icon

কুমার সমিত রায় এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

Jumjournal

Last updated May 9th, 2021 icon 1071

কুমার সমিত রায় ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা সঙ্গীত-জগতের এক কিংবদন্তী। এছাড়া চাকমা সাহিত্য অঙ্গনেও ছিলো তার দৃপ্ত পদচারণা। পেশাগত জীবনে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন কবি, সাহিত্যিক, গীতিকার ও সুরকার। বাংলাদেশের ক্রীড়াজগতেও রয়েছে তার বিশেষ অবদান।

তার লেখা “আজার বজর ধরি”, “কোচপানা কারে কয়”, “গাজ ফাগন্দি জুনান যেক্কে উদে”, “ও বার্গী তুই যা উরি” সহ অনেক গান এখনো তরুণ সমাজের কাছে জনপ্রিয়।

কুমার সমিত রায়ের জন্ম

১৯৪৩ সালের ২২ শে আগস্ট রাজা নলিনাক্ষ রায় ও রানী বিনীতা রায়ের দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে চাকমা রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কুমার সমিত রায়। দুই ভাই ও তিন বোন (কুমারী অমিতি রায়, রাজা ত্রিদিব রায়, কুমারী মৈত্রী রায়, কুমারী রাজশ্রী রায় এবং কুমার নন্দিত রায়) এর সাথে চাকমা রাজবাড়িতে বেড়ে ওঠেন সমিত রায়।

শৈশবকাল ও শিক্ষাজীবন

কুমার সমিত রায়ের ডাকনাম ছিল জনি। তিনি ছোটবেলা থেকে খুব মিশুক ও প্রকৃতিপ্রেমী ছিলেন। তার শিক্ষাজীবন ও ছেলেবেলা দুটোই কলকাতায় শুরু হয়। তিনি দার্জিলিং এর ভিক্টোরিয়া স্কুল এ পড়াশোনা করেন এবং সেখান থেকেই ১৯৬২ সালে সিনিয়র ক্যাম্ব্রিজ পাস করেন।

ছেলেবেলাতেই কুমার সমিত রায় বাবাকে হারান। ১৯৫১ সালের ৭ অক্টোবর মাত্র ৪৯ বছর বয়সে অকাল-মৃত্যু হয় ৪৯ তম চাকমা রাজা নলিনাক্ষ রায়ের।

পরবর্তীতে ১৯৬৩-৬৪ সালে তিনি ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিএ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।

এর মধ্যে চট্টগ্রাম কলেজে পড়াশোনার সময় এক বছর আইন বিষয়ে পড়াশোনা করেন। কিন্তু আইন নিয়ে পড়তে ভালো না লাগার কারণে আইনের উপর পড়াশোনা ছেড়ে দেন।

কর্মজীবন

কর্মজীবনে তিনি রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। যদিও তিনি মাস্টার্স এর পর দু-দুবার সিএসপি পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হন ও  করাচিতে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার এর “ফরেন এফেয়ার্স” এ চাকরি পান কিন্তু তিনি চাকরি তে যোগদান করেননি। কারণ হিসেবে বলা যায়, তার প্রিয় দেশ, প্রিয় রাঙ্গামাটি ছেড়ে সুদূর বিদেশে তিনি যেতে চান নি।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর তারা স্বপরিবারে ভারতে চলে যান, কিন্তু সেখানে মন না টেকায় কয়েকবছর পর পরিবার নিয়ে আবার রাঙ্গামাটিতেই ফিরে আসেন।

বাংলাদেশে ফিরে আসার পর শেখ মুজিবুর রহমান বেশ কয়েকবার কুমার সমিত রায়কে তার মন্ত্রীসভায় যোগ দিতে বললেও, মন্ত্রীর দায়িত্ব নিলে তাকে হয়তো রাঙ্গামাটির বাইরে থাকতে হবে- এই আশঙ্কায় তিনি প্রতিবারই এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে দেন।

কুমার সমিত রায়
ছবি- কুমার সমিত রায়

কুমার সমিত রায়ের পারিবারিক জীবন

আমাদের এই আত্মভোলা রাজকুমারের জীবনেও এসেছিলো প্রেমের ভ্রমর। পড়াশোনার তাগিদে বেশিরভাগ সময়ই রাঙ্গামাটির বাইরে থাকতে হতো কুমার সমিত রায়কে। তিনি বছরের মধ্যে খুব অল্প সময়ের জন্য রাঙ্গমাটি আসতেন। রাঙ্গামাটি তখনো তার পূর্ণ রূপে বর্তমান ছিলো, কাপ্তাই বাধ এর পানিতে তখনো ডুবে যায়নি পুরাতন রাজবাড়ি, হাজারীবাগসহ আরো সুবিশালএলাকা।

রাজবাড়ির পাশ দিয়েই প্রবাহিত ছিলো কর্ণফুলী নদী। আর নদীর অপর পাড়ে ছিলো খেলার মাঠ, পাশেই সিনেমা হল। সিনেমা হলের পাশের মাঠে রাজকুমার সমিত রায় আর তার বন্ধুরা নিয়মিত ফুটবল খেলতেন।

হাজারীবাগ এর এই মাঠের পাশেই ছিলো জয়তি রায়দের বাড়ি।

 কুমার সমিত রায় এবং জয়তি রায়
ছবি- কুমার সমিত রায় এবং জয়তি রায়

এই কর্ণফুলীর পাড়ে দেখা হয়েছিল দু’জনের। জয়তি রায় তখনো অনেক ছোট। এলাকার বান্ধবীদের সাথে তিনিও ওই মাঠে খেলা করতে যেতেন। কুমার সমিত রায় ছিলেন বন্ধুত্বপরায়ণ ও রসিক স্বভাবের। তিনি  প্রায়ই জয়তি রায় ও তার বান্ধবীদের সাথে কথার ছলে রসিকতা করতেন।

একদিন কুমার সমিত রায় মাঠে খেলতে আসা মেয়েদের জন্য চুড়ি (বাঙুরী) কিনে নিয়ে আসেন। যেহেতু তিনি অনেক রসিকতা করতেন, তাই অন্যসব মেয়েরা চুড়ি নিলেও পছন্দ হওয়া সত্তেও জয়তি রায় চুড়িগুলো  নিতে মানা করেন। পরে তার বান্ধবীদের কথা রাখতে জয়তি রায় চুড়িগুলো নিলে কুমার সমিত রায় খুশী হন।

পরবর্তীতে এইসব স্মৃতিকে নিয়েই তিনি গান লিখেন,

“ইধোত আগেনি নেই?

পূণ্যামেলাত্তুন।

কিনি দিদুং বাঙুরী, 

পিনেই দিদুঙ মুই!!”

জয়তি রায় আর কুমার সমিত রায় এর ছিল তালতো সম্পর্ক, তালতো সম্পর্কের কারণ জয়তি রায় ছিলেন রানী আরতি রায় এর ছোটবোন।

চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়ের সাথে আরতি রায়ের বিয়ে হওয়ার সূত্রে জয়তি রায়ের বেশ আনাগোনা ছিলো চাকমা রাজবাড়িতে। ১৯৬৫ সালে পরিবারের সম্মতিতে প্রণয় থেকে পরিণয় ঘটে আমাদের কুমার সমিত রায় ও জয়তি রায়ের।

কুমার সমিত রায় স্বপরিবারে
ছবি- কুমার সমিত রায় স্বপরিবারে

কুমার সমিত রায়ের গীতিকার জীবন

ছোটবেলা থেকেই একটি সাংস্কৃতিক আবহের মধ্যে বেড়ে উঠেছেন কুমার সমিত রায়। মা বিনীতা রায় পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্য, আবার কাকা সলিল রায় ছিলেন চাকমাদের মধ্যে প্রথম কবি। রাজপরিবারে বিভিন্ন শিল্পীদের আনাগোনা ছিলো, তিনি নিজেও শৈশব কাটিয়েছিলেন কলকাতার স্কুলে- সেখানের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ছিল তার নিয়মিত অংশগ্রহণ, শৈশবের এসব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তার পরবর্তী জীবনকে নানাভাবে প্রভাবিত করেছে। ৭০’র দশকের দিকে কুমার সুমিত রায়, তার ছোট ভাই কুমার নন্দিত রায় ( রেনি) সহ আরো কিছু বন্ধু-বান্ধব মিলে গড়ে তোলেন ‘উন্মাদ শিল্পীগোষ্ঠী’।

তখনও তাদের নিজেদের কোন গান ছিলো না, অন্য ব্যান্ড এর গানগুলোই তারা গাইতেন। এরপর ৮০’র দশকের দিকে নিজস্ব গান নিয়ে শুরু হয় গেংগুলির পথচলা। কুমার সমিত রায় তার গীতিকার-সুরকার জীবন শুরু করেন ৮০’র দশকের শুরুর দিকে।

কুমার নন্দিত রায় , কুমার সমিত রায় এবং জয়তি রায়।
ছবি – কুমার নন্দিত রায় , কুমার সমিত রায় এবং জয়তি রায়।

রাজবাড়ির ড্রয়িং রুমে বসে তিনি আপনমনে গান এর লাইন লিখতেন আর গুনগুন করে নিজের গানের নিজেই সুর করতেন । সেই সময়টাতেই হয়তো তিনি লিখেছিলেন,

“শনোঘরত পরের ঝড়, মনান লাগের ভারি গম,

সিংগোবা দূয়ারত হিক্কান আগজ্জি,

আয় না বিদিরে বজজি তুই , গায় গায় আগং মুই”

নিজের লেখা এসব গান নিয়ে জ্যামিং করতেন রাংগাবাবু , গুডুবাবু দের সাথে। এই জ্যামিং-এর সময়ের  একটা গল্প আছে। চাকমা সংগীত-জগতের আরেকটি কালজয়ী গান-

“হোজপানা হারে হই , যে হোজপাই তে বুঝে তে বুঝে

চুবে চুবে মরে হই , হোজপানা হারে হই?”

এই গানটাও কুমার সমিত রায় এর লেখা ও সুর করা , সেই ৮০’র দশকে গান রেকর্ড করা হতো ক্যাসেটে। তো এই গানটা গাওয়ার কথা ছিলো উত্তম দেওয়ান (মানি আজু) এর, কিন্তু দুপুরে হাতে কাজ থাকার কারণে স্টুডিওতে আসতে কিছুটা দেরি হয় তার। আর এর মধ্যে চিজিমনি বাবু এসে গানটা তার কণ্ঠে রেকর্ড করার কথা বলেন এবং গানটা  চিজিমনি বাবুর কণ্ঠেই রেকর্ড করা হয়। কিছুক্ষণ পর মানিবাবু আসেন এবং গানটা অন্য কারো গলায় রেকর্ড হয়ে যাওয়ায় মন খারাপ করেন। কুমার সমিত রায় তখন মানি দেওয়ান কে বলেন মন খারাপ না করতে , আর ঐ স্টুডিওতে বসেই লিখে ফেলেন আরেকটি গান-

“মোনতোলা আদামর টান্নেবি ,

হুদু আগজ হিজেনি “

নতুন গানটি রেকর্ড করা হয় মানি দেওয়ান এর গলায়। এইভাবেই একইদিনে জন্ম নেয় কালজয়ী দুইটি চাকমা গান ।

কুমার সমিত রায় এবং জয়তি রায়
ছবি- কুমার সমিত রায় এবং জয়তি রায়

ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন কারণে রাঙ্গামাটির বাইরে বড় হলেও তার রক্তে আর মননে মিশেছিলো আমাদের হিল চাদিগাং । তার প্রত্যেকটি গানের কথায় খুঁজে পাওয়া যায় হিল চাদিগাং এর অপরূপ সৌন্দর্য্যের অনবদ্য  বর্ণনা । পাহাড়ের প্রতি এই ভালোবাসার কারণেই তিনি পিএসপি পরীক্ষাতে পাস করার পরেও চাকরিতে যোগ দেননি। সারাজীবনের অর্জিত সকল শিক্ষা আর জ্ঞান তিনি নিংড়ে দিতে চেয়েছিলেন তার প্রিয় পাহাড়ের মানুষদের মাঝেই। ছোটবেলায় বাঁধের পানি আসার রাঙ্গামাটিকে যেমন দেখেছিলেন তা মনে করে লিখেছেন-

” হিল্লে আদিক্কে স্ববনত দেক্কোং,

পুরোন রাংগামাত্তে”

একবার কুমার সমিত রায় চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় এর সাথে রাঙ্গামাটি জেলার সুবলং এর অনেক ভিতরে ” আলাম্বা ” নামে এক গ্রামে ঘুরতে যান, ওই এলাকার সৌন্দর্য্যে মুগ্ধ হয়ে তিনি সেখান থেকে ফিরেই লিখেন –

” এনজান দোল জাগা গান হুদু আগে হিজেনি ,

রং- বেরং অর টেংটুমুরি বং পাদারে যাদন উরি

এঞ্জান দোল জাগাগান হুদু আগে হিজেনি”

এরপর তিনি আরো অনেক গান লিখেন , তাঁর প্রায় সব গানেই ছিলো রাঙ্গামাটির প্রকৃতি আর ওই অঞ্চলের বাসিন্দাদের সংস্কৃতির সুনিপুণ বর্ণনা। গানের লাইন এ ছিলো চাকমা লোকসাহিত্যের রাধামন-ধনপুদির কথা , শিবচরন- চান্ধবীর কথা। তিনি লিখেছেন-

” আজার বজর ধরি ,এলুং ইদু মুই,

রাধামন-ধনপুদি , শিবচরন -চান্দোবি,

বেগে মিলি আগি ইদু , আজার বজর ধরি “

কুমার সমিত রায়ের খেলোয়াড় জীবন

গীতিকারের পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন ভালো খেলোয়াড়ও। তিনি গ্রামে গ্রামে গিয়ে বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন, আর সেখান থেকেই খেলোয়াড় বেছে বেছে টিম তৈরি করতেন। তিনি নিজেও ভালো ফুটবলার ছিলেন, তিনি বলতেন আমি একদিন বলে লাথি না মেরে থাকলে মনে হয়, একদিন ভাত না খেয়ে আছি। খেলোয়াড়সহ টিমগুলোরযাবতীয় দায়-দায়িত্ব আর খরচ তিনিই বহন করতেন।

একবার নাকি তার স্ত্রী জ্যোতি রায় এর কাছে তার হাতের সোনার বালা চান, তা বেচে টিম এর খরচ বহন করবেন বলে। তিনি একজন অলরাউন্ড খেলোয়াড় ছিলেন। পারদর্শী ছিলেন ক্রিকেট, হকি, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন এবং টেবিল-টেনিস খেলায়। তবে ফুটবল ও ক্রিকেট এর প্রতিই বেশি ঝোঁক ছিল তার।

একবার তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমানের সাথে দেখা করে রাঙ্গামাটিতে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের প্রতিশ্রুতি আদায় করে নিয়ে আসেন, এর ফলশ্রুতিতেই পরবর্তীতে রাংগামাটিতে তৈরি হয় মারী স্টেডিয়াম।

কুমার সমিত রায়ের ফুটবল টিম
ছবি- কুমার সমিত রায়ের ফুটবল টিম

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি দীর্ঘ কয়েক বছর চট্টগ্রামে প্রেস্টিজিয়াস স্টার ক্লাবের ক্রিকেটের ক্যাপ্টেন ছিলেন। তিনি রাঙ্গামাটির শহীদ শুক্কুর ক্লাব এবং রাজবাড়ী স্টার ক্রিকেট ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

যখনই কোন মেধাসম্পন্ন খেলোয়াড় দেখতেন, তিনি তাদের সহায়তা করতেন এবং উৎসাহ যোগাতেন তাদের স্বপ্ন পূরণের জন্য। বিভিন্ন ধরণের খেলা এবং অ্যাথলেটিকসে কোচ হিসেবে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৬ সালে মন্ট্রিয়াল অলিম্পিকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বও করেন কুমার সমিত রায়।

শিক্ষকতা জীবন

কর্মজীবনে তিনি ছিলেন রাঙ্গামাটি সরকারি কলেজের শিক্ষক। ১৯৭২ সালে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে রাঙামাটি সরকারি কলেজে যোগদান করেন তিনি আর ২০০৪ সালে এই কলেজ থেকেই অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষক হিসেবেও তার বেশ সুনাম ছিলো। 

কুমার সমিত রায়ের গীতিকার হিসেবে শেষ জীবন

কুমার সমিত রায় তার প্রায় সব গানই ৮০-৯০’র দশকের মধ্যে লিখেছিলেন। এরপরের সময়টাতে তিনি আর তেমন গান লিখেননি। তিনি তাঁর শেষ গান লিখেন ২০০২-০৪ এর দিকে তার জীবনাবসানের কয়েক বছর আগে । হয়তো তিনি বুঝে গিয়েছিলেন এই সৌন্দর্য্য , এই প্রকৃতি, তার রাঙ্গামাটি , বড়গাং এর পাড় আর দেখতে পাবেন না । যাপিত জীবনের সারমর্মই হয়তো তুলে ধরেছেন তার শেষ গানে-

মোন-মুরো ,ছড়া- গাং ফেলেই যাংগোল্লোই ,

সিগোন সিগোন হদানি ইদোত উদেল্লোই ।

জিঙ্ঘানির ভালুদ্দুর পথ ফেলেই ইচ্চোং মুই ,

হি চেয়োং হি পেয়োং , ইজেব রাক্কোনি হেউ?

এই গানে তিনি নিজের পরিচয় দিচ্ছেন একজন পথিক হিসেবে, যে প্রশ্ন রেখে যাচ্ছে আমাদের কাছে- “জীবনের এতদূর পথ ফেলে এসে কি খুঁজেছে আর কি পেয়েছে হিসাব করেছে কি কেউ?”

কুমার সুমিত রায় ছিলেন একজন প্রচারবিমুখ মহৎ ব্যাক্তি। জন্মসূত্রে রাজার ছেলে হলেও তার মধ্যে কোন অহংকার ছিলো না, ব্যক্তিগত জীবনে খুব অমায়িক ও দয়ালু মানুষ ছিলেন। তিনি সব শ্রেনির মানুষের সাথে খুব সহজেই মিশে যেতে পারতেন। জনচক্ষুর আড়ালে কোনপ্রকার প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই তার এলাকার বিভিন্ন শ্রেণির মানুষকে তিনি সাহায্য করতেন ,এমনও হতো যে তার বাড়ির কেউই এই ব্যাপারে কিছু জানতো না।

গেংগুলির সাথে কুমার সমিত রায়
ছবি- গেংগুলির সাথে কুমার সমিত রায়

কুমার সমিত রায়ের মৃত্যুর পর তার এক ছাত্র এসেছিলেন জয়তি রায় এর কাছে, এসে স্মৃতিচারণ করেন তার প্রিয় শিক্ষকের- স্যার তার এই ছাত্রকে কলেজে থাকতে মাসে মাসে আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন , পরে সেই ছাত্রটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। উনার মৃত্যুর পর রাঙ্গামাটি কলেজের এক কেরানি মাথা ন্যাড়া করে ফেলেন। কুমার সমিত রায় কে তিনি বাবা মানতেন । ওই কেরানি তার স্ত্রী কে বলছিলেন “আজ থেকে আমি বাবা হারা হলাম , এখন কোন বিপদে পড়লে বাবার মতোন কে ছায়া হয়ে দাঁড়াবে” ।

মৃত্যু

কুমার সমিত রায় খুবই সাদামাটা জীবন যাপন করতেন। প্রচারবিমুখ, প্রচন্ড আবেগী এই ভালো মানুষটি লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে ২০০৮ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর পর রাজবাড়িতে তার মায়ের পাশেই তাকে সমাধি দেয়া হয় । তার নামে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয় ,সেই স্মৃতিফলকে লিখে দেয়া হয় তারই লেখা একটি গান-

“দগিনো বইয়ের বার,

বিজু ফুল উন ঝড়ি জাএ,

এঞ্জান ফাগুনো দিনোত ,

গিত্তুন ইদোত গরিজ মর”।

প্রসঙ্গঃ
জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator