icon

খুমি জনগোষ্ঠীর উত্তরাধিকার (ঙাছাং)

Jumjournal

Published on Dec 23rd, 2019 icon 30

খুমি উত্তরাধিকার প্রথার উদ্ভব

পার্বত্য অঞ্চলে খুমি সমাজ ব্যবস্থা বিকাশের প্রাথমিক স্তরে জুম চাষ ও পশু-পাখি শিকার ছিল তাদের প্রধান পেশা। ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধির ৪২ নং বিধিমতে পাহাড়ে জুম চাষের জন্য জমির মালিকানা স্বত্বের প্রয়োজন হয় না, যার কারণে খুমি সমাজে স্থাবর সম্পত্তি তথা ভূমির চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বা স্থায়ী মালিকানা স্বত্ব অর্জনের প্রচেষ্টা অতীতে তেমন একটা ছিল না বললেই চলে।

এ অবস্থায় সম্পত্তির উত্তরাধিকার অর্জনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তেমন একটা সুস্পষ্ট ধারণা পার্বত্য জেলাসমূহে বসবাসকারী খুমি সমাজে গড়ে উঠেনি।

ইদানীংকালে জুম চাষের জন্য জমির অপ্রতুলতা এবং পর্যায়ক্রমে একই জমিতে বংশানুক্রমিকভাবে চাষাবাদের কারণে খুমি জনগোষ্ঠীর মধ্যে বর্তমানে উদ্যান কৃষির প্রতি মনযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি বর্তমান শিক্ষিত সমাজে ভূ-সম্পত্তির উপর স্থায়ী মালিকানা স্বত্ব অর্জনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে ধারণার উদ্ভব হয়েছে।

খুমি সমাজভূক্ত কোনো পরিবারের কেউ মারা গেলে তার ক্রিয়া সংকার ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করায় করার দায়-দায়িত্ব পালন দ্বারা মৃতের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবার বিষয়টি সম্পর্কযুক্ত এবং পারিবারিক কর্তব্য হিসেবে সমাজে স্বীকৃত।

খুমি উত্তরাধিকারের সাধারণ নীতি:

উত্তরাধিকার: খুমি সমাজভুক্ত পরিবারের কেউ মারা গেলে তার সৎকার, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পাদনের বেলায় সামাজিক রীতিনীতি অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সমাজের অনুশাসন অনুসারে মৃতের আত্মার সদ্গতির জন্য বিশেষ কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী হতে হয়।

মৃত ব্যক্তির সৎকার/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যয়, তার অনাদায়ী ঋণ (যদি থাকে) জীবদ্দশায় সম্পাদিত উইল বা দানমূলে দখল হস্তান্তরিত হয়েছে কিন্তু মালিকানা হস্তান্তরিত হয়নি এমন ভূ-সম্পত্তির দায়-দেনা মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকে, তার উপরই উত্তরাধিকারীগণের অধিকার বর্তায়। এ সকল দায়-দাৰী না মিটিয়ে সম্পত্তির মালিকের সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় না।

উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি কি কি: সম্পত্তির মালিক যেসব স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি রেখে মারা যায় সেসবই উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য। অস্থাবর সম্পত্তি যেমনঃ- আসবাবপত্র, থালা-বাটি, কাপড়চোপড়, অলংকার, গবাদিপশু ইত্যাদি উত্তরাধিকারীগণের মধ্যে আপোষ রফায় ভাগবন্টন হয়।

কিন্তু লিখিত কোনো আইন বা বিধিবিধানমতে সেগুলো ভাগবন্টন করা হয় না। কেবলমাত্র ভুমি তথা জায়গা-জমিকে স্থাবর সম্পত্তি হিসেবে সামাজিক বিধি-বিধানমতে ভাগবন্টন করা হয়। তাই উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি বলতে সাধারণভাবে স্থাবর সম্পত্তিকেই বুঝানো হয়।

কিন্তু একজন সম্পত্তির মালিকের সম্পূর্ণ স্থাবর সম্পত্তি উত্তরাধিকারযোগ্য সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হয় না। সম্পত্তির মালিকের মৃত্যুর পর তার সৎকার/অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যয়, তার অনাদায়ী ঋণ (যদি থাকে) এবং জীবদ্দশায় দখল হস্তান্তরিত হয়েছে কিন্তু মালিকানা স্বত্ব হস্তান্তরিত হয়নি এমন ভূ-সম্পত্তির দায়/দেনা মেটানোর পর যা অবশিষ্ট থাকে তার উপরই উত্তরাধিকারীগণের অধিকার বর্তায়।

সম্পত্তির উত্তরাধিকার রীতি: তিন পার্বত্য জেলার সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট মৌজার হেডম্যান/ইউ.পি চেয়ারম্যান/কার্বারী/পৌর চেয়ারম্যান/সার্কেল চীফ-এর নিকট হতে মতামত ও সুপারিশ গ্রহণ পূর্বক ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম রেগুলেশনের ৭ নং ধারামতে প্রাপ্ত ক্ষমতাবলে সংশ্লিষ্ট জেলার দেওয়ানী আদালতের ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি হিসেবে বিবিধ মামলা মূলে তিনি মৃত ব্যক্তির আইনগত উত্তরাধিকারীগণকে উত্তরাধিকার সনদপত্র প্রদান করেন।

পার্বত্য জোলাসমূহে বসবাসকারী খুমি পরিবারের কারো মৃত্যুর পর তার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ব্যয় খরচ, তার জীবদ্দশায় অনাদায়ী ঋণ এবং জীবদ্দশায় কোনো সম্পত্তির দান বা বিক্রি কিংবা মৃত্যুর পূর্বে সম্পাদিত উইল ইত্যাদির দাবী পরিশোধ বা নিষ্পন্ন করার পর নিম্নোক্ত উপায়ে পার্বত্য জেলাসমূহের খুমি সমাজে উত্তরাধিকার রীতির প্রচলন রয়েছেঃ-

ক) বোমাং সার্কেলে বসবাসকারী খুমি সমাজে মৃত ব্যক্তির পুত্র তার মৃত পিতার সম্পত্তিতে অপ্রতিরোধ্য আইনগত উত্তরাধিকারী। পিতার জীবদ্দশায় পিতৃস্নেহ অনুসারে সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি কে বেশী পায় তা নির্ধারণ করা হয়। পিতা-মাতাকে আমৃত্যু যে সন্তান ভরনপোষণ করে সেই সম্পত্তির বেশী অংশ পায়। পুত্র সন্তানের অবর্তমানে মৃতের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী মৃতের সহোদর ভাই/ভ্রাতুস্পুত্র হয়।

উত্তরাধিকারযোগ্য পদ পদবী: পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি ১৯০০এর ৪৮ নং বিধিমতে সার্কেল চীফ নিয়োগ এবং হেডম্যান নিয়োগ ও বরখাস্ত বিষয়ে লিপিবদ্ধ আছে।

ক) পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি ১৯০০-এর ৪৮ নং বিধিতে খুমি সমাজের হেডম্যান/কার্বারী এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সার্কেল চীফের সুপারিশ বা মতামতকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়। হেডম্যান/কার্বারী নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পরিবারের পিতামাতার ভরণপোষনকারী পুত্র সেই পদে উত্তরাধিকারী হয়।

খ) খুমি সমাজের কার্বারী পদটি বংশানুক্রমিক হিসেবে পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র এতে অগ্রাধিকার পায়। যদিও উক্ত কার্বারী পদটি ১৯০০ সনের পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসন বিধি অনুসারে স্বীকৃত নয়।

খুমি পরিবারের উত্তরাধিকার প্রশ্নে অগ্রাধিকার ভিত্তিক শ্রেণীবিন্যাস:-

ক) খুমি পরিবারে পিতার মৃত্যু হলে তার পুত্র সন্তানেরা অপ্রতিরোধ্য আইনগত উত্তরাধিকারী। তার বা তাদের উপস্থিতি অন্য সকল নিকটাত্মীয়ের অধিকারকে খর্ব করে। অবশ্য এক্ষেত্রে সন্তান বলতে- ঔরসজাত, অবৈধ ও দত্তক সন্তানকেও বুঝায়। পুত্রের মৃত্যুজনিত কারণে পুত্রের সন্তানগণ আইনগত উত্তরাধিকারী হিসেবে গণ্য হয়।

খ) খুমি পরিবারে মৃত ব্যক্তির পুত্র সন্তান, নাতি, পিতা যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে মৃতের সহোদর ভাই/ভ্রাতুস্পুত্র সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারী হয়।

গ) স্বামীস্ত্রীঃ খুমি পরিবারে বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান থাকাবস্থায় স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর কোনো প্রকার আইনগত উত্তরাধিকার স্বামীর সম্পত্তিতে থাকে না। তবে স্বামীর সংসারে ভরনপোষণ লাভের অধিকার স্ত্রীর থাকে। খুমি সমাজে স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবার আপন সহোদর ভাইয়েরা মৃত স্বামীর জাতি বা আত্মীয়স্বজনের সাথে আলোচনা করে বিধবা বোনের ভরনপোষণের যাবতীয় দায়-দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নেয়। সেক্ষেত্রে বিধবার সন্তানেরা মায়ের ইচ্ছায় ও মাতৃকুলের সম্মতিতে নিজ হেফাজতে মায়ের ভরনপোষণের দায়-দায়িত্ব পালন করতে পারে।

ঘ) পিতামাতাঃ মৃত ব্যক্তির পুত্র, নাতি যদি না থাকে, সেক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তি যার ঔরসজাত অথবা দত্তক সন্তানরূপে লালিত পালিত হয়েছে সেই পিতা তার উত্তরাধিকারী হয়।

ঙ) রক্ত সম্পর্কীয়ঃ খুমি সমাজে মৃত ব্যক্তির পুত্র, নাতি, পিতা কেউ যদি জীবিত না থাকে অথবা জন্মগ্রহণ না করে, সেক্ষেত্রে মৃত ব্যক্তির সহোদর ভ্রাতা, তার অবর্তমানে ভ্রাতুস্পুত্র মৃত ব্যক্তির উত্তরাধিকারী।

চ) খুমি পরিবারে মৃতের যদি পুত্র, পিতা, ভাই, এবং ভ্রাতুস্পুত্র, নাতি এ সকল রক্ত সম্পর্কীয় কেউ জীবিত না থাকে অথবা জনুগ্রহণ না করে, সেক্ষেত্রে মৃতের রক্ত সম্পর্কীয় জেঠা-কাকা, তাদের পুত্র, পৌত্র উত্তরাধিকারী হয়।

সম্পত্তির ভাগবন্টন: খুমি পরিবারে মৃতের সম্পত্তি নিম্নমতে ভাগ হয়ঃ-

ক) খুমি পরিবারে মৃতের পুত্র/পুত্রগণ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। স্ত্রী ও কন্যা সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয় না। স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী স্বামীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার লাভ কর না, কেবল জীবনসত্বের অধিকারী হয়।

খ) পিতার জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভাগবন্টনে পিতৃস্নেহ অনুসারে সম্পত্তির ভাগবন্টন করা হয়। পিতা-মাতাকে আমৃত্যু যে সন্তান ভরনপোষণ দেয় সে সন্তান সম্পত্তির বেশী অংশ পায়। পাড়া প্রধানের উপস্থিতিতে পরিবারের কিংবা বংশের বয়োজ্যেষ্ঠ ব্যক্তি সম্পত্তির যার যার প্রাপ্য অংশ নির্ধারণ করেন।

গ) খুমি সমাজে পুত্র সন্তানের অবর্তমানে মৃতের পিতা/সহোদর ভাই/ভ্রাতুস্পুত্রগণ সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়।

ঘ) খুমি সমাজে যুবক-যুবতীর পারস্পরিক সম্মতি বা মনোমিলনে দৈহিক সম্পর্কজনিত কারণে যদি কোনো যুবতী গর্ভবতী হয় এবং যুবকটি তার দায় অস্বীকার করে সেক্ষেত্রে সমাজ প্রধানের সিদ্ধান্তমতে গর্ভবতী যুবতী সেই যুবকের বাসায় সন্তান প্রসব করে। ভূমিষ্ট সন্তান পুত্র হলে সন্তানের পিতৃত্ব সেই যুবক দাবী করতে পারে। জন্মদাতা পিতার স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তিতে পুত্র উত্তরাধিকারী হয়।

অবৈধ সন্তানের উত্তরাধিকার স্বত্ব: যে ব্যক্তির ঔরসে অবৈধ সন্তান (জারজ) জন্মগ্রহণ করে সেই ব্যক্তির (জন্মদাতা) সামাজিক রীতিনীতি ও প্রথা অনুসারে সন্তানের উত্তরাধিকার নির্ধারণ করা হয়। তবে ভিন্ন কোনো ব্যক্তির পিতৃ পরিচয়ে সে যদি পরিচিত হয়, সেক্ষেত্রে জন্মদাতা পিতার উত্তরাধিকার সে দাবী করতে পারে না, সন্তান কেবলমাত্র নিজ মায়ের নামীয় সম্পত্তির (যদি থাকে) উত্তরাধিকারী হয়।


তথ্যসূত্রঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের আদিবাসীদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন (গ্রন্থনা ও সম্পাদনা – এডভোকেট জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা,  এডভোকেট প্রতিম রায়, সুগত চাকমা)।

Share:
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Follow Jumjournal

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *