ককবরক ভাষার বিকাশ গভীর আত্মসমীক্ষা প্রয়োজন

0
3

ককবরক ভাষার বিকাশ গভীর আত্মসমীক্ষা প্রয়োজন

ককবরকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত শিক্ষাদান প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল আজ থেকে কুড়ি একুশ বছর আগে। যে সমস্ত অঞ্চলে বা বিদ্যালয়ে ককবরকভাষী ছাত্রছাত্রী সংখ্যায় অধিক সেখানেই মূলতঃ এই শিক্ষা সূচনা শুরু হয়।

ককবরক রাজ্যভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরে আমাদের মধ্যে যে আশা আখাঙ্খা, স্বপ্ন নতুন করে ডালপালা মেলতে শুরু করছিল এখন সেখানে আনন্দে উৎসাহে ফুলের কুঁড়ি যেন উঁকি দিয়ে বেড়িয়ে পড়ল।

মাতৃভাষার শিক্ষার আনন্দই অন্যরকম। প্রথম পর্যায়ে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয় ­– অংক, বিজ্ঞান, ভূগোল ইত্যাদি এবং তারপরে ক্রমশ ককবরকে উচ্চশিক্ষা লাভ করার এই আখাঙ্খা ব্যাপ্ত হয় অভিভাবক এবং সাধারণ মহলে। চমৎকারভাবে ককবরকের এক নতুন অধ্যায় শুরু হল।

তখন ককবরকভাষী ছাত্রছাত্রী – যারা খানিকটা উচুঁ ক্লাশে পড়তো তাদের আক্ষেপ করতে শোনা যায়। আরও ক’বছর আগে ককবরকে শিক্ষা লাভের এই সুযোগ থাকলে কত ভালো হতো।

তারাও পড়তে পাড়তো। মাতৃভাষায় শিক্ষাদান এবং শিক্ষা গ্রহন সত্যিই তো অনেক সহজ। গ্রামের অনেক স্কুলের শিক্ষক ককবরক ভালো জানেননা আবার নিচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা বুঝতনা বাংলা ভাষা।

এতে কত সমস্যা হতো! বইয়ের মধ্যে লেখা আছে আম। কিন্তু কি বস্তু ছাত্র বুঝেনা। শিক্ষক হয়তো আম গাছের দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে জিজ্ঞেস করতেন – ঐটা কি? ছাত্র উত্তর করত – থাইচুক।

কেননা জন্মের পর থেকে আম-এর ককবরক শব্দ “থাইচুক” ঐ  ছাত্রটি শুনে এসেছে। এই আম শব্দটি যদি কচি শিশুর পাঠ্যপুস্তকে ‘থাইচুক’ লেখা থাকত তবে কোন সমস্যাই হতোনা।

ককবরক রাজ্যভাষার স্বীকৃতি লাভের পঁচিশ বর্ষপূর্তি উৎসব আয়োজিত হয়েছে। এই উপলক্ষে আজকের সেমিনারে ককবরক শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে কতটুকু এগিয়েছে, কোথায় দুর্বলতা রয়েছে আলোচনা হবে।

এক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য কতটুকু যেমন জানা যাবে তেমনি কিছু ক্ষেত্রে ব্যর্থতার কারনগুলিও চিহ্নিত করা সহজ হবে।

আমরা যদি সমস্যাগুলো খুঁজে বের করতে পারি তাহলেই সম্ভাবনার দিকে অগ্রসর হতে পারব। আমি সমস্যার প্রান্ত থেকেই আলোচনা শুরু করতে চাই।

ত্রিপুরা রাজ্যে বর্তমানের এ ডি সি এলাকাগুলোতে প্রায় সাড়ে তেরশ স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ককবরক মিডিয়ামে শিক্ষাদান শুরু হয়েছিল।

রাজ্য সরকারের আরও চারশ স্কুলে অর্থাৎ মোট সাড়ে সতেরশ প্রাথমিক স্কুলে ককবরকে শিক্ষাদান চালু হওয়ার কথা। এখন এগুলোর অবস্থা কি?

সমস্যাগুলো চেপে রাখা, এড়িয়ে গিয়ে আলোচনা করা আমাদের কাজ নয়। বাস্তবতাকে অনুধাবন করতে হবে।

যখন কোনো গ্রামে যাই সুযোগ পেলেই আমি খুঁজে নিতে চেষ্ঠা করি। ককবরক স্কুলের ছোট ছাত্রছাত্রীদের, অনেক সময় শিক্ষকদের সেই স্কুলের কথা জিজ্ঞেস করি।

তাদের উত্তর শুনে প্রায়ই আমার কষ্ট হয়। কেননা ইদানিং ককবরকে পড়ি অথবা ককবরকে পড়াই এরকম উত্তর শোনা যায়না।

মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের বাঁধভাঙ্গা আনন্দ, উজ্জ্বল আশা, বুকভরা স্বপ্ন যেন কোথাও হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ছে।

অনেকগুলো স্কুলে ককবরক শিক্ষক দেওয়া হল, ককবরক শিক্ষা চালু হল। এগুলোর এমন হতাশাজনক চিত্র কেন? সঠিক তথ্য এখন আমার হাতে নেই, কিন্তু দেখতে হবে ক’টি স্কুলে এখনও ককবরকে শেখানো হয়।

শুনেছি খোয়াই মহকুমার রতনপুর হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ককবরক ল্যাঙ্গুয়েজ সাবজেক্ট হিসেবে পড়ানো হচ্ছে। এটা আনন্দের বিষয়।

কিন্তু প্রাথমিক ককবরক স্কুলগুলির অবস্থা আরো ভালো হওয়া দরকার। কোথাও কোথাও বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের পরিদর্শক, ককবরক শিক্ষক বা অভিভাবকদের সাথেও সমস্যাটা নিয়ে কথা হয়েছে।

কেন ককবরকে পড়ানো হয়না, ছাত্রছাত্রীরা ককবরকে পড়তে আগ্রহী কিনা এসব জানতে চেয়েছি। কারো মতে ককবরকে পড়াতে গেলে আরো বিভিন্ন রকমের বইয়ের জোগান চাই।

শুধু পাঠ্যপুস্তকে শিশুদের অভাব হয়না। বাড়তি জ্ঞানলাভের জন্য সিলেবাসের বাইরেও বিভিন্ন বিষয়ে বই থাকা আবশ্যক।

এগুলো ককবরকে না থাকার ফলে কোনো কোনো অভিভাবক বলেন-বাংলা বা ইংরেজী মাধ্যমেই পড়াশুনা করাই ভাল।

আবার অনেকের মতে ককবরকে পড়লে ষষ্ঠ শ্রেণীতে হঠাৎ বাংলা মাধ্যমে পড়তে গিয়ে খুব অসুবিধা হয়। এর চেয়ে প্রথম শ্রেণী থেকেই বাংলা বা ইংরেজী মাধ্যমে পড়া দরকার। এতে ড্রপ আউটের সংখ্যা কমবে।

ককবরকে শিক্ষালাভের প্রতি এই নেতিবাচক ধারনা বাঞ্চনীয় নয়। সমস্যাটা কোথায় সন্ধান করতেই হবে। ছাত্রছাত্রীদের দোষ দেওয়া যায়না।

এরা কোন মাধ্যমে পড়াশুনা করবে এটা সম্পূর্ণটাই নির্ভর করে স্কুলের অবস্থা অথবা মা-বাবার ইচ্ছার উপরে।

কোনও অভিভাবক মনে করেন ককবরক ভাষায় শিক্ষালাভের কোন উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নেই। ককবরক শিক্ষকেরা সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষাটাকে ধরতে পারছেন না, দিতে পারছেন না – ছেলেমেয়েরা এত পিছিয়ে যাবে।

এরকম ভাবনা থেকে ককবরকভাষী সাধারণ লোকজন ককবরক স্কুল থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন। মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের যে দারুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, উন্মুক্ত হয়েছিল পথ-সেই পথ ‍রুদ্ধ হয়ে যাবে নাকি?

এখানে এই ককবরক উৎসবের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে  মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, অন্যান্য বক্তারাও বলছেন যে ককবরক Language Subject হিসেবে কলেজ স্তরে চালু করা হবে। এটা বড় আশার কথা।

একসময় বিশ্ববিদ্যালয়েও ককবরক পরিপূর্ণ বিষয় হিসেবে হয়তো পড়ানো হবে। আমরা হয়তো পেয়ে যাব দু’চার দশজন ককবরকে এম এ অথবা অনার্স ডিগ্রিধারী লোকজন।

এমন অবস্থা তৈরী হলে এক ধরনের আনন্দ নিশ্চয় হবে। এসব ভাবনায় আমি কিন্তু এখন আর আবেগে আপ্লুত হইনা। কোন উৎসাহ পাইনা।

ককবরকভাষী ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক, গণমানুষ যদি নিজের মাতৃভাষার প্রতি আকৃষ্ট না হয়, মাতৃভাষায় শিক্ষালাভে আগ্রহী না হয়, তবে সবাই বিফলে যাবে।

ককবরকে উচ্চশিক্ষা দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হলে সবাই পুলকিত হবেন, আমিও খুশি হব। কিন্তু যে সাড়ে সতেরশ স্কুলে ককবরক শিক্ষা শুরু হয়েছিল সেখানে আবার ককবরকে শিক্ষা দেয়ার কাজ শুরু করতে হবে।

আমি আরও খুশী হব, ককবরকভাষী ছাত্রছাত্রী যেখানে সংখ্যায় বেশী সেইসব প্রত্যেকটা  স্কুলে যদি ককবরকে শেখানো হয়, ককবরক মিডিয়ামে সেখানেও যদি শিক্ষাদান চালু হয়।

বিদ্যালয়ের সংখ্যা এতে সাড়ে সতেরশ থেকে অনেক বেশীই হবে।

আমাদের মধ্যে উৎসাহের যে জোয়ার তৈরী হয়েছিল তাতে ভাটা পড়ল কেন, হারিয়ে গেল কেন তা দেখা দরকার। রাজ্য সরকার এবং এ ‍ডি সি থেকে যে সমস্ত ককবরক শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছিল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে পড়ানোর ক্ষেত্রে এদের প্রস্তুতি কিরকম তাও দেখতে হবে।

শুধু পাঠ্যপুস্তকের অতিরিক্ত অন্যান্য বইয়ের অভাবেই এই সমস্যা তৈরী হয়নি। শিক্ষকদের মধ্যে রিফ্রেশার্স-এর ব্যবস্থা হয়েছে কিনা, কিভাবে হবে এসবও রয়েছে।

ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত ককবরকে পাঠ শুরু হলে উপযুক্ত শিক্ষক প্রয়োজন হবে। এখন যে সকল ককবরক শিক্ষক আছেন তাদের দিয়ে একাজ সম্ভব নয়।

এক্ষেত্রে গ্র্যাজুয়েট টিচার দরকার। সাধারণ শিক্ষক যারা রয়েছেন তাদের মধ্যে কি ককবরকে শিক্ষা দেয়ার প্রস্তুতি আছে? সুপরিকল্পিতভাবে এগুলো দেখা না হলে আমাদের মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের, শিক্ষালাভের স্বপ্ন কখনো সফল হবেনা। ‍

সম্ভাবনা সব শেষ হয়ে গেছে এটা বলা ঠিক হবেনা। এখনও সময় আছে। ককবরক সরকারী ভাষার স্বীকৃতি পাওয়ার এই রজতজয়ন্তী বর্ষে বলা যায় ভাষাটা যৌবনে পদার্পণ করেছে।

একটা ভাষার বিকাশে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন। তবে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে এখনই কাজের উদ্যোগ নেয়া আবশ্যক।

এই সেমিনারে খানিকটা অপ্রাসঙ্গিক হলেও আর একটা বিষয় হলো হরফ নিয়ে বিতর্ক। এই বিতর্কে ককবরক ভাষার বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করছে। বেশীর ভাগ ককবরক স্কুল এ ডি সি এলাকায় রয়েছে।

একসময় বাংলা হরফে পাঠ্যপুস্তক লেখা হয়েছিল। ‍এরপর সেখানে রোমান হরফে ককবরক পাঠ্যবই সিদ্ধান্ত হল। কোথাও আবার রোমান হরফের অতি উগ্র সমর্থকেরা বাংলা হরফে লেখা বই নষ্ট করে ফেলল।

অথচ রোমান হরফেও ককবরক শিক্ষা চালু করতে পারলনা। ছাত্রছাত্রীদের বয়স থেমে থাকেনা। এরা ক্ষতিগ্রস্থ হল। হরফ নিয়ে টানাটানি সিদ্ধান্তহীনতা এই ভাষাকে পেছনে টেনে রেখেছে।

আমি ভাষার কিছু সমস্যা তুলে ধরলাম। এটা শুধু ককবরকের কথা নয়। অন্যান্য অবিকশিত ভাষা-চাকমা, মগ, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, হালাম কুকী সব ভাষারই বিকাশ প্রয়োজন।

ভারতবর্ষে সংহতির জন্য অনেক কথা হয়েছে, আমরা সাম্যের কথা বলি। কিন্তু অবিকশিত ভাষার জনগোষ্ঠী, সংস্কৃতির দিক থেকে পিছিয়ে থাকা মানুষ সবসময় একটা হীনমন্যতায় ভোগে।

দশতলার বাসিন্দা একজন ধনবানের সঙ্গে রাস্তায় রাত কাটানো কোন নিঃস্ব লোকের মধ্যে বন্ধত্ব বা মানসিক সংহতি থাকা কতটুকু সম্ভব? এটা হয়না।

পিছিয়ে পড়া ভাষাকে আমাদের সকলের মঙ্গলের জন্য সামনে এগিয়ে নিয়ে আসতে হবে। হীনমন্যতা ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্নবোধের জন্ম দেয়। সামান্য ইন্ধন পেলেই তখন সংহতির সূত্র হারিয়ে ফেলে বিচ্ছিন্ন মন ও মানুষ।

শিক্ষার মাধ্যেম হিসেবে পিছিয়ে থাকা ককবরক নিয়ে, সমস্যা নিয়ে আলোচনা হোক- আমি শ্রোতা। সবাই খোলামেলা আলোচনা করে বলুন সম্ভবনা কোথায় কতটুকু, সমাধান কোন পথে।

এখানে বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরের অধিকর্তা, ত্রিপুরা মধ্যশিক্ষা পর্ষদের সেক্রেটারী সহ ককবরকের কবি, সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবিরা কথা বললেন।

ককবরকের স্বাভাবিক বিকাশ কেন ব্যহত হচ্ছে, এ নিয়ে এখন আমাদের মধ্যে এক গভীর আত্মসমীক্ষার প্রয়োজন। দায়িত্ব নিয়ে সমস্যা থেকে ককবরকের উত্তরনের জন্যে একটা দিশার সন্ধান শুরু হোক।


লেখকঃ জীতেন্দ্র চৌধুরী। মন্ত্রী, উপজাতি কল্যাণ এবং ক্রীড়া ও যুব বিষয়ক ইত্যাদি দপ্তর

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here