জুম্ম তরুণের আড্ডাজুড়ে, “জুম”-ই থাকুক ঘুরে ফিরে

0
198

ফেসবুক ফ্রেন্ডলিস্টের কারো একজনের টাইমলাইনে একটা প্রিয় চাকমা গানের লিরিক দেখলাম। খুব সম্ভব গানটি রণজিৎ দেওয়ানের।

“আমি এক ন্যুও জীংহানি গরিবোঙ,
আমি এক ন্যুও দিনোর পেগ অবং”

“আমরা এক নূতন জীবন গড়বো,
আমরা এক নতুন দিনের পাখি হবো”।

গানটি অনেকদিন ধরে শুনি না। কেবল এই গানটি নয় আরো কত কত সুন্দর সুন্দর চাকমা গান ইদানিং শোনা হচ্ছে না। কখনো গান শেখার সুযোগ হয়নি আমার, তবে আমার কাছের মানুষেরা জানে আমি কী রকম গানপাগলা মানুষ!! বন্ধু সার্কেলে হোক, ধোঁয়ার ধকলে হোক কিংবা পেগের পর পেগের আদলে হোক কোথাও কোন জমানো আড্ডা খুঁজে পেলেই আমি পারি না পারি গলা মিলাতে ভালোবাসি। ছোটবেলা থেকেই আড্ডাবাজ। আমাদের গ্রামে “ফিবেক একাডেমী” নামে একটা স্থানীয় গানের তালিম নেওয়ার প্রতিষ্ঠান ছিলো। ফিবেক একাডেমীর আশেপাশেই আমরা প্রচুর আড্ডা দিতাম। সে সুবাদেই জানি, যারা চাকমা গানের উপর তালিম নেন, তারা এই গানটি অবশ্যই শিখেন! রাঙ্গামাটির বিভিন্ন স্থানীয় অনুষ্ঠানে শিশু শিল্পীরা এই গানটি প্রায়শই পরিবেশন করেন। গানটি আজ হঠাৎ করে আমার রাঙ্গাপানিতে ফেলে আসা আড্ডাময় কৈশোরিক বিকেলগুলোর কথা মনে করিয়ে দিলো।

কৈশোর কিংবা তারুণ্যের দিনগুলিতে আড্ডাই হচ্ছে সমস্ত ভাবনার প্রাণসঞ্চারকারী! এই আড্ডাগুলো থেকেই সৃষ্টি হয় কতকিছুর! গান হয়, কবিতা হয়, গল্প হয়, প্রেম হয়, বিরহ হয় আরো কতকিছুই তো হয়!! এই আড্ডাগুলোই ক্ষেত্রবিশেষে আমাদের মনন গড়ে দেয়, ঠিক করে দেয় জীবনে চলার পথের নিশানা।

ঢাকায় আসার পর থেকে ফেলে আসা রাঙ্গাপানির আড্ডাগুলো বেশ মিস করি। নটরডেম কলেজে পড়ার সময় বলতে গেলে, আড্ডাবাজি থেকে শ’হাত দূরে থাকতে হয়েছিলো। ক্যাম্পাসে আসার পর থেকে বিপুল গতিতে আবার উদ্যম পাই আড্ডাবাজির! এখনো সারাদিন তৈ তৈ করে আড্ডাবাজি করে বেড়াই। আমার কেন জানি মনে হয় এই আড্ডাগুলোই আমাকে শেখায়, আমাকে ভাবায়….

পাহাড় থেকে অনেক জুম্ম শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য এখন ঢাকা শহরে অবস্থান করেন। জুম্ম শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ মেস বা ভাড়া বাসাবাড়িতে থাকেন। বিশেষত রাজাবাজার এলাকা, কাজীপাড়া-শেওড়াপাড়া-মিরপুর এলাকায় জুম্ম শিক্ষার্থীদের আনাগোনা বেশি। এগুলো বাদ দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, মোহাম্মদপুরের ট্রাইবাল হোস্টেল, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ইডেন মহিলা কলেজ, টিটিসি এবং বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির এলাকায়; যেখানে আবাসিক সুবিধা আছে সেসমস্ত জায়গাগুলোতে জুম্ম শিক্ষার্থীরা অবস্থান করেন। সংগঠন করার সুবাদে উপরের সব এলাকা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেই কম বেশী যাওয়া-আসা হয়। খুব ভালো লাগে জুম্ম শিক্ষার্থীদের মধ্যকার পারস্পরিক যোগাযোগ রক্ষা ও সংঘবদ্ধ থাকার প্রয়াসগুলো যখন চোখে পড়ে।

ঢাকায় আসার পর থেকেই জানতাম জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার বিপরীতে ন্যাম ভবনের সামনের রাস্তার আশেপাশে, খামারবাড়ি মোড়ের টিএন্ডটি মাঠ এলাকা প্রায় প্রতিদিনই প্রাণবন্ত থাকে জুম্ম তরুণ-তরুণীদের বৈকালিক শহুরে আড্ডায়। আবার আমাদের জগন্নাথ হলে একসাথে অনেক জুম্ম শিক্ষার্থীর অবস্থান থাকার সুবাদে প্রতিদিনই এখানে ভালো আড্ডা জমে ওঠে। অনেকসময় ক্যাম্পাসের বাইরে থেকেও জগন্নাথ হলে আমাদের অনেক বন্ধু-বান্ধবী এসে আমাদের সাথে আড্ডা জুড়ে দেন। কাছের ইডেন মহিলা কলেজ, বদরুন্নেসা মহিলা কলেজ থেকে আসেন মেয়ে বন্ধুরা। হরেক বিষয়েই আলোচনা হয়। গালগপ্প হয়। কেন জানি আমার এই আড্ডাগুলোতে অনেকসময় “কী নেই” “কী নেই” বা কিছু একটা নেই টাইপের অনুভূতি হয়।

যখন নতুন নতুন হলে আসি, তখন জগন্নাথ হলের পুরাতন পূর্ব বাড়ি বিল্ডিং/সন্তোষচন্দ্র ভট্টাচার্য ভবনটি ছিল। আমরা জুম্ম শিক্ষার্থীরা থাকতাম – ৩২০, ৩২৩, ৩৭২, ৪৮৬ প্রভৃতি রুমগুলোতে। আর সিনিয়র-জুনিয়র আমরা সবাই মাঠে খেলাধূলা করে এসে একসাথে চা-নাস্তার আড্ডা জমিয়ে দিতাম হলের টেনিসকোর্টের একপাশে দক্ষিণবাড়ি লাগোয়া সিঁড়িটায়! আমরা জুম্ম শিক্ষার্থীরা সেখানে নিয়মিত বসতাম বলে হলের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা সচরাচর কেউই সেখানে বসতো না। সবাই জানতো যে আমরা সেখানেই বসি। ঐক্যবদ্ধভাবেই!! গরম গরম পুড়ি, রঙ চায়ের সাথে আলোচনা জমে উঠতো। সিনিয়ররাই মূলত মধ্যমণি হয়ে থাকতেন। আমরা জুনিয়ররা হা করে থাকতাম আর মাথা নেড়ে যেতাম। সব আলোচনারই সর্বশেষ গন্তব্য হতো পার্বত্য চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম!! অবধারিতভাবেই!! এখনো বৈকি!!

লম্বা কোন ছুটিতে রাঙ্গামাটি গেলে ঘরে আমার একমুহূর্তও মন টিকে না। হয় কোথাও ঘুরতে বেড়োই নতুবা খুঁজে বেড়াই আড্ডার স্থল। রাঙ্গামাটি স্টেডিয়ামের গ্যালারিগুলোতে বিকেল হলে প্রতিদিন অনেক জুম্ম ছেলে-মেয়ের জটলা পড়ে। আবার সাম্প্রতিক সময়ে রাঙ্গামাটির আসামবস্তি ব্রীজেও অনেক ছোটবড় আড্ডার আসর চোখে পড়ে।

বেশ বড় একটা পরিচিত সার্কেল আমার। তাই কোথাকার কোন আড্ডায় কী বিষয়ে জমে উঠছে আলোচনার খোড়াক…সেগুলো প্রত্যক্ষভাবেই পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ সাধারণত আমার হয়। সে সুবাদে জানি অধিকাংশ আড্ডাস্থলেই কমবেশি যে বিষয়গুলো আলোচনায় থাকে, “চিকু” , ক্ল্যাশ অব ক্ল্যান এর এ্যাটেক, সানি লিওন, ফেসবুক পিক আর স্ট্যাটাস, রক এন্ড মেটাল মিউজিক (ক্ষেত্রবিশেষে), ব্যাচ পিকনিক আয়োজনের প্রস্তুতি, বিসিএসের প্রিপারেশন প্রভৃতি!

আমাদের প্রত্যহ জীবনের বিষয়গুলো, যা আমাদের জীবনের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিকভাবে জড়িত তা নিয়েই আমরা আড্ডা জমাই। তাহলে জুম্ম তরুণদের আড্ডাজুড়ে অন্যান্য যাই থাকুক না কেন কিঞ্চিৎ হলেও জুম পাহাড়ের কথা থাকাটাই অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ বলছে, পরিস্থিতি ভিন্ন! আমরা পাহাড়ের চলমান ঘটনাপ্রবাহগুলো থেকে এতটাই মুখ ফিরিয়ে রয়েছি যে, আমাদের আড্ডাগুলোই বলে দেয় – আমরা আপাদমস্তক কাঁদামাটিতে ডুবন্ত থেকেও তা অস্বীকার করে যাওয়ার ভ্রান্ত প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছি মাত্র! অন্তত আমার ধারণা তাই!

আমাদের আড্ডাগুলোতে কেন জানি চুনীলাল দেওয়ানের শিল্পসাধনা নেই, রণজিৎ দেওয়ানের গান নেই, কবি সুহৃদ চাকমার “বার্গী” কাব্যগ্রন্থ নেই, একসময়কার জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিলের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কথা নেই, একসময়কার জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর (জুভাপ্রদ)-র কথা নেই, গেংহুলী শিল্পীগোষ্ঠী বা গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠীর কথা নেই, “জুম্ম সংবাদ বুলেটিন” নামে পাহাড়ের সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালীন নিষিদ্ধ প্রকাশনার কথা নেই, পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের মুখপত্র কেওক্রডঙের কথা নেই, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একসময়কার সাড়া জাগানো প্রকাশনা রাডার নেই, কাপ্তাই বাঁধে উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর কথা নেই, হারিয়ে যাওয়া গেংহুলীদের কথা নেই, কাউখালী গণহত্যায় নিহত তিন শতাধিক মানুষের কথা নেই, লোগাঙ গণহত্যার কথা নেই এমনকি সাম্প্রতিকতম ২০০৩ সালের মহালছড়ি সাম্প্রদায়িক হামলা, ২০১০ সালের বাঘাইছড়ির বুদ্ধপুদির কথা, খাগড়াছড়ি শহরজুড়ে সাম্প্রদায়িক হামলার কথা, মাটিরাঙ্গার তাইন্দং এবং নান্য়াচরের বগাছড়ির কথা নেই। সুজাতা ধর্ষণের বিচার হয়েছে কি? হয়নি, থুমাচিং মারমা কেন নিহত হলেন, বলিমিলে কেন মারা পড়ল তার খবর আমাদের আড্ডাই নেই। সাজেক, নীলাচল, নীলগিরি, চিম্বুক, বগালেক, কেওক্রডংসহ সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামটাকে যেভাবে পর্যটনের নামে গিলে ফেলা হচ্ছে তার কথা কে বলবে, তুমি আমি না বললে??? দীঘিনালায় বিজিবি ব্যাটালিয়ন ক্যাম্প স্থাপনের ফলে উচ্ছেদ হওয়া ২১টি পরিবারের কথা আমাদের আড্ডাগুলোতে স্থান নিলে কী আমাদের আড্ডাগুলো পঁচে যাবে?

৭০ দশককে বলা হয়ে থাকে, পার্বত্য চট্টগ্রামের রেঁনেসার যুগ। এ সময়েই সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারাটা বেগবান হয়েছে। কাপ্তাই বাঁধের আগ্রাসনে হঠাৎ নিঃস্ব হয়ে যাওয়া জুম্ম সমাজের মধ্যে প্রবল জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ হয়েছিল। মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নেতৃত্বে সেসময়কার তরুণ ছাত্রসমাজ সমাজ পরিবর্তনে কান্ডারীর ভূমিকা নিতে পেরেছিলো। ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। প্রায় সমসাময়িক ভাবে প্রতিষ্ঠা পায় পার্বত্য ভিক্ষু সংঘ। মোনঘর শিশু সদন। পরবর্তীতে মোনঘর প্রতিষ্ঠানটিকে কেন্দ্র করে একঝাঁক সৃষ্টিশীল জুম্ম তরুণ গড়ে তোলেন জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল। রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা, সামাজিক মূল্যবোধের বিকাশ, শিক্ষার প্রসার সবদিকেই একটা জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রতিফলন দেখা যায় এই দশকে। এই জাগরণটা বেশ কিছুকাল ধারাবাহিকও থেকেছে এবং তা সম্ভব হয়েছে অত্যাবশ্যকীয়ভাবে জুম্ম তরুণ সমাজের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে। কী রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, কী সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, কী শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে সব জায়গাতেই তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত ও সক্রিয় অংশগ্রহণই ছিল এসময়কার সমাজ-রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের চালিকাশক্তি।

আমাদের মতোই সেসময়কার তরুণরাও হয়তো নানা জায়গায়-নানাবিষয়ে, নানাভাবে-নানাঢঙে-নানারঙে আড্ডা দিতো, গল্প জমাতো, আসর জমাতো। কাপ্তাই বাঁধ নিয়ে লেখা গানগুলো শুনলেই বোঝা যায় সেসময়কার তরুণদের আড্ডাজুড়ে এই বাঁধের প্রভাবটা কীরকম ছিলো!! মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমাই বা কেন স্লোগান তুলেছিলেন “শিক্ষা নাও গ্রামে ফিরে চলো” অথবা “উচ্চমার্গীয় চিন্তা-সাধারণ জীবন” (Simple Living, High Thingking)। শিক্ষিত তরুণরা গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে প্রাইমারি স্কুল গড়লো, অচল সমাজকে নাড়া দিতে থাকলো ধীরে ধীরে। জানেন তো, জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে পাহাড়ে যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিলো সেটাকে অনেকেই বলে থাকেন হেডমাস্টার রেভ্যুলিউশন? জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালীন সময়টাতে জুম্ম সংবাদ বুলেটিন-এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ঘটনাবলীর বিবরণ পাওয়া যেতো। আদামে আদামে চায়ের দোকানে, জুমো টুগুনে, দীঘোল লাঙেলোত, ফুলসুমোরি গাছের মিধে ছাভায়, ছড়াপাড়ে, হিজিঙে-হিজিঙে, লাল বইয়ের কথা, চেয়ারম্যান মাওর কথা কীভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলো? জন লেননের Imagine গানটি শুনেছেন? গানটি শুনতে থাকুন আর Imagine করুন। Only Imagine, যদি কিছু পান, তবে সেটা আপনার আড্ডায় যোগ করতে ভুলবেন না যেন!!

Enemy at the Gates, মুভিটি অনেকেই দেখেছেন। সেখানে দেখানো হয়েছে যে, ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার বাহিনী যখন প্রচন্ড আঘাত হানতে হানতে রাশিয়ার লেলিনগ্রাড প্রায় দখল করে ফেলেছিল, সেসময় ক্রশ্চেভ রুশবাহিনীকে সামাল দিতে পারছিলেন না কোনভাবেই। হুকুম জারি করা হয় যদি কোন রুশ সেনা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালানোর চেষ্টা করেন, তবে তাকে গুলি করে হত্যা করা। কঠোর সামরিক শৃঙ্খলা, জেনারেলদের উপর অত্যধিক চাপ প্রয়োগ সবকিছুই করার পরেও পরিস্থিতির কোন পরিবর্তন আসছিল না। সমগ্র রুশ বাহিনীতে কেবল হতাশা, হতাশা আর হতাশা। চারিদিক থেকেই কেবল হতাশার খবর। রুশ প্রতিরোধ প্রায় বিপর্যস্ত। এমন সময়ে একটি আইডিয়া বাঁচিয়ে দেয় রুশ বাহিনীর অবশ্যম্ভাবী পরাজয় থেকে। সেই আইডিয়ার নাম হচ্ছে “Hope”। আশাবাদী হওয়া। চারিদিক থেকে যখন পরাজয়ের, হতাশার খবর আসতে থাকে তখন এক রুশ সেনা একটি স্নাইপার নিয়ে জার্মান সেনা অফিসারদের উপর একের পর এক নিখুঁত আক্রমণ করতে থাকেন। পুরো রাশিয়ান বাহিনীতে সেই কাহিনীগুলো ফলাওভাবে প্রচার করা হয়। চারিদিকে এত এত হতাশার খবরে এই একটিমাত্র আশাজাগানিয়া/জয়ের/অর্জনের খবর পুরো রুশ সেনাবাহিনীকে চাঙ্গা করে তোলে। ধীরে ধীরে রাশিয়ানরা একটি স্নাইপার বাহিনী গড়ে তোলেন এবং একের পর এক জার্মান সেনা অফিসারদের কাবু করতে থাকেন। বদলে যেতে থাকে যুদ্ধক্ষেত্রের চিত্র। (স্মৃতি থেকে লেখা-বর্ণনায় ঈষৎ ভুল থাকতে পারে)

আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম সমাজেও আজ চারিদিকে কেবল হতাশা, হতাশা আর হতাশার খবর! এই বোন ধর্ষিত হচ্ছে, এই ভূমি বেদখল হয়ে যাচ্ছে, এই পর্যটন কেন্দ্র, এই বিজিবি ক্যাম্প, এই সাম্প্রদায়িক হামলা!! তরুণদের মধ্যে এই নেই, সেই নেই, জুম্মবী বেজাতির সাথে পালিয়ে যাচ্ছে, গাভুজ্জ্যে নেশায় আসক্ত, পিসিপির কর্মীরা হেনতেন, রাজনৈতিক দলগুলো এমন তেমন। সুশীলরা এই সেই ব্লা ব্লা ব্লা ….

এই যে এত এত নেই, এত এত হতাশা তা কেবলমাত্র সমালোচনা করে পরিবর্তন সাধন করা যাবে না, সমাজপরিবর্তনে সর্বদা অংশীদার হতে হয় সক্রিয়ভাবে, রুশ স্নাইপারদের মতনই। নিরুপায়ের মতোই বলতে হবে, পার্বত্য চট্টগ্রামের এমন হতাশাব্যঞ্জক পরিস্থিতিতে আশার আলো সঞ্চার করতে জুম্ম তরুণেরাই একমাত্র ভরসা। নতুন একটি গান, নতুন একটি কবিতা, নতুন একটি উদ্যোগ, নতুন একটি কর্মসূচি, নতুন একটি বিশ্বাস এবং নতুন একটি আড্ডাই হোক সেই একমাত্র ভরসার নৌকা। এই নৌকায় পাত্তলী/হাল ধরার লোকজন যে খুব একটা নেই, সেও জানা কথা। তবু আমরা অনেক কিছু নেই এর ভীড়ে কিছু কিছু যা আছে সেগুলো নিয়েই স্বপ্ন দেখি, সেগুলো নিয়েই হোক আমাদের আড্ডাগুলো, সেগুলো নিয়েই হোক আমাদের প্রত্যহ জীবন, সেগুলো নিয়েই হোক আমাদের পথচলা………..

দাবী করে বলতে চাই, পিসিপির নবীনবরণ কেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোতে এখনো বেশ উঁচুমানের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা হয়ে থাকে। ঢাকা, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি কেন্দ্রিক বেশ কিছু প্রতিশ্রুতিশীল ব্যান্ড গড়ে উঠছে। জুম্মল্যান্ড রেডিও, জুম্ম সায়েন্স, সিএইচটি অনলাইন ব্লগার এ্যান্ড এ্যক্টিভিস্ট ফোরাম প্রভৃতি নতুন নতুন সাইবার আইডিয়ার জন্ম হচ্ছে। গত তিন বছর ধরে বিঝুর সময়ে রাঙ্গামাটিতে তরুণদের উদ্যোগে চলচিত্র প্রদশর্নীর আয়োজন হচ্ছে। নিজেদের উদ্যোগেই আন্ডারগ্রাউন্ড মিউজিক্যাল শো হচ্ছে। পিসিপির প্রবল প্রতাপের যুগেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিসিপির স্বতন্ত্র শাখা কার্যক্রম ছিলো না। এখন কেবল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নয় পুরো ঢাকা শহরেই বেশ কয়েকটি ইউনিটে পিসিপির কর্মীরা কাজ করছে। নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে ডকুমেন্টারি হচ্ছে, ফিল্ম হচ্ছে, ফটোগ্রাফী হচ্ছে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ক্ষেত্রে এই যে এই কিছু কিছু যা আছে সেগুলোতেই যদি আমরা আমাদের অংশগ্রহণগুলো জোরদার করতে পারি….দ্বায়িত্ব নিয়ে বলছি, যদি লাইগা যায় নয়, কেল্লাফতে অতি অবশ্যই হতে বাধ্য। Just try it man!!! Hurry…

যারা “আদাম্যে মেলা-মেব্বান”-এ কখনো গিয়েছেন, তারা অবশ্যই জানবেন কোন গ্রামে বিয়ের অনুষ্ঠান, সামাজিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলোতে গ্রামের যুবকরা কিরকম সামাজিকতাবোধের পরিচয় দেন। বলতে গেলে আমি বিভিন্ন জায়গায়তেই ঘুরে বেড়াই। সেসময় গ্রামের অর্ধশিক্ষিত তরুণদের মধ্যে একধরণের প্রবল সামাজিকতাবোধ এবং জাতীয়তাবোধের প্রতিফলন আমি খেয়াল করি। একবার এক আদামে গিয়ে দেখলাম তরুণদের মোবাইলে মোবাইলে একটি কমন গান বাজছে। একটা বার্মিজ আন্ডারগ্রাউন্ড গেরিলা গ্রুপের ভিডিও ক্লিপ ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করে দৃশ্যপট ঠিক রেখে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে বসানো হয়েছে কালায়ন দা’র একটা সংগ্রামী গান।

“ও ভেই গাভুর লগ বুরো ন ওয়ো-বয়জ
যেদক ওদঅ সাত মনান হাজা রাগেয়ো।”

কাজটি দেখলেই বোঝা যায় সেটি কাঁচা, কিন্তু আবেগ আর ভালোবাসায় ভরা। জন্মভূমির প্রতি এই দরদ ও মমত্ব নিয়ে যদি শহুরে শিক্ষিত তরুণরা এগিয়ে আসতেন কত আশা-জাগানিয়া কাজই তো হতে পারতো।

আমাদের DSLR ওয়ালারা যদি তরুণীদের ফেসবুক প্রোফাইল বানিয়ে দেওয়ার চাইতে এভাবে সামাজিক-রাজনৈতিক চেতনার বিকাশে সহায়ক ফটোগ্রাফী-ভিডিওগ্রাফীতে মনযোগ দিতেন তবে নিশ্চয়ই তরুণদের ফেসবুকের ওয়ালে ওয়ালে কেবলই ঝুলে থাকতো “শিক্ষা নাও গ্রামে ফিরে চলো”! আমরা নিজেরাই এমন এক মনোজগৎ তৈরী করে নিচ্ছি যা আমাদের বাস্তবতার সাথে বেশ তফাতে অবস্থান করে। সেই মনস্তাত্ত্বিক জগৎটাকে ভাঙতে না পারলে সমাজ ভাঙার চেতনা আসবে কী করে? এই অচল মনোজগৎটাকে ভাঙতে আমাদের আড্ডাগুলোই হোক হাতিয়ার। আমিতো রাজনীতি করি। কিন্তু বন্ধু?? আড্ডাবাজি করতে আপনার রাজনীতি করা লাগে না, হুম? সেই প্রাণের আড্ডাটাই স্রেফ একটা শব্দ আর একটা স্বপ্ন লাগিয়ে নিও। শব্দটা হবে “জুম”, স্বপ্নটা হবে “জুমপাহাড়ের মুক্তি” ….

আমাদের জুম পাহাড়ের ভাঁজ চিরে শত শত বছর ধরে যে নিবিড় “সারাল্ল্যে আদাম” গুলো সেই আদামে আদামে বিপুল সংখ্যক তরুণ পড়ে আছেন দিশাহীন হয়ে। তারা অনেকেই জানেনই না যে তাদের অমিত সম্ভাবনার কথা। কিন্তু প্রকৃতির মাঝে নিরন্তর সংগ্রাম করে টিকে থাকার যে লড়াই, সে লড়াইটা তাদের রপ্ত করা থাকে প্রাকৃতিকভাবেই। হাজার ট্রেনিং এও প্রকৃতির শিক্ষা অর্জন করা যায় না, যদি প্রকৃতির সাথে মিশে থাকাটা না হয়। অন্যদিকে শহুরে শিক্ষিত তরুণরা পড়ে রয়েছে ভাবলেশহীন। এই শিক্ষিত তরুণদের পরিচয় হয়েছে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের ধারণা আর তথ্য-প্রযুক্তির শক্তির সাথে। সমগ্র বিশ্বকে তারা বিশ্লেষণ করতে জানেন। তাই আদাম্যে গাভুজ্যদের সাথে শহুরে শিক্ষিত তরুণদের মধ্যে একটিবারমাত্র সংযোগটা যদি স্থাপন করা যায়, আমাদের আর ঠেকায় কে? শাসক যত শক্তিশালীই হোক, শুধু আধোঘুম-আধো জাগরণ থেকে আমরা একবার জেগে দেখি, চোখ মেলে তাকাই ওই ফুরমোনটার দিকে, আলুটিলের দিকে আর কেওক্রডঙের দিকে, করণীয় কী তা খুঁজে পেতে সময় লাগে না আর!! গুণগুণিয়ে কখন যে গেয়ে ফেল…

“নাঙ তার, লারমা লারমা”

আদামে আদামে জুম পাহাড়ের প্রতি প্রচন্ড আবেগ আর দরদ নিয়ে জুম্ম ভাইয়েরা-জুম্ম বোনেরা, মায়েরা-বাপেরা পথ চেয়ে আছে, শহুরে শিক্ষিত তরুণরা আশা জাগানিয়া বার্তা নিয়ে রুক্কেঙ এর ভিতরে ফিরে যাবে, জুম পাহাড়ের বুকে ফিরবে স্বস্তির নিঃশ্বাস… আর আমরা সবাই মিলে গাইবো,-

“আমি এগ ন্যু জীংহানি গরিবোঙ,
আমি এগ ন্যুও দিনোর পেগ অবং”


লেখক: সুলভ চাকমা 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here