icon

পাদি সাহবাং: চাকমা ঐতিহ্যের জীবন বৃক্ষ

Jumjournal

Last updated Dec 13th, 2020 icon 197

চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী বয়নশিল্পে (বেন) ‘পাদি সাহবাং’ বৃক্ষটির আবেদন জীবনবৃক্ষ (Tree of Life) হিসেবে। জীবন-বৃক্ষ সম্পূর্ন প্রতীকধর্মী এক বৃক্ষ। এ প্রতীকে বৃক্ষ জীবনের সাথে সম্পৃক্ত হয়েছে। বৃক্ষ ছায়াদানকারী, ফুল ও ফল দানকারী হিসেবে জীবন লালন করে।

বৃক্ষ পৃথিবী মন্ডল পরিচ্ছন্ন রেখে নিশ্চয়তা দেয় সুষ্ঠু, ভারসাম্যপূর্ন পরিবেশের ও জীবনের। পৃথিবী যদি বৃক্ষহীন হত তবে জীবনহীন এক পৃথিবীর তুল্য হত। জীবনের সাথে নিবিড় সম্পর্কের বৃক্ষকে বিশ্বের বহু ঐতিহ্যে প্রাচীনকাল থেকে কখনও মাতৃরূপে, দেবী ও দেব রূপে পূজা করেছে, স্তুতি করেছে কথায়, গীতে, শাস্ত্রে ও কাব্যে।

বৃক্ষের জীবন সম্পৃক্ত শক্তির তুলনা কখনও হয়েছে সূর্যের সাথে। এক্ষেত্রে জীবন ও আলো ব্যবহৃত হয়েছে সমার্থক অর্থে, একে অপরের পরিপূরক অর্থে। সূর্যের অমিত তেজে বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার, বৃক্ষ পল্লবিত হওয়ার, ফুল প্রতিত ও ফল বিকশিত হওয়ার নিয়মকে কেন্দ্র করে জীবনের উপমা হয়েছে সূর্য।

সূর্য তার জ্যোতি ছড়িয়ে জীবন-বৃক্ষতে কখনও মূর্ত করেছে আলোময় জ্ঞান-বৃক্ষরূপে। দক্ষিণ এশিয়ায়, স্বল্প পরিচিত ও আলোচিত চাকমা ঐতিহ্যে শিল্প ও আচারেও জীবন-বৃক্ষ রূপ পেয়েছে বিভিন্ন নামে ও মাধ্যমে।

এ প্রবন্ধে চাকমা ঐতিহ্যের শিল্প ও আচারের জীবন-বৃক্ষকে বেন শিল্পের ‘পাদি সাহাং’ নক্সাকে কেন্দ্র করে আলোচনা করা হল।

দক্ষিণ এশিয়ার ঐতিহ্যে জীবনবৃক্ষ:

দক্ষিণ এশিয়ার সব প্রাচীন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্যে জীবন-বৃক্ষ সমাদৃত হয়েছে। সিন্ধু সভ্যতার মহেঞ্জোদারো, হরপ্পা থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি ঐতিহ্যে জীবন-বৃক্ষকে নিখুঁত আঁকা হয়েছে ভাস্কর্যে, তুলিতে, লেখনীতে, এমনকি সূচিকর্মে।

বিভিন্ন রূপে ও নামে জীবন-বৃক্ষ শিল্পীর হৃদয়ে ও হাতে নন্দিত হয়েছে। মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার শিল্পীরা জীবন-বৃক্ষকে আশ্চর্য নিপুনতায় খোদাই করেছেন। হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ঐতিহ্যে জীবন-বৃক্ষ শুধু খোদাই হয়নি, প্রাণ পেয়েছে ভাস্কর্যে, স্থাপত্যে, তুলিতে, ধুলিতে, ধর্মশাস্ত্রে, শিল্পশাস্ত্রে ও সুঁই সুতোয়।

সারা ভারতে মন্দির স্থাপত্যে জীবন-বৃক্ষ অতি সুচারু কারুকাজে খোদাই হয়েছে। বাংলার মন্দিরে ও বিহারে টেরাকোটায় এ বৃক্ষ ব্যাপকভাবে দেখা যায়। এছাড়াও বিভিন্ন শিল্প মাধ্যমে বৃক্ষটি ফুটে উঠেছে, বটবৃক্ষ, কখনও তমাল, পারিজাত, কল্পতরু বা অন্য কোন স্বর্গলোকের বৃক্ষ অবলম্বনে।

স্থাপত্যে জীবন-বৃক্ষ তৈরী হয়েছে সুদৃশ্য স্তম্ভ হিসেবে। হিন্দু স্থাপত্যে এ বৃক্ষতে পাওয়া যায় ‘সূর্য-স্তম্ভ’ বা-‘অরুন-স্তম্ভ’ হিসেবে। এ স্তম্ভ আছে পুরীর জগন্নাথ মন্দির, কোনারকের সূর্য মন্দিরে। সূর্য স্তম্ভের ডিটেইল আঁকা হয়েছে তালপাতার পান্ডুলিপি বিখ্যাত শিল্পশাস্ত্র ‘শিল্প প্রকাশ’ এ।

এ ধরনের প্রতিটি স্তম্ভ চুড়ায় সুর্য মুকুট হয়ে আছে। স্থাপত্যের সূর্য স্তম্ভ যে জীবন-বৃক্ষের অপর রূপ তা বর্নিত আছে বহু প্রাচীন শাস্ত্রে। যেমন আছে মৈত্রী উপনিষদের চতুর্থ খন্ডের, চতুর্থ সূত্রে।

এই সূত্রে ঋষি-কবি জীবনবৃক্ষকে বটবৃক্ষ সাজে রূপায়িত করেছেন একপায়া সূর্য হিসেবে। ভারতে বিভিন্ন হিন্দু মন্দিরে বটবৃক্ষের পূজা হয় ‘অর্ক-বট’ বা ‘সূর্য-বট’ নামে। ‘সূর্য তন্ত্র’ বা সূর্য তন্ন বিস্তার’ নামক শাস্ত্রেও অর্ক-বটের উল্লেখ আছে। এইভাবে জীবন-বৃক্ষ সূর্য-বৃক্ষ নামে “এক পায়া সূর্য” হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত।

বৌদ্ধ ঐতিহ্যেও জীবন-বৃক্ষ বটবৃক্ষ আদলে রূপায়িত হয়েছে প্রভাদানকারী বৃক্ষ হিসেবে: এ ঐতিহ্যে জীবন-বৃক্ষ শুধু জীবন সঞ্চারী মহীরুহ নয়, আলো সঞ্চারী, বোধ সঞ্চারী ‘বোধি-বৃক্ষ’ (Tree of Awakening) এর তলে ধ্যানমগ্ন গৌতম বুদ্ধ বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে অর্জন করেছিলেন সম্যক সম্বোধি।

জীবন-বৃক্ষ বৌদ্ধ স্থাপত্যে বোধি-বৃক্ষ রূপে ব্যাপকভাবে চিত্রিত হয়েছে সাঁচী, অমরাবতী ও বুদ্ধগয়ার ওপার দেয়ালে। এছাড়া জীবন-বৃক্ষ এসেছে চক্র-স্তম্ব হিসেবে। যেমন সারনাথ, সাঁচী ও অমরাবতীতে চক্র-স্তম্ভ ও সূর্য-স্তম্ভের নন্দন-কলাও গঠন একই ধরনে চক্রের প্রতিটি অংশ সূর্য রশ্মির মত একটি মধ্য বিন্দু থেকে উৎসারিত হয়ে একটি বহিবৃত্তে আবদ্ধ হয়ে স্তম্ভের শীর্ষে শোভা পেয়েছে।

সম্রাট অশোকের আমলে, খ্রিষ্টপূর্ব দু’শ বছর আগে চক্র স্তম্ভের সার তীর্থ স্থানের নির্দেশ করেছে। দক্ষিণ এশিয়ার সান্তাল ও ভারতে বিভিন্ন অঞ্চল ও নেপালের নারীরা জীবন-বৃক্ষকে এঁকেছেন ধূলিচিত্রের আয়নায় বাঙালী, বিহার, উড়িশ্যা ও বহু অঞ্চলের নারী জীবন-বৃক্ষকে প্রাণ দিয়েছেন সুই কথায়। পন্ডিত স্টেলা ক্রামরিস অনায়াসে বাঙালী নারীর সৃষ্টি জীবন-বৃক্ষকে কাঁথার শিল্পে চিনে নিয়েছেন।

চাকমা বেনশিল্পে পাদি সাহোং:

বেন চাকমাদের এক প্রাচীন শিল্প যার ব্যবহারিক সংজ্ঞা হচ্ছে ‘কোমর তাঁত’ (Backstrap Loom)। বেন শুধু চাকমা ঐতিহ্যে নয়, পার্বত্য চট্টগ্রামের সব আদিবাসী ও দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় বহু জাতীর ঐতিহ্য। ‘বেন’ শব্দটি একটি প্রাচীন চাকমা শব্দ।

চাকমা শব্দ গঠনের এক ধারা অনুয়ায়ী বেন এর ধারণ ও লালনকারী বা অধিকারী নারীকে বলা যায় ‘বেনবি, ‘বি প্রত্যয় যোগে শব্দ, বিশেষ করে নাম গঠনের রীতি রয়েছে চাকমা ধারায়। যেমন নাম দোলবি (সুন্দরী, দোল/সৌন্দয্যের অধিকারী, রাঙাবি(রাঙামেয়ে, রাঙা গায়ের রঙের অধিকারী), কালবি(কালোমেয়ে) ইত্যাদি।

বেনবি-র পাত্রী হিসেবে যে সমাদর রয়েছে তা বুঝা যায় একটি ছড়ার মাধ্যমে।” ধুরুজ ধুরুজ বেন বুনং/কার্বারী ঘরত বৌ পরং” অর্থাৎ ” ধুরজ ধুরজ বেন বুনি/কারীর(গ্রাম প্রধান) ঘরে বৌ বনি”।

প্রসঙ্গক্রমে ‘বেনবি’ শব্দটি এক বৌদ্ধ সিদ্ধ, চর্যাকবি তান্তিপাদ বা Tha-ga ব্যবহার করেছেন, বা মতান্তরে ‘তান্তী’ (তাঁতী) নামের চর্যাপদ বা চর্যাগীতিতে ব্যবহৃত হয়েছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর ১৯০৭ সালে নেপালের রাজ দরবার গ্রন্থাগারে আবিস্কৃত চর্যাগীতিকোষ বা ‘চৰ্য্যাচর্যবিনিশ্চয়’ বা ‘আশ্চৰ্য্যচৰ্য্যাচয়’ পুথির ৫১টি পদ বা গীতিকার মাঝে ‘তান্তী’ হচ্ছে ২৫ নং পদ।

এ গীতিকোষের রচনাকাল বিভিন্ন পন্ডিতের গবেষণায় এক ব্যাপক অনুমিত সময়, খ্রীষ্টিয় সপ্তম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ব্যাপৃত। তবে তান্তীপাদ যদি এ পদের রচয়িতা হন তবে তার সময় নবম শতাব্দী।

তান্তীপাদ বা তান্তীপা ছিলেন মহান আচার্য কাহ্নপাদ/পা’র শিষ্য। কাহ্নপাদের রাজা দেবপালের সময় ৮৪০ সালের সময়কাল বলে অনুমিত। এভাবে ‘বেন’ শব্দটির চাৰ্যাসাহিত্যে উদ্ভব নবম শতাব্দীতে বলে অনুমান করা যেতে পারে। বাংলা ভাষায় ‘বেন’ শব্দটির সমসাময়িক ব্যবহার নেই।

বাংলা ভাষার মত দক্ষিণ এশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় অন্যান্য ভাষা, বিশেষত: যে সৰ ভাষা চর্যাগীতিকোষের ভাষাকে তাদের প্রাচীন ভাষা বলে আখ্যায়িত করেছে যেমন মৈথালী, উড়িয়া, আসামী, হিন্দী ও নেপালী ভাষায় ব্যবহৃত হয় কিনা জানার আগ্রহ সৃষ্টি করে।

চাকমা মধ্যযুগীয় সাহিত্যে (১৬০০-১৯০০) ‘বেন’ এর উল্লেখ করা হয়েছে বহু রচনাতে। বিখ্যাত ‘রাধামন ধনপুদি’ পালার ‘সাপেকুল’ পর্বে ধনপুদি তার স্বামী রাধামনের জন্য ‘সাজন্যা গামছা’ বা ‘সন্ধ্যা গামছা’ বুনার স্থান ও পেয়েছে।১০

এই বিশেষ গামছা একদিনে তুলো থেকে সুতো বানিয়ে, বেনের মাধ্যমে বুনতে হয় ও সূর্য ডোবার আগে শেষ করতে হয়। লোক বিশ্বাস রয়েছে যে এ কাপড় রক্ষাগুন সম্পন্ন। ধনপুদির এই উপহার সেনাপতি রাধামনকে যুদ্ধে কোন রকম ক্ষতি থেকে রক্ষা করেছে ও বিজয়ী করেছে বলে বিশ্বাস সমাজে ও সাহিত্যে প্রচলিত রয়েছে।

‘তান্যাবি’ উনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধের বারমাসী রচনা যাতে তান্যাবির বেন বুনা ও ‘পাদি সাহবাং’ নক্সাটি বুনাকে গ্রন্থনা করা হয়েছে।১১

তান্যাবি ফুল তুলে আলামত্তুন সাহবাং গাচ
বো’চা এলে কধা দিপং ও তান্যাৰি কেজান পাচ

অর্থাৎ

তান্যাবি নক্সা তুলে আলাম থেকে সাহবাং গাছ
বৌ দেখতে এলে কথা দেব কি ও তান্যাৰি মত জানাস

আধুনিক চাকমা সাহিত্য ও চাকমা সম্পর্কীয় লেখায় বেন/পালি সাহৰাং ও আলাম-এ উল্লেখ পাওয়া যায়।

বেন এর একচ্ছত্র শিল্পী চাকমা রমণী। কেননা এ ঐতিহ্যে নারীই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রাণ সঞ্চার করেছেন। নারী হাতে-কলমে শিখিয়েছেন ও শিখেছেন, শিল্পের অন্যতম সমঝদার ও কর্ণধার।

চাকমা নারী জীবন সম্পৃক্ত প্যাটার্ণ সৃষ্টি করেন সুতোর টানা পোড়েনের সুক্ষতায়, অন্যদিকে যেমন তিনি জীবন প্রতিপালন সংসারের টানা পোড়েনের স্থুলতায়। নদীর মত বহমান ঐতিহ্যে- প্রজন্মের পর প্রজন্ম-মাতা-কন্যা সূত্রে, এবং মাতৃতান্ত্রির উত্তরাধিকার চাকমা নারীর অপূর্ব সৃষ্টি এই বেন শিল্প।

চাকমা নারী জীবন-বৃক্ষ, ‘পাদি সাহবাং’, রচনা করেছেন তার সর্বশ্রেষ্ঠ বেন শিল্প ‘আলাম’ এ। আলাম হচ্ছে সাদার উপর লাল, সবুজ, নীল, কাল রঙের সুতোয় বোনা বেন, যাতে চাকমা ঐতিহ্যের বহু নক্সা তুলে রাখা হয়।

প্রায় শতের কাছাকাছি বা শতাধিক সৰ নক্সার সমন্বয়ে এক একটি আলামকে বলা যেতে পারে চাকমা বেন-শিল্পের এনসাইক্লোপেডিয়া, প্রতিটি প্যাটার্ন বুননে আলামের সাহায্য নেয়া হয়। আলাম তাই এই শিল্পের অনিবার্য গাইড।

ঐতিহ্যের বাইরের কোন প্যাটার্ন সাধারনত: আলামে তুলা হয় না। এতে করে পূর্বসুরীদের সৃষ্ট প্যাটার্নগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্মে পুনারাবৃত্ত হয়ে এক চিরায়ত, শাশ্বত প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে। প্যাটার্নগুলোর শতাব্দীর পর শতাব্দী দীর্ঘ ধারাবাহিকতা এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের দাবী রাখে।

বেনের আন্তর্জাতিক শিল্প স্বীকৃতি সম্ভবত: প্রথম এসেছিল ১৮৮৩ সালে, যখন দয়াময়ী দেওয়ানের কাজ, মনে হয় আলাম, বিখ্যাত কলিকাতা ইন্টারন্যাশনাল এক্সিবিশনে পুরস্কৃত হয়।১৩

পরবর্তীতে এই বেনৰি দয়াময়ীর বিয়ে ‘কার্বারী’ বা গ্রাম প্রধান, বা হেডম্যান, যিনি কয়েকজন কার্বারীর প্রধান, কারো সাথে হয়নি। কিন্তু, ১৮৮৫ সালে পূর্বে উল্লেখিত চাকমা ছড়াটির অবমাননা করে তার বিয়ে হয় রাজ্য প্রধান রাজা ভূবন মোহন রায় এর সাথে। তখনকার রাঙ্গামাটির ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনারের স্ত্রী স্বয়ং এ বিয়ের ঘটকালি করেছিলেন।১৪

রাজা ভুবন মোহন রায়ের কনিষ্ঠ ভ্রাতা কুমার রমণী মোহন রায় বিয়ে করে আরেক নিপুন বেনৰি ষোড়শী বালা দেওয়ানকে। তিনি প্রখ্যাত কবি অরুন রায় ও সলিল রায়ের জননী। তার বেন ১১৫টি নক্সার এক আলাম রাঙ্গামাটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে।

রাজা ত্রিদিব রায়ের স্ত্রী রাণী আরতি রায়, বর্তমানের রাজমাতাও একজন সুদক্ষ বেনবি। ১৯৫১ সালে আরতি দেওয়ান তার বেনের জন্য রাঙ্গামাটির এক প্রদর্শনীতে পুরস্কৃত হয়।

১৯৫৩ সালে রাজা ত্রিদিপ রায়ের সাথে আরতির বিয়েতে রাঙ্গামাটির ডেপটি কমিশনার লে. কর্নেল হিউম আর বেনের প্রশংসা নিয়ে ঘটকালি করেছিলেন বলে জানা যায়। ১৯৮০ শতকের বীনাপানি চাকমা (১৯৩১-২০০৩, ডিএসপি হরিলাল চাকমা স্ত্রী) ‘পাদি সাহবাং ৮০টির বেশী নক্সা নিয়ে একটি আলাম বুনেছিলেন যা তার কন্যা রীতা চাকমা উন্নয়নকর্মী) উত্তরাধিকার সূত্রে লাভ করেছেন।

প্রখ্যাত বেনবি পঞ্চলতা খীসা, জন্ম ১৯১৯ সাল(রাঙ্গামাটির বেইন টেক্সটাইলের মালিক বেনৰি মঞ্জুলিকা চাকমার মাতা) ১৯৬০ এর দশকে ১০১টি নক্সার একটি আলাম বুনেছিলেন।১৫

সম্ভবত: ১৯৬৪ সালে পঞ্চলতা খীসা, আরেক বেনৰি বাসন্তী দেওয়ান( ডা: হিমাংশু দেওয়ানের স্ত্রী) বেন প্রদর্শনের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে যান। তারা দু’জন আরও চারজন বাঙ্গালী কারুশিল্পীর সাথে ‘Artisans from East Pakista ‘ নামের সংবাদে ছবিসহ The Pakistan Times এ উপস্থাপিত হন। অনেক সম্মানে ভুবনের মাঝে পঞ্চলতা খীসার ১৯৬৪ সালে ‘East Pakistan Small Industries Corporation’ এর জন্য প্রথম পুরস্কার ও ১৯৮২ সালে ‘বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প সংস্থা’ থেকে শ্রেষ্ঠ কারুশিল্পীর সম্মানে ভূষিত হওয়া উল্লেখযোগ্য।

তেমনি আরেক বেনৰি শরৎ মালা চাকমা (শিল্পী কনকচাঁপা চাকমার মা) ১৯৮৪ সালে BSCIC এর ‘Master Craft persons’ ‘সম্মান’ অর্জন উল্লেখযোগ্য। এই বেনৰি তার আলামের জন্য খ্যাতি কুড়িয়েছেন প্রচুর।

তার আলামে ‘পাদি সাহৰাং ফুটে উঠেছে কালো সুতোয় সাদা ভূমির উপর। ২০০১ সালে বেনৰি মঞ্জুলিকা চাকমা তার আলামের জন্য পুরস্কৃত হন। সাম্প্রতিক সময়ে, ২০০৯ সালে নারী প্রবর্তনা কর্তৃক আয়োজিত ‘আদিবাসী বয়নশিল্পের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি প্রতিযোগিতায়’ ‘পাদি’ সাহবাং নক্সাকে বাধ্যতামূলক হিসেবে রেখে একমাস সময়ের মধ্যে আলাম বুনা হয়।

এতে কনিকা চাকমার ৪৫টি নক্সাসম্পন্ন আলাম প্রথম, দিপালী চাকমা ৪টি নক্সা সম্বলিত আলাম দ্বিতীয় ও ঝর্ণা চাকমা ৩৬টি নক্সাযুক্ত আলাম তৃতীয় স্থান অধিকার করে। এভাবে বেনৰিরা শতাব্দীর পর শতাব্দী বেনকে সমৃদ্ধ করে রেখেছেন ঘরে ও বাইরে, আঞ্চলিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সোপানে।

চাকমা বেনশিল্পে ‘পাদি সাহবাং নক্সাটি ‘গাচ’ বা ‘বৃক্ষ’ ও আরেকটি নক্সা ‘কল্পতরু’ বৃক্ষ হিসেবে রূপায়িত। অন্যান্য শত শত, কারো মতে মোট ২১০টি নক্সায় বিভিন্ন ছোট, বড় ফুল ফল, পাতা, সব্জী, প্রাণি, অলংকার ও ব্যবহার্য দ্রব্যাদি চিত্রিত হয়েছে।

‘পাদি সাহবাং’ নক্সাটি আলামের মধ্যমনি, এটি সবচেয়ে বড় নক্সা ও আলামের মাঝামাঝি অবস্থানে বুনা হয়। এ নক্সাটি আলামে ‘ফুলর-ৰাজা’ ৰা ‘শ্রেষ্ঠ নক্সা’ হিসেবে পরিচিত। এভাবে বেন শিল্পে ‘পাদি সাহবাং’ জীবন-বৃক্ষ শ্রেষ্ঠ চিত্র হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।

বেন ঐতিহ্যের মত চাকমা প্রাচীন কল্প-কথা বা পজ্জন ঐতিহ্যে বৃক্ষ কখনও রূপায়িত হয়েছে জীবন-সঞ্চারী হিসেবে এবং কখনও বা মাতারূপে। ১৭ ‘ক’বি,ধ’ৰি পজ্জনে বৃক্ষ মাতারূপে ‘আশাপূরণকারী বৃক্ষ’ হিসেবেও পরিচিত।

‘ক’বি, ধ’ৰি দুই বৈমাত্রেয় বোন। জৈষ্ঠজন ক’ৰি মাতৃহারা সত্যযুগের অপূর্বসুন্দরী এক নারী। তাকে কেন্দ্র করে এই পজ্জন সৃষ্টি হয়েছে। সত্যযুগ এমন এক যুগ যখন প্রত্যেকে সত্যি কথা বলত ও তার বাক্য সত্যে পরিণত হত।

ক’বির মাকে পজ্জনে পাওয়া যায় দুপুরের খড়রোদে তার স্বামীর সাথে জুম পরিষ্কার করতে। তৃষ্ণায় কাতর হয়ে সে স্বামীকে তাগাদা দেয় আর স্বামীও বলছিল ‘এ বাগকো ধুযোক অর্থাৎ এ অংশটা শেষ হোক’, এরপর স্বামী-স্ত্রী, বুড়ো-বুড়ি, পাহাড়ের নীচে নামে পানির খোঁজে।

এখানে হরিণের পায়ের খুঁড়ে তৈরী দু’টো কুয়োর সন্ধান মেলে। পানি নাড়ার সাথে সাথেই বুড়ির কুয়োর পানি ঘোলাটে হয়ে যায়, কিন্তু বুড়োর কুয়ার পানি থাকে পরিষ্কার। বুড়ো যখন কুয়োর ঠান্ডা , ফুটিক স্বচ্ছ পানি পান করছিল বুড়ি বায়না করছিল তাকে পানি খেতে দেওয়ার।

এতে বিরক্ত হয়ে বলে ‘দুর’ অর্থাৎ ‘দূরে সর’ এ শব্দটির আরেকটি চাকমা অর্থ হচ্ছে ‘কচ্ছপ’, বুড়ি এতে কচ্ছপে রূপান্তিরিত হয়ে উপত্যকার ছড়ায় নেমে যায়। বুড়ো, বুড়িকে হারিয়ে মনোকষ্টে বাড়ী ফিরে। দিন কাটে তার কষ্টে বিহ্বল হয়ে।

কিন্তু এক সময়ে বুড়ো আবার বিয়ে করে। এ ঘরানায় জন্ম নেয় ধ’বি। বুড়োর নতুন বৌ ধ’বিকে চোখের মনি করে রাখে আর ক’বিকে নিয়ত অবহেলা ও উপেক্ষা করে। ঘরে বাইরের সমস্ত কাজ করায়। বুড়ো সব বুঝতে পেরেও মুখ বুজে থাকে।

নতুন বৌ একদিন বুঝতে পারে তার সতীন কচ্ছপ হয়ে নদীতে আছে, সে তখন তার সতীনকে মেরে ফেলার জন্য বুদ্ধি আঁটে। হিংসায় অন্ধ নতুন বৌ বুড়োকে ছিপ বানিয়ে দেওয়ার আবদার করে।

ছিপ তৈরী হলে নতুন বৌ ক’বিকে নদীর ধারে বসিয়ে দেয় কচ্ছপ ধরার জন্য। ক’বিকে একবুক আশংকা, ভয়, কষ্ট নিয়ে ছিপ পেতে বসে থাকতে হয়। সে তার কচ্ছপ-মাকে ডেকে সতর্ক করে দেয়, ‘ও মা হেদেদি ন যেচ তেরাত ৰাযিবে, আগরো ন যেচ চেইঅত বাযিৰে, কুলদি ন যেচ বচ্যিত নাযিবে, মধ্যে মধ্যে থেচ’ অর্থাৎ ‘ও মা স্রোতের দিকে যেও না তেরায় (এক ধরনের ফাঁদ) ধরা পড়বে, উজানে যেও না চেই (ফাঁদ) এ আটকাবে, কুলে এসো না বড়শীতে বিঁধবে, মাঝ নদীতে থেক।’ কিন্তু একদিন কচ্ছপ-মা কুলে এসে বড়শীতে ধরা পড়ে।

নতুন বৌ মহাখুশীতে কচ্ছপের মাংস রান্নায় চড়িয়ে দেয়। রান্না ফুটতে থাকলে এক অদ্ভুত শব্দে ছড়া কাটা শোনা যায়: বক বক বক, বুড়ি মাধা হাঙ/বক বক বক, বুয্যে মাধা হাঙ’, ‘বক বক বক, বুড়ির মাথা খাই/বক বক বক,বুড়োর মাথা খাই।

নতুন বৌ, চমকে উঠে- একি কথা? সে পাতিলসহ রান্না ইজোর(বাঁশের তৈরী ঝুলন্ত বারান্দা) থেকে ছুড়ে দেয়। সেখানে বেড়ে উঠে এক বিশাল বিরিচ গাছ, যার বুকে আছে বিরাট ফাটল। বাড়ীর সব কাজ সেরে ক’বি ভরদুপুরে গাছের ছায়ায় বসে। তার মা রূপী বিরিচ গাছ তখন তাকে মমতায় ছায়া দেয়, বাতাস দেয়। এমনি করে দিন কাটে ক’বির।

একদিন খবর আসে রাজকুমার রাজ্যের সব সুন্দরীদের রাজপ্রাসাদে নিমন্ত্রণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের মাঝ থেকে বেছে নেবেন তার বধু, ভাৰী রাণী। বুড়োর বাড়ীতেও নিমন্ত্রণ আসল।

নতুন বৌ ধ’বিকে সিন্ধুকে তোলা নতুন, জমকালো পিনোন-খাদি পরালো, সাজালো বাহারী গয়না দিয়ে। আর ক’বির জন্য জুটলো পুরনো, জীর্ন পিনোন-খাদি। ক’বি ভাবে সে কি করে এই সাজে নিমন্ত্রণে যাবে। তার মা যদি বেচেঁ থাকতো তার এই অবস্থা হতো না।

এইসব ভেবে সে বিরিচ-বৃক্ষের তলে এসে গাছকে জড়িয়ে মনে মনে বলে-‘মা আমাকে রাজবাড়ীর নিমন্ত্রণে যাওয়ার জন্য ও সাজসজ্জা দাও’ থর থর কেঁপে উঠল বৃক্ষের ডাল-পালা, সবুজ পাতা, ঠান্ডা হাওয়ায় ভরে যায় চারিদিক।

ক’বি চোখ খুলে দেখে গাছের ফাটল ভরে তার জন্য উপহার- নানা রঙের পিনোন-খাদি, কানের অলংকার- কজফুল, বাজ্জুর, অলংকার,- হাজুলী, টেঙা ছড়া, চিক ছড়া, সীতা হার, হাতের বালা, কুজি হারু, বাহুর জন্য তাজ্জুর, পায়ের জন্য থেং খারু, নাকের নচ- আরো অনেক কিছু। ক’বি চন্দন স্নান সেরে পড়ে নেয় পিনোন-খাদি, সূক্ষ রুচির অলংকার।

অতিরিক্ত সৰ জমা দেয় গাছের ফাটলে। রাজবাড়ীর উৎসবে জূহানী, মানী, অপূর্ব সুন্দর রাজকুমার, ভাবী রাজা, ক’বির ব্যবহারে, স্বভাবে ও রূপে মুগ্ধ হয়। ক’বির পরিচয় নিয়ে বিয়ের দূত পাঠানো হয় রাজবাড়ী থেকে। ক’বির বিয়ে হয় সেই রাজকুমারের সাথে ও পরে রাণী হয়ে সুখে শান্তিতে রাজ্য পরিচালনায় সহায়তা করে।

বিরিচ বৃক্ষের মত ‘আশাপূরণকারী আরেক বৃক্ষ আছে। প্রধানতঃ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী চাকমাদের ধর্মীয় ঐতিহ্যে। এ বৃক্ষের নাম ‘কল্প-বৃক্ষ’ বা ‘কল্পতরু’। বৌদ্ধ ও হিন্দু  শাস্ত্রে এই বৃক্ষ স্বর্গোদ্যানের এক বৃক্ষ হিসেবেও উল্লেখ আছে।

বিজু উৎসবের শেষ দিন ৰা বৈশাখের প্রথম দিনে, বৈশাখী ও মাঘী পূর্ণিমায় দায়ক-দায়িকরা পাতা ও ফুলের মত বৃক্ষ সাজায় বিভিন্ন দানসামগ্রীতে বিদ্বান হওয়ার মানসে ঝুলানো হয় বই, ধনী হওয়ার মানসে অর্থ, উজ্জ্বল রং হওয়ার মানসে কাঁচা হলুদ ইত্যাদি।

মানস পূরণকারী এই বৃক্ষ চাকমা ঐতিহ্যে নারীরূপী বিরিচ বৃক্ষের মতই এক মঙ্গল-বৃক্ষ। বেনের ‘কল্পতরু’ নক্সা এই দেববৃক্ষের স্বরণে চিত্রিত। জীবন বৃক্ষ ‘পাদি সাহৰাং গাচ’ এর প্রতীকী মর্মার্থ (Sutitle Bold)।

যদিও নক্সাটি সংক্ষেপে ‘পাদি সাহবাং’ হিসেবে পরিচিত এর পুরো নাম ‘পাদি সাহবাং গাচ’, অন্যসব নক্সার মত এটি প্রস্থজুড়ে বুনে এক প্রশস্ত পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে আলামে ফুটিয়ে তোলা হয়। নক্সার এ চিত্রটির পাদদেশ ত্রিকোণাকার।

এ হতে উৎসারিত সরল, স্তম্ভের মত মধ্যকান্ড হতে তিনপর্বে দুইপাশে সমতায় ডাল বের হয়েছে মোট ছয়টি। প্রতিটি ডালের শাখা ফুলকুঁড়ির মত নেমেছে নিম্নমুখী হয়ে। কিন্তু মধ্যকান্ডের চুড়ায় মুকুট হয়ে থাকা অনেকটা হৃদয় আকৃতির ফুটন্ত পদ্মের মত ফুলটি রয়েছে আকাশমুখী হয়ে।

এছাড়া দুইপাশে সমতায় ডায়মন্ড আকৃতির তিনটি প্যাটার্ন উর্ধ্বপথে সাজানো। সর্বনিম্ন প্যাটার্নটি বড়, বাকী দুটি ছোট ও সমান আকারের। এই ডায়মন্ড প্যাটার্নগুলোর উন্নতির শিখরে ভেসে রয়েছে আরেকটি আকাশমুখী ফুটন্ত পদ্ম।

এই উর্ধ্বপথের ত্রয়ী-ডায়মন্ড ও ফুটন্ত পদ্ম, মধ্যকান্ডযুক্ত প্রতিটি বৃক্ষ প্যাটার্নকে আলাদা করেছে। প্রবন্ধের এই অংশে ‘পাদি সাবাহাং গাচ’ নক্সার প্রতীকী মর্মার্থ আলোচনা করা হল।

‘পাদি সাহাবাং গাচ’ পদটির মূল-বুৎপত্তি বিশ্লেষণে (etymological analysis) প্রথম পদ ‘পাদি’ এর উৎপত্তি হতে পারে ‘পাদা’ অর্থাৎ ‘পাতা থেকে। ‘পাদি’ নারী সম্পর্কিত শব্দ। চাকমা ভাষায় সচরাচর নারী সম্পর্কিত শব্দে ই-কার বা ‘ই’ প্রত্যয় যোগ থাকে।

যেমন ডাকে বা নামে, মামি (মামী), হাক্কি (কাকী), ভুজি (বৌদি), ঝি (কন্যা), পুদি (কন্যা এর বিপরীত শব্দ ‘পুদ’ মানে ‘পুত্র’) ইত্যাদি। দ্বিতীয় পদ ‘সাবাহাং’ অর্থ হতে পারে (স্বয়ং) ছাপ দিই’ বা ‘(স্বয়ং) চিত্রিত করি’।

তৃতীয় পদ ‘গাচ’ অর্থ ‘গাছ’ বা ‘বৃক্ষ’। এভাবে এর পুরো অর্থ দাঁড়ায় ‘ স্বয়ং চিত্রিত পত্র বৃক্ষ’, যেখানে ‘পাদি’ শব্দের মাধ্যমে এটিকে নারী হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়েছে।

আবার দ্বিতীয় পদ ‘সাবাহাং’ এর উদ্ভব হতে পারে ‘সাহব+আঙ’ থেকে। ‘সাহৰ’ অর্থ স্থান ‘ছান দেওয়া বা চিত্রিত করা’ ও ‘আঙ’ হচ্ছে মন্ত্র-তন্ত্র ব্যবহারে এ ধরনের চিত্র যাকে ‘মন্ডল (cosmos) বলা যেতে পারে, যেহেতু ‘আঙ’ চিত্র কসমলজিক্যাল বা বিশ্ব ব্রহ্মান্ড বিষয়ক ধারনাকে রূপ দেয় ও তন্ত্র হিসেবে কাজ করে। মহাযানী বৌদ্ধ অনুশাসনে মন্ডলের ব্যবহার ব্যাপক।

এছাড়াও হিন্দু, শৈব ও অন্যান্য ঐতিহ্যে এর বহুল প্রচলন রয়েছে। এভাবে এর অর্থ হতে পারে ‘পত্র চিত্রিত মন্ডল বৃক্ষ’ বা ‘পত্র চিত্রিত বিশ্বব্রহ্মান্ড বৃক্ষ’। চাকমা বৈদ্য ঐতিহ্যেও ‘আঙ’ বা মন্ডলে চিত্র তাবিজে তন্ত্রোক্ত মারন-মোহন-বশীকরণ-উচাটন-স্তম্ভন ক্ষেত্রে ব্যাপক ব্যবহার করা হয়।২০

‘পাদি সাবাহাং গাচ’ আকৃতি বা গঠন শৈলী বিশ্লেষনে প্রথমত নির্দেশ করে দিক  (direction) : অধঃ, অন্তরিক ও উর্ধ্ব, এবং বাম, ডান ও মধ্য রেখা বা পথ। এই নক্সাটি অধঃ থেকে বুনে নেওয়া, মধ্য পথ থেকে বাম ও ডানে প্রসারিত হয়ে, উর্ধ্ব পথে বেড়ে উঠা বৃক্ষ।

এর ত্রিকোনাকৃতির পাদদেশ শিকড়ের সমতুল্য, যা মাটি ও জলের গভীরে প্রোথিত। এলিভেশনে ৰা উন্নতিতে বোনা এ নক্সার সরল মধ্য কান্ড শুদ্ধ হয়ে মুকুট করে রেখেছে এক আকাশমূখী পদ্ম বা সূর্যের মত ফুটন্ত ফুলকে।

হিন্দু ও বৌদ্ধ শাস্ত্রে ও শিল্পে সাধনায় পদ্ম ও সূর্যকে সমার্থক পাওয়া যায়। এসব ঐতিহ্যে আধ্যাত্মিক সূর্য হচ্ছে বোধ বা জাগরনের প্রতীক, আর প্রতিদিনের সূর্য হচ্ছে দিক ও সময়ের নির্দেশক।

বৃহদ আরন্যক উপনিষদ, VI, 3.6, এই আধ্যাত্মিক সূর্যকে স্তুতি করেছে। শীর্ষের অনন্য পদ্ম (the, one lotus of the zenith) হিসেবে। ফুটন্ত পদ্ম সৃষ্টি, চেতনা বা বোধ জাগরনের প্রতীক। বৌদ্ধ ও হিন্দু ঐতিহ্যে বিশ্ব ব্রহ্মান্ড সৃষ্টি ধারনায় ‘মেরু পর্বত’ প্লান হিসেবে মহাসমুদ্রে ভাসমান এবং ‘চতুর্দল পদ্ম’ বা ‘চার পাপড়ির পদ্ম’ বলে বর্ণিত হয়েছে।

শাস্ত্রে মেরুপর্বত এলিভেশন হিসেবে উঠে এসেছে সমুদ্র গর্ভ থেকে ইন্দ্রের স্বর্গকে চূড়ায় নিয়ে। তেমনি এই দুই ঐতিহ্যে ধ্যান, বিভিন্ন যোগ ও তান্ত্রিক সাধনায় পদ্ম মানুষের চেতনা বা বোধ জাগরনের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

শরীরের সর্বোচ্চ শক্তির আধার ‘মস্তিষ্ক চক্র’ কে বর্নণা করা হয়েছে কখনও বা ‘উষ্নীষ কমল’ বা ‘উষ্নীষ পদ্ম’, ‘সহস্র কমল’, ‘সহস্রার চক্র’ ইত্যাদি নামে। চাকমাদের বর্তমান থেরাবাদ বৌদ্ধ ঐতিহ্য ছাড়াও বিভিন্ন আধ্যাত্মিক সাধনা ও অনুশাসনে দেহ চক্র ছাড়াও তিন মূল নাড়ির উল্লেখ রয়েছে।

মেরুদন্ডের সমান্তরালে মধ্য নাড়ির দু’পাশে রয়েছে ইংগলা ও পিংগলা নাড়ি, যেখানে বায়ু শ্বাস-প্রশ্বাস রূপে শরীরকে সুস্থ রাখে। মধ্য নাড়ি সুষুম্মায়, ইংগলা ও পিংগলার বায়ু শাসনে এনে সাধক তার শরীরের বিভিন্ন পর্বের শক্তির আধার বা চক্রদের ভেদ করে উর্ধ্বপথে বায়ু এনে যোগবল আয়ত্ত করে। চাকমা তান্ত্রিক বা চিকিৎসা শাস্ত্রে তিন নাড়ির বর্নণা এসেছে এভাবে;

বাহাত্তর হাজার নাড়ি শরীরের পর
লহরে আছয়ে জান ঐ সপ্ত সায়র ।।
এই নাড়ির মধ্যে জান দশ নাড়ি সার,
বৈদ্যগনে ভিন্ন করি তিন নাড়ি করিল প্রচার ।।
ইংগলা পিংগলা সুষুমা যে হয়
বুকে পিঠে তিন রসে খিচিয়ে আছয়।।২১

এই তিন নাড়ি, দুই দরজা ও মুরখামের মাধ্যমে চাকমা আবাস স্থাপত্যে ধাবিত

হয়েছে।২২

দেহের সর্বনিম্ন চক্রে কুলকুন্ডলিনী শক্তি ঘুমিয়ে থাকে। বৈদ্য ও অন্যান্য আধ্যাত্মিক সাধকরা সাধনা যোগে এই শক্তিকে জাগিয়ে তুলে সুষুম্মার মাধ্যমে উর্ধ্ব পর্বেও চক্রদের ভেদ করে মস্তিষ্ক চক্রের পদ্ম বা সূর্যকে প্রস্ফুটিত করে। এইভাবে আয়ত্ব করা হয় আধ্যাত্মিক জাগরন বা বোধ।

‘পাদি সাহবাং গাচ’ এর মধ্য কান্ড বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের ‘মেরু পর্বত’ বা শরীরের ‘সুষুম্মার’ প্রতিরূপ, যা শিকড়, সমুদ্র গর্ভ বা নিম্ন চক্র থেকে বেড়ে উঠে সর্বশীর্ষে পদ্ম বা সূৰ্য্য ফুলকে মুকুট করে রেখেছে। এইভাবে ‘পাদি সাহবাং গাচ’ শব্দ বুৎপত্তি, গঠন শৈলী ও প্রতীকী বিশ্লেষনে চাকমা বেন ঐতিহ্যেও অপরূপ জীবন বৃক্ষ।

তথ্যসূত্র:

১. এ রচনায় প্রতীক শব্দটি ইংরেজী Symbol অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। Symbol (প্রতীক) Sign (চিহ্ন) যদিওবা সমার্থক অর্থে ব্যবহৃত হয়, ভারতীয় ঐতিহ্য সম্বন্ধীয় স্কলার কুমারস্বামী Symbol এর যথার্থ তাৎপর্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে প্রতীক ও চিহ্নের ভিন্নতার কথা উল্লেখ করেন।

তাঁর মতে প্রতীক উপস্থাপন করে কোন ধারনাকে আর চিহ্ন উপস্থাপন করে কোন বস্তু বা জিনিসকে। একই চিত্র বা বস্তু প্রেক্ষাপট অনুসারে প্রতীক ও চিহ্ন উভয়ই হতে পারে। উদাহরন স্বরূপ তিনি বলেছেন ক্রস যখন ক্রসরোড বুঝায় তখন এটি একটি চিহ্ন, কিন্তু সে যখন স্ট্রাকচার অফ দ্য ইউনিভার্স বুঝায় তখন এটি একটি প্রতীক। অনেক স্কলার তাঁদের রচনায় Symbol এর তাৎপর্য অত্যন্ত নিপুনতায় তুলে ধরেছেন।

যেমন: আনন্দ কুমারস্বামী , ১৯৮৯; পৃঃ ১২৩ ও ১২৬, Rene Guenon , ১৯৪৫, পৃঃ ১১০-১৩২; Nasr, ১৯৮১, পৃঃ ৬৮; ভারতীয় স্থাপত্যে এর জন্য দেখুন Adrian Snodgras ,১৯৮৫; Kabita Chakma, ১৯৯৩ ইত্যাদি।

২. Maitri Upanisad, Vol. 4, S, Radhakrishnan, ed.,The pricipal upanisad (Delhi: Oxford University Press, 1990 inprenion), 817-818

৩. Stella Kramrisch, unknown India, Ritual Art in tribe and Village (Philadelphia : Philadelphia museum of Act, 1968)

৪. কবিতা চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা জাতির নিজস্ব লোকশিল্পের মূল নক্সা এবং এতে নিয়োজিত নারীদের অর্থনৈতিক মান উন্নয়নে গবেষণা (ঢাকাঃ রিসার্চ ইনিশিয়াটিস বাংলাদেশ, ২০০৪), ১

৫. অতীন্দ্র মজুমদার, চর্যাপদ (কলিকাতা: নয়া প্রকাশন, ১৯৮১, চতুর্থ মুদ্রণ), ১৫০-১৫১

৬. তিব্বতী নাম, সৈয়দ আলী আহসান, চর্যাগীতি প্রসঙ্গ (ঢাকা: বাংলা একাডেমী, ১৯৮৫), ১০

৭. মুহম্মদ আব্দুল হাই ও আনোয়ার পাশা, চর্যাগীতিকা (ঢাকা: স্টুডেন্ট ওয়েজ, ১৯৮৬), ৭

৮. মুহম্মদ আব্দুল হাই ও আনোয়ার পাশা, চর্যাগীতিকার (ঢাকা: স্টুডেন্ট ওয়েজ’ ১৯৮৬), ১৭-১৮

৯. চর্যাপদে ‘বেন’ শব্দটির দৃষ্টি আকর্ষনের জন্য আমি সোসিয়াল মিডিয়ার নভেম্বর ২০১৪ এক আলোচনায় অংশগ্রহনকারী ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায়, ইঞ্জিনিয়ার পুলক জীবন খীসা ও অনেকের কাছে কৃতজ্ঞ।

১০. সুহৃদ চাকমা, চাকমা সাহিত্যের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ, আলবেরুনী হল বার্ষিকী (সাভার: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ১৯৮০)

১১, সুগত চাকমা, et. Al. সম্পাদিত, রাধামন ধনপুদি (রাঙ্গামাটিঃ উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, ২০০৪), ১৩৮-১৪০

১২. নন্দলাল শর্মা, চাকমা লোকসাহিত্য (ঢাকা: সূচীপত্র, ২০০৯), ২৪-২৮

১৩. বিরাজ মোহন দেওয়ান, চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত (রাঙ্গামাটি: উদয় শংকর দেওয়ান, ২০০৫, দ্বিতীয় সংস্করন), ফুটনোট ২৭, ১১

১৪. Raja Tridiv Roy, The Departed Melody (Islamabad: PPA Publication, 2003), 53

১৫. ibid, 126

১৬. Manjulika Chakma & Niaz Zaman, Strong Backs Magic Fingers, Traditions of Backstrap Wearing in Bangladesh (Dhaka: Nymphea Publication, 2010), 28, 31

১৭. ibid.. 28. তবে চাকমা বেন শিল্পে নক্সার সংখ্যা ২১০টি আরও খতিয়ে দেখা দরকার। ভবিষ্যতে নক্সা ও সংখ্যা নিয়ে অনেক গবেষণা করবেন বলে আশা করা হল।

১৮. চাকমা নারীর বিভিন্ন অলংকারের জন্য দেখুন, রানী তাতু রায়, ফুলৰাৱেং (ঢাকা: ১৯৯৩), ১২

১৯. বিষ্ণুপুরান ব্যমায়ন মহাবদ্ধি জাতক কলিঙ্গবোধ জাতক।

২০. ডাঃ ভগদত্ত খীসা, চাকমা তালিক চিকিৎসা (রাঙ্গামাটি হারবাল মেডিসিন সেন্টার কমিটি, ১৯৯৬), ১৯,২০ ও ২১

২১. প্রাগুক্ত, ২৮

২২. Kabita chakma, The Androgynous House: The symbolism of Chakma Domestic Architecture, Architectural Theory Review (Vol 6, no 2, 2001), 12-27; Kabita Chakma, Building a Bamboo Mountain: The Chakma house and the cosmology of mount mera, Architectural Theory Revieue (vol 8, no 2. 2003),59-70

লেখক : কবিতা চাকমা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator