চাকমাদের গোজা বা গোত্তি পরিচিতি

0
115

চাকমাদের বংশ বা গোষ্ঠীর বিবরণ বিশ্লেষণ করা কিছুটা অসুবিধা। চাকমাদের বহুল গোজার কথা উল্লেখ রয়েছে। চাকমারা জাতি হিসেবে ক্ষুদ্র হলেও তাতে আবার বহু গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া যায়। এই গোষ্ঠী মূলত সম্ভ্রান্ত বা নামীদামী কোন একজন লোক থেকে উৎপত্তি হয়। আবার এমনও হয়েছে বিভিন্ন গোষ্ঠীর লোক নিয়ে গোজার সৃষ্টি হয়েছে। কাজেই চাকমাদের সমাজে পরিচয়ের ক্ষেত্রে প্রথমেই গোজার অনুসন্ধান করতে হয়। গোজার সংখ্যাও কম নয়, গোজা শব্দটি পদ বাচক সংস্কৃত গুচ্ছ শব্দের একই অর্থ বহন করে।

একে চাকমারা আরও বিকৃত উচ্চারণে “গোজা” আর গোষ্ঠীর শব্দকে “গুত্তি” উচ্চারণ করে থাকেন। সাধারণত পিতৃকূল নিয়ে গোষ্ঠী আর সম্প্রদ্বায় নিয়া গোজার অর্থ করেন। দেখা যায় পিড়াভাঙ্গা গোষ্ঠীর লোক যেমন ধামাই গোজায় আছে আবার ঐ একই গোষ্ঠীর লোক লারমা গোজায়ও আছে। এই ভাবে এক গোষ্ঠীর লোক দুই বা ততোধিক গোজায়ও আছে।

নিম্নে কয়েকটি গোজার নাম দেওয়া হল:

১। বগা গোজা: ধূর্য্যা নামীয় কোন এক সম্ভ্রান্ত সর্দার বাশখালীতে (চট্রগ্রাম জেলায়) ছিলেন। তাঁর অধঃস্তন বংশধরকে ধূর্য্যা গোষ্ঠী বলা হয়। এরা বগা গোজা। গোজার সর্দারের বর্ণ উজ্জ্বল গৌর এবং পা ও গলা লম্বা ছিল। এজন্য তাকে বগা (বক) নামে ডাকা হত।
গোষ্ঠী: ধূর্য্যা, নিনান্দ্যা, কাঠ্যোয়া, রাম দালিকা, মুলিখাজা, ভেলে, কাত্তুয়া, বোয়া নানু, কতুয়া ইত্যাদি।
গোজার প্রধান: শ্রীযুক্ত সূর্য্যচন্দ্র তালুকদার।

২। তৈন্যা গোজা: এই দলপতির নাম কুর্য্যা। তিনি এক সময়ে তিনমুড়ি নদীর তীরে বাস করতেন বলে তা হতে তৈন্যা গোজা নামে পরিচিত।
গোষ্ঠী: কুর্য্যা।

৩। মুলিমা গোজা: ধামানা গোষ্ঠী এক সময়ে এই দলপতি ছিলেন মহুরী নদীর তীরে। দলপতির নাম মুলিমা থংজা। মুলিমা থংজা এক সময় রাজার মন্ত্রী ছিলেন। তাঁর নামানুসারে মুলিমা গোজা নাম হয়।
গোষ্ঠী: ধাবানা, মিঠা, নোয়ান্যা, কলা, বামুন, চেগে, পচা, সল্যা, চাদং, বাদালি, রাঙাছিলন্যা।
প্রধান: মুলিমা থংজা।

৪। লচ্চর গোজা: গোষ্ঠী: ভিদ্দিনী, ওয়াংঝা, গজাল, পিড়াভাঙা ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত পঞ্চারাম তালুকদার।

৫। লার্মা গোজা: বর্তমান লামার একস্থানে পিড়াভাঙ্গা বংশীয় লার্মা নামে এক সর্দার ছিলেন। তাঁরই নামানুসারে লার্মা গোজার নামকরণ হয়। আবার মতান্তারে, কোন স্থান হতে নেমে গিয়েছিল বলে লার্মা গোজার নাম হয়েছে। বর্তমান লার্মা সেটারই নামান্তর। পূর্বনাম পিড়াভাঙ্গা।
গোষ্ঠী: চায্যা, বগা, ভবা, ঠদেগা, সমঝা ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত যুবরাজ দেওয়ান।

৬। কুরাকুট্যা গোজা: মাতামূহুরী নদীর এক উপনদীর “কুরা আঙুত্যা ছড়া” ছিল ঐ উপনদী অঞ্চলে এক সর্দার ছিলেন। তাঁর নাম নেন্দাব। কেউ কেউ ঐ ছড়া মহেশখালী দ্বীপে বলে থাকেন। ঐ অঞ্চলের নেন্দাবের বংশধরেররা বা তাঁর অধঃস্তন ব্যক্তিরা কুরাকুট্যা গোজা নামে পরিচিত। মতান্তরে, এক সময়ে তাঁরা রাজবাড়ীতে মোরগ বা কুড়ো কাটতো বা ঐ কাজের ভার তাঁদের উপর ছিল বলে এই নামে আখ্যা পেয়েছে। কোন এক সময়ে তাঁরা পার্বত্য ত্রিপুরায় গেলে, ত্রিপুরা মহারাজ সর্দারকে “নারাণ” আখ্যা দেন। নারাণ সেনাপতি বাচক শব্দ।
গোষ্ঠী: নেন্দাব, সুরেশ্বরী, তেতৈয়া, আউনাপুনা, কাউয়া, ভূত, ভদং, অমরী ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত গঙ্গামানিক দেওয়ান।

৭। বড়ুয়া গোজা: পূর্বে বড়ুয়ারা রাজ প্রাসাদের যাবতীয় কার্য্যাদি করতেন। কিন্তু তাতেও লোকের অভাব হলে বিভিন্ন গোজা হতে আরও ১৫০ শত পরিবার সংগ্রহ করে ঐ কাজে নিয়ুক্ত করা হয়। এতে তাঁরা বড়ুয়ার কাজ করত বলে কালে কালে ঐ সম্প্রদায় বড়ুয়া গোজা নামে খ্যাত হয়। মতান্তরে, সেনাপতি রণ পাগালার পুত্র বুড়া বড়ুয়ার অধঃস্ত লোকদের রাজার দেহরক্ষী, পাচক, হুকুমদারী ইত্যাদি কাজে নিয়োগ করা হয়। তাঁরাই সময়ে বড়ুয়া গোজা নামে পরিচিত হয়। এই গোজা রাজপাড়ালিয়া নামেও পরিচিত।
গোষ্ঠী: প্রায় সকল গোষ্ঠীর লোক এই গোজায় আছে।
প্রধান: শ্রীযুক্ত ভৈরব চন্দ্র দেওয়ান।

৮। বড়চেগে গোজা: পূর্বে রাজা রাম থংজার ছেলের নাম ছিল তৈন চেগে, বুন চেগে, রাঙ্যা কাউর ও কালা কাউর। এই চার পুত্রের মধ্যে তৈন চেগে ও রাঙ্যা কাউর-এর বংশধরেরা চেগে গোজা ও বড় চেগে গোজা। তৈন চেগে মন্ত্রী ছিলেন। তখনকার সময়ে মন্ত্রিদের চেগে বলা হতো।
গোষ্ঠী: কাট্যাল, উন্দুর তালা, দাড়িরাঙা, চেলিপুনা, পুংঝা, লোহা কদ্দা ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত চন্দ্রধন তালুকদার।

৯। ওয়াংঝা গোজা: রাঙ্যা কাউর ও কালা কাউরের বংশধর গাবুর ওয়াংঝা ও বুড়া ওয়াংঝা নামে “ওয়াংঝা গোজা” নামে পরিচিত। গোষ্ঠী: কাঁকড়া, শেঠ্যা, পুংঝা ইত্যাদি।
প্রধান: চাকমা রাজাগণ।

১০। কাম্বে গোজা: রাজার পাল্কী বহনকারীদের কার্বোয়া বলা হতো। ঐ কার্বোয়ার বংশধরেরা কাম্বে গোজা নামে পরিচিতি লাভ করে।
গোষ্ঠী: মেন্দর, কালাপেনজাঙি ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত জয়ধন তালুকদার।

১১। উচ্ছরী গোজা: পূর্বে হেলই নামে এক ধনুবিশেষ অস্ত্র ছিল। সেটি দিয়ে বড় বড় শিকার মারা হতো। সেটারই এক প্রধান শিকারীর নাম আসুরী। তাঁরই বংশধরেরা উচ্ছরী গোজা।
গোষ্ঠী: নেই।
প্রধান: শ্রীযুক্ত শশীকুমার দেওয়ান।

১২। পুমা গোজা: কচ্ছ নামীয় এক খীসা সর্দারের বংশধরেরা পুমা গোজা।
গোষ্ঠী: জান্দর, গুইয়া, তুদা ইত্যাদি।
গোজা প্রধান: শ্রীযুক্ত রাজকুমার তালুকদার।

১৩। দার্য্যা গোজা: পূর্বে দার্য্যা নামীয় এক দলপতি সর্দারের মাথায় ভীমরাজের পালক গুজতো। ঐ সূত্রে দার্য্যা গোজা।
গোষ্ঠী: কোমরেং, নানু কতোয়া, কাতুয়া ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত নবীন চন্দ্র তালুকদার।

১৪। কুদুগ গোজা: কুদুক সেন নামীয় এক শক্তিশালী ব্যক্তি এক সময়ে রাজার নিকট এক অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়ে এক তালুক প্রাপ্ত হন। তাঁর বংশধরেরা কুদুগ গোজা।
গোষ্ঠী: ভূলা, কালাবাগা ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত হরিধন তালুকদার।

১৫। রাঙী গোজা: রাঙী পানছড়ি নামীয় সর্দারের বংশধরেরা মতান্তরে বুং চেগের পূত্র রাঙী ধারের ও রাঙী ফানেশ্বর হইতে রাঙী গোজা।
গোষ্ঠী: লৌহ ঝাত্তোয়া, বুংচেগে, কাল, মেন্দর, চেগে, ভেঙেয়া ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত কর্ণচন্দ্র তালুকদার।

১৬। খ্যংজয় গোজা:
গোষ্ঠী: চৈয়দনী, সেম, ধ্বজা, বেদ্দু, বাঙ্গালী, নাপিটা, চকই ও কবাল্যা মোট ৮টি।
প্রধান: চৈয়দনী

১৭। পোয়া গোজা: এক সময়ে কোন গ্রামে বয়ো: বৃদ্ধাগণ জুম কাটতে গিয়েছিল। বাড়ীতে শিশুসন্তান ব্যতীত আর কেউ ছিল না। এসময়ে কুকিরা এসে সেই গ্রামে আক্রমণ করে। শিশুরা একমাত্র “কানন্টাগুলি”র সাহায্যে আত্মরক্ষা করেছিল বলে, অপূর্ব বীরত্বপূর্ণ সেই বালকদের বংশধরেরা বালক অর্থাৎ “পোয়া” গোজা নামে আখ্যায়িত হয়েছে। কথিত আছে ব্যক্তি থেকে গোষ্ঠীর উৎপত্তি। তিনটি গোষ্ঠী মানেই তিন ভাই ছিল। সবচেয়ে বড় ভাই হক্কিঙ্গ্যা, মেজো ভাই কজমা, আর সবচেয়ে ছোট ভাই লাংদা গোষ্ঠী।
প্রধান: শ্রীযুক্ত নীলরথ তালুকদার

১৮। চেক্কবা গোজা:
গোষ্ঠী: নেই।
প্রধান: শ্রীযুক্ত বিজয়গিরি তালুকদার।

১৯। তৈন্যা গোজা: পূর্বনাম কুর্য্যা, তৈন্যাছড়ির তীরে বসবাস করত।
গোষ্ঠী: কুর্য্যা, ধূর্য্যা, মুলিয়, পৈয়ব ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত কৈলাসাধন তালুকদার।

২০। ফেদুংজা গোজা: মুলিয়া, কপাল্যা, পুংঝা, কাশমানিক, ইন্দুর তালা, কালাপিলা বাপ ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত পূর্ণচন্দ্র দেওয়ান।

২১। বুংছা গোজা:
গোষ্ঠী: কাঁকড়া, মোছচড়া, চগদা ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত পুরখা দেওয়ান।

২২। মুনিয়া গোজা: পূর্বনাম ধাবানা, মুড়ি নদীর নামানুসারে।
গোষ্ঠী: ধাবান, মিঠা, নোয়ান্যা, কলা, বামুন, চেগে, পচা, সল্যা, চাদং, বাদালি, রাঙাছিলন্যা।
প্রধান: শ্রীযুক্ত রাজচন্দ্র দেওয়ান।

২৩। মুনিয়া চেগে গোজা: চকোয়া, শেলপাত্যা, শেলছ্যা ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত কিনাধন তালুকদার।

২৪। ফাকসা গোজা:
গোষ্ঠী: বালকা, বরৈবেচা, তিনভেদা, কলাচেম, বড়কুজ্জ্যে, ছোটকুজ্জ্যে ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত রমনীমোহন দেওয়ান।

২৫। আঙুন গোজা: হোজাল সল্যা আঙুন নামানুসারে এই গোজার উৎপত্তি।
গোষ্ঠী: গোদা, মঘ, মিঙিরাপুনা।
প্রধান: শ্রীযুক্ত মানিকচন্দ্র তালুকদার।

২৭। চেগে গোজা: দুঃখে চেগের নামানুসারে।
গোষ্ঠী: লুলাং, ধাবানা, ভুরুমা, কাঁকড়া, বহলা ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত সূর্যমণি খীসা।

২৯। লেবাগোজা: রাজার নাম উচ্চারণে জড়তা থাকায় এই দলের প্রধান ব্যাক্তির আখ্যা লেবা দেওয়া হয়েছিল।
প্রধান: শ্রীযুক্ত ভাগ্যধন তালুকদার।

৩০। বোম গোজা:
গোষ্ঠী: আমু, জাদি, বাদালি, পারবোয়া ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত অভয়চন্দ্র তালুকদার।

৩১। হাইয়ো বা ইয়ো গোজা:
গোষ্ঠী: কুয্যা, ধূয্যা, মুলিয়, জাল্যা, সল্যা, তালুকদার ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত নীলধন তালুকদার।

৩২। চাদগ গোজা: চাদগ সর্দার নামানুরে এই গোজা।
গোষ্ঠী: সর্দার, শেয্যা, রসিরি ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত নীলকান্ত দেওয়ান।

৩৩। বাবুরোগোজা:
গোষ্ঠী: বাবুরো, গজাল্যা, মানাইয়া, লৌহকদ্দা, ভগতপ ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত অক্ষয়মনি তালুকদার।

৩৪। পেদংছাড়ি গোজা:
গোষ্ঠী: কুয্যা, মলিয়, পৈয়ব ইত্যাদি।
প্রধান: শ্রীযুক্ত কিনারাম তালুকদার।

৩৬। ধামাই গোজা: পিড়াভাঙ্গা গোষ্ঠী – এই সর্দার পিড়াভাঙ্গার পূত্র গিজা ধাবেং, মেজা ধাবেং এবং কন্যা নূতনপতি তাঁদের বংশধর বা অধঃস্তান লোকদেরকে ধামাই গোজা বলা হয়। পিড়াভাঙ্গা এক সময় মন্ত্রী ছিলেন আর ধাবেংরা ছিলেন রাষ্ট্রদূত।

জানা না থাকায় আরো হয়তো অনেক গোজা গোত্তির (গোষ্ঠী) কথা লিখতে পারিনি। মূলতঃ চাকমা জাতির মূল চার গোজা হতে ক্রমে ক্রমে তাঁদের বংশধরেরা বিস্তৃত হয়ে পড়ে। ব্যক্তিগত বিশেষত্ব নিয়ে অনেক গোজা গোষ্ঠীর নামকরণ করা হয়েছে। তবে এই গোজা গোত্তি সমাজে প্রচলন না থাকাই ভালো। কেননা সমাজে সবাই চাকমা গোজা আর চাকমা গোত্তি।


নিঝুম তালুকদারের ব্লগ

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here