নোয়াম চমস্কিঃ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেখানে ভুল পথে

0
46

সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন Yarden Katz যিনি MIT এর ডিপার্টমেণ্ট অফ ব্রেইন এন্ড কগনিটিভ সাইন্স এর গ্রাজুয়েট ছাত্র। তার গবেষণার বিষয় স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশ এবং ক্যান্সার বিস্তারে জিনের প্রভাব।

 

সাক্ষাৎকার গ্রহনকারীর ভূমিকাঃ

মানব সভ্যতার সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জগুলোর যদি তালিকা করা হয় তাহলে সবার উপরে থাকবে মানুষের মন এবং মস্তিস্কের আভ্যন্তরিন গঠন, এদের কার্যপ্রনালী এবং কীভাবে এদের গঠনপ্রণালী জিনের সংকেতে লিপিবদ্ধ থাকে সেটা বোঝা। এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চ্যালেঞ্জটি দর্শন থেকে মনোবিজ্ঞান হয়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান আর স্নায়ু বিজ্ঞান সহ জ্ঞানের বিভিন্ন শাখাই গ্রহণ করেছে। তবে তাদের মধ্যে সমস্যাটিকে নিয়ে কীভাবে এগোতে হবে সে বিষয়ে নানান মতভিন্নতা দেখা যায়।

১৯৫৬ সালে জন ম্যাকার্থি নামক একজন কম্পিউটার বিজ্ঞানী প্রথম বুদ্ধিমত্তার অপরিহার্য উপাদানগুলোকে কম্পিউটারে ইমপ্লিমেন্ট করে সেটা নিয়ে বিশ্লেষণ করার চর্চাকে নাম দেন “আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স” বা “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা”। এভাবে মানুষের তৈরি যন্ত্রপাতির মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বানাতে পারলে বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে আমাদের বোঝা সম্পূর্ন হয়েছে বলে প্রমাণিত হবে। তখন এর অনেক ব্যবহারিক প্রয়োগও পাওয়া যাবে, বুদ্ধিমান যন্ত্রপাতি এবং রোবট তৈরীতে।

ম্যাকার্থির সমসাময়িকরা অবশ্য কম্পিউটারে ইমপ্লিমেন্ট করার বদলে আগে মানুষের (বা অন্য প্রাণীদের) মধ্যে বুদ্ধিমত্তা কিভাবে কাজ করে সেটা বোঝার চেষ্টায় বেশী আগ্রহী ছিলেন। সে সময় আরো অনেকের সঙ্গে নোম চমস্কি আমাদের অনুভব এবং অনুধাবন করার ক্ষমতার পিছনে যে মানসিক নিয়মকানুন কাজ করে সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলেন। এই চর্চাকে পরবর্তিতে কগনিটিভ সাইন্স বা চৈতন্য বিজ্ঞান হিসাবে নাম করণ করা হয়। এ কাজ করতে গিয়ে চমস্কিদের তখনকার প্রচলিত সবচেয়ে প্রভাবশালী তত্ত্ব (হার্ভার্ড মনোবিজ্ঞানী বি এফ স্কিনার কর্তৃক প্রণীত) বিহেভিয়ারিসম কে ছুঁড়ে ফেলতে হয়, যে তত্ত্বে প্রাণীদের আচরণকে স্রেফ কিছু কাজ আর তার ফলে প্রাপ্ত লাভ আর ক্ষতির মধ্যে সম্পর্ক হিসাবে সরলীকরণ করা হতো। ১৯৫৯ সালে চমস্কি স্কিনারের বই Verbal Behavior – যেখানে বাচনক্ষমতাকে বিহ্যাভিয়ারিস্ট নীতিমালার সাহায্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে- এর একটি সমালোচনামূলক প্রবন্ধ লেখেন। যেটা মনোবিজ্ঞানের উপর থেকে স্কিনারের প্রভাব বহুলাংশে হ্রাস করে।

স্কিনারের অ্যাপ্রোচে কোনো প্রাণীর প্রাপ্ত প্রণোদনা আর তার ফলে তার প্রতিক্রিয়াগুলোকে তার আচরণের ইতিহাসের সাপেক্ষে বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়। ব্যাপারটাকে অতীতের সাপেক্ষে ভবিষ্যৎ অনুমান করার একটা পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি হিসাবে দেখা যেতে পারে। অপরদিকে চমস্কির বিশ্লেষণে মানব জিনোমের অন্তর্গত জটিলতা কীভাবে উপযুক্ত তথ্যের উপস্থিতিতে একটা জটিল গণনাপ্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে ভাষাজ্ঞান হিসাবে বিকশিত হচ্ছে তা অনুসন্ধান করা হয়। এ ধরনের জটিল বিকাশ স্রেফ সরল কিছু নিয়মের সমষ্টি হিসাবে প্রকাশ করা যায় না। এটা স্পষ্ট যে শুধুমাত্র বিহেভিয়ারিস্ট নীতিমালা মেনে ভাষার প্রাচুর্য ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। বিশেষ করে যদি ভাষার সীমাহীন সৃষ্টিশীল ব্যবহার আর কোনো শিশুর আশেপাশের পরিবেশ থেকে ভাসা ভাসা ভাবে শোনা শব্দ থেকেই পুরো একটা ভাষা শিখে ফেলার ক্ষমতাকে হিসাবে আনা হয়। চমস্কির মতে ‘ভাষার ক্ষমতা’ মানুষের দৃষ্টি শক্তি, শ্রবণ শক্তি, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, পরিচলন তন্ত্র ইত্যাদির মত স্রেফ আরেকটা খাঁটি শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার যা মানুষ তার জেনেটিক উত্তরাধিকারসূত্রে পায়।

নিউরোলজিস্ট ডেভিড মার কোনো শারীরবৃত্তিয় ব্যবস্থা (যেমন মস্তিস্ক) কে বিশ্লেষণের একটা সাধারণ কাঠামো প্রণয়ন করেন তাঁর Vision নামক বই এ। চমস্কির ‘ভাষা ক্ষমতার’ বিশ্লেষণ এই বই এ প্রণীত কাঠামোতে পড়ে। মারের মতে কোনো জটিল শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থাকে তিন স্তরে বোঝা সম্ভব। প্রথম স্তর (গণনা স্তর) ঐ ব্যবস্থাটির ইনপুট আর আউটপুট নিয়ে আলোচনা করে, যা ঐ সিস্টেমটি আসলে কী করছে সেটা নির্ধারণ করে। যেমন দৃষ্টি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইনপুট হচ্ছে আমাদের রেটিনাতে প্রক্ষিপ্ত ছবি আর আউটপুট হচ্ছে মস্তিস্কে সেই ছবির মাঝে উপস্তিত বস্তুগুলোর পরিচিতি। দ্বিতীয় স্তরে (অ্যালগরিদমিক স্তর) আলোচনা হয় কীভাবে এই ইনপুট আউটপুটে পরিণত হচ্ছে তার প্রক্রিয়া। অর্থাৎ রেটিনায় প্রক্ষিপ্ত ছবিটাকে কীভাবে বিশ্লেষণ করলে গণনা স্তরে যে কাজের কথা বলা হয়েছে সেটা সম্পন্ন হবে তা। সবশেষে তৃতীয় স্তর (প্রায়োগিক স্তর) যেখানে আলোচনা করা হয় কীভাবে আমাদের জৈব কোষগুলো সম্মিলিতভাবে দ্বিতীয় স্থরের কাজগুলো সম্পন্ন করে।

আমাদের মন কীভাবে কাজ করে সেটা বোঝার জন্য চমস্কি আর মার যা করেছেন তা বিহেভিয়ারিজম থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর। তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট পরিবেশে কোনো ব্যবস্থার অতীত আচরণের সাথে ভবিষ্যত আচরণের বাহ্যিক সম্পর্ক নির্ণয়ের বদলে ব্যবস্থাটি কোনো কাজ তার আভ্যন্তরীন গঠনের সাহায্যে কীভাবে সম্পন্ন করছে সেটা বোঝার চেষ্টা করেছেন। এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যবস্থাটির ‘ব্লাক বক্স’ খুলে দেখা। অনেকটা কোনো কম্পিউটার বিজ্ঞানী যেমন কোনো চমৎকার সফটওয়ারের প্রতিটি অংশের কাজ আলাদা ভাবে বুঝতে পারেন এবং চাইলে সেটি একটা ডেস্কটপ কম্পিউটারে চালাতেও পারেন, তেমন।

চৈতন্যবিজ্ঞানের বর্তমান ইতিহাস হচ্ছে স্কিনারের বিহ্যাভিয়ারিস্ট ধ্যান ধারনার বিপরীতে চমস্কির পদ্ধতির বিজয়ের ইতিহাস যাকে প্রায়ই ‘চৈতন্য বিপ্লব’ (cognitive revolution) অভিধা করা হয়। চমস্কি যদিও এই ‘বিপ্লব’ নাম দেবার বিরুদ্ধে। চৈতন্য বিজ্ঞান আর মনোবিজ্ঞানে বিহ্যাভিয়ারিস্ট ধ্যান ধানরানার কর্তৃত্ব খর্ব হলেও আনুসাংগিক কিছু শাখায় এই চর্চা এখনো বিদ্যমান। যেমন স্নায়ুজীববিজ্ঞানীরা গবেষণাগারে বিভিন্ন প্রাণীর (যেমন ইদুর) আচরণ বিশ্লেষণে বিহেভিয়ারালিজম নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত করে থাকে, মারের প্রস্তাবতি তিন স্তরের বিশ্লেষণ কাঠামো এখানে অবহেলিত।

ম্যাসাচুসেস্ট ইন্সটিটিউট অফ টেকনলজির (MIT) ১৫০ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকি উপলক্ষ্যে “মস্তিষ্ক মন এবং মেশিন” এই শিরোনামে একটি আলোচনাসভা আয়োজন করা হয়। সেখানে প্রথম সারির কম্পিউটার বিজ্ঞানী, মনোবিজ্ঞানী এবং স্নায়ুবিজ্ঞানীরা জড় হয়েছিলেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতীত ভবিষ্যৎ এবং স্নায়ুবিজ্ঞানের সাথে এর সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে।

এই সম্মেলনটার উদ্দেশ্য ছিলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক চর্চার শুরুর প্রশ্নটা নিয়ে উৎসাহ উদ্দীপনা ফিরিয়ে আনা। প্রশ্নটা হচ্ছে, বুদ্ধিমত্তা কিভাবে কাজ করে? আমাদের মস্তিষ্ক থেকে কিভাবে আমাদের চৈতন্যের উদ্ভব হয়, এবং এই চেতনা কি কোনো যন্ত্রের মধ্যে বাস্তবায়ন করা সম্ভব?

এই সম্মেলনে নোয়াম চমস্কির বক্তব্য অবশ্য সাম্প্রতিক অগ্রগতি নিয়ে অতটা আশাবাদী ছিলো না। তিনি প্রচলিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চর্চাকে সমালোচনা করেন এই বলে, যে এটা যেন অনেকটা বিহেভিয়ারিজম এর পুনরুত্থান হয়ে গেছে, যা স্রেফ গণনার দিক থেকে একটু বেশি কৌশলী। চমস্কি বলেন এই ক্ষেত্রে পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি ব্যবহার করে অত্যধিক উপাত্ত থেকে প্যাটার্ন খুজের বের করার যে চর্চা তা থেকে কোনো ব্যাখ্যামূলক অন্তরদৃষ্টি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। মানে “নতুন AI” পরিসংখ্যানিক শিখন পদ্ধতি ব্যবহার করে তথ্যানুসন্ধান এবং অনুমানে গুরুত্ব আরোপ করায় এর পক্ষে বুদ্ধিমত্তা আর চৈতন্য সম্পর্কে কোনো সাধারণ নীতিমালা নির্ণয় প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এই সমালোচনার একটা বিস্তৃত প্রতিউত্তর লিখেছেন গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণার পরিচালক পিটার নরভিগ, যিনি পরিসংখ্যানিক পদ্ধতির পক্ষে যুক্তি দেখিয়েছেন এই বলে যে AI এর এসব নতুন পদ্ধতি এবং সংজ্ঞা বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার চেয়ে খুব বেশি ভিন্নতর নয়।

চমস্কি এটা স্বীকার করেছেন যে পরিসংখ্যানিক পদ্ধতির কিছু ব্যবহারিক মূল্য আছে যেমন এটা কার্যকর সার্চ ইঞ্জিন এবং বিপুল পরিমান তথ্য বিশ্লেষণে সক্ষম দ্রুতগতির কম্পিউটারের বিকাশে সাহায্য করেছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোন থেকে এ ধরনের অগ্রগতি অপ্রতুল এবং কিছুটা অগভীরও। আমরা কম্পিউটারকে “পদার্থবিজ্ঞানী স্যার আইজাক নিউটন” কথাটার অর্থ আসলে কী তা এখনো বুঝাতে পারিনি, যদিও কোনো সার্চ ইঞ্জিনিনে কথাটা টাইপ করলে ঠিকই সংশ্লিষ্ট পাতাগুলো সে খুঁজে আনতে পারে।

দেখা গেছে জীববিজ্ঞানীদের মধ্যেও এ ধরনের দ্বন্দ কাজ করছে। বিশেষ করে যারা যারা চমস্কির ‘ভাষা ক্ষমতার’ মত কোনো শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থার কর্মকান্ড বুঝতে চেষ্টা করছেন। কম্পিউটারে গণনাক্ষমতার ব্যাপক বৃদ্ধি যেভাবে সুবিশাল তথ্যভান্ডার বিশ্লেষণ করে “নতুন AI” এর অগ্রগতির রসদ যোগাচ্ছে, তেমনি জিন সংকেত বিশ্লেষণের বিপ্লব আধুনিক জিনতত্ত্ব এবং সিস্টেম বায়োলজির মত ক্ষেত্রের উদ্ভব ঘটাচ্ছে। লক্ষ-লক্ষ্য DNA এর সংকেত দ্রুত এবং কম খরচে পাঠোদ্ধার করার উচ্চক্ষমতার জিনবিশ্লেষণ পদ্ধতি আবিষ্কার হওয়ায় ব্যায়বহুল এক যুগের কাজ এখন কম খরচে একটা সাধারণ গবেষণাগারেই করা সম্ভব। একটা জিনকে আলাদাভাবে পরীক্ষানিরীক্ষা করার বদলে আমরা এখন একদল জিনের একটা ব্যবস্থা কিভাবে একটা কোষের মধ্যে হাজার হাজার ভিন্ন ভিন্ন অবস্থায় সম্মিলিতভাবে কী আচরণ করছে সেটা দেখতে পারি।

জিন সংকেত বিশ্লেষণের বিপ্লব মাত্রই শুরু হয়েছে এবং এর মধ্যেই বিপুল পরিমান উপাত্ত আহোরিত হয়ে গেছে। যার মাধ্যমে মানুষের নানান রোগের নির্ণয় ও নিরাময়ের আশা দেখাচ্ছেন অনেকেই। যেমন কোনো প্রচলিত ক্যানসার প্রতিরোধক ওষুধ যদি কোনো রোগীর উপর কাজ না করে তাহলে এর সমাধান হয়তো লুকিয়ে আছে রোগীর জিনের কোন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের মাঝে যা ঐ ওষুধটিকে কাজে বাধা দিচ্ছে। তাই এ ধরনের ক্যানসার রোগীদের বিপুল পরিমান জিনোম তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাপ্ত জ্ঞান প্রয়োগে হয়তো এমন ‘ব্যক্তিগত ঔষধ’ প্রস্তুত করা সম্ভব হবে যেটা প্রত্যেক রোগীর জন্য আলাদা আলাদা। অবশ্য এখানে ধরে নেওয়া হচ্ছে, যে উচ্চতর পরিসংখ্যানিক পদ্ধতি প্রয়োগে বিপুল পরিমান উপাত্ত থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যটি বের করে নেওয়া সম্ভব। যেখানে এই বিপুল উপাত্ত প্রায় অবোধগম্য শারীরবৃত্তীয় ব্যবস্থার থেকে পাওয়া যা সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান সীমিত।

চমস্কির মতে এ ধরনের ব্যক্তিগতকৃত ওষুধ প্রস্তুতির ক্ষেত্রে সফলতা এই জিন বিশ্লেষণের বিপ্লবের একটা উপজাত যা আমাদের “বিপুল অবিশ্লেষিত উপাত্ত” বিশ্লেষণের ক্ষমতার উপর দাঁড়িয়ে আছে। এর ফলে জীববিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান এবং কৃত্রিমবুদ্ধিমত্তা নিয়ে বিতর্কের মত একটা বিতর্কের মাঝে পড়ে গেছে।

সিস্টেম বায়োলজির এই উন্নতি প্রাথমিক সংশয় ব্যাতিরেকে হয় নি। নোবেল প্রাইজ প্রাপ্ত জিনতত্ত্ববিদ সিডনি ব্রেনার সিস্টেম বায়োলজির ক্ষেত্রটিকে একসময় “low input, hight throughput, no output science” বলে  বিদ্রুপ করেছিলেন। ব্রেনার, যিনি চমস্কির সমসাময়িক, একই AI বিষয়ক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন এবং মস্তিষ্ককে বোঝার ব্যাপারে এই সিস্টেম অ্যাপ্রোচের ব্যাপারে একই ধরনের সংশয় প্রকাশ করেছেন। কানেকটমিক্স নামক একটি সিস্টেম যা ব্রেইনের প্রতিটি নিউরনের পুরো সার্কিটকেই ম্যাপ করে ফেলতে চায় সেটার ব্যাপারেও ব্রেনার তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। তিনি এভাবে অগ্রসর হওয়াকে পাগলামি বলে উল্লেখ করেন।

সিস্টেম বায়োলজি নিয়ে ব্রেনারের সমালোচনা আর AI নিয়ে চমস্কির সমালোচনা যেন একই সূত্রে গাঁথা। দুটো ক্ষেত্রই একটা অতি জটিল সিস্টেমের অন্তর্গত রহস্য উদ্ঘাটন না করেই তার আচরণ বাইরে থেকে পুননির্মান করার চেষ্টা করা হয়। যেখানে, ধারাবাহিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সুবিশাল উপাত্ত ভান্ডার সৃষ্টি করছে যার খুব ছোট একটা অংশই আসলে কাজের। আমরা কি শক্তিশালী গণকযন্ত্র আর উচ্চতর পরিসংখ্যানিক পদ্ধতির উপর নির্ভর করে বিপুল এলোমেলো উপাত্ত ঘেটে অর্থবহ কিছু খুঁজে বের করবো নাকি আরো গভীর কোনো মৌলিক নীতিমালার অনুসন্ধান করবো। আর সুলভ হওয়ায় বেশি বেশি উপাত্ত সংগ্রহ করার প্রলোভনটা সামলানো মুশকিল যদিও কী ধরনের তাত্ত্বিক কাঠামোতে এইসব উপাত্ত বসবে তা আমাদের অজানা। এই বিতর্ক বিজ্ঞানের দর্শনের একটি সুপ্রাচীণ প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে: একটা বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব বা ব্যাখ্যা কখন সন্তোষজনক হয়, এবং বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সফলতা কীভাবে নির্ধারিত হবে?

MIT stata center
MIT stata center

এপ্রিলের এক বিকেলে নোয়াম চমস্কির সঙ্গে বসি আমি। ফ্রাঙ্ক গেরির চোখ ধাঁধানো ডিজাইনের MIT স্টেটা সেন্টারের এক নিভৃত কোনে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চমস্কির সমালোচনা এবং এই ক্ষেত্রটা কেন ভুল দিকে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করছেন সেটা আরো ভালোভাবে বুঝতে চাইছিলাম আমি। তার এই ধারণা নিউরো সাইন্স বা সিস্টেম বায়োলজির মত ক্ষেত্রেও কী প্রভাব ফেলে সেটাও বুঝতে চাচ্ছিলাম। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মত এসব ক্ষেত্রেও একটা জটিল ব্যবস্থাকে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং এর চেষ্টা করা হয় এবং সেই প্রক্রিয়ায় প্রায়সই বিজ্ঞানীদেরকে এক সাগর উপাত্তের মধ্যে হিমসিম খেতে হয়। এই সাক্ষাৎকারের একটা প্রেরণা ছিল এই যে চমস্কিকে আজকাল বিজ্ঞান বিষয়ে খুব কমই জিজ্ঞেস করা হয়। সাংবাদিকরা সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিমালা, মধ্যপ্রাচ্য, ওবামা প্রশাসন ইত্যাদি নিয়ে কিছু গৎবাধা প্রশ্ন করেন তাকে। আরেকটা কারণ হচ্ছে চমস্কি সেই দুষ্প্রাপ্য প্রজাতির বুদ্ধিজীবি যারা দ্রুতই বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছেন। ইসাইয়াহ বার্লিনের সেই বিখ্যাত নিবন্ধটা প্রকাশিত হবার পর থেকেই একাডেমিকদের প্রিয় অবসর যাপন হয়ে গেছে বিজ্ঞানী এবং চিন্তাবিদদের ““হেজহগ আর শৃগাল গোত্রে ভাগ করা। যেখানে হেজহগ হচ্ছেন এমন একজন বিশেষায়িত কর্মী যিনি সুনিপুনভাবে অভিষ্ট লক্ষ্যের দিকে ক্রমে অগ্রসর হন, অপরদিকে শিয়াল হচ্ছেন একজন ধারণা চালিত চিন্তাবিদ যিনি তার কৌতূহলকে কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে এক প্রশ্ন থেকে আরেক প্রশ্নে চলে যান এবং নিজের দক্ষতাগুলো কাজে লাগিয়ে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেন। চমস্কি আলাদা, কারণ তিনি এই দ্বিবিভাজনকে একটা পুরনো ক্লিসেতে পরিণত করেছেন। চমস্কির গভীরতার কারণে তাঁর ব্যপ্তিতে কোনো কমতি ঘটেনি, যদিও তিনি তাঁর কর্মজীবনের বেশিরভাগই ব্যয় করেছেন ভাষাতত্ত্ব এবং চৈতন্যবিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট এবং সুসংজ্ঞায়িত ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে। চমস্কির কাজ তাঁর নিজের ক্ষেত্র বাদেও কম্পিউটার বিজ্ঞান বা দর্শনের নানা শাখায় সুবিশাল অবদান রেখেছে। এবং তিনি তাঁর ধারণাগুলোর প্রভাব নিয়ে আলোচনা সমালোচনাও কখনো এড়িয়ে যাননি। ফলে সাক্ষাৎকার গ্রহনের জন্য চমস্কি একজন খুবই আগ্রোহদ্দীপক ব্যক্তি।

একটা খুবই মৌলিক প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শুরুর দিকে মানুষ এই ক্ষেত্রের অগ্রগতির ব্যাপারে খুবই আশাবাদী ছিলো, কিন্তু পরে দেখা গেছে অতটা উন্নতি হচ্ছে না। ব্যাপারটা এত কঠিন হবার কারণ কী? স্নায়ুবিজ্ঞানীদের যখন প্রশ্ন করা হয় যে মস্তিষ্ককে বুঝতে আমাদের এত কষ্ট হচ্ছে কেন, তখন তারা অসন্তোষজনক উত্তর দেয়, এই বলে যে ব্রেইনে কয়েক বিলিয়ন কোষ আছে তাদের সবগুলোর কর্মকান্ড আমরা রেকর্ড করতে পারি না… ইত্যাদি ইত্যাদি।

চমস্কি: এ কথাটা কিছুটা সত্যি। আপনি যদি বিজ্ঞানের অগ্রগতির দিকে তাকান দেখবেন বিজ্ঞানের ক্ষেত্রগুলো ধারাবাহিক, কিন্তু সেগুলোকে আমরা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন শাখায় ভাগ করেছি। সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি হয়েছে বিজ্ঞানের সেসব শাখায় যারা সবচেয়ে সরল ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করে। যেমন ধরুন পদার্থবিজ্ঞান— সবচেয়ে বেশি উন্নতি হয়েছে এই শাখায়। এর একটা কারণ হচ্ছে পদার্থবিজ্ঞানীদের একটা সুবিধা আছে যা অন্য কারো নেই। যদি কোনো কিছু খুব বেশি জটিল হয়ে যায় তাহলে তারা সেটা অন্য কারো হাতে ছেড়ে দেয়।

যেমন রসায়নবিদদের হাতে?

চমস্কি: কোনো অণু যদি খুব বড় হয়ে যায় তাহলে আপনি সেটা রসায়নবিদদের হাতে ছেড়ে দেবেন। রসায়নবিদ যদি দেখে কোনো ব্যবস্থা তাদের পক্ষেও অনেক বড় হয়ে যাচ্ছে তখন তারা সেটি জীববিজ্ঞানীদের হাতে ছেড়ে দেয়। জীব বিজ্ঞানিদের জন্য যেটা খুব বেশি বড়, সেটা তারা ছেড়ে দেয় মনোবিজ্ঞানীদের হাতে, এভাবে চলতে চলতে এটা একসময় হাজির হয় সাহিত্য সমালোচকদের হাতে… । তাই স্নায়ুবিজ্ঞানীরা যেটা বলছেন সেটা আসলে পুরোপুরি মিথ্যা না।

যেমন হেবিয়ান প্লাস্টিসিটি? [সম্পাদকের নোট: ডোনাল্ড হেবের নামে প্রচলিত এক তত্ত্ব যা মনে করে পরিবেশ থেকে কী প্রেরণা পেলে কী প্রতিক্রিয়া হবে, সেটা নিউরনসমূহের বিভিন্ন সিন্যাপটিক সংযোগের জোর দিয়ে নির্ধারিত হয়]

চমস্কি: হুম, সিন্যাপটিক সংযোগের জোর বৃদ্ধির মত। বহু বছর ধরে গ্যালিস্টেল এটা বলে আসছেন যে তুমি যদি মস্তিষ্ককে ঠিকভাবে বুঝতে চাও তাহলে [ডেভিড] মারের মত পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। তার জন্য শুরুতেই জিজ্ঞেস করতে হবে, মস্তিষ্ক কী কাজ করছে। উনি অবশ্য পোকামাকড় নিয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। আপনি যদি পিঁপড়ার স্নায়ুতন্ত্র নিয়ে গবেষণা করতে চান শুরুতে আপনাকে জিজ্ঞেস করতে হবে, পিঁপড়ারা কী করে? দেখা গেছে পিঁপড়ারা বেশ জটিল সব কাজ কর্ম করে থাকে, যেমন ধরুন পাথ ইন্টিগ্রেশন! যদি মৌমাছিদের কথা ভাবেন তাদের দিকনির্ণয়ের জন্যও সূর্যের অবস্থান, এটা সেটা সহ আরো অনেক কিছু মিলিয়ে জটিল গণনা করতে হয়। তার যুক্তি হচ্ছে আপনি যদি মানুষ সহ যেকোনো প্রাণীর চৈতন্যের ব্যাপারটা খেয়াল করেন দেখবেন এগুলো আসলে এক ধরনের গণনাযন্ত্র। ফলে এই গণনার বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে আপনি জানতে চাইবেন। টুরিং মেশিনের কথা চিন্তা করুন। এটা সবচেয়ে সরলতম গণনাযন্ত্রের মডেল। সেটাও এমন কিছু একক দিয়ে গঠিত যাদের ‘পড়া’, ‘লেখা’, ‘নির্দেশ করার’ ক্ষমতা আছে। কোনো গণনার জন্য এই তিনটি একক (unit) লাগবেই। আপনি হয়তো মস্তিষ্কের মধ্যেও এমন কিছু একক উপাদান খুঁজতে চাইবেন। শুধু সিন্যাপটিক সংযোগের জোর হ্রাস-বৃদ্ধি বা এদের ক্ষেত্রগুণাবলি বিবেচনা করে এগুলো খুঁজে পাওয়া যাবে না। আপনাকে প্রথমে দেখতে হবে মস্তিষ্কে আসলে কী আছে, এবং তারা কী কার্যসমাধা করছে অর্থাৎ মারের প্রস্তাবিত ত্রিস্তর বিন্যাসের সর্বোচ্চ স্তর থেকে।

ঠিক, কিন্তু বেশিরভাগ স্নায়ুবিজ্ঞানীই শুরুতে তারা যে সমস্যাটা নিয়ে গবেষণা করছেন তার ইনপুট আউটপুট সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করেন না। তারা মূলত, কোনো ইদুরকে কোনো একটা কাজ শেখানোর সময় যত বেশি সম্ভব নিউরনের কর্মকান্ড রেকর্ড করা সম্ভব তা করতে থাকেন। আবার কখনো কোনো জিন X কোনো একটা কাজ শেখার জন্য প্রয়োজন কি না সেসব নির্ণয়ের চেষ্টা করেন। তাদের গবেষণায় এই ধরনের বক্তব্য বের হয়ে আসে।

চমস্কি: ঠিক বলেছেন।

এটা কি ধারনাগতভাবে ভুল?

চমস্কি: উমম, এ থেকে কিছু কাজের তথ্য পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু ভিতরে যদি সত্যিই কোনো ধরনের গণনা চলতে থাকে তাহলে সেই গণনার এককগুলোর খোঁজ এভাবে পাওয়া যাবে না। অনেকটা ভুল ল্যাম্প পোস্টের নিচে খোঁজার মত। এটা একটা চলমান বিতর্ক… আমি মনে করি না যে গ্যালিস্টেলের অবস্থান স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মধ্যে খুব বেশি গ্রহনযোগ্যতা পেয়েছে, যদিও এটা মূলত মারের বিশ্লেষণের মতই। যেমন, দৃষ্টিশক্তি নিয়ে গবেষণার সময় আপনি জিজ্ঞেস করবেন, এই দৃষ্টি ব্যবস্থা কী ধরণের গণনামূলক কাজ করছে? এরপর আপনি একটা অ্যালগরিদম খুঁজে বের করবেন যেটা ঐ ধরনের কাজ করতে পারে, এরপর আপনি এমন সব কলকব্জা খুঁজবেন যারা এই অ্যালগরিদমটাকে চালাতে পারে। এভাবে না খুঁজলে হয়তো আপনি কখনোই কিছু খুঁজে পাবেন না। এমনকি ভৌত বিজ্ঞানেও এ ধরনের অনুসন্ধানের অনেক উদাহরণ আছে, আর সামাজিক বিজ্ঞানে তো আছেই। মানুষ যেসব বিষয়ের ব্যাপারে জানে যে কীভাবে গবেষণা করতে হবে সেগুলো নিয়েই গবেষণার প্রতি তার ঝোঁক থাকে। এক হিসাবে ব্যাপারটা ঠিক। আপনার হাতে কিছু পরীক্ষণ পদ্ধতি আছে, কিছু ব্যাপার আপনি বোঝেনও আপনি চাইবেন এই বোঝার সীমাটা বাড়াতে— সেটা তো একরকম ঠিকই, আমি কোনো সমালোচনা অর্থে বলছি না, কিন্তু মানুষ সাধারণত সেটাই করে যেটা সে করতে পারে। অপরদিকে আপনার লক্ষ্য সঠিক দিকে আছে কি না সেটাও ভাবার দরকার। আবার, আপনি যদি মার-গ্যালিস্টেল এর দৃষ্টিভঙ্গিটা গ্রহণ করেন (ব্যক্তিগতভাবে যার প্রতি আমারো সহানুভূতি আছে) তাহলে আপনি ভিন্ন ভাবে কাজ করবেন, ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নীরিক্ষার চেষ্টা করবেন।

ঠিক, আমার মতে মারের একটা মূল ধারণা হচ্ছে, যেমনটা আপনি বললেন, সমস্যাটাকে বর্ণনার সঠিক এককগুলো চিহ্নিত করা, অর্থাৎ সঠিক মাত্রায় বিমূর্তরূপে (right level of abstraction) সমস্যাটিকে দেখতে পারা। এখন আমরা যদি একটা বাস্তব উদাহরণ বিবেচনা করি, যেমন স্নায়ুবিজ্ঞানের একটা নতুন শাখা- সংযুক্তিতত্ত্ব Connectomics-, যেখানে কোনো প্রাণীর যেমন মানুষ বা ইঁদুরের সেরিব্রাল কর্টেক্সের সকল নিউরনের সংযুক্তির একটা নকশা তৈরির চেষ্টা করা হয়। সিডনি ব্রেনার এ ধরনের প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন যদিও ঐতিহাসিকভাবে তিনিই এই অ্যাপ্রোচের স্রষ্টা। এই অ্যাপ্রোচের পক্ষপাতীরা অবশ্য এটা বিবেচনা করেন না যে এটা সত্যিই সঠিক মাত্রার বিমূর্তায়ন কি না— হয়তো তা না, এ বিষয়ে আপনার মতামত কি?

চমস্কি: আচ্ছা, এরচেয়েও অনেক সহজ প্রশ্ন আছে। যেমন এখানে MIT তেই একটা আন্তবিভাগীয় কার্যক্রম আছে যারা গোলকৃমি C. elegans নিয়ে কাজ করছে কয়েক যুগ ধরে। আমি যতদূর বুঝি, এই খুদে প্রাণীর ক্ষেত্রেও, যার প্রতিটি নিউরণের সংযুক্তির নকশা জানা, … সম্ভবত ৮০০ টা নিউরন আছে এর…

আমার মনে হয় ৩০০…

চমস্কি: … তারপরেও এটা (C. elegans nematode) কী করতে যাচ্ছে এই নকশা থেকে তা অনুমান করা সম্ভব হয়নি। হয়তো সমাধানটা আমরা ভুল জায়গায় খুঁজছি।

Noam Chomsky
Noam Chomsky

আলোচনাটা একটু ভিন্ন দিকে নেই, আমি AI গবেষণায় পূর্বে ব্যবহৃত বিভিন্ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করতে চাই। যেটাকে আজকাল, “Good Old Fashioned AI” বলা হয়। পুরাতন AI তে গোটলব ফ্রেগে এবং বারট্রান্ড রাসেলের গাণিতিক যুক্তিবিদ্যা বা এর থেকে উৎসরিত ননমনোটনিক রিজনিং এর মত পদ্ধতি ব্যবহৃত হতো। বিজ্ঞানের ইতিহাসের দৃষ্টিকোন থেকে এটা বেশ আগ্রোহদ্দীপক যে অতি সম্প্রতি এই পুরাতণ পদ্ধতিগুলো মূল ধারা থেকে সম্পূর্ণ মুছে ফেলে আধুনিক AI চর্চার সূচনা হয়েছে, যেখানে এসব পদ্ধতির স্থান নিয়েছে সম্ভাবনাতত্ত্ব এবং পারিসাংখ্যিক কাঠামো। এই পরিবর্তন আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করেন? এটা কি সঠিক দিকে যাচ্ছে?

চমস্কি: এ নিয়ে অনেক বছর আগে প্যাট উইনস্টনকে বক্তৃতা দিতে শুনেছি। সে একটা বিষয় তুলে ধরেছিলো যে AI এবং রোবটিক্স এর উন্নতিটা এই পর্যায়ে পৌঁছে গেছে যে সেখান থেকে ব্যবহারিক কাজে লাগে এমন প্রযুক্তি বানানো সম্ভব। ফলে মূল মৌলিক অনুসন্ধানগুলোকে একটা পাশে সরিয়ে এইসব প্রযুক্তিগত লক্ষ্য পূরণের ব্যাপারেই সবাই মেতে ওঠে।

তারমানে, এই ক্ষেত্রটা প্রকৌশলে পরিণত হয়েছে?

চমস্কি: এটা কিসে পরিণত হয়েছে তা বোঝাই যাচ্ছে… কিন্তু এর ফলে মানুষ মূল প্রশ্ন থেকে সরে এসেছে। আমি অস্বীকার করব না যে, আমি নিজেও শুরুর দিককার গবেষণার ব্যাপারে সন্দিহান ছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল ব্যাপারটা একটু বাড়াবাড়ি রকমের আশাবাদী। তখন ধরে নেওয়া হয়েছিল যে স্রেফ জটিল যন্ত্র ব্যবহার করেই এমন সব সিস্টেমকে বাস্তবিক অর্থে বুঝে ফেলা সম্ভব যেগুলো সম্পর্কে সত্যিকারে তেমন কোনো ধারণাই আমাদের ছিল না। আপনি যদি তা করেন তাহলে আপনার সাফল্যের ধারণাটা হয়ে যাবে স্ব-প্রতিপাদী কারণ সাফল্যগুলো এই ধারণার আলকেই অর্জিত হবে। কিন্তু বিজ্ঞান এভাবে কাজ করে না। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক, কেউ যদি চায় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগটাই তুলে দিয়ে সব কিছু সঠিক উপায়ে করতে। ‘সঠিক’ উপায় টা হচ্ছে এটা একটা ভিডিও ক্যামেরা দিয়ে একটা জানালার বাইরে কী হচ্ছে তা ভিডিও করতে থাকবে। এবং সেটাকে সবচেয়ে বড় সবচেয়ে দ্রুততম কম্পিউটারে ইনপুট দেবে। কম্পিউটারটি এই বহু গিগাবাইট উপাত্ত নিয়ে নানান রকম জটিল পারিসাংখ্যিক হিসাব নিকাশ, বা বায়েসীয় হেন তেন করে [সম্পাদকের টীকা: বায়েসীয় পদ্ধতি হচ্ছে, উপাত্তবিশ্লেষণের একটা আধুনিক পদ্ধতি যেটা সম্ভাবনাতত্ত্বকে উপর্যুপরী ব্যবহার করে] অনুমান করতে সক্ষম হলেন জানালার বাইরে পরবর্তীতে কি ঘটতে যাচ্ছে। হয়তো এভাবে কাজ করে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ে অনেক নিখুঁতভাবেই অনুমান করা সম্ভব হবে। অবশ্য যদি সাফল্য বলতে বিপূল পরিমান অবিশ্লেষিত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে মোটামুটি সঠিক একটা অনুমানে আসতে পারাকে বুঝানো হয় তাহলে তো কোনো কথাই নেই। পদার্থবিজ্ঞানীদের মত করে, ঐসব ঘর্ষণহীন তল টল নিয়ে মাথা ঘামানোর আর কী দরকার। কিন্তু এর ফলে চিরকাল বিজ্ঞান সবকিছুকে যেভাবে উপলব্ধি করতে চেয়েছে সেই ধরনের উপলব্ধি অর্জন সম্ভব নয়— আপনি যা পাবেন তা হচ্ছে, বিভিন্ন ঘটনাবলির একটা ভাসা ভাসা অনুমান।

এই ধরনের কাজ প্রচুর করা হচ্ছে। ধরুন আপনি আগামীকালের আবহাওয়া অনুমান করতে চান। তার জন্য শুরুতে আমি কিছু পারিসাংখ্যিক পূর্বানুমান ধরে নেব, এরপর এর সাথে নানান রকম পর্যবেক্ষণ যুক্ত করতে থাকব। যেমন, এখানকার আজকের আবহাওয়া গতকালের ক্লিভল্যান্ডের আবহাওয়ার সাথে মেলে, সেটা যোগ করবো, এই সময়ের সূর্যের অবস্থানেরও কিছু প্রভাব থাকবে, আমি সেটা যোগ করব, এভাবে করে কিছু অনুমান পাওয়া যাবে, সেইসব খাটিয়ে সিমুলেশন চালাবো, এভাবে প্রাপ্ত প্রাথমিক ফলাফলের উপর বায়েসিয়ান পদ্ধতির বিশ্লেষণ প্রয়োগে আরো উন্নততর পূর্বানুমান পাব। এইভাবে পুনরাবৃত্তি করতে করতে এক সময় আগামীকালের আবহাওয়ার একটা কার্যকর অনুমান করা সম্ভব। এটা এক ধরনের সাফল্য কিন্তু আবহাওয়াবিদরা শুধু অনুমান করতে চান না তারা বুঝতে চান কীভাবে সবকিছু কাজ করছে। এখেত্রে সাফল্য আর অর্জনের ধারণা তাই দুই প্রকারের [অনুবাদকের টীকা: স্রেফ ফলাফল অনুমান করতে পারা, বনাম গভীর ভাবে বোঝা]। আমার নিজের ক্ষেত্র ভাষাতত্ত্বে এর ব্যাপক প্রাদুর্ভাব। গাণনিক চৈতন্যবিজ্ঞান (computational cognitive science) যখন ভাষাতত্ত্বে ব্যবহার করা হয় তখন সফলতা বলতে এরকম কিছুই বোঝায়। অর্থাৎ, আপনার হাতে যদি বিপুল পরিমান উপাত্ত থাকে, শ্রেয়তর পরিসংখ্যান থাকে, তাহলে কোনো বিপুল লিখিত করপাসের, যেমন ধরুন ওয়াল স্ট্রিড জার্নালের আর্কাইভ, একটা শ্রেয়তর আন্দাজ আপনি করতে পারবেন, কিন্তু এর ফলে ভাষাটি সম্পর্কে আপনি কিছুই শিখতে পারবেন না।

আমার মতে সঠিক, কিন্তু এসব থেকে বহুলাংশে ভিন্ন একটা পদ্ধতি হচ্ছে, শুরুতে মূল বৈশিষ্ট্যসমূহ নিয়ন্ত্রণ করে এমন কিছু মৌলিক নীতিমালা বুঝতে চেষ্টা করা। এবং এটা বোঝা যে ব্যবহারিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে এইসব নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গে আরো হাজারটা চলক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে, মানে তখন আপনি আমাদের ঐ জানালার বাইরে কী ঘটছে সেসব উপাত্তও কাজে লাগাতে পারেন। এই হচ্ছে বিজ্ঞানের দুই রকমের ধারণা। পরে বলা এই পদ্ধতিটাই আধুনিক বিজ্ঞান, সেই গ্যাগিলিলিওর থেকে বিজ্ঞান এভাবে চলে এসেছে। এই এসব বিপুল পরিমান অবিশ্লেষিত উপাত্ত থেকে অনুমান করার পদ্ধতিটা মূলত এযুগের একটা নতুন প্রচেষ্টা, অবশ্য পুরোপুরি নতুনও নয়, অতীতেও এ ধরনের কিছু জিনিস ছিল। অবশ্য, আমার মতে, এই নতুন অ্যাপ্রোচ গাণনিক চৈতন্যবিজ্ঞানকে অনেকটা ব্যবহারিক প্রয়োগের দিকে চালিত করছে…

… প্রকৌশলের দিকে?

চমস্কি: … কিন্তু মৌলিক জ্ঞানঅর্জন থেকে দূরে সরিয়ে নিচ্ছে। হ্যাঁ, হয়তো কিছু কার্যকর প্রযুক্তি পাওয়া যাচ্ছে। এদিকে প্রকৌশল বিদ্যাতে কী ঘটছে সেটাও বেশ আগ্রোহদ্দীপক। আমি যখন MIT তে আসি, ১৯৫০ এর দিকে, তখনো এটা ছিল স্রেফ একটা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। খুব ভালো গণিত আর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ ছিলো, কিন্তু সেগুলো ছিল সেবাদানকারী বিভাগ। এরা ইঞ্জিনিয়ারদেরকে নানান রকম ব্যবহারিক কৌশল শেখাতো। যেমন তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে শিক্ষার্থীরা তড়িৎ বর্তনী বানানো শিখতো। অবশ্য ১৯৬০ এর দিকে, বা এখন, যদি আপনি MIT তে যান দেখবেন সবকিছু বদলে গেছে। আপনি যে বিভাগেরই হন না কেন, কিছু মৌলিক বিজ্ঞান ও গণিত আপনাকে শিখতেই হবে, এরপর সেগুলোর কিছু প্রয়োগও আপনি শিখবেন। কিন্তু এটা বেশ ভিন্ন একটা ভঙ্গি। এই পরিবর্তনের সূচনা হয় তখন যখন ইতিহাসে প্রথমবারের মত মৌলিক বিজ্ঞান, যেমন পদার্থবিদ্যা, ইঞ্জিনিয়ারদেরকে কিছু শেখাতে শুরু করে। আর প্রযুক্তিও খুব দ্রুত বদলাচ্ছিল, ফলে আজকের প্রযুক্তি শেখাটাও খুব বেশি লাভজনক ছিল না যদি সেটা ১০ বছর পর বদলেই যায়। অপরদিকে মৌলিক বিজ্ঞান শিখে ফেললে সামনে যে পরিবর্তনই আসুক তাতে আপনি আপনার জ্ঞান প্রয়োগ করতে পারবেন। একই ব্যাপার ঘটেছে চিকিৎসাবিদ্যাতেও। ফলে গত শতাব্দীতে প্রথমবারের মত জীববিজ্ঞান চিকিৎসাবিদ্যাকে জরুরী কিছু শেখাতে পেরেছে। এখন ডাক্তার হতে গেলেও জীববিজ্ঞান আপনাকে ভালোভাবে বুঝতে হবে, কারণ প্রযুক্তি বদলাবে। এটা অনেকটা শিল্প (যেখানে, অতটা ভালো না বোঝা কিছু উপাত্ত থেকে ব্যবহারিক কিছু তৈরির চেষ্টা করা হয়) থেকে বিজ্ঞানে (মানে গ্যালিলিয়ান বিজ্ঞান) উত্তরণের মত ব্যাপার।

বুঝতে পারছি। আমাদের আগের বিষয়ে ফিরে আসি। ভাষা এবং চৈতন্যের বায়েসীয় পারিসাংখ্যিক কাঠামো সম্পর্কে। আপনার একটা যুক্তি বহুল প্রচলিত যে কোনো বাক্যের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলাটাই অবোধগম্য…

চমস্কি: হুমম, সম্ভাবনাটা আপনি হিসাব করতে পারেন। কিন্তু এর কোনো বিশেষ অর্থ নেই।

এর কোনো অর্থ নেই। কিন্তু, আপাত দৃষ্টে মনে হয় এই সম্ভাব্যতাত্ত্বিক পদ্ধতির সাথে অন্তর্নিহিত মানসিক প্রতিরূপ, নিয়ম-কানুন এবং সাংকেতিক কাঠামোর বেশ সরল একটা সংযোগ হতে পারে। যেখানে বাস্তব জগতের অপরিশুদ্ধ অপ্রতুল উপাত্তর সাথে এই অন্তর্নিহিত সাংকেতিক কাঠামোর মিলন ঘটবে সম্ভাব্যতা তত্ত্বের মাধ্যমে। এর ফলে, এইসব সাঙ্কেতিক কাঠামোগুলো কীভাবে উদ্ভব হলো তা নিয়ে আপনাকে কিছু বলতে হচ্ছে না। (মানে, সেগুলো অনাদিকাল থেকেই ছিলো, নাকি আংশিক ভাবে ছিল যার কিছু চলক সময়ের সাথে সাথে বদলেছে এসব…)। সম্ভাব্যতাতত্ত্ব স্রেফ এই অপরিশুদ্ধ উপাত্তকে এই সমৃদ্ধ মানসিক প্রতিরূপের সাথে জুড়ে দেবার কাজটা করছে।

চমস্কি: হুমম, সম্ভাব্যতা তত্ত্বের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই, পরিসংখ্যানের মধ্যেও কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু এদের কি কোনো ভূমিকা আছে?

চমস্কি: আপনি যদি এটা ব্যবহার করতে পারেন, তাহলেতো ভাল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে আপনি এটা কী কাজে ব্যবহার করছেন? এখানে প্রথম প্রশ্ন হচ্ছে, অপরিশুদ্ধ উপাত্ত বুঝে কী হবে? জানালার বাইরে কী ঘটছে সেটা বুঝেই বা কী হবে?

হুমম, প্রতিনিয়ত ভুরিভুরি অপরিশুদ্ধ উপাত্ত আমাদের সামনে এসে হাজির হচ্ছে। যেমন মারের দেওয়া একটা উদাহরণ, আমাদের সামনে সব সময়ই অপরিশুদ্ধ উপাত্ত এসে হাজির হয়, রেটিনা থেকে…

চমস্কি: তা সত্যি। কিন্তু তিনি যা বলেছেন তা হলো: চলুন আগে জিজ্ঞেস করি, জৈব ব্যবস্থাগুলো কীভাবে এই অপরিশুদ্ধ উপাত্ত থেকে অর্থপূর্ণ কিছু খুঁজে বের করে। রেটিনা, তার ভিতরে আসা অপরিশুদ্ধ উপাত্তগুলোর প্রতিলিপি তৈরির চেষ্টা করছে না। বরং, তা এটা-সেটা নানান জিনিস খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। ব্যাপারটা ভাষাজ্ঞান লাভের ক্ষেত্রেও একই। সদ্যভূমিষ্ট শিশু এসেই একটা বিপুল কোলাহলের মধ্যে পড়ছে, উইলিয়াম জেমস যেটাকে বলেছেন, “A booming, buzzing confusion” পুরো জগাখিচুড়ি যাকে বলে। একটা নরবানর, বিড়াল ছানা, বা পাখিকে যদি এই কোলাহলের মধ্যে আনা হয়, তাহলে কিছুই হবে না। কিন্তু মানবশিশু কিভাবে যেন, এই বিপুল কোলাহলপূর্ণ শব্দ থেকেই ভাষা সংক্রান্ত অংশগুলো চিহ্নিত করে ফেলে। এটা হলো প্রথম ধাপ। এই কাজ সে কীভাবে করছে? শিশুটি নিশ্চই পারিসাংখ্যিক বিশ্লেষণ চালাচ্ছে না, কারণ একটা নরবারের সম্ভাব্যতা বিশ্লেষণ ক্ষমতা তো প্রায় শিশুটির মতই। শিশুটি সুনির্দিষ্ট কিছু জিনিস খুঁজছে। তাই, মনোভাষাতাত্ত্ববিদ, স্নায়ুভাষাতত্ত্ববিদ এবং অন্যরা গণনা ব্যবস্থার এই সুনির্দিষ্ট অংশগুলোই চিহ্নিত করতে চেষ্টা করছেন যেগুলো, পরিপার্শ্বের বিভিন্ন অংশের সাথে সুক্ষ্মসমন্বিত। দেখা গেছে, মস্তিষ্কে কিছু স্নায়ুবর্তনী আছে যারা সুনির্দিষ্ট কিছু ছন্দ পেলে প্রতিক্রিয়া করে। ভাষায় এ ধরনের ছন্দ প্রায়ই দেখা যায়, যেমন সিলেবাল এর দৈর্ঘ্য বা এমন আরো কিছু। এবং কিছু কিছু প্রমাণ পাওয়া গেছে যে শিশু মস্তিষ্ক সবার প্রথমে যা খোঁজে তা হচ্ছে এ ধরনের ছন্দময় কাঠামো। সেই গ্যালিস্টেল এবং মারের অনুমিত গাণনিক ব্যবস্থার মত কিছু একটা শিশুর মস্তিষ্কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, “এইসব উপাত্ত নিয়ে আমি এই কাজ করব” যেমন উদাহরণ স্বরুপ, জন্মের নয় মাসের মধ্যে সাধারণ কোনো শিশু তার মাতৃভাষায় যেসব ধ্বনি ব্যবহার করা হয় না সেগুলো তফাত করার ক্ষমতা মস্তিস্ক থেকে মুছে ফেলে। অবশ্য একদম শুরুতে যেকোনো শিশুকেই যেকোনো ভাষার উপযুক্ত করে গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু ধরুন, জাপানী শিশুরা নয় মাস পরে আর ‘ল -র’ এর মধ্যে তফাত করতে পারে না। তাদের মস্তিষ্ক থেকে এই ক্ষমতা একেবারে সমূলে বিনাশ হয়ে যায়। তার মানে ব্যবস্থাটা অসংখ্য সম্ভাবনাকে বাদ দিয়ে একটা নির্দিষ্ট ভাষার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলে। আপনি চাইলে একটা অপভাষা বানাতে পারেন, যেটা শুরু থেকে শিশুটিকে শোনালে, তার পক্ষে কোনো ধ্বনিই বাদ দেওয়া সম্ভব হবে না। তারপর ধরুন ভাষার বিভিন্ন বিমূর্ত কাঠামো খুঁজে বের করার ব্যাপারটা। প্রচুর প্রমাণ আছে যে রৈখিক ক্রম (linear order), মানে কীসের পরে কী আসবে সেই ধারণা, কোনো ভাষার শব্দবিন্যাস ও অর্থগত গণনা কাঠামোতে স্বাভাবিক ভাবে খুঁজে পাওয়া যায় না। ফলে মস্তিষ্ক এ ধরনের রৈখিক ক্রম খোঁজে না। তার মানে, বাক্যের শব্দসমূহের অর্থগত দূরত্বগুলো সরল রৈখিক দূরত্ব নয় বরং কোনো জটিল গণনার ফলে প্রাপ্ত। এর কিছু স্নায়ুতান্ত্রিক তথ্য প্রমাণও আছে। উদাহরণস্বরুপ, যদি কোনো রৈখিক ক্রম বিশিষ্ট কৃত্রিম ভাষা তৈরি করে মানুষকে শেখানো যায় যেখানে কনো বাক্যকে না বোধক করার জন্য, এই ধরুণ, তৃতীয় শব্দে কোনো পরিবর্তন করতে হয়। সেক্ষেত্রে মানুষ সেই ধাঁধার (puzzle) সমাধান করতে পারবে, কিন্তু এতে মস্তিস্কের ভাষাপ্রক্রিয়াকরণ অংশগুলো সক্রিয় হবে না— বরং অন্যান্য অংশ সক্রিয় হবে। তার মানে তাদের মস্তিস্ক এই কৃত্রিম ভাষার বাক্যকে না বোধক করার সমস্যাটিকে একটি ধাঁধা হিসাবে দেখছে, কোনো ভাষা বিষয়ক সমস্যা হিসাবে নয়। এ নিয়ে আরো কাজ করা দরকার, কিন্তু…

আপনি তাহলে মস্তিষ্কের কোনো অংশের সক্রিয়করণ বা নিস্ক্রিয়করণকে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ হিসাবে গণ্য করছেন…

চমস্কি: … এটা একটা প্রমাণ তো বটেই, অবশ্য একেবারে নিশ্চিত হতে আরো বেশি প্রমাণ লাগবে। আর এ থেকে ভাষা কীভাবে কাজ করে তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়, যেমন ‘বাক্যের তৃতীয় শব্দ’ ধরনের ব্যাপারগুলো ভাষায় স্বাভাবিকভাবে ব্যবহৃত হয় না। একটা সহজ উদাহরণ দেখা যাক, “Instinctively, Eagles that fly swim”, এখানে instinctively কথাটা swim এর সাথে যাচ্ছে, fly এর সাথে না, যদিও পুরো বাক্যটি অর্থহীন। এই ব্যাপারটা প্রতিবর্তি। “instinctively” ক্রিয়াবিশেষণটি তার সবচেয়ে নিকটবর্তি ক্রিয়াকে খুঁজছে না, বরং খুঁজছে গাঠনিকভাবে সবচেয়ে উপযুক্ত ক্রিয়াটিকে। এ ধরনের গণনা (“বাক্যের তৃতীয় শব্দ” আকারের) সরল দূরত্ব বিচারের চেয়ে অনেক কঠিন। কিন্তু ভাষাতে শুধু এ ধরনের গণনাই ব্যবহৃত হয়। এ ধরনের ভুরিভুরি উদাহরণ আছে, এমনকি স্নায়ুভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণাদিও আছে কিছু। যাদের সবই এই একই ব্যাপার নির্দেশ করে। আর আপনি যখন ভাষার আরো জটিল কোনো কাঠামো নিয়ে বিশ্লেষণ করবেন, এ ধরনের উদাহরণ বাড়তেই থাকবে।

মারের ল্যাবে সিমন উলম্যান দৃষ্টিশক্তি নিয়ে গবেষণা করে অনমনীয়তার নীতির ((Ullman’s Rigidity Theorem: “Suppose you are given three frames, each containing at least four points. If the points are placed at random in each frame, then the probability is zero that they have a rigid interpretation in three dimensions. If the points do have a rigid interpretation, then they almost surely have exactly two interpretations (which are mirror-symmetric).”)) মত উল্লেখযোগ্য কিছু আবিষ্কার করেছেন। আমার মতে কোনো কিছু কীভাবে কাজ করছে তা বুঝতে উলম্যানের ব্যহৃত পদ্ধতিই কার্যকর উপায়। পারিসাংখ্যিক বিশ্লেষণ করে এ ধরনের আবিষ্কার সম্ভব হত না। বরং খুব যত্ন নিয়ে করা কিছু পরীক্ষা-নীরিক্ষার মাধ্যমে উলম্যান এই নীতিগুলো আবিষ্কার করেন। এর পরের ধাপে হচ্ছে স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে এই গণনার ভার যাদের সেই অংশগুলো চিহ্নিত করা। আমার মতে ভাষার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম। আমাদের সাংখ্যিক সামর্থ্য, পরিকল্পনা করার ক্ষমতা, এ ধরনের সবকিছু নিয়ে গবেষণার ক্ষেত্রেই এভাবে এগোনো উচিত। স্রেফ কিছু অবিশ্লেষিত বিশৃংঙ্খল উপাত্ত ঘাটাঘাটি করে কোনো অগ্রগতির সম্ভাবনা নেই বললেই চলে, ঠিক যেমন গ্যালিলিও এভাবে এগোলে কিছুই করতে পারতেন না। আর, আপনি যদি গ্যালিলিও বা ১৭ শতকের গুরুত্বপুর্ণ বিজ্ঞানীদের কথা ভাবেন, তাদের পক্ষে এযুগের অভিজাতগোষ্ঠি মানে, NSF [ন্যাশনাল সাইন্স ফাউন্ডেশন] কে নিজের গবেষণা বোঝানো অসম্ভব হত। মানে, একটা ঘর্ষণহীন তলে একটি গোলকের গড়িয়ে পড়া নিয়ে কেন আপনি খামাখা মাথা ঘামাবেন, যার কোনো অস্তিত্বই নেই? এর চেয়ে বরং ফুলের বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করুন। আমার তো মনে হয়, সে যুগে যদি আপনি ফুলের বৃদ্ধি নিয়ে গবেষণা করতেন তাহলে তাদের বাহ্যিক রূপের পারিসাংখ্যিক বিশ্লেষণের মত কিছু একটা পাওয়া যেত। এটা মনে রাখতে হবে যে চৈতন্যবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে আমরা এখনো গ্যালিলিওপূর্ব যুগে আছি। এই ক্ষেত্রটা তার সূচনালগ্নে আছে। ফলে আমার মনে হয় বিজ্ঞান সেই শুরুর দিকে কীভাবে কাজ করেছে তা থেকে এখনো কিছু শেখার আছে। এমনকি, ১৬৪০ এর দিকে রসায়নের একটি ভিত্তিমূলক পরীক্ষা করা হয় যেখানে পানি থেকে জীবন্ত বস্তুর সৃষ্টি হতে পারে এই বিষয়টা নিউটন সহ সব বিজ্ঞানীর সামনে প্রমাণ করা হয়। সে যুগে সালোকসংশ্লেষণ সম্পর্কে কেউ কিছু জানত না। তারা যেভাবে কাজটা করেছিল তা হচ্ছে— প্রথমে আপনি একটি মাটির স্তুপ নেবেন, তারপর সেটাকে উত্তপ্ত করবেন যেন তার মধ্যে থেকে সব পানি বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এরপর আপনি সেই মাটিকে ওজন করবেন। তারপর সেই মাটিতে পানি দিয়ে একটি উইলো চারা রোপন করবেন। গাছটি বড় হয়ে যাবার পর, সেটাকে সমূলে উপড়ে ফেলে আবার আপনি সেই মাটি থেকে তাপ দিয়ে সব পানি সরিয়ে ওজন করবেন। দেখা যাবে মাটির ভরে কোনো হ্রাসবৃদ্ধি হয়নি। এখানে যেহেতু শুধুমাত্র বাড়তি পানি যুক্ত করা হয়েছিল তার মানে উইলো গাছটির শরীর সেই পানি থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। তার মানে পানিকে জীবন্ত বস্তুতে রূপান্তরিত করা যায়। এটা মোটামুটি একটা বৈধ বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, স্রেফ এক্ষেত্রে কী জিনিস অনুসন্ধান করতে হবে সেটা আপনি জানেন না। অনেক পরে এই ‘কী খুঁজতে হবে’ তার উত্তর পাওয়া যায়। প্রিস্টলি যখন আবিষ্কার করেন বাতাসও জগৎ এর একটা উপাদান, এবং এর মধ্যে নাইট্রোজেন সহ নানান জিনিস আছে; এছাড়া প্রকৃতিতে সালোকসংশ্লেষণ সহ নানান রকম প্রক্রিয়া ঘটে…। শুধু মাত্র এর পরই পুরপুরি সঠিক ভাবে পরীক্ষাগুলো আবার করা যম্ভব হয়। কী খুঁজতে হবে তাই যদি না জানা থাকে তাহলে আপাতত সফল মনে হওয়া পরীক্ষার মাধ্যমে সহজেই বিভ্রান্ত হওয়া সম্ভব। এইসব বিভ্রান্তি আরো বাড়বে যদি আপনি গাছের বৃদ্ধি কীভাবে হচ্ছে তা বুঝতে এইসব বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিপুল পরিমান উপাত্ত সংগ্রহ করে বিশাল এক কম্পিউটারে ঢুকিয়ে পারিসাংখ্যিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কী ঘটছে তা অনুমান করার চেষ্টা করেন।

জীববিজ্ঞানের ক্ষেত্রে মেন্ডেলের কাজকে কি আপনি সফল বলবেন? তিনি তো অপরিশুদ্ধ উপাত্ত (ঘটন সংখ্যা) দেখেই তার তাত্ত্বিক স্বীকার্যগুলো দাঁড় করিয়েছিলেন…

চমস্কি: … হুমম, উনি অনেক উপাত্ত যেগুলো তত্ত্বের সাথে মিলছিল না সেগুলো বাতিল করে দিয়েছিলেন।

… কিন্তু সেই বাতিলের হারটা গ্রহণযোগ্য, তার তত্ত্বটা বিবেচনা করলে।

চমস্কি: হ্যাঁ, তিনি সঠিক কাজটাই করেছিলেন। নিজের তত্ত্বকেই উপাত্তের দিকনির্দেশক হিসাবে ব্যবহার করে। কিছু বিপরীত উপাত্ত ছিল যেগুলো তিনি একরকম ফেলেই দিয়েছেন, মানে সবকিছু তো আর আপনি গবেষণাপত্রে লেখেন না। আর তিনি এমন কিছু একক (জিন) নিয়ে কথা বলছিলেন যার খোঁজ সে সময়ের কারো জানা ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞান এভাবেই কাজ করে। রসায়নের কথা ধরুণ। এমনকি আমার শৈশবেও রসায়ন ছিলো মূলত কিছু হিসাবনিকাশ করার ব্যবস্থা। কারণ তখনো রসায়নের নিয়মগুলো পদার্থবিজ্ঞানের সাথে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই এটা ছিলো স্রেফ কোনো পরীক্ষার ফলাফল গণনা করার একটা উপায়। বোরের অ্যাটমকেও সেভাবেই বিবেচনা করা হত। মানে, এটা ছিলো কিছু রাসায়নিক পরীক্ষার ফলাফল হিসাব করার কৌশলমাত্র, ফলে মডলেটাকে প্রকৃত বিজ্ঞান বিবেচনা করা হতো না কারণ সে সময়ের পদার্থ বিজ্ঞানের সাথে এটা মিলতো না। কিন্তু তার কারণ সেই সময়ে পদার্থবিজ্ঞানই ভুল ছিল। কোয়ান্টাম মেকানিক্স আবিষ্কারের পর এই পরমাণুতত্ত্ব রসায়নের কোনো পরিবর্তন ছাড়াই তার সাথে একীভূত হয়। তাই শুরুতে একটার মাধ্যমে আরেকটাকে প্রকাশ করার প্রচেষ্টাতেই ত্রুটি ছিল। বরং এই দুইভাবে পৃথিবীকে দেখার উপায়কে একীভূত করার প্রচেষ্টাটিই সঠিক বলে পরিগণিত হয়। চমকপ্রদ ব্যাপার হচ্ছে, এই দুই ক্ষেত্রকে একীভূত করা সম্ভব হয় তাদের অন্তর্নিহীত বিজ্ঞানকে আমূল বদলে ফেলার মাধ্যমে। আমার মতে, পদার্থবিজ্ঞান একশ বছর আগে যতটা উন্নত ছিলো স্নায়ুবিজ্ঞান এখনো তার ধারের কাছেও নেই।

ব্যাপারটা বিভিন্ন অণুর মধ্যে সম্পর্ক নির্ণয়ের রিডাকশনিস্ট প্রচেষ্টার (reductionist approach) বিরুদ্ধ…

চমস্কি: হ্যাঁ, রিডাকশনিস্ট প্রচেষ্টাগুলো প্রায়ই ভুল প্রমাণিত হয়। এর চেয়ে বরং একীভূত করার প্রচেষ্টাগুলো অর্থবহ। কিন্তু এভাবে একীভূত করার মাধ্যমে সব সময় রিডাকশোনে পৌঁছানো নাও যেতে পারে। বিশেষ করে যদি অন্তর্নিহিত বিজ্ঞানে কোনো ত্রুটি থাকে। যেমনটা রসায়ন-পদার্থবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ছিল। আমার সন্দেহ হয়, স্নায়ুবিজ্ঞান-মনোবিজ্ঞানের মধ্যেও এমন কোনো মৌলিক ভ্রান্তি আছে। গ্যালিস্টেল যদি সঠিক হয়, তাহলে সেটা নির্দেশ করবে যে এদেরকে হয়তো একীভূত করা সম্ভব কিন্তু বর্তমান স্নায়ুবিজ্ঞানের পদ্ধতিগুলো বদলাতে হবে।

এভাবে একীভূত করার লক্ষ্য কি অর্থবহ, নাকি এই দুটি ক্ষেত্রের সমান্তরালে অগ্রসর হওয়া উচিত?

চমস্কি: বৈজ্ঞানিক ক্ষেত্রে একীভূত করার প্রচেষ্টা এক ধরনের সহজাত ধারণা। অনেকটা মহাবিশ্বের একীভূত তত্ত্ব খোঁজার মত। এটা হতেই পারে যে হয়তো এমন কোনো একীভূত তত্ত্ব নেই এবং বিভিন্ন অংশ বিভিন্নভাবে কাজ করে। তবে আমি ভুল প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ধরে নিতে চাই যে এমন একীভূত বর্ণনা আছে এবং সেটা খুঁজে বের করাই আমার লক্ষ্য। এ ধরনের একীভূত তত্ত্ব রিডাকশন পদ্ধতিতে নাও পাওয়া যেতে পারে, যেমনটা প্রায়ই দেখা যায়। ডেভিড মারের পদ্ধতির এটাই একটা মূলনীতি: গাণনিকভাবে (computationally) আপনি যেটা আজ আবিষ্কার করবেন, একদিন গাঠনিক স্তরের(Mechanism level) কোনো আবিষ্কারের সাথে সেটা একীভূত হবে, অবশ্য তখন গাঠনিক উপাদানগুলোকে বর্তমানে আমরা যেভাবে বুঝি তা হয়তো বদলাতে হবে।

মারের ভাষ্যে প্রচ্ছন্নভাবে বলা হয় যে তিনটি স্তর [গাণনিক, অ্যালগরিদমিক এবং গাঠনিক] একসঙ্গে নিয়ে সমান্তরালে কাজ করা যাবে না, বরং আপনাকে উপর থেকে নিচে এগোতে হবে, যেটা খুবই কঠিন শর্ত, কারণ বিজ্ঞান সাধারণত ওভাবে এগোয় না।

চমস্কি: উনি হয়তো এমন বাঁধা ধরা নিয়ম বোঝাতে চাননি। যেমন ধরুন, ভিতরকার কলকব্জা সম্পর্কে আরো তথ্য জানার পরে হয়তো আপনার গাণনিক ধারণাও বদলাতে হতে পারে। কিন্তু, এখানে এক ধরনের যৌক্তিক ক্রম আছে যদিও তা গবেষণার ক্রমের সাথে সব সময় মেলে না। তার পরেও আমি মনে করি চিত্রটা মোটামুটি সঠিক। অবশ্য এখানে উল্লেক্ষ্য যে মারের ধারণা ইনপুট গ্রহনকারী ব্যবস্থা জন্য প্রযোজ্য…

তথ্য-প্রক্রিয়াকারী ব্যবস্থা…

চমস্কি: হ্যাঁ, যেমন যেমন ধরুন দৃষ্টিশক্তি। এটা এক ধরনের তথ্যপ্রক্রিয়াকারী ব্যবস্থা। কারণ বাইরের কিছু উপাত্ত চোখ দিয়ে ঢুকছে এবং ভিতরে সেই তথ্য প্রক্রিয়া হচ্ছে। আবার ধরুণ আপনার সাংখ্যিক গণনার ক্ষমতা…

ক্ষমতাটা আমার খুবই দুর্বল যদিও…

চমস্কি: আচ্ছা [হাসি]। এটা এক ধরনের অন্তর্গত ক্ষমতা, আপনি জানেন যে আপনার মস্তিস্ক আসলে একধরনের টুরিং মেশিনের নিয়ন্ত্রক। যেই মেশিনের কিছু বাহ্যিক উপাত্ত, যেমন স্মৃতিকোষ, সময় ইত্যাদির নিয়ন্ত্রনাধিকার আছে। এবং তাত্ত্বিকভাবে দেখলে আপনি যে কোনো দুইটি সংখ্যাকে গুণ করতে পারবেন, যদিও কার্যক্ষেত্রে সেটা সব সময় সত্যি নয়। এখন আপনার সেই অন্তর্গত ব্যবস্থাটা কেমন তা যদি আপনি বের করতে চান তাহলে মারের স্তরগুলো খুব একটা কাজ করবে না। অবশ্য গাণনিক স্তর নিয়ে আপনি কথা বলতে পারবেন। হয়ত সেই স্তরের নিয়মগুলো হয়তো পিয়ানোর স্বীকার্য [সম্পাদকের টীকা: ইটালীয় গণিতবিদ গিউসেপ্পে পিয়ানোর নাম অনুসারে একটা গাণিতিক তত্ত্ব যা গণনা ও স্বাভাবিক সংখ্যা সংক্রান্ত কিছু মৌলিক নিয়ম বর্ণনা করে যা থেকে গণিতের কার্যকর অনেক তথ্য নির্ণয় করা যায়], বা অন্য কিছু। সেগুলো যা-ই হোক না কেন তারাই হচ্ছে গাণনিক স্তর। তাত্ত্বিকভাবে, যদিও আমরা প্রক্রিয়াটা জানি না, আপনি স্নায়ুশারীরবৃতীয় স্থর নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। কিভাবে করা হবে তা কেউ জানে না, কিন্তু বাস্তবে তেমন কোনো অ্যালগরিদমিক স্থর নেই। কারণ জ্ঞানের গণনা বলে কিছু নেই, এটা স্রেফ জ্ঞানীয় ব্যবস্থা। এই জ্ঞানীয় ব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ণয়ের কোনো অ্যালগরিদম নেই, কারণ এটা কোনো প্রক্রিয়া নয়। অবশ্য জ্ঞানীয় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করাটা এক ধরনের প্রক্রিয়া, কিন্তু সেটা ভিন্ন জিনিস।

কিন্তু আমরা যে সব ভুল করি, সেগুলো কি কোনো একটা চলমান প্রক্রিয়ার ভ্রান্তি নির্দেশক নয়?

চমস্কি: ঐ প্রক্রিয়াটা হচ্ছে আমাদের অন্তর্নিহিত ব্যবস্থার ব্যবহারের প্রক্রিয়া। কিন্তু ঐ অন্তর্নিহিত ব্যবস্থা নিজেই একটা প্রক্রিয়া নয়, কারণ তার কোনো নিজস্ব অ্যালগরিদম নেই। সাধারণ গণিতের কথা ধরুন। আপনি যদি পিয়ানোর স্বীকার্য, এবং অবধারণের নিয়মগুলো ধরেন এরাই সাংখ্যিক গণনার সবকিছু নির্ধারণ করে দেয়, কিন্তু এরা কোনো অ্যালগরিদম নয়। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন একজন গণিতবিদ কীভাবে এগুলোর প্রয়োগ করেন; সেটা নানান উপায়ে হতে পারে। হয়তো আপনি স্বীকার্যগুলো থেকে শুরু না করে, অবধারণের নিয়মগুলো থেকে শুরু করবেন। প্রথমে উপপাদ্যটা নিয়ে দেখতে হবে, এর কোনো লেমাকে দাঁড়া করানো যাচ্ছে কি না। সেটা সম্ভব হলে দেখতে হবে ঐ লেমা কোনো ভিত্তির উপর স্থাপন করা যায় কি না, এভাবে আপনি একটা গাণিতিক প্রমাণ পাবেন যে প্রমাণটা একটা জ্যামিতিক বস্তু।

কিন্তু সেটা তো, আমার মনে মনে দুইটা সংখ্যা যোগ করার থেকে মৌলিকভাবে ভিন্ন কার্যক্রম। হয়তো যোগ করার কোনো ধরনের অ্যালগরিদম আমার মাথায় আছে।

চমস্কি: ব্যাপারটা অপরিহার্য নয়। উভয় ক্ষেত্রেই প্রক্রিয়াটার একটা অ্যালগরিদম আছে। কিন্তু এই অন্তর্গত ব্যবস্থার নিজস্ব কোনো অ্যালগরিদমিক গঠন নেই, আপনি এক ধরনের শ্রেণীবিন্যাসগত ভুল করছেন। পিয়ানোর স্বীকার্য, এবং তার অবধারণের নিয়মগুলো কী কী প্রক্রিয়াকে সংজ্ঞায়িত করছে সেই প্রশ্ন আপনি করবেন না, কারণ এদের মাঝে কোনো প্রক্রিয়া নেই। এগুলোকে ব্যবহার করার প্রক্রিয়া থাকতে পারে। এবং সেই প্রক্রিয়া হয়তো জটিল প্রক্রিয়া, আপনার সাংখ্যিক গণনার ক্ষেত্রেও এটা সত্য। আপনার অন্তর্নিহিত যে ব্যবস্থা আছে তার অন্তর্গত প্রক্রিয়ার প্রশ্নটা আসছে না। কিন্তু সেই অন্তর্নিহিত ব্যবস্থাটা আপনি কীভাবে ব্যবহার করছেন সে প্রশ্নে প্রক্রিয়ার কথাটা আসতে পারে। একটা গুণ অংক আপনি ভিতরে ভিতরে নানান রকম ভাবেই করে থাকতে পারেন। মনে করেন আপনি ৭ এবং ৬ যোগ করতে চান। যেমন, এর একটা অ্যালগরিদম হতে পারে, শুরুতে আপনি ভাববেন ৭ থেকে ১০ এ যেতে কত লাগে? — লাগবে ৩ এরপর বাকি থাকলো আরো ৩। আপনি ১০ এর সাথে এই ৩ যোগ করবেন, ফলাফল ১৩। এটা যোগ করার এক ধরনের অ্যালগরিদম— আসলে আমাকে কিন্টারগার্টেনে এভাবেই শেখানো হয়েছিল। এটা একটা যোগের উপায়।

কিন্তু যোগ করার অন্য অনেক উপায়ই আছে— একমাত্র সঠিক অ্যালগরিদম বলে কিছু নেই। এসব হচ্ছে আমাদের মনের মধ্যকার চৈতন্যব্যবস্থাকে চালিয়ে নেবার নানান রকম অ্যালগরিদম। ফলে এই ব্যবস্থার নিজরস্ব অ্যালগরিদমটা কী সে প্রশ্ন অর্থহীন। আপনি গাণনিক স্থর সম্পর্কে পশ্ন করতে পারেন, গাঠনিক স্থর সম্পর্কেও প্রশ্ন করতে পারেন। কিন্তু এই ব্যবস্থার কোনো অ্যালগরিদম স্তর নেই। ব্যাপারটা ভাষার ক্ষেত্রেও একই রকম। ভাষা অনেকটা এই সাংখ্যিক গণনার ক্ষমতার মত। ভিতরে এক ধরনের ব্যবস্থা আছে যা অসীম সংখ্যক বাক্যের অর্থ নির্ধারণ করছে। কিন্তু তার অ্যালগরিদমটা কি, সে প্রশ্ন আসে না। ঠিক যেমন সাংখ্যিক গণনার স্বীকার্যসমূহ উপপাদ্য প্রমাণের নিয়ম সম্পর্কে কী বলছে, সে প্রশ্নও আসে না। কোনো ব্যবস্থাকে ব্যবহার করা কে বলে প্রক্রিয়া, যা মারের ত্রিস্তরী বিশ্লেষণের মাধ্যমে অধ্যয়ন করা সম্ভব। কোনটা প্রক্রিয়া আর কোনটা প্রক্রিয়া না সেই ধারণা পরিস্কার থাকা জরুরী।

দেখা যাচ্ছে গাণনিক স্তর, যেমন পিয়ানোর স্বীকার্যসমূহ, থেকে মারের তৃতীয় স্তরে …

চমস্কি: গাঠনিক স্তর…

… গাঠনিক আর প্রায়োগিক স্তরে …

চমস্কি: আচ্ছা…

মাঝে কোনো ধরনের অ্যালগরিদমিক স্তর বাদ দিয়ে পৌছানোটা রীতিমত বিস্ময়কর।

চমস্কি: আমি অবশ্য তা মনে করি না। হয়তো কিভাবে এটা ব্যবহৃত হচ্ছে সেখান থেকেই গাঠনিক স্তর সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। আমাদের চেয়েও উচতর কোনো বুদ্ধিমত্তা হয়তো এই অন্তর্গত ব্যবস্থাটা দেখতে পারবে, কারণ এর একটা শারীরিবৃত্তীয় ভিত্তি আছে, আমরাও এটা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে পারি। অন্তঃস্থ ব্যবস্থাটাকে কী প্রক্রিয়ায় ব্যবহার করা হচ্ছে সেটা না দেখেও এই অধ্যয়ন সমভব। এটা সম্ভব, যে এইসব প্রক্রিয়া কীভাবে কাজ করছে তা দেখে অন্তঃস্থ ব্যবস্থার গঠন সম্পর্কে মূল্যবান ধারণা পাওয়া যাবে। কিন্তু ধারণাগত ভাবে সেটা একটা ভিন্ন সমস্যা। কারণ, কোনো সমস্যা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার সেরা উপায় কী সেই প্রশ্ন এখানে এসে যাচ্ছে। তাই হয়তো, পিয়ানোর স্বীকার্যের সাথে স্নায়ুকোষের সম্পর্ক বোঝার সেরা উপায় হচ্ছে গণিতবিদদের উপপাদ্য প্রমাণ করতে দেখা। কারণ, হয়তো এ থেকে কিছু কার্যকর তথ্য পাওয়া যাবে। এই নিরীক্ষা থেকে উদ্দিষ্ট ফলাফল হচ্ছে মস্তিস্কের অন্তস্থ ব্যবস্থার একটা শারীরবৃত্তীয় ভিত্তি খুজে বের করা, কোনো ধরনের অ্যালগরিদমের উল্লেখ না করে। অ্যালগরিদম হচ্ছে এই অন্তস্ত ব্যবস্থা ব্যবহারের প্রক্রিয়া, যার সম্পর্কে জানলে হয়তো কিছু উত্তর খুঁজতে সুবিধা হবে। যেমন, অবনত তলের দিকে তাকিয়ে, সেই তল বরাবর পতনের হার সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়, ওদিকে নিউটনের সূত্র কিন্তু অবনত তল নিয়ে কিছু বলে না।

ঠিক। তার মানে, চৈতন্য ব্যবস্থা বা ভাষা ব্যবস্থার অধ্যায়নে মারের স্তরবিভাগের প্রয়োগের পিছনে যুক্তি আছে। আবার, আপনি যেহেতু যুক্তি দিয়েছেন যে ভাষা ক্ষমতা বংশগতীয়ভাবে পাওয়া, তার মানে অন্যান্য জৈবব্যবস্থা যেমন, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, সংবহন তন্ত্র এগুলোর অধ্যায়নেও মারের পদ্ধতি খাটানো যাবে…

চমস্কি: অবশ্যই, আমি মনে করি এদের অনেক মিল। রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অধ্যয়ন নিয়েও আপনি একই কথা বলতে পারেন।

হয়ত চৈতন্যের তুলনায় এসব সিস্টেম নিয়ে এভাবে কাজ করাটা আরো সহজ হবে।

চমস্কি: একইভাবে পরিপাকতন্ত্রের উপরও গবেষণা করা সম্ভব। যদিও সে ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উত্তরগুলো ভিন্ন। ধরুন কেউ পরিপাক তন্ত্র নিয়ে গবেষণা করছে। তাদের গবেষণা নিশ্চই আপনার পেটখারাপ হলে কী হয়, বা একটা বড় বার্গার খাবার পরপর কি ঘটে শুধু সে সব নিয়ে হবে না। সেই জানালার বাইরের ছবি তোলার উপমাতে ফিরে যাওয়া যাক। পরিপাক তন্ত্র নিয়ে কাজ করার একটা উপায় হচ্ছে সম্ভাব্য সব রকম পরিস্থিতিতে ব্যবস্থাটি কী করে সে বিষয়ক সম্ভাব্য সব রকমের তথ্য সংগ্রহ করে একটা বড় কম্পিউটারে ঢুকিয়ে পারিসাংখ্যিক বিশ্লেষণ করা — হয়তো এ থেকে কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু একজন জীববিজ্ঞানী এমনটা করবেন না। তারা শুরুতেই, পেট খারাপ হবার মত, আপাত দৃষ্টিতে অপ্রাসঙ্গিক চলকগুলোকে (কখনো কখনো ভুলভাবে, কারণ আপনি ভুল করতেই পারেন) বাদ দিতে চান।

কিন্তু জীববিজ্ঞানীরা তো সেটাই করছেন। তারা একদল সুস্থ্য এবং অসুস্থ্য মানুষকে নিয়ে তাদের পরিপাক তন্ত্রের ক্রিয়াকলাপ তুলনা করছেন এবং এ থেকে জৈবনিক বৈশিষ্ট্যসমূহ অনুমানের চেষ্টা করছেন।

চমস্কি: তারা এটা করছেন বেশ অনেকটা অগ্রসর পর্যায়ে পৌছানোর পর। তারা ইতোমধ্যেই পরিপাকতন্ত্রের গঠন সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন, না হলে কিসের সাথে কিসের তুলনা করছি, কে অসুস্থ্য কে সুস্থ্য সেটাই তো বোঝা যাবে না।

তারা পারিসাংখ্যিক পদ্ধতিতেই চলকগুলোকে বাছাই করছেন। এভাবে কাজ করলে ফান্ডিং পাওয়াও সহজ, কারণ আপনি অসুস্থ্য মানুষের ব্যাপারে অধ্যয়ন করার কথা বলছেন।

চমস্কি: ফান্ডিং পাবার এটা একটা উপায় হতেও পারে। যেমন ভাষা নিয়ে গবেষণায় ফান্ড পেতে কেউ হয়তো দাবি করল, এটা অটিজম নিরাময়ে সাহায্য করে। এসব কথা আলাদা [হাসি]। কিন্তু, কোনো ব্যবস্থার অধ্যয়নে শুরুতে আপনাকে যে সব চলক অপ্রাসঙ্গিক মনে হবে সেগুলোকে বাদ দিয়েই একটা বিমূর্ত মডেল তৈরি করতে হবে, এবং বিষয়টার মৌলিক প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা করতে হবে— তারপর এক সময় আপনি প্রশ্ন করবেন, দেখি তো এইসব বাড়তি চলক, যেমন পেঠের পীড়া, বিবেচনায় আনলে কী হয়।

তারপরেও মার এর ত্রিস্তরী বিশ্লেষণ এ ধরনের ব্যবস্থায় প্রয়োগ করা খুবই কঠিন মনে হচ্ছে। আপনি যদি জিজ্ঞেস করেন, মস্তিষ্ক কী ধরনের গাণনিক কার্য সম্পাদন করছে, আমাদের কাছে তার এক ধরনের উত্তর আছে, কারণ মস্তিষ্ক এক রকম কম্পিউটারের মতই। কিন্তু আপনি যদি প্রশ্ন করেন, আমাদের ফুসফুস কী ধরনের গাণনিক কার্য সম্পাদন করছে, ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করাই খুব মুশকিল— স্পষ্টতই এটা কোনো তথ্যপ্রক্রিয়াকারী কাজ করছে না।

চমস্কি: তা নয়, কিন্তু এটা ভাবার কোনো কারণ নেই যে সম্পূর্ণ জীববিজ্ঞানই গাণনিক। কিন্তু, চৈতন্য কে গাননিক মনে করার অনেক কারণ থাকতে পারে। বস্তুত, গ্যালিস্টেল বলছেন না যে শরীরের সবকিছু অধ্যায়ন করতেই আগে /পড়া/লেখা/ এবং নির্দেশকারী এককগুলোকে চিহ্নিত করতে হবে।

এটা বিবর্তনীয় ধারণার বিপরীত মনে হচ্ছে। এইসব ব্যবস্থা তো সম্মিলিতভাবে বিবর্তিত হয়ছে, এবং ব্যবস্থাগুলো বিভিন্ন অংশ, বিভিন্ন অণু, এবং প্রক্রিয়া মিলিয়ে-মিশিয়ে পুনর্ব্যবহার করে। কোষগুলো নানান কিছু গণনা করছে।

চমস্কি: কিন্তু, আপনি নিশ্চই ফুসফুক কীভাবে কাজ করে সেটা অধ্যয়ন করতে গিয়ে কোষগুলো কী গণনা করছে সেটা জিজ্ঞেস করেন না। আপনি, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, দৃষ্টি ব্যবস্থা এসব নিয়ে অধ্যয়ন করতে পারেন, কিন্তু দুটো থেকেই একই উত্তর পাবার আশা করতে পারেন না। একটা জীব, খুবই মডিউলার একটা ব্যবস্থা। এদের মধ্যে বহু জটিল উপব্যবস্থা থাকে যারা ভিতরে ভিতরে সংযুক্ত। তারা ভিন্ন ভিন্ন নীতি মেনে চলে। জৈব ক্রিয়াকলাপ খুবই মডিউলার। আপনি এমনটা ভাবতে পারেন না যে এটা তালগোল পাকানো একটা বিশাল জিনিস, যার পুরোটাই একই ভাবে কাজ করছে।

নিশ্চয়ই তা না, কিন্তু আমি বলছি আপনি তাদের সবাইকে অধ্যয়ন করতেই একই ধরনের পদ্ধতি অবলম্বন করবেন।

চমস্কি: যদি মডিউলগুলো ভিন্ন হয় তাহলে সবসময় তা নাও হতে পারে। কিছু কিছু মডিউল হয়ত গাণনিক অন্যরা না।

তাহলে আপনার অভিমত কি? স্রেফ পারিসাংখ্যিক ভাবে উপাত্ত অনুমান করার বদলে, বাখ্যামূলক তত্ত্বের কী ধরনের বৈশিষ্ট্য থাকবে? বিশেষ করে যেসব ব্যবস্থা গাণনিক নয় তাদের ক্ষেত্রে— আমরা কি এসব ব্যবস্থা বুঝতে পারব?

চমস্কি: অবশ্যই। যেমন ধরুন, কোনো একটা ভ্রুণ কেন মুরগিছানা হয়ে যাচ্ছে, কেন ইঁদুর হয়ে যাচ্ছে না, এ ধরনের প্রশ্নের ব্যাপারে আপনি অনেক কিছুই জানতে পারবেন। এটা খুবই জটিল একটা ব্যবস্থা এতে বিভিন্ন রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়া সহ নানান রকম জিনিস জড়িত। এমনকি সেই গোলকৃমির কথাই ধরুণ। এখানকার এক গবেষণাতেই দেখা গেছে, যে এটাকে স্রেফ একটা স্নায়ুয়োকোষের নেটওয়ার্ক হিসাবে দেখে বোঝা সম্ভব নয়। আপনাকে মস্তিষ্কের মধ্যে, স্নায়ুতন্ত্রের মধ্যে ঘটমান জটিল রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়াগুলোর দিকেও তাকাতে হবে। এইসব সিস্টেমগুলোকে আলাদা আলাদা ভাবেই দেখতে হবে। হয়তো এদের কোনোটা আপনার সাংখ্যিক ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত নয়, কিন্তু আপনার হাত আপনি উচু করবেন কি না তার সাথে সম্পর্কিত।

যদিও, আপনি যদি রাসায়নিক মিথস্ক্রিয়াগুলোকে অধ্যয়ন করেন তাহলে হয়তো শেষমেস, আপনি যেটাকে বলেছেন, ঘটনার একটা পুনর্বিবরণীতে পৌছে যাবেন।

চমস্কিঃ কিংবা একটা বাখ্যায়। কারণ হয়তো এটা সরাসরি খুব গুরুত্বপূর্ণভাবে জড়িত।

কিন্তু আপনি যদি এ ধরনের কিছু খুঁজে পান যে, অমুক রাসায়নিক উপাদানটি সক্রিয় হতে হবে, বা অমুক জিনটি সক্রিয় হতে হবে, তাতে কিন্তু কোনো জীব কীভাবে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা আপনি জানতে পারছেন না। আপনি স্রেফ একটা সুইচ খুঁজে পেয়েছেন।

চমস্কি: তারপর আপনি আরো গভীরে তাকাবেন। এই জিনগুলো এইসব পরিস্থিতিতে এক রকম কাজ করছে এবং ভিন্ন পরিস্থিতিতে অন্য রকম কাজ করছে সেটা খুঁজে বের করবেন।

কিন্তু জিন যদি ভুল স্তরের বিমূর্তায়ন হয় তাহলে তো আপনি শেষ।

চমস্কি: সেক্ষেত্রে আপনি সঠিক উত্তরটি পাবেন না। এবং হয়তো জিনরা সঠিক বিমূর্তায়নের স্তর নয়। যেমন ধরুন, স্রেফ জিনোম থেকে কীভাবে একটা জীবের উদ্ভব হচ্ছে সেটা বের করা খুবই কঠিন। কোষের মধ্যে নানান রকম জিনিস উৎপাদন হচ্ছে। আপনি শুধু জিনের দিকে তাকালে হয়তো সঠিক বিমুর্ত স্তরে নাও থাকতে পারেন। আপনি জানেন না বলেই তো এটা নিয়ে গবেষণা করছেন। আমার তো মনে হয় এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কোনো অ্যালগরিদম নেই। আপনাকে স্রেফ চেষ্টা করে যেতে হবে।

আমি আলোচনার মোড় ঘুরিয়ে বিবর্তনের দিকে নিতে চাই। আপনি একটা আগ্রোহদ্দীপক ধারনার সমালচনা করেছেন, যেটার নাম দিয়েছেন “জিনতাত্ত্বিক অভিজ্ঞতাবাদ”। আপনি এই পদ্ধতির সমালোচনায় বলেছেন যে এরা কোনো বাখ্যা করার ক্ষমতা নেই। এটা স্রেফ বলে- মন এমন কারণ প্রকৃতিতে আমরা অভিযোজীত হতে গিয়ে এভাবেই বিবর্তিত হয়েছি। এবং এটা নির্ধারিত হয়েছে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে। আপনি বলেছেন এটা তেমন কোনো বাখ্যা দেয় না কারণ সবকিছুর ব্যাখ্যাতেই পরিব্যপ্তি আর নির্বাচনের দারস্থ হওয়া যায়।

চমস্কি: আমি ওদের পদ্ধতিতে অসন্তুষ্ট হলেও, হয়তো ওরাই সঠিক। এমন হতেই পারে যে আপনার সাংখ্যিক গণনার ক্ষমতা স্রেফ বিক্ষিপ্ত পরিব্যপ্তি এবং নির্বাচনের মাধ্যমেই উদ্ভূত হয়েছে। যদি দেখা যায় এটাই সঠিক, তাহলে তো ভালো।

শুনে মনে হচ্ছে সত্যভাষ(truism)।

চমস্কি: আমি বোঝাতে চাচ্ছি, এটা মিথ্যা নয়। সত্যভাষ তো সত্যই [হাসি]

কিন্তু এ থেকে তেমন কোনো বাখ্যা পাওয়া যায় না।

চমস্কি: হয়তো এটাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের বাখ্যা। আপনি একটা জগৎ কল্পনা করতে পারেন— আমাদের জগৎ যদিও এমন না বলে মনে করি আমি— যেখানে বিভিন্ন বস্ত্যুর মধ্যে এলোমেলো পরিবর্তন ছাড়া কিছুই ঘটে না। এবং বাহ্যিক কোনো বল নির্বাচনের কাজটা করে। আমি মনে করি না আমাদের জগৎ এভাবে কাজ করে, কোনো জীববিজ্ঞানীও এমন ধারণা পোষণ করেন বলে আমি মনে করি না। প্রাকৃতিক নিয়মসমূহ থেকে হাজার উপায়ে একটা ব্যবস্থার উদ্ভত হতে পারে, যেখানে প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করবে, এবং যেখানে কিছু জিনিস ঘটবে এবং কিছু জিনিস ঘটবে না। জৈব ব্যবস্থায়, বা বিভিন্ন জীবের মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে যারা এমন নয়। প্রথমে মিয়োসিসের কথা ধরুন। কেন কোষগুলো বিভক্ত হয়ে আলাদা গোলকে পরিণত হয়? কেন ঘণকে পরিণত হয় না? এর জন্য কোনো জিনের বিক্ষিপ্ত পরিব্যপ্তি দায়ী নয়। বরং, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম দায়ী। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম শুধু এখানেই থেমে গেছে তা ভাবার কারণ নেই, পুরো ব্যস্থার সব স্তরেই এই নিয়মগুলো কাজ করছে।

হ্যাঁ, নিয়মগুলো নিশ্চিত ভাবেই জৈব ব্যবস্থার সীমা নির্ধারণ করে।

চমস্কি: তার মানে এটা স্রেফ বিক্ষিপ্ত পরিব্যপ্তি আর নির্বাচন নয়। বরং বিক্ষিপ্ত পরিব্যপ্তি, নির্বাচন এবং বাকি যা কিছু প্রোযোজ্য, তেমন সবকিছুর সমন্বয়। যেমন, পদার্থ বিজ্ঞানের সূত্রসমূহ।

তাহলে কি “তুলনামূলক জীনবিশ্লেষণতত্বে” এ ধরনের প্রচেষ্টার কোনো স্থান আছে? এখানে (এমআইটি/ হার্ভার্ড) বোর্ড ইন্সটিটিউট বিভিন্ন প্রাণীর বিভিন্ন জিনমকে বিভিন্ন পরিবেশে রেখে সেখান থেক উৎপাদিত সব ধরনের অণুর সূত্র লিপিবদ্ধ করে বিপুল পরিমান উপাত্ত সংগ্রহ করছে। উচ্চ স্তরের চৈতন্য প্রক্রিয়া সম্পর্কে এ ধরনের তুলনামূলক বিবর্তনীয় অনুসন্ধান থেকে কি কোনো ধারণা পাওয়া সম্ভব, নাকি এটা অসময়োচিত?

চমস্কি: আমি বলছি না যে এ ধরনের প্রচেষ্টা ভুল, কিন্তু এর থেকে কী ধরনের উপসংহারে পৌছানো সম্ভব তা আমি জানি না। তেমন কিছু পাবার আশা করাও উচিত নয়।

আপনি এমন কোনো উদাহরণের কথা জানেন না যেখানে এ ধরনের বিবর্তনীয় বিশ্লেষণ থেকে কোনো ধারণা পাওয়া গেছে? যেমন Foxp2 পরিব্যপ্তি? [সম্পাদকের টীকা: এটা একটা জিন যা বাকশক্তি, এবং ভাষা ক্ষমতার সাথে জড়িত বলে ধারণা করা হয়। একটা পরিবারের যাদের সবার মধ্যে সুনির্দিষ্ট ধরনের বাক প্রতিবন্ধকতা ছিলো, তাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, পরিব্যপ্তির ফলে এই এই জিন বদলে গেছে। বিবর্তনের মানব শাখায় এই জিন বেশ কিছু অনন্য পরিব্যপ্তির মধ্য দিয়ে গেছে, যা অন্য জীবের ক্ষেত্রে দেখা যায় না।]

চমস্কি: Foxp2 বেশ আগ্রোহদ্দীপক। কিন্তু ভাষার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বরং, এটা সুক্ষ্ম নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের সাথে সম্পর্কিত। এ ধরনের সুক্ষ্ম নড়াচড়া ভাষার ব্যবহারের সাথে জড়িত, যেমন আপনি কথা বলার সময় আপনার ঠোট এবং অন্যান্য অংশ সুক্ষ্মভাবে নিয়ন্ত্রণ করেন। কিন্তু এটা ভাষার বাহ্যিক ব্যাপার এবং আমরা ব্যাপারটা জানি। সে আপনি বাগযন্ত্র ব্যবহার করে ভাষা প্রকাশ করুন, অথবা হাত নেড়ে ইঙ্গিত ভাষার মাধ্যমে প্রকাশ করুন, মূল ভাষাটা তো একই। এমনকি উভয় ক্ষেত্রেই মস্তিস্কের একই অংশসমূহে কথাগুলো উৎপাদন এবং বিশ্লেষণ হচ্ছে, যদিও এক ক্ষেত্রে নড়ছে আপনার ঠোট, অন্যক্ষেত্রে হাত। তার মানে যে ভাবেই আপনি বহিঃপ্রকাশ করুন, সেই প্রকাশ প্রক্রিয়াটা বাহ্যিক। এসব নিয়ে কথা বলা বেশ জটিল, কিন্তু আমি মনে করি আপনি যদি ভাষার বিভিন্ন গঠনের দিকে লক্ষ্য করেন আমার কথারই প্রমাণ পাবেন। এমন কিছু আগ্রহোদ্দীপক উদাহরণ আছে যেখানে ভাষার গাণনিক দক্ষতার সাথে, যোগাযোগ দক্ষতার সঙ্ঘাত দেখা যায়।

সরল ক্রম বিষয়ক উদাহরণের কথা তো আমি বলেছিই। আপনি যদি জানতে চান, কোন ক্রিয়া-বিশেষণটি কোন ক্রিয়ার সাথে যুক্ত হচ্ছে তখন, এমনকি কোনো শিশুও স্বভাবজাতভাবেই, সরল দূরত্বের বদলে গাঠনিক দূরত্ব হিসাব করে। সরল দূরত্ব ব্যবহারের জন্য তার কাছে সরল ক্রম বিচারে ক্ষমতা থাকতে হবে। কিন্তু সরল ক্রম যদি স্রেফ ইন্দ্রিয়-সঞ্চালন(sensory-motor) তন্ত্রের একটা সহজাত প্রবণতা হয়, তাহলে ওই শিশুর ক্ষেত্রে সেটা পূর্ণরূপে বিকশিত হয়ে নাও থাকতে পারে। এটা একটা প্রমাণ যে অন্তর্গত ব্যবস্থার সাথে ইন্দ্রিয়-সঞ্চালন ব্যবস্থার সংযোগ গাণনিক ব্যবস্থার কার্যক্রমের ক্ষেত্রে স্রেফ একটা গৌণ ব্যাপার।

কিন্তু এটা ঐ ব্যবস্থাকে সীমাবদ্ধ করে থাকতে পারে, ঠিক যেভাবে পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম কোষ বিভাজনকে সীমাবদ্ধ করে?

চমস্কি: হতে পারে, কিন্তু তার সপক্ষে তেমন কোনো প্রমাণ নেই। যেমন, কোনো বাক্যের বামপাশের অংশের— বাম বলতে শুরুর অংশ বোঝাচ্ছে এখানে— সাথে ডান পাশের অংশের বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য আছে। আপনি যদি জিজ্ঞেস করতে চান, “Who did you see?” তখন আপনি “Who” কথাটা শুরুতে লেখেন, শেষে লেখেন না। সব ভাষাতেই, যেখানে wh-phrase যেমন who, which, বা এমন কিছু আছে সেখানে ওগুলো সামনের দিকে সরে যায়। পিছনের দিকে নয়। এটা খুব সম্ভবত প্রক্রিয়াকরণ জনিত কোনো সীমাবদ্ধতা। বাক্যের শুরুতেই শ্রোতাকে জানিয়ে দেওয়া যে কী ধরনের বাক্য হতে যাচ্ছে এটি। এটা সবার শেষে থাকলে, শুরুতে একটা বর্ণনামূলক বাক্য থাকবে এবং শেষে আমি কী জানতে চাচ্ছি বোঝা যাবে। তার মানে, এই ধরনের wh কে সামনে আনাটা কোনো ধরনের প্রক্রিয়াকরণ জনিত সীমাবদ্ধতা থেকে উদ্ভুত হতে পারে। তো এটা যদি সত্যি হয়, তাহলে প্রক্রিয়াকরণের সীমাবদ্ধতা, যেটা বাহ্যিক প্রকাশের সাথে জড়িত, সেটা ভাষার গঠন ও ভাবগত চরিত্রকে প্রভাবিত করছে।

কিছু কিছু উদাহরণ আছে যেখানে গাণনিক দক্ষতার সাথে যোগাযোগ দক্ষতার সুস্পষ্ট সংঘর্ষ দেখা যায়। একটা সহজ উদাহরণ ধরুন। আমি যদি বলি, “Visiting relatives can be a nuisance”। কথাটা অস্পষ্ট। কারণ, বেড়াতে আসা আত্মীয়রা বিরক্তিকর নাকি আত্মীয় বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া বিরক্তিকর সেটা বোঝা যাচ্ছে না। দেখা যায় আমাদের জানা এধরনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই অস্পষ্টতা আসে ভাষার নিয়মগুলোকে কোনোভাবে সীমাবদ্ধ না করে মুক্তভাবে ব্যবহৃত হতে দিয়ে। কারণ এরকম মুক্ত ব্যবহার গাণনিকভাবে সহজসাধ্য, কিন্তু যোগাযোগের ক্ষত্রে এটা দুঃসাধ্য কারণ এখানে অনিরুপণযোগ্য অস্পটতার সৃষ্টি হয়েছে।

অথবা আরেকটা উদাহরণ ধরুন, যেটাকে বলে বাগান-রাস্তা বাক্য ( garden path sentence) [অনুবাদকের টীকা- বাগান রাস্তা বাক্য হচ্ছে এমন ধরনের ব্যাকরণগতভাবে সঠিক বাক্য, যেটা পড়াতে পড়তে পাঠক প্রথম বারে ভুলভাবে বোঝে। মনোভাষাতাত্বিকেরা এ ধরনের বাক্য ব্যবহার করেন আমরা যে বাক্যের শব্দগুলো একটা একটা করে প্রক্রিয়া করি তা প্রমাণ করতে]। “The horse raced past the barn fell”। যেভাবে বলা হয়েছে তাতে এই বাক্য শুনলে মানুষ বুঝতে পারে না। “The horse raced past the barn” এটুকুকেই বাক্য মনে হয়। তারপর হঠাত শেষের “fell” দেখে মনে হয়, এই শব্দ আবার এখানে কী করছে! কিন্তু আপনি যদি ভেবে দেখেন, এটা একটা সুগঠিত বাক্য। এর অর্থ, যে ঘোড়াটি গোলাঘরের পাশ দিয়ে দৌড়ে গেল সেটা আছাড় খেয়েছে। কিন্তু এখানে ব্যকরণের বিভিন্ন নিয়ম, ঠিকঠাক কাজ করেও শুরুতে একটা বিভ্রান্তিকর স্থানে পৌছে দিচ্ছে পাঠককে। এমন ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। কিছু কিছু কথা আছে, যা আপনি স্রেফ বলতেই পারবেন না। যেমন আমি যদি বলি, “The mechanic fixed the cars.” এবং আপনি বলেন, “They wondered if the mechanics fiexed the cars.” শুনে আপনি গাড়ি সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারেন, “How many cars did they wonder if the mechanics fixed?” যেটা কম-বেশি সঠিক। কিন্তু ধরুন আপনি মেকানিকদের সম্পর্কে প্রশ্ন করতে চান। “How many mechanics did they wonder if fixed the cars?” কেন যেন এ ধরনের বাক্য কাজ করে না। এটা একটা ঠিকঠাক চিন্তা, কিন্তু আপনি তা বলতে পারছেন না। আপনি যদি খেয়াল করেন, দেখবেন সবচেয়ে দক্ষ গাণনিক নিয়মের কারণেই কথাটা আপনি বলতে পারছেন না। কিন্তু স্রেফ চিন্তার বহিঃপ্রকাশের জন্য, যোগাযোগের জন্য, আপনি যদি এই কথাটা বলতে পারতেন তাহলে ভাল হত— তার মানে এখানে একটা সঙ্ঘাত দেখা যাচ্ছে।

বাস্তবে দেখা যায়, এমন সব ধরনের সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে গাণনিক সহজ-সাধ্যতাই জিতছে। বাহ্যিক প্রকাশের সহজ-সাধ্যতা থেকে অনেক ধরনের অস্পষ্টতা সৃষ্টি হয়, কিন্তু দেখা যায় ভিতরে ভিতরে ভাষা ব্যবস্থা গাণনিক দক্ষতার কথা মাথায় রেখেই হিসাব করছে, সেখানে বাহ্যিক প্রকাশে নিয়ে কোনো মাথাব্যাথা নেই। আমি সম্ভবত খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে ব্যাপারটা উপস্থাপন করতে পারলাম না। তবে পুরো ব্যাপারটা গুছিয়ে লিখে একটা গ্রহনযোগ্য যুক্তি দাঁড়া করানো সম্ভব।

এ থেকে বিবর্তন সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়। কারণ এটা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে, ভাষাক্ষমতার বিবর্তনের ক্ষেত্রে শুরুতে একটা অন্তর্গত গাণনিক ব্যবস্থা উদ্ভব হয়েছে, এর পর বাহ্যিক প্রকাশের ব্যবস্থা। আপনি যদি কোনো বিশেষ ভাষা কীভাবে উদ্ভব হলো সেটা নিয়ে চিন্তা করেন, তখনও একই উপসংহারে পৌছাবেন। মানব বিবর্তনের কোনো এক পর্যায়ে, প্রত্নতাত্বিক প্রমাণ অনুযায়ী হয়তো এক লক্ষ বছর আগে, যা বিবর্তনীয় হিসাবে খুবই কম সময়, প্রথম এই গাণনিক ব্যবস্থার উদ্ভব হয়, যা অন্য কোনো জীবের মধ্যে হয়নি। এর এক ধরনের সাংখ্যিক গণিতীয় গুণাবলি আছে…

এর মাধ্যমে, বাহ্যিকপ্রকাশের ক্ষমতার আগেই ভালভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা উদ্ভব হয়?

চমস্কি: এর ফলে আপনি চিন্তাক্ষমতা পাচ্ছেন। হয়তো কোনো একক ব্যক্তির মস্তিস্কের মধ্যে কিছু একটা ভিন্নভাবে যুক্ত হলো, পুরো গোত্রের মধ্যে নয়। ফলে সেই ব্যক্তির মধ্যে চিন্তাভনার ক্ষমতার উদয় হলো, পুরো গোত্রে নয়। ফলে তখনো কারো কাছে ভাবনার বহিঃপ্রকাশের কোনো প্রশ্ন আসছে না। পরবর্তীতে, এই জিনগত ভিন্নতা যখন আরো অনেকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, তখন হয়তো ভাবনা বহিঃপ্রকাশের প্রশ্ন এসে যায়। আর তখনই ইন্দ্রিয়-সঞ্চালন ব্যবস্থার সাথে সেই অন্তঃস্থব্যবস্থার সংযোগের প্রশ্ন আসে। কিন্তু সেটা দ্বিতীয় ধাপের প্রক্রিয়া।

যদি না, এই বহিঃপ্রকাশ এবং অন্তর্গত ভাবনার ব্যবস্থাগুলো এমনভাবে জড়িত হয়ে থাকে যা আমরা অনুমান করতে পারছি না।

চমস্কি: আমরা এধরনের অনুমান করিও না, এবং এ ধরনের অনুমান অর্থবহও নয়। কেন এটা বাহ্যিক ব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত হবে? যেমন ধরুন, আপনার সাংখ্যিক গাণিতিক ব্যবস্থা তো সেভাবে বাহ্যিক কিছুর সাথে সংযুক্ত নয়। অন্যান্য প্রাণীতেও এমন আছে যেমন গানের পাখি, যাদের অন্তর্গত গাণনিক ব্যবস্থা আছে, যেটা হচ্ছে তাদের গান। এটা হয়তো ভাষাক্ষমতার মত কোনো ব্যবস্থা না, কিন্তু এটা একটা অন্তর্গত গাণনিক ব্যবস্থা তো বটেই। এবং কোখনো এটা বহিঃপ্রকাশিত হয়, আবার কখনো কখনো হয় না। কিছু কিছু প্রজাতির ছানারা অনেক আগেই তাদের গান আত্মস্থ করে নেয়, কিন্তু পুরোপুরি সেয়ানা হয়ে ওঠার আগে প্রকাশ করে না। সেই প্রাথমিক অবস্থায়, এদের ভিতরে গানটা ঠিকই আছে, কিন্তু বহিঃপ্রকাশের জন্য দরকারি বাহ্যিক ব্যবস্থাটা নেই। ব্যাপারটা মানুষের ক্ষেত্রেও সত্যি। যেমন মানব শিশু যা কিছু বলতে পারে তার চেয়ে অনেক কিছু বুঝতে পারে, — এ ঘটনার প্রচুর পরীক্ষামূলক প্রমাণ আছে। অর্থাৎ, তাদের অন্তঃস্থব্যবস্থাটা আছে, কিন্তু সেটাকে বহিঃপ্রকাশ করার বাহ্যিক ব্যবস্থাটা তখনো বিকশিত হয়নি। হয়তো তখনো তার স্মৃতিসংরক্ষণ ক্ষমতা যথেষ্ট নয়, বা অন্য কোনো কারণে।

আমি বিজ্ঞানের দর্শন বিষয়ক একটা প্রশ্ন দিয়ে এই আলোচনার ইতি টানতে চাই। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে আপনি বলেছেন, সমস্যার একটা বড় অংশ হচ্ছে বিজ্ঞানীরা কী করতে চাচ্ছেন তা নিয়ে নিজেরা ভাবছেন না। আপনি বলেছেন যে আপনি এমআইটিতে বিজ্ঞানের দর্শন বিষয়ক একটি বিষয় পড়িয়েছেন এবং সেখানে ছাত্ররা, ধরুন উইলার্ড ভান অরমান কোয়াইন এর লেখা পড়লেও সেটা তাদের এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যেত, এবং পরে তারা যে ধরনের বিজ্ঞান চর্চা করছিলো সেখানেই ফিরে যেত। বিজ্ঞানের দর্শন থেকে কী ধরনের অন্তঃর্জ্ঞান আমরা পেতে পারি যেটা বিজ্ঞানীদের কাজে লাগবে। যেমন ধরুন যারা জীবজগৎকে ব্যাখ্যা করতে চাচ্ছে, তারা কিভাবে স্রেফ একটা ঘটনার পুণঃর্লিখন করার বদলে, ঘটনাটির একটা ব্যাখ্যামূলক বর্ণনা দাঁড় করাতে পারবে? এ ধরনের একটা তত্ত্বের থেকে আপনি কি আশা করেন, এবং কী ধরনের অন্তঃর্জ্ঞান বিজ্ঞানকে সেই পথে চালিত করতে পারে? যেমন স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মাঝে প্রচলিত আচরণবাদী (behaviorist) ধ্যান ধারণার বদলে।

চমস্কি: বিজ্ঞানের দর্শন খুব আগ্রহোদ্দীপক একটা ক্ষেত্র, কিন্তু আমি মনে করি বিজ্ঞানে এর তেমন কোনো অবদান নেই। বরং এটাই বিজ্ঞান থেকে শেখে। এটা বুঝতে চেষ্টা করে, বিজ্ঞান কি করছে, কেন তারা কিছু জিনিষ অর্জন করছে, বিজ্ঞানের ভুল পথ কোনগুলো, দেখি তো এগুলোকে লিপিবদ্ধ করে কিছু বোঝা যায় কি না। সে তুলনায় আমি মনে করি, বিজ্ঞানের ইতিহাস বরং গুরুত্বপূর্ণ। আমার মনে হয় বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি যা আগমনী বিজ্ঞানের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে, আমরা যদি বুঝতে পারি, ধরুন চৈতন্য বিজ্ঞানে আমরা এখনো গ্যালিলিও পূর্ব যুগে আছি। আমরা কী খুঁজতে হবে সেটাই জানিনা, গ্যালিলিও যেমন জানতেন না। এ থেকে আমাদের অনেক কিছু শেখার আছে। যেমন, আদি বিজ্ঞানের, (শুধুমাত্র গ্যালিলিয়ান নয়) একটা বিষ্ময়কর আবিষ্কার হচ্ছে- আপাত সরল জিনিসও হতবুদ্ধিকর হতে পারে।

যেমন ধরুন, আমি এই কাপটা ধরে আছি [পানির কাপ], এবং ধরুন পানিটা ফুটছে, জলীয় বাষ্প উপরের দিকে উঠতে থাকবে, কিন্ত আমি যদি ছেড়ে দেই, তাহলে কাপটা নিজের দিকে পড়বে। কিন্তু কেন কাপ নিচের দিকে পড়ছে, আবার জলীয়বাষ্প উপরের দিকে উঠছে? হাজার বছর ধরে এর একটা সন্তোষজনক উত্তর ছিলো: এরা এদের সহজাত অবস্থানের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

যেমন অ্যারিস্টিটলিয় পদার্থবিজ্ঞানে?

চমস্কি: হ্যাঁ ওটা অ্যারিস্টটলিয় পদার্থবিজ্ঞান। সবার সেরা আর মহত্তম বিজ্ঞানী ভেবেছিলেন এটাই উত্তর। কিন্তু গ্যালিলিও এই ব্যাপারটা নিয়ে নিজেকে ধাঁধায় পড়তে দেন। যখনই আপনি কোনো কিছু নিয়ে নিজেকে ধাঁধায় পড়তে দেবেন সাথে সাথেই দেখবেন আপনার সব অন্তঃর্জ্ঞানই ভুল প্রমাণিত হচ্ছে। যেমন ভারী বস্তু বনাম হালকা বস্তুর পতন ইত্যাদি। দেখবেন আপনার সকল অন্তঃর্জ্ঞান ভুল, যে দিকেই তাকাবেন শুধু ধাঁধা। বিজ্ঞানের ইতিহাস থেকে এইটা শেখার আছে। যে উদাহরণটা আমি আপনাকে আগে দিয়েছি সেটার কথাই ভাবুন, “Instinctively eagles that fly swim.” কেউ ভাবেনি এর মধ্যে কোনো ধাঁধা আছে— কেন ভাববে? কিন্তু ব্যাপারটা নিয়ে যদি আপনি ভাবেন দেখবেন এটা বেশ হতবুদ্ধিকর, একটা সোজাসাপ্টা হিসাব করার বদলে আপনি একটা জটিল হিসাব করছন। আপনি যদি এই কাপ পড়ে যাওয়ার মত ব্যাপার নিয়ে নিজেকে ধাঁধায় পড়তে দেন, এবং জিজ্ঞেস করেন, “কেন?” তাহলে এমন এক পথের দিকে ধাবিত হবেন যেখানে বেশ আগ্রোহদ্দীপক কিছু উত্তর আপনার জন্য অপেক্ষা করছে। যেমন, হয়তো সরল ক্রম আমাদের গাণনিক ব্যবস্থার অংশই নয়, যেটা মনের গঠন সম্পর্কে খুব শক্তিশালি একটা দাবি— কারণ এই দাবি মতে সরল ক্রম হয়তো আমাদের বহিঃপ্রকাশ ব্যবস্থার অংশ, যা গৌন। এবং এর ফলে অনেক দরজা খুঁলে যাবে। এটা অন্য আর সবকিছুর ক্ষেত্রেই সত্য।

আরেকটা উদাহরণ ধরুন: বিভাজন (reduction) আর সমন্বিত করণের (unification) ভিন্নতাটা লক্ষ্য করুণ। বিজ্ঞানের ইতিহাস এই ভিন্নতার কিছু খুব আগ্রহোদ্দীপক নিদর্শন পাওয়া যায়, যেমন রসায়ন ও পদার্থবিদ্যা। এবং আমি মনে করি এগুলো এখনকার চৈতন্য ও স্নায়ুবিজ্ঞানের চর্চায় খুবই প্রাসঙ্গিক।


[এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়েছে মুক্তমনা ব্লগ সাইট থেকে; যেখানে লেখক তানভীর তিনটি পর্বে তার অনুবাদটিকে সাজিয়েছেন। “জুমজার্নাল” পাঠকদের জানার সুযোগ করে দিতেই লেখাটি এই সাইটে প্রকাশ করছে। কোন প্রকার অভিযোগে আমরা লেখাটি সরিয়ে নিতে বাধ্য।]

এই সাক্ষাৎকারটি ইংরেজিতে পড়তে চাইলে – Noam Chomsky on Where Artificial Intelligence Went Wrong.

মূল সাক্ষাৎকারের লিঙ্ক

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here