Last updated Oct 6th, 2026
2

খাদ্য শষ্য বা ফলের রসে থাকে শর্করা। তাকে গেঁজিয়ে যে তরল পানীয় তৈরী হয়-তাই মদ ৷ পানে নেশা হয় । অল্পে স্নায়ু-মস্তিষ্ক উত্তেজিত হয় । ফুর্তি আসে। তুরীয় আনন্দে নেশাখোর লাফায় । হাসে, গান গায় । পরিমাণ বেশী হলে মগজে ধ্বস নামে । শরীর অবশ হয় । ঝিম ধরে। চেতনাবোধ থাকে না ।
বৌদ্ধ সাহিত্যে মদের উৎপত্তির কাহিনী আছে । সুর নামে ছিল এক কাঠুরিয়া। কাঠ কেটে তার সংসার চলে । একদিন বনে গিয়ে দেখে অবাক কান্ড । গাছের এক খোদলে জমে আছে তরল পানীয়। দু’চারটা পাখী সেই পানীয় সেবন করে ডানা ঝাপটায় । তারপর ঝিম মেরে থাকে অনেক্ষণ । উড়তে গেলে পাক খেয়ে পড়ে। প্রহর পেরোলে চাঙ্গা হয়ে ফের উড়াল দেয়।
একই দৃশ্য সুর দেখে প্রতিদিন। কৌতূহল হয় তার। একদিন সেও পানীয় গ্রহণ করে। তূরীয় আনন্দ ও অর্ধ অবশ চেতনা তাকেও গ্রাস করে প্রহর ধরে। সংসারের দুঃখ কষ্ট সব ভুলিয়ে দেয় এই পানীয়। দারা-পুত্র-পরিবার কারো কথা আর মনে পড়ে না। বনের সেই বৃক্ষকে জড়িয়ে বেড়ে উঠেছিল এক লতিকা৷ সেই লতার পাকা ফল ঝরে জমা হয় গাছের খোদলে। পানির সঙ্গে মিশে গেঁজে তৈরী হয় মদ প্রাকৃতিক নিয়মে।
কাঠুরিয়া দারুন চালাক৷ এই প্রক্রিয়া বুঝতে সক্ষম হয় সে। ঘরে বসে একই রীতিতে সে মদ বানাতে শুরু করে। নিজে পান করে, অন্যকে পান করতে শিখায়৷
মদকে শাস্ত্রীয় পরিভাষায় ভদ্রভাবে বলা হয় সোমরস। সোমলতা সহযোগে তৈরী হয়-তাই। এটা দেব ভোগ্য বস্তু। কাজেই মুনি-ঋষিদেরও। প্রাচীনকালে কোন ঋষির আশ্রমে রাজা অতিথি হলে- শূলপক্ক গো-বৎসরে মাংসসহ সোমরস পরিবেশন করা হত। তান্ত্রিক সাধনায় মদ্য-সেবন অপরিহার্য। কাপালিকরা এটাকে বলে কারণ বারি। মড়ার মাথার খোদলে ভরে সাধনকালে সেব্য।
পানীয় সংস্কৃতির অধিকারী চাকমারাও। আমাদের দো-চোয়ানি মদ রসিক জনের কাছে খুবই সমাদৃত। এলকোহলের পরিমাণ খুবই বেশী। এক চুমুকেই শরীরকে চাঙ্গা করে। খ্যাতনামা ব্যঙ্গ লেখক রাজ শেখর বসু (পরশুরাম) এটাকেই বুঝি নাম দিয়েছিলেন- চাঙ্গায়নী সুধা। সোমলতা এখানে পাওয়া যায় কিনা জানি না। তবে আমাদের মেয়েরা বনজ শিকড়-বাকল পাতা চাউলের গুঁড়ার সঙ্গে মিশায়ে এক দেড় ইঞ্চি ব্যাসের গোল-চ্যাপটা বড়ি বানায়-যাঁর নাম ‘মুলি’। এতে থাকে ‘ইস্ট’ বা ছত্রাক জাতীয় উদ্ভিদের বীজ৷
শর্করা জাতীয় উপাদানের সঙ্গে মিশালে এর জৈবিক বিক্রিয়ায় এলকোহল বা মদ তৈরী হয় । ভাতের সঙ্গে মুলি মিশায়ে ২/৩ দিন রেখে দিতে হয়। এই মিশ্রণ মদ তৈরীর মৌলিক উপাদান।
চাকমারা পাঁচ প্রকারের মদ তৈরী করে৷
জগরা : বিন্নিভাত ১৫/২০ দিন গেঁজিয়ে সেই রস ছেঁকে নিলে পাওয়া যাবে জগরা। স্বাদে-টক-মিষ্টি।
এক চোয়ানি : পানি মিশ্রিত গ্যাজানো ভাত চোলাই করে পাওয়া যায় এক চোয়ানি মদ৷
দো-চোয়ানি : এক চোয়ানি মদ দ্বিতীয় বার অল্প আঁচে চোলাই করলে দো- চোয়ানি পাওয়া যায় । দুই বার চোলাই করা হয় তাই-এর নাম দো চোয়ানি৷এতে সুরার পরিমাণ খুব বেশী ।
ভাদি কাবা : সুরা ৭০° সেন্টিগ্রেড্ ও পানি ১০০° সে. উত্তাপে বাষ্পীভূত হয় । আগুনের তাপকে নিয়ন্ত্রণে রেখে Fractional distillation প্রক্রিয়ায় একবার চোলাই করে উত্তম মদ তৈরী করা যায়৷
* চাকমাদের সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে মদ নিষিদ্ধ বস্তু নয় । মদ ও মাতলামি এক জিনিস নয়, মাতলামি ঘৃণাহ৷
উপজাতীয় সমাজে মদ অতি তাপরিহার্য । এর ব্যবহার বহুমাত্রিক ।
(১) দেবভোগ্য হিসাবে পূজায় ব্যবহার : দেবতাকে মঙ্গল কামনায় পূজা দেওয়া হয়, মদ্য পরিবেশন অপরিহার্য। শষ্যের অধিষ্ঠাত্রী দেবী মা-লকিখমার পূজায়ও অবশ্যই মদ থাকবে ।
(২) তান্ত্রিক চিকিৎসায় ও ওঝা-বৈদ্য আপ্যায়নেঃ চিকিৎসা ও সামাজিক ক্রিয়াকর্ম ও পূজা সম্পাদনের জন্য ওঝা-বৈদ্যকে বাড়িতে ডাকা হলে তাকে সকাল বিকাল মদ পরিবেশন করা নিয়ম ।
৩) ঔষধ প্রস্তুত করণেঃ চাকমাদের তালিক শাস্ত্রমতে ঔষধ প্রস্তুত করতে অনেক সময় দো-চোয়ানি মদ দরকার হয়।
(৪) অতিথি আপ্যায়নে : বাড়িতে সম্মানিত অতিথি এলে খাদ্য পরিবেশনের আগে দো-চোয়ানি বা নিদেনপক্ষে এক চোয়ানি মদ পরিবেশন করা শিষ্টাচারের পরিচায়ক।
(৫) সামাজিক ভোজে ঃ বিয়ে, প্রীতি ভোজ, পূজা-পার্বন ইত্যাদি অনুষ্ঠানে প্রচুর মদ্য পরিবেশন করা হয় । এই মদ গৃহকর্তাকে তৈরী বা যোগাড় করতে হয় । কেউ মারা গেলে তার শ্রাদ্ধ বা সাপ্তাহিক ক্রিয়া সাত দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয় । সেক্ষেত্রে প্রচুর মদ গাজানো সম্ভব নয় । তাই নিমন্ত্রিত অতিথি ও আত্মীয় স্বজনরা সাধ্যমত মদ নিয়ে আসে। আগে ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও মদের ব্যবস্থা থাকত। এখন অনেকে মদ্য পরিবেশন থেকে বিরত থাকেন।
(৬) বিয়ের প্রস্তাবনায় ও আচার অনুষ্ঠানে ঃ কনে দেখা, বিয়ের তারিখ ঠিক করা বা কনে আনতে যাওয়ার সময় মদ নেওয়া সামাজিক শিষ্টাচার ভুক্ত । বরপক্ষ নারিকেল ও বিবিধ খাদ্যদ্রব্যের সঙ্গে কয়েক বোতল মদ নিয়ে কনের বাড়িতে যায়৷ আহারের আগে এই পানীয় পরিবেশন কালে নানা রঙ্গ-পরিহাসের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা বা দিন তারিখ পাকা হয়ে যায়।
(৭) উপঢৌকন স্বরূপ মদঃ কারো কাছে কৃপাপ্রার্থী হয়ে গেলে এক বোতল মদ নেওয়া বিধেয় । এটাকে ঘুষ বলা যায় না। বরং ভেট বলা যায়৷
(৮) প্রণামী স্বরূপ মদ : শ্রদ্ধেয় গুরুজন বা সম্মানিত ব্যক্তিকে দর্শনি বাবদ এক বোতল দো-চোয়ানি মদ এর জুড়ি নেই। গুরুত্ব অনুসারে এরপর এক বোতল মধু, জগ্রা কিংবা এক চোয়ানি মদ৷ নব-বর-বধূ গুরুজনকে প্রণাম জানাতে যায় এক বোতল মদ উপহার নিয়ে৷
(৯) সামাজিক বাধ্য-বাধকতাঃ বিয়ের কনে নিয়ে কোন গ্রামের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় যদি কেউ একটা বাঁশ ফেলে রাস্তা আটকে দেয়, তবে এক বোতল মদ সম্মানী দিয়ে সেই বাধা অতিক্রম করা যায়৷ গ্রাম-সালিশের সময় বিচার প্রার্থীকে সম্ভব হলে মদ যোগাতে হবে বিচার কাজে আলাপের সময় পরিভোগের জন্য৷

(১০) বিঝু উৎসবে মদঃ বছরের শেষ দু’দিন এবং নূতন বছরের প্রথম দিন-এই তিন দিন পালিত হয় বিঝু উৎসব । মদ এই উৎসবের প্রধান অঙ্গ । ঘরে ঘরে মদ প্রস্তুতের ধুম পড়ে যায় এই সময় ।
বিঝু পবিত্র দিন। এই সময় শত অপরাধে কেউ যদি কারো কাছে এক বোতল মদ প্রণামী দিয়ে মাফ চায়, তাকে ক্ষমা না করা কেউ ভাল চোখে দেখে না। সোমরস দেব-ভোগ্য । মুনি-ঋষি, রাজা-মহারাজাদের পরিভোগের বস্তু । কারণবারি তান্ত্রিক সাধনায় অপরিহার্য। চাঙ্গায়নি সুধা চাঙ্গা করে দৈহিক ও মানসিকভাবে নির্জীবদের। আর দো-চোয়ানি সবার পরিভোগ্য। দেব-দেবীকে দিতে হয় পূজার সময়। শ্রমিকরা পান করে হাড় ভাঙ্গা খাটুনির পর। রসিক জনেরা সন্ধ্যায় আসর জমায়৷
বাংলাদেশের গাঁজা নিয়ে গান আছে-
একছিলিমে যেমন তেমন দুই ছিলিমে তাজা,

তিন ছিলিমে উজির নাজির, চার ছিলিমে রাজা ।
দুপাত্র দো-চোয়ানি পান করার পর সত্যি আমি রাজা হতে দেখেছি অশোক কুমারকে৷
ইংরাজ রাজত্বের শেষ পাদে চাকমারা যাত্রাভিনয় করত । এই অশোক বাবু ছিলেন এক নামী অভিনেতা । নাটকে রাবণ রাজা বা যে কোন রাজা সাজতে হত তাকে । দশাসই চেহারা । মাথায় বাবরি চুল । যাকে বলে ষ্টেজে মানান সই ফিগার । দু-পাত্র পেটে পড়লে তিনি চাঙ্গা হয়ে উঠতেন। গায়ে কম্বল জড়িয়ে রাজা হয়ে যেতেন।
তাৎক্ষণিক মেক আপ আর পোষাক আর কোথায় পাওয়া যাবে। সান্ধ্য আসরের কোলাহল ছাপিয়ে গমগমে গলায় রাবন রাজার বিখ্যাত উক্তি আওড়াতেন—এক লক্ষ পুত্র মোর সোয়া লক্ষ নাতি, আর কেউ রইল না বংশে দিতে বাতি ।
মদ স্ব-মহিমায় সর্বত্র প্রতিষ্ঠিত । চাকমা সমাজে তো বটেই।
লেখক -ডা: ভগদত্ত খীসা
প্রসঙ্গ:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।