নারী মুক্তি প্রসঙ্গে এম এন লারমা

0
62

নারীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা তথা নারী মুক্তির যে সংগ্রাম অদ্যাবধি দেশে দেশে চলে আসছে তা কেবলমাত্র নারী সমাজের একক সংগ্রাম নয়। সমস্ত নির্যাতিত, নিপীড়িত ও অধিকারহারা মানুষের মুক্তি সংগ্রামের সঙ্গে নারী মুক্তি সংগ্রাম অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পৃক্ত। তাই নারী অধিকার আদায়ের সংগ্রামকে আত্ননিয়ন্ত্রাণাধিকার আন্দোলন তথা বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের মুক্তি সংগ্রামের সাথে শামিল করা ব্যতীত নারীর প্রকৃত মুক্তি অর্জন হতে পারে না। পক্ষান্তরে নারীর প্রকৃত মুক্তি ব্যতীত জাতীয় মুক্তি তথা বিশ্বের নিপীড়িত ও শোষিত মানুষেরও মুক্তি অর্জিত হতে পারে না।

জুম্ম জনগণের জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত, নিপীড়িত ও বঞ্চিত জনতার পরম বন্ধু, মহান চিন্তাবিদ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা নারী অধিকার ও নারী মুক্তি প্রসংগে ছিলেন সদা সচেতন ও সোচ্চার। জুম্ম নারী জাগরণসহ বাংলাদেশের নিপীড়িত, শোষিত ও বঞ্চিত ব্যাপক নারী সমাজের মুক্তির জন্য তিনি আজীবন নিরলস সংগ্রামেও ব্যাপৃত ছিলেন। বাংলাদেশের নিষিদ্ধ পল্লীর অলিতে গলিতে গণিকাবৃত্তিতে নিয়োজিতা মানবিক অধিকার থেকে বঞ্চিত নারীসহ বাংলাদেশের আপামর নির্যাতিতা নারীদের মুক্তির কথা তিনি তৎকালীন গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদে বার বার তুলে ধরেছিলেন।

M N Larma
এম এন লারমা, ছবিঃ ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত

সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় নারী সমাজের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের নানা পরিবর্তন হয়েছে। সমাজ ও সভ্যতার ঊষালগ্নে নারীর স্থান ছিল মর্যাদাপূর্ণ। তখন ছিল না নারী-পুরুষের কোন ভেদাভেদ ও বৈষম্য। কিন্তু ক্রমবিকাশের এক পর্যায়ে নারী সমাজের উপর নেমে আসে পুরুষের চরম আধিপত্য ও নির্মম পারিবারিক দাসত্ব। মানব সমাজ যতই সভ্যতার দিকে ক্রমাগত অগ্রসর হতে থাকে ততই নারী সমাজের উপর দাসত্ব ও অধীনতা জঘন্যভাবে জেঁকে বসতে থাকে। জুম্ম নারী সমাজও এর থেকে ব্যতিক্রম নয়।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণ যুগ যুগ ধরে সামন্ততান্ত্রিক শাসন শোষণে নিষ্পেষিত হয়ে আসছে। এই সামন্ত শাসকগোষ্ঠী জুম্ম জনগণের জাতীয় বিকাশ ও স্বার্থের দিকে কোনদিন মনোযোগ দেয়নি। তাই জুম্ম সমাজে নারীর স্থান একেবারে নিকৃষ্ট পর্যায়ের পুরুষের ভোগ্যবস্তু, সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র ও পারিবারিক দাসী ছাড়া নারীদের আর অন্য কিছু ভাবা হয় না। আতুর ঘর, রান্না ঘর ও শয়ন ঘর – এই তিন কামরার গন্ডিবদ্ধ খাঁচায় তাদের সারা জীবন তিলে তিলে ক্ষয় হয়ে যায়। ঘরকন্নার কাজ যতই পরিশ্রমের হোক না কেন পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় তার কানাকড়িও মুল্য দেয়া হয়না। পাশাপাশি  পুরুষের সাথে তাদেরকে উৎপাদনের কাজেও অংশগ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়। কিন্ত উৎপাদন শক্তির উপর নারীর অধিকার সমাজে স্বীকৃত হয় না। যৌনসম্ভোগ, সন্তান লালন-পালন, ঘরকন্নার কাজ প্রভৃতি অমানুষিক পরিশ্রমের বিনিময়ে জুম্ম নারীরা পায় মাত্র ন্যূনতম জীবন-ধারনের খাদ্য ও লজ্জা নিবারণের ন্যূনতম বস্তু। তার অধিক নারীদের বিন্দুমাত্র অধিকার প্রদানের সামন্ততান্ত্রিক সমাজ বরদাস্ত করে না। অধিকন্ত সামান্য পদস্খলনে তাদের উপরে নেমে আসে অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন যার মাত্রা মৃত্যু পর্যন্ত গড়াতে পারে।

পশ্চাৎপদ ও রক্ষণশীল সামন্ততান্ত্রিক শাষন-শোষনের পাশাপাশি সমান্তরালভাবে জুম্ম জনগণের উপর যুগ যুগ ধরে চলে আসছে নির্মম বিজাতীয় শাসন-শোষন। বৃটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ – এই সাম্রাজ্যবাদী ও সম্প্রসারণবাদী শাসকগোষ্ঠীর হাতে জুম্ম জনগণের ভাগ্যের চাবিকাঠি পর্যায়ক্রমে পালাবদল হয়ে আসছে। স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর শুরু হয় উগ্র বাঙালি জাতীয়বাদ ও ইসলামিক সম্প্রসারণবাদ প্রতিষ্ঠার হীন ষড়যন্ত্র। ইসলামিক সম্প্রসারণবাদের জঘন্য পরিকল্পনা অতি দ্রুতগতিতে বাস্তবায়িত হতে থাকে। জুম্ম জনগণের জাতীয় অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব বিলোপসাধন এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামিক সম্প্রসারণবাদ বিস্তারের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর হাজার হাজার সদস্য পার্বত্য চট্টগ্রামে নিয়োগ করা হয় এবং পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ বাঙালি  মুসলমানকে বেআইনীভাবে বসতিদানের হীন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়। জুম্ম জনগণের উপর চলতে থাকে বেপরোয়া অত্যাচার, নির্যাতন, গণহত্যা, জেলজুলুম, অগ্নিসংযোগ, ধর্মান্তরকরণ প্রভৃতি শ্বেতসন্ত্রাস। এই সন্ত্রাসের অন্যতম শিকার হলো জুম্ম নারী সমাজ। সেনাবাহিনী ও অনুপ্রবেশকারী পুরুষেরা জুম্ম নারীদের উপর লোলুপ দৃষ্টি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকে। ফলে জুম্ম নারীদের উপর চলতে থাকে অমানুষিক অত্যাচার, নিপীড়ন, পাইকারী ধর্ষণ, ধর্ষনের পর হত্যা, পথে-ঘাটে ও অফিস আদালতে শালীনতাহানি, জোরপূর্বক বিবাহ, ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণ প্রভৃতি মানবতাবর্জিত জঘন্য কার্যকলাপ।

মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা জুম্ম নারীদের এই করুণ অবস্থা প্রত্যক্ষ করে খুবই পীড়িত হতেন, আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়তেন। একাধারে পারিবারিক জীবনে পুরুষের আধিপত্য এবং জাতীয় জীবনে ইসলামিক সম্প্রসারণবাদের চরম শিকার এই দ্বৈত অত্যাচার নিপীড়নের মাঝে এম এন লারমা জুম্ম নারী সমাজের মধ্যে এক দুর্বার সংগ্রামী শক্তি প্রত্যক্ষ করতেন। জুম্ম নারী সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত করার অপরিহার্যতা তিনি গভীরভাবে অনুভব করতেন।

সামন্ততান্ত্রিক জুম্ম সমাজ নারীদের উপর এযাবৎ কেবল শোসনের স্টিম রোলার চালিয়ে এসেছে, নারী সমাজকে কেবল ঘুম পাড়িয়ে এসেছে, সর্বোপরি নারীদের উপর ইসলামিক সম্প্রসারণবাদের অত্যাচার নিপীড়ন নিরবে নিভৃতে প্রত্যক্ষ করে এসেছে। কিন্তু তাদের মুক্তির কথা, তাদের অধিকারের জয়গান কেউই কোন দিন শোনাতে এগিয়ে আসেনি। সত্তর দশকে বর্তমান নেতা সন্তু লারমাকে সাথে নিয়ে এম এন লারমাই সর্বপ্রথম জুম্ম নারী সমাজের মুক্তির বাণী উচ্চারণ করলেন। জুম্ম নারী সমাজকে পুরুষদের আধিপত্য ও পারিবারিক দাসত্ব থেকে মুক্তির মহান প্রয়াসে অধিকার সচেতন করে সংগঠিত করার রাজনৈতিক তাগিদ অনুভব করলেন। সর্বোপরি তিনি অনুভব করলেন – সমাজের অর্ধেক অংশই নারী। এই অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে অধিকার সচেতন করে উদ্বুদ্ধ করতে না পারলে জাতীয় মুক্তি ত্বরান্বিত হতে পারে না।

পক্ষান্তরে একমাত্র জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে নারী সমাজের সক্রিয় অংশগ্রহনের মাধ্যমেই প্রকৃত নারী মুক্তির পথ উন্মুক্ত হতে পারে। অতএব, তিনি জুম্ম নারীর মরণ ফাঁদ ইসলামিক সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনসহ আত্ননিয়ন্ত্রনাধিকার আন্দোলনে জুম্ম নারী সমাজকে সামিল করার মহান উদ্যোগে প্রয়াসী হলেন। শুরু হলো জুম্ম নারী সমাজকে সংগঠিত করার মহান উদ্যোগ। নারীর অধিকার ও এই অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচারণার মধ্য দিয়ে জুম্ম নারী সমাজকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ  ও সামিল করার প্রচেষ্টা অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে। বস্তুতঃ জুম্ম নারী জাগরণ সংঘবদ্ধভাবে শুরু হয় সত্তর দশকের মাঝামাঝি থেকে।

সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত স্বাধীন বাংলাদেশে জুম্ম জনগণের স্বায়ত্বশাসনের  নববাণী তখন পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সর্বত্র ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। ১৯৭২ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি  গঠিত হলো জুম্ম জনগণের একমাত্র রাজনৈতিক পার্টি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। জুম্ম জনগণের আলোকবর্তিকা ও গণপ্রতিনিধি এম এন লারমা জুম্ম জনগণের স্বায়ত্তশাসন তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের ন্যায়সঙ্গত দাবী হাতে নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে গণপরিষদ ও জাতীয় সংসদের ভিতরে ও বাইরে আন্দোলন করছিলেন। কিন্তু তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী জুম্ম জনগণের ন্যায্য অধিকারসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের পৃথক শাসনের অস্তিত্ব চিরতরে লুপ্ত করে দেয়ার ষড়যন্ত্র করতে থাকে। ফলশ্রুতিতে একদিকে জুম্ম জনগণের উপর নেমে আসে নির্মম নির্যাতন-নিপীড়ন, অন্যদিকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পথ রুদ্ধ করে দেয়া হতে থাকে। তাই শুরু হল সশস্ত্র আন্দোলনের সতর্ক উদ্যোগ। বর্তমান নেতা জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা ওরফে সন্তু লারমার মুখ্য ভূমিকায় ১৯৭৩-এর ৭ জানুয়ারি গঠিত হলো জনসংহতি সমিতির সশস্ত্র শাখা (শান্তিবাহিনী)। তারই পাশাপাশি জুম্ম নারীদের সংগঠিত করে একটি শক্তিশালী নারী সংগঠন গঠনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চললো। ১৯৭৩ সালের প্রারম্ভে এক পর্যায়ে মহিলা সংগঠনের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে অগ্রগামী জুম্ম মহিলাদের নিয়ে একটি সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয় এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক সাংগঠনিক কমিটি গটিত হতে থাকে। আঞ্চলিক কমিটির সদস্যগণ পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে জুম্ম নারী সমাজকে সংগঠিত করার কাজে নেমে পড়লেন। অবশেষে জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে ২১ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৫ সনে “পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি” নামে জুম্ম নারীদের একটি নিজস্ব রাজনৈতিক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটলো।

Jyotiprova Larma and Madhobilota Larma
পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য  ১. জ্যোতিপ্রভা লারমা (বাম পাশের জন) ২. মাধবীলতা চাকমা (ডান পাশের জন)

পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির ইশতেহারে বলা হয়েছে যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজব্যবস্থা মূলত সামন্ততান্ত্রিক পিতৃপ্রধান মতাদর্শ ও ব্যবস্থার উপর প্রতিষ্ঠিত। তাই পার্বত্য চট্টগ্রামের নারীজাতি সামন্তবাদী, সাম্রাজ্যবাদী ও ইসলামিক সম্প্রসারণবাদী শাসন, শোষণ, নির্যাতন, নিপীড়ন ছাড়াও পুরুষদের দ্বারা শাসিত হওয়ার ফলে অকথ্য নির্যাতন, নিপীড়ন ও অমানুষিক অত্যাচার ভোগ করতে বাধ্য হচ্ছে। নারীজাতি পরনির্ভরশীল হওয়াতে সমাজজীবনে অপাংক্তেয়া, অবহেলিত ও ভোগ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অথচ নারী ও পুরুষ যদি সম্মিলিতভাবে সংগ্রামমুখী না হয় তাহলে সমাজজীবন হতে সকলপ্রকারের শোষণ ও ভেদাভেদ নির্মূল করার কোন কল্পনা করা যায় না। নারীর সৃজনী প্রতিভা ও সংগ্রামী ভূমিকা যে পুরুষের সংগ্রামী জীবনে অপরিহার্য একথা বিশ্বের দেশে দেশে বারবার প্রমাণিত হয়েছে। পুরুষের পাশাপাশি নারী জাতিকে অগ্রসর করতে না পারলে কোন দেশে বা জাতিকে সকল প্রকারের জাতিগত ও শ্রেণীগত অন্যায় শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত করা অসম্ভব। তাই নারী জাতিকে দেশ ও জাতির উন্নয়নকল্পে ও গঠনমূলক সংগ্রামে অংশীদার করানোর মাধ্যমে বিশ্বের নিপীড়িত ও নির্যাতিত জাতি ও সর্বহারা মানুষের সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে ভূমিকা পালন করার পূর্ণ সুযোগ উন্মুক্ত করে দিতে হবে।

আজ সারা বিশ্বে নারী জাতি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয়ক্ষেত্রে সকলপ্রকারের নির্যাতন, নিপীড়ন ও শোষণের নাগপাশ ছিন্ন করার লক্ষে সংগ্রাম করে চলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম নারী সমাজ এর থেকে ব্যতিক্রম থাকতে পারে না। পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জাতির অধিকাংশ হচ্ছে নারী। সুতরাং এই নিপীড়িত, নির্যাতিত, বঞ্চিত, লাঞ্চিত ও শোষিত নারী সমাজকে গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল চিন্তাধারায় উদ্বুদ্ধ ও সুসজ্জিত করে একদিকে সামন্ততান্ত্রিক ও পিতৃপ্রধান মতাদর্শ ও ব্যবস্থার নিপীড়ন ও শোষণ এবং অন্যদিকে সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, উগ্র বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ইসলামিক সম্প্রসারণবাদের ধারক-বাহক বাংলাদেশ সরকারের শাসন ও শোষণের অবসানকরণার্থে সর্বোপরি জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলন অনিবার্যভাবে ক্রমাগত এগিয়ে থাকে।

১৯৭৫ সালে ১০ আগস্ট, শনিবার সাংগঠনিক কমিটির উদ্যোগে ও জনসংহতি সমিতির নেতৃত্বে মহিলা সমিতির প্রথম প্রতিনিধি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। মহিলা সমিতির অন্যতমা নেতৃস্থানীয় সদস্যা শ্রীমতি মিনুপ্রু মারমা এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। এ সম্মেলনে বিভিন্ন আঞ্চলিক কমিটি থেকে ৬৫ (পঁয়ছট্টি) জন প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেন। পার্টির পক্ষ থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বে চার সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রতিনিধিদল এ সম্মেলনে যোগদান করেন। এ সম্মেলনে একটি পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়। সভানেত্রী হিসেবে মাধবীলতা চাকমা, সাধারণ সম্পাদিকা হিসেবে জয়শ্রী দেওয়ান ও সাংগঠনিক সম্পাদিকা হিসেবে দীপ্তি চাকমা সর্বসম্মতিক্রমে নির্বাচিতা হন। তৎপরে চির অবহেলিত পশ্চাৎপদ জুম্ম নারী সমাজকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ করার কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন অঞ্চলে জোরদার হতে থাকে। ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বর মাস সর্বপ্রথম ৩৫ (পঁয়ত্রিশ) জন মহিলা সমিতির সদস্যা নিয়মিতভাবে সামরিক শাখায় যোগদান করেন। তারা সশস্ত্র গেরিলা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। জুম্ম নারীদের সশস্ত্র বাহিনীতে যোগদান জুম্ম নারী মুক্তি তথা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে এক উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

নারীমুক্তি আন্দোলনের এই অগ্রযাত্রা কিন্তু সহজ-সরল পথে এগোয়নি। নানা বাধা বিপত্তির মধ্য দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে এগোতে হয়েছে। রক্ষণশীল জুম্ম সমাজ নারীসমাজের এই বহির্মুখী পদচারণা সহজভাবে মেনে নিতে পারে নি। সমাজে নানা কটুবাক্য ও উপহাস জুম্ম নারীদের শুনতে হয়েছে। মহিলা কর্মীদের নানা অভিধায় আখ্যায়িত হতে হয়েছে। মাতাপিতা, অভিভাবক, স্বামী সর্বোপরি পুরুষের নানা বাধার সম্মুখীন হতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও এম এন লারমা ও সন্তু লারমা সামন্ত সমাজের প্রতিক্রিয়াশীলতা ও রক্ষণশীলতা উপেক্ষা করে অত্যন্ত সুকৌশলে নারীদের আত্মনিয়ন্ত্রনাধিকার আন্দোলনে সমাবেশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিলেন।

প্রিয়নেতা এম এন লারমা বরাবরই প্রতিটি বিষয়ে আভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রকে সর্বাধিক প্রাধান্য দিতেন। তাই জুম্ম নারীদের কেন অধিকারের জন্য আন্দোলন করতে হবে, জুম্ম নারীদের উপর অন্যায় অবিচারের প্রকৃত কারণ কি, নারী সমাজরে উপর যে শোষণ নিপীড়ন চলছে তা থেকে মুক্তির প্রকৃত উপায় কি, কেন জুম্ম নারীদের জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব ও জন্মভূমির অস্তিত্ব সংরক্ষণের সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে সামিল হতে হবে ইত্যাদি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর যেন মহিলা সমিতির নেতৃবৃন্দ তথা জুম্ম নারী সমাজ নিজেরাই খুঁজে পেতে পারে সেভাবে তিনি তাদের প্রশ্ন করতেন, তাদের সাথে আলোচনা করতেন। কারণ নারী সমাজের মধ্যে যদি অধিকার সচেতনতা গড়ে না উঠে তাহলে প্রকৃত নারী মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে না।

স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে নির্যাতন তথা পুরুষ কর্তৃক নারীকে নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন বরাবরই সোচ্চার। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে তিনি সময় ও সুযোগ পেলে প্রায় পুরুষ কর্মীদের সাথে আলোচনা করতেন। কেননা নারী অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে নারী সমাজের পাশাপাশি পুরুষদেরও সমতালে এগিয়ে আসার অপরিহার্যতা তিনি গভীরভাবে উপলব্দি করতেন। তিনি এটাও ভালোভাবে জানতেন যে, শেণীবিভক্ত সমাজে বিদ্যমান নারী নিপীড়ন ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে পুরুষ সমাজ ও নারী সমাজকে সচেতন করার কাজ সহজসাধ্য নয়। সমাজের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা, রক্ষণশীলতা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপণা থেকে উদ্ভূত নানা সমস্যা সহজে দূর করা সম্ভব নয়। সামাজিক কাঠামো ও প্রচলিত উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তনের মাধ্যমেই তবে নারী মুক্তির বদ্ধ দুয়ার খোলা সম্ভব হতে পারে।

আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলনের গতি যতই জোরদার হতে থাকে শাসকগোষ্ঠীর দমন-পীড়নের মাত্রাও তত বৃদ্ধি লাভ করে থাকে। ১৯৭৬ সাল হতে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার আন্দোলন জোরদার হলে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামে হাজার হাজার সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য নিয়োগ করতে থাকে। ফলে সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক সন্ত্রাসসহ হত্যা, লুন্ঠন, ধরপাকড়, অগ্নিসংযোগ, নারী ধর্ষণ প্রভৃতি মানবতা বিরোধী কার্যকলাপ চরমভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। বিশেষত: জনসংহতি সমিতির পুরুষ ও মহিলা কর্মীদের ধরপাকড় এবং গ্রেফতারকৃত কর্মীদের উপর অমানুষিক নির্যাতন এবং আটকাবস্থায় হত্যা করা হতে থাকে। এমতাবস্থায় মহিলা কর্মীদের নিরাপত্তা ও চলাফেরা এবং মহিলা সমিতির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে আন্দোলনের এক পর্যায়ে মহিলা সমিতির কার্যক্রমের ক্ষেত্র ধীরে ধীরে সীমিত হতে থাকে। কিন্তু ৭০ দশকে যে নারী জাগরণের উত্তাল ঢেউ পার্বত্য চট্টগ্রামের আনাচে-কানাচে উদ্বেলিত হয়ে উঠে তার ফলে জুম্ম নারী মুক্তি অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। জুম্ম নারী সমাজের এক ক্ষুদ্র অংশের মধ্যে অধিকার সচেতনতা এবং কঠোর সংগ্রামী প্রত্যয় সৃষ্টি হতে পেরেছে।

সেই সুত্র ধরে এটা নি:সন্দেহে বলা যেতে পারে যে সত্তর দশকের প্রারম্ভ থেকে জুম্ম নারী সমাজে যে জাগরণের ঢেউ জেগেছিলো, যে সংগ্রামী প্রেরণার ধারা শুরু হয়েছিলো সে জাগরণের ঢেউ ও সংগ্রামী ধারা শাসক-শোষক গোষ্ঠীর নানাবিধ ষড়যন্ত্র ও সামরিক সন্ত্রাসের দ্বারা দমন ও নি:শেষ করা সম্ভব হয় নি। আজো জুম্ম নারী সমাজের একটি অংশ যারা উপনিবেশিক শাসন-শোষণ ও পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার পারিবারিক দাসত্ব থেকে নারী সমাজকে মুক্তি দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ সেই অগ্রগামী ও অধিকারকামী নারীসমাজ পুরুষের পাশাপাশি জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে সামিল রয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে পরিবর্তীত অবস্থার প্রেক্ষাপটেও যেমনি পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতি নানা কৌশল অবলম্বন করে স্বীয় দ্বায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সদা সচেষ্ট ও সক্রিয় রয়েছে তেমনি সত্তর দশকের জুম্ম নারী সমাজের জাগরণের ধারাবাহিকতা হিসেবে ১৯৭৮ সালে ৮ই মার্চ গৌরী চাকমা ও শিলা চাকমার নেতৃত্বে “হিল উইমেন্স ফেডারেশন” নামে আর একটি নারী সংগঠন আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়ে উঠে। ১৯৯৫ সালে ১৫ জানুয়ারী এই সংগঠনের প্রথম জাতীয় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তখন থেকেই এই মহিলা সংগঠন নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকারের সামরিক সন্ত্রাসের দ্বারা পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্ম নারী জাতির উপর যে নির্যাতন নিপীড়ন চলছে তার বিরুদ্ধেও এই সংগঠন দেশে-বিদেশে সোচ্চার হয়ে নারী অধিকার প্রতিষ্ঠায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালনে প্রয়াসী হয়েছে। ১৯৯৫ সালের ৪ সেপ্টেম্বর থেকে বেইজিং এ অনুষ্ঠিত বিশ্ব নারী সম্মেলনে “হিল উইমেনস ফেডারেশন” এর দুই সদস্যা বিশষ্টি একটি বেসরকারি প্রতিনিধিদল যোগদান করে জুম্ম নারীদের অবস্থা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেন।

অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইউরোপের নবজাগরণের যুগে যুক্তিবাদ ও মানবতাবাদের ভাবাদর্শে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সমানাধিকারের আন্দোলন শুরু হয়। নারীদের সমানাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের প্রতি শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে মানুষের শুভবুদ্ধি ও সম্ভাবনা জাগ্রত করার মানসে নারী আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা আন্দোলনের প্রারম্ভে মনে করা হলেও কিন্তু কালক্রমে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইহা স্পষ্ট হয়ে উঠতে থাকে যে, পকৃতপক্ষে নারী আন্দোলন শুধুমাত্র নারী সমাজের জন্য হতে পারে না বরঞ্চ ইহা সমগ্র সমাজের জন্যই ও সমগ্র সমাজের স্বার্থে এই আন্দোলন। অতএব নারী আন্দোলনের সফলতা ব্যর্থতা সবই হচ্ছে সমগ্র সমাজের সাফল্য অসাফল্য। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের পর থেকেই বিংশ শতাব্দীর অন্তিম দশকের মধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে সংঘটিত শ্রেণী সংগ্রাম, জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার সংগ্রাম, জীবন জীবিকা ও গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নারী জাতি সাংগঠনিক উপায়ে অনেক সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে বটে কিন্তু বিশ্বের সমগ্র নারী সমাজের অধিকাংশই এখনো অর্থনৈতিক অধিকার (স্বাধীনতা) বঞ্চিত হয়ে রয়েছে। বস্তুত: পুরুষের উপর অর্থনৈতিকভাবে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল নারীরা কখনোই সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত অধিকারকে কাজে লাগাতে পারে না। তাই নারী জাতি আজো পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পারিবারিক দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য হচ্ছে ও সমানাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে সকলক্ষেত্রে নিপীড়িত ও লাঞ্চিত হচ্ছে।

১৯৪৫ সালে জাতিসংঘের সনদে নারীর সমানাধিকার ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ১৯৭৬-৮৬ সালকে নারী দশক হিসেবে জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু জাতিসংঘের এসব যুগান্তকারী ঘোষণা নারী জাতির মুক্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তেমন কোন কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে নি। বস্তুত বিশ্বের দেশে দেশে নারী আন্দোলন চলে আসছে। চলছে বিশ্বব্যাপী নারী আন্দোলন। কিন্তু বিশ্বের দেশে দেশে যে গণতান্ত্রিক নারী আন্দোলন চলছে তা সমাজের কোন শ্রেণীর স্বার্থে ও কোন শ্রেণীর বিরুদ্ধে তা স্পষ্টভাবে বুঝতে হবে। তা না হলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যে নারী আন্দোলন চলে আসছে তার প্রকৃত তাৎপর্য মূল্যায়ন করা যাবে না। নারী আন্দোলনকে অবশ্যই একটা গণআন্দোলন হিসেবে এগিয়ে নিতে হবে। নারীদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি অবশ্যই বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাবে না। নারীর অধিকার অর্জনের অর্থ পুরুষের অধিকার খর্ব করা নয়। নারী পুরুষ নির্বিশেষে শাসক-শোষক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে আর নারী পুরুষ নির্বিশেষে শোষিত ও নিপীড়িত জাতি ও মানুষের জন্যই এই নারী অন্দোলন।

নারীদের বৈষম্যের কারণ হিসেবে পুরুষদের চিহ্নিত করা, পুরুষ কর্তৃক নারীর উপর যৌন নির্যাতনকে সামাজিক বৈষম্যের মূল কারন হিসেবে ধরে নেয়া, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার অর্জন করাই নারী আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য মনে করা এবং পুরুষের আধিপত্যবাদের বিরোধিতা করাই নারী আন্দোলনের মুখ্য উদ্দেশ্য হিসেবে বিবেচনা করা ইত্যাদি বিভ্রান্তিকর ও হঠকারী দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধে প্রতিটি দেশের নারী আন্দোলনের সংঘবদ্ধভাবে বিরোধিতা করা বাঞ্চনীয়। নারী আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হতে হবে নারীদের কাজের উৎপাদনের মধ্যে টেনে আনা ও অর্থনৈতিক অধিকার প্রদান করা, পারিবারিক দাসত্ব থেকে নারীদের মুক্ত করা এবং রান্নাঘর ও আতুর ঘরের অবমাননাকর কাজ ও অধীনতা থেকে নারীদের মুক্ত করা। এই লক্ষ্য সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতিকে অন্যান্য গণতান্ত্রিক জুম্ম মহিলা সংগঠনসমূহ সাথে নিয়ে জুম্ম নারী সমাজের মুক্তি অর্জনে বিপ্লবী আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। তবেই নারী মুক্তি প্রশ্নে এম এন লারমার স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে।


লেখকঃ পল্লবী 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here