Jumjournal Logo

Search

Menu

বাঁধ আমার তিন ভাইবােনকে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে

Jumjournal

Last updated Dec 10th, 2020

1062

Kaptai Hydro Electric dam which caused a huge migration

আমার পরিচিতি

আমরা ৫ ভাই ৪ বােন, মােট ৯ ভাইবােন। বাবা মদন মােহন দেওয়ান ও মা জ্ঞানবালা দেওয়ান। কাপ্তাই গােদা/ কাপ্তাই বাঁধ থেকে আমাদের গ্রাম প্রায় ৭/৮ মাইল উপরে হবে। আমাদের গ্রামের নাম মুরঘােনা গ্রাম, ১১৫নং মগবান মৌজায় অবস্থিত । আমাদের গ্রামে শ্রদ্ধেয় বনভান্তের জন্ম।

যখন কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের সময় আমার বয়স প্রায় ১৬ /১৮ বছরের মধ্যে হতে পারে । ১৯৫৬ সালে আমি মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি। আমরা ১৯৫৯/৬০সালের দিকে এখানে চলে আসি। মগবান মৌজার হেডম্যান ছিলেন আমার কাকা বিরাজমােহন দেবান।

আমাদের গ্রামের কার্বারী ছিলেন তরুনী সেন কার্বারী । আমাদের বাড়ি থেকে মাইল তিনেক দূরে আমার জেঠাবাবু কামিনী দেওয়ানের বাড়ি । তারপর আমাদের বাড়ি তারপরে হেডম্যানের বাড়ি।

আমাদের তিন ভাইবােন সবার বড় ভাই শিশির কুমার দেওয়ান আর আমার ইমিডেয়েট বড় অমিয় কুমার দেওয়ান এবং সবার ছােট বােন দিপীকা দেওয়ান অরুনাচলে বর-পরং’-এ চলে গিয়েছিল। সেখানেই তারা স্থায়ী নিবাস গড়েছে ।

আমার ছােটবােন দিপীকা দেওয়ানের স্বামী সেসময়ের পূর্ব পাকিস্তানের বিখ্যাত ফুটবলার ছিলেন। কাপ্তাইয়ের বাসিন্দা আদি তালুকদারের ছেলে সুমতি তালুকদার। কাপ্তাই বাঁধের পানিতে জায়গা জমি হারিয়ে তারাও অন্য সকলের মতাে এখানে মানে এই খাগড়াছড়িতে এসেছিল কিন্তু নানা অত্যাচারে বাধ্য হয়ে মনের দুঃখে তারাও পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে বর-পরং এ চলে যায় ।

অত্যাচার বলতে প্রয়ােজনমতাে জায়গা জমি না পাওয়া, পরিবারের সকলের জায়গা সংকুলান না হওয়া, জায়গা জমি নিয়ে একে অপরের সাথে ঝগড়া বিবাদ সেসব ভালাে না লাগাতে আর বাঙালিদের আসা যাওয়া দেখে ভবিষ্যতের কথা ভেবে ওরা ঠিক করে একেবারে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার।

তারা ১৯৬৪ তে দেশ ছাড়ে। তবে আমরা এখানে থেকে যাই। আমরা যে কেন এখানে রয়ে গেলাম সেটা আর মনে নেই। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন বিখ্যাত ডা. হিমাংশু দেওয়ানের স্ত্রী বাসন্তি দেওয়ান হচ্ছেন আমাদের বড় দিদি । আমাদের ভাই বােনদের মধ্যে তিনিই সবার বড়।

আমাদের বাবা আমাদের ডুবে যাওয়া গ্রামেই মারা যান। কাপ্তাই বাঁধের কারণেই তাে আমাদের পূর্ব পুরুষের শুশানভূমিও ডুবে গেল । বাবা ভাগ্যবান তিনি সেখানে দেহ রাখতে পেরেছেন। কিন্তু আমার মা এখানেই মারা যান। ১৯৬৪ সালে দেশ ছাড়ার পর আমার মেঝাে ভাই অমিয় কুমার দেওয়ানের সাথে আমাদের আর কখনাে দেখা হয়নি। মানে দেখা হবার কোন সুযােগ ছিল না বললেই চলে। একেতাে অরুনাচল অনেক দূরে আর তার উপর ভারত তাে অন্য আলাদা দেশ। এখনকার মতাে ভারত বাংলাদেশ আসা যাওয়া তখন এতাে সহজও ছিল না।

পুরােনাে স্মৃতি সেসময়ে আমাদের সমাজে সামাজিক অবস্থা তাে খুব ভালাে ছিল। ছেলেমেয়েদের মধ্যে খারাপ কাজ করার প্রবণতা ছিল না। সবাই সমাজের নিয়ম মেনে বসবাস করতাে। বড়দের সবাই ভক্তি করে চলতাম।

আমাদের সময়ে লেখাপড়া নিয়ে কোন ধরাবাধা ছিল না। সুযােগ কম ছিল বলা যায়। যে কেউ চাইলেই পড়তে পারতাে না কারণ স্কুলের সংখ্যা অনেক কম ছিল। আমাদেরকে রাঙামাটি শহরে গিয়ে পড়তে হতাে। আমি কোনােমতে মেট্রিক পাস করেছি। আমাদের গ্রামে ছােট একটা স্কুল ছিল যেখানে বনভান্তেও কিছুদিন পড়াশােনা করেছেন।

আমরা গরীবও ছিলাম না আবার বিশাল জমিদারও ছিলাম না। কিন্তু স্বচ্ছল পরিবার ছিলাম। এখন বলে মধ্যবিত্ত, সেটাই ছিলাম। গ্রামের মধ্যে আমাদের জায়গা-জমি যথেষ্ট ছিল। সেসবের প্রচুর ফলন হতাে তাই দারিদ্রতা কি সেটা তখন বুঝতাম না । আমাদের বাড়ি মাটির তৈরি ছিল চাকমারা বলে ‘গুদাম ঘর। বিশাল বাড়ি ছিল আমাদের। এখনতাে গুদাম ঘর নেই বললেই চলে।

এখন বললে হয়তাে গল্পের মত শােনাবে যে, আমাদের বাড়ির দুই দিকে দুটো টানা লম্বা বারান্দা ছিল। যাদের দৈঘ্য ৮২ আর প্রস্থ ৩২ হাত লম্বা। প্রত্যেকটি বারান্দায় কমপক্ষে ১০০ জন করে ভাত খাওয়ানাে যেতাে । বাড়িতে ৫টা রুম ছিল।

বাড়ির সবচেয়ে ছােট রুম, যেটি বাড়ির মাঝখানে ছিল, ‍সেই রুমে আমরা ৭টা গরু দিয়ে ধান মাড়াই-এর কাজ করতে পারতাম। এখন চিন্তা করো বাড়ির বড় রুমগুলাে কেমন বড় ছিল। এতো বিশাল বাড়ি ছিল যে এককোনো থেকে কেউ ডাক দিলে আরেক কোনায় শােনা যেতাে না । হায়! তােমাদের কাছে এখন হয়তাে এসব ‘গব’ বা গল্পের মতাে শােনাচ্ছে।

বাড়ির ভিটায় পূর্ব দিকে একটা আর পশ্চিম দিকে একটা মোট দুটো বিশাল বিশাল আমগাছ ছিল। যে গাছ বছরে তিন বার ফলন দিত। আর খেতে খুবই সুস্বাদু ছিল। এই আমগাছের চারা বাবা বােম্বে থেকে পার্শেল করে এনেছিল । ছােটবেলায় বাবাকে কতবার জিজ্ঞেস করেছি বাবা এই আমগুলাের নাম কী? বাবা উত্তরে বলতেন ‘মহারাজ পছন্দ’।

আমি আজো বুঝতে পারিনি এটা সত্যিকারের নাম কিনা! নাকি বাবা আমাদের সাথে ইয়াকি’ করছিল । কিন্তু আবার এটাও তাে সত্যি যে সেসময়ে মহারাজারা নানা ধরণের জিনিস পছন্দ করে নিজেদের নামে চালিয়ে দিতেন। তাই বাবার বলা এই দুটো আম গাছের নাম মহারাজা পছন্দ হতেও পারে।

আহা, গ্রামে আমাদের কত ধরণের বাগান ছিল! লিচু বাগান কঁঠাল বাগান আর কত ধরণের গাছ । এখনাে চোখে ভাসে আমাদের সেই লিচু বাগানের দৃশ্য। লিচু গাছ ছিল হাজার বারশ মতাে। হাজারের উপর কাঁঠাল গাছ। এখন ভাবি এই সময়ে যদি আমাদের সেসব বাগান থাকত তাহলে লক্ষ কোটি টাকার মালিক হয়ে যেতাম।

তখন আমরা কাঁঠাল বিক্রি করেছি শতে ১১/১২ টাকা। এখন একটা কাঁঠাল ২০০/৩০০ টাকা বিক্রি হয়। লিচু বিক্রি করেছি শ’তে ৩ আনা ৪ আনা করে। এখন ১০০ লিচুর দাম ৩০০/৪০০ টাকা করে। এখন বলাে সেসব যদি থাকতাে তাহলে কি আমরা এখন লক্ষ কোটি টাকার মালিক হতাম না।

সময়-দিন সব বদলে দিয়েছে, আমাদের জীবনটাকে করে দিয়েছে দুঃখময়। কিন্তু কি আর করার আছে বল আমি মেনে নিয়েছি। গ্রামে কাবারীই ছিল গ্রামের প্রধান। যদিও তিনি গ্রাম প্রধান ছিলেন কিন্তু সবাই নিজের মতাে চলতে ফিরতে পারতাে আমাদের গ্রামে কেউ কারােকে অধস্তন করে রাখবে এমন অবস্থা ছিল না তখন।

এমনিতে আমাদের সমাজে পরিবারে মেয়েরা স্বাধীনভাবে থাকতে পারতাে। তবে এখনকার মতাে রাতের বেলা ঘুরতে যাওয়া সিনেমায় যাওয়া এসব ছিল না। সুমের সময় জুম করা ধান কাটার সময় ধান দেয়া ছিল আমাদের সকলের কাজের অংশ ।

আমাদের সমাজে মেয়েরা সম্পত্তি পায় না। তবে আনেক নিজ তাগিদে ময়েদেরকে সম্পত্তি দিয়ে যেত। অবশ্য এখন মােটামুটি মেয়েরা সম্পত্তির ভাগ পেয়ে থাকে। বর্তমান সময়ে এটা একটা ভালাে দিক আমাদের সমাজের জন্য। আমার মনে আছে কৃঞ্চ কার্বারী নামে একজন কার্বারী ছিলেন বিশাল বপুর আধিকারী।

তিনি প্রতিবছর একবার আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসতেন। আসার আগেই খবর পাঠাতেন যে তিনি আসছেন। উনার আসার খবর পেলে বাবা মাকে বলতাে ধান রােদে দেওয়া আছে কিনা! মেহমান আসবে। শুকর লাগতো ২টা। একা আসতেন না সাথে অনেক লােক নিয়ে আসতেন ।

রুপার দাবা/হক্কা সাথে করে নিয়ে আসতেন। সেটি আমাদের আজু তাকে গিফট করেছিলেন। তার ১১ট ছেলে কোন মেয়ে ছিল না। তার বাড়ির সংখ্যা ছিল ৪৪ জন। সবাই ভয় পেতো তাকে। মােনের উপরে থাকা কৃঞ্চ কার্বারী আদাম বলে বিখ্যাত ছিল সে আমাদের গ্রাম থেকে তাদের গ্রাম দেখা যেতাে। বাড়িতে যখন থাকতেন বিকাল বেলায় বজ্যা বডি বাংকো তে বসে ‘শিঙে’ নিয়ে বসতেন। নাতিরা খেলা খেলতাে আর তারা দেখতেন। কোন নাতি কাদছে সে অনুসারে তারা বাজাতেন। এমন হিসেব ছিল তাদের।

আমাদের গ্রাম

আমি রাঙামাটি সরকারি স্কুলে পড়েছি। রাঙামাটি শহরেই আমাদের বাড়ি ছিল । আমরা সব ভাই বোনরা সেখানে থেকে পড়াশুনা করতাম। রাঙামাটি শহর থেকে আমাদের গ্রামে হেটে আসা যাওয়া করা যেতাে। আমি প্রায় সময় হেটেই শহর থেকে গ্রামে আসা যাওয়া করতাম।

আমাদের ছােট্ট গ্রামে মাত্র ৮/১০ পরিবারের বসতি ছিল। গ্রামে কোন বাঙালি পরিবার ছিল না। কিন্তু কাজের মৌসুমে কাজের জন্য বাঙালিরা সমতল থেকে আমাদের গ্রামে আসতাে। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে সাতকানিয়া, পটিয়া রাউজান থেকে বাঙালিরা আসতাে। কানি প্রতি ৪ টাকা করে মাসিক ১২/১৩ টাকার ভিত্তিতে কাজ করতাে আর কাজ শেষ হলেই বেতন নিয়ে আবার নিজেদের বাড়িতে চলে যেতাে । কোনরকম ঝামেলা ছিল না তাদের নিয়ে।

সেসময়ে রাঙামাটিতেও এতাে বাঙালি ছিল না। কয়েক ঘর মাত্র পুরাতন বাঙালি ছিল। চাকমা রাজা কাজের সুবিধার্থে যে ৫০ পরিবারের মতন যে বাঙালি নিয়ে এসেছিল তারাই স্থায়ীভাবে বসবাস করছিল। সেসময়ে সিলেট কুমিল্লা বা বরিশালের কোনাে বাঙালি ছিল না।

আমাদের গ্রামে তঞ্চংগ্যা ছিল কিন্তু চাকমাদের সাথে সামাচিক ভাবে বিবাহ হাতো না। এমনকি প্রেমের বিয়েও হতোনা। কিন্তু সবাই একসাথে চলাফেরা করতাম। আমাদের বাড়ি তাে ছিল অনেক পাহাড়ের ওপারে। মেয়েরা যে কীভাবে পানি আনা-নেওয়া করতো আমি এখন অবাক হয়ে ভাবি।

আমরা ছেলেরা লেখাপড়া শিখেছি সাথে আমার বােনেরাও লেখাপড়া শিখেছে। তবে সমাজে মেয়েদের লেখাপড়া চাইতে বুনাে কাটা মানে কোমড় তাঁতশিল্প শিখতে হতাে । এটাই তার সক যােগ্যতা যে মেয়েটা বুনাে কাটায়/তাঁতশিল্পে পারদর্শী তার ভালাে ঘরে বিয়ে হবে।

আমাদের বাড়িতে একটা কাগজ ফুলের লুদী ছিল। সেই ফুলের পাতা ছিল কাগজের মতাে পাতলা। সেখানে কালা জামুরাে সাপ ছিল একটা। এখন মানুষের কাছ খকে শুনি আমাদের ডুবে যাওয়া গ্রামের ভিটায় নাকি পানি নেমে গেলে এখনো সেই কাগজ ফুল ফুটে থাকে। এবং সেই সাপটির মতাে আরেকটি সাপ সেই ফুলের লুদির সাথে জড়িয়ে থাকে।

সত্য কি মিথ্যা আমি জানি না। রাজবাড়ি গেছি অনেকবার। বিশাল রাজঘর। দোতলা ছিল। নাটঘর ছিল, পাকা বাড়ি কিন্তু টিনের চালের। ভূবন মােহন রাজার একটা অবাক্ষ মূর্তি ছিল। একবার পানি কমে যাবার পর আরেকবার রাজবাড়িতে গেছি। ত্রিদিব রাজাকে নিয়ে কতবার শিকারে গেছি আমি! তখনাে সে রাজা হয়নি। সকালে যেতাে রাতে ফিরতাে। আমাদের বাড়িতে কখনাে রাতে থাকেনি।

ত্রিদিব রাজার বাবা নলীনাক্ষ রায় তাে বিষ খেয়ে মারা যান। অবশ্য কথিত আছে রাণী বিনীতা রায় তার স্বামীকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলেছেন। কে জানে কোনটা সত্য কোনটা মিথ্যা। তখনতাে তাদের প্রভাব ছিল অনেক। রাণী দেখতে সুন্দর ছিলেন। উনি তাে বাঙালি ছিলেন কিন্তু চাকমা ভাষায় কথা বলতে পারতেন।

কাপ্তাই বাঁধ

কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ হবে। তাই তকালিন পাকিস্তান সরকার ১৯৫০-এর পরে ঘােষণা দেয় যে বাঁধের পানি আসবে আর এই পানিতে সব ডুবে যাবে এবং তােমাদের চলে যেতে হবে। এই ঘােষণার সাথে সাথে জরিপ চালিয়ে কতিপূরণের ব্যবস্থা করে। সেসময় পাকিস্তান সরকার জায়গা জমি অনুসারে টাকাও দিয়েছে।

আমাদের পরিবারের ৭০০ একরের মতাে জমি ছিল। যদ্দর মনে পরে ১ম, ২য়, ৩য় শ্রেণির ভাগ করে টাকার পরিমাণ নির্ধারণ হয়। ১ম শ্রেণির একরে ৩০০ টাকা, ২য় শ্রেণি একরে ২০০ টাকা এবং ৩য় শ্রেণি একরে ১০০ টাকা। কিন্তু সব ঠিক করে দেয়া থাকলে কি হবে প্রায় সকলের মতাে আমরাও আমাদের জমির ঠিকঠাক দমি পাইনি। এখন এইরকম জমির দাম কোটি ৯ মতাে বিক্রি হচ্ছে।

ডুবে যাওয়া গ্রামে আমাদের ৭০০ একরের মতাে জমি থাকলেও আমরা এখানে এসে জায়গা পেয়েছি মাত্র জনপ্রতি এক একর । যখন আমি সেখান থেকেেএখানে আসি তখন আমি ছিলাম যুবক। গ্রাম ছেড়ে আসার পরে এখানে এসে বিয়ে করি। কিন্তু ১ একর জমি একটি পরিবারের জন্য কিছুই না। ১ একর জমি আমার নয় বরাদ্দ হবার পর আমার মনে হচ্ছিল এইটা কি হলাে? আমি চলবাে কীভাবে। যেখানে আমার পরিবারের ৭০০ একরের মতাে জমি ছিল সেখানে মাত্র ১একর।

তাই আমি সরকার থেকে অন্যভাবে (তিনি বলছেন চুরি করে) আরাে ৪ একর জমি ব্যবস্থা করি। এই জমির ব্যাপারে তৎকালীন সরকারের একজন বাঙালি কানুনগাে আমায় সাহায্য করেছিল। তার নাম সম্ভবত ক্যাপ্তেন সােলেমান । তিনি সেক্টর অফিসার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।

তিনি কাগজে কলমে ১০ একর পাহাড়ি জমি দিয়ে গেলেও মাত্র ৪/৫ একর শস্যজমি পেয়েছিলাম । যাই হােক, পরে তােমাদের মানে মহাজন পাড়া গ্রামের ধ্রুপ্র মাজনের কাছ থেকে একরে ৬০০/৭০০ টাকা করে জমি কিনি । তখন আমরা সকল ভাইরা একটা বাড়িতেই ছিলাম । আমার দাদা অশােক কুমার দেওয়ান তখনাে বিয়ে করেননি । শুধু সবার বড় ভাই শিশির কুমার দেওয়ান বিয়ে করেছেন ।

বাধ সময়ের প্রতিশ্রুতি

পাকিস্তান সরকার বাঁধ নির্মাণ হবার আগে কাগজে কলমে মুখে কতধরণের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল । কাপ্তাই বাঁধ হবে, বিদ্যুৎ হবে আর তাতে আমাদেরই উন্নয়ণ হবে। এখন তাে দেখি কিছুই হয়নি, যা হয়েছে তা ধ্বংস । আমাদের সমাজ পরিবার সব ধ্বংস হয়ে বসে আছে । কে কোথায় ছিটকে গেলাম । একতাবদ্ধ পরিবার ভেঙে গেল । আমাদের শক্তিও কমে গেল । আজকে যদি আমরা একসাথে থাকতাম তাহলে হয়তাে আমাদের ইতিহাস অন্যরকম হতাে।

আমাদের সেই ঘাম : মুর ঘােনা

আমাদের গ্রামের চারিদিক ঘুরে কর্ণফুলি নদী প্রবাহিত হয়েছে। গ্রামের নাম মুরঘােনা । আমাদের বাড়ি ছিল একেবারে পাহাড়ের মাথায়। কীভাবে বলে বােঝাই, কিন্তু পুরােনাে সবকিছু এতাে বছর পরেও এখনাে চোখের ওপর ভেসে বেড়াই । আমাদের বাড়ি আমাদের গ্রাম থেকে একটু দূরে পাহাড়ের মাথায় ।

বাড়ির চারপাশে আমাদেরই ব বাড়িতে যারা কাজ করে তাদের পরিবারের লােকজন বাস করতাে। গ্রামের সকলেই সবাই স্বাবলম্বী এবং স্বচ্ছল । কাউকে অন্যের কাছে হাত পাততে হতাে না। বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু শ্রদ্ধাভাজন বনভান্তেরাও ছিলেন ৫ ভাই। সম্ভবত তাদের নাম বজরুক্যা ঘর, চন্দ্রসেন, তরুনসেন।

আমাদের গ্রাম একটা হিয়ং মানে বৌদ্ধমন্দির ছিল। কিন্তু কোনাে মাধ্যমিক স্কুল ছিল না। তবে একটা ইউপি স্কুল ছিল। যেখানে ক্লাস ৫ পর্যন্ত পড়াশুনার ব্যবস্থা ছিল। তখন মাধ্যমিক স্কুল বুড়িঘাটে একটা ছিল ।

আসলে বহুদিন আগের কথা। মুরঘােনার নাম কেন হয়েছে আমি জানি না। তবে আমার ধারণা নদীতে তখন বিরাট বিরাট ২টা মুরং ছিল । একটা মানিকছড়ি দোরে আরেক মুড়াে ঘােনাতে। সেখানে মাঝে মাঝে আমরা মাছ ধরতাম জাল দিয়ে। সেখানে বেশ বড় একটা বালুচর ছিল।

সেই বালুচরে একজন গ্রামবাসী তরমুজ লাগাতাে। সেই তরমুজর মালিকের আমার বয়সি একটা মেয়ে ছিল । তার কাজ ছিল তরমুজ পাহারা দেয়া । একদিন আমি জাল দিয়ে মাছ ধরছি হঠাৎ শুনি বিশাল শোঁ শোঁ শব্দ। আমি উপরে তাকালাম কিছুই দেখা যায় না। একটু পরে সে মেয়েটি যার নাম জটিলা সে ডাকছে ‘দাদা দাদা আসসা দেখে যাও একটা কুমির ভেসে উঠেছে ।

আমি দৌড়ে চর এ উঠে এসে দেখি কুমির একটা ভেসে উঠেছে। বেশ কিছুক্ষণ পরে সে আস্তে করে ডুবে চলে যায়। আমরা আগে কেউ জানতাম না যে সেখানে কুমির ছিল । মাঝে মাঝে আসতাে কুমির। আমাদের গ্রামের চারিদিক ঘুরে কর্ণফুলি নদী প্রবাহিত হয়েছে।

কর্ণফুলি নদীতে লঞ্চ দিয়ে গ্রামের লােকেরা রাঙামাটি শহরে আসা-যাওয়া করতাে। রাস্তায় চলাচলের জন্য গাড়ি ছিল তবে অনেক কম। আমাদের অশােক কুমার দাদা রাঙামাটি থেকে মেট্রিক পাস করে চট্টগ্রামে পড়াশুনা শেষ করে পরে কলকাতা পড়তে যান। সেসময় যাঁরা উচ্চশিক্ষায় পড়তে চাইতেন তারা প্রায় সকলে কলকাতায় পড়তে যেতেন।

জীবন দুঃখে ভরা : বর-পরং যাত্রা

কাপ্তাই বাঁধের পর আমাদের তিন ভাইবােন চিরতরে ভারতে বরপরং-এ চলে গেলেন। আর আমরা এখানে রয়ে গেলাম। আমি এখানে আসার পর বর-পরং যাবার বছর খানেক বা তারও বেশি আগে যখন চেঙেই, মেইনি, সুভলং-এর মানুষ বর-পরং যাবে যাবে করছে তখন দেখেছি ঝাঁকে ঝাঁকে সাদা প্রজাপতি প্রতিদিন দক্ষিণ থেকে উত্তরে উড়ে যেতে। শুধু সাদা করে দেখা যেতাে কিছু একটা উড়ে যাচ্ছে। এরকম করে ৩/৪ দিন উড়ে গেল। সেসব প্রজাপতি আসলাে কোথেকে গেল কোথায় জানি না। তখন তাে বুঝিনি এটা কীসের লক্ষণ। তারপরেই তাে বর-পরং যাত্রা শুরু হলাে।

যাই হােক, আমার ভাইবােনেরা আমাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন সেই দল মা মারা যান। আমরা সকলেই তাদেরকে মানা করলাম না যেতে কিন্তু ওরা , করেছে যাবে তাই গেল। দাদার বন্দুক ছিল সেটি দিয়ে দিলাম আমরা বলল পথে কত বিপদ হতে পারে সাথে নিয়ে যাও।

কিন্তু পরে সেটি দেমাগ্রীতে ভারত সরকার কেড়ে রেখে দেয়। তারা বরকল দিয়ে গেছে। তাদের প্রত্যেক দলে একজন লিডার ছিল। কিন্তু কে আমার মনে নেই। সেই লিডারাই ঠিক করতে কোন সময় কোনাে দিনে তারা চলে যাবে। আমাদেরকেও বলা হয়েছিল যেতে কিন্তু আমরা গেলাম না। এইযে ভাইবােনেরা চলে গেল আর দেখা হলাে না, এই দুঃখটা আমাদের সকলের চিরটাকাল বয়ে বেড়াতে হবে।

জীবন সায়াহ্নে

এখন আমার বয়স ৮০ বছরের কাছাকাছি। কাপ্তাই বাঁধ হবে তাই আমরা পানি হবার আগেই খাগড়াছড়ি এসে জায়গা কিনে বাড়ি তৈরি করে রেখেছিলাম। ঠিক পুরােনাে ঘরের ডিজাইনে বাঁশের তৈরি বাড়ি। ২৫০ টাকা নৌকা ভাড়া দিয়ে আমরা এসেছিলাম।

পুরােনাে বাড়ি থেকে কোনাে কিছুই সঙ্গে আনিনি শুধু একটা গরু ছাড়া। বাড়ির বাকি সব পােষা গরু ছাগল হাঁস মুরগি ফেলে ছেড়ে দিয়ে এসেছি । হরিনি নামের যে গরুকে সাথে এনেছিলাম সেই গরু থেকে রােজ আড়াই কেজি দুধ পাওয়া যেতাে। মায়ের প্রিয় গরু হরিনি, তাকে মা ফেলে আসতে চায়নি তাই সাথে এনেছিলাম আমরা।

ছােটবেলার কথা মনে আছে আমি তখন বেশ ছােট। বাবার সাথে মাছ ধরতে নদীতে যাবাে তাই বাড়ি থেকে বের হলাম। ‘দুলাে’ মানে মাছ রাখার জন্য পাত্রটি ধরে আছি আমি। বাবার সাথে যাচ্ছি সূর্য তখন মাথার উপরে।

আমাদের বাড়ির পাহাড় নেমে গ্রামের জমি পার হয়ে গেলাম। পথে কিছু ঝোপ ঝাড় ছিল সেখান থেকে মাত্র কিছুটা দূরে আমরা, বাবা তখন আমার হাত ধরে টেনে রাখলেন। দেখি একটা বাঘ পানি খাচ্ছে। বাবা আর মাছ ধরতে না গিয়ে বাড়ি ফিরে মাকে বললেন আজ রাতে বাঘ শিকার করতে বের হবে।

বাবা আমাদের পাঠালেন কাকার বাড়িতে গিয়ে খবরটা দিতে। আমরা গিয়ে কাকাকে বললাম, বাবা বলেছেন চারিদিকে আগুন দিতে রাতে। যেহেতু বাঘ গ্রামে ঢুকেছে রাতে বাড়ির সব গরু মহিষ একসাথে কাছাকাছি বেধে রাখা হলাে। আমাদের বাড়িতে ১৪ জনের মতাে বাঙালি কাজের লােক ছিল।

আমাদের গরুও ছিল প্রায় ১০০ উপরে। আগুন দেয়া হলাে তারপরেও রাতে গরুর পালে বাঘ হানা দিলাে। গভীর রাতে গরুরা চারিদিকে ঘুরতে শুরু করলে বাবা সবাইকে ডেকে টিন আর ঢােল দিয়ে শব্দ করতে বললাে যাতে বাঘ পালিয়ে যায়। কিন্তু আগুনের লুরাে দিয়ে এগিয়ে দেখা গেল বাঘ ৮টি গরুকে হতাহত করেছে। কিন্তু বাঘটাকে আমরা ধরতে পারিনি।

আমার ভাইবােনেরা দেশ ছেড়েছে ১৯৬৪ সালে। তারা যাবার পর তাদের সাথে অনেক বছর আমাদের কোন যােগাযােগ ছিল না। তারা কোথায় আছে কেমন আছে কোনােকিছুই আমরা জানতাম না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর দাদা দেশে বেড়াতে এলেই আমরা জেনেছিলাম যে তারা অরুণাচলে আছেন। কিন্তু মেজদা অমিয় কুমার দেওয়ানের সাথেতাে আর দেখাই হলাে না। ভাইবােনরা সকলে মারা গেছে সেখানে, নেফায় । নানা কারণে তারা আসতে চাইলেও আসতে পারেনি। টাকা পয়সার বড় অভাব ছিল ।

তাছাড়া এত দূর জায়গা থেকে আসা এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়া তখন সহজ ছিল না। বড় দাদার ছেলে বাংলাদেশ বর্ডার পর্যন্ত এসে ভয়ে আবার ফেরত চলে গেছে। দেখাই হলাে না আমাদের। আমার মেঝাে ভাই মারা গেল সেই খবর পেয়েছি প্রায় মাস খানেক পর তাও অন্যের কাছ থেকে যারা দেশে বেড়াতে এসেছিল । ছােটবােন দেবিকা এসেছিল আরাে অনেক পরে। তাওতাে দেখা হয়েছে। মনতাে সবার জন্য কাঁদে। কিন্তু কি হবে। কাপ্তাই বাধ তাে সবকিছু অন্যরকম করে দিলাে।

গাছ কাটিং হবার পরও পানি হতে বছর খানেক সময় লেগেছিল । পানি আসার আগেই গাছ কেটে ফেলে দিয়েছিল। আমাদের সেই মহারাজা আমগাছকে আমাদের চোখেরই সামনে কেটে দিল। চেয়ে চেয়ে দেখলাম ।

একটা কলা গাছের দাম পেয়েছিলাম ৪ আনা। ধীরে ধীরে পানি জমতে শুরু করে। আমাদের বাড়িটা পাহাড়ের মাথায় হবার কারণে ডুবতে আরাে সময় লেগেছে। কোমড় সমান পানি নিয়ে বাড়িটা অনেকদিন দাঁড়িয়ে ছিল । অথচ মাটির ঘর ছিল । তবুও এই বাড়ি ডুবতে সময় নিয়েছিল অনেকদিন।

বুঝাে কতবড়াে বাড়ি ছিল আমাদের। এখনাে আমাদের সেই বাড়ির দৃশ্য চোখে ভাসে। (দীর্ঘশ্বাস) প্রায় গ্রামের পুরােনাে মানুষরা সেসব ফেলে আসা জায়গা দেখতে যায়। তারা এসে বলে এখনাে নাকি আমাদের সেই পাহাড়ের উপরের ঘরের ভিটাটা আছে । তাদের কাছ থেকে জেনেছি আমাদের ভিটার মাথায় একজন পরিবার বসত করেছে চাষবাস করে কিন্তু শুকনাে মৌসুম পর্যন্ত।

বর্ষায় পানি বেড়ে গেলে আবার অন্য কোনােখানে সে চলে যায়। আসলে আমাদের বাড়ির পাহাড়টা অনেক উচু ছিল তাই হয়তাে পানি শুকিয়ে গেলে আবার মাথা তুলে দাঁড়িয়ে জানান দেয় এখানে মানুষ ছিল।

এসব শুনতেই আমার মনটা বেদনায় ভরে যাই আছি জানি সেখানে গেলে কাছ থেকে দেখলে আরাে বেশি দুঃখ কষ্ট লাগবে। তাই ইচ করেই আমি যাওয়াটা এড়িয়ে চলি। কাপ্তাই বাঁধ আমাদের জন্য ছিল মরণ ফাঁদ। কোন কিছু বােঝার আগেই আমরা সেই মরণ ফাঁদে ডুবে গেলাম।

নােট : অবসর প্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মি, অরুন কুমার দেওয়ানের এই সাক্ষাৎকার ২০১৬ সালে তার খবংপুয্যা বাসভবনে লেখক গ্রহণ করেন। মি.দেওয়ান গত বছর ২০১৭ সালে নিজ বাসভবনেই বার্ধক্য জনিত কারণে মৃত্যু বরণ করেন। তিনি স্ত্রী ১ পুত্র ৪ কন্যা সন্তান রেখে যান।

১. শিঙে : চাকমা জতির একটি বাদ্যযন্ত্রবিশেষ।
২. লুরো : আগুনের মশাল

লেখকঃ মি. অরুণ কুমার দেওয়ান, অবসর প্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, খাগড়াছড়ি।

তথ্যসুত্র : “কাপ্তাই বাঁধ : বর-পরং – ডুবুরীদের আত্মকথন” – সমারী চাকমা।

প্রসঙ্গ:অরুণ কুমার দেওয়ান, কাপ্তাই বাঁধ, বড়পরং

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - jumjournal@gmail.com এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা