Last updated Oct 6th, 2026
0

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রামে স্মরণাতীত কাল থেকে বিভিন্ন আদিবাসী পাহাড়ি জাতি বাস করে আসছে। এই আদিবাসী পাহাড়ি জনগােষ্ঠীর ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজব্যবস্থা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য দেশের বৃহত্তর জনগােষ্ঠী থেকে সম্পূর্ণরূপে পৃথক।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের সামাজিক ব্যবস্থা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা যুগ যুগ ধরে প্রথাগতভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। পৃথিবীর সকল আদিবাসী জাতির সামাজিক ব্যবস্থা ও ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রথা ও রীতিনীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই প্রথা ও রীতিনীতি আদিবাসীদের জাতীয় জীবনে খুবই প্রয়ােজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথা ও রীতি সর্বদা গতিশীল ও অসীম। তাই প্রথাকে অনড়-অটল ভেবে কোনাে এক নির্দিষ্ট সীমারেখায় আবদ্ধ করা কাম্য নয়। প্রথা সাধারণত অলিখিত হয়ে থাকে। স্মরণ রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র আইন সৃষ্টির পূর্বে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত আইন বিদ্যমান ছিল এবং এই আইন আদিবাসীদের সংস্কৃতি, জীবনব্যবস্থা ও অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত। তাই আদিবাসীদের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় আইনের চেয়ে আদিবাসীদের প্রথাগত আইন প্রাধান্য পাওয়া বাঞ্চনীয় ও অত্যাবশ্যক।
পাহাড়ি আদিবাসীদের প্রথাগত আইন বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত। বাংলাদেশের আইন যেমন- ১৯০০ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন ১৯৯৮, স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন ১৯৮৯, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরােধ নিষ্পত্তি কমিশন আইন ২০০১ ইত্যাদি এবং ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধানেও আদিবাসীদের প্রথাগত অধিকার স্বীকৃত।
আদিবাসীদের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও মালিকানা ব্যবস্থা কতােগুলাে নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এসব নীতিমালার বিষয়ে নিচে আলােকপাত করা হলাে।
১. ভূমির মালিকানা সামাজিক: প্রথাগত ভূমিব্যবস্থাপনা অনুসারে আদিবাসীদের ভূমির ওপর মালিকানা ব্যবস্থা সমষ্টিগত বা সামাজিক। প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থায় ব্যক্তিগতভাবে কাউকে ভূমির ওপর স্থায়ী মালিকানা প্রদান করা হয় না।
গ্রামের আওতাধীন ভূমির ওপর ওই গ্রামের অধিবাসীদের সকলের সমান অধিকার রয়েছে। গ্রামের কার্বারী বা মৌজাপ্রধানের নেতৃত্বে বা ব্যবস্থাপনায় প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। একটি শক্তিশালী নীতিবােধ ও শৃঙ্খলার ভিত্তিতে এই প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়।
আদিবাসীদের সামাজিক মালিকানা যেমন- জুমভূমি, শ্মশানভূমি, পাড়াবন বা মৌজাবন, গােচারণভূমি, গ্রামভূমি ইত্যাদি।
২. অবিক্রয়যােগ্য: জুমভূমির মালিক কোনাে জুমচাষী শুধু চাষের জন্য অন্য কোনাে জুমচাষীকে তার আওতাধীন জুমভূমিকে প্রদান করতে পারে। এর জন্য জুমভূমির মালিক জুমচাষী অপর জুমচাষীর কাছ থেকে কোনাে আর্থিক মূল্য বা অন্য কোনাে বিনিময় গ্রহণ করে না। আদিবাসীরা ভূমিকে বিনিময়ের (অর্থ বা অন্য কোনােভাবে বিনিময়) সম্পদ মনে করে না।
৩. মৌখিক: প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা মৌখিক ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। জুমভূমির ওপর সাময়িক মালিকানা প্রদান, জুমচাষের লক্ষ্যে কোনাে জুমচাষীকে এক বছরের জন্য জুমভূমি প্রদান, ঘর নির্মাণের জন্য জমি প্রদান ইত্যাদির ক্ষেত্রে মালিকানার দলিল প্রদান করা হয় না। ভূমির মালিকানা প্রদানসহ সমস্ত ক্ষেত্রে প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা মৌখিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। সকলেই এই মৌখিক সিদ্ধান্তকে গ্রহণ এবং শ্রদ্ধা করে।
৪. অঞ্চল: আদিবাসীরা কোনাে একটি অঞ্চলকে ঘিরে বসবাস করে। সে অঞ্চলে তারা গ্রাম গড়ে তোলে এবং চাষাবাদ করে। তারা সে অঞ্চলে গােষ্ঠীবদ্ধ ও সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করে।
আদিবাসীরা এ ধরনের অঞ্চলকে নিজেদের অঞ্চল বা দেশ মনে করে। আদিবাসীদের ভূমি বা অঞ্চলের ওপর এ ধরনের ধারণা বিশ্বাস ও মূল্যবােধকে আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘ স্বীকৃতি দিয়েছে।
৫. প্রেসক্রাইব রাইট: দীর্ঘদিন বসবাসের কারণে যে অধিকার প্রতিষ্ঠা পায় সেটিই প্রেসক্রাইব রাইট। কোনাে জুমভূমির ওপর কোনাে জুমচাষী বার বার চাষ করলে সেই জুমভূমির ওপর সেই জুমচাষীর অধিকার বর্তায়। এ ধরনের অধিকার আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনায় স্বীকৃত।
৬. পূর্ব অনুমােদন: গ্রামের জুমচাষীরা কোন বছরে কোন এলাকায় জুমচাষ করবে তা গ্রামের কার্বারীর সঙ্গে আলােচনা করে অনুমােদন নিয়ে জুম অঞ্চল নির্বাচন করে। কোনাে মৌজার জুমচাষী অপর মৌজায় জুমচাষ বা বসবাস করতে চাইলে মৌজাপ্রধানের পূর্বানুমােদন নিতে হয় এবং এটি বাধ্যতামূলক।
৭. শক্তিশালী নীতিবােধ: প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনায় শক্তিশা লী এক শৃঙ্খলাবােধ কাজ করে। কোনাে জুমচাষী যদি কোনাে জুমভূমিকে জুমচাষের জন্য নির্বাচনপূর্বক ‘জুম নির্বাচনী চিহ্ন’ প্রদান করে, গ্রাম বা এলাকার অন্যরা সেই নির্বাচিত জুমভূমি চাষে এগিয়ে আসে না। এ ধরনের চিহ্ন বা রীতিকে জুমচাষীরা খুব শ্রদ্ধা করে।
প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনায় কী পরিমাণ নীতিবােধ কাজ করে তা এখান থেকে সহজে অনুমান করা যায়।
[প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনার জুমচাষের এ সংস্কৃতি বর্তমান যুগেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে, বিশেষত ব্রিটিশ আমল থেকে হালচাষের জমির ওপর মালিকানার চিহ্ন হিসেবে রাষ্ট্র কর্তৃক কাগজ দেয়া হয়। রাষ্ট্রপ্রদত্ত মালিকানার কাগজ থাকা সত্ত্বেও জমির মালিকানা নিয়ে বিরােধ বাধে, মারামারি বা খুনাখুনি হয়। এক্ষেত্রে প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনা থেকে আমাদের শেখার আছে। প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনায় কোনাে লিখিত কাগজকে নয় বরং নীতিবােধকে উচ্চস্থানে তুলে ধরে এবং নীতিবােধই প্রধান মনে করে। সে কারণে এ ব্যবস্থায় নীতিবােধ সংরক্ষণ ও প্রতিপালনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়াহয়]।
৮. শক্তিশালী শৃঙ্খলাবােধ: প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনায় শক্তিশালী নীতিবােধ যেমন কাজ করে, তেমনি এ ব্যবস্থার শৃঙ্খলাবােধও অত্যন্ত শক্তিশালী। উদাহরণস্বরূপ, ‘জুমভূমি’ আদিবাসী সমাজের সমষ্টিগত। মালিকানাধীন হলেও এর ওপর ব্যক্তি জুমচাষীর মালিকানা সুশৃঙ্খলভাবে প্রতিষ্ঠিত। কোনাে জুমভূমি একই জুমচাষী বার বার চাষ করলে সে জুমভূমির ওপর সেই জুমচাষীর মালিকানা প্রতিষ্ঠা পায়।
তবে ব্যক্তি জুমচাষীর এ মালিকানা স্বাধীন ও চিরস্থায়ী মালিকানা নয়। ব্যক্তি জুমচাষীর এ মালিকানা ওই গ্রাম বা অঞ্চলের অধিবাসীদের সামাজিক মালিকানার অধীন। ব্যক্তি জুমচাষী জুম থেকে জুমের উৎপাদন তােলার পর তা আবার সামাজিক মালিকানায় চলে যায়। এ সময়কালে গ্রামের সকলেই সে জুমভূমি থেকে লাকড়ি, ভেষজ ঔষধ, বনজ শাক সবজি ইত্যাদি সংগ্রহ করতে পারবে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী পাহাড়িদের ভূমি সংক্রান্ত প্রথা-রীতি দেশের বিভিন্ন আইনে স্বীকৃত হলেও বাস্তবে এসব আইনের বাস্তবায়ন নেই বললেই চলে। প্রথাগত আইন অনুসারে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বন্দোবস্তীর ক্ষেত্রে মৌজাপ্রধানের সুপারিশ গ্রহণ বাধ্যতামূলক।
কিন্তু সরকার সবসময় আদিবাসীদের এ প্রথাগত অধিকারকে মান্য করে না। জিয়াউর রহমান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের এই আইন লঙ্ঘন করে বহিরাগত সেটেলারদের ভূমির দলিল প্রদান করেছিলাে।
পার্বত্য চট্টগ্রামে জুমভূমি হলাে আদিবাসী পাহাড়িদের সমষ্টিগত মালিকানাধীন ভূমি। সরকার বা সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা পার্বত্য চট্টগ্রামের আইন ও প্রথা লঙ্ঘন করে। আদিবাসীদের জুমভূমির ওপর অবৈধভাবে ভূমি বন্দোবস্তী প্রদান করে চলেছে। আইনের উৎস হলাে প্রথা। সে রণে দেশে এমন কোনাে আইন প্রণয়ন করা উচিত হবে না যাতে কোনাে জনগােষ্ঠীর প্রথা ও রীতিনীতির প্রতি অবজ্ঞা কিংবা অগ্রাহ্য করা হয়।
আদিবাসীদের ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রথা ও রীতির ভিত্তিতে পরিচালিত। প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনায় মালিকানা ব্যবস্থা হলো সামাজিক। সে কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী পাহাড়িদের সকল প্রকার ভূমির মালিকানা সমষ্টিগত বা সামাজিক। ব্রিটিশ উপনিবেশের পরই কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যক্তিমালিকানার প্রবর্তন ঘটে। ব্রিটিশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের কাছে খাজনা সংগ্রহের লক্ষ্যে ভূমির ওপর ব্যক্তিমালিকানা ব্যবস্থার প্রবর্তন করে।
ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যক্তিমালিকানা ব্যবস্থা প্রবর্তনের কারণে আদিবাসী পাহাড়িরা নানাভাবে ক্ষতির শিকার হয়। ভূমির ওপর ব্যক্তিমালিকানার ব্যবস্থায় ব্রিটিশ সরকার আর্থিক ও অন্যান্য দিক দিয়ে লাভবান হলেও এই ব্যবস্থা আদিবাসী জনগােষ্ঠীর সংস্কৃতি ও তাদের মূল্যবােধের ওপর বড় ধরনের আঘাত হানে।
ভূমির সঙ্গে আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে জড়িত। তাই আদিবাসী সংস্কৃতিতে ভূমিকে মাততুল্য মনে করা হয়। আদিবাসীরা কখনও ভূমিকে বিক্রয়যােগ্য সম্পদ মনে করে না। তারা ভূমিকে পূজ্য মনে করে, তাই আদিবাসীরা প্রতি বছর ভূমির দেবতাকে পূজা দেয়, জুমভূমিতে উৎপাদিত শস্য ও শস্যদেবতার উদ্দেশ্যে পূজা দিয়ে থাকে। মনে রাখা দরকার, প্রথা-রীতি মানে হলাে অলিখিত ও বাস্তবতা অনুসারে সদা পরিবর্তশীল।
আদিবাসীদের ভূমি ব্যবস্থাপনাও প্রথা ও রীতির ভিত্তিতে পরিচালিত। আদিবাসীরা তাদের জীবন-জীবিকার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভূমিকে নানা ভাগে ভাগ করেছে-
(১) জুমচাষের জন্য জুমভূমি,
(২) গৃহস্থালী কাজের জন্য পাড়াবন বা মৌজাবন যেখান থেকে আদিবাসীরা ঘরনির্মাণের জন্য গাছ বা বাশ সংগ্রহ করে,
(৩) গরু-মহিষ ইত্যাদি চারণের জন্য গােচারণভূমি’,
(৪) মারা গেলে পােড়ানাে বা কবর দেওয়ার জন্য শ্মশানভূমি বা কবরভূমি,
(৫) বসতবাটির জন্য গ্রামভূমি’,
(৬) মাছ সংগ্রহের জন্য জলাশয় ইত্যাদি,
(৭) ধর্মীয় বা ঐতিহ্য কিংবা বিশ্বাসগত কারণে আদিবাসীরা কিছু জায়গাকে পবিত্র ভূমি মনে করে ইত্যাদি।
আদিবাসীদের ভূমি ব্যবস্থাপনা প্রথা ও রীতির ভিত্তিতে পরিচালিত বলে সাধারণত আদিবাসীদের কাছে ভূমির কোনাে কাগজপত্র থাকে না। কারণ তারা মনে করে- এ ভূমি কোনাে একক আদিবাসী ব্যক্তির নয়, এ সকলের। তাই ভূমির ক্ষেত্রে আদিবাসীদের মালিকানা ব্যবস্থা হলাে সামাজিক বা সমষ্টিগত মালিকানাধীন।
উল্লিখিত ভূমিসহ অপরাপর ভূমির মালিকানা ব্যবস্থা সমষ্টির, একক কারাের মালিকানাধীন নয়। ব্রিটিশ আসার পর কেবল পার্বত্য চট্টগ্রামে ব্যক্তিমালিকানাধীন বন্দোবস্ত প্রথার প্রবর্তন হয়। ব্রিটিশ সরকার ভূমির ওপর কর বসানাের লক্ষ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমির ওপর ব্যক্তিমালিকানা ব্যবস্থার প্রবর্তন করে। তখন থেকে রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতার কারণে কিছু কিছু আদিবাসী হালচাষের জমির বন্দোবস্ত নেয়।
পরবর্তীকালে কিছু কিছু পাহাড়ও বন্দোবস্ত করে নেয় আদিবাসীরা। কিন্তু এখনও অধিকাংশ আদিবাসী রাষ্ট্রীয় পরিচালিত ভূমিব্যবস্থাপনা ও মালিকানা ব্যবস্থায় অভ্যস্ত নয়। অধিকাংশ আদিবাসী এখনও তাদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, রীতিনীতি ও মূল্যবােধ অনুসরণ করে। সমষ্টিগত মালিকানার ভিত্তিতে নিজেদের ভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে আসছে। প্রথা ও রীতির আলােকে পরিচালিত সমষ্টিগত মালিকানাধীন ভূমি ব্যবস্থপনার কয়েকটি দৃষ্টান্ত নিচে তুলে ধরা হলাে।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রধান জীবিকা হলাে জুমচাষ। জুমচাষকে কেন্দ্র করে আদিবাসীদের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। আদিবাসীদের রূপকথা, গল্প, বাদ্যযন্ত্র, নৃত্য ও সঙ্গীত গড়ে উঠেছে জুমচাষ, বন ও পাহাড়কে কেন্দ্র করে। জুমচাষের জন্য আদিবাসীদেরকে জুমভূমি সংরক্ষণ করতে হয়।
জুমভূমি মানেই হলাে বন ও পাহাড়। পাহাড়ের বনজঙ্গল পরিষ্কার করেই জুমচাষ করা হয়। বনজঙ্গল ছাড়া ভালাে জুম হয় না। তাই জুমচাষীদের ভালাে জুমচাষের স্বার্থে বন সংরক্ষণ করতে হয়।
জুমভূমির মালিকানা সামাজিক। কোন গ্রামের জুমভূমি অঞ্চলের মালিক হলাে সেই গ্রামের সকল আদিবাসী বাসিন্দা। জুমভূমিতে জুমচাষ করা, লাকড়ি, প্রাকৃতিক সবজি, ওষুধ, জুম এলাকার ছড়ার মাছ ইত্যাদি আহরণে গ্রামবাসীর সকলের সমান অধিকার রয়েছে।
একটি সুশৃঙ্খল রীতি-পদ্ধতি ও শক্তিশালী নৈতিক মূল্যবােধের ভিত্তিতে জুমভূমি ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। জুমভূমির মালিক গ্রামের সবাই হলেও কোনাে পাহাড়ে প্রথম যে ব্যক্তি জুমচাষের জন্য চিহ্ন দিবে, সেই সে পাহাড়ে জুমচাষের অধিকারী হয়ে থাকে।
জুমচাষের লক্ষ্যে প্রদত্ত কোনাে চিহ্ন দেখলে সেই পাহাড়ে জুমচাষের জন্য কেউ আর হাত দেয় না। আদিবাসীদের সমষ্টিগত মালিকানায় এক শক্তিশালী মূল্যবােধ কাজ করে। কোনাে ব্যক্তি একটি পাহাড় প্রথম জুমচাষ করার পর পরবর্তীতে সেই পাহাড়ে জুমচাষের ক্ষেত্রে উপযুক্ত ব্যক্তিই অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। প্রথাগত ভূমি ব্যবস্থাপনায় এভাবে সামাজিক মালিকানার অধীনে ব্যক্তির অধিকার সুশৃঙ্খলভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
সাধারণভাবে চাষের এক বছর অবধি জুমের উৎপাদিত শস্যের ওপর জুমচাষীর অধিকার থাকে। তবে কোনাে কোনাে শস্য যেমন- মরিচ এক বছরের বেশি উৎপাদন দিয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে জুমের ওপর সেই জুমচাষীর অধিকার দেড় বছর পর্যন্ত থাকে। তারপর সে জুম (হাপেং/রান্যা) বা জুমভূমি গ্রামবাসীর সকলের হয়ে যায়। সকলেই সে জুমভূমি থেকে লাকড়ি, শাকসবজি ইত্যাদি সংগ্রহ বা ভােগের অধিকার থাকে।

আদিবাসী পাহাড়ি সমাজে পাড়াভিত্তিক ও ক্ষেত্রবিশেষে মৌজাভিত্তিক প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণ করা একটি সনাতনী প্রথা। পাহাড় এলাকায় সাধারণত পাড়াগুলাে গুচ্ছাকারে গড়ে উঠে। স্বাভাবিক কারণেই সংশ্লিষ্ট পাড়াবাসীর বনজ দ্রব্যের চাহিদা মেটাতে প্রাকৃতিক বন সংরক্ষণের বিকল্প নেই।
অনুরূপভাবে, নদীর অববাহিকা বা অপেক্ষাকৃত সমতল এলাকায় যেসব গ্রাম গড়ে উঠে, সেগুলাে বিস্তৃতি আকারে হয়ে থাকে। ফলে তখন পাড়াভিত্তিক বনের পরিবর্তে মৌজাভিত্তিক সংরক্ষিত বন সৃষ্টি করা আবশ্যক হয়ে পড়ে।
এ প্রকার বন শুধু বনজ দ্রব্যাদির চাহিদাই মেটায় না, বরং বন্যপ্রাণীর আশ্রয়স্থল হয়ে উঠে এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ ও ভারসাম্যতা রক্ষণেও এ সকল বনের গুরুত্ব অপরিসীম। এই উভয় প্রকার সংরক্ষিত বনের ক্ষেত্রে আদিবাসীদের প্রথা ও রীতি নিম্নরূপ:
(ক) পাড়াবন ও মৌজাবন সম্পূর্ণ সামষ্টিক মালিকানাধীন ও প্রাকৃতিক সংরক্ষিত বন। এই বনে কাঠজাতীয় গাছ রােপন করা হয় না। তবে এ সকল বনে বনৌষধি (দুষ্প্রাপ্য প্রজাতিসহ) ও ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়ােজনীয় বনজ উদ্ভিদাদি যেমন- বিভিন্ন প্রকার বেত ও লতা রােপন করা হয়।
(খ) গ্রাম পর্যায়ে কার্বারী ও মৌজা পর্যায়ে মৌজাপ্রধান এ সকল বন-ব্যবস্থাপনায় নেতৃত্ব প্রদান করে থাকেন।
(গ) সামষ্টিক কাজে বিশেষত বিদ্যালয় ঘর, উপাসনালয়, বিশ্রামাগার ইত্যাদি নির্মাণে এই বন হতে বনজ দ্রব্য সংগৃহীত হয়। বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যক্তির জন্যও অনেক সময় এই মৌজা বা পাড়াবন থেকে বনজ দ্রব্য সংগ্রহের অনুমতি দেয়া হয়। গ্রামে বিধবা, অসহায় ও খুব গরীব ব্যক্তি বা পরিবারের ক্ষেত্রে এটি প্রযােজ্য। সংশ্লিষ্ট কার্বারী বা হেডম্যানের উপস্থিতিতে আলােচনার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে হীত সিদ্ধান্তক্রমে সামষ্টিক কাজে বনজদ্রব্যাদি আহরণ করা হয়। ব্যবসা বা বিক্রয়ের উদ্দেশ্যে এই বন থেকে কোনাে দ্রব্য আহরণ নিষিদ্ধ।
(ঘ) পশুপাখি শিকারের উদ্দেশ্যে এই ধরনের বনে মারণাত্মক ফাদ পাতা শাস্তিযােগ্য অপরাধ।
(ক) বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ: পাখির ডিম সগ্রহ করা এবং বিরল প্রজাতির পশুপাখি শিকার নিষিদ্ধ। অনেক সময় কমদৃষ্ট হওয়ার কারণে কোনাে প্রজাতির পশুপাখি বিপদাপন্ন প্রজাতি বলে চিহ্নিত হলে সেই পশুপাখি শিকারে বিধিনিষেধ আরােপিত হয়। লঙ্ঘনকারীকে জরিমানা বা জরিমানাসহ শাস্তি প্রদানের বিধান রয়েছে।

(ক) জলের উৎস সংরক্ষণ: জলের উৎসমাত্রেই সামষ্টিক মালিকানাধীন । বিশেষত গ্রামের পাশে ঝর্ণা বা ঝিরির জল যাতে শুকিয়ে না যায়, সেজন্য পাড়াবনের গুরুত্ব অপরিসীম। এ ছাড়াও জুম কাটার সময় ঝর্ণা বা ঝিরির দুই পাড়ে অবস্থিত গাছ ও জঙ্গল কাটা হয় না। ফলে ওই স্থানের জল শীতল থাকে এবং শুকিয়ে যায় না।
(খ) মাছ শিকার ও জলজ প্রাণী আহরণ: প্রধানত জাল, দা, হার্টুন ইত্যাদি অস্ত্র বা বড়শি দিয়ে মাছ শিকার করা হয়ে থাকে। ঐতিহ্যগতভাবে আদিবাসীরা লুসি (লুই), চেমাই (যেটি দিয়ে জল সেছা হয়) ইত্যাদির মাধ্যমে নদীর পানি সেচের মাধ্যমে নদী বা ঝর্ণার মাছ ধরে। এ পদ্ধতিতে বিভিন্ন প্রকার জলজ প্রাণী যেমন- মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, শামুক, ঝিনুক, ব্যাঙাচি, ব্যাঙ ইত্যাদি আহরণ করা হয়। নদী, খাল, বিল ও অন্যান্য জলাশয়ে এভাবে মাছ আহরণ ও শিকার করা হয়।
(গ) মাছ শিকারে তথা জলজ প্রাণী আহরণে বিশেষ বিধিনিষেধ: জলাশয়, ঝিরি বা ঝর্ণায় মাছ ও জলজ প্রাণী আহরণ করতে জলে বিষাক্ত দ্রব্য প্রয়ােগ নিষিদ্ধ। লঙ্ঘনকারীর জরিমানা বা জরিমানাসহ শাস্তিবিধানের ব্যবস্থা রয়েছে।
(ঘ) জলজ প্রাণী আহরণে ব্যক্তিমালিকানা: কোনাে জলাশয়, ঝিরি বা জলাধারে ঝােপ কেটে ফেলে রাখা হয় যাতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী আশ্রয়গ্রহণ করে। ঝােপ বা বিভিন্ন গাছগাছালি রাখার পর উক্ত স্থানে প্রথাগত মালিকানা চিহ্ন স্থাপন করা হয়। এ ব্যবস্থাকে চাকমা ভাষায় ‘ঝঘা’ আর ত্রিপুরা ভাষায় ‘খাজি’ দেওয়া বলা হয়। অন্যান্য আদিবাসী জাতিসমূহেরও নিজস্ব ভাষায় নাম রয়েছে।
শ্মশান বা কবরস্থানের সংরক্ষণ: প্রতিটি আদিবাসী পাহাড়ি গ্রামে শ্মশানভূমি বা কবরস্থান সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। এ শ্মশানভূমি বা কবরস্থানের মালিকানা সামাজিক। এ শ্মশানভূমি বা কবরস্থানে গ্রামের ধনী-দরিদ্র বা নারী পুরুষ সবার সমান অধিকার রয়েছে। গ্রামের কেউ মারা যাওয়ার পর এই সামাজিক মালিকানাধীন শ্মশানভূমি বা কবরস্থানে দাহ বা কবর দেয়া হয়।
আদিবাসী পাহাড়ি সমাজে শশান বা কবরস্থানকে অন্যতম। পবিত্র স্থান বলে গণ্য করা হয়। পাহাড়ি সমাজে এর অপব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সেখানে গােচারণও নিষিদ্ধ। শাশান বা কবরস্থান যাতে জঙ্গলাকীর্ণ না হয়, তার জন্য সামাজিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। কার্বারীর নেতৃত্বে গ্রামবাসীরা মিলে আলােচনা করে গ্রামের পাশে সুবিধাজনক স্থানে শুশানভূমি বা কবরস্থান নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
পাহাড়িরা জুমচাষের পাশাপাশি বিভিন্ন প্রাণী যেমন গরু-মহিষ ইত্যাদি পালন করে আসছে। গ্রামের এসব গরুমহিষ চড়ানাের নিমিত্তে গ্রামবাসীরা প্রত্যেকটি গ্রামাঞ্চলে গােচারণভূমি সংরক্ষণ করে। জুমভূমির মতাে গােচারণভূমিও সমষ্টিগত মালিকানাধীন।
গ্রামবাসীর নির্ধারিত গােচারণভূমি কোনাে ব্যক্তি কর্তৃক দখল, আবাদ বা বাস্তুভিটা করা নিষিদ্ধ। গােচারণভূমি যাতে আগুনে পুড়ে না যায় তা সর্বদা লক্ষ্য রাখা হয়। সাধারণভাবে এক গ্রামের গবাদি পশু অন্যগ্রামের জন্য নির্দিষ্ট করা গােচারণভূমিতে চরানাে যায় না।
আদিবাসী পাহাড়িরা সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করে। তারা যেখানে যায় সেখানে পাড়া বা গ্রাম গড়ে তােলে। আদিবাসী পাহাড়িদের পাড়া বা গ্রামভূমি সমষ্টিগত মালিকানাধীন। গ্রামের কেউ যদি গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়, তখন সেই ব্যক্তির বসতভিটা কার্বারীর হেফাজতে চলে যায়। গ্রাম বা গ্রামের বাইরের কেউ যদি সেই খালি বসতভিটায় ঘর নির্মাণ করতে চায় তাহলে কার্বারীর অনুমতি নিয়ে নির্মাণ করতে হবে।
শন একপ্রকার তৃণজাতীয় উদ্ভিদ। এটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট। আদিবাসী পাহাড়িরা এটিকে ঘরের ছাউনী (চাল) বা আচ্ছাদনের কাজে ব্যবহার করে। শন দিয়ে ঘর কিংবা ক্ষেতের বেড়াও দেয়া হয়। আচ্ছাদনের কাজে শনের ব্যবহার খুবই কার্যকর বলে স্মরণাতীত কাল থেকে পাহাড়িরা শনের ব্যবহার করছে। শন খােলা বা শনখলা থেকে গ্রামের সকলেই শন সংগ্রহ করে থাকে। এই শনখােলা যাতে আগুনে পুড়ে না যায়, সে ব্যাপারে গ্রামবাসীরা সতর্ক থাকে।
আদিবাসী পাহাড়ি সমাজে পবিত্র স্থান বলতে শুধু যে ধর্মীয় উপাসনালয়, শ্মশান, কবর, বা কোনাে আরাধ্যস্থলসমূহ বুঝায় তা নয়। কোনাে না কোনাে কারণে স্থান, বস্তু বা বৃক্ষ ইত্যাদি ইষ্টদেবতার প্রতি ভক্তি জ্ঞাপন, প্রার্থনা বা পূজা-অর্চনার স্থল হয়ে উঠে। যেমন-
(ক) চলার পথে পাথর বা বৃক্ষবিশেষ,
(খ) কোনাে ব্যক্তি-কর্তক পজাকত। কোনাে স্থান,
(গ) প্রাকৃতিক জলাশয় বা পাহাড় ইত্যাদি।
পবিত্র বলে গণ্য এই ধরনের স্থান জাতিভেদে বিভিন্ন নামে পরিচিত। এই স্থানের পবিত্রতা নষ্ট হয়, এমন কিছু করা সমাজে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এ ধরনের পবিত্র স্থান। সামাজিক মালিকানাধীন হয়ে থাকে। এখানে ব্যক্তি কর্তৃক দখল বা চাষাবাদ করা গর্হিত কাজ হিসেবে বিবেচিত।
‘ঘাট’ বলতে স্নানের ঘাট, ধােয়ার ঘাট, গাে-স্নানের ঘাট, নদী পারাপারের ঘাট ইত্যাদিকে বুঝানাে হয়। এসব। ঘাট সমষ্টিগত মালিকানাধীন। এছাড়া নদী, ঝর্ণা, জলাশয়, কুয়া ইত্যাদিও সমষ্টিগত মালিকানাধীন। এসব ঘাট, কুয়া, নদী বা ঝর্ণার পানি ও সম্পদ আহরণে গ্রামের সকলের সমান অধিকার রয়েছে।
প্রসঙ্গ:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।