icon

ত্রিপুরী লোককথা: ম্যাজিক কৌটো

Jumjournal

Last updated Apr 21st, 2021 icon 145

অনেক দিনের কথা। দুই মেয়ে ছিল এক ত্রিপুরী দম্পতির। বড় মেয়ে যখন খুব ছোট তখন একটানা রোগে ভূগে মৃত্যু হয় তার মায়ের।

সারাদিন জুমের কাজে ব্যস্ত থেকে মেয়েকে দেখে শুনে রাখার খুব অসুবিধা হচ্ছিল। গ্রামবাসী, নিকট আত্মীয়দের পরামর্শে আবার বিয়ে করলেন গৃহকর্তা। বিয়ের পরের বছরই ছোট মেয়ের জন্ম।

নতুন মাকে পেয়ে বড় মেয়ে খুব খুশি। মেয়েরা বড় হয়েছে। জুমের কাজ, ঘর ঘরসংসারের কাজে সাহায্য করে মা-বাবাকে।

ওদের জুম ক্ষেতের পরিমাণ এখন অনেক বেশী। মা, বাবা, দুই মেয়ে- চারজনে সমান তালে কাজ করলে তবে জুমের কাজ শেষ হয়। সেবার অগ্রহায়ণের শেষাশেষি। জুমের ধান কাটা শেষ।

অন্যান্য কিছুন্সলের সাথে জুম ক্ষেতের বাকী অংশের প্রায় সবটাই কার্পাস গাছে ভরা। এবার কার্পাসের বীজ বেশী বোনা হয়েছিল।

শীতের লাইসাম্পি, লেপ সব পুরনো হয়ে গেছে। তাছাড়ার সমতলের অনেক চাষী বন্ধুরা বলে রেখেছিল- লেপ, তোষক বানাবে। পৌষের প্রথমেই কার্পাসের বীজ পেকে ফেটে গেছে। সারা জুম ক্ষেত সাদা হয়ে আছে। আর দেরী করা যাবেনা।

এখনই পেড়ে নিতে হবে সব কার্পাস। চার জনে মিলে সকাল-সন্ধ্যে কাজ করে দু’তিন দিনেই ঘরে তুলে আনল সব কার্পাস। বীজগুলো থেকে তুলো ও বের করে নিল সবাই।

সেদিন ভোর বেলা। ঘুম থেকে উঠে গোদকভাত খেয়ে বাবা বেরিয়েছেন গ্রামের অন্য কয়েকজন পুরুষের সাথে-জুম চাষের জন্য নতুন টিলার খোঁজে।

মা আর ছোট বোন গেছে পাশের বনে। জ্বালানী কাঠ আনতে। বড় মেয়ের উপর দায়িত্ব পড়ল কার্পাস তুলো ধোনার।

সবাই বেরিয়ে যাবার পর ঘরের দরজা বন্ধ করে তুলো ধুনতে বসল মেয়ে। কিছুক্ষণ পর মা ও ছোট মেয়ে বন থেকে কাঠকুটো নিয়ে ফিরে এল। ঘরে বসে তুলো ধোনার ফলে সারা ঘর ভরে গেছে তুলোর আঁশে।

কান্ড দেখে রাগ হলো মায়ের,“বুদ্ধি সুদ্ধি একদমই নেই দেখছি তোর! সারা ঘর তুলোর আঁশে ভরে গেছে, সেদিকে নজর নেই! ধুনছিলি তো ধুনেই যাচ্ছিস! সারা উঠোন পড়ে আছে, যা, সেখানে গিয়ে তুলো ধুনগে যা!”

মায়ের কথায় কিছুটা মন খারাপ হল বড় মেয়ের। বাকি তুলে নিয়ে উঠোনের এক কোণে গিয়ে বসল তুলো ধুনতে।

কিন্তু সেখানেও সুবিধে হল না। গাছের শুকনো পাতা ঝরে পড়ে মিশে যেতে লাগল তুলোর সাথে। রেগেমেগে বড় বোন তুলোর পাত টিটংঘরের চালের উপর গিয়ে বসল।

 টংঘরের চালের মাঝখানে বসে একমনে তুলে ধুনে ধুনে পিঠের খারায় রাখতে লাগল বড় বোন।

ম্যাজিক কৌটো
তুলা হারানোতে বড় বোন কাঁদছে। ছবি- সুরেশ চাকমা

সূৰ্য্য তখন প্রায় মাঝ আকাশে। হঠাৎ দমকা বাতাস এসে খারায় রাখা সব তুললা উড়িয়ে নিয়ে গেল। আচমকা এমন ঘটনায় ভীষণ ঘাবড়ে গেল বড় বোন।

উড়ন্ত তুললাগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। অনেক কষ্ট করে ধুনে ফেলেছিল তুললাগুলো। দুঃখে মন ভার হয়ে গেল। ছল ছল চোখে ভাবতে লাগলো কি জবাব দেবে মাকে।

বড় বোনের এই অবস্থা দেখে বাতাসের সহানুভূতি হল। “রোদের তাপে টংঘরের চালে বসে কাঁদছিস কেন একা বসে! কি হয়েছে তোর?”

বড় বোনকে ডেকে জিজ্ঞেস করল বাতাস। বাতাসের কথায় কিছুটা ভরসা পেল বড় বোন। বাতাসকে মামা সম্বোধন করে খুলে বলল সব কথা -ধুনে রাখা তুলো উড়িয়ে নিয়ে যাবার কথা। “এতে আর এত ঘাবড়ানোর বা মন খারাপ করার কি আছে! চল যাবি নাকি আমার বাড়িতে! অনেক অনেক তুলে দিয়ে দেব তোকে”।

বাতাস মামার প্রস্তাবে এক কথায় রাজি হয়ে গেল বড় বোন। বাতাস মামার পিঠে চড়ে যাওয়া আর ফিরে আসা কতক্ষণই বালাগবে।হারানো তুললাগুলো তো পাওয়া যাবেই;-উপরন্তু বাতাস মামার পিঠে চড়ে আকাশ পথে ঘোরার অভিজ্ঞতাটিও দারুণ হবে।

 টিলা, পাহাড়, আকাশ, নদী পেরিয়ে আকাশ পথে দেখতে দেখতে বাতাস মামার বাড়ি চলে এল বড় বোন। সব কিছু ছবির মতো দেখা যাচ্ছিল।

বাতাস মামার বাড়ি আসতেই খুব আদর করলেন দিদা- বাতাস মামার মা। বিন্নি চালের পিঠা বানিয়ে খাওয়ালেন।

গল্প-গুজব করতে করতে প্রায় সন্ধ্যে হয়ে এল। এরই মধ্যে খুব ভাব হয়ে গেছে দিদার সাথে।

বড় বোন বাতাস মামাকে তাড়া দিল,“কি গো বাতাস মামা! চল শিগগির! রাত করে বাড়ি ফিরলে মায়ের বকুণি খেতে হবে!তুললাগুলো দিয়ে আমাকে বাড়ি পৌঁছে দাও।”

“কিরে মেয়ে! এইতো সবে এলি! এসেই বাড়ি ফেরার তাগাদা দিচ্ছিস! কয়েকটা দিন থেকে যা! তোর মামা তো বাড়িতে থাকেই না; সারাটা দিন একা একাই সব কিছু করতে হয় আমাকে।

তুই ক’টা দিন থেকে গেলে আমার খুব ভাল লাগবে। বাড়ির জন্যে কিছু চিন্তা করিস না।

বলবি বাতাস মামার বাড়িতে কিছুদিন থেকে এসছি-তা হলে আর বাবা মা কিছু বলবে না। ” দিদাকে খুব ভাল লেগে গিয়েছিল; দিদার অনুরোধ না রেখে পারলনা বড় বোন। বলল,“ঠিক আছে তুমি যখন বলছ তখন থেকেই যাই কিছুদিন।”

সন্ধ্যেয় সন্ধ্যেয় খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল দু’জনে। পরদিন কাক ভোরে ঘুম ভেঙে গেল বড় বোনের। দিদা অবশ্য অনেক আগেই বিছানা ছেড়ে বাইরে চলে গেছেন। প্রথমটায় একটু কেমন কেমন লাগল-নতুন জায়গা ততা।

সত্যি কথা বলতে কি -ঘুম ভাঙার সময় ভুলেই গিয়েছিল বাতাস মামার বাড়িতে ঘুমানোর কথা। আগের দিনের ঘটনা। “কিরে ঘুম ভেঙেছে”-দিদার ডাকে ঘোর কাটল।

ওপাশের ঝরণার জলে হাত মুখ ধুয়ে আয়। শিঙ্গি মাছ আর কাঁচা হলুদ দিয়ে গোদক বেঁধেছি। খেয়ে জুমে যাব। সার আগাছারাই খেয়ে ফেলবে। জুমের ফসল ভাল হবে না”।

 দিদার জুম ক্ষেত দেখে তো বড় বোন থ। এই বয়েসে প্রচুর পরিশ্রম করতে পারেন দিদা। মানতেই হবে।

তা নইলে এত বড় জুম একা সামলান! জু’জনে মিলে আগাছা বাছাইয়ের কাজ শুরু করে দিল। দিদার হাত তো নয়; যেন মেশিন, দুই হাতে সমান তালে আগাছা উপড়ে চলেছেন। বড় বোনও কম যায় না।

দিদার সাথে প্রায় সমান তালেই আগাছা বাছাই করে চলেছে। কাজ দেখে দিদা খুব খুশী। “খুব ভাল কাজ শিখেছি তো? তুই যদি আমার সঙ্গে থাকিস তাহলে তিন দিনের মধ্যেই আগাছা সব পরিস্কার করে দিতে পারবে।”

দুপুরে পাশের ঝরণার জলের চান করে, মোচা ভাত খেয়ে দু’জনে মিলে শেষ বিকেল অব্দি কাজ করল জুমে।।

বাড়ি ফিরে জুম থেকে আনা কিছু আনাজপাতি, জ্বালানী কাঠ রেখে হাত, মুখ ধুয়ে চটপট রান্না সেরে নিলেন দিদা। তারপর খেয়ে দেয়ে শুয়ে শুয়ে দুজনে গল্প করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লেন।

পরদিন ভোর বেলা যথারীতি খাওয়া দাওয়া সেরে দু’জনে চলে এল জুমে। নিপুণ হাতে একমনে কাজ করে চলেছে বড় বোন। “সত্যি দারুণ কাজের মেয়ে”।

দিদা খুব খুশী বড় বোনের কাজে। গুণগুণ করে গান ধরেছে দিদা। -জুম বাছাইয়ের গান। মাঝে মধ্যে গাছের ছায়ায় বসে বাঁশের হুঁকোয় তামাক খেয়ে বিশ্রাম করে নিচ্ছেন।

বড় বোনের ক্লান্তি নেই। একটানা কাজ করেই চলেছে।“এভাবে কাজ চালালে আগামীকালের মধ্যেই জুম বাছাইয়ের কাজ শেষ হয়ে যাবে মনে হচ্ছে।

তুই না এলে দশদিনেও আমি তা পারতাম না। আর যাই করিস না কেন দিদিভাই-তুই আমার জুম বাছাইয়ের কাজটা শেষ করে তবে বাড়ি ফেরার বায়না ধরিস।”

দিদার কথায় দারুণ উৎসাহ পেল বড় বোন। কাজের গতি বাড়িয়ে দিল আরও। দুপুরের খাবার খেয়ে শেষ বিকেল অব্দি জুমের কাজ করে দিদার সাথে ফিরে এল বাড়ি।

গা-হাত, পা ধুয়ে খেয়ে দেয়ে দিদার পাশে শুয়ে পড়ল বড় বোন। কথাবার্তার ফাঁকে এক সময় বলল, “দিদা! দিদা! জুম বাছাইয়ের কাজ শেষ হলে কিন্তু বাতাস মামাকে বলবে আমাগে বাড়ি পৌঁছে দিতে। – দু’দিন হলো বাড়ি ছাড়া।

মা-বাবা, ভীষণ দুঃশ্চিন্তায় আছেন। ওদের কথা খুব মনে পড়ছে।”“তুই ভেবেছিল কি, বলত? আমি কি তোকে জোর করে আটকে রাখব।

মামার বাড়ি বলে কথা! এসে অন্তত তিনটা রাত না কাটিয়েই চলে যাবি? ঠিক আছে যা, কালকের মধ্যে জুমের কাজ শেষ হয়ে গেলে তোর বাতাস মোমাকে বলব পরশুই তোকে বাড়ী পৌঁছে দিয়ে আসতে।

এখন নিশ্চিন্ত মনে ঘুমো তো।” বললেন দিদা। কালকের মধ্যে জুমের কাজ শেষ করতে পারলে পরশু বাড়ী ফেরা যাবে। দিদার মুখে এই কথা শুনে ঘুম আর এল কোথায়। সারারাত মা, ছোট বোনদের কথা ভেবে ভেবেই কাটিয়ে দিল বড় বোন।

রাত তখনো শেষ হয়নি। আস্তে আস্তে দিদার পাশ থেকে উঠে এল বড়বোন। দরজা খুলে বাইরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে উনুন জ্বালিয়ে ভাত আর গোদক রান্না করে ফেলল। মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙল দিদার।

পাশে নাতনি নেই; সারা ঘর ম ম করছে গোদকের গন্ধে। পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখল রান্না করছে নাতনি। প্রথমে কিছুটা অবাক হলেন। নাতনিকে বললেন,“কিরে! এত সকাল সকাল উনুন জ্বালিয়ে রান্না করছিল! খুব ক্ষিদে পেয়েছ বুঝি?

পাবেই তো!কাল সারাদিন যা পরিশ্রম করেছিল তার তুলনায় রাতে তো কিছুই খাসনি!

এখনও লজ্জা কাটেনি তোর!” “আরে না গো না! তুমি যে কি বল! ক্ষিদেটিদে পায়নি! একটু আগে ঘুম ভেঙে গেল; ভাবলাম রান্নাটা সেরে রাখি।”-বলল বড় বোন।

উত্তর শুনে বেশ আদুরে সুরে দিদা বললেন,“তা মন্দ করিস নি!

আগে ভাগে খেয়ে দেয়ে জুমের কাজে যাওয়া যাবে। বড় বোনেরও উদ্দেশ্য তাই – যে করেই হোক আজকের মধ্যে শেষ করে ফেলতে হবে জুমের কাজ।

তারপর কাল সকালে বাতাস মামার পিঠে চড়ে ফিরে যেতে হবে বাড়ি। ঘর থেকে বেরিয়ে হাত-পা ধুয়ে এলেন দিদা, তারপর খেয়ে দেয়ে কাক ভোরেই চলে গেলে জুমে। দুপুরের মধ্যেই প্রায় শেষ হয়ে এল জুম বাছাইয়ের কাজ।

চলেছে বাতাস মামার দেশে
চলেছে বাতাস মামার দেশে । ছবি- সুরেশ চাকমা

বড়বোনের এত চটপটে কাজ দেখে দিদা একেবারে আহ্লাদে আটখানা। বললেন,“তুই যেভাবে কাজ করছিস তাতে আর অল্প সময়ের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে জুম বাছাইয়ের কাজ।

আর তুই তো একাই করে ফেলতে পারবি। আমি বরঞ্চ ঘরে ফিরে গিয়ে তুললাগুলো রোদে দিয়ে শুকিয়ে রাখি।

কাজ শেষ করে তুইও চলে আয় বাড়ি। দুপুরের খাবার ঘরে বসেই খেয়ে নেয়া যাবে।”

দিদা চলে যেতে ঝড়ের বেগে কাজ করতে লাগল বড় বোন এবং অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই শেষ করে ফেলল জুমের কাজ।

সুৰ্য্য তখন ঠিক মাঝ আকাশে। একটু জিরিয়ে নেবার জন্যে এবার জুমের শেষ প্রান্তে বসে পড়ল বড় বোন। বিরামহীন কাজ করে খুব ধকল গেছেশরীরে।হঠাৎ চোখ পড়ল এখটি স্ট্রা গাছের নীচে।

আগাছায় ছেয়ে আছে গোটা গাছের চার পাশ; তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ঐ টুকু জায়গাই নিড়াননা বাকি রয়ে গেছে।

এতক্ষণে শরীরটাও কিছুটা চাঙ্গা হয়েছে। উঠে গিয়ে ভূট্টা গাছটির আগাছাগুলো উপড়ে ফেলল বড় বোন।

তারপর ছুড়ে দিল জুম ক্ষেতের বাইরে। বাড়ি চলে আসবে এমন সময় নজরে পড়ল আগাছা উপড়ানো ভূট্টা গাছের নিচের সরে যাওয়া মাটির তলায় চকচক করছে কি একটা ধাতব জিনিস।

হাত দিয়ে মাটি সরাতেই বেরিয়ে এল ছোট একটি রূপোর কৌটো।

ম্যাজিক কৌটো
বড় বোন ম্যাজিক কৌটো পেল। ছবি- সুরেশ চাকমা

দিদাকে দিলে খুব খুশী হবেন; পান, সুপারী রাখতে পারবেন। -এই ভেবে কৌটোটি নিয়ে বড় বোন ফিরে এল ঘরে।

চানটান সেরে অপেক্ষা করছিলেন দিদা। নাতনিকে আসতে দেখে একটু জোর গলায় বললেন,“ও পাশের ঝরণায় চান সেরে চলে আয়।

আমি খাবারের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।” দিদার কথামত চান সেরে চলে এল বড় বোন। কুড়িয়ে পাওয়া রুপোর কৌটোটা দিদার হাতে দিয়ে বলল, “জুমের শেষ প্রান্তে মাটির তলায় পেয়েছি এটা।

তুমি পান সুপারি রাখতে পারবে।” “কি যে বলিস! এই বুড়ো বয়সে রূপোর কৌটোর পান সুপারি রাখলে লোকে হাসবে।

তার চেয়ে তুই এটা বাড়ি নিয়ে যাস। তোর অনেক কাজে লাগবে।” বড় বোন আপত্তি জানাল। কিন্তু দিদা তা কানেই তুললেন না। বললেন,“কাপড়-চোপড় পাল্টে আগে খেয়ে নে। কৌটো নিয়ে পরে চিন্তা করা যাবে।

খাওয়া সেরে দিদা নাতনি গল্প করলেন অনেকক্ষণ। তারপর দিদা বসলেন বিন্নি চালের পিঠে বানাতে।

বেড়াতে এসে অনেক কাজ করেছে নাতনি। কাল চলে যাবে। যাবার আগে একটু আরাম-আয়েশ করে যাক। টং-এর মাচায় কিছুক্ষণ বসে থেকে বড় বোন চলে এল দিদার পাশে।

অনেক পিঠে বানালেন দিদা। শেষ বিকেলের আলোয় পাখিরা চারপাশে কিচির মিচির গান ধরেছে। একটু পরেই সূর্য ঘুমিয়ে পড়বে আঁধারের লেপ মুড়ি দিয়ে।

দিদা আর নাতনি পেট ভরে পিঠে খেলেন। কলাপাতায় মুড়ে অনেকগুলো পিঠে রেখে দিলেন। কাল নাতনির সঙ্গে দিয়ে দেবেন, বাড়ি নিয়ে যাবার জন্যে।

সারারাত দু’জনের ঘুম হল না। শুয়ে শুয়ে গল্পে গল্পেই কেটে গেল রাতটা। ভোর বেলা চান সেরে বাড়ি ফেরার জন্য তৈরী হয়ে গেল বড় বোন।।

নতুন ধারায় জুমের ফসল, পিঠে, তুলো আর সেই রূপোর কৌটোটা ভরে দিলেন দিদা।

রূপোর কৌটো দেখে নাতনি বলল,“এটা নিয়ে আমি কি করবো! বললাম না তোমাকে পান সুপারি রাখতে। মুচকি হেসে দিদা বললেন, “তুই যে কি? শুধু ভাল কাজই শিখেছিস!

কাজের অনুপাতে বুদ্ধি হয়নি তোরা জানিস এটা কি! এটা হল একটা ম্যাজিক কৌটো। রাতে ঘুমানোর সময় শিয়েরর নিচে নিয়ে ঘুমবি। মাঝরাতে কৌটো খুলে যা চাইবি তাই এনে দেবে তোক।

তবে সাবধান! কাউকে বলবি না কিন্তু এসব কথা। আসলে দিদাই রেখে এসেছিলেন কৌটোটি জুমের শেষ প্রান্তে। নাতনি যেমন নিপুণভাবে কাজ করে, ও ঠিক খুঁজে পেয়ে যাবে এটা-এই ভেবে।

দিদার কথা শেষ হতে না হতে বতাসমামা এসে হাজির। আর দেরী না করে দিদার কাছে বিদায় নিয়ে বাতাস মামার পিঠে চড়ে বসল বড় বোন।

দিদা নাতনি দু’জনেরই চোখ ছল ছল। এই ক’দিনেই দারুণ ভাব হয়ে গেছে দু’জনের। মাঝে মধ্যে আমাকে দেখে যাবি কিন্তু!

তোর বাতাস মামাকে বললেই পৌঁছে দিয়ে যাবে।” বিদার কথা শেষ হতেই উড়তে শুরু করল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই পৌছে এল বড় বোন।

বলে গ্রাম ছেড়ে কয়েকদিন কাটিয়ে আসায় বড় মেয়ের উপর ভীষণ রেগে গেছেন না, বাবা। “বুদ্ধি আর সাহস রে তোর! বলা নেই, কওয়া নেই গ্রাম ছেড়ে উধাও!

এদিকে দুশ্চিন্তায় আমাদের প্রতিটি রাত জেগে কেটেছে। তা, কোথায় ছিলি এতদিন। আজ রাতে আর ঘরে আসতে হবেনা!

টংঘরের বাইরে কাটাতে হবে সারারাত! কাল গ্রামের বড়দের সাথে কথা বলে ঘরে তোলার ব্যপারটা ঠিক হবে! আপাতত এটাই তোর শাস্তি!

রেগে মেগে কথাগুলো বলে ঘরে গিয়ে না খেয়েই শুয়ে পড়লেন বাবা। শাস্তির কথা শুনে বড় বোন টংঘরের নিচে বসে বসে কাঁদল অনেকক্ষণ।

ছোট বোনের খুব কষ্ট হচ্ছিল। টং থেকে নেমে লুকিয়ে বড় বোনকে কিছু খাবার দিয়ে বলল, “কাদছিল কেন দিদি।

একটা রাত কোনও মতে কাটিয়ে দে! দেখিস কাল সকালে সব রাগ কমে যাবে বাবার।

আমি সারারাত ঘরে না ঘুমিয়ে থাকব; প্রয়োজন হলেই আমাকে ডাকবি; আমি চলে আসব।” না রে তার দরকার হবেন! একটা রাত আমি ঠিক কাচিয়ে দিতে পারব।

তুই ঘুমোগে যা! আমার জন্যে ভাবিস না।” বলল বড় বোন।

তখন মাঝ রাত। অমাবস্যা না হলেও ঘন অন্ধকারে ছেয়ে আছে চারদিক। মেঘ করেছে আকশে। গ্রামের পাশের বন থেকে বুনো শূকরের ডাক শোনা যাচ্ছিল।

ভীষণ ভয় করছিল বড় বোনের। হঠাৎ মনে পড়গেল ম্যাজিক কৌটোর কথা। কোমর থেকে বের করে মাথার নিচে রেখে শুয়ে থাকল কিছুক্ষম।

এক সময় কৌটোটা হাতে নিয়ে তার মুখ খুলে বলল,“ম্যাজিক কৌটো, ম্যাজিক কৌটো আমার ভীষণ ভয় করছে।

তুমি আমার জন্যে খুব সুন্দর একটা টংঘর বানিয়ে দাও- আমাদের রাজার ঘরের থেকেও সুন্দর। আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে, খাবারও এনে দাও।”

এবার কৌটোটা বন্ধ করে শিয়রের নিচে রেখে দিল।

বাতাস মামার বাড়িতে পিঠে খাবার পর সারাদিন। পেটে কিছু পড়েনি। অবসন্ন, ক্লান্ত দেহ। এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল বড় বোন।

বহুলোকের কথাবার্তা, গুণগুণে ঘুম ভাঙল বড় বোনের।

অনেক বেলা হয়ে গেছে। চোখ মেলে চারিদিকে তাকিয়ে ও থ! এ যে দারুণ সুন্দর একটি টংঘর। যেন কেউ এঁকে দিয়ে গেছে। ঘরের এক কোণে পাত্রে পাত্রে সাজানো দারুণ সব খাবার। উঠে বসল বড় বোন।

রূপোর কৌটোটা কোমরে বেঁধে টংঘরের দরজা খুলে দিল।

হুড়মুড়িয়ে গ্রামের লোকের ঢুকল ঘরে। সবাই খুব আদর যত্ন করল বড় বোনের। ছোট বোন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল দিদিকে।

বাবা, মা বাইরে দাঁড়িয়ে রইলেন লজ্জায়। গ্রামের সবার ধারণা হল বড় বোনের কষ্ট দেখে কোনও অলৌকিক শক্তি এসে বানিয়ে দিয়েছে এই ঘর।

 মায়েরও বিশ্বাস হলো গ্রামবাসীদের কথা। মনে মনে তিনি আরেকটি ফন্দি করে রাখলেন।

ছোট মেয়েও যদি বড় মেয়ের মত করে, তাহলে ওকেও নিশ্চয়ই আরো একটা সুন্দর ঘর বানিয়ে দেবেন সেই অলৌকিক শক্তি।

আর তাই যদি হয় তবে দু’টো ঘর হয়ে যাবে ওদের। তখন সারা জীবনের জন্যে আর ঘরের চিন্তা করতে হবেনা। তাছাড়া এই অঞ্চলের সব চাইতে নাম করা লোক হয়ে যাবেন ওরা।

দিদির কাছ থেকে সব ঘটনা জেনে নিল ছোট বোন। মাকে বলল সব কথা। দু’চার দিন গেল।

ছোট বোনকে তুলো ধুনোর কাজ দিয়ে মা, বাবা বেরিয়ে পড়লেন ঘর। থেকে। তারপর বড়বোন যে যে ভাবে বাতাস মামার বাড়ি পৌঁছেছিল ঠিক সে ভাবেই ছোট বোনও চলে গেল বাতাস মামার বাড়ি।

বড় বোনরে মত ছোট বোনকেও খুব আদর করলেন দিদা। তারপরের দিন থেকে যথারীতি শুরু হল জুম বাছাইয়ের কাজ।

এখনও দিদির মত কাজে পটু হতে পারেনি ছোট বোন।তার ওপর আগে থেকেই ছোট বোনের মন পড়ে ম্যাজিক কৌটোর দিকে।

দিদার কাজের কিন্তু একটুও পরিবর্তন হয় নি। আগের মতই দুই হাতে সমান তালে চটপট জুম বাছাইয়ের কাজ করে চলেছেন। এমনি করে কেটে গেল কয়েকদিন।

 সেদিন দুপুরবেলা অব্দি দিদা কাজ করলেন জুমে। পুরাে জুমের আগাছাই প্রায় বাছাই করা হয়ে গেছে। জুমের শেষ প্রান্তে একটি ম্যাজিক কৌটো রেখে দিদা চলে গেলেন বাড়ী।

ছােট বােন কিছুই টের পেলনা। যাবার আগে বলে গেলেন। “অল্প যা আগাছা আছে তা উপড়ে ফেলে চলে আয় বাড়ী। আমি তুলােগুলাে রােদে দিয়ে রান্নার কাজটা শেষ করে রাখি।

 দিদা চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট বোন পেয়ে গেল রূপোর কৌটো। লতা, পাতা দিয়ে মুড়িয়ে খারায় করে চলে এল দিদার কাছে।

তারপর চান সেরে খাওয়া দাওয়া সেরে শুয়ে রইল দিদার পাশে। পরদিনই বাতাস মামার সাথে বাড়ি ফিরে যাবার কথা।

শুয়ে শুয়ে দিদা জিজ্ঞেস করলেন, কিরে জুমের শেষ প্রান্তে কোনও রূপোর কৌটো পাসনি?”-কই না তো?

পাছে দিদা রেখে দেন তাই মিথ্যে করে বলল ছোট বোন। দিদার তো সবই জানা। কথা না বাড়িয়ে বললেন,“ঠিক আছে, ঘুমিয়ে পড়ো চটপট, কাল খুব ভোরে উঠতে হবে।”

ভোরে ঘুম থেকে উঠে চটপট তৈরী হয়ে গেল ছোট বোন। খারা সহ রূপোর কৌটো নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে যেতে হবে বাড়ি।

কিছুক্ষণের মধ্যে বাতাস মামাও এসে হাজির।

খারাটা পিঠে নিয়ে দিদার কাছে চটজলদি বিদায় নিয়ে বাতাস মামার পিঠে গিয়ে বসে পড়ল ছোট বোন।

বাড়ি গিয়ে ভাল করে থাকিস! ওরে হ্যা। তোর খারায় যে রূপোর কৌটোটা আছে সেটা কিন্তু আসলে ম্যাজিক কৌটো।

শশাবার সময় শিয়রের নিচে রেখে ঘুমোস। প্রয়োজনে কৌটো খুলে তার কাছ যা চাইবি, তাই পাবি।

তবে চাইতে হবে মাঝ রাতে।” -বেশ একটু রেগে রেগেই কথাগুলো বললেন। দিদা। বেশ মন দিয়েই কথাগুলো শুনল ছোট বোন।

তারপর বাতাস মামার পিঠে চড়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে এল বাড়ি।

এদিকে ছোট মেয়ে চলে যাবার পর ওদের ট্যঘরের পাশেই ছোট এবং উঁচু একটি টংঘর বানিয়ে রেখেছেন মা।

যাতে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে ছোট মেয়ে একা একা রাত কাটাতে পারে।এতদিন কোথায় উধাও হয়েছিলি! খুব বড় হয়ে গেছিস না?

যাবার আগে মনে করিসনি! আর এদিকে আমাদের দুঃশ্চিন্তায় দিন কাটছে! আজ আর ঘরে আসতে হবে না!

যদি অবাধ্য হস, তবে তোর জন্যে এই ঘরের দরজা চিরদিনের জন্যে বন্ধ। মেয়েকে আসতে দেখেই চড়া গলায় কথাগুলো বলে টংঘরের দরজা বন্ধ করে দিল বাবা।

তখন সবে মাঝ দুপুর।নতুন,উঁচু, ছোট টংঘরেউঠে গেল ছোট মেয়ে। রূপোর কৌটো মাথার নিচে দিয়ে শুয়ে পড়ল।

মায়ের আর আনন্দ ধরে না। আর একটা রাত।

তারপরই আরেকটা দারুণ সুন্দর বাড়ি হয়ে যাবে ওদের। আবার গ্রামের সবাই এসে জড়ো হবে ওদের নতুন বাড়ির সামনে।

রাতারাতি পরীর মত সুন্দরী হয়ে যাবে ওদের ছোট মেয়ে। দামী দামী পোশাক, অলংকারে ঢেকে যাবে সারা দেহ।

মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতে অতিথিদের জন্যে পান, সুপারির ব্যবস্থা করতে লাগলেন মা।

আজ সারারাত আর ঘুমানো যাবে । পান সুপারি তৈরী করতে হবে।

হঠাৎ বুনো শূকরের ডাকে ঘুম ভাঙল ছোট মেয়ের। অনেক আগেই সন্ধ্যে হয়ে গেছে। সারা গ্রামের লোক ঘুমিয়ে আছে।

ধড়মড়িয়ে উঠে বসল ছোটবোন।

রূপোর কৌটো খুলে দিদার কথা অনুযায়ী বলল, ম্যাজিক কৌটো, আজ রাতের মধ্যে তুমি আমাকে খুব সুন্দর একটা টংঘর বানিয়ে দাওয় যাতে খাবার দাবার, পোশাক আশাক কোনও কিছুরই অভাব না হয়।

এই বলে কৌটোর মুখ বন্ধ করে শি?রের নিচে রেখে আবার শুয়ে বড়ল ছোট মেয়ে। মনে মনে প্রহর গুনতে লাগল নতুন বাড়ি, গয়নাগাটির।

একটু তন্দ্রার মতো এসে গিয়েছিল ভাবতে ভাবতে। হঠাৎ ফোঁস ফোঁস শব্দে তন্দ্রা ভেঙে গেল। চোখ মেলে সামনে যা দেখল তাতে ভয়ে হিম হয়ে গেল দেহ।

মস্ত একটি অজগর সাপ হাঁ করে পায়ের কাছে ফোস ফোস করছে। এমন দৃশ্যে ভয়ে কাঠ হয়ে রইল ছোট মেয়ে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট মেয়ের পা মুখ ঢুকিয়ে ফেলল অজগর। অনেক চেষ্টায় মুখ দিয়ে কথা বেল ছোট মেয়ের মাগো।

আমার পায়ের পাতা গিলে ফেলেছে মস্ত একটি অভার।”

খুশীতে ডগমগ হয়ে এক মনে পান সুপারি সাজাতে সাজাতে প্রথম কয়েকটি শব্দই শুনলেন মা। শুনালেন পায়ের পাতা’।

ভাবলেন এরই মধ্যে টংঘর বানানো শেষ হয়ে গেছে। আনন্দে আরও তৎপর হয়ে কাজ করতে লাগলেন মা।

এর মধ্যে ছোট মেয়ের কোমর অব্দি গিলে ফেলেছে অজগরটি।

ভয়ে ব্যথায় চিৎকার করে বলল, “মা। মাগো এখন আমার কোমর অব্দি” | এভারও ভুল বুঝলেন মা। ভাবলেন রাজকন্যার পোশাক বলে কথা।

এবার নিশ্চই দারুণ দারুণ গয়না পরানো হচ্ছে কোমরে। খুশিতে কাজের গতি আরও বেড়ে গেল মায়ের।

ছোট মেয়ের অবস্থা তখন চরমে। গলা অব্দি চলে গেছে অজগরের পেটে। শেষ বারের মতো দেহের সমস্ত জোর দিয়ে বলল,“এবার শেষ মা! এখন আমার গলা পর্যন্ত।

তা হলে গলার গয়নাগুলোও পরাননা শেষ। ভাবলেন মা। কাজের গতি আরও বাড়িয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন ভোরের।

 এদিকে ছোট মেয়ের পুরোটা দেহই গিলে ফেলেছে অজগর।

আর কোনও কথা শুনতে না পেয়ে মা ভাবলেন, রাজকন্যার পোশাক, অলংকার বলে কথা। এত দামি দামি হীরে, মনিমুক্তার গয়নাগাটি পরতে এখটু পরিশ্রম হবে বইকে!

ক্লান্ত দেহে নিশ্চই ঘুমিয়ে পড়েছে। ভালই হয়েছে। একটু ঘুমিয়ে নিলে শরীরটা ঠিক হবে। সকাল হলেই তো সারা গ্রামের লোকের সাথে কথাবর্তা, গল্পসল্প করতে হবে।

 দেখতে দেখতে শেষ রাতের কালো হারিয়ে গেল। ভোরের আলোয় ফর্সা হয়ে গেল চারদিক। এবার আর বসে থাকতে পারলেন না মা।

টংঘরের দরজা খুলে চলে এলেন বাইরে। কিন্তু একি। কোনও নতুন ঠংঘর তো হয়নি গ্রামের কোথাও! কিছুই বুঝতে পারলেন না মা।

তরতরিয়ে উঠে গেলেম মেয়ের রাত কাটানোর জন্যে বানানো টংঘরে।

দরজা খুলে ভেতরের দৃশ্য দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন। মেয়ে নেই টংঘরে। সে জায়গায় শুয়ে আছে মস্ত একটি সাপ। পেট ফুলে ঢোল হয়ে আছ।

ছোট মেয়েকে সাপ গিলে ফেলছে
ছোট মেয়েকে সাপ গিলে ফেলছে । ছবি – সুরেশ চাকমা

এবার আর বুঝতে বাকি রইল না। রাজকন্যা হতে গিয়ে কি পরিণতি হয়েছে মেয়ের। শাকে, ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগলেন মা।।

মায়ের চিৎকার শুনে গ্রামের সবাই চলে এল সেখানে।

অজগরের খবর শুনে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে এল এক দল। টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলবে সাপের দেহঘগ ছোট টংঘরটির চারিদিক ঘিরে ফেলা হল।

ধারালো অস্ত্র নিয়ে সাহসী কয়েকজন যবিক উঠে গেল টংঘরে। কিন্তু অজগরটির দেহে আঘাত করতে গিয়েও পারলেন না।

সে এক অন্য দৃশ্যহগ অজগরের মুখ গিয়ে আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে মেয়েটির অক্ষত দেহ। এই অবস্থায় সাপকে আঘাত করলেই তা গিয়ে লাগবে মেয়েটির দেহে।

সিদ্ধান্ত হল মেয়েটির সবটা দেহ বেরিয়ে গেলেই আঘাতে আঘাতে টুকরো টুকরো করে ফেলা হবে সাপটিকে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী এদম তৈরী হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল ছেলেরা। দেখতে দেখতে মেয়েটির প্রায় সম্পূর্ণ দেহই বেরিয়ে এল অজগরের পেট থেকে।

বাকি শুধু পায়ের পাতা। চকচকে ধারাল অস্ত্র রিনয়ে তৈরী হয়ে গেল একজন।

অজগরের মুখ থেকে মেয়েটির দেহের শেষ অংশ বেরিয়ে আসলেই এক কোপে আলাদা করে নিতে হবে ধড় থেকে মাথা।

সাথে সাথে বাকিরা টুকরো টুকরো করে ফেলবে সমস্ত দেহ। চরম মূহুর্ত। মেয়েটির দেহেগর শেষ অংশটুকু বেরিয়ে এল অজগরের মুখ থেকে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ধারালো অস্ত্র ঝলসে উঠল।

কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে দেহে আঘাত লাগার আগেই বিদ্যুৎ গতিতে চলে গেল সাপ। সবআঘাত গিয়ে পড়ল টংঘরের মেঝেয়।

ভীষণ শব্দ হল, কেঁপে উঠল সারা টংঘর।

বিকট আওয়াজে ধড়মড়িয়ে উঠে বসল মেয়েটি। কিছুক্ষণ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল সামনের যুবকদের দিকে।

ঘোর কাটাতে মনে পড়ে গেল গত রাতের কথা, উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করল, পারল না।

ক্লান্ত, অবসন্ন দেহ। যুবকরা ধরাধরি করে উঁচু টংঘর থেকে নিচে নামাল মেয়েকে।

দৌড়ে এল মা, বাবা,বড় বোন, গ্রামের সবাই। সবার শুশ্রষায় কিছুক্ষণের মধ্যেই খানিকটা সুস্থ হয়ে উঠল ছোট মেয়ে।

গ্রামবাসীরা জানতে চাইল ঘটনা। সব কথা খুলে বলল ছোট বোন। অনুশোচনায়, লজ্জায় ভেঙে পড়লেন মা।

এক সময় মন শক্ত করে উঠে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাইলেন সবার কাছে। বললেন, “লোভের সমুদ্রে ডুব দিয়েছিলাম। ভেবেছিলমা কোনও কাজ না করে রাতারাতি অনেক অনেক ধন আর সম্মানের অধিকারী হয়ে যাব।

এখন বুঝতে পেরেছি পরিশ্রম করেই ধন উপার্জন করতে হয়। সম্মান পেতে হয় ভাল কাজ করে আর ভালবেসে।

তথ্যসূত্র: ত্রিপুরার আদিবাসী লোককথা

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator