icon

মৃত্যুর ফাঁদ, কাপ্তাই বাঁধ – করুণাময় চাকমা

Jumjournal

Last updated Dec 10th, 2020 icon 228

করুণাময় চাকমা
করুণাময় চাকমা

পানির নিচের সেই ঝগড়াবিল আদাম

আমার নাম করুণাময় চাকমা। বর্তমান নিবাস রূপকারী, মারিশ্যাতে হলেও রাঙামাটির যে পর্যটন মােটেলটি আছে তার ঠিক পূর্ব দক্ষিণ বরাবর কাপ্তাই লেকের যে পানি দেখা যায় ঠিক সেইখানে পানির তলে ডুবে আছে আমাদের আসল ঝগড়াবিল আদাম। আজো চোখ বন্ধ করলে আমি যে গ্রামে ফিরে যাই, সে গ্রাম আমার পানিতে ডুবে যাওয়া গ্রাম ‘ঝগড়াবিল’ আদাম।

কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের পূর্বের আমাদের আদি আবাস, ১০৪ নম্বর ঝগড়াবিল মৌজা, রাঙামাটি। রাঙামাটি শহর থেকে মাত্র ৫ মাইল দক্ষিণে আমাদের এই গ্রাম। বর্তমানের তবলছড়ি বাজারও তখন ছিল আমাদের এই ঝগড়াবিল মৌজার অন্তর্ভুক্ত। ঝগড়াবিল নামকরণের একটা কাহিনী আছে।

আমাদের এই জায়গায় একটি বিশাল বিল ছিল। আর বিশাল বিল ভর্তি ছিল মাছ । বিলের আশপাশের গ্রামের লােকজন মাছ ধরতে এসে শুধুই নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করত। এই থেকেই ৯ বিলের নাম হয়ে গেল ঝগড়াবিল’।

তবে বালুখালি মৌজার অধীনে ঝগড়া বিলের পরে আরেকটা বিল ছিল ‘পদ্মবিল’। এই পদ্মবিল ঝগড়াবিলের চেয়ে অনেক বড়। দুই বিলের মধ্যবর্তী উর্বর জায়গায় ধীরে ধীরে মানুষের বসতি গড়ে উঠে এবং অনেক গ্রামের পত্তন ঘটে।

তার মধ্যে বালুখালি আদাম, হােনা তুলি আদাম অন্যতম। আর পদ্মবিলের আশপাশেও আমাদের মানে আমার বাবার অনেক জায়গাজমি ছিল। আমাদের ঝগড়াবিলের গ্রামে শুধু ‘ধামেই গােজার’ চাকমা ছিল না, অন্য ‘গােজারও’ বসতি ছিল। ছিল মগ তঞ্চঙ্গ্যার আবাস। আর ১০০ ঘরের বেশি বাঙালির আবাস ছিল এই গ্রামে।

তারা সকলেই ছিল মসুলমান। বাঙালি মুসলমানরা ছিল জমিদার কামিনী দেওয়ান-এর প্রজা। কামিনী বাবু এদেরকে নিজেদের জমিদারী কাজের জন্য চট্টগ্রামের শরৎবাধা কাউকালী শিলকছড়ি থেকে এনেছিলেন।

কামিনী বাবু তাদেরকে দিয়ে জায়গাজমি ভেঙে জমিদারী পত্তন করেন এবং কিছু জায়গা বাঙালি মুসলমানদের দিয়ে দেন, তবে তিনি বছর শেষে এসব জায়গার খাজনা এসে নিয়ে যেতেন। বাঙালি মুসলমানদের বাড়ি আর আমার বাড়ি ছিল পাশাপাশি। তা সত্ত্বেও আমাদের মাঝে সম্পর্ক নিয়ে কোনাে টেনশন ছিল না। আদর্শ গ্রাম বলতে যা বােঝায় তাই ছিল আমাদের গ্রাম।

এই গ্রামে একটা বৌদ্ধমন্দির ছিল। ঝগড়াবিল বৌদ্ধমন্দির। এখন যেভাবে গ্রামে গ্রামে বৌদ্ধমন্দির দেখা যায় তখনকার সময়ে এত বৌদ্ধমন্দির ছিল না। আমাদের এলাকায় শুধুমাত্র এই বৌদ্ধমন্দিরটি ছিল।

তখনকার মানুষ প্রকৃতিকে পূজা করত। আমার মনে আছে, যে বছর আমাদের গ্রাম ছেড়ে যেতে হয় সেই বছরই আমরা ধুমধাম করে বৌদ্ধ ধর্মের আড়াই হাজার বর্ষপূর্তি উদযাপন করেছিলাম। সেই মেলার আয়ােজন কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসাবে আমি দায়িত্বে ছিলাম।

আমাদের গ্রামের পাশের গ্রামের কমুদ বাবুর কাছে বৌদ্ধ ধাতু ছিল, সেই বৌদ্ধ ধাতু এনেছিলাম এই মেলায়। তিন দিন ধরে মেলা চলাকালে কত ধরণের খেলা চলেছিল। হাউজি খেলার বিপরীতে আমরা নিজেরা একটি যাত্রাপালা করেছিলাম। আমরা সবাই জানতাম এই গ্রামে আমাদের এটাই শেষ উৎসব, তবুও ধুমধামের আর উৎসাহের কোনাে কমতি ছিল না।

এই গ্রামে একটি ইমি স্কুল ছিল। এই স্কুলে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়ানাে হতাে। এরপরে কেউ পড়তে চাইলে তাকে রাঙামাটিতে গিয়ে পড়তে হতাে। ক্লাস ওয়ান থেকে ৪র্থ শ্রেণি পর্যন্ত হচ্ছে প্রাইমারি সেকশন, আর ৪র্থ থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত হচ্ছে সেকেন্ডারি সেকশন।

এই গ্রামের ইমি স্কুলটি আমরাই প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম। এর আগে প্রাইমারি শিক্ষার জন্য রাঙামাটি শহরে যেতে হতাে, না হয় বাড়িতে গৃহশিক্ষক রেখে পড়াতে হতাে।

কর্ণফুলির নদীর পারেই গড়ে উঠেছিল ‘ঝগড়াবিল আদাম’। উর্বরা ভূমি বলতে যা বােঝায় তাই ছিল এই গ্রামের মাটি। সারা বছর নদীর পার-জুড়ে সবজি চাষ হতাে। সর্ষে, মরিচ নানা ধরণের সবজি কিনা হতাে সেই পার-জুড়ে ।

মরিচ পাকা শুরু হলে শুধু দেখা যেতাে লালে লাল হয়ে আছে নদীর দুই পাড়। আর সর্ষের ফুলের সময়! যেদিকে চোখ যায় শুধু চিকচিক করা হলুদ আর হলুদ। আর হতাে আখ। অনেক বড় বড় আখ হতাে। সে আখের রস থেকে আখগুড় বানানাে হতাে। আখ চাষ করার সময় আখের খেতের ভেতরে আমরা হলুদ লাগাতাম।

বিশাল বিশাল হলুদ যখন মাটি খুড়ে বের করতাম চোখ মন আনন্দে ভরে যেত। মনে আছে আমার তখন হলুদের দাম ছিল মণে ৩ (তিন) টাকা। তবে কোনাে একবছর সম্ভবত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমরা আখের গুড় খুব দামে বিক্রি করেছিলাম মণ প্রতি ২৫ (পঁচিশ) টাকা করে। আর মরিচের দাম ছিল মণ প্রতি ৮০ (আশি) টাকা করে। তবে সেসময়ে এমনিতে এর থেকে কম দামে বিক্রি হতাে।

ধামেই হজা কাংখং গােষ্ঠীর গােড়া পত্তন

আমরা ‘ধামেই হজার কাংখং’ গােষ্ঠির বংশধর। বাবার কাছে শুনেছি, এই গােষ্ঠীর মীননাথ আর সিংহনাথ নামে দুই ভাই ছিলেন এবং তারা এই এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করেন। তবে তাদেরকে সকলেই ‘উত্তয্যে পাকসা’ বলত ।

কিন্তু এই দুই ভাই কোথা থেকে এসেছিলেন সেটা কারাের জানা নেই। এমনকি বাবাও জানতেন না। আমার বাবা ছিলেন জাঁদরেল পুলিশ অফিসার। নাম শুম্ভমুনি চাকমা। মায়ের নাম হেমাঙ্গিনী চাকমা।

আমরা দুই ভাই এক বোন। আমাদের আদি নিবাস রাঙ্গামাটিতে হলেও বাবার চাকরির কারণে আমার জন্ম হয় হতােনালায় খাগড়াছড়িতে। বাবা চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর আমরা আমাদের আদি গ্রামে ফিরে আসি। অবশ্য গ্রামের মানুষের সাথে আমাদের সম্পর্ক সবসময় ছিল।

আমার জন্ম ১৯২৮ সালে। তবে কোন মাসে তা জানি না। সে হিসাবে আমার বয়স এখন ৮৬ বছর। বাবা মা আমার নাম রাখেন করুণাময় চাকমা। হতে পারে কাপ্তাই বাধের সেই প্রজন্মের মধ্যে আমিই শেষ ব্যাক্তি।

লেখাপড়া করা হয়ে উঠেনি আমার। তবে আমার বড় ভাই জ্যোতির্ময় চাকমা লেখাপড়া শিখেছেন, ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট হয়েছেন। তাই তিনি রাঙামাটি শহরেই রয়ে যান।

কিন্তু বাবা অবসর নেওয়ার পরপরই আমি বাবার সাথে গ্রামেই ফিরে এসেছিলাম। বাবা অবসর নেওয়ার পর উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বিশাল মাটির ঘরে চাকমা ভাষায় আমরা বলি গুদাম ঘর সেখানে এসে উঠেন।

এখানেই জীবন শুরু হয়। কিছু সময়ের পরে আমার মা এই গ্রামেই মারা যান। গ্রামে প্রায় সকলের যৌথ পরিবার থাকলেও আমরা একক পরিবার ছিলাম। তবে আমার এতিম জেঠাতাে ভাই গােপালকৃষ্ণ চাকমা থাকতেন। এই ভাইয়ের নিজের বলতে কেউ ছিল না। যদিও আমার বিয়ের পরপরই তিনি আলাদা হয়ে যান।

মাত্র ১৭ বছর বয়সে আমি বিয়ে করি। চাকরি থেকে অবসর নেওয়া পরেও বাবার দুটো লাইসেন্স করা বন্দুক ছিল। অবশ্য তখন প্রায় পাহাড়িদের প্রত্যেকের ঘরে ঘরে বন্দুক থাকত। নিজেদের প্রয়ােজনে, শিকারের প্রয়ােজনে সবাই বন্দুক রাখতেন ঘরে। এইসব বন্দুক দিয়ে কাউকে মারা তখন ভাবাই যেতাে না।

আর রাঙামাটি শহর খুব কাছে হওয়াতে আমাদের অন্য কোনাে অভাব অভিযােগ ছিল না বললেই চলে। খুব স্বাচ্ছন্দ্যময় আর শান্তির জীবন বলতে যা বােঝায় তাই ছিল আমাদের সেই পুরােনাে জীবন। যে জীবন কাপ্তাই বাঁধের পানিতে ডুবে গেছে চিরতরে।

মৃত্যুর ফাঁদ, কাপ্তাই বাঁধ

কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শুরু হয় সম্ভবত ১৯৫০ সালের পর থেকে। তাহলে ধরে নিতে হবে এই বাঁধের পরিকল্পনা অনেক বছর আগে নেয়া হয়েছিল। কিন্তু আমরা জানতেও পারিনি এমন এক মৃত্যুর ফাঁদ আমাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছিল।

এখনাে মাঝে মাঝে যে প্রশ্নটি বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে সেটা হচ্ছে আমাদের চাকমা রাজা কি জানতেন না যে কর্ণফুলির নদীর উপর যে বাঁধটি তৈরি হচ্ছে সেটি আমাদের জন্য মরণ ফাঁদ হবে?

তার প্রাসাদ ডুবে যাবে চিরকালের মতাে? যদি জানতেন তাহলে প্রতিবাদ করেননি কেন? তাহলে কি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল? যা হােক- কোনাে একদিন গ্রামে এসে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের কর্মচারিরা এসে জানালেন যে কর্ণফুলির নদীর উপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য একটি বাঁধ তৈরি হবে। এতে আমাদের গ্রামসহ হাজার গ্রম চিরতরে পানিতে তলিয়ে যাবে।

আর আমাদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রামের কোনাে নিরাপদ জায়গায় চলে যেতে হবে। ক্ষতিপূরণসহ আমাদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার সব ব্যবস্থা করে দেবে। সরকারের পক্ষ থেকে এলাকার ম্যাপ এনে আমাদের দেখানাে হলাে। সরকার আমাদেরকে কোথায় কোথায় ব্যবস্থা নিয়েছে। এমনকি সেসব ম্যাপে দাগ ক্ষতিয়ান নম্বরসহ মার্ক করা ছিল।

যে যেখানে যেতে চাই সেখানে যেতে পারবে। আর যার যত জমি সম্পত্তি আছে সেসব হিসাব করে সবাইকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। তখন আমাদের জনপ্রতিনিধিরা যেমন হেডম্যান বা জমিদার বা রাজা কেউ এসে আমাদের সাথে লোকজনের সাথে বাঁধের বিষয়ে কখনাে আলােচনা করেননি।

সরকারের প্রতিনিধিরা আমাদের সবাইকে একটি করে ফরম দেন, পরে সেগুলাে পূরণ করে তাদেরকে ফেরত দিতে হয়েছিল। আমাদের কাছে সংগ্রহে রাখার মতাে কোন ফরম বা ডকুমেন্টস তারা আমাদের দেয়নি। আজ এতাে বছর পরে মনে হয় সেসব সরকার পরিকল্পনা মাফিকই করেছিল।

কোনাে ঘটনা ঘটলে এখন যেভাবে প্রতিবাদ হয় সেসময়ে আমরা এই ধরণের কোনাে প্রতিবাদ করতে পারিনি। আমাদের নেতারাও করেননি। মনে আছে, যাদেরকে আমরা আমাদের নেতা ভাবতাম যেমন ঘনশ্যাম বাবু, তারা সকলেই দেশভাগের সময় ভারতে চলে গিয়েছিলেন।

তাই এই বাঁধের ফলে আমাদের সবকিছু ডুবে যাবে, আমাদের গ্রাম ছেড়ে দূর কোনাে জায়গায় গিয়ে বসতি গড়তে হবে, সেসব জানার পরও শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আমাদের কিছু করার ছিল না।

হয়তাে এটি আমাদের নিয়তি ভেবে নীরবে মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু অনেকে ফর্ম পূরণ করেনি এই বিশ্বাস থেকে যে, একটি নদীর পানি কখনাে বাঁধ দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না, পানি তাে প্রবাহমান আর যদি যায়ও এই নদীর পানি দিয়ে আমাদের গ্রাম ডুবে যেতে পারে না।

তবে আমার বাবা বিশ্বাস করেছিলেন তাই ফরম পূরণ করেছিলেন একেবারে প্রথমেই। ফরমে ১ম চয়েস হিসাবে কাজলং রিজাভ ফরেস্ট আর ২য় চয়েস খাগড়াছড়ি এলাকার নাম ছিল। ফরম হাতে পাওয়ার পর বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন আমরা কোথায় যাবাে! আমি বাবার কাছ থেকে একদিন সময় নিয়ে চলে গিয়েছিলাম গ্রামের অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের কাছে জানতে যে কে কোথায় যাবে বলে ঠিক করেছে।

কেউ কেউ ‘চেঙেই কূল’, আর কেউ ‘কাজলং ফরেস্ট’ চলে যাবে বলে ঠিক করেছে। আমি সবার সাথে আলােচনা করে ঠিক করেছিলাম আমরা কাজলং ফরেস্ট এলাকায় যাব। এই সিদ্বান্ত নেওয়ার কারণ হচ্ছে এই এলাকা সম্পূর্ণ রির্জাভ ফরেস্ট এলাকা।

নিজেরা নিজেদের প্রয়ােজন মতাে জঙ্গল কেটে জমি গড়ে নিতে পারব। আর খাগড়াছড়ি যেহেতু জনবসতি এলাকা সেখানে গেলে হয়তাে আমরা ঠিকমতাে প্রয়ােজনমতাে জায়গা না ও পেতে পারি এবং হয়তাে-বা সেখানকার কারাের জমি দখল করে বসতি গড়তে হবে। সেটা ভালাে হবে না।

কাপ্তাই বাঁধ আমাদের ঝগড়াবিল এলাকা থেকে মাত্র ২০/২২ মাইল দূরে হতে পারে। ১৯৫৯ সালে বা তার কাছাকাছি জায়গাজমি ভিটেমাটি ছেড়ে নির্ধারিত ফরেস্ট এলাকা মারিশ্যায় রূপকারীতে চলে আসি। এই এলাকার রিজার্ভ ফরেস্টের গহীন জঙ্গলে আমরা বসতি স্থাপন করি।

এখানেই এই সময়ে আমরা ৩৭৬নং ৩ টিলা মৌজা সৃষ্টি করি। গহীন বলতে গহীন, যেখানে সূর্যের আলাে সারাদিনই মাটিতে পড়ে না। এমনই গহীন এলাকায় আমাদের নতুন জীবন শুরু করেছিলাম আমরা।

ঝলমল আলাের জন্য জীবন

কাপ্তাই বাঁধ হবে আর সেই বাঁধ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, আর বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে আমাদের চাকমাদের ঘরে ঘরে আলাে জ্বলবে, সেই আলাের জন্য আমাদের কোনাে টাকা খরচ করতে হবে না, সেই সঙ্গে ক্ষতিপূরণও দেয়া হবে, এই ছিল আমাদের মতাে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষের প্রতি পাকিস্তান সরকারের বার্তা । হ্যা, কাপ্তাই বাঁধের ফলে ডুবে যাওয়া জায়গা-জমির জন্য আমরা ক্ষতিপূরণ পেয়েছি। কিন্তু সেগুলাে ছিল সরকার নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ।

কিন্তু এই ক্ষতিপূরণ দিয়ে কি ডুবে যাওয়া জমি ঘরবাড়ি, চিরতরে হারিয়ে ফেলা হাজারাে স্মৃতিময় জায়গা ফিরে পাবাে? ফিরে পাবাে আমাদের পূর্বপুরুষদের পবিত্র শ্মশানভূমি! (দীর্ঘশ্বাস)।

তবে এও তাে সত্যি এই ক্ষতিপূরণ না দিলে আমরা কি কিছু করতে পারতাম? পারতাম না। আমার মনে পড়ে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করা হয়েছিল খুব অদ্ভুত নিয়মে। মােট জমিকে তিন ভাগে ভাগ করে অর্থাৎ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে একর প্রতি জমির ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হয়েছিল।

যেমন : ১ম শ্রেণির জমির ক্ষতিপূরণের দাম হচ্ছে ৯০০ টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির জমির দাম ৬০০ টাকা আর তৃতীয় শ্রেণির দাম ৩০০ টাকা। ঘর ভিটা প্রথম শ্রেণি ভুক্ত হওয়ায় তার দাম ছিল ৯০০ টাকা। কিন্তু হলে কী হবে, ৪ থেকে ৫টা গ্রামের মানুষ বাদে বাকিরা যারা সবকিছু হারানাের দলের মানুষ, তারা কেউ এই ৯০০ টাকার ক্ষতিপূরণ পাইনি। আমার যতটুকু মনে আছে চাকমা রাজাও ৯০০ টাকার ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন। আপাতদৃষ্টিতে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ অনেক মনে হলেও উদ্বাস্তু হওয়ার তুলনায় কিছুই না।

অন্যদিকে ক্ষতিপূরণ হিসাবে পুনর্বাসনের জন্য যে জমি বন্দোবস্ত দেয়া হয়েছিল, সে হিসাবটাও বড়ই মর্মান্তিক আর গােলমেলে। জনপ্রতি হিসাব করে পরিবারের জন্য জমির বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। প্রতি ১ জনে ১ একর। তবে প্রত্যেক পরিবার মাত্র সর্বোচ্চ ১০ (দশ) একর করে জমি পাবে।

তাও সেসব পরিবার ১০ (দশ) একর জমি পাবে যদি তাদের পরিবারে ১০ (দশ) জন সদস্য থাকেন এবং পুরােনাে জায়গায় ১০ একরের বেশি জমি থাকতে হবে। আর সে ১০ (দশ) জন সদস্যের মধ্যে মায়ের কোলে শিশুও গােনার মধ্যে পড়েছিল। যেসব পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১০ (দশ) জন নয় কিন্তু পুরােনাে জায়গায় তাদের ২০ একরও বেশি জমি আছে সে পরিবার নতুন জায়গায় ১০ (দশ) একর জমি বরাদ্দ পাবে না।

শুধ তাই নয়, যে পরিবারের সদস্য সংখ্যা ১০ জনেরও বেশি তাদের জন্য জমি নির্ধারিত হয় ঐ ১০ একরেই। পুরােনাে জায়গায় তাদের হাজার একর জমি থাকলেও বেশি পাবে না। এই অদ্ভুত এবং মর্মান্তিক নিয়মের ফলে আমার চেনা পরিচিত অনেক অনেক পরিবার ধুম করে সহায় সম্পত্তিহীন সম্বলহীন এক অসহায় পরাজিত ব্যাক্তিতে পরিণত হয়ে গেল।

কারণ প্রত্যেকের জনপ্রতি এক একর জমি দেড় ছিল মাত্র। অসহায় থেকে আরাে অসহায় হয়ে পড়ে তারা। এতসব অনিয়মের পরেও আমাদের করার কিছুই ছিল না। সমৃদ্ধশালী পুরাতনকে পানিতে ডুবিয়ে দিয়ে দীর্ঘশ্বাস আর কান্নাকে সাথী করে আমরা নতুন জায়গায় চলে এলাম।

সঙ্গে অবশ্য এই আশা নিয়ে এলাম যে একদিন আলাে ঝলমল হয়ে উঠবে আমাদের এলাকা হয়তাে সেটা হবে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে। এইভাবেই তাে সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের বােঝানাে হয়েছিল।

পানির নিচে গ্রাম

বাঁধ বাঁধা শুরু হবার পরপরই আমাদেরকে জানানাে হয়েছিল যে কিছুদিনের মধ্যে গ্রাম ছেড়ে নতুন জায়গায় যেতে হবে। আলােচনা, ফরম পূরণ করা, নতুন জায়গা দেখে আসা গাছ কাটিং অন্য সবকিছু মিলিয়ে সময় কখন ফুরিয়ে যাচ্ছিল সেটা প্রথমেই বুঝতে পারিনি।

একদিন সত্যি সত্যি গ্রাম ছাড়ার সময় যখন এলাে তখন শুরু হল আসল যন্ত্রণা। গ্রামে গ্রামে ঘরে ঘরে কান্নার রােল পড়ে গেল, হাহাকার, বিশ্বাস অবিশ্বাস, দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তা। এখন এসব অনুভূতি বলে বুঝানাে যাবে না, যায় না। শুধু কি মানুষের কান্না? গৃহপালিত পশু পাখির করুণ ডাকও মিশে গেল মানুষের কান্নার আর হাহাকারের সাথে।

বিড়াল মিউ মিউ করে কান্নার কথা আর কুকুরদের করুণ সুরের ডাকের কথা কী করে ভুলবাে? ওদের ডাকের সাথে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিল অমঙ্গলের চিহ্ন। দিনের পর দিন রাত গভীরে করুণ ধরে ডাকতে ডাকতে ঝাঁক ঝাঁক পাখি উড়ে যেত একদিক থেকে আরেকদিকে। চারদিকে মৃত্যুর চিহ্ন। ঐসময়ে আমাদের জীবন থেকে জীবনের চিহ্ন যেন হারিয়ে গিয়েছিল চিরতরে।

এসবের মধ্যে ১৯৫৯ খ্রিস্টাব্দে বা তার কাছাকাছি কোনাে এক সময়ে আমরা চলে আসি পুরাতন গ্রাম ছেড়ে নতুন জায়গায়। আমাদের গ্রামে পানি আসার আগে আমরা গ্রাম ছেড়ে চলে আসি।

সরকার প্রত্যেক গ্রামের একজনকে দলপতি নির্বাচিত করে দিয়েছিল। তাই আমাকে আমার গ্রামের দলপতি করা হলাে। আমি আমার পরিবারকে রাঙামাটি শহর রেখে দলবলসহ কাজলং ফরেস্ট এলাকায় চলে গিয়াছিলাম জমি জমার দখল বুঝে নিতে।

তবে গ্রামের অনেকেই গ্রাম ছেড়েছে পানি আসার পর। আর আমাদের বেশির ভাগ আত্মীয়-স্বজন চলে গিয়েছিল খাগড়াছড়ি জুমমরং এলাকায়। কিছু আত্মীয়-স্বজন চলে যায় মেইনি বাবুছড়ায়।

আমাদের গ্রামের মারমাদের একটা অংশ গেছে মাটিরাঙ্গায় আর একটা অংশ বান্দরবানে। আর আমার বাঙালি প্রতিবেশীরা ফিরে যায় তাদের পুরাতন গ্রামে ক্ষতিপূরণ নিয়ে।

আমাদের বংশের মধ্যে আমরা মাত্র চার খুড়ততাে ভাই চলে যাই কাজলংয়ে। যাই হােক, কাজলং গিয়ে জায়গা-জমি দখল নেওয়ার পরপরই আমি আবার ফিরে এসেছিলাম আমাদের গ্রামে।

ফিরে এসে দেখি গ্রামে পানি চলে এসেছে। ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছে ঝগড়াবিল গ্রাম। আমারই চোখের সামনে গ্রামের বাগান বাগিচা, বাড়িঘর সব সব পানির নিচে চলে গেল। যারা তখনও গ্রামে ছিল তারা চেষ্টা করতে লাগল পানির হাত থেকে নিজেদের কিছু জিনিস রক্ষা করতে।

গতবার গ্রাম ছেড়ে যাবার সময় আমি আমার এক প্রতিবেশী বাঙালিকে আমাদের ৩০০ গরু-ছাগলের দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলাম, আমি না ফেরা পর্যন্ত দেখাশােনা করার জন্য। কিন্তু ফেরার পরে তাকে আর গ্রামে পাইনি, এমনকি কোনাে গরুছাগলও খুজে পাইনি।

আমি আসার আগেই সব গরুছাগল নিয়ে সে গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল। আমি যখন ফিরেছি তখন আমাদের বাড়ি পানিতে ডুবে গেছে, তাই স্মৃতিচিহ্ন হিসাবে আমি আমাদের পুরাতন খাট পালং বা অন্য কোনাে ফার্নিচার রক্ষা করতে পারিনি। হাজারাে দুঃখের মধ্যে এটি আমার অন্যতম দুঃখ ।

এবার যাবার পালা

তখনাে পর্যন্ত যারা গ্রাম ছেড়ে যায়নি তারা নিজেদের জন্য নৌকা ভাড়া করে সবকিছু বাঁচানাের চেষ্টা করছে। লােকজন পারলে ঘরসুদ্ধ নৌকায় তুলে নতুন জায়গায় নিয়ে যায়। কিন্তু সেটা তাে সম্ভব নয়, তাই নৌকায় যা ধরে সেটুকু নিয়েই গ্রামের লােকজন গ্রাম ছেড়েছিল একেবারের জন্য।

পথে যাতে কোনাে বিপদ না ঘটে সেজন্য সাথে করে সরকার পুলিশ সদস্য দিয়েছিল। সরকার আমাদের মতাে এইসব শরণার্থী লােকজনের যাতায়াতের সুবিধার জন্য রাস্তার মধ্যে নদীর পাড়ে পাড়ে ছােট ছােট ঘর বা তাঁবু বেঁধে রেখে দিয়েছিল, সাথে পুলিশ সদস্য যাতে কোনাে সমস্যা না হয়। কারণ একেকটা জায়গায় পৌছাতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন দিন লাগতাে।

আর পথখরচ বাবদ ১১ টাকা করে দিয়েছে সরকার সবাইকে। অনেক নৌকা একসাথে সারি বেঁধে যাচ্ছে, এগুচ্ছে সেটা দেখার মতাে ছিল। কাঁদতে কাঁদতে সবাই গ্রাম ছেড়ে এসেছি। যথাসময়ে আমরা কাজলং-এ এসে পৌঁছলাম। আমাদের জন্য কাজলং পারে ছােট ছােট করে বাসা বাধা হয়েছে।

চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। সন্ধ্যা নামলে কাজলং পার এলাকা দেখার মতাে হয়ে যায়। যখন টিম টিম করে কুপির বাতি জলে তখন হয় ইতােমধ্যে লােকজন ক্ষতিপূরণের টাকা হাতে পেয়ে গেছে । আর এই টাকা দিয়ে কেউ রেডিও কিনছে। সেই রেডিও থেকে গান সে এক ধুমধাম অবস্থা।

এসময়ে এদের দেখলে কারাের মনেও হবে না। সর্বস্বান্ত হয়ে এখানে আসতে বাধ্য হয়েছে। কিছু কিছু সময় আসে নিজেদের দুঃখ-বেদনা মানষ কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলে থাকতে চাই। হতে পারে এই রংঢং বেদনা ভােলার অন্যরকম চেষ্টা।

সরকার ঝগড়াবিল থেকে কাজলং আসার পর ‘ঝগড়াবিলের গ্রুপের লিডার ‍হিসাবে’ নতুন মৌজার হেডম্যান পদে আমাকে নমিনেশন দিয়েছিল। কিন্তু আমি হেডম্যানশিপটা পাইনি। এই হেডম্যানশিপ নিয়ে তখনকার চাকমা রাজা অনেক কূটনীতির চাল চালিয়েছে। কাজালং এলাকার আমাদের মৌজার হেডম্যানশিপটা তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় নিজের কাছে রেখে দেয়। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে অন্য আরাে ২টা জায়গার হেডম্যানশিপ রাজা তার হাতে রেখে দেয়।

সবাই যখন এই নিয়ে প্রশ্ন তুলে তখন রাজা বলেছিল কিছুদিন পরেই এই হেডম্যানশিপগুলাে যথাযথ মানুষের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ক্ষমতা নিজের হাতে রাখার চক্রান্তের অংশ হচ্ছে এই ২/৩টা হেডম্যানের পদ নিজের কাছে রেখে দেয়া।

যা হােক, বেশ কিছুদিন পরে আমাদের মৌজার হেডম্যান পদটা দেয়া হয় উষাময় দেবানের হাতে। পরে হাট্টলী মৌজার হেডম্যান পদটাও আরেকজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর এই সকল হেডম্যান সকলেই ছিল রাজা ত্রিদিব রায়ের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। সাধারণ জনগণের কাছে যাতে ক্ষমতাগুলাে চলে না যায় সেজন্য রাজা এই কূটনীতির আশ্রয় নিয়েছিল বলে আমি মনে করি। জনগণের জন্য কাজের কাজ তাে এই রাজারা করেনি কখনাে।

বেচে থাকার কঠিন লড়াই

পুরাতন গ্রাম ঝগড়াবিল আদামকে পানির নিচে রেখে আমরা নতুন জায়গায় এসে থিতু হওয়ার চেষ্টা করতে শুরু করার পর একের পর এক কঠিন বাস্তবতায় মুখােমুখি হতে শুরু করেছিলাম। সে এক কঠিন কষ্টের নতুন জীবন। আমরা কেউ এই কঠিন জীবনে অভ্যস্ত ছিলাম না, এমনকি এই জীবনের কথা আমাদের কল্পনাতেও ছিল না।

সূর্যের আলাে দিনেও যে জায়গায় পৌছাতে পারে না এমন জায়গায় বিশাল বিশাল গাছ কেটে জঙ্গল সাফ করে বাড়ি বানানাের জন্য জায়গা সৃষ্টি করতে হয়েছিল আমাদের। কত ভয়ংকর হিংস্র প্রাণী চারাদকে ঘােরাফেরা করে। সূর্যের আলাে জঙ্গলের উপরেই থাকে।

প্রথম প্রথম সবকিছু ভয় লাগত, বেশির ভাগ মানুষ বিশেষ শিশু আর বয়স্ক মানুষেরা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। কলেরা, ম্যালেরিয়া আর পেটের অসুখ আরাে কত রােগশােকে ভুগে কত জন যে মারা গেছে তখন সে হিসাব আমরা কেউ রাখিনি। হাতে টাকা আছে কিন্তু বাজার ঘাট কই! ধীরে ধীরে অভাব অনটন ঘিরে ধরতে শুরু করেছিল।

আর রাঙামাটি শহরে কাছাকছি মানুষ হবার কারণে আমরা শহরে হওয়ায় এ অভ্যস্ত ছিলাম। সেই অভ্যস্ততাও কাটা হয়ে বিঁধছে। এখন সেসব তাে স্বপ্নের মতাে। সব মিলিয়ে সকলের জীবন্ত অবস্থা হয়ে গেল। সবাই আমরা ভেবেছিলাম আর বােধহয় আমরা বাঁচতে পারবাে না। এভাবে কিছু সময় চলে যায়। মানুষ অভ্যাসের দাস।

ধীরে ধীরে আমরাও এখানে এই নতুন জায়গায় অভ্যস্ত হতে লাগলাম। পুরাতন বাড়িঘর ডুবে যাবার পর বাবা ২ বছর রাঙামাটিতে ছিলেন। পরে বাবা এখানে চলে আসেন। আর চলে আসার ১ বছর পর বাবা এখানেই মারা যান। সালটাও মনে আছে আমার ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে বাবা এই রূপকারীতে মারা যান। বাবার বয়স তখন ৮৯ বছর। মা তাে অনেক আগে মারা গেছেন।

আমার সাথে যে জেঠাতাে ভাই এখানে এসেছিলেন, যার নাম গােপালকৃষ্ণ চাকমা। তিনি একদিন এসে আমাকে বললেন চিক্ক, আমি আর এখানে থাকতে পারছি না। এই জায়গা থেকে আরেকটু ভেতরে দিকে যেতে চাই। এখানে থাকলে আমাকে না খেয়ে থাকতে হবে। আমার ভাতের যােগান এখান থেকে হবে না। তাই আমি চলে যাবো।

“কেন দাদা? আমরা মাত্র ক’ভাই এখানে এসেছি। এখানে পাশাপাশি দুই ভাই আছি। এখন আমরা আলাদা হয়ে গেলে আপন বলতে তাে আর কেউ থাকবে না দাদা!’

‘আমার অনেক ছেলেমেয়ে। এখানে আমাদের জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। এখন হয়তাে থাকতে পারব কিন্তু ছেলেমেয়ে বড় হয়ে গেলে তখন মুশকিলে পড়ে যাবাে। তাই সময় থাকতে আমার যাওয়া উচিত।’ এই বলে দাদা অন্য জায়গায় চলে গেলেন। আমাদের এই জায়গা থেকে বেশ দূরের একটা জায়গায়।

আর আমি একেবারে একা হয়ে গেলাম। আপন বলতে একমাত্র সেই তাে ছিল। তখন কিন্তু ভঙ্গলতুলি এলাকা আমাদের জন্য বরাদ্দ হয়নি। বরাদ্দ ছিল শুধুমাত্র রূপকারী এলাকা। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, আমরা যে নতুন জায়গাকে কেটেকুটে সাফ করে বসবাসের যােগ্য করেছি সেসব জমি কয়েক বছরের মধ্যে ডুবে যায় কাজলং নদীর পানিতে।

সেই একই কারণ কাপ্তাই বাঁধের পানি। বাধের পানি বেড়ে গেলে আমাদের সেই জায়গা ডুবে যায় তবে শুধু শীতকালেই এই জমিগুলাে জেগে থাকে। আর বাকি সময়টা কাপ্তাই বাঁধের পানির নিচে ডুবে থাকে। নতুন জায়গায় আসার পর আমি এবার নিজের নামে একটা বন্দুক নিলাম।

কিন্তু ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনীরা আমার সেই বন্দুকটি নিয়ে যায়। তারা আর আমার সেই বন্দুকটি ফেরত দেয়নি। চাকমা ভাষায় একটা প্রবাদ বাক্য আছে : কবা পিত্ত র’ নেই ডুলি পিলে র’ নেই এমন জায়গায় আমরা নতুন গ্রাম বেঁধেছিলাম।

এখন তাে কাজলং নদীর পার থেকে আমাদের গ্রামে আসতে এখন আধা ঘণ্টারও বেশি সময় লাগে না। কিন্তু প্রথম দিকে ঘন জঙ্গল যেখানে সূর্যের রােদ মাটিতে পড়ে না এমন জঙ্গল দিয়ে গ্রামে আসতে একদিন লেগে যেতাে। এমনই একসময় আসার পথে আমাদের গ্রামের ২ জন লােককে বাঘে ধরে নিয়ে যায়। তাদের আর পাওয়া যায়নি ।

হাতি বাঘের অভাব ছিল না তখন। এখানে আসার পর লােকেরা “খেদার” করেছিল । ১৪/১৫ টি হাতি ধরা পড়েছিল। এটা ৫৮/৫৯ সালের কথা সম্ভবত। এইসব লােকেরা আমাদের আগে বসতি গড়েছিল এখানে। ও একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, আমাদের জায়গা বুঝিয়ে দিতে আমিন কানুনগাে এসেছিল আমাদের সাথে ।

কিছুদিনের মধ্যে আমাদের সাথে যারা এসেছিল তাদের অনেকেই বর-পরং-এ চলে গিয়েছিল। তাদের ফেলে যাওয়া জায়গা জমি আমাদের মধ্যে ভাগ হয়েছিল। ৬১ থেকে ৬৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে বেশির ভাগ মানুষ বর-পরং-এ চলে যায়। চলে যাওয়ার তখন অন্যতম কারণ ছিল, প্রয়ােজন অনুযায়ী জায়গা-জমি ভাগ না পাওয়া।

তাই ভবিষ্যত্রে কথা ভেবে ওরা চলে যায়। কারণ ক্ষতিপূরণ নিয়ম অনুযায়ী সদস্য সংখ্যা ১০ জনের কম হলেই ১০ একর জমি পাওয়া যেতাে না। অথচ অনেকের পুরাতন জায়গায় দুন দুন* জমি ছিল। ছােটখাট জমিদারি ছিল অনেকের।

তারা এখন ভিখারি। তাই অগ্যতা দেশ ছেড়ে দূরদেশে যাওয়া ছাড়া কোনাে গত্যন্তর ছিল না তাদের। আমার ভাইয়ের ছেলে একজন মিজোরামে বসতি স্থাপন করে। তার ছেলে মিজোরামের এমএলএ হয়েছিল এই কয়েক বছর আগে। এভাবে কাপ্তাই বাঁধ আমাদের আলাদা করে দেয় গ্রাম থেকে, পরিবার থেকে, সমাজ থেকে আর শেষে দেশ থেকেও।

শেষ বয়সের অনুভূতি

কাপ্তাই বাঁধের বয়স ৫০-এর বেশি হয়ে গেল বােধহয়। শেষ বয়সে এসে একা একা থাকি আর পুরাতন দিনের স্মৃতি একে একে চোখের সামনে হাজির হয়। কত কিছু তাে মনে উঠে আবার হারিয়ে যায়। পাকিস্তান সরকার আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। যখন বাঁধ করবে বলে ঘােষণা হলাে একই সাথে আমাদের জানানাে হলাে যে এই বাঁধ থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে সে বিদ্যুতের আলাে আমরা বিনা পয়সায় আজীবন ভােগ করতে পারবাে। কিন্তু সেসব শুধুমাত্র বুলি ছিল, সেটা তাে এখন প্রমাণিত।

আজো রাঙামাটি গেলে যদি পর্যটন মােটেলের সামনে যাই তখন পানির দিকে তাকিয়ে বুক ফেটে যায়। এতে আমাদের গ্রাম। পানি নেমে গেলেই বােধহয় আমাদের পুরােনাে সবকিছু ফেরত আসবে এমন ভাবনাও আসে। কিন্তু সেটা তাে ভাবনা পর্যন্ত। এখন তাে আমাদের হাতে কোনাে কিছু নেই।

আগে বাঙালিদের সাথে থাকাটা ভয়ের কিছু ছিল না। কিন্তু এখন-সারাক্ষণ তাে ভয়ের ভেতর থাকি। মুসলমান বাঙালি দেখলেই সন্দেহ জাগে এই বুঝি মারতে এলাে। এই ৫০ বছরের ভিতর এভাবে পাহাড়ে বাঙালির সংখ্যা এতাে বেড়ে যাবে সেটা কল্পনাতেও ছিল না।
সেসময়ে যারা বর-পং-এ গেছে এখন মনে হয় তারা ভালাে সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে আমি বৌদ্ধধর্মের অনুসারী। তাই আমি কর্মবাদী। যতটুকু কাজ করেছি। ততটুকু ফল পেয়েছি। যেমন ধরাে, আমার বাবা ১০ একর জমি পেয়েছে। আমি কর্ম করে সে জমি বাড়িয়েছি। আমি পড়াশুনা করিনি কিন্তু আমার সব ছেলেমেয়েকে পড়াশুনা করিয়েছি। এটাই আমার জীবনের কর্ম।

মাঝে মাঝে অদ্ভুত ভাবনা হয় এই বয়সে- আচ্ছা কাপ্তাই বাঁধ যদি ভেঙে যায় তাহলে কি আমরা আমাদের পুরােনাে জমি নিজের ভিটে মাটি ফিরে পাবাে? যেতে পারবাে? হুম, এতাে বছর সব তাে গলে যাবে।

হােক-না গলে যাওয়া মাটি। তবুও তাে নিজের ভিটে। আমার মায়ের শ্মশান তাে ঐ গ্রামে। কত হাজারাে স্মৃতি সেই গ্রামকে ঘিরে। ঝগড়াবিল, পদ্মবিল। এই দুই বিলকে ঘিরেই কত গ্রাম কত মানুষের বাড়ন্ত সংসার ছিল। সেগুলাে কি ফিরে আসবে আবার। বরকলের সেই বিশাল জলপ্রপাতকে আরেকবার দেখতে মন চায় যে জলপ্রপাত এখন পানির নিচে।

একবার কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ দেখতে গিয়েছিলাম। সে এক বিশাল কাজ। কর্ণফুলির নদীকে দু’দিক থেকে চেপে এনে বন্ধ করা হচ্ছে। অসংখ্য মানুষ কাজ করছে। কত যন্ত্রপাতি। দানবের মতাে। রাঙামাটি থেকে তখন চট্টগ্রামে প্রতিদিন বােট নৌকা চলতাে। সেসব শব্দ আজো শুনি।

কাপ্তাই বাঁধকে ঘিরে কত রহস্য কত কাহিনী মানুষের মাঝে। মানুষ এখন এই লেকে আনন্দ করতে আসে দেখতে আসে। আমার দেখা ঐ পর্যন্ত যখন বােটে করে মারিশ্যা থেকে রাঙামাটি যেতে হয়।

যখন বাঁধ নির্মাণ হচ্ছিল, তখন তাে বুঝিনি কাপ্তাই বাঁধ আমাদের জীবনের সাথে কতটা জড়িয়ে যাচ্ছে। এখন যতই দিন যায়, ততই উপলব্ধি করি চাকমা ইতিহাস আর কাপ্তাই বাঁধ মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ হয়ে আছে।

চাকমারা পৃথিবীর যেখানেই যতদূরে থাকুক কাপ্তাই বাঁধ আর বাঁধের পানি জীবনের সাথে বইতেই থাকবে। এখান থেকে ওখানে, ওখান থেকে এখানে।

লেখকঃ করুণাময় চাকমা, বাঘাইছড়ি, রাঙামাটি।

তথ্যসুত্র : “কাপ্তাই বাঁধ : বর-পরং – ডুবুরীদের আত্মকথন” – সমারী চাকমা।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator