে দেখেনি। কারণ তা দেখার আগেই তাঁর জীবন শেষ করা হয়েছিল। কিন্তু সে যতদিন বেঁচে ছিল ততদিন সে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের (Hill Women’s Federation) সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে আদিবাসীদের অধিকারের জন্যে লড়ে গিয়েছে। বাংলাদেশী নারীদের প্রতি যৌন সহিংসতা প্রবল কিন্তু আদিবাসী নারীরা যৌন সহিংসতার জন্য সর্বদা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।

HWF(Hill Women’s Federation) মূলত গঠিত হয়েছিল আদিবাসী মহিলারা যে ধর্ষণ এবং যৌন অপরাধের স্বীকার হন তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে।

কল্পনার ডায়েরি, পত্রপত্রিকার বিভিন্ন অনুচ্ছেদ এবং বিভিন্ন কর্মীর প্রবন্ধ থেকে “কল্পনার ডায়েরি” নামে একটি বই প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর গ্রন্থিবদ্ধ স্মৃতিকথা সরকার এবং সামরিক বাহিনীর অধীনে আদিবাসীরা যে কষ্টের সম্মুখীন হয় তা প্রকাশ করে।

পিতৃতান্ত্রিক সমাজের বিরুদ্ধে কঠোর বিরোধিতা এবং সামরিক শাসনের অধীনে ও জাতিগত আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাস করার ঘৃণা সে তাঁর লেখনিতে প্রকাশ করেছে।

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় বাঙালি এবং আদিবাসীদের সমান অংশগ্রহণের কথা সে বলে। সে বর্ণনা করেছে সমাজ কিভাবে একটি কাঠামো গঠন করেছে যেখানে একজন নারী যখন কোন কিছুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় তখন তাকে শান্তি ভঙ্গের কারণ হিসেবে দেখা হয়।

প্রতিবছর জুনের ১২ তারিখ কল্পনা চাকমার জন্যে বিচার দাবি এবং শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের আহ্বান জানানোর জন্য সমাবেশ, আলোচনা সভা এবং মানববন্ধনের আয়োজন করা হয় হয়। এই বছর ও ব্যতিক্রম হবে না, কিন্তু সরকার কি শেষ পর্যন্ত এইসব বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিবে?

কল্পনা খুবই অল্প বয়সে দুর্দান্ত রাজনৈতিক বিচারশক্তি এবং নেতৃত্বের গুণাবলী দেখিয়েছিল। জনগণকে শাসকদের হাত থেকে বাঁচানোর গুণ ছিল তাঁর। সুতরাং তাঁর অদৃশ্য হওয়া জরুরি ছিল নয়তো সে যেকোনো ধরনের সমস্যা সৃষ্টির কারণ হতে পারত। তাঁর অপহরণকারীরা সার্থক হয়েছে এবং কখনও তাদেরকে শাস্তি দেওয়া হয়নি।

আমরা আর কতদিন অপরাধীদেরকে এই অপরাধ থেকে পালিয়ে যেতে দিব? এটি এখনও আমাদের হাতে রয়েছে।

ডেইলি স্টার, ১২ই জুন,২০০৯।

মূল লেখিকাঃ Hana Shams Ahmed

এ লেখাটি নেওয়া হয়েছে মূলত Between Ashes and Hope: Chittagong Hill Tracts in the Blind Spot of Bangladesg Nationalism থেকে।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Saptorshi Dewan

Editor
"Do one thing every day that scares you."

Follow Saptorshi Dewan

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Close Bitnami banner