চিক্কোবি তোমাকে চিক্কো’র সাথে ভালো মানায় করিম বা রহিমের সাথে নয়

0
102

পড়ালেখা কিংবা চাকরীর সুবাদে প্রিয় পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে অনেক জুম্ম ছেলে-মেয়ে চট্টগ্রাম, ঢাকা, রাজশাহী, সিলেট কিংবা অন্যান্য শহরগুলোতে গমন করি। পড়ালেখার সুবাদে ২০১৪ সালের প্রথম দিকে চট্টগ্রাম শহরে পদার্পন করি। চট্টগ্রাম শহরের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও স্বনামধন্য কলেজ চট্টগ্রাম কলেজে দু’বছর অধ্যয়ন করি। এ দু’বছরে চট্টগ্রাম শহরের প্রায় প্রতিটি জায়গায় এক-আধটু হলেও ঘুরেছি। আর এ দু’বছর পেরিয়ে ঢাকা শহরে পদার্পন করি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুবাদে।পড়াশুনার ফাঁকে ফাঁকে বিভিন্ন কাজের সুবাদেও ঢাকা শহরে মাঝে মধ্যে ঘোরাফেরা হয়।

ঘোরা ফেরার সময়ে মাঝে মাঝে আমারই জুম্ম বোন ‘চিক্কোবী’ কর্তৃক আমার সামাজিক প্রথাবিরুদ্ধ কর্মের দৃশ্য দেখে বেশ খারাপ লাগত। কৈশরিক আধপাকা অবুঝ মননে কেবল মাত্র বের হয়েছিলাম সবুজ চট্টলার স্বকীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক গন্ডিবদ্ধ সমাজ থেকে। এ চিত্র অামাকে বেশ হতাশ করত এবং অনেক সময় অবচেতন মনে কখন যে রাগে, ক্ষোভে, দুঃখে দু’চোয়ালের দু’পাটি দাতঁ এক হয় খেয়াল থাকে না।

অনেক সময় প্রত্যক্ষভাবে দেখতাম এ অনাকাংখিত দৃশ্য আবার কারও কারও মুখ থেকে ‘পুজু-পুজু’ করে শুনতাম কোনো এক জুম্ম চিক্কোবির করিম/রহিমের সাথে উপচেপড়া প্রেমের অবুঝ আবেগীয় ভালোবাসার সম্পর্কের কাহিনী।

যাক বলে নিই আমার স্বকীয় সামাজিক, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট। পার্বত্য চট্টগ্রামের যে তের ভাষাভাষী চোদ্দটি আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের সকল জাতিগোষ্ঠীর রয়েছে স্বতন্ত্র ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, প্রথা। এ স্বকীয়তার কারণেই পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগোষ্ঠীকে তাদের আর্থসামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্য, প্রথাগত স্বতন্ত্রতার বিচারে দেশের মূলজনগোষ্ঠী বাঙালীদের থেকে পৃথক হিসাবে বিবেচনা করা হয়। আর এ পৃথক বা স্বতন্ত্রতার বিচারেই জুম্মজাতীয়তাবাদের উদ্ভব এবং এ জুম্মজাতীয়তাবাদ ধারণা থেকেই জুম্মদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্য ও প্রথাগত নানা উপাদানে সমৃদ্ধ জীবনকে বাচাঁনোর তাগিদেই আমাদের জুম্মদের রাজনীতির মূল দর্শন।

এবার সংক্ষিপ্ত করে বলে নেয়া দরকার আমাদের সংস্কৃতির প্রথাবদ্ধ নিয়মের কথা। আমাদের প্রথাবদ্ধ নিয়মে প্রচলিত সমাজিক বাস্তবতা বলে দেয় চিক্কোবি চিক্কো’র হাতেই থাকবে। এখানে চিক্কোবি জুম্ম ললনারই প্রতিনিধি আর চিক্কো জুম্ম যুবকেরই প্রতিচ্ছবি। এ প্রথাবিরুদ্ধ যেকোনো নিয়মকেই আমাদের সামাজিক বিচারে আমরা আমাদের সমাজ, সংস্কৃতি এবং জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে বলে বিবেচনা করি এবং বাস্তবতা তাই বলে।

কিন্তু আমরা বাস্তবিক প্রেক্ষাপটে দেখি, ঢাকা শহর কিংবা চট্টগ্রাম শহরে কোনো এক চিক্কোবি তার সেই  বর্ণাঢ্য সমাজ, সাংস্কৃতির প্রথাবদ্ধ নিয়মকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পাহাড়ী নারীর চিরায়ত পরিধান রেবেক ফুলের হাসি মাখা ‘সাবুগী’ সমেত পিনোন আর জুম্ম ললনার মননে লুকায়িত স্বপ্নের নানান পাহাড়ী ফুলের সমারোহে নিখুঁত সুতার বুননে মেলে ধরা ‘খাদি’-কে ভুলে গিয়ে অবুঝ, মিথ্যা আবেগীয় ভালোবাসার ছলনায় বিজাতীয় সংস্কৃতির ‘শাড়ী’ কিংবা কালো ‘বোরকা’-কে আঁকড়ে ধরে রহিম কিংবা করিমের হাত ধরে ভালোবাসার ভ্রান্ত মোহে ছুটে বেড়ায়।

এ বৃথা চেষ্টাকে দেখলে কষ্ট লাগে অনেক। বুকে দীর্ঘশ্বাস জমে যায় আর দু’চোয়ালের দাঁত আবার একত্র হয় রাগে কিংবা দুঃখে। পড়াশুনার সুবাদে আমার জুম্ম বন্ধু ছাড়াও মূল জনগোষ্ঠীর বন্ধুদের সাথেও মেলামেশা হয়। খুব কাছে থেকেও মিশেছি। অনেক সময় কথার ছলে বা মজা নেওয়ার কৌশলে মূল জনগোষ্ঠীর অনেক বন্ধু বলে ওঠে, “বন্ধু তোমাদের পাহাড়ী মেয়েরা নাহ্ সেইইইই……..জোশ”। এখানে আমি অন্যায়ের কিছু দেখি না। তবে ঐ কথা বলার ভঙ্গি কিংবা কথাটার চূড়ান্ত পরিণতি বা উদ্দেশ্যের মূলে ঢুকতে গিয়ে আমার সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের মাত্রাটা বেড়ে যাই কেননা আমি দেখেছি ঐ করিম বা রহিমের হাতেই ১৬ বছর বয়সী চিক্কোবি সুজাতার ধর্ষণের পর হত্যার দৃশ্য। জলপাই রঙের পোশাকধারীদের হাতে নেত্রী কল্পনা অপহরণের বেদনাহত কাহিনী। তুমাসিং, সবিতা, বলিমিলা, ইতিসহ পাহাড়ের জুম্মবি বা চিক্কোবীদের প্রিয় প্রাণপ্রদীপগুলো ঐ রহিম করিমের হাতে নিভিয়ে দেওয়ার বেদনাহত ঘটনা। বান্দরবানে বোমাং রাজার রাজপূন্যাহ্তে প্রিয় চিক্কোদা’র হাত ধরে রাজপূন্যাহ্ দেখতে আসা চিক্কোবীকে কী নির্মমভাবেই না তার ইজ্জতখানি লুঠিয়ে নিয়ে জীবনমৃতের সমান করে দিল ঐ রহিম বা করিম!

কাজেই চিক্কোবী কেমন করে সুখ খুঁজে বেড়াও তোমারই হাতে বুনন হওয়া ‘পিনন-খাদি’ কে ডানপায়ে লাঠি মেরে ‘বোরকা-শাড়ির’ অপরিচিত সাজকে আকড়ে ধরে বাঁচবে এই স্বপ্নে!

জানি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষয়িষ্ণু সামন্তীয় সমাজের নারীরা সমাজ, পরিবারের বিভিন্ন স্তরে নিগৃহীত-নিপীড়িত ছিল। জুমঘরের চুলোর এককোণে কিংবা জুমের নানা কাজে কর্মে নিয়োজিত চিক্কোবী আধুনিক সমাজ থেকে পুরোপুরী ছিল বিচ্ছিন্ন। কাজেই মনঃস্তাত্ত্বিকভাবে তারা জুম্ম পুরুষদের তুলনায় দুর্বল ছিল এটা অকপটে স্বীকার করতেই হবে। কেননা, একাধারে সামন্তীয় সমাজের কাঠামো অন্যদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দাপট জুম্ম ললনা চিক্কোবীর মননকে বিকাশের জন্য যে যথেষ্ট সুযোগটুকু দেওয়া দরকার ছিল তা দেয়নি। আর শিক্ষাকেই যদি আমরা মানুষের মনঃস্তাত্ত্বিক বিকাশের অন্যতম সিঁড়ি হিসাবে বিবেচনা করি তাহলে আমরা দেখতে পায় আমাদের পাহাড়ী নারীদের শিক্ষিতের হার ১৯৯৭ পূর্ব অর্থাৎ চুক্তি পূর্ব সময়ে খুব একটা বেশী ছিল না। আর সামন্তীয় ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের দাপটে নির্যাতিত ভীতু এবং এনালগ চিক্কোবী যখন চুক্তির পরে এক  বিশেষ বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে জুমের ‘মাচাংঘর’ এর ‘সাঙো’ অতিক্রম করে পুঁজিবাদী অপেক্ষাকৃত ডিজিটাল সমাজের শিক্ষা কিংবা চাকরীর সুযোগ গ্রহণ করতে বেড়িয়ে পড়ল তখনই ঘটল মূল বিপত্তি।

ক্ষয়িষ্ণু সামন্তীয় সমাজের জুমনির্ভর নানা অর্থনৈতিক টানাপোড়ন এবং অর্থনৈতিক নিপীড়নের গ্লানি থেকে বেড়িয়ে পড়ার আশায় চিক্কোবী বুক বাঁধে পুঁজিবাদী ডিজিটাল সমাজের চাকচিক্যময়তার সাথে নিজেকে জড়িয়ে কিছু সুখ কুড়িয়ে নেবে এই প্রত্যাশায়। আর এ প্রত্যাশার সাথে সাথে অবচেতন মনে খুঁজে পেল নানা প্রেক্ষাপটে মেলামেশা হওয়া পুঁজির অফুরান ঝরনাধারায় অবগাহন করা করিম কিংবা রহিমকে। ভুলে গেল স্বীয় হাতে বুনন হওয়া পিনোন-খাদির বৈচিত্র্যময় সাজকে পুঁজিবাদীর নানা প্রলোভনে মুগ্ধ হয়ে। কিন্তু চিক্কোবী সত্যি বলছি, বুকে হাত দিয়ে বলছি, মিথ্যা এ প্রলোভনে সুখের প্রত্যাশা বৃথা অনুনয় বা অরণ্যে-রোদন ছাড়া কিছু নয়। রহিমরা ছিড়ে খাবে তোমার দেহ তার পরে ভাসিয়ে দেবে লোগাঙের ‘লো’ স্রোতে। আর এটা তুমি থাড়/অনুধাবনও করতে পারবে না। কেননা, বাস্তবতা সে কথাই বলে দেয়।

কিন্তু তুমি বুঝো না তোমার জন্য চিক্কো দা করুণ আকুতি আর অফুরান ভালোবাসা নিয়ে গাইছে,

মা গঙ্গা রে সাক্ষী রাগেই বুগোত তরে লোম তুলি

দুরোর ওই হাল মৌনত চিগোন গরি ঘর বানি

অনুবাদ

গঙ্গা মা’কে সাক্ষী রেখে বুকে তোমায় নেবো তুলে

দূরের ঐ কালো পাহাড়ে তোমায় নিয়ে ছোট্টঘর বাঁধবো যে

তুমি বুঝো না আসলে পুঁজিবাদী সমাজের ইটের দেওয়ালে গড়া দালানের সুখের চেয়ে ঐ কালো পাহাড়ের দক্ষিণা বাতাসের স্রোতে ‘শন’ এর ছাউনি আর বাঁশে গড়া ‘ইজোর’ সমেত বানানো ‘মাচাং’ ঘরের সুখটাই আসল সুখ এবং এটাই প্রকৃত সুখ।

আর এ সুখ বুঝোনা বলেই চিক্কোদা তোমার জন্যই বেদনাহত হৃদয়ে গেয়ে ওঠে,

চিক্কোবি ম্ মনান বুজতে ন্ তুই

যদি তুই দূরত দূরত থাজ

কাজেই চিক্কোবি দূরের ঐ কালো পাহাড়ে চিরায়ত ঐতিহ্যে গড়া শন আর বাঁশ দিয়ে গড়া ছোট্ট মাচাং ঘরের ইজোরে বসে দক্ষিণা বাতাসে তোমার চিক্কোদা’র সামনে বসে খোলা প্রাণে উড়িয়ে দাও তোমার ঘনখোলা কালো চুলটা।

আর আমি নিশ্চিত তখনই চিক্কোদা আনমনে গান ধরে,

পিবির পিবির বোয়োরত উড়ি যার ত্ চুলান

অনুবাদ

এলো মেলো বাতাসে উড়ছে তোমার চুলটাই

আর কখনোই আক্ষেপ করে গাইবে না,

মনত উদে পরানি, তর সেই মিদে মু-গান

অনুবাদ

মনে ভেসে উঠে প্রাণের প্রেয়সী তোমার মুখটাই

চিক্কোবী ভেবে নিও তোমার নতুন প্রজন্মের কাছে ‘চুচ্যেঙ্যে-কা’ যদি তুমি শেখাতে না পারো তাহলে হারিয়ে যাবে এ চুচ্যেঙ্য-কা, ককরবক আরো কত কি! তোমার মা কর্তৃক তোমাকে ‘অলি-অলি’ ডেকে ঘুম পাড়ানির গল্পগুলো হারিয়ে যাবে। ‘আলাম’ দেখে দেখে ‘হুদুক-হাদাক’ চুলে গুঁজে নানান রঙের ফুলগুলো আর ‘বিয়োং’-এর তিল তিল আঘাতে ‘পিনোন’-এ আর সেঁজে উঠবে না ‘রেবেক’ ফুলের সুন্দর ‘সাবুগী’, যদিনা তুমি অচেনা কোনো রহিম বা করিমের হাত ধরে খুঁজে বেড়াও মিথ্যা সুখ।

কল্পনার ‘জিত্তো সোল মাদনি’-র চেতনাটা কষ্ট পাবে। মাধবি লতাদের হাতে গড়া পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির পিনোন-খাদি,খবং,আলাম, বিয়োং সর্বোপূরী জুম রক্ষার সংগ্রামের চেতনাটা হারিয়ে যেতে দিও না ‘চিক্কোবী’।

তোমার চেতনায় শানিত হয়ে আবারো কল্পনার ‘জিত্তো সোল’ ফিরে আসবে তোমার মুখ বেয়ে।

তাই আবারো শেষবারের মত বলছি “চিক্কোবি তোমাকে পিনোন-খাদিতে ভালো মানায়, শাড়ি-বোরকায় নয়”।


সতেজ চাকমা, 

শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here