ককবরক বানান সমস্যা

0
3

বছর কয়েক আগে এ. ডি. সি-র এক সেমিনারে রিসোর্চ পার্সন হিসেবে অংশ নিয়ে কিছু কথা বলার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখন বলেছিলাম, একটি জাতিগোষ্ঠী হিসেবে পরিচয় দিতে গেলে আমাদের হয় বড়ো নয় ব্রু লেখা উচিত, বরক নয়।

যাহোক আমার বলার বিষয় যেহেতু বানান সমস্যা নিয়ে তাই এখানে আমার বক্তব্য সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। যেখানেই ককবরক সংক্রান্ত সেমিনার সেখানেই আমি একটি বিষয় বার বার উত্থাপন করি। বিষয়টা বানান সমস্যা। কিন্তু সে সমস্যার গুরুত্ব এখনও দেয়া হচ্ছেনা। সমস্যা থেকেই যাচ্ছে।

ককবরকের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে যা অন্য কোন ভাষাতে নেই। তা হল একই বানানে লিখিত শব্দ উচ্চস্বরে অথবা নিম্নস্বরে উচ্চারণ হলে অর্থের পার্থক্য ঘটা। যেমন-ফায় মানে আসা, ফাই মানে ভেঙ্গে দেয়া।

হর রাত্রি, হ-র আগুন। বাংলা অক্ষরে যখন ককবরক লেখালেখি হয় তখন আসা অর্থে ফায়, ভেঙ্গে দেয়া অর্থে ফাই, বেচেঁ থাকা। অর্থে থাঙ এবং চলে যাওয়া অর্থে লেখা হয় থাং

। এককথায় উচ্চস্বরে ই এবং ং ও নিম্নস্বরে য় এবং ঙ ব্যবহৃত হয়। তখনই আমি প্রশ্ন তুলেছিলাম রাত এবং আগুন অর্থের ‘হর’ এর পার্থক্য কি করে বুঝানো হবে। আবার যাওয়া এবং ঠিক হওয়া অর্থে ‘চা’ এর পার্থক্য কি করে বুঝানো হবে। অ-কার এবং আ-কার তো আর দু’টো নেই।

এর কোন উত্তর পাওয়া না গেলেও কাজ চলতে থাকে। একই বানানে লিখিত শব্দের ভিন্নার্থ হিন্দী, বাংলা, ইংরেজী ভাষায়ও আছে। যেমন ইংরেজী desert এর দু’টো অর্থ। তবে তার সাথে আমাদের সমস্যা এক নয়।

আমাদের সমস্যা high tone আর low role বর্তমানে আমি কৈলাশহরে একটি ককবরক কোচিং সেন্টারে শিক্ষকতা করি। সেই সেন্টারের শিক্ষার্থীরা সবাই অ-ককবরক ভাষী। তাই তাদের বানান সম্পর্কীয় বিভিন্ন প্রশ্নের সদুত্তর আমিও দিতে পারিনা।

আমার মতে একারণেই high tone আর low toneএর জন্য বানান পার্থক্য রাখা ঠিক নয়। শব্দের সাথে অন্য মাত্রা যোগ দিয়ে অর্থের পার্থক্য বুঝতে গেলেও সঙ্গীতের সুর দেয়ার ক্ষেত্রে প্রকটভাবে সমস্যা দেখা দেয়া স্বাভাবিক।

মুদ্দা কথা হল, বাক্য পঠনেই অর্থ যেখানে বুঝা যায় সেখানে বানান পার্থক্যের মত জটিল বিষয় রাখা ঠিক নয়। আগরতলা থেকে উত্তর ত্রিপুরায় যাওয়ার রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় লেখা আছে ফাই কাহাম এবং হামবাই ইত্যাদি শব্দ।

কিন্তু কেউতো বলছেনা বানান ঠিক নয়। কেননা সূত্র অনুযায়ী লেখা উচিত ফায় কাহাম এবং হামবায়। কাজেই বলতে বাধ্য হচ্ছি, কোথায় কিভাবে লেখা হচ্ছে, কোনটাই বুঝতে সক্ষম হচ্ছিনা।

রোমান হরফে ককবরক লিখতে গেলেও high tone low tone-এর সমস্যা থেকে যায়। তাই সেটাকে abolish করা দরকার।

ব্রু দের কথা যেখানে কউ বরকদের সেটা কক। Originaly কউ ব্রু আর ককবরক একই। সেটা ব্যবহারে পার্থক্য হয়ে গেছে। যেমন বৗকখাসে হাময়া মানে মন একেবারে ভাল নয় এবং বরকসে হাময়া মানে মানুষটা ভাল নয় বাক্যগুলো বুঝার ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা হয়না।

তাহলে কউ ব্রু আর ককবরক একই ভাষা হবেনা কেন? তবে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে অন্য শব্দ ব্যবহৃত হয়। যেমন চোঙ-এ বিশেষ পদ্ধতির রান্নাকে ককবরকে বলা হয় গুদক আর কউ ব্রু তে বলা হয় পেং।

সেসব ক্ষেত্রে দু’টো শব্দই রেখে দেয়া উচিত। এতে শব্দ ভান্ডার বৃদ্ধি পাবে। লেখকেরা যেটাকে appropriate মনে করবেন সেটাই লিখবেন। বাংলাতেও এধরনের শব্দ বহু আছে। যেমন সূর্য শব্দের অনেক প্রতিশব্দ। সমস্যা এখানে নয়, অন্যখানে।

কউ ব্রু কে যদি ককবরকের সাথে মেলাতে হয় এবং যদি বাংলা অক্ষরে ককবরক লিখতে হয় তাহলে আরও কয়েকটি বর্ণ সংযোজন করতে হবে। যেমন  ‘ঃ’ (বিসর্গ) ছাড়া কউ ব্রু বা রিয়াংদের পঞ্চাশ শতাংশ শব্দ লেখা যায়না। আবার ‘্’ ছাড়া অন্য কোন পদ্ধতিতে সেগুলো লেখা যায়না।

কে অর্থে ‘স্ব’ লেখা যায় কিন্তু বাংলায় সেখানে ‘ব’ উহ্য থাকে। যেমন-স্বাধীনতা। তাই? হসন্ত দিয়ে ‘ব’ লেখাই শ্রেয়। প্রথম অক্ষর ‘্’ হসন্ত বাদ দিয়ে ব্রু শব্দ লেখা যায়না।

বিসর্গ এবং হসন্ত ককবরকে যুক্ত করতে হবে। আমি আগেও একথা বলেছি। SCERT-র এ বিষয়ে চিন্তা করা এবং গুরুত্ব দেয়া উচিত। বানানের সমস্যা আরও আছে। যেমন-গাড়ী, বাড়ী, ঘড়ি, শাড়ী,কলম ইত্যাদি।

কলমের ককবরক শব্দ ইদানিং রিককং লেখা হচ্ছে। কিন্তু কলম আমাদের কাছে অপরিচিত শব্দ নয়। কাজেই প্রতিশব্দ হিসাবে কলম শব্দ রাখা উচিত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে গাড়ী, ঘড়ি ইত্যাদির। কারণ এদের বানান ‘ড় দিয়ে।

ককবরক লিপি নিবার্চনে ‘ড’ এবং ‘ঘ’ রাখা হয়নি। ঘড়ি লেখা হবে না গরি লেখা হবে-এর সমাধান এখনও হয়নি। তবে সমাধান দরকার।

পরিশেষে একথা বলে আমার বক্তব্য শেষ করতে চাই। বিসর্গ এবং হসন্ত অবশ্যই ককবরক লিপিতে অন্তর্ভুক্ত করা দরকার।

এমনিতেই রিয়াংগন এ সেন্টিমেন্ট নিয়ে আছে যে, ককবরক কউ ব্রু নয়। তাই তাদের উচ্চারন গুলোর প্রতি গুরুত্ব দেয়া দরকার। তাদের ব্যবহৃত শব্দগুলোকে ককবরকের প্রতিশব্দ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া দরকার।

কোন লেখক যদি রিয়াং ডাইলেক্টে গল্প উপন্যাস লিখতে চান তাহলে তার লেখা ককবরক হিসেবে প্রকাশ করা দরকার। তাহলেই তার মনে এ ধারনা জাগবে যে, কউ ব্রু আর ককবরক ভিন্ন নয়।

 


 লেখকঃ  গীত্য কুমার রিয়াং, বিশিষ্ট লেখক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here