সমকালীন ভাবনায় পাহাড়ের রাজনীতির প্রাসঙ্গিক পাঠ

0
48

রাজনৈতিক দল হিসেবে একটি জাতিকে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করা কোনভাবেই ছেলেখেলা নয়। জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার উদ্দেশ্যে সংগঠিত একটি রাজনৈতিক দলের জন্য সঠিক রাজনৈতিক লাইন নির্ধারণ এবং তার আলোকে দলের অভ্যন্তরে বাস্তবসম্মত নেতৃত্ব গঠনের অব্যাহত ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সময়োপযোগী নীতিগত ও কৌশলগত অবস্থান তৈরী করে নেওয়াটা জরুরী।

পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা বিচার করতে গেলে বিগত সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাবলীর চুলচেরা বিশ্লেষণ দরকার! যে কোন মানদন্ডের বিচারেই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি একটি যুগান্তকারী বাস্তব রাজনৈতিক ঘটনা। চুক্তির পূর্বাপর ঘটনাপ্রবাহ জানা থাকাটা পার্বত্য চট্টগ্রামের সামগ্রিক ইতিহাস বিচারের জন্য আবশ্যক। চুক্তির পূর্বেকার রাজনৈতিক ইতিহাস জানতে হলে জেএসএসের ঐতিহাসিক ৪ দফা দাবীনামা ১৯৭২, ৫ দফা দাবীনামা ১৯৮৭, এই দাবীসমূহের বিপরীতে ১৯৮৯ সালের স্থানীয় সরকার পরিষদ আইন, এবং এর বিপরীতে জেএসএসের ১৯৯২ সালের সংশোধিত ৫ দফা দাবীনামা গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। আবার ৮৩-র সশস্ত্র সংগ্রাম চলাকালীন সময়ের বহুমাত্রিক রাজনৈতিক ঘটনাবলীর অখন্ডিত পাঠ আমাদেরকে নিতেই হবে।

এরপর চুক্তিকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, চুক্তি পরবর্তী পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদেরকে সঠিক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম চিহ্নিত করণ বা অনুপস্থিত থাকলে তার গঠনপ্রক্রিয়ায় পথ প্রদর্শন করতে পারে।

কোন একটি রাজনৈতিক দলকে মাপতে গেলে তাঁর আশু ও চূড়ান্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার বা স্লোগান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে বর্তমানে বিবদমান দলগুলোর বর্তমান রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও স্লোগান এবং তা পরিপূরণে সাংগঠনিক প্রস্তুতির ধরণটা বাস্তবসম্মত কিনা তা খতিয়ে দেখা জরুরী।

দলীয় কর্মসূচি ও দলীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতির দিকে নজর দিয়ে বলা যায় জনসংহতি সমিতির আপাত: রাজনৈতিক অঙ্গীকার হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন জোরদার করা। পরবর্তীতে চুক্তি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠায় কৌশলগত অর্জনগুলোকে সামনে রেখে চূড়ান্ত দলীয় লক্ষ্যগুলি অর্জনে ধারাবাহিক দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়া এবং এ দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রায় জুম্ম জনগণকে ধাপে ধাপে প্রস্তুত করে গড়ে তোলা। এই সমীকরণটা অনুমিতি নির্ভর ছিল বলে মনে হয় না, বরং বাস্তব পর্যবেক্ষণ ও পরিকল্পনা থেকে উৎসারিত বলে ধরে নেওয়া যায়, কেননা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনসংহতি সমিতি রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে সেভাবেই এগোনোর চেষ্টা করছে বলে প্রতীয়মান হয়। যথেষ্ট সাহস ও দূরদর্শীতা প্রয়োজন ছিল এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে। তবে, চুক্তির আগে সমীকরণটা মেলানোর ক্ষেত্রে যতটা আয়েসের অবসর মিলবে বলে অনেকের ধারণা বদ্ধমূল হয়ে উঠেছিলো, তা অচিরেই মিথ্যে প্রমাণিত হওয়ার পর থেকে এই সমীকরণটা আদৌ মেলানো সম্ভব কিনা সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে জেএসএসের বর্তমান নেতৃত্ব!

ইউপিডিএফের বর্তমান রাজনৈতিক কর্মসূচীগুলো থেকে তাদের আশু লক্ষ্যটা কী তা ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে বোধগম্য নয়। তবে তাদের চূড়ান্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার পার্বত্য চট্টগ্রামে “পূর্ণস্বায়ত্ত্বশাসন” খুবই চমকপ্রদ একটি রাজনৈতিক স্লোগান। কিন্তু এ অঙ্গীকার পরিপূরণে তাদের দলীয় প্রস্তুতির দিকে তাকালে আমাদের অনেক বেশী হতাশ হতে হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্বশাসনের দাবী কেবল আজকের নয়। জেএসএসের ঐতিহাসিক ৪ দফার মূল সারটাই ছিলো আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের।

জেএসএস (এম এন লারমা) নামধারী সংস্কারপন্থীদের উত্থান আমাদের মতো একেবারেই কাঁচা এবং উঠতি তরুণদের চোখের সামনেই। ২০০৭ সালের জরুরী অবস্থাকালীন সময়ে পার্টি যখন দু:সময়ে সেসময়টাই দলীয় সংস্কারের আহবান জানিয়ে দলচু্যতির মধ্য দিয়ে নতুন দল সৃষ্টির মাধ্যমে তারা জুম্ম জাতিকে কী বার্তা দিতে চেয়েছিলো জানি না, তবে জুম্ম জনগণ তাঁদেরকে প্রত্যাখ্যান করতে তেমন একটা সময় নেয় নি, একথা নির্দ্বিধায় বলা যায়! তাঁদের সীমিত পরিসরের রাজনৈতিক কার্যক্রম পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়িত হোক এ আকাঙ্খাকে ঘিরে।

এমনিতর বাস্তবতায়, দলগুলোর বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থার সার নিংড়ালে যে চিত্র মেলে, তা হচ্ছে:

একদিকে- আন্তর্জাতিক পরিসরে গ্রহণযোগ্যভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাকে তুলে ধরার অপর্যাপ্ত প্রস্তুতি, বিশৃঙ্খল সাংগঠনিক অবস্থান, অপরিণত ও ঝুঁকিপূর্ণ দলীয় নেতৃত্ব, জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক পোলারাইজেশনের ক্ষেত্রে নামসর্বস্ব রাজনৈতিক ব্যানারের সাথে দৃশ্যমানভাবে অফলদায়ক জোট গঠনের হঠকারিতা।

আবার অন্যদিকে,- বেশ অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পরও পৌণ:পুণিক দলীয় ভ্রান্তি ও সমস্যার আবর্তে পর্যবসিত থাকা, সময়ের দাবী মেটানো সাংগঠনিক ও মতাদর্শগত নেতৃত্ব গঠনে ব্যর্থতা, তরুণদের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠায় অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে না পারা, জাতীয় ঐকমত্য ধরে রাখতে না পারার ক্লান্তি, কৌশলগত নেতৃত্বের প্রতি বাড়তি ঝোঁক।

উভয় দিক থেকেই আমাদের জুম্ম তরুণদের একটা বিপুল অংশকে ইতিমধ্যে হতাশা ও কিংকর্তব্যবিমুড়তার বেড়াজালে কাবু করে ফেলেছে। তথাপিও এ দুই বিপরীত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার যে গতিবিধি তার সঠিক ও অর্ন্তভেদী পর্যবেক্ষণই আমাদের আগামী দিনের পথ-মত নির্ণয়ে যৌক্তিক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে কোনপ্রকার দেরি করার সুযোগ আমাদের নেই। আমাদের সংগ্রামের ঐতিহাসিক ভিত্তি, বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং ভবিষ্যত অভিমুখীনতার সঠিক বিশ্লেষণটা আমাদের প্রজন্মকে অতি অবশ্যই করতে হবে।

আমাদের দ্বন্দের ইতিহাসটা নতুন নয়। তথাপিও এখনো অমীমাংসিত, অবিকশিত। এর বিকাশ তাই অবশ্যম্ভাবী। বিকাশের গতিটা আমাদের জুম্ম জাতীয় জীবনে ধনাত্বকভাবে প্রবাহিত করতে পারার সক্ষমতা প্রজন্মের জুম্ম তরুণদের করতেই হবে। রক্ত তো কম ঝরে নি। এই রক্তপাত বন্ধ করতে হলে মুখ্য ভূমিকাটা পরিকল্পিতভাবে আমাদেরকেই করতে হবে। তাই সবচেয়ে বড় সত্যটা হচ্ছে সংগঠিত হওয়ার বিকল্প নেই।

আমাদের তরুণ প্রজন্মের সম্ভাবনা বিপুল। অনেক প্রশ্নের সামনে আমরা দাঁড়িয়ে। চারপাশের অসংখ্য ঘটনাপ্রবাহকে সাধারণ আবেগের মাপকাঠিতে পাল্লায় তোলাটা হবে আমাদের প্রজন্মের জন্য বোকামী! অন্যের প্রতি তর্জনী নির্দেশ করে নিজের দ্বায়িত্বকে অস্বীকার করার কোন সুযোগ আমাদের নেই। সমস্যা চিহ্নিত করার আগেই বৈদিক তন্ত্র-মন্ত্র ঝাড়াটা কোনভাবেই সমীচীন হচ্ছে না। অথচ আমাদের মনোভাবটা এখনো পর্যন্ত ঠিক এ জায়গাতেই আটকে আছে। যে বা যারা ভুল করছে, তাকে কষে গালি দিলাম, বেশ ল্যাঠা চুকে গেল এ ধারণার পরিবর্তন খুবই আবশ্যক। বিশেষ করে যারা লেখালেখি করছেন, তাদের এদিকটাই নজর দেওয়ার জন্য নিবেদন করি!

পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্ভাব্য অনিশ্চিত রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি না হয়ে উপায় নেই আর আমাদের। সে আমরা চাই বা না চাই, মুখোমুখি হতেই হবে। তাই প্রস্তুতির প্রশ্নটা নিয়েই বরঙ মনযোগী হওয়াটা শ্রেয়তর হবে। তাই আমাদের অনুসন্ধান গভীর থেকে গভীরে প্রবেশ করাতে না পারলে, সঠিক অনুশীলন বা চর্চা দাড় করাতে না পারলে প্রস্তুতিতে অনেক বেশি ঘাটতি থেকে যাবে। সেটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে, দলীয় পর্যায়ে এবং সর্বোপরি জাতীয় পর্যায়েও। সোজাসাপ্টা কথা হচ্ছে চলমান ঘটনাপ্রবাহে সরাসরি প্রবেশ করার মানসিকতা আমাদের তৈরী করে নিতেই হবে।বর্তমান সময়ের ক্রাইসিসকে নির্মোহ বিশ্লেষণ করতে হবে। বিলোং করতে হবে চলমান রাজনীতিকে। আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসকে। সচেতন তরুণদের এই ঐক্যবদ্ধ চেতনাই আমাদের আগামী দিনের ভিত নির্মাণে জোরালো ভূমিকা রাখতে পারে। ভবিষ্যত সম্ভাব্য যে কোন পরিণতি তার আলোকেই গড়ে উঠতে পারে।

রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক বিভাজন খন্ডিত জুম্ম জাতীয় সমাজ বাস্তবতার বর্তমান ভঙ্গুর অবস্থার জন্য অনেকাংশে দায়ী। ঠিক এই জায়গাটাতেই সর্বাগ্রে নজর দেওয়া দরকার। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত রাজনৈতিক গতিবিধি জানতে হলে বস্তুনিষ্ঠ তথ্যপ্রবাহ খুবই জরুরী। আবার বর্তমান বাস্তবতায় সবকিছু জানাজানি করাটাও হবে বোকামি। জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম পরিচালনার ক্ষেত্রে গোপনীয়তা একটি মারাত্বক অস্ত্র, সে কি আর বলা লাগে?? তথ্য, প্রচার ও প্রকাশনা ক্ষেত্রেও সুসংহত জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠা ভীষণ দরকার। সেজন্যে অবশ্যই জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। আশু লক্ষ্য, চূড়ান্ত লক্ষ্য! এক্ষেত্রে বিবদমান দলগুলোর রাজনৈতিক অঙ্গীকার, রাজনৈতিক লাইন, দলীয় কর্মসূচী ও সাংগঠনিক প্রস্তুতি, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির হালচাল অবশ্যই বিবেচনায় নিতে হবে।

শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে, সামাজিক নেতৃত্ব গঠনের ক্ষেত্রে আমাদের শূণ্যতা স্পষ্ট! নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গি দূরে থাক, এসমস্ত অনুর্বর জায়গাগুলিতে কেউ যে বিচরণ করবে তার নু্যনতম কর্মচাঞ্চল্যই তো কোথাও পরিলক্ষিত হয় না। দু পয়সা কামানোর নাচ-গানকে আমরা সংস্কৃতি বলছি, আর আড়মোরা ভাঙতে না পারা সমাজটাকে কষে গালি দেওয়াটাকে বলছি সাহিত্য! আর শিল্প?? চুনীলালের যাত্রা অনেক আগেই ভঙ্গ হয়ে যাওয়ার পর কেউ আর এ পথে দিশা পায় নি!

অথচ একটি জাতীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গঠনে এসবের ভূমিকা কতটাই না জরুরী! হালের অনলাইন এ্যাক্টিভিটি, ব্লগিং প্রভৃতিও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির পাশাপাশি আমাদের সমাজের উপরিকাঠামো নির্মাণে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সমাজের এসব উপরিকাঠামো সংশ্লিষ্ট উপকরণসমূহের যোগফলের ধাক্কাটা যদি ধনাত্বকভাবে সমাজের মৌলকাঠামোর গতি নির্ণয়ে সঠিক আঘাতটা হানতে পারে তবে আশাবাদী হওয়ার জায়গাগুলো অতিদ্রুতই সম্প্রসারিত হতে থাকবে। যেহেতু সমাজের মৌল কাঠামো হচ্ছে অর্থনীতির উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জন বা ক্ষমতা চর্চায় অংশগ্রহণ সেহেতু, সমাজের উপরিকাঠামো গঠনের উপদানগুলির ভূমিকা হবে সবসময় সাপোর্টিভ। সহজ করে বললে, জুম্ম জাতীয় জীবনের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি-অনলাইন এ্যক্টিভিটি-ব্লগিং-ফিল্ম-ফটোগ্রাফি- সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম প্রভৃতির সচেতন চর্চা সক্রিয় সমর্থন জানাবে সঠিক রাজনৈতিক লাইনকে, যেটার উপর ভিত্তি করে প্রকৃত অর্থেই রাজনৈতিকভাবে এগনো যাবে। আমাদের ক্ষেত্রে হয় কী, সহায়ক ভূমিকা রাখা তো দূরের কথা, এসবকিছু দিয়ে আমরা উল্টো রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে অহেথুক চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিই যা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় এগনোর ক্ষেত্রে বাড়তি মাথাব্যাথা তৈরী করে!

কেবলমাত্র রাজনৈতিক লাইন আর মতাদর্শ ঠিক থাকলেই হবে না, রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে বাস্তবিক সাংগঠনিক প্রস্তুতি থাকাটাও সমান দরকার। এ জায়গাটাই আমাদের দুর্বলতা চোখে পড়ার মতোন। অবশ্য হুম, পরিণত নেতৃত্ব গড়ে উঠতে কিছুটা সময় তো লাগবেই। সেদিক থেকে চিন্তা করলে, বিবদমান দলগুলির অপরিণত-অদূরদর্শী-অপর্যাপ্ত- হঠকারী কার্যক্রমগুলির দ্বায়ে তাদেরকে কষে গালি দেওয়াটা কোন সমাধান টানে না বরঙ তা নতুন করে ঝটলা পাকায়। এ থেকে উত্তরণের জন্য সচেতন জুম্ম তরুণদের কান্ডারী হওয়ার স্বপ্ন এবং সাহস অর্জন করতেই হবে। কথা হচ্ছে সে সাহসই বা কজনের আছে? ঠিক একারণেই বোধহয় বেশ একটা বড় সময়কাল ধরে জাতীয়ভাবে আমরা রাজনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার এক অপ্রত্যাশিত দুষ্টুচক্রে ঘুরপাক খাচ্ছি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পরবর্তীতে আমাদের জুম্ম জাতীয় নেতৃত্ব বিকাশের গতি ও ধারাবাহিকতা অনস্বীকার্যভাবে কেন জানি অতি নড়বড়ে এবং ক্রম অবনমনমুখী! তাই ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতৃত্ব গড়ে তুলতে যে চ্যালেঞ্জগুলো চোখে পড়ে সেগুলো কেবল অভিজ্ঞতার মানদন্ডে বিচার করলে চলে না, বরঙ এই উপলব্ধি তৈরী হতে হবে যে, রাজনীতিতে সৃষ্টিশীল নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সংযোজনটা আমাদের জুম্ম জাতীয় জীবনে সময়ের দাবী।

বিগত ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিবদমান দলগুলোর মধ্যে পরিমাণগত রাজনৈতিক পরিবর্তনটা সহজেই পরিমেয়। সেটাকে পরিমাপ ধরে আগামী দিনের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পার্বত্য চট্টগ্রাম খুব সহজেই অনুমান করা যায় এবং সেখানে আশাবাদী হওয়ার মতোন যথেষ্ট উপাদান আছে, আবার একইসাথে চ্যালেঞ্জটাও কম নয়। তাই আগামী সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জটাকে সঠিকভাবে মোকাবেলা করতে গেলে বুদ্ধিবৃত্তিক যোগাযোগ ও সংহতি স্থাপনটাই সবচেয়ে বেশী জরুরী । কমবেশী সবাইকেই একটু নমনীয় হতে হবে এই আর কী! অত্যধিক সমালোচনাত্বক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহার করে রাজনীতিতে সমাজের সর্বস্তরের লোকজনের সর্বোচ্চ অংশীদারিত্বমূলক প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবে খেয়াল রাখা উচিত, আবেগের তাড়না আমাদের সাময়িকভাবে দ্বায়িত্বশীল করতে পারে মাত্র, তাই আমরা যেভাবেই এগোতে চাই না কেন, রাজনৈতিক লাইন ধরেই এগোতে হবে।

সে যাই হোক, দীর্ঘকাল ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ বাস্তবকারণেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জনসংহতি সমিতিকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, সেকথা নিসন্দেহে বলা যেতে পারে। জনসংহতি সমিতির এযাবৎকালের রাজনৈতিক ইতিহাস প্রকারান্তরে জুম্ম জাতীয় রাজনৈতিক ইতিহাস এটা অস্বীকার করার জো নেই। জনসংহতি সমিতির সংগ্রাম আজ ৭২ থেকে হিসেব করলেও ৪০ বছর ইতিমধ্যে পেরিয়েছে। জনসংহতি সমিতির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলায় অনেক ক্ষত আছে, না শুকনো ঘা গুলো আজও প্রখড়ভাবে দৃশ্যমান। এ দীর্ঘ সময়ের রাজনৈতিক পথচলার অভিজ্ঞতা, সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার অভিজ্ঞতা, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতিগত ও কৌশলগত অবস্থান প্রভৃতি বিবেচনায় জনসংহতি সমিতির বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতাকে নির্মোহ বিচার করতে পারলে জুম্ম জনগণের আশু করণীয় ঠিক করতে এত বেগ পেতে হয় বলে মনে করি না। এই পর্যবেক্ষণটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কেননা সঞ্চিত অভিজ্ঞতার আলোকে এটি আমাদের জুম্ম জাতীয় জীবনে সম্ভাব্য আগামীর প্রতি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত নির্দেশ করে। যদি এটা ভুল অনুমান হয়ে থাকে, বিশ্বাস রাখি আমাদের বোধদয়টা সময়ের দাবীকে যথার্থ মূল্যায়ন করে সঠিকভাবেই হবে।

গোমতী, ফেনী, সত্তা, চেঙে, হাজলঙ, মেইনী, থেগা, শলক, বরগাঙ, সাঙ্গু, মাতামুহুরী বেয়ে অনেক রক্ত গড়িয়েছে। তোমার রক্ত-আমার রক্ত! থুমাচিঙ-র রক্ত, সবিতার রক্ত। ভরদ্বাজমণির রক্ত, মংসাচিঙ-র রক্ত, লালরিজার্ব বম-র রক্ত। বাতাসে মিশে আছে অসংখ্য তরুণের স্বপ্নভঙ্গের ইতিহাস, জুম্মবীর নীরব আর্তনাদ, মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ, বাপ-ভাইয়ের কষ্টমাখা দীর্ঘশ্বাস।

তবু দিনশেষে মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার স্বপ্ন, সাহস ও লড়াইয়ের আহবান জানানো সেই আদর্শিক জায়গা থেকেই আমরা নতুন আগামীর পথচলা শুরু করতে চাই। এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। চলছে লড়াই চলবে, লারমা সেনা লড়বে, জুম্ম জনগণের জয় অনিবার্য…


সুলভ চাকমা 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here