icon

গ্রামীণ সাধারণ বন ব্যবস্থাপনাঃ প্রেক্ষিত পার্বত্য চট্টগ্রাম

Jumjournal

Last updated Jun 3rd, 2020 icon 397

আমার এই জন্মভূমি পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি ঝর্ণার জলে তপ্ত শরীর জুড়াবে! আর সবকটি ছোট বড় পাহাড়ের চূড়ায় উঠে প্রাণ ভরে উপভোগ করবো প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য! এ আকাঙ্খা আমার প্রকৃতির প্রতি ভালবাসা জন্মাবার পর থেকে।

শান্তি চুক্তির (পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি) আগে পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে কানাচে ঘোরার সুযোগ আমার খুব একটা হয় নি। তীব্র সে ইচ্ছেটা সব সময় অন্তরে গুমড়ে কেঁদেছে। কিন্তু ইচ্ছেকে বাস্তবে রুপ দানের সুযোগ কখনো কখনো হাতের মুঠোয় চলে এলেও তাৎক্ষণিক সেটা লুফে নিতে পারি নি।

প্রথম কারণ অবশ্যই চুক্তির পূর্বেকার অস্থিতিশীল পরিস্থিতি। আর তথাকথিত এই অশান্ত পরিস্থিতিকে পুঁজি করে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে গজিয়ে উঠা নিরাপত্তা বেষ্টনী! আর সব কিছু মিলিয়ে কিছু ভয় ভীতি তো নিজের মধ্যেও দানা বেঁধেছিল।

প্রকৃতি প্রেমিক হিসেবে নিজেকে ভাবতে ভালো লাগে। পরিবেশ নিয়ে চিন্তা ভাবনা এবং প্রকল্প ভিত্তিক কিছু কর্মকান্ড চালায় সেরুপ একটি স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থার দীর্ঘ সময় কাজ করার সুবাদে নিজেকে পরিবেশবাদী উন্নয়ন কর্মী হিসেবে কোন কোন ফোরামে পরিচয় দিতেও স্বচ্ছন্দ বোধ করি।

আমার ধারণা, পার্বত্য জনপদে আমার মত যাদের বেড়ে উঠা পারিপার্শ্বিকতার নাটকীয় পরিবর্তন এবং ক্রমবর্ধনশীল পরিবেশ বিপর্যয় তাদেরকেও ব্যথিত করে। প্রকৃতি প্রেমিরা প্রকৃতির মাঝে মিশে যাবার সুযোগ পেলে চারপাশে সবকিছু ফ্রেমবন্দী করার জন্য উদগ্রীব থাকেন।

বিজ্ঞানের উন্নয়ন যাত্রায় ডিজিটাল ক্যামেরা আর মুভি ক্যামেরাও এখন সামর্থবানদের হাতের মুঠোয়। এমনকি মোটামুটি চলনচই মোবাইল ফোনেও এখন সংযুক্ত থাকে ছবি তোলার কলকব্জা। সত্যিই বিস্ময়কর আধুনিক সভ্যতার এই অগ্রযাত্রা!

তবে বিজ্ঞানের এই আশীর্বাদ হাত পেতে নিতে আমি বরাবরই সিদ্ধ হস্ত নই। নিতান্তই আনাড়ী। আর বিজ্ঞানই যেহেতু মানুষকে প্রকৃতি বিমূখী এবং শহরমূখী করেছে। তাই বিজ্ঞান আর আধুনিক এই সভ্যতার প্রতি একধরণের উন্নাসিকতা প্রদর্শনের যুক্তিহীন ভাবাবেগও আমার মাঝে কাজ করে।

তবে একবার সঙ্গে ক্যামেরা না রাখার জন্য আক্ষেপ হয়তো আমার আজীবনই থেকে যাবে। সে ঘটনার উল্লেখ করেই মূল প্রবন্ধের প্রবেশের চেষ্টা করি। বছর আটেক আগে বিলাইছড়ির ফারুয়ায় কয়েকটি প্রত্যন্ত অঞ্চলে গেছি প্রকল্পের কাজ সরেজমিনে দেখতে আর প্রকল্পের লোকদের সাথে মতবিনিময় করতে।

তাদের সাথে রুটিন কাজ কর্ম সেরে পড়ন্ত বিকেলে আমাদের আশ্রয়দাতা এক তঞ্চঙ্গ্যা গৃহস্তের মাচাং ঘরের প্রশস্ত ইজরে ( ইজর- বাঁশ দিয়ে তৈরি ঘরের সম্মুখের উন্মুক্ত বারান্দা) ক্লান্ত শরীর নিয়ে আমি তখন শুয়ে পড়েছি। চারিদিকে লম্বা লম্বা গাছের সারি।

এক সময় উঁচু এক শিমুল গাছের মগডালে ডজন খানেক কালো বর্ণের পাখি এসে বসলো। এটি অবাক হয়ে দেখার মত কোন দৃশ্য নয়! আমার খেয়াল হলো, চারদিক অরণ্য আচ্ছাদিত এবং মূল শহর থেকে প্রায় অর্ধ শত মাইল দূরের এমন একটি স্থানে কাক এভাবে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ানোর কথা নয়।

আর কোকিল দল বেঁধে এভাবে ঘুরে বেড়ায় কিনা আমার জানা নেই। একটু খুঁটিয়ে দেখতেই বুঝলাম পরিচিত শালিকের চেয়ে এদের রং অনেকটা কালো। আর এদের ঠোঁটে হলদে রঙের আধিক্য। আমার আর বুঝতে অসুবিধা হয়না এরা সেই দুষ্প্রাপ্য ময়না।

পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমাদের আশ্রয়দাতার দারস্থ হলে তিনিও আমার অনুমানে সায় দিলেন। জানালেন এমন দৃশ্য সচরাচর তারাও চোখে দেখেন না। কারণ গহীন অরণ্যে একসময় এদের নিয়মিত দেখা মিললেও ফারুয়াতেও এমন অরণ্য এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে।

বাঘাইছড়ির দুর্গম গঙ্গারাম আর সাজেক এলাকায় এ বিরল প্রজাতির ময়নার দেখা মেলে বলে জানি। লোকমুখে শুনেছি ভালো একটা চাকরী বা ইপ্সিত লক্ষ্য অর্জনে ক্ষমতাবানদের নিকট উপঢৌকন হিসেবে এই দুর্লভ পক্ষী যথার্থই ফলদায়ক।

তাই এমন বিরল দৃশ্যের সঙ্গী হতে পেরে এখনো নিজেকে সৌভাগ্যবান ভাবি। এদিকে ভেতরেরর ঘর থেকে সহকর্মীর ব্যাগে থাকা অফিসের ডিজিটাল ক্যামেরা নিয়ে আসতে আসতে তারা উড়াল দিলো তাদের গন্তব্যে।

আরেকটি ছোট ঘটনার উল্লেখ করার লোভ সংবরণ করতে পারছিনা। ‘৯৯ সালের দিকে পরিচিত কলেজ পড়ুয়া এক ছাত্রের আমন্ত্রণে আমার কয়েকজন সাহসী বন্ধুসহ সিন্ধান্ত নিলাম জুরাছড়ির দুর্গম ফকিরাছড়ি ইউনিয়ন ঘুরতে যাবো।

সেই মত একদিন তবলছড়ি ঘাট থেকে বিলাইছড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। সেবারই প্রথম আমার মত সঙ্গের তিন বন্ধুরও বিলাইছড়ি যাত্রা। দুপুরের খাবার পর্ব বিলাইছড়ির এক ছোট রেষ্টুরেন্টে সেরে ভর দুপুরে আমরা হাঁটা শুরু করলাম ফকিরাছড়ির উদ্দেশ্যে।

আগেই জানতাম, প্রখর রোদে কখনো নৌপথে, পাহাড় ডিঙিয়ে, পাথুরে আর কর্দমাক্ত পথ পেরিয়ে ৪/৫ ঘন্টায় আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে হবে। শুরু হলো আমাদের রোমাঞ্চকর পদযাত্রা। ঘন্টা দুয়েক চলার পর বনের মধ্যে আমরা পাঁচ ছয়টি সেগুন গাছ পড়ে থাকতে দেখলাম।

দু’জন লোক গাছগুলো কেটে সাইজ করে নিচ্ছে। আলাপে জানলাম, সাইজ করা এক একটা গাছের রদ্দা তারা দুই/দেড় ঘন্টার পথ কাঁধে করে নিয়ে বিক্রি করবে বিলাইছড়ি বাজারে অথবা পৌঁছে দেবে তাদের পরিচিত কোন কাঠ ব্যবসায়ীর কাছে। বিনিময়ে তারা পাবে তিনশ/চারশ টাকা।

যা দিয়ে তারা তাদের বউ বাচ্ছার মুখে তুলে দিতে পারবে কিছু খাবার। কিন্তু একথা বলার অপেক্ষা রাখেনা, পার্বত্যাঞ্চলের অধিকাংশ বন উজাড় হবার পিছনে অভাবী এই মানুষগুলো সামান্যই দায়ী। কারণ তারা বাণিজ্যক ভিত্তিতে ব্যাপক হারে কাঠ আহরণ করে না।

শুধুমাত্র জীবন বাঁচানোর তাগিদে তারা এ কাজ করে। অথচ গাছ কাটা, চুরি, বনে অবৈধ প্রবেশ ইত্যকার বন বিভাগের নানান হয়রানিমূলক মামলার শিকারও হতে হয় অভাবী স্থানীয় এই লোকগুলোকেই। কাউকে কাউকে বেছে নিতে হয় ফেরারী জীবন।

কিন্তু বন ধ্বংসের জন্য প্রকৃতই যারা দায়ী তারা সব সময়ই থেকে যায় ধরা ছোঁয়ার বাইরে। পরে জেনেছি আমাদের স্বচক্ষে দেখা সেই প্রকান্ড সেগুন গাছের সারি আর পুরো বনাঞ্চল ধ্বংস হতে অতপরঃ বছর তিনেকের বেশি সময় লাগেনি বনখেকোদের বদান্যতায়।

jum forest
ছবিঃ পার্বত্য জঙ্গল

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন, ভূমি ও মৌজা রিজার্ভ বন:

পার্বত্য চট্টগ্রামের বন, ভূমির মালিকানা এবং ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জটিল। এ নিয়ে জ্ঞানগর্ব আলোচনা আমার পক্ষে রীতিমত অসম্ভব। তাই আমার বিচরণের ক্ষেত্রটি হবে নিতান্তই নিয়ন্ত্রিত। মূলতঃ মৌজা রিজার্ভ ফরেষ্ট বিষয়ে আমি পাঠকদের কাছে নিবেদনের চেষ্টা করবো।

পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রায় সর্বত্র রয়েছে সরকারী সংরক্ষিত বন, রক্ষিত বন, ব্যক্তি মালিকানাধীন বন বাগান। এছাড়াও রয়েছে অশ্রেণীভুক্ত বনাঞ্চল। তবে সমতল অঞ্চলের ন্যায় এগুলো খাস জমি নয়। প্রকৃত অর্থে পার্বত্য চট্টগ্রামের খাস জমি/ভূমি বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নেই।

এগুলো সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান এর আওতাধীন বন। হেডম্যান ইচ্ছে করলে তার মৌজার প্রজাদের জুম চাষ, বন বা ফলদ বাগান সৃষ্টির জন্য বন্দোবস্তি দিতে পারেন। এছাড়া মৌজার অভ্যন্তরে এ ধরণের বনের দেখা মেলে যা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গড়ে উঠে।

সাধারণ্যে এই বন ‘রিজেব’, ‘মৌজা রিজার্ভ ফরেস্ট’, রাজধানী ইত্যাদি নামে পরিচিত। পার্বত্যাঞ্চলের আদিবাসীরা আদিকাল থেকে নিজেদের প্রয়োজনে সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে প্রচলিত প্রথা ও রীতিনীতির আওতায় এ বন সংরক্ষণ করে আসছে।

মৌজা রিজার্ভ বন বা গ্রামীণ সাধারণ বন সৃষ্টির ইতিহাস:

১৯০০ সালের পার্বত্য শাসন বিধির ৪১ (ক) ধারা মোতাবেক মৌজা ফরেস্ট বা গ্রামীণ সাধারণ বন সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা অনুমোদিত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম এস রহমান ১৯৬৫ সালের ৩ রা আগস্ট পার্বত্য শাসন বিধির ৭ ধারা মোতাবেক প্রত্যেক মৌজায় হেডম্যানের নেতৃত্বে এক বা একাধিক বন সৃষ্টির সরকারী আদেশ জারী করেন।

হেডম্যান ইচ্ছে করলে এ দায়িত্ব তার আওতাধীন কারবারীকে প্রদান করতে পারেন। উল্লেখ্য যে, এ ধরনের বন ব্যবস্থাপনা এ আদেশ জারির অনেক আগে থেকে আদিবাসী গ্রামসমূহে প্রচলন ছিলো। মূলতঃ নির্বিচারে গাছ, বাঁশ কাটা যাতে বন্ধ হয় এবং ভবিষ্যতে গ্রামবাসীরা যাতে এই বন থেকে গৃহ নির্মাণ এবং অন্যান্য প্রয়োজনে এখান থেকে সবকিছু সংগ্রহ করতে পারেন এটি অনুধাবন করেই তিনি এ আদেশ জারি করেন।

একটি সংরক্ষিত বনের আয়তন আনুমানিক ১০০ একর পর্যন্ত হতে পারে এ আদেশে উল্লেখ করা হয়। রাঙ্গামাটির স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা টংগ্যা ২০০৩ সালের দিকে এই প্রকৃতির বনসমূহকে নিয়ে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার কয়েকটি উপজেলায় কাজ শুরু করে। তারা এই বনগুলির সামষ্টিক নাম দেন গ্রামীণ সাধারণ বন বা Village Common Forest (VCF)

ডেনমার্ক সরকারের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ডানিডা এই প্রকল্পের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করে। এ প্রকল্পের মাধ্যমে এ বন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভিন্ন সভা, সেমিনার, কর্মশালায় প্রচারণা শুরু হলে এ বিষয়টি অনেকের নজরে আসে।

পরিবেশবাদীদের কাছে এটি পরিবেশ রক্ষার ক্ষেত্রে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহনযোগ্যতা পায়। বর্তমানে এই বনগুলি শুধুমাত্র হেডম্যান (মৌজা প্রধান) বা কারবারীদের (গ্রাম প্রধান) দ্বারা পরিচালিত না হয়ে কোন কোন গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সরাসরি তত্ত্বাবধানেও পরিচালিত হয়ে থাকে।

টংগ্যা’র তৎকালীন প্রকল্পের সংশ্লিষ্টদের মতে, কোন কোন মৌজায় ৩০০ থেকে ৪০০ একর জায়গা নিয়েও এ ধরনের বন সংরক্ষণ করতে দেখা যায়। এমনও দেখা গেছে যে লংগদু উপজেলায় ৭/৮ গ্রামের মানুষ একত্রিত হয়ে মৌজা রিজার্ভ বন সংরক্ষণ করেছেন।

রাঙ্গামাটির জেলার লংগদু ছাড়াও রাঙ্গামাটি সদর, রাজস্থলী, বাঘাইছড়ি, বিলাইছড়ি, জুরাছড়ি এবং বরকল উপজেলায় মৌজা রিজার্ভ বন আছে। বরকল উপজেলাতেই মৌজা রিজার্ভ বন এর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ফারুয়া ইউনিয়নের দুর্গম বড়থলী গ্রামেও সেখানকার উঁসুই সম্প্রদায়ের লোকেরা কয়েক একর এলাকা নিয়ে বাঁশ বাগান রেখেছেন মৌজা বন এর আওতায়।

রাঙ্গামাটি জেলা ছাড়াও খাগড়াছড়ির দীঘিনালা ও লক্ষীছড়ি, বান্দরবানের সদর উপজেলা, রুমা এবং রোয়াংছড়ি উপজেলায় এ প্রকৃতির বনের অস্তিত্ব আছে।

গ্রামীণ সাধারণ বন ব্যবস্থাপনার সাধারণ বৈশিষ্ট্যসমূহ:

– এই বনের উপর গ্রামের সকল বাসিন্দার সমান অধিকার থাকবে। এমনকি সংশ্লিষ্ট গ্রামের নারীরা বৈবাহিক সূত্রে অন্যত্র বা অন্য গ্রামের কোন পুুরুষ একই সূত্রে সংশ্লিষ্ট গ্রামের বাসিন্দা হিসাবে সমাজ কর্তৃক স্বীকৃত হলে তাদেরও সমান অধিকার বলবৎ থাকে।

সর্বোপরি, এ বন থেকে কোন গাছ, বাঁশ বা অন্যান্য দ্রব্যসামগ্রী বিক্রির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থের তারা অংশীদার হিসাবে বিবেচিত হন।

– উক্ত সংরক্ষিত এলাকার জুম চাষ, শিকার, গবাদি পশুর বিচরণ এবং উদ্ভিদ ও প্রাণীকুলের জন্য ক্ষতিকারক কোন ধরনের কর্মকান্ড সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

– বিক্রয় উপযোগী বৃক্ষ, বাঁশ বা অন্যান্য বনজ দ্রব্য আহরণ বা বিক্রয়ের ক্ষেত্রেও কমিটি যথাসময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রাপ্ত অর্থ সামাজিক প্রয়োজনে যেমন: কেয়াং নির্মাণ, স্কুল সংস্কার ইত্যাদি সামাজিক প্রয়োজনে কাজে লাগানো হয়। কমিটি চাইলে এ অর্থ গ্রামের কোন মেধাবী ছাত্র/ছাত্রীর শিক্ষা গ্রহণে, দরিদ্র কোন পরিবারের সাহাযার্থে বা অন্য যে কোন সামাজিক খাতে ব্যয় করতে পারবে।

– ব্যবস্থাপনা কমিটি বা এলাকার মুরুব্বীদের অনুমোদন ছাড়া কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে উক্ত বন থেকে বাঁশ, লতা, গুল্ম, বেত, ঔষধি বৃক্ষ বা কোন ধরনের বনজ দ্রব্য আহরণ করতে পারে না। তবে কমিটির অনুমতি নিয়ে এলাকার দরিদ্র পরিবারের সদস্যরা বাড়ি নির্মাণ বা মেরামতের প্রয়োজনে এ বন থেকে গাছ ও বাঁশ আহরণ করতে পারে। গ্রামের কোন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হলেও মৃতের সৎকার করার জন্য বাঁশ ও গাছ কেটে নিয়ে আসা যায়।

আদিবাসী মূল্যবোধ এবং গ্রামীণ সাধারণ বন ব্যবস্থাপনা:

আদিবাসী সমাজ ব্যবস্থা যৌথতা, সহভাগিতা, সহমর্মিতা এবং ভাতৃত্ববোধের উপর প্রতিষ্ঠিত। পার্বত্যাঞ্চলের আদিবাসী সমাজ তো বটেই এমনকি সমতলের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী সমাজ ব্যবস্থাও অনুরূপ মূল্যবোধকে সব সময় বিশ্বস্ততার সাথে লালন করে এসেছে।

আদিবাসীদের এই জীবনবোধের পরিচয় মেলে তাদের দৈনন্দিন জীবনে, নৃত্য-গীতে, পূজা পার্বনে, সামাজিক প্রথায়, বিচার ব্যবস্থায়, ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে, ক্রীড়া এবং জুম চাষ পদ্ধতিতে। এ

কবার আদিবাসী সংস্কৃতি মেলায় রাঙ্গামাটিতে এক আলোচনা সভায় বিশিষ্ট আদিবাসী লেখক এবং মানবাধিকার কর্মী বাবু সঞ্জীব দ্রং বলেছিলেন, গারো সমাজে এক সময় এমন রীতিরও প্রচলন ছিল যে, গ্রামের কোন যুবক বা যুবতীর বিয়ে ঠিক হলে নির্দিষ্ট দিন পাড়ার সব লোক এমনকি আশেপাশের গ্রাম থেকে সকলে গিয়ে বিয়ে বাড়িতে সাহায্যের জন্য ঝাপিয়ে পড়তো।

যার বাড়িতে দেবার মত যা শাক-সবজি, ফলমূল, হাঁস, মুরগি, শুকর আছে তা নিয়ে বিয়ে বাড়িতে হাজির হতো। আর বিয়ে বাড়িতে মহা ধূমধামের সাথে সকলে খাওয়া দাওয়া করতো।

সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা, বসত ভিটার দলিল পত্র ইত্যকার কাগুজে বিষয়গুলো তাই আদিবাসী সমাজে বরাবরই উপেক্ষিত থেকে গেছে। যার ফলে, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই আদিবাসী জনগণ এখন আদি বাসভূমি থেকে ক্রমশঃ উৎখাত হচ্ছে।

এটি ধারণা করা যায় যে, সম্পত্তির যৌথ মালিকানা বা সামষ্টিক অধিকারের এই মূল্যবোধ থেকেই আদিবাসী সমাজে গ্রামীণ সাধারণ বন ব্যবস্থাপনার উদ্ভব হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের প্রধান সামাজিক উৎসব বৈসুক-সাইগ্রাই-বিঝু-বিষু-বিহু উপলক্ষে এখনো প্রতি বছর কোন কোন গ্রামে ঐতিহ্যবাহী ক্রীড়ার আয়োজন করা হয়ে থাকে।

এসব ঐতিহ্যবাহী খেলার মধ্যে ঘিলা খেলা, নাদেং খেলা, পোর খেলা, বাঁশ খরম প্রতিযোগিতা অন্যতম। উল্লেখ্য যে এসব ক্রীড়া সামগ্রী তৈরির প্রধান কাঁচামাল গাছ, বাঁশ আহরণ করা হয় গ্রামের পাশে মৌজা রিজার্ভ ফরেস্ট থেকেই।

আর ঘিলা নামক এই ফল/বিচি একমাত্র গভীর অরণ্যতেই পাওয়া যায়। আদিবাসীদের নিজস্ব এসব প্রাচীন খেলাধুলার প্রচলন একমাত্র সেসব গ্রামের মধ্যে প্রচলিত আছে যেখানে এ ধরনের গ্রামীণ সাধারণ বনের অস্তিত্ব আছে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ ও গ্রামীণ সাধারণ বন:

পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ ঝর্ণা আজ তার গতিধারা হারিয়েছে। নাম জানা, না জানা অনেক ঝর্ণা আজ মৃতপ্রায়। বলার অপেক্ষা রাখেনা নির্বিচার বৃক্ষ নিধন আর ব্যাপক বন ধ্বংসের কারণে কলরব মুখর ঝর্ণাগুলোর আজ এই পরিণতি!

অজ্ঞতার কারণে নিজ হাতেই আমরা ক্রমাগত বিনষ্ট করে চলেছি প্রকৃতির এই উপহার। আদিবাসীরা তাদের সহজাত জ্ঞান থেকে জানে ঝর্ণার উৎস থেকে শুরু করে ঝর্ণার দু’ধারের কোন গাছ কাটা যায় না। এতে ঝর্ণার পানি ক্রমশঃ শুকিয়ে যাবে।

কারণ পাহাড়ে বসবাসকারী আদিবাসীদের পানীয় জলের প্রধান উৎস এই ঝর্ণাগুলো। এসব ঝর্ণায় পাওয়া যায় ছোট ছোট মাছ, কাঁকড়া, শামুক, চিংড়ি, ব্যাঙাচি যা মেটায় তাদের প্রাণিজ প্রোটিনের চাহিদা। তাই নিজের অস্তিত্বের স্বার্থেই তারা এসব ঝর্ণাকে বাঁচিয়ে রাখে।

ছড়ার পাড় যাতে না ভাঙে সেজন্য ছড়ার দু’পাড়ের ছোট বড় কোন গাছই তারা কাটে না। এই বন থেকে পাহাড়ী বৈদ্যরাও সংগ্রহ করে চিকিৎসার কাঁচামাল লতাপাতা, ফলমূল। বিনা প্রয়োজনে তাই তারা কখনো গাছ কাটে না। বন ধ্বংসের ব্যাপারে আদিবাসীদের উপর এক তরফা এই অভিযোগ তাই বিতর্কে খুব একটা ধোপে টিকে না।

জুম চাষ নিয়েও এক দশকের অধিক সময় ধরে পরিবেশ বিষয়ক সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে উত্তপ্ত আলোচনা চলছে। আলোচনার খোরাক হিসেবে এটি বেশ উপাদেয়ও বটে। জুম চাষ নিয়ে অল্প বিস্তর পড়াশুনা আছে তারাও এ বিতর্কে ঘি ঢালতে পছন্দ করেন।

পাঠ্য-পুস্তক, পত্র পত্রিকা, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এমনকি সরকারী বিভাগে কর্মরত কর্তা ব্যক্তিদের অধিকাংশের বক্তব্যেও জুম চাষবিদ্বেষী মনোভাবের পরিচয় ফুটে উঠে।

কিন্তু সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এবং পরিবেশবাদীদের উচিত এ বিষয়ে ধারণা নির্ভর, ভাসা ভাসা বা অজ্ঞাত প্রসূত কোন বক্তব্য না দিয়ে জুম চাষ বিষয়ে পার্বত্যাঞ্চলে মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক গবেষণা পরিচালনা করা। কারণ জুম চাষ পৃথিবীর প্রায় সব অঞ্চলে আদিবাসীদের জীবন জীবিকার প্রধান উৎস।

কাজেই এ বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত নিতে গেলে তা নিয়ে অবশ্যই বড় আকারের জরিপ, মতামত এবং পর্যালোচনার প্রয়োজন আছে।

বন ব্যবস্থাপনার দুর্বল দিকসমূহ:

পার্বত্যাঞ্চলে জনসংখ্যার নাটকীয় বিস্তার এবং বাসযোগ্য ভূমির অস্বাভাবিক চাপের ফলে কোন কোন এলাকায় এ বন ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়েছে। ক্ষেত্র বিশেষে সুবিধাবাদী নেতৃত্বের কারণেও এই বনগুলো হুমকির মুখে। তাই সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদেরও এ বিষয়ে এখন ভাবনার সময় এসেছে।

তদুপরি এই বন ব্যবস্থাপনায় এখনো আইনী দুর্বলতা রয়ে গেছে। আদিবাসীরা এ বনের উপর সমষ্টিগত মালিকানার দাবি করলেও জায়গার রেকর্ড সংক্রান্ত মালিকানা আদিবাসীদের নেই। তাই সরকার বা বন বিভাগ ইচ্ছে করলেই রাষ্ট্রীয় প্রয়োজনে অথবা অন্য কোন অজুহাতে গ্রামীণ সাধারণ বনকে আদিবাসীদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারে।

১৯০০ সালের পার্বত্য শাসন বিধির ৪১ (ক) ধারা মোতাবেক স্বীকৃত মৌজা ফরেস্ট বা গ্রামীণ সাধারণ বন সংরক্ষণ ব্যবস্থা পুনরায় ১৯৩৯ সালের জুলাই মাসে সংশোধন করে এ বন সংরক্ষণের আইনগত স্বীকৃতি এবং পরিবেশ রক্ষায় এ ধরনের বন ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব স্বীকার করা হয়।

১৯৬৭ সালের পর সরকারীভাবে বন সংরক্ষণের জন্য আর কোন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। উপযুক্ত সম্পূরক শাসন বিধি এবং নীতির অভাবে অধিকাংশ সরকারী কর্মকর্তা এবং নীতি নির্ধারকদের কাছে এই বন ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অজ্ঞাত রয়ে গেছে।

বন বিভাগের সংশ্লিষ্টরা সকলে এ বন ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অবগত নন। যারা অবগত তাদের বেশির ভাগেরই অভিমত হচ্ছে, এ ধরনের বন ব্যবস্থাপনাকে বক্র চোখে দেখা ঠিক নয়।

কারণ স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করেই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বন সংরক্ষণ সফল উদাহরণ আছে। তবে এই বন সংরক্ষণ পদ্ধতি পরিবেশ রক্ষা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবস্থাপনায় আরো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে যদি এক্ষেত্রে বন বিভাগকেও সম্পৃক্ত করার প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ নেয়া যায়। তাই নীতি নির্ধারণী পর্যায়েও এ বিষয়টিকে উত্তাপনের তৎপরতা চালাতে হবে।

পরিশেষে বলতে চাই যে, ব্যাপক বন ধ্বংসের কারণে বিশ্ব পরিবেশ যখন আজ প্রায় বিপর্যস্ত বৈশ্বিক উঞ্চতা আর জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সারা বিশ্বের সচেতন মানুষ যখন উন্মাতাল এমন পরিস্থিতিতে আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত এই বন ব্যবস্থাপনা পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হতে পারে।

২০০৯ সালের আগস্ট মাসে স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা টংগ্যা’র প্রকল্পের দ্বিতীয় মেয়াদের কার্যক্রমের শুরুতে রাঙ্গামাটিতে এক উদ্ভোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। উক্ত অনুষ্ঠানে এই বন ব্যবস্থাপনাকে আরো জোরদার করার জন্য বেশ কিছু সুপারিশমালা পেশ করা হয়। এই সুপারিশসমূহ হচ্ছেঃ

১. বন আইন ১৯২৭ এর আওতায় ২৮ অনুচ্ছেদে পরিবেশ ও গ্রামীণ সাধারণ বন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নতুন আইন সংযোজন করা।

২. পার্বত্য জেলা পরিষদ আইনে ৪১ (ক) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে পরিবেশ ও গ্রামীণ বন সংরক্ষণ এর ব্যাপারে নতুন সেল গঠন করা এবং

৩. এই বন ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের অবহিত করা এবং উক্ত কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকল অংশীজনকে যথাযথ সহায়তা প্রদানের জন্য বন বিভাগেও কারিগরি সহায়তা সেল গঠন করা।


লেখকঃ অম্লান চাকমা, উন্নয়নকর্মী ও সদস্য, জুম ঈসথেটিকস্ কাউন্সিল।

তথ্যসূত্রঃ জের’ তম্বা ম্যাগাজিন, বিঝু সংখ্যা, ২০১৩।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator

Follow Jumjournal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *