icon

সুইডেন থেকে মেক্সিকোঃ আদিবাসীদের ব্যাখ্যায় তাঁদের ভাষা বিলুপ্তির কারণ

Neeti Chakma

Last updated Jun 7th, 2020 icon 244

প্রত্যেক ভাষা বাস্তবতাকে দেখার এক একটি স্বতন্ত্র উপায় প্রতিনিধিত্ব করে । ভাষা হলো সেই বাহন যার মাধ্যমে একটি সম্প্রদায়ের চিন্তা, ঐতিহ্য, রীতিনীতি, উপাখ্যান, এমনকি অনুভূতি গড়ে ওঠে ও প্রকাশ পায়।

ভাষা সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই কোনো নির্দিষ্ট ভাষাভাষী গোষ্ঠীর পরিচয় ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করতে হলে তাঁদের ভাষাকে রক্ষা করতেই হবে।

ইউনেস্কোর মতে, বর্তমানে বিশ্বের তিন হাজারের অধিক ভাষা বিলুপ্তির মুখে। যেমন – ‘ইয়াগান’। ইয়াগান আর্জেন্টিনা ও চিলির দক্ষিণ অঞ্চল প্যাটাগোনিয়ার একটি যাযাবর জাতির ভাষা, যে ভাষার মাত্র একজন ভাষী বেঁচে আছেন।

মেক্সিকোর ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব ইন্ডেজেনাস ল্যাঙ্গুয়েজ (ILANI) এর তথ্য মতে, দেশটির অন্তত ৬৪ টি ভাষা বিলুপ্তির পথে। পুরো বিশ্ব জুড়েই বহু ভাষা হারিয়ে যাবার পথে, ইউরোপ ও আমেরিকা তার ব্যতিক্রম নয়। ইউরোপে বিশটিরও বেশি ভাষা বিলুপ্তির একেবারে দ্বারপ্রান্তে।

কেন ভাষা হারিয়ে যায়?

ভাষাবিদ ও অ্যাক্টিভিস্ট ইয়াসনায়া এলেনা এগুইলার ও সোফিয়া জানকের মতে, আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি যে অবস্থায় বা যেভাবে বসবাস করে তা ওই দেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রাদায়ের সংস্কৃতির সাথে একীভূত নয়, যা তাদের ভাষার বিলুপ্তির মূল কারণ।

টেডএক্স (TEDx) এ এক বক্তব্যে জানক, যিনি সামি আদিবাসী গোত্রের একজন, আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির উপর অবিরত আসতে থাকা আক্রমণ নিয়ে বলতে গিয়ে বলেন,

“গুটিকয়েক বড় বড় কর্পোরেশন আমাদের ভূমিতে আক্রমণ চালায়, আমাদের বসতভিটা ছেড়ে যেতে বাধ্য করে, এক কথায় তারা আমাদেরকে উচ্ছেদ করে আমাদের থেকে পরিত্রাণ পেতে চায়।

এসব কর্পোরেশনগুলোর লক্ষ্য শুধুই অর্থ, এছাড়া আর কিছু নয়। এটিই হলো আমার সম্প্রদায়ের করুণ অবস্থা, আর এটিই হলো বিশ্বের প্রত্যেক আদিবাসী সম্প্রদায়ের অবস্থা।”

বিশ্বের বহু আদিবাসী গোষ্ঠী বরাবরের মতোই তাঁদের ভূমির বেদখল ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছে। মেক্সিকোতে ২০১৮ সালের অক্টোবরে ঘটে যাওয়া জুলিয়ান ক্যারিলো হত্যা বিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছিল।

রারামুরি জুলিয়ান ক্যারিলো ছিলেন একজন পরিবেশবিদ যিনি মেক্সিকান সরকার দ্বারা অনুমোদিত খনি খননের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছিলেন এবং চোরাই কাঠ কাটা থেকে সিয়েরা মাদ্রের বনকে রক্ষা করেছিলেন।

একইভাবে ২০১৬ সালের মার্চে বের্তা ক্যাসেরেস হত্যা বিশ্বে বিভিন্ন সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনামে পরিণত হয়েছিল। হন্ডুরাসের লেন্সা সম্প্রদায়ের বের্তা ক্যাসেরেস হাইড্রোইলেক্ট্রিক বাঁধ নির্মাণের বিরুদ্ধে তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।

এরুপ বিচারহীন রয়ে যাওয়া ঘটনা পরবর্তীতে আরও ঘটে থাকে, বারবার। এই বছরের ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে কোস্টারিকার ব্রোরান সম্প্রদায়ের এক আদিবাসী অ্যাকটিভিস্টকে হত্যা করে এক সশস্ত্র দল।

সরকার এই হত্যার বিচারের কার্যকর পদক্ষেপ নেয় নি যা সরকারকে অন্যান্য অ্যাকটিভিস্টদের তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।

২০১৯ সালের মার্চে ‘মেক্সিকান কংগ্রেস অব ডেপুটিস’ – এর কাছে দেওয়া এক ঘোষণায় ইয়াসনায়া এগুইলার দাবি করে বলেন,

“আদিবাসীদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে না। মেক্সিকোর সরকার এসব ভাষাকে হত্যা করছে।”


মেক্সিকোর চাতিনো (Chatino) সম্প্রদায়ের এক বালিকা
Photo Credit : Pxfuel, under CC license

এই ঘোষণায় তিনি তুলে ধরেন আদিবাসী ভাষার বিলুপ্তি কীভাবে ভূমি দখলের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

একই দাবি উঠে এসেছে এনজিও গ্লোবাল উইটনেস এবং নানা অ্যাকটিভিস্টদের বক্তব্যে। নরওয়ের সামি সম্প্রদায়ের অ্যাকটিভিস্ট ইভা এম. ফেলহেইম দাবি করেন, আদিবাসী পরিবেশ রক্ষকদের হত্যার পেছনে কৃষিশিল্প এবং খনি খনন-ই প্রধান কারণ।

লাতিন আমেরিকায় এরুপ বহুসংখ্যক হত্যার নজির আছে। ফেলহেইম পিকারা ম্যাগাজিনকে বলেন,

“গত দশ-পনের বছরে আমাদের ভূমির উপর চাপ লক্ষ্যনীয়ভাবে বেড়েছে এবং এর কেন্দ্রীয় কারণ হলো প্রাকৃতিক শক্তি সম্পদ”

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, 

“আমরা উপলব্ধি করেছি আমাদের কোনো আইনগত অধিকার-ই নেই যা আমদের রক্ষা করতে পারে।”

এমনও অনেকে আছেন যারা মনে করেন,  আদিবাসী ভাষা বিলুপ্তির একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হলো তাঁদের উপর চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্য। 

২০১৭ সালে লিমার আন্তর্জাতিক বইমেলায় পেরুর লেখক এবং কেচুয়া বক্তা পাবলো ল্যান্ডিও বলেন,

“আদিবাসী ভাষার সামাজিক অবকাঠামো থেকে বৈষম্যের উদ্ভব হয় এবং এই ভাষা নিয়ে অনেকের মধ্যে লজ্জার মনোভাব দেখা যায় কারণ আদিবাসী ভাষাগুলোকে ধরা হয় সেকেলে এবং অনগ্রসর হিসেবে। শব্দের অপ্রতুলতা ও চর্চার অভাব এই বৈষম্যের কিছু দিক। “

মেক্সিকোর মতো আরও অনেক দেশের রাষ্ট্র আদিবাসী সংস্কৃতি, সাহিত্য ও শিল্প রক্ষাবিষয়ক প্রকল্পের জন্য ফান্ড গঠন করে না। সুইডেনে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে স্থানীয় ভাষার চেয়ে ইংরেজি, ফিনিশিয় ও জার্মান ভাষা বেশি সেখানো হয়।

সুইডেন, নরওয়ে, ফিনল্যান্ড থেকে শুরু করে মেক্সিকো কিংবা পেরু, নরডিক দেশগুলোর মধ্যে স্থানিক দূরত্ব থাকলেও আদিবাসী ভাষাগুলোর পৃথকীকরণে, তাদের পরিচয় বিনাশে ও আদিবাসীদের সামগ্রিক স্মৃতি মুছে দিতে তারা সবাই এক।


ফিনল্যান্ডে সামি সম্প্রদায়ের একজন আদিবাসী   
Photo Credit: flickr/youngbrouv, under CC license

জাতিসংঘ আদিবাসী ভাষাসমূহকে পুনরুজ্জীবিত ও অগ্রসর করতে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী ভাষা দশক’ উদযাপনের ঘোষণা দিয়েছে। এটি শুরু হবে ২০২২ সাল থেকে।

মূল লেখকঃ অ্যানেট একলান্ড  (Anette Eklund)

তথ্যসূত্রঃ https://medium.com/adinkra/from-sweden-to-mexico-indigenous-people-explain-why-their-languages-are-disappearing-4a2a3e37e734

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Neeti Chakma

Contributor

Follow Neeti Chakma

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Close Bitnami banner