আদিবাসী জনগণের কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতি

0
9

১.

বাংলাদেশ বহুজাতির, বহুলিঙ্গ, বহুবর্গ, বহুভাষা, বহুপ্রতিবেশ ও বহুসংস্কৃতির এক বৈচিত্র্যময় দেশ। এ জনপদ ঐতিহাসিকভাবেই নিম্নবর্গের যাপিতজীবনের অর্থনীতির ভেতর দিয়েই মেলে ধরেছে এই ভূগোলের ঐতিহাসিকতা।

বাংলাদেশে আদিবাসী জনগণের সাংবিধানিক পরিচয় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা এবং নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০-এর ২(১) এবং ধারা ১৯ এ চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, তঞ্চঙ্গা, বম, পাংখোয়া, চাক, খিয়াং, খুমি, লুসাই, কোচ, সাঁওতাল, ডালু, উসাই(উসুই), রাখাইন, মণিপুরী, গারো, হাজং, খাসিয়া, মং, ওরাও, বর্মণ, পাহাড়ী, মালপাহাড়ী, কোল এবং বর্মণ নামে মোট ২৭ জনগোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে।

পূর্বের ২৭ আদিবাসী জাতির পাশাপাশি বর্তমানে কুর্মি মাহাতো, কন্দ, গঞ্জু, গড়াইত, মালো, তুরি, তেলী, পাত্র, বানাই, বাগদী, বেদিয়া, বড়াইক, ভূমিজ, মুসহর, মাহালী, রাজোয়ার, লোহার, শবর, হদি, হো এবং কড়া এ ২১ আদিবাসী জাতির নাম ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন ২০১০’ এর তফশিলভূক্তকরণের সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে।

দেশের প্রায় ৩০ লাখ আদিবাসী সমাজ এখনও মূলত: কৃষি ও জুমনির্ভর উৎপাদন অর্থনীতিকে আগলে আছে।

আদিবাসী জনগণের এ অর্থনীতি ‘স্বনির্ভর’, না ‘উৎপাদনমুখী’ না ‘শিল্পবিমুখ’ না ‘সবুজ’ এ তর্কে না গিয়ে আমরা এর দার্শনিকতা নিয়েই আজ আলাপ হাজির করছি। যা কোনো অথনৈতিক ব্যবস্থার বিস্তার ও স্থায়িত্বশীল বিকাশের ক্ষেত্রে জরুরি প্রশ্ন।

২.

দেশের আদিবাসী জনগণের মূল সংখ্যাঘনত্ব পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রাম একসময় দুনিয়ার অন্যতম তুলামহল হিসেবে পরিচিত ছিল। এ অঞ্চলই দুনিয়ার বস্ত্রখাতকে বিকশিত করেছে।

যার চলতি বিকাশমান রূপ হিসেবে করপোরেট গার্মেন্টস বাণিজ্য হাজির হয়েছে। কেবলমাত্র পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, ভাওয়াল ও মধুপুর গড়ও তুলা উৎপাদন অঞ্চল।

টাঙ্গাইলের মধুপুর শালবনের চুনিয়া গ্রামের মিধন চিরান ছিলেন একজন সফল মান্দি খিল (জুম তুলা) উৎপাদক।

১৩৪০ বাংলায় প্রতি সের জমতুলা বিক্রি হতো ১২ আনায়। ১৯৫০ সনে শালবনে রাষ্ট্রীয়ভাবে জুমচাষ নিষিদ্ধকরণের ফলে মধুপুর ও ভাওয়াল অঞ্চলে তুলা উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়।

রাষ্ট্রীয়ভাবে তুলা উৎপাদন বন্ধ করে আবার সেই ভাওয়াল অঞ্চলেই গাজীপুরে গড়ে তুলা হয় তুলা গবেষণা কেন্দ্র।

দেশের গরিষ্ঠভাগ চাবাগানসমূহ সিলেট বিভাগে, যা এখনো পর্যন্ত সাঁওতাল-মুন্ডা-কোল-ভূমিজ-ওরাঁও-খাড়িয়া-দেশোয়ালীসহ আদিবাসী শ্রমিকদের ঘাম ও যত্নে পরিচালিত।

অন্যায় শ্রমশোষণ, মজুরি-বৈষম্য আর নিরন্তর অধিকারহীনতার ভেতরেও আদিবাসী চা শ্রমিকরাই এখনও পর্যন্ত ধরে রেখেছেন দেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানিখাত চা শিল্প।

যদিও এসব কোনো চাবাগানের মালিকানাই আদিবাসী জনগণের নয়। তবে রাঙামাটির সাজেক অঞ্চলের লুসাই আদিবাসীরা ছোট ছোট চা বাগানে হাতে তৈরি চা উৎপাদন করছেন।

সেসব চাপাতা ও তাদের বাগানের কমলা বাজারে বিক্রিও হয়। দেশের উত্তরাঞ্চলের আদিবাসী জনগণ সম্পূর্ণত কৃষি-অর্থনীতির সাথে জড়িত।

ভূমিহীন ও প্রান্তিক এ অঞ্চলের আদিবাসী নারী-পুরুষেরা বাঙালি মহাজনের জমিতে বর্গাচাষী ও কৃষিমজুর হিসেবে কাজ করেন। দিনাজপুর দেশের এক উল্লেখযোগ্য ধান-উৎপাদন এলাকা।

দিনাজপুর, রংপুর, রাজশাহী, ঠাকুরগাও, নওগাঁ, জয়পুরহাট, পঞ্চগড়, নাটোর, পাবনা, গাইবান্ধা জেলার কৃষি-উৎপাদনে আদিবাসী নারী-পুরুষের অবদান অনস্বীকার্য।

১৯৫০ সনে মধুপুরে জুম চাষ নিষিদ্ধ হওয়ার পর মধুপুরের ইদিলপুর গ্রামের মিজি মৃ নামের এক মান্দি নারীর উদ্যোগে নতুনভাবে শুরু হয় আনারস-আদা-হলুদ-পেঁপে-কচু-থাবুলচুর (শিমূল আলু) এক মিশ্র চাষ।

যার ফলশ্রুতিতে আমরা দেখতে পাই মধুপুর দেশের এক অন্যতম আনারস উৎপাদন এলাকাতে পরিণত হয়। যদিও পরবর্তীতে বাণিজ্যিক কলাচাষই হয়ে ওঠে মধুপুর অঞ্চলের নিয়তি।

পান দেশের এক গুরুত্বপূর্ণ কৃষিফসল। বাংলা পান বাদেও আদিবাসী খাসি সমাজ খাসি-পান নামের এক লতানো গাছপানের আবাদ করেন।

মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, সিলেট অঞ্চলের আদিবাসী খাসিরা খাসি-পান, সুপারী, লেবু, গোলমরিচ উৎপাদনে বেশ পারদর্শী। খাসি জনগণ দেশেকে ঐতিহাসিকভাবেই খাসিপান সরবরাহ করে আসছেন, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আজ রপ্তানীও হচ্ছে খাসিপান ও অন্যান্য কৃষিপণ্য।

সিলেট অঞ্চল ঐতিহাসিকভাবেই সাতকড়া, জারা, আদাজামির, কাটাজামির নামের বৈচিত্র্যময় লেবুর জন্য বিখ্যাত। ঐতিহাসিকভাবে এসব লেবু মূলত: চাষ করে আসছেন সিলেটের আদিবাসী লালেং বা পাত্র সমাজ।

সিলেটের গোয়াইনঘাটের ফতেপুর ইউনিয়নের মালগাঁও গ্রামের সত্য পাত্র ও চিরতি পাত্রের পরিবার বাৎসরিক খরচ বহন করে মূলত: জারা ও জামির লেবু চাষ করে।

বাঙালি পাইকাররা আদিবাসী গ্রামে এসে এসব লেবু কিনে নিয়ে যায়, যা মূলত: রপ্তানি হয় ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। কক্সবাজার ও পটুয়াখালীর রাখাইন আদিবাসীরা সামুদ্রিক শুঁটকী ও নাপ্পি নামের একধরণের প্রক্রিয়াজাত শুঁটকি উৎপাদন করেন।

লবন উৎপাদনেও জড়িত আছেন রাখাইন ও কিছু তঞ্চংগ্যা পরিবার। নাপ্পি ও সামুদ্রিক শুঁটকি জোগান দিয়ে চলেছেন উপকূলীয় অঞ্চলের আদিবাসী জনগণ, যার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ দেশের বাইরে মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী রাজ্যে রপ্তানীও হয়।

পাবর্ত্য চট্টগ্রাম, শেরপুর-জামালপুর ও নেত্রকোণার সীমান্তবর্তী অঞ্চল, উত্তরাঞ্চল, শ্রীমঙ্গলের ত্রিপুরাগ্রামসমূহ, হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা অভয়ারণ্য এবং সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে বসবাসকারী মান্দি, ত্রিপুরা, কোচ ও হাজং আদিবাসীরা এখনো বৈচিত্র্যমূ সুগন্ধী জুমধান আবাদ করেন।

স্থানীয় প্রয়োজন মিটিয়ে যা দেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে মজবুত করতে অসামান্য ভূমিকা রাখছে।

মারফা, মাশরুম, বনআলু, কুড়িয়ে পাওয়া নানান জাতের পাহাড়ি শাক, থৈকর, জুমকুমড়া, খাসিপান, নাপ্পি, বাঁশের তৈজস, আদিবাসী তাঁত সামগ্রি, আদিবাসী কুটিরশিল্প, ঐতিহ্যগত পানীয়, মধু, ভেষজ সামগ্রি আজ আদিবাসী সমাজ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের মূলধারার জীবনেও জড়িয়ে পড়েছে।

রাষ্ট্রীয় কোষাগারে গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব জমাদানসহ গড়ে তুলছে এক অনন্য অর্থনৈতিকধারা। কেবলমাত্র জুম ও কৃষিনির্ভর উৎপাদন অর্থনীতিই নয়, আদিবাসী জনগণের সংগৃহীত ও কুড়িয়ে পাওয়া সামগ্রিও আজ দেশের খাদ্য-চিকিৎসা ও উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

দেশের কাঠ ও বাঁশের মোট চাহিদার এক বিরাট অংশ সরবরাহ করা হয় আদিবাসী অঞ্চল থেকে। আদিবাসী অঞ্চলই জোগান দিয়ে চলেছে প্রকৃতিবান্ধব জ্বালানি।

একক আয়তনে দুনিয়ার সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ অরণ্য সুন্দরবন থেকে মৌয়াল ও বাওয়ালিদের পাশাপাশি সুন্দরবন অঞ্চলের মুন্ডা ও মাহাতোরাও মধু-মোম-গোলপাতা-গরান সংগ্রহ করেন।

সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট থেকেই এখনো পর্যন্ত সবচে’ বেশি প্রাকৃতিক মধু আহরণ ও সংগ্রহ করা হয়। প্রাকৃতিক বন থেকে বনআলু সংগ্রহ প্রায় আদিবাসী অঞ্চলেরই এক গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক নজির।

বান্দরবানের পাহাড়ি ছড়ার পাথর থেকে ক্র্যকঅ নামের এক বুনো শ্যাওলা সংগৃহীত হয়, যা স্থানীয় আদিবাসীদের চাহিদা মিটিয়ে মশলা হিসেবে মিয়ানমার ও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলেও বিক্রি করা হয়।

একসময় শিশুখাদ্য হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত বার্লির মূল জোগান আসতো মধুপুর-ভাওয়াল ও উত্তরাঞ্চলের শালবন থেকে। স্থানীয় আদিবাসীরাই শটি গাছ থেকে বার্লি উৎপাদন করতেন। কিন্তু করপোরেট বাজারের সর্বগ্রাসী পণ্যসর্বস্বতার চাপে এ রীতিটি এখন প্রায় উধাও।

তাছাড়া অন্যায়ভাবে প্রাকৃতিক বনভূমি দখলও এরকম বননির্ভর অর্থনৈতিক চর্চা রুদ্ধ হওয়ার জন্য দায়ী। কুইচ্যা প্রায় আদিবাসী সমাজেরই এক অন্যতম প্রিয় খাদ্য।

আদিবাসীরাই দেশের নানাপ্রান্ত থেকে কুইচ্যা শিকার করেন। কেবলমাত্র আদিবাসী খাদ্য চাহিদা মেটানোই নয়, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাণিজ্যিক চিংড়ি ও কাঁকড়া ঘেরেও আজ কুইচ্যা ব্যবহৃত হচ্ছে ব্যাপ্‌কভাবে।

পাশপাশি দেশ থেকে কুইচ্যা রপ্তানিও হচ্ছে বিদেশে। আদিবাসী সমাজে শূকর পালনের পাশাপাশি অনেক আদিবাসী সমাজে বিশেষ জাতের মুরগী, হাঁস, কবুতর, গয়াল, কুকুর লালনপালন করতে দেখা যায়।

দেশের প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন ও বিকাশে আদিবাসী সমাজের শূকর পালন নীরবে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে।

আদিবাসী সমাজের মাধ্যমে মাশরুম, বনজ ফল ও সব্জি, খরগোশ, কোয়েল চাষ আজ আদিবাসী সমাজের গন্ডি পেরিয়ে দেশের বেকার যুবসমাজের কর্মসংস্থানের নতুন দরজা খুলে দিয়েছে।

প্রায় আদিবাসী সমাজই প্রাকৃতিক ভেষজ চর্চার ধারাকে টিকিয়ে রেখেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোণা ও উত্তরাঞ্চলের অনেক আদিবাসী বৈদ্য ও কবিরাজগণ আজ নিজ জাতির পাশাপাশি বাঙালিসহ অপরাপর সকল জাতির চিকিৎসাসেবা দিয়ে চলেছেন।

আদিবাসী চিকিৎসায় ব্যবহৃত ভেষজের মূল জোগানটা আসে স্থানীয় বনভূমি ও পাহাড় থেকে। যা করপোরেট উন্নয়নের মাতবরিতে আজ ক্রমেই বিলীন হতে চলেছে।

কুইচ্যার পাশাপাশি কোনো কোনো আদিবাসী অঞ্চলে কাঁকড়া, শামুক, কচ্ছপ, ব্যাঙও অর্থনৈতিক গতিকে চাঙ্গা রেখেছে। সাঁওতাল, বাগদী, মুসোহর, কোল, কড়া, মুন্ডা আদিবাসীরা ধানজমিন থেকে ইঁদুর শিকার করে যেমন ফসল রক্ষা করছেন, আবার চাঙ্গা করছেন রাষ্ট্রীয় খাদ্য-অর্থনীতি।

মৌলভীবাজার, সিলেট, রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, পটুয়াখালী অঞ্চলের আদিবাসীরা নিজেদের কুটিরশিল্পজাত সামগ্রি উৎপাদনের ভেতর দিয়ে দেশের পর্যটন খাতে এনেছেন যুগান্তকারী সাফল্য।

কারণ প্রতিটি পর্যটন অঞ্চলেই আদিবাসী হস্তশিল্প এক গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয়। পাশাপাশি আদিবাসী জনগণ দেশকে উপহার দিয়েছেন অবিস্মরণীয় তাঁতশিল্প।

মণিপুরী তাঁত, পার্বত্য চট্টগ্রামের তাঁত, মান্দি তাঁত ও হাজং বানা তাঁতে বোনা কাপড় দেশের বস্ত্রখাত উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বিকাশে জোরদাড় ভূমিকা রেখে চলেছে।

এখনো গ্রামের হাট-বাজারে শুঁটকি-মাছ-লবন-গুড় বিক্রির জন্য শটি-পদ্মপাতা-আজুগি-শাল পাতা ব্যবহৃত হয়। স্থানীয় এলাকা থেকে যার জোগান মূলত: আসে আদিবাসী নারীদের মাধ্যমেই।

৩.

এখন প্রশ্নটা হচ্ছে আদিবাসী জনগণের এ ঐতিহাসিকজীবনধারা এবং অর্থনৈতিকখাতকে আমরা কোন দার্শনিকতার প্রশ্নে হিসাব করবো? জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত আলোচনা-উদ্যোগ প্রক্রিয়ায় ‘কম কার্বন ভিত্তিক অর্থনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ।

এখানে এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা বলা হয় যেখানে সবচে কম গ্রীণ হাউজ গ্যাসের নির্গমন ঘটে। বিশেষজ্ঞরা সকল গ্রীণ হাউজ গ্যাসের ভেতর কার্বন-ডাই-অক্সাইড এর নির্গমনকেই বেশী চিহ্নিত করছেন জলবায়ু পরিবর্তনের কারন হিসেবে।

কারন যত বেশী কার্বন-ডাই অক্সাইড নির্গত হয় ততবেশী পৃথিবীর আবহাওয়াচক্র এবং জলবায়ুতে পরিবর্তন ঘটে। পৃথিবী মুহূর্তে মুহূর্তে উষ্ণ হয়ে উঠে।

শিল্পকারখানা, ভোগবিলাসি জীবন, যানবাহন, ইলেকট্রনিক এবং ডিজিটাল পণ্যের ব্যবহার, রাসায়নিকের ব্যবহার এই কার্বন নির্গমন এবং উষ্ণায়নকে অনেক বেশী বাড়িয়ে দেয়।

পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি অনেক কম কার্বন নির্গমন করে। পৃথিবীর প্রায় ৪৫ ভাগ ভূমি কৃষির আওতাধীন এবং এখান থেকে মাত্র ১৩.৫ শতাংশ গ্রীণ হাউজ গ্যাসের নির্গমন ঘটে।

পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যারা কৃষিকাজ করে, মাছ ধরে, কুটিরশিল্প করে, বনজদ্রব্য আহরণ করে, কবিরাজী করে, পশুপালন করে, গান বাদ্য করে, শিকার করে, সংগ্রহ করে জীবন নির্বাহ করেন এরাই ঐতিহাসিকভাবে গড়ে তুলেছেন কম কার্বনভিত্তিক অর্থনীতির মজবুত পাটাতন।

ধারণা করা হয় যে, বিশ্বের ৫টি উপমহাদেশের ৭০টিরও বেশী দেশে কমপক্ষে ৫০০০ আদিবাসী জাতির ৩০০ মিলিয়ন লোক বাস করে যাদের জীবন পদ্ধতি, ভাষা, জীবিকা, ধর্ম এবং সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন।

আর এই আদিবাসী জনগণ তাদের নিত্যদিনের জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে কেবলমাত্র কমকার্বনভিত্তিক অর্থনীতি নয় গড়ে তুলেছিলেন এক কার্বন-নিরপেক্ষ স্বর্নিভর অর্থনীতি।

পাহাড় জংগলে খাদ্য-ঔষধি-জ্বালানি কুড়িয়ে, জুম আবাদ করে, মধু-মোম সংগ্রহ করে, পশু পালন করে, শিকার ধরে, স্থানীয় বনজ দ্রব্য আহরণ করার ভেতর দিয়েই এককালে গড়ে উঠেছিল আদিবাসীদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার।

কিন্তু দিনে দিনে কর্পোরেট বাণিজ্যের প্রশ্নহীন বিস্তৃতি, তথাকথিত মুক্তবাজারের প্রবেশ এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলা আদিবাসীদের কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক অধিকারকে ছিন্নভিন্ন করেছে। কার্বন-নিরপেক্ষ আদিবাসীদের জীবনকেও কর্পোরেট বাজারের পণ্যদাস বানাতে বাধ্য করেছে।

স্থানীয় সম্পদ এবং নিজস্ব উৎপাদন সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল যে বৈচিত্র্যময় আদিবাসী সামাজিক জীবন সেই স্বর্নির্ভরতা আজ কর্পোরেট বাণিজ্যিক বিশ্বায়নের ফলে ভেঙ্গেচুরে গেছে।

আদিবাসীদের নিজস্ব ঐতিহ্যগত খাদ্য-পানীয়-পরিধান সংস্কৃতিকে কোনো বিবেচনা না করে কোকাকোলা-পেপসি-ম্যাকডোনালস-সিনজেন্টা-মনসান্টো-ফাইজার-এডিডাস-নাইকি কোম্পানির বাজার জোর করে গিয়ে ঢুকেছে আদিবাসী গ্রামে গ্রামে পাহাড়ে জংগলে।

উন্নয়নের নামে আদিবাসী বসত দখল এবং আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে ইকোপার্ক-জাতীয় উদ্যান-অবকাশ কেন্দ্রর নামে কর্পোরেট কোম্পানিরা বানিজ্যিক পর্যটনকে চাঙ্গা করছে প্রশ্নহীনভাবে।

আদিবাসী জীবনের কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে এভাবেই দিনে দিনে গলাটিপে হত্যা করা হচ্ছে আবার জলবায়ু পরিবর্তিত দুনিয়ায় সাফাই গাওয়া হচ্ছে কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতির।

কিন্তু এখানেই কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতির মৃত্যুদন্ড থামিয়ে রাখেনি বানিজ্যিক বিশ্বায়ন, গবেষণার নামে আদিবাসী এলাকায় জোরপূর্বক প্রবেশ করে সমানে আদিবাসী এলাকার প্রাণসম্পদ এবং আদিবাসীদের লোকায়ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লুটপাট করা হয়েছে।

আদিবাসী এলাকায় প্রাণডাকাতি এবং জ্ঞানডাকাতি সমানে এখনও প্রশ্নহীন কায়দায় অব্যাহত আছে। অথচ আদিবাসী এলাকার স্থানীয় প্রাণসম্পদ এবং আদিবাসীদের নিজস্ব জ্ঞানপ্রক্রিয়ার ভেতর দিয়েই গড়ে উঠেছে আদিবাসীদের নিজস্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার।

যে প্রক্রিয়া কম কার্বনভিত্তিক এবং কার্বন-নিরপেক্ষ জীবনের কথা বলে। যা জলবায়ু পরিবর্তিত এই বিপদাপন্ন দুনিয়ার প্রাণ ও প্রকৃতির ধারাবাহিকতা টিকিয়ে রাখবার জন্য একমাত্র অবলম্বন।

বাংলাদেশের আদিবাসী জনগণের অর্থনৈতিক উৎপাদনধারা মূলত: কার্বন-নিরপেক্ষ দার্শনিকতাকেই প্রমাণ করে চলেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সমপ্রতি মাত্রাতিরিক্তি কার্বন নির্গমনকেই কেন্দ্রীয় মনোযোগে রাখা হয়েছে।

১৮০০ সন থেকেই শিল্পকারখানা ভিত্তিক উন্নয়ন কর্মকান্ড পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাসের নির্গমন বাড়িয়ে তুলেছে যা বিদ্যমান বাস’সংস্থান এবং পৃথিবীর সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার জন্য একটি সমস্যা তৈরী করছে।

পৃথিবী গ্রহের চারধারে ওজোন গ্যাসের একটি চাদর আছে, এই চাদর মানুষের মাত্রাহীন কার্বন ব্যবহারে দিন দিন ফুটো হয়ে যাচ্ছে।

দক্ষিণের গরীবদেশের আদিবাসীসহ কৃষিনির্ভর জনগণ সবচে কম কার্বন ভিত্তিক খাদ্যতালিকা মেনে চলে এবং তাদের খাদ্যাভাস বা খাদ্যসংস্কৃতি সবসময়ই বায়ুমন্ডলকে কার্বন-নিরপেক্ষ রাখে।

কিন’ কর্পোরেট বাণিজ্য মূলত: শহরের মানুষদের ভেতর যে কর্পোরেট বিলাসিতা তৈরী করেছে সেখানে খাদ্যাভাসের ভেতর দিয়ে ব্যাপক কার্বন বায়ুমন্ডলে নির্গত হয়।

Bon Appetit Management Company ২০০৭ সালে দেখিয়েছেন, আমেরিকার জনগণের খাদ্যাভাস এবং খাদ্যতালিকা বায়ুমন্ডলে উচ্চমাত্রায় কার্বন নির্গমন করে এবং এর পরিমান আমেরিকার গ্রীণ হাউজ গ্যাস নির্গমনের প্রায় ২০ ভাগ।

জলবায়ু বিপন্ন এই সময়ে বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগণকে বারবার আরো বিপন্নতার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।

জলবায়ু বিপর্যয়ের জন্য কোনোভাবেই যুক্ত না থেকেও দেশের আদিবাসী নিম্নবর্গকে আজ সামাল দিতে হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ু বিপর্যয়ের এই অসহনীয়তা।

অথচ আদিবাসী জনগণ শত সহস্র করপোরেট চোখরাঙানি আর অন্যায় বলপ্রয়োগের ভেতরেও এখনও পর্যন্ত বাঁচিয়ে রেখেছেন এক সবুজ সহনীয় ন্যায্যতার অর্থনৈতিক সংগ্রাম।

৪.

বিশ্বব্যাপী খাদ্য সংকট, সহিংসতা এবং জলবায়ুর পরিবর্তন সবকিছু মিলিয়ে পৃথিবী এমন এক জায়গায় দাঁড়াচ্ছে যেখানে বাংলাদেশের মত একটি গরীব দেশের প্রান্তিক জনগণের জীবনের কোনো ধরনের সুরক্ষা বা নিশ্চয়তা থাকছে না।

২০০৮ সালের ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবসের মূল প্রতিপাদ্য ছিল কম কার্বন ভিত্তিক অর্থনীতি। ২০০৮ সালের ৯ আগস্ট আন্তজার্তিক আদিবাসী দিবসের কেন্দ্রীয় প্রতিপাদ্যও তৈরী করা হয়েছে ‘আদিবাসীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকারকে’ ঘিরে।

আদিবাসী নারীরাই মূলত: স্থানীয় সম্পদ এবং লোকায়ত জ্ঞান অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে কম কার্বন ভিত্তিক এবং কার্বন-নিরপেক্ষ সামাজিক জীবন এবং অর্থনীতির চাকা ঘুরানোর লড়াই করে চলেন প্রতিনিয়ত।

পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা, অধিপতি রাষ্ট্র , ঔপনিবেশিক কর্পোরট বাণিজ্য এবং বহুজাতিক বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া আদিবাসী জনগণের সেই স্থায়িত্বশীল অর্থনীতি ও সামাজিক অধিকারকে বিপন্ন করে বারবার।

ভোগবাদী এবং কর্তৃত্বপরায়ণ দুনিয়ার বিরুদ্ধে দক্ষিণের এক গরীব দেশ হিসেবে বাংলাদেশকেও নিজের মেরুদন্ড নিয়ে আজ টিকে থাকবার লড়াইয়ে মনোযোগী হতে হবে প্রান্তিক জনগণের দিনযাপন এবং নিজস্ব লড়াইয়ের প্রতি।

কারন এখানেই বিরাজিত আছে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে আপন মর্যাদা নিয়ে বাঁচবার মূলমন্ত্র ও সম্ভাবনার বীজ। যা দেশের সকল জনগণের সমমর্যাদা এবং সামাজিক জীবনের ঐক্যকে দৃঢ়করণের ভেতর দিয়ে নিশ্চিত করবে সকলের অর্থনৈতিক ন্যায্য অধিকার।

আদিবাসী জনগণ ঐতিহাসিকভাবেই মারদাঙ্গা ভোগবিলাসী একতরফা অন্যায় অর্থনৈতিক বলপ্রয়োগের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন। নেত্রকোণার কলমাকান্দা-দূর্গাপুর সীমান্তে হাতিবাণিজ্যের বিরুদ্ধে হাজং-মান্দি ও বানাই আদিবাসীরা সংগঠিত করেছেন হাতিখেদাবিরোধী বিদ্রোহ।

পাহাড় কেটে চুনাপাথর খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে খাসি জনগণ লড়েছেন বিট্রিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে। এশিয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ বহুপাক্ষিক ব্যাংকের প্রাকৃতিক বন কেটে রাবার বাগান ও আগ্রাসি প্রজাতির বানিজ্যের বিরুদ্ধে অরণ্য ও পাহাড় রক্ষায় আদিবাসীরা সংগঠিত করেছেন দুর্বার আন্দোলন।

একতরফা হাওর ইজারার বিরুদ্ধে ভাসান পানির সংগ্রামে হাজংরাও অংশ নিয়েছেন। অপরিকল্পিত পাথর-বাণিজ্যের বিরুদ্ধে খাসি ও মান্দি জনগণ এখনও সোচ্চার।

এশিয়া এনার্জীর কবল থেকে ফুলবাড়ি কয়লাখনি রক্ষায় আদিবাসী জনগণ বাঙালিদের সমন্বয়ে সংগঠিত রেখেছেন এক জোরালো অঙ্গিকার।

আজ আদিবাসী জনগণের এই কার্বন-নিরপেক্ষ অর্থনীতির দর্শন ও সংগ্রামকে জানা-বোঝা জরুরি। জরুরি বুক মেলে কন্ঠ খুলে হাত বাড়িয়ে এর পক্ষে দাঁড়ানো। নতুন বছরে এই হোক আমাদের দৃঢ় অঙ্গীকার।


লেখকঃ পাভেল পার্থ, গবেষক ও লেখক। ইমেইল:[email protected]

তথ্যসূত্রঃ IPNEWSBD

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here