আমার চোখে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা

0
101

সম্ভবত ১৯৭৮ সাল, দিন-তারিখ স্মরণে আসছে না। কোন এক জরুরি কাজে আমাকে জেনারেল হেড কোয়ার্টারে পাঠানো হয়েছিল। কেন্দ্রে এই আমার প্রথম আগমন। ক্লান্ত ও অবসন্ন দেহে পড়ন্ত বেলায় যখন পৌঁছি, তখন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ভীষণ ব্যস্ততা। দেখলাম সবার চোখে-মুখে উৎকন্ঠা। কারণ ব্যারাকে হঠাৎ একজন অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমাদেরকে অবশ্য বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেয়া হল। কিন্তু ব্যারাকের অন্যান্যদের মত আামরাও উৎকন্ঠিত না হয়ে পারলাম না। তাই অসুস্থ সহকর্মীকে একটু দেখার জন্য নির্দিষ্ট স্থানে এগিয়ে গেলাম। দেখলাম রোগীর পাশে কয়েকজন কর্মী উপবিষ্ট। সবাই রোগীর সেবাকাজে ব্যস্ত। তন্মধ্যে সুশ্রী, গৌরবর্ণ ও সুঠাম দেহের অধিকারী একজনকে বেশি ব্যস্ত মনে হলো। যারা রোগীর সেবায় নিয়োজিত তাদের কাউকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনতাম না। সেই সুন্দর সুপুরুষ কর্মীটি থর্মোমিটারে রোগীর তাপমাত্রা দেখলেন, সাথে সাথে ইউনিটের ডাক্তারকে ডেকে প্রয়োজনীয় ব্যাবস্থাপত্র তাড়াতাড়ি করে দিতে পরামর্শ দিলেন। তারপর রোগীকে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকেন। ইতিমধ্যে একটা বাসন এনে পরিষ্কার করে ধুইয়ে তার মধ্যে ঔষুধ ও থার্মোমিটার রেখে দিলেন। আর রোগীর কপালে ও মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে অসুস্থ বন্ধুকে ঘুমাবার চেষ্টা করতে বললেন।

সহকর্মীর প্রতি এত দরদ ও সহানুভূতি দেখে আমার মনে বড়ই কৌতূহল জাগল। তাই এই সুন্দর ও সহানুভূতিশীল বন্ধুর পরিচয় জিজ্ঞাসা না করে আর থাকতে পারলাম না। জানতে পারলাম উনি আর কেউ নন, ইনি হলেন ছয় লক্ষ জুম্ম জাতির কর্ণাধার, জাতীয় চেতনার অগ্রদূত, পার্টি প্রতিষ্ঠাতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা মঞ্জু। পরিচয় জেনে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম। পার্টির সর্বোচ্চ ব্যক্তি হয়েও সাধারণ একজন ভলান্টিয়ারের (সামরিক শাখার সদস্য) জন্য এত পরিশ্রম করে সেবা শুশ্রূষা করে যাচ্ছেন। শ্রদ্ধায় ও ভক্তিতে তাঁর প্রতি আমার মাথা নত হয়ে এলো। ভাবলাম তাঁর মধ্যে এত মহৎ প্রাণ আছে বলেই আজ সমগ্র জুম্ম জাতিকে নেতৃত্ব দিকে সক্ষম হয়েছেন। ধন্য জনসংহতি সমিতি, ধন্য জুম্ম জাতি।

M N Larma
কলেজ জীবনে এম এন লারমা, ছবি: এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশন

ঘুরে ফিরে মনে পড়েছে সেদিনের সেই অতি ব্যস্ত শুশ্রূষাকারী মহান নেতার উদ্বিগ্ন মুখখানা। যিনি আজীবন সহযোদ্ধা ও কর্মীদের রোগে শোকে পরম সহানুভূতি ও সহমর্মিতা দিয়ে গেছেন। একজন সহকর্মী রোগে আক্রান্ত হলে তা রোগমুক্তি না হওয়া পর্যন্ত যার ব্যস্ততা ও উদ্বিগ্নতার সীমা থাকতো না, যিনি মায়ের স্নেহ ও বোনের ভালোবাসা দিয়ে বছরকে বছর ধরে সহকর্মীদের নিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলন এগিয়ে নিয়ে এনেছেন – সেই মহান ব্যক্তি তাঁর কঠিন মৃত্যুশয্যায় পেলো না কোনো সেবাশুশ্রূষা, মুমূর্ষু অবস্থায় তাঁর চতুর্পাশ্বে ছিল শুধুমাত্র কুচক্রীদের উন্মত্ততা। এটা নিশ্চয় জাতির দুর্ভাগ্য ছাড়া কিুছুই হতে পারে না। জাতির এই মহান কর্ণধার ও অন্যান্য শহীদদের স্মরণ করছি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও প্রণাম জানিয়ে।

প্রথম দর্শনে যার প্রতি আমার মাথা নত হয়েছিল সেই আমাদের দলীয় নেতার গুণাবলী সম্পর্কে পরে অনেক কিছু জানার সুযোগ হয়েছিল। কারণ এরপর থেকে কেন্দ্রে আমাদের আসা-যাওয়া হতে থাকে। পরবর্তী পর্যায়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বদলি হওয়াতে প্রয়াত নেতাকে অতি কাছ থেকে আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।

জাতীয় চেতনার অগ্রদূত মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা ছিলেন অনেক মহৎ গুণের অধিকারী। তাঁর মন প্রাণ কঠোরতা ও কোমলতা – এই দুইয়ের সংমিশ্রণে ছিল। তিনি শাসক-শোষক গোষ্ঠীর প্রতি যেমনি ছিলেন কঠোর ও আপোসহীন, তেমনি নির্যাতিত, নিপীড়িত জাতি ও মানুষের প্রতি ছিলেন পরম দরদী ও সহমর্মী। তাঁর দেশপ্রেম ছিল দেশকালের উর্ধ্বে। তিনি ত্যাগী, মিতব্যয়ী, সাহসী, সংযমী, সহিঞ্চু, ধৈর্যশীল, উদ্যোগী ও দৃঢ় মনের অধিকারী ছিলেন। তিনি পরোপকারী ও সহানুভূতিশীল, গরীবের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ ছিল অতি সাধারণের উর্ধ্বে। তিনি সৎ ও স্বাধীনচেতা ছিলেন। তাঁর দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ছিল অতি সাধারণ। নিয়মিতভাবে তিনি পড়াশুনা করতেন। পরিষ্কারভাবে না বুঝা পর্যন্ত তিনি যে কোন বিষয়ে গভীরভাবে অধ্যয়ন ও অনুশীলন করতে অভ্যস্ত ছিলেন। যেকোন কঠিন বিষয় প্রাঞ্জল ভাষায় বুঝিয়ে দেবার দক্ষতা ছিল তাঁর একটি অন্যতম গুণ। তিনি খুবই চিন্তাশীল ছিলেন। তাঁর একটা শিল্পী মন ছিল। তিনি সংস্কৃতিবান। জুম্ম সংস্কৃতি উন্নতি সাধনে তাঁর একাগ্র ইচ্ছা ছিল। রাজনীতির প্রজ্ঞায় ছিলেন অগ্রগামী। বিপ্লবী চেতনায় ও মানসিকতায় সমৃদ্ধ এই রাজনীতিবিদের সামরিক ক্ষেত্রেও ছিল অগাধ জ্ঞান। তাঁর উদ্ভাবিত সমরনীতি ও কৌশল জনসংহতি সমিতির শান্তিবাহিনীর বীর সদস্যরা বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর মনে ভীতি ও ত্রাস সৃষ্টি করে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি লাভ করতে পেরেছে। শুধু তাই নয়, তিনি অসামান্য দূরদর্শীও ছিলেন। তাঁর দূরদর্শীতায় জুম্ম জনগণ আজ ঐক্যবদ্ধ ও অধিকার সচেতন। আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনের প্রত্যেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাঁর দূরদর্শীতার স্বাক্ষর বহন করেছে।

মানবতাই ছিল তাঁর জীবনের আদর্শ। তিনি আমৃত্যু মানবতার জন্য সংগ্রাম করে গেছেন। তাই তাঁর অন্তর দয়া, করুণা ও ক্ষমাশীলতায় পরিপূর্ণ ছিল। শুধু মানুষের প্রতি নয় তিনি সকল জীবের প্রতিও দয়ালু ছিলেন। তিনি প্রকৃতিপ্রেমিক, প্রকৃতির অপার মহিমা ও উদারতায় মুগ্ধ হয়ে থাকতেন।

আগেই উল্লেখ করেছি যে, তাঁর সংস্পর্শে এক নাগাড়ে আমার আামার বেশ কয়েকটি বছর অতিবাহিত করার সৌভাগ্য হয়েছে। সুতরাং তাঁর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনের অনেক খুঁটিনাটি বিষয়ও আমার স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে আছে। কিন্তু এত বড় মহান ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জীবনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলী সম্পর্কে ফুটিয়ে তোলা আমার মত একজন অনুগামীর পক্ষে সম্ভবপর নয়। তবুও কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরতে প্রয়াসী হয়েছি যাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবিসংবাদী নেতার গুণাবলী হৃদয়ঙ্গম সহজতর হয়।

গরিব চাষী ও ভূমিহীন তথা সমাজে যারা সবচেয়ে বেশি গরিব ও অসহায়, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে তাদের সকলের প্রতি মহান নেতা এম এন লারমা ছিলেন সবচেয়ে দরদী। দেশে যখন খাদ্যভাব দেখা দেয়, তখন দেখেছি তাঁর মনে কি যেন একটা বেদনা যা বরাবরই তাঁকে উৎকন্ঠিত করে রাখত। তিনি সাধ্যমত চেষ্টা করতেন যাতে গরিব লোকেরা অন্ন সংস্থানের একটা উপায় বের করে নিতে সক্ষম হয়। তাই দেখেছি আমরা যেখানে যাই, যে এলাকায় অবস্থান করি, সে স্থানেও সে এলাকার সর্বহারা গরিবদের জন্য কিছু কিছু সাহায্য দিতে। কেউ বাইরের দায়িত্ব সম্পাদন করে ব্যারাকে ফিরে গেলে সাধারণ মানুষের অবস্থা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করতেন। জনগণের দুঃখ-দুর্দশা ও সমস্যা সম্বন্ধে জেনে নিয়ে যথাসম্ভব পার্টির সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিকট নির্দেশ পাঠিয়ে দিতেন। যেমন – যাদের বীজধান সংগ্রহ করার ক্ষমতা নাই তাদের বীজধান কিনে দেওয়ার জন্য ব্যবস্থা করে দিতেন।

জুম চাষীদের জীবনের ইতিহাস আরো করুণ। বৎসরে মাত্র একবার চাষ করে। ৬/৭ মাসের মধ্যে খোরাকী শেষ হয়ে যায়। তুলা, তিল ও জুমের অন্যান্য উৎপাদিত শস্যদি দিয়েও আর কত টাকা পাওয়া যায়। বাকি ৫/৬ মাস প্রায় অভাবের মধ্যে দিয়ে কাটাতে হয়। জুম চাষের সময় চাষীর বীজধানও থাকে না। কখনও অনেকেই আলু খেয়ে কোনো রকমে চাষ করে থাকেন। এইসব কথা নেতার অজানা ছিল না। তাই জুমচাষীদের প্রতি বিশেষ সহানুভূতি রাখতে বরাবরই আমদেরকে পরামর্শ দিতেন অথবা স্বয়ং উদ্যোগী হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। সম্ভবত এপ্রিল মাস। জুম পোড়া শেষ হয়েছে। যাদের একটু সামর্থ রয়েছে তারা জুম ধান বপনের কাজ শেষ করেছে। কিন্তু যারা খু্বই গরিব তাদের ধান বপন করা সম্ভব হয়নি।

আমাদের ব্যারাকের অনতিদূরে একটা জুম ছিল। সেদিন সেই জুমের উপর দিয়ে প্রয়াত নেতাকে বাইরে এক জায়গায় যেতে হবে। শত্রুর গতিবিধি লক্ষ্য রাখার জন্য জায়গায় জায়গায় লোক রাখা হয়। তাই একটু নিশ্চিন্তে পড়ন্ত বেলায় আমরা জুমের পথ বেয়ে চলেছি। চলার পথ থেকে জুমের নিচে সারা শরীরে কালি মাখা একজন লোককে কাজ করতে দেখা গেল। এ জুম চাষীটি হলো একজন ত্রিপুরা। তখন তিনি আমাদেরকে দেখিয়ে বললেন – দেখ, একজন লোক জুমের আগাছা পরিষ্কার করছে। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয় আর কিছুক্ষণ কাজ করে। মনে হয় শরীরের দুর্বলতার কারণে কিছুক্ষণ কাজ করে এবং কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়। আমরাও সবাই দেখলাম। আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘ভাতের অভাবে মনে হয় তাকে এমন দেখাচ্ছে। তুমি যাও তাকে কিছু দিয়ে এসো।’ তখন তাঁর রুখসেক নামিয়ে আমাকে ৩০০ (তিন শত) টাকা দিয়ে দিলেন। আরও বললেন, পরে অসুবিধায় পড়লে যেন সে আমাদের সাথে যোগাযোগ করে। আমি তখন তাঁর দেওয়া টাকা দিয়ে লোকটার নিকট দাঁড়ালাম। প্রথমে হাতিয়ার কাধে থাকা অবস্থায় দেখে ভয় পেয়েছিল। কিন্তু তাঁর সাথে আলাপ করার পর তাঁর ভয় দূরীভূত হলো। দেখলাম তার শরীরের অবস্থা। বুকের হাড় পর্যন্ত গোনা যায়। পরনে শার্ট নেই। শুধু একটা নেংটি লজ্জা নিবারণের জন্য। তখন তাকে বুঝিয়ে তিনশত টাকা দিয়ে দিলাম। লোকটি বললেন, ‘এ বছর তো টাকা পরিশোধ করতে পারবো না।’ আমি বললাম পরিশোধ করতে হবে না। অসুবিধায় পড়লে যোগাযোগ করো বলে ফিরে আসলাম। তখন জুম চাষীটি অশ্রুসিক্ত নয়নে আমাকে নমস্কার জানালো। কিন্তু সে বুঝলো না, এটা কার অবদান?

শুধু তা নয়। একবার এক জুম চাষীকেও নিজের পরিশ্রম দিয়ে প্রয়াত নেতা সাহায্য কলেছিলেন। তখন ১৯৭৮ সাল। আমরা জুমে সাময়িক কালের জন্য অবস্থান করছিলাম। জুম চাষীটি নেতাকে চিনতেন না। জুমে তখনও পর্যন্ত অনেক কাজ বাকি। তাই জুম চাষীকে সাহায্য করার জন্য তাঁর কথাতে আমরা জুমের কাজে লেগে গেলাম। প্রত্যেকদিন আমরা প্রয়াত নেতাসহ উঁচু পাহাড়ে বেয়ে পিঠে ঝুঁড়ি দিয়ে তিল সংগ্রহের কাজে সাহায্য করতাম। এভাবে আমরা যতদিন ছিলাম ততদিন এই গরিব জুম চাষীর উপকার করতে সচেষ্ট ছিলাম।

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড – এ কথাটি মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। তাই তাঁর শিক্ষকতা জীবনে তিনি এদেশে নিরক্ষরতা দূরীকরণে ও শিক্ষা বিস্তারে যথেষ্ট অবদান রেখেছিলেন। যতদিন তিনি শিক্ষকতা করেছেন ততদিন গরিব ও মেধাবী ছাত্রদেরকে সর্বপ্রকারে সাহায্য করতেন। বিভেদপন্থী চার কুচক্রীর অন্যতম হোতা পলাশের মত গরিব ছাত্রকে তিনি উদার হস্তে সাহায্য করেছেন।

M N Larma
১৯৭৩ সালে লংগদুর বনভান্তের বিহারে কঠিন চীবর দানোৎসবে তৎকালীন মহিলা এমপি সুদীপ্তা দেওয়ানসহ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, ছবি: এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশন

ইহা বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, জনসংহতি সমিতির সার্বক্ষণিক কর্মীদের মধ্যে অধিকাংশই নিরক্ষর অথবা স্বল্প শিক্ষিত। তিনি এদেরকে নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তা-ভাবনা করতেন। তাই তিনি দলীয় দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এসব নিরক্ষর ও স্বল্পশিক্ষিত সহকর্মীদের জন্য পার্টিতে লেখাপড়ার ব্যাবস্থা করে দেন। এমনকি হাজারো কর্মব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে তিনি সহকর্মীদের লেখাপড়া শিখাতেন। লেখাপড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি রাজনীতির ক্লাসও পরিচালনা করতেন। তাঁর নিজস্ব উদ্যোগে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে অনেক কর্মী বিভিন্ন স্থানে আজও দলীয় দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।

প্রয়াত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি তার অর্জিত জ্ঞান ভান্ডার সবার জন্য উন্মুত্ত রাখতেন। তিনি যা জানতের তাই অপরকে দিতে বরাবরই সচেষ্ট থাকতেন। তজ্জন্যে তিনি বছরের পর বছর পরিশ্রমও করে গেছেন।

তিনি যে একজন সঙ্গীতপ্রিয় ছিলেন তা জানতে পারি যখন তিনি মধুর সুরে বাঁশি বাজাতেন। একদিন আমাকে বাঁশি বাজাতে দেখে বললেন- ‘দেখ তোমরা যদি বাঁশি বাজানো শিখতে চাও তাহলে আমি চেষ্টা করতে পারি।’ এভাবে তিনি বাঁশি বাজানোর ক্লাসও নিতে থাকেন। হায়রে আজ তাঁর সেই মন মাতানো বাঁশির সুর শোনা যাবে না, শোনা যাবে না তার সেই অনলবর্ষী বক্তব্যও।

তিনি প্রকৃতি প্রেমিক ছিলেন। বনের বাঁশ ও পশুপক্ষী সংরক্ষণের প্রতিও ছিলেন খুবই সংবেদনশীল। আমাদের প্রায় সময়ই স্থান পরিবর্তন করে নতুন ব্যারাক তৈরি করতে হতো তাই কোনো সময় নতুন ব্যারাক তৈরি করতে হলে অনেক বাঁশ কাটতে হতো। তখন তিনি নির্দেশ দিতেন যাতে অপ্রয়োজনীয় বাঁশ-গাছ কাটা না হয়। তিনি বলতেন যে, এসব আমাদের জাতীয় সম্পদ, তাছাড়া বাঁশ-গাছ প্রকৃতির শোভা যেমনি বৃদ্ধি করে, তেমনি আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে। তাই কোনো কারণে জঙ্গলে ঘুরতে গেলে বাঁশ-গাছ অহেতুক না কাটার জন্য ও বারণ করতেন।

বনের পশু রক্ষা করার ব্যাপারে তিনি ছিলেন বড়ই কড়া। তাই কয়েক প্রকার বনের পশুপক্ষী বধ করা ছিল নিষিদ্ধ। এটা সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে পার্টিগতভাবে নির্দেশ জারি করা আছে। একটা আশ্চর্য ঘটনার কথা বলি। প্রয়াত নেতা যে ব্যারাকে থাকতেন সে ব্যারাকের নিচে ঠিক তাঁর বিছানা বরাবর একটা বিষধর সাপ যে থাকতো তা আমরা জানতাম না। ব্যারাকের চতুর্পাশে পরিষ্কার করতে গিয়ে ঐ সাপটাকে আমাদের চোখে পড়ে। আমরা সাপটাকে মারার জন্য উদ্যত হলে তিনি বারণ করলেন। বললেন, সাপটা কাউকেও যখন ক্ষতি করে না অনর্থক মারবে কেন? সাপটি সেখানেই রয়ে গেল। অথচ তাঁর কোন ক্ষতিই করলো না। আমরা অবশ্য এজন্য শংকিত হয়ে পড়েছিলাম। শুধু সাপটি নয়, একটি পাখিও আসতো তাঁর নিকটে। এক রুকসেক থেকে আরেক রুকসেকে পাখিটি ঘুরে ঘুরে থাকতো। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে পাখিটি তার জায়গায় চলে যেতো। তিনি সেই পাখিটিকে প্রতিদিন খাবার দিতেন। আমরা পাখিটিকে ধরার চেষ্টা করলে তিনি বারণ করতেন। শুধু পশুপক্ষী নয়, কীটপতঙ্গের প্রতিও তিনি দয়ালু ছিলেন। কোন কীটপতঙ্গ যদি অসহায় হয়ে পড়ে থাকে তাহলে তিনি সেটা তুলে নিয়ে নিরাপদ জায়গায় রেখে দিতেন। শুধু তাই নয়, ব্যারাকের ঘাটে যে সব কাঁকড়া ও চিংড়ি মাছ থাকতো, সেগুলোকেও তিনি খাবার দিতেন এবং না মারার জন্য বলতেন।

একটা ঘটনার কথা বললে আরো ভালোভাবে জানা যাবে তিনি পশুপক্ষীর প্রতি কি রকম দয়ালু আর তাদের সংরক্ষণের জন্য কি রকম উদ্যোগী ও সচেষ্ট ছিলেন। ১৯৭৯ সাল, অরণ্যে ব্যারাক করেছি। বাঘ, ভল্লুক ও অন্যান্য প্রাণীরা ছিল আমাদের প্রতিবেশী। ব্যারাকে অনতিদূরে ছিল জুম। একজন জুমচাষী ঘুরতে ঘুরতে পাহাড়ের উপরে একটা কচ্ছপ পেয়েছিল। লোকটি কচ্ছপটি বিক্রি করতে যাবে এমন মুহূর্তে আমাদের ব্যারাকের একজন সেখানে উপস্থিত হয়। কচ্ছপটি দরাদরি করে ব্যারাকে নিয়ে আসা হলে সবাই একে একে দেখতে গেলাম। কচ্ছপের কথা জানাজানি হয়ে গেলো। নেতার কানেও পৌঁছালো এ খবর। তিনি দেখতে গেলেন কচ্ছপটিকে। তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। টর্চের আলো জ্বালিয়ে ভালো করে দেখলেন। তখন তিনি আমাদেরকে বললেন, দেখ দেখ কচ্ছপটি কাঁদছে। এরকম কচ্ছপতো এখন পৃথিবীতে বোধ হয় খুব কমই দেখা যায়। আমাদের দেশে যে এরকম কচ্ছপ আছে তা আনন্দের বিষয়। এদের বংশ মনে হয় কমে যাচ্ছে। ছেড়ে দিলে কেমন হয়? প্রস্তাব দেওয়ার সাথে সাথে আমরা তা সমর্থন করলাম।

প্রত্যেকদিন সকালে বিকালে রেডিওতে দেশ-বিদেশের খবর শুনতে তিনি ভুল করতেন না। খবর আরম্ভ হওয়ার পূর্বে কলম আর কাগজ নিয়ে প্রস্তুত হয়ে থাকতেন যাতে গুরুত্বপূর্ণ খবরাদি লিখে রাখতে পারেন।

ব্যরাকের নিয়ম অনুযায়ী রাত্রে নির্দিষ্ট সময় আসলে আলো নিভিয়ে ঘুমাতে হয়। তিনিও নিয়ম অনুযায়ী বিছানায় শুয়ে পড়তেন। বারটার আগে তিনি ঘুমাতেন না। দিনের মধ্যে যতকিছু সমস্যা সম্বলিত চিঠিপত্র আসতো সেসব চিন্তা করে এসময়ে সমাধান বের করতেন।

তিনি অতি সরলভাবে জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাইতেন। আরামদায়কভাবে ঘুমানো পছন্দ করতেন না। বাঁশের তৈরি বিছানার উপরে পুরানো একটা কম্বল বিছিয়ে তাঁর উপর ছেঁড়া লুঙ্গি দিয়ে তৈরি করতেন তার বেডসীট। আর মাথায় দিতেন শার্ট-প্যান্ট ও অন্যান্য কাপড়-চোপড় ভাঁজ করে।

তিনি সবসময় সবকিছু গুছিয়ে রাখতেন। ছেঁড়া কাপড় ধুয়ে যত্ন করে রাখতেন, পাছে প্রয়োজন হয়ে পড়ে। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসাদি তার রুকসেকে রাখতেন। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র যেমন – কাপড়-চোপড়, সুচ, সূতা, ব্লেড, পিন, মুচিসুচ, টর্চ, মোমবাতি, ছোট চাকু ইত্যাদি এমনকি দাও পর্যন্ত রাখতেন। ওজনে সবগুলো মিলিয়ে প্রায় ১৫/২০ কেজির মত। কোন জায়গায় গেলে ঐটি তিনি নিজেই বহন করতেন। কেউ এই রুকসেক বহন করে দিতে চাইলেও তিনি দিতেন না।

M N Larma
নদীর ধারে এম এন লারমা, ছবি: এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশন

তিনি সহকর্মীদের সুখ-দুঃখের ব্যাপারে খুবই যত্নশীল ছিলেন। তিনি যখন খাবার ঘরে যেতেন তখন পাচকদের সাথে অবশ্যই রান্না-বান্না ও খাদ্য সংক্রান্ত ব্যাপারে কথা বলতেন। সাধারণত পালাক্রমে আমাদের রান্না-বান্না করতে হতো। আলাদা কোন খাদ্যের আয়োজন করে দিলে তিনি মনে কষ্ট পেতেন। তা জানতে পারলে তিনি তা বারণ করে দিতেন। তাঁর প্রিয় খাদ্য ছিল শুটকী ও শাক-সবজি।

সাধারণত প্রত্যেকদিন ব্যারাকের বাইরে নানা কাজে আমাদেরকে যেতে হয়। কেউ বাইরে পরিশ্রম করার পর ব্যারাকে ফিরে আসলে তখন তাঁর ব্যস্ততার সীমা থাকতো না। তিনি নিজেই সেই সহকর্মীদের জন্য যে স্তরের হোক না কেন খাবার জল, হাতপাখা ইত্যাদি এনে দিতেন। দূরাঞ্চলের কোন সহকর্মী কেন্দ্রে আসলে তিনি খুবই খুশি হয়ে উঠতেন। তাদেরকে সাদরে অভ্যর্থনা জানিয়ে যত্ন সহকারে বসাতেন ও সর্বপ্রথম শারীরিক কুশলাদি জেনে নিতেন। সময় পেলে তিনি শারীরিক পরিশ্রমও করতেন। মাঝে মাঝে ব্যারাকের কাজ যেমন – বাঁশ আনা, জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করা ইত্যাদি কাজেও অংশগ্রহণ করতেন। এভাবে তাঁকে ঘিরে শত শত কর্মীর রাজনৈতিক জীবনধারা যে গ্রথিত হয়েছে তাতে কোন সন্দেহ নেই।


রেণী

স্মারক গ্রন্থ, মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার জীবন ও সংগ্রাম; এপ্রিল ২০১৬

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here