icon

চোখের পানি বাঁধের পানি যখন একাকার – পঞ্চ চাকমা

Jumjournal

Last updated Dec 11th, 2020 icon 368

আমাদের গ্রামের নাম ছিল মাইচছড়ি আদাম। রাঙামাটি জেলার শুভলং-এ ছিল আমাদের এই আদাম। তখনকার রাঙামাটি শহর থেকে সম্ভবত চার/পাঁচ মাইল দূরে হবে। তখন তাে হাঁটাপথ দিয়ে রাঙামাটি আর আমাদের এলাকায় আসাযাওয়া করা যেতাে। আমি এই গ্রামের নামকরা ‘বিন্দা মাজন’-এর নাতনি।

এলাকার সবাই আমার দাদুকে বিন্দা মাজন নামে চিনত। আমার নাম পঞ্চ চাকমা। আমরা ৩ ভাই ৪ বােন। আমার বাবা আর মায়ের নাম ভরতচন্দ্র চাকমা ও হিরনচন্দ্ৰী চাকমা। আমার কত সালে জন্ম, তা আমি জানি না। তাই এখন আমার বয়স কত তাও সঠিকভাবে বলতে পারবাে না। তবে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শেষ হবার আগে আমার বিয়ে হয়ে যায়। তাই মনে হয় এখন আমার বয়স সত্তর এর ওপরে।

সেই আমি ২০১২ সালে এসে ১৯৬০ সালের আগের কথা বলতে বসেছি। আমি তাে কখনাে ভাবিনি এভাবে এসে কেউ তখনকার সময়ের কথা জানতে চাইবে। প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের কথা। সব কী মনে আছে? সময়ের সাথে সাথে, বয়সের কারণেও অনেক কিছু ভুলে গেছি।

তাছাড়া নিজেদের পরিবারের বাইরে এই প্রথম। আমি অন্য কারাের কাছে এভাবে বাঁধের পানিতে তলিয়ে যাবার সময়ের কথা বলছি। এখন তাে সবাই বললেও বুঝবে না ঐ সময়ের কথা, যন্ত্রণার কথা।

কাপ্তাই বাঁধের পানিতে সব কিছু ডুবে যাবার পর তখন আমাদের কী অবস্থা হয়েছিল! কী ভয়ানক কষ্ট আর সময় গেছে আমাদের! এত বছর পরে সেই মানসিক যন্ত্রণাগুলো, অনুভূতিগুলাে ভালাে করে বলা আর বুঝানােও কঠিন।

তবে এটা কি আমার আজও এতাে বছর পরেও সেই বাড়ি সেই জায়গা সেই মানুষদের জন্য মন কাঁদে। আমরা মারা যাবার পর আর কেউ থাকবে না সেই সময়ের কথা বলার, স্মৃতিচারণ করার। আমার বাবার বাড়ির, শ্বশুরবাড়ির সব জায়গায় বাগান-বাগিচা চিরদিনের জন্য কাপ্তাই বাঁধের পানিতে তলিয়ে গেছে। ডুবে গেছে সব। একই পরিবারের সদস্য, গ্রামের লােকজন একে অপরের কাছ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে চিরজনমের জন্য।

অন্যসব পরিবারের মতাে আমাদের অনবর্তী পরিবারও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। কে কোথায় গিয়ে বসতি করেছে তা বলা কঠিন। যে যেখানে পেরেছে সেখানে বসতি করেছে। আমাদের নিরাপদ সুখের স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন একেবারে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে এই কাপ্তাই বাঁধ। আমি শুনেছি আমাদের গ্রামের অনেকেই বর-পরং’ এ চলে গেছে।

এই পানি আমাদের সুন্দর জীবন কেড়ে নিয়েছে, অন্তত আমার সুখের আর নিরাপদ জীবন । হ্যা, আমার বলতে কোনাে সংকোচ নেই যে, তখনকার সময়ে আমরা সত্যিকার অর্থে খুব ধনী ছিলাম । বললেই বুঝবে, বিশাল বলতে বিশাল মাটির ঘর ছিল আমাদের। সাদা চুনকাম করা।

এই বাড়ির ছাউনি দিতে ঘরের চালের টিন লেগেছিল ১০০ বানেরও বেশি। ঐ সময়ে শুভলং বাজারের দোরে একটা মাত্র বৌদ্ধমন্দির ছিল আর সেটি ছিল আমার দাদুর নামে । সেই সময়ে গ্রামে গ্রামে এখনকার মতাে এত বৌদ্ধমন্দির ছিল না। তখন বছরে একটা সময়ে আমাদের গ্রামে যাত্রাপালা হতাে।

আমার মনে আছে যাত্রাপালা চলাকালে আমাদের সেই বিশাল বাড়ির বারান্দায় যাত্রাদলের সকল মেয়েদের থাকার বন্দোবস্ত করা হতাে। আমাদের বড় বড় দুটো ধানের গােলা ছিল। এক একটা গােলাতে ২০০০ আড়ি ধান আটতো ।

আমাদের তাে তখন অনেক জায়গা-জমি। সুখ, স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং নিরাপদ জীবন ছিল আমাদের একান্নবর্তী সংসারে। শুধু আমাদের কেন আমাদের গ্রামে সকলেরই একই জীবন ছিল । ধনে সম্পদে ভরপুর কোনাে অভাব, দুঃখ নেই। তাছাড়া এখনকার মতাে তখন এত ভয়ের জীবন ছিল না। এখন তাে সারাক্ষণ বাঙালি, আর্মির ভয়। কখন কী হয় সেই ভয়!

পরে অবশ্য আমার দুই দাদু আলাদা হয়ে যান। আমার মনে আছে এই বিশাল বাড়িটা দুভাগ করে বাড়ির দুদিকে দুটো আলাদা ইজোর’ তুলে পৃথক সংসার শুরু করেছিলেন আমার দুই দাদু। আমাদের বড় বড় দুটো পুকুর ছিল। একটি বাড়ির সামনের দিকে আরেকটি পেছনে।

পেছন দিকে পুকুরটি ছিল গোসল করার জন্য। বাড়ির সামনে পুকুরটি ছিল খাবার পানির জন্য। এই পুকুর থেকে আমাদের বাড়িসহ আশেপাশের লােকজন সবাই খাবার পানি গল্প করতো। বাড়ির সামনের দিকের পুকুরের সাথে অনেক বছর আগে লাগানো একটা বিশাল বটগাছ ছিল। বটগাছটি এতাে বড়াে ছিল যে আমার সাহস কুলাতো না ঐ বটগাছের তলে একা একা যেতে ।

আমার দাদুর বাবা মানে আমার বড় দাদু এই বট গাছটি লাগিয়েছিলেন। ধান কাটার সময়ে বাঙালি কামলা আনা হতো দূর থেকে। এই বাঙালি কামলারা ধান কাটা থেকে শুরু করে গােলায় তুলে দিতো। শুধু আমরা না আমদের গ্রামের সকলেই ধান কাটার মৌসুমে বাঙালি কামলা দিয়ে কাজ করাতাে। ৭/৮ জন মিলে এক একটা গ্রুপ ছিল তাদের।

সবকিছু করা শেষ হয়ে গেলে টাকা নিয়ে বাঙালি কামলারা চলে যেতাে তাদের গ্রামে। সেটা কোথায় তা আমরা জানতাম না। হয়তাে বাবা বা দাদুৱা জানতাে তাদের গ্রাম কোথায়। এতাে গেল আমাদের বাড়ির বর্ণনা। যদিও তখনকার সময়ের আমাদের বাড়ির অবস্থা এইভাবে বলে বুঝানাে কঠিন।

অনেক বড় ছিল আমাদের গ্রাম। তখন আমরা রাঙামাটি শহর থেকে আমাদের গ্রামে হেটেই আসতাম। হাঁটা পথ ছিল তখন। এখনতাে হাঁটা পথ নেই। আছে শুধু পানি পথ । নৌকায় করেই তাে সব জায়গায় যেতে হয়। আমাদের বাড়ির সামনেই ছিল প্রাইমারি স্কুল। সেই স্কুলের অনেক শিক্ষক আমাদের বাড়িতেই থাকতেন। কিন্তু থাকলে কী হবে আমি মেয়ে বলে আমার কখনও স্কুলে যাওয়া হয়নি।

আমার দাদু মেয়েদের পড়াশুনা করাটা একেবারেই পছন্দ করতেন না। তাঁর অপছন্দের কারণে আমার লেখাপড়া আর করা হয়ে উঠেনি। আমার বােনদেরও না। যদিও বাবা মা চাইতেন আমাকে স্কুলে দিতে। লেখাপড়া শেখাতে। কিন্তু দাদুর অনুমতি ছাড়া সেটা সম্ভব ছিল না। তাই আমার ছােট বেলার দিনগুলাে ছিল হাসি আর আনন্দে ভরা।

বাড়ির কোনাে কাজ নেই। লেখাপড়া নেই । ঘুরে বেড়ানাে ছাড়া ছােটবেলায় আমার আর কোনাে কাজ ছিল না। মাঝে মাঝে শুধু কাকার ছােট বাচ্চাদের দেখাশুনা করা । আর কিছুই না।

কাপ্তাই বাঁধের পানিতে পুরাতন চাকমা রাজবাড়ি ডুবে যাবার আগে তিন বার সেই রাজবাড়ি দেখার আর বেড়ানাের সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। রানী মাতা বিনীতা রায়ের সাথে কথা বলারও সুযােগ হয়েছিল। রাজবাড়ির এক কর্মচারির সাথে আমার এক মাসির বিয়ে হয়েছিল। সেকারণেই রাজবাড়িতে যাওয়া সহজ ছিল আমার। আমার জীবনে এইটা এক বিশাল স্মৃতি।

আমার আবছাভাবে মনে পড়ে বিশাল চাকমা রাজবাড়ি সম্ভবত কালাে পাথর দিয়ে তৈরি করা তবে ভেতরটা রং । গেট দিয়ে ঢুকার পরই দুইটা বড় সিংহমূর্তি ছিল। তারপর সম্ভবত টানা বারান্দা সেখানে অনেক ছবি টাঙানাে ছিল। দুটো বড় বড় হাতির দাত ছিল মা লােহা দিয়ে মােড়ানাে। দুটো হাতিও ছিল রাজার। রাজবাড়িতেে একটা বৌদ্ধমন্দির ছিল, ছিল একটি বিশাল নাটঘর।

রাজপূণ্যার সময়ে এখানে যাত্রাপালা হতাে। সম্ভবত রাজবাড়ির ভিতর দিকে কোথাও ছিল রাজা ভুবন মোহনের একটা বড় মূর্তি। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে এখন, সেই মূ্র্তিটি কি পানিতে ডুবে গিয়েছিল না ভেঙে নতুন রাজবাড়িতে আনা হয়েছিল! রাজবাড়ির মধ্যে আরেকটা জিনিস আমার মনে আছে।

দোতলায় নাকি তিনতলায় আমার ঠিক মনে নেই, অনেক বড় একটা ঝুলবারান্দা ছিল। চারিদিকে গ্রীল দেয়া। সেটি আমার এখনাে চোখে লেগে আছে। পিনন খাদির প্রতি রাণীমার আগ্রহ ছিল খুব। যতবারই দেখা হয়েছে ততবারই আমাদের কাছে জিজ্ঞেস করতেন আমাদের গ্রামে নতুন পিনন খাদি পাওয়া যাবে কিনা, থাকলে তিনি কিনে নেবেন। আর দেখতে খুব সুন্দর ছিলেন।

আমাদের সাথে ভাঙা ভাঙা চাকমায় খুব সুন্দর করে কথা বলতেন। লম্বা চুল ছিল তার। রাজবাড়ির রাজকন্যাদেরও দেখেছি। সবাই ছিল খুব সুন্দর দেখতে। বিশেষ করে বুড়ি। একবার আমরা চিৎমরং থেকে ফেরার পথে আবার রাজবাড়িতে যায়। এটাই ছিল আমার শেষ যাওয়া। মনে আছে আমার, রাণীমা তখন ছিলেন দোতলায়।

রাজবাড়ির কর্মচারির সাথে সাথে আমরাও দোতলায় উঠে গিয়েছিলাম। সে রাণীমার কাছে গিয়ে জানালাে, যে আমরা রাজবাড়ি দেখতে এসেছি। তখন আমাদের সাথে কেউ একজন ছিল যে কখনও রাজবাড়ি দেখে নাই ।

রাণীমা অনুমতি দিয়ে বললেন ঘুরে দেখাতে এবং আপ্যায়ন করতে। রাণীমাকে আমার কখনও অহংকারী মনে হয়নি। সবার সাথে খুব ভালাে করে কথা বলতেন। এরপরতাে আমার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের পর আর রাজবাড়িতে যাওয়া হয়নি।

আমার বিয়ে কবে হয়েছে সেই সন-তারিখ মনে নেই, তবে আমার মনে আছে। রাজা ত্রিদিব রায়ের যে বছরে বিয়ে হয়েছে সে বছরেই আমারও বিয়ে হয়েছে। রাজাকেও একটু কম বয়সে বিয়ে করতে হয়েছে। শুনতাম লােকজন বলাবলি করতে রাজা হতে গেলে ত্রিদিব রায়কে বিয়ে করতে হবে। সম্ভবত এই কারণেই রাজাকে অল্প বয়সে বিয়ে করতে হয়েছিল।

বিয়ে হবার পর আমি শ্বশুরবাড়িতে চলে আসি, আমার শ্বশুরবাড়ি বন্দুক ভাঙায়। আমার শশুররা ছিলেন ৭ ভাই। সবাই এক কথায় ধনী। অনেক ধন সম্পদ ছিল তাদের। এই গ্রামটিও খুব সুন্দর।

গ্রামের পাশ দিয়ে চেঙ্গী নদী বয়ে গেছে। আমার শশুর বাড়িটি ছিল বড় একটি টিলার উপর যেখানে সাত ভাই সকলে পাশাপাশি বাড়ি করেছেন। আমার শ্বশুরবাড়িটিও ছিল অনেক বড়। আমার শশুররা ছিলেন বড়বু গােজার বংশধর। চেঙ্গী নদীর ধারে হবার কারণে আমাদের গ্রামের চাষবাদের ফলন খুব বেশি ছিল।

কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ হবার আগে আমাদের বাড়ির কাছেই মানে শুভলং-এর ‘চিলকগােদায়/ চিলকধাক’ বাঁধ হবার কথা ছিল। সেজন্য লােগাং মনে উপর বাঁধ করার জন্য সকল মেশিন যন্ত্রপাতি বসানাে হয়েছিল। চিলকধাক একা নদীর দু’দিকে দুইটা করে চারটা বিশাল গর্ত করা হয়েছিল ।

শোনা যায় এখনো নাকি ঐ গর্তগুলো আছে। চিলকগােদাতে বাধ হলে সে বাঁধের পানিতে ভারতের অনেক এলাকা তলিয়ে যেতাে। তাই ভারত সরকার আপত্তি জানিয়েছিল ভারতের আপত্তির কারণে এই চিলকধাকে আর বাঁধ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। আমার এখন মনে হয় হয়তাে এখানে বাধ হলে আমাদের বাড়ি ডুবে যেতােনা ।

যখন কর্ণফুলির নদীর মুখে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শুরু হলাে, তখন আমাদের এদিকে গ্রামে গ্রামে গাছ কাটিং শুরু হয়েছিল। এই গাছ কাটিং হচ্ছে বাঁধ নির্মাণের একটি পর্ব । গাছ কাটিং’ হচ্ছে এলাকার সকল বড় বড় গাছ, বাগান, জঙ্গল কেটে ফেলা। যাতে বাঁধ হয়ে যাবার পর নৌকা বা বােট চলাচলের অসুবিধা না ঘটে।

কাপ্তাই বাঁধ করার সিদ্ধান্তের সাথে সাথে পানি কতটুকু উঁচু হতে পারে এসব নিয়েও সরকার হিসেব করেছিল। সে হিসেব অনুযায়ী এলাকার সকল বাগান বাগিচা উঁচু বড় গাছ সরকার নিজ দায়িত্বে বিজেই’ কেটে দিয়েছিল। এটি পানি আসার অনেক বছর আগের কথা। আমাদের বাড়ির গাছগুলােও কাটা পড়েছিল। এত গাছ! সব বড় বড় কাটা গাছ পড়ে আছে এখানে সেখানে। মন খারাপ করা সব স্মৃতির কথা বলছি।

পরে আমার শ্বশুর রান্নার লাকড়ি হিসেবে ব্যবহার করার জন্য সে কাটা গাছগুলাে সাইজ করা নিয়ে সারাদিন ব্যস্ত থাকতেন, সময় কাটাতেন এইটা আমার স্পষ্ট মনে আছে। কী-বা করার ছিল তখন! অপেক্ষা করা ছাড়া। তখন থেকে সবার মনে হাহাকার শুরু হয়ে যায়।

যারা এতদিন শুনেও বিশ্বাস করতাে না যে পানিতে সবকিছু ডুবে যাবে, ডুবে যেতে পারে তারাও আস্তে আস্তে বিশ্বাস করতে শুরু করলাে। গােছগাছ করা, দূরে কোথাও জায়গা কিনতে হবে সে ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়া শুরু করলাে সবাই। গাছ কাটিংটা ছিল আমাদের জন্য একটা সিগনাল।

এর আগে সরকারের পক্ষ থেকে গ্রামে গ্রামে খবর পাঠানাে হয়েছিল কাপ্তাই মখে সাধ তৈরি করা হবে। আর সেই বাধের ফলে কর্ণফুলির নদীর পানি আর বের হতে পারবে না আর সে পানিতে আমাদের জায়গা-জমি ঘরবাড়ি সব ডুবে যাবে।কিন্তু সরকারের এই কথা অনেকে বিশ্বাস করতে পারেননি ।

আমার চাচা শ্বশুর ছিলেন তাদেরই একজন। তিনি বলতেন নদীর পানি বেঁধে রাখা কার সাধ্যি। তাও আবার এতবড় কর্ণফুলি নদীর পানি! তিনি আরও বলতেন আমাদের এই ‘লেককুং’ ছড়া বাঁধা যায় না, আর এত্তবড় কর্ণফুলি নদী কীভাবে বাঁধ দিয়ে রাখা যাবে? এবং তার এই অবিশ্বাসের কারণে সময় থাকতে তিনি কোথাও জমি কেনার চেষ্টা করেননি।

যখন সত্যি সত্যি বাঁধের পানি বাড়তে থাকলাে, পানিতে সব কিছু ডুবে যেতে লাগলাে তখনই তিনি বিশ্বাস করলেন যে এইবার সত্যি সবকিছু তলিয়ে যাবে, নতুন জায়গায় চলে যেতে হবে। পরে কাকা চলে গিয়েছিলেন খাগড়াছড়ির ফেনীর কূলে, নতুন জীবনের সন্ধানে।

কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, মাত্র কয়েকবছর পর আবার অন্য সকলের সাথে কাকাকেও সেই নতুন করা বসতি থেকে উচ্ছেদ হতে হয়েছিল। আবার ফিরে যেতে হয়েছিল পুরােনাে ডুবে যাওয়া এলাকার অনেক উঁচু জায়গায়। সেই আরেক কাহিনী । আসলে আমাদের তাে আর কাহিনী’র শেষ নেই। একটার পর একটা আজ অব্দি লেগে আছে।

আমার শ্বশুরের গ্রামটা আসলেই সুন্দর ছিল। এই গ্রামে একটা বিশাল ’হামরাঙ’ গাছ ছিল। আমার মনে হয় আজকালকার ছেলেমেয়েরা এই হামরাঙ গাছ চিনবেনা। পানি আসার সাথে সাথে আমাদের পুরােনাে অনেক গাছ আর দেখা যায়না। অনেক গাছ হারিয়ে গেছে চিরতরে ।

আমাদের এই বিশাল হামরাঙ গাছটি ঢাকা ছিল ’সাব ফুলের লুদি’ দিয়ে। ’সাবফুল লুদি’র ফুল যখন ফুটতাে তখন অনেক দূর থেকেই তা দেখা যেত। মনে হতাে একটা বিশাল ফুলের গাছ দাঁড়িয়ে আছে। চেঙ্গী নদী দিয়ে নৌকায় করে আসা যাওয়ার পথে দূর থেকে এই হামরাঙ গাছের ফুল দেখা যেতাে।

সাবফুলের লুদি হচ্ছে এক ধরণের কাগজ ফুলের মতাে। কোনাে এককালে আমাদের এই গ্রামে কিছু বিদেশি বেশ কিছু সময় বসবাস করেছিল। তারা সাথে করে এই ফুলের লতা এনেছিল, তাই এই ফুলের তার নাম হয়ে গেল সাহেব ফুলের লতা, চাকমা ভাষায় সাব ফুল লুদি। আমাদের লেককুং’ নদীতে একটা মড়ং’ ছিল। এই নদীর তীরেও আরো একটা হামরাঙ গাছ ছিল। আর এই গাছে ছিল বিশাল ‘ঘিলা লুদি’। এখন তাে ঘিলা লুদি কোথাও দেখা যায় না। সব হারিয়ে গেছে।

বাঁধের পানিতে আমাদের সকল কিছু তলিয়ে যাবে, এরপর আমরা কোথায় যেতে পারি কোন জায়গা আমাদের জন্য ভালাে হবে এই নিয়ে আমাদের চিন্তার শেষ ছিলনা। বিশেষ করে আমার শ্বশুরের। গ্রামের লােকজন আর নিজেদের সাথে কথা বলে আমার শ্বশুর ঠিক করলেন লােগাং চলে যাবেন ।

গ্রামের অনেকে চলে যাবে মারিশ্যা রির্জাভ ফরেস্টে আবার অনেকে মনে মনে ঠিক করেছে ভারতে চলে যাবে। আমার শ্বশুরের ভাইরা খাগড়াছড়ি ফেনীর কূলে যাবে বলে ঠিক করেছে। ওরা আমার শ্বশুরকেও যেতে বললাে। কিন্তু তিনি কিছুতেই ওদিকে যাবেন না।

তিনি ঠিক করলেন লােগাং-এ যাবেন, ওখানেই জায়গা কিনবেন . তখন ‘ফেনীর কুল’ ছিল চাকমাদের এক নামকরা অঞ্চল। একধরণের শস্যভাণ্ডার বলা যায়। ফেনীর কূলের জমি ছিল অস্বাভাবিক উর্বর । ওখানকার অধিবাসীরা সবাই ছিলেন ধনশালী । তাই আমাদের সকল আত্মীয়-স্বজন ওখানেই জায়গা কিনতে চলে গেলেন ক্ষতি পূরণের টাকা দিয়ে ।

কত সালে একেবারে পানি চলে এসেছিল এখন তা সঠিক বলতে পারবাে না। তবে ১৯৬০ বা ৬১ দিকে হবে। তবে বাঁধের পানি একেবারে আসার আগে তার আগের দুই/তিন বছর বর্ষার সময় পানি ওঠেছিল । কিন্তু পানি উঠার কিছুদিন পর আবার চলে যায়। তবে পরের বছর মানে তিন বছরের মাথায় পানি আর চলে যায়নি।

বর্ষার সাথে সাথে পানি বেড়েছিল আর এই পানি প্রথমে সমতলের জমি পরে টিলার ঘর বাড়ি সব কিছু ডুবিয়ে নিয়ে যায়। তবে আমরা ঠিক ঐ সময়ে এলাকা ছাড়তে পারিনি। কারণ আমার শ্বশুরের একমাত্র মেয়ের ওখানেই বিয়ে হয়েছিল। যেহেতু আমার ননদের শ্বশুরবাড়ির লােকেরা ঐ জায়গা ছাড়ছেন না তাই আমার শ্বশুরও ঠিক করলেন ওখানেই থাকবেন। কিছুতেই মেয়েকে একা রেখে যাবেন না।

তাই আমরাও রয়ে গেলাম । অবশ্য এর আগেই আমরা ঐ এলাকায় আরেকটা অনেক উঁচু পাহাড়ে নতুন ঘর করেছিলাম। পানিতে আমাদের পুরাতন গ্রাম, সবকিছু তলিয়ে গেলে আমরা চলে এলাম নতুন বাড়িতে। এই বাড়িতে আমাদের নতুন সংসার শুরু হলাে। শুরু হলাে আমাদের টানাটানির কষ্টের সংসার। এই টানাটানি কষ্টের সংসার আমার কাছে একেবারে নতুন।

এই পর্যন্ত অভাব কি তাতো আমি কখনও অনুভব করিনি। শুরু হলাে কষ্টের জীবন । পানিতে সব ডুবে যাবার পরও আমাদের পুরাতন বাড়ির খুঁটির মাথাগুলাে অনেক বছর পর্যন্ত দেখা যেতে পানির উপর মাথা বের করে দাঁড়িয়ে আছে । যতবারই দেখেছি তবারই কান্না থামাতে পারিনি। এই অনুভূতিগুলাে তাে আসলে বলে বুঝাবার মত নয়। দেখানাের মতােও নয়। তাছাড়া তখন কান্না ছাড়া আর আমাদের কিইবা করার ছিল।

সবার মতাে আমরাও পানিতে ডুবে যাওয়া জায়গা-জমির ক্ষতি পূরণ পেয়েছিলাম। কিন্তু ক্ষতিপূরণ দিয়ে কি সব ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া যায়? টাকা দিয়ে কি মানুষের দুঃখ কষ্ট স্মৃতি সুখ পুষিয়ে নেয়া যায়? আমার মনে আছে তখনকার দিনে আমার বাবা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন ষাট (৬০) হাজার টাকা।

বাবার ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দেখে সাহেব বাবার সাথে পুলিশ দিলেন গার্ড হিসাবে, যাতে বাবা টাকা নিয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারে। বাবা কি কারণে এত টাকা ক্ষতিপূরণ পেলেন তা সরােজমিনে দেখতে সাহেব বাবাদের বাড়িতে চলে এসেছিলেন একদিন। এসেই তাে অবাক। সেই সাহেবের মতে, বাবা যদি চাইতেন তাহলে আরাে অনেক ক্ষতিপূরণ আদায় করতে পারতেন।

সে সময়ে আমরা মানে আমার বাবার দিকে এমন বিশাল সম্পত্তির অধিকারী ছিলাম । আমার বাবা আগেই ঠিক করেছিলেন মারিশ্যায় চলে যাবেন। সেখানেই নতুন করে জীবন শুরু করবেন। সেভাবেই বন্দোবস্ত করেছিলেন। জায়গা কিনেছিলেন মারিশ্যার সার্বোতলীতে। তাই পানিতে সবকিছু তলিয়ে যাবার পর বাবা মারিশ্যা চলে যান। সেখানেই নতুন জীবন শুরু করেন।

কিন্তু নতুনভাবে সবকিছু শুরু করা এত সহজ ছিল না। আমি পরে শুনেছি, নতুন নতুন বাবাদের হাজারাে কষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল। নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেয়াটা ছিল অনেক কষ্টের। গভীর জঙ্গল কেটে কেটে বসবাসের উপযােগী করতে হয়েছিল। সেই জঙ্গল কেটে বসতবাড়ির জন্য উপযুক্ত করা এতটা সহজ ছিলনা। চাষাবাদের জমির জন্য জঙ্গল কেটে নতুন জমি তৈরি করতে হয়েছিল। কতজন যে অসুখে মারা গেছে সেটাই বা হিসেব করেছে কে। এসব কষ্ট কি লিখলেই বুঝানাে যাবে? আমার তা মনে হয় না।

পানিতে ডুবে যাবার পর বন্দুকভাঙ্গায় আমাদের সেই নতুন বাড়িতে আরাে অনেক বছর মানে আট (৮) বছরের মতাে ছিলাম। আমাদের সব আত্মীয়-স্বজন নতুন নতুন জায়গায় চলে গেছে। পানিতে ডুবে যাবার পরবর্তী কয়েকটা বছর আমাদের অনেক কষ্ট করতে হয়েছে।

একটা সহজ স্বাভাবিক জীবন থেকে হঠাৎ করে এমন একটা কঠিন জীবন শুরু হলাে আমাদের, কে কাকে সাহায্য করে। জীবনের তাগিদে তখন আমার স্বামীকে আমাদেরকে রেখে সেই মারিশ্যায় গিয়ে কন্ট্রাকটার করতে হয়েছে। আর আমরা আমাদের সেই ডুবে না যাওয়া পুরনো ভিটার মাথায় চাষবাষ করেছি কিছুদিন।

আমার সব ছেলেমেয়েগুলাে এই কষ্টকর সময়ে জন্ম নিয়েছে। এরপর অনেক বছর পরে আবার একদিন আমরা নতুন জায়গা, খাগড়াছড়ির লােগাং যাবার জন্য তৈরি হলাম। আমার তখন কেবলই মনে হতাে আমার আর কখনাে সুখের মুখ দেখা হবে না। আমার সুখ বােধহয় পানি নিচে তলিয়ে গেছে।

একটা বিষয় আমার পরিষ্কার মনে পড়ে, কাপ্তাই বাঁধ বানানাের শেষের দিকে যখন বাঁধের পানি আসি আসি অবস্থা তখন মানুষের হাহাকার আর কান্নার সাথে সাথে পশুপাখিদের কান্নাও বেড়ে গিয়েছিল। কি করুণ ছিল কুকুরের ডাক। এই ডাক, কুকুরের স্বাভাবিক ডাক ছিল না। একেবারে অন্যরকমের ডাক।

অলুক্ষুণের ডাক। আমরা সবাই বলাবলি করতাম ঐযে কুকুররাও কাঁদছে। আর সঙ্গে পাখিদের চিৎকার কিচিরমিচির তাে ছিলই। আমাদের চাকমারা বলে যখন বড় বিপদ আসে তখন সবার আগে পশুপাখিরা বুঝতে পারে। আর কুকুরের এই ডাক মানেতাে বিপদের লক্ষণ।

আমি এখনাে দেখি, আমার একেবারে চোখে লেগে আছে, দিনের আর রাতের বেলায় ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরা উড়ে যাচ্ছে শব্দ করতে করতে। কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। সবকিছু থমকে আছে। প্রকৃতি বাতাস সব থমকে আছে। প্রকৃতি আগেই বুঝে গেছে যে বিপদ আসছে। সত্যি সত্যি সেই জানা বিপদ চলে এলাে, পানি চলে এলাে আর সবকিছু ডুবিয়ে দিয়ে গেল।

আমাদের স্বপ্ন সুখ সব ডুবিয়ে দিল। ঐতাে আমাদের ঘর ডুবে যাচ্ছে যেসব গাছ তখনও মাথা উঁচু করে দাড়িয়ে ছিল সেগুলােও ডুবে যাচ্ছে, আমরা সবাই তাকিয়ে দেখছি আর কাঁদছি। প্রকৃতি, মানুষ, পুশু পাখি আমরা সবাই একসাথে কাঁদছি আর কাঁদছি। একসময় ধীরে ধীরে পানিতে সব ডুবে গেল। সে এক পরিস্থিতি।

এখন, আজ বলার সময় মনে হচ্ছে আমি গল্প বলছি। অন্য কারাের গল্প । জানো তখনও পর্যন্ত আমরা বুঝতাম না কিসের জন্য আমাদের এই কর্ণফুলি নদীতে বাঁধ দেয়া হচ্ছে। হুম আবছা আবছা করে শুনেছি কারেন্ট বানাবে । কিন্তু কারেন্ট বানাতে কেন নদী বন্ধ করে দিতে হবে সেটা মাথায় ঢুকেনি তখন। এখন মনে হয় আমাদের সেই কারেন্ট গেল কোথায়?

সেই কাপ্তাই বাঁধের পানিতে তলিয়ে যাবার সাত বা আট বছর পরে আমরা পাকাপাকিভাবে লােগাং চলে এলাম। কিন্তু এই আসাটা এতটা সহজ ছিল না। আমার শশুর যখন জানালেন এইবার লােগাং চলে যাবার সময় এসেছে আমার তখন শুরু হলাে আবার কান্না। বিচিত্র কষ্ট আর অনুভূতি।

এইবার আমার সারাক্ষণ মনে হতে লাগলাে আমি আর বাঁচবাে না । এই জায়গা ছেড়ে গেলে আমি কিছুতেই বাঁচবাে না। যে জায়গা আমি জীবনেই দেখিনি সে জায়গায় গিয়ে আমি কীভাবে বাঁচবাে! ভাবতাম আর কাঁদতাম। কিন্তু আমার ছােট বাচ্চারা ছিল খুব খুশি। আর নতন জায়গায় যাচ্ছে এই খুশিতে তারা লাফাতে লাগলাে । লােগাং আসার একটা বড় নৌকা ভাড়া করা হয়েছিল।

সেই নৌকার উপর বসে সারাটা পথ আমি কাঁদতে কাদতে এলাম। এত কান্না কি পাওনা ছিল আমাদের? যা হোক নতন জায়গা লােগাং এ এসে থিতু হলাম কিন্তু আমি অনেক বছর পর্যন্ত পুরোনো জায়গা পুরােনাে সবকিছুকে মনে করে কেঁদেছি। কোথাকার আমরা কোথায় কোন জায়গায় এসে থাকতে হচ্ছে।

আমার বাবা মা ভাইবােন আজ সব কোথায়। কিন্তু মানুষ তাে আমারও পরে আস্তে আস্তে মন বসলাে। নতুন জীবন হলাে আমার। তবে মনে মনে সারাক্ষণ একটা হাহাকার ছিল আমাদের বন্দুকভাঙ্গার জন্য। আমার মাইচছড়ি গ্রামের জন্য। এর আগে আমাদের সকল আত্নীয় স্বজন আগেই থিতু হয়েছিল খাগড়াছড়ির ফেনীর কুলে।

সবাই যার যার নতুন নতুন জায়গায় নতুন জীবন শুরু করেছিল। আমাদের এইভাবে আসা যাওয়ার কাহিনী এখানেই শেষ হলেই হয়তাে ভালাে হতাে। কিন্তু হয়নি। দুঃখের দিন আর শেষ হয় না। মাত্র কয়েকটা বছর পর ১৯৬০ সালের পর খাগড়াছড়ি জেলার ফেনী কূলে জলিয়া নামের জায়গাকে কেন্দ্র করে ভারত আর পাকিস্তানের যুদ্ধ হয়।

এই যুদ্ধ চাকমাদের কাছে ‘জলিয়া যুদ্ধ‘ নামে পরিচিত। এই যুদ্ধের কারণেই আবার আমাদের সকল আত্মীয়-স্বজনকে উচ্ছেদ হতে হয় তাদের নতুন বসতি থেকে। এই তাে মাত্র কিছুদিন আগেই ওরা এসেছে কয়েক পুরুষের ভিটে মাটি পানিতে হারিয়ে শরণার্থীর মতাে। সেই তাদেরকে আবার উচ্ছেদ হতে হয়েছে যুদ্ধের কারণে।

আমাদের সেইসব আত্মীয়-স্বজন আবার ফিরে চলে যেতে বাধ্য হন বন্দুকভাঙ্গায় । ওখানের পাহাড়ে বসতি স্থাপন করেন নতুন করে। তবে এখন মনে হয় হয়তাে ভালােই হয়েছে আবার ফিরে গিয়ে। এখন সেখানে তারা বাগান বাগিচা করে স্বাবলম্বী। এই ফেনীর যুদ্ধের কারণে অনেককেই আবার চলে যেতে হয়েছিল মারিশ্যা কাজালং এলাকায়।

আমাদেরকেও অনেকবার ফিরে যেতে বলা হয়েছিল। কিন্তু আমার শ্বশুর আর ফিরতে চাননি ফেলে আসা জায়গাতে। তাঁর কথা হচ্ছে যে জায়গা থেকে একবার চলে এসেছি সেখানে জীবন থাকতে আর ফিরে যাবাে না। তাই আমরা রয়ে গেলাম লােগাং-এ। নতুন জায়গায় আত্মীয়-পরিজন ছাড়া।

লােগাং চলে আসার ৫ বছর পরে আমি একবার গিয়েছিলাম আমাদের পুরোনো ভিটায়। তখন কাপ্তাই লেকের পানি কম ছিল বলে আমাদের ভিটার মাথাটা দেখা যাচ্ছিল। সেই শেষ যাওয়া আমার সেখানে। আর যেতেও চাই না।

তবে আমি প্রতিবছর ২/৩ মাসের জন্য একবার রাঙামাটি বেড়াতে যাই । না, না নদীর পানি বা লেকের পানি দেখতে যাই না। আমার এইসবে মন নেই । বরং পানিটা দেখলেই আমার মন খারাপ হয়ে যায়।

আমাদের পুরােনােদের কাছে এই পানি কাপ্তাই বাঁধের পানি। কিন্তু এখন সবার কাছে শুনি এই পানির নাম কাপ্তাই লেক। সময়ের সাথে সাথে কত কিছু বদলে যায়। কর্ণফুলি নদী বন্ধ করার ফলে আমরা যে সবকিছু হারিয়েছিলাম আমাদের মৃত্যুর পর হয়তাে সেটাও কেউ আর মনে করবে না।

আমার প্রায় সব আত্মীয়-স্বজন তাে ওখানেই, রাঙামাটিতে। তাদের দেখতে যাই । আজ এতাে বছর পরেও রাঙামাটি গেলে আমার আর ফিরে আসতে ইচ্ছে করেনা। খাগড়াছড়িতে আমার সব ছেলে মেয়ে থাকে কিন্তু তবুও রাঙামাটি গেলে ফিরে আসতে মন চায় না।

আমার মন পড়ে থাকে সেখানে। জীবনের শেষ বেলায় এসে আমার শুধু মনে হয় কাপ্তাই বাঁধ না হলে কত-না ভালাে হতাে। আমাদের সেই গ্রামের কত উন্নতি হতাে। কারণ আমাদের গ্রামটি যে রাঙামাটি শহর থেকে খুব কাছে। অথচ এই বাঁধের কারণে শুধু হারিয়েছি পেলাম না কিছুই। এই কাপ্তাই লেকে আমাদের লক্ষ মানুষের চোখের জল দীর্ঘশ্বাস জমে আছে।

১. কাপ্তাই বাঁধের পানিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের হাজারো একর জমি আর গ্রাম ডুবে যাবার পর লক্ষ লক্ষ মানুষকে পরিবেশ রিফউজি হতে হয়েছিল। অর্ধ লক্ষেরও বেশি চাকমা আর হাজং জনগোষ্ঠীকে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যেতে হয়েছিল। চাকমাদের কাছে এটাই বর-পরং নামে পরিচিত।
২. চাকমা রাণী জাতিতে বাঙালি ছিলেন বিধায় চাকমা ভাষা খুব সাবলীলভাবে বলতে পারতেন না।
৩. এটি চাকমা শব্দ যার অর্থ হচ্ছে কোনো অবশিষ্ট না রেখে নিশ্চিহ্ন করে ফেলা।
৪. ঐ গ্রামের একটা ছোট্ট নদী যার স্থানীয় নাম লেককুং।
৫. এটি একটি চাকমা শব্দ। নদীর মাঝখানে গভীর ঘুর্ণায়মান তীব্র পানির স্রোত।
৬. একটি বিশেষ ধরণের বড় লতা। এই লতার ফল এর ভূমিকা পাহাড়ি সমাজে, পরিবারে অতীব গুরুত্বপূর্ণ। এই লতার ফল পবিত্রতার প্রতীক। এই ফলের মিশ্রিত পানি ছিটিয়ে দিয়ে অপবিত্র ঘর বা মানুষকে পবিত্র করা হয়।
৭. খাগড়াছড়ি জেলার মাটিরাংগা উপজেলার তবলছড়ি ফেনী এলাকায় জলিয়া নামে একটি জায়গা আছে। এই জায়গাটি নিয়ে পাকিস্তান আমলে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে একবার যুদ্ধ হয় ১৯৬০ সালের পরে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পরও আরো একবার এই এলাকা নিয়ে যুদ্ধ হয় ভারত আর বাংলাদেশের মধ্যে। চাকমাদের কাছে এই যুদ্ধ বিখ্যাত জলিয়া যুদ্ধ নামে পরিচিত।

পঞ্চ চাকমা
পঞ্চ চাকমা

লেখকঃ পঞ্চ চাকমা, অনন্ত মাস্টার পাড়া, খাগড়াছড়ি।

তথ্যসুত্র : “কাপ্তাই বাঁধ : বর-পরং – ডুবুরীদের আত্মকথন” – সমারী চাকমা।

জুমজার্নালে প্রকাশিত লেখাসমূহে তথ্যমূলক ভুল-ভ্রান্তি থেকে যেতে পারে অথবা যেকোন লেখার সাথে আপনার ভিন্নমত থাকতে পারে। আপনার মতামত এবং সঠিক তথ্য দিয়ে আপনিও লিখুন অথবা লেখা পাঠান। লেখা পাঠাতে কিংবা যেকোন ধরনের প্রয়োজনে যোগাযোগ করুন - [email protected] এই ঠিকানায়।

আরও কিছু লেখা

Jumjournal

Administrator