জুম্ম সমাজ ও আমাদের সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়ররা

0
31

জু্‌ম্ম সমাজ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বাহ্যিক এমনকি অভ্যন্তরীন নিয়ামক দ্বারা প্রভাবিত। এই লেখায় জুম্ম সমাজে সোশ্যাল জাস্টিস মুভমেন্টের স্বরূপ উন্মোচনের চেষ্টা করা হয়েছে। 

বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে “সোশ্যাল জাস্টিস” (Social Justice) এবং “সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়র” (Social Justice Warrior) এই দুইটা টার্ম জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সাধারণভাবে সোশ্যাল জাস্টিস এর বাংলা হতে পারে সামাজিক ন্যায়বিচার ; এবং যিনি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেন তিনিই সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়র বা সামাজিক ন্যায়বিচারের যোদ্ধা।

আমার এ লেখার উদ্দেশ্য উন্নত বিশ্ব, তৃতীয় বিশ্ব বা বাংলাদেশ কোনোটাই না বরং জুম্ম সমাজে সামাজিক ন্যায়বিচারকামী যোদ্ধাদের নিয়ে।

এবং আমি এও দেখাতে চাই যে আমাদের জুম্ম সমাজ যে নিজেদের সেকেলে মনে করে থাকলেও প্রকৃতপক্ষে ইউরোপ আমেরিকানদের মত হয়ে গেছে।

আমরা আজকাল ফেসবুকে অনেক পড়াশোনা করে অনেক বড় বড় বিষয় নিয়ে ফেসবুকে তর্ক করি। সুতরাং আমরা উন্নত দেশগুলোর এম্বাসেডর ও ডেলিগেটদের সুনজরের আশায় সভা সেমিনারে তাদের গলায় গামছা না পেঁচিয়ে অতিসত্বরই তাদের দূতাবাসে যোগাযোগ করতে পারি।

সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়ররা সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ইস্যু উত্থাপন করে নিজেদের এজেন্ডা বা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করে এবং দাবি করেন সমাজে উপস্থিত ভুলগুলোকে শুদ্ধ করা তার দায়িত্ব।

সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়র অনেক বড় শব্দ এবং এই লেখা আদতে কেউই পড়বে না তাই আমি সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়রদের “সোজাও” বলব।

তাদের কাজের পরিধির একটা বড় অংশ জুড়ে থাকে জাতি, লিঙ্গ এবং আত্মপরিচয়। উল্লেখ্য যে সোজাও রা কিন্তু বিরাজনৈতিক বা অরাজনৈতিক নয়। তাদের উত্থাপিত ইস্যুর বেশিরভাগই বড় রকমের রাজনৈতিক।

কিন্তু এটাও সঠিক তাদের কার্যক্রম বা প্রচারণা রাজনৈতিক বিপক্ষ দল বা বিরাজনৈতিক স্বার্থেই বেশি কাজে লাগে। যা তাদের নীতি বিরুদ্ধ। এই আত্মবিরোধী বিষয়টির জন্য বর্তমানে এই টার্মকে উপহাস করে দেখা হয়।

ম্যারিয়াম ওয়েবস্টারে সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়র হিসেবে বলা আছে- “অতিমাত্রায় প্রগতিশীলদের জন্য ব্যবহৃত একটি ব্যঙ্গাত্বক শব্দগুচ্ছ।”

স্বভাবত সোজাওরা লিবারেল বা প্রগতিশীল। তা স্বত্ত্বেও অনেক সময় আমরা তাদের প্রতিক্রিয়াশীল আচরণ দেখতে পাই। তাদের মধ্যে একটা পুঞ্জিভূত ক্ষোভও বিদ্যমান। এবং একে কাজে লাগিয়ে কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করাও বেশ দেখা যায়।

মূলত অনলাইন-বেইজড এক্টিভিজমের একটা বড় সমস্যাকে তুলে ধরে এই সোজাওদের স্ববিরোধী কার্যক্রম।
এরকমের এক্টিভিজমে নিরাপদ দূরত্বে থেকে মন্তব্য করা যায়।

নিজের পরিচয় গোপন রাখা যায়। এমনকি সবার হাতে হাতে মোবাইল ফোন থাকায় খাটে শুয়ে শুয়ে কাঁথা কম্বলের নিচে লুকিয়েও রাজা উজির মারা সম্ভব।

এছাড়া অতিমাত্রায় খুল্লাম খুল্লা অনলাইন মাধ্যমগুলো থেকে দু চার লাইন তথ্য জেনে নিজেকে অনেক জ্ঞানী মনে করাও নেটিজেনদের প্রিয় কাজ। এদেরই কিছু অংশ সোজাও রূপে আবির্ভূত হয়।

সোজাও দের আদর করে কট্টর-বামপন্থীও (Far-left) বলা হয় যা পরিহাস ব্যতিত কিছুই নয়।

জুম্ম সমাজে সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়র শীর্ষক প্রভাব নিয়ে বলতে গিয়ে এতটা আলোচনা টানার কারন হচ্ছে বিশ্বে সবকিছুই আন্ত-সম্পর্কযুক্ত। যেমন- আফ্রিকায় এইডস উৎপন্ন হয়ে কিছুদিন পরেই দুনিয়ায় ছড়ায় গেল, আবার আম্রিকায় সেটলার গেল তার শ দুই বছর পরেই পার্বত্য চট্টগ্রামেও সেটলার এসে ঢুকল।

জুম্ম সম্প্রদায়ের মাঝে সোশ্যাল জাস্টিসের স্বরূপ বোঝার আগে আমাদের দেখা উচিত এর উত্থানের কারণ তথা প্রেক্ষাপট।

স্বাভাবিকভাবে গোটা বিশ্বে ইন্টারনেট প্রজন্ম যখন থেকে সামাজিক বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে সোচ্চার হওয়া শুরু করেছে তখন থেকেই অনলাইন সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়ররা দৃশ্যপটে আসতে থাকে।

পার্বত্য চট্টগ্রামও এর ব্যতিক্রম নয়। বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সামাজিক জমায়েত সম্ভব না হওয়া, বাহ্যিক সংস্কৃতির প্রভাব, নির্দিষ্ট বয়সের গ্রুপগুলো ঠিকমত একত্রিত হয়ে আড্ডা দিতে না পারা, রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রভাব এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান ভিত্তিক সংস্কৃতির কারণে একাধিক প্রজন্ম ইন্টারল্যাপড বা একে অপরের সাথে জড়িয়ে গিয়েছে।

স্বাভাবিক এই যে, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের জন্য জুম্ম সমাজে কিছু আক্ষেপ বা ক্ষোভ প্রবেশ করেছে। এ ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশের জায়গাটাতেই মূল দ্বন্দ্ব।

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী অনলাইন সমাজে বর্তমান সময়ে দুই শ্রেণীর সোজাও উপস্থিত। এরা হচ্ছে- জুম্ম অনলাইন যোদ্ধা এবং এনজিও (নন-গভর্নমেন্ট অর্গানাইজেশন)পন্থী নারীবাদী। উভয়ের মাঝেই সোজাও এর লক্ষণসমূহ বিদ্যমান।

জুম্ম সমাজ বৃহৎ ও গণ পরিসরে ইন্টারনেটে আসতে শুরু করে ২০১০ সাল পরবর্তী সময়ে। বৃহৎ ও গণ- এ দুইটা শব্দ ব্যবহার করা হচ্ছে তার কারণ এর আগেও কিছু সংখ্যক জুম্ম ইন্টারনেট ব্যবহার করতে স্বল্প পরিসরে, যা কোনো বড় প্রভাব রাখে নি।

তবে ২০১০ পরবর্তী সময় থেকে আমাদের সমাজ কেবল ইন্টারনেটে এসেই বসে থাকে নি। বরং তারা বিভিন্নভাবে নিজেদের বক্তব্য উত্থাপন করেছে।

তবে ২০১৪ পরবর্তী সময়ে উত্থাপনটা প্রচারে পরিণত হয়। সে সময়ে অনলাইনে প্রভাব বিস্তারকারীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে।

এর একটা বড় কারণ হচ্ছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গোটা বাংলাদেশেই একটা অনলাইন ভিত্তিক প্রগতিশীল বা লিবারেল আন্দোলন চলছিল। যার মধ্য দিয়ে জুম্মদের মধ্যেও আত্মসচেতনতা বৃদ্ধি পায়।

শুরুর দিকের অনলাইন কার্যক্রমকে আমি সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়র এক্টিভিজম বলব না। কারণ তার মধ্যে একটা সার্বিক বা হলিস্টিক প্রচেষ্টা লক্ষ্যণীয় ছিল।

কিন্তু বর্তমানে অনেক জুম্ম অনলাইন যোদ্ধাদের অবস্থা দেখে মনে হয় তাদের মগজটা হাতের কাছে নাই। বোধ হয় তারা মাথা আর মগজ খুলে ধুয়ে শুকাতে দিয়েছিলেন।

পরে মাথা নিয়ে আসছেন কিন্তু মগজটা না থাকায় আর মগজের কথা স্মৃতিতে আসে নি।

তুলনামূলক নতুন কিন্তু প্রতিশ্রুতিশীল জুম্ম সোজাও গ্রুপটি হল এনজিওপন্থী নারীবাদীরা। বলা বাহুল্য যে তারাও কিন্তু এক দিক দিয়ে জুম্ম অনলাইন যোদ্ধাদের জনরাতেই পড়ে যান। কারণ তারাও অনলাইনেই ভুলকে শুদ্ধ করতে চান এবং অনলাইনেই যুদ্ধ করেন।

তবে তাদের কোনো দৃশ্যমান তত্ত্ব নেই। তাদের কাজের পরিধিটি পারসোনাল লিবার্টি বা ব্যক্তিস্বাধীনতায় গিয়ে শেষ হতে দেখা যায়। সামাজিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক পরিসরগুলোকে খুব একটা গ্রাহ্য করা হয় না।

কথায় বলে হিস্ট্রি রিপিটস ইটসেলফ। আদতে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হয় না বরং মানুষই বিভিন্ন সময়ে একে অপরের সাথে সম্পর্কিত স্বার্থবাদী কর্মকাণ্ডে ঘুরেফিরে অংশ নেয়।

দুই সোজাও গোষ্ঠির দ্বন্দ্বে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম সমাজ একটা দান্দ্বিক চক্রাকার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

অনলাইন যোদ্ধারা জুম্ম সমাজের একাংশের বিশেষত নারীদের উপর তাদের পুঞ্জিভূত ক্রোধ আর হতাশা প্রচার করছেন, সুযোগ হলেই বিভিন্ন উছিলায় নারীদের ছবি, নাম, ঠিকানা, বাবার নাম ধাম সব প্রচার করে গালিগালাজ করছেন, এ কাজে বিভিন্ন ফেসবুক আইডি ও পেইজ ব্যবহৃত হচ্ছে, এবং আপনার আমার চারপাশের অনেকে এতে মৌন সম্মতিও দিয়ে যাচ্ছেন।

এদিকে এনজিওপন্থীরা এসব নারীদেরকে দলে ভিড়িয়ে নিতে চেষ্টা করছেন। অথচ এটা একটা মহৎ উদ্যোগ। যদি এটা সার্বিকভাবে হত তবেই সোজাওগিরির উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হত।

একটা সম্প্রদায়ের মধ্যে সোশাল জাস্টিস তখনই আসবে যখন সম্প্রদায়ের সবার মাঝে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপিত হবে।

কিন্তু যেহেতু সমাজের বাকিরা নির্বিকার সেখানে অবশ্যই স্বার্থবাদী গোষ্ঠি সুযোগ নেবে। না নিলে তাদের কচুগাছে ফাঁস দিয়ে মরে যাওয়া উচিত।

এনজিওপন্থীদের যেহেতু নিজস্ব এজেন্ডাটাকেই প্রাধাণ্য দেওয়ার প্রবনতা আছে সেজন্য অনেকাংশে তারাও কিছু জিনিস আকারে ইঙ্গিতে উৎসাহিত করছেন।

যে উৎসাহ আবার নারীদেরকে এমন অবস্থায় নিয়ে আসছে যেখানে তিনি অনলাইন যোদ্ধাদের শিকার।

উভয়ের কর্মকান্ডে কিছু সাধারণ সাদৃশ্য আছে। উভয় দলই এমন ইস্যু হাতে নেয় যেখানে ভাবনার বালাই নাই।

খুব অল্পতেই সমমনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। এবং বড় আকারে আলোচনায় যাওয়ার চেষ্টা লক্ষ্যণীয়। এটি বৈশিষ্ট্যগতভাবে একটা পপুলিস্ট পন্থা। পপুলিজমকে আবার আশীষ নন্দী ও প্রনব বর্ধন বলেছেন ‘সস্তা জনপ্রিয়তা’।

আমি মনে করি আমাদের জুম্ম সমাজের দুই সোজাও গোষ্ঠিই অনেক ভালো। তারা সত্যিকার অর্থে সকলের মঙ্গল কামনা করেন। তারা মানবিক।

তারা কাউকে অযথা আক্রমণ করেন না। তারা লিঙ্গবৈষম্য করে্ন না। তারা যৌন অবদমনে ভুগে যৌনতাকেন্দ্রিক গালিগালাজ করে না। এমনকি তারা বিদেশ থেকে টাকা পাইলেও সবাইকে তাঁর ভাগ দিয়ে থাকেন।

সবশেষে আশা করি সোজাওরা নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেবেন। জুম্ম সমাজের মধ্যে যে দ্বন্দ্ব সেগুলো নিয়েই যদি সবাইকে পড়ে থাকতে হয়, তবে ভবিষ্যতের ইস্যুগুলো নিয়ে নিজেদের মধ্যে কামড়াকামড়ি করবেটা কে শুনি?

শেষ করতে চাই আমার প্রিয় (কানাডিয়ান) রাজনৈতিক রক ব্যান্ড নিকেলব্যাকের হিট গানের কিছু অংশ দিয়ে

“…and not it’s your turn
the ashes will burn, and wither away
leaving your bones out on the stones,
picking them clean
and carving the truth, while harvesting you
to feed the machine”

*মন্ত্যব্যঃ সবথেকে বড় পরিহাসের বিষয় হচ্ছে সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়রদের নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার বক্তব্যও সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়রদের সাব জনরা এংগ্রি টিনেজারদের মত লাগছে। আমি এজন্য ঘোষণা করছি যে আমি এখন মোটেই টিনেজার নই এবং আজকাল ম্যারিলিন ম্যানসনের গান শোনা শুরু করলেও এখনো এতটা এংগ্রি হই নি।*

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here