ভারত বিভাগ ও পার্বত্য চট্টগ্রাম – একটি ঐতিহাসিক দলিল

0
49

বিগত রাজ্য সরকারে কংগ্রেস শাসিত মিজোরামের মাননীয় মন্ত্রী শ্রী নিরূপম চাকমার বদান্যতায় ‘হেল্‌প্‌ ফর রিসার্চারস’ নামক একটি ওয়েবসাইট থেকে এই ঐতিহাসিক ও জনগুরুত্বপূর্ণ দলিলটির খোঁজ পাওয়া সম্ভব হয়েছে। এটি ভারত বিভাগের প্রাক্কালে স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ-এর নেতৃত্বাধীন বাউন্ডারি কমিশনের ‘ভারত-পাকিস্তানের সীমানা নির্ধারণ’ সংক্রান্ত রোয়েদাদ বা ফয়সালার ব্যাপারে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকের কার্যবিবরণী। ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধি এবং সদ্য বিভক্ত ভারত ও পাকিস্তানের জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্বরাজনীতি এবং ভারত উপমহাদেশ সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু গবেষকদের জন্যে তো বটেই, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ এই অঞ্চলের আদিবাসীদের জন্যেও তাদের ভাগ্য বা দুর্ভাগ্য নির্ধারণকারী সেই সভার দলিলটি একটি চেতনা উজ্জীবক ও চেতনা পরিশোধক বটিকা হিসেবে অনন্য বিবেচিত হওয়ার দাবি রাখে। অমূল্য এই ঐতিহাসিক দলিলটি সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার জন্য আমরা বিগত মিজোরাম রাজ্য সরকারের মাননীয় মন্ত্রী শ্রী নিরূপম চাকমার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আশা করি ভবিষ্যতেও আমাদের জনকল্যাণমূলক ও সৃজনশীল উদ্যোগগুলোতে আমরা তাঁর সহৃদয় সহযোগিতা ও সমর্থন পাবো। ইংরেজী ভাষায় মূল দলিলটি পড়তে আগ্রহীদের জন্য ওয়েবসাইটে সেটি খুঁজে পাওয়ার সূত্রটি নীচে উল্লেখ করা হলোঃ Bl.uk > Help for researchers Home > Find help by region > Asia > India > Indian Independence > Indian Independence: Partition of India and Pakistan

মূল দলিলঃ

ভারতের স্বাধীনতা লাভঃ ভারত বিভাগ, সূত্র ৯

ভারত এবং পাকিস্তানের মধ্যে অবস্থিত বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমানা নির্ধারণ করার লক্ষ্যে গঠিত বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্তগুলোকে (এওয়ার্ডস্‌) বিবেচনার জন্য ১৬ আগস্ট ১৯৪৭ নয়াদিল্লীস্থ গভর্নমেন্ট হাউজে অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণী।

স্মারক নংঃ [OR: L/P&J/10/117]

বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্তগুলোকে বিবেচনার জন্য আহুত এই সভায় উপস্থিত ভারতীয় নেতৃবৃন্দ সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাপারে অত্যন্ত সমালোচনারমুখর ছিলেন। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের ব্যাপারে তীব্র বাদানুবাদ চলে। এই অঞ্চলে হিন্দু জনগণের ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। তাদেরকে ভারতের সাথে অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু একের পর এক যুক্তি তুলে ধরেন। তবে এক্ষেত্রে যা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল সেটি হলো, পার্বত্য অঞ্চল ও পূর্ববঙ্গের মধ্যে একটি ঘনিষ্ঠ ভৌগলিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান। অন্যদিকে আসামের সাথে এই অঞ্চলের সঠিক কোন যোগসূত্র নেই। ফলে স্যার র‍্যাডক্লিফ অঞ্চলটিকে পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দেন। পাঞ্জাব হলো সেরকম আরেকটি বিতর্কিত এলাকা। এই অঞ্চলের জনগণের একটি বিরাট অংশ হলো শিখ সম্প্রদায়ভুক্ত। অঞ্চলটির সাথে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় সম্পর্ক রয়েছে। শিখ সম্প্রদায়ের জনৈক নেতা তারা সিং, দেশ বিভাগ করতে হলে শিখদের জন্যও একটি আলাদা রাষ্ট্র দাবি করে বসেন। তাঁর সে দাবি গ্রাহ্য হয়নি এবং পাঞ্জাব অঞ্চলকে মুসলিম এবং অ-মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে দুইভাগে ভাগ করা হয়। সেক্ষেত্রে প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রাকৃতিক সীমারেখা এবং যোগাযোগ, পানি ও সেচ ব্যবস্থা প্রভৃতি বিষয়কেও বিবেচনায় নেওয়া হয়। শিখরা পাঞ্জাবের ভারতীয় অংশে চলে আসেন এবং দেশ বিভাগের পরপরই সেখানে আলাদা শিখরাষ্ট্র গঠনের দাবিটিকে পুনরুজ্জীবিত করেন।

Bengal and Assam religion statistics final boundary
১৯৪১ সালের ভারতবর্ষ এবং ধর্মীতায় বিভক্ত মানচিত্র, ছবিঃ southasiablog.wordpress.com
গোপনীয়

বাউন্ডারি কমিশনের রোয়েদাদ বা সিদ্ধান্ত

শনিবার, ১৬ আগস্ট, বিকাল ৫ ঘটিকায় গভর্নমেন্ট হাউজ, নয়াদিল্লীতে অনুষ্ঠিত একটি সভার কার্যবিবরণী।

উপস্থিতিঃ

মিস্টার মাউণ্টব্যাটেন – ভাইকাউণ্ট, বার্মা ও গভর্নর জেনারেল, ভারত। পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু – প্রধানমন্ত্রী, ভারত। মিস্টার লিয়াকত আলী খান – প্রধানমন্ত্রী, পাকিস্তান। সরদার বল্লভভাই প্যাটেল – স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, ভারত। মিস্টার ফজলুর রহমান – মিনিস্টার অব দি ইন্টেরিয়র, পাকিস্তান। সরদার বলদেব সিং – প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, ভারত। মিস্টার মোহাম্মেদ আলী – কেবিনেট সেক্রেটারি, পাকিস্তান। রাও বাহাদুর ভি. পি. মেনন – স্বরাষ্ট্র সচিব ,ভারত। লে. কর্নেল. ভি. এফ. ইরাকাইন-ক্রুম – ভারতের গভর্নর জেনারেলের কনফারেন্স সেক্রেটারি।

(১) সভাটি বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্তগুলোকে বিবেচনায় নেয়। সিদ্ধান্তগুলোর অনুলিপি ঐদিন সকালে জয়েণ্ট ডিফেন্স কাউন্সিল সভার পরে মন্ত্রীদেরকে প্রদান করা হয়।

বাংলা অঞ্চলঃ

(২) পন্ডিত নেহেরু জানান যে, বাউন্ডারি কমিশনের শর্তাবলীর (Terms of Reference) অধীনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ববঙ্গের সাথে জুড়ে দেওয়া যে সম্ভব হবে সেটি তাঁর বিবেচনাতে কখনও আসেনি। প্রখ্যাত সব আইনবিদরাও তাঁর সেই দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত পোষণ করেছিলেন। পার্বত্য এই অঞ্চলটি একটি শাসন বহির্ভূত এলাকা ছিল এবং বেঙ্গল কাউন্সিলে এর কোন প্রতিনিধিত্ব ছিলনা। তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে তাঁদের সাথে দেখা করতে আসা পাহাড়ি প্রতিনিধিদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, এই অঞ্চলটি পাকিস্তানভুক্ত হওয়ার কোন প্রশ্নই আসেনা। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনসংখ্যা কম হলেও (মোটামুটিভাবে আড়াই লক্ষ) তাদের ৯৭% মানুষ বৌদ্ধ এবং হিন্দু। এসব মানুষ যে নিজেরাই  ভারতের অংশ হতে আগ্রহী হবেন সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিলনা। ধর্ম এবং সংস্কৃতির বিবেচনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অংশ হওয়া উচিত। তাদেরকে স্পর্শ করার কোন অধিকার/এখতিয়ার স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফের নেই।

(৩) স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ কেন পার্বত্য চট্টগ্রামকে পূর্ববঙ্গের সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন গভর্নর জেনারেল তার কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বিশেষভাবে অর্থনৈতিক যোগসূত্রটির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন যেটি চট্টগ্রাম এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে একসাথে জড়িয়ে রেখেছে। তিনি চট্টগ্রাম বন্দর এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা কর্ণফুলী নদীর যথাযথ তদারকির উপর গুরুত্ব আরোপ করেন।

(৪) মিস্টার ফজলুর রহমান তাঁর অভিমত দিতে গিয়ে বলেন, চট্টগ্রাম জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। তাঁর মতে, এই পার্বত্য অঞ্চলকে (বাউন্ডারি কমিশনের) শর্তাবলীর অধীনে পূর্ববঙ্গের সাথে জুড়ে দেওয়া প্রশ্নাতীতভাবে অনুমোদনযোগ্য। বাস্তবে শর্তাবলীর ‘নৈকট্য’ (Contiguity) অনুচ্ছেদটি পশ্চিমবঙ্গের সাথে এই অঞ্চলকে জুড়ে দেওয়ার বিষয়টি সমর্থন করতো না।

(৫) গভর্নর জেনারেল বলেন, আসলে এটি স্যার ফ্রেডেরিক বারো’রই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, পূর্ববঙ্গের সঙ্গে রাখা না হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমগ্র অর্থনীতি ক্ষতির সম্মুখিন হবে। তবে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, স্যার ফ্রেডেরিক স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফকে এ বিষয়ে কোন মতামত দেননি। তাই এই সিদ্ধান্তটিকে তিনি প্রভাবিত করেছেন, সেটি বলা যাবে না।

(৬) গভর্নর জেনারেল সম্ভাব্য একটি সমঝোতা বিষয়ে তাঁর পরামর্শ তুলে ধরেন। সেটি হলো, পূর্ববঙ্গকে নদীর দুই তীরের পার্বত্য অঞ্চলের একটি অংশ ছেড়ে দেওয়ার মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীর উজানের পানি সুরক্ষিত রাখা এবং অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অবশিষ্ট অংশের প্রশাসনের ভার ভারতের হাতে ন্যস্ত করা।

(৭) এই পরামর্শটি উভয় পক্ষের কাছে সন্তোষজনক সমাধান বলে বিবেচিত হয়নি। পন্ডিত নেহেরুর অভিমত ছিল যে, সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্ব ভারতের গ্রহণ করা উচিত। নদীর উভয় তীরে কিছু অংশ পাকিস্তানকে ছেড়ে দেওয়া হলে দুই ভাগে বিভক্ত করা হবে। অন্যদিকে পার্বত্য চট্টগ্রামকে ভারতের হাতে দেওয়া হলে দুই ভাতৃপ্রতীম দেশের সরকারের মধ্যে একটি যুতসই চুক্তি সম্পাদন করা যাবে, যার মাধ্যমে পাকিস্তান প্রত্যাশিত সকল সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে।

(৮) পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মিস্টার লিয়াকত আলী খান জানান যে, তিনি শুধুমাত্র এই অঞ্চলটির জন্য প্রযোজ্য কোন সমন্বয়মূলক পরামর্শ বিবেচনায় নিতে অপারগ। উভয় কমিশনের সিদ্ধান্তগুলোকে অবশ্যই সামগ্রিকভাবে দেখতে হবে। যদি সেটি করা না হয় তাহলে দেখা যাবে যে, স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ তাঁর কমিশনের শর্তাবলীর মৌলিক ভিত্তিকে সম্পূর্ণরূপে অগ্রাহ্য করেছেন। অধিকন্তু, পার্বত্য চট্টগ্রামই হলো পূর্ববঙ্গে জলবিদ্যুৎ পাওয়ার একমাত্র উৎস।

(৯) অতঃপর গভর্নর জেনারেল উভয় পক্ষে কিছু সুনির্দিষ্ট অঞ্চল বিনিময়ের ব্যাপারে দুই সরকারকে সম্মত হওয়ার পরামর্শ দেন। সেটি হলো, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং এর বিনিময়ে কমিশন কর্তৃক ইতিমধ্যে ভারতকে দিয়ে দেওয়া কিছু মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত অঞ্চল পাকিস্তান পাবে।

(১০) মিস্টার লিয়াকত আলী খান জোর দিয়ে বলেন যে, কমিশনের সকল সিদ্ধান্তই সামগ্রিকভাবে পাকিস্তানের প্রতি অত্যন্ত বিরূপ ভাবাপন্ন। সে কারণে তিনি এখানে যেসব পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে তার ভিত্তিতে সামান্যতম কোন সংশোধনী বা পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে অপারগ।

(১১) মিস্টার ফজলুর রহমান দার্জিলিং ও জলপাইগুড়ি জেলাকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার বিরুদ্ধে জোর প্রতিবাদ জানান। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে স্যার সিরিল র‍্যাডক্লিফ কমিশনের শর্তাবলীর মূলনীতিকে লঙ্ঘন করেছেন।

পাঞ্জাব অঞ্চলঃ

(১২) পন্ডিত নেহেরু অভিমত দেন যে, বাউন্ডারি কমিশনের পাঞ্জাব বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলো শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাঁরা বিশেষভাবে জটিল একটি সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন।

(১৩) সরদার বলদেব সিংও মনে করেন, সিদ্ধান্তগুলো শিখদের মনে অত্যন্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।

(১৪) মিস্টার লিয়াকত আলী খান বলেন যে, বিষয়টি মুসলমানদের মাঝেও একই ধরণের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি মনে করেন ভারতের নেতৃবৃন্দ পূর্ব পাঞ্জাবের শিখদের অধিকারের পক্ষে যেভাবে দাঁড়িয়েছেন ঠিক সেভাবে পশ্চিম পাঞ্জাবের শিখদের অধিকারের জন্য দাঁড়ানোও তাঁর দায়িত্ব। তিনি শিখদের জন্য পরিপূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা অনুমোদন করা হবে বলে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।

(১৫) সরদার প্যাটেলের অভিমত হলো, ব্যাপক পরিমাণে জনসংখ্যা হস্তান্তরই হচ্ছে পাঞ্জাব বিষয়ক সিদ্ধান্তগুলোর ক্ষেত্রে একমাত্র সমাধান।

(১৬) গভর্নর জেনারেল জানান যে, তিনি মিস্টার জিন্নাহ্‌’র সাথে নানকানা সাহিব সম্পর্কে কথা বলেছেন। মিস্টার জিন্নাহ্‌ বলেছেন, বিষয়টি তাঁর মনেও আগে থেকে ছিল। সেখানে তাদের গুরুদুয়ারাটির জন্য প্রয়োজনীয় যে কোন ধর্মীয় প্রতিশ্রুতি শিখদের কাছে ব্যক্ত করার কথা তিনি ভেবে রেখেছিলেন। গভর্নর জেনারেল পরামর্শ দেন যে, বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্তগুলোর একটি বিষয় হিসেবে একই সময়ে নানকানা সাহিব সম্পর্কেও একটি বিশেষ ঘোষণা পাকিস্তান সরকার কর্তৃক দেওয়া যেতে পারে।

(১৭) মিস্টার লিয়াকত আলী খান বলেন, তিনি বুঝেছেন যে পাঞ্জাব সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে আলাদা করে একে যৌথ নিয়ন্ত্রণে রাখার বদলে দুইটি সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীনে রাখার চিন্তাটি স্যার ফ্রান্সিস মুডি’রই ছিল। সিদ্ধান্ত হয় যে, এই পরামর্শটি পরের দিন আম্বালাতে অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে বিবেচনা করা হবে।

(১৮) পন্ডিত নেহেরু পরামর্শ দেন যে, তাঁর এবং মিস্টার লিয়াকত আলী খানের অবশ্যই পরবর্তী দিন লাহোর ও অমৃতসর পরিদর্শনে যাওয়া উচিত। তাঁর পরামর্শটি গৃহীত হয়।

(১৯) পন্ডিত নেহেরু পরামর্শ দেন যে, তিনি লাহোর থেকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনকভাবে সব তথ্যাদি পাচ্ছেন। সেখানে হাজার হাজার শিখ ও হিন্দু আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে ভীড় করছেন, যেখানে পর্যাপ্ত কোন নিরাপত্তা এবং রেশনের ব্যবস্থা নেই। মিস্টার লিয়াকত আলী খান জানান যে, তিনি পশ্চিম পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীর সাথে যোগাযোগ করবেন এবং তাঁকে শরণার্থীদের নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলবেন। তিনি আরও পরামর্শ দেন যে, শরণার্থীদের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সহায়তা দেওয়ার জন্য পাঞ্জাব সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া উচিত।

বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্ত-এর মুদ্রণ ও প্রকাশনা

(২০) মিস্টার লিয়াকত খান জানান যে, আলোচ্য সভায় দুই সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনার প্রেক্ষিতে বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্তগুলোর কোনরূপ সংযোজন-বিয়োজনের তিনি বিরোধী। তাঁর বিবেচনায়, বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্ত যে অবস্থায় আছে ঠিক সেভাবেই তা প্রকাশ করা উচিত।

(২১) গভর্নর জেনারেল পরামর্শ দেন যে, বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীগণ বিবেচনায় নিয়েছেন, তবে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে অসন্তোষের যেসব বিষয় রয়েছে সেগুলো পরবর্তীতে সরকারি পর্যায়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে তাঁরা সম্মত হয়েছেন, এই মর্মে প্রস্তাবিত সরকারি তথ্যবিবরণীতে উল্লেখ করা যেতে পারে। মিস্টার লিয়াকত আলী খান গভর্নর জেনারেলের এই পরামর্শকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অভিমত দেন যে (যা গৃহীত হয়), প্রস্তাবিত সরকারি ঘোষণায় শুধুমাত্র এই সভায় আলোচিত বিষয়গুলো সম্পর্কে যথাযথভাবে উল্লেখ থাকা উচিত। কোন ধরনের অসন্তোষ কিংবা জনসংখ্যা স্থানান্তরের কোন প্রস্তাবের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করার প্রয়োজন নেই।

(২২) পন্ডিত নেহেরু জোর দিয়ে বলেন যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে তিনি এবং তাঁর সহকর্মীরা নিজেদেরকে নৈতিকভাবে পরাজিত বোধ করেছেন। কারণ বিগত তিন চার মাস ধরে তাঁরা ঐ অঞ্চলের প্রতিনিধিদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবেনা এই মর্মে অসংখ্যবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন। অধিকন্তু, আইনজীবীদের পরামর্শ গ্রহণ করার পরেই এই কাজটি করা হয়েছিল।

(২৩) এই মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, গভর্নর জেনারেল পরবর্তী কার্যদিবসে বাউন্ডারি কমিশনের সিদ্ধান্তগুলো বিশেষ গেজেট আকারে প্রকাশ করবেন এবং অনতিবিলম্বে এর কপি পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গ এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাঞ্জাবের গভর্নরদের কাছে পাঠানো হবে।

(২৪) আরও সিদ্ধান্ত হয় যে, সভায় সম্মত নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে সংযোজিত করে একটি সরকারি খসড়া তথ্যবিবরণী আজ রাতের মধ্যে জারি করা হবে। মন্ত্রীদের একে অপরের রাষ্ট্রে সফর করার বিষয়টি এর অন্তর্ভুক্ত থাকবে।


তথ্যসূত্রঃ হেল্‌প্‌ ফর রিসার্চারস, ব্রিটিশ লাইব্রেরি, ইউকে


অনুবাদকের পর্যবেক্ষণঃ  ব্রিটিশ শাসকদের কুটচাল, পাকিস্তানের তৎকালীন নেতৃবৃন্দের অনড় অবস্থান এবং পন্ডিত নেহেরুসহ অন্যান্য ভারতীয় নেতৃবৃন্দের ভদ্র ও মিনমিনে দর কষাকষির কারণে পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাগ্যবিড়ম্বিত আদিবাসীরা পাকিস্তানের ইসলামী সম্প্রসারণবাদ এবং পরে যুগপৎ মুসলিম-বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদের আগ্রাসনে পিষ্ট হয়ে আজ একেবারে কোণঠাসা, বিপন্ন এবং নিজভূমে পরবাসী জীবন কাটাতে বাধ্য হচ্ছেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের অর্থনীতির বিপন্নতার কথা বলে, পূর্ববঙ্গের সাথে ভৌগলিক নৈকট্য আর পশ্চিমবঙ্গের সাথে দূরত্ব থাকার অজুহাত তুলে ধরে ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষাসহ অভিন্ন ভৌগলিক সীমানা থাকা সত্ত্বেও পার্বত্য চট্টগ্রামকে ত্রিপুরা, মিজোরাম তথা ভারতের অন্তর্ভুক্ত না করে পূর্ব পাকিস্তানের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়েছিল। ইসলামী দৈত্য ও কসাই ইয়াহিয়া, টিক্কা খানদের শাসনাধীন সেই পূর্ব পাকিস্তান সৌভাগ্যক্রমে আজ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং তার অকৃত্রিম আলো হাওয়াপুষ্ট মৌলিক সন্তান অর্থাৎ পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি আদিবাসীরা এখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের গর্বিত নাগরিক। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের অনেকে জীবন বাজী রেখে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছেন। যদিও চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়সহ অনেকে পাকিস্তানের পক্ষালম্বনেও বাধ্য হয়েছিলেন। কিন্তু সেটি এক চক্রান্তমূলক ও অতি সংবেদনশীল ভিন্ন ইতিহাস, যার বস্তুনিষ্ট গভীর বিশ্লেষণ আজ সময়ের দাবি। এখন প্রশ্ন হলো, সৌভাগ্যক্রমে হোক বা দুর্ভাগ্যক্রমে – উপমহাদেশের তৎকালীন ‘বুড়ো খোকা’দের তর সইতে না পারা ক্ষমতালিপ্সা ও লোভের কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হলেও এর প্রথম অধিবাসী পাহাড়িদের বংশধরেরা কী সেখানে সত্যিই ভালো আছেন? বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সীমানাভুক্ত হয়ে গর্বিত হওয়ার মতো নিরাপদ, সমৃদ্ধ জীবন কী তারা পেয়েছেন? তাদের জীবন, ভূমি-অরণ্য, ভাষা-সংস্কৃতি-ধর্ম-প্রথাগত শাসন-জীবিকা, তাদের শিশু ও নারীরা কী সেখানে নিরাপদ? দেশের মাত্র এক দশমাংশ ভূখন্ডকে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান সামরিকায়িত অঞ্চলে পরিণত করা, রাষ্ট্রীয়ভাবে বাঙালি জনসংখ্যা পুনর্বাসিত করে ৯৭% পাহাড়ি জনসংখ্যাকে কয়েক দশকের ব্যবধানে ৪০-৪৫ শতাংশ নামিয়ে আনা, পাহাড়ের আনাচে কানাচে মসজিদ-মাদ্রাসা-জঙ্গিবাদের বিস্তার, বাঙালি সেটেলার কর্তৃক পাহাড়ি নারী ধর্ষিত বা নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়া প্রভৃতি কিসের আলামত? এসব প্রবণতাকে ধর্ষক কিংবা মানবাধিকার হরণকারীরাও নিশ্চয় নিরাপদ, গর্বিত ও সুখী জীবনের আলামত বলে স্বীকার করবেনা। কারণ আদম সন্তান হিসেবে তাদের অন্তরও কখনো না কখনো এসব ঘটনার অনুতপ্ত বা অপরাধবোধে আক্রান্ত হবে!

আসলে দেশবিভাগ ও জাতীয়তাবাদযুক্ত স্বাধীনতার দম্ভ, হিংস্রতা, ক্ষমতা লিপ্সা ও অসংবেদনশীলতাসহ বর্তমান সময়ের ব্যবসাসর্বস্ব ভূ-রাজনীতি পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং বাংলাদেশের সমতল অঞ্চলের আদিবাসীদেরকে যুগ যুগ ধরে নানাভাবে ক্ষতবিক্ষত, বিপন্ন করে চলেছে। নানা সমস্যা জিইয়ে রেখে ভবিষ্যতে ছেড়ে যাওয়া দেশগুলোতে পুনরায় কিংমেকার হওয়ার অভিপ্রায় ঔপনিবেশিক শাসকদের বরাবরই ছিল। কিন্তু তাদের ষড়যন্ত্রমূলক দেশ বা অঞ্চল বিভাজন এবং ‘বুড়ো খোকা’দের তড়িৎ ক্ষমতালিপ্সার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন বাংলাদেশের ভাগে পড়লেও এখানকার পাহাড়ি আদিবাসীদের জীবন-জীবিকা নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কোন শাসকগোষ্ঠীর বা দেশের নৃগোষ্ঠীর থাকতে পারেনা। দেশের গণতন্ত্র, সুশাসন, সম্পদ ও স্বাধীনতার স্বাদ বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর প্রত্যেক সদস্যের মতো সমানভাবে আদিবাসীদেরও প্রাপ্য। বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর সমান অধিকারে ও মর্যাদায় স্বকীয় জাতিগত, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আত্নপরিচয় নির্মাণ ও বিকাশের অধিকার ভিন্ন জাতিসত্তা হিসেবে যেমন তাদের রয়েছে, তেমনি আছে এই আত্নপরিচয় নির্মাণে রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা এবং আনুকূল্য লাভের অধিকারও। রাষ্ট্রকেই আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতিসহ এসব অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ভারত তার সংবিধানে সংযোজিত ৫ম ও ৬ষ্ঠ তফসিলের মাধ্যমে সেদেশের আদিবাসীদের (তফসিলি জাতি/উপজাতি/অন্যান্য অনগ্রসর জনগোষ্ঠী) জন্য আলোচ্য অধিকারগুলো নিশ্চিত করেছে। যদিও কোন কোন জনগোষ্ঠী আরও বেশি অধিকার পাওয়ার জন্য এখনও সংগ্রাম ও আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশ বিভাগের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলে এর অধিবাসীরা সাধারণ নাগরিক হিসেবে প্রাপ্য অধিকারগুলোর পাশাপাশি সেদেশের সংবিধানের ৫ম ও ৬ষ্ঠ তফসিলভুক্ত বিশেষ অধিকার ও মর্যাদাও ভোগ করতেন। হয়তো মূলধারার ভারতীয় সংস্কৃতি ও মূল্যবোধের সাথে নৈকট্যের কারণে একটু বেশিই ভোগ করতেন। পূর্ববঙ্গের সাথে জুড়ে দিয়ে স্বতন্ত্র জাতিসত্তা হিসেবে প্রাপ্য সেসব স্বাভাবিক অধিকার থেকে পার্বত্য জাতিগুলোকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বহুযুগের সেই বঞ্চনা, তাদের বর্তমান জীবন্মৃত অবস্থা ও বিপন্নতাবোধের দায় র‍্যাডক্লিফের উত্তরসুরি ব্রিটিশ সরকার এবং ভারত ও বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠী কোনভাবে এড়াতে পারেননা। অথচ দায়শোধের পরিবর্তে বৃহৎ নৃগোষ্ঠীর জাতিগত, সামরিক, সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের মাধ্যমে তাদেরকে প্রতিনিয়ত আরও প্রান্তিক ও ছিন্নমূল করা হচ্ছে। ব্রিটিশ সরকারসহ ভারত ও বাংলাদেশের শাসকগোষ্ঠীকে তাদের স্বার্থপর কৃতকর্মের ফলে আদিবাসীদের জীবনে সৃষ্ট বিপন্নতা ও দুরবস্থা লাঘবের নৈতিক দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা যে তাদের, সেটি স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সময় এসেছে। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো এখন যেসব অধিকার ও স্বাধীনতা ভোগ করে, র‍্যাডক্লিফের ভ্রান্ত রোয়েদাদের ফলে সৃষ্ট অধিকার বঞ্চনার দুর্ভোগ লাঘবে পাহাড়ের আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাও সঙ্গত কারণে হারানো সেসব অধিকার ও স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার দাবি করতেই পারেন।

বলাবাহুল্য, সেসব ন্যায়সঙ্গত দাবি উত্থাপন বা আদায়ের জন্য প্রথমে অবশ্যই নিজেদেরকে সংগঠিত হতে হবে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সব বিভাজনকে পিছনে ফেলে নিজেদের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে হবে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উদার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে না এলে শাসকগোষ্ঠীর উস্কানিতে ক্রমবিস্তৃত এই বিভাজনকে পরাভূত করা সম্ভব হবে না। তাই সাধারণ জুম্ম জনগণ নিজেদের মানবিক অধিকার ও মর্যাদা ফিরে পাওয়াসহ একটি নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার স্বপ্নে তিন পার্বত্য রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের শুভবোধ, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, উদারতা, ক্ষমা ও ভ্রাতৃত্ববোধ উজ্জীবিত একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ঐক্যের প্রত্যাশায় উদ্বিগ্ন প্রহর গুনছেন।


অনুবাদকঃ স্বাগতম চাকমা 

জুম ম্যাগাজিন, পার্বত্য চুক্তির ১৭ বছর পূর্তি উপলক্ষে বিশেষ সংখ্যা ২০১৪ 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here